জীবন যেরকম – ৬


মাঝে মাঝে জীবনটা বড় অদ্ভূত মনে হয়। কলেজের দিনগুলোর মতন জীবনটা কেন ফিরে আসে না? কেন মনে হয়, এ পৃথিবীতে আনন্দ আর সুখ বলে কিছু নেই। আমারও তো কিছু পাবার ছিল। কিছু প্রত্যাশা ছিল। জীবনকে ঘিরে ধরে শুধু ব্যাথা আর বেদনা। পুরোনো কলেজ জীবনের, বিশ বছরের সেই উদ্দামতাকে যখন ফিরিয়ে আনতে চাই, জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলতে চাই, তখুনি বাঁধা বিপত্তিগুলো আবার ফিরে ফিরে আসে। নারী যেন আমার জীবনে অংশভাগিনী হতে চেয়েও পারে না। কেউ আমাকে ভালবাসতে চায়, সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় অন্য নারী। আবার যখন সেই নারীকেই আমি ফিরে পেতে চাই, তখন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের স্বামী। এ যেন জীবন সঙ্গিনীকে পাবার সমস্ত সুযোগই ব্যর্থ। আমার জীবনকে রমনীয় করে তোলবার জন্য সত্যি বোধহয় কোন নারী নেই। নেই কোন সঙ্গিনী।

পুরোনো দিনের কথা আর বর্তমান এই দুটোকে মেলাতে গিয়ে মনটা ভীষন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিল। নতুন করে কার প্রেমে যে পড়ব, সেটাই ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আবিষ্ট মন, স্পর্ষকাতর মন আমার সিদ্ধান্তকে একজায়গায় এনে ফেলতে পারছে না। কখনো বিদিশার মুখটা আমি চোখের সামনে দেখছি, কখনো শুক্লার মুখটা সেখানে ভেসে উঠছে। দুজনেই যদি আমার প্রেয়সী হয়, তাহলে কাছে পাওয়ার জন্য কার প্রতি আমার সুতীব্র আকুলতা জেগে উঠবে, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কি শুক্লার আশাটাকে মেনে নেব? না বিদিশাকে এখনো ভরসা দিয়ে যাব। যতক্ষণ না ওর ডিভোর্সটা সম্পন্ন না হচ্ছে, ততদিন অপেক্ষা করে যাব। কোন একজনেরই একনিষ্ঠ প্রেমিক হয়ে ওঠার জন্য আমি এখন আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই দুজনের মধ্যে কোনো একজনকে বেছে নিতে পারছি না। বড্ড কঠিন অবস্থা হয়ে উঠেছে আমার। দুজনের মুখদুটোকে শুধু চিন্তা করে পীড়াদায়ক চিন্তারাশি আমার বুক ঠেলে উঠে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমন এক দূরঅবস্থা। আমার মনের দুশ্চিন্তাটাকে আমি কাউকে জানাতেও পারছি না। সত্যিই কি করুন এক পরিস্থিতি।

ডায়েরীর পাতাটা খুলে ভাবছিলাম কিছু একটা লিখব। উপন্যাসটা হঠাৎই এমন একটা জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে যেন এগোতেই চাইছে না। অতীত ভুলে এখন বর্তমানটাই আমার চোখের সামনে। শুক্লা বিদিশা দুদুটো মেয়ে হঠাৎই এসে হাজির হয়েছে আমার জীবনে। তারা আমার সান্নিধ্য পেতে চাইছে, অথচ কি করে সমস্যা কাটিয়ে উঠব, ভেবে কোন কূলকিনারা পাচ্ছি না। বিদিশার জন্যও কষ্ট হচ্ছে আবার শুক্লার জন্যও মনটা ভীষন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আমার অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ আমার খেয়াল হল, শুভেন্দু বিদিশাকে বলেছে, ‘দেবের বাড়ীতে এক্ষুনি তুই যাস না। ওর সাথে দেখা করবার জন্য আমার বাড়ীটাই বেস্ট।’ আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে নিজের বাড়ীতেও ডেকে নিয়ে গেছে। বিদিশাকেও সেখানে আমন্ত্রণ করেছে। তারমানে শুভেন্দু এটা জানতো, ওর বাড়ীতে এসব সমস্যার কথা উঠবে না, বিদিশাও আমাকে কিছু বলবে না। বিদিশাকে শুভেন্দুই হয়তো বারণ করে রেখেছিল আগে থেকেই। ‘এই মূহূর্তে দেবকে এসব কিছু বলার দরকার নেই।’

শুভেন্দু আমার কাছে সত্যি কথাটা বলেও পরে ওটা মিথ্যে বলে আমার মনটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করে। শুভেন্দু হয়তো জানতো, আমি চিন্তায় পড়ে যাব বিদিশাকে নিয়ে। মন অস্থির হয়ে উঠবে। বিদিশার ফিরে আসার খবরটা আমার মনকে সেভাবে নাড়া হয়তো দেবে না। ও আমার কাছে ফিরে এলেও, সেটা কোন খুশীর খবর হয়ে উঠবে না।

ভাবছিলাম, শুভেন্দুরই বা বিদিশাকে নিয়ে এত আগ্রহ কেন? ও যখন সব আগে থেকেই জানে। জেনেও বিদিশার সাথে আমাকে আবার মেলানোর চেষ্টা করছে। বিদিশার কথা ভেবে শুভেন্দু এটা করেছে? না আমার কথা চিন্তা করে আমাকে ধৈর্য রাখতে বলছে। অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল, সেদিন কিন্তু বিদিশার প্রতি শুভেন্দু এতটা দয়ালু হয়নি। মিনুর বাড়ীতে ওই ঘটনাটা ঘটে যাবার পর দোষ দেখেছিল বিদিশারই। আমাকে বলেছিল, ‘বিদিশা এটা ঠিক করেনি। সত্যি মিথ্যে যাচাই না করে তোর দোষ দেখল বিদিশা। এটা কি ও ঠিক করল?’

মিনুর বাড়ীতে হঠাৎই ঘটে যাওয়া সেদিনের সেই ঘটনাটা। আমার বাড়ীতে তার কিছুদিন আগেই সৌগত এসে হাজির। কলিংবেল টিপতেই দেখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, একগাল হাসি। বিয়ের কার্ড নিয়ে এসেছে, বাবুর ফূর্তী যেন আর ধরে না। ওকে বললাম, ‘কি রে সৌগত তুই?

সৌগত বলল, ‘সামনের মাসের দশ তারিখে আমার বিয়ে, তোকে কার্ডটা দিতে দেরী হয়ে গেল। অবশ্য কোন বন্ধুদেরই এখনো কার্ড দিইনি। বলতে পারিস, তোর কাছেই প্রথম এলাম। তুই ফার্স্ট।’

সৌগতকে ঘরে ডেকে বসালাম। বললাম, ‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করছিস? তোর কি বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি রে শালা। এই তো সবে আমরা কলেজ পাশ করলাম। ‘

সৌগত বলল, ‘তাও নয় নয় করে তিনবছর তো হয়ে গেল। বাড়ীতে সবাই হূটোপাটি করছে। আমিও তাই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম।’

আমি বললাম, ‘তাও চব্বিশ বছরে বিয়ে? আমি তো ভাবতেই পারছি না।’

সৌগত বলল, ‘সেদিক থেকে বিয়েটা একপ্রকার একটু তাড়াতাড়িই হচ্ছে। আসলে আমার বউটা খুব সুন্দরী। ওদের বাড়ীর লোকেরাও আমাকে পছন্দ করেছে। ওরাই চটজলদি বিয়েটা সেরে নিতে চাইছে। আর আমিও ভেবে দেখলাম, বউ যা সুন্দরী। বিয়ে করে নেওয়াই ভালো। পরে যদি হাত ফসকে ছিটকে যায়।’
বলেই হাসতে লাগল সৌগত।

ওকে বললাম, তোর বউয়ের বয়স কত?

সৌগত বলল,কুড়ি।

আমি বললাম, ‘সেকিরে তাহলে তো একেবারে কচি খুকী।’

সৌগত বলল, চারবছরের ডিফারেন্স, তাই বা কম কি? আমি তো বলব, সেদিক দিয়ে আমি খুব লাকি।’

সৌগতকে উইশ করলাম। বললাম, ভালো ভালো। বিয়েটা তাহলে কর। আমরা সবাই একটু ফূর্তী করি। কলেজ পাশ করার পরে, সেভাবে তো আর কারুর সাথে দেখাই হয় না। তোর বিয়েতে না হয় সবাই মিলে আনন্দ করা যাবে। ’

সৌগত বলল, ‘বিদিশার খবর কি?’

আমি বললাম, ‘ভালোই আছে। মাঝে মধ্যে আসে। দেখা সাক্ষাত হয়। এখনো প্রেম করে যাচ্ছি। তবে তোর মত এত তাড়াতাড়ি বিয়ে? ওটা এখনো ভাবিনি।’

সৌগত বলল, আমি তো বলব, বেশী দেরী করা উচিৎ নয়। জানিস তো, কোথাথেকে কখন কি হয়ে যায়। আজকাল কোন কিছুর উপরেই আমার কোন ভরসা নেই।’

মনে হল, শুক্লার ব্যাপারে সৌগতর মনে হয়তো কিছু খেদ আছে। প্রেমটা ভেঙে গেল বলে, আমাকেও ও সাবধান করছে।
সৌগত নিজেই বলল, ‘আমি কিন্তু শুক্লার সাথে ব্যাপারটা সহজ করে নিয়েছি। ওকে ফোনও করেছি, কথাও বলেছি। বিয়েতেও শুক্লাকে আসতে বলব। আশাকরি ও না বলবে না।’

আমি বললাম, তোর আর শুক্লার ব্যাপারটা বড় অদ্ভূত। কি যে হল তোদের দুজনের মধ্যে। কিছুই বুঝতে পারলাম না। অথচ তোদের প্রেমটা-

সৌগত বলল, ‘প্রেম মানে তো লাভ। আমি মনে করি লাভ ইস নট পার্মানেন্ট। যে কোন মূহূর্তে ভেঙে যেতে পারে। আমার আর শুক্লার ব্যাপারটাও তাই হয়েছে। এরকম ঘটনা আর কারুর জীবনেও ঘটতে পারে। ভালবাসা, প্রেম, যেকোন মূহূর্তে ভেঙে যেতে পারে।’

কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সৌগত বলল, ‘তোর আর বিদিশার ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তোদের প্রেম হল, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রেম। একে অপরকে অঙ্গীকার করে বসে আছিস। চটকরে এ প্রেম ভাঙা খুব কঠিন। সেদিক দিয়ে তুই আবার আমার থেকে একটু লাকি বলতে পারিস।’

আমি বললাম, ‘বিদিশা আসলে আমাকে একটু বেশী বিশ্বাস করে। ও জানে চট করে দেব, ওর বিশ্বাসটাকে ভাঙবে না।’
সৌগত এবার আমার মুখের দিকে তাকালো, আমাকে বলল, ‘বিশ্বাস থাকতে থাকতে, তুইও বিয়েটা করে নে দেব। বলাতো যায় না। কখন কি থেকে কি হয়ে গেল। আমার কেন জানি, প্রেমটেম ওগুলোকে আর চিরস্থায়ী বলে মনে হয় না। জীবনে প্রেম ভালোবাসার এগুলোর কোন দাম নেই। সব বেকার জিনিষ।’

-তুই একথা বলছিস সৌগত? তুই না-

সৌগত বলল, ‘হ্যাঁ আমিই বলছি। প্রেম আমার জীবনে টেকেনি বলে বলছি না। মেয়েদের মন বোঝা খুব কঠিন। কখন তোকে কি অবস্থায় ওরা ফেলে দেবে,তুই ঠাওরও করতে পারবি না। লেজে গোবরে এক হয়ে যাবি। শেষ পর্যন্ত হতাশায় তোর চুল ছিঁড়তেও তোকে হতে পারে। এরা ভীষন অবুঝ। সত্যি কথাটা শপথ করে বললেও বিশ্বাস করতে চায় না।’

আমি বললাম, ‘বিয়ে যাকে করছিস, তাকেও তো তোকে ভালবাসতে হবে। নইলে সেটাও তো টিকবে না। প্রেম মানে তো প্রেম। হয় বিয়ের আগে, নয়তো বিয়ের পরে। সেই একই তো কথা।’

সৌগত বলল, ‘জানি, সেটাও জানি। বিয়ের পরে ভালবাসা না টিকলে সেখানেও লবডঙ্কা। সবই জানি। সেই জন্যই তো এবারে একেবারে দেখেশুনেই বিয়ে করছি। একেবারে পার্মানেন্ট হিসেবে টিকে যাবে ও। তোকে গ্যারান্টী দিয়ে বলছি।’

দেখলাম শুক্লার থেকে নিজের বউয়ের ওপরেই ওর ভরসাটা এখন অনেক বেশী। কিভাবে আস্থা অর্জন করল ও, আমার জানতে ভীষন ইচ্ছে করছিল। সৌগত বলল, ভেবে দেখলাম, নিজের প্রেম করার থেকে বাড়ীর লোকজনের পছন্দমত বিয়ে করাই অনেক ভাল। তাছাড়া মেয়েটা সুন্দরী। স্বভাব চরিত্রও ভালো। অন্য মেয়েদের মত অত প্যাঁচালো নয়।’

সৌগত বলল, বিদিশাকে তো আলাদা করেই নেমতন্নটা করতে হবে। তুই বরঞ্চ ওকে একটা ফোন কর। বল সৌগত যাচ্ছে, তোমাকে বিয়ের নেমতন্ন করতে। এখন যদি যাই? বিদিশা বাড়ী থাকবে তো? তুইও আমার সাথে যেতে পারিস।’

বিদিশাদের বাড়ীর ল্যান্ডফোন নম্বরে বিদিশাকে তক্ষুনি পেয়ে গেলাম। সৌগতর বিয়ের খবরটা শুনে ও কিছুটা অবাক হল, আমাকে বলল, তুমি আসছ সাথে? তাহলে দুজনেই এসো। আমি বাড়ীতেই আছি।’

সেদিন বিদিশার বাড়ীতে আমার অবশ্য আর যাওয়া হয় নি। সৌগতর বাড়ী থেকে হঠাৎই তারকিছু পরেই একটা ফোন চলে এসেছিল। ওকে বেরিয়ে চলে যেতে হয়েছিল। আমাকে বলল, বিদিশাকে আমি কার্ড পৌঁছে দেবো। তুই চিন্তা করিস না। বরযাত্রী হিসেবে তোদের জন্য আলাদা গাড়ীর ব্যবস্থা করেছি। সব কালকে ফোন করে তোকে বলছি। তুই, বিদিশা, শুভেন্দু সব একই গাড়ীতে যাবি। তোদের গাড়ীটা ঠিক আমার গাড়ীর পেছনে পেছনে থাকবে। তোদের কোন অসুবিধা হবে না। ব্যারাকপুরে বিয়ে। কলকাতা থেকে যেতে একঘন্টা মতন লাগবে।’

যতক্ষণ আমার কাছে বসেছিল সৌগত, কথায় কথায় এটাও আমাকে বলেছিল, ‘আমার কেন জানি না দেব, মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যেন একটা খুব ভুল করে ফেলেছি।’

ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কি ভুল করেছিস তুই?’

সৌগত সেই সময় মিনুর প্রসঙ্গটা তুললো। আমাকে বলল, ‘মিনুর জন্য তোকে বোধহয় সেই হ্যাপাটা এখনো পোয়াতে হচ্ছে? সেই ওর বোনকে গান শেখানোর ব্যাপারটা? ভীষন বেয়ারা মেয়ে। একবার কারুর পিছু নিলে, সহজে তাকে ছাড়তে চায় না।’

ওকে হেসে বললাম, ‘না না, সেতো কবেই আমি সেই পাট তুলে দিয়েছি। এখন আর ওর বোনকে গান শেখাতে যাই না। সেই প্রথম প্রথম কদিন গিয়েছিলাম, তারপরে যাওয়া আমি বন্ধ করে দিয়েছি।’

সৌগত বলল, ‘কলেজ ছাড়ার পরে আর মিনুদের বাড়ী আর যাসনি?’

ওকে বললাম, ‘শ্যামল মিত্রর এক ছাত্রের কাছে আমি কিছুদিন তালিম নিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল মিনুর বোন রীনাকে ওখানে পাঠিয়ে দেবার। কিন্তু মিনু রাজী হল না। গোঁ ধরে বসে থাকলো। আমার কি ওখানে যেতে আর ইচ্ছে করে? তুই তো বিদিশার ব্যাপারটা জানিস। ও পছন্দ করে না রীনাকে গান শেখাতে আমি যাই বলে। সেই শেষ দিন থেকে মিনুর প্রতি বিদিশার একটা বিতৃষ্মা। বিদিশা মিনুকে সহ্য করতে পারে না। নাম শুনলেই ক্ষেপে ওঠে। আমি যে মিনুর বাড়ীতে এখন যাই না। সেটা ওকে বললেও অবিশ্বাস করে ওঠে। বলে সত্যি বলছ তো? কি জানি তোমার কথা বিশ্বাস করলেও। মিনুকে আমার একদম বিশ্বাস হয় না।’

সৌগত বলল, ‘লাস্ট কবে গিয়েছিলিস মিনুর বাড়ীতে?’

আমি বললাম, ‘তাও নয় নয় করে মাস ছয়েক তো হয়ে গেল। এখন যাওয়া একদমই বন্ধ করে দিয়েছি।’

সৌগত বলল ভালো, এইজন্যই তো মিনুকে আমি বিয়েতে নেমতন্ন করতে চাই না। ওখানে বিদিশাও আসবে। মিনুকে দেখলে বিদিশা একেবারেই চটে যাবে। কি করতে কি করে বসবে মিনু। ওকে বোঝা খুব মুশকিল।’

সৌগত এরপরে চলে গেল। ভাবিনি মাস ছয়েক পরে হঠাৎই মিনুর আবার দর্শন পাবো। সেদিনই সন্ধেবেলা মিনুর হঠাৎই আবির্ভাব ঘটল আমার বাড়ীতে। সাথে ওর বোন রিনাকেও নিয়ে এসেছে। বেশ সেজেগুজে এসেছে মিনু। আমাকে বলল, দেব, তোর জন্য একবাক্স মিষ্টি নিয়ে এসেছি। রীনা খুব ভালোভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। তুই ওর গানের গুরু। ওকে ভাল করে আশীর্ব্বাদ কর।’

রীনা মাথা হেট করে, ঝুঁকে প্রনাম করল আমাকে। ওকে বললাম, ‘থাক থাক আর প্রনাম করতে হবে না। তা গান টান কি গাইছ? নাকি ছেড়ে দিয়েছে সব?’

রীনা ঘাড় নেড়ে বলল, এখনো গাইছি, ছেড়ে দিই নি এখনো। তবে আপনাকে খুব মিস করি। আপনি তো আর আমাদের বাড়ী আর আসেন না। আসুন না একদিন।’

ঠিক সেভাবে ওকে জোর দিয়ে বলার মতন আমার আর কিছু ছিল না। মিনু আমাকে পটানোর জন্য ওর বোনকে সাথে করে নিয়ে এসেছে, সেটাও বুঝতে পারলাম। পাছে আমি না বলে ফেলি, মিনু আগে থেকেই রীনাকে বলল, ঠিকই যাবে। তুই ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? এখন দেবদার সময়ের খুবই অভাব। দেবদার এখন অনেক দায়িত্ব। চাকরী করতে হবে। বিয়ে করে বউকে খাওয়াতে হবে। তোর জন্য ভাড়ী দেবদার দরদ? তবে তুই বলছিস যখন, ঠিকই যাবে। কি ‘দেব’ যাবি না?’

আমি রীনার সামনে মিনুকে সেভাবে কিছু বললাম না। শুধু বললাম, ‘যাব একদিন। এই সামনে সৌগতর বিয়ে। ওর বিয়েটা হয়ে যাক। তারপরে সময় করে একদিন যাব। তোমাদের বাড়ী যাবার পথে কলেজেও একবার ঘুরে আসব।’

মিনু জানতো, আমি শুধুই ওর বোনকে সান্তনা দিচ্ছি। যাবার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা নেই আমার। আমাকে বলল, সৌগতর বিয়েতে যাবি নিশ্চই? তোকে কার্ড দিয়েছে। কই আমাকে তো দিল না?’

আমি বললাম, ‘হয়তো পরে দেবে। এখনও অবধি আমাকে ছাড়া কাউকেই কার্ড দেয় নি ও।’

মিনু যেন পরিকল্পনা করেই এসেছিল। আমাকে বলল, ‘কাল বাড়ীতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। তোকে কিন্তু আসতে হবে।’

হঠাৎ কিসের অনুষ্ঠান, কিছুই আমি জানি না। বেশ ভ্যাবাচাকা খেযে গেলাম। মিনু বলল, ‘আসলে রীনা ভালভাবে পাশ করেছে তো। তাই কজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়ীতে ডাকছি। তুই ও আসবি, একটু আনন্দ আর হৈহুল্লোর হবে।’

আমি প্রায় মুখের ওপরেই না বলতে যাচ্ছিলাম। মিনু বলল, ‘কেন বিদিশা রাগ করবে তোর ওপর? আমি যদি ওকেও বাড়ীতে ডাকি।’

বেশ অবাক হলাম মিনুর কথা শুনে। বিদিশাকে ও বাড়ীতে আসতে বলবে। আর বিদিশাও ওর কথাশুনে একডাকে ছুটে যাবে। কখনোই সেটা সম্ভব নয়। মিনুকে বললাম, ‘শুধু শুধু বিদিশাকে কেন বলতে যাবি? ও তোর ওখানে যাবে না।’

মিনু একটা গম্ভীর মতন হয়ে গেল। আমাকে বলল, ‘তাহলে তুই আসবি তো?’

আমি বললাম, ‘কথা দিতে পারছি না। তবে চেষ্টা করব।’

রীনাকে নিয়ে মিনু একটু পরে চলে গেল। আমাকে বলে গেল, ‘রীনার কথা ভেবে অন্তত আয়। তোকে কথা দিচ্ছি, আর কোনদিন তোকে আমার বাড়ীতে আসতে বলব না।’ রীনাও বলল, হ্যাঁ দেবদা আপনি এলে কিন্তু খুব ভাল লাগবে সবার।

আজ মনে পড়ে সেদিন কিন্তু মিনুর বাড়ীতে আমি গিয়েছিলাম। বিদিশা যাইনি। বিদিশাকে বলেই আমি মিনুর বাড়ীতে গিয়েছিলাম। মনে মনে একটু অসুন্তষ্ট হয়েছিল বিদিশা। ওকে বলেছিলাম। বোনটা ভালভাবে পাশ করেছে,তার জন্যই বাড়ীতে একটা পাটি দিচ্ছে মিনু। রীনা যদি আমাকে সেভাবে না বলতো, আমি হয়তো ওর বাড়ীতে যেতাম না।

পরের দিন মিনুর বাড়ীতে বেশ কিছু ঘন্টা আমি ছিলাম। ও কিন্তু একবারও বুঝতে দেয় নি ওর অভিসন্ধিটা। আমার কাছ থেকে বিদিশার ফোন নম্বরটা নিয়েছিল, বিদিশাকে ফোনও করেছিল, অথচ আমাকে বিদিশা সেকথা বললেও মিনু একবারও তা বলেনি।

বিদিশা ভাবতেই পারেনি, মিনু ওকে ফোন করবে। ফোনটা যখন করেছে, বিদিশার মা ধরেছিল। মিনু নিজের পরিচয় দেয় নি। বিদিশা এসে ফোনটা ধরতেই ওকে ঠেস মেরে বলেছিল, ‘কালতো দেব আসছে আমার বাড়ীতে। তুমি আসবে নাকি?’

আমাকে একনাগাড়ে কতকিছু বলে গেল বিদিশা। মিনুর বাড়ী থেকে ফেরার পর ফোন করে আমাকে বলল, ‘সখ মিটেছে তোমার? আঁশ মিটেছে? ধন্যি মেয়ে বাপু। এখনো তোমার পিছন ছাড়ে না।’

সেদিন বিদিশার মুখে ওই কথা শুনে মিনুর ওপরে আমিও খুব চটে গিয়েছিলাম। ভাবিনি আরো কত পরিকল্পনার জাল বিস্তার করে রেখেছে মিনু। তার কিছুদিন পরেই ঘটল আর একটি মারাত্মক ঘটনা।

সেদিন ছিল রবিবার। মা বলল, সোদপুরে আমার বড়মামার বাড়ীতে যাবে। বাড়ীতে রান্না সব করাই আছে। শুধু ভাতটা ফুটিয়ে নিলেই হবে। বিদিশাকে ফোন করলাম। বিদিশা বলল, ‘বাড়ীতে একা রয়েছ বলে আমাকে ডাকছ? কি করবে তুমি?’

আমি বললাম, ‘কেন এর আগে যখন একা ছিলাম, তুমি বুঝি কোনদিন আসোনি আমার বাড়ীতে? মা, এই একটু পরেই বাড়ী থেকে বেরোবে। তারপরে সারাদিন আমি শুধু একা। এই মূহূর্তে একজনকে আমার খুব দরকার। বিদিশা ছাড়া আর কারুর নাম এই মূহূর্তে মনে করতে পারছি না।’

বিদিশা বলল, ‘বাহ্ আমাকেও তো বলে বেরোতে হবে। রবিবারে বাড়ী থেকে বেরুচ্ছি। বাড়ীতে বললেই তো বুঝে যাবে। মা বাবা তো জেনেই গেছে, তোমার বাড়ীতে যাবার জন্য আমি সবসময় পা বাড়িয়ে রয়েছি।’

বিদিশাকে বললাম, ‘শোন বিদিশা। আমি তোমার সাথে ছাড়া আর কারুর সাথে তো প্রেম করিনা। ফুলশয্যার রাতে স্বামী যেটা তার স্ত্রীর সাথে করে, সেটা যদি এই ফাঁকা বাড়ীতে হয়ে যায় মন্দ কি? সুযোগকে কখনো পায়ে ফেলতে নেই। একা একা বাড়ীতে বসে তোমার স্বপ্ন দেখবো, অথচ তুমি আসবে না এটা কি কখনো হয়? কখন আসবে বলো। মা কিন্তু ঠিক এক ঘন্টা পরেই বেরুবে।’

বিদিশা ফোনেই বলল, ‘তুমি কি করবে আমাকে? বিয়ের আগেই ফুলশয্যা সেরে নেবে? দাঁড়াও মাসীমাকে আমি বলছি।’

ওকে বললাম, ‘দেখো সৌগত বিয়েটা সেরে নিচ্ছে। তোমার আমার বিয়েটাও হয়তো হয়ে যাবে আর কিছুদিনের মধ্যে। বিয়ের আগে ফুলশয্যার প্র্যাকটিশটা করে নিতে অসুবিধে কি? মা তো সেই সুযোগই আমাদের করে দিয়ে যাচ্ছেন।’

একটু যেন ঘাবড়ে গেল বিদিশা। আমাকে বলল, এই না। তারপরে কি থেকে কি হয়ে যাবে। মরি আর কি?ওসব সখটক তোমার পূরণ হবে না বাপু। বলোতো এমনি আমি যেতে পারি।’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা বিদিশা? তুমি আসবে, আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করবে। তোমার শরীর আমাকে ছুঁয়ে যাবে, আমার হৃদয়কে চঞ্চল করে তুলবে। সেই আশা নিয়েই তো আমি তোমাকে ডাকছি। তোমার কি মনে হয় না প্রেম মানেই একটা নিবিড় মূহূর্ত? যেখানে প্রেমের সাথে থাকবে একটু চুমোচুমি। নারীর সাহচর্য এক মধুর অনুভূতি। এর থেকে আমাকে কেন বঞ্চিত করছ বিদিশা? তুমি কি চাওনা মাঝে মধ্যে এই সখগুলো আমি পূরণ করি। মাঝে মধ্যে গোপণ খেলাটা খেললে অসুবিধা কি বিদিশা? তুমি এখুনি চলে এস। দেরী কোরো না।’

বিদিশা একপ্রকার নাই বলে দিল আমাকে। আমাকে বলল, ‘তোমার গোপণ খেলা আমি বার করছি। আজ তুমি জব্দ। বেশ হয়েছে। আজ বাড়ীতে একা থাকো। আমি আর যাচ্ছি না।’

একটু হতাশই হলাম। ভাবলাম, ঠিক আছে বিদিশা যদি না আসে, ঘুরতে ঘুরতে বিকেলবেলা ওর বাড়ীতেই চলে যাব। সময়টা কিছুটা হলেও অন্তত কাটবে। বিদিশা না থাকলে, কিছুই আমার ভাল লাগে না।

মা একটু আগেই বড়মামার বাড়ীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। ঘড়িতে তখন বাজে সকাল এগারোটা। সারাটা দিন বাড়ীতে বসে কি করব তাই ভাবছি। হঠাৎই দরজায় কলিংবেল। ছুটে গেলাম। ভাবলাম, বিদিশাই এসেছে বোধহয়। আমাকে চমকে দেবার জন্যই না বলেছে তখন ফোনে। আমার সাথে মজা করতে বিদিশাও খুব ভাল পারে।

দরজা খুললাম। দেখি বিদিশা নয়। সামনে মিনু দাঁড়িয়ে। এক গাল হেসে আমাকে বলছে। ‘চমকে গেছিস না? আসলে তোদের বাড়ীর খুব কাছেই একটা দরকারে আমি এসেছিলাম। ভাবলাম, একটু ঢুঁ মেরে যাই। আজ তো রবিবার। তুই নিশ্চই বাড়ী থাকবি। তা আমাকে ভেতরে আসতে বলবি না? নাকি দরজা থেকেই বিদায় করে দিবি।’

মিনু হাসছে। আর আমি ভাবছি, এ আবার অসময়ে কেন এল? কি মুশকিল, বিদিশাও যদি আবার এখন এসে পড়ে?কি হবে তাহলে?

মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়েই ওকে ঘরে ঢোকালাম। আমার মন বলছিল, হঠাৎ মিনুর আগমনটা উদ্দেশ্যপ্রনোদীত। মাঝে মাঝে এত ন্যাকামি করে মিনু, বিরক্তিতে গা জ্বলে যায়। ওর এই গায়ে ঢলানি স্বভাবটা আমি জানি, যতদিন কলেজে পড়েছি, মিনু আমার পিছু ছাড়েনি। এতদিন পরে গায়ে পড়ে এসে আবার মাঝে মধ্যেই আমার বাড়ীতে এসে হানা দিচ্ছে, এটা একধরণের ফন্দী ছাড়া আর কিছুই নয়। আগের দিন ও বাড়ীতে গিয়ে, পুনরায় ওর বোনকে গান শেখানোর জন্য ভীষন কাকুতি মিনতি করছিল মিনু। আমি একপ্রকার না ই করে দিয়েছি। রীনা একটু দূঃখ পেয়েছে, কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি জানি, যতক্ষণ আমি রীনাকে গান শেখাব,মিনু এসে সামনে বসে থাকবে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে আমার দিকে। চোখের পাতা পড়বে না। ওর ওই দৃষ্টিতে আমার ভীষন অস্বস্তি হবে। মনোসংযোগে চীড় ধরবে। বলা যায় না রেগেমেগে ওকে কিছু বলেও দিতে পারি। মিনু অবশ্য এসবে অভ্যস্ত। আমার কাছে না শুনেও সেই একপ্রকার আমার পায়ের উপরেই সে পরে আছে।

মনে পড়ে কলেজে যেদিন মিনুকে প্রথম দেখেছিলাম, ও একটা কালো রঙের শাড়ী পড়ে এসেছিল। বগল কাটা ব্লাউজ। শাড়ীতে যতনা ওকে আকর্ষনীয়া লাগছিল, তার থেকেও বেশি ঠিকরে পড়ছিল ওর নির্লজ্জ্বতা। মিনু বেশ ব্যাটাছেলেগুলোকে ধরে ধরে জবাই করতে পারে। কেন জানি না আমাকেও ও অত চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই সফল হয়ে দেখাতে পারল না। মিনুর বেশ আফশোসও হয়েছিল। বিদিশার জন্যই ওকে এই হারটা স্বীকার করতে হয়েছিল, তাতে অবশ্য ওর কোন দূঃখ নেই। রীনাকে গান শেখাতে রাজী হয়ে যাওয়াটা মিনুর কাছে একপ্রকার মেঘ না চাইতেই জল পাওয়ার মতন। ঠিক দুদিন আগেই ও আমাকে এসে বলল, দেব, ‘আমার সন্মন্ধে অনেকে বাজে বাজে কথা সবাই বলছে, আমি কিন্তু এতটা নির্লজ্জ্ব নই। নিজের স্বার্থকে আমি কখনই বড় করে দেখিনা। তুই ভাবিস, আমি খুব খারাপ। তাই আমার বাড়ীতে তোর যেতে ইচ্ছে হয় না, তাইতো? আজ থেকে তোকে আমি কথা দিলাম। বিদিশা যেমনটি আছে, ঠিক তেমনটিই তোর থাকবে। আমি তোদের মাঝে আর মাথা গলাবো না।’

তাও মনটা ভীষন খুচখুচ করছিল। শেষে মেষে এই সৌগতই আমাকে ভরসা দিল। বলা যায় ওর কথাতেই শেষপর্যন্ত আমি রীনাকে গান শেখাতে রাজী হয়ে গেলাম।

সেই প্রথমদিন থেকে সপ্তাহে একদিন করে আমি মিনুর বাড়ীতে আমি যেতাম। একঘন্টা রীনাকে গান শেখাতাম। মিনু সামনে এসে বসে থাকতো। আমার গান শুনতো। কিন্তু আমার প্রতি ওর দূর্বলতার কথা কখনো আর বলেনি। কলেজের শেষ কটাদিন, আমার সাথে দেখা হলে শুধু কথা বলত। কিন্তু ওর হাবভাবে, ওর আচরণে সেরকম কিছু আমার চোখে পড়ত না।

কলেজ ছাড়ার দুমাস বাদে আমি যখন মিনুর বাড়ী যাওয়া বন্ধ করে দিলাম, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বিদিশার আপত্তি ছিল, সে কথা আমি আগেই বলেছি। একদিন বিদিশা এল কলেজে মুখ ভার করে। আমার সাথে সেভাবে ভাল করে কোন কথা বলছে না। ভেতরে ভেতরে যেন কোন চাপা রাগ, রাগটা ঠিক আমাকে দেখাতেও পারছে না। অথচ আমি ধরেই নিয়েছি, ওর মনের মধ্যে আমাকে নিয়ে কিছু একটা শঙ্কা রয়েছে।

একটু জোর করতেই বিদিশা বলল, ‘তুমি প্রনব বলে কাউকে চেনো?’

আমি বললাম, ‘প্রনব বলে সেরকম তো আমি কাউকে চিনি না। সে কি আমাদের কলেজে পড়ে?’

বিদিশা বলল, ‘সেভাবে ওকে কোনদিন কলেজে আমিও দেখিনি। কালকে হঠাৎই তোমার সন্মন্ধে আমাকে উল্টোপাল্টা কথা বলল, আমার মনটাকে খারাপ করার চেষ্টা করছিল ছেলেটা। কে ও?’

ওকে বললাম, মুখ না দেখলে কি করে বুঝব? আর আমার সন্মন্ধে খারাপ কথা বলবেই বা কেন সে তোমাকে? কি করেছি আমি? কারুর ক্ষতি করেছি?

বিদিশা বলল, প্রথমেই সে আমাকে বলল, দেব তো গেল ফসকে। এবারে কি করবে তুমি?

আমি বিদিশাকে বললাম, মানে?

বিদিশা বলল, আমার ইচ্ছে করছিল ছেলেটার মুখের ওপরে একটা চড় কসাতে। সবকটা দাঁত বার করে আমার মুখের সামনে এমন বিশ্রীভাবে টোনটিটকিরি কাটছিল ছেলেটা। ভীষন রাগ হচ্ছিল। আমি ওর কোন কথা শুনতে চাই না। তাও জোর করে আমাকে বলল, ‘দেব তোমাকে নিয়েও খেলছে, আবার মিনুকে নিয়েও খেলতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত মিনুরই জয় হবে তুমি দেখে নিও। দেব শীগগীরই তোমাকে টা টা আর বাই বাই করে দেবে। সেদিনটা আসতে আর খুব বেশী বাকী নেই।’

আমি বিদিশার কথায় ভীষন অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। কে এই প্রনব বলে ছেলেটা? বিদিশাকে এই কথাটা বলার কারণই বা কি? মাথামুন্ডু কিছু ভেবে পেলাম না। শুভেন্দুকে ডাকলাম। শুভেন্দু এল। বলল, ‘আমি খবর নিয়ে দেখছি। কে এই প্রনব? দরকার পড়লে মিনুকেও জিজ্ঞাসা করছি। রহস্যটা খুঁজে বার করছি।’

সত্যি কথা বলতে কি, কলেজে আমার শত্রু সেরকম কেউ ছিল না। এখন বিদিশার প্রতি যদি কারুর দূর্বলতা থেকে থাকে, তাহলে সেটা অন্য কথা। আমি যেন বিদিশার কষ্টটা বুঝে ওকে আর সেদিন কিছু বললাম না। মনে হল, মিনুকে নিয়ে বিদিশার দ্বিধা এখনো কাটেনি। মিনু যখন কথা দিয়েছে, আমার প্রতি ওর দূর্বলতাটা আর নেই। তখন প্রনব বলে এই ছেলেটাই বা কেন বিদিশার কান ভাঙাতে যাবে। তাহলে কি মিনুই এই খেলাটা খেলেছে?

পরের দিন মিনু এল কলেজে। প্রথমেই এসে বলল, ‘প্রনব বলে আমি কাউকে চিনি না। আর এ কলেজের যে ছেলে নয়, তাকে এত গুরুত্ব দেওয়া কেন?’

আমাকে বলল, ‘বিদিশাকে এই পরের কথায় কান না দেওয়াটা বলে, একটু তুই বন্ধ কর। সবকিছুতেই তোকে আর আমাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি, আমারও বাপু সহ্য হয় না।’

মিনুর সঙ্গে তারপর থেকে বেশ কয়েকদিন কথা বলা আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। রীনাকেও গান শেখানো বন্ধ করে দিয়েছি। হঠাৎই একদিন আমার পায়ে ধরে আবার সাধা শুরু করে দিল মিনু। আমাকে বলল, যেটা সত্যি নয়, সেটা নিয়ে শুধু শুধু তুই পড়ে আছিস। খামোকা রীনাকেও তুই গান শেখাতে যাওয়া বন্ধ করে দিলি। আচ্ছা আমার কি দোষ বল তো? তুই যেন আমাকেই দোষী সাব্যাস্ত করতে চাইছিস। আমি কি প্রনব বলে ছেলেটাকে বিদিশার কাছে পাঠিয়েছি?

সেদিন বিদিশাকেও অনেক বুঝিয়েছিল শুভেন্দু। ‘এসব কথার কান দেওয়ার কোন দরকার নেই। দেব কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ, নিজে খুব ভালো বোঝে। যেদিন বুঝবে, মিনুর বাড়ীতে ও নিজে থেকেই যাওয়া বন্ধ করে দেবে। তুই কেন এসব কথায় কান দিয়ে মন খারাপ করছিস? কেন দেবের প্রতি কি তোর ষোলো আনা বিশ্বাস নেই?’

এতদিন বাদে সেই মিনুই আবার আমার বাড়ীতে আসা আরম্ভ করেছে। আমি না পারছিলাম ওকে দোড়গোড়া থেকে বিদায় করতে, না পারছিলাম মুখের ওপরে সরাসরি কিছু কটু কথা বলে দিতে। ঘরে ঢুকে প্রথমেই আমার ভুল ধারণাটা ভেঙে দিল মিনু। আমাকে বলল, ‘আমি কিন্তু তোকে আমার বাড়ী যাওয়ার কথা আর বলব না। একবার তুই আমাকে না করে দিয়েছিস। রীনাকেও না বলে দিয়েছিস, সুতরাং গান শেখানোর প্রসঙ্গ আর নয়।’

আমি বললাম, ‘তাহলে তুই হঠাৎ?’

মিনু বলল, ‘কেন তোর কাছে কি এমনি আসতে নেই?’

আমি বললাম, তাও কারণ তো কিছু একটা থাকবেই। সাত সকালে এসে হাজির হয়েছিস। তোর আসার কারণটা কি, খুলে বল।

মিনু বলল, ‘আমার কেন জানি না দেব, তোকে আমার মনের কথাটা বলতে খুব ইচ্ছে করে। এই ধর তোকে যদি আমি বলি, দেব তোকে আমার সেই আগের মতন পেতে খুব ইচ্ছে করে। তুই রেগে যাবি। আমি জানি তোর কানের লতিটাও তখন লাল হয়ে যাবে। প্রেমকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতন আমার তো বিদিশার মতন রূপ নেই। যে তোকে বলব, বড় আশা করে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও। আমি আসলে খুব ভুল করেছিলাম। মানুষতো পদে পদে ভুল করে। ধরে নে তোর প্রতি আমার দূর্বলতাটা একপ্রকার ভুল।’

মিনুকে বললাম, ‘ছাড় না ওসব পুরোনো কথা। কি জন্যে এসেছিস তুই বল।’

মিনু বলল, ‘আমি না ঠিক তোর মতই আর একজনের প্রেমে পড়ে গেছি। আজ তোকে সেকথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে।’

আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মিনুকে বললাম, ‘শুনে খুশী হলাম। তা সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটি কে?’

মিনু বলল, ‘ছেলেটির চাউনির মধ্যে কী একটা অদ্ভূত আকর্ষন আছে জানিস তো। কিছু কিছু ছেলেদের চোখ থেকে এমন দুটি ঝরে পড়ে। মনে হয়, তারা যেন হৃদয়ের সবটুকু দেখতে পাচ্ছে। কথার মধ্যেও এক অদ্ভূত কুহক মায়া আছে। মনে হয় ও বুঝি এক জাদুকর। কেমন করে মেয়েদের মন চুরি করতে হয়, সে বিদ্যা ও শিখেছে সযত্নে।’

আমি বললাম, ‘এতদিন ধরে যে মিনুর প্রেমে সবাই পাগল। সেই মিনু কিনা কারুর প্রেমে পড়েছে। ব্যাপারটা তো ইন্টারেস্টিং। তা বিয়েটা কবে করছিস? আর ছেলেটিই বা কে?’

মিনু বলল, ‘বিয়ের দিনখনটা আমি তার উপরই ছেড়ে দিয়েছি। ওখানে আমার কোন তাড়াহূড়ো নেই। শুধু ছেলেটাকে একটা মেয়ে বড় জ্বালাচ্ছে। সে আমারই মতন তাকে ভালবাসে। এখন আমার প্রেমিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কাকে ছেড়ে সে কার কাছে যাবে? আমার কাছে না তার কাছে?’

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিনুর মুখটা তখন বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মনে মনে বললাম, এ আবার কি কথা?কাকে না কাকে পছন্দ করে বসে আছে, তাকে আবার অন্য একটি মেয়েও ভালবাসে। তারমানে আবারো সেই নিরীহ কোন ছেলেকে নিয়ে টানাটানি, মিনুর চক্করে পড়ে একটা ভালো ছেলের মাথানষ্ট। নিরীহ ছেলেটা জীবনটা নষ্ট হল, আর কি?

ওকে বললাম, ‘তোর মতলবটা কি বলতো? এতো আমার সাথে বিলকুল মিলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। কার কথা বলছিস তুই?’

মিনু একগাল হেসে বলল, ‘কারো কথা বলছি নারে বাবা। ওফ, তোকে কিছু বলতে যাওয়াই মুশকিল। সবসময় কিছু একটা ধরে বসে থাকিস তুই। আমি তো এমনি বলছি।’

ভীষন বিরক্তি হচ্ছিল আমার। মনে হল, যতক্ষণ আমার ঘর থেকে ও বিদায় না হচ্ছে রেহাই নেই। কি করে যে ভাগাবো, সেটাও বুঝতে পারছি না। ও আমাকে বলল, এই দেব, চা খাওয়াবি?

আমি বললাম, ‘মা তো ঘরে নেই। তাহলে বস, আমি চা করে নিয়ে আসছি।’

কি বলতে কি বলে বসলাম, মিনুর দেখলাম, মুখটা বেশ খুশী খুশী হয়ে উঠল। মা’র ঘরে না থাকাটা ওর কাছে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতন। উঠে আমারই পেছন পেছন চলে এল মিনু। আমাকে বলল, ‘তুই একা কেন চা করবি? চল আমিও তোকে সাহায্য করছি।’

আমার রান্নাঘরে যেখানে স্টোভটা রাখা রয়েছে, মিনু আমার পিছন পিছন ঠিক ওখানটাই এসে দাঁড়ালো। অস্বস্তি হচ্ছে আমার। একে মা ঘরে নেই। মিনু জ্ঞানহারা হয়ে হঠাৎ যদি কিছু করে বসে আমার আফশোসের শেষ থাকবে না। বেয়ারাপনা শুরু করলে আর এক কেলেঙ্কারী। সুযোগের সদ্বব্যবহার করতে মিনুর কোন জুড়ি নেই।

হঠাৎই পেছনে দাঁড়িয়ে মিনু বলল, ‘রীনার খুব মন খারাপ। তুই ওকে হ্যাঁ বলে আসিস নি। ও আর গান গাইবে না বলছে। রেওয়াজও বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে, দেবদা যতক্ষণ না আমাকে আবার গান শেখাতে না আসছে, আমি আর হারমোনিয়াম ধরব না। এবার থেকে গান গাওয়া আমি ছেড়ে দিলাম।’

আমি বললাম, ‘দেখ, গান তো সেভাবে আমি কাউকেই শেখাই না। তুই জোর করেছিলিস, তাই রীনাকে গান শেখাতে আমি রাজী হয়েছিলাম। ওকে একটু বোঝানোর চেষ্টা কর। মাষ্টারের কি অভাব আছে? বেস টা তো ভালভাবে তৈরী হয়ে গেছে। তাছাড়া রীনার গলায় সুর আছে। গলাও মিষ্টি। আর আমি তো একজনের কাছে ওকে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়াই বা বন্ধ করে দিল কেন? থাকলে এতদিনে তো ভাল তৈরী হয়ে যেত।’

মিনু বলল, ‘আমি অনেক বুঝিয়েছি। কিছুতেই আমার কথা শুনছে না। তাই তো তোর কাছে ছুটে এলাম।’

মিনুকে এবার মুখের ওপর না ই বলে দিতে হল আমাকে। ওকে বললাম, আমাকে মাফ কর মিনু। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমার মাথার উপরে এখন অনেক দায়িত্ব। তাছাড়া সময়েরও খুব অভাব। কথা দিয়েও যখন কথা রাখতে পারব না। তখন শুধু শুধু আস্বাস দিয়ে কোন লাভ নেই। আমি পারব না। কিছুতেই পারব না।’

হঠাৎই মিনু আমার হাতটা ধরল। ওর এই হাত ধরার মানেটা আমার কাছে পরিষ্কার হল তখনই, যখন মিনু বলল, তোকে একবার রিকোয়েস্ট করব। তুই একবার অন্তত আমার বাড়ী আয়। রীনাকে তুই ই বোঝা। আমার দ্বারা ওটা সম্ভব নয়।’

আমি মিনুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু বরাতে যে আমার দূঃখ আছে। তখনো জানতাম না। কথায় বলে পৃথিবীর সব থেকে সুখী লোকও যেকোন মূহূর্তে দূঃখী বনে যেতে পারে। হঠাৎই বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়ে যাবার মতন মিনুকে বলে বসলাম, ‘কবে যেতে হবে বল? আমি গিয়ে বোঝাবো রীনাকে। আশাকরি ও নিশ্চই আমার কথা ফেলবে না।’

মিনুর সঙ্গে আমার ব্যবধানটা যতটাই বেড়েছিল, ঠিক ততটাই আবার কমে গেল সেই মূহূর্তে। ওর ওই আমন্ত্রণের মধ্যে যে একটা রহস্য আছে, তখনো আমি নিশ্চিত নই। ধরেই নিলাম মিনু সত্যি কথাটা বলছে। অন্তত রীনার কথা ভেবে মিনুর বাড়ীতে আমার যাওয়া দরকার।

মিনুকে চা করে খাওয়ালাম। একগাল হেসে মিনু বলল, ‘তোর ভারী ভয় শুধু আমাকে নিয়ে। এতই তুই বিদিশাকে ভালবাসিস, অন্যকোন মেয়েছেলের সংস্পর্ষেও আসতে চাস না। আরে আমরা তো ভাল বন্ধু হতে পারি না কি? মিনু নয় তোর ভালবাসার পাত্রী হতে পারল না। কিন্তু বন্ধু হতে চাইলেও তুই কি না করবি আমাকে? কেন বিদিশার কি ছেলেবন্ধু একেবারেই নেই?’

মিনুকে বললাম, ‘আগে হয়তো ছিল। কিন্ত আমার সঙ্গে প্রেম শুরু করার পর থেকে, যতদূর জানি, বিদিশার কোন ছেলেবন্ধু নেই।’

হো হো করে হেসে উঠল মিনু। আমাকে বলল, তোর সাথে শুক্লারও তো খুব ভাল দোস্তী ছিল। তা বিদিশা সেখানে কোন আপত্তি করেনি?

আমি বললাম, ‘শুক্লা নিজেই তো পরে সৌগতর সাথে প্রেম করেছে। আপত্তি থাকবে কেন? তাছাড়া শুক্লার সঙ্গে সেভাবে তো আমি কোনদিন মিশিনি। বিদিশা প্রথম প্রথম সেটা দেখে একটু অস্বস্তিতে ভুগলেও, পরে খুব সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া শুক্লা, বিদিশা দুজনেই ওরা খুব ভাল বন্ধু। খামোকা বিদিশা রাগ করতে যাবে কেন?

মিনু বলল, ‘এই আমিই কারুর ভাল বন্ধু হতে পারলাম না। তাই না? সবার দুচোখের বিষ হয়ে গেছি। আমার যেন কারুর কাছে মুখ দেখানোর আর জো নেই।’

মিনুকে বললাম, ‘এসব মন খারাপের কথা ছাড়। এবার তুই বল, তুই নিজে বিয়েটা কবে করছিস?’

একটা হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে মিনু যেন আমার মুখের দিকে তাকালো। আমাকে বলল, ‘আমি ভাবছি, এ জীবনে বিয়ে থা আর করব না।

আমি বললাম, কেন রে?

মিনু বলল, ‘আমার তো অনেক বদনাম আছে। বিয়ে করলেই কি বদনাম সব ধুয়ে যাবে? ওসব বিয়ে ফিয়েতে আমার বিশ্বাস নেই। ফটর ফটর করে কটা অজানা সংস্কৃত মন্ত্র পড়লেই কি সব হয়ে যায় নাকি? দাউ দাউ আগুনে হাত রাখলেই কী আর সতী হওয়া যায়? আমাদের এই মেয়েদের শরীরটাকে নিয়ে সব থেকে বড় জ্বালা, মনের অরণ্যে সবসময় জ্বলছে দাউ দাউ আগুন। তোরা যতই বলিস না কেন, মেয়েরা লজ্জ্বাবতী লতা। আমি তো বিশ্বাস করি না। বিধাতা আমাদের ওভাবেই তৈরী করেছে। বিশ্বে এমন কোন পুরুষ আছে কি যে আমাকে সেন্ট পার্সেন্ট খুশি করতে পারবে? আমার মনে হয়, কেউ বোধহয় এমনটা সুখী হয় না। সুখী সুখী মুখ করে বসে থাকে সব। এসব দের ন্যাকামি আমি পছন্দ করি না।’

ভাবছিলাম, আমার জায়গায় অন্যকেউ থাকলে ওকে হয়তো বলে বসত, জিও বেটি হাজার সাল। তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। তুই শালি ঠিক কথা জেনেছিস তো। সত্যি এই পৃথিবীতে এমন কোনো আখাম্বা দন্ড নেই যা মেয়েদের একশো ভাগ সুখি করতে পারে। তবুও তো তার মধ্যে সুখ খুঁজে নিতে হয়। এক দন্ড থেকে আর এক দন্ডে নিরন্তর পরিভ্রমণ করতে হয়। দেখতে হয় কে সব থেকে বেশি আনন্দ দিতে পারে।

মিনুকে দেখে আমার ওই মূহূর্তে তাই মনে হল। এ মেয়ে বিয়ে থা সত্যি আর করবে না। শুধু শুধু ঘনঘন বয় ফ্রেন্ড চেঞ্জ করবে।

ভাগ্যিস আমার কপালটা এরকম নয়। আমাকে নিয়ে বিদিশা ছেনাল খেলা খেলবে না কোনদিন। কিছুদিন খেলাটা চলল, তারপর এঁটো পাতার মতো তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল ডাস্ট বিনে। পরে দেখছি, কুকুরের কাড়াকাড়ি।

জীবন নাটকের পরবর্তী অধ্যায় যে শুরু হচ্ছে তার একটু পরেই, তখনো জানি না। মিনু একেবারে হাত পা ছড়িয়ে আমার সাথে বসার ঘরে সোফায় বসে কথা বলছে। ঠিক তখুনি শুনলাম, দরজায় কলিংবেলের শব্দ। চমকে উঠলাম। এই সময় কে এল?

দরজা খুললাম, দেখি বিদিশা দাঁড়িয়ে।

আমার হাট বিটটা একটু বেড়ে গেল। ওর মুখটা দেখে কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ যেন ভূত দেখার মতন দেখছি। বিদিশাকে বললাম, ‘তুমি যে বললে বড় আসবে না? হঠাৎই চলে এলে? আমাকে তো জানালে না?’

চিরকালের যারা প্রেমিক প্রেমিকা হয়, জন্মজন্মান্তরেও যারা পরষ্পরকে ভালবাসে। ভগবান কখনো কখনো তাদের মধ্যে বাধার প্রাচীর তৈরী করে দেন। সেই মূহূর্তে বাঁধার প্রাচীরটি কে? সেটা অবশ্য বুঝতে অসুবিধে নেই। কিন্তু আমি চাইলেও, বিদিশা যেন সেটা মন থেকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারল না। ঘরে ঢুকেই আমাকে বলল, ‘মিনু এসেছে, তোমার কাছে, এটাতো তুমি আমাকে আগে বলো নি?’

মিনু ততক্ষনে বিদিশাকে দেখে ফেলেছে। ওকে বলল, ‘এই তো বিদিশা। এতক্ষণ তোমার কথাই হচ্ছিল। অনেক দিন বাঁচবে তুমি। এসো এসো ভেতরে এসো। কতদিন তোমায় দেখি না।’

বিদিশার প্রচন্ড অস্বস্তি হচ্ছে। মুখ তুলতে পারছে না। আমি ব্যাপারটা সহজ করে দেবার জন্য বললাম, ‘আসলে মিনু, রীনার জন্যই আমার কাছে এসেছে। রীনা খুব ঝেমেলা পাকাচ্ছে বাড়ীতে। গানটান সব বন্ধ করে দিয়েছে। ওকে আমি যতক্ষণ না বোঝাচ্ছি, মিনু বলছে কোন কাজ হবে না। রীনাকে বোঝানোর জন্য আমাকে একবার অন্তত যেতেই হবে।’

বিদিশা মুখ তুলে একবার আমার মুখের দিকে তাকালো। বুঝতেই পারলাম, কথাটা মনে ধরে নি ওর। যেন মিনুকে আমার ফ্ল্যাটে দেখে হঠাৎই ছন্দোপতন ঘটে গেছে। মনের মধ্যে জমে উঠছে অনিশ্চয়তার ইঞ্চি ইঞ্চি ধুলো। অথচ ওকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। মিনু আর কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসেনি। এসেছে শুধু রীনার জন্যই। বিদিশা হয়তো যেটা ভাবছে, সেটা ভুল।

ঠিক সেই মূহূর্তে মিনু হয়ে গেল বিদিশার কাছে বিভীষিকার মতন। হঠাৎ আমাকে বলে বসল, আমি তাহলে যাই? তুমি মিনুর সঙ্গে গল্প করছ, জানলে আসতাম না।’

মিনু খুব চালাক। সঙ্গে সঙ্গে ও উঠে পড়ল। বিদিশাকে বলল, ‘না, না, একি? তুমি যাবে কেন? এই তো এবার আমিই যাব। টাইম হয়ে গেছে। দেব তাহলে আমি আসি। টা টা বাই। তুই কিন্তু রীনার কথাটা মনে রাখিস। ভুলে যাস না।’

মিনুকে বিদায় দিয়ে আমি এবার বিদিশার মন ঠিক করতে পড়ে গেলাম। ওকে বললাম, ‘কি হয়েছে? মিনুকে দেখে খারাপ ভাবছ? আরে বাবা, আমি তো ওকে ডাকিনি। ও নিজেই এসেছে। হঠাৎ করে দরজা খুলে দেখি মিনু দাঁড়িয়ে। কি করব বল? ঘরে এসে বলল, রীনার জন্য আমাকে একবার নাকি যেতে হবে।’

বিদিশা বলল, এখন কি মনে হচ্ছে জানো? এই পৃথিবীতে আমি বুঝি আর সুখী নই।

আমি বললাম, ‘কেন এ কথা বলছ বিদিশা?

বিদিশা বলল, ‘সুখ নামের একটা সুখপাখীকে হৃদপিন্ডের মধ্য বন্দী করতে চাইছিলাম। সেই পাখিনী ভীষন চালাক। হঠাৎই খাঁচা খুলে ফুড়ুত করে উড়ে যেতে চাইছে নীল আকাশে।’

ভীষন খারাপ লাগল ওর কথা শুনে। বললাম, ‘কেন আমাকে অবিশ্বাস করছ বিদিশা? আমি তো সত্যি কথাই বলছি।’

বিদিশা বলল, ‘তোমাকে বলেছিলাম না। ওকে বেশী প্রশ্রয় দিও না। সাতঘাটে জল খাওয়া একটা মেয়ে। ওকে তুমি বিশ্বাস করো?’

আমি বললাম, ‘আমিও করি না বিশ্বাস। বলছি তো। ও নিজে থেকেই আমার কাছে এসেছে।’

বিদিশা বলল, ‘তাহলে কথা দাও, ওর বাড়ীতে কোনদিন যাবে না। ও ডাকলেও যাবে না।’

বিদিশাকে বললাম, কথা দিলাম।

বিদিশা বলল, ‘আমার মাথায় হাত রেখে বলো, সত্যি।’

আমি ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, সত্যি, সত্যি, সত্যি। এই তিন সত্যি করলাম তোমার কাছে।’

হঠাৎ পুরোনো কথা চিন্তা করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের বারান্দাটায় এলাম। জানি মা ঘুমিয়ে পড়েছে। খাবারটা টেবিলে রাখা রয়েছে। আমাকে খেয়ে নিতে হবে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চাঁদটা সরে গেছে। কোথা থেকে একরাশ মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিয়েছে। অসময়ের কুচকুচে কালো মেঘ। এ মেঘকে যে আমি এসময় দেখবো আশাই করিনি। বেচারী চাঁদ হবো হবো সন্ধে থেকেই দুহাতে দু মুঠো জোৎস্না ছড়িয়ে ছিল চারপাশে। চাঁদ বোধহয় অকালেই ঝরে পড়ল। মাঝরাতেই ঢলে পড়েছে চাঁদ। তাহলে কি আমার জীবনটাও তাই?-

মনে পড়ছিল, বিদিশাকে একদিন অনেক রাত অবধি একা পেয়ে একটা গান গেয়েছিলাম, ‘এখনি বিদায়, বোলো না। এখনো আকাশে চাঁদ জেগে আছে। কোন কথা তো এখনো হল না। এখনি বিদায় বোলো না।’

বিদিশা আমাকে বিদায় দিয়ে চলে গেল। আর যখন ফিরেই এল। সেই চাঁদটাকে কিন্তু আমি আর দেখতে পাচ্ছি না।

অসমাপ্ত

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s