লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ১০


প্রশ্নের সম্মুখীন

ডিসেম্বরে দিল্লী থেকে চলে আসার পরে, বন্দনা রাত গুলো অনেক বড় মনে হত। খালি মনে হত যেন ছুটে যায় স্যামন্তকের কাছে। আসার দিন মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল, সারা দিন স্যামন্তককে জড়িয়ে ধরে বসেছিল, থেকে থেকে মনে হচ্ছিল যেন বিকেল কখন না আসে। কিন্তু সময় পেড়িয়ে যায়, চলে আসতে হয় ওকে। একটু কান্না পেয়েছিল ওর তবে কাঁদে নি। স্যামন্তক কাঁদতে বারণ করেছিল, বলেছিল যে রোজ দিন ফোন করবে।

সকালে বিকেল ফোনে কথা না বললে যেন দিনটা ঠিক মতন কাটে না আর। দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস কেটে যায়। পুবালী ইতিমধ্যে ফোনে জানিয়েছে যে স্যামন্তক আর পুবালী এপ্রিলে কোলকাতা আসছে, পয়লা বৈশাখ কলকাতায় কাটাবে, সিতাভ্র কাজের চাপে আসতে পারবে না।

ঠিক যাবার আগের রাতে স্যামন্তক জিজ্ঞেস করে পুবালীকে “এই দিদি, এবারে তো বাড়ি যাচ্ছি। আমাদের কথা কিছু বলবি নাকি বাড়িতে?”

একমনে টিভি দেখছিল পুবালী, মাথা ঘুড়িয়ে দেখে যে পেছনে স্যামন্তক দাঁড়িয়ে “দেখা যাক, কিছু তো আস্তে আস্তে হিন্ট দিতে হবে তবে না বুঝতে পারবো যে মা কাকিমার মনের কথা। তবে তুই চিন্তা করিস না, সব ঠিক করে দেব।”

“হ্যাঁ তুই তো মা অন্নপূর্ণা আমার।” হেসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে স্যামন্তক।

“ব্যাগ গুছানো হয়ে গেছে তোর, বন্দনার জন্য কিছু কিনেছিস?”

“হ্যাঁ রে বাবা কিনেছি।”

“বাঃ বা আমাকে তো দেখালি না।”

“সারপ্রাইস, তবে বেশি কিছু না, ছোট্ট একটা সোনার আংটি।” বলে পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করে দিদিকে দেখায়।

বাক্স খুলে আঙ্গুলে আংটিটা নাড়িয়ে হেসে ফেলে পুবালী “হাঁটু গেড়ে হাতে পড়িয়ে দিবি নাকি। আর পারি না।”

সিতাভ্র আসতে পারেনি, অফিসের কাজের চাপে ছুটি পায়নি। পুবালী আর স্যামন্তক কোলকাতা এল এপ্রিলে, পয়লা বৈশাখে। অনেক দিন পরে ছেলে এসেছে, তাই বাড়ি বেশ জমজমাট। সোনারপুর থেকে বড়দি একদিন আগেই কাকুর বাড়ি দমদমে চলে এসেছে। এখানে দু’দিন থেকে পুবালী দুর্গাপুর চলে যাবে। স্যামন্তক থাকবে দিন চারেক তারপরে দিন দুয়েকের জন্য দুর্গাপুর তার পরে আবার কোলকাতা এসে ফিরে যাওয়া নিজেদের কর্মস্থল, দিল্লী।

বাড়ি পৌঁছে রাতের বেলা ফোন করেছিল বন্দনা কে, বন্দনা বেশ খুশী, কাল দেখা করবে স্যামন্তক। কি পরে যাবে কি করবে, কিছুই যেন ঠিক মতন ভেবে পাচ্ছে না। ওদিকে মা বলে রেখেছে যে স্যামন্তক এলে যেন একদিন বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

ভোরবেলা ফোন করে স্যামন্তক “শোনো আমি এই ব্রেক ফাস্ট করে বেড়িয়ে যাবো, তোমাকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নেব।”

“আরে না, মা বলেছেন আজ দুপুরে তুমি আমার বাড়িতে খাবে।”

“বাপরে, তাহলে হয়েছে। আচ্ছা দেখা যাবে খানে।”

“না না, তুমি সোজা আমার বাড়ি চলে এসো, মায়ের সাথে একবার দেখা করে যাও তারপরে আমরা না হয় বেড়াতে বের হব।”

“ওকে অ্যাজ ইউ সাজেস্ট। আই কান্ট ডিসঅবে মাই হার্ট, রাইট।”

“উম্মম…” ফোনের রিসিভারে চুমু খেয়ে দেয়।

সকাল বেলা বের হবার আগে মা জিজ্ঞেস করলেন “এই তো এলি কাল এর মধ্যে আবার কোথায় বের হচ্ছিস তুই?”

দিদির দিকে তাকায়, পাশে সবাই বসে কি বলবে কিছু মাথায় আসছে না স্যামন্তকের। পুবালী বলল “ওকে আমি একটু কাজে পাঠাচ্ছি, আসতে দেরি হবে ওর।” তারপরে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলে “সাবধানে যাস আর কাজটা ঠিক করে আসিস।”

মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয়, চেষ্টা করবে, বেড়িয়ে পরে স্যামন্তক। যাই হোক না কেন, আজকেই আংটি টা দেবে আর দিদি যা বলেছে সেটা বলবে। বালিগঞ্জফাঁড়ী নেমে হেঁটে চলে হাজরা রোড ধরে, কিছুটা গেলে বন্দনার বাড়ি। নিচে দাঁড়িয়ে ফোন করে “আমি এসে গেছি, তুমি কি নিচে আসবে না আমি ওপরে যাবো।”

আওয়াজ শুনে যেন ঘরের মধ্যে পা থাকে না বন্দনার “এই দাঁড়াও, আমি এখুনি আসছি।” ফোন টাকে একদম ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসে বলে “তোমাকে খুউউউব দেখতে ইচ্ছে করছে গো!!”

“ওকে বাবা, আমি নিচেই আছি, এসো তারপরে একসাথে ওপরে যাবো।”

বন্দনার লাফালাফি দেখে ওর মা হেসে দেন, বলেন “দেখিস সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় যেন পা হরকে পরে যাস না।” এক লাফে প্রায় দু’তিন সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে নিচে নেমে আসে বন্দনা। নিচে নেমে দেখে স্যামন্তক বারবার ঘড়ি দেখছে আর সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবে “যাক বাবা, শুধু আমি না, তাহলে।”

স্যামন্তক দেখে বন্দনা এক রকম প্রায় ছুটে আসার মতন, আসতে করে এগিয়ে গিয়ে হাত দেখিয়ে বলে “আছি তো আমি।” চারদিকে রাস্তার লোকজন দেখছে। একটু নিরিবিলি হলে বন্দনাকে কোলে তুলে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খেয়ে নিত, কিন্তু এটা আমেরিকা নয় এটা যে বঙ্গভূমি।

স্যামন্তকের বাঁ হাত নিজের বাহুপাসে নিয়ে বুকের ওপরে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে, জনসমক্ষে এইটুকু তার ভালবাসার অধিকার আছে। মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে “মিসড মি?”

“হেল লট।” বন্দনার দিকে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তক। ওর দেহ থেকে নির্গত বেশ একটি মিষ্টি সুবাস ওর নাকে লাগছে আর মনের ভেতর টাকে কেমন ছিন্ন ভিন্ন করে তুলছে। কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে “গায়ে কি লাগিয়েছ, গন্ধে যে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।”

“হ্যাঁ, রাস্তার মধ্যে এবার কিছু করে বস না, তোমার ওপরে এক পয়সার ভরসা নেই আমার।” স্যামন্তকের বাজুতে আলতো করে ঠোঁট ঘষে বলে।

ঘরে ঢুকে, বন্দনার মাকে দেখে পায় হাত দিয়ে প্রনাম করে স্যামন্তক। বন্দনার মা বেশ খুশী, ছেলেটা সংস্কারি বটে। হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে ওদের বুকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ কথা বার্তা বলার পরে বললেন যে খেতে যেতে। খাওয়ার সময়ে স্যামন্তক তো দেখে হাঁ, এত তো কোনদিন খায় না। মুড়ো ঘন্ট, চিংড়ী মাছের মালাই কারি, বাপরে, একবার থালার দিকে তাকায় একবার বন্দনা আর ওর মায়ের দিকে তাকায়।
খাওয়া শেষে, বেড়িয়ে পরে দুজনে। এপ্রিল মাস, হাওয়ায় এখন ঘাম ছোটান গরম আসেনি, বেশ সুন্দর হাওয়া চলছে। স্যামন্তকের সাথে মানিয়ে আজ ড্রেস করতে হবে, কি পড়বে, শাড়ী। সুন্দর একটা কটনসিল্কের সাড়ী পরে বন্দনা, সাধারন ভাবে সাজতে বলেছিল স্যামন্তক। ওর নাকি একটা ন্যাচারাল বিউটি আছে, আয়নার সামনে নিজেকে দেখে বলে “ঘেঁচু কলা।”

“কোথায় যাবো আমরা” বন্দনা জিজ্ঞেস করে।

“পুরানো জায়গা, আউট্রাম ঘাটের স্কুপ।”

“উম… দারুন…”

বাইক তো দিল্লীতে তাই ট্যাক্সি নিয়ে যেতে হবে। ট্যাক্সিতে চেপেই স্যামন্তক বাঁহাতে জড়িয়ে ধরে গালে একটি চুমু খায়, বলে “অনেক অনেক দিন ধরে তোমার মিষ্টি গালে চুমু খাই নি।”

“উম…” কানে কানে ফিসফিস করে বলে “চুমু তো অনেক জায়গায় খাওয়ার বাকি আছে সেগুলর কি হবে?”

“বলত শুরু করবো নাকি? চল আজ রাতে কোথাও…”

“মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোমার” হেসে বলে বন্দনা।

স্কুপে বসে আইস্ক্রিম খেতে খেতে অনেক সুখ দুখের গল্পে মেতে ওঠে দুই চাতক চাতকি। চোখের দেখাতে নিজদের ভেতরের মরুভুমিতে বারী সিঞ্চন করে নিজেদের পরিতৃপ্ত করে।
“আমি একটা প্রেসেন্ট এনেছি তোমার জন্য।” এক চামচ আইস্ক্রিম বন্দনার ঠোঁটে লাগিয়ে বলে।

“কি কি” গলায় বেশ উতফুল্লের সুর।

পকেট থেকে ছোট্ট ভেল্ভেটের বাক্স বের করে স্যামন্তক। আলতো করে খুলে ভেতরের সোনার আংটিটা বের করে বন্দনার বাঁ হাতের অনামিকায় পড়িয়ে দেয়। আংটি দেখে বন্দনা স্তব্ধ হয়ে যায়, ভেবে পায়না কি বলবে, চোখের কোলে জল চলে আসে। খুব ইচ্ছে করছে বন্দনার, দুহাতে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে চুপ করে বসে থাকার। হাতের আঙটিটা বার বার করে দেখে, খুব সাধারন একটি সোনার আংটি, কোন হীরে জহরত বসান নেই, দামের চেয়ে ভালোবাসা জড়িয়ে আছে ঐ সোনার টুকরো তে।

দু’দিন পরে পুবালী দুর্গাপুর চলে যায়, স্যামন্তক সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসে। দিদিকে তো সবসময়ে কাছে পাবে, যাকে পাবে না সে হচ্ছে বন্দনা। এই ছয় দিনে মনে হয় যেন সবসময় ওর সাথে কাটায়, কিন্তু বাড়ি বলে কথা আছে, সেখানে ও সময় দিতে হয়। রবিবার বিকেলের ফ্লাইট দিল্লী ফিরে যাবার, পুবালী শনিবার সকালবেলা কোলকাতা ফিরে আসবে।

ঠিক শুক্রবার বিকেলে দেখা করে স্যামন্তক আর বন্দনা। বন্দনাকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের একটি বড় রেস্টুরেন্টে খেতে ঢোকে স্যামন্তক। আঙটিটা হাতে ঝলমল করছে, নরম আঙ্গুলে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় স্যামন্তক।

একটা কথা বেশ কিছুদিন ধরে স্যামন্তকের মাথার মধ্যে ঘুরছিল, কি করে বলে সেই কথা। স্যামন্তকের ইতস্তত ভাব দেখে বন্দনা জিজ্ঞেস করে “কি গো কিছু বলবে?”

স্যামন্তক কে চুপ করে থাকতে দেখে, বন্দনার বুক আবার করে কেঁপে ওঠে, সেই পুরনো জায়গা যেখানে দিল্লী যাবার আগে নিয়ে এসেছিল স্যামন্তক। আবার কি বলতে চায় ও, সেবার বলেছিল যে কোলকাতা ছেড়ে দিল্লী যাচ্ছে, এবারে কি বলবে, দেশ ছেড়ে বিদেশ যাচ্ছে? না, তাতে কি আসে যায়, এই শর্মাকে ফিরে তো আসতে হবে এই কোলে। ভাবতে ভাবতে হেসে ফেলে বন্দনা “এবারে তুমি নিশ্চয় বলবে যে তুমি বিদেশ যাচ্ছ।”

স্যামন্তক এক দৃষ্টিতে বন্দনার হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে, গোলাপি ঠোঁট দুটি যেন ডাকছে। “হ্যাঁ কিছু বলার আছে আমার।” বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় স্যামন্তক, একটু খানি এদিক ওদিক চেয়ে দেখে “বিয়ে করবে আমাকে?”

তিনটে শব্দ শুনে যেন ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে বন্দনা, খুশী তে যেন পাগল হয়ে যাবার যোগাড়। নিচের ঠোঁট চেপে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে বলে “যদি না করি, তাহলে…”

“তাহলে চুরি করে নিয়ে যাবো।”

“বাঃবা, মনে তো হয় না সেই টুকু ক্ষমতা আছে তোমার।”

“হুম, এখন বলছ যে ক্ষমতা নেই” চোখ টিপে ইশারা করে যে ‘একবার কোলে এস বলে দিচ্ছি কার কি ক্ষমতা।’ কিছুক্ষণ থেমে বলে “বনা, আমার কিছু বলার আছে।”

ধুক করে ওঠে আবার বন্দনার প্রান, আবার কি নতুন কথা বলবে স্যামন্তকে “এবারে সত্যি আমার ভয় করছে।”

“না না এটা ভয়ের কথা নয়। আমার মনে হয় বিয়ের আগে আমার ফ্যামিলি ব্যাক গ্রাউন্ড তোমার যেনে নেওয়া উচিৎ।”

অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে বন্দনা, স্যামন্তকের দিকে “হ্যাঁ বল, আমি শুনছি।”

“আমার বাবা, জ্যাঠা দু’জনে আমার অনেক কাছের মানুষ। আমি একমাত্র ছেলে দুই পরিবারের মধ্যে। আমাকে নিয়ে ওদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। আমি কোনদিন কোলকাতা বা দুর্গাপুরের বাইরে পা রাখিনি, এই প্রথমবার কর্মসুত্রে দিল্লী গেছি।” মন দিয়ে শুনে যায় বন্দনা, ঠিক করে বুঝে উঠতে চেষ্টা করে যে কথাটা ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে। “ভবিষ্যতে আমাকে আমার বাবা মা, জেঠু জেঠিমা কে দেখতে হবে, হয়তো এখন নয় কিন্তু কিছু বছর পরে।”

“হুম, তুমি কি বলতে চাইছ যে আমি বিয়ের পরে কোলকাতা থাকবো।” বন্দনার মনের কোনে একটা অজানা শঙ্কা ভর করে, বিয়ের আগেই কি স্যামন্তক ওকে ভয় দেখাচ্ছে আজ থেকে দশ বছর পরে শ্বশুর শ্বাশুরি নিয়ে কি করে ঘর করতে হবে সেটার। ও যে এত কোনদিন ভেবে দেখেনি, ও ভেবেছিল যে স্যামন্তক কে নিয়ে আক নতুন সংসার গড়বে।

“না এখন নয়, তবে হয়ত ভবিষ্যতে থাকতে হতে পারে।”

এত খোলামেলা জীবনের ছবি যে বন্দনাকে এত তাড়াতাড়ি দেখিয়ে দেবে স্যামন্তক, সেটা ও স্বপ্নেও ভাবেনি। হটাৎ করে মনে হল, যে জীবনটা অনেক প্যাঁচালো, অনেক জটিল এই সংসার ধর্ম। জিজ্ঞেস করে “আমাকে কি করতে হবে?” মনে মনে ভাবে আমি কি এখনি এর হাতের খেলার পুতুল হয়ে গেলাম।

“জাস্ট বি নাইস টুঁ মাই পেরেন্টস, আর কিছু না।”

প্রশ্ন করে বন্দনা, সব থেকে বড় প্রশ্ন “আমাকে বিয়ে তো করবে, বাবা মা কে সেটা জানিয়েছ তুমি? তুমি যেরকম কথা বললে সেটা শুনে তো মনে হচ্ছেনা যে তোমার ফ্যামিলি আমাকে বউ হিসাবে কোনদিন মেনে নেবে। যদি না মেনে নেয় তাহলে তুমি কি করবে?”

স্যামন্তক ভাবেনি এই কথা কোনদিন, কি করবে যদি ওর পরিবার ওদের সম্পর্ক মেনে না নেয়। অনেক কঠিন প্রশ্ন, বাবার চেয়ে জেঠু অনেক কঠোর আর ঋজু স্বভাবের মানুষ। কি করবে ও? বুকের মাঝে বারংবার জেগে ওঠে প্রশ্ন, জেঠু যদি না মানেন তাহলে তো বিয়ে করা যাবেনা, কি করে বঝাবে।

উত্তর না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করে বন্দনা “কি হল, বল, কি করবে তখন? শুধু মুখের বলা ভালোবাসা নিয়ে ভুলে চলে যাবে তুমি, তাইতো।”

বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় স্যামন্তক “দিদি নিশ্চয় কিছু একটা ঠিক করে দেবে।”

মাথায় রক্ত চড়ে যায় বন্দনার, এই ছেলেটার কি নিজের কোন মেরুদন্ড নেই, নিজে কিছু করতে পারেনা, সবসময়ে দিদির আঁচলের তলায় কি নিজের জীবন কাটিয়ে যাবে? এই করলে তো বিয়ের পরে ওদের জীবনে পুবালীর হস্তক্ষেপ অনিবার্য, তখন কি হবে। ঝাঁজিয়ে ওঠে বন্দনা “তোমার নিজের কি কিছু ক্ষমতা নেই করার, সব সময়ে তোমার কি দিদিকে চাই? দিদি বলবে, দিদি করবে। হ্যাঁ।”

কথাটা ঠিক ভাবে হজম করতে পারেনা স্যামন্তক “আমার দিদির নামে কিছু বলার আগে একটু ভেবে বল।”

মাথা ঠিক থাকেনা বন্দনার, এমন ছেলে কে ভালবেসেছে যে কিনা মেরুদণ্ড হীন “ঠিক আছে, বেশ। আগে তুমি তোমার পরিবারের সাথে কথা বল, সবাই মত দিক, তারপরে তুমি আমার সাথে কথা বল।” চোখ জ্বালা করে বন্দনার, দৃষ্টি ঝাপ্সা হয়ে আসে চোখের সামনে। ভালবাসার মানুষ টাকে আবার হারাতে হবে ভেবে “কি হবে তোমাকে ভালবেসে, তুমি তো জাননা ঠিক করে যে আমাদের ভবিষ্যৎ কি। আমিকি শুধু মাত্র একটি খেলার পুতুল, তুমি ডাক দেবে আমি দিল্লী যাবো, আমার শরীর টাকে নিয়ে খেলবে আর আমি কিছুদিন পরে বাড়ি ফিরে আসবো? এই জীবন হবে আমাদের?”

উত্তর খুঁজে পায়না স্যামন্তক, একদিকে ওর পরিবার, একদিকে ওর বুকভরা ভালোবাসা। বাড়ির সাথে কথা বলার মতন সাহস ওর নেই, তাহলে কি হারিয়ে দেবে ওর প্রানের বনা কে? না কিছু একটা উপায় খুঁজতে হবে ওকে।

উত্তর না পেয়ে ধরা গলায় বলে বন্দনা “আমি বাড়ি যাবো। এখানে আমার বসার এর একটুকু ইচ্ছে নেই।” উঠে দাঁড়ায় বন্দনা, ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে স্যামন্তক মাথা নিচু করে বসে আছে। আবার বলে “আমাকে যদি বাড়ি ছাড়তে ইচ্ছে না করে সেটা বলে দাও, আমি একা একা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যেতে পারবো।”

অস্ফুট স্বরে বলে স্যামন্তক “থাম একটু, শোন আমার কথা। আমি সবকিছু ঠিক করে দেব।”

অসীম বেদনায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে বন্দনার, চোখে জল, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি নিয়ে বলে “যেদিন নিজে থেকে বুক ঠুকে আমাকে নিয়ে যাবার সাহস হবে, সেদিন এস আমার কাছে। আমি সানন্দে তোমার সাথে এক কাপড়ে বিয়ে করব।” আঙ্গুল থেকে আংটিটা খুলে নিয়ে হাতের মুঠোর মধ্যে রেখে দিল, ফিরিয়ে দিতে মন করলনা, একরকম ফিরিয়ে এনেছে স্যামন্তক। কিছু একটা নিয়েই বেঁচে থাকুক বন্দনা “আংটি টা আমি খুলে রাখছি, দেব না তোমাকে। যদি মনে হয় কোনদিন পড়িয়ে দিও আমাকে, এই আংটিটা। আমার হাত না হলে চির জীবন খালি থাকবে।”

“দাঁড়াও একটু, আমার কথা শন বনা।” কাতর স্বরে ককিয়ে ওঠে স্যামন্তক।

বনা নাম শুনে কেঁদে ফেলে বন্দনা, ডান হাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরে থাকা আংটি, দু’চোখে অবিশ্রান্ত বয়ে চলে অশ্রু, প্রেমের কি গভীর বেদনা “আমার কাছে সেদিন এস, যেদিন নিজে থেকে বলবে যে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছ। আমি আজ চললাম, পুবালী কে বল যে আমি ওকে খুব মিস করব, কিন্তু একটি বারের জন্য নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু করার চেষ্টা কর সামু।” তারপরে আর পেছন দিকে তাকায় না, বন্দনা। নেমে যায় সিঁড়ি দিয়ে, বাইরে বেড়িয়ে ট্যাক্সি ধরে সোজা বাড়ি।

বাড়ির নিচে পৌঁছে চোখ মুছে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘরে ঢোকে। ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করেন যে কি রে কেমন কাটল, হেসে বলে বন্দনা ভালো কেটেছে, নিচে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে স্যামন্তক। কাল বাদে পরশু দিন দিল্লী ফিরে যাবে, হাতে শুধু মাত্র দু’দিন দেখা যাক কি করে। বুক ফেটে হাজার টুকরো হয়ে গেছে বন্দনার, এযে ধাক্কা নয়, এযে প্রতারণা নয়, এযে ভালবাসার মাঝে একটা বেড় যেটা লঙ্ঘন করতে শুধু স্যামন্তক পারে। নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে কান্নায় ভেঙে পরে বন্দনা, এই কান্নার কোন ওষুধ ওর জানা নেই, কি বলে বুঝাবে নিজের মনকে, স্যামন্তক তো ওকে ভালবাসে, যদি না বাসত ভালো তাহলে না হয় অন্য কথা ছিল, নিজেকে বুঝিয়ে উঠতে পারত। কিন্তু এমত অবস্থায় কি নিয়ে বেঁচে থাকবে। মনে হয়, সেই দুর্যোগের রাতে কেন মৃত্যু হল না ওর।

বন্দনার পেছন পেছন দৌড়ে নিচে নামে স্যামন্তক, কিন্তু ওর বনা একবারের জন্যে পেছনে না তাকিয়ে ওর চোখের সামনে ট্যাক্সি চেপে চলে যায়। কিছু বলার অবকাশ দেয় না। ক্ষুধ, বিধ্বস্ত স্যামন্তক সন্ধ্যে বেলার ঝলমলে পার্ক স্ট্রিটের আলো কেমন যেন বিষাক্ত মনে হয়, মনে হয় যেন ওকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। রাস্তা ধরে হাটতে হাটতে কোথায় পৌঁছায় ঠিক করে উঠতে পারেনা। চোখ তুলে দেখে যে পার্ক সার্কাস মোড়ে চলে এসেছে। একবার ভাবে দিদিকে ফোন করবে, একবার ভাবে করে কি বলবে।

চুপ চাপ বসে টিভি দেখছিল পুবালী, কিছুক্ষণ আগে সিতাভ্রকে ফোন করেছিল, ঠিক আছে। কাল বাদে পরশু দিল্লীর উদেশ্যে রওনা, আবার নিজের জীবনে ফিরে যাওয়া। এই কদিন বেশ ভালো কাটল। এমন সময়ে ফোনে রিং হয়, ফোন তুলে দেখে ভাইয়ের নাম্বার “কি হল?”

“তুই কাল কখন আসবি?”

“কেন তুই তো আমাকে সকালে নিতে আসছিস, তারপরে বিকেল বেলা বেড়িয়ে যাবো?” গলাটা কেমন আলাদা শুনাচ্ছে যেন, কি করে ভুলে গেল যে ওকে নিতে আসতে হবে “কি হয়েছে রে তোর? আজ তো তুই বন্দনার সাথে দেখা করতে যাবি তাই না?”

“হ্যাঁ।” শুধু এইটুকু উত্তর দিল স্যামন্তক, কি বলবে?

“ঝগড়া করেছিস?”

“না।”

“তোর কি হয়েছে?”

“আমি আজ রাতে বাড়িতে সব বলে দেব, আমার আর বন্দনার সম্পর্কের ব্যাপারে।”

অবাক হয়ে যায় পুবালী “না, তুই পাপা কে ভালো মতন জানিস। সব একদম ভেস্তে যাবে? তোর হয়েছে টাকি?”

সব কথা দিদিকে জানায় স্যামন্তক, বন্দনা বলেছে যে ওর নাকি কোন ক্ষমতা নেই কারুর সামনে দাঁড়ানোর, সব সময়ে নাকি দিদি দিদি করে।

হেসে ফেলে পুবালী “ব্যাস এই টুকু কথা। আমি কাল বাড়ি যাই তারপরে দেখছি।”

“কাল এলেও আমি বলব যা বলার।”

“বন্দনার কথাতে এত চোটে আছিস কেন? আমি কথা বলছি ওর সাথে, আর তুই বাড়িতে কিছু বলবি না, কাকু পাপাকে ফোন করে জানিয়ে দেবে আর তোর দিল্লী যাওয়া বন্দ করে দেবে, সেটা কি ভালো হবে? আমি জানি পাপা এত সহজে মেনে নেবে না। অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হবে রে সামু।”

“আমার সাথে কথা বলা বন্দ করে দিয়েছে, আমার দেওয়া আংটি খুলে নিয়েছে। আমি কি করব?”

অবস্থা সঙ্গিন “ওকে, আমি কথা বলছি বন্দনার সাথে।”

নিজের ঘরে ঢুকে বন্দনা, আংটিটা গলার চেনে ঝুলিয়ে দেয়। বিশ্বাস একটাই, একদিন তো পড়াবে কিন্তু কবে আসবে সেইদিন সেটা জানা নেই বন্দনার। কান্নায় ভেঙে পরে বন্দনা, বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুফিয়ে কেঁদে ওঠে “হাঁ ভগবান।” ফোনের রিং বেজে ওঠে।

হ্যালোর আওয়াজ শুনে পুবালী বুঝতে পারে যে বন্দনা কাঁদছিল “কিরে কাঁদছিস কেন?”

ধরা গলায় বলে বন্দনা “কি বলব তোকে?”

“কি হয়েছে?” অবস্থা বেশ সঙ্গিন।

পুবালীর গলা শুনে একটু আহত হয় বন্দনা, তাহলে স্যামন্তক সেই দিদির আঁচলের আশ্রয় নিয়েছে। চোখ মুছে বলে “তোর ভাইয়ের তো কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই। শুধু প্রেম করতে জানে, কি করে সেটা ফলপ্রসূ করবে সেটা জানেনা।”

“সব ঠিক হয়ে যাবে, বন্দনা, আমি বলছি।”

“তুই বললি ব্যাস হয়ে গেল?” জিজ্ঞেস করে বন্দনা “এমন ছেলেকে ভালবেসেচি আমি যার নিজের কোন শক্তি নেই কিছু করার।”

“তুই ভুল বুঝচিস, দেখ আমার বাবা কে বাড়ির সবাই ভয় পায়। পাপার সামনে কথা বলা একটু সাবধানে বলতে হয়।” গলা একটু খানির জন্য ধরে আসে পুবালীর “তুই জানিস না অনেক কথা। দিদি অনেক বড় আমাদের চেয়ে, আর দিদির কথা অনেক চলে বাড়িতে। বোন সব থেকে ছোটো, তাই সবার আদুরের। আমরা দুজনে মাঝখানে, ঠিক মন্দিরের ঘন্টার মতন, সব কিছুর মাঝে আমি আর সামু পিষে থাকি। আমি তাই ঠিক করে নিয়েছিলাম সেই ছোটো বেলা থেকে যে, কোনদিন ওকে ছেড়ে যাবনা।”

“স্যামন্তক এটা জানত, তাহলে আমার সাথে প্রেম করতে কেন গেছিল? আমাকে কেন সেদিন তোর বাড়িতে চুমু খেতে গেছিল? আমি এমনি চলে আসতাম, কিছু বলতাম না। ওকি চিরকাল তোর আঁচলের তলায় থাকবে?”

পুবালী বন্দনার কথা শুনে রেগে যায় “তুই কি বলতে চাস যে আমার সামু মেরুদন্ডহীন ছেলে? জানিস, সিতাভ্র ওকে চাকরি দিতে চেয়েছিল ওর কোম্পানিতে, ও করতে চায়নি। পাপা বলেছিল যে ডিভিসি তে ঢুকিয়ে দেবে যাতে সবার কাছে থাকে সেটাও করতে চায়নি। নিজের ক্ষমতায় নিজে কাজ খুঁজবে বলে একা একা পুনে, দিল্লী গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে। তারপরে তুই আমার ভাইকে বলবি যে মেরুদণ্ডহীন ছেলে?”

বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় বন্দনা, দৃঢ় স্বরে উত্তর দেয় পুবালীকে “আমি কিছু জানিনা পুবালী, আমি শুধু ওর মুখ থেকে শুনতে চাই যে ও আমাকে সবার সামনে মাথা উঁচু করে নিয়ে যেতে এসেছে, ব্যাস। যেদিন আমাকে এসে বলবে ঐ কথা, সেদিন আমাকে আংটি পড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমি যেতে রাজী, শুধু একবার ওকে বলতে দে। আমি ওর উত্তরের জন্য ওয়েট করব।”

জানেনা ভবিষ্যৎ কি, তবুও বুকের মাঝে একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে গলার চেনে ঝোলা আংটিটার দিকে।

http://www.exbii.com/showthread.php?t=1149408&page=112

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s