লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ৭


স্বল্প বিরাম

দুপুরের পরেই বন্দনার বাবা মা দুর্গাপুর পৌঁছে যান। মা মেয়ের কান্না দেখে স্যামন্তক চুপ করে থাকে। বন্দনার মা জিজ্ঞেস করেন স্যামন্তক কে “আচ্ছা বাবা, তুমি কি করে পেলে ওকে?”

স্যামন্তক একবার বন্দনার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মাকে উত্তর দেয় “ওতো গতকাল দুপুরে শান্তিনিকেতন যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলো সেই সময়ে বাথরুমে পরে যায় আর মাথা ফেটে যায়। তাই ওর যাওয়া হয়নি। কাল রাতে আমাকে বলে যে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। তাই তো জোর করে ওর কাছ থেকে আপনাদের ফোন নাম্বার নিয়ে আপনাদের ফোন করা।” এতো বড় ঘটনাটা লুকিয়ে রেখে, অবান্তর অজুহাত দেবার পরে স্যামন্তক একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বুকের ভেতরে অনেকক্ষণ থেকে একটা বড় পাথর পড়েছিল কি জিজ্ঞেস করবে, কি উত্তর দেবে ও। হোক না মিথ্যে কিন্তু মেয়েটাকে তো কারুর সামনে মাথা নিচু হয়ে থাকতে হবেনা, নিজের সামনে না।

সন্ধ্যের পরে বন্দনার বাবা মা ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। স্টেশান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে স্যামন্তক। গাড়িতে চড়ার আগে পর্যন্ত বন্দনা ওর পাশ ছাড়তে চায়না। ট্রেনে উঠে পড়ার সময় স্যামন্তকের মুখটা খুব ছোটো হয়ে যায়। বন্দনার মনের ভেতরটা দুমড়ে ওঠে। জল ভরা চোখ আজ, দুরে চলে যাবার করুন সুর বেজে ওঠে বন্দনার বুকের মাঝে। ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল আর কড়ে আঙ্গুল দিয়ে ফোনের ইশারা করে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা স্যামন্তকের দিকে “আমাকে ফোন কোরো আমি অপেক্ষায় থাকবো।”

আজ আর পিছিয়ে থাকে না স্যামন্তক, হাত নেড়ে জানিয়ে দেয় “হ্যাঁ আমি করবো।”
শূন্য ঘর, এতো দিন এই ফাঁকা ঘরে ছিল স্যামন্তক, এক দিনের জন্য মনে হয়নি ঘরটা কত খালি, আজ যেন বাড়ি ফিরে ঘরটা অতিরিক্ত খালি খালি মনে হয়। জানালা, দরজা, দেয়াল পর্দা সব যেন ওর থেকে দুরে মুখ করে বসে আছে। আজ আর ঘরের লাইটগুলো জ্বালাতে ইচ্ছে করল না। চুপ করে এক কাপ কফি বানিয়ে বারান্দায় বসে পড়লো। কত সময় কেটে গেলো মনে পড়েনা, ফোনের আওয়াজে নিজেকে ফিরে পায় স্যামন্তক।

“কিরে এতো বার করে ফোনটা বেজে গেলো উঠাচ্ছিস না কেন?” পুবালির ফোন।

বিষণ্ণ মন, ভারাক্রান্ত হৃদয় তাও নিজের ভাবটা লুকিয়ে রাখতে হবে। দিদিকে বললে কি মনে করবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন সময় আসেনি দিদিকে বলার “না রে আমি একটু ছাদে ছিলাম।”

গলার আওয়াজ চাপা, কিছু তো লুকচ্ছে ছেলেটা কিযে করে “তোর কিছু একটা হয়েছে, তুই আমাকে বলবি না?”

এক বার ভাবে বলে দেবে, কিন্তু কি বলবে দিদিকে, তাও সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বলে “বন্দনা এসেছিলো বাড়ি থেকে পালিয়ে, নিরুপমের কাছে।”

“কি” আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে পুবালি “কবে এসেছিলো?”

—“গত পরশু রাতে, ঐ যেদিন খুব ঝড় হচ্ছিলো আর তুই ফোন করেছিলিস।”

—“তারপরে কি হল?”

“চলে গেলো আবার কি হবে।” ব্যাস এইটুকু জানিয়ে দেয় স্যামন্তক, একেবারে মিথ্যে নয় তবে শুধু সত্যটা লুকিয়েছে।

বন্দনার বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। বাবা মা মেয়েকে ফিরে পেয়ে বেশ খুশী আর তার সাথে এটা জেনে খুশী যে নিরুপমের সাথে ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বন্দনা খাওয়ার পড়ে নিজেকে নিজের ঘরের মধ্যে বন্দি করে নেয়, খুব ফাঁকা লাগে মনের ভেতরটা, এই দু’দিনে জীবনের স্রোতে অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পাড় করে এল। হটাৎ করে মনে হল, কত ভুল কত পাপ করেছে, সেই সব ভুল আর সেই সব পাপ আর কারুর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ও ঠিক করে নেয় যে জীবনে আর কাউকে ভালবাসবে না, স্যামন্তক ও নয়। অনেক ভালো ছেলেটা, ঐ ঝড় মাথায় নিয়ে বোলপুর থেকে রাতে নিয়ে এসেছে, ফিরিয়ে দিয়েছে ওকে ওর বাবা মার কাছে। সব কিছু ঢেকে রেখে ওকে আবার করে জীবনে ফিরে যেতে বলেছে। কিন্তু কি করে ভুলবে সেই সুমধুর রস যেটা ওর আধর ওষ্ঠ তে লেগে রয়েছে। বারে বারে মনে পড়ে যায়, কত নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরেছিল, এত আলতো করে চুমু টা খেয়েছিল যেন মনে হয়েছিল যে ওটা ওর ঠোঁট নয়। চুপ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়, ভাবতে থাকে, কত জোরে জড়িয়ে ধরেছিল মনে হচ্ছিল যেন একটু হলে ও গলে যাবে আর স্যামন্তকের বুকের ওপরে মিশে যাবে। কি করছে ছেলেটা একা একা, নিশ্চয় ওর কথা মনে করছে, একবার ফোন তো করতে পারে করলনা তো এখন।

“এই জেগে আছিস নাকি” মা ডাক দেয় বন্দনা কে “স্যামন্তক ফোন করেছে?”

এক লাফে হ্রিদস্পন্দনটা যেন শত গুন বেড়ে যায় গলা কেঁপে ওঠে উত্তেজনায় “না ঘুমোই নি।” তাড়াতাড়ি করে ফোনটা ধরে “কি করছিলে এতক্ষণ?”

“নাথিং এজ সাচ, জেগে ছিলাম ঘুম আসছিল না তাই।” আওয়াজটা অনেক ফাঁকা ফাঁকা শোনায় “ঠিক করে পৌঁছে গেছ?”

“হ্যাঁ” উত্তর দেয় বন্দনা, বুকের মাঝে একটা তোলপাড়, সত্যি কি ও স্যামন্তকের আওয়াজ শুনছে? “কেন ঘুম আসছিল না?”

—“জানি না কেন, আজ ঘরটা অনেক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।”

—“খেয়েছ?”

—“হ্যাঁ খেয়ে নিয়েছি।”

একটু মজা করে জিজ্ঞেস করে বন্দনা “সত্যি বলছ না কি ফাঁকা ঘরে না খেয়ে শুধু সিগারেট খেয়ে কাটাচ্ছ?”

বন্দনার গলা শুনে চারদিকে শূন্য ভাবটা অনেকটা কেটে যায়। একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের বুকের ওপরে হাত বোলায় স্যামন্তক ঠিক যেখানে বন্দনাকে জড়িয়ে ধরেছিল। ঠোঁট দুটি যেন মধু দিয়ে ভরা আর ঠিক যেন গোলাপের পাপড়ির মতন নরম। প্রথম বার বেশি জোরে চুষতে চায়নি, যদি ঠোঁট দুটি ছিঁড়ে যায়? কি বোকা ছেলে নিজেই হেসে ফেলে “তুমি কেন ঘুময় নি? অনেক তো ঝড় ঝক্কি গেছে।”

ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরে চুপিচুপি বলে “জানিনা, এমনি এমনি ঘুম আসছিল না। পুবালি কি ফোন করেছিল?”

—“হ্যাঁ দিদিকে বলেছি?”

ভয় পেয়ে যায় বন্দনা, পুবালি কে বলে দিয়েছে? খুব রাগ হয় স্যামন্তকের ওপরে, ওযে কথা দিয়েছিল যে কাউকে কিছু বলবে না। একটু রাগত স্বরে বলে “সব বলে দিয়েছ? কথাটুকু রাখলে না আমার?”

—“রেগ না, আমি সে রকম কিছু বলিনি।”

“জানিনা কাকে কতটা বিশ্বাস করব আর।” একটু হতাশ সুরে বলে বন্দনা। সত্যি কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে নয়। চোখ বন্দ করে মনপ্রান সঁপে যাকে ভালবেসেছিল সে তো এতো বড় ধাক্কা দিল যে নিজের শিরদাঁড়া পর্যন্ত ভেঙ্গে গেছে। লোকের সামনে মুখ দেখানর শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলেছে বন্দনা।

—“এ রকম ভাবে কথা বল না। আমি তোমার এই আওয়াজ শুনতে এতো রাতে ফোন করিনি।”

—“কিন্তু পুবালি কে এটা তো জানিয়েছ যে আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছি।”

একটা বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে উত্তর দেয় স্যামন্তক “হ্যাঁ, এটা আমাকে বলতে হত। দিদিকে আমি পুরো মিথ্যে কথা বলতে পারিনা। আমি সত্যিটা লুকিয়েছি, মিথ্যে কিছু বলিনি।”

তাহলে বন্দনা এবারে পুবালির চোখে অনেক নিচু হয়ে যাবে, পুবালি জেনে গেছে যে ও বাড়ি থেকে পালিয়েছে “ফোন রাখ, তুমি তোমার দিদিকে নিয়ে থাকো।” এই বলে ফোন রেখে দেয় বন্দনা।

মনটা বড় বিষিয়ে যায় স্যামন্তকের, দিদির কাছে আজ পর্যন্ত কিছু লুকায়নি। শ্যামলীর সাথে যখন ওর সম্পর্ক ছিল সেটা সব থেকে আগে দিদিকে জানায়, সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার পড়ে দিদি ওকে বুঝিয়ে আবার পড়াশুনাতে মন বসায়। আজ এমন কি বলেছে বন্দনার নামে যে মেয়েটা তিতিবিরক্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দিলো? পুরো কথাটা পর্যন্ত শুনল না, দিদিকে একদিন না একদিন তো জানাতে হত।

বাড়ি ফিরে বন্দনা নিজেকে একটা শামুকের মধ্যে লুকিয়ে নেয়। একজন কে বিশ্বাস করে সব হারিয়েছে, আর একজন কে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল কিন্তু সেটাও পারল না। মমতাশংকরের নাচের ট্রুপ ছেড়ে দেয় বন্দনা। বাবা মা কে একবার অনুরোধ করে যে ডিব্রুগড় ফিরে যাবে, সেখানে যে নাচের স্কুলটা খুলেছিল সেখানে নাচ শেখাবে। বন্দনার কথা শুনে ওর বাবা মা খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েন। অনেকবার বলে বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না ওকে।

দুর্গাপুর থেকে চলে আসার পড়ে, স্যামন্তক বেশ কয়েক বার ফোন করেছিল। স্যামন্তকের গলার আওয়াজে কেমন যেন প্রতারণার ছায়া দেখতে পেত তাই আর নিজেকে খুঁজতে চেষ্টা করেনি। বাড়ি ছাড়া আর হল না বন্দনার বাবা মায়ের মুখ দেখে।

এর মাঝে স্যামন্তকের কলেজের রেসাল্ট বের হয়,ও জানে যে রেসাল্ট ঠিকঠাক হবে, সে নিয়ে অত মাথা ঘামায় না। যেটা ওর সব থেকে বেশি ছিন্তার বিষয় সেটা হচ্ছে একটা চাকরি পাওয়া। দিল্লি এবং পুনের ইন্টারভিউর উত্তর এখনো কিছু আসেনি, দু’বাড়ির ফোন নাম্বার দেওয়া আছে সব জায়গায়। ফোন করে কলেজের বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে নেয় যে রেসাল্ট ঠিকঠাক হয়েছে। আনন্দিত মনে পূবালীকে ফোন করে জানিয়ে দেয় রেসাল্টের কথা। বন্দনাকে ফোন করেনা স্যামন্তক, এমনিতে মেয়েটা ভালো ভাবে কথা বলছেনা, দেখা না করে কিছু জানানো ঠিক হবে না।

একদিন বিকেল বেলা ফোন করে স্যামন্তক “হ্যালো, কেমন আছো?”

ভারী গলায় উত্তর দেয় বন্দনা “কি হয়েছে বল।”

“জেঠু জেঠিমা ফিরে এসেছেন, আমি কাল কোলকাতা ফিরে যাচ্ছি। বিকেলবেলা দেখা করতে পারি কি তোমার সাথে?” আওয়াজে বেশ উচ্ছাস ভরা, মনটা বেশ উৎফুল্ল স্যামন্তকের।

কেমন যেন হয়ে যায় বন্দনা, ভাবে কেন দেখা করবে ওর সাথে “কেন দেখা করবে আমার সাথে?”

আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে স্যামন্তক “মানে? কি বলছ তুমি, কি হয়েছে তোমার? তুমি আমার সাথে দেখা করতে চাও না?”

এক বার ভাবে বন্দনা, ঠিক আছে এক বার দেখা করা যাক “ঠিক আছে কাল বিকেলে আমি দাঁড়িয়ে থাকবো বিড়লা মন্দিরের সামনে।”

আগস্টের প্রথম সপ্তাহ, কলকাতার আকাশে এখন কালো মেঘের ভিড়, কোন ঠিক নেই কখন নামে আর কখন ধরে। সকাল থেকে গুমোট মেরে আছে আকাশ, ধুসর মেঘে ঢাকা, সূর্য ঠিক ভাবে দেখা দিতে পারেনি।

সকালবেলা উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে বন্দনা, আকাশের গুমোট মেঘের মতন ভরে যায় মনটা। গত পনেরদিনে একবারের জন্য ঘর থেকে বের হয়নি। এমনিতে কলকাতায় নতুন, রাস্তা ঘাট বিশেষ চেনেনা। শপিং বলতে মাঝে মাঝে গরিয়াহাট যাওয়া হয় মায়ের সাথে না হলে ট্রায়ঙ্গুলার পার্কে পাশে বাজার করতে যাওয়া। নাচের স্কুলটা বাড়ির কাছেই ছিল হিন্দুস্তান রোডের ওপরে।

বন্দনার মনে সেই উৎফুল্ল আর নেই, হারিয়ে গেছে চিরদিনের মতন। বিকেল ঠিক তিনটের সময় স্যামন্তক ফোন করে “আমি বের হচ্ছি আর আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবো, তুমি রেডি তো?”

নিরস বন্দনা উত্তর দেয় “ঠিক আছে।” বন্দনার গলার আওয়াজে যেন দায় সারা ভাব।
স্যামন্তক বেশ জোর দিয়ে বলে “তোমার ইচ্ছে নেই সেরকম তাই তো, কিন্তু আমি দেখা করতে চাই, সুতরাং তুমি আসবে।”

একটু খানি রেগে ওঠে বন্দনা “তুমি আমার ওপরে জোর দেখাচ্ছ?”

“তাই যদি তোমার মনে হয়ে থাকে, তাহলে তাই। আমি বের হচ্ছি, আমি ওয়েট করে থাকবো, আসতে হয় এস না ইচ্ছে হলে আসবে না। পুরটাই তোমার ওপরে।” কথা বলতে বলতে কান গরম হয়ে যায় স্যামন্তকের, মেয়েটা সত্যি অকৃতজ্ঞ। এতো করে মন পাওয়া গেলনা। হতে পারে বন্দনা প্রবল বিষন্নতায় ভুগছে কিন্তু সেখান থেকে টেনে বের করার জন্য স্যামন্তক তো আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। না, দেখা না করলে মেয়েটা কে বার করা যাবেনা ওর মানসিক হতোদ্যম অবস্থা থেকে।

বন্দনা একটা সাধারন ঘিয়ে রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে বেড়িয়ে যায়। মাকে বলে যায় যে স্যামন্তক দেখা করতে আসছে। স্যামন্তক আসছে শুনে বন্দনার মা বলেন “একবার ছেলেটাকে বাড়ি নিয়ে আসিস।” শুনে বন্দনা একটু রেগে গিয়ে বলে “কেন তোমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে পুজো করবে?”

বিড়লা মন্দিরের সামনে পৌঁছে দেখে স্যামন্তক বাইকে হেলান দিয়ে বসে আছে একটা সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে। একটা সাদা সার্ট, হাতা গোটান আর গাড় নীল জিন্স পড়ে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চোখ বোলায় বন্দনা, প্রায় পনেরো দিন পড়ে দেখা। বেশ পুরুষালী গড়ন, ভালো লম্বা, চোখে চশমা। এই পনেরো দিনে একটা জোড়া গোঁফ গজিয়ে গেছে নাকের নিচে। দেখেই মনে মনে হেসে ফেলে, পাগল করার মতন চেহারা বটে স্যামন্তকের। এক মনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে আর আসে পাশের পথ যাত্রী গুলো কে বেশ মন দিয়ে দেখছে। বন্দনাকে এখন পর্যন্ত লক্ষ্য করেনি স্যামন্তক। নিজেকে ওর পাশে দাঁড় করিয়ে একবার ভাবতে চেষ্টা করে, বড় বেমানান লাগে ছবিটা। কেমন যেন ছন্ন ছাড়ার মতন সেজে এসেছে, মুখ টিপে হেসে ফেলে নিজের সাজ দেখে। এক দমকা বাতাসে বুকের ভেতর থেকে কালো গুমোট মেঘ উড়ে চলে যায় ঠিক তার সাথে এক গুচ্ছ চুল এসে ওর ডিম্বাক্রিত মুখমণ্ডল ঢেকে ফেলে। বাঁ হাত দিয়ে চুল সরাতে সরাতে এগিয়ে যায় স্যামন্তকের দিকে।

পেছন থেকে এসে, মাথায় আলতো করে ছাতা দিয়ে মেরে বলে “কি দেখছিলে?”

মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পেছন ঘুরে তাকায় স্যামন্তক “ওঃ তুমি এসে গেছ। মেয়ে দেখছিলাম, এই মারোয়াড়ীদের যা পাছা কি যে বলব। যেন এক এক টা কলসি।”

হাসি থামাতে পারে না বন্দনা “তুমি নাকি আমার জন্য এসেছ আর এসে কিনা মেয়েদের ওইসব দেখছ?”

স্যামন্তক মুখটা বন্দনার মুখের খুব কাছে নিয়ে এসে হেসে বলে “দেখলে তো, ঐ মুখে হাসি ফোটানর জন্য কত কি করতে হচ্ছে।”

চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে, কত ভুল বুঝেছে স্যামন্তককে, কত উল্টোপাল্টা কথা শুনিয়েছে, একবারও ফোনে ঠিক করে কথা বলেনি, সব সময় রাগ আর অভিমান করে কথা বলেছে তাও ছেলেটা দেখা করতে এসেছে, শুধু ওর মুখের হাসি দেখার জন্য। নাকের ডগা লাল হয়ে যায় বন্দনার, চোখ দুটি জ্বালা করতে থাকে। নিচের ঠোঁটটা ওপরের দাঁতের নিচে কামড়ে ধরে, জল টিকে গালের ওপরে গড়াতে দেয় না। স্যামন্তকের গভীর চাহনি ওর দু’চোখ ভেদ করে যেন ওর মাথার পেছনের খোঁপা দেখতে পাবে। ঐ দু’চোখের সামনে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে বন্দনা, আপনা থেকে মুখ নিচু হয়ে যায়।

“চল আগে বাড়ি যাই, তোমার মুড মনে হয় না আজ ঠিক আছে।” স্যামন্তক বলে বন্দনাকে।

“না পড়ে বাড়ি যাবে, মা এমনিতে তোমাকে নিয়ে একবার যেতে বলেছে।” বন্দনা বাইকের পেছনে উঠে বসে “চল কোথায় নিয়ে যেতে এসেছ।”

হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে এক কিকে বাইক স্টার্ট করে স্যামন্তক। বাঁ পাশে পা ঝুলিয়ে সামনের দিকে বেকে বসে বন্দনা। দু’হাতের নিচ দিয়ে নিজের দু’হাত গলিয়ে কাঁধটা জাপটে ধরে, সামনে ঝুঁকে নিজেকে স্যামন্তকের চওড়া পিঠের সাথে একত্রীত করে দেয়। স্যামন্তক পিঠের ওপরে বন্দনার নরম বুকের স্পর্শ অনুভব করে, তার সাথে অনুভব করে বাঁ কাঁধে থুতনি।

কানের কাছে মুখ নিয়ে বন্দনা নিচু স্বরে বলে “কি হল স্টার্ট করে কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে না কোথাও নিয়ে যাবে?”

বুক ভরে একটা বড় নিঃশ্বাস নেয় স্যামন্তক, বন্দনাকে তাহলে শেষ পর্যন্ত খুশী করতে পেরেছে। জিজ্ঞেস করে “কোথায় যেতে চাও?”

বাইকটা ধিরে ধিরে হাজরা রোডের ওপরে চালাতে থাকে। থুতনি দিয়ে আলতো চাপ দেয় বন্দনা স্যামন্তকের কাঁধের ওপরে “আমি কি জানি কলকাতার, তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে যাবো।”

—“এক কাজ করি, আকাশের অবস্থা তো ভালো নয়, চল আউট্রাম ঘাটে একটা স্কুপ আছে সেখানে।”

স্যামন্তকের ঘাড়ের পেছনে নিজের গাল চেপে ধরে বসে থাকে, শরীরের উষ্ণতাটুকু নিজের গালের মধ্যে শুষে নিতে চায়। ঘাড়ের ওপরে বন্দনার গরম নিঃশ্বাস আর নরম গালের স্পর্শানুভব, স্যামন্তক শরীরে এক শিহরণ ছড়িয়ে দেয়। কেউ যেন জ্বলন্ত লাভা ঢেলে দিয়েছে ওর ঘাড়ে পিঠে বুকে। চোয়াল শক্ত করে নিজেকে শাসন করে স্যামন্তক, বাছাধন বাইক চালাচ্ছ সাবধানে চালাও।

বন্দনার মাথার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের ওপরে এসে পড়ে, কিছু উড়ে স্যামন্তকের ঘাড়ের ওপরে চলে আসে। বুকের মাঝে এই বিকেল পর্যন্ত যে কালো মেঘ জমে ছিল সেটা আর নেই, কোথায় উড়ে গেছে কে জানে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় বন্দনা, খুব ইচ্ছে হয় দুই হাত দিয়ে পিষে ফেলতে। শার্ট ভেদ করে শরীরের উষ্ণতা যেন সারা বক্ষের ওপরে উপচে পড়ছে। ইচ্ছে করে একটু দুষ্টুমি করতে, সুগোল বক্ষ দুটি চেপে ধরে পিঠের ওপরে, দেখা যাক না ছেলেটার কত নিয়ন্ত্রণ আছে নিজের ওপরে। মাঝে মাঝেই ঘাড়ের পেছনে গাল ঘষে দেয়। চারদিকের ঠাণ্ডা হাওয়া আর যেন ঠাণ্ডা নেই, দুজনার শরীরের ঘর্ষণে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চারদিক।

ঠিক রেস কোর্সের পাশে বাইকটা একটু ধিমে করে স্যামন্তক, মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখে বলে “তখন থেকে শুধু বদমাইশি করা হচ্ছে, হ্যাঁ। একবার হাতে পাই সব দুষ্টুমি দেখিয়ে দেব।”

স্কুপের সামনে বাইক পার্ক করার সময় আকাশের দিকে তাকায় বন্দনা, ধূসর মেঘ একটু জমাট বেঁধে আসছে। একটু আগে পর্যন্ত জলীয় হাওয়া বয়ে আসছিল গঙ্গাবক্ষ থেকে, সেটা যেন থমকে গেছে। স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বন্দনা “এই, বৃষ্টি আসবে না তো?”

মজা ছলে উত্তর দেয় স্যামন্তক “আচ্ছা মেয়ে তো তুমি, আমাকে কি বৃষ্টি জানিয়ে আসবে নাকি, যে আমি জানবো।”

ছাতা দিয়ে হাতের ওপরে মারে বন্দনা “ধুর, আমি তো আকাশ দেখে জিজ্ঞেস করলাম।”
ছাতার মার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে হেসে বলে “আগে ঠিক কর কাকে জিজ্ঞেস করছ, আকাশকে না আমাকে?”

—“তোমার সাথে না, একদম কথা বলতে নেই।”

—“ও কে ম্যাডাম, কথা বলতে হবে না, ওপরে চলুন।”

স্যামন্তকের বাঁ হাতটাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে হাঁটতে থাকে বন্দনা। পশ্চিম দিকের কালো মেঘটা বড় সুন্দর দেখায়। দ্বিতীয় হুগলী সেতুর পেছনে আকাশটা যেন দু’ভাগ হয়ে গেছে। নিচে কালো জল, ওপরে কালো মেঘ, মাঝখানে সাদা দিগন্ত রেখা। আজ অনেক দিন পড়ে বন্দনা যেন প্রান ভরে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিচ্ছে। মনের অলিগলিতে যেন রক্ত কণা গঙ্গার ক্ষুদ্র তরঙ্গের ন্যায় ঢেউ খেলছে। ইস, বিকেলটা এক সময় শেষ হয়ে যাবে, যদি আর কিছুক্ষণ আগে আসতে বলত স্যামন্তককে, তাহলে আর একটু বেশি সময় বসতে পারত ওর সাথে। এর পড়ে তো আবার মা বলেছেন বাড়ি নিয়ে যেতে।

দু’তলায় উঠে বিশাল কাঁচের জানালার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে পড়ে। স্যামন্তক নিচে আইস্ক্রিমের অর্ডার দিয়ে উপরে আসে। বন্দনা নিজেকে একবার দেখে আর স্যামন্তকেকে এক বার দেখে, ধুর কত বেমানান লাগছে ওর পাশে, কেন মরতে এতো রাগ পুষে রেখেছিলো কে জানে। সাদা শার্টে যা দারুন দেখতে লাগছে ছেলেটাকে, বন্দনা আর চোখে শুধু দেখে যাচ্ছে আর ভেবে যাচ্ছে, বৃষ্টিটা যেন বাড়ি ফেরার পড়ে আসে, তাহলে রাতে দেরি করে বাড়ি ফিরবে স্যামন্তক। চোয়াল, চিবুক যেন কেউ ছেনি দিয়ে ক্ষুদে তৈরি করেছে, ইস লোকজন আছে পাশে নাহলে জড়িয়ে ধরে এখুনি একটা চুমু খেয়ে নিত। আবার কেমন গোঁফ রেখেছে, ওটাকে কামিয়ে দিতে বলতে হবে নাহলে মুখের মধ্যে ঢুকে যাবে, নাঃ বেশ পুরুষালী দেখাচ্ছে ঐ ঘন কালো গোঁফ জোড়ায়। স্যামন্তকের বাম বাজুটা দু’হাতে জড়িয়ে বাঁ কাঁধে মাথা রাখে বন্দনা।

স্যামন্তক বাঁ দিকে মাথা হেলিয়ে ওর মাথার ওপরে গাল রাখে। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে “কি হল, কিছু বলবে না। কত তো রাগ অভিমান করে বসেছিল আমার সাধের নর্তকী।”

—“বাহ্: রে, তুমি সব কিছু পুবালিকে বলে দিলে তো আমি রাগ করবো না।”

—“তুমি তো কিছু ঠিক করে শুনবে না তার আগেই ফোনটা কেটে দেবে, তো আমি কি করি।”

—“কি বলেছ ওকে বল।”

—“আর সে নিয়ে কথা বলে কি বিকেলটা মাটি করবে?”

কাঁধের গোলায় ঠোঁট, নাক ঘষে মৃদু স্বরে বলে “না আজ আর রাগ করার মতন মুড নেই।”

—“উফফফ্* রাখি কোথায় এ মেয়েকে।”

—“যেখানে খুশী। এখন বলত পুবালিকে কি বলেছ?”

—“আমি শুধু বলেছি যে তুমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছিলে, ব্যাস বাকি আর কিছু জানাইনি। যেটা তোমার বাবা মা জানেন সেটাই দিদি জানে তার বেশি কিছু নয়। আমার মনে হয় না যে দিদি কোনদিন দুর্গাপুর এসে শান্তিনিকেতন গিয়ে খোঁজ নেবে। এবারে শান্তি?”

আইস্ক্রিম খেতে খেতে আর গল্প করতে করতে অনেকটা সময় কেটে যায়, দু’জনের কারুর আর হুঁশ থাকেনা। ঠিক যখন বাইরে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে তখন দু’জনার মনে হয় যে বাড়ি ফিরতে হবে। বন্দনা, ছোটো ছোটো কাজল আঁকা ভীতি মাখা চোখে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “বাড়ি কি করে ফিরব?”

নিচে নেমে দেখে বাইরে ঝড় শুরু হয়ে গেছে তবে বৃষ্টি শুরু হয়নি। বন্দনাকে বাঁ’হাতে জড়িয়ে ধরে স্যামন্তক “ভিজে ভিজে ফিরব। যাচ্ছি তো তোমার বাড়িতে, সেটা অবশ্য বাবা মা জানেনা।”

একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বন্দনা “মানে? তুমি বলে আসনি যে তুমি আমার বাড়ি আসছ?”

হেসে বলে স্যামন্তক “তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি যদি বলি যে আমি দিদির বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছি, তো সহজেই প্রশ্ন উঠবে যে বান্ধবীটি কে। যখন জানবে যে তার নাম বন্দনা, আমার বোন দুয়ে দুয়ে চার করে খবর দিয়ে দেবে বম্বে, ব্যাস।”

হেসে ফেলে বন্দনা “বাঃহ বা দিদিকে এতো ভয়।”

মৃদু হেসে উত্তর দেয় স্যামন্তক “ভয় নয় ঠিক, ও হচ্ছে আমার মা দুর্গা, আমার রক্ষাকবচ।”

হাজরা ছাড়াতেই বৃষ্টি নেমে আসে, বালিগঞ্জ ফাঁড়ি বেশি দুরে নয় তাই দাঁড়াতে বারন করে বন্দনা। খুব ইচ্ছে হয় ওর এই রকম ভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে। সারা মুখে ঝাপটা মারে বিন্দু বিন্দু জলের ছাট, মাথার চুল কিছু ভিজে, কিছু গালের সাথে লেগে, কামিজটা ভিজে গেছে, জড়িয়ে ধরে থাকে স্যামন্তকের বুক পিঠ। ঠাণ্ডা বৃষ্টিতে যেটুকু উষ্ণতা শুষে নেওয়া যায় এই সময়ে।

বন্দনাকে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে বেশিক্ষণ বসে না স্যামন্তক। একটু খানি গল্প করে উঠে পড়ে। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে বন্দনা, চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে। দু’চোখ একটু খানির জন্য ছলছল করে ওঠে, এতো দিন পড়ে এলো, ধরে ঠিক রাখতে পারল না।

মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে “কাল আসবে?”

কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিচু গলায় উত্তর দেয় স্যামন্তক “ফোনে জানিয়ে দেব, এখন ঠিক করে বলতে পারছিনা।”

সিঁড়ি দিয়ে ল্যান্ডিংয়ের আড়াল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে বন্দনা, তারপড়ে দরজা বন্দ করে দেয়। আজ মনটা বড় উৎফুল্ল, যেন হাতে আকাশ ধরতে পেরেছে বন্দনা।
ধিরে ধিরে দেখা করাটা নিয়মিত হয়ে গেছে, একদিন যদি না দেখা করতে আসে স্যামন্তক তাহলে যেন রাতে ঘুম ঠিক ভাবে আসে না। বাইকের পেছনে চেপে এস্প্লানেড, কলেজ স্ট্রিট থেকে শ্যামবাজার, হাতিবাগান পর্যন্ত চষে বের হয়।

দিল্লির পাশে গুরগাঁও এক বহু জাগতিক আই.টি. সংস্থা থেকে অফার লেটার আসে স্যামন্তকের। বাড়ির সবাই খুব খুশী, তার সাথে একটু দুঃখ হয় সবার, বাড়ির এক মাত্র ছেলে। পূবালী খুব খুশী হয়, কিন্তু মনে মনে চেয়েছিল যে ভাইয়ের বম্বে বা পুনেতে চাকরি হোক যাতে পাশে থাকতে পারে। স্যামন্তক ভাবে কি করে বন্দনাকে এই খবর টা দেওয়া যায়, যদি জানতে পারে যে দুরে চলে যাচ্ছে তাহলে মেয়েটা বড় ভেঙ্গে পড়বে। ফোন করে জানায় স্যামন্তক, যে আজ ওকে একটা খুব বড় সারপ্রাইস দেবে। সেই শুনে বন্দনার মন খুশী তে নেচে ওঠে। স্যামন্তক চুমু খেয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত “আই লাভ ইউ” বলেনি। সেই তিনটি শব্দ শোনার অধীর আগ্রহে পরানে বাঁশি বেজে ওঠে। আজ তাহলে ওকে দিয়ে বলিয়ে ছাড়বে। কলেজের রেসাল্ট বের হয়ে গেছে তাও কিছু বলেনি, আজ ওর মাথা ভেঙ্গে সেই ট্রিট টা আদায় করতে হবে।

বন্দনা খুব খুশী, একটা গাড় নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে। চোখের কোলে কাজল, ঠিক পূবালীর বিয়ের সময় যেমনটি করে তিনটে ফুটকি এঁকে দিয়েছিল থুতনিতে, ঠিক সেই রকম করে তিনটে ফুটকি এঁকে এসেছে আজ। মাথার পেছনের বেনুনীটাকে সাপের মতন নামিয়ে দিয়েছে পিঠের ওপরে। ডান হাতে অনেক গুলো কাঁচের চুড়ি, বেশ সুন্দর সেজেছে। টেবিলে স্যামন্তকের সামনে বসে এক মনে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। যত বার দেখে, প্রত্যেক বার যেন চশমার পেছনের চোখ দুটি কেমন যেন মাতাল করে দেয়। বন্দনাকে ট্রিট দিতে নিয়ে যায় পার্কস্ট্রিটের এক বড় রেস্টুরেন্টে।

স্যামন্তক অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে বন্দনার রূপসুধা পান করে। বুকের ভেতরে তীব্র ইচ্ছে জাগে, নিজের বাহুবেষ্টনীতে আবদ্ধ করে পিষে ফেলে ওর কমনীয় কোমল শরীরটি। চুম্বনে চুম্বনে জর্জরিত করে দেয় ওর গাল আর ঠোঁট। চোখের দৃষ্টি আটকে যায় থুতনিতে এসে, মেয়েটা ঠিক সেদিনের মতন তিনটে ফুটকি এঁকেছে। মাতাল চোখ একটু নিচে নামতেই থমকে যায়, আজ যেন উপরি বক্ষ একটু বেশি উন্মচিত, ভরাট বুকের মাঝের খাঁজটা যেন হাতছানি দিয়ে আহ্বান করছে। চনমন করে গরম হয়ে ওঠে বুকের রক্ত, দাঁতে দাঁত পিষে লোভ সংবরণ করে স্যামন্তক।

মুখ লাল দেখে বুঝতে পারে বন্দনা যে একলা পেলে হয়তো আজ পাগল করে তুলত স্যামন্তক। দৃষ্টি রেখা যেন আগুন ধরিয়ে দেয় ওর উন্মচিত কোমল বক্ষে। লজ্জায় লাল হয়ে যায় মুখ।

“কি দেখছ, ঐরকম ভাবে?” কাঁপা গলায় নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে বন্দনা।

—“আজকে তুমি কি আমাকে পাগল করার জন্য এসেছ?”

আলতো হেসে উত্তর দেয় বন্দনা “হতে চাইলেও কিছু করার নেই।”

স্যামন্তক বন্দনার বাঁ হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চুমু খায়। ভিজে ঠোঁটের পরশে, কেঁপে ওঠে বন্দনা, সারা শরীরে খেলে বেড়ায় এক অদ্ভুত শিহরণ। নখের ডগা থেকে কাঁধ অবধি হাতের সব রমকূপ গুলো যেন খুলে যায়। স্যামন্তক বন্দনার হাত চেপে ধরে ঠোঁটের ওপরে তারপরে আলতো করে অনামিকা নিজের মুখের মধ্যে পুরে দেয়। বন্দনার সারা শরীর দুমড়ে কেঁপে ওঠে, কুঁকড়ে যায় চেয়ারে বসে। ডান হাতটা মুঠি করে নেয়, আপনা থেকে চোখ বন্দ হয়ে যায়।

মৃদু প্রতিরোধ জানায় “প্লিস করনা এই রকম। ছেড়ে দাও, নাহলে মরে যাবো।” হাতটা যত টেনে নিতে চায়, তত যেন চেপে ধরে স্যামন্তক। অনামিকা ভিজে চুপচুপ হয়ে গেছে স্যামন্তকের মুখের রসে। আর থাকতে না পেরে ডান হাত দিয়ে নাকে একটা ছোট্ট ঘুসি মেরে বাঁ হাত ছাড়িয়ে নেয় বন্দনা। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, এযে এক অদ্ভুত শিহরণ জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেল। বন্দনার বুকের মাঝে, মিলনইচ্ছুক বহ্নিশিখা ধিক ধিক করে জ্বলে ওঠে।

“কেন ডেকেছ আজ আমাকে?” কোলের ওপরে নিজের অনামিকা নিয়ে খেলতে খেলতে স্যামন্তকের দিকে মিষ্টি করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে। উত্তর শোনার অধীর ইচ্ছায়, মনের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে ওঠে। বলে ফেল না একবার, এত সুন্দর করে সেজে এসেছে শুধু স্যামন্তকের জন্য। তাও কেন এতো দেরি করছে বলতে। একি, কেন হটাৎ করে মুখ নিচু করে বসে আছে। বুকের মাঝে এক চিলতে রক্ত ছলাৎ করে উঠল, তাহলে কি স্যামন্তক আবার প্রতারণা করবে ওর সাথে? ওকি এটা বলতে এসেছে। টান টান হয়ে যায় বন্দনা, মুখ নিচু করে বসে কেন স্যামন্তক, কিছু বলছে না কেন।

“কি হয়েছে তোমার, কিছু বলবে তো?” ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে বন্দনা, বুকের মাঝে রক্ত উথাল পাতাল হয়ে আন্দোলন করছে, উত্তর চাই এখুনি না হলে এই সাজ, এই শৃঙ্গার সব মিথ্যে। অধীর উদ্বেগে তাকিয়ে দেখে

স্যামন্তকের চোখের কোণে একফোঁটা জল চিক চিক করছে। মাথার মধ্যে রক্ত চলাচল বন্দ হয়ে যায়। কাঁদ কাঁদ গলায় জিজ্ঞেস করে “কি হয়েছে তোমার?” হাত দুটি চেপে ধরে। স্যামন্তকের হাত দুটি অত্যধিক ঠাণ্ডা মনে হয়। “আমি আর এখানে বসতে চাইনা আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে চল যেখানে শুধু তুমি আর আমি। আমি জানতে চাই তোমার কি হয়েছে।”

হটাৎ করে এমন হয়ে গেল স্যামন্তক, এমনটি তো হবার কথা নয়। কিন্তু কি করে জানাবে যে দিল্লীতে চাকরি হয়েছে, কোলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই সংবাদ শুনে বন্দনা কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা একবার মনে মনে এঁকে নিতে প্রবল চেষ্টা করে স্যামন্তক। প্রানের নর্তকী ওর চেয়ে দেড় বছরের বড়, সুতরাং একটু বিচক্ষণ হবে নিশ্চয়। বন্দনা ঠিক বুঝবে যে দু’জনার ভালর জন্য, আগামি দিনের প্রস্তুতির জন্য ওকে যেতে হবে। বুক ভরে একটা বড় নিঃশ্বাস নেয় স্যামন্তক, ঠিক যেন গভীর সমুদ্রে ডুব দেওয়ার আগের প্রস্তুতি।

“আমি দিল্লির কাছে, গুরগাঁও একটা আই.টি. কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছি, কাল বিকেলে ফ্লাইট।” এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে বন্দনার দিকে, প্রানের নর্তকীর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য।

কথা শুনে একটু থমকে যায় বন্দনা, চুপ করে বসে থাকে, দশ দিন হয়ত ঠিক ভাবে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে পারেনি, এর মধ্যে চলে যেতে হবে ওকে। হাত দুটি গুটিয়ে নেয়, কাজলে আঁকা চোখ দুটি জলে ভরে যায়। চারপাসের লোকের আওয়াজ কান পর্যন্ত পৌঁছয়না বন্দনার। পৃথিবীটা হটাৎ করে অবিশ্বাসঃ ভাবে নীরব মনে হয়। মনে হয় ওর স্বপ্ন দ্বিতীয় বারের জন্য চুরমার হতে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়, মাথা নিচু করে বসে থাকে, দু’চোখের কোল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।

“আমি এখানে আর বসতে চাই না, আমি বাড়ি যাবো।” কাঁদ কাঁদ গলায় বলে বন্দনা।

—“কাবাবের অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে।”

—“তুমি খাও, আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা।”

কাবাব আসার পড়ে, কোনও রকমে খুঁটে খুঁটে দু’এক টুকরো মুখে পুরে বন্দনা বলল “বাড়ি যাবো।”

স্যামন্তক মনের ভাব টা বুঝতে পারে, কিন্তু নিরুপায়, যেতে হবে এবং মানাতে হবে আকাঙ্খিতা কে। প্রানের রমণীর চোখে জল নিয়ে কিভাবে অত দুরে থাকবে।

সারাটা রাস্তা চুপ করে, বাইকের পেছনে বসে, স্যামন্তককে জাপটে ধরে থাকে বন্দনা। মনে কত আসা নিয়ে এসেছিল, স্যামন্তক আজ ওকে জানিয়ে দেবে কত ভালবাসে, তার বদলে শুনাল বিচ্ছেদের সংবাদ। এমন ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে যেন ছাড়াতে গেলে বন্দনার শরীর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। বাড়ির সামনে বাইক থামানর পরে, নামার ইচ্ছে করেনা বন্দনার। এই রকম ভাবে জড়িয়ে ধরে যদি চলে যাওয়া যায় ওর সাথে, প্রানপন চেষ্টা চালায় নিজেকে ওর পিঠের সাথে মিলিয়ে দিতে, এক করে দিতে দুই শরীর। নিজেকে তরল করে নিয়ে ওর বুকে প্রলেপ হয়ে যেতে প্রবল ইচ্ছে করে।

মৃদু স্বরে বলে স্যামন্তক “বনা, বাড়ি এসে গেছে।”

ঠোঁট কামড়ে ধরে বন্দনা, এই প্রথম বার, একটি ছোট্ট দুষ্টু মিষ্টি নামে ডাক দিল স্যামন্তক, বনা। ফুঁপিয়ে ওঠে, ঘাড়ের কোলে মুখ গুঁজে কেঁদে ওঠে বনা “না নামবো না।”

—“প্লিস এই রকম ভাবে কাঁদেনা, বনা। আমি রোজ দিন ফোন করব, কথা দিচ্ছি।”

কলারে নাক চোখ ঘষে একাকার করে দেয়, চোখের কাজল শার্টের কলারে লেগে যায় “সত্যি বলছ?”

—“হ্যাঁ, এবারে নামো।”

ধিরে ধিরে নেমে সামনে এসে দাঁড়ায় বন্দনা। স্যামন্তক বাইক থেকে নেমে, ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলে “ভেতরে চল।” ঠিক সিঁড়ির ল্যান্ডিং এ দাঁড়িয়ে বন্দনার হাত ধরে টান দেয় স্যামন্তক। আছড়ে পড়ে বন্দনা, স্যামন্তকের বুকের ওপরে, খামচে ধরে শার্টের সামনেটা। স্যামন্তক দু’হাতে বন্দনার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের প্রসস্থ বুকের ওপরে টেনে নেয়। স্যামন্তকের মাথাটা যেন অনেক ওপরে মনে হয়, শার্টের কলার ছেড়ে, দু’হাতের দশটা আঙ্গুল দিয়ে মাথার চুল খিমচে ধরে, নিজের ঠোঁটের ওপরে টেনে নেয় ওর মুখ। গোলাপের পাপড়ির মতন কোমল লাল ঠোঁট দুটি চেপে ধরে, আলতো করে একটা কামর বসিয়ে দেয় স্যামন্তকের নিচের ঠোঁটে। ভাবাবেগ উপচে পড়ে, মত্ত হরিণীর ন্যায় চিবোতে থাকে ঠোঁট, পাগল হয়ে যাবে বন্দনা। দীর্ঘ থেকে দ্রীঘায়িত করার প্রবল চেষ্টা চালায় বন্দনা, এই চুম্বন যেন শেষ না হয়, কবে আবার বুকের মাঝে ফিরে পাবে মনের মানুষ টাকে, জানেনা। চুম্বনে চুম্বনে জর্জরিত করে তোলে স্যামন্তক প্রান প্রেয়সীর অধর ওষ্ঠ, শুষে নেয় মুখ গহ্বরের সুধা।

অনেকক্ষণ ধরে দু’জনা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপরে স্যামন্তক নিচু স্বরে বলে “আমাকে যেতে হবে, আর একদম কাঁদবে না, আমি কাল রাতে দিল্লি পৌঁছে ফোন করব। তুমি যেন এয়ারপোর্ট আসতে যেওনা তাহলে এক কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।” সিক্ত নয়নে বিদায় জানায় বন্দনা, তার হৃদয়টাকে যেন কেউ খুবলে নিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে।

সারা রাত ঘুমোতে পারেনা বন্দনা, বালিশ আঁকড়ে পড়ে থাকে। বুকের মাঝে তোলপাড় করে ওঠে রক্ত, আজ পর্যন্ত দু’জন এসেছে ওর জীবনে, দুজনেই কারন বশত দুরে চলে গেছে। এক জন চিরকালের জন্য, যেটা ভুলে যেতে চায়। এক জন কাল চলে যাবে, সেই কি পুরানো কালচক্র আবার ঘুরে ফিরে এক জায়গায় এসে দাঁড়াবে? আবার কি মানুষ চিনতে ভুল করেছে? স্যামন্তক যদি দিল্লী গিয়ে অন্য কাউকে দেখে ওকে ভুলে যায়, তাহলে আর বেঁচে থেকে কি লাভ? বিছানার এপাশ ওপাশ করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয়।
বিকেল বেলা, বোর্ডিং পাস পাওয়ার পরে ফোন করে বন্দনা কে “বনা, আমি দিল্লী নেমেই ফোন করবো।”

ফোনে স্যামন্তকের গলার আওয়াজ শুনে মনটা ব্যাকুল হয়ে যায়। কানের সাথে প্রানপনে চেপে ধরে রিসিভারটা, একবার যদি বিদ্যুৎ হয়ে এই তার দিয়ে ওর কাছে চলে যেতে পাড়ত কত ভালো হত “আই উইল মিস ইউ ভেরি মাচ।” বলতে বলতে গলা ধরে আসে বন্দনার।

দিল্লী নেমেই ফোনে জানিয়ে দেয় বন্দনাকে যে ঠিক করে পৌঁছে গেছে। গুরগাঁওএ বেশ বড় একটি আই.টি. কোম্পানিতে চাকরি পায়। ওখানেই সেক্টর 32 তে কয়েক জন অফিস কলিগের সাথে একটা মেস ভাড়া করে থাকে। কোলকাতা থেকে দিদির প্রেসেন্ট করা বাইক নিয়ে এসেছিলো, তাই অফিস আর মেস জাতায়াত করতে কোন অসুবিধা হয় না। তবে এই প্রথম কলকাতার বাইরে এসে মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছিল। বাজারে সবে নতুন রঙ্গিন স্ক্রিনওয়ালা মোবাইল ফোন এনেছে নোকিয়া। প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে একটা মোবাইল ফোন কেনে।

দিদিকে ফোন করে জানায় নতুন মোবাইলের কথা “জানিস আজ মোবাইল কিনলাম।”

ভাইয়ের জন্য মনটা খারাপ লাগে। একা একা বাইরে থাকে, কি খায় কখন বাড়ি ফেরে। এতদিন তো কাকু কাকিমার কাছে আর ওর কাছে থেকে মানুষ হয়েছে। গলা ধরে আসে “কখন বাড়ি ফিরেছিস, কেমন আছিস? মেসে ঠিক মতন খেতে দেয়?”

গলা ভারী শুনে স্যামন্তক জিজ্ঞেস করে “কিরে, তুই এতো ইমোশানাল হয়ে গেলি কেন?”

ওপারে চোখের কোল মুছতে মুছতে পূবালী বলে “তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছেরে।” বলেই কেঁদে ফেলে।

স্যামন্তক বুঝতে পারেনা কি বলবে দিদিকে, কি বলে শান্ত করবে, মনের ভেতর থেকে মুচড়ে একটা কান্না বেড়িয়ে আসে। এর পড়ে যদি আবার বন্দনা কে ফোন করে বলে তাহলে মেয়েটা আবার গলে পড়বে।

বন্দনা নিজের জমানো টাকায় একটা মোবাইল কেনে, যদিও কলকাতায় মোবাইলের ওতটা চল হয়নি, তবে মোবাইল হাতে দেখলে লোকেরা বেশ সম্ভ্রান্ত বলে ভাবে। প্রথম মাসে প্রত্যেক দিন ফোন করত স্যামন্তক। কাজের চাপে সেটা ধিরে ধিরে কমে গিয়ে এক দিন বাদে বাদে হয়ে ওঠে। বন্দনা উতলা হয়ে পড়ে শুধু ফোন আসার জন্য। নিজে যদি ফোন করে তাহলে কোন কোন সময় কেটে দিত কাজের চাপে। রেগে আরো দু’দিন কথা বলা বন্দ থাকতো দু’জনার মাঝে। এই ভাবে মানে অভিমানে কেটে যায় মাস দুয়েক। দিদিকে এখন বন্দনার বিষয় জানায়নি, স্যামন্তক। একটা ভয়ে আছে মনে মনে, যে দিদি শুনলে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আগে অনেক বার বারন করেছিল বন্দনার পেছনে যেতে, তখন সময় ছিল ভিন্ন এখন সময় ভিন্ন।

ঠিক পুজোর আগে পূবালী ফোন করে একদিন রাতে “এই জানিস একটা ভাল খবর দেবার আছে তোর কাছে।”

একদিকে বন্দনার ফোন আসেনি দু’দিন ধরে, রেগে আছে ওর প্রানের বনা, কেননা পুজোতে বাড়ি যেতে পারছেনা বলে। সবে চাকরিতে ঢুকেছে, ছুটি পাওয়া মুশকিল। একটু খানি বিষণ্ণ সুরে জিজ্ঞেস করে “কি হয়েছে বল।”

আওয়াজ শুনে ধরে ফেলে পূবালী যে ভাইয়ের কিছু একটা হয়েছে, যেটা অনেক দিন ধরে চলছে, কিন্তু কিছুতেই মুখ খুলছে না। এবারে দিল্লী গিয়ে সব কিছু ভালো ভাবে জানতে হবে।

পূবালী বলে “তোর জামাইবাবুর দেরাদুন হেডঅফিসে ট্রান্সফার হয়েছিলো তো সেটা না নিয়ে দিল্লীতে পোস্টিং নিয়েছে। লক্ষীনগরে অফিস, এবারে তুই আমার কাছে থাকবি।” দিদির গলায় খুশির আবেগ।

খবরটা শুনে আনন্দে ফেটে পড়ে স্যামন্তক “সত্যি বলছিস? মার কাটারি এবারে সিতাভ্রদার মাথাটা বেশ ভালো করে খাব।”

—“হ্যাঁ সত্যি। পুজোর পড়ে আমরা সিফ্ট করছি। একটা ফ্লাট দেখে রাখিস তো, যেখান থেকে তোর অফিস আর সিতাভ্রর অফিস কাছাকাছি হবে।”

মাথা চুলকোয় স্যামন্তক “আরে, আমি তো গুরগাঁও থাকি আর সিতাভ্রদার অফিস তো পুরো উলটো দিকে। আমি মেসে ভালো আছি, তোর জন্য নাহয় নয়েডা তে ফ্লাট দেখে দেব।”

রেগে যায় পূবালী “পাগল নাকি তুই? আমি দিল্লী থাকব আর আমার ভাই আমার কাছে থাকবেনা? আমরা দিল্লীর ম্যাপ দেখেছি। শোন নেক্সট উইকে সিতাভ্র দিল্লী যাচ্ছে, সি.আর.পার্কে একটা ফ্লাট দেখিস। কম্পানি লিজ দেবে চিন্তা কি।”

পুজোতে বাড়ি ফেরা হয়নি স্যামন্তকের, তাই নিয়ে বন্দনার খুব মন খারাপ। এমনিতে ছেলেটা আজকাল একদিন পর পর ফোন করে, তবে হ্যাঁ, ফোন করলে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে, যেন সারা দিনের ডায়রি খুলে বসে পড়ে। ফোনে কথা না বললে যেন রাতের ঘুম হয় না। বন্দনা একরকম, সবকিছু ছেড়েছুড়ে ঘরে বসে, নাচে আর মন বসে না, কিছুতেই আর মন বসে না। বাবা মা বিয়ের কথা বললেই, বলে যে আর বিয়ে করবে না। সত্যি কথাটা জানানর আগে স্যামন্তকের উদেশ্যটা জানার প্রয়োজন। এক বিষয়ে নিশ্চিন্ত যে দিল্লী গিয়ে ভুলে যায়নি স্যামন্তক, কিন্তু অন্য কিছু তো হতে পারে যা পূর্বে ঘটেছিল ওর সাথে। মাঝে মাঝে কেমন ভয় ভয় করে বন্দনার, আর সেদিন স্যামন্তক শত কথা বলেও বুঝিয়ে উঠতে পারেনা ওকে।

ঠিক পুজোর পড়ে পূবালী আর সিতাভ্র দিল্লী সিফ্ট করে। কম্পানি লিজে বেশ বড় একটা, তিন বেডরুমের ফ্লাট ভাড়া নেয় দিল্লীর নামকরা এক বাঙালি পরিবেষ্টিত জায়গায়। সিতাভ্র একটা গাড়ি কিনে ফেলে, হুন্ডাই এসেন্ট। স্যামন্তক গুরগাঁও এর মেস ছেড়ে চলে আসে দিদির সাথে থাকতে। পূবালীর কাজ বেড়ে যায় রোজ সকালে দু’দুটো টিফিন, তারপর বাড়ির কাজ। ভাইটা এমনিতে নিজের ঘরটাকে যা নোংরা করে রাখে তাতে রোজ দিন ঝগড়া হয়। অফিস থেকে ফিরে জুত ছুঁড়ে একদিকে ফেলে, জামাটা কোনদিন সোফায় পড়ে থাকে, কোনদিন ডাইনিং টেবিলে। বাইকের চাবি খুঁজে খুঁজে কি হোল্ডারে ওকেই ঝোলাতে হয়। তারপরে আবার রাত জেগে ফিসির ফিসির করে কার সাথে কথা বলে কে জানে। ভাই প্রেম করবে সেটা ওর জানা, কিন্তু ওর কাছে থেকে লুকিয়ে, আগে কোনদিন এইরকম ভাব দেখেনি।

সন্দেহ হয় একদিন, রাতে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে জিজ্ঞেস করে “এই শামু, রাতে কার সাথে অত কথা বলিসরে তুই?”

ধরা পড়ে গেছে স্যামন্তক, কি করে বলে আমি তোর বান্ধবীর সাথে প্রেম করছি। সিতাভ্র একবার তাকায় স্যামন্তকের দিকে তারপরে খাবার দিকে মন দেয়, পারতপক্ষে ভাইবোনের কথার মাঝে আসতে চায়না। রোজ সকালে এক চোট মারামারি করে স্যামন্তক অফিসে বের হবে আর বিকেলে অফিস থেকে ফিরে দেখবে যে ভাইয়ের মাথায় তেল লাগাতে বসে গেছে দিদি। তাই সিতাভ্র বুঝে গেছে যে এদের দ্বারা কিছু হবে না, এরা মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে নিজেদের ভালবাসা দেখায়।

স্যামন্তক আমতা আমতা করে উত্তর দেয় “কিছু না, আমার অফিস কলিগ।”

সিতাভ্র কানে কানে ফিস্ফিসিয়ে বলে “শালা, বলে দাও নাহলে সকাল বেলা আবার ঝ্যাঁটার বাড়ি খাবে।”

স্যামন্তক ভেবে কূলকিনারা পায়না, কি করে দিদির সামনে কথাটা পারবে যে বন্দনা কে ভালবাসে।

বন্দনাকে রাতে ফোন করে স্যামন্তক “বনা, দিদি কিছু আঁচ করেছে।”

আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে বন্দনা “তো, একদিন তো জানাতে হবে নাকি।”

—“কি করে বলি সেটা আমি বুঝে পাচ্ছি না।”

—“সেটা তো আমার জানার নয়, আর তুমি আমার নামে যা বলেছ পূবালী কাছে তারপড়ে আমি কি করে ওকে ফোন করি বলত?”

রেগে ওঠে স্যামন্তক, কতবার করে বলেছে যে দিদিকে কিছুই জানায়নি তাও বনা শুনবেনা “কতবার বলেছি যে আমি কিছুই জানাইনি দিদিকে তাও তুমি শুনবে না তাই তো?”
একটু ক্ষুণ্ণ মনে বলে বন্দনা “আমি কিছু জানিনা। বাবা মা আমার জন্য ছেলে দেখছেন। সেটা মাথায় রেখে যা করবার করো। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাইনা।”

একটা বড় নিঃশ্বাস নেয় স্যামন্তক, কিছুতেই ভেবে কোন উপায় বার করতে পারেনা যে কি করে দিদিকে জানাবে “ওকে আমি দেখছি। গুড নাইট।”

নভেম্বর শেষ হবহব করছে, দিপাবলির পরপর দিল্লীতে ঠাণ্ডা পড়ে যায়, কলকাতার মানুষের জন্য এখানকার ঠাণ্ডা একটু বেশি মনে হয়। এর পরের মাসে পূবালী আর সিতাভ্রর প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। কোলকাতা যেতে হবে, স্যামন্তককে দু’তিন বার বলে কোন লাভ হয়নি, ছেলেটার অফিস বড় বেখাপ্পা। এমন কাজের চাপ যে মাঝে মাঝে রাত দশটা, এগারটা বেজে যায় বাড়ি ফিরতে। ঐ ঠাণ্ডায় এতোটা রাস্তা বাইক চালিয়ে এসে কোন রকমে খেয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। শুধু শনি রবি বার টা একটু সময় পায় ঠিক করে নিঃশ্বাস নেবার। সারাটা দিন ধরে সোফায় শুয়ে পড়ে পড়ে টিভি দেখে। পূবালী কিছু বলেনা, বেচারা ভাইটা গত একমাসে অনেক শুকিয়ে গেছে, আবার পরের মাস থেকে নাইট ডিউটি পড়বে, সারা ডিসেম্বর ধরে।

ঠিক ঐ রকম এক শনিবার সকালে স্যামন্তকের ফোন বেজে ওঠে। পূবালী ফোন তুলে নাম দেখে, বনা। নামটা দেখে থমকে যায় পূবালী, এই কি সে বন্দনা শুধু মাঝের দুটো অক্ষর বাদ আছে? মানে বন্দনা কি এখন ওর ভাইয়ের বনা? জল এতদুর গড়িয়ে গেছে আর কিছুই জানেনা পূবালী। মনটা একটু খারাপ লাগে প্রথমে, একজন এক সময় ওর সব থেকে প্রিয় বান্ধবী বন্দনা আর একজন চোখের মণি, ভাই।

ফোন তুলে জিজ্ঞেস করে “তুই কি বন্দনা?”

কেঁপে ওঠে কান, কেউ যেন টেনে এক চড় মেরেছে বন্দনার কানে এমন মনে হয়। থমকে যায়, গলা থেকে আওয়াজ বের হয় না। আবার জিজ্ঞেস করে পূবালী “তুই কি বন্দনা?”
বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নেয় বন্দনা, ভালবাসে স্যামন্তককে তাহলে সেটা বলতে এতো গলা কাঁপছে কেন আজ? উত্তর দেয় বেশ জোর গলায় “হ্যাঁ আমি বন্দনা।”

আঁচ একটা কিছু করেছিল পূবালী নামটা দেখে জানতে পেরে একটু খানির জন্য থমকে গেল “তোদের কি ব্যাপার?”

নির্বিকার গলায় উত্তর দেয় বন্দনা “কি ব্যাপার আবার, এমনি ফোন করেছি?”

—“এমনি ফোন করেছিস মানে? আমাকে তো এতদিনে একবারো ফোন করিসনি, তো সামুকে কেন?”

“তাহলে তোকে এখন কিছু জানায়নি।” জিজ্ঞেস করে বন্দনা।

“কি জানাবে” বুঝেও না বোঝার ভান করে পূবালী।

—“তুই কি জানতে চাস সেটা বল।”

—“আমি জানতে চাই কত দিন ধরে ফোনে চলছে।”

—“জুলাইয়ে, আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে ছিলাম।”

“হ্যাঁ, সামু আমাকে বলেছিল।“ তারপরে গলার আওয়াজ বদলে যায় পূবালির “তখন থেকে? কিন্তু তুইতো…”

“হ্যাঁ আমি তো………” হেসে ফেলে বন্দনা “পালিয়েছিলাম আর বেঁচে গেছি একরকম ভাবে।”

—“কি করে, কি হয়েছিল?”

পুরান সব কথা জানায় পূবালী কে। সেই বিভীষিকা ময় দুঃস্বপ্নে ভরা রাতের কাহিনী। বলতে বলতে চোখে জল এসে যায়। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা পূবালী। ধুপ করে বসে পড়ে চেয়ারে, একবার চেয়ে দেখে স্যামন্তকের দিকে, একমনে সোফায় শুয়ে টিভি দেখে চলেছে। ভাইটা সত্যি কি দিয়ে তৈরি, ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারেনা।
ধরা গলায় জিজ্ঞেস করে বন্দনা “কিরে আছিস না কেটে দিয়েছিস ফোন?”

উলটো হাতে চোখ নাক মুছে বলে “না, আছি। তোদের দু’জন কে কিযে বলি।”

হাসি কান্না মাখানো গলায় বলে বন্দনা “তোর সাথে এত দিন পরে কথা বলে সত্যি খুব ভাল লাগছে।”

“তুই তো একরকম হারিয়েই গেছিলি। আমি তো ভেবেছিলাম হয়তো কোনদিন আর কথা হবেনা।” তারপরে হেসে ফেলে পূবালী “শেষ পর্যন্ত আমি যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হল। আমার ভাইটা শেষমেশ তোর প্রেমে পড়লো।”

—“যাঃ ঐ রকম ভাবে বলিস না, আমি পাগল হয়ে গেছি।”

—“হ্যাঁ তাতো বেশ বুঝতে পারছি। আমি ভেবেছিলাম যে তোর বরের সাথে মজা করব আর তুই কিনা, শেষমেশ আমার ভাই?”

—“আর বলিস না, কি খাইয়ে বড় করেছিলিস রে ভাইকে? কথায় কথায় শুধু দিদি দিদি করে?”

হেসে ফেলে পূবালী “আমাকে তো এখন কিছু জানায়নি রে।”

—“কি যে করি। এদিকে বাবা মা আমার জন্য ছেলে দেখছে আবার করে। আমি যত বার বলি, বল বল, কিছুতেই কিছু বলে উঠতে পারেনা। আমি তো সত্যি এবারে পাগল হয়ে যাব।”

—“আমি নেক্সট উইকে কোলকাতা যাচ্ছি, আমি তোর বাবা মায়ের সাথে দেখা করে সব বলে দেব চিন্তা নেই। আর আমার বাড়ি, সেটা একটু দেখে শুনে হ্যান্ডেল করতে হবে, এক মাত্র ছেলে তো তাই। তবে তুই এক কাজ কর, আজ রাতে ফোনে জোর ঝগড়া কর, বল যে দিদিকে দিয়ে ফোন করাও নাহলে তুই আর ওর সাথে কথা বলবিনা। ব্যাস তারপরে দেখি ছেলে কি করে।”

“মানে?” জিজ্ঞেস করে বন্দনা “আবার ঝগড়া, এমনিতে দেখা নেই কতদিন।”

“বাঃ বা মেয়ে দেখছি প্রেমের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছে।” একটু ঠাট্টার স্বরে বলে পূবালী।

“যাঃ বেশি বলিস না, তুই তো দু’মাস সিতাভ্র কে ছেড়ে ছিলিস, তখন কেমন লেগেছিল।” উলটো জবাব দেয় বন্দনা।

“আর বলিস কেন, পাগল হয়ে যাবার যোগাড় ছিল। রাত গুলো যেন আর কাটতো না। বিয়ের ছ’মাস পরে কি কেউ বউ ছেড়ে যায়?” বলতে বলতে মুখ লাল হয়ে যায় পূবালীর।

হেসে বলে বন্দনা “উম… তাহলে আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছিস।” কত দিন পরে দুই বান্ধবীর মধ্যে সেই পুরান ভাবে কথা হচ্ছে।

—“তোকে তো তাও সামু একদিন পড় পড় ফোন করে আমি তো চাতকের মতন বসে থাকতাম, কি করব আই.এস.ডি তো আর রোজ রোজ করা যায় না। তুই তো আমার চেয়ে ভালো আছিস।”

—“হ্যাঁ তা আর বলতে। জানিস প্রায় চার মাস হয়ে গেল দেখা হয়নি।”

“বাপ রে, এতো প্রেমের বহর।” যদিও জিজ্ঞেস করতে একটু লজ্জা করে পূবালীর, কারন ছেলেটা তো ওর ভাই, কি করে গোপন কথা গুলো জিজ্ঞেস করবে “কি করি বলতো? তোর সাথে ঠিক করে মজা করতেও পারবোনা আর, বড় অদ্ভুত সমস্যায় ফেললি তোরা আমাকে।”

মন খোলা হাসি হাসে বন্দনা “আমি তো তোরটা জিজ্ঞেস করতে পারি। যাই হোক, তুই যা ভাবছিস ততদুর এগুইনি আমরা, চিন্তা নেই তোর।”

—“একবার হাতে পাই তোকে।”

—“চলে আয়। অনেক দিন দেখিনি তোকে, আর আমার শামু কে নিয়ে আসিস খালি হাতে আসিস না।”

—“ওহ, তুমি ওর বনা হয়ে গেছ আর ও তোমার সামু? বাঃ বা বেশ। কিন্তু ছুটি পাচ্ছেনা সেটাই মুশকিল, নাহলে আমার ফার্স্ট ম্যারেজ এনিভারসারি তে ঠিক যেত।”
খবর শুনে মন মড়া হয়ে পড়ে বন্দনা “জানিস কত দিন দেখিনি, মনটা কেমন করছে, এখন কি করেছে রে?”

—“কি আর করবে, সোফায় শুয়ে টিভি দেখছে। ছুটির দিনে ওর কাজ ওটাই।”

একটু খানি মন মড়া হয়ে যায় বন্দনা “জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে।”

আশ্বাস দিয়ে বলে পূবালী “আরে ওত চিন্তা করছিস কেন? তুই ওকে ভালোবাসিস?”

উত্তর দেয় বন্দনা “হ্যাঁ”

—“ও তোকে ভালবাসে”

রিসিভারটা ঠোঁটের সামনে এনে নিচু গলায় বলে “বোধ হয় আমার চাইতেও বেশি করে আমাকে ভালবাসে।”

হেসে উত্তর দেয় পূবালী “তাহলে বাকি টুকু আমি ম্যানেজ করে নেব।”

ফোন রেখে দিয়ে সিতাভ্র কে সব কিছু জানায় পূবালী, সিতাভ্র একবার বসার ঘরে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে পূবালীকে জিজ্ঞেস করে “কি বলছ? ছেলেটার পেটে পেটে এতো কিছু ছিল।” তারপরে ঠাট্টা করে বলে “ড্যাম সিট্*, আমি ভেবেছিলাম বন্দনার সাথে একটু মজা করবো, তা শালিটা একদম সব মাঠে মারা করে দিল।”

—“আমাকে সামু কিছু বলেনি এখন, তাই ভাবছি আমি কিছু জানাব না, দেখি কবে জানায় আমাকে।”

—“তো তোমার আইডিয়া টা কি, শুনি?”

চোখ টিপে উত্তর দেয় পূবালী “দেখতে পাবে।”

যথারীতি বন্দনাকে রাতে ফোন করে স্যামন্তক “হ্যালো কেমন আছ?”

সকালেই পূবালীর সাথে ফোনে কথা হয়ে গেছে, ফোন নাম্বার আদান প্রদান হয়ে গেছে দুই বান্ধবীর মাঝে। বুকের মাঝে একটা দুষ্টু হাসি বারবার করে ধাক্কা মারতে থাকে, একটু মজা করা যাক স্যামন্তকের সাথে “ভাল নেই একদম, আজ আমাকে দেখতে ছেলের বাড়ি থেকে লোকজন এসেছিল।” প্রানপন হাসিটাকে চেপে ধরে একটু রাগি গলায় বলে বন্দনা।

সংবাদটা শুনেই একটু বিচলিত হয়ে পড়ে স্যামন্তক, কি করবে কি করে বলবে দিদিকে। এই তো সবে চার মাস হয়েছে চাকরির এর মধ্যে যদি বিয়ে করতে হয় তাহলে তো বড় মুশকিল। আর বিয়ে কাউকে না জানিয়ে করতে চায় না, ওর মুখের দিকে বাবা মা, জেঠু জেঠিমা সবাই তাকিয়ে। আর দিদি তো হয়তো হার্টফেল করবে জানতে পারলে। একটু ভাবুক হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে “আচ্ছা আমি দেখছি কি করা যায়।”

ওদিক থেকে চিৎকার করে ওঠে বন্দনা “হ্যাঁ তুমি দেখে যাও, আর তোমার সামনে কেউ আমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাক। তুমি আমার বিয়ে খেতে এসো হাতে একটা ফুলের তোড়া নিয়ে।”

রেগে ওঠে স্যামন্তক “তো আমাকে কি করতে বল, তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে? এখুনি কিছু করা সম্ভব নয়, বনা। জাস্ট লেট মি থিঙ্ক।”

তর্জনীটা দাঁতের নিচে চেপে ধরে বন্দনা, পেটের ভেতরে হাসিটা ফেটে পড়ার যোগাড় আর পারছেনা ধরে রাখতে নিজেকে, একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে আবার রাগত স্বরে বলে “তুমি আজ, এখুনি পূবালী কে সব জানাবে।”

দেয়ালে প্রায় মাথা ঠোকার মতন অবস্থা স্যামন্তকের “না এখুনি নয়।”

“আমি কিছু জানিনা, আমি নেক্সট ফোন পূবালীর কাছ থেকে চাই নাহলে তুমি আর আমাকে ফোন কোরো না।” এই বলে ফোন কেটে দিয়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়।

স্যামন্তক মাথার চুলগুলো মুঠি করে ধরে বসে পড়ে বিছানায়। রাগে বিতৃষ্ণায় বালিশ টাকে দু’তিনটে ঘুসি মেরে দেয়। কেন মরতে প্রেম করতে গেছিল তাও আবার দিদির বান্ধবীর সাথে? অন্য কোন মেয়ে হলে তো এই সমস্যা দেখা দিত না, ঠিক জানিয়ে দিত দিদিকে, সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যেত। এখন কি করবে, জানতে পারলে দিদি কি বলবে আর না জানালে বন্দনা কি করবে। একবার মনে হচ্ছিল জানিয়ে দেয় বন্দনাকে, বিয়ে করে ফেল যার সাথে বিয়ে দিচ্ছে, তারপরে আবার মনে হয় এবারে মেয়েটা নির্ঘাত মারা যাবে আর নিজে কি করবে? সারা রাত ঘুম হল না স্যামন্তকের।

======= সপ্তম আধ্যায় সমাপ্ত ======

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s