জীবন যেরকম – ৩


পর্ব ৩

বিদিশার চিন্তাতে আমি কেমন মশগুল হয়ে গিয়েছিলাম। কি একটা বলতে গিয়ে শুক্লাও হঠাৎই থেমে গেছে। দেখলাম মা, চা নিয়ে ঢুকেছে ঘরে। শুক্লা মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে মা’কে ঢুপ করে একটা প্রনাম করে বসলো। মা, শুক্লার মাথায় দুহাত রেখে বললো, ‘থাক থাক মা, আমাকে আর প্রনাম করতে হবে না। আমি এমনি তোমাকে আশীর্ব্বাদ করছি।’

চায়ের সাথে চানাচুর আর মিষ্টি। শুক্লা বললো, এ কি মাসিমা? দেবকে দিলেন না। শুধুই আমাকে?

মা বললো, ‘ও তো খেয়েছে এই সবে। তুমি খাও। দেব সকালে একবারই চা খায়, তারপরে আর খায় না।’

শুক্লা আমাকে বললো, ‘কলেজে তো খুব চা খেতিস। ঘন্টায় ঘন্টায়। এখন সব কমে গেছে বুঝি?

এক সময়ে চায়ের একটা নেশা ছিল। চায়ের সাথে বিস্কুট আর সিগারেট। বিদিশা বলতো, ‘তোমার এই চায়ের নেশাটা খুব বাজে। আর এত ঘনঘন সিগারেট খাও কেন তুমি? জানো বেশী সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়। গলা খারাপ হয়ে যায়। তোমাকে গলাটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে কিনা?’

আমি বিদিশার জন্য চায়ের নেশা কমিয়ে দিলাম। সিগারেট খাওয়াও ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বড়ই অদ্ভূত। বিদিশাই তারপরে আমাকে ছেড়ে চলে গেল।

শুক্লাকে দেখলাম, চা খাচ্ছে, আর বারে বারেই আমার দিকে তাকাচ্ছে। কি যেন বলতে গিয়ে একটু আগে থেমে গিয়েছিল ও। শুক্লার এমন দৃষ্টি, কলেজে যখন পড়তাম, আগে কখনো দেখিনি। আমার পাশেই বসে রয়েছে ও। অথচ কলেজে যখন পাশে বসতো, কোনদিন এভাবে কখনো তাকাতো না আমার দিকে।

-’কিছু বলবি শুক্লা? কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেলি তুই?’

শুক্লা বললো, ‘তোকে যদি কিছু বলি, তাহলে তোর মান হবে। অভিমান হবে আমার ওপর। রাগ করবি না বল?’

শুক্লাকে বললাম, ‘তুই তো আমার ক্ষতি কোনোদিন চাস নি। রাগ করবো কেন? কি বলছিলিস বল?’

চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে, আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সব বলবো তোকে, যদি পারিস, আজ সন্ধেবেলা আসবি একবার আমার ফ্ল্যাটে?’

আমি বললাম, ‘সন্ধেবেলা? আমাকে তো শুভেন্দুও আবার ডেকেছে ওর বাড়ীতে। কি করে যাবো?’

শুক্লা বললো, ‘ওকে বারণ করে দে। বল, শুক্লাও আমাকে ডেকেছে। আমি শুক্লার ফ্ল্যাটে যাচ্ছি।’

শুভেন্দুকে আজ অবধি কোনদিন না করিনি। শুক্লার কথায় না বলবো, মনটা কেমন খচখচ করতে লাগলো। বিদিশার চিন্তাটাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। শুভেন্দু আমাকে সারপ্রাইজের কথা বলেছে, সেটাও আমাকে জানতে হবে। ওকে যদি না বলে দিই।, শুভেন্দু অসন্তুষ্ট হবে, সারপ্রাইজটাও আমার জানা হবে না।

-’কি হল? কিছু বলছিস না যে? বল আজ আসবি কিনা? আমি তো এখন অফিসে যাবো। ওখান থেকে ফিরে সন্ধেবেলা ফ্ল্যাটেই থাকবো। তোর জন্য অপেক্ষা করবো। আসবি তো?’

সল্টলেকের কোয়ালিটি বাস স্টপেজের কাছে শুক্লারা ফ্ল্যাট কিনেছিল আমি জানি। এই শুভেন্দুই আমাকে বলেছিল, ‘জানিসতো দেব, শুক্লারা এখন সল্টলেকে থাকে। আগে থাকতো বেহালায়। এখন ওখানেই রয়েছে মা বাবাকে নিয়ে।’

শুভেন্দু পুরোনো বন্ধু বান্ধবদের সব খবর গুলো কেমন পেয়ে যায়, অথচ আমি পাই না। নিজেকে বেশ কিছুদিন গুটিয়ে রেখেছিলাম, হয়তো সেইজন্য।

শুক্লা বললো, ‘আমার ফ্ল্যাটটাতেও তো তুই কোনদিন আসিস নি। তা একবার এসে দেখে যা। সবাই তো এসেছে। শুধু তুই বাকী।’

আমি বললাম, ‘সবাই বলতে কে কে?’

শুক্লা বললো, ‘কেন শুভেন্দু, রনি। ওরা দুজনেই তো এসেছে।’

-’আর সৌগত?’

নামটা শুনে মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল শুক্লার। আমাকে বললো, ‘কষ্ট দিচ্ছিস?’

ভাবিনি ওর মুখটা এমন করুন হয়ে উঠবে। শুক্লাকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। চোখের কোনে জলটা চিকচিক করছিল। রুমাল দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখটা মুছে নিয়ে বললো, ‘না তোকে এমনি বললাম, আমি জানি তুই কোনদিন কাউকে কষ্ট দিতে শিখিস নি।’ সৌগত কি করে আসবে? ও তো বিয়ে করে কবেই চলে গেছে আমাদের থেকে অনেক দূরে। মনে নেই? ওর বিয়েতে তো আমিও তো গিয়েছিলাম।’

বললাম, জানিস সৌগত এখন কোথায়?

শুক্লা বললো, ‘শুনেছিলাম তো অ্যামেরিকায়। নিউ জার্সি তে রয়েছে। যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল, কি সুন্দর দেখতে মেয়েটাকে। বিয়ে করার একবছর পরেই অ্যামেরিকাতে চলে গেল। আমাকে একটা বিয়ের কার্ড পাঠিয়েছিল সৌগত। তখন আমি বেহালাতেই রয়েছি। কার্ডটা পেয়ে যাবো কিনা ভাবছি। তারপরই সৌগত আমাকে ফোন করলো। বললো, কি গো আসবে না? নাকি রাগ এখনো রয়েছে আমার প্রতি? আমি কিন্তু সব কিছু ভুলেই ওর বিয়েতে গিয়েছিলাম।’

শুক্লাকে বললাম, ‘তোকে কিন্তু সেদিন দেখে আমিও খুব অবাক হয়েছিলাম শুক্লা। পরে ভেবেছিলাম, শুক্লার মনটাও কি তাহলে বিদিশার মত বিষিয়ে গেল। এত সুন্দর গড়ে উঠেছিল তোদের প্রেমটা। অথচ হঠাৎই কোথাথেকে কি যেন হয়ে গেল। তুই আবার সৌগতর বিয়েতেও এসেছিলিস, আমার খুব অবাক লেগেছিল।’

শুক্লা বললো, ‘অবাক তো লাগবেই। তুই যে আমার কথা ভাববি, আমি খুব ভালো করেই জানতাম। এই সৌগতই না কতদিন তোর পেছনে পড়েছিল, আমাকে রাজী করানোর জন্য।’

আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ। মনে পড়ে সেসব কথা। তারপরেই ওকে বললাম, ‘সৌগতর জন্য তোর কোনদিন আফশোস হয় না শুক্লা? দুজনে পৃথিবীর এখন দুই মেরুতে। কখনো মনে হয় না, এই জীবনটা আমরা হয়তো চেষ্টা করলে একসাথেই কাটাতে পারতাম।’

শুক্লা বললো, ‘আফশোস তো হয়। এই যেমন তোরও হয় বিদিশার জন্য। কিন্তু কথায় বলে, আফসোস করে নাকি কিছু হয় না। পৃথিবীতে আমরা কি কেউ পেছনের দিকে তাকিয়ে চলি? বল? সবাই চায়, সামনের দিকে তাকাতে। আমিও তাই-

মনে হল শুক্লা যেন দূঃখ কষ্টটাকে চেপে রেখেছে, আমারই মতন। ভালোবাসা ওরও টেকেনি। পৃথিবীতে আমরা দুজন যেন একই পথের যাত্রী।

শুক্লাকে বললাম, ‘তাহলেও আমার আর তোর ব্যাপারটা তো আলাদা। সৌগতর সঙ্গে তোর বিয়ে দিতে নাকি তোর বাবা মা আপত্তি করেছিল। সৌগতও জেদের বশে বিয়ে করে ফেললো ওই মেয়েটাকে। এটা কি সত্যি?’

শুক্লা বললো, ‘হ্যাঁ বাবা মা আপত্তি করেছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল ঠিকই তো করেছে। এটা তো সত্যি। আমিই বা জোর করবো কেন?’

শুক্লাকে বললাম, ‘তুই তো সৌগতকে ভালোবাসতিস। জোর করলি না কেন?’

শুক্লা বললো, ‘আমার ভালোবাসাটা আসলে ঠুনকো ছিল। সেটাই বলতে চাইছিস তো? আমি তো বিদিশার মত অত ওকে ভালোবাসতাম না। যতটা বিদিশা তোকে ভালোবাসতো।’

শুক্লাকে বললাম, ‘আমি বিশ্বাসই করবো না সেকথা। শুধু এটুকু জানতাম, বিদিশা আমাকে যতটা ভালোবাসে, শুক্লা ঠিক ততটাই ভালোবাসে সৌগতকে। বিদিশা আমাকে ছেড়ে গেলেও শুক্লা কিছুতেই ছাড়তে পারে না সৌগতকে।’

আমার দিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসলো শুক্লা। বললো, ‘দেব তুই এখনো কত সরল। সেই আগের মতই রয়ে গেছিস। তোকে দেখে ভাবি, ইস প্রেমটা যদি তখন আমি তোর সাথেই করতাম।’

বলতে বলতেই হেসে ফেললো শুক্লা। ‘আমাকে বললো, ভয় পেলি?’

আমি বললাম, ‘ভয় পাবো কেন? তোর প্রতি আমার সহানুভূতিটা সবসময়ই ছিল। আমি জানতাম শুক্লার মত মেয়ে হয় না। তাও মনটা একটু খচখচ করেছিল সেদিন। বিদিশা তারপরপরেই আমাকে যখন ছেড়ে গেল, তুই আমার প্রতি অনেক সহানুভূতি দেখিয়েছিলিস। অথচ আমি সেটা তোকে দেখাতে পারলাম না। অবাক হলাম, যখন দেখলাম সৌগতও মানিয়ে নিয়েছে ব্যাপারটা। তোদের দুজনের মধ্যে আবার দেখা হল। কিন্তু সেই দূঃখের অনুভূতিটা যেন নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে।’

শুক্লা বললো, ‘ওর সাথে আমার পরেও একবার দেখা হয়েছিল। কার যেন বিয়েতে আবার দেখা হল। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। রনির বিয়েতে। সৌগত এসেছিল। সাথে ওর সুন্দর বউটা। আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল। বললো, ভালো আছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। ওকে বললাম, তুমি? সৌগত বললো, আমি খুব ভালো আছি।’

শুক্লার কথা শুনে আমারো পুরোনো অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। ওকে বললাম, ‘মাঝে মাঝে আমিও ভাবি শুক্লা, এই ভালোবাসাই যদি পরষ্পরকে কাছে আনার জন্য সৃষ্টি হয়, তাহলে এভাবে বিচ্ছেদ কেন শুরুতেই? পুরোনো ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনকে তো প্রভাবিত করবেই। তুই হয়তো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবি। কিন্তু সত্যিই কি সব ভুলে থাকতে পারবি?’

শুক্লা হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সৌগত তখন একটা অবাঙ্গালী মেয়েকে নিয়ে বাইকে করে ঘুরতো, সেটা কি জানতিস?’

আমি অবাক হলাম। বললাম, ‘না, আমি জানতাম না, শুক্লা ছাড়াও সৌগতর অন্য কোনো প্রেমিকা আছে।’

শুক্লা বললো, আমিও জানতাম না। ‘সৌগতকে, বেহালায় যেদিন আমাদের বাড়ীতে নিয়ে গেলাম। বাবা মায়ের সাথে ওর আলাপ করালাম। বাবা বললো, তোমরা সব এক একটা ব্রিলিয়ান্ট বয়। আমি শুক্লার মুখে তোমার কথাও শুনেছি। দেব ছেলেটাও ভালো। আর তুমি তো ভালো অবশ্যই।’

শুক্লাকে বললাম, ‘মেসোমশাই আমার কথা এখনো বলেন? সেই একবারই তোর বেহালার বাড়ীতে গেছিলাম। উনি অনেক্ষণ ধরে আমার সাথে গল্প করেছিলেন।’

শুক্লা বললো, ‘বাবা তোকে খুব পছন্দ করতো। শুধু বলতো, দেবের মত ছেলে হয় না। কিন্তু সৌগতটা যে কি করলো।’

আমি বললাম, ‘তোর বাবা মা কি এটা জানতে পেরেছিলেন? কি করে জানলো? তুই বলেছিলিস?’

শুক্লা মাথাটা একটু নিচু করলো। আমাকে বললো, ‘হ্যাঁ আমিই বলেছি। আমি সৌগতকে একবার নয়, বেশ কয়েকবার ঘুরতে দেখেছি ওই মেয়েটাকে নিয়ে। মনের মধ্যে কষ্টটাকে চেপে রেখেছিলাম। জানিস তো দেব, আমার আবার বিশ্বাস ভাঙতে একটু সময় লাগে। মনে প্রানে যাকে বিশ্বাস করি, চটকরে তার প্রতি বিশ্বাস ভেঙে যায় না। সৌগতকে আমি নিজেই অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। ও বলতো, দূর তুমি পাগল নাকি? ও তো আমার শুধু বন্ধু।’

আমি অবাক হয়ে শুনছি শুক্লার কথা। শুক্লা বললো, ‘আমি ভুল করেছি আমি মানি। প্রথম প্রথম আমি সহ্যও করতাম। সৌগত বলতো, ও আমার বন্ধু। এর বেশী কিছু নয়। কিন্তু সৌগতর হাবভাব দেখে মনে হত, এর মধ্যে নিশ্চই কিছু একটা ব্যাপার আছে। আচ্ছা ‘দেব’, মানুষ কাউকে ভালোবাসলে কি আনসোসাল হয়ে যায়? পরষ্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সন্মান অক্ষুন্ন রেখে যদি প্রেম করা যায়, তাতে তো হানিকর কিছু ঘটে না। ভালোবাসার মূলমন্ত্র যদি আন্ডার স্ট্যান্ডিং হয়। তাহলে যেকোনো ব্যাপারই মানিয়ে নেওয়া চলে। আমি প্রথমে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরে মনে হল সৌগত যে মেয়েটার সাথে ঘুরছে, এটাকি আমাকে অসন্মান করা নয়? আমার কেন জানি না বিশ্বাসটাই চলে গেল সৌগতর প্রতি। মনে হল ও মিথ্যে কথা বলছে আমাকে। তারপরে যখন ওই আবার অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করলো। বুঝলাম সেদিন সত্যি কথাটাই বলেছিল সৌগত। আমারই ওর কথাটা মেনে নেওয়া উচিত ছিল।’

শুক্লার কথা শুনে মনে হল, এখনো চরম একটা আফশোস রয়েছে সৌগতর জন্য। সবাই যেন ভুলের খেসারত দিয়ে যাচ্ছি আমরা। আর এটাই দিয়ে যেতে হবে আজীবন ধরে।

শুক্লা বললো,ছাড়াছাড়ি মানে তো কয়েকটা সম্পর্কের কাটান ছাড়ান। এই যেমন তোর জীবনটাকে নিয়েও কাটাছেড়া করল মিনু আর বিদিশা। আমারো তাই। ওই অবাঙ্গালী মেয়েটাই আমার বিশ্বাসটাকে সেদিন ভেঙে দিলো।

শুক্লাকে বললাম, ‘তুই এখনো দূঃখ পাস?’

শুক্লা বললো, ‘দূঃখ তো আমারই পাবার কথা। ভুলতো আমিই করেছি। সৌগত নয়। যে ভুল করে তারই তো দূঃখ পাওয়া উচিত। অথচ ভগবান বোধহয় তোর বেলায় উল্টোটাই করেছে।’

হেসে বললাম, ‘কেন? একথা বলছিস কেন?’

শুক্লা বললো, ‘ভুল করলো বিদিশা, আর তুই যেমন ওর জন্য শুধু শুধু দূঃখ করে মরলি। কার ভুল কে করলো? আর এখন দেখ, ও কেমন আফসোস করছে তোর প্রতি। এই ভুলের কি কোনো ক্ষমা হয়?

পৃথিবীতে বিদিশাই একমাত্র মেয়ে। যাকে কোনোদিন আমি ক্ষমা করতে পারবো না। এ কখনো হয় না। বিদিশার মনটা ফুলের মত নরম। যে ফুল অল্প আঘাতও সহ্য করতে পারে না। সেদিন হয়তো, অল্প আঘাতেই ওর মনটা ভেঙে গিয়েছিল। বিদিশা আমাকে ভুল বুঝেছিল, তাই বলে কি ওকে আমি ক্ষমা করতে পারি না? নিশ্চই পারি।

শুক্লা হঠাৎই আমার হাতের ওপর হাতটা রেখে বললো, ‘আচ্ছা ‘দেব’, আমি যদি তোকে বলি, তোকে আমি ভালোবাসি। তুই কি প্রমান চাস?

আমি বললাম, ‘আমি যদি কোনো অন্যায় কাজ করি আর এসে তোকে বলি ক্ষমা করে দে। তুই করবি।’

শুক্লা বললো, ‘আমি সেটাকে অন্যায় বলেই ভাববোই না। কারণ তোর প্রতি আমার সেরকমই বিশ্বাস আছে। বিদিশা তাহলে কেন এটা করলো না?’

শুক্লার কথাগুলো আমার কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি না, ও কেন চাইছে না। কেন বলছে, বিদিশার সাথে আমার দেখা না করাই ভালো।

কিছু একটা বলতে গিয়েও শুক্লা আবার থেমে গেল। আমাকে বললো, ছাড় এসব পুরোনো কথা। তুই আসবি কিনা বল?

নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, ও বাবা। কটা বাজে খেয়াল করেছিস? আমাকে আবার অফিসে যেতে হবে, তোর এখানে এমনিতেই আমি লেট। এরপরে আরো বসলে আরো লেট হবে। এবার আমি উঠবো। বল না যাবি কিনা?

শুক্লাকে বললাম, তোর অফিস মানে তো ব্যাঙ্ক। কোন ব্যাঙ্কে আছিস যেন?

শুক্লা বললো, ‘পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কে আছি। ওই চাকরিটাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখান থেকে সোজা বালীগঞ্জ যাবো। ব্যাঙ্কে সারাদিন ডিউটি দেবো। তারপর খাটাখাটনি করে বাড়ীতে একটু বিশ্রাম।’

শুক্লাকে বললাম, ‘মেসোমশাই, মাসীমা কেমন আছেন? মানে তোর বাবা মা?’

শুক্লা বললো, ‘বাবা তো মারা গেছেই সেই কয়েক বছর আগে। মা হালে মারা গেলেন। ক্যানসার হয়েছিল।’

অবাক হয়ে শুক্লাকে বললাম, তুই তাহলে একা?

শুক্লা বললো হ্যাঁ একা। বড় নিসঙ্গ আমি।

শুক্লা এরপরে উঠি উঠি করছে। মা ঘরে এলো। শুক্লাকে বললো, চলে যাচ্ছো?

শুক্লা বললো, ‘হ্যাঁ মাসিমা। পরে একদিন আসবো। এই আপনার ছেলেকে বলে গেলাম, আমার ফ্ল্যাটে যেতে। বাবু এখন যাবে কিনা আমাকে কথা দিতে পারছেন না। ‘

মা বললো, ‘তা যাবে খন। অসুবিধের কি আছে?’

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। শুভেন্দুর কথাটা একটু আগে মাকে বলেছি। মা বোধহয় ভুলেই গেছে। শুক্লা আমাকে বললো, ‘এই বদমাইশটা। তোর ফোন নম্বরটা আমাকে দে তো। কথা বলতে বলতে আসল কাজটাই ভুলে গেছি।’

আমি শুক্লাকে আমার সেলফোন নম্বরটা দিলাম। শুক্লা সেভ করলো। আমাকে বললো, ‘তুই তাহলে আমাকে কনফার্ম করিস। এখন তো কিছু আমাকে বললি না।’

শুক্লাকে বললাম, ‘দেখছি, আমি শুভেন্দুকে ফোন করে। তোকে বিকেলে আমি ফোন করবো। বলেছিস যখন নিশ্চই যাবো। শুধু আমাকে শুভেন্দুর সাথে একটু কথা বলতে দে।’

আমাকে শুক্লা বললো, ‘তোকে নিচে যেতে হবে না কষ্ট করে। আমি নিজেই চলে যাচ্ছি।’

বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে ওর দিকে হাত নাড়লাম। শুক্লাও হাত নাড়লো। তারপর ওর শরীরটা আসতে আসতে গলির মুখটা থেকে মিলিয়ে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, আমাকে শুক্লা বিদিশার কাছে যেতে মানা করলো। আবার ওর ফ্ল্যাটেও যেতে বলে গেল। কিন্তু কেন বলে গেল? মনে কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে গেল।

কথায় বলে প্রেম ভালোবাসা থেকে নাকি একধরণের শক্তির জন্ম নেয়। জীবনের বাঁচার রসদ খুঁজে পাওয়া যায়। অদ্ভূত এক হতাশায় জীবনটা কেটে গিয়েছিল বেশ কয়েকটা বছর। ভাবলাম, বিদিশার ফিরে আসাটা কি কোনো কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে? আমি যেন একটা অবলম্বনের পথ খোঁজারই চেষ্টা করছিলাম। অথচ শুক্লাই এসে আমাকে কেমন দ্বিধায় ফেলে দিল। মন থেকে শুক্লার না চাওয়াটা একটু অবাকই করলো আমাকে। এতদিন পরে চিঠিটাও খুঁজে খুঁজে ঠিক নিয়ে এসেছে আমার কাছে। ও কি বলতে চাইলো ঠিক স্পষ্ট হল না।

মনে পড়ছিল, কলেজে যেকটা দিন আমাদের কেটেছে, শুক্লাকে কোনদিন বিদিশার প্রতি এত বিদ্বেশ করতে দেখিনি। ও কোনদিন বিদিশাকে দেখে হিংসেও করতো না। আমি বিদিশার সাথে চুটিয়ে প্রেম করছি। শুক্লাকে কোনদিন অখুশি হতে দেখিনি। যখন প্রেমটা আমাদের ক্রমেই দানা বাঁধতে শুরু করেছে তখনো শুক্লা স্বাভাবিক। কোনদিন প্রেম ভালোবাসার কথা ও আমাকে বলেনি। আর শুক্লাকেও সেচোখে আমি কোনদিন দেখিনি।

শুক্লা বলতো, ‘দেব’ হচ্ছে এমন একটা ছেলে, যার সাথে যে মেয়ে প্রেম করবে, সেই ধন্য হয়ে যাবে। আমি করিনি তো কি আছে। দেব আমার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু বিদিশা করেছে। সেই দিক দিয়ে বিদিশাকে আমি খুব লাকি বলেই মনে করবো। সুন্দরী হলেই শুধু হয় না। ভালো ছেলেদের মন পাওয়ার জন্যও মেয়েদের অনেক তপস্যা করতে হয়। বিদিশা করেছে, তাই ও দেবকে পেয়েছে। আমি চাই দেব আর বিদিশা জীবনে আরো সুখী হোক। প্রেম ভালোবাসা দিয়ে ওরা একে অপরকে পাওয়ার আনন্দটা আরো উপভোগ করুক।

নিজেও যখন সৌগতর সঙ্গে প্রেম করা শুরু করলো, তখন আমাকে বললো, ‘তুই ই আমাকে পথ দেখালি দেব। তোকে দেখেই শিখলাম পৃথিবীতে প্রেম জিনিষটা কত সুন্দর। মধুর প্রেমের সত্যিই কোনো বিকল্প হয় না।’

সৌগত আর শুক্লা আমাকে আর বিদিশাকে খুব নকল করতো। বিদিশা আমাকে ভ্যালেনটাইন্স ডে তে কার্ড দিচ্ছে, সাথে ডায়েরী আর পেন। আর সুন্দর কারুকার্য করা একটা রুমাল। শুক্লা তাই দেখে বললো, ‘আমিও সৌগতকে তাহলে এগুলো দিই? শুধু কার্ড কেন দেবো? সাথে ডায়েরী, পেন আর রুমালটাও তো দেওয়া দরকার।’

কলেজস্ট্রীটে গিয়ে সব কিনে নিয়ে এসেছে। আমাকে এনে দেখাচ্ছে, আর বলছে, ‘দেখ, বিদিশার মত কিনেছি সব। ভালো হয়েছে?’

প্রথম প্রথম আমি আর বিদিশা মাঝে মাঝে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে যেতাম। বেশ কয়েকটা নতুন সিনেমাও দেখে ফেলেছি দুজনে। শুক্লা আবদার করে বসলো, ‘এবার থেকে তোরা একা যাবি না। গেলে আমরা চারজনে মিলে যাবো।’

মাঝে মাঝে শুভেন্দুও এসে জুড়ে বসতো আমাদের সাথে। আমাকে আর শুক্লাকে বলতো, ‘এই শোন, তোদের দুজনের এই যে প্রেমটা হচ্ছে না। এসবই আমার বদলৌতে। সেদিন যদি বিদিশাকে আমি চিঠিটা না দিতাম না, তাহলে দেব কোথায় আর বিদিশা কোথায়? আর শোনো, পারুল রানী, তুমি তোমার প্রেমিকের যা অবস্থা করেছিলে, দেবদাস হতে হতে বেঁচে গেছে ব্যাচারা সৌগত। ভাগ্যিস তোর মনটা ঘোরাতে পেরেছিলাম সেদিন। নইলে?

শুভেন্দুর আমাদের সাথে ভিক্টোরিয়াতে গিয়ে যে কি অবস্থা হয়েছিল, সেকথা তো আগেই বলেছি। ও কখনো বোর ফিল করত না। আমরা চারজনে আপন মনে যখন নিজেদের মধ্যে ভাব, ভালোবাসার কথা বলছি, শুভেন্দু তখন আপনমনে বাদাম চিবোতো। আর মুখে বলতো, ‘তোরা প্রেম কর। আমার ভাই বাদামই ঠিক আছে।’

শুক্লা চলে যাবার পরে শুভেন্দুর সেই বিদিশাকে দেওয়া চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেক্ষণ ধরে দেখছিলাম, আর পুরোনো কথাগুলো আবার মনে পড়ে যাচ্ছিল।

মা, ঘরে ঢুকে বললো, ‘তোর মনে হচ্ছে কাজে বেরোনোর আজ বারোটা বেজে গেল। কোনো তাড়া নেই, সেই সকাল থেকে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লি। তারপরে এখন আবার বসে বসে কি ভাবতে শুরু করেছিস?’

আমি বিদিশার কথাই ভাবছিলাম, মাকে সেভাবে বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, ‘মা কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে আমাকে খুব দোটনায় থাকতে হচ্ছে। ভাবছি, কি সিদ্ধান্ত নেবো?’

মা বললো, ‘কি সিদ্ধান্ত?’

– ‘সেটা তোমাকে এখনি বলা যাবে না। আমি পরে বলবো।’

মা বললো, ‘তুই তো সব কথা আমাকে সেভাবে বলিস না। নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখিস। যদি মনে করিস বলবি না। তাহলে বলিস না। আমি আর কি বলবো?’

মাকে বললাম, ‘তোমাকে আজ অবধি কোনোকিছু কি আমি লুকিয়েছি? তুমি তো সবই আমার পুরোনো কথাগুলো জানো। আমার অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, সেগুলোই মাঝে মাঝে বসে আমি ভাবি। কলেজের দিনগুলোর কথা এতদিন বাদে মনে পড়ে যাচ্ছিল। তাই সকালে লিখছিলাম। তারপরে শুক্লাও এলো। এতদিন বাদে আমার বাড়ীতে প্রথম এসেছে, ওর সাথে কথা বলে ভালো লাগল। পুরোনো স্মৃতিগুলো মনকে নাড়া দিচ্ছে এই আর কি।

মা বললো, ‘শুক্লা তোকে কিছু বলেছে?’

অবাক হলাম। বললাম, ‘না কই কিছু বলেনি তো। কি বলবে?’

মা বললো, ‘আমি শুনেছি আড়াল থেকে। ও বিদিশার কথা বলছিল। বিদিশা নাকি ফিরে এসেছে কলকাতায়। ওর স্বামীকে ছেড়ে।’

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, মাও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দেখছে জবাবে আমি কি বলি?

মাকে বললাম, ‘কেন তুমি শুনে খুশি হও নি? বিদিশা ফিরে এসেছে।’

একটা চাপা দূঃখ। ঠিক আমারই মতন। মাকে বরাবরই দেখে এসেছি, আমার জন্য আফশোস করতে। মা আমার এমনই। যখন আমি দূখী তো মা দূখী। আবার আমি সুখি তো মাও সুখী। যেভাবে ছেলের মুখে হাসি ফুটলে মায়েরও মুখে হাসি ফোটে, ঠিক সেভাবেই মা, আমাকে বললো, আমি তোর মুখে হাসিটা দেখে ফেলেছি। এতদিন বাদে তুই খুশী হয়েছিস। আমি কি খুশী না হয়ে থাকতে পারি?

আমি মাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘খুশি হয়েছি মা, খুব খুশি হয়েছি। বিদিশা ফিরে এসেছে, আমার থেকে বড় খুশী বোধহয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

শুক্লার কথাটা মন থেকে মুছে ফেললাম। মনে মনে বললাম, যে মেয়েটিকে আমি এত ভালোবাসতাম, যার কথা আমি সবসময় ধ্যান করতাম, তাকে যদি এতদিন বাদে আবার দেখতে পাই, চোখ তো ফেরাতে পারবো না। বিদিশা যদি আমার খোঁজ করে, আমি নিশ্চই ওর কাছে যাবো।

মনে মনে বললাম, ভাগ্যিস, এই গল্পটার নাম, একটি ভালোবাসার মৃত্যু দিইনি। তাহলে বিদিশার ফিরে আসাটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়তো।

বিকেল হতেই শুভেন্দুর বাড়ী যাব বলে তৈরী হয়ে নিলাম। অফিসে ফোন করে বলে দিয়েছি, ‘আজ আর অফিসে যাচ্ছি না। কিছু কাজ পড়ে গেছে। সুতরাং কালকে আবার আসছি যথারীতি।’

শুভেন্দু বলেছে, সাতটার মধ্যে ওর ওখানে যেতে। আমি যখন বাড়ী থেকে বেরোলাম, তখন ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। বাড়ী থেকে বেরিয়ে হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে, বড় রাস্তার মোড় অবধি গেলাম। মনে হল, এই যাঃ। কিছু একটা আমি ফেলে এসেছি। খেয়াল হল, বিদিশাকে দেওয়া শুভেন্দুর ওই চিঠিটা বাড়ীতে ফেলে এসেছি। শুক্লা যেটা বাড়ী বয়ে এসে আমাকে দিয়ে গেল। শুভেন্দুকে দেখালে বেশ ভালো হত। বিদিশার কথা আমিও শুভেন্দুকে আগে থেকে বলতে পারতাম।

চিঠিটা তাড়াহূড়োতে আর পকেটে ঢোকানো হয় নি। খেয়াল হলো বসার ঘরের টেবিলের ওপরেই রেখে এসেছি। মা’র চোখে পড়লেও পড়তে পারে। কিন্তু ঐ চিরকূট দেখে মা আর কিছুই বুঝবে না। ওতে হিজিবিজি ছাড়া আর কিছু নেই।

কাঁকুড়গাছি মোড় থেকে একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সিওয়ালাকে বললাম, পিকনিক গার্ডেন যাবো। ট্যাক্সিওয়ালা বললো, বাইপাস ধরবো? আমি বললাম, যেদিক দিয়ে খুশি চলুন। আমার পিকনিক গার্ডেন পৌঁছোলেই হল।

ট্যাক্সিওয়ালা ফুলবাগান পেরিয়ে বাইপাশই ধরলো। বুঝলাম রুবী হসপিটাল থেকে তারমানে ডানদিকে টার্ণ নিতে হবে। আমি তাহলে ঠিক ছটার আগেই শুভেন্দুদের বাড়ীতে পৌঁছে যাবো।

ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ভাবছি, শুভেন্দুতো বলেছে সারপ্রাইজের কথা। রনিও ওখানে থাকবে। তারমানে রনিও ব্যাপারটা জানে। অথচ শুক্লা বললো, শুভেন্দুর সাথে এ ব্যাপারে নাকি কোনো কথা হয় নি। বিদিশাকে শুক্লাই দেখেছে, কাল গড়িয়াহাটের মোড়ে। শুভেন্দু যে সারপ্রাইজের কথা বলছে, এটা তাহলে কোন সারপ্রাইজ?

কিছুতেই মাথায় কিছু এলো না। কত চিন্তা করলাম। ভাবলাম, বিদিশাকে কি তাহলে শুভেন্দুও দেখেছে শুক্লার মত? কিন্তু আমাকে ও বললো না কেন? অন্তত বিদিশার ব্যাপার হলে শুভেন্দু আমাকে লুকোবে না। এই কবছরে অনেক যন্ত্রণায় মরেছি। অনেক কষ্ট পেয়েছি। শুভেন্দু প্রথম প্রথম সান্তনা দিয়েছে আমাকে। পরে বলেছে, ছেড়ে দে বিদিশাকে। মনে কর, বিদিশা বলে তোর জীবনে কেউ কোনদিন ছিল না। আবার নতুন করে জীবনটাকে শুরু কর। সেই বিদিশাই যখন ফিরে এলো। শুভেন্দুর তো বলা উচিৎ ছিল।

ট্যাক্সিতে যেতে যেতে শুভেন্দুকে মোবাইলে ধরার চেষ্টা করলাম। এক চান্সেই ওকে পেয়ে গেলাম। শুভেন্দুকে বললাম, ‘আমি কিন্তু তোর ওখানে যাবো বলে রওনা দিয়ে দিয়েছি। ঠিক ছটার মধ্যেই আসছি।’

শুভেন্দু হাসলো। বললো, ‘রনি থাকবে বাড়ীতে। আমি সাড়ে ছটার মধ্যে কাজ সেরে ঢুকবো। আর যে সারপ্রাইজটার কথা তোকে বলেছি, তার জন্য আরো আধঘন্টা তোকে অপেক্ষা করতে হবে।’

মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। ওকে বললাম, ‘হেঁয়ালিটা রাখ না। কি সারপ্রাইজ দিবি, সেটা আগে থেকে বল না?’
শুভেন্দু বললো, ‘সারপ্রাইজ ইজ অলওয়েজ সারপ্রাইজ। আগে থেকে বললে, ওটা আর সারপ্রাইজ থাকে না। তুমি এসো। ধীরে ধীরে সব রহস্য উন্মোচন হবে। একটু অপেক্ষা কর বৎস।’

শুক্লার সকালে আমার বাড়ীতে আসার ব্যাপারটা চেপে গিয়েই ওকে বললাম, ‘তুই কিন্তু যে সারপ্রাইজের কথা আমাকে বলছিস। ওটা আমি আগে থেকেই জানি। আমার জানা হয়ে গেছে, আজ সকালে।’

শুভেন্দু বললো, কি জেনেছিস? আমাকে বল দেখি।

আমি বললাম, না থাক। বলবো না।

শুভেন্দু বললো, ‘বলবি না যখন তুইও চেপে থাক। দেখা যাক তোর জানার সাথে আমার সারপ্রাইজ মেলে কিনা’।

ফোনটা রাখতে রাখতেই আবার বললো, ‘তোর মুখে আমি অনেকদিন হাসি দেখিনি। আজ তোর মুখে আমি হাসি ফোটাবো।’

আমি বুঝে গেলাম, তারমানে বিদিশার কথাই শুভেন্দু আমাকে বলতে চাইছে।

ট্যাক্সির কাঁচ দিয়ে কতগুলো ছেলে মেয়েকে হাত ধরাধরি করে ঘুরতে ফিরতে দেখছি। আর ভাবছি বয়সটা আমার দশবছর কমে গেছে। কি জানি হয়তো বিদিশারই জন্য।

রনির কথা ভেবে, রনিকেও একটা ফোন লাগালাম। রনি বললো, ‘কিরে দেব? তুই আসছিস তো?’

একটু আগেই শুভেন্দুর সাথে ফোনে কথা হয়েছে রনিকে সেটা বললাম। রনি বললো, ‘তোর জন্য আমি আর শুভেন্দু একটা পাত্রী ঠিক করেছি। তুই এলে, সেই মেয়েটিকে তোকে দেখাবো। শুভেন্দু যে সারপ্রাইজটার কথা বলেছে, ওটা সেই সারপ্রাইজ।’

আমি বললাম, ‘পাত্রীটি কে?’

রনি বললো, ‘ধরে নাও খুব সুন্দরী। তবে এখন একটু বয়স হয়েছে। তবে সৌন্দর্য তার কমে নি। তোমার সাথে ভালো মানিয়েও যাবে, কোনো চিন্তা নেই। এবার একটু ধৈর্য নিয়ে তুমিও এসো। আর হ্যাঁ আজকে কিন্তু খুব সহজে তোমায় ছাড়ছি না। অনেক গান শোনাতে হবে, সেই রাত অবধি। যিনি আসবেন, তিনিও তোমার গান শুনবেন।’

তারপর আবার হেসে রনি বললো, ওফ দেব, কতদিন তোর গান শুনি না। সেই কবে শুনেছিলাম লাস্ট। মনেই নেই। তারপর মনে হয় একযুগ হয়ে গেছে।

মোবাইলটা কানে ধরে নিজের ভেতরের আনন্দটা ওকে প্রকাশ করতে পারছি না। শুধু রনি বললো, আজ তুই মুকেশের ওই গানটা আবার গাইবি। যেটা খুব গাইতিস আগে। বলে নিজেই গাইতে লাগলো -সুহানি চাঁদনী রাতে। হামে শো নেহী দেতে। তুমহারী প্যায়ার কী বাতে, হামে শো নেহী দেতে।

আমি ওর রকম দেখে হাসতে লাগলাম।

রনি ফোনটা ছাড়ার পরেই ধরে নিলাম, এ মেয়ে বিদিশা না হয়ে কিছুতেই যায় না। ও যা বলছে, তাতে আর রহস্যের কিছু নেই। শুক্লার মত শুভেন্দুও হয়তো দেখে ফেলেছে বিদিশাকে। রাস্তায় দেখতে পেয়ে ওকে ইনভাইট করেছে বাড়ীতে। আজ সেখানে আমিও যাচ্ছি। সামনা সামনি আজ আমরা আবার দুজনে মুখোমুখি।

বিদিশাকে আমি ভালোবাসতাম। সেই ভালোবাসার মধ্যে কোনো খুঁত ছিল না। জানি, ভালোবাসার মধ্যে যদি সততা থাকে, সে ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। সেদিন বিদিশা আমাকে ভুল বুঝেছিল, তাই আমার জীবন থেকে ও হারিয়ে গিয়েছিলো। বিদিশার যখন ভুলটা ভাঙলো, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। কিন্তু আমার এই স্বচ্ছ ভালোবাসাই ওকে আবার ফিরিয়ে আনলো আমার কাছে। এই পৃথিবীতে দেবকে ছেড়ে বিদিশা আর যাবে কোথায়?

আমার মনে আছে, কলেজে বিদিশার সাথে যখন প্রেম শুরু করলাম, তখন রনি কত পেছনে লেগেছে আমাদের। বিদিশার সাথে ফাজলামী আর খুনসুটি তো করতোই এছাড়া আমাকেও কখনো কখনো ছাড়তো না। একদিন খুব গুরু গম্ভীর ভাবে আমাকে বললো, ‘দেব, একটা কথা খুব সিরিয়াসলি ভাবে তোকে জিজ্ঞাসা করছি। ‘এখনো অবধি বিদিশাকে তুই কটা চুমু খেয়েছিস? গালে, কপাল আর ঠোঁট মিলিয়ে কটা?’
তারপর আবার নিজেই হেসে বললো, ‘গুনে দেখিস নি, তাই না বল?’

রনিকে কোনদিন কাব্যিক হতে দেখিনি, আমাকে বলেছিল,‘প্রেম যখন হৃদয়ে আসে, তখন পুরুষ বা রমনী কি চায় জানিস? সে নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়। বাঁচিয়ে রাখতে চায়, লালন করতে চায় তার প্রেমকে। সবার উপরে থাকে সমর্পনের ইচ্ছে।’ একেবারে পি সি সরকারের ম্যাজিকের মতন। এক ঝলক চাহনি, একটু ঠোঁটের কাঁপন, মাথাটা হেলিয়ে রাখা, হাতের আঙুলের নড়াচড়া। এর প্রত্যেকটিই প্রেমকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ঠিক ম্যাজিকের মতন। কিন্তু খুব সাধারণ ম্যাজিক।’

রনির কথা ভাবছিলাম আর বিদিশার মুখটাকে চিন্তা করছিলাম, ট্যাক্সিতে যেতে যেতে হঠাৎই আমার মনে হল, বিদিশার মুখটা যেন আমার মুখের খুব কাছে। সেই আগে যেরমকম গরম নিঃশ্বাস ফেলতো আমার ঠোঁটের ওপরে। প্রথমবার চুমু খেতে গিয়ে ওর ঠোঁটটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন ওর ঠোঁটে প্রেমের চিহ্ন এঁকে দিলাম, ও জড়িয়ে ধরলো আমাকে। প্রজাপতির মত বিদিশার আঙুলগুলো আমার পিঠে তখন খেলা করছে। বিদিশার ঠোঁটের ওপর আমার ঠোঁট। বিদিশার পায়ের ওপর আমার পায়ের উষ্ণ চাপ। দ্রুত নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যাচ্ছে। আঙুল গুলো দিয়ে বিদিশা আমার পুরো শরীরটাকে এমন ভাবে খেলাচ্ছে, যেন শরীরের প্রতিটি কোনকে জানার জন্য ও কত অধীর। জড়িয়ে ধরে বিদিশাকে আমি বলছি, ‘বিদিশা, ভালোবাসাটাকে আমি অমর করে রাখতে চাই। তুমি আমাকে কোনদিন ভুলে যাবে না তো? বিদিশার মুখ দিয়ে শুধু গোঙানির মত শব্দ। দুটো ঠোঁট তখন ভালোবাসার আলিঙ্গনে আবদ্ধ। আমাকে জড়িয়ে ধরে বিদিশা বলছে, ‘না গো না। আমি কি তোমাকে ভুলে যেতে কখনো পারি?’

ভালোবাসার বেশী সুখ নাকি কপালে কখনো সয় না। মূহূর্তগুলো সব ঝাপসা হয়ে যায়। এই বুঝি শুরু হল। আর কদিন পরেই সব শেষ। মনে হল, বিদিশার মুখটাকে আমি দেখছিলাম এতক্ষণ। তারপরেই ওর মুখটা কেমন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল আসতে আসতে। আমার মুখের কাছে বিদিশার মুখটা আর নেই, হঠাৎ দেখছি ওখানে মিনুর মুখটা চলে এসেছে। বিদিশার ঠোঁটদুটোও নেই। ওখানে মিনুর ঠোঁট দুটো চলে এসেছে।

মূহূর্তে মুখটা কেমন পাথরের মত হয়ে গেল আমার। মনে পড়ল, মিনুর বাড়ীতে সেদিন কি ঘটেছিল।

সেদিন ছিল শনিবার। বাবা বলতেন, শনিবার দিনটা আমার কাছে নাকি শুভ নয়। শনি যদি ঘাড়ে চেপে বসে, তাহলে তো আরো মুশকিল। সেদিন মিনু হয়েছিল আমার শনি। তখন ঠিক সন্ধে সাতটা। মিনু আমাকে বাড়ীতে ডাকলো। আগের দিন সৌগতর বিয়েতে গিয়েছিলাম। সারারাত সৌগতর বাসরে জেগেছি। অনেক রাত অবধি হৈহুল্লোর আর গানবাজনা হয়েছে। শরীরটা এমনি খারাপ। মিনুকে বললাম, ‘আজ ছেড়ে দে মিনু, আজ আমার বাড়ী থেকে বেরোনোর একদম ইচ্ছে নেই।’

মিনু শুনলো না। বললো, ‘তোকে কি এমনি এমনি আমি বাড়ীতে ডাকছি? কারন তো একটা আছে। তুই আয়। আমি দশমিনিটের মধ্যে তোকে ছেড়ে দেবো।’

জানতাম না সেদিন বিদিশাও আমার বাড়ীতে এসে হাজির হবে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি, মিনুর বাড়ী যাবো বলে। তার ঠিক একঘন্টা পরেই বিদিশাও আমার বাড়ীতে এসে হাজির। আমাকে দেখতে পাইনি। মা’ বলে দিয়েছে আমি মিনুর বাড়ী গেছি। বিদিশাও আর অপেক্ষা করেনি।

বিদিশার ভীষন রাগ ছিল মিনুর ওপর। কলেজে কোনদিন দাঁড়িয়ে কথা পর্যন্ত বলেনি মিনুর সঙ্গে। মিনুর বাড়ীতে আমি যাই, সেটা ওর বোনকে গান শেখানোর জন্য হলেও বিদিশার একেবারেই পছন্দ হতো না। সৌগতর বিয়ের দিন এই নিয়ে একটু মুখ ভার করেছিল বিদিশা। আমি ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করছি। বিদিশা বললো, ‘আমি তো বলেছি মেয়েটা ভালো নয়। তুমি তাও শুধু শুধু। কি পাও তুমি ওখানে গিয়ে?’

বিদিশাকে কথা দিয়েছিলাম, আর মিনুর বাড়ীতে যাবো না। কিন্তু সেদিন নিয়তি আমাকে ডেকে নিয়ে গেল মিনুর কাছে।

যখন ওর বাসায় ঢুকলাম, তখন দেখলাম ওর ছোট বোনটা নেই। মিনু একা রয়েছে ঘরে। ওর চোখ দুটো কেমন ঘোলা ঘোলা। ঘরের মধ্যে শাড়ী ছেড়ে নাইটি পড়ে রয়েছে। মুখ চোখ দেখেই মনে হল, যেন শয়তান ভর করেছে ওকে।
শুরুটা করলো ভালোভাবে। আমাকে বললো, ‘সৌগতর বিয়েতে খুব আনন্দ হল। তাই না রে?’

-তুই তো যাসনি। গেলে আনন্দটা বুঝতে পারতিস।
-আমাকে তো সৌগত বলেনি। তোদের বলেছে আমি বাদ।
-তোকে কেন বলেনি, সেটা তো বলতে পারবো না। তবে আনন্দ তো খুব হয়েছে।
-এই দেব, তুই গান গেয়েছিস?
-গেয়েছি অনেক। ওরা ছাড়ছিল না তাই।
-বিদিশা গেছিল কাল?
-হ্যাঁ গেছিল। তাতে তোর কি?
-তুই দিন রাত শুধু বিদিশার কথাই চিন্তা করিস। তাই না?
-কেন ডেকেছিস, সেটাই বল। বিদিশার কথা বলতে ডেকেছিস আমাকে?
-ওফ বড্ড বিদিশা আর বিদিশা করিস তুই।
-কেন, বিদিশাকে বুঝি তোর হিংসে হয়? সহ্য হয় না, তাই না?
-আমার তো মনে হয়, বিদিশা তোর সাথে ঢং করে। ভালোবাসার আবার ও বোঝেটা কি?
-মিনু, তুই এসব কথা বলার জন্য আমাকে বাড়ীতে ডেকেছিস?
-ও তুই রাগ করলি? অত রাগটাক করে না মেরী জান।
-মিনু তুই কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস।
-আচ্ছা দেব, তুই কেন আমাকে এত অবজ্ঞা করিস বলতো? কেন, তোর প্রেমে পড়েছি, এটাই আমার দোষ?
– না তুই ছাড় আমাকে। যেতে দে এখান থেকে।
-যেতে দেবো বলে তো ডাকিনি তোকে। তোর সাথে একটু প্রেমের খেলা খেলবো। মদ না খেয়েই আজকে মাতালিনী হয়ে গেছি।
-তুই মদ খাসনি?
-সত্যি খাই নি। বিশ্বাস কর।
-তুই দিনকে রাত করতে পারিস। নয়কে ছয় করতে পারিস। মিনু তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই।

মিনু এবার একটু খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো। আমাকে বললো, -শুধু শুধু আমার ওপরে রাগিস তুই। আমার জীবনের বড় স্বপ্ন তো তুই। আজ বাদে কাল তোরই হাতে হাত রেখে সপ্তবনী প্রহর পার হবো। তুই হবি আমার জীবনের জ্যাকপটের সবচেয়ে দামী ঘোড়া।

-মিনু তুই মদ খেয়েছিস। ইস কি নোংরা তুই। ছাড় আমাকে ছাড়।
-কেন রে দেব? আমাকে কি তোর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ্য মাগী বলে মনে হয়?
-মিনু আই সে স্টপ নাও। লিভ মি।
-উঃ গোঁসা দেখো ছেলের? বিদিশা কে পেয়ে যেন বড় অহঙ্কার তোর। কেন আমাকেও একটু ভালোবাসতে চেষ্টা কর। ‘দেব’ প্লীজ।
-মিনু তুই কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছিস।

মনে হচ্ছিল মিনুর গালে একটা চড় মেরে দিই। তখনো মারতে পারিনি। আমাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে মিনু। মুখটাকে আমার মুখের কাছে নিয়ে এসে মাকালীর মত জিভ বার করে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গী করতে লাগলো।

-আমার জিভটা জ্বলে যাচ্ছে দেব। দেখ একটু আগে লঙ্কা খেয়ে ফেলেছি। প্লীজ্ আমার জিভে তুই জিভ টা ঠেকা। আমাকে একটু আদর কর। বিচ্ছিরি আর বুনো আদর। শুয়োর যেমন শুয়োরের পেছনে পেছন ঠেকিয়ে আদর করে। ঠিক সেইভাবে তুই পারবি তো! আমার বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে, মাইরি দেব, তুই একটা ল্যাদল্যাদে পুতুল হয়ে যা। আমি তোকে ছিঁড়বো, চাটবো, চুষবো। আমি তোকে পায়ের নীচে ফেলে রাখবো পাপোশ করে। আমি তোকে মাথায় বসাবো। তুই হবি আমার গলার হার। তুই হবি আমার অন্তবাস। হবি তো?

-তুই এসব খারাপ খারাপ কথা বলার জন্য আমাকে বাড়ীতে ডেকেছিস?
-ওফঃ। পারি না দেব। তুই যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানিস না। সবই জানিস। অথচ বিদিশার জন্য সব রেখে দিয়েছিস। বিদিশার কি দেখে মজেছিস তুই? বল না রে দেব? যেভাবে ও তোর ঘাড়ে চেপে বসেছে, যেন কচি লেবুর সাথে প্রথম বৃষ্টির মেলামেশা। ও যেন তোর এই ঠোঁটদুটো থেকে মধু চুরি করে নিয়েছে। হ্যাঁ রে দেব? তুই কি অসভ্য মাইরী। তুই কি পুরুষ বেশ্যা নাকি? বিদিশাকে এতসব দিলি কেন? আমার জন্য তো কিছু রাখতে পারতিস।

মিনুর কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম ও আমি আসার আগেই মদ খেয়েছে অনেকটা । অসংলগ্ন কথা বলছে, কথা জড়িয়ে আসছে। পেটের ভেতরে যেন ধাকতিনাকতি ধাকতিনাকতি শুরু হয়েছে। উল্টে আমাকেই বলে বসল। ‘এ আমার কি হল দেব? কথাগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে কেন? তুই আমাকে গুন করেছিস? বল না দেব, তুই কি করেছিস আমার?

আমার মুখটা তখন এত কঠিন হয়ে গেছে, আগে কোনদিন হয় নি।

মিনু বললো, ‘ওহ্ তুই কি কিউট রে? দেখি তোর বুক দেখি। তোর বগল দেখি।’
বলে আমার জামার বোতাম গুলো সব খুলতে লাগলো পট পট করে। মিনু প্রচন্ড আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। আমি ওর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করবো না ঠেলে দূরে সরিয়ে দেবো বুঝতে পারছি না।

মিনু বললো, ‘দেব তুই কিন্তু স্টেডী থাকবি। আমি তোকে সিডিউস করছি বলে ঘাবড়ে যাস না। তাড়াহূড়োতে তুই আবাব বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করিস না। তাহলে কিন্তু আমি খুব রেগে যাবো। তুই তো জানিস, মেয়েদের সেক্স আসতে আসতে ওঠে। একটা বিন্দুতে পৌঁছে যাবার পর অনেক্ষণ স্ট্রে করে। তোদের মতো দুম ধড়াস কেলাস হয়ে যায় না।’

মিনু আমার জামাটা প্রায় খুলে ফেলেছে। বুকে একটা চুমু খেয়ে বললো, দেব, তুই মাইরি দারুন সেক্সী। আমার ভাগ্য ভালো বলতে হবে। তোর পেছনে এতদিন শুধু ঘুরঘুর করেছি, আমি কিনা সত্যি- দেব আজ তুই আমার সাথে বিট্রে করিস না প্লীজ।’

মিনু আমার মুখের মধ্যে জিভটা ঢুকিয়ে দিল জোর করে। আমাকে বললো, ‘দেখ, আমি কেমন মুখরোচক চানাচুর। আমাকে খেতে তোর দারুন লাগবে।’

ঠিক ঐ মূহূর্তে মিনুকে আমার একটা বেশ্যা বলে মনে হচ্ছিল। গালে একটা চড় মারতে গেলাম। মিনু চড়টা খেলো না। তার আগেই ওর কলিং বেলটা বেজে উঠলো। মিনু আমাকে ছেড়ে দিয়ে নিজেই দরজা খুলতে লাগলো। দরজা খুলতে গিয়ে আবার একটু টলেও গেল। দরজার সামনে বিদিশা দাঁড়িয়ে। আমি হতবাক। স্তম্ভিত হয়েগেছি বিদিশাকে দেখে। বুঝতে পারছি না ও কি করে এখানে এলো?

মিনু বিদিশাকে দেখে বলে উঠল। ‘কি চাই এখানে? ভাগো ভাগো। এটা তোমার জায়গা নয়। আমার দেবের ওপরে গোয়েন্দাগীরি? সারাটা দিন চিপটে বসে আছিস ওর সাথে। এখানেও রেহাই নেই?’

বিদিশার চোখ মুখ দিয়ে তীব্র ঘেন্না ছড়িয়ে পড়ছে। আমি বুঝতে পারছি না, বিদিশা আমার খোঁজে এখানে কি করে চলে এলো?

ভেতরে ঢুকলো না বিদিশা। আমাকেও কিছু বলার সুযোগ দিলো না। মিনুকে বললো, ‘বড্ড ভুল হয়ে গেছে আমার। ভুল জায়গায় এসে পড়েছিলাম। সরি। আমি চলে যাচ্ছি।’

পেছন থেকে বিদিশাকে ডাকছি,’ বিদিশা যেও না। প্লীজ, প্লীজ। আমার কথা শোনো।’
মিনু তখন আমার জামাটা শক্ত করে ধরে রেখেছে, যাতে ছুটে আমি বিদিশার কাছে যেতে না পারি।

কখনো ভাবিনি, একটা ছোট্ট অঘটনই জীবনে বিষাদ ডেকে আনতে পারে। বিদিশা আমাকে ভুল বুঝলো। আমি তো কোনো নোংরামো করিনি মিনুর সাথে। মিনু শেষ চালটা দিয়ে হাসিল করতে চেয়েছিল আমায়। যখন দেখলো ও আর পারলো না। আশা ছেড়ে দিল। অথচ বিদিশা ভুল বুঝে আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।

বাড়ি ফিরে বিদিশাকে অনেক ফোন করার চেষ্টা করেছি সেদিন। বিদিশা ফোন ধরেনি। ল্যান্ডফোনের রিসিভার তুলে রেখে দিয়েছিল। আমার মনে হল শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস নিতেই পারলাম না। পকেট থেকে রুমাল বার করে চোখের ওপর চেপে ধরলাম। নিরুদ্ধ অশ্রু বাঁধ ভেঙে ঝরে পড়তে চাইছে। রুমাল দিয়ে সেটাকে আটকাতে চাইছি। একটা দূঃসহ বেদনার ভারে হৃদয়টা যেন গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। মনে হল, বিদিশা তো আমার কাছে এখন নেই। থাকলে হয়তো বলতো কেঁদো না, তাহলে আমি কষ্ট পাবো।

আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমি আমার কান্নাটাকে রোধ করতে পারলাম না। চোখ থেকে রুমালটা সরিয়ে নিলাম। ধীরে ধীরে আমার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো। এক একটা করে ফো’টা ঝরে পড়তে লাগলো।

প্রচন্ড একটা ব্রেক কষে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমার যেন হোশ ফিরলো। কোথায় যেন এতক্ষণ হারিয়ে গিয়েছিলাম এতক্ষণ, সেই অভিশপ্ত দিনটাতে। এমন জোরে ব্রেক কষেছে গাড়ীটা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সি ওয়ালা বললো, দেখেছেন, কিভাবে এরা গাড়ী চালায়? আর একটু হলে গাড়ীর তলায় যাচ্ছিল আর কি? আমরা নিজেরাও দুজনে মরতাম সাথে এও।

দেখলাম এক মটর সাইকেল আরোহী খুব জোরে বাইক চালিয়ে একেবারের ট্যাক্সির সামনে চলে এসেছে। ট্যাক্সি ওয়ালা পাশকাটাতে গেলে পাশের লাইটপোষ্টটায় ধাক্কা মারতো। সামনের কাঁচটা গুঁড়িয়ে যেতো। তারপরে কি হত আমি জানি না। ট্যাক্সিওয়ালাকে খুব ভালো বলতে হবে। সময় মত ব্রেক কষে ছেলেটার প্রাণটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে আমারও। নইলে অকালে চলে যেতো প্রাণটা।

শুভেন্দুর বাড়ীর খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। ট্যাক্সিওয়ালাকে বললাম, ‘দাদা আপনি আমার খুব উপকার করলেন আজকে। বেঁচে না থাকার মতই বেঁচেছিলাম এতদিন ধরে। যার সাথে দেখা হবে বলে যাচ্ছি। তারজন্যই বাঁচাটা আমার নিতান্তই দরকার ছিলো।’

পর্ব ৩ সমাপ্ত

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s