অনন্ত নিঝুমতা – ৪


পর্ব ৪

বেশ কিছুদিন পর দুজনের পরিবার থেকেই একটা ফ্যামিলি ট্যুরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গন্তব্য- শহরের অদূরে অবস্থিত নন্দন থিম পার্ক। যাত্রার দিন সকাল থেকেই ভীষণ উত্তেজনায় কাটে দুজনের। সময় যেন আর কাটতেই চাইছেনা। গুটি গুটি পায়ে ঘড়ির কাঁটা সময় দেখায় সকাল দশটা। খুশিতে নেচে ওঠে নিঝুমের মন। এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের হবে তারা। তারপর নিবিড়, আনটি আর ঈশিতাকে তুলে পাড়ি জমাবে নন্দনের উদ্দেশ্যে। পেঁয়াজ রঙের সালোয়ার কামিজের সাথে হাঁটার উপযোগী ম্যাচিং স্লিপার আর ছোট্ট কানের দুলে ক্যাসুয়াল সাজে সেজেছে আজ নিঝুম। বের হওয়ার আগের মুহূর্তে কালো রঙের একটা ছোট টিপ বসিয়ে দেয় কপালে। নিবিড়ের খুব পছন্দ এই টিপ। বাসা থেকে বের হয়ে নিবিড়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তারা। প্রাডো গাড়ির পিছনের সীটে বসেছে সে। এই সীটটা বাড়ির বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য রিসার্ভড।

মাঝেরটায় আপাতত মা বসেছেন, একটু পর তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য নিবিড়ের মা-ও এসে পড়বেন। আর ড্রাইভারের পাশের সীটে বাবা। ফুরফুরে মুডে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিবিড়ের বাসার কাছে এসে যায় গাড়ি। সবার আগে নিবিড়দের চোখে পড়ে নিঝুমেরই। এক মুহূর্তের জন্য নিবিড়ের চোখে চোখ আটকে যায়। পর মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিতে নিতে ভাবে, “মাথা খারাপ করে দেবে দেখছি ছেলেটা। এত ভাল লাগার কী দরকার ছিল? সাদা শার্টে ওকে কত ভাল লাগে ও কি জানে না? তাও যেন আমাকে পাগল করার জন্য সাদা পড়েছে আজ! জানি তো, একবার ভাল লাগছে বললেই সারা জীবনের জন্য খেপাবে আমাকে! হুহ! কিন্তু আমিও বলব না যে আজ আমি সত্যিই ওর উপর মরেছি!” একই সাথে টের পায় যে সে অন্যদিকে তাকালেও নিবিড় তার উপর থেকে চোখ সরায়নি। ওরা গাড়িতে উঠে বসে। মা নিবিড় আর ঈশিতাকে পিছনে পাঠিয়ে দেন নিঝুমের সাথে। নিঝুম আগেই ঠিক করে রেখেছিল নিবিড়ের পাশে বসবে না, কে কী সন্দেহ করে বসবে, পরে ঝামেলা হবে। তাই সীটের কোণের দিকে সরে যেতে চেষ্টা করে ঈশিতাকে মাঝে রেখে। কিন্তু তার আগেই ভাইবোন তার দুপাশে বসে পড়ে। নিঝুম প্রবল আপত্তি জানায় মাঝে বসা নিয়ে, বলে যে সে জানালার ধারে বসতে চায়। কিন্তু সামনে থেকে মা বলেন আজকের মত মাঝে বসতে একটু কষ্ট করে। আর গাড়িও চলতে শুরু করে দিয়েছে, এখন সীট চেঞ্জ করাও সম্ভব নয়। অগত্যা চুপচাপ নিবিড়ের পাশেই বসে পড়তে হয় তাকে। নিবিড় নীরবে অভিমানী চোখ নিয়ে তাকায় তার দিকে। নিঝুম বুঝতে পারে এ অভিমান কেন। প্রথমত, আজ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে তার কোন খোঁজ ছিল না, দ্বিতীয়ত, নিবিড় ঠিকই ধরে ফেলেছে যে সে তার পাশে বসতে চায়নি। ইশ! রাগলে কী মায়া মায়া লাগে নিবিড়ের চেহারাটা। নিঝুমের ইচ্ছে হয় গালটা টিপে দেয়।
কিন্তু সবাই আছে, তাই সেই ইচ্ছে দমন করতে হয়। সেও চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দেয়, “স্যরি!” তারপর ছোট্ট একটা হাসি দেয়, যে হাসি নিবিড়ের সমস্ত অভিমান ভুলানোর জন্য যথেষ্ট, যে হাসির জন্য নিবিড় সারা পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করতেও দ্বিধা করবে না। নিঝুম চোখ নামিয়ে নেয়। নিবিড় দেখতে থাকে তাকে। অস্বস্তি কাটানোর জন্য পাশে বসে থাকা ঈশিতার সাথে গল্পে মনোযোগী হয় নিঝুম। হঠাৎ ওড়নায় টান পড়ে। নিবিড় টান দিয়েছে। যার অর্থ, “আমার সাথে কথা বল। এভাবে চুপ মেরে থাকার মানে কী?” তিনজন মিলেই আড্ডা শুরু হয় এরপর। এরই মাঝে নিচুস্বরে নিবিড় জানান দেয় যে সে নিঝুমকে ভালবাসে। সরাসরি বলে না। রোমান্টিক একটা মেসেজ লিখে নিঝুমের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলে দেখতে। নিঝুম দেখে ফোনটা ফেরত দিয়ে দেয়। কিছু বলেনা। তবে গালের রক্তিম আভা নিবিড়ের চোখ এড়ায় না। মনে মনে ভাবে, “বেশ লাগে লজ্জা পেলে আমার রাণীকে। ”

দেখতে দেখতে গাড়ি শহর ছাড়িয়ে আসে। বাইরে ভীষণ সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। সবাইই মুগ্ধ হয়ে দেখছে বাংলার সবুজের মেলা। কথা এখন একটু কম গাড়ির ভেতর। নিবিড় এম পি থ্রি প্লেয়ারে গান ছেড়েছে। হেডফোনের একপ্রান্ত নিজের কানে ঢুকিয়ে অপর প্রান্ত নিঝুমের কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। উদ্দেশ্য, নিঝুমকে আরও একটু কাছাকাছি রাখা। সুযোগ পেলেই তো সরে বসছে। নিঝুম জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে গান শুনতে শুনতে। হাওয়ায় চুল উড়ে নিবিড়ের মুখে পড়ছে। নিবিড় বুক ভরে টেনে নিচ্ছে সেই চুলের সুঘ্রাণ। ইচ্ছে করে মেয়েটার মাথাটা চেপে ধরে রাখে বুকের মধ্যে আর চুলে নাক ডুবিয়ে রাখে। কিন্তু হায়! পরিবার যে জানেনা তাদের ভালবাসার কথা। তাই মনের ইচ্ছে মনেই চেপে রেখে দেখতে থাকে নিঝুমকে আর ভাবতে থাকে আর কতদিন পর বিয়ের বাঁধনে বাঁধতে পারবে ওকে। আর অল্প কিছুক্ষণ পরেই তারা গন্তব্যে পৌঁছে যায়। নিঝুমের এই প্রথম নন্দন আসা। নিবিড় আগেও এসেছে। তবে এখন তো সাথে আছে তার প্রানপ্রতিমা, তাই একই জায়গায় হাজারবার আসতেও তার খারাপ লাগবে না। সুবিশাল পার্কের প্রতিটা রাইড নিঝুমের পাশে বসে উপভোগ করতে চায় সে। ঈশিতাও আগে এসেছে নন্দনে। সে এবার কোন রাইডে চড়তে অসম্মতি জানায়; বলে, এত ঝাঁকি দেয় রাইডগুলো যে তার মাথা ঘোরে। তাই আর চড়তে চায় না। নিবিড় কৃতজ্ঞ চোখে তাকায় বোনের দিকে। ঈশিতা মৃদু হাসে। বড়রা কেউই রাইডে চরবেন না। সুতরাং সমস্ত রাইডে ছোটদের, মানে নিবিড় আর নিঝুমকেই চড়তে হবে। খুব মজা করে সারাদিন সবাই মিলে। হাসি ঠাট্টা, একে অপরকে খোঁচানো, দুপুরে নন্দনের ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ, তারপর হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে ভেজা। সময়ের কোন বাঁধাধরা নেই আজ। নেই কোন নিয়মের বেড়াজাল। একান্ত আপন কিছু সময় কাটাচ্ছে দুটি সদ্য ফোটা প্রেমের ফুল। বিধাতা অলক্ষ্যে থেকে আশীর্বাদ করেন হয়তো এই দুজনকে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাধাকে অতিক্রম করে এরা ভালবাসতে পেরেছে, এই ভালবাসার যেন কোনদিন শেষ হবে না।
বৃষ্টিস্নাত নিঝুমকে নতুন দৃষ্টিতে দেখে আজ নিবিড়। সেই দৃষ্টিতে নেই কোন কামনা, শুধু আছে ভালবাসার উচ্ছ্বাস, আছে মুগ্ধতা, আছে নিঝুমের পবিত্রতা রক্ষার শপথ। একদম নির্জনে নিঝুমকে পেয়েও নিবিড় কোন সুযোগ নেবার চেষ্টা করেনি। নিঝুম অন্তরের অন্তস্থলে অনুভব করে, সমস্ত মহাবিশ্বে এই মানুষটির কাছেই সে নিরাপদ, এই মানুষটিকে দিয়ে তার কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। এই মানুষটি জানে কীভাবে ভালবাসার গভীরে প্রবেশ করতে হয়, জানে কীভাবে ভালবাসাকে পবিত্র রাখতে হয়। আজ নিঝুম বুঝতে পারে, সে সত্যিই এই ছেলেটিকে ভালবেসে ফেলেছে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখে নেয় সাথের সুঠামদেহী বলিষ্ঠ সঙ্গীটিকে, তাকে কোন জানান না দিয়েই। বলতে চায়, ভালবাসি, কিন্তু প্রবল লজ্জা এসে গ্রাস করে তাকে। তাই বলা হয়না নিঝুমের। ভাবে, ক্ষতি কী, থাক না এমন আমার নিঃশব্দ ভালোবাসা, ও তো বোঝে যে আমি ওকে ভালবাসি। নিজের অজান্তেই মনে মনে হাজারো ধন্যবাদ দেয় স্রষ্টাকে, নিবিড়কে ভালবাসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
বিকেল ঘনিয়ে আসে। সময় হয়েছে ফেরার। কারুরই ইচ্ছে নেই যাওয়ার, কিন্তু উপায় যে নেই। ফিরে যেতে হবে কর্মব্যস্ত জীবনে আবার। তাই শেষবারের মত নন্দনকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে ওঠে সবাই। নিবিড় আবার হেডফোন গুঁজে দেয় নিঝুমের কানে। যাওয়ার সময় একটা গান শুনছিল, আবারও সেই গানটাই প্লে করে নিবিড়।

“এক পায়ে নূপুর তোমার, অন্য পা খালি।
একপাশে সাগর, একপাশে বালি…
আমার ছোট তরী, বল, যাবে কি?

বলব না আকাশের চাঁদ এনে দেব, বলব না তুমি রাজকন্যা।
শুধু জিগ্যেস করি, দেবে কি পাড়ি হোক যত ঝড় বন্যা?

চাঁদের আলো, যদি ভাল লাগে কাল হয়ে যায় ঝাপসা।
আমার এ তরী যদি চলে যায়, ফিরে আর আসবে না।
যত ভালবাস তারে, দূরে রয়ে যাবে তা কি তুমি জান না?
আমার ছোট তরী, বল, যাবে কি?”

নিঝুম বুঝতে পারে আবার এই গান চালানোর কারণ। গানের প্রশ্নটি নিবিড় তাকে করেছে যাওয়ার সময়। সে উত্তর দেয়নি। তাই আবারও জানার জন্য এই উদ্যোগ। নিবিড় জিগ্যেস করে মৃদুস্বরে, “উত্তর দিলি না আমার প্রশ্নের?” নিঝুম চোখ তুলে তাকায় নিবিড়ের দিকে। মন সাহস করতে পারে না, তারপরও শেষ পর্যন্ত অসীম সাহসে ভর করে বলে, “পাস নি উত্তর? সত্যিই?” এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে নিবিড়। তারপর বলে, “পেয়েছি। এভাবে থাকিস সবসময় রাণী। আমি তোকে ছেড়ে বাঁচব না। মরেও শান্তি পাব না।” নিঝুম জিগ্যেস করে, “সত্যি বলছিস তো?” নিবিড় বলে, “হ্যাঁ রে পাগলি। তুই আমার সব। ভয় পাস না, দেখবি সবাই সবকিছু মেনে নিবে, আমি তো আছি।” নিঝুমের মনে হয়, সময়টা এখানেই কেন থেমে যাচ্ছে না। খুব খুব ইচ্ছে হয় আজই নিবিড়ের হাত ধরে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। তাড়াতাড়ি মুছে বাইরে তাকায়। এরপর হালকা হওয়ার জন্য নিবিড়ের দিকে ফিরে তার স্বভাবসুলভ দুষ্টু মিষ্টি হাসি হাসে। তাদের এই কথাবার্তার কিছুই ঈশিতা বা গাড়ির আর কারো কানে যায়নি। এভাবে গম্ভীর হয়ে থাকলে বড়রা কিছু সন্দেহ করে নেবে, তাই নিবিড় আর ঈশিতার সাথে আবার খুনসুটি শুরু করে। মুহূর্তে হালকা হয়ে যায় তাদের মাঝের বাতাস।
যেতে যতক্ষন সময় লেগেছিল, ফিরতে ততটা লাগে না। মনে হয় যেন সময় বড্ড তাড়াতাড়ি পার হয়ে যাচ্ছে। শহরে ঢুকতে বেশিক্ষণ লাগে না। বাইরে গোধূলির রঙ্গে সেজেছে আকাশ। গাড়ির বড়রা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্তিতে। ঈশিতাও ঘুম ঘুম ভাব। জেগে আছে শুধু নিবিড় আর নিঝুম। উপভোগ করছে গোধূলি আর তাদের মাঝের নিঝুমতাকে। হঠাৎ নিবিড়ের মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে। নিঝুমকে ইশারায় তার দিকে ফিরতে বলে। বাইরে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে থাকা নিঝুম কিছুটা অবাক হয়েই তাকায় তার দিকে। মাথা ঝাঁকিয়ে জানতে চায়, “কী?” নিবিড় তেমনি নিঃশব্দেই শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলে, “love you.” ভীষণ লজ্জা পায় নিঝুম। সাথে সাথে আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। নিবিড় আবার তাকে ডাকে, আবার একই কাজ। নিঝুম চোখের ইশারায় শাসন করে। কিন্তু নিবিড় কিচ্ছু শোনে না। এরপর বাড়ি ফেরা পর্যন্ত তেমনি নীরবে প্রেম নিবেদন করতেই থাকে। নিঝুম কিছু বলতেও পারছে না, সে অন্যদিকে তাকালেই নিবিড় জোরে বলে দেওয়ার হুমকি দেয়। গোধূলির লালিমা গালে মেখে এই অসম্ভব ভাললাগা, ভালবাসার সাগরে ভেসে যেতে থাকে নিঝুম, আর নিবিড় ভাসতে থাকে প্রণয়িনীর লজ্জাবনত মুখের রূপের সাগরে, আলতো করে হাত বুলিয়ে আদরও করে দেয় একবার। বিদায় নিয়ে নামার সময়ও বলে যায়। নিঝুম মনে মনে উত্তর দেয়, “আমিও তোকে অনেক অনেক ভালবাসি রে সোনা। জানিনা কখনও বলতে পারব কিনা, কিন্তু ভালবাসি, জানি তুইও জানিস। ”

অদ্ভুত এক মন্ত্রবলে কেটে যায় একটি বছর। একদম উড়ে চলে যায় যেন। নিবিড়ের অন্তত তাই মনে হয়। এই একটি বছরে নিঝুমকে সে চিনেছে আরও ভালভাবে। নিঝুমের অসাধারণ মনোবল আর চিত্তের দৃঢ়তা তাকে করেছে বিমুগ্ধ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক যেটা নিঝুমের চরিত্রের, তা হল, নিবিড়কে নিয়ে কেউ একটা বাজে কথা বললে সে সহ্য করতে পারে না। শুধুমাত্র এই কারণে আকাশের সাথে অনেক ভাল বন্ধুত্বটাকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে নিঝুম দ্বিধা করেনি একবিন্দু। হ্যাঁ, আকাশকে তাদের সম্পর্কটার কথা জানিয়েছিল নিঝুম। কিন্তু আকাশ সেটাকে সহজভাবে নিতে পারেনি। নিঝুম পারিবারিক সমস্যার কারণে তার সাথে যোগাযোগ করতে না পারায় সে এটাকে বলেছে “বন্ধুত্বের অপমান”। নিবিড়কে বেছে নিয়েছে শুনে রাগে ক্ষোভে বলেছে নিঝুম তাকে শুধুমাত্র ব্যবহার করেছে নিবিড়কে আকর্ষণ করার জন্য, নিঝুমের চরিত্রের দিকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েনি আকাশ। শুধু এতটুকু পর্যন্ত জল গড়ালেও নিঝুম চুপচাপ হজম করতে পারত সবকিছু। কিন্তু এরপর আকাশ নিবিড়ের উদ্দেশ্যে অজস্র কটুকথার বান ছুঁড়েছে। আর এখানে এসেই নিঝুমের ধৈর্যের বাঁধ গেছে ভেঙ্গে। সংক্ষেপে অথচ কঠিন বক্তব্যে সে জানিয়ে দিয়েছে, আকাশের সাথে তার বন্ধুত্বের এখানেই ইতি। যে মানুষ নিবিড়কে সম্মান করে কথা বলতে পারবেনা, তার দিকে তাকাতেও সে নারাজ। নিবিড় নিজে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে। তার যে খারাপ লাগেনি, তা না, কিন্তু নিঝুমের রাগ দেখে সে নিজেই রাগ করতে ভুলে গিয়েছিল……সম্পর্কের এক বছর পর এক শীতের বিকেলে মিষ্টি রোদ গায়ে মাখতে মাখতে এসব কথাই ভেসে আসছিল বারবার নিবিড়ের মনে। নিঝুম! নিঝুম নিঝুম আর নিঝুম! নিবিড়ের সমস্ত অন্তরাত্মা জুড়ে ধ্বনিত হয় এই একটিই নাম। সমস্ত পৃথিবী এসে কেন্দ্রীভুত হয় তিন অক্ষরের এই একটি শব্দে। ইস! যদি এই সমস্ত কথা নিঝুমকে বলা যেত, এক্ষুনি! তা তো হবার উপায় নেই, প্রেয়সী তার এখনও মুঠোফোনহীনা। এখনও সেই আগের মতই ছোট্ট ছোট্ট সময়ে ছোট্ট ছোট্ট কথার ঠাসবুননে গাঁথা হয় তাদের প্রেমের মালা। “কী করছে এখন মেয়েটা?”, ভাবতে ভাবতে আনমনেই নিজের মোবাইলে হাত চলে যায় নিবিড়ের। নিঝুমের ল্যান্ডলাইনে একটা মিসডকল দিয়েই দেয়। সাথে সাথেই তার ফোন বাজতে শুরু করে। স্ক্রীনে নাম উঠেছে, “নিঝুম”। একেই বোধহয় ভাগ্য বলে। নাকি মনের টান? জানে না, নিবিড় জানে না। শুধু জানে, যাই-ই হোক, জিনিসটা খুব ভাল। নাহলে সে-ও নিঝুমকে মিস করে, আর সাথে সাথে নিঝুমও তাকে ফোন দেয়? ভাগ্য হোক আর ভালোবাসা, অথবা দুটাই, সে হিসেবনিকেশ আপাতত তোলা থাক, ভেবে বহুদিনের (২৪ ঘণ্টাও হয়নি যদিও শেষবার কথা বলার) না-শোনা কণ্ঠস্বরে ডুবে যায় নিবিড়…

বলছিলাম নিবিড়ের কথা। এখন একটু নিঝুমের দিকেও তাকানো দরকার, না? দেখি নিঝুম কেমন আছে। বেচারী ফোনটা কানে ধরে শুধু লজ্জায় লালই হয়ে যাচ্ছে অপর প্রান্ত থেকে নিবিড়ের ক্রমাগত “ভালোবাসি” শুনতে শুনতে। নিবিড়ের অনেকবার অনুরোধ সত্ত্বেও সে আজ পর্যন্ত বলতে পারেনি তার মনের কথাটি। জানে, নিবিড় কষ্ট পায় মাঝে মাঝে এতে, কিন্তু সাথে এটাও জানে যে নিবিড় বোঝে। হু, সে ভালবাসে নিবিড়কে, খুব বেশি ভালবাসে, কিন্তু বলতে পারেনা। নিবিড়ের কথা শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে যায় নিঝুম এসব ভাবতে ভাবতে। বেশ খানিকক্ষণ পর সম্বিত ফেরে নিবিড়ের ডাকে। সাড়া দেওয়ার পর নিবিড়ের অসহিষ্ণু কণ্ঠ ভেসে আসে। কিন্তু তাতেও নিঝুমের মন নেই। প্রায় শোনা যায় না এমন কণ্ঠে উচ্চারণ করে, “ভালবাসি।” “কী বললি?”, নিবিড় থমকে গিয়ে জিগ্যেস করে। “হুম?”, হঠাৎ করে প্রচণ্ড লজ্জা এসে ভর করে নিঝুমের ওপর। আপনমনেই বলে ফেলেছে সে তার মনের একান্ত গোপন কথাটি আজ। এখন হুঁশ হওয়ায় লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে তার। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “যা শুনলি…”। নিবিড় বলে, “আবার বল্*।” নিঝুমের উত্তর, “উহু আর পারব না।” কিন্তু নাছোড়বান্দা নিবিড়ের কাছে হার মানতেই হয় নিঝুমকে। অন্তত আরও আট-দশবার নিঝুমের কাছ থেকে সে নিজেকে ভালোবাসার কথা শোনে, তারপর রেহাই দেয়। আর নিঝুম? নিজের সাথে নিজেই যে কথাটা এতদিন অসংখ্যবার আউড়েছে, আজ ধ্বনিত হয়ে সেই চরম ও পরম সত্য যেন আবার নতুন করে প্রকাশ পায় তার কাছে। মনের গহীন কোণে পাখা মেলে হাজারো রঙের প্রজাপতি, লক্ষকোটি ভ্রমর যেন গুনগুনিয়ে ওঠে তার প্রিয় সুরে-

“কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া
তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া।
চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি
গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি।
ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা,
কেমনে তোমারে কব প্রণয়ের কথা।
ভেবেছিনু মনে মনে দূরে দূরে থাকি
চিরজন্ম সঙ্গোপনে পূজিব একাকী –
কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়,
কেহ দেখিবে না মোর অশ্রুবারিচয়।
আপনি আজিকে যবে শুধাইছ আসি,
কেমনে প্রকাশি কব কত ভালোবাসি।”

নিবিড়ের মা কিছুটা টের পেয়েছেন ছেলের মনের অবস্থা তার উড়ুউড়ু ভাব দেখে। তবে এখনও সিরিয়াসভাবে নেন নি বিষয়টাকে। তাঁর নিজেরও প্রেমের বিয়ে নিবিড়ের বাবার সাথে। সুতরাং ছেলে প্রেম করতেই পারে। তবে মেয়েটা যে নিঝুম সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেন নি। সময় আসলে সে ব্যাপারে কথা বলবেন ভেবে রেখেছেন।

নিবিড় আর নিঝুম মাঝে বেশ কয়েকবার একে অন্যের বাসায় যাওয়া আসা করেছে মা’দের সাথে। প্রতিবারই নিবিড় কিছু না কিছু পাগলামি করেছে নিঝুমের জন্য সবার চোখ এড়িয়ে। নিঝুম বাধা দিলেও একেবারেই ভাল লাগেনি, তা বলতে পারবে না। মান অভিমানের সময়টা সবচেয়ে সুন্দর ওদের মধ্যে। নিঝুম একটু চুপ করে গেলেও নিবিড় তা সহ্য করতে পারে না। যতক্ষণ নিঝুম সাড়া না দিচ্ছে, ল্যান্ডফোনে রহস্যময় মিসডকল আসতেই থাকে। নিবিড়ের এসব কাণ্ডে নিঝুম তাই রাগ হলেও না হেসে থাকতে পারে না।

অনন্যার সাথে নিঝুমের এখনও কথা হয় না। নিবিড়ও কথা কমিয়ে দিয়েছে। শুধু জানিয়েছে ওদের সম্পর্কের কথা। তারপর অনন্যা ক্লাসে চিরকুট-মারফত অভিনন্দন জানিয়েছে নিঝুমকে। নিঝুমও প্রতিউত্তরে ধন্যবাদ দিয়েছে। সব মিলিয়ে সময় বেশ ভালই কাটতে থাকে নিবিড় আর নিঝুমের। দেখা খুব একটা না হলেও মনের টান কমে না। বরং এই বিরহ যেন প্রেম আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড় বিচিত্র। সব খারাপেরই যেমন শেষ আছে, ভালটাও হয়তো তেমন বেশিদিন থাকতে পারে না, খারাপকে তাঁর জায়গা ছেড়ে দিতে হয়ই। নিঝুমের জীবনেও ঝড় আসে হঠাৎ করেই।

সময়টা ইন্টার পরীক্ষার আগে। অনন্যা আর নিঝুমের মা স্কুলজীবনের বান্ধবী। মেয়েদেরকে তাঁরা প্রশ্ন করেন কেন কথা বলে না। কেউই উত্তর দিতে পারে না। শুধু এড়িয়ে চলে। অবশেষে নিঝুম ঠিক করে যে না, থাক অনন্যার সাথে সব ঠিক করে ফেলবে আবার। একটা বিয়ের আসরে যেয়ে দেখা হলে নিজেই অনন্যার সাথে কথা বলে নিঝুম। অনেকদিন পরে কথা হওয়ায় দুজনেই প্রথমে একটু জড়তা ফিল করে। আস্তে আস্তে সহজ হয়। এ-কথা সে-কথার পর আসে নিবিড়ের সাথে নিঝুমের সম্পর্কের কথা। অনন্যা হঠাৎ করেই বলে বসে, “আমার যাকেই পছন্দ হয় তুমি তাকে নিয়ে নাও!” কথাটা ঠাট্টার ছলে বলা হলেও নিঝুমের বুঝতে অসুবিধা হয় না অনন্যা কী বলতে চেয়েছে। এ নিয়ে আর কিছু বলে না। বুকের ভেতর কোথায় যেন মুচড়ে ওঠে তাঁর। তবে কি নিবিড়ও অনন্যাকে…? নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকে নিঝুমের। সে কি তবে অনন্যা আর নিবিড়ের মাঝে এসে পড়েছে? বাসায় ফিরে খুব আপসেট লাগতে থাকে তার। অনেক ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নেয় নিবিড়ের জীবনে সে আর থাকবে না। আর কারো অধিকার কেড়ে নেবার কোন অধিকার তো তার নেই। মনে পরে, নিবিড়ও অনন্যার সাথে বেশ ফ্রী হয়ে গিয়েছিল পরিচয়ের পর থেকে, মজা করে ‘জানু’ বলে ডাকত একজন আরেকজনকে। সে যখন এটাকে সত্যি ভাবত, তখন নিবিড় তাকে বলত এটা শুধুই দুষ্টুমি। সম্পর্কের পর নিবিড় বলেছে অনন্যা জানত যে নিবিড় নিঝুমকে পছন্দ করে। তাহলে কেন অনন্যা আজ এ কথা বলল? পুরোটা রাত ঘুমাতে পারেনা নিঝুম। বারবার চোখের কোণে জল এসে যায়। পরদিনও সারাদিন নিবিড়ের সাথে কোন যোগাযোগ করে না সে। খুব কষ্ট হয়, কিন্তু চেপে রাখে সব নিজের ভেতরেই, বাবা মাকেও কিছু বুঝতে দেয় না। শুধু ভাবে, নিবিড়কে ছাড়া সে কীভাবে থাকবে? একবার মনে হয় নিবিড়কে জানান উচিত ছিল, কিন্তু পরক্ষনেই মনে হয় জানালে হয়তো ছেড়ে যাওয়াটা কষ্ট হবে। অনন্যার সাথে তো নিবিড়ের কথা হয়ই, অনন্যা হয়তো পারবে নিবিড়কে তার অভাব ভুলিয়ে দিতে…

আজ নিয়ে তিনদিন হয়ে গেল, নিঝুম নিবিড়ের সাথে একটা কথাও বলেনি, একবারও নিজের খোঁজ দেয়নি নিবিড়কে, কোন মেসেজ আছে কিনা তাও চেক করেনি। শুনতে খুব সহজ, কিন্তু নিঝুম জানে এগুলো করতে তার কতটা কষ্ট হচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত কাঁটার মত বিঁধছে বুকে। আজ সকালে মন অন্যদিকে সরিয়ে রাখার জন্য সিডি প্লেয়ারে ধুমধাড়াক্কা গানের একটা সিডি চাপিয়ে এসে বসে বিছানায়। পাঁচ মিনিট পরই বিরক্ত হয়ে বন্ধ করে দেয় গান। এসব পাগল ছাগলের গান মানুষে শোনে? কম্পিউটার স্ক্রীনে দ্রুত নড়েচড়ে বেড়ায় মাউসের কার্সর। অবশেষে খুঁজে পায় কাঙ্ক্ষিত গানটি। পুরো ঘর গমগম করে উঠে বাজতে থাকে-

Although loneliness has always been a friend of mine
I’m leavin’ my life in your hands
People say I’m crazy and that I am blind
Risking it all in a glance
And how you got me blind is still a mystery
I can’t get you out of my head
Don’t care what is written in your history
As long as you’re here with me

I don’t care who you are
Where you’re from
What you did
As long as you love me
Who you are
Where you’re from
Don’t care what you did
As long as you love me
Every little thing that you have said and done
Feels like it’s deep within me
Doesn’t really matter if you’re on the run
It seems like we’re meant to be

I don’t care who you are
Where you’re from
What you did
As long as you love me
Who you are
Where you’re from
Don’t care what you did
As long as you love me

I’ve tried to hide it so that no one knows
But I guess it shows
When you look into my eyes
What you did and where you’re comin’ from
I don’t care, as long as you love me, baby

I don’t care who you are
Where you’re from
What you did
As long as you love me
Who you are
Where you’re from
Don’t care what you did
As long as you love me.

অনেকক্ষণ পর হুঁশ হয় নিঝুমের। কখন যে অশ্রুধারা নেমেছে দু চোখের কোল বেয়ে, ভিজিয়ে দিয়েছে মাথার নিচে থাকা বালিশ, টের পায়নি সে। Backstreet Boys এর এই গানটি তাদের দুজনেরই খুব প্রিয়। হ্যাঁ, তার আর নিবিড়ের অসম্ভব ভাললাগার গান এটি। একে একে সব স্মৃতি ভেসে আসতে থাকে নিঝুমের মনের বায়স্কোপে। আর…চোখের আকাশে আরও আরও মেঘ ভেঙ্গে পড়ে।

দুপুরে কোচিং ক্লাসে যায়। সারাক্ষণই আনমনা হয়ে থাকে নিঝুম। বিকেলে মায়ের সাথে ফেরার সময় ভিড়ের রাস্তা পার হতে গিয়ে হঠাৎ টান পড়ে হাতে। চোখ পড়ে পাশের ফুটপাতের দিকে। তাকিয়ে চমকে যায়। তার জন্য এত বড় চমক যে এভাবে এখানে অপেক্ষা করবে, নিঝুম ভাবতেও পারেনি।

গত তিনটি দিন নিবিড় নিঝুমের ল্যান্ডফোনে মিসডকল, এবং শেষে থাকতে না পেরে ফোন দিয়ে গেছে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় কেটেছে দিনের প্রতিটা মুহূর্ত, রাতের প্রতিটা নিস্তব্ধতা। ফোন বাজলেই মনে হয়েছে এই বুঝি নিঝুমের ফোন আসলো। কিন্তু না, বারবার হতাশ হতে হয়েছে তাকে। বারবার মনে হয়েছে, কোন বিপদ হল না তো? প্রজ্ঞা আর নিলীমাকে দিয়ে বারবার ফোন করিয়েছে নিঝুমের বাড়িতে, কোনবারই নিঝুম তাদের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি। নিবিড় বেশি মেসেজ দেওয়ারও সাহস পায়নি নিঝুমকে, কারণ নাম্বারটা নিঝুমের বাবার। একেকটা দিন, একেকটা নরককুণ্ডের মত মনে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে পারেনি নিবিড় আজ। বের হয়ে পড়ে বাসা থেকে নিঝুমের খোঁজে, দরকার হলে ওর বাসাতেই যাবে, যা হয় হোক।

উদভ্রান্ত চেহারায় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নিবিড় রায়। নিবিড় জানে নিঝুমের কোচিং শিডিউল। জানে আজ এখানে তার ক্লাস আছে। তাই আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল নিঝুমের জন্য। জানে নিঝুমের সাথে তার মা থাকবে, নিবিড়কে এই সময় এখানে দেখলে মহাবিপদ হয়ে যাবে, তারপরও চলে এসেছে সে কোন কিছুর পরোয়া না করে। দূর থেকেই নিঝুমকে মায়ের পিছে পিছে আসতে দেখে। মুখের দিকে একবার নজর দিতেই বুঝে যায় মেয়েটা খুব কষ্টে আছে কোন কিছু নিয়ে। আর সেই কোন কিছুটা যে তার সাথে যোগাযোগ না করা-ই, তা বুঝতে নিবিড়ের একটুও সময় লাগে না। কেমন যেন করতে থাকে নিবিড়ের বুকের ভেতরটা ওই মুখের দিকে তাকিয়ে।

কোন দিকে না তাকিয়েই হাঁটছিল নিঝুম। একেবারে নিবিড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাত ধরে টান দিয়েছে সে। মুখ ফিরিয়ে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় নিঝুমের। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি তাকিয়ে থাকে দুজন। নিবিড়ের আকুতিভরা দৃষ্টি আর নিঝুমের বেদনা ও বিস্ময়ের মিলিত অভিব্যক্তি যেন অনন্তকালের জন্য থমকে যায়। তারপরই হাত ছেড়ে দেয় নিবিড়, আলতো চাপ দিয়ে বোঝায় সামনে এগুতে, মা পিছে তাকালে সমস্যা হবে। চোখে চোখে কথা হয়ে যায়। নিঝুম সাবধানে চোখ মুছে মায়ের পিছে এগোয়। নিবিড় দাঁড়িয়ে থাকে পিছনে। নিঝুম আর ফিরে না তাকিয়েও অনুভব করতে পারে তার প্রতিটা পদক্ষেপ নিবিড় মনে গেঁথে রাখছে, তার চলে যাওয়া পথের উপর পড়ে থাকছে নিবিড়ের দৃষ্টি। আর নিবিড় বুঝতে পারে নিঝুমের আর পিছনে না তাকানো চোখের জল লুকোনোর প্রানান্তকর কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা। একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে মনে প্রশ্ন জাগবে, একফোঁটা জল কি নিবিড়ও মুছে ফেললো না চোখের কোণ থেকে?
রাতে নিবিড়ের মেসেজ পায় নিঝুম, পরদিন যেভাবে হোক ফোন করার অনুরোধ রয়েছে সেখানে। পরদিন সুযোগ এসেও যায় ফোন করার। কিন্তু শুরু থেকেই নিঝুম কেমন যেন গুটিয়ে যায় নিজের ভেতর। তার প্রাণচঞ্চল স্বভাবের আভাস মাত্রও পাওয়া যায় না কথায়। অনেক জেরা, অনেক কাকুতি মিনতির পর মুখ খোলে সে, বলে অনন্যা তাকে কী বলেছে, আর সেজন্য নিঝুম নিজেকে অপরাধী মনে করে। সব শুনে নিবিড় প্রচণ্ড রেগে যায় অনন্যার উপর। কিন্তু একই সাথে খুব কষ্টও পায় নিঝুম এই কদিন একা একা কষ্ট পেয়েছে ভেবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিঝুমকে ডাকে

-নিঝুম?
-হুম?
-স্যরি।
-তুই কেন স্যরি বলছিস? স্যরি তো আমার বলা উচিত, আমার জন্য অনন্যা…
-চুপ কর। অনন্যার জন্য কোনদিন আমার মনে কিছু ছিল না। অনন্যা নিজেও তো জানত যে আমি তোকে ভালোবাসি। শুধু তোকে। তারপরও এমন কথা ও কেন বলল আমি জানিনা। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি শুধু তোকে ভালোবাসি। আমি শুধুই তোর। তোর নিবিড়। আমার নিঝুমের নিবিড়।
-হুম…
-উম নিঝুম, তুই কাঁদছিস?
-কই না তো।
-আমাকে তুই নিজেকে চিনাতে আসিস না।
-আচ্ছা। রাখি এখন।
-কেন?
-ভাল লাগছে না।
-কেন?
-জানিস না?
-জানি। স্যরি।
-যাহ আবার তুই স্যরি বলিস কেন? ঠিক আছে তো।
-স্যরি বলছি তোর কষ্টটা আমি এই কদিন ভাগ করে নিতে পারিনি, তুই একা একাই কষ্ট পেয়েছিস তাই। শোন
-বল
-তোকে এত কম কথা বললে মানায় না। তুই কথা বলবি ননস্টপ ট্রেনের মত, সেটাই তোকে বেশি স্যুট করে। বুঝলি পাগলি?

এবার নিঝুম হেসে দেয়। নিবিড়ের খুব ইচ্ছে করে ফোনেই একটা কিস করে দেয়। কিন্তু নিঝুম যদি রেগে যায়, তাই কিছু বলে না। শুধু অনুভব করতে থাকে নিজের ভেতর বয়ে যাওয়া ভালোবাসার ঝর্ণাধারা।

ভ্রামমম! ছোট্ট মোটরটির বার্*স্*ট হওয়ার বিকট শব্দে লাফিয়ে ওঠে নিঝুম। মা বাবা ছুটে আসেন কী হয়েছে দেখতে। নিঝুমের এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল হিসেবে জ্বলে গেছে বাসার কিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির লাইন। ব্যাপারটার ওপর একটু আলোকপাত করা যাক। কাহিনী হচ্ছে, নিবিড় আর নিঝুম বাড়িতে একই স্যারের কাছে পড়ে। ফিজিক্স বইয়ে মোটরের চ্যাপ্টার পড়ে নিঝুমের শখ হয়েছে মোটর কীভাবে কাজ করে প্র্যাকটিকালি দেখবে। নিবিড়ের কাছে অনেক খেলনা গাড়ি আছে, তাই স্যারকে বলে ওর থেকে একটা ছোট্ট মোটর আনিয়ে নিয়েছে। স্যার সুন্দর করে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন, সমস্ত পার্টস আলাদাভাবে চিনিয়ে দিয়েছেন, সেগুলোর কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিঝুম খুব খুশি। কিন্তু স্যার চলে যাওয়ার পর নতুন একটা প্রশ্ন আসে মাথায়, মোটরের ভোল্টেজ বেশি না, মাত্র ১.৫ ভোল্ট। আরও বেশি ভোল্টেজ এর ওপর প্রয়োগ করা হলে কী হবে? খুবই সহজ উত্তর যে কাজ করবেনা। কিন্তু রিয়াকশন কী হবে? থাক, নিজেই হাতে কলমে পরীক্ষা করে দেখে নিই, ভেবে দু প্রান্তের তার ঢুকিয়ে দেয় ২২০ ভোল্টের লাইনে। ব্যস, আর দেখতে হয় না, প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে বাড়ি। মা এসে কাণ্ড দেখে জড়িয়ে ধরে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর শুরু করেন বকাবকি, বলেন এরপর আর এমন বিধ্বংসী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালে সমস্ত এক্সপেরিমেন্টাল জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেবেন।নিঝুম ভদ্র মেয়ের মত চুপ করে সব শোনে আর মাথা নাড়ায়। কিন্তু মেয়ের মনের ভেতর কী চলছে তা জানলে মা হয়তো ওকেই বের করে দিতেন বাড়ি থেকে।

পরদিন স্যার ঢুকতে না ঢুকতে মা’র অভিযোগনামা শুরু হয়ে যায়। স্যার নিঝুমকে বকবেন না কী করবেন ভেবে পান না। পুরোটা সময় লেকচার দেন ওর সৃষ্টিছাড়া কার্যকলাপের ভয়ঙ্কর ফলাফলের ওপর। নিঝুম এবারেও চুপ। শেষে মোটরটা ফেরত চান স্যার। এবার নিঝুম প্রবল বেগে মাথা নাড়ে, সে দেবে না ফেরত। হতাশ শিক্ষক আর কী করবেন, এরপর নিবিড়ের বাসায় যান। সেখানে কী হয় জানার উপায় নিঝুমের ছিল না রাত দশটা পর্যন্ত। দশটার সময় ল্যান্ডলাইনটা বেজে ওঠে। মা ধরেন। নিঝুম পাশের রুমেই ছিল। কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারে ফোন করেছেন নিবিড়ের মা, এবং কথার বিষয়বস্তু আর কিছু নয়, তার গতকালকের “পাগলামি”। কিছুক্ষণ পর নিঝুমকে ডাকেন মা, নিবিড় কথা বলবে। প্রমাদ গোনে নিঝুম। ফোন ধরে তার মধুরতম “হ্যালো” উপহার দেয় ওই প্রান্তের মানুষটিকে। কিন্তু ওপাশ থেকে মধুর ‘ম’ ও ঝরে না। আগ্নেয়গিরির মত অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে যায়-
“ফাযলেমি পেয়েছিস?? তোকে আমি মোটর দিয়েছিলাম কি বাড়িঘরে আগুন লাগানোর জন্যে???!!”
-“আগুন? কই কোথায় আগুন? আমি তো শুধু একটা এক্স…”
-“চুপ। একদম চুপ। তুই যখন ভদ্রভাবে মোটর চেয়েছিলি স্যারকে দিয়ে, আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিল। এতো ভদ্র তো তুই নোস। আমার কাছে চাইলে যে আমি ধরে ফেলব তোর মাথায় কী সব বুদ্ধি ঘোরাফেরা করে, তাই সরাসরি আমার কাছে না চেয়ে স্যারকে দিয়ে বলিয়েছিস। তুই জানিস মা কত বকেছে আমায়?”
-“ওহ তাই বল! আনটি বকেছে তাই তোর এতো রাগ। আমি আরও ভাবলাম বুঝি আমার জন্য চিন্তা হয়েছে তোর।”, উদাস কণ্ঠে বলে নিঝুম।
-“তুই না নিঝুম……তুই আসলে কক্ষনও মানুষ হবি না!”, বলে ঠাশ করে ফোনটা রেখে দেয় নিবিড়।

নীরব হাসিতে ফেটে পড়ে এরপর নিঝুম। নিবিড়কে জ্বালাতে ভীষণ মজা পায় সে। ভাগ্যিস মা নেই এখন রুমে, তাহলে নির্ঘাত বকা খেত নিঝুম।

পরদিন নিবিড়কে অনেকবার মিসডকল দিয়েও কোন রিপ্লাই পায়না সে। রাতের আগে মেসেজও দিতে পারেনা কোন। কিন্তু সেই একই অবস্থা, উত্তর আসে না মেসেজের। নিঝুমের মন খুব খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎই অনুভব করে, নিবিড়কে মিস করছে সে, খুব মিস করছে।

তার পরদিনও সারাদিন কোন খোঁজ না পেয়ে নিঝুম মা-কে ম্যানেজ করে নিবিড়ের বাসায় চলে যায়। গেট নিবিড়ই খোলে। মা-র পেছন থেকে উঁকি দিয়ে নিবিড়কে দেখে মনটা খুশিতে ভরে যায় নিঝুমের। যদিও মুখে প্রকাশ করে না কিছু। কিন্তু সেই সময় খেয়াল করে নিঝুমের মুখের দিকে তাকালে সেই অনির্বচনীয় আনন্দের আভা চোখ এড়ানোর কথা নয়। হালকা গোলাপি গালে আলোছায়ার খেলা। গালটা গোলাপি ছিল না আসলে, মাত্রই হয়েছে নিবিড়ের সাথে চোখাচোখির ফলে। কিন্তু নিবিড়ের দৃষ্টি খুব কঠিন দেখায় নিঝুমের কাছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে একবার পেছন ফিরে নিবিড়কে দেখে নেয়।

নিবিড়ের মা এমন আচমকা বান্ধবীকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে যান। আজ সারাদিনই তাঁর মনে হচ্ছিল নিঝুমের মা’র কথা। আর কোনদিকে যেন খেয়াল করার সময় নেই দুজনের। শূন্য ড্রয়িংরুমে ছেলেমেয়ে দুটোকে রেখে ভেতরে চলে যান দুজন।

অস্বস্তিকর নীরবতা। কেটে যায় প্রায় পাঁচ মিনিট। নিঝুম উঠে যেয়ে ভেতর থেকে ঘুরে আসে একবার। ইশিতা বাড়িতে নেই। আনটিকে জিগ্যেস করে জানতে পারে এখনও ফেরেনি ভার্সিটি থেকে। আবার ড্রয়িংরুমে ফিরে আসে। নিবিড় টি ভি দেখছে। আস্তে করে যেয়ে পাশে বসে নিঝুম। জিগ্যেস করে, “কী হয়েছে?” । টিভির পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই আরেকজন উত্তর দেয়, “কই কিছু না তো। কী হবে?”
-“তাহলে?”
-“কী তাহলে নিঝুম? বিরক্ত করিস না তো, টি ভি দেখতে দে।”

অভিমানে ছেয়ে যায় নিঝুমের মনের আকাশ এ কথার পর। চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে নিবিড়ের দিকে কিছুক্ষণ, তারপর উঠে চলে যায় ড্রয়িংরুম ছেড়ে। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে এসে ঢোকে নিবিড়ের রুমে। ঢুকে সোজা এগিয়ে যায় জানালার কাছে। এই ঘর তার পরিচিত। কোথাও যেতে বাধা নেই তার এখানে, কারো বাধা শুনবে এমন গ্যারান্টিও নেই অবশ্য। জানালা দিয়ে বাইরের নিঃসীম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।

এভাবে কতক্ষণ যে কেটে গেছে, খেয়াল নেই নিঝুমের। পেছনে কেমন একটা নড়াচড়া টের পেয়ে ঘুরে তাকায়। দেখে নিবিড় এসে দাঁড়িয়ে আছে কখন থেকে যেন। চোখে চোখ পড়ে। সেই স্থির দৃষ্টি কাঁচের ওপাশে। “কখন এলি?” জিগ্যেস করতে যেয়েও করে না নিঝুম। চোখ সরিয়ে নিয়ে, মাথা নামিয়ে নিবিড়ের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যায়। কিন্তু নিবিড় সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে…“কোথায় যাচ্ছিস?”

নিঝুম উত্তর দেয় না। মাথা নামিয়েই রাখে। তাকায় পর্যন্ত না নিবিড়ের দিকে। “কী হল? উত্তর দিচ্ছিস না কেন? যাচ্ছিস কোথায়? আমার বাড়ি এসে আমার সাথেই কথা বলছিস না কেন?” নিবিড়ের কণ্ঠের উত্তাপ টের পেয়ে এবার চোখ তোলে নিঝুম। আহত, মৃদু কণ্ঠে বলে, “আমি তো বলিনি নিবিড় যে তুই আমায় বিরক্ত করছিস। বলেছি?”
গলাটা কি ভেজা মনে হয়? তবে কি এতক্ষণ…? খানিকক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায় নিবিড়। কী করবে সে? নিঝুম সেদিন মোটর নিয়ে যা করেছে, তাতে তো সারাজীবনের মত ওর নিঝুমকে হারাতেও হতে পারত। নিবিড় যে কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না, পুরো ব্যাপারটার জন্য তার নিজেকেই দায়ী মনে হচ্ছে। সে তো জানে মেয়েটার মাথায় সারাক্ষণই নানা উদ্ভট চিন্তা ঘুরপাক খায়, তবুও সে কেন দিতে গেল ওর হাতে এরকম একটা জিনিস? সে জন্যই রেগে আছে। আর রাগটা নিঝুমকে দেখে ঝেড়ে ফেলেছে। “ইশ বড্ড ভুল হয়ে গেছে। তখন অতো শক্ত বকুনি দেওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু ওর কিছু হলে আমার কী হবে তা কি ও বোঝে না? ও বোঝে না সেদিনের ঘটনা শুনে আমার কেমন লেগেছে? বুঝেছে আমি জানি। শুধু ওই অমন করে দূরে ঠেলে দেওয়াটা মেনে নিতে পারেনি…” ভাবতে ভেবতে কথা আর বলা হয়ে ওঠে না নিবিড়ের। আহত হরিণীর চোখ দুটোতে কখন যে ডুব মেরেছে কে জানে। কোথায় আছে, কী করছে সব ভুলে যেয়ে আরও এক পা এগোয় নিঝুমের দিকে। কী করতে চেয়েছিল, জানে না। তার আগেই বাধা পড়ে নিঝুমের কণ্ঠে-
-“উঁ।”
-“কী?”
-“উঁহু।”
-“কী উঁহু? কী করেছি?”
-“কিছু না।” অভিমানী স্বরটা যেন আরও অভিমানী হয়ে ওঠে।
-“হুম।”

নিঝুম আবার চলে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আবার বাধা দেয় নিবিড়, “কী সমস্যা? যাচ্ছিস কেন?”
মুখ ফিরিয়ে নেয় নিঝুম। তখনই চোখের কোণে চিকচিকে কিছুর আভাস ধরা পড়ে নিবিড়ের চোখে।
এবার আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারেনা সে। বলে, “কেন সেদিন অমন পাগলামি করতে গেছিলি? তুই জানিস আমি কত ভয় পেয়ে গেছিলাম? বুঝিস না তুই তোকে ছাড়া আমি…?”…কথা শেষ হয় না, আবেগে গলা বুজে এসেছে নিবিড়ের।
অভিমানিনীর অভিমানের বরফ এতক্ষণে গলে জল। ইচ্ছে করে নাকটা টিপে দেয় দুষ্টুটার। কিন্তু “ধ্যাত কী সব ভাবছি!” বলে মনে মনে নিজেই নিজেকে বকা দেয় একটা। জলভরা চোখ এবার ভরে ওঠে দুষ্টু মিষ্টি হাসিতে। আর কিচ্ছু বলার দরকার নেই। শুধু ঘাড় কাত করে কানে হাত দিয়ে শব্দহীন ছোট্ট একটা শব্দ বলে, “স্যরি!”

সেই ভঙ্গির দিকে তাকিয়ে আবার ভাষা হারিয়ে ফেলে নিবিড় রায়। না, সামনের জন কোন অপ্সরীর ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে নেই। কোন মোহের জালে জড়াবার ইঙ্গিতও করেনি। তবুও কী যেন আছে যা শুধুই আকর্ষণ করে, মায়ায় জড়ায়। দুষ্টু অথচ নিষ্পাপ চাহনি, আর সেই চাহনিতে কারুর জন্য ভীষণ ভালোবাসা মানুষটির সমস্ত সত্তাকে দিয়েছে অন্যরকম স্নিগ্ধতা। ‘স্নিগ্ধা’ নামটি বোধহয় এ কারণেই তার জন্য ঠিক করা হয়েছিল জন্মের পরপরই, মনে মনে স্বীকার করে নিবিড়। মুখে বলে, “হুম…উহহু এতো সহজে ক্ষমা করা যাবে না তো।”

-“কেন?” আদুরে গলায় প্রশ্ন করে ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলে নিঝুম। অভিমানের মেঘ কেটে গেছে। এখন আহ্লাদ করতে বাধা নেই। বাঁধ মানছেও না অবশ্য আহ্লাদ।
– “Compensation লাগবে।”, দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে ওঠে নিবিড়ের চোখে।
সাথে সাথে সেই হরিণীর চপলতা ফিরে আসে, “ইশশশ! ভাল হচ্ছে না কিন্তু, এই! দেব এক চড়! একটা খেয়ে শখ মেটেনি? আবার খেতে চাস, না?” একই সাথে পালানোর রাস্তা খুঁজতে থাকে এদিক ওদিক তাকিয়ে।

-“দে না। আমি তো খেতেই চাইছি।”, বলে আরও একটু এগোয় আরেকজন। এবার নিঝুমের আর যাবার জায়গা নেই। পিছিয়ে জানলার তাকেই বসে পড়ে পা ঝুলিয়ে। মুখে ড্যাম কেয়ার ভাব। কিছুতেই অপ্রস্তুত হতে রাজি নয় যেন। কিন্তু ততক্ষণে নিবিড়ের চোখ আবার বেঁধে নিয়েছে তার চোখ দুটোকে। আয়না না থাকলেও গালে রক্তিমাভা টের পায়। সম্মোহন করে ফেলছে যেন ছেলেটা তাকে…না পারছে চোখ নামাতে, না সরাতে। এই সম্মোহনের মধ্যেই কখন যেন ওর নিবিড় হাত বাড়িয়ে খুলে দিয়েছে পনিটেলটা, আর কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে বলেছে, “শোন না, এরকম অগোছালো চুলের নিঝুমকেই আমার বেশি পছন্দ জানিস তো? লাভ ইউ।” আর তারপর ঠিকমতো লজ্জা পাওয়ারও সুযোগ না দিয়ে আরও কাছে এসে বলেছে, “আর কখনও সেদিনের মত কিছু করলে পিটিয়ে হাড় গুঁড়ো করে দেব মনে রাখিস।” তারপর আলতো করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিয়েছে জানলা থেকে। আর…তারও পর দেখা যাচ্ছে সদ্য-ঘাড়-ধাক্কা-প্রাপ্তা মেয়েটি ভীষণ অখুশি হয়ে নিবিড়কে পেটানোর জন্য ওর পিছে বাড়িময় ছুটে বেড়াচ্ছে মায়েদের বকুনি উপেক্ষা করেই। কে বলবে এই একটু আগেও অভিমান বাসা বেঁধেছিল দুজনের মাঝে? ঠিক এই মুহূর্তে দুজনের হৃদয়সাগরের অতলে তলিয়ে দেখলে পাওয়া যাবে ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের বিরল সংমিশ্রনের ঝিনুকের রস নিঃসরণে গঠিত মুক্তো। যে মুক্তো জ্বলছে আগুনের মত; ভালোবাসার পবিত্রতায় শীতল সে আগুন। আর সাথে রয়েছে সবচেয়ে ভাল দুটি বন্ধুর সারাজীবন একে অপরের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয়ের কঠিন অথচ স্নিগ্ধ শুভ্রতা।

“নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা”— হ্যাঁ, শরৎকাল চলে এসেছে। সাথে এসেছে শারদীয় দুর্গাপূজাও। আকাশে বাতাসে পূজার আমেজ। শরতের নির্মল প্রকৃতির আনাচে কানাচে যেন আনন্দ আর আনন্দ। রঙ লাগতে শুরু করেছে মণ্ডপে মণ্ডপে, রঙ লেগেছে মানব মনেও। আর বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, যেখানে ধর্মীয় উৎসব মানে শুধু বিশেষ কোন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের উৎসব নয়। এ উৎসব সমগ্র জাতির- ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে। তাই আনন্দ থেকে দূরে নেই কেউ। নিবিড়ের সাথে সাথে নিঝুমের বাড়িতেও লেগেছে শারদীয় দুর্গোৎসবের রঙ।

মহালয়ার দিন থেকে মহা অষ্টমী পর্যন্ত রোজ মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেরিয়েছে দু’ পরিবার। নিঝুম উড়ে বেরিয়েছে রঙ্গিন প্রজাপতির মত। এবার যে তার মনে অন্যরকম আনন্দ। সে যে কারুর মনের দেবীও হয়ে গেছে। সেই বিশেষ মানুষটিকে এবার রোজ পেয়েছে নিজের পাশে। অনেকক্ষণের জন্য অনুভব করতে পেরেছে তার উপস্থিতি, ঘ্রাণ নিতে পেরেছে মন চাইলেই। পাশাপাশি হাঁটার সময় সবাইকে লুকিয়ে একটু ছুঁয়ে দেওয়া, নিঝুম যখন প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থেকেছে মুগ্ধ চোখে, সেইসময় আরেকজনের মুগ্ধ দৃষ্টি তার ওপর পড়ে রয়েছে, তা বুঝতে পেরেই পালিয়ে যাওয়া, ভিড়ের মধ্যে নিঝুমের পাশে ওর অভিভাবকের মত চলা, আর কোন ছেলে যাতে ওর পাশে না আসে সেদিকে কড়া নজর রাখা…আর সুযোগ পেলেই “ভালোবাসি” জানিয়ে দেওয়া… ইশ কী সুখ! “সইবে তো এতো সুখ আমার কপালে?”, একলা মুহূর্তগুলোতে বারবার এ প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে নিঝুমের মনে। কিন্তু নিবিড়ের ভালোবাসা পর মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিয়েছে সবকিছু, কেটে গেছে সমস্ত সংশয়, রংধনুর সাতটি রঙ নিয়ে হেসে উঠেছে নিঝুম আবার।

আজ মহানবমী। নিবিড়রা আজ ওদের গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। শহরের একক পরিবারগুলো বছরের এই একটা সময়েই একত্রিত হয়ে যৌথ পরিবারের রূপ নেয়। একদিকে খুশি হলেও অন্যদিকে নিবিড়ের মন ভাল নেই। তার প্রাণপ্রতিমাকে যে ছেড়ে যেতে হচ্ছে কিছুদিনের জন্য। গতকাল খুব মন খারাপ ছিল সেজন্যে। রাতে মণ্ডপ থেকে ফেরার পথে বারবার নিঝুমের হাত আঁকড়ে ধরছিল। আরেকটু সময় যদি কাছে পাওয়া যায়, আরও একটুক্ষণ যদি একসাথে থাকা যায়, যদি এই তারাভরা আকাশের নিচে হাত ধরে কখনও শেষ না হওয়া পথ বেয়ে হেঁটে চলা যায়……কল্পনার কতশত রঙ খেলে গেছে মনে। নিঝুম সব বুঝেছে। কিন্তু তাও হাসিমুখে বিদায় দিয়েছে তাকে। ও- ও মন খারাপ করে ফেললে যে ওর নিবিড় আরও মন খারাপ করবে। তাই অশ্রু চেপে হাসিমুখে শেষবারের মত হাতে একটু চাপ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। কিছু না বলেও অনেক কিছু বলেছিল। সাথে চোখে ছিল একটু দুষ্টুমির ঝিলিক। যেন বলছে, “যাও না। এবার আমার দুষ্টুমিতে বাধা দেবে কে? কিছুদিনের জন্য আমি আবার বনের বাঁদর হয়ে যাচ্ছি!” কিন্তু ভাবার সাথে সাথে অন্যজন যেন মনের কথা পড়ে নিয়েছে, বলেছে, “এই একদম দুষ্টুমি করবি না এই কদিন। মনে আছে তো কী করব বলেছি তাহলে?” নিঝুম ছোট্ট করে ভেংচি কেটে দিয়েছে, বলেছে, “হুহ!”… তারপর একবারের জন্য চোখে চোখ রেখে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেখতে দিতে চায়নি এই বিচ্ছেদে তারও কষ্ট হচ্ছে। আজ সকালে ফোনও করেছিল এক ফাঁকে। বলেছে সাবধানে যেতে, নিজের যত্ন নিতে, মা-কে দেখে রাখতে, রাস্তায় উল্টোপাল্টা কিছু না খেতে, আরও হাজারো উপদেশ। নিবিড় চুপচাপ শুনেছে। স্বাভাবিক উচ্ছ্বলতায় কথা বললেও মেয়েটা ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে, আর কেউ না জানুক, সে তো জানে।

“কবে যে ওকে নিজের করে পাব, আর যেখানে যাব সাথে করে নিয়ে যাব! আজ মা-কে পাশে নিয়ে যাচ্ছি, কবে যে ও থাকবে আমার পাশে! যে ঘুমকাতুরে মেয়ে, ঠিক আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়বে, আমি দু’ চোখ ভরে ওকে দেখব। কতদিন? আর কতদিন?! যাকে একদণ্ড ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না, তাকে ছেড়ে তিনটে দিন আমি কীভাবে কাটাবো?”, ছুটন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরের পরিচিত দৃশ্য আর পরিচিত শহরটাকে পিছে চলে যেতে দেখতে দেখতে একথা ভেবে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস পড়ে নিবিড়ের। তখনই পকেটে রাখা ফোনটাতে vibration টের পায়। মিসডকল দিয়েছে কেউ। বের করে দেখে, স্ক্রীনে ভেসে উঠেছে- “Nijhu_home”। এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দেয় গম্ভীর হয়ে চেপে থাকা ঠোঁটের কোণে। “যাক আমি তবে একাই মিস করছি না!”, নিজেই বলে নিজেকে। একই সাথে পরপর তিনটি মিসডকল চলে যায় নিঝুমের ল্যান্ডলাইনে, যার অর্থ- “I love you”… নিবিড়ের মোবাইলেও সাথে সাথে একই নাম্বার থেকে আরেকটা মিসডকল আসে, অর্থ- “হুম।” হেসে দেয় নিবিড়, “মরে যাবে, তাও বলবে না ‘ভালোবাসি’। পাগল মেয়ে!”…সেই মুহূর্তটাতে আরও বেশি ভালবেসে ফেলে নিঝুমকে। চোখ বন্ধ করে তলিয়ে যায় কল্পনার গভীরে…কানে লাগানো হেডফোনে গান বাজছে-

“যখন নিঝুম রাতে
সব কিছু চুপ,
নিষ্প্রাণ নগরীতে ঝিঁঝিঁরাও ঘুম!
আমি চাঁদের আলো হয়ে,
তোমার কালো ঘরে;
জেগে রই সারা নিশি
এতটা ভালবাসি….
এ কি অপরূপ সুন্দর
তার স্বপ্নের বর্ষা রাতে;
আমি ভিজে ভিজে মরি
মিছে মগ্ন প্রভাতে…
দেখি ভীষণ অন্ধকার মাঝে
আলো ছায়ায় তার নূপুর বাজে!
আমি যে ভেবে ভেবে শিহরিত…
আমি সূর্যের আলো হয়ে
তোমার চলার পথে
ছায়া হয়ে তোমায় দেখি
এতটা ভালবাসি।
হুম….. এতটা ভালবাসি….”

কিন্তু পরদিন সকালেই সব বদলে যায়, সারাজীবনের মত। জরুরি তলব পেয়ে তড়িঘড়ি ক্লাস থেকে ফেরার পর নিবিড় জানতে পারে গত সন্ধ্যাটাই ছিল বাবাইয়ের সাথে কাটানো তার সর্বশেষ সন্ধ্যা, আজ সকালে তাকে মাথায় হাত দিয়ে “বাবু ওঠ, ক্লাস আছে তো” ডাকাটাই ছিল নিবিড়ের বাবার শেষবার তাকে “বাবু” বলে ডাকা………… সব শেষ…। জানতে পারে নিবিড় যাবার কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরোতে গিয়ে হঠাৎ অ্যাটাক হয়, মা এসে ধরেন, তারপর মায়ের হাতের ওপরই শেষ হয়ে যায় সব………… পাথর হয়ে যাওয়া নিবিড় কাঁদতে পর্যন্ত পারেনি সেদিন… দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল চুপচাপ… নিঝুমের বাবা মা আসেন… বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এই মানুষটিকেই কালকে সন্ধ্যায় দেখে গেছিলেন, কী হাসিখুশি, কী প্রাণোচ্ছল, আজ সেই মানুষটাই অতীত………

“ক্রিং ক্রিং! ক্রিং ক্রিং!”, ফোনের শব্দে চমকে ওঠে নিবিড়। ধাতস্থ হতে খানিকটা সময় লাগে, বুঝতে পারে সে সেইদিন থেকে আজ অনেক দূরে, সেই স্মৃতি শুধুই স্মৃতি এখন। বাবা নেই…শুধু স্মৃতি আছে, ফটোফ্রেমে বন্দী হয়ে আছে হাসি, কান্না, দুঃখ, আনন্দ। মনের অ্যালবামে সাজিয়ে রাখা আছে সেই মানুষটার নিত্যদিনের কথাগুলো………আবার বেজে ওঠে ফোন। বেজে বেজে কেটে গিয়েছিল এতক্ষণে। এখন আবার বাজছে। চোখ মুছে পকেট থেকে বের করে ফোনটা। নিঝুম ফোন করেছে। মনে মনে ভাবে, “এই মুহূর্তে ওকেই সবচেয়ে দরকার ছিল আমার……”। ধরে ফোনটা, কিছু বলার আগেই নিঝুমের গলা শোনা যায়, “মন খারাপ খুব?” নিবিড় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “কীভাবে জানলি?” উত্তর আসে, “জানিনা, মনে হল। খুব মনে হচ্ছিল তোর মন খারাপ। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল খুব। বাবা-মাও বাইরে গেল, কী ভাগ্য! তাই ফোন করলাম। ”
-“হুম।”
কেন মন খারাপ জানতে না চেয়েই ওইপাশের মানুষটি বলে, “তুই এমন মন খারাপ করে থাকলে আনটির কেমন লাগবে বল তো? আজ তো উনার তোকে খুব দরকার। প্লিজ আজ একটু উনার পাশে থাকিস তুই, একা ছাড়িস না। আর বিসর্জনের পর তো নয়ই।” নিবিড় বুঝতে পারে কেন এ কথা বলছে। বিসর্জনের পর আবির খেলা হয়, প্রকাশ না করলেও মা’র ও তো মন কেমন করে……… ভালবেসে যার সাথে সাত জন্ম কাটানোর শপথ নিয়েছিলেন, সেই গাঁটছড়া ছুটে গেছে হঠাৎ, অকালে………
আবার ওপাশে নিঝুমের কণ্ঠ শুনে বাস্তবে ফিরে আসে নিবিড়, “এমন মন খারাপ করেনা রে। একদম চুপ হয়ে গেছিস, কিছুই বলছিস না। আনটির সামনে এমন করিস না, খুব কষ্ট পাবেন উনি।”

এরপর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করে নিবিড়। একেই বোধহয় ভালোবাসা বলে, টেলিপ্যাথি বলে কিছু থাকলেও সেটাও বোধহয় এটাকেই বলে। কিছু না বলেও অনেক কথা বলে ফেলা, বুঝে ফেলা… আর ঠিক সময়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া…… মেয়েটার কথায় যেন জাদু আছে, মন খারাপ করে থাকা যায় না বেশিক্ষণ। অনেক ভার নেমে যায় মন থেকে। কদিন থেকেই আকাশটা মেঘ হয়ে ছিল, আজ ওরা কথা বলতে বলতেই ঝুমবৃষ্টি নামে। একজন তাতে ভিজতে ভিজতে পুকুরপাড় থেকে বাড়িতে ফেরে, আর আরেকজন ফোন কানে নিয়ে সেই বৃষ্টির শব্দ শোনে আর ভালোবাসার মানুষটির মন ভালো করার খুশির অদৃশ্য বৃষ্টিধারায় ভিজতে থাকে………

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s