নিষিদ্ধ ভালবাসা – ০৩


খুঁজে পাওয়া ছোট্টবেলা

কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম সেটা মনে নেই। চোখ খোলে যখন মাথার পেছনে সজোরে এক থাপ্পর খাই। ঘুম ঘুম চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখি যে কে আমাকে চড়টা মারল। আমি দেখলাম যে আমি উঠানের মাটিতে পড়ে আছি, পায়ের কাছে মাটিতে সুব্রত পড়ে আছে। আমি ওপর দিকে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করি যে কে আমাকে চড়টা মারল, আমি অবাক হয়ে দেখি যে ইন্দ্রানি মাসি আমাদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে।

আমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন “শুয়োর গুলো এখানে শুয়ে? আর আমারা তোদের দু’জনকে সারা বাড়িতে হন্যে হয়ে খুঁজছি। তোদের কি কোন বোধ বুদ্ধি নেই?”
আমি সুব্রতর কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠিয়ে দিলাম, সুব্রত আর আমি দুজনেই উঠে পড়লাম মাটি থেকে। আমি কাতর চোখে ইন্দ্রানি মাসির দিকে চেয়ে বললাম “সরি মাসি। ভুল হয়ে গেছে, কাল রাতে একটু বেশি হয়ে গেছিল।”

চেয়ারের ওপরে মদের বোতল আর গ্লাসের দিকে ইন্দ্রানি মাসির চোখ পড়ে যায়, তাড়াতাড়ি করে চেয়ারের ওপরে নিজের শাল ফেলে দিয়ে ঢেকে দেয় গ্লাস আর বোতল। ঠিক সেই সময়ে পেছন থেকে অনেক গুলো পায়ের আওয়াজ পাই। মাসি সবাই কে বলে “এই ছেলে দুটো সারা রাত এই প্যান্ডেলে পড়ে ছিল।”

দিদা, মা, পরী, মৈথিলী সবাই আমাদের ওপর চোটপাট করতে শুরু করে দেয়। ইন্দ্রানি মাসি দেখলেন যে আমাদের অবস্থা খারাপ, তাই আমাদের বাঁচানোর জন্য ওদের আস্বস্থ করে বললেন যে অল্পবয়স্ক ছেলেরা সব, এখন রক্ত গরম তাই একটু মজা তো করবে। মৈথিলী সুব্রতকে টেনে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। মা আর দিদা আমাকে বেশ বকাঝকা করে চলে গেলেন। পরী আমার কাছেই দাঁড়িয়ে, ঘুম জড়ানো চোখে চেয়ে দেখলাম বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে, মনে হয় স্নান করে নিয়েছে। গা থেকে সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছে, সেই জুঁই ফুলের গন্ধ।

আমাকে টেনে নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে “এই ঠাণ্ডায়, ঠিক কি করছিলে বলত সারা রাত?”

“কিছু না, জাস্ট গল্প করছিলাম আমরা তারপরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম ঠিক জানিনা” আমি আড় চোখে ইন্দ্রানি মাসির দিকে চেয়ে দেখি, মাসি তখন ওখানে দাঁড়িয়ে। এক চাকর কে ডেকে বলে গ্লাস আর বোতল গুলো ফেলে দিতে, যাতে কেউ দেখতে না পায়।

বাড়িতে ঢোকা মাত্র বুঝতে পারলাম যে সবার চোখ আমার দিকে। আমি একটু অসস্তি তে পড়ে যাই। বিশেষ করে সুমন্ত মামা আর বাবা যেন আমাকে খেয়ে ফেলবে এমন ভাবে তাকিয়ে আমার দিকে।

পরী আমাকে টেনে নিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমার এলোমেলো চুল গুলো নিজের আঙ্গুল দিয়ে আঁচরে দেয়। ধিরে ধিরে আমি নিজের সম্বিৎ ফিরে পাই। স্নান সেরে নিয়েছে পরী, ঠিক যেন সদ্য শিশিরে ভেজা পদ্ম ফুলের মতন দেখাচ্ছে ওকে। ধবধবে সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে, তাতে রুপোলী সুতোর কাজ। ঘন কালো লম্বা চুল মাথার পেছনে হাত খোঁপা করে বাঁধা। সদ্য তোলা জুঁই ফুলের গন্ধে আমার মন ভরে ওঠে, আমি দু’হাতে ওর পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরি, ভুলে যাই যে দরজা খোলা আছে। কাতর গলায় বলি “আই অ্যাম সরি, পরী। কাল রাতে যা হয়েছিল তার জন্যে সত্যি আমি সরি।”

আমার চুল আঙ্গুল দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে “ঠিক আছে, দুষ্টু ছেলেরা এখন তো বদমাশি করবে। তাতে আমি রেগে নেই।”

“সত্যি রেগে নও তুমি? ওহ না, আমার সুইট পরী। দ্যাটস দ্যা রিসন আমার হার্ট চুরি করে নিয়েছ তুমি।”

“অনেক আদিখ্যেতা হয়েছে, আমার একটা কাজ করে দেবে?” বলে ঘুরে দাঁড়ায় “আমার সোনার হার টা লাগিয়ে দেবে?” হাতে মায়ের দেওয়া সোনার হার।

আমি ওর পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ি, হাত পেছনে নিয়ে ঘাড়ের ওপর থেকে খোঁপা টা সরিয়ে দেয়, আর তার সাথে সাথে ঘাড়ের মসৃণ ফর্সা ত্বক আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি দু’হাতে হার নিয়ে দাঁড়িয়ে, ভাবছি কি করে লাগাব আগে না চুমু খাবো আগে। আঙ্গুল গুলো কেঁপে উঠলো আমার, একটু ঝুঁকে আলতো করে ঘাড়ের ওপরে ঠোঁট ছুঁয়ে দেই আমি। ভেজা ঠোঁটের পরশ পেয়ে একটু কেঁপে ওঠে, মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে “আবার দুষ্টুমি হচ্ছে? তাড়াতাড়ি করে হার গলায় লাগিয়ে দাও কেউ এসে যাবার আগে।”

আমি হারে “এস” টা লাগিয়ে দিয়ে মরালীর ন্যায় গ্রীবায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম। বেড়াল ছানার মতন মেউ মেউ করে আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল। আমি ওর পাতলা কোমরে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি যাতে পালাতে না পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে রাতে কি পড়ছে, ও আমাকে জানাল যে ও এখন ঠিক করেনি রাতে কি ড্রেস পরবে।

আমি ওকে বললাম “তুমি যা পরবে তাতেই তোমাকে সুন্দরী দেখাবে। তুমি তো আমার পরী।” আমি অনুরোধ করি “এবারে প্লিস একটা ছোট্ট করে কিসি দাও।”

আমার নাকে আলতো করে নাক ঘষে আমাকে বাথরুমের দিকে ঠেলে দেয় “না এখন নয়। বাথরুমে ঢুকে স্নান করে এসো, গা থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে।”

ঠিক সেই সময়ে দরজায় কারুর পায়ের আওয়াজ শুনে আমরা সরে দাড়াই। ইন্দ্রানি মাসি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েন, পরী ইন্দ্রানি মাসির দিকে তাকিয়ে আমার গালে একটা চড় মেরে বলে “বাথরুমে ঢুকে তাড়াতাড়ি স্নান করে নাও।”

ইন্দ্রানি মাসি পরী কে বলে যে আমার মা ওকে খুঁজছে। কারন জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিলেন যে কারন ঠিক জানেনা। পরী আমাকে আর ইন্দ্রানি মাসিকে ঘরের মধ্যে ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। ঠিক বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ে, ডান হাতের তর্জনী ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেয়ে আমার দিকে নাড়িয়ে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেয়। ইন্দ্রানি মাসি যেহেতু দরজার দিক পিঠ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাই পরীর কান্ড কারখানা দেখতে পায়না। পরীর চলে যাবার পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন মাসি যে আমার মা বাবা, আমার এই মদ খাওয়ার কথা জানে কিনা। আমি বললাম পাগল নাকি, ওরা জানে না। আমি মাসি কে একটা বড় থ্যাঙ্কস জানালাম, সকাল বেলা আমাদের বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য। মাসি হেসে আমকে ধাক্কা দিয়ে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিতে।

আমি তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে পরি, স্নান সারার জন্য। পরী আমাদের সাথে আজ যাচ্ছেনা, তার মানে, পরীর সাথে আবার কবে দেখা হবে সেটা জানিনা। যতটা বেশি সময় ওর সাথে কাটানো যায় সেই চেষ্টা করব আমি। স্নান সেরে নিচে নেমে পরী অথবা মা কারুর দেখা পাইনা। একটু খারাপ লাগে আমার, কোথায় গেল? আমি এক’জন কে জিজ্ঞেস করলাম যে মাকে অথবা পরী কে দেখেছে কি না, উত্তর দিল না দেখেনি। আমি কি করব, কিছু বুঝে না পেয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলাম। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম যে দিদা বসে আছেন আর চন্দ্রানি মাসি কে কিছু বঝাচ্ছেন। আমি চুপ করে পাশে গিয়ে দাড়াই। ওনাদের কথাবার্তা শেষ হয়ে যাবার পরে দিদা কে জিজ্ঞেস করি যে মা আর পরী কোথায়, আমার মন বলছিল যে যেখানে মা থাকবেন সেখানে পরী থাকবে। আমি জানতাম যেহেতু পরী আমাদের সাথে যাচ্ছে না তাই ও চাইবে যত সম্ভব সময় ওর ছোটমার সাথে থাকতে। দিদা আমাকে জানালেন যে, পরী কে নিয়ে আমার বাবা মা শপিং করতে গেছেন। মা নাকি পরী কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে রাতে কি পড়ছে, পরী উত্তর দিয়েছিল যে ও হয়তো সালোয়ার অথবা কোন সাড়ী পরবে, তাই মা ওকে নতুন ড্রেস কিনে দেবার জন্য শপিং নিয়ে বেরিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে গ্রামে কোথায় দোকান যে শপিং করবে? দিদা বললেন যে ওরা বারাসাত গেছে। আমি ঘড়ির দিকে দেখি, দশ’টা বাজে, তার মানে ফিরতে ফিরতে চার পাঁচ ঘন্টা লেগে যাবে, মানে সেই বিকেল তিনটে তে ফিরবে। ধুর বাবা, কেন যে স্নান করতে ঢুকলাম আমি, না হলে আমিও যেতে পারতাম ওদের সঙ্গে। আমি পরীর ওপরে রেগে গেলাম, একবারের জন্য বলে গেলনা আমাকে?

আমি দিদার পাশে বসে পড়ি, দিদা আমাকে আমার ছেলেবেলার গল্প শোনাতে লাগলেন। এইখানে নাকি আমার জন্ম হয়েছিল, আমি নাকি খুব চঞ্চল ছিলাম। সারা বাড়ি হামাগুরি দিয়ে বেরাতাম আর পরী আমার পেছন পেছন ছুটে বেড়াত। এখানেই আমার বড় হওয়া। সুব্রত অনেক ছোটো ছিল তখন। বাড়ির পেছনে যে পুকুর আছে সেখানে আমাকে নিয়ে ছিপ দিয়ে মাছ ধরত সুব্রত। আমরা নাকি ছিপ দিয়ে মাছ ধরে আবার সেটা পুকুরে ছেড়ে দিতাম, সেটাই ছিল আমাদের ছোটবেলার খেলা। দিদা আমাকে বললেন চল তোকে কিছু দেখাতে চাই আমি।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়, গাড়ি থেকে কিছু মহিলা নামেন। আমরা কাউকে ঠিক চিনিনা তাই দিদা আমাকে নিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে বাড়ির পেছন দিকে নিয়ে এলেন। অনেক দিন মানে সতের বছর পড়ে আমি এদিকে আসছি। বাড়ির পেছনে ফলের বাগান, আম কাঁঠাল লিচু জামের গাছে ভর্তি। বাগান পেরিয়ে কিছু দুর যাবার পড়ে পুকুর দেখতে পাই। বিশাল পুকুর, জলে টলমল করছে।
আমাকে বললেন দিদা “তোর কিছু মনে নেই হয়ত।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম “না, কিছু মনে নেই আমার।”

আমার হাত ধরে পুকুরের এক কোনায় নিয়ে একটা আম গাছের নিচে দার করিয়ে বলেন যে গাছ টাকে ধর “তুই তখন বেশ ছোটো টুকুটুকু করে কথা বলিস, আমি সকালে পুজো দিয়ে উঠি, তুই আমার হাত ধরে টানতে টানতে এখানে নিয়ে আসিস। এখানে নিয়ে আমকে গাছ দেখাস, তুই এই গাছটা পুঁতে ছিলিস। চেয়ে দেখ, কত বড় হয়ে গেছে গাছটা।” আমার মাথায়, স্নেহ ভরা হাত বুলিয়ে বললেন “তুই কত বড় হয়ে গেছিস। আমার বাগানের সব থেকে মিষ্টি আমের গাছ এটা, আজও ঠিক ফল দেয়।” কথা শুনে আমার মনের ভেতর কেমন উদাস হয়ে যায়।

আমার দিকে অশ্রু ভরা নয়নে তাকিয়ে বলেন “আমার বয়স হয়েছে, তোর মায়ের ও অনেক বয়স হয়েছে। অনেক বেদনা নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন।” আম গাছের তলায় বসে পরলেন দিদা, সাথে আমাকেও পাশে বসতে বললেন “উলুপি, তোর মা, আমাদের জন্য অনেক করেছে না হলে হয়ত আমরা যেখানে আছি সেখানে থাকতাম না। আমাদের কিছু ভুল বোঝাবুঝির জন্য সব ছাড়াছারি হয়ে গেছে।”

আমি দিদা কে আসস্থ করার জন্য বললাম “আবার ওসব পুরানো কথা কেন উঠাচ্ছ তুমি, ছাড়ো ওসব কথা।”

কেঁদে ফেললেন দিদা আমার দিকে তাকিয়ে “একটি মাত্র মেয়ে, দুই মায়ের কোলে, শুধু মাত্র সময়ের ব্যাবধানে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তুই বুঝবিনা সেই কষ্ট।”

ঠিক সেই সময়ে দেখি ইন্দ্রানি মাসি আমাদের দিকে হন্তদন্ত করে হেঁটে আসছেন। আমরা অবাক হয়ে দেখি। দিদা মাসি কে জিজ্ঞেস করলেন যে কি হয়েছে? উল্টে মাসি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন যে আমরা এখানে কি করছি। দিদা বললেন যে আমাকে বাড়ি দেখাচ্ছিলেন আর আমার ছোটবেলার গল্প বলছিলেন। ইন্দ্রানি মাসি বললেন যে মৈথিলীর বাড়ি থেকে কিছু আত্মীয় সজ্জন এসেছে তারা দিদাকে খুঁজছে। ইন্দ্রানি মাসি সারা বাড়ি খোঁজেন তখন একজন জানান যে আমরা বাড়ির পেছনে বাগানে।

বাড়ি তে ঢুকতেই দিদাকে ঘিরে ধরে লোকজন, আত্মীয় সজ্জন। আমার খুব একা একা মনে হয়, কিছু যেন করার নেই।

নতুন নারীর আবির্ভাব

খুব একা একা লাগছিল, পরী কাছে নেই। এমন সময়ে দুষ্টু এসে জানাল যে সুব্রতর ঘরে আমার ডাক পড়েছে। সুব্রতর ঘরে ঢুকে দেখলাম এক নতুন কোন মেয়ে মৈথিলীর পাশে বসে। সুব্রত পরিচয় করিয়ে দিল মেয়েটার সাথে, মেয়েটা সুব্রতর শালি, মৈথিলীর খুড়তুতো বোন, অরুণিমা। অরুনিমা কলকাতায় থাকে, বিএ ফার্স্ট ইয়ার পড়ছে, দক্ষিণ কলকাতার কোন কলেজে। আমি মনে মনে হেসে উঠি, সুব্রতর প্রচেষ্টা দেখে, আমার সাথে অরুনিমার সাক্ষাৎ করানোর ঢঙ্গ দেখে মনে হল যে ও চায় আমি আর অরুনিমা… । অরুনিমার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, উনিশ বছর বয়স হবে হয়তো মেয়েটার। সবে যেন গোলাপের কুঁড়ি, বেশ সুন্দর করে প্রস্ফুটিত হবার অপেক্ষায়। আমার দিকে তাকিয়ে সৌজন্য সুলভ হাসে হাসে। আমি সুব্রতর কাঁধে হাত রেখে বললাম “ভায়া আমার শরীরটা ঠিক ভালো লাগছেনা, আমি এখন আসছি।”
আমি মৈথিলীর দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করি, আমাকে মাথা নিচু করতে দেখে ঘাবড়ে যায় মৈথিলী, জিজ্ঞেস করে কি করছি। আমি বলি “চূর্ণি, তোমাকে সত্যি সুন্দর দেখতে। তোমার সাথে আগে মিট করতে হত।”
লজ্জায় লাল হয়ে যায় মৈথিলী, আমার মুখে চূর্ণি নাম শুনে সুব্রতর দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। ওকে ঐ নামে সুব্রত ছাড়া আর কেউ ডাকে না। আমি সুব্রতর কাঁধে হাত রেখে আসস্থ করে বলি যে আমি মজা করছিলাম।
আমি ঘর থেকে বেড়িয়ে, নিচে নেমে এক কাপ কফি নিয়ে ছাদে উঠে যাই। ছাদে কেউ নেই, আমি এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকি, সূর্য মধ্য গগনে জ্বলজ্বল করছে। শীত কালিন রুদ্দুর বেশ মনোরম লাগছে। চোখ বন্ধ করে দুহাত মাথার ওপরে তুলে একটু আড়ামোড়া ভাঙ্গি।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে ভাবি পরীর কথা। কোথায় যাবে আমাদের সম্পর্কটা, কি হবে ভবিষ্যতে? সত্যি বলতে আমাদের মাঝে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই, মায়ের অনেক দুর সম্পর্কের বোন, পরী। সেটাই কি একমাত্র কারন হয়ে দাঁড়াবে আমাদের ভালবাসার মাঝে? কেন আমরা একে অপরকে ভালবাসতে পারিনা? যদি পারি তো বিয়ে কেন হতে পারেনা? শুধু কি এই জন্য যে ও আমার চেয়ে দু’বছরের বড় বলে? আমি নিজেকে বুঝিয়ে উঠতে পারিনা যে কেন আমাদের প্রেম নিষিদ্ধ। ও একটা মেয়ে আমি একটা ছেলে, আমরা দু’জনে রক্তে মাংসে গড়া মানুষ, আমাদের বুকের মাঝে একটা হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করে চলেছে। না ভালবাসা কখন নিষিদ্ধ হতে পারেনা। হয়তো এই সমাজ মেনে নেবে না ঠিক মতন, হয়তো দিদা বা আমার মা আমাদের ভালবাসা মেনে নেবেন না। কিন্তু প্রেম কি বলে কয়ে আসে? বিদ্যুতের ঝটকার মতন আসে, কে কার সাথে কোন সময়ে প্রেমে পরবে কি করে জানা যাবে, কেউ তো আর পাঁজি দেখে প্রেম করেনা। প্রেম তখন হয় যখন কেউ ব্যাস্ততার মধ্যেও তার মনের মানুষের কথা ভাবে, খালি সময়ে তো অনেকে অনেক কিছু ভাবে। নাড়ি বন্ধ হয় যখন মনের মানুষ কাছে থাকেনা। কারুর মিষ্টি ডাকে আমি সম্বিৎ ফিরে পাই “হাই, তোমাকে সবাই খুঁজছে নিচে। খেতে ডাকছে তোমাকে।”
আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি অরুনিমা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে।

আমি হেসে জিজ্ঞেস করলাম “আরে খাবার কথা তো আমি একদম ভুলে গেছিলাম। তো তোমাকে কে ডাকতে পাঠিয়েছে, তোমার জামাই বাবু না দিদি?”

উত্তর দিলো “দিদি তোমাকে ডাকতে পাঠিয়েছে খেতে যাবার জন্য।” নিচে নামার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল “তুমি কলকাতায় থাকো?”

“হ্যাঁ, আমি উত্তর কলকাতায় থাকি আর তুমি মনে হয় দক্ষিণ কোলকাতা?”

“হ্যাঁ, ঢাকুরিয়া।”

আমি চেয়ে দেখলাম ওর দিকে, মেয়েটার সাজার শৈলী বেশ সুন্দর। লাল রঙের সাড়ী পরেছে, ব্লাউসের পেছনে একটা গিঁঠ দিয়ে বাঁধা, খোলা পিঠ, বাঁকা নদীর মতন মেরুদণ্ড। গায়ের রঙ ফর্সা, পাতলা গড়ন।

আমাকে জিজ্ঞেস করল “তুমি ফাইনাল ইয়ারে?”

“হ্যাঁ”

“তারপর?”

“তারপর কি?”

“তারপর মানে, কলেজের পড়ে কি করবে? হাইয়ার স্টাডিস না জব।”

আমি মনে মনে ভাবি আমাকে নিয়ে এত প্রশ্ন কেন মেয়েটার। আমি উত্তর দিলাম “আমাকে চাকরি পেতে হবে। আমি একটা প্রাইভেট অরগানাইজেসানে কম্পিউটার কোর্স করছি।”

আমি ওকে ওর ভবিষ্যতের কথা জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিল যে ও চাকরি বাকরি করতে চায় না, ও জীবন খুব সাধারন ভাবে কাটাতে চায়। কলেজের পরে বিয়ে, ঘর সংসার। আমি মাথা নারি “হুম”। আমার পরীর একদম উল্টো। নিচে কওয়ার জায়গায় দেখলাম যে শুধু দুটো জায়গা খালি, অগত্যা ওর পাশেই খেতে বসতে হল।

আমাদের উল্টো দিকে সুব্রত আর মৈথিলী খেতে বসেছিল। খাবার সময়ে দেখলাম যে মৈথিলী সুব্রতর কানে কানে কিছু একটা বলল, সেই শুনে দু’জনে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। আমি নিশ্চিত যে মৈথিলী চাইছে আমার আর অরুনিমা মধ্যে কিছু একটা হোক। আমি ভেবে মনে মনে হেসে ফেলি, কত বোকামো করছ। খাবার সময়ে আমি চুপচাপ ছিলাম, বিশেষ কথা বলতে ভালো লাগছিল না আমার।

আমি এত চুপ দেখে সুব্রত আমাকে খাবার ওপরে একদিকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল যে কি হয়েছে। আমি আমার মনের অবস্থা লুকিয়ে বললাম যে দিদা আমাকে ছোটবেলার কথা শুনাল, সেই আমের গাছ দেখাল, এই সব দেখে আমার মন কেমন একটা হয়ে গেছিল তাই আমি চুপ করে ছিলাম।

সুব্রত আমাকে বলল “আরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এক কাজ কর, অরুনিমাকে নিয়ে বাগান দেখিয়ে নিয়ে এসো, ভালো লাগবে।” কানে কানে বলল “অরুনিমা একদম তোমার জন্য ফিট, সুন্দরী, স্মার্ট।”

আমি বাঁকা হাসি হেসে বলি “আরে না না, আমি ঠিক আছি। তুমি এরকম কেন করছ?”

“হুম, এত সুন্দরী মেয়ে, আমার কোন বন্ধু হলে তো হুমড়ি খেয়ে পরত আর তুমি কিনা এড়িয়ে যাচ্ছ। আমি নিজে থেকে আমার শালিকে তোমার কাছে পাঠাচ্ছি আর তুমি কিনা মানা করছ। তুমি ছাদে যাও, আমি একটু পরে পাঠিয়ে দেব।”

বিস্ময়ান্বিত সুন্দরী

আমি ছাদে উঠে, সবুজ মাঠের পারে দিগন্তের দিয়ে চেয়ে রই। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলতে শুরু করেছে। একটি সুন্দর দিনের অবসান। পরী এখন এলোনা, বুকের মাঝে ছিঁড়ে নেওয়ার এক ব্যাথা কঁকিয়ে ওঠে। এই তিন দিন, হাসি কান্নায় ভরা, কত মধুময় সময়ে একসাথে থাকা। আমি শুধু চেয়েছিলাম আর কিছু সময় ওর সাথে কাটানোর, সেটা আর ভাগ্যে জুটলো না। কিছুক্ষণ পরে বাড়ির সবাই সাজগোজে ব্যাস্ত হয়ে পরবে, বউভাতের জন্য মুখর হয়ে উঠবে বাড়ি। একে একে আত্মীয় সজ্জনের আনাগোনা শুরু হয়ে যাবে, চারদিক লোকে লোকারণ্য। আমি হয়তো আর ওর সাথে কিছু সময় একলা কাটাতে পারবোনা। সেটা ভেবেই মনের ভেতরটা নিঙরে কেঁদে ওঠে। এর মধ্যে কোন এক সময়ে, গভীর রাতে আমরা চলে যাবো। আমি ছাদের রেলিঙের ওপরে মাথা নিচু করে বসে পড়ি, নিজের ওপরে কুব রাগ হয়, কেন যে আমি সেই সময়ে স্নান করতে গেলাম। কেন আমি রাতে মদ খেতে গেলাম। আমি মাথা নিচু করে নিজের কপালে করাঘাত করি। দু’চোখের কোল বেয়ে জল বয়ে যায়। আমার হৃদয়টা যেন কাঁচ ভাঙ্গার মতন ঝনঝন করে সহস্র টুকরো হয়ে যায়।

আমার মনে হল কেউ যেন অনেক দুর হতে আমার নাম ধরে ডাকছে। মায়ের গলা শুনে সম্বিৎ ফিরে পাই, পেছনে তাকানর আগে চোখের জল মুছে নেই আমি। পেছনে তাকিয়ে দেখি মা ডাকছেন আমাকে, মায়ের পেছনে পরী। আমার বেদনা ভরা চেহারা দিকে তাকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে কি হয়েছে আমার। আমার অভিব্যাক্তি হীন চাহনি দেখে পরী সব বুঝে যায়। বুঝে যায় আমি কি ঝঞ্ঝার মধ্যে ছিলাম এই কয়েক ঘণ্টা। চোখে জল চলে আসে ওর, ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নেই পরী।

মা পৌঁছান মাত্র বাড়ির সবাই জিজ্ঞেস করছিল যে আমার কি হয়েছে, আমি নিরুত্তর। পরী আমার পাশে এসে মাকে বলে যে ও আমাকে নিয়ে নিচে যাবে।

আমি মাকে জিজ্ঞেস করি “আমাকে কেন শপিং করতে নিয়ে গেলেনা”। প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারল, যে প্রশ্নটা ঠিক মাকে করা হয়নি করা হয়েছে ওকে।

মা বললেন “পরীর জন্য নতুন ড্রেস কেনার ছিল তাই শপিংএ গেছিলাম আমরা, তুই তো কখন শপিংএ যেতে ভালবাসিস না তাই তোকে ডাকিনি। ও তোর জন্য কিছু একটা কিনেছে, তোর ড্রেসের সাথে মানাবে। কি পরবি আজ রাতে? ধুতি না সুট?”

পরী আমার কানে কানে বলে যে ও আমার জন্য একটা টাই কিনেছে, টাই আমি যেন সুট পরি। আমি মাকে বললাম যে আমি সুট পড়ব। মা আমাদের ছেড়ে নিচে নেমে যায়।

মা নিচে নেমে যেতেই, পরী আমার মুখখানি দুহাতে নিয়ে বলে “আমি জানি তোমার মনের অবস্থা। আমি সরি।” মাথা টেনে নিচে নামিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে “পাগল ছেলে একেবার, এখন বড় হয়নি। বড় হও, তুমি ভেঙ্গে পড়লে আমি কোথায় যাবো একবার ভেবে দেখছ?” আমার হাত ধরে নিচে টানতে টানতে বলে “এখন সেই বাচ্চা ছেলেটাই আছো। চল চোখ মোছ আর ড্রেস করে নাও তাড়াতাড়ি। তার পরে একটা বিশাল সারপ্রাইস দেবো তোমাকে।” আমি ওর দেওয়া রুমাল বের করে মুখ মুছে ওকে জিজ্ঞেস করি যে সারপ্রাইসটা কি। ও হেসে বলে যে, যদি বলে দেই তাহলে কি আর সারপ্রাইস থাকবে।

নিচে নেমে দেখলাম যে বাড়িতে বেশ সাজসাজ রব। আমাকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে পরি বলল তাড়াতাড়ি ড্রেস পরে নিতে। বিছানায় দেখলাম আমার ধূসর রঙের সুট পাট পাট করে রাখা। আর তার ওপরে এক নীল রঙের স্ট্রাইপ করা টাই রাখা। টাই দেখে আমার খুব পছন্দ হল, পরী জিজ্ঞেস করল যে টাই আমার পছন্দ কিনা। আমআর মনে হল পরীকে ওখানে জড়িয়ে ধরি, কিন্তু সেটা আর হলনা, মা চলে এলেন। পরীকে বললেন যে মৈথিলীর রুমে যেতে, ওকে সাজাতে বিউটিসিয়ান এসেছে। আমার দিকে চোরা চাহনিতে দেখে যেন বলল “নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করো।” বলেই দৌড়ে চলে গেল।
আমি সুট পরে নিচে নেমে গেলাম, সুব্রত আমাকে দেখে বলল “বস আজকেও আমাকে মাত করে দিয়েছ।” সুব্রত আজকে একটা কালো পাঞ্জাবী পরেছে তার ওপরে সোনালী সুতোর ভারী কাজ করা। দারুন দেখাচ্ছে সুব্রতকে, আজ ওর বউভাত।

আমি ওর পিঠ চাপড়ে বললাম “তো, আজকে তোমার বেড়াল মারা দিন আর তারপরে হানিমুনে গোয়া। আমি সত্যি থাঙ্ক ফুল যে আমাকে তোমরা তোমার বিয়েতে ডেকেছ।”
আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সুব্রত বলল “না, আমি ধন্য হয়ে গেছি তোমরা এসেছ বলে।”

“আর যাই হোক, এই তিন দিনে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলা, আমার পোঁতা আমের গাছ, পুকুর পারে মাছ ধরা আর সেই মাছ গুলো আবার পুকুরে ছেড়ে দেওয়া।”

হেসে বলে সুব্রত “হটাৎ করে কবি হয়ে গেলে কি করে। টেকনিক্যাল সায়েন্সের ছেলে।”
ঠিক সেই সময়ে অরুনিমা আমার কাছে এসে হেসে বলে “হাই, ড্যাসিং ম্যান। আজকে তো অনেক মেয়ের মাথা ঘুরে যাবে বলে মনে হচ্ছে।”

আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একটা হাল্কা গোলাপি রঙের সাড়ী পড়েছে। মাথা চুলে সুন্দর একটি খোঁপা বাঁধা। কাজল টানা চোখ, বেশ সুন্দরী লাগছে মেয়ে টাকে। সুব্রত আমার দিকে চোখ টিপে ইশারা করে অখান থেকে চলে যায়।

জিজ্ঞেস করে অরুনিমা “খাবার পরে কোথায় ছিলে তুমি? আমি সারা বাড়ি খুঁজছিলাম তোমাকে।”

যা বাবা, এ মেয়েটা দেখছি হাত ধুয়ে আমার পেছনে পরে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম “কেন খুঁজছিলে আমাকে?”

“এমনি, একা একা ভালো লাগছিল না বলে।”

“হাঁটবে আমার সাথে।”

মাথা নাড়িয়ে বলল “হ্যাঁ”

“মাঝে মাঝে ভিড় অনেক বোরিং মনে হয় তাই না।” উঠোনের ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকি দু’জনে। কিছু লোক আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখে। ইন্দ্রানি মাসি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে।

“তুমি বড় চুপচাপ। তুমি কি বরাবরি এইরকম?” অরুনিমা আমাকে জিজ্ঞেস করে।

“হ্যাঁ। আমি কম কথা বলতে ভালবাসি। কথা শুধু তাদের সাথে বলি যাদের সাথে মনের মিল হয়।”

“আমার মতন তাহলে। আমার কারুর সাথে বেশি কথা বলতে ভালো লাগেনা, কিছু লোক ছাড়া।”

আমি হেসে বললাম “যাক বাঁচালে, সেই কিছু লোকের মধ্যে আমি আছি তাহলে।”

কথায় কথায় জানতে পারলাম যে অরুনিমা এক ভাই এক বোন। ও বড়, ভাই ক্লাস এইটে পড়ে। বাবা সরকারি চাকুরিরত, রাইটার্স বিল্ডিঙ্গে চাকরি করেন। কথা বলতে বলতে আমরা অনেক দুর এগিয়ে গেছিলাম।

আমি ওকে বললাম যে এবারে আমাদে ফেরা উচিৎ। আমাকে বলল “আর একটু হাঁটবে, এমনি এমনি।”

দু’কদম আরও এগিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে অরুনিমা। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “একটা প্রশ্ন করতে পারি কি? খুবই পারসোনাল।”

আমি বললাম “ওকে জিজ্ঞেস করো।”

“তোমার কোন গার্ল ফ্রেন্ড নেই তাই না। না মানে এমনি জিজ্ঞেস করলাম।” এই প্রশ্ন টার সম্মুখীন হতে হবে সেটা আমি আগে থেকে আঁচ করেছিলাম।

আমি হেসে ফেলি, সত্যি কথা বলা যাবে না “কেন মনে হল তোমার?”

“তুমি যা কম কথা বল, তাই আমার মনে হল।”

“না, আমার সময় নেই ফুল টাইম গার্লফ্রেন্ড জোটানোর।” আমি হেসে উত্তর দেই।

ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি মাখিয়ে বলে “হুম, মানে স্মল টাইম এফেয়ার।”

“আরে না না, সে রকম কিছু নয়, অনেক বন্ধু আছে, তার মধ্যে মেয়ে বন্ধুও অনেক আছে।”

আমি আঁচ করলাম যে আমার কথা শুনে অরুনিমা স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ভেতরে ভেতরে তো আমি হেসে লুটোপুটি খাচ্ছি। আমি ওকে বললাম যে বাড়ি থেকে আমরা অনেক দুরে চলে এসেছি এনারে আমাদের ফেরা উচিৎ। আমার কথা শুনে সায় দিল অরুনিমা। আমার মনে ভেতরে একটা ভয় ছিল যে পরী যদি আমাদের দেখতে পায় তাহলে কি ভেবে বসবে। ফেরার পথে দু’জনেই চুপচাপ হেঁটে চলি।

বাড়ির কাছাকাছি এসে আমাকে বলে “আমরা দু’জনেই কোলকাতা থাকি। একদিন আমাদের বাড়ি আসবে?”

আমি মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেই যে যেতে পারি তোমাদের বাড়ি। আমার হাতের মধ্যে একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়, অরুনিমা। যাওয়ার আগে ইশারা করে বলে যায় যে কাগজে ওর বাড়ির ফোন নাম্বার লেখা, আমি যেন ফোন করি। ও চলে যাবার পরে, কাগজের টুকরোর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলি আমি। চুলে আঙ্গুল নিয়ে বুলিয়ে নেই।

পেছন থেকে কেউ আমার কাঁধে টোকা দেয়, ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি আমার প্রানপ্রিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসছে। ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি “কি চলছে… হ্যাঁ। কিছুর যেন গন্ধ পাচ্ছি মনে হল আমার।”

মাথা থেকে পা পর্যন্ত হাঁ করে চেয়ে থাকি, অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। দামী তুঁতে রঙের লেহেঙ্গা চোলি পড়েছে, সারা শরীরে রূপলি সুতোর ভারী কাজ করা। দুধে আলতা গায়ের রঙ, ত্বক যেন মক্মলের মতন চমক দিচ্ছে। হাসলে যেন মুক্ত ঝরে পড়ছে আর গালে টোল পড়ে হাসির মাধুর্য যেন দ্বিগুন হয়ে গেছে। কোমল কটিদেশ অনাবৃত, নরম পেট, নাভি উন্মচিত। রূপে সম্মোহনে আমি মাতোয়ারা হয়ে যাই। ওড়নাটা ঘাড়ের পেছন দিয়ে সামনের দিকে দু’পাশে ঝোলান। হৃদয়ের গভীরে প্রবল ইচ্ছে জাগে যে ওখানে হাঁটু গেড়ে বসে সুগভীর নাভির ওপরে একটি সিক্ত চুম্বন এঁকে দেই। কাজল কালো ডাগর নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে আমার প্রণয়িনী। আমি ওর বিমুগ্ধ সৌন্দর্য দেখে উন্মাদ প্রায় হয়ে উঠি। বাকরুদ্ধ হয়ে যাই আমি।

একবার চক্কর খেয়ে আমায় জিজ্ঞেস করে “কেমন দেখাচ্ছে আমাকে?”

আমি ওর সৌন্দর্য বিবরণ করার ভাষা খুঁজে পাই না, হাঁ করে তাকিয়ে বলি “আমার হার্ট অ্যাটাক এসে যাবে যে।”

ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে “অরুনিমার চেয়ে ভালো দেখতে লাগছি?”

ওর টোল পরা গালে আঙ্গুল দিয়ে টোকা মেরে বলি “হুম, আমি কি কোথাও কোন কিছু জ্বলার গন্ধ পাচ্ছি?”

আমার দিকে আঙ্গুল উচিয়ে বলে “ভুলেও ভাববে না অন্য কারুর কথা।” আমি চট করে ওর আঙ্গুলে ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে চুমু খেয়ে ফেলি।

মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে “বদমাশ ছেলে, সবাই দেখে ফেলবে যে।”

“সরি ম্যাডাম।”

“আমি একটু ছোটমার সাথে কথা বলব, আসবে আমার সাথে?”

আমার মা কাছেই দাঁড়িয়ে কয়েক জন আত্মীয়র সাথে কথা বলছিলেন। পরী দৌড়ে গিয়ে মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। মাকে দেখলাম পরীর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেতে, আমি ওখান থেকে সরে পরি।

ইন্দ্রানি মাসি আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন যে আমরা কখন বের হব। আমি উত্তর দিলাম যে আমি সঠিক জানিনা, মা বলতে পারবেন। মা আর পরীর দিকে একবার তাকিয়ে চোখের কোল মোছে মাসি।

“আজকে পরী কে সামলানো অনেক দুষ্কর হবে। আমি জানিনা তোরা চলে যাবার পড়ে কি হবে।” বলতে বলতে গলা ধরে আসে ইন্দ্রানি মাসির।

আমি ইন্দ্রানি মাসি কে নিয়ে একটা ঘরে ঢুকে পায়ের কাছে বসে ওনার দু’হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলি “তুমি না ওর বড়দি। তোমাকে কাঁদতে দেখলে ও আরও বেশি কেঁদে ফেলবে যে।”

দু’চোখের জল বাঁধ মানে না, ঝরে চলে অবিশ্রান্ত। কান্না ভেজান গলায় বলে ইন্দ্রানি মাসি “কোনদিন ভালো চোখে দেখিনি ওকে, চিরটা কাল শুধু বকে গেছি।”

আমি মাসি কে আসস্থ হবার জন্য বলি “চোখ মোছ, আমার জন্য অন্তত একবার হাসো। আজ তোমার ছোটো ভাইয়ের বউভাত।”

চোখ মুছে আমার কপালে ঠোঁট ঠেকিয়ে ধরা গলায় বলে “তুই সত্যি খুব ভালো ছেলে রে।”

ঠিক সেই সময়ে মেঘনা মামি ঘরের মধ্যে ঢুকে আমাদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে “কি হচ্ছে বাড়িতে, হ্যাঁ? ওদিকে উলুপিদি, শাশুড়ি মা, পরী তিন জনে কাঁদছে। এদিকে আবার তোমরা কান্না কাটি জুড়েছ। আমি সত্যি এবারে পাগল হয়ে যাবো। ঘর থেকে বের হও আর হ্যাঁ, ভুলেও যদি ওদিকের ঘরে ঢুকলে।”

আমি ইন্দ্রানিমাসি কে জানাই যে আমি পরীর খেয়াল রাখব। ঘর থেকে বেড়িয়ে দেখি, লোকজন খেতে বসতে শুরু করে দিয়েছে। রাত ক্রমে বেড়ে চলেছে। সময় যেন হাতের মুঠোর থেকে হুহু করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন এক মুঠো বালি, যত চেপে ধরি তত বেড়িয়ে যায়।

উঠানে নেমে পরী কে দেখলাম বেশ হাসি খুশী, কিছু লোকের সাথে কথা বলছে। আমার খুশী হলাম ওর ঠোঁটে হাসি দেখে, যাক বাঁচা গেছে। আমাকে দেখে কাছে ডাকে, ওর দুই বান্ধবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় আমায়। দু’জনেই বিবাহিতা। আমি পরীকে জিজ্ঞেস করি যে ঠিক আছে কি না। আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দেয় না।

আমি বললাম “বাবা মাকে এবারে খেতে ডাকা যাক।”

“এত তাড়াতাড়ি কেন, আমার সাথে খাবে না?” গলা একটু ধরে আসে ওর।
ঠিক সেই সময়ে, সুব্রত ডাক দেয় আমাদের, ফটো তলার জন্য।

বিদায় চুম্বন

ফটো তলার পরে আমি পরী কে জিজ্ঞেস করি, হাঁটবে একটু আমার সাথে?
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছন দিকে যায় আমরা। নিস্তব্ধ অন্ধকার বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে থাকি দু’জনে পাশা পাশি। আমাদের ঘিরে ঘন কালো রাত চারদিকে ছড়িয়ে। সুপ করে হাঁটতে থাকি আমরা, পরী আমার বাঁ হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। হাঁটতে হাঁটতে, পুকুর পাড়ের শেষ প্রান্তে আমার পোঁতা সেই আমের গাছের কাছে চলে যাই। অনুজ্বল আকাশের আলোয় পরী যেন ঠিক স্বর্গ থেকে নেমে আসা অপ্সরার মতন সুন্দরী দেখায়।

কিছুক্ষণ পড়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে “আজকেই তোমাকে চলে যেতে হবে?”

“হ্যাঁ।”

কান্না ভেজা কাতর স্বরে বলে “একটা রাত বেশি থাকতে পারনা, তুমি।”

“কালকে তুমি এই কথা আবার বলবে, সোনা।”

মাঝপথে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখে। গভীর আলঙ্গনে বদ্ধ করে নেই আমার প্রেয়সীর কোমল দেহ। বুক ভরে টেনে নেই প্রেয়সীর সুবাস।

আমার দিকে মাথা উঁচু করে বলে “এত দিন আমি কিছু জানতাম না। যে রকমি ছিলাম, ভালো ছিলাম। তুমি এলে আর……”

মুখের কথা ঠোঁটে থেকে যায়, চেপে ধরি ওর লাল অধর ওষ্ঠ নিজ অধরের মাঝে। প্রগার প্রেমের চুম্বনে বদ্ধ হয়ে যায় দু’জোড়া অধর। ধিরে ধিরে চোখ খোলে পরী, যেন পদ্ম পাপড়ি মেলে ধরেছে আমার সামনে। ঠোঁট ছেড়ে, কপালে চুমু খাই আমি। দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে। ধিরে ধিরে আমার ঠোঁট নেমে আসে ওর চোখের পাতার ওপরে, আলতো করে মসৃণ ত্বকের ওপরে ঠোঁট বুলিয়ে দেই। ঠোঁট নেমে আসে ওর কাঁধের ওপরে, আলতো করে কানের লতি ঠোঁটে নিয়ে চুষে দেই আমি। ঘাড়ের কোমল ত্বকের ওপরে নাক ঘষে দেই। আমার দু’হাত ওর খালি পিঠের ওপরে বিচরন করতে থাকে। শিরদাঁড়ার ওপর দিয়ে আঙ্গুলের দাগ কাটি। আমাদের নিঃশ্বাসে জ্বলে ওঠে আগুন। আমার মাথার চুলে দশ আঙ্গুলে আঁচড় কাটতে থাকে পরী। সুউন্নত কোমল বক্ষদ্বয় আমার প্রসস্থ বুকের ওপরে পিষ্ট হয়ে যায়। বক্ষের কোমল পরশে আমার সারা শরীরে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে যায় বারেবারে। নিঃশ্বাসে ফলে কোমল বক্ষদ্বয় ওঠানামা করে। প্রগাঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ কপোতীর নিঃশ্বাসে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। আমার ঠোঁট নেমে আসে পরীর উন্মচিত বক্ষে বিভাজনের ওপরে। সিক্ত ঠোঁটের পরশে কেঁপে ওঠে প্রানপ্রেয়সী। দু’হাতে আমার মাথা চেপে ধরে নিজ বক্ষ ওপরে। কামনার আগুনে দগ্ধ হয়ে যাই। রমণীর দেহের মিষ্টি সুবাস হৃদয়কে উন্মাদ করে তোলে।

আমার হাত’দুটি নেমে যায়, নিটোল নিতম্বের ওপরে। চেপে ধরি কোমল নিতম্ব, নিজ করতলে। পিষ্ট করে দেই নরম নারী মাংস। নিতম্বের ওপরে আমার কঠিন হাতের পরশ পেয়ে মৃদু শীৎকার করে ওঠে পরী। মাথা পেছনের দিকে হেলে গেছে, দু’চোখের পাতা দৃঢ় ভাবে বন্ধ।

আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি ওর সামনে। আলতো করে সিক্ত ঠোঁট ছুঁইয়ে দেই মধ্যচ্ছদার ওপরে। পরী আমার মাথা চেপে ধরে ছোট্ট সুগোল পেটের ওপরে। আমি ওর সুগভীর নাভির ওপরে আলতো করে চুমু খেয়ে নেই। ভিজে ঠোঁটের স্পর্শে যেন সহস্র মৃদু বিস্ফরনে কেঁপে ওঠে পরীর সর্পিল দেহখানি। আমি পরীর দেহের রোমকূপের উন্মচন জিবের ওপরে অনুভব করি। আমার জিব আলতো করে সুগভীর নাভির পাশে ঘুরতে থাকে।

মৃদু শীৎকার করে ওঠে প্রেয়সী “আমি পাগল হয়ে যাবো অভি। প্লিস, আর করোনা।” আমি ওর কাতর শীৎকারে কান না দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরি নাভির নিচের কোমল অংশে। নাভির নিচে চুমু খাওয়ার ফলে, প্রবল ভাবে কেঁপে ওঠে পরী। কোনক্রমে শীৎকার করে ওঠে “আর না, সোনা।” ধুপ করে বসে পড়ে আমার কোলের ওপরে, আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা গুঁজে দেয়। কানে কানে বলে “আমাকে আর বেশি পাগল করে দিওনা। আমি আর থাকতে পারছিনা।”

প্রগাড় আলঙ্গনে বদ্ধ হয়ে বসে থাকি দু’জনে অনেকক্ষণ ধরে। প্রেমঘন আলঙ্গনে ভাসিয়ে দেই আমাদের দুইপ্রান। শুধু মাত্র স্বাসের আওয়াজ ছাড়া কারুর মুখে কোন কথা নেই। জীবনের প্রথমবার আমার মনে হয় যে নিশ্চল নিস্তধতা কত মধুময় হতে পারে।
সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আমাদের চারপাশে। অনেকক্ষণ পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে “সোনা, এবারে আমাদের ফিরতে হবে। কেউ আমাদের খুঁজতে পারে।”

“হ্যাঁ কিন্তু আর একটু……”

“না সোনা আর নয়, এবারে ওঠ।” আমার দিকে মিষ্টি হেসে বলে।

বাড়ির দিকে ফিরে যাই আমরা, হাতে হাত ধরে। বাড়ি পৌঁছেই হাত ছেড়ে দেয় পরী, আমাকে বলে যে ওর বান্ধবীদের কাছে যাচ্ছে গল্প করতে।

অশ্রু ভরা প্রস্থান

সময় খুব দ্রুত অগ্রসর হয়ে চলেছে। বাবা খেতে যাওয়ার জন্য ডাক দিলেন। আমাদের খাবার জায়গা আলাদা করা হয়েছে, বাড়ির ভেতরে খাবার ঘরে। খাওয়ার সময়, ইন্দ্রানি মাসি আর চন্দ্রানি মাসি মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল যে আর একটা দিন থাকা যায়না। মা হেসে বললেন যে আগামি কাল, বাবার অফিস আর আমার কলেজ, তাই ফিরে যেতে হবে।

খাওয়ার পরে উঠানে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমি আর বাবা। বাব জিজ্ঞেস করলেন কেমন কাটল আমার একি কটা দিন, আমি বললাম যে খুব আনন্দ করেছি।
বাবা আমাকে বললেন “তিন তলার ঘরে তুই শিফট হয়ে যাস। পরীর জন্য আমাদের বেডরুমের পাশের ঘর ছেড়ে দিস।” আমি মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলাম ঠিক আছে।
ধিরে ধিরে রাত বাড়ছে, বিয়েবাড়ির লোকজন কমে এসেছে ক্রমে ক্রমে। বাবা বললেন যে গাড়ি তৈরি আমাদের এবারে বাড়ি ফিরতে হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে রাত প্রায় এগারটা বাজে। বাবা আমাকে বললেন যে বাড়ির ভেতর থেকে সুটকেস এনে গাড়িতে উঠাতে। মন খুব খারাপ লাগছিল, অনেক কিছু পাওয়া অনেক কিছু ছেড়ে যাওয়া। মাথা নিচু করে জুতোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে, আমি ভেতরে ঢুকে যাই।
খাবার ঘরে সবাই চুপ করে বসে। দিদা মায়ের হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে চুপ করে বসে আছেন। ইন্দ্রানি মাসি, মেঘনা মামি আর সবার চোখে জল। আমি সুব্রতর দিকে তাকালাম, ও আমাদের সুটকেস নিচে নামিয়ে চাকর দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছে। মৈথিলী তার নতুন শাশুড়ির পাশে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে প্রবোধ দেবার জন্য। কারুর মুখে কোন কথা নেই। আমি চারদিক তাকিয়ে পরী কে খুঁজতে চেষ্টা করি, কোথাও দেখা নেই আমার প্রেয়সীর।

ঠিক সেই সময়ে চন্দ্রানি মাসি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমাকে জানালেন যে পরী নিজের ঘরে দরজা বন্দ করে দিয়েছে, খুলছেনা।

দিদা মাকে অনুরোধ জানালেন আর একটা রাত থেকে যেতে। মা জানালেন যে যদি আগামি কাল যায়, তাহলে আগামি কাল রাতে ও এই কান্না কাটি শুরু হবে।
চন্দ্রানি মাসি মায়ের কাছে গিয়ে বলল যে, পরী ঘরের দরজা বন্দ করে নিজেকে আটকে দিয়েছে, দরজা খুলছে না। ইন্দ্রানি মাসি কে নিয়ে মা দৌড়ে গেলেন পরীর ঘরের দিকে, পেছন পেছন আমি আর সুব্রত। দুজনে দরজা ধাক্কাতে শুরু করে, কিন্তু ভেতর থেকে কোন আওউয়াজ আসে না। মা আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে।

মা বলেন “পরী, সোনা মা আমার দরজা খোল।”

কোন আওয়াজ নেই ভেতর থেকে। দিদা দৌড়ে আসেন পেছন পেছন। দিদাও দরজা ধাক্কা দিয়ে প্রায় কেঁদে ওঠেন “সোনা মা আমার দরজা খোল।”

দরজার ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ আসেনা। আমি আর সুব্রত মুখ চাওয়া চাওয়ি করি, প্রমাদ গুনতে শুরু করি, কিছু অঘটন না ঘটিয়ে ফেলে মেয়েটা। সুব্রত ছাদের দিকে দৌড়ে যায়, পেছনে আমি। ছাদে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, কার্নিশে নেমে ওর ঘরের জানালা দিয়ে ওর ঘরে ঢুকতে পারবো কিনা। আমি বললাম সব পারবো। আমার ভেতরটা তখন উন্মাদ হয়ে উঠেছিল, পরীর জন্য সব কিছু করতে রাজী আমি। ওর কিছু হয়ে গেলে, নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি। দু’জনে ছাদের কার্নিশ দিয়ে নেমে, জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঘরে ঢুকে, বিছানার ওপরে তাকিয়ে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। বিছানার ওপরে লুটিয়ে পরী, অনড় অচল। আমরা ভয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করি, কি হল মেয়েটার। পরী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সুব্রত দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। আমি পাশে বসে ওর মাথা আমার কোলে তুলে নিলাম, গালে থাপ্পর মেরে ওকে জাগানর চেষ্টা করি। চোখ খোলে না পরী। সবাই ছুটে এসে আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। দিদা আর মায়ের কান্না জুরে যায়। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন এক গ্লাস জল ধরায় আমাকে। আমি ওর মুখে চোখে জলের ছিটা মারতে, চোখ খোলে পরী।

চোখ খুলতেই মা ওর মাথা কোলে নিয়ে কাঁদতে শুরু করে, বলে “পাগলী মেয়ে, আর কোনদিন আমার মুখের সামনে দরজা বন্দ করবি না।”

নিচু স্বরে বলে “আর একটা দিন থেকে যাও।”

“সোনা মা আমার, তুই বড় হয়ে গেছিস, তুই সব বুঝিস তো। একটু হাস মা আমার।”
আমি সুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললাম, হয়েছে অনেক, বাইরে চলো। আবার একবার কান্নার রোলে বাড়িটা কেঁদে ওঠে। নিচে নেমে দেখি, মৈথিলী চুপ করে বসে আছে ওর কিছু আত্মীয় সজ্জনের সাথে। কিছু পরে সবাই আমাদের বিদায় জানাতে উঠানে আসে। পরী তখন পর্যন্ত মাকে আঁকড়ে ধরে।

মৈথিলী আমার দিকে উঠে এলো, আমি সুব্রত আর মৈথিলী কে জড়িয়ে ধরে বললাম “হুম, চূর্ণীকে ভালো ভাবে রাখবে আর এঞ্জয় কর হানিমুন।” কথা শুনে দু’জনে হেসে ফেলে।

অশ্রু ভরা নয়নে বিদায়। সবার চোখে জল, মা কাঁদছেন, দিদার চোখে জল। মাকে দেখে মনে হল যেন মায়ের হৃদয়টা কেউ খুবলে নিয়েছে। বাবা মাকে ধরে গাড়িতে উঠায়।
আমি নিচু হয়ে দিদার পা ছুঁয়ে প্রনাম করি, তারপরে নিচু হয়ে ইন্দ্রানি মাসির পা ছুঁতে যাই। মাসি আমার কপালে চুমু খেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। আমি পরীর দিকে তাকাই, আমার দু’চোখ জ্বালা করে ওঠে, জল ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারিনা আমি, পুরুষ মানুষ যে, সেটাই তো সব থেকে বড় বিড়ম্বনা। পরী আমার দিকে অশ্রু ভরা নয়নে তাকিয়ে, চোখ দুটি জবা ফুলের মতন লাল। মৈথিলী ওকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি শেষ বারের মতন সবার দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পরি।
কনকনে ঠাণ্ডার রাত। নিশুতি রাতে স্তব্ধতা ভেঙে আমাদের গাড়ি স্টার্ট নেয়। সামনের সিটে বসে আমি, গাড়ির মধ্যে এক অদ্ভুত ঠাণ্ডা নিস্তব্ধতায় ভরা। কারুর মুখে কোন কথা নেই। আঁধার রাতের কালো পর্দা কেটে গাড়ি এগিয়ে চলে আমাদের গন্তব্য স্থলের দিকে। চোখ বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকি আমি। আমার বন্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠে, পরীর ডাগর কালো জলে ভরা চোখ দুটি। লাল ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে, যেন আমাকে বলতে চায় যে, প্রত্যেক হৃদয় কম্পনের সাথে আমার অনুপস্থিতি ওকে তাড়িয়ে বেড়াবে। আমার ভেতরটা পরীর চোখের জলে ভিজে যায়।

(পর্ব ০৩ সমাপ্ত)

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s