অনন্ত নিঝুমতা – ৩


পর্ব ৩

বাসায় এসে নিবিড়কে ফোন করে। সৌভাগ্যক্রমে মা বাইরে গিয়েছেন নিঝুমকে বাসায় ড্রপ করেই। তাই বাসায় ঢুকেই ফোন দিতে পারে। নিবিড় একটু গম্ভীর হয়েই ফোনে কথা বলে নিঝুমের সাথে। নিঝুম অনেক বোঝায়, অসংখ্য রিকোয়েস্ট করে উল্টোপাল্টা কিছু না করার জন্য। বলে যে আকাশ যাই বলুক, তার কাছে তো নিবিড় তার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। অবশেষে শান্ত হয় নিবিড়। ভালভাবে কথা বলে নিঝুমের সাথে। তবে নিঝুম ঘুণাক্ষরেও বলেনা অনন্যা আজ তার সাথে কী ব্যবহার করেছে। নিবিড় ওর গলা শুনে মন খারাপ বুঝতে পারলেও হাজার চাপাচাপিতেও কিছু বলেনা। শুধু বলে যে টায়ার্ড লাগছে খুব। এরপর অল্প কথায়ই ফোন রেখে দেয়।

এতক্ষণে নিজের সাথে একা হওয়ার সুযোগ পায় নিঝুম। সমস্ত আবেগের আগল খুলে যায়। চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে অজস্র বারি। কিন্তু কোন প্রশ্নেরই কোন জবাব দিতে পারেনা সে নিজেকে। অবুঝের মত কাঁদতে থাকে শুধু একা একা। তার এই কষ্ট কাউকে বলার নয়। এর ভাগীদার সে একলাই। আগে নিবিড় ছিল, যাকে সবকিছু সে মন উজাড় করে বলতে পারত। কিন্তু এখন সেই নিবিড়ই…

আরেকটা কর্তব্য বাকি থেকে যায় তখনও। তবে সেটাও সে তাড়াতাড়িই করে ফেলে। তা হল, আকাশকে সাবধান করে দেওয়া। সেইদিন রাতেই সে আকাশকে একটা লম্বা মেসেজ পাঠায় কঠোর ভাষা প্রয়োগ করে। বলে দেয়, নিবিড় তার “আর সবার মত কেবল একটি বন্ধু” নয়, সে তার সারা জীবনের বন্ধু। বরং আকাশকেই তার শুধুই একজন বন্ধু বলা যেতে পারে। সাথে এটাও বলে দেয় যে এরপর নিবিড়ের আর একটা অপমানও সে সহ্য করবেনা। এর আগেও মানা করেছে আকাশকে, এবার শেষবারের মত সাবধান করছে। আরও বলে, “তুই যে আমার সাথে ফোনে কথা বলতে মানা করেছে বলে নিবিড়কে এত কথা শুনিয়েছিস তা আমি খুব ভালমত জানি। কিন্তু একটা কথা তোকে বলে দিই, আমার নিজেরও ইচ্ছা নেই তোর সাথে ফোনে কথা বলার। তোর যদি আমার সাথে কথা বলতেই হয়, নিবিড়কে ভালভাবে রাজি করা, দরকার হলে ওকে ‘প্লিস’ও বলতে হবে তোকে। ও যদি মানে তাহলেই আমি কথা বলব, নাহলে না। তবে এটা মনে রাখবি, আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে তোর সাথে কথা আমি বলবনা। আর হ্যাঁ, শেষ একটা কথা বলে রাখি। আমার এই মেসেজের কোন উল্টোপাল্টা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা তুই করবিনা। আমাকেও না, আর নিবিড়কে তো না-ই। কারণ তুই নিজেও জানিস যা করেছিস খুব ভুল করেছিস। সুতরাং উত্তর দিতে চাইলে ভালভাবে দিবি। একটা উল্টোপাল্টা কাজ করবি তো কাল তোর সাথে যে কোন উপায়ে দেখা করে এমন মার মারব, কোন ছেলেও এত মারতে পারবেনা কোনদিন তোকে। জানিস যে এটা আমি পারি। নিঝুমকে এতদিনে ভালভাবেই চিনে গেছিস আশা করি। বাই।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে আকাশের নাম্বারটা বের করে মেসেজটা সেন্ড করে দেয় নিঝুম। এসব কী হচ্ছে তার জীবনে? ছোটবেলা থেকে ভাইদের মধ্যে বড় হওয়ার কারণেই হোক, আর বিভিন্ন স্পোর্টসে পারদর্শী হওয়ার কারণেই হোক, ছেলেদের সে ভয় করতে শেখেনি কখনও। বরং এটা খুব ভালভাবেই বোঝে যে ছেলেরা তাকে সমীহ করে চলে। কিন্তু কোন ছেলেকে পিটুনি দেওয়ার হুমকি দেওয়া এই প্রথম। নিজের মনেই একটু হেসে ফেলে সে। তার স্বচ্ছ,কোমল অথচ দৃঢ় প্রকৃতির কারণেই কোন ছেলে আজ পর্যন্ত তাকে কোন ফালতু কথা বলতে সাহস পায়নি। শুধুমাত্র নিবিড় তার ভেতরের আসল নিঝুমকে চেনে, বোঝে। নিবিড়ের নামটা মনে আসতেই একটা বিদ্রূপাত্মক হাসিতে ঠোঁটের কোণ বেঁকে যায় নিঝুমের। এ বিদ্রুপ আর কাউকে নয়। এ বিদ্রুপ নিজেকে। নিবিড়! হাহ!

আকাশ এরপর স্যরি লিখে মেসেজ দেয় নিঝুমকে। কিন্তু নিঝুম আর নরম হয় না। রিপ্লাই করেনা এই মেসেজের। নিজের জগতে নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে চায়। পরবর্তী পরীক্ষার আগে বেশ কয়েকদিন ছুটি আছে। রাজ্যের গান শোনে এই দিনগুলোতে সে। নিবিড়ের কোন খোঁজ নেয় না ইচ্ছে করেই। যদিও ল্যান্ডলাইনে মিসডকল আসতে শুনে বোঝে যে নিবিড় তাকে খুঁজছে। নিলীমা আর প্রজ্ঞা দুজনেরই লুকোনো মোবাইল, পরীক্ষার সময় ইউস করতে পারছে না, তাই ওদেরকেও বলতে পারছে না নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে দিতে। আর অনন্যাকে তো বলার প্রশ্নই আসে না। ওকে বললেও ও কখনোই নিঝুমের খোঁজ বের করে দেবে না। বা দিলেও নিবিড়ের ওপর খুবই বিরক্ত হবে, জানে নিঝুম। কারণ অনন্যা তার সাথে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে কথা বলা পছন্দ করে না। সুতরাং…নিবিড় ওকে বলার সাহসই পাবে না। এজন্য অবশ্য অনন্যাকে দোষও দেয় না নিঝুম। যার যা স্বভাব। নিবিড়ের থেকে ইচ্ছে করেই সে দূরে দূরে থাকছে। না, তার অনুভুতি নিয়ে খেলতে নয়, বরং তাকে অভ্যস্ত করতে। যদি অনন্যার সাথে সত্যি কোন সম্পর্ক হয়েই থাকে নিবিড়ের, তবে তার কারণে তাতে কোন বিঘ্ন যাতে না ঘটে, এই উদ্দেশ্যেই সে নিবিড়ের সাথে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অনন্যা আর নিবিড় দুজনের পরীক্ষাই ভাল হবে হয়তো একজন আরেকজনের সাথে কথা বললে। তাই হোক।

গান বরাবরই নিঝুমের খুব প্রিয়। নিজে সে রবীন্দ্র সঙ্গীত শেখে। ঈশ্বরপ্রদত্ত সুরেলা কণ্ঠ তার নেই। অনেক কষ্ট করে, অনেক সাধনা করে এখন কিছুটা সুরে এসেছে গলা। নিঝুম বোঝে ভাল গানের কত কদর। তাই গান শুনতেও খুব পছন্দ করে। পরীক্ষা-অন্তর্বর্তীকালীন ছুটিতে চুটিয়ে গান শোনে, আর নিজেও চর্চা করে। আর তা করতে যেয়ে নিজের মধ্যে কিছু পরিবর্তন সে টের পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সে যেন নতুন করে আবিষ্কার করতে থাকে প্রতিটা গানের মধ্য দিয়ে। আগে কখনও গান এমন করে মনে দাগ কাটেনি নিঝুমের। এখন যেন প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য তার কাছে নতুন নতুন অর্থ প্রকাশ করতে থাকে। বিস্ময়ে, শ্রদ্ধায় বারবার মাথা নুয়ে পড়তে থাকে তার সঙ্গীতের সেই মহান স্রষ্টার উদ্দেশ্যে। গভীর অনুরাগের মধ্য দিয়ে বুঝতে পারে, অবশেষে সে প্রেমে পড়েছে। হ্যাঁ, গানকে সে মন থেকে ভালবাসতে পেরেছে অবশেষে। এই কয়দিন তাই নিবিড়কে ভুলে থাকতে তার অসুবিধা হয়নি। কিন্তু…ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অশান্তি তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। যতক্ষন গানের মধ্যে থেকেছে, ভাল থেকেছে। গানের জগতটা থেকে বাইরে আসলেই অবসাদ তার নিত্যসঙ্গী হয়েছে। বাবা মা’র সামনে ভাল থাকার চেষ্টা করলেও নিজের কাছে নিজেকে সে কিছুতেই লুকাতে পারেনা। সেদিন অনন্যার ওই ব্যবহার তাকে ভীষণ নাড়া দিয়ে গেছে। তাই প্রচণ্ড মানসিক চাপ বারবার তাকে চেপে ধরছে। এই চাপ নিয়েই সে বাকি পরীক্ষাগুলো দেয় কোনমতে। অনন্যার কাছে শোনে নিবিড় তার খোঁজ করেছে। শুনে কিছু বলে না। বাসায় এসে একটা দুটা মিসডকল দেয়। কিন্তু কোনরকম মেসেজে যায় না। থিওরি পরীক্ষা শেষ করে কোনরকমে। এবার কিছুদিনের বিরতির পর প্রাকটিকাল পরীক্ষা শুরু।

ছুটির প্রথমদিন সকালে অনেক দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে নিঝুম। সবে নাস্তা শেষ করে গোসল করেছে, ডোরবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে নিবিড়, ঈশিতা আর আনটিকে দেখে ভীষণ অবাক হয় সে। ভাবতেই পারেনি ওরা চলে আসবে আজ। মাও খুব খুশি হন তাঁর বান্ধবীকে পেয়ে। নিবিড় আর ঈশিতাকে পাঠিয়ে দেন নিঝুমের রুমে। ওরা আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত নিঝুম একটাও কথা বলেনি নিবিড়ের সাথে। নিবিড়ের মা আর ঈশিতার সাথে কথা বলে নিজের ঘরে চলে গেছে। নিবিড় আর ঈশিতা ঘরে ঢুকে দেখে নিঝুম জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, তার ‘ঝনটু মিয়া’র সাথে গল্প করছে। ঝনটু মিয়া হচ্ছে নিঝুমের পোষা কাকের ছানা। আসলে ঠিক পোষা নয়। নিঝুমের ঘরের জানালার ঠিক পাশেই বিশাল আমগাছ আছে একটা,যার একটা ডাল নিঝুমের জানালা ছুঁইছুঁই। সেই ডালেই কাকের বাসা রয়েছে। এমনিতে নিঝুম কাক অসম্ভব ভয় পায়। তার দিকে কোন কাক উড়ে আসতে দেখলে চিৎকার করে চারপাশ কাঁপিয়ে দেয়। এই নিয়ে বন্ধুবান্ধবরা কত হাসাহাসি করে, নিবিড়ও তার বাইরে নয়। কিন্তু এই বাসাটায় কয়দিন আগে একটা কাকের ছানা হতে দেখেছে নিঝুম। কেন যেন খুব মায়া পড়ে গেছে তার বাচ্চাটার ওপর। চোখ নেই, ডানা নেই, খালি কিচকিচ করে। নিঝুম এর আগে কখনও কাকের ছানা দেখেনি, তাই হয়তো এটাকে প্রথম দেখে তার কাছে “চরম কিউট” লেগেছে। তারপর থেকে নিঝুমকে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় এই জানালার কাছে কাকের বাসার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। কাকের বাচ্চার আবার নামও রেখেছে, ‘ঝনটু মিয়া’! নিবিড় আর অনন্যা শুনে হাসতে হাসতে কাহিল হয়ে গেছে। মানুষের এমন খেয়ালও হতে পারে! তবে নিবিড় জানে যে তার নিঝুম এমনই। তাই বেশি হাসাহাসি করেনি। সস্নেহে বলেছে, “পাগলি।” তাই আজ যখন ঘরে ঢুকে নিঝুমকে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে সে ওখানে কী করছে। নিঝুমের সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কেন যেন কিছু বলতে পারে না। নিঝুমও মুখ ফিরায় না তার দিকে। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে থাকে দুজনে। প্রথম কথা শুরু করে ঈশিতাই। তারপর আস্তে আস্তে নরমাল হয়ে আসতে থাকে নিবিড় আর নিঝুম। কথাপ্রসঙ্গে অনন্যার কথা এসে যায়। নিঝুম জিগ্যেস করে, “তুই যে এখানে এসেছিস তোর বউ জানে? ওকে জানা। ও তো তোকে দেখেনি। আমাকে বলেছিল তুই আসলে জানাতে। আমার তো ফোন নেই, তাই তুইই জানা।” নিবিড় একটু গাইগুই করলেও তেমন আপত্তি করেনা। ফোন দেয় অনন্যাকে। কিন্তু ফোন ধরেনা কেউ। বলে, “ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে হয়তো।” নিঝুম বলে, “সে এখনও আছে? আবার তুইও তো তার বর। কীজানি বাবা, বুঝিনা তোদের ব্যাপার।”

আরও কিছুক্ষণ থাকার পর ওরা চলে যায়। একটু পর নিঝুম বাবার সাথে একটু বাইরে বের হয়। বাইরে গেলে বাবার মোবাইল ওর হাতেই থাকে। হঠাৎই নিবিড়ের নাম্বার থেকে একটা মেসেজ আসে, “কেমন আছিস?” নিঝুমের মেজাজটা একটু খিঁচরে ছিল নিবিড়ের উপর। তাই রিপ্লাই করে, “দেখেই তো গেলি কেমন আছি। আবার জিগ্যেস করছিস কেন? যা তোর বউয়ের খোঁজ নে গিয়ে। বাই” নিবিড়ের রিপ্লাই আসে, “মানে?” এর আর কোন উত্তর দেয় না নিঝুম।

প্রাকটিকাল পরীক্ষা শুরু হয়। প্রথমদিন অনন্যার সাথে যায় নিঝুম। গাড়িতে যেতে যেতে নিবিড়কে আর আকাশকে নিয়ে অনেক কথা হয় দুজনের মাঝে। একই কোচিঙে পড়ার সুবাদে আকাশ অনন্যারও পরিচিত। তার পুরনো বয়ফ্রেন্ডের বন্ধু আকাশ। সেই হিসেবেও পরিচিত। আকাশ খুব একটা পছন্দ করেনা অনন্যাকে। অনন্যাও আকাশের ব্যাপারে নানা উল্টোপাল্টা কথা বলে। তবে নিঝুম এসব কিছুতে নাক গলায় না। আকাশ তার ভাল একজন বন্ধু। যদিও এই মুহূর্তে আকাশের উপর সে রেগে আছে সেদিনের ব্যাপারে, তবে আকাশ তাকে খুব অল্প সময়ে আপন করে নিতে পেরেছে, এজন্য সে আকাশের প্রতি কৃতজ্ঞ। কথায় কথায় অনন্যা হঠাৎ বলে, “জান নিঝুম, কাল নিবিড় আমাকে খুব সিরিয়াসলি জিগ্যেস করেছে আমি ওকে বিয়ে করব নাকি।” নিঝুম অবাক হয়ে যায় শুনে। নিবিড় জানেনা ওর বয়ফ্রেন্ড আছে? মাথা কি পুরোটাই গেছে ছেলেটার? সে কিছু বলার আগেই অনন্যা বলে, “আমি শুনে খুব হেসেছি। ওকে আমি বিয়ে করব নাকি? ও আমার পিছে ঘুরে, আর সব ছেলের মতই।” বলে আবার হেসে ওঠে। কান গরম হয়ে যায় নিঝুমের এই কথা শুনে। মেয়েটা কাকে কী বলছে বুঝে বলছে তো? তবে মুখে সেটা প্রকাশ করেনা। বলে, “নিবিড় খুব ভাল ছেলে। ও যদি সিরিয়াসলি কিছু বলে থাকে তাহলে সেটা মিন করেই বলেছে।” অনন্যা কথার মোড় ঘুরিয়ে দেয় হঠাৎ। বলে, “কিন্তু আকাশকে নাকি ও পছন্দ করে না?” নিঝুম উত্তর দেয়, “হু করে না। কিন্তু কেন করে না আমি জানিনা। আকাশের সাথে আমি আর কথা বলিনা। ও নিবিড়কে অপমান করেছে।” অনন্যা খোঁচা দিতে ছাড়ে না, “কেন, আকাশ না তোমার খুব ভাল বন্ধু?” নিঝুম অপমানটা হজম করে বলে, “নিবিড়ের থেকে ভাল নয়। হ্যাঁ এটা সত্যি যে ও আমার ভাল বন্ধু, কারণ অন্য অনেকের চেয়ে অনেক কম সময়ে ও আমাকে বুঝতে পেরেছে, সেজন্যই ও আমার ভাল বন্ধু।” অনন্যা বলে ওঠে, “হ্যাঁ নিবিড়ের চেয়েও ভাল।” এবার আর সহ্য করতে পারেনা নিঝুম। তার আর নিবিড়ের বন্ধুত্ব একযুগেরও বেশি সময়ের। তের বছর ধরে তারা বন্ধু। আর এই মেয়েটা মাত্র তের সপ্তাহের পরিচয়ে তাদের বন্ধুত্বে যা না তা বলতে শুরু করে দিয়েছে? গাড়ির সামনের সীটে বসেছিল সে। অনন্যার কথা শুনে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনা সে। শুধু পিছে ফিরে এক পলক তাকায় মেয়েটার দিকে। তারপর পাথরের মূর্তির মত নির্বাক নিশ্চল হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। পুরোটা রাস্তা আর একটা কথাও বলেনা।

ফেরার পথেও অনন্যার হাজার সাধাসাধিতেও নিঝুম কথা বলে না। আজ অনন্যা তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে। সে কখনওই পারবেনা অনন্যাকে ক্ষমা করতে। আর নিবিড়? নিবিড় প্রশ্রয় না দিলে অনন্যা এসব বলতে পারত না। তাই নিবিড়ের ওপরও রাগ উঠতে থাকে নিঝুমের। তবে নিবিড়কে কিছু না বলারই সিদ্ধান্ত নেয় সে। ঠিক করে, যোগাযোগ কমিয়ে দেবে এখন থেকে। ও অনন্যাকে নিয়ে যা ইচ্ছা করুক। নিঝুম আর নেই এসবে। আর আকাশকে নিয়ে কথা বলেছে তো, ঠিক আছে, এখন থেকে আকাশই হবে তার বন্ধু। তাই নিবিড়ের মানা থাকা সত্ত্বেও সেদিন জেদ করে নিঝুম আকাশকে ফোন করে। কিন্তু ফোন ধরেই আকাশের “ফোন করিস না কেন” অভিযোগের ফিরিস্তি শুনে বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দেয়। এরপর নিবিড়কে ফোন করে। অনন্যার ব্যাপারে কিছু বলে না। নিবিড় নিজেই শুনেছে অনন্যার কাছ থেকে কী হয়েছে। সেজন্য সে স্যরি বলে। কিন্তু নিঝুম বলে দেয়, “তুই কেন স্যরি বলছিস? তোর স্যরি বলার তো কিছু নেই নিবিড়। অনন্যার সাথে তোর সম্পর্ক গভীর হয়েছে, এখন সে আমাকে যা খুশি বলতেই পারে। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বটা আমার কাছে এখনও অনেক মূল্যবান। এটা নিয়ে যাকে তাকে যা তা আমি বলতে দিতে পারিনা। আকাশকে নিয়ে তোর যখন এতই সমস্যা সেটা তুই আমাকে সরাসরি বললে পারতি যে সমস্যাটা আসলে কোথায়। অনন্যার মত বাইরের মানুষের তো আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কথা বলার কোন অধিকার নেই। ” এরপর নিবিড়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন রেখে দেয়।

সেদিনের পর থেকে নিঝুম আর নিবিড়কে কোন মিসডকল দেয়না। নিবিড় মেসেজ দিলে শুধু রিপ্লাই করে। কিন্তু নিবিড়ের উপর্যুপরি অনুরোধে আর অনুনয় বিনয়ে বেশিদিন এমন চুপ করে থাকতে পারেনা নিঝুম। আস্তে আস্তে আবার যোগাযোগ শুরু করে। তবে অনন্যার সাথে আর কথা বলে না। নিবিড় চেয়েছিল অনন্যার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে, কিন্তু নিঝুম দেয়নি তা করতে। তার জন্য কারো সাথে কারো সম্পর্ক খারাপ হোক এটা সে চায়নি।

কয়েকমাস কেটে যায়। নিবিড়ের সাথে অনেক কথা হয় এখন নিঝুমের। অনন্যাকে নিয়েও দুষ্টুমি করে বন্ধুর সাথে। তবে নিবিড় মাঝেমাঝেই তাকে আবারও দ্বিধায় ফেলে দেয়। যেমন সেদিন একটা এসএমএস পাঠাল, যার মানে শুধু বন্ধুত্ব দিয়ে বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু নিবিড়কে জিগ্যেস করায় সে বলেছে ভাল লেগেছে তাই পাঠিয়েছে। আবার আরেকদিন কী যেন বলবে বলে, কিন্তু বলে না। নিঝুম ধরে নিয়েছে নিশ্চয়ই অনন্যার সাথে সম্পর্কের কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু যেহেতু নিঝুম অনন্যার সাথে কথা বলেনা, তাই বলতে পারেনি। “থাক যখন বলা দরকার মনে করবে, তখন বলবে”, ভেবে আর চাপাচাপি করেনি সে নিবিড়কে। মাঝে আবার একচোট মান-অভিমান হয়ে গিয়েছিল দুজনের মাঝে। নিঝুম রাগ করে নিবিড়কে কোন ফোন, মিসডকল, মেসেজ কিচ্ছু দেয়নি। পরে মান ভাঙলে ফোন দিলে নিবিড় বলেছে, “রাগ করলে কি ফোনও দেওয়া যাবেনা?” নিঝুম বলেছে, “না। আমাকে রাগাস আবার কথা বলতে চাস কেন?” অভিমানী কণ্ঠের উত্তর পেয়েছে, “আমার ভাল লাগেনা তোর সাথে কথা না বলতে পারলে, তুই ফোন না দিলে…”। কিছু সময়ের জন্য নির্বাক হয়ে গেলেও কথাটার মানে আর কিছু যে হতে পারে এটা নিঝুমের মাথায় আসেনি। বন্ধুত্বের টানই ভেবে নিয়েছে এই কথাটাকে নিঝুম, কারণ তারও তো ভাল লাগেনা বেস্টফ্রেন্ডটার সাথে কথা না বলে থাকতে, যতই রাগ হোক, যতই অভিমান দেখাক। আর তাছাড়া আগেও তো এমন কথা বলেছে নিবিড়। সুতরাং অন্যকিছু ভাবার কোন কারণ নিঝুম খুঁজে পায়নি।

অনন্যার সাথে সেদিনের ঘটনার পর আকাশকে ফোন দিলেও পরে আর নিজে থেকে তাকে ফোন দেয়নি নিঝুম। কারণ তখন দিয়েছিল রাগের মাথায়। পরে যখন জেদ কমে এসেছে তখন আর নিবিড়ের কথা সে অমান্য করেনি। দেয়নি ফোন আকাশকে। তবে আকাশের অনেক অনুনয়ের পর নিবিড় মেনে নিয়েছে আকাশের সাথে নিঝুমের কথা বলা। যদিও নিঝুম আকাশের সাথে তেমন কথা বলেনা, সে জানে নিবিড় অনুমতি দিলেও এখনও আকাশকে পছন্দ করেনা। তাই খুব কম কথা বলে আকাশের সাথে। কিন্তু একটা ব্যাপারে সে খুব খুশি যে তার জীবনে নিবিড় আর আকাশের মত দুজন বন্ধু আছে যারা তার কেয়ার করে, তাকে মূল্য দেয়। আকাশ অবশ্য বলে যে নিবিড় তাকে পছন্দ করে, নিঝুম গায়ে লাগায় না। প্রজ্ঞা নিলীমার সাথেও মাঝে মাঝে কথা হয়, তবে এখন তো স্কুল কোচিং সব বন্ধ, তাই আগের মত কথা হয় না। ওরাও আকাশের সাথে একমত। কিন্তু নিঝুম মেনে নিতে পারে না। সে তো বুঝতে পারে নিবিড়ের সাথে দুষ্টুমি করতে যেয়ে যে অনন্যার সাথে কিছু একটা আছে ওর। আর সে নিজেও তো নিবিড়কে ওভাবে দেখেনি কখনও। ওদের কথা শুনে নিবিড়কে অন্য চোখে দেখার কথা ভাবতে গেলেই হাসি পেয়ে যায় তার। “ধ্যুত” বলে উড়িয়ে দিয়ে অন্য কথায় চলে যায়।

দেখতে দেখতে রেজাল্টের সময় এগিয়ে আসে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। আর দু সপ্তাহ পরেই রেজাল্ট। সবার মনেই একটা কী হয়, কী হয় টেনশন। এমন টেনশনে ভরা এক দুপুরে নিঝুম আর নিবিড়ের কথা হচ্ছে। কেউই রেজাল্ট নিয়ে কথা বলছে না। এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে বলতে অনন্যার প্রসঙ্গ এসে যায়, যথারীতি অনন্যাকে নিয়ে নিবিড়কে খেপায় নিঝুম। তারা এখনও দেখা করেনি। অনন্যা নাকি বলেছে দেখা হলেই বিয়ে করে ফেলবে, তাই নাকি নিবিড় দেখা করতে চায় না। শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে নিঝুম। নিবিড় রেগে গেলে তারপর হাসি থামানোর চেষ্টা করে। বলে, “হায় রে বীরপুরুষ আমার! বিয়ে যদি না-ই করার সাহস থাকে তবে পছন্দ করিস কেন?” নিবিড় বলে, “কই পছন্দ করলাম?” নিঝুম আবারও হাসে, “থাক থাক আর লজ্জা পেতে হবে না।” এমন সময় হঠাৎই ফোনটা কেড়ে নেয় কেউ। ওইপাশে শোনা যায় ঈশিতার গলা, “হ্যালো নিঝুম?” একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায় নিঝুম, “জ্বি?”
ঈশিতা-“কেমন আছ?”
নিঝুম-“এই তো ভাল। তুমি কেমন আছ?”
ঈশিতা-“আছি। তোমাকে একটা জরুরী কথা বলতে আজকে ফোনটা নিলাম তোমার বন্ধুর হাত থেকে জোর করে…এই নিবিড়, একদম পিছে পিছে ঘুরবিনা। যা ওই ঘরে যা। আমার কথা শেষ হলে তারপর আসবি।”
নিঝুম একটু ভয় পেয়ে যায় ঈশিতার এইসব সিরিয়াস কণ্ঠের কথাবার্তা শুনে। ঈশিতা কখনও তাকে “তুমি” করে বলে না। আজ বলছে। কী হল হঠাৎ? জিগ্যেস করে, “কী হয়েছে? কোন সমস্যা হয়েছে কি?” ঈশিতা বলে, “আচ্ছা নিঝুম, তোমার মনে আছে আমি তোমাকে জিগ্যেস করেছিলাম নিবিড়কে তুমি পছন্দ কর কিনা?” নিঝুম মনে মনে প্রমাদ গোনে, “এখন আবার এ শুরু করল সেই একই কথা! উফফ!” মুখে বলে, “হু আছে। আমি তো উত্তর দিয়ে দিয়েছি।”
ঈশিতা-“আজ আবারও একই প্রশ্ন করছি তোকে।”
নিঝুম-“দেখ, আমার উত্তর আমি দিয়ে দিয়েছি সেইদিনই। আবার কেন এসব নিয়ে কথা বলছ? তুমিও আশা করি বলবে না যে নিবিড় আমাকে পছন্দ করে! তুমি তো ওর সাথে এক ছাদের নিচে থাক। তোমার থেকে ভাল তো নিশ্চয়ই কেউ জানবেনা যে ও কাকে পছন্দ করে না করে। আর আমি আসলে প্রেম ভালোবাসা এইসব জিনিস নিয়ে ভাবি না কখনও। যদি কাউকে পছন্দ করেও থাকি, সেটা আমার নিজের কাছেই থাকবে, তাকে বলতে যাব না কখনও। আর সবচেয়ে জরুরী কথা যেটা সেটা হল, নিবিড় অনন্যাকে পছন্দ করে, এটা তোমার জানার কথা। সুতরাং দয়া করে আমাকে শুনাতে এস না যে ও আমাকে পছন্দ করে। কারণ এটা সম্ভব না। প্রথম কারণ তো তুমি ভালভাবেই জান, সেটা আর আমাকে বলে দিতে হবেনা। আর দ্বিতীয় কারণ তো মাত্র বললাম যে নিবিড় আর অনন্যা একজন আরেকজনকে পছন্দ করে।”
ঈশিতা-“তোকে ধরে থাপ্পড় লাগানো উচিত নিঝুম।”
“মানে????”, ঈশিতার উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে হকচকিয়ে যায় নিঝুম। এক মুহূর্ত নীরবতা। এরপর নিঝুমের সমস্ত সত্তাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে অস্বাভাবিক শান্ত স্বরে ঈশিতা বলে ওঠে, “নিঝুম রে, তুই এত বোকা কেন? কেন বুঝতে পারছিস না এতদিন পরেও? হ্যাঁ আমি সবচেয়ে ভাল জানি নিবিড় কাকে পছন্দ করে। আমাকে সেটা বলা হয়েছে। নিবিড় নিজেই বলেছে। ও তোকে পছন্দ করে রে পাগলি।”

“কিইইইইইইইই???”, প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে নিঝুম।
ঈশিতা বলে, “হু তাইই। ও তোকে পছন্দ করে। কিন্তু তুই এত অবাক হচ্ছিস কেন? এর আগে কেউ কি কখনও তোকে এ কথাটা বলেনি?”
একটু চুপ করে থেকে উত্তর দেয় নিঝুম, “বলেছে। আমার সব বন্ধুবান্ধবই বলেছে। কিন্তু সেটা শুধুই তাদের অনুমান। আমি কখনওই পাত্তা দিইনি ওদের কথায়। আর নিবিড়ও আমাকে তেমন কোন ধারণা দেয়নি। কিন্তু তুমি…তুমি বলছ নিবিড় বলেছে! এও কি সম্ভব?!”
“সম্ভব হবেনা কেন রে পাগল? যাকে চার বছর বয়স থেকে চিনিস, যার সাথে তোর আত্মার সম্পর্ক, সে তোকে ভালবাসবে না তো কে বাসবে? আর ও ইঙ্গিত দেয়নি কেন বলছিস? দিয়েছে। কতবার তোকে কিছু বলার চেষ্টা করেছে, মনে পড়ে? তোর সাথে আকাশকে নিয়ে ঝগড়া করেছে, তোকে আজব আজব মেসেজ পাঠিয়েছে, তোর একদিন খোঁজ না পেলে কী সব কাণ্ড করেছে, মনে নেই?”
“আছে।”, নিঝুম ছোট্ট করে বলে।
“তাহলে?”
নিঝুম চুপ করে থাকে। একটু পর ঈশিতাই বলে, “তুই নাকি ওকে চড় মারবি, তাই ও তোকে বলার সাহস পাচ্ছিলনা। আমি কত করে বলেছি বলে দিতে, কিছুতেই বলেনি। আজ বলেছিল তুই ফোন দিলে বলবে। কিন্তু দেখি শুধু আবোলতাবোল বকে যাচ্ছিস দুজনে, তাই আমি জোর করে ফোন নিয়ে তোকে বলে দিলাম। দ্যাখ না, কেমন বিদেশী ছোট ছোট কুকুরগুলোর মত ঘুরছে আমার পেছন পেছন কী বলেছি শুনতে।”, বলতে বলতে হেসে দেয় ঈশিতা। সহসাই গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, “দ্যাখ, আমি তোকে সব বললাম। এখন তোর সিদ্ধান্ত জানা। যদিও আমার মনে হয় যে আমি তোর উত্তর জানি।”
নিঝুম বলে, “জান? কী?”
ঈশিতা বলে, “হ্যাঁ-ই হবে। তুইও মনে মনে ওকে পছন্দ করিস।”
এবার নিঝুম হেসে ফেলে। বলে, “তাই মনে হয়? আমার কখনও এমন মনে হয়নি কিন্তু।”
ঈশিতা বলে, “তুই কবে তোর অনুভূতি নিজে বুঝতে পেরেছিস বল্ তো? সবসময় তো নিবিড়ই তোর কখন কী মনে হয় না হয় সেটা তোর আগেই বুঝতে পেরেছে।”
“তাহলে আমি যদি পছন্দ করিই ওকে, সেটাও তো ওর বুঝে যাওয়ার কথা, তাই না?”, ঈশিতাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে নিঝুম।
“হয়তো বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তুই এটা না বুঝা পর্যন্ত তো ও আগাতে পারছে না। শোন, আসল কথায় আয় এবার। তোর ডিসিশন কী?”, ঈশিতা নিঝুমকে প্রসঙ্গে টানে আবার।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নিঝুম। তারপর আস্তে আস্তে বলে, “কী বলব বল? ভাললাগা আর ভালোবাসা তো এক নয়। আর তাছাড়া…”
নিঝুমের কথার মাঝে কথা বলে ওঠে ঈশিতা, “তাছাড়া যেটার কথা তুই বলতে চাচ্ছিস নিঝু, ওটা কোন সমস্যাই না আসলে। সেটার কথা পরে আসছে। ভাললাগা না ভালোবাসা, সেই পরীক্ষাটা তো তোকেই নিতে হবে রে। আমি তো জানি ও তোকে ভালবাসে। কিন্তু জীবনটা যেহেতু তোদের দুজনের, তুই দেখ্ নিবিড় তোকে আসলেই ভালবাসে কী না। সেজন্য তোকে ওর সাথে থাকতে হবে। ”
“উম…আমায় একটু সময় দাও প্লিস।”, নিঝুম বলে।
ঘরের ভেতর থেকে বারান্দায় অস্থিরভাবে পায়চারিরত ভাইয়ের দিকে তাকায় ঈশিতা। এক মুহূর্ত ভাবে। তারপর বলে,“আচ্ছা দিলাম সময়। কিন্তু বেশি সময় নিস না। আমার ভাইটা তোকে বড্ড বেশি ভালবাসে নিঝুম। তুই ঠকবি না, আমি কথা দিতে পারি।”
“হুম্।”, কী বলবে ভেবে না পেয়ে বলে নিঝুম।
আবার নীরবতা। একটু পর প্রায় শোনা যায় না এমন কণ্ঠে নিঝুম বলে, “আমি কি ওর সাথে একটু কথা বলতে পারি?”
ওপাশ থেকে ঈশিতার কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠ শোনা যায়, “কার সাথে?”
থেমে থেমে নামটা উচ্চারণ করে নিঝুম, “নিবিড়”, বলতে যেয়ে স্বর কেঁপে যায়।
“অ্যাই গাধা, আয়। আর ওখানে দাঁড়িয়ে তড়পাতে হবেনা কখন ওর সাথে কথা বলতে পারবি ভেবে ভেবে।…আচ্ছা নিঝু, বাই। কথা বল তোর ‘তার’ সাথে!”, বলেই আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিবিড়ের কানে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে যায় ঈশিতা।
“আচ্ছা আমি যে নিবিড়কে চাইলাম, ওর সাথে কী কথা বলব আমি? কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে ওর সাথে কথা বলতে হবে ভেবেই!”, আপনমনেই ভাবে নিঝুম, একটা অস্বস্তি কাজ করছে ওর ভেতর। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শোনা যায়, “হ্যালো!”, নিবিড়ের চিরচেনা কণ্ঠ। একটু কি রক্তিম হয় নিঝুম? হয়তো হয়। নাহলে যে নিবিড়ের কণ্ঠ শুনে নদীর মত কলকলিয়ে উঠত সে, একটু আগেও যে নিবিড়ের সাথে অন্য একজনকে নিয়ে দুষ্টুমি করেছে, এখন মাত্র পনের মিনিটের বিরতিতে সেই নিবিড়ের কণ্ঠ তার হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ির বাড়ি মারছে কেন? কেন নিঝুম কথা বলতে পারছেনা তার প্রিয় বন্ধুর সাথে? এ অনুভূতি কি শুধুই অস্বস্তি? না সাথে অজানা এক আনন্দ আর শিহরণমিশ্রিত লজ্জাও আছে? সৃষ্টিকর্তাই এর উত্তর ভাল দিতে পারবেন। মানবমনের বিচিত্র রংবেরঙের অনুভূতির রহস্য মানুষের কাছে আজও তো অনেকটাই অজানা। ইতিমধ্যে নিবিড় আরও দু-তিনবার “হ্যালো হ্যালো” বলে ফেলেছে। কিন্তু নিঝুম নীরব হয়ে আছে। অবেশেষে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে নিঝুম উত্তর দেয় নিবিড়ের ডাকাডাকির, “হু হ্যালো!”
“কী?”, প্রশ্ন আসে ওপাশ থেকে। প্রশ্নকারীকে একটু রাগত স্বরেই পাল্টা প্রশ্ন করে উত্তরদাতা, “কী আবার? কী শুনলাম এটা? যা শুনলাম তা সত্যি?” কিন্তু সেই রাগের প্রশ্নে নিবিড় কেন যেন একটু অভিমান খুঁজে পায়, এ অভিমান নিঝুমকে আগে কেন বলা হল না যে নিবিড় ওকে পছন্দ করে সেজন্য। এ অভিমান তার ভীষণ ভীষণ ভীষণ প্রিয়। তাই আরও একটু উপভোগ করার লোভ সামলাতে পারেনা। অবাক হবার ভান করে নিঝুমকে প্রশ্ন করে, “কই কী শুনলি? আমি তো কিছু জানি না? খোলাখুলি বল্ কী শুনলি?” এবার বিপাকে পড়ে যায় অভিমানিনী। যা শুনতে চাইছে তা তো বলা মুশকিল। বলতে গেলে যে ঈষৎ রক্তিম থেকে পুরোপুরি “মাল্টিকালার” হয়ে যেতে হয় তাকে! কিন্তু ছোটবেলা থেকে ড্যামকেয়ার নিঝুমের সাথে এসব “মেয়েসুলভ” আচরণ একদমই মানানসই নয়, তাও আবার নিবিড়ের সাথে কথা বলার সময়। নির্ঘাত পরে পিছে লাগবে এই নিয়ে বদমাশটা। সুতরাং লজ্জা-টজ্জা সব বাদ, বেপরোয়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় নিবিড়ের উদ্দেশ্যে, “ধুর ছাই! মরার আর জায়গা পেলিনা? শেষমেশ আমাকে…?!”, কিন্তু শেষ করতে পারেনা। সত্যি সত্যিই লাল আভায় আলোকিত হয়ে ওঠে ফর্সা গাল দুটি। ফোনের ও প্রান্ত থেকেও মনের আয়নায় নিবিড় পরিষ্কার দেখতে পায় এই দৃশ্য। হাসে নীরবেই। খোঁচা দিতে ছাড়ে না, “লজ্জা পেলি নিঝুম?” নিঝুমের তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার মত প্রশ্নই বটে এটা। কিন্তু আজ জ্বলে না সে। আস্তে আস্তে বলে, “It really feels odd…isn’t it? We are best friends, but… I’ve never thought of you like anything else…neither did I think that you’ve thought so…it’s odd Nibir. Do you really like me?” নিবিড় বলে, “Test me. You’ll get the answer.” নিঝুমের দ্বিধান্বিত কণ্ঠ ভেসে আসে, “কী জানি! দেখি…”

সেদিন বিকেলটা অসম্ভব অস্থির কাটে নিঝুমের। ভাললাগা না ভালোবাসা? ভালোবাসা না ভাললাগা? মাথাটাই খারাপ হয়ে যাবার যোগাড় হয়। আবার ভাবে, নিবিড় তার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। ও নিশ্চয়ই নিঝুমকে ঠকাবে না। ভাবতে ভাবতে কোন দিক দিয়ে যে সময় কেটে যায় টের পায় না। অবশেষে ভাবে, নাহ, তাকেই এ পরীক্ষা নিতে হবে। আর এর মধ্যে না ঢুকে পরীক্ষা নেওয়ার কোন উপায় নেই, কারণ তাকে তো নিজের ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে হবে। নিবিড়কে মেসেজ লিখতে শুরু করে, “যা তোকে বেটে হারিয়ে দিলাম। ” ঈশিতার কাছে শুনেছে সে আর নিবিড় নাকি বেট ধরেছে ওর সিদ্ধান্তের উপর। নিবিড় বলেছে যে নিঝুম না-ই বলবে। আর ঈশিতা বলেছে, হ্যাঁ। মেসেজটা লিখে আবার কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর সেন্ড বাটনে চাপ দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। দুরুদুরু বুকে প্রতীক্ষা এরপর রিপ্লাইয়ের। প্রায় দশ মিনিট পর নিবিড়ের রিপ্লাই আসে। একদম স্বাভাবিক কথাবার্তা; দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিঝুম। এজন্যই এই ছেলেটা তার বেস্ট ফ্রেন্ড। নিবিড় ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে এই মুহূর্তে নিঝুম ভীষণ অস্বস্তিতে ভুগছে। তাই অন্য কোন কথায় যায়নি, বন্ধুর মতই ব্যবহার করেছে তার সাথে।
দিন যায়। কেটে যায় দুটো মাস। এরমধ্যে ঈশিতার অনেক অনুরোধে নিবিড়ের বাসায় আর না যাওয়ার জেদ ছেড়েছে নিঝুম। গেছে নিবিড়ের বাসায়। নিবিড় আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে যে সে নিঝুমকে ভালবাসে। নিঝুম এড়িয়ে গেছে। কারণ আরও বন্ধুবান্ধব উপস্থিত ছিল। কিন্তু বারবার তার দিকে নিবিড়ের একমনে তাকিয়ে থাকা দেখে শেষ পর্যন্ত মৃদু বকা না দিয়ে পারেনি। নিঝুম নিজের মধ্যে কেমন একটা পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। নিবিড় আশেপাশে থাকলে কেমন একটা ভাললাগা এসে ভর করে তার চারদিকে। একটু বেশি হাসি, একটু বেশি আনন্দ, আর… চলে আসার সময় আরও একটু থাকার ইচ্ছে। তবে এসব অনুভূতির কোনটাই সে নিবিড়ের সামনে প্রকাশ করেনা। নিবিড়ও চায় না তার কাছে আলাদা কিছু। সে হয়তো আপনমনেই অনুভব করতে পারে সবচেয়ে আপন বন্ধুটির অনুভূতিগুলোকে। “ভালবাসি” বলা হয় না কোন পক্ষ থেকেই। তাও যেন ভালবাসার বাঁধনে ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ছে দুটি মন। যদিও এখনও প্রশ্ন করে ফেরে অবুঝ মন, এ কী আসলেই ভালোবাসা? না শুধুই ভাললাগা? কিন্তু একদিনের ঘটনায় সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে যায় একে অপরের। রেজাল্ট বের হয়ে গেছে। কলেজে ভর্তির প্রক্রিয়াও সমাপ্ত। নিঝুম ভর্তি হয়েছে তাদের স্কুলেরই কলেজে। বলা বাহুল্য, নিলীমা, প্রজ্ঞা, অনন্যাও সেই একই কলেজে। নিবিড় ভর্তি হয়েছে আরেকটি কলেজে। ক্লাস শুরুর আগের দিনের কথা। ছোট একটা গেট টুগেদারে মিলিত হয় নিবিড়, ঈশিতা, নিঝুম, লিসা, সুপ্তি। সাথে অবশ্যই তাদের বাবা-মা’রাও আছেন। ডিনার শেষে বন্ধুরা মিলে একটু হাঁটতে বেরোয়। নিঝুম-নিবিড়ের মধ্যে কী চলছে তা শুধু ঈশিতাই জানে, লিসা আর সুপ্তিকে জানান হয়নি। সবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে নিবিড় ইচ্ছে করেই একটু পিছিয়ে পড়ে, আর ঈশিতাকে ইঙ্গিতে বুঝায় যাতে নিঝুমকে পিছে পাঠিয়ে দেয়। ঈশিতা সেইমত লিসা আর সুপ্তিকে কথার জালে ব্যস্ত রেখে নিঝুমকে পাঠিয়ে দেয় নিবিড়ের সাথে। কিন্তু পাশাপাশি এসেও দুজনের কারো মুখে কোন কথা নেই। চুপচাপ হাঁটতে থাকে। নীরবেই যেন একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করে। সেসময়টা নিবিড়ের চরিত্রের আরেকটা দিক স্পষ্ট হয় নিঝুমের কাছে। তার বান্ধবীরা, যাদেরই বয়ফ্রেন্ড আছে, তাদের মোটামুটি সবারই বয়ফ্রেন্ডদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। অন্তত কিস তো হয়েছেই। মুখে কিছু না বললেও নিঝুমের এটা মোটেই পছন্দ নয়। তার মতে একটা মানুষকে শরীর দিয়ে চেনার আগে মন দিয়ে চিনতে হয়। প্রথম পরিচয়েই কিস করা, শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করা, অল্পদিনের মধ্যেই এসব করা উচিত নয়। “যে মানুষ আমার শরীরকে নয়, মনকে আগে ভালবাসবে সে-ই প্রকৃত প্রেমিক, সে-ই আমায় সত্যিকার অর্থে ভালবাসে”, এটাই নিঝুমের আদর্শ। বিস্মিত হয়ে নিঝুম দেখে যে এতদিনের পরিচয় তাদের, তবুও এই নির্জন পথে তাকে একা পেয়েও নিবিড় তাকে ছোঁয়ার কোনরকম চেষ্টা করছে না। এক অন্যরকম আনন্দে ভরে যায় নিঝুমের মন। নিবিড়ের প্রতি নতুন একটা শ্রদ্ধা জেগে ওঠে মনে। নিবিড়ের মনেও তখন একই অনুভূতির খেলা চলছে। সে নিজে একটা কো এড স্কুলে পড়েছে, রিলেশনে গেলে ছেলেমেয়ে উভয়ের আচরণই দেখার সুযোগ হয়েছে তার। এখনকার দিনে ভালোবাসা মানে শুধু যেন শরীরের আনন্দ। ছেলেরা যতটা অ্যাগ্রেসিভ এ ব্যাপারে, মেয়েরাও তার চেয়ে কিছু কম নয়। অথচ এই একটি ঘণ্টায় তার পাশাপাশি হেটেও নিঝুম সেরকম কোন ইঙ্গিত দেয়নি। দুজনই বুঝতে পারে, হয়তো এটাই ভালোবাসা, যা শুধু স্বচ্ছ জলের মত বয়ে চলে, যাতে নেই কোন ক্লেদ। কিন্তু একই সাথে একটা বিষাদও এসে ভর করে, এই ভালোবাসা কীভাবে সার্থক হবে? নিবিড় আর নিঝুমের মাঝে যে সীমাহীন সীমা, তাকে অতিক্রম করা কি সম্ভব হবে তাদের দুজনের পক্ষে? নিবিড় ভাবে, “আমি তো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি এই অগ্নিপরীক্ষা দেবার, কিন্তু নিঝুম কি পারবে?” আর নিঝুম যে কী ভাবছে, নিজেই তার থৈ খুঁজে পায়না। নীরবে একজন আরেকজনের উপস্থিতি, সান্নিধ্য উপভোগ করতে করতেই ফিরে আসে তাদের পরিবারের কাছে। সেদিন বিদায় নেবার সময় দুজনের মনই যেন একই সাথে আনন্দ আর বেদনায় ভরপুর হয়ে থাকে।
কলেজ শুরু হয়ে যায়। প্রথম থেকেই অনেক ব্যস্ততার মাঝে দিন কাটতে থাকে সবারই। বিশাল সিলেবাস, স্বল্প সময়। সুতরাং ব্যস্ত না হয়ে উপায় নেই। এরই মাঝে সময় বের করে নিয়ে যোগাযোগ করে নিঝুম-নিবিড়। যোগাযোগ বলতে সেই মিসডকল আর সুযোগ পেলে একটু মেসেজ। নিলীমার সাথে কলেজে দেখা হয় নিঝুমের। তার থেকে জানতে পারে, নিবিড় রোজ ওর খবর নেয় নিলীমার কাছ থেকে। নিলীমা যেন নিবিড়ের ভালোবাসা দেখে আরও বেশি ভালবাসতে শুরু করে নিঝুমকে। তবে নিঝুমের খোঁজ নেওয়া ছাড়াও নিবিড়ের সাথে নিলীমার আরও কিছু কথা হয়, যা নিঝুমের অজানা। নিলীমা জানে নিঝুমকে কিছু বলে লাভ নেই, তাই নিবিড়কেই প্রতিদিন জিগ্যেস করে, কবে নিঝুমকে “ভালবাসি” বলবে। নিবিড় বলে, “বলতে তো চাই, কিন্তু সাহস হয় না রে।” আর তারপর রাজ্যের বকা শোনে নিলীমার কাছ থেকে।
পার হয়ে যায় আরও সাতটি দিন। নিঝুমের কাজিন, অভি এসেছে ইংল্যান্ড থেকে। বয়সে অভি বড় হলেও নিঝুমের সাথে তার সম্পর্ক বন্ধুর মত। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় নিঝুমকে সে তার প্রেমিকার কথা জানায়। তারপর জানতে চায় নিঝুমের কেউ আছে নাকি। নিঝুম প্রথমে বলে না। কিন্তু ভাইয়ের চাপাচাপিতে বলে যে না, সেরকম কেউ এখনও নেই, তবে একজন ওকে ভালবাসে হয়তো, আর ওরও তাকে ভাল লাগতে শুরু করেছে। এরপর নিবিড়ের কথা খুলে বলে। সব শুনে অভি বলে নিবিড়কে আপন করে নিতে, সমস্যা যাই থাকুক, সে সবসময় আছে নিবিড় আর নিঝুমের পাশে, কারণ জীবনসঙ্গী অনেকেরই ভাল বন্ধু হয়ে যায় সময়ের সাথে, কিন্তু সবচেয়ে ভাল বন্ধুকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সেই সুযোগ যখন নিঝুমের কাছে এসে ধরা দিয়েছে, তখন নিঝুমের পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয়। শুধু তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে সে-ও নিবিড়কে ভালবাসে কিনা। নিঝুম এর উত্তর না দিলেও অলক্ষ্যে থেকে অন্তর্যামীই নিঝুমের মুখে আলোছায়ার খেলা দেখে অভিকে তা বুঝতে সাহায্য করেন। অভির সাথে রোজই দেখা হয়, তাই এই কদিন তার মোবাইল থেকেই নিঝুম নিবিড়ের সাথে মেসেজিং করে। আগের থেকে একটু বেশি কথা হয়, তাই দুজন দুজনকে আরও একটু ভালভাবে চেনার সুযোগ পায়, অভিও বাধা দেয় না। কিন্তু ভালবাসার কথা কারুরই বলা হয়না। নিবিড়ের প্রতিটা দিন একটা নতুন পরীক্ষা মনে হতে থাকে, যে পরীক্ষায় সে সব প্রশ্নের উত্তর জানে, কিন্তু তার কাছে লেখার জন্য কোন কলম নেই।
অগাস্ট মাসের সাত তারিখ। রাত দশটা। অভির সাথে তার রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে নিঝুম, একই সাথে অভির ফোন থেকে নিবিড়কেও মেসেজ করছে। হঠাৎ ফোনটা কেড়ে নেয় অভি দুষ্টুমি করে, বলে যে এরপর যা মেসেজ আসবে, সে পড়বে। নিঝুম কয়েকবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আগের মেসেজগুলো পড়তে থাকে অভি। সাধারণ কথাবার্তা। একটু পর মেসেজের টোন বেজে ওঠে অভির মোবাইলে। হু, নিবিড়ই মেসেজ দিয়েছে। মেসেজটা পড়ে সে। নিঝুম প্রবল আগ্রহের সাথে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটাও কথা না বলে, ফোনটা বাড়িয়ে দেয় নিঝুমের দিকে। হঠাৎ চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। মেসেজে লেখা, “if luving u is wrong, i don’t wanna be right. my luv 4 u is stronger than any other light. the path ahead is full of struggle. but together, we’ll win every fight….I Love You Nijhum.” অভি বলছে, “হ্যাঁ বলে দাও নিঝুম। he is genuine.” কিন্তু নিঝুমের কানে এসব যেন ঢুকেও ঢুকছে না। আজ এক বিশাল প্রশ্নের সম্মুখীন সে। নিবিড় পেরেছে তাদের মধ্যেকার সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তাকে মনের কথা বলে দিতে। কিন্তু নিঝুম? নিঝুম কি পারবে? কী উত্তর দেবে সে নিবিড়কে? এ কি সম্ভব? সে যে স্নিগ্ধা ইসলাম নিঝুম, আর অপরজন… নিবিড় রায়!

পরদিন একটু সকাল সকালই কলেজ চলে যায় নিঝুম। রোজ যাওয়ার আগে নিবিড়কে একটা মিসডকল দিয়ে যেতে হয় তার। আজ না দিয়েই বের হয়ে পড়ে। কলেজ যেয়ে দেখে তখনও কেউ আসেনি। বিশাল বারান্দায় পায়চারি করতে করতে সকালের নরম আলোর পরশ নিতে থাকে আর ভাবতে থাকে কাল রাতের সেই এস এম এসটির কথা। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, সে তেমন একটা চিন্তিত নয় সেটি নিয়ে। আরও অবাক হওয়ার মত বিষয় হল, এত সিরিয়াস একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েও কাল রাতে তার ঘুমের একটুও ব্যাঘাত ঘটেনি। নিঝুম শুনেছে, অনেকে নাকি সারারাত ঘুমুতে পারেনা প্রেমের প্রস্তাব পেয়ে। তার বরং ভাল ঘুম হয়েছে। ভাবতে ভাবতে একটু হেসেও দেয় আপনমনে। নিলীমাকে আসতে দেখে এই সময়। দূর থেকে ওকে হাই দিয়ে ক্লাসে ঢুকতে যেয়েও ঢোকে না নিলীমা। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে দৌড়ে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে প্রিয় বান্ধবীকে। “নিবিড় বলেছে অবশেষে?!!”, নিলীমা ভীষণ উত্তেজিত। লাজুক হাসি হেসে অল্প একটু মাথা নাড়ে নিঝুম। আবার তাকে জড়িয়ে ধরে নিলীমা, চুমু দেয় ঘাড়ে। “এই ধ্যেৎ কী করছিস?”, নিঝুম মৃদু বকা দেয়। নিলীমা বলে, “কী আবার করব? তোকে শুভেচ্ছা জানালাম! হ্যাঁ বলেছিস তো?” নিঝুম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, “আ- আমি কী করব বুঝতে পারছিনা রে নিলী…কোথায় সমস্যা বুঝতেই তো পারছিস…” “কিন্তু তুইও তো ওকে ভালবাসিস।”, নিঝুমকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবার নিলীমা। চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করে, “বাসিস না?” চোখ সরিয়ে নেয় নিঝুম। এর মানে বুঝতে কষ্ট হয় না নিলীমার। বাইরে শান্ত দেখালেও নিঝুমের ভেতর কী ঝড় বইছে তা সে ঠিকই টের পায়। তাই আর কোন প্রশ্ন করেনা। কারণ উত্তর সে জানে। চুপ করে নিঝুমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, আর মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে, “হে পরম দয়ালু, এরা যাতে ভালবাসতে পারে। এদের ভালোবাসার ফুলটা যাতে ফোটার আগেই ঝরে না পড়ে…”

কলেজ থেকে বাসায় ফিরেও নিবিড়ের সাথে কোন যোগাযোগ করে না নিঝুম। রাতে দেখে মেসেজ দিয়েছে, তাও রিপ্লাই করে না। এভাবে কেটে যায় দু দিন। এই দু দিনে। নিঝুম নিজের সাথে নিজে অসংখ্যবার তর্ক করেছে। ফলাফল হয়েছে শূন্য। আর মনে মনে নিবিড়কে ইচ্ছেমত বকা দিয়েছে। এমন সময়ে মানুষজন বেস্টফ্রেন্ডের পরামর্শ চায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাহায্য হয় তাতে। কিন্তু তার বেস্টফ্রেন্ডই তো…..ধুত্তেরি! বিরক্ত লাগতে থাকে নিঝুমের নিজের উপরই। দুটো দিন কেটে গেল, অথচ কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। তবে এই দু দিনে নিবিড়কে অনেক মিস সে করেছে। তাই তৃতীয় দিন কলেজ থেকে ফিরে মিসডকল দিয়েই ফেলে। নাহলে নিবিড় চিন্তায় পড়ে যাচ্ছে, নিলীমার কাছে শুনেছে সে। মিসডকল যাওয়ার সাথে সাথেই নিঝুমের ল্যান্ডলাইনে কল আসে। নিঝুম ফোনের কাছেই ছিল, সেই ধরে ফোন। কিন্তু তার গলা শোনার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ফোন কেটে দেওয়া হয়। নিঝুম বুঝতে পারে যে আর কেউ নয়, নিবিড়ই আর থাকতে না পেরে ফোন দিয়ে বসেছে। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস পড়ে নিঝুমের। ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ তাকে একই সাথে একটু আনন্দিত আর বিমর্ষ করে তোলে। কী করবে সে? সে তো নিজেকেই বুঝতে পারছে না ঠিকমতো।

সেদিন পুরো রাত নির্ঘুম কাটে নিঝুমের। নিবিড়কে সে কোনভাবেই মাথা থেকে বের করতে পারছে না। সে বুঝতে পারছে এটা হয়তো কখনোই সম্ভব না, আবার এটাও বুঝতে পারছে যে নিবিড়কে ছাড়া জীবনও তার পক্ষে কাটানো অসম্ভব। নিবিড় তাকে যতটা বুঝে, আর কারো সাধ্য নেই তার সামান্যতমও বোঝার নিঝুমকে। একদম সোজা ভাষায় বলতে গেলে, নিবিড় ছাড়া আর কারো সাথেই কোন দিক দিয়েই নিঝুমের মিল খাওয়া কোন অবস্থাতেই সম্ভব না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল তাদের এত বছরের বন্ধুত্ব। এপাশ ওপাশ করতে করতে কেটে যায় রাত। অবশেষে সমস্ত যুক্তিতর্ক হার মানে ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের এক অপূর্ব সমন্বয়ের কাছে। ভোরের নতুন সূর্যের সাথে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়ের। পৃথিবীর বুকে লেখা শুরু হয় আরও একটি প্রেমগাথা। রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হবার প্রস্তুতি নেয় আরও একটি ভালবাসার নাটক, যার মূল চরিত্র কাল রাত পর্যন্ত শুধুই বন্ধুত্বের আসনে থাকা দুটি কিশোর কিশোরী- নিবিড় আর নিঝুম। সকালের কোচিঙে যেয়ে নিলীমার ফোন থেকে মেসেজ করে তার উত্তর জানিয়ে দেয় নিঝুম। নিবিড় তখনও ঘুমে, তাই তার রিপ্লাই জানা সম্ভব হয় না নিঝুমের পক্ষে। কিন্তু ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরার একটু পরেই ল্যান্ডলাইনে আসা পরপর তিনটি মিসডকল জানিয়ে দেয় তার মনেপ্রানে নিবিড়ের উপস্থিতি।

এরপর প্রায় এক সপ্তাহ শুধু মিসডকলেই একে অপরের কাছে নিজেদের সত্তার জানান দেয় নিবিড় আর নিঝুম। মেসেজ বা ফোনে কথা বলার কোন উপায় নেই এই কদিন। এক সপ্তাহ পর সুযোগ মেলে। আগেও তো বলেছে ওরা কথা, কিন্তু আজ তো একেবারেই আলাদা একটা সম্পর্ক নিয়ে তাদের কথা শুরু। দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ে প্রথমে। ফোন ধরেই নিঝুমের কান লাল হতে শুরু করে। শুধু “হ্যালো” বলে চুপ করে থাকে। অপর প্রান্ত থেকে নিবিড়ও আর কিছু বলতে পারে না। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয় তারা, কথা বলে বন্ধুর মতই, যা তাদের চিরন্তন পরিচয়। আজ তারা প্রেমিক-প্রেমিকার আসনে উপনীত হলেও মনে মনে দুজনেই ঠিক করে, এই বন্ধুত্বটাকে তারা আজীবন এমনই রাখবে; নিখাদ, শুদ্ধ, পবিত্র।

নিঝুমের বান্ধবীরা তাকে প্রতিদিনই লুকোনো মোবাইল নিতে অনুরোধ করে। তাতে নিবিড়ের সাথে রোজ কথা হবে। কিন্তু নিঝুম কোনমতেই রাজি হয় না। নিবিড়েরও সায় নেই এতে। দুজনেরই এক কথা, যখন নিঝুমকে লিগ্যালী মোবাইল দেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত একটু কষ্ট করে হলেও তারা এতদিন যেভাবে যোগাযোগ রেখেছে, সেভাবেই রাখবে। ওদের এই আন্ডারস্ট্যান্ডিং দেখে বন্ধুবান্ধবরা ঈর্ষান্বিতও হয়, আবার তাদের সম্পর্কটাকে অনেক অনেক আশীর্বাদ না করেও পারে না। নিঝুমকে যারা চেনে, তারা জানে নিঝুম আর সব মেয়ের মত নয়। তার মধ্যে একই সাথে আছে সৌন্দর্যের কমনীয়তা আর সঙ্কল্পের কাঠিন্য। যদি একবার কোন কিছু ধরে বসে, তবে তা থেকে সে নিজে না চাইলে তাকে আর সরানো সম্ভব নয়। আর সবার অনুভূতি যেমন খুব সহজে সে ভাগ করে নিতে পারে, ঠিক তেমনি নিজের অনুভূতিগুলোর ব্যাপারে সে খুব চাপা। কোন কিছু নিয়ে কষ্ট পেলে একেবারে চুপ হয়ে যাবে। একমাত্র নিবিড়ের মধ্যেই এই ক্ষমতা আছে যে সে নিঝুমকে সামলাতে পারে, তাকে বুঝতে পারে। তাই নিঝুমের সমস্ত বান্ধবী, বিশেষত নিলীমা আর প্রজ্ঞা এই সম্পর্কটা নিয়ে নিঝুমের চেয়েও বেশি খুশি।
দিন যায়। যায় মাস। তবে নিঝুম এখনও বলতে পারেনি, ভালবাসি। নিবিড় সেই একবার বলেছে, তারপর সেও আর বলতে পারেনি। তবে তাতে ভালোবাসা কম হয় না। দুজনই দুজনের ভালবাসাটাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পারে। যদিও তাদের দেখা হয় না, কারণ নিঝুমকে বাসা থেকে একা বেরুতে দেওয়া হয় না, তাও দুজনেই চেষ্টা করে মাসে একবার হলেও মায়েদের সাথে একজন আরেকজনের বাসায় যাওয়ার। দিনগুলো যেন স্বপ্নের মত কেটে যেতে থাকে। চলে আসে নতুন একটি বছর। এরপর আসে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সবাই চায় এদিনে তার প্রিয় মানুষটির সঙ্গে থাকতে। কিন্তু নিবিড় আর নিঝুমের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তবুও, তাদের প্রথম ভালোবাসা দিবসে নিতান্ত কাকতালীয় ভাবেই দেখা হয়ে যায় দুজন দুজনার সঙ্গে। বুঝতে পারে, অদৃশ্যে থেকে মহান সৃষ্টিকর্তাই তাদের এই দেখা করিয়ে দিয়েছেন। দুজনের মনেই অন্যরকম আনন্দের পরশ লাগে। হোক না দূর থেকে দেখা, হোক এক পলকের দেখা, তবুও তো দেখা। এই সুখের আবেশটুকু নিয়েই পরের সারা দিনটা কাটিয়ে দেয় দুজন।

পর্ব ৩ সমাপ্ত

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s