অজানা পথে – ৪র্থ পর্ব


৪র্থ পর্ব

বেশ ভোরেই হরতন বাবু বাসায় এসে উপস্থিত। ডাকা ডাকি করতেই আমি নিচে চলে গেলাম। নিচে যাওয়ার সময় মোবারকের বাসায় উকি দিয়ে দেখলাম ঘুম থেকে উঠেছে কিনা। মোবারকের কোন খবর নেই। হরতনকে দেখেই বললাম কি বাবু এত সকালে? কোন সমস্যা?
• নাহ দাদা কোন সমস্যা নেই
• কাল রাতেই চেয়েছিলাম একবার আসতে। সৌমিন দা আপনাকে যেতে বলেছে। চাকরীর ব্যপারে। আমার বাসায় কাল রাতে গিয়েছিল। বেশি রাত হয়ে গিয়েছিল তাই আর আমি বিরক্ত করতে চাইনি। চাকরির ব্যপারে সে অনেকটা নিশ্চিত। তবে ঢাকার দিকে হতে পারে। সরকারি চাকরি।
• তাই নাকি আমি এখুনি যাবো। সকাল সকাল একটা ভালো সংবাদ দিয়েছেন দাদা। আপনি আমার জন্যে অনেক করতেছেন। আপনি দেবদূত ছাড়া আর কেও না।
• লজ্জা দিবেন না, সময় হলে বাসায় যাবেন
• অবশ্যই যাবো। দাদা আমার তো কবুতরের ঘর, অনেক ইচ্ছে করতেছে আপনাকে বাসায় নিয়ে যেতে, কিন্তু লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় এ কথা মনে আসলে
• আহা ওসব রাখুন তো। আমি কি জানিনা? আপনার এ অবস্থায় তো আমি নিরলজ্জে মত আপনার নিমন্ত্রনের অপেক্ষা রাখিনা। তবে আপনাকে আমি আগেই বলেছি আমার বাসায় আপনি এই হরতন বাবু যতোদিন বেচে রইবে ততোদিন নিমন্ত্রিত।

মনটা অনেক হালকা লাগছে, আজকে সকালটা হঠাত অন্যরকম হয়ে গেলো। নিমিষে সব কিছু যেন আনন্দময় লাগছে। মোবারককে খবরটা দেই, আর হরতন দা যেহেতু নিজে এসে বলে গেছেন তাহলে চাকরি আমার এ যাত্রায় হয়ে যাবে। মোবারকের দরজার সামনে কড়া নাড়তে থাকলাম। কিহে মোবারক মরার ঘুম দিয়েচিস নাকি? দরজা খোল। ভাবি ও ভাবি দরজা খুলো। দরজা খুলল মোবারক, লুঙ্গি খুলে যেকোন মুহুরতে পরে যেতে পারে, সে কোন মতে লুঙ্গির মাথা ধরে রেখেছে। কি ব্যপার জাহিদ এই সকালে, আমি বললাম
• মরে গিয়েছিলি নাকি? গত ২০-২৫ তোর দেখা নাই। তোর সমস্যাটা কি?
• ভিতরে আয়। মরিনাই এখোনো জিন্দা আছি। তবে মরতে দেরি নাই
• হুম। আমার একটা চাকরি হতে পারে। সকালে হরতনের সাথে কথা হয়েছে। সে আমাকে এসে বলল। দেখি এ যাত্রায় যদি কোন গতি হয়। আর যদি না হয় তাহলে গ্রামে চলে যাবো। কাল রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করেছি
• দ্যাখ কি হয়, আমি তো আর কিছু করতে পারলাম না তোর জন্যে। কি করবো বল। অনেক ঝামেলায় আছি। কিছুই ভালো লাগছেনা
• শুন তোকে একটা কথা বলি, তুই নিজেই তোর ঝামেলা ডেকে আনতেছিস। তুই একবার ভালো করে চিন্তা কর কি করতেসিস। তুই এখন ছোট না। ছেলের বাপ। তুই যদি এমন করিস তাহলে ছেলেটা বড় হয়ে কি হবে একবার চিন্তা করেসিস?
• হুম।
• আজকে কি অফিসে যাবি? যাওয়া দরকার নেই বঊ পোলাপানরে সময় দে।
• জাহিদ তোর সাথে কিছু কথা বলব।
• বলে ফেল
• এখানে না। বাহিরে বলব। এক সাথেই বের হই। তুই রেডি হয়ে নে। আমি গোসল সেরে তোকে ডাক দিবনে।

কবুতরের খোপের মধ্যে ডুকে বসে বসে দুয়া করতে থাকলাম যাতে সৌমিন বাবুর কথাটা যেনো সত্য হয়। আর পারছিনা। আর না হলে কালকের মধ্যেই চলে যাবো গ্রামে। এই নরকে আর থাকতে চাইনা। অনেক হয়েছে। আমি একজন খোলা মনের উড়ন্ত মানুষ। জঞ্জাল আর চিপার মধ্যে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে যেয়ে ক্ষেত খামারি করবো।

মোবারকের সাথে অফিসের নিচের চায়ের দোকানটায় বসলো জাহিদ। বেশ গম্ভির মোনভাব মোবারকের মধ্যে। কিছুক্ষন পর জাহিদের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল আমি জোহরাকে তালাক দিবো। জাহিদের মাথায় যেন একটা বাজ পড়লো
• কি বলিছ? একি সর্বনাশের কথা। সকালে আমি তোকে কি বললাম আর তুই এগুলা কি বলচিছ?
• আমি আর পারতেছিনা দোস্ত
• এসবের মানে কি? তালাক দিবি মানে কি? তোর ছেলের কি হবে? আর ভাবি খারাপ কাজটা করেছে কি যে তুই ভাবিকে তালাক দিবি? তুই যদি ঠিক থাকিস তাহলে তো সব কিছুই ঠিক। আমার কাছে ঘটোনা কেমন জানি লাগছে। খুলে বলতো। সত্যি করে বলবি
• জাহিদ আমি কি করবো বুঝতেছিনা। আমি আরেকটা বিয়ে করেছি। দয়া করে তোর ভাবিকে আগে ভাগে কিছু বলতে যাছনে। আসলে বিয়েটা করেছি এক বছর যাবত। একটা সেমিনারে মেয়েটার সাথে আমার পরিচয় ঘটে। মেয়েটা থাকে ঢাকায়, রামপুরায়। পূর্ব রামপুরায়। বেশ টাকা পয়সা আছে, তবে মা বাবা নেই। নানুর কাছে মানুষ হয়েছে। স্থানীও।
• আমার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলা কি শুনাইতেছিস। তোর একটা ছেলে আছে, বউ আছে জেনেও এ কাজ কেন করলি? আর মেয়েটা কি জানেনা কিছু তোর ব্যপারে?
• মেয়েটাও কিছু জানেনা। সে গর্ভবতী হয়ে গেছে। দোস্ত আমাকে বল কি করবো। আমার মাথায় কিছু ডুক্তেছেনা। আমি মোহে পরে গেছিলাম। কথা বলতে বলতে আর মাঝে মধ্যে দেখা করতে গিয়ে একেবারে ধরা পরে গেছিরে। এখন আমাকে বাচা। আমি জোহরাকে তালাক দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখছিনা।
• জোহরাকে তালাক দিলে দিতে পারবি কিন্তু তোর ছেলেকে ? তাকে কি পারবি দূরে রাখতে? আর গ্রামে কি বলবি খালা খালুকে?
• ছেলেটার জন্যে কিছু করতে পারছিনা। তা না হলেই অনেক আগেই কাম সেরে ফেলতাম। আর ওই মেয়েটার কাছ থেকেও দূরে সরে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু ৮ মাস এর গর্ভবতী। সেটাও পারছিনা। আমার গেরাকলে পড়ে গেলাম রে।
• মেয়েটাকে ছেড়ে চলে আয়। তুই বলেছিস মেয়েটার টাকা পয়সার অভাব নেই। সে সামলিয়ে নিবে।
• বন্ধু, সে অনেক একা। বাবা মা অনেক আগেই হারায়ছে, এখন যদি আমি এমন করি তাইলে নিরঘাত মরে যাবে।
• আমার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে যাইতেছে। আমি এখন চলে যাবো। এ ব্যাপারে আমার কাছে কোন সমাধান নেই। তুই লোভে পরে এক সাথে কয়েকটা জীবন মেরে ফেলতেছিস। আমার কিছু বলার নেই।

মোবারক পারেনা আমার পায়ে ধরে বলে যে তোর ভাবিকে কিছু বলিস না যদি এর মধ্যে কোন সমাধান পাই। তারা যদি দুইজন দুইজনকে মেনে নেয় তাহলে তো কোন কথা নেই। আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। বললাম তোর কি মনে হয়, রুমের ভিতর দুইটা বিছানা রাখবি আর দুজনকে অদল বদল করে চুদবি আর তারা আরামে যৌন স্বাদ নিয়ে যাবে? এটা ভালোবাসার ব্যপার যৌন স্বাদের ব্যাপার না। আমি এখন চললাম। যা করেছিস ভালো করিস নি। আজিবন এর জন্যে মাথার চুল ছিড়বি।

সেদিন হরতন বাবুর বিশেষ আমন্ত্রণে তার বাসায় গেলাম। সৌমিন বাবুকেও আমন্ত্রন করেছেন। সৌমিন রয় মন্ত্রলানয়ে চাকরি করে। বয়স ৩৫ এর মতো হবে, দুই ছেলে ও এক মেয়ের পিতা, কিন্তু তার স্ত্রি মারা গেছেন ২ বছর হবে। অনেকদিন তার স্ত্রি অসুস্থতায় ভুগে মারা যান। উনার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ দু জায়গায় বাড়ি করেছেন। নারায়ণগঞ্জ তার পৈত্রিক বাড়ি। এখানেই তিনি ছুটির সময়গুলা ও সপ্তাহে ৩ দিন থাকেন। ছেলে মেয়েও এখানে থাকেন। একা একা সময় কাটেনা, তাই হরতন এর বাড়িতে তার আনাগোনা। বয়সের অনেক তফাৎ থাকলেও দুজনের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক। একজন আরেকজনকে দাদা বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে তারা একজন আরেকজনের চাচা-ভাতিজা সম্পর্ক। সৌমিন রয় এর পিতা হরতনকে ছোট ভাই এর মতোই দেখতো। কিন্তু সৌমিন ও হরতনের বয়সের তেমন তারতম্য না থাকায় আর একজন আরেকজনের সাথে বাল্যজিবনের অনেকটা সময় পার করার সুবাদে দাদা বলে সম্বোধন করেন। সৌমিন পড়াশুনা করেছেন অনেক। এলাকায় তার প্রভাব অনেক, নারায়ণগঞ্জ জেলা হিন্দু সমিতির যুগ্ন আহ্বায়ক। দুপুরে এক সাথেই বসলো সবাই।

সৌমিন বাবু বললেন দেখ জাহিদ দা, তুমার চাকরীটা হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে। সহকারি একাউন্টেন্ট। বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয়ে থেকে আমি সব কথা পাকা করে ফেলেছি। তুমি আজি একটা বায়ো ডাটা করে এনে আমাকে দিবে, আমি সেটা জমা দিয়ে পরের দিন ডাকযোগে তোমার স্থায়ী ঠিকানায় জয়েন লেটার পাঠিয়ে দিবো। এ নিয়ে কোন টেনশন নিওনা। আর সুখবর যে তুমার পোস্টিং ঢাকায় হচ্ছে। আগামি ৩ দিনের মধ্যে যাবতীর কাজ শেষ করে ফেলো। পাড়লে আমার অফিসে একবার যেয়ো। ৫-৬ দিনের মধ্যেই জয়েন করবে আশা রাখি। ঢাকায় তো কাওকে চিননা। তুমি আমার ঢাকার বাসায় উইঠো নাখাল পাড়ায়। কিছুদিন থেকে নাহয় নতুন বাসা খুজে নিবা। আমি বললাম দাদা আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দিবো বুঝতে পারছিনা। আমি ডিসিশন নিয়ে নিছিলাম এই সপ্তাহের মধ্যে গ্রামে চলে যাবো। আসলে মানুষের জীবনের কখন কোন পথে পরিবর্তন এসে যায় তা উপরওয়ালাই জানেন। আমি আপনার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ। সৌমিন বাবু হো হো করে হেসে বলল হরতন বুড়োটাকে দেন। অনেকদিন ধরেই আমার কানের সামনে ঢোল পিটিয়ে বাতিল করে দিচ্ছিলো। আসলে সরকারি চাকরির ব্যপার। সার্কুলার না হলে তো আর ঢুকানো যায়না। সার্কুলারটা কয়েকদিন পরেই দিবে মন্ত্রলানয় থেকে। সার্কুলার আর কি কাজ হয়? নাম মাত্র। লোকজন থাকলে হয়ে যায়। যদিও সামরিক সরকার একটু প্যাচ তো থাকেই। তা এবার বিয়ে থা করেই ফেলুন। আর একা বসে থাকা নয়। সুলেখা আমার দিকে মাথা নিচু করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সৌমিন দার মুখে বিয়ের কথাটা শুনেই। আমি চুপ করেই রইলাম। হরতন দা চিল্লিয়ে বলে উঠলো আরে আমি যদি মুসলমান হতাম তাহলে আজি পাত্রি খুজে এনে বিয়ে পরিয়ে দিতাম। ২৬-২৭ বছরের ছেলে। বিয়ের বয়স হয়ে গেছে আর কতদিন বসে থাকবে। তবে যাই হোক মেয়ে আমি খুজে আনবই মুসলমানের ঘর থেকেই, তখন কিন্তু এই বুড়োটাকে তুমার বউকে দিয়ে রান্না বারা করে খাওয়াতে হবে। আমি তাদের কথা একমনে শুনে যাচ্ছি। সুলেখা বলে উঠলো বিয়ে কি গ্রামেই করবেন? নাকি এখানেই? এখানে হলে কিন্তু আমাদের বাড়িতে রেখেই করাবো। বেশখানিক্ষন তাদের সাথে সময় বিনিময় করলাম। বিকেলের দিকে সবাই বিদেয় নিলো আমিও নিলাম। সুলেখা এসে বলল চলে যাচ্ছেন? বাসায় যেয়ে কি করবেন, বিয়ে করলে তো সারাদিন বাসায় থাকবেন বঊকে নিয়ে, তখোন তো আমাদের মনে পরবেনা। থেকেই যান না আরো কিছুক্ষন। আমি বললাম বাড়ির ভিতরে ভালো লাগছেনা। বাহিরের খোলা আকাশের নিচে একটু হাটা হাটি করে বাসায় যাবো। কোথায় যাবেন? আমি কি সাথে আসতে পারি? আমি বললাম অবশ্যই আসতে পারেন, তবে এই চিপা গলির ভিতর তো আর হাটা হাটি করতে পারবেন না। আমি হয়তো কিছুটা দূরে নদীর ধারে যাবো। সুলেখাও সাথে যেতে চাইলো ।

দুজনে শীতলক্ষ্যার তীরে হাটতেছি। সুলেখা বলল জায়গাটা অনেক সুন্দর লাগছে আজ তাইনা? আমি বললাম হ্যা ঠিক বলেছো। একজন পুরুষ সাথে থাকলে সব কিছুই স্বর্গীয় সুন্দর লাগে। ও* আচ্ছা তাই?* আর মেয়েরা থাকলে কি সুন্দর লাগেনা? খোচাটা কি একদিকেই দিলেন? –নারী থাকলে অনেক সুন্দর লাগে কিন্তু সে সুন্দরের মধ্যে অনেক ভয় থাকে। সেই সুন্দরতা বেশীক্ষণ থাকেনা, কিছু সময় পর নারী সৌন্দর্যকে নষ্ট করে সাথে তাকেও নষ্ট করে ফেলে।
• কথা কিন্তু একদমই ঠিক না জাহিদ ভাই, হয়তো আপনার জীবনে একটা ঘটনা ছিল তাই আপনি নারীর প্রতি দোষ টানছেন।
• নাহ, সে কারনে নয়। আখির প্রতি আমার ভালোবাসা অনেক ছিল। তখোন খেলার সাথী বলো আর যেই সাথী বল আমার বয়স তো তেমন ছিলনা। অনেকটা মায়া জড়িত ভালবাসা ছিল তার প্রতি। আর সে তো আমাকে ইচ্ছে করে কষ্ট দেয়নি, তার প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই। সে অনেক আগের কথা ওখানে নাহয় নাই গেলাম।
• তাহলে? তাহলে কেন বলছেন যে নারী সৌন্দরযকে গড়ে আবার নষ্ট করে।
• আসলে দোষটা নারীকে দিবনা, বিধাতা নারীকে সৃষ্টি করেছেন আবেগ দিয়ে। সুন্দরতা দিয়ে। পুরুষ তাকে দেখে প্রেমে পড়বে, ভালোবাসতে চাবে। কাছে টানতে চাবে। একজন নারীকে আপন করে নেয়ার মুহুরতে সে তার চারিদিকে অপার সৌন্দর্য, স্বর্গীয় সুখ সপ্ন দেখতে পায়। কিন্তু একজন মেয়ে সেটা বেশিক্ষন ধরে রাখতে পারেনা। সামান্য জোয়ারে তা ভেসে যায় স্রোতের টানে। লড়াই করার চেষ্টা করেনা। সে নিজেকে মারে সাথে অন্যকে।
• হুম, আসলে আপনারা বুঝবেন না। আমরা কতোটা অসহায়। সমাজের যে প্রান্তেই যান একজন পুরুষ দাড়াতে পারবে। একজন মেয়ে কি পাড়বে? তাকে বেশ্যা বলে গায়ে হাত দিতে চাইবে। যাই হোক আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ সেটা বলুন।
• আচ্ছা সেই দুপুর থেকেই হরতন দা, তুমি আর সৌমিন দা কি শুরু করেছো বলোতো। আমি কি একবারো বলেছি যে আমার যৌবন রসাতলে চলে যাচ্ছে।
• হি হি হি, রাগ করে ফেললেন নাকি বাবু। আপন করে নিয়েছি আমরা তাই অধিকার দেখাই। বলুন বলুন। আমি পাত্রি দেখবো। আমার অনেক বান্ধবি আছে অবিবাহিত। কলেজে তো আমার এক বান্ধবীর জন্যে এক ছেলে পারেনা সারাদিন শুয়ে থাকবে রাস্তার মাঝে, শুধু একবার দেখার জন্যে। কি তাকে দেখবেন?
• অবশ্যই দেখবো। যে ছেলে এমন এক সুন্দরি নারীর জন্যে রাস্তায় শুয়ে থাকে তাকে দেখার ও বিয়ে করার সৌভাগ্য যদি হয়। সে কি আমাকে পছন্দ করবে? আমার মত একজন ভবঘুরে ছেলেকে
• কেন করবেনা? অবশ্যি করবে। আপনি সুদরশন ছেলে। তবে জামা কাপর এত ঢোলা না পরলে আরো সুদর্শন লাগবে। আমি তাকে আজ-ই খবর দিবো হি হি হি……।। চলুন ওখানটায় বসি। পা ব্যথা করছে
সুলেখা তুমি অনেক সুন্দরি। তুমাকে দাদা বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেনা কেন? সুলেখা বলল আমি তো আপনাকে বললাম। বাবা চেষ্টা করেছিলো এক মুসলমানের ছেলের সাথে,পারেনি। আর হিন্দু ছেলেদের সাথে তো আমার বিয়ে আরো আগে হবেনা। তাদের জাত চলে যাবে ব্যাপার আছে। আমি বললাম যদি ধরো কোন হিন্দু ছেলের সাথে তুমার বিয়ে ঠিক হয় তখন? সুলেখা হেসে বলল, আমার এতে কোন আপত্তি নেই। আমি যখন রাস্তায় পড়েছিলাম কই কোন মুসলমান তো এগিয়ে আসলোনা। রাতে তারা আমার গায়ে হাত দিতে চেয়েছে। সেখান থেকে একজন হিন্দু লোক আমাকে তুলে এনেছেন। বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন। এমনকি তার পরিবার এর জন্যে তাকে ছেড়ে দূরে চলে গেছেন। আমার তো কোন হিন্দু বিদ্ধ্যেশ নেই। আমার কাছে সবাই মানুষ। বাবা আমাকে মানুষ ধর্ম শিখিয়েছেন। ভগমানের মধ্যে মানুষকে ভালোবাসা খুজতে বলেছেন। মানুষকে অবহেলা বা দূরে সরিয়ে দেয়া না। আমি আসলেই অনেক ভাগ্যবান, উনার মত একজন মানুষকে আপন করে পেয়েছি। সন্ধ্যে হয়ে এলো বলে, চলুন আগানো যাক।

দুজনে পাশা পাশি হেটে যাচ্ছি। আসলেই চারিদিকটা আমার কাছে অন্যরকম লাগছে। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা অনুভুতি। জীবনের অনেকটা পথে হেটে এসেছি বহু কষ্ট যন্ত্রনা আর অবহেলার মধ্যে। আজ সকাল থেকে আমার মন ভালো। উপরওয়ালাকে আমি মাঝে মধ্যে ধিক্কার দিতাম। তাহলে উনি কি আমাকে একটি দিন উপহার দিলেন? স্বর্গের সুখের একটি দিন। সুলেখার সাথে যখন আমার দেখা হয় আমার ভিতরে জোয়ার বইতে থাকে। এক মায়াবী আকর্ষণ আমাকে ঘীরে রাখে। এক মায়াবী বন্ধনে কে জানি আমাকে আটকে ফেলতে চায়। যেখান থেকে আমি ছুটতে চাইলেও আমার মন তাতে বাধা দেয়। কিশোরে প্রেমে পড়েছিলাম। আজ এই ভরা যৌবনে এ কিসের মায়া বইয়ে দিচ্ছে। আমি কি তাহলে আবার ভালবাসায় নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছি। ভাবতে ভাবতে হঠাত এক নিজের মধ্যে কম্পন অনুভুতো হলো, সুলেখার একটি কোমল হাতের স্পর্শ থেকে বয়ে যাওয়া তড়িৎ আমার সারা দেহের প্রতিটি কোনায় শিহরিত করে দিচ্ছে। সে অন্যদিকে মুখ করে, মুখে তার সেই সুন্দরতম হাসি নিয়ে হেটে চলেছে। যদি এ পথের কোন শেষ না হতো, পথ অজানা* থাকতো!! এতোদিন অজানা পথে হেটে আমি ক্লান্ত, কিন্তু আজ কেন মনে প্রানে চাচ্ছি পথ যেন হারিয়ে ফেলি।

রিক্সা দিয়ে সুলেখাকে গলির মাথায় নামিয়ে দিলাম। আমি বললাম তাহলে এখন যাই। -আচ্ছা শুনুন। এখোন কি নিজেকে হালকা লাগছে?
– হুম, উরন্ত পাখির মতো
– ঢাকায় চলে গেলে আসবেন না?
– আসবো না কেন? আমাকে যে এখানকার কিছু মানুষ আত্মার আত্মীয় বানিয়ে ফেলেছে। আমাকে যে আসতেই হবে। আর কিছু না হোক অন্তত…
– অন্তত কি?
– আচ্ছা আমি এখন যাই। পরে একদিন কথা হবে। দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে বাসার দিকে হাটা দিলাম।

জয়েন লেটার পোষ্ট অফিসের কর্মরত লিটন ভাই এর কাছে পৌছে গেছে, সে ডাকযোগে আর্জেন্ট আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ মাসের ১ তারিখ থেকে জয়েন করবো। এটা কি মাস চলে, আজকে তারিখ কত। মাথায় পেচ লেগে যাচ্ছে। অনেক অনুসন্ধানের পর বের করলাম আজ মঙ্গলবার। হালকা হালকা ঠান্ডা বইছে। শীতকাল আসবে তাই মাঝে মধ্যে ঠান্ডা বাতাস উকি দিয়ে যাচ্ছে। কোন এক বর্ষায় চাকরির সন্ধানে বাড়ি ছেরেছিলাম। চাকরীটা আজ পেয়ে গেলাম কোন এক শীত কালে। মা- বাবা থাকলে তাদের কাছে দোয়া নিয়ে আসতাম। দোয়া নেয়ার মত আমার মানুষ নেই তেমন। গ্রামের কিছু মুরুব্বি আছেন তাদের কাছে দোয়া চেতে যেতে হলে মিস্টি নিয়ে যেতে হবে। হাতে টাকা নেই। একেবারেই যাবো বেতন পেয়ে। তাদের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে আসা যায়। টেলিফোনে তাদের সাথে কথা বলতে পারলে দোয়া নেয়া যেত, পরে মিষ্টি দিয়া আসতাম। চাকরি শুরু হয়ে গেলে দোয়া কেমন কাজে দিবে জানিনা। আগে থেকেই চাওয়া উচিত। ভাবিকেও জানাতে হবে যে কনফার্মেশন পেয়েছি। মোবারককে জানাতে চাইলেও পারবো কিনা জানিনা। সে দেঊলিয়া হয়ে গেছে। তার নতুন হুরপরী নিয়ে ব্যস্ত। হুরপরী গর্ভবতি।

অবশেষে সেই কাঙ্খিত দিন এলো, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ভাবির বাসায় টোকা দিলাম, ভাবি এসে দরজা খুললেন, আমি বললাম ভাবি জানো তো আজ আমি চলে যাবো, ভোরে* রওনা না দিলে পরে আবার অফিসে যেয়ে পৌছাতে পারবোনা। ভাবি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে, তার চোখ ছল ছল করছে জলে, আমি বললাম মোবারক এসেছে? – নাহ আসেনাই, আপনি গোসল সেরে নিন আমি রুটি বানায়া দিতেছি। গোসল সেরে তৈরি হয়ে নিলাম। খেতে বসে ভাবিকে বললাম, ভাবি নিজের দিকে খেয়াল নিবে। মোবারক যাই করুক না কেন। সে তো মাসে মাসে টাকা দিচ্ছে। নিজের ছেলেটার দিকে নজর দিও, তার জন্যে চুপ করে থাকতে হলেও থেকো। — ঢাকায় কোথায় উঠবেন ঠিক হয়েছে? – হুম, সৌমিন দার ঢাকায় বাড়ি আছে, উনি কয়েকদিন ওখনে থাকতে বলছেন, বাসা ঠিক না হোওয়া পর্যন্ত উনার বাসায় থাকবো। অফিসের আশে পাশে যদি পাই তাহলে উঠে যাবো। সৌমিন বাবুর বাড়িতে কবুতরের ঘর আছে কিনা কে জানে, থাকলেও উঠবোনা, ভালো বাসায় উঠবো। ভাবি হেসে দিলেন, –এবার নাহয় বিয়েটা করেই ফেলুন, বড় বাসা নিয়ে কি একা একা থাকবেন বলুন? খাওয়া দাওয়া শেষে ভাবিকে বিদায় দিলাম, আপাতত ব্যাগে একটা সেট জামা কাপড় নিয়ে নিয়েছি, অবস্থা বুঝা হলে বাকিগুলা নেয়া যাবে। গত রাতে হরতন দার কাছে বিদায় নিয়েছি, সুলেখাকেও বলে এসেছি যদি পারি সকালে এসে দেখা করে যাবো। আর না পারলে বিদায়, আরেকদিন দেখা হবে। সুলেখা দূর রাস্তা পর্যন্ত চেয়েছিল, আমাকে কয়েকটা উপদেশ দিলেন, এক- শীত বইছে, ঠান্ডা কন কনে বাতাস, বাতাসে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে তাই মাফলার পেচিয়ে নিবেন। মোটা জামা কাপড় নিবেন। দুই—প্রতি সপ্তাহে অন্তত যেনো দুদিন এসে দেখা করে যাই। তার মধ্যে শুক্রবার অবশ্যই পুরো সময়টা তাদের সাথে কাটাতে হবে। গাড়িতে বসে সুলখার কথাগুলো বার বার চিন্তা করতেছিলাম। আসলেই মেয়ে মানুষ বিচিত্র, তারা খেয়ালি। ভাবি আমার খেয়াল নিতেন, সুলেখাও নিতে চায়। ভাবি হয়ত তার দায়িত্য পালন করছেন কিন্তু সুলেখা? তার তো আমার উপর কোন দায়িত্য নেই। তারপরও তার মায়া মাখা উপদেশগুলো আমার কাছে মনে হয় আমার উপর তার অধিকার আছে। আমি তার বাসা থেকে বের হলে দূরদৃষ্টিতে একমনে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখলে মনে হয় সে কিছু বলতে চায়, এখুনি দৌড়ে চলে আসবে। হুমমম, না বলা অধিকার চাপিয়ে বসে আছে।

অফিসে জয়েন করার পর অফিস বেশ ভালোই যাচ্ছে। সবাই আমার থেকে একটু বয়স্ক হলেও তারা আপন করে নিয়েছেন, অফিসে খোস-গল্প করেই অনেক সময় কাটিয়ে দিই। তারা আমার থেকে বয়স্ক হলে কি হবে তাদের কথাবার্তার অধিকাংশ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে তাদের বঊ। কাল রাতে কার বউ কিভাবে তাদের সোহাগ করেছে। কতক্ষন ঠাপিয়েছে এইসব বিষয়। মাঝে মধ্যে তারা একে অন্যের বৌকে হামলা করতেও দ্বিধা করেনা। এ নিয়ে বেশ রসিকতা হয় সবার মাঝে, ভাগ্যিস আমি বিয়ে করিনাই। তাছাড়া তাদের থেকে আমি বয়সে ছোট। আমার বৌকে নিয়ে যদি তারা এসব বলে তাহলে অবশ্যই আমার কাছে ভালো লাগবেনা। রসিকতার মাঝে হয়ত অনেক সময় নিতিবোধ থাকেনা। কিন্তু রসিকতা করে ফেললেন, আমার বৌকে কোন কারনে তাদের সামনে নিয়ে আসলাম, তারা মুখে ঠিকি ভালো ব্যাবহার করছেন, বলবেন ভাবি কেমন আছেন? ভাই তো আপনার খুব প্রশংসা করেন। আপনার রান্না নাকি অনেক ভালো, একদিন যেয়ে খেয়ে আসবো। কিন্তু মনের চোখ দিয়ে আমার বৌ এর স্তন চুষবেন, উচু নিতম্বে তাদের লিঙ্গ দিয়ে ঘসবেন। কিন্তু তাদের বৌকে দেখলে প্রথমে শ্রদ্ধা জিনিসটা আমার মাথায় আসে, যেহেতু তারা বয়সে বড়। আমার বৌ এর ক্ষেত্রে তাদের স্নেহ জিনিসটা আগে আসবে, সেই স্নেহের ফাকে তারা হাতায়া দিবেন কু-নজর দিয়া। — এই যে জাহিদ সাহেব ঘুম দিছেন নাকি?, নিচের দিকে তাকায়া কি ভাবছেন? রাতে কি ঘুম হয়নাই? সরকারি চাকরির এই এক সুবিধা, রাতে ঘুম ভালো না হলেও দিনে আরাম করে চেয়ারে বসে ঘুমানো যায়। আমি নিঃশব্দ হাসি দিয়ে খাতায় চোখ বুলাতে থাকলাম। অনেকদিন হলো বাড়ি যাইনা। তাছাড়া প্রায় এক মাস হয়ে গেছে চাকরি করছি। বেতন পেলে মিষ্টি নিয়ে প্রথমে হরতন দার বাড়ি হয়ে, সৌমিন দা ও ভাবিদের মিষ্টি দিবো, তারপর সেখান থেকেই বাড়ি চলে যাবো। একদিন দুদিন থেকে আসা দরকার। কেমন জানি হাপিয়ে উঠেছি। অফিস জীবন এর অভিজ্ঞতা আমার নেই, মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। দেখি আগামি শুক্রবার চলে যাবো, সকাল সকাল সবার বাসা ঘুরে বাড়ির দিকে রওনা দিবো। তাছাড়া এই সপ্তাহে যেভাবেই হোক আমাকে বাসা খুজে বের করতে হবে। পরগাছা হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছেনা। সৌমিন দার এলাকা নাখালপাড়ায় খোজা খুজি করেছিলাম, কয়েকটা পেয়েছি। তার মধ্যে একটা নিয়ে নিব।

বাহাদুরবাদ রেল আজকে অনেক ভিড় লেগে আছে। আসার সময় এক ভিড়ের মধ্যে এসেছি যাওয়ার সময় আরেক ভিড়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাজে সকাল ৮ টা। ট্রেন আসেনি এখোনো। স্টেশন মাষ্টার এর কাছে খোজ নিয়ে জানলাম ট্রেন আসতে আসতে সাড়ে ৮টা কি ৯টা বাজবে। সেই ফযরের সময় বের হয়েছি, তারাহুরো করে সবার কাছে বিদায় নিয়ে আসলাম এখোন বলে ট্রেন আসতে দেরি হবে!! *একটু ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস বইছে। শীতের জামা কাপড় নিয়ে বের হইনি। গ্রামে অনেক শীত পড়তে পারে। ভারতের মেঘালয় থেকে কন কনে বাতাস গৌড়িপুরকে শীতকালে বরফ বানিয়ে দেয়, শীতকাল শুরু হউয়ার আগেই। ওয়েটিং রুমে বসে রইলাম। ওয়েটিং রুমেও শান্তি নেই। বাচ্চা কাচ্চারা একে অন্যের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে। আর ঝাপ দেয়ার সাথে সাথে এত জোরে চিল্লান দিচ্ছে যে মনে হচ্ছে কান ঘেছে ফাইটার প্লেন যাচ্ছে। সকালে সবার সাথে দেখা হয়েছে কিন্তু আজো মোবারককে বাসায় পাইনি। মোবারকের কথা মনে পড়লে খুব জিদ হয়। প্রতি শুক্রবার নাকি সে বাসায় আসেনা। এটা একটা নিওম হয়ে গেছে।* শুক্রবারে সেই মেয়ের কাছে যায় মনে হয়। মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিস ভালো কথা। প্রেম করেছিস ভালো কথা, বিয়ে করতে গেলি কেন হাদারাম? চুলকানি উঠেছে যখন টেস্ট নিয়ে নিতি। জগতে চুপি চুপি কতরকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। প্রকাশ না হলে সবই ভালো। গর্দভটা একেবারে বিয়ে করে পেট বাধিয়ে দিয়েছে । ভাবির কথা মনে পড়লেও খারাপ লাগে। বেচারা পাগোল হয়ে গেছে। কথা বার্তার কোন ঠিক নেই। মাঝে মধ্যে বাসায় পাওয়া যায়না। অফিস থেকে বের হয়ে কয়েকবার বাসায় গিয়ে তাকে পাইনি, সন্ধ্যে রাতে সেজেগুজে কোথা থেকে যেন ফিরে।

এক লোক জাহিদের দিকে বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। জাহিদ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে আটটা বাজে। লোকটি কাছে এগিয়ে আসতেছে
• এই যে ভাই, আপনি উঠুন, এখানে একজন মহিলা বসবে।
• মহিলা? কই আমি তো কোন মহিলা দেখছিনা
• আছে উনি টয়লেটে গেছেন।
• টয়লেটে গেছে মানে? আপনি দেখছেন না এখানে পুরুষরা বসে আছে? আর সকালে এসে ওয়েটিং রুমে জায়গা রাখতে পারলেন না?
• ভাই আপনি উঠবেন? তা না হলে আমি স্টেশন মাষ্টারকে বলে ঠিকি জায়গা করে নিব। আপনি পুরুষ মানুষ। বাহিরে মেঝেতে চেগিয়ে বসে যাবেন। সমস্যা নেই
• ভাই আপনি এখন যান। আমি জায়গা দিতে পারবোনা।
• ভাই দেখেন মহিলা মানুষ, আর উনি অসুস্থ। তা না হলে কি আমি নিরলজ্জের মত আপনার কাছে জায়গা চাইতাম? আরো মানুষের কাছে যাইতে পারতাম কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হলো ভদ্র ঘরের ছেলে।

অনেকটা মেজাজ খারাপ নিয়েই ঊঠলাম। একটু পরে টয়লেট থেকে সেই মহিলাটা আসলো। তাকে দেখে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো। বিশাল দেহের অধিকারি। আমি আমার জায়গাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম অতটুকুতে তার হবেনা। আমার পাশে বসা দুইজনকে উঠতে হবে। এটা ভেবে এখন একটু ভালো লাগছে। ট্রেন আসার কোন খবর নেই। ষ্টেশন মাষ্টার এর রুমের দিকে এগুতে থাকলাম।
• মাষ্টার সাহেব ট্রেন তো এখোনো আসেনাই
• আসেনাই আসবো। আজকে আসবোনা কাইল আসবো। না আয়সা যাইবো কই?
• কি বলেন যাদের আজকে গ্রামে যাওয়া লাগবে তারা কাইল যেয়ে কি করবে?
• ভাই আমি ট্রেন চালাই না। কোন জায়গায় হয়তো আটকা পড়ছে। আয়সা পড়বো। আপনি বসেন, অপেক্ষা করেন
• ভাই রাত হয়ে গেলে একটু সমস্যা আমার জন্যে, আর একদিন দুদিন থাকবো। ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি করে তাই জানতে চেয়েছিলাম। আর এমনেও এলাকা ভালোনা বুঝছেন তো?
• ভয় পাওয়া লাগবোনা, আয়সা পরবো। ভাইজান করে কি?
• সরকারি চাকরি করি, বিদ্যুৎ অফিসে। থাকি ঢাকায়
• ঢাকা থিকা উঠতেন। এখান থিকা কেন? সিগারেট খাবেন? নতুন ব্রান্ড। আগে দেখিনাই। সকালে একজন দিয়া গেছে। বেনসন। সারাজিবন তো ফিল্টার ছাড়া টানছি। ফিল্টার সিগারেট টেনে আরাম আছে। কাশি কম হয়। ধরেন একটা ধরান। দাম আছে ২টাকা প্রতি পিছ। একজন দিয়া গেলো আমারে। তা ভাইজান যাবেন কোথায়?
• গৌরিপুর যাবো
• হুম, বউ পোলাপানরে দেখতে যাবেন?
• এখোনো বিয়ে করিনাই, তাই পোলাপান নাই।
• বসেন ট্রেন এসে পরবে যেকোনো মুহূর্তে, সিগন্যাল পাঠিয়েছে

অবশেষে ট্রেন আসলো, ভৈরবে রেলস্টেশনে আটকা পরেছিল। তাই দেরি হইছে। অনেক ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে চরলাম। বহুদিন পর আপন ঠিকানায় যাচ্ছি। নিজের সিট পাওয়াতে ভালো লাগছে, জানালার কাছে একটু পর ট্রেন তার লম্বা হুইসাল মেরে চলা শুরু করল আমার জন্মস্তান এর উদ্ধ্যেশে। আমার চিরচেনা সেই গ্রাম, মাঠ, জঙ্গলে ঘেরা ভুমি। কত পরিচিত মুখ, নিজের কাছে অনেক ভালো লাগছে। আমি এখন চাকরি করি। পকেটে টাকা নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি যাচ্ছি। মুরুব্বিদের বাসায় যেয়ে নিজ হাতে মিষ্টি দিয়ে আসবো। চাচা চাদিকে দিয়ে আসবো। কে জানে আখি এখোনো আছে কিনা। ইদানিং একটা সমস্যায় ভুগতেছি। আখির কথা মনে করতে গেলে সুলেখা এসে হাজির হয়। নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনা। নিজের মন নিজের কাছে খুব শক্তিশালী, তার সাথে লড়াই করা চলেনা। লড়াই করতে গেলে হার মেনে ফিরতে হয়। সুলেখা এই মুহূর্তে আমার মনের একটা বিশাল অংশ জুরে আমার মনের ঢাল হিসেবে লড়াই করে যাচ্ছে। তাকে যত দূরে সরাতে চাই সে তত কাছে আসতে চায়। আখি এতদিন আমার মনের পুরো অংশ জুরে ছিল। কখোনো কাওকে ভিরতে দেয়নি। আমি আখিকে সমর্থন করতাম। এখন তাকে সমর্থন করতে গেলেও পিছু হাটি। সুলেখা বাধা দেয়। মন কি তাহলে সুলেখাকে চায়?, তাকে কি ভালোবেসে ফেলেছে? অনেকদিন ধরে তাকে দেখছি, খুব কাছে থেকে তার সাথে কথা বলেছি। তার মায়া মাখা কথা আমাকে মুগ্ধ করে, সুলেখা কি আমাকে ভালোবাসে? নাহ এ কিভাবে হবে। হরতন দা বা কি মনে করবেন।

ট্রেনে আপন মনে ছুটে চলেছে। যেন কোথাও থামবেনা। দুপাশ দিয়ে গাছ গাছালি আবার ঘন জঙ্গলে ঘেরা। দিনের বেলায় অন্ধকার। আবার মাঝে মাঝে আলো উকি দিচ্ছে। বহুদিন নোংরা পরিবেশ আমাকে অসুস্থ করে দিয়েছে। রাস্তা ঘাট নর্দমায় নোংরা জিনিসে ভর্তি। গোসল করতে পারিনি অনেকদিন শান্তি মত। গ্রামে যেয়ে পুকুরে ডুবিয়ে গোসল করবো। বহুদিন ডুবিয়ে গোসল করা হয়না। সেই ছোটবেলায় মার হাতে কত বকা খেয়েছি। সারাদিন পুকুরের মধ্যে পড়ে থাকতাম। মা পুকুর পারে লাঠি নিয়ে দাড়িয়ে থাকতো। বেলা গরিয়ে গেছে তাও পুকুর থেকে উঠার নাম নেই। লুঙ্গি দিয়ে মাছ ধরেছি। মার সামনে যেয়ে মাছ ছেরে দিয়ে দৌড় দিয়েছি, বাসায় ফিরলে মা কিছু বলতেন না। আদোর করতেন।* এখোনো সেই পুকুর আছে, মা চলে গেছেন। আমি এখন সারাদিন ডুবিয়ে গোসল করলেও মা কিছু বলবে না, লাঠি নিয়ে তাড়া দিবেনা। পুরোন সেই সুখ স্মৃতি করতে করতে চোখে ঘুম এসে যাচ্ছে। ট্রেনের ঝাকুনি আর শব্দ প্রথমে খারাপ লাগলেও একসময় দোলনার মত কাজ করে। তখোন ঝিমুনি ধরে, ঘুম চলে আসে। বাচ্চা কাচ্চার ও মহিলাদের শব্দ এখন নেই। সবাই ঝিমাইতেছে। আমারো প্রচন্ড ঝিমানি ধরেছে। আটকে রাখতে পারছিনা চোখ। যেকোনো মুহূর্তে চোখ বুজে যাবে। নাহ ঘুমিয়ে নেই। এখোনো অনেক পথ বাকি। আজকে আমার সাথে কিছু নেই। চুরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বেশ রাত্রি করেই স্টেশনে পৌছালাম। ষ্টেশনে কিছুটা ভীড় হলে দূর চোখে নির্জন অন্ধকার। বেশ কন কনে বাতাস বইছে। বাড়ির দিকে হাটা দিতে গিয়ে একবার মনে হলো পোষ্ট অফিসের দিকে যাই। বাড়িতে তো কেও নেই। যেয়ে কি করবো। যদি লিটনকে পাওয়া যায়। অফিসে যেয়ে লিটনকে পাওয়া গেলো। গলায় মাফলার লাগিয়ে পা নাড়িয়ে খাতা দেখে যাচ্ছে। হিসেবের খাতা। পোস্ট অফিসে কে কার একাউন্টে কত টাকা জমা রাখলো। তার সাথে ক্যলকুলেটর দেখে বুঝা গেলো। তার কাছে যেতেই লাফিয়ে উঠলো – আরে জাহিদ, একেবারে ভুতের মত এসে হাজির হলি যে? ফোন তো দিলিনা আসার আগে। অনেকদিন পর তোকে দেখলাম। – এইতো লিটন ভাই আমি আছি ভালো। বাড়ির দিকে হাটা দিছিলাম কিন্তু চিন্তা করলাম যদি আপনাকে পাওয়া যায়। একেবারে মাফলার পেচিয়ে রাতের ডিউটি দিচ্ছেন যে। – আর বলোনা পোষ্ট অফিসের চাকরির কোন টাইম নেই। তা তো্র কি অবস্থা ? বোস, তা জয়েন করেছিস? জয়েন লেটার দেখে আমি তো অবাক হয়েছিলাম একেবারে ঢাকায় কাম সেরে দিলি। ভালো দান দিয়েছিস বটে। – হুম, জয়েন করেছি আর এক মাস ও হয়ে গেলো, প্রথম প্রথম তো হাপিয়ে উঠেছি তাই চিন্তা দুদিন বাড়িতে থেকে যাই, মা-বাবার কবরটা জিয়ারত করা দরকার। – কিছু খেয়েছিস? দাড়া একটু বোস, রফিকরে পাঠাই, পুরি পেয়াজু নিয়া আসুক। বাজার এখোনো খোলা আছে।

লিটন আমার থেকে বয়সের বেশি বড় না। তবে একসাথেই পড়াশুনা করেছি। আমার প্রতিবেশি। সে এখোনো বিয়ে করেনি। মেয়ে পাচ্ছেনা তার পছন্দ মত। যেগুলো পায় ওগুলার পরিবারের সাথে লেনদেন এর বিষয়ে একমত না হতে পেরে শেষ মেস বিয়ে আর ঠিক হয়না। ওর চরিত্র সব দিক দিয়ে ভালো হলেও, টাকা পয়সার দিকে লোভ বেশি। বিশাল অঙ্কের যৌতুক দাবি করে বসে। শিক্ষিত ছেলে যদি যৌতুক চায় তাহলে সেটা লজ্জাজনক, তার উপর ছেলের চাকরি আছে, এমন তো নয় যে বেকার। বিয়ে তাদের কাছে মুখ্য বিষয় না, কন্যা তাদের কাছে কোন ব্যপার না, লেংরা, লুলা আন্ধা হলেও চলবে তবে তাকা চাই। এই প্রত্ত্যন্ত অন্ধলে যৌতুক একেবারে পেয়ে বসেছে।

লিটনকে অনেকটা মলিন মুখেই বললাম
• আখি কি এখোনো আছে?
• হুম আছে, আজকে সকালেও দেখেছি।
• সে কি তার জামাই নিয়ে আয়ছে?
• তার জামাই নিয়া আসলে তো দেখতাম, জামাই নিয়া আসেনাই। কোন নতুন পোলা তো দেখিনাই। আর আমিও বুঝলাম না সেই যে বিয়া করে গেলো একবারো জামাই নিয়ে আসলো না। কেমন মাইয়া, আর তারে জামাই কিছু কয়না?
• হুম, এতো কিছু তো জানিনা। হইতে পারে জামাই হুজুর মানুষ। শ্বশুর বাড়িতে আসতে লজ্জা পায়। আর শুনেছি বহুদুরে বিয়া করাইছে, এই জন্যে আসেনা মনে হয়। আপনে আর কতোদিন? যৌতুক এর লোভটা এবার ছারেন, পরে টাকা দিয়াও মাইয়া পাইবেন না। চাকরি করেন যৌতুক এর কি দরকার?
• আহা, যৌতুক তো বিষয় না। আর আমার তো চাকরি ছাড়া আর কোন সম্পত্তি নাই। ধরেন কোন কারনে আমি লুলা হইয়া গেলাম, প্যরালাইসিস হইয়া গেলো, তখোন বঊ পোলা দেখবো কে? মাইয়ার সম্পত্তি তো খাইবো ভাইয়েরা। শরিয়তে আছে সম্পত্তিরে তিনভাগ করলে এক ভাগ পাবো মাইয়া আর দুই ভাগ পোলা। কিন্তু দেখ কয়টা মেয়েকে তার ভাইয়েরা সম্পত্তি দিচ্ছে? আমার দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তো মেয়েরা ভাইয়েরা আমার পরিবারকে দেখবেনা। যৌতুক দরকার আছে, এতাকে যৌতুক না বলে বলো অন্য এক মাধ্যম মেয়ের পাওনা আদার এর। আর পোস্ট অফিসে চাকরি কইরা কিছু হয় নাকি? বিয়া সাদি জটিল বিষয়। টাকা পয়সার মামলা। তারপরও মাইয়া তো জুইত মতোন পাইনা।
• লিটন ভাই বাড়িত যাবেন কখোন? গেলে এক সাথেই যাই
• এইতো যামু আধা ঘন্টা পর। এক সাথেই যামুনে। তোর বাড়িত তো সারাদিন দরবার লাইগা থাকে। তোর চাচারা যা শুরু করছে। ইদানিং তোর চাচার গলা কম শুনা গেলেও তোর চাচাতো ভাইরা তো খুনা খুনি করে পারলে। গ্রামের মাইনসের সাথে জায়গা জমি নিয়া সারাদিন খেচ খেচ লাইগা থাকে। কাসেম চাচায় জমি ঠিক রাইখা আইল ছাইরা দিসে, সেই আইল কাইটা চিকোন কইরা দিছে। মানুষ কেন পিপড়াও হাইটা যাইতে পারবনা। এতো চিকোন কইরা দিছে। এই নিয়া ব্যপক লাগা লাগি। কাসেম চাচার পোলা উকিল না হইলে এতদিনে তিনি খুন হইয়া যাইতো। সাহস আছে তোর ভাইগো। উকিলের বাপরেও পাড়লে ছারেনা। চল বাড়ির দিকে হাটা দেই।

খুব সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল, বহুদিন পর সকালে মোরগের ডাক শুনতে পাইলাম। বিছানা ছারতে মন চাইছেনা। কুয়াশায় ঘর ছেয়ে গেছে। আশে পাশে কিছু দেখা যাচ্ছেনা। সকাল ৭টা বাজে, গ্রামাঞ্চলে এতো সকালে ঘুম থেকে উঠলেও কেও ঘরের বাহির হয়না। মহিলারা রান্নাঘরে থাকেন। ছেলেরা লুঙ্গি হাটুর উপর উচিয়ে পিরার উপর বসে দাত মাজেন, নাহয় আকাশের দিকে তাকায়া আপন মনে ভাবতে থাকেন। তার পাশে বদনা থাকে। ওই বদনা দিয়ে তারা মুখ কুলি ও বাথরুমের কার্যাবলী সারেন। আমার আকাশের দিকে ভাবার মতো কিছু নেই। আমার ঘরে রান্না করার মতো কোন মহিলা নেই। খাওয়া দাওয়া বাজারে করতে হবে। বিবাহ না করা পর্যন্ত আমার ঘরে চুলা জল্বেনা। ঢাকায় এখোনো পরগাছা হয়ে আছি। নারায়নগঞ্জে নাহয় কিছু মানুষ আমাকে আপন করে নিয়েছে, ঢাকায় আমাকে নিবার মতো কেও নাই। ঢাকার মানুষের সাথে আমি পরিচিত না। অফিসের কেও আজ পর্যন্ত দাওয়াত করলো না। সৌমিন দার বাসার দারোয়ানের বউ রাইন্ধা দেয়। সৌমিন দার বাড়িতে তার বোন ও বোন জামাই থাকেন। আমি নিচের তলার একটা কোনের ঘরে উঠেছি। দারোয়ানের ঘরের পাশেই। সৌমিন দার বোন ও বোন জামাই দুজনেই শীক্ষকতা করেন, তারা অনেক ব্যাস্ত। দেখা খুব কম হয়। কথা তেমন বলেনা। ঘরকুনো টাইপের দুজনেই। ঢাকায় যারা থাকে তাদের হাতে সময় কম। তারা কাজে ব্যস্ত থাকে। আপন করে নিবার মতো তাদের হাতে সময় কম। টাকা টাকা দুনিয়ার সব কিছু হচ্ছে টাকা। নাহ আর বিছানায় থাকা যাবেনা। বাজারের দিকে যাওয়া দরকার।

ঘর থেকে বের হয়ে আখিদের ঘরটা চোখে পরলো। দরজা এখোনো চাপানো। আখি কি এখোনো ঘুমাচ্ছে? সে কি টের পেয়েছে আমি এসেছি। টের পেলেও লাভ হবেনা। আমার খারুস টাইপের চাচা তাকে আমার সাথে কথা বলতে দিবেনা। কিছুক্ষন নিশব্দে চাচার ঘরের চারিপাশে পায়েচারি করে বাজারের দিকে রওনা দিলাম। শীতকালে কুয়াশার শিশিরে ঘাস পানিতে ভিজে চুবসে হয়ে আছে। মাটি নরম হয়ে গেছে। আমার পা নরম মাটিতে পা রাখা মাত্রই পিছলে যাচ্ছি। কোনমতে আইল ধরে হাটতে হাটতে বাজারের দিকে গেলাম। বাজারের মাথায় কাসেম চাচার নজরে আসলো। এক ঠ্যাং টেবিলের উপর তুলে বিড়ি টেনে যাচ্ছেন। আমাকে দেখেই বললেন- তাইলে আয়ছো, আমি তো মনে করছিলাম তোমার খোজ পামুনা, আর আয়বানা। লিটনের কাছে মাঝে মধ্যে জিগাইতাম। বহো। কেমন আছো? এই সকালে খুম ভাইঙ্গা গেলো যে? খানা পিনা করছো নি?– নাহ এখোনো করিনাই, বাজারে আয়ছি এর জন্যে, আমি আছি ভালো। আপনে আছেন কেমন?- আর ভালো। তুমার চাচার জালায় তো থাকতে পারিনা। বেটা এমনিতে ফকির, কয়দিন পর হবে দেউলিয়া। ফকিরে দেঊলিয়া হবার সখ জাগছে। আমি কিন্তু ছাড়ুম না। সামনে ইলেকশান-এ দারাইতেছি। সরকারি দলের চামচামি আমি ছুটাইতেছি। নেতাগিরি করে, ভয় দেখায়। আমার পোলায় তো মামলা ঢুকায়া দিবার চাইতাছে। খালি প্রতিবেশী দেইখা কিছু কইতাছিনা এখোনো। গ্রামের সবাই আমারে সম্মান করে। আর হারামজাদা ফকিরে দেঊলিয়া আমারে চোখ গরম দেখায়। মাঝে মধ্যে মন চায় ওর চক্ষু আমি সরকারি চুক্ষুদান হাসপাতালে দান কইরা দেই। বয়স হইছে এখোনো চোখের পাওয়ার কমেনাই।

যাই হোক ভাইস্তা, তুমার বাপ অনেক ভালা মানুষ ছিলো। এই জন্যে কই শিক্ষিত মাইনশের দাম আছে। বুঝ গেয়ান আছে। চলো হোটেলে যাইয়া বসি।
• তা তোমার কি কিছু হইলো? চাকরি পাইছোনি? লিটন একবার কইছিলো চাকরির কথা। কি অবস্থা? আর আমার পোলারে কইয়া রাখছি দেখতে
• হা চাচা বিদ্যুৎ অফিসে হইছে। ঢাকায়। ভালোই আছি। আরামের চাকরি।
• হুম ভালো, তাইলে আর গ্রামে থাকবানা। চাকরি যখন হইয়া গেছে বিয়া সাদি করে বউ ঢাকায় নিয়া যাওগা।
• হুম, গ্রামে তো আর থাকা হবেনা। দেখি মাঝে মধ্যে যদি আসা হয়। আর পিছুটান নেই আসতে মন চাবে কিনা কে জানে। নারায়ণগঞ্জে ছিলাম একবারো আসতে মন চায়নাই। চাকরি ঠিক না হইলে হয়তো আয়সা পরতাম, ক্ষেত খামারি করতাম
• হুম, এখোন তো আর করবানা, বরগা দিয়া তো তেমন টাকা পয়সা পাওনা। তোমার চাচার জালায় তো আবার কিছু করতে পারোনা। জায়গা জমি বেইচা দেও। ভালো দাম পাইবা
• বাপের সম্পত্তি বেচতে মন চায়না চাচা
• সম্পত্তি যদি জীবনের শত্রু হয় তাইলে রাইখা তো কোন লাভ নাই। ভালো দাম পাইবা, বেইচা দেও, তাছারা তুমার ভিটা ঘরটা তো সলিড, উচা মাটিত করছে। ওইটা ডাবল দাম পাইবা
• নাহ চাচা, সব বেচুম কিন্তু ভিটা মাটি বেচতে পারুম না।
• দেখো যা মনে হয়, তবে বেচলে আমারে কইয়ো। ভালো দাম দিবনে।

জগতের মানুষ সুযোগ সন্ধানি। তারা এই সুযগের জন্যে নিজের চেহারা বেবুনের মতো করে ফেলে। কাসেম চাচাও তাদের মধ্যে একজন। তিনি আমাকে যতটুকূই উপকার করেছেন, বিনিময়ের মাধ্যমে করেছেন। তার কাছে যে জায়গাগুলো বরগা দিয়েছি তা অন্য কাওরে দিলে ডাবল দাম পেতাম। কিন্তু কেও সাহস করে নিতে চাইবেনা। এই সুযোগটা কাসেম চাচা নিলো। কাসেম চাচাকে বিদায় জানালাম। তার কথা শুনতে ভালো লাগছেনা। সুযোগ সন্ধানি মানুষের সামনে বসে থাকাও নিরাপদ না। যেকোনো সময় সে কোন সুযোগ খুজে আমার উপর চড়াও হবেন। সেই সুযোগ অবশ্যই কোন আর্থিক সুযোগ ছাড়া অন্য কিছু হবেনা। মুরুব্বি মানুষ, তার নরম আখির আখির চাওনিতে আমার অনিচ্ছা মনকে গলিয়ে কিছু আদায় করে নেবেন। তার চেয়ে ভেগে পড়াই ভালো। এতো সাকালে দু চারটা দোকান ছাড়া আর কোন দোকান খুলেনি। পথের কিনারা দিয়ে বাসার দিকে হাটা দিলাম।

কিছুদুর যেতেই মেয়েলি কন্ঠের ডাক পেলাম। জাহিদ এই জাহিদ। পিছনে তাকাতে গিয়ে পিছলে আরেকটু হলে নামায় পড়ে যেতাম। ফিরে দেখলাম অন্তরা। তার নাম অন্তরা দাস। পরিচয় অন্তরে অন্তরে গোপন খেলা। কলেজে আমার সাথে পড়েছে। তবে আর পাশ করতে পারেনি। আমার কলেজের এক শিক্ষকের সাথে তার বেশ ভালো খাতির ছিলো। শ্যম বর্ণের ভালো সাস্থের অধিকারি। তবে তাকে মোটা বলা যাবেনা। পেট সমতল কিন্তু পাছা পাহাড় উত্তাল। ৭ বছর আগে কলেজের শেষের দিকে বিয়ে করেছে গ্রামের একজনকে, সেই শিক্ষক তাকে আর বিয়ে করেনি কারন শিক্ষক ছিলেন বিবাহিত। মুখে শুনেছি স্যার সাথে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। আমিও সেই মুখের কথায় বিশ্বাস করেছি, কারন তার পাছা কলেজের পড়ার সময় দিনকে দিন উচু হয়ে পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। সে পাছা নাড়িয়ে নাড়িয়ে আমার কাছে আসলো, সাথে তার ছেলে, আমাকে জিজ্ঞেরস করলো
• কিরে কেমন আছিস, তোকে তো পাওয়াই যায়না, চাঁদ হয়ে গেলি নাকি। কতোদিন দেখিনা
• দেখবি কিভাবে জামাই সেবা নিয়ে বড় ব্যস্ত আছিস যে।
• হ জামাই সেবা করে তো কুল পাচ্ছিনা। সেই কতোদিন তোকে দেখিনা। বিয়ের পর তো আর তোদের অনেকের সাথে আমার দেখা হলোনা। জামাই নিয়ে ঢাকা্তেই থাকি। গ্রামে আসলে একদিন থাইকা আরেকদিন চইলা যাই। জামাই ছুটি পায়না।
• হুম তোর ছেলে নাকি? বেশ বড় হয়ে গেছে, জামাই করে কি?
• জামাই একটা ফ্যক্টরিতে চাকরি করে, প্রডাকশন ইন-চারজ। তুই কি করিছ? বিয়া করেছিস?
• নাহ করিনাই। চল হাটতে হাটতে কথা বলি। তা ভালোই আছিস দেখে বুঝা যাচ্ছে। কলেজে থাকতেও ভালো ছিলি হরিপদ স্যারকে নিয়া
• দেখ মশকরা করবিনা, কলেজে তোরা আমারে কম জালাস নাই। হরিপদ স্যার তো আমার প্রেমে পড়ছিল। আমার কাছে ঘেঁষতে চাইতো আর তোরা আমারে নিয়া নাটক বানাইলি।
• হা হা হা হা হা, আমি কি তোরে খোচাইতাম ক?
• কথা কবিনা তুইও কম ছিলিনা। তলে তলে ঠিকি খোটা দিসছ, তোগো লাইগা পরে আর পরীক্ষায় পাস করিনাই
• হুম, এখন আমাগের দোষ। বল যে তোর জামাই সেবা করতে করতে আর পরীক্ষায় পাস করিস নাই। যাই হোক আমিও গ্রামে থাকিনা, ঢাকায় থাকি। তুই ঢাকার কোথায় থাকিস।
• মহাখালি। নাবিস্কো এর দিকে থাকি, ঢাকায় গেলে বাসায় যাইছ, ঠিকানা দিমুনে। পোলা নিয়া সারাদিন ব্যস্ত থাকি। স্কুলে পাঠায়া সারাদিন বইসা থাকি। এখোন কি বাড়িত যাবি? চল আমাগের বাড়িত চল।
• নাহ আরেকদিন, ঢাকায় গেলে দেখা হইবনে। ঢাকায় তো আমার পরিচিত কেও নাই, সারাদিন অফিসে সময় কাটাই। দেখিস তো আমার জন্যে কোন বাসা পাওয়া যায় কিনা। আমি তোর থিকা বেশি দূরে না কাছেই থাকি। নাখালপাড়া।

আচ্ছা দেখুমনে, ঠিকানা ধর, আমার পোলারে দেখলি কিছু জিগালিনা যে? তোরা আসলে হারামি, খালি পারস মাইয়া মাইনসের পাছার দিকে তাকায়া থাকতে, নির্লজ্জ। — খাইয়া খাইয়া পাছা এতো ঊচা করলে মাইনসে তাকাইবোনা কি মহিষ তাকাইবো? হা হা হা হা –- ভাগ হারামি, খাসর জানি কোথাকার। ঢাকায় গেলে বাসায় যাইস, তোর দুলাভাই এর সাথে পরিচয় করায়া দিবানি। মাথা বাকা করে অন্তরার পাছা দেখতে দেখতে বাড়ির দিকে হাটা দিলাম, অন্তরা বড় রাস্তা ধরে পাছা নাচিয়ে একবার বামে আরেকবার ডানে হেলিয়ে দুলিয়ে হেটে যাচ্ছে।

2 thoughts on “অজানা পথে – ৪র্থ পর্ব

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s