নিষিদ্ধ ভালবাসা – ০৪


অদৃশ্য পত্র

দিন কেটে যায়। মা জানালেন যে পরী বাসন্তি পুজোর পরে বাড়িতে আসবে। খবর শুনে আমি আহ্লাদে আটখানা, তবে বাসন্তি পুজ মানে সেই এপ্রিল মাসে। সাথে সাথে মনের মধ্যে একটু দুঃখ হয়, এপ্রিল মাস মানে অনেক দিন। এতদিনের বিচ্ছেদে আমাদের প্রেমে চর না পরে যায়, মনের এক গহিন কণে লাগে ভয়। দু’তলার নিজের রুম ছেড়ে আমি তিন তলার রুমে শিফট করে যাই। পরী আসবে, মা ব্যাস্ত ওর ঘর সাজানো নিয়ে। নতুন পর্দা, নতুন বিছানার চাদর, সব কিছু নতুন কেনা হয়। আমার যেহেতু কোন বোন নেই তাই পরীকে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে তার সব স্বপ্ন পূরণ করে নিতে চায় মা। বাবা মা সব সময়ে আমার ওপরে যেন একটু ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হয়তো ভগবানের কাছে মেয়ে চেয়েছিলেন, সেখানে ভগবান ছেলে দিয়েছে, সেটাই ক্ষোভ। প্রতি রাতে খাবার টেবিলে পরীর কথা, মাঝে মাঝে আমার কেমন হিংসে হয় পরীর ওপরে। সাথে সাথে মনটা বেশ খুশিতে ভরে ওঠে, এবারে কাছে পাবো, একেবারে আমার চোখের সামনে, হৃদয়ের পাশে। আমার সাথে থাকবে সব সময়ে।

গ্রামের বাড়িতে যে হেতু ফোন ছিলনা তাই পরীর সাথে যোগাযোগ করা হত না। পরীর কথা মনে পরত প্রতি রাতে আর আমি ওর দেওয়া রুমালটা নাকে ধরে ওর গন্ধ শুঁকে ঘুমিয়ে পরতাম। সেই ছোট্ট সিল্কের রুমালের মাঝে ওর ঠোঁটের পরশ খুঁজে পেতাম, যেন কোমল অধর ওষ্ঠ আমার গালে স্পর্শ করছে।

একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে, মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন “কি রে বিয়েবাড়িতে কিছু হারিয়ে এসেছিস নাকি।” আমি বললাম “না আমার ঠিক মনে নেই।” প্যাকেট থেকে একটা জামা বের করে আমারকে ধরিয়ে দিয়ে দেখতে বললেন যে এটা আমার কিনা। আমি দেখেই চিনতে পারলাম যে ওটা আমার শার্ট, বেশ কিছু দিন ধরে খুঁজছিলাম আমি। বললেন যে পরী মায়ের স্কুলে এসে জামাটা দিয়ে গেছে। পরী দিয়ে গেছে শোনা মাত্র আমার মনের ভেতরটা খুশীতে নেচে উঠলো।

ও আমার শার্ট ছুঁয়েছে। হাথে ধরে, ওর হাতের কোমল স্পর্শ অনুভব করার চেষ্টা করলাম। মা আমাকে একটা খাম দিয়ে বললেন যে পকেটে ছিল, কিন্তু খালি।
রাতের আমি শার্ট পরে শুয়ে পরি, পরীর ছোঁয়া সারা শরীরে অনুভব করার চেষ্টা করি। খালি খামটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখলাম, কিছুই লেখা নেই পুরো খালি। ঘিয়ে রঙের পুরনো ডাকঘরের খাম। পরের দিন আমি খামের কথা নিয়ে ভাবতে থাকি, কি হতে পারে এই খামে, খালি কেন? ভেবে ভেবে উত্তর পাইনা। রাতে খাবার পরে, নিজের রুমে ঢুকে খামটা হাতে নিয়ে আবার উল্টে পাল্টে দেখি। খামের চার কোনা খুলে, আবার আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছে। তার মানে খামটা খোলা হয়েছিল। আমি হাতে একটু জল নিয়ে এসে, চার কোনায় লাগিয়ে খাম খানি মেলে ধরি। খোলার পরেও দেখি ভেতরে কিছুই নেই। নাকের কাছে নিয়ে এসে প্রেয়সীর মন মাতানো জুঁই ফুলের সুবাসে মন ভরে যায়, তার সাথে পেলাম অন্য এক গন্ধ, ভাবলাম “জুঁই ফুলের গন্ধ তো ঠিক আছে, কিন্তু লেবুর গন্ধ কেন আসছে?”

কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে দেখার পরে হটাৎ যেন মাথার সব কটা শিরা উপশিরা জেগে ওঠে। আমার হাতে পরীর লেখা একটা চিঠি, অদৃশ্য চিঠি লেবুর রসে লেখা যাতে কেউ পড়তে না পারে। আমি খাম খানি ঠোঁটের ওপরে চেপে ধরি, পরী টিচার না হয়ে সিক্রেট এজেন্ট হলে ভালো হত। মোমবাতির আলোর সামনে মেলে ধরি চিঠিটা।

“মাই লাভ, ছোট্ট রাজকুমার,
তোমার শাল গায়ে দিলেই মনে হয় যেন তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে আছো। শীতের রাত গুলো অনেক বড় অনেক ঠাণ্ডা। তোমার ফেলে যাওয়া স্মৃতি গুলো ঘুরেফিরে আমাকে ঘুমোতে পর্যন্ত দেয়না। আমার কপালে তোমার ঠোঁটের পরশ এখন লেগে আছে, যেখানে তুমি প্রথম চুম্বনখানি এঁকেছিলে। আমাকে হারিয়ে আমার হৃদয় খানি চুরি করে নিয়ে গেলে। তুমি আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে চল যেখানে শুধু তুমি আর আমি, আর কেউ নয়।
ভবিষ্যতে কি হবে জানতে চাইনা আমি। আমি বর্তমানে তোমার পাশে তোমার সাথে প্রত্যেক দিন বাঁচতে চাই।
জীবনের সব পুরানো কথা সব ভুলে যেতে চাই। সারা জীবন ধরে আমার কনিষ্ঠ কন্যে হবার যে দুঃখ সেটা আমি ভুলে যেতে চাই। আমি আমার অতীত ভুলে, বর্তমানে বেঁচে থাকতে চাই, আমি দেখতে চাই না ভবিষ্যতে কি হবে। শুধু মাত্র এই টুকু চাহিদা তোমার কাছে।
আমি তোমার অপেক্ষায় আছি, সোনা, তোমার সাথে দেখা করার উগ্র প্রতীক্ষায় দিন গুনছি। কাল বাদে পরশু, দুপুর এগারোটা, বারাসাত রেল স্টেসানে।
ভালো থেক। ফর এভার ইওরস, ফ্রম এওর হার্ট।”

কাল বাদে পরশু, মানে গত কাল চিঠি দিয়েছে, মানে রাত পেরলেই পরীর সাথে দেখা হবে। এটা জেনে হৃদয়টা পেখম তোলা ময়ুরের মতন নেচে ওঠে। প্রবল উত্তেজনায় সারা রাত ঘুমোতে পারিনা, কত দিন পরে পরীর সাথে দেখা হবে।

সকালে খাবার টেবিলে আমাদের বিশেষ কথা বার্তা হয় না। শীত কালের সকাল, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। চারদিকে একটু কুয়াসাচ্ছন্ন ভাব। স্কুলে বের হবার আগে মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে পরীকে কিছু জানানর আছে কি না। আমি তো কথা শুনে থ, মানে মা আজকে পরীর সাথে দেখা করবে আর পরী আমার সাথে মানে মায়ের সাথে পরীর দেখা হবেনা। মাই মাকে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেই যে পরীকে কিছু জানানর নেই। মনে মনে তো বললাম, যে তোমাকে জানাতে হবে না আজ তো আমি ওকে জানিয়ে দেব।

নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই আমি স্টেসানে পৌঁছে গেছিলাম। পরীর ব্যাকুল প্রতীক্ষায় যেন সময় কাটছিল না আমার। এক সেকেন্ড যেন এক এক বছর মনে হচ্ছিল। কি করবো, সময় তো কিছু করে হোক কাটাতে হবে তাই প্লাটফর্মের এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত হেঁটে বেড়াই আমি। প্রায় পনেরো দিন পরে দেখা করবো আমরা। পনেরো দিন, না, পনেরো বছর পরে দেখা হচ্ছে যেন আমাদের। বার বার ঘড়ির দিকে দেখি, কখন আসবে মেয়েটা, আদৌ আসবে কিনা।

কিছুক্ষণ পরে দেখি প্লাটফর্মের একদিক থেকে দৌড়ে আসছে পরী। আমি তাকিয়ে দেখলাম, হাল্কা নীল রঙের সাড়ী পরা, তার ওপরে একটা লম্বা জ্যাকেট চাপিয়ে। দৌড়ে আসার ফলে হাপাচ্ছে, ডান গালে চুলের এক গুচ্ছ নাচছে আর তার জন্য চেহারার সৌন্দর্য টা যেন শত গুন বেড়ে গেছে। কি মেয়ে, সব সময়ে শুধু সাড়ী পড়তেই ভালবাসে। আমি ওকে বললাম এত হাঁপাচ্ছ কেন, একটু থেমে বড় করে শ্বাস নাও।

“আমি সরি, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছনা তুমি?”

আমি একটু রাগ দেখিয়ে বলি “ইউ সুড বি সরি।” আমার বাঁ হাত জড়িয়ে ধরে, স্টেসান থেকে বেড়িয়ে পরি আমরা।

আমাকে জিজ্ঞেস করে যে ওর ছোটমা মানে আমার মা কেমন আছেন, আমি জানিয়ে দিলাম যে বাড়ির সবাই ভাল আছে। আমি আর জানালাম যে আমার মা আজ বিকেলে ওদের বাড়ি যাবে সবার সাথে দেখা করতে। সেই শুনে পরীর একটু খানি মন খারাপ হয়ে যায়, আমার মাকে খালি ফিরতে হবে। দেখা হবে না ওর সাথে।পরী দিদাকে জানিয়ে এসেছে যে বারাসাতে বান্ধবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। আমি আর জানালাম যে, আমার মা ওর রুম তৈরি করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, মা খুব খুশী যে পরী মায়ের কাছে থাকবে।

পরী আমার দিকে বড় বড় কালো চোখে তাকিয়ে থাকে, বুকের বাঁ পাশে কেমন ব্যাথা অনুভব করি ওর চাহনি দেখে, মনে হল যেন হৃদয় টাকে চোখ দিয়ে চুরি করে নিয়ে গেল। মিষ্টি হেসে বলে “খুব দেখা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল তোমার সাথে, আর কিছু দিন হলে তো আমি মারা পরতাম। আমার চিঠি পেয়েছ তাহলে, কত বুদ্ধিমান অভি আমার।”

আমি হেসে বললাম “বুদ্ধিমান কে, আমি না তুমি? আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে তুমি ওরকম করে চিঠি লিখতে পারো।”

একটু খানি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলে “তাহলে বল তোমার প্রেমিকা অনেক বুদ্ধিমতী।”
হসি দেখে আমার মনে হচ্ছিল যে আমি ওখানেই দু’হাতে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে নেই। কিন্তু সে উপায় নেই, চারদিকে লোকজনের ভিড়। আমি জিজ্ঞেস করলাম “কোথাও যাবে?”

উচ্ছল তরঙ্গিণীর ন্যায় হেসে বলে “হ্যাঁ, নিশ্চয়। চল একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি। আমার কাছে একটা দারুন প্লান আছে।”

“আবার কি মাথার মধ্যে ঘুরছে তোমার?”

রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমরা পাশাপাশি বসলাম। আমি পরীকে বললাম যে আমি এখন চাকরি করিনা, সুতরাং আমার কাছে বেশি পয়সা নেই। আমার বাঁ হাত জড়িয়ে ধরে ঘাড়ের পাশে নাক ঠোঁট ঘষে বলে “চিন্তা করছ কেন, তোমার মাসি আছে তো তোমার সঙ্গে।” ওর মুখে নিজেকে আমার মাসি বলাতে আমি হেসে ফেলি, সেটা দেখে ও হেসে ফেলে।
“তোমার মনে আছে, ছোড়দার বিয়েতে আমার দুই বান্ধবীর সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম, যাদের বিয়ে হয়ে গেছে।”

“হ্যাঁ, মনে আছে, তো?”

“জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ওরা পুরো এক সপ্তাহর জন্য মানালি যাচ্ছে ঘুরতে, আমি সাথে যাচ্ছি।”

আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না কি জানাতে চাইছে, আমি মাথা নেড়ে বলি “ঠিক আছে, তো?”

আমার দিকে রেগে মেগে তাকিয়ে বলে “তো মানে, আমার সাথে তুমি যাবে।”

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, বলে কি মেয়েটা? “বাবা মাকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে তো কাটানো যাবে। সেটা প্রবলেম নয় পরী। কিন্তু প্রবলেম হচ্ছে তোমার বান্ধবীরা, সবাই জানে তুমি আমার সম্পর্কে মাসি হও।”

চেঁচিয়ে ওঠে প্রায় “না না, আমি ওদের সাথে যেতে চাই না” আমার কাঁধে মাথা রেখে বলে “তুমি নিয়ে যাবে আমাকে এমন জায়গায়, যেখানে শুধু তুমি আর আমি, আর কেউ আমাদের চেনে না।” আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে। ওর চাহনি দেখে আমার ভেতরটা গলে যায়।

“ঠিক আছে, হাওড়া স্টেসান থেকে আমি তোমাকে আলাদা তুলে নেব। ব্যাস।”

“না রে বাবা, সেখানে এক প্রবলেম আছে। সুব্রত দা আমাদের সবার টিকিট কেটেছে একসাথে। আমরা সবাই মিলে হাওড়া কাল্কা মেলে করে কাল্কা যাচ্ছি।”

কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বললাম “ওকে ঠিক আছে, হিমাচলে কি কি জায়গা আছে সেটা একবার দেখতে হবে আমাকে।”

“আমি জায়গা জানতে চাই না, অভি, শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই আমি।”

ততখনে নুডলস আর সুপ দিয়ে যায় ওয়েটার, কাঁটা চামচে কিছু নুডুলস নিয়ে আমার মুখের মধ্যে পুরে দেয়। আমি বলি “আমি আর ছোটো নই পরী।”

আমার মুখের মধ্যে কাটা চামচ দিয়ে নুডুলস ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে “তুমি এখন আমার সেই ছোট্ট রাজকুমার।”

আমি নুডুলস চিবোতে চিবোতে বলি “আর তুমি আমার সুন্দরী মাসি।”

হেসে বলে “আচ্ছা এবারে বল, কি করে আমায় চুরি করছ?”

আমি মাথা চুলকে বলি “আমাকে ভাবতে দাও। আমার ওপরে বিশ্বাস আছে তোমার?” মাথা নাড়ায় পরী “হ্যাঁ।”

“ঠিক আছে আমি তোমার জন্য কাল্কা স্টেসানে উপেখা করে দাঁড়িয়ে থাকবো। তোমাকে ভেবে দেখতে হবে যে কি করে তুমি তোমার বান্ধবীদের কাছ থেকে ছাড়া পাবে। তারপরের প্লান, কোন প্লান নেই এখন পর্যন্ত।”

আমার গাল দুটিতে চিমটি কেটে নাড়িয়ে দিয়ে বলে “উফফফ এটা ভেবেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তুমি আমি একসাথে। আমার ছোট্ট সোনার রাজকুমার।”

আমি ওর চিবুককে আলতো করে আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলি “তোমার বান্ধবীরা কি জানে যে তুমি প্রেম করছ?”

“না সেটা ঠিক জানে না, তবে কিছু একটা আন্দাজ করেছে ওরা। তবে আমি যদি বলি যে আমি কাল্কা থেকে অন্য কারুর সাথে অন্য কোথাও যাবো, তাহলে ওর হয়তো জানতে চাইবে বাঁ দেখা করতে চাইবে কার সাথে আমি কোথায় যাচ্ছি।”

এত আচ্ছা মুশকিলে ফেলে দিল আমাকে আমার প্রেমিকা। আমি মাথা চুলকে ভেবে চিন্তে কূলকিনারা করতে পারছিনা যে কি করা যায়। আমি ওর কাঁধে ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করি “কিছু তো আইডিয়া দেবে।”

“যা বাবা, আমি রাস্তা দেখালাম এবারে তুমি কি করে নিয়ে যাবে সেটা তোমার ব্যাপার।”

হুম, বেশ প্যাঁচাল অবস্থা। আমি পরীকে জানালাম যে, জানুয়ারি মাসে হিমাচল প্রদেশে অনেক ঠাণ্ডা পড়বে, তার জন্য ওকে অনেক গরম জামাকাপড় নিতে হবে। ও আমাকে জানাল যে গরম জামা কাপড় ওর আছে সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি ওকে বললাম যে সাড়ীতে কাজ হবে না, যা ঠাণ্ডা পড়বে ওখানে। ও বলল যে ওর সাড়ী আর সালোয়ার ছাড়া আর কিছু পরেনা। ও জিন্স, প্যান্টস্* বা শর্টস পরেনা, তাই ও সালোয়ার নিয়ে যেতে পারে। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম যে তাই ঠিক।

নুডুলস খাওয়া শেষ। কথায় কথায় জানতে পারলাম যে সুব্রতর হানিমুন ভালো কেটেছে, খুব মজা করেছে দুজনে মিলে। ইন্দ্রানি মাসি বম্বে ফিরে গেছে, চব্বিশ বছরে প্রথম বার ইন্দ্রানি মাসি ওর সাথে ভালো ভাবে কথা বলেছে, ওকে বম্বে যেতে বলেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে ও যেতে চায় কিনা। ও মাথা নাড়িয়ে বলল, যে ও পুরানো কথা সব ভুলে শুধু এগিয়ে যেতে চায়। ও চায় ওর ছোটমার সাথে থাকতে, কলেজে পড়তে আর এম.এস.সি করে ছোটমার মতন স্কুল টিচার হতে।

রাস্তায় বেড়িয়ে পরি আমরা। পরী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বলে “এবারে আমাকে উঠতে হবে, না হলে বাড়ি পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

আমি বললাম “একটা গুডবাই কিস পাবো না?”

“না সোনা, আমি অত আধুনিকা নই যে শহরের মেয়েদের মতন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে তোমাকে চুমু খাবো।”

আমার দিকে চোখ টিপে ঠোঁটে একটা দুষ্টু মিষ্টি হাসি মাখিয়ে বলে “এই গেঁয়ো মেয়েকে ভালবেসেছ তাকে নিয়ে থাকতে হবে।”

বাস স্টান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেই সময়ে জিজ্ঞেস করি আমি “আমাকে বিশ্বাস কর তুমি?”

আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলে “হটাৎ এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছ কেন?”

“আমি কিছু একটা করব, যাতে আমাদের এই ট্রিপটা মনে থাকে।”

মিষ্টি হেসে বলে “সেটা তো আমি জানি। আমি তোমার জন্য কাল্কা স্টেসানে ওয়েট করব।”

বাস এসে পরে, বাসে উঠে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পরে। জানলা দিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকে। হাসি দেখে আমার মনের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হয়। পরী ডান হাতের তর্জনী, লাল ঠোঁটে ছুঁইয়ে আমার দিকে নাড়িয়ে একটা মিষ্টি চুম্বন ছুঁড়ে দেয়। বাস বেড়িয়ে যায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ না বাসটা আমার চোখের সামনে থেকে চলে গেল।

অজানার পানে ভ্রমন

কিছুদিন পরে আমার মনে হল যেন আমার চোখে কিছু একটা অসুবিধা হচ্ছে, দুরের জিনিস ঠিক ভাবে দেখতে পারিনা। ডাক্তার দেখান হল, আমার চোখের সমস্যা শুনে মা একটু চিন্তায় পরে গেলেন। নাকের ওপরে চড়ে বসল চশমা। প্রথম কয়েক দিন চশমা পরে বেশ অসুবিধা হয়েছিল, ধিরে ধিরে সেটা কেটে যায়। মনে হয় যেন ওটা আমার শরীরের একটা অঙ্গ।

আমাদের ভ্রমনের বিস্তারিত আয়োজন আমাকেই করতে হবে। অনেক কিছু ভাবতে হবে, বাবা মাকে কি বলব, টাকা কথা থেকে যোগাড় করব। স্কুলের এক জন সিনিয়র, সুপ্রতিমদা, দিল্লীতে বাড়ি। নয়ডাতে খুব বড় একটা আই টি কোম্পানিতে চাকরি করে। একদন তাকে ফোন করলাম। ফোন পেয়েই প্রথমে তো আমাকে গালাগালি দিতে শুরু করল। তারপরে জানালাম যে আমি হিমাচল যাচ্ছি ঘুরতে, আমার একটা গাড়ির ব্যাবস্থা করে দিতে হবে। সুপ্রতিমদা বলল যে আমি ওর টাটা সাফারি নিয়ে যেতে পারি। আমাকে মজা করে জিজ্ঞেস করল যে আমি কি একা যাচ্ছি না সাথে কেউ স্পেশাল কে নিয়ে যাচ্ছি। আমি হেসে জানালাম যে আমি আমার একজন স্পেশাল কে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছি। আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমার বাবা মা আমাদের প্রেমের ব্যাপারটা জানেন কি না। আমি বললাম যে মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি ওর। আমি বললাম যে দেখা হলে সব কিছু বিস্তারিত ভাবে জানাবো, কিন্তু গাড়ি আমার কালকা স্টেসানে চাই। ও বলল যে সেটা হচ্ছে না, আমাকে আগে দিল্লী যেতে হবে তারপরে আমার সব গল্প শুনবে তারপরে ও গাড়ি দেবে।

আমি হেসে বললাম যে “এটা কি ঠিক হচ্ছে সুপ্রতিমদা।”

“দেখ, অনেকদিন পরে দেখা হবে তোর সাথে। তোর গল্প আমি শুনব তারপরে তুই আমার গাড়ি পাবি।”

হুম, আর এক মুশকিলে পরা গেল। এবারে আমাকে ভেবে দেখতে হবে যে কি করে দিল্লী যাওয়া যায়। একদিন রাতে খাবার সময়ে আমি বাবা মাকে জানালাম যে আমি ঘুরতে যেতে চাই। আমি আগেও অনেক একা একা ঘুরে বেরিয়েছি। তাই অনুমতি পেটে বিশেষ বেগ পেতে হল না। বাবা জিজ্ঞেস করলেন যে আমি কোথায় যাবো। আমি বললাম আমি হিমাচল প্রদেশ ঘুরতে যাবো, তবে সিমলা, কুলু মানালির মতন জায়গায় নয়, এমন জায়গায় যেখানে লোকজন কম যায়। আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি একা যাচ্ছি না বন্ধুদের সাথে, আমি বললাম যে আমি একা যাবো। মিথ্যে কথা। আমি বললাম যে অনেক দিন ধরে আমি ঘুরতে যাইনি তাই একটা ব্রেক দরকার আমার। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে অনুমতি পাওয়া গেল। এবারে আসল সমস্যা কি করে পরী কে জানাই।

বাবা দমদম এয়ারপোর্টের এক উচ্চ পদস্থ ম্যানেজার তার সাথে বেশ ভ্রমন রসিক। আমার প্লেনের টিকিট কাটা হল, শনিবার সকালের, ঠিক যেরকম আমি আর পরী প্লান করেছিলাম। একদিন আমাকে হিমাচলের ম্যাপ এনে দেখিয়ে বললেন যে আমি কোথায় যাবার প্লান করছি। আমি বললাম এমন জায়গায় যেতে চাই যেখানে লোকজন বিশেষ যায়না। আমাকে ম্যাপের একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন যে আমি সাঙলা উপত্যকা যেতে পারি। জায়গাটা নাকি খুব সুন্দর আর দুর্গম। আমি যেহেতু একা তাই বিশেষ অসুবিধা হবে না। আমি কোনদিন নাম শুনিনি, চিতকুল বাঁ সাঙলা উপত্যকার। তবু আমি ম্যাপের দিকে ঝুঁকে একবার দেখে নেই জায়গাটা কোথায়। যেতে তো হবে পরীর সাথে, তাও দেবীর মন রেখে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যেখানে মানুষজন কম যায়।

এবারে আমাকে ভাবতে হবে যে পরীকে কি করে কালকা স্টেসান থেকে তোলা যায়। ওর বান্ধবীরা আমাকে দেখেছে, সেটাই সব থেকে বড় বাধা। তারপরে ভাবলাম, ওরা কেউ আমাকে চশমা পড়তে দেখেনি, এমন কি পরীও আমাকে চশমাতে দেখনি। ভালো হবে, যদি আরও সপ্তহা দুই দাড়ি না কামাই, তাহলে বেশ একটা ছদ্মবেশ ধারন করা যাবে যাতে করে ওরা আমাকে চিনতে পারবে না। মনের ভেতরে তো খুশীর জোয়ার বইছে। পিঠের ব্যাগ গছান শুরু করে দিলাম, জ্যাকেট, টর্চ, দস্তানা, টুপি, একদম যেন অ্যাডভেঞ্চারএর জন্য তৈরি আমি।

প্রমোদসফরে শুধু আমি আর পরী আর কেউ নয়। ভেবেই যেন গায়ে কাটা দিতে শুরু করে দেয়। আমরা পাড়ি দেব এক অচেনা অজানা জায়গায়, যেখানে আমাদের কেউ চেনে না, কেউ জানেনা। শুধু মাত্র পরী আর আমি। বাঁকা ভুরু, মিষ্টি লাল ঠোঁট, উন্নত সুগোল বক্ষ আমাকে কাছে টেনে নেবে, আমি পরীর মন প্রান ভরিয়ে দেব আমার ভালবাসা দিয়ে। এই রকম ভালবাসার কোন এক বাঁকে আমরা হয়তো সেই নদীতে ঝাঁপ দেব, বয়ে যাবো অনাবিল প্রেমের জোয়ারে। মনে মনে ভাবলাম যে ভেসে যাওয়ার পূর্বে কিছু সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন, তাই কয়েক প্যাকেট কন্ডম কোনে লুকিয়ে রাখলাম ব্যাগের মধ্যে।

অবশেষে এল সেই দিন যার জন্য আমি অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুনছিলাম। দাড়ি গোঁফ বাড়িয়ে ঠিক একটা বনমানুষের মতন দেখাচ্ছিল আমাকে। মা জিজ্ঞেস করলেন যে কিরে তুই দাড়ি না কেটে চললি কোথায়। আমি জানালাম যে দিল্লী নেমে সুপ্রতিমদার বাড়িতে দাড়ি কামিয়ে নেব। মনে মনে হাসি, আরে এত আমার ছদ্মবেশ না হলে কি করে প্রানের রানীকে চুরি করবো ওর বান্ধবীদের সামনে থেকে। প্রবল উত্তেজনায় বুকের পাঁজরে হৃদয়টা জোরে জোরে ধাক্কা মারছে। কতদিন পরে প্রেয়সীর সাথে হবে দেখা। বাবা মাকে একটা সাদা খাম দিয়ে বললেন যে এতে আট হাজার টাকা আছে আমার ঘোরার জন্য।
প্লেন ছাড়ল কোলকাতা। রবিবার ভোর বেলায় কালকা স্টেসানে পরী আমার জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকবে। সব থেকে বড় সমস্যা যে পরী জানেনা যে আমি প্লেনে যাবো, কোথায় যাবো কিছুই জানে না। শুধু বিশ্বাস করে দাঁড়িয়ে থাকবে আমার পরী, যে ওর ছোট্ট রাজকুমার ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্য ঠিক আসবে।

দিল্লী নামতেই দেখলাম সুপ্রতিমদা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমাকে দেখেই বলে উঠলো “তো, অনেক দিন পরে দেখা হল।”

আমাকে জিজ্ঞেস করল যে কি চলছে কার সাথে চলছে। পরীর সাথে আমার সম্পর্ক টা লুকিয়ে বললাম যে প্রেম করছি আর তাকে নিয়েই ঘুরতে যাচ্ছি। আমি শুধু এইটুকু জানালাম যে মা পরীকে দেখেছে তবে ভবিষ্যতে কিছু অসুবিধা হতে পারে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে। আমি বাড়ির সবার কথা জিজ্ঞেস করলাম, সবাই ভালো আছেন কি না। সুপ্রতিমদা দিল্লীর চিত্তরঞ্জন পার্কে থাকে, বিয়ে করেনি এখন পর্যন্ত। আমার চেয়ে বছর দু তিনের বড়।

আমি মজা করে বললাম “কি শুধু এফেয়ার করে কাটিয়ে দিবি নাকি।”

“আরে এখন তো শুধু টাইম পাশ করছি, সেটা তেও অনেক মজা আছে রে। সব কটা ওয়ান ডে ম্যাচ রে, টেস্ট খেলার পিচ পাচ্ছিনা খুঁজে।” কথা শুনে দুজনে হেসে ফেললাম।

আমাকে জিজ্ঞেস করল “যাচ্ছিস কোথায় তোরা।”

আমি বললাম “চিতকুল, সাঙলা ভ্যালিতে একটা ছোটো জায়গা।”

“কোথায় রে জায়গাটা কোনদিন নাম শুনিনি আমি। তুই ডালহৌসি বা মানালি যেতে পারতিস।”

আমি বললাম “পরীর বান্ধবীরা মানালি যাচ্ছে, আর আমার রানীর ইচ্ছে যে তাকে নিয়ে একদম খালি কোন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যেতে, যেখানে লোকজন কম যায়, যেখানে আমাদের কেউ চিনবে না।”

“হুম, বেশ রোম্যান্টিক”

গাড়িতে উঠলাম, সুপ্রতিমদার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। সুপ্রতিমদা বলল যে ওর ড্রাইভার, একজন মধ্যবয়স্ক লোক, নাম বল্বিন্দার আমদের সাথে যাবে। বল্বিন্দার বেশ খোশমেজাজি লোক, আমাকে দেখে হেসে বলল, কোন অসুবিধা হবে না।

সুপ্রতিমদা জানাল যে দিল্লী থেকে কালকা যেতে ঘন্টা ছয় সাত লেগে যাবে। শীতকাল সেই জন্য রাস্তায় কুয়াশা জমতে পারে, তাই আমাদের বিকেল বিকেল রওনা দেওয়া ভালো। ও আর বলল যে হাইওয়েতে ট্রাকের ভিড় হবে রাতের বেলা তাই সাবধানে গাড়ি চালাতে। আমরা যেখানে যাবো, সেখানে রক্ত জমিয়ে দেওয়ার মতন ঠাণ্ডা পড়বে তাই জিজ্ঞেস করল যে আমি পর্যাপ্ত গরম জামা কাপড় এনেছি কি না। আমি জানিয়ে দিলাম যে আমার কাছে জ্যাকেট আছে।

বিকেল ছ’টার সময়ে, সুপ্রতিমদাকে বিদায় জানিয়ে শুরু করলাম অজানার পানে যাত্রা। আমি বল্বিন্দার কে বললাম যে আমি গাড়ি চালাতে জানি, তাই এতটা রাস্তা একা একা গাড়ি না চালিয়ে আমি কিছুটা চালিয়ে নেব। বল্বিন্দার বলল ঠিক আছে, একবার গাড়ি দিল্লী থেকে বেড়িয়ে হাইওয়েতে পৌঁছে গেলে আমি গাড়ি চালাতে পারি। দিল্লীর ট্রাফিক, মাথা ঘুরে গেল আমার, শুধু মাত্র কুড়ি কিলোমিটার যেতে দু’ঘন্টা লেগে গেল।

গাড়ি সোনিপত ছাড়ার পরে বল্বিন্দার আমাকে গাড়ি চালাতে বলল। আমি জানালাম যে আমি পাহারে গাড়ি চালাতে হয়তো পারবো না। আমি ড্রাইভারের সিটে বসে, গাড়ি হুহু করে দৌড়ে চলেছে হাইওয়ের ওপর দিয়ে। সুপ্রমতিমদা আমাকে বলেছিল যে গাড়ির তেলের পয়সা আমাকে দিতে হবে, আমি সম্মতি জানিয়েছিলাম।

বল্বিন্দার আমাকে বলল “(হিন্দিতে) স্যার জি, আমার দু’টো খাম্বা চাই।”

খাম্বা, আমি বললাম সব হবে। বল্বিন্দার বলল যে পাঞ্জাবে মদের সস্তা, আমরা আম্বালাতে মদের বোতল কোনে নিতে পারবো। গাড়ি চালানর সাথে সাথে কথা বলতে বলতে বল্বিন্দার বেশ কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। ও জানে যে আমি আমার প্রেমিকার সাথে ঘুরতে যাচ্ছি।

আমাকে জিজ্ঞেস করে “স্যারজি, ভাবিজি কি করেন?”

আমি শুনে হেসে ফেললাম, আমার পরী ওর ভাবীজি। আমি বললাম যে, কলেজ পাশ করেছে সবে।

“ট্রেন কটায় কালকা পৌছবে?”

“সকাল চারটে নাগাদ কালকা পৌছবে, হাওড়া কালকা মেলে।”

শুনে হেসে ওঠে বল্বিন্দার “ও স্যারজি, কালকা মেল, ওত লেট করবে।”

“ট্রেন লেট করবে কি না জানিনা, তবে আমি কালকা চারটের আগেই পৌঁছাতে চাই।” পরী আসছে, এতদিন পরে দেখা হবে আমি চাইনা আমার জন্য এই ঠাণ্ডায় অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকুক।

ঠাণ্ডা, কুয়াশা ঘন রাত কেটে গাড়ি ছুটে চলেছে। পাশ দিয়ে ট্রাক দৌড়ে চলে যাচ্ছে পেছনে। আই জ্যাকেট বের করে গায়ে জড়িয়ে নেই। বল্বিন্দার বলল যে রাতের বেলায় এই রাস্তায় অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, তাই একটু সাবধানে চালাতে। টানা চালানর জন্য, কিছুক্ষণ পরে মাথাটা ঝিম ধরে যায়। বল্বিন্দার বলল যে কারনালে গাড়ি থামাতে। চা খেয়ে নিলে ঘুমের আবেশ কেটে যাবে। রাত দশটা নাগাদ, কারনালে থামলাম আমরা। চা খেয়ে, ঘাড়ে মুখে জলের ঝাপটা মেরে চাঙ্গা হয়ে নিলাম।

আবার যাত্রা শুরু, কুয়াশাটা যেন হটাৎ করে বেড়ে গেল। আমি গাড়ির গতি ধিরে করে চালাতে লাগলাম। আম্বলা পৌঁছানোর আগে বল্বিন্দার আমাকে বলল যে ফ্লাইওভার না নিয়ে পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে। ও নেমে দুটি মদের বোতল কিনতে চায়। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ আম্বালা পৌঁছে গেলাম, ধিরে ধিরে গাড়ি একটা মদের দকানের সামনে দাঁড় করালাম। বল্বিন্দার হাতে টাকা দিয়ে বললাম যে মদ কোনে আনতে। ও দুটি ওল্ড মঙ্ক রামের বোতল কিনে আনল, আমার পছন্দের পানীয়। খেতে পারবো কিনা জানিনা, কেননা সাথে পরী থাকবে।

বল্বিন্দার বলল যে আমরা যদি এখনি এখান থেকে যাত্রা শুরু করি তাহলে রাত দুটো নাগাদ পৌঁছে যাবো কালকা। ও বলল যে পিঞ্জর পর্যন্ত আমাকে গাড়ি চালাতে তারপরে ও চালিয়ে নিয়ে যাবে। আমি ওকে জানালাম যে আমি এইদিকে একদম নতুন, রাস্তাঘাট কিছু চিনি না, তবে হ্যাঁ আমার কাছে ম্যাপ আছে।

আম্বালার পরে এন এইচ এক ছেড়ে দিয়ে আমরা এন এইচ বাইশ ধরে চলতে শুরু করি। শীতের রাতের নিস্তধতা কে খান খান করে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। পিঞ্জরের পরে বাল্বিন্দার গাড়ি চালায়। বল্বিন্দার বলল যে পিঞ্জর থেকে কালকা বেশি দুরে নয়।

আমি পাশের সিটে বসে পেছনে মাথা হেলিয়ে বিশ্রাম নেই। কিছুক্ষণ পরে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখের সামনে শুধু মাত্র আমার প্রেয়সীর মিষ্টি মুখ খানি, দু’গালে টোল পরা হাসি। মাথার ভেতরে খালি এক চিন্তা, স্বপ্নের রাজকন্যের সাথে দেখা হবে কতদিন পরে। পকেট থেকে ওর দেওয়া রুমালটা বের করে মুখের ওপরে মেলে ধরি, বুক ভরে ওর গায়ের গন্ধ টেনে নেই নিজের ফুস্ফুসের ভেতরে। মনে হল যেন ওর ঠোঁট আমার চোয়াল আমার গালে বিচরন করছে। রুমালে সেই গন্ধ নেই তবে, প্রেমিকের হৃদয় প্রেমিকার দেওয়া সব কিছু থেকে সুবাস নেওয়ার চেষ্টা করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাজল কালো ডাগর দুটি নয়ন, ঠোঁটে মাখা মিষ্টি হাসি। গালে টোল পরে সেই হাসি টিকে আর বেশি সুন্দর মধুময় করে তোলে। ডান গালের ওপরে এল গুচ্ছ চুল সব সময়ে দুলতে থাকে, মাঝে মাঝে চোখের সামনে চলে আসে সেই গুচ্ছ। আলতো করে আঙ্গুল দিয়ে যখন সরিয়ে দেয় সেই চুলের গুচ্ছ, তখন মুখ খানি আর বেশি মিষ্টি দেখায়। কি করবে আমার সাথে? এত দিন পরে দেখা হবে আমাদের। এই দাড়ি গোঁফে যদি আমাকে চিনতে না পারে তাহলে তো আমি বড় মুশকিলে পরে যাবো। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরি ঠিক জানিনা।

“স্যারজি, ট্রেন এসে গেছে, উঠে পড়ুন।” বল্বিন্দার আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গায়।

আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সকাল হয়ে গেছে। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে আটটা বাজে। আমি বল্বিন্দার কে জিজ্ঞেস করলাম যে আমাকে জাগায় নি কেন। ও বলল যেহেতু আমি ঘুমচ্ছিলাম তাই আর আমাকে জাগায় নি। ও স্টেসানে দাঁড়িয়ে ছিল, ট্রেন লেট ছিল তাই সময় মতন ঘুম ভাঙ্গায়নি আমার। চোখে মুখে জলের ঝাপটা মেরে একটু ঘুম কাটিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম, এতদিন পরে দেখা পাবো, একটু তো ভদ্রস্ত হয়ে দেখা করতে হবে।

মাথায় একটা টুপি চড়িয়ে, প্লাটফর্মে ঢুকে দেখলাম যে পরী ওর বান্ধবীদের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। আমি চেয়ে দেখলাম যে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমাকে খুঁজতে চেষ্টা করছে। আমি মনে মনে হেসে ফেলি ওর অবস্থা দেখে। একটা সাদা রঙের লম্বা জ্যাকেট গায়ে চাপিয়েছে, তাতে যেন একটু মোটাসটা দেখাচ্ছে ওকে। চোখ মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রচণ্ড ক্লান্ত, চোখ দুটি লাল, মনে হয়না রাতে ঘুমিয়েছে।

আমি ধিরে ধিরে ওদের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, যেহেতু কেউ আমাকে চিনতে পারেনি তাই কারুর চোখ যায়না আমার দিকে। কিছুক্ষণ পরে আমার সাথে ওর চোখাচুখি হয়, আমি রুমাল বের করে ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসি। আমাকে দেখে, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। ঘুম পালিয়ে গেছে ওর চোখ থেকে। আমি ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি যে বুকের মাঝে এক উত্তাল তরঙ্গ কে সামলে রেখে আমার দিকে ধির পায়ে এগিয়ে আসছে। কাছে এসেই আমার বাঁ হাতটা জড়িয়ে ধরে বুকের ওপরে। পরীকে আমার দিকে ওইরকম ভাবে আস্তে দেখে বাকিরা আমাদের দিকে তাকায়।

আমি আমার আসল পরিচয় লুকিয়ে একটু গম্ভির গলায় বলি “আমি অর্জুন, ইন্দ্রানির হাসব্যান্ডের কাজিন ভাই। আমরা হয়তো আগে মিট করিনি” আমি হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন ভদ্রলকের সাথে হাত মেলাই “আপনাদের জার্নি কেমন গেল?”

পরীর দুই বান্ধবী ওর দিকে প্রশ্নসুচক চাহনি নিয়ে জিজ্ঞেস করে কে আমি। পরী হেসে বলে, যে ও আমার সাথে দেখা করার জন্য আর আমার সাথে ঘুরতে যাবার জন্য এখানে এসেছে। আমি ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারলাম যে পরী প্রানপন নিজের মনের অবস্থা টাকে দেখে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি ভরে হেসে যাচ্ছে।

পরী পরিচয় করিয়ে দিল ওর দুই বান্ধবীর সাথে, একজনের নামে কল্যাণী একজন রানী। দু’জনের গত বছর বিয়ে হয়েছে। কল্যানির বর দীপঙ্কর আর রানীর বর রামানুজ। বসিরহাটে ওদের পারিবারিক ব্যাবসা। ওরা সিমলা হয়ে কুলু মানালি ঘুরতে যাচ্ছে। কল্যাণী আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি পরীকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছি। আমি হেসে উত্তর দিলাম যে যেখানেই যাচ্ছি তার জন্য চিন্তা নেই, আমার পাশে ও ঠিক থাকবে।

কল্যাণী বলল “সারা রাত শুচিস্মিতা ঘুমোয়নি। আপনি ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন সেটা ও জানে না, তাই প্রবল উত্তেজনায় সারা রাত জেগে কাটিয়েছে। কত রোম্যান্টিক ব্যাপার স্যাপার আপনাদের, এক রকম অজানা অচেনা জায়গায় ঘুরতে যাওয়া। আপনারা আমাদের সাথেই তো বেড়াতে যেতে পারেন।”

রানী ও কল্যানির কথায় সায় দিয়ে বলে “হ্যাঁ, চলুন না আমাদের সাথে, সবাই মিলে বেশ মজা হবে।”

পরী দেখল যে ব্যাপারটা ঠিক হাতছারা হয়ে যাচ্ছে, তাই আমার হাত জড়িয়ে বলল “না না, ও নিশ্চয় কিছু প্লান করে এসেছে, সেটা মাটি হয়ে যাবে।” আমার হাতে চিমতি কেটে বলে “আমরা কি স্টেসানের বাইরে যাবো?”

আমি ওর ব্যাগটা হাতে নিয়ে সবাই মিলে প্লাটফর্ম থেকে বেড়িয়ে এলাম । বেড় হওয়া মাত্র, পরী আমার দিকে সহস্র প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে হেসে ফেলল, বলল যে দাড়ি গোঁফ নিয়ে এক অদ্ভুত ছদ্মবেশ ধারন করেছি যে ও নিজেই আমাকে চিনতে পারছিল না। আমি যদি ওর দেওয়া রুমাল না বের করতাম তাহলে হয়তো কাছেও আসত না আমার। জিজ্ঞেস করল যে আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমি বললাম যে আমরা, সাঙলা উপতক্যায় চিতকুল নামক একটা জায়গায় বেড়াত যাচ্ছি। কল্যাণী জানাল যে ওর আগে থেকেই সিমলা কুলু মানালির ট্রিপ বুক করে ফেলেছে না হলে আমাদের সাথে যেত। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যা বাবা, আমি যাবো আমার পরীর সাথে সেখানে তোমাদের কেন নিয়ে যাব। দীপঙ্কর আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমরা সিমলা হয়ে যাবো কি না, আমি বললাম যে আমরা ঠিক সিমলা হয়ে যাবো না, আমরা শিম্লার আগে কান্দাঘাট নামে একটা জায়গা থেকে বেকে যাবো। জিজ্ঞেস করল আমি এদিকে আগে এসেছি কি না, আমি জানালাম যে আমি আসিনি তবে আমি ম্যাপ খুব ভাল ভাবে দেখে নিয়েছি আর রাস্তা মুখস্থ করে নিয়েছি তাই আমাদের যেতে বিশেষ অসুবিধা হবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে ওরা ফিরবে কবে। দীপঙ্কর জানাল যে ওর পরের রবিবার ফিরবে। কল্যাণী পরীকে বলল যে “যেখানেই থাকিস, রবিবারের মধ্যে যেন কালকা ফিরে আসিস।”। আমি ওদের জানিয়ে দিলাম যে আমরা যেখানেই থাকবো, ঠিক রবিবারে পরীকে আমি কালকা নিয়ে আসবো।

আমি বল্বিন্দার কে ডেকে বললাম পরীর ব্যাগ গাড়িতে রাখতে। বল্বিন্দার পরীকে দেখে হাত জোর করে বলল “নমস্তে ভাবিজি।” পরী হিন্দি বিশেষ কিছু বোঝে না, তবে এইটুকু বুঝল যে ওকে ভাবিজি বলে ডেকেছে। পরী আমার দিকে একটু রেগে তাকাল, কেন ওকে ভাবিজি বলে ডাকা হয়েছে, সুন্দরীর মান হয়েছে। দীপঙ্কর আমার সাফারি দেখে বেশ চমকে গেল। আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কি করে কালকা পৌঁছেছি। আমি জানালাম যে আমি প্লেনে করে দিল্লী এসছি কাল সকাল বেলা সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে।

রানী পরী কে একটু ধাক্ক দিয়ে হেসে বলে “তুই তো ডুবে ডুবে জল খাওয়ার মেয়ে রে। অনেক ভাগ্যবতী রে তুই।”

ওদের বিদায় জানিয়ে আমরা গাড়িতে চড়লাম। গাড়ি চলতে লাগলো।

পরী আমার হাত জড়িয়ে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে যাচ্ছে সমানে “তুমি সাংঘাতিক সেজেছ তো, আমি একদম চিনতে পারিনি তোমাকে। ঐ চশমা টাকি নকল না আসল? এই দাড়ি গোঁফ, এই গুলো নকল?”

“আমাকে কথা বলতে দেবে না শুধু হেসে যাবে”

“না না বল বল” বলে আবার মুখ টিপে হাসতে শুরু করে দেয়।

আমি ওকে সবিস্তারে আমার ছদ্মবেশের কথা, ঘুরতে যাবার প্লান, সব কিছু জানালাম। আমার কথা শুনে হাসি আর থামেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা কান্দাঘাট থেকে ছোটো রাস্তা ধরলাম পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। এক পাশে উঁচু উঁচু পাইন, কেদার ঝাউএর বন, এক দিকে খাদ। ধিরে ধিরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে, পাহারের সর্পিল রাস্তা ধরে।

পরী আমার বাঁ হাতটি নিজের হাথের মধ্যে চেপে ধরে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখছে। অনেকক্ষণ পড়ে আমি আমার প্রেয়সীর রূপ বুক ভরে দেখতে থাকি, এক কথায়, যেন গিলছি ওকে দু’চোখ দিয়ে। কালো রঙের আঁটো সালোয়ার কামিজের ওপরে সাদা রঙের লম্বা জ্যাকেট পরা। ডান হাতের আঙ্গুলে দিয়ে ওর গাল আলতো করে ছুঁই আমি।

আমার দিকে ফিরে হেসে বলে পরী “উম… আমি কোনদিন পাহাড় দেখিনি। আমার মনে হচ্ছে যেন আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি, আমি চাইনা কেউ আমাকে আমার এই ঘুম থেকে উঠিয়ে দিক।”

“এই দেখো, আমি তোমার পাশে বসে, তুমি ঘুমিয়ে নও পরী, সব কিছু সত্যি।”

আমার কাঁধে গাল ঘষে পরী, আমি ওকে জড়িয়ে ধরে গালে আলতো করে চুমু খাই। একটু খানি রাগ দেখিয়ে হেসে বলে “আউচ, আমার লাগছে। এই দাড়ি গোঁফ নিয়ে একদম আমাকে চুমু খাবে না।”

“ওকে বাবা, এই দাড়ি গোঁফ আমি কেটে ফেলব, চিন্তা নেই।”

“উফ… আমি ভীষণ এক্সসাইটেড” আমার ডান হাত ওর বুকের ওপরে চেপে ধরে বলে “দেখো আমার বুক টা কেমন কাঁপছে।” আমি দুষ্টুমি করে ওর বুকের ওপরে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেই। মৃদু রেগে বলে “একদম দুষ্টু ছেলে তুমি। আমি একটু ফ্রেস হব।”

আমি ওকে বললাম যে চ্যায়েল এলে আমরা একটা রুম নিয়ে নেব সেখানে স্নান করে একটু রেস্ট নিয়ে আবার এগিয়ে যাবো।

চ্যায়েল পৌঁছে একটা রুম নিয়ে নিলাম। রুমে ঢুকে আমি পরীকে বললাম যে দেখো সময় তো খুব কম তাই একসাথে চান করে নেই। রেগে যায় আমার রমণী, চেঁচিয়ে বলে “আমি মেরে ফেলব এবারে তোমাকে।”

ফ্রেস হয়ে, চ্যায়েল থেকে বেড়িয়ে পড়ি আমরা। চারপাশে কুয়াশা কেটে গেছে। পরী একটা সাদা রঙের সালোয়ার পড়েছে, দেখতে একদম শিশিরে ভেজা পদ্ম ফুলের মতন। আমি দাড়ি গোঁফ কামিয়ে নিজের আসল চেহারা ধারন করে নিয়েছি, আমাকে না হলে কাছে আসতে দেবে না যে। বল্বিন্দার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিয়েছে, গাড়ি আবার পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে অজানা গন্তব্য স্থানের পানে।

এক সময়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল যে চিতকুল কত সময় লাগবে পৌঁছতে, আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে আমি ঠিক জানিনা। বল্বিন্দার উত্তর দিল যে আমরা যখন চ্যায়েলে দাঁড়িয়েছিলাম ও আসে পাশের লোকজন কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে যে চিতকুল পৌঁছতে আর আট থেকে দশ ঘন্টার মতন লাগবে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা হাইওয়ে ধরে ফেললাম, পাহাড়ি হাইওয়ে কিন্তু সঙ্কীর্ণ।

আমার কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে চলেছে, দুজনে চুপ করে বসে। ও দেখছে পাহাড়ের সৌন্দর্য আর আমি দেখছি আমার সুন্দরীকে। আমি বাঁহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বসে, ওর কোলে আমার ডান হাত, আমার হাতের আঙ্গুল নিয়ে আপনমনে খেলছে পরী। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা নারকান্ডা পাড় করে নিচে নামতে শুরু করি। নারকান্ডা পাড় করে বেশ কিছু দুর যাওয়ার পড়ে, দেখি রাস্তার বাঁ পাশ দিয়ে নদী বিয়ে চলেছে।

পাহাড়ি স্রোতস্বিনী দেখে পরী উতফুল্লে চেঁচিয়ে ওঠে “উফ কি সুন্দর পাহাড়ি নদী, এর নাম কি?”

মাথা চুলকে মনে করে বললাম “সাটলেজ নদী।”

“সাটলেজ মানে, বাঙ্গালয় শতদ্রু?”

আমি মাথা নারলাম “হ্যাঁ।” পরী জেদ ধরল গাড়ি থামাতে হবে, ও নেমে নদীর পাড়ে যাবে। আমি যত বুঝাই যে নদীর জল খুব ঠাণ্ডা, হাত কেটে বেড়িয়ে যাবে, কিছুতেই শোনে না মেয়ে।

আমার কথায় কোন কান দেয় না, বল্বিন্দার কে বলে গাড়ি দাঁড় করাতে। গাড়ি দাঁড়াতেই, দরজা খুলে এক লাফে নিচে নেমে যায় পরী।

আমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল “তুমি কি নামবে, না আমি নদী তে ঝাঁপ দেব?”

ঐ রকম সুন্দরীর কথা শুনে কোন পাষাণ হৃদয় একা একা বসে থাকতে পারে। অগত্যা আমাকে গাড়ি থেকে নামতে হল। আমাকে নামতে দেখে, রাস্তা ছেড়ে, নদীর পাড়ের দিকে নামতে শুরু করে দেয়। উঁচু নিচু, ছোটো বড় পাথরের ওপর দিয়ে বেশ সুন্দর ভঙ্গিমায় নেমে যায়।

ঝুঁকে পড়ে কনকনে ঠাণ্ডা নদীর জল ছুঁয়ে চিৎকার করে ওঠে “বাপরে কি ঠাণ্ডা, আঙ্গুল গুলো কেটে গেল মনে হচ্ছে।” আমি বললাম “সাবধানে যাও না হলে পড়ে যাবে।”
জলের ধারে গিয়ে আমার দিকে জল ছিটিয়ে বলে “তুমি না, কেমন যেন, একদম রোম্যান্টিক নও। তোমার সাথে একদম কথা বলতে নেই।” আমি বললাম যে আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে একটা নদী আছে। অবাক হয়ে যায় পরী জিজ্ঞেস করে সত্যি কি না, আমি বললাম হ্যাঁ।

অভিমানিনী একটু রেগে গিয়ে বলে “তো আমাকে আগে বলো নি কেন?”

আমি বললাম “সবকিছু আগে থেকে বলে দিলে তো মজা তাই মাঠে মারা যাবে।”

“তাহলে আমি একদম রেগে নেই, চল এবারে।” গাড়িতে চড়ার সময়ে আবার জিজ্ঞেস করে “কোথায় যাচ্ছি আমরা, জায়গার টার নাম কি?”

“ধুর বোকা মেয়ে। চিতকুল।”

গাড়ি চলতে শুরু করল, নদীর পাশে দিয়ে, একপাশে উঁচু পাহাড়, একপাশে বয়ে চলে শতদ্রু। গাড় নীল রঙের আকাশ যেন একটি বিশাল পর্দা কেউ ঝুলিয়ে রেখেছে মাথার ওপরে, সাদা তুলোর মতন মেঘের ছড়াছড়ি নিঈল আকাশের বুকে। পাহাড় গুলো সবুজ গাছে ঢাকা। কোন কোন পাহাড়ের ওপরে আপেলের বাগান দেখা যাচ্ছে, নদীর ওপরের পাহাড়ে ছোটো ছোটো গ্রাম যেন ছবিতে আঁকা। রামপুর পৌঁছে আমরা দুপুরের খাওয়া শেষ করি। খাওয়ার পরে আমার খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল।

সিগারেট বেড় করতেই আমার দিকে তাকিয়ে পরী ঝাঁজিয়ে উঠলো “তুমি নাকি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিলে?”

আমি কাতর স্বরে বলি “দেখ শুধু একটা খাবো। এই ঠাণ্ডায় ঠিক থাকা যাচ্ছে না।” আমি দেখলাম যে অভিমানিনী রাগ করে চুপচাপ গাড়িতে উঠে গেলেন, আমি তো প্রমাদ গুনলাম, না সিগারেট খাওয়াটা ঠিক হবে না।

মানিনীর মান ভাঙ্গানর জন্য বললাম “দেখ, রাগ করোনা, আমি কিন্তু সিগারেট খাই নি।”

রামপুর ছাড়ার পড়ে পরী বলল যে ওর ঘুম পাচ্ছে, আমি সিটের ডান দিকে সরে গেলাম। আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল, সিটের ওপরে পাগুটিয়ে শুয়ে পড়ল, আমার বাঁ হাত নিজের বুকের ওপরে জড়িয়ে ধরল। চোখ বন্ধ করা অপ্সরা, মুখের দিকে চেয়ে থাকি আমি। প্রথম বার আমি ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখছি, চুলের কিছু গুচ্ছ মুখের ওপরে চলে এসেছে। হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ভালো করে দেখি ওর মুখখানি, ঘুমন্ত অবস্থায় কত সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। আমি একটু ঝুঁকে পরে ওর গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেই, আমার ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে একটু নড়ে ওঠে। আমার হাত খানি জোর করে চেপে ধরে বুকের মাঝে, আমার উষ্ণতা টুকু শুষে নেয় কোমল বক্ষ।

রাস্তা বেশ জনবহুল, অনেক ট্রাক বাসের আনাগোনা। কিছুদুর যেতে জিওরি নামে একটি জায়গায় গাড়ি দাঁড় করায় বল্বিন্দার, বলল যে গাড়িতে তেল ভরতে হবে।

গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে পরীর ঘুম ভেঙে যায়, আমার দিকে তাকিয়ে বলে “কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি?”

আমি বললাম “বেশীক্ষণ ঘুময়নি তুমি”

“আমরা থামলাম কেন?”

“তেল ভরার জন্য।”

“আর কত দেরি পৌঁছতে?”

আমি পেট্রল পাম্পের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম যে জিওরি থেকে চিতকুল কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে। লোকটা আমায় জানাল যে আরও ঘন্টা চারেকের রস্তা বাকি। লোকটা আরও জানাল যে কারছাম ব্রিজের পরে রাস্তা খুব খারাপ। বল্বিন্দার আমাকে বলল যে ও রাস্তা জানে, কোন চিন্তা করতে বারণ করল আমাকে।

পরী হিন্দি বিশেষ ভালো করে বোঝেনা তাই আমাকে জিজ্ঞেস করে যে বল্বিন্দার কি বলল। আমি রাস্তার কথাটা চেপে গেলাম, জানালাম যে কোন কিছুর জন্য চিন্তা না করতে। ঘড়ির দিকে তাকালাম, আড়াইটে বাজে তখন, তারমানে চিতকুল পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। একে শীতকাল তায় আবার পাহাড়, এখানে রাত সমতলের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি নামে। জিওরি ছাড়ার কিছু পরেই পরী বলল যে ও আর ঘুমোতে চায় না, বাইরের দৃশ্য দেখবে। আমি বললাম ঠিক আছে। কিছু পরেই সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে। যখন আমরা কারছাম ব্রিজ পৌঁছই ততক্ষণে চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। কারছামে দেখলাম দুটি নদী একসাথে মিলেছে, একটির জল সবুজ একটির জল মাটির মতন ঘোলা।

নদীর সবুজ জল দেখে পরী অবাক হয়ে গেল, আমাকে জিজ্ঞেস করল “আমি কোনদিন নদীর সবুজ জল হয় দেখিনি। এখানে গাড়ি থামাবে, আমি নামবো।” আমি দেখলাম যে ওর বিপরীত কিছু না বলাটাই ভালো, তাই আমি বল্বিন্দার কে বললাম গাড়ি থামাতে।
গাড়ি থেকে নেমে সবুজ নদীর দিকে দেখিয়ে বলল “কত সুন্দর দেখতে। এই নদী টাকি চিতকুলে আছে?” আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে এই নদীটা চিতকুলের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ব্রিজ পেরিয়ে, সঙ্কীর্ণ পাথুরে রাস্তা ধরে এগিয়ে চলি। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে বাইরে, একদম হাড় কাঁপান বাতাস বিয়ে আসছে পাহাড়ের দিক থেকে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরি যাতে গায়ের গরমে একটু ভালো লাগে দু’জনার। কিছুক্ষণ পরে বল্বিন্দার গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে দেয়, রাস্তায় কুয়াশা নেমে বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভয় ভয় চোখে আমার দিকে তাকায় পরী, আমি ওকে আশস্ত করে বললাম চিন্তা করো না সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

আমার গালে হাত বুলিয়ে হেসে বলে “দুঃসাহসী ছেলে বটে তুমি। তুমি কি ভেবে আমাকে নিয়ে এইরকম একটা জনমানব শূন্য জায়গায় বেড়াতে নিয়ে এলে?”

আমি হেসে জবাব দিলাম “তুমি কাছে থাকতে আমি তো সারা পৃথিবীর সাথে লড়তে পারি।”

আমার গালে চুমু খেয়ে বলে “উম, আমার বীর ছোট্ট রাজকুমার।”

সাঙলা পের হতেই চারদিকে নেমে আসে ঘন অন্ধকার রাত। এবর খাবর রাস্তার ওপরে দিয়ে বল্বিন্দার বেশ ধির স্থির ভাবে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম কিছু অসুবিধা হচ্ছে কি না, আমাকে আশস্থ করে বলল যে ঠিক ভাবে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

পরীর চোখে মুখে উদ্বগের ছায়া ফুটে উঠেছে। আমি ওকে বললাম যে টেন্সান নিচ্ছে কেন। আমার কথা শুনে রেগে গেল পরী “তুমি একটা আস্ত পাগল, তোমার কোন বোধগম্য নেই। কেউ যদি আমাদের মেরে গভীর খাদে ফেলে দেয়, তাহলে কারুর কিছু করার থাকবে না। কেউ জানে না যে আমরা এখানে এসেছি। আমাদের এই রকম জায়গায় আসাই উচিৎ ছিলনা।” রেগে মেগে মুখ ঘুড়িয়ে জানালার বাইরে দেখতে থাকে, বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

আমি ওকে ঠাণ্ডা করার জন্য বললাম “কিছু হবে না, চুপ করো” তারপরে মজা করে বললাম “বাইরে অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছ কি?”

রেগে মাথা নাড়িয়ে বলল “তোমার সাথে কথা বলে কি হবে।”

এত চেষ্টা করে মান ভাঙ্গান যাচ্ছে না অভিমানিনীর, আমি একটু রেগেই যাই তখন। আমি কি করে জানবো যে জায়গাটা এই রকম হবে, আমি প্রথম বার এখানে এসেছি।
সাঙলা থেকে আর এক ঘন্টা পরে আমরা চিতকুল পৌঁছলাম, ঘড়িতে তখন রাত সাতটা বাজে। আমি পরীকে বললাম গাড়িতে বসে থাকতে, আমি নেমে হোটেল খুঁজতে গেলাম। গাড়ি থেকে নামতেই, চারদিকের পাহাড়ের থেকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে আমাকে প্রায় জমিয়ে ফেলল। চারদিক অন্ধকার, বাড়ি ঘরের কোন চিন্হ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা হোটেল দেখলাম। হোটেলে ঢুকে ম্যানেজার আমাদের দেখে বলল যে আমরা শুধু মাত্র দুটি প্রাণী এই হোটেলে, এই সময়টা টুরিস্ট সিসেন নয়। সাঙলা ছাড়ার পর থেকে সেই যে পরী চুপ ছিল, হোটেলে ঢোকা পর্যন্ত একদম ঠোঁটে কুলুপ এঁটে ছিল। চোখ মুখের অবস্থা দেখে তো আমার আত্মা রাম খাঁচা ছাড়া।

অপ্রত্যাশিত রজনী

হোটেলের রুমটা বেশ বড়, দু’দিকে মেঝে পর্যন্ত নেমে আশা কাঁচের জানালা। জানালার ওপরে ভারী পর্দা টাঙ্গানো। হোটেল বয় আমাদের ব্যাগ রুমে রেখে যাবার পরে আমি রুমের দরজা বন্ধ করে দেই। পরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে রুমটা কেমন, কোন কথা না বলে খালি মাথা নেড়ে উত্তর দিল ঠিক আছে। চেহারা হাবভাব দেখে বুঝতে পারলাম যে রাতে বিশাল একটা ঝড় বইবে।

পরী জ্যাকেটা খুলে ফেলেছে, চুপচাপ আমাদের ব্যাগ গুলো খুলে এক এক করে জামা কাপড় বার করে কাপবোর্ডে গুছিয়ে রাখছে। আমি একটা চেয়ার টেনে বসে দেখতে লাগলাম আমার প্রেয়সী কে। মেঘের মতন ঘন কালো চুল সারা পিঠের ওপরে ছড়ানো। পেছন থেকে পরীর দেহ অবায়াব যেন ঠিক আদি প্রাচিন বালির ঘড়ির মতন দেখতে লাগছে। কামিজের হাতা লম্বা। চওড়া কাঁধ দুপাশে বেঁকে নেমে এসেছে পাতলা কটিদেশ তারপরে ঢেউ খেলে বর্ধিত হয়েছে সুডৌল দুই পুরুষ্টু নিতম্বে। সালয়ারের নিচে মনে মনে দুই পেলব জঙ্ঘার ছবি এঁকে নিলাম। হাঁটুর নিচে সুন্দর মসৃণ পায়ের গুচ্ছের ছবি, এখন অসূর্যস্পেশ্যা নধর দেহখানি। হ্রদয়ের এক গভীর কোনে প্রবল আকাঙ্খা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরি আমার প্রান প্রেয়সী কে, নিজ বাহুবেষ্টনী মাঝে আবদ্ধ করে চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দেই ঐ দুটি গোলাপি গাল, মসৃণ গর্দান, সারা শরীর। থেকে থেকে চুড়ির আওয়াজে মনটা যেন মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। একমনে নিজের কাজ করে চলেছে পরী, আমি যে পেছনে বসে ওর দিকে তাকিয়ে ওর রূপ সুধা পান করছি সেদিকে হুঁশ নেই ওর।

মাঝে মাঝে গালের ওপরে নেচে ওঠে চুলের গুচ্ছ টিকে আঙ্গুল দিয়ে কানের পাশে সরিয়ে দেয়। আমি ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে উন্মাদ হয়ে যাবার যোগাড়। আমি উঠে ওর পেছনে দাঁড়িয়ে ওকে নিজের আলঙ্গনে আবদ্ধ করে দেই। ডান কাঁধের ওপর থেকে চুলের গুচ্ছ সরিয়ে দিয়ে কাঁধের ওপরে ছোট্ট করে একটি চুমু খাই। মসৃণ ত্বকের ওপরে আমার সিক্ত ঠোঁটের পরশ পেয়ে মৃদু কেঁপে ওঠে রমণী। ঘাড় ঘুড়িয়ে আমার দিকে শীতল চাহনি নিয়ে তাকায়। আমার এত উৎফুল্ল, উত্তেজনায় ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল ওর কঠিন কালো দুই চোখ।

আমার বাহুবন্ধনির মাঝে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শীতল কণ্ঠে বলে “বাথরুম যাবো আমি, ছাড়ো আমাকে।”

উত্তাল উমত্ত ঝঞ্ঝার পূর্বাভাস টের পাই আমি, আমার আলিঙ্গন পাশ হতে নিজেকে মুক্ত করে একটি ছোটো গোলাপি রঙের রাতের পোশাক আর ভারী উলের গাউন নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পরে। আমি বিছানার ওপরে বসে নিজের জামা কাপড় বদলে নেই। কিছুক্ষণ পরে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এসে আমাকে পরিস্কার হবার জন্য বাথরুমে ঢুকতে বলে।

আমি ওর শীতলতা দেখে না থাকতে পেরে জিজ্ঞেস করলাম “কি হয়েছে তোমার? এত চুপচাপ কেন? কথা বলবে না আমার সাথে?”

ভাবলেশ বিহীন কণ্ঠে বলে “তাড়াতাড়ি হাত পা ধুয়ে নাও। আমি কি ডিনারের অর্ডার করে দেব?”

“হ্যাঁ সেটা তো ঠিক আছে, কিন্তু তুমি কি আমার সাথে কথা বলবে না?”

আমাকে থেকে বাথরুমে ঢুকিয়ে দেয়। আমি হাতমুখ ধুয়ে বেড়িয়ে এসে দেখি পরী চুপচাপ একটা চেয়ার টেনে, একদিকের বিশাল একটা কাঁচের জানালার সামনে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। পায়ের ওপরে একটা পা দিয়ে, ডান হাতের ওপরে থুতনি রেখে ভাবহীন চোখে তাকিয়ে আছে বাইরে। বাইরে ঘুটঘুটে কালো আঁধার ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। পুরো ঘরের পরিবেশ বদলে গেছে এক অধভুত শীতল বাতাস বয়ে চলেছে, ঠাণ্ডার জন্য নয়, পরীর জন্য। সকাল বেলার দুরন্ত মেয়েটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে হোটেলবয় এসে আমাদের ডিনার দিয়ে গেল। খাবার সময়ে কোন কথা না বলে চুপ করে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। রাত যত গভীর হয়ে চলেছে, তত যেন পরীর রাগ বেড়ে চলেছে। আমি দেখলাম যে এই বরফ যদি না গলানো যায় তাহলে ভবিষ্যতে সাংঘাতিক রূপ ধারন করবে।

খাওয়ার পরে কোন কথা না বলে, গায়ের উলেন গাউন খুলে, চুপ করে বিছানায় উঠে লেপে ঢেকে মাথার দিকে দুটি বালসে ভর দিয়ে বসে। কামরার নিষ্প্রভ আলোয় ঠিক যেন এক অপ্সরা আমার বিছানার ওপরে নেমে এসেছে মনে হয়। সোনার কানের দুল দুটি চিকচিক করছে নরম আলোয়। আমার দিকে কঠিন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
আমি বিছানার পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম “অসুবিধা টাকি তোমার, কিছু বলবে আমাকে?”

ফোঁস করে ওঠে সুন্দরী “বাইরের দিকে দেখেছ? এক চিলতে আলো নেই কোথাও, কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে? দোকানপাট নেই, বাড়ি ঘরদোর নেই, রেস্টুরেন্ট নেই। লোকজন থাকে এইখানে? একটা টুরিস্ট পর্যন্ত নেই।”

“দেখ পরী তুমি চেয়েছিলে তোমাকে নিয়ে আমি কোথাও যাই। তোমার মতন আমিও প্রথম বার এসেছি এখানে। আমি কি করে জানবো?”

“শপিং করার মতন একটা দোকান নেই এখানে।”

“দোকান দিয়ে তুমি কি করবে?”

আমার কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে “কেন দোকান দিয়ে মানুষে কি করে? শপিং করব আবার কি। সবাই বেড়াতে গেলে শপিং করে।”

“তুমি এখানে শপিং করতে এসেছ” আমি একটু রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।

“আচ্ছা শপিং নয়, ঠিক আছে। কিন্তু কি আছে এখানে দেখার, বাইরে কিছু নেই, আর তুমি তো বলেছিলে যে এখানে নাকি একটা নদী আছে, কোথায় সেটা?”

“বাইরে অন্ধকার তাই তুমি দেখতে পাওনি।”

“ও, বাইরে অন্ধকার। এখানে আসার রাস্তা দেখেছ? রাস্তা, না রাস্তা নেই বললে চলে, শুধু পাথর ছাড়া কিছু ছিল? কি সাংঘাতিক রাস্তা।”

কথা শুনে আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারিনা। কপোত কপোতীর মাঝে তাদের প্রথম প্রেমালাপ থুড়ি দন্দযুদ্ধ আরম্ভ হল। চেঁচিয়ে উঠি আমি “আমি কি করে জানবো যে রাস্তা এত খারাপ হবে।”

“না তুমি সব জানতে আগে থেকে।”

“মাথা খারাপ করা কথা বোলোনা পরী।”

“কল্যাণী আর রানীর সাথেই ঘুরতে যাওয়া উচিৎ ছিল আমার। তোমার সাথে আসাই উচিৎ ছিলনা।”

“হ্যাঁ যেতে ওদের সাথে। আমার সাথে এসেছ কেন?”

চোখের কোল চিকচিক করে ওর “তুমি ভালো ভাবে জানো আমি কেন এসেছি তোমার সাথে, আর তুমি কিনা…”

“আমি কি, পরী… ?”

“বাইরে দেখ, কেমন একটা জায়গায় এনেছ যেখানে কোন লোকজন নেই। পুরো হোটেলে আমাদের ছাড়া একটা লোক নেই। আমাদের যদি কিছু হয় তখন কি হবে? কেউ জানেনা আমরা এখানে এসেছি…”

আমি চেঁচিয়ে উঠি “হাঁ ভগবান, কিছু হবে না আমাদের।”

কান্না জড়ানো গলায় বলে “আমি শুধু চেয়েছিলাম আমাদের প্রথম বেড়ান যেন আমার চিরদিন মনে থাকে, আর…” কেঁদে ফেলে পরী, আঙ্গুল দিয়ে চোখের কোল মোছে। আমি রেগে ছিলাম তাই ওর চোখের জলের কোন মুল্য না দিয়ে চেঁচিয়ে বলি “কুমিরের কান্না কাদবে না আমার সামনে।”

আমার দিকে তর্জনী উচিয়ে চিৎকার করে বলে “একদম আমার সাথে ওইরকম ভাবে কথা বলবে না তুমি। কাল সকালে আমাকে সিমলা দিয়ে আসবে। আমি জানি কল্যানিরা কোন হোটেলে উঠেছে।”

“ঠিক আছে কাল সকালে দিয়ে আসবো তোমাকে।”

আর কথা না বাড়িয়ে, ডান পাশ ফিরে জানালার দিকে মুখ করে শুয়ে পরে পরী। গলা পর্যন্ত টেনে নেয় লেপ। আমি দেখলাম যে থেকে থেকে পিঠের ওপরে মৃদু কম্পন নাড়িয়ে দিচ্ছে পরীকে। আমি বেশ বুঝতে পারলাম যে কাঁদতে শুরু করেছে। আমি নিজের কর্মের জন্য কপাল চাপড়াই।

আমি যথাসম্ভব গলা নিচু করে ওকে শান্ত করার জন্য বললাম “কেঁদো না, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”

কান্না ভেজা গলায় বলে “আমি জানি কেন যাচ্ছ, হ্যাঁ যাও, মর তুমি। তোমার সিগারেটের প্যাকেট গুলো আমি দেখেছি ব্যাগের ভেতরে। খাও আর মর।”

“আরে বাবা তুমি একটু চুপ করবে”

“আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও। আমি খুব ক্লান্ত আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও।”

আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছিল তখন, রাগের চোটে আমি সিগারেট আর লাইটার নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলাম। সিগারেট জ্বালিয়ে বুক ভরে ধোঁয়া নিয়ে ভাবলাম, এখুনি রুমের মধ্যে হল টাকি? আমি কি জানতাম আগে থেকে যে চিতকুল জায়গাটা এতটাই জনমানবশূন্য হতে পারে, আমিও এই জায়গায় প্রথম বার এসেছি, পরীও এই জায়গায় প্রথম বার এসেছে। আমার মাথা ঠাণ্ডা রাখা উচিৎ ছিল, পরীর ওপরে ঐরকম চিৎকার চেঁচামেচি করা উচিৎ ছিলনা আমার। অভিমন্যু তুমি হৃদয়হীন প্রাণী, তুমি তোমার শুচিস্মিতার ওপরে ঐ রকম ভাবে চিৎকার কেন করেছ। আমাদের এই ভ্রমন যাত্রা, বিষাদে পরিপূর্ণ। সবা প্রেমিক যুগল চায় তাদের প্রথম নিশাযাপন স্মরণীয় হোক, অভিমন্যু এই দুঃখ তোমাকে চির জীবন বহন করতে হবে। তুমি এই তপ্ত অবস্থার জন্য দায়ি, চাইলে তুমি হয়ত পারতে এই অবস্থার সামাল দিতে, কিন্তু সেটা না করে তুমি বাক বিতন্ডে লেগে গেলে। এই সব সহস্র কটু চিন্তায় মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে আমার। বাইরে প্রবল ঝড়ের আওউয়াজ শুনতে পাই, হয়তো বরফের ঝড় চলছে বাইরে। ঘরের ভেতরে ঝড়, ঘরের বাইরে ঝড়।

রুমে ঢুকে দেখলাম যে পরী ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ট্রাক সুটের জ্যাকেটটা খুলে, ওর পাশে লেপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। মাথা নিচু করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ঘুমন্ত অবস্থায় পরীকে খুব সুন্দরী দেখায়, মুখের ওপরে চুলের কয়েক গুচ্ছে নেমে এসে যেন চাঁদ কে ঢেকে দিয়েছে মেঘ। আমি আঙ্গুল দিয়ে চুলের গুচ্ছটি সরিয়ে সুন্দর মুখখানি ভালো ভাবে দেখার চেষ্টা করি। চোখের কোণ থেকে একটি সরু শুকনো জলের রেখা, নাকের ডগা পর্যন্ত বয়ে গেছে। দেখে খুব কষ্ট হয় মনে। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঐ জলে রেখা মুছে দিলাম আমি। ওর সুন্দর মুখ খানির ওপরে আমার উষ্ণ নিঃশ্বাস ঢেউ খেলে বেড়ায়, আমার নিঃশ্বাসের পরশ পেয়ে নড়ে ওঠে পরী। আলতো করে আমি ওর বাঁকা ভুরু ওপরে তর্জনী বুলাই। ঝুঁকে পড়ে আমি ওর গোলাপি গালে ঠোঁট দিয়ে আলতো করে চুমু খাই। গালে আমার ঠোঁটের পরশ পেয়ে কেঁপে ওঠে আবার।

(অসমাপ্ত)

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s