শরীরের মিষ্টি গন্ধ


বাসে উঠে রাশেদ ভাল করে তাকিয়ে দেখলো বাসের সব সীট পুর্ণ। শুধু ডান পাশের তরুনীর পাশের সীটটি খালি। কেমন অবাক লাগে। পুরো বাসে সব সীটে লোকজন বসে আছে কিন্তু সুন্দরী এই তরুনীর পাশে কেউ বসেনি। এটা যে ইচ্ছেকৃত তা বোঝা যায়। কারন মেয়েদের পাশে বসা অনেক ঝামেলার, অনেক কিছু ভাবতে হয়। গায়ে গা লেগে গেলো কিনা। নিজের অজান্তেই অশোভনীয় কিছু ঘটে গেল কিনা। অনেক যাত্রী আড়চোখে তাকিয়ে থাকে। পাশের মেয়েটিও সাবধানী চোখে লক্ষ্য রাখে। সব মিলিয়ে বিরাট ঝামেলা। তাই পারতপক্ষে রাশেদ মেয়েদের পাশে বসে না। তবু এই ক্লান্ত দুপুরে দাড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করলো না বলে রাশেদ এটা সেটা ভাবতে ভাবতে বসেই গেলো মেয়েটির পাশে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটির চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। সামনে রাখা কালো ব্যাগে হাত রেখে উদাস চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে। সে যে বসেছে তাও খেয়াল করেনি ভাল করে। হাতের নখে মেহেদী দেয়া। হয়তো ঈদে দিয়েছিল।

এক পাশে সরে বসে রাশেদ মোবাইল খুলে ই-মেইল চেক করছিল। কিছুক্ষন পর হঠাৎ করেই অনুভব করলো তার কাধে মেয়েটির ভর। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মেয়েটি তার কাধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। এ রকম এর আগে কখনো হয়নি। সে বেশ অবাক এবং একই সঙ্গে অপ্রস্তুত বোধ করলো। সে সরেও বসতে পারছে না। ঘুমন্ত একজন মানুষের অসুবিধা হয় এমন কিছু করাও যায় না।

মোবাইল পকেটে রেখে রাশেদ স্থানুর মত বসে রইলো। মেয়েটির ঘুমের সুবিধার জন্য রাশেদ নিজের অজ্ঞাতসারেই আরো সরে এসে মেয়েটির গায়ে গা লাগিয়ে বসলো। কিছুক্ষন পর সে বিপদ টের পেলো। মেয়েদের শরীর এমন গরম হয় তার জানা ছিলনা। চিরকালের সুবোধ বালক সে। কোন মেয়ের সঙ্গেই তার খাতির জমেনি এতোটা বছর। একেবারেই অনভিজ্ঞ মেয়েদের ব্যাপারে সে। মেয়েটির শরীর থেকে কেমন ভাপ ঊঠছে মনে হচ্ছে। কেমন তুলতুলে মেয়েটার গা। মেয়েদের শরীর এতো নরম হয় নাকি? মেয়েটির গা থেকে সুন্দর গন্ধ আসছে। সুগন্ধী মেখেছে হয়তো। বাতাসে চুল উড়ছে। কিছু এসে তার মুখেও লাগছে। চুলে শ্যাম্পু দেয়াতে চুলেও মিষ্টি গন্ধ। অবাক ব্যাপার একটা ভালো লাগা বোধ সারা শরীর জুড়ে ঘুরছে। আহা!

বাসের ঝাকুনিতে ঘুমিয়ে থাকা তরুনীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাশেদের ভাবনাও থেমে যায় সঙ্গে সঙ্গে। মেয়েটি লজ্জিত চোখে রাশেদের দিকে তাকিয়ে থেকে একটু মনে হয় হাসি দিলো। রাশেদের তাই মনে হল । খুব আস্তে প্রায় কষ্ট করে শুনতে হয় এমন স্বরে মেয়েটি বললো, সরি। রাশেদ ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে বললো,
: না না, সরি কেন? ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই। আমি কিছু মনে করিনি।
: ছিঃ ছিঃ আমি এভাবে ঘুমিয়ে গিয়ে আপনাকে বিব্রত করেছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমি কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম তাই বুঝতে পারিনি কখন ঘুমিয়ে গেছি।
: আপনি শুধু শুধু নিজেকে দোষী ভাবছেন। আমি কিছুই মনে করিনি। রাশেদ প্রায় বলে ফেলছিল আমারতো বেশ ভাল লাগছিল। কিন্তু কোনমতে সেটা আটকালো । কি ভাববে মেয়েটি। নিজের উপর বিরক্ত হল সে। সাবধানে কথা বলতে হবে। কখন কি বলে ফেলে।

কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ। বাস ছুটে চলেছে উর্ধঃশ্বাসে। মেয়েটি নড়েচরে বসে চুল ঠিক করলো। উড়না ঠিক ঠাক করে ব্যাগ খুলে পানি খেলো। এক ফাকে মোবাইল খুলে কল লিষ্ট দেখে নিলো। আড়চোখে মাঝে মাঝে রাশেদকেও দেখছে রাশেদ ঠিক বুঝতে পারছে।

: আপনি কোথায় যাবেন? মেয়েটি এবার বেশ স্পষ্ট করে বললো।
: ঢাকা। রাশেদ বাধ্য ছেলের মত বললো। একটু থেমে বললো, আপনি?
: আমিও ঢাকা যাচ্ছি। বলেই বললো,
: আচ্ছা আমরা অনেকক্ষন পাশাপাশি বসে আছি অথচ কেউ কারো নাম জানি না।
: আমি রাশেদ। ঢাকায় থাকি। পড়াশোনা শেষ। চাকুরী করছি একটা ফার্মে। গ্রামে গিয়েছিলাম মা কে দেখতে। ট্রেন পাইনি বলে বাসে যাচ্ছি। আপনি?

হড়বড় করে একসঙ্গে সব বলে ফেললো রাশেদ। মেয়েটি জবাব না দিয়ে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে হেসে ফেললো। রাশেদ বোকার মত এদিক সেদিক তাকালো। বুঝতে পারল না তার ভুল কি হল। তার এই নিরীহ প্রশ্ন শোনে মেয়েটি হেসে দিল কেন? সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললো,
: আপনি হাসছেন যে?
মেয়েটি আবার হেসে দিয়ে বললো, কোথায় হাসলাম। এই যে দেখেন আমি কেমন গম্ভীর। বলেই আবার হাসি।

রাশেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির মুখের দিকে। এমন করে কেউ হাসতে পারে? কি সুন্দর নির্মল হাসি। হাসির দমকে চোখগুলো ছোট হয়ে আসছে। কেমন একটা ঝিলিক চোখেমুখে। দাতগুলো পাশাপাশি আটসাট করে বসানো যেন। মনে হয় টুথপেষ্টের বিজ্ঞাপন দেখছে সে। এভাবে এতো কাছ থেকে কোন মেয়েকে এর আগে দেখেনি রাশেদ। কেমন ঘোরলাগা আবেশ মাখানো চোখে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে। রাশেদের চোখে মুখে তাকিয়ে তরুণী এবার কিছুটা লজ্জা পেল। সত্যি সত্যি লজ্জা। পুরুষের এই দৃষ্টি প্রতিটি মেয়ের চেনা। খুব মায়া হল পাশে বসে থাকা এই অবাক সারল্য মাখা মুখশ্রীর ছেলেটির জন্য। কিছু কিছু মানুষকে এক নিমিষেই কেমন আপন মনে হয় আবার কিছু মানুষকে একজীবনেও চেনা হয়ে উঠে না। জীবন কত বিচিত্র। আমরা মানুষেরা কত অদ্ভুত।

খুব; খুব ইচ্ছে হল রাশেদ নামের এই ছেলেটির কাধে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে যেতে

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s