লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ৬


৬ষ্ঠ পর্ব – ফিরে এসো

আজও বৃষ্টি পড়ছে বাইরে, এই বৃষ্টি থামার নয়। রাতে খাবার পরে দিদির সাথে ফোনে কথা হয় স্যামন্তকের। সকাল বেলা থেকেই মনটা একটু খিঁচরে, মেয়েটা যাবার আগে একটু ভদ্রতা পর্যন্ত দেখাতে পারলোনা? একটা চিঠি লিখে চলে গেলো। খুব রাগ হয় ওর, বন্দনার ওপরে। একবার ভাবে দিদিকে সব বলে দেবে, যে বন্দনা বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরুপমের কাছে চলে গেছে। রাগের চোটে দিদির সাথে ঠিক করে কথা পর্যন্ত বলতে পারেনি স্যামন্তক। সব দোষ যেন দিদির, কেননা বন্দনা তো দিদির বান্ধবী, তাও রাগটা সংযমে রেখে দিদির সাথে কথা বলে।

পুবালি ওর গলার আওয়াজে বুঝতে পারে যে ভাইয়ের কিছু একটা হয়েছে, তাই সবাই ঘুমিয়ে পরার পরে রাত বারোটা নাগাদ আবার ফোন করে জিজ্ঞেস করে “কিরে কি হয়েছে তোর আজ?”

“কই কিছু হয়নি তো।“ গলাটা স্বাভাবিক করে উত্তর দেয় পুবালিকে।

“জানিস আমি তোর দিদি, তুই হাঁ করার আগে আমি বুঝতে পারি তোর জ্বর হয়েছে না কাশি হয়েছে, সুতরাং সত্যি কথাটা বলে ফেল” একটু রেগেই প্রশ্ন করে পুবালি।

দিদিকে সত্যি কথাটা বলতে মন চায়না, কেননা ও বন্দনাকে কথা দিয়েছে। কিছুত টান ওর মধ্যে আছে মেয়েটার জন্য “নারে, আজ বন্ধুদের সাথে একটু টাকা পয়সা নিয়ে ঝগড়া হয়ে গেছিলো তাই মুডটা খিঁচরে আছে।”

—“সত্যি বলছিস তো?”

“হ্যাঁ বাবা তোকে কেন মিথ্যে বলতে যাবো, সত্যি কথাই বলছি” কিন্তু দিদিকে সত্যি কথাটা জানায় না, খুব খারাপ লাগে ওর।

“ওকে গুড নাইট শুয়ে পর।” পুবালি ফোন রেখে দেয়।

জল খেয়ে, মাথার পেছনে জলের ঝাপটা মেরে শুতে যায় স্যামন্তক। রাত প্রায় বারোটা, বৃষ্টিটা অনেক ধরে এসেছে। চারদিক নিস্তব্ধ, বুকের ধুকপুকও কান পাতলে শোনা যায়। এমন সময় রাতের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ফোনটা আবার বেজে ওঠে।

ফোন উঠিয়েই ঝাঁজিয়ে প্রশ্ন করে স্যামন্তক “তোকে একবার বললাম আমি ঠিক আছি তুই কিছুতেই কি বিশ্বাস করবিনা, কি হয়েছে তোর বলতো।”

অন্য দিকের মানুষটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে প্রশ্ন করে “হ্যালো এটা কি পুবালির বাড়ি?”

এতো রাতে একজন মানুষ ফোনে দিদির খোঁজ করছে, আওয়াজ শুনে আশ্চর্য হয়ে উলটো প্রশ্ন করে স্যামন্তক “আপনি কে বলছেন?”

একটু আমতা আমতা করে লোকটি বলে “আমি দেবমাল্য, পুবালির বন্ধু। পুবালিকে একটু ফোনটা দেবেন।”

—“দিদি বাড়িতে নেই, কি দরকার দিদির সাথে?”

কাঁপা গলায় উত্তর দেয় অচেনা আওয়াজ “খুবই জরুরি ব্যাপার, আচ্ছা আপনি কে? আপনি কি স্যামন্তক?”

অজানা অচেনা একজন মধ্যরাত্রে ওর নাম নিয়ে ফোনে কথা বলছে, একটু ঘাবড়ে যায় স্যামন্তক “হ্যাঁ, কি দরকার আমাকে, বলুনতো?”

—“বন্দনার খুব খারাপ অবস্থা, ও শুধু পুবালির নামটা বলতে পেরেছে আর আপনাকে একটা ফোন করতে বলেছে।”

ফোনের রিসিভার টাকে শক্ত করে ধরে নিজের মুঠোর মধ্যে, এক ঝটকায় যেন এক গাদা রক্ত ওর সারা মুখে ছড়িয়ে পরে, বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। তোলপাড় টিকে সংযত রেখে জিজ্ঞেস করে “কি হয়েছে ওর?”

—“আপনি এলে বলবো। আপনি কাল সকাল বেলা শান্তিনিকেতন আসতে পারেন কি? আমি বোলপুরে থাকি।”

চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, বুকের ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে ‘দাঁড়িয়ে কেন ওর আজ তোকে দরকার।’ একটু ধরা গলায় স্যামন্তক বলে “আমি আসছি, এই কয় ঘণ্টা শুধু ওকে বাঁচিয়ে রাখুন, আমি এখুনি বের হচ্ছি।”

—“আচ্ছা আমি বোলপুর স্টেশানের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে, যত রাত হোক।”

—“ও.কে. আপনি শুধু বন্দনাকে বাঁচিয়ে রাখুন।”

ফোন রেখেই অনির্বাণ কে ফোন লাগায় “হ্যালো, ঘুমিয়ে পরেছিস কি তুই?”

—“বাল, এখন তো সবে সন্ধ্যে, গান্ডু রাত বারোটা বেজে গেছে সেটা খেয়াল আছে তোর। কি হয়েছে বল, কোন মেয়ের রেপ করেছিস তুই?”

—“আমি সিরিয়াস, আমাকে এখুনি শান্তিনিকেতন যেতে হবে, গাড়ির ব্যাবস্থা করতে পারিস তুই, প্লিস।”

—“এতো রাতে? কি ব্যাপার বলতো?”

—“তুই একটা গাড়ির ব্যাবস্থা করনা প্লিস, পরে সব বলবো।”

—“আচ্ছা দেখছি আক্রাম কে বলে ওর এম্বাসেডর পাওয়া যায় কিনা।”

ফোনটা রেখে কুল কিনারা পায় না স্যামন্তক, হন্তদন্ত হয়ে একটা জামা গায়ে গলায়। মাথার মধ্যে রক্ত টগবগ করে ফুটছে, কি হল মেয়েটার, এতো রাতে এক অজানা অচেনা মানুষ ফোন করলো ওকে। একবার ভাবতে থাকে এটা কোনও বাজে লোকের কাজ নয় তো? হাজার চিন্তা মাথার মধ্যে ভিড় করে। একবার পার্সটা খুলে দেখল কত টাকা আছে, না হাজার দুই আছে, হয়ে যাবে না হলে কাল ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নেবে। দরজায় তালা মেরে নিচে নেমে গেটের বাইরে পায়চারি করতে থাকে। আকাশের ঝড় তো কেটে গেছে, ভেতরের ঝড় টাকে কে সামলায়।

পনেরো মিনিট যেন পনেরো বছর, অনির্বাণ হন্তদন্ত হয়ে ওর দিকে দৌড়ে আসে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে “আক্রাম এর গাড়ি পাওয়া গেছে। চল আমিও যাবো, আক্রাম ও সাথে আছে।”

দুজন বন্ধুকে পাশে পেয়ে একটু আসস্থ হয় স্যামন্তক, খরা বালুচরে যেন একটি মরুদ্যান “চল বেরিয়ে পড়ি।”

আক্রাম ঝরের বেগে গাড়ি চালায়, রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে গাড়ি দৌড়ায় শান্তিনিকেতনের পথে। যেতে যেতে স্যামন্তক জানায় “দিদির এক বান্ধবীর খুব শরীর খারাপ, আমি এক জনের ফোন পেলাম এই রাতে, মনে হয় খুব খারাপ অবস্থা।”

ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে অনির্বাণ “দিদির বান্ধবী তো তোর এতো মাথাব্যাথা কেনও, সেটা তো বুঝলামনা, একটু ঝেড়ে কাশ তো বোকাচোদা ছেলে?”

—“মেয়েটির নাম বন্দনা।”

—“হুম তাই বলি, কি হয়েছে বন্দনার?”

—“জানিনা রে।”

গাড়ি যখন বোলপুর স্টেশানে পৌঁছায় রাত তখন প্রায় তিনটে বাজে। সারা স্টেশান খাঁখাঁ করছে, জনমানব শূন্য কেউ কোথাও নেই, দু একটা কুকুর এদিক ওদিক ঘরাফেরা করছে। গাড়িটা ধিমে করে স্টেশানের সামনে দাঁড় করায় আক্রাম।

অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে “বাড়ি চিনিস তুই?”

মাথা নাড়ায় স্যামন্তক “না, তবে বলেছিল কেউ একজন থাকবে এখানে।”

রাস্তার পাশে একজন লোক একটা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে একটু ইতস্তত্ত করে এগিয়ে আসে গাড়ির দিকে। লোকটা অপরিচিত, তিন জনেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়।
অচেনা লোকটি ওদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে “আপনারা কি দুর্গাপুর থেকে আসছেন?”

গলার আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে স্যামন্তক যে ফোনে যার সাথে কথা বলেছিল সেই লোকটি “আপনি দেবমাল্য? আপনি আমাকে ফোন করেছিলেন?”

মাথা নাড়ায় দেবমাল্য “হ্যাঁ, আমিই, আপনাকে ফোন করেছিলাম। চলুন এই পাশেই আমার বাড়ি।”

ও একবার অনির্বাণের দিকে তাকায় একবার আক্রামের দিকে তাকায়। দেবমাল্য ওদের ইতস্তত ভাবটা বুঝতে পারে। একটি ম্লান হাসি হেসে বলে “ভয় নেই আপনার, আমি মিথ্যে কথা বলছিনা, আমি পুবালির বন্ধু।”

স্যামন্তক পাল্টা প্রশ্ন করে “দিদির তো বিয়ে হয়ে গেছে, আপনাকে তো দেখিনি?”

—“তাই নাকি? কবে? যাই হোক ও যখন এখানে নাচ শিখতো তখন আমাদের চেনাজানা ছিল। এখন তো চলুন, বন্দনার খুবই খারাপ অবস্থা।”

—“কি হয়েছে ওর।”

—“আমার মনে হয়, অ্যাটেম্পট মার্ডার। তবে বেঁচে যাবে মেয়েটা।”

অস্ফুট চিৎকার করে ওঠে স্যামন্তক, নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারেনা “কি? কে করেছে?”

—“বাড়ি চলুন সব বলছি। আপনারা গাড়ি তে আমার পেছন পেছন আসুন”

দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে স্যামন্তক, চোয়াল শক্ত করে গর্জে ওঠে “কে করেছে আমি জানি, আপনি শুধু নিরুপমের বাড়িটা আমাকে দেখিয়ে দিন।”

আক্রাম ওর পিঠে হাত রেখে শান্ত হতে বলে “চল আগে মেয়েটাকে দেখি তারপরে ব্যাবস্থা নেওয়া যাবে। আর বেশি কিছু হলে ডি.ভি.সির জলে কেটে ভাসিয়ে দেবো।”

দেবমাল্য বলে স্যামন্তককে “আমি বোলপুরের ছেলে, কালকের সকাল ও দেখবেনা এটা নিয়ে চিন্তা করবেননা। চলুন বাড়িতে।”

স্যামন্তকের গা হাত পা রাগে চিড়বিড় করতে থাকে, দাঁত কিড়মিড় করতে করতে গাড়িতে ওঠে। দেবমাল্য বাইক নিয়ে আগে, আক্রাম গাড়ি নিয়ে পেছনে। মিনিট দশেক পরে দেবমাল্যর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়ায়। বাড়ির বারান্দায় একজন ভদ্রমহিলা ওদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

দেবমাল্য ওদের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় ভদ্রমহিলার সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয় “আমার মা।”

স্যামন্তক এবং বাকিরা হাত জোড় করে নমশকার জানায়। দেবমাল্যর মা স্যামন্তকদের জিজ্ঞেস করে “স্যামন্তক কে?”

স্যামন্তক বলে “আমি।”

“ও তুমি। যাও ভেতরে।” গলা ধরে আসে ভদ্রমহিলার “শকুনের মতন ছিঁড়ে খেয়েছে মেয়েটাকে তারপরে ফেলে গেছে কোপাইয়ে।” বলতে বলতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে ভদ্রমহিলার।

কথাটা শুনে, রিরি করে জ্বলে ওঠে স্যামন্তক, চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে, নাকের পাটা ফুলে ওঠে। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে, একরত্তি মেয়েটা একটা চাদরে ঢাকা শুয়ে আছে বিছানায়।

স্যামন্তক পাশে বসেবন্দনার মুখের দিকে তাকায়, মুখটা ফুলে লাল হয়ে গেছে, কপালের ডান দিকটা ফুলে কালচে হয়ে আচে, চোখের কোণে একটু রক্ত জমে, চুলগুলি এলোমেলো। কপালে আলতো করে হাত বোলায়, গাটা একটু গরম। গালের আঁচড়ের দাগের ওপরে আঙ্গুল বোলায়। একটু খানি ঝুঁকে পরে ওর শরীরের ওপর, কপালে একটা ছোটো চুমু খায় স্যামন্তক, ধরা গলায় বলে “তোমাকে এই অবস্থায় দেখতে হবে আমি ভাবিনি।”

“জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে, এখন ঘুমোচ্ছে।” পেছন ফিরে তাকায় স্যামন্তক, দেখে দেবমাল্যর পাশে দাঁড়িয়ে আরেক জন ভদ্রলোক। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে বলেন “আমি দেবমাল্যর দাদা, ডাক্তার। ডোন্ট ওরি, সি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার। মাথার পেছনে কিছু একটা ভারী জিনিস দিয়ে মারা হয়, তাতে অজ্ঞান হয়ে যায়। তিনটে স্টিচ করতে হয়েছে, তবে বেশি রক্ত ক্ষরণ হয়নি।”

স্যামন্তক দেবমাল্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “হয়েছিলটা কি? কোথায় পেলেন আপনি একে? আজ সকালে বাড়ি থেকে বলে বের হয় যে নিরুপমের কাছে যাচ্ছে। তো এর মাঝে একি হল?” স্যামন্তক আলতো করে বন্দনার গালে মাথায় হাত বোলাতে থাকে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা, কোন হুঁশ নেই। নিঃশ্বাস ধিমে লয় নিচ্ছে, যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর।

দেবমাল্য মাকে একটু চা করতে বলে, তারপরে ওর দিকে তাকিয়ে বলে “আপনাকে কি যে বলি।” দেবমাল্য পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে। ওর মা, কিছুক্ষণ পরে ওদের চা দিয়ে যায়। অনির্বাণ আর আক্রাম একবার ঘরে ঢুকে দেখে যায়।

অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে “কি অবস্থা রে?”

দেবমাল্যর দাদা উত্তর দেন “ভয়ের চিন্তাটা নেই, তবে মানসিক অবস্থা কোন দিকে যাবে সেটা ঘুম ভাঙ্গলে বোঝা যাবে। আপনার বাইরের ঘরে বসুননা, একটু রেস্ট নিয়ে নিন।”
স্যামন্তক কৃতজ্ঞতা ভরা চোখে অনির্বাণ আর আক্রামের দিকে তাকায়, মাথাটা দুপাশে একটু নাড়িয়ে বলে “মেনি থ্যাকন্স, ম্যান।”

আক্রাম বলে “ছাড় ওসব কথা। কখন বের হবি ওকে নিয়ে?”

স্যামন্তক দেবমাল্যর দিকে তাকিয়ে বলে “আমি নিয়ে যেতে চাই ওকে, একটু পরে।”

দেবমাল্যর দাদা বলেন “ঘুমোচ্ছে তো এখন আর অনেক রাত এখন। সকালের দিকে বেরিয়ে পরবেন না হয়।”

স্যামন্তক দেবমাল্যকে জিজ্ঞেস করে “হয়েছিল কি ঘটনাটা, একটু বলুন তো?”

দেবমাল্য শুরু করে “আজ নিরুপমের বাড়িতে বিকেল বেলা একটা গেটটুগেদার ছিল, এমনি আমার এমন কিছু বন্ধু নয় তাসত্তেও আমায় যেতে বলেছিল কেননা, আমাদের হোটেলে ওর পার্টনাররা স্টে করেছে, তাই। যাই হোক, মদ ফদ খেয়ে সবাই আউট হয়ে যায় কিছুক্ষণ পরে, আমার সবাই বেরিয়ে আসি, এই ধরুন দশটা কি সওয়া দশটা নাগাদ।
আমরা বের হওয়া পর্যন্ত, নিরুপমের নতুন গার্লফ্রেন্ড দ্বীপানিতা, তখন এসে পৌঁছয়নি। আমি আগেই বন্দনাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম দ্বীপানিতার ব্যাপারে, তবে ঘটনাটা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটে যাবে সেটা বুঝতে পারিনি। আমি নিরুপম আর দ্বীপানিতার ব্যাপারটা বেশি ভালো করে জানতামনা তাই বিশেষ কিছু খোলতাই করে জানাতে পারিনি ওকে। হ্যাঁ যা বলছিলাম, বেরিয়ে দেখি আমার এক বন্ধুর গাড়ি, ওটাতে বাকি সবাই কে চড়িয়ে দিয়ে বন্ধুটাকে বললাম আমার হোটেলে পৌঁছে দিতে। ঐ প্রান্তিকেই পিছনের দিকে একটা নতুন জায়গায় রেসর্ট তৈরি হচ্ছে আমাদের, তো আমি সেখানে যাই একবার দেখতে। এমনিতে কিছু লোক ওখানেই থাকে রাতে, কেননা অনেকটা তৈরি হয়ে গেছে, বেশ কিছু মালপত্রও আছে।“

স্যামন্তক মন দিয়ে শোনে আর একবার করে বন্দনার দিকে তাকায়।

“আধ ঘণ্টা কি এক ঘণ্টা পরে, এই ধরুন রাত তখন সাড়ে এগারোটা বাজে, আমি ঐ রাস্তা দিয়েই ফেরার সময় দেখি দ্বীপানিতা আর নিরুপম ওদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে। আমি যেহেতু অন্ধকারে ছিলাম তাই ওরা আমাকে দেখতে পায়না। আমি দাঁড়িয়ে ওদেরকে লক্ষ্য করি, দ্বীপানিতা বেশ উত্তেজিত আর নিরুপম ওকে কিছু বোঝাচ্ছে। আমার একটা ফিল হয় যে কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে। তার কিছুক্ষণ পরে ওরা দুজনে ঘরের মধ্যে ঢুকে কাপড়ে পেঁচানো কিছু একটা নিয়ে রেল লাইনের দিকে এগোয়। আমার একটু সন্দেহ হয়। ওদের পেছন ফলো করি। কিছু দুর যাবার পর মনে হল একবার সাইটে গিয়ে আর কয়েক জনকে ডেকে নিয়ে আসি তাই দৌড়ে আমাদের সাইটে গিয়ে দুটো লোক নিয়ে ওদের ফলো করতে যাই। কিন্তু তত্তক্ষণে ওরা ঐ জায়গা থেকে চলে গিয়েছে তাই ওদের আর দেখতে পাইনা। আমরা রেল লাইন ধরে এগিয়ে গিয়ে কোপাই ব্রিজে পৌঁছই। বৃষ্টির জন্য চারদিকে জল আর কাদা। আমি একজন কে নিচে নেমে দেখতে বলি সাথে সাথে আমি নিচে নেমে যাই। ঠিক ব্রিজের নিচে জলের ধারে একটা চাদরে ঢাকা কিছু দেখতে পেয়ে ছুটে যাই। চাদর সরিয়ে দেখি, এই যে, বন্দনা। নাকের কাছে আঙ্গুল নিয়ে ফিল করলাম যে নিঃশ্বাস আছে তখন। আমার মাথায় তখন যেন বাজ পড়লো, আমি কি করবো কিছু ভেবে পেলাম না। চোখে মুখে একটু জলের ঝাপটা মারতে অনেক কষ্টে মেয়েটা চোখ খুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল “পুবালির বাড়িতে ওর ভাই স্যামন্তক আছে, তাকে একটা ফোন করো।” ব্যাস এই বলে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আমার সাথে যে দুজন ছিল, তাদের একজন কে সাইট থেকে ভ্যান নিয়ে আসতে বলি আর একজনের সাথে মিলে আমি বন্দনাকে ওপরে নিয়ে বাড়ি নিয়ে আসি। বাড়িতে দাদা ছিলেন তাই বাঁচোয়া।“

পুরো ঘটনাটা শুনে স্যামন্তকের ভেতরটা বিষিয়ে যায়, এমন একটা মানুষ হতে পারে যে একটি মেয়েকে হত্যা করতে পারে? পাশে ঘুমিয়ে বন্দনা নিস্তেজ, অসাড় হয়ত জানেনা কোথায় আছে, জানেইনা হয়তো যে ঠিক কি হয়েছিলো ওর সাথে। সুন্দর মুখটিতে কিছু আঁচর, কিছু কাটা। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকে বন্দনার মুখের দিকে।

স্যামন্তক একটু ম্লান হেসে দেবমাল্যকে জিজ্ঞেস করে “আপনার তো দিদির সাথে অনেক দিন কনট্যাক্ট নেই, ফোন নাম্বারটা পেলেন কোথা থেকে?”

দেবমাল্য হেসে বলে “আরে কন্ট্যাক্ট নেই তাই বলে কি ফোন নাম্বার থাকবে না। যাই হোক একটু রেস্ট নিয়ে নিন।”

ঘড়ির দিকে তাকায় স্যামন্তক, সাড়ে পাঁচটা বাজে, এবারে উঠতে হয়। দেবমাল্য ওকে জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি কি আপনাকে, যদিও খুব পেরসোনাল প্রশ্ন।”

স্যামন্তক বুঝতে পারে যে প্রশ্নটা কি তাই হেসে বলে “আপনি যা ভাবছেন সেটা নয়। পরশু রাতে দুর্গাপুরে এসেছিলো আর দিদি আর ও খুব ভালো বন্ধু তাই। যাই হোক আমাদের এবারে উঠতে হবে, দশটার আগে আমাকে বাড়ি ঢুকতে হবে।”

“তাহলে আর বেশি দেরি করবেন না। দেখি দাদা কে ডেকে দেই যদি কিছু বলার থাকে দাদার তাহলে” এই বলে দেবমাল্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।

দেবমাল্য ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পরেই, স্যামন্তক বন্দনার পাশে গিয়ে বসে গালে হাত রাখে আলতো করে। ধিরে ধিরে চোখ খুলে তাকায় বন্দনা, একটু আবছা লাগে ওর মুখটা, তারপরে মাথাটা একটু নাড়ায়, মাথার পেছনের ব্যাথাটা অনুভব করে। ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে, চোখে জল চলে আসে যখন বুঝতে পারে যে সামনে স্যামন্তক বসে আছে। বুকের মাঝের খালি জায়গাটা ভরে যায়, একটু খানি মাথা উঠাবার চেষ্টা করে বন্দনা। স্যামন্তক বাধা দিয়ে বলে “শুয়ে থাকো, একটু পরে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।“

চোখে জল, কাঁপা গলায় বন্দনা নিচু স্বরে বলে “তুমি এসেছ?”

হেসে বলে স্যামন্তক “না যমরাজ এসেছে তোমাকে নিতে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।”

ঠিক সেই সময়ে দেবমাল্য ঘরের মধ্যে ঢোকে পেছন পেছন ওর দাদা ঢোকেন। বন্দনার ঘুম ভেঙে গেছে দেখে দেবমাল্যর দাদার মুখে একটি স্বস্তির হাসি। নাড়ী দেখে জ্বর দেখে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে বলেন “নিয়ে যেতে পারেন, একটু সাবধানে রাখবেন। আমি কিছু ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছি, আর ওর ড্রেসিং টা নিয়মিত করে নিতে হবে।”

স্যামন্তক কি ভাবে ওদেরকে ধন্যবাদ জানাবে বুঝে উঠতে পারছিল না, হ্যান্ডসেক করতে গিয়ে হাত কেঁপে ওঠে স্যামন্তকের। দেবমাল্য ওকে বলে “আপনি যান ওকে নিয়ে এদিক কার টা আমরা দেখে নেবো।”

বন্দনার পরনে কোন কাপড় ছিলোনা তাই দেবমাল্যর মা ওকে একটি শাড়ী পড়িয়ে দিলো। শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে বাইরে অনির্বাণ আর আক্রাম তৈরি। স্যামন্তককে দেখে জিজ্ঞেস করে “কিরে যাওয়া যাক নাকি?”

স্যামন্তক বন্দনা এক রকম পাঁজাকোলা করে তুলে গাড়িতে ওঠালো। দেবমাল্যর দাদা স্যামন্তক কে বললেন “কিছু অসুবিধা হলে ফোন করবেন এমনিতে সি.টি. সেন্টারে এক জন ভালো ডাক্তার আছেন তাকে বলে দেবো খানে, বিকেলের দিকে একবার এসে দেখে যাবে।”

গাড়ি যখন বোলপুর ছাড়ে তখন বাজে সাড়ে পাঁচটা, ওদিকে আক্রামের তাড়া আছে যে বাড়ি তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। বন্দনা স্যামন্তকের কোলে মাথা দিয়ে চুপ করে শুয়ে পরে। স্যামন্তক এক মনে ওর মুখের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ তার পরে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
বন্দনা চোখ বন্দ করে ভাবতে থাকে “কি হল এটা আমার সাথে? আমি এতো ভালবাসতাম নিরুপমকে আর সে কিনা আমাকে এই ভাবে প্রতারণা করলো? এর চেয়ে একবার বলে দিলে ওর কি ক্ষতি ছিল? আমাকে এতো আঘাত? কেন?” চোখের কোণে জলের ধারা বয়ে চলে অবিরাম। সারা শরীরে ব্যাথা তার চেয়ে যেটা বেশি সেটা তার ভাঙা হৃদয়ের। তিন বছর আগের কথা সব মনে পরে যায় ওর, বনেরপুকুরডাঙা প্রথম চুম্বন আর আলিঙ্গন, প্রান্তিকের অলিগলিতে হাত ধরে ঘোরা, আম্রকুঞ্জতে বসে গল্প করা, রতনপল্লীতে বসে সব বন্ধু বান্ধবীদের সাথে আড্ডা মারা আর চা খাওয়া। কত সখ ছিল ওর, দেশে বিদেশে নিরুপমের আঁকা চিত্রের প্রদর্শনী হবে, ওর সাথে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। অনেক স্বপ্ন ছিল ওর মনে, ঠিক করেছিলো যে বিয়ের পরে নাচ ছেড়ে দেবে, নিরুপম ওকে যেরকম ভাবে রাখবে সেই রকম ভাবেই থাকতে চেয়েছিল। কিছুই পেলনা, তার বদলে যেটা দিলো তা মৃত্যুর চেয়ে বড়। এই ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে কি করে বাকি জীবনটা কাটাবে। এই সব ভাবতে ভাবতে চোখের জল থামতে চায় না।

অনেক সকালে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ছিল, রাস্তায় বিশেষ গাড়ি ঘোড়া ছিলোনা তাই দুর্গাপুর পৌঁছাতে বিশেষ দেরি হয়না। বাড়ি পৌঁছে স্যামন্তক অনির্বাণ কে বলে “ভাই তোরা অনেক করেছিস, বিকেলে আসিস আমি গাড়ির ভাড়াটা দিয়ে দেবো।”

ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে আক্রাম “মানে?”

—“মানে তেল খরচ তো হয়েছে রে”

—“ও সে দেখা যাবে খানে। তুই এখন ওকে সামলা, এখনো তো ঘুমোচ্ছে।”

স্যামন্তক গাড়ির পেছনের সিটে শুয়ে থাকা সাধের রমণীর দিকে একবার তাকায় তারপর ওদের কে বলে “আমি নিয়ে যাচ্ছি ওপরে” তারপরে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে ওর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে বলে “একটু দুধ আর কিছু কিনে দিয়ে যেতে পারিস? আমি ওকে নিয়ে ওপরে যাচ্ছি।”

দরজা খুলে, বন্দনার গায়ে হাত দিয়ে আলতো করে ঠেলা দেয়, বন্দনা চোখ খুলে দেখে স্যামন্তককে। স্যামন্তক ওকে বলে “একটু ওঠ বাড়ি এসে গেছে।” তারপরে বাঁ হাত ওর ঘাড়ের নিচে দিয়ে ওকে উঠিয়ে বসায়, ডান হাত ওর হাঁটুর নিচে দিয়ে গলিয়ে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে বার হয়। বন্দনা নিরুপায় হয়ে ওর দিকে চেয়ে বলে “আমি হাঁটতে পারবো।” স্যামন্তক বলে “হ্যাঁ তা জানি অনেক হেঁটে এসেছ তুমি।” বন্দনা ওর গলা জড়িয়ে ধরে নিজেকে সামলানোর জন্য।

সিঁড়ি দিয়ে চড়ার সময় বন্দনা ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, পলক যেন পড়তে চায়না। ভাবতে থাকে মনে মনে, কে এই ছেলেটা আর কেনই বা ওর দরকার ছিল আমার জন্যে এতো করতে? কেন আমি জ্ঞান ফিরে ওর নাম নিলাম? স্যামুন্তকের বুকের ধুকপুকানি ওর ভেতরের ব্যাথাটা আর বেশি করে চাড়া দিয়ে ওঠে। বন্দনা ওর ডান হাতটা একটু জোর করে জড়িয়ে দেয় স্যামন্তকের ঘাড়ে। স্যামন্তক আলতো হেসে বলে কানে কানে “ওরকম ভাবে দেখছ কেন? দিদি এখনো কিছু জানে না, একটু পরে ফোন করবে আমাকে, বুঝলে।”

কেঁপে ওঠে বন্দনা শরীরে কোন শক্তি নেই, গলার আওয়াজ তাই ক্ষীণ “আমাকে মরতে দিলে না তোমরা।” চোখের কোণে এক ফোঁটা জল।

দরজার তালা কোন রকমে খুলে, পুবালির ঘরের বিছানায় শুইয়ে দেয় বন্দনা কে, মাথার পেছনে দুটি বালিশ দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে দেয়। গায়ে চাদর ঢাকা দেবার সময় বুকের ওপরে নজর পরে যায় স্যামন্তকের। বুকের নরম তুলতুলে উপরি অংশে আঁচরের দাগ, দাঁতের দাগ। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় স্যামন্তকের, ঐ দেখে। হাত দিয়ে দেখবে কি দেখবে না ভেবে পায়না। বন্দনা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে স্যামন্তক ওর দুই বুকের ক্ষত দেখছে। লজ্জায় লাল হয়ে যায় বন্দনা, নিজে থেকে চাদরটা টেনে বুক ঢেকে ফেলে। সেটা বুঝতে পেরে স্যামন্তক বেশ লজ্জায় পরে যায়।

স্যামন্তক বন্দনা কে জিজ্ঞেস করে “বাড়ির ফোন নাম্বারটা দাও, তোমার বাবাকে একবার জানানো উচিৎ। পরশু বেরিয়েছ না বলে, তারা অনেক চিন্তায় থাকবেন।”

“না, কি হবে জানিয়ে তাদের। আমি ঠিক হলে চলে যাবো এখান থেকে” ভয়ে আর গ্লানিতে ভরা বন্দনার চোখ ছলছল করে ওঠে “বাবা মা সবাই আমাকে বারবার বারন করেছিল, কারুর কথা আমি শুনিনি। আমার তো এই হবার ছিল।”

স্যামন্তক ওর পাশে বসে ওর মুখটা নিজের হাতের মধ্যে করে নিয়ে দুচোখে গভীর ভাবে তাকায়। সেই গভীর চাহনিতে বন্দনার মনে হয় যেন ওর বুকের অলিগলি সব কিছু যেন স্যামন্তক দেখতে পাচ্ছে। ওর হাতের উষ্ণ পরশে বন্দনার ক্ষত বিক্ষত গালে যেন এক কেউ চন্দনের শীতল প্রলেপ লাগিয়ে দেয়।

—“আমি আছি তো ভয় কিসের, ফোন নাম্বারটা দাও ফোন করে দেই, বাবা মা চিন্তায় আছেন। তাদের দিকটা তো একবার ভেবে দেখনি।”

মনের ভেতর থেকে কেউ যেন চিৎকার করে বলে “তুমি কে?” তারপরে বন্দনা বাড়ির ফোন নাম্বারটা স্যামন্তক কে দিয়ে দেয়।
“গুড গার্ল, এখন চুপ করে শুয়ে পড়। আমার অনেক কাজ আছে, দুপুরবেলা খাবার আগে ডেকে দেবো।” নাকের ওপরে আলতো করে ডান হাতের তর্জনীটা ছুঁয়ে ঘরের থেকে বেড়িয়ে যায় স্যামন্তক।

বন্দনা একপাশ ফিরে শুয়ে, স্যামন্তকের চলে যাওয়া দেখে। পর্দার আড়ালে চলে যেতেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে বন্দনার। বাইরে আকাশ যদিও পরিষ্কার তবু মনের ভেতরে গুমরে ওঠে ব্যাথা আর কান্না। নিজের ওপরে একটা বিকট ধিক্কার জন্মায়, যারা ওকে ভালবাসত তারা সবাই ওকে বারন করেছিলো, বন্দনা শোনেনি তাদের কথা। বাবা মা আর তার প্রানের বান্ধবী পুবালি, সবাই ওর চোখে বিষ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কেন নিরুপম ওর সাথে এত ছল করল, কেন সকাল থেকে একবারের জন্য ওকে বুঝতে দিলো না যে ওর মনে অন্য কিছু। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বন্দনা, বুকের ভেতরে এক অসীম শূন্যতা ভর করে। এই শ্রাবণেও ওর মনে হয় বৈশাখের দুপুরে এক বিশাল ফাঁকা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ও, মাথার ওপরে তপ্ত সূর্য কিরণ ঝলসে দিচ্ছে ওর মন শরীর আত্মা। দুমড়ে মুচড়ে নিঙরে কেউ যেন ওর বুকের মাঝে এক তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত করছে, মরতে চেয়েও মরতে পারছেনা বন্দনা। এই সব ভাবতে ভাবতে মাথাটা আবার ঝিম ঝিম করতে থাকে। ওপাশ ফিরে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে স্যামন্তক কোথায়। ঘরে কি নেই, আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না যে। ওর মনের ভেতরে আর এক ভয় ভর করে, কত টুকু জানি আমি ছেলেটাকে যে ওর ওপরে আমার এত অগাধ বিশ্বাস। বিশ্বাস তো আমি নিরুপম কেও করেছিলাম, কিন্তু কি পেলাম। বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে চেষ্টা করে বন্দনা। খোলা জানালা দিয়ে সকালের নরম রদ্দুর গায়ে এসে পড়ছে, যেন সদ্য স্নাত ঊষা ওকে আহ্বান করছে এক নতুন জীবনের গণ্ডীতে।

চুপ করে হাঁটু মুড়ে বিছানার ওপরে উঠে বসে বন্দনা, হাঁটুর ওপরে থুতনি রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, সামনে বড় ফাঁকা মাঠ, লাল মাটি, ঐ দুরে জি টি রোড দিয়ে কত গাড়ির আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। কাল রাতের বৃষ্টির পড়ে আকাশটা বড় বেশি পরিস্কার মনে হচ্ছে। রাস্তার পাশের বিপিন দেবদারুর গাছ গুলো যেন আজ একটু বেশি করে সবুজ, আলতো মাথা নাড়িয়ে বন্দনাকে যেন ডাকছে “বাড়ির ভেতরে বসে কেন, ঝড় তো কাল রাতে যা হবার হয়ে গেছে, দেখ আজ আমারা কেমন সবুজে ঢেকে আছি, তুই ও বেড়িয়ে পড়।”

“খেয়ে নাও, তার পড়ে ওষুধ খেতে হবে আর ড্রেসিং তা করতে হবে।” স্যামন্তকের গলা শুনে কেঁপে ওঠে বন্দনা। এতক্ষণ এত নিস্তব্ধ ছিল সারা বাড়িটা যে ও হারিয়ে গেছিলো সেই নিস্তব্ধতায়। ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ উঁচু করে দেখে যে স্যামন্তক একটা বাটিতে দুধ আর কলা মেখে এনেছে, সাথে একটা প্লেটে দুটি ব্রেড।

কাঁপা হাতে স্যামন্তকের হাত থেকে বাটিটা নিয়ে, চুমুক দিয়ে খেতে থাকে দুধ টুকু। বুঝে গেছে বন্দনা, এই ছেলের সামনে ওর কোন জোর চলবে না। স্যামন্তকের মুখের দিকে তাকিয়ে দুধের বাটি খালি করে। ঠোঁটের ওপরে একটু দুধ লেগে থাকে, বাটিটা হাতে ধরাবার সময়, আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে ঠোঁটটা মুছিয়ে দেয় স্যামন্তক। ঠোঁটের ওপরে ওর আঙ্গুলের পরশে কেমন যেন করে ওঠে ওর মুখের শিরা, কি বলবে কি করবে কিছু ভেবে পায়না বন্দনা। একভাবে দেখতে থাকে স্যামন্তককে।

“তোমার বাড়িতে ফোন করে দিয়েছি, তোমার বাবা মা বিকেলের মধ্যে চলে আসবেন, চিন্তা নেই তোমার।” স্যামন্তক বন্দনাকে জানায় “আমি বলেছি যে তুমি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়েছ আর তারপরে তোমার জ্বর হয়েছে। সুতরাং সেটা যেন মনে থাকে। কি হয়েছে না হয়েছে তা আবার কাউকে বলতে যেওনা।”

বাবা মা আসবেন শুনে বন্দনার ভেতরে এক অদ্ভুত গ্লানিতে ভরে যায় কাঁপা গলায় কিছু বলার চেষ্টা করে “তুমি কে আমার।” গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না।

“কিছু বলবে কি তুমি?” জিজ্ঞেস করে স্যামন্তক, তারপরে একটু মাথা চুলকে বলে “আমাকে যে ড্রেসিং করতে হবে।”

“আমি করে নিতে পারবো” একটা ছোট্ট হাসি হেসে উত্তর দেয় বন্দনা “আমি একটু বাথরুমে যাবো।”

“ঠিক আছে, আমি দিদির জামাকাপড় বের করে রেখেছি, পড়ে নিও, আর বাথরুমের দরজা বন্দ করবে না” বলে স্যামন্তক চলে যায় ঘর থেকে।

বাথরুমে ঢুকে আপন মনেই হেসে ফেলে বন্দনা “দরজা বন্দ করবে না, ধুর ছাই।” পরনের শাড়ীটা খোলা মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে সারা শরীরের ক্ষত। বুকের ওপরে দাঁতের দাগ কেটে বসা, ঘাড়ের কাছেও দাঁতের দাগ, পেটে ওপরে, নাভির কাছে আঁচড়ের দাগ, শুকিয়ে কালো হয়ে আছে একটু জ্বলছে সেই সব ক্ষত। কপালে ডান দিকে কালশিটে পড়া, চোখের কোণে একটু রক্ত জমা। বাবা মা কি বাইরের দাগ গুলো দেখে বিশ্বাস করবে যে ও বাথরুমে পড়ে গেছিলো? মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, চুলে জট কিন্তু মাথায় তো আর জল দেওয়া যাবেনা। আস্তে আস্তে গায়ে জল ঢেলে পরিষ্কার হয়ে নেয়। তোয়ালে জড়িয়ে ঘরে ঢুকে দেখে, বিছানার ওপরে পুবালির সালোয়ার কামিজ, ড্রেসিং গাউন, মাক্সি সব রাখা। বন্দনা একটা মাক্সি পড়ে ধিরে ধিরে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে ডাইনিং রুমের দিকে।

স্যামন্তক রান্না ঘরে একটা প্রেসার কুকারে ডাল চাল মিলিয়ে খিচুড়ি রান্নার তোড়জোড় করছিল বন্দনা ওকে দেখে হেসে বলে “তুমি কবে থেকে রান্না করতে জানো?”

“তোমাকে বাইরে কে আসতে বলেছে?” স্যামন্তক ওর দিকে একটু কড়া নজরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।

—“আর শুয়ে শুয়ে ভালো লাগছেনা তাই বাইরে এলাম।”

“সোফায় বস, আমি আসছি।” প্রেসার কুকারটা গ্যাসে চাপিয়ে কিছু সবজি কাটতে কাটতে বলে “দিদি ফোন করেছিলো, এখনো আমি কিছু জানাইনি।”

এতো বড় ঘটনাটা চেপে গেছে স্যামন্তক? ওর জন্য আর কার কার কাছে মিথ্যে কথা বলবে, স্যামন্তকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “কেন চেপে গেলে? বলে দিতে পারতে সব, ও তো তোমার দিদি।”

মাথা না উঠিয়েই উত্তর দেয় স্যামন্তক “সব কথার একটা সময় আছে, আমি মিথ্যে বলিনি দিদিকে শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছি। যখন সময় হবে তখন আমি দিদিকে জানাবো।”

মনে মনে বলে বন্দনা “এই সময়টাকেই তো ঠিক ভাবে ধরতে পারলাম না তাই তো আমার আজ এই অবস্থা।” ধিরে ধিরে সোফায় গিয়ে বসে পড়ে, মাথার পেছনটা একটু ব্যাথা ব্যাথা করছে, গা হাত পা ও ব্যাথা ব্যাথা করছে। চুপ করে সোফার ওপরে পা গুটিয়ে কুঁকড়ে বসে থাকে বন্দনা, নিজেকে নিজের কাছে খুব ছোটো মনে হয়। দুমড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে বুক, বেড়িয়ে পরে রক্ত না সেটা জল হয়ে চোখ দিয়ে ঝরছে।

কিছুক্ষণ পরে স্যামন্তক এক কাপ কফি নিয়ে ওর পাশে একটা ছোটো সোফায় বসে পরে। ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে “শরীর কেমন আছে?”

বন্দনা মুখ তুলে তাকায়, এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গরিয়ে পরে। আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয় “ঠিক আছে।” তারপরে উলটো হাতে গাল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে “আমি খুব খারাপ মেয়ে তাই না।”

কথাটা শুনে স্যামন্তকের ভেতরে যেন এক প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে, বুঝতে পাড়ে স্যামন্তক যে বন্দনা ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙ্গে গেছে। ছোটো সোফা থেকে উঠে ওর বাঁ পাশে বসে, হাতের কফি কাপটা টি টেবিলে ওপরে রেখে আস্তে করে ডান হাতটা ওর ঘাড়ের পেছন দিয়ে ডান কাঁধের ওপরে রাখে। বন্দনা জল ভরা চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে “আমি জানতাম তুমি আসবে।” ডান কাঁধের গোলায় স্যামন্তকের শক্ত মুঠি ওকে টেনে নেয় বুকের ওপরে। চওড়া বুকে আছড়ে পরে বন্দনা, মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে “আমি খুব খারাপ মেয়ে তাই না।”

মাথার ওপরে ঠোঁট চেপে ধরে স্যামন্তক, বাঁ হাতের তালু বন্দনার গাল স্পর্শ করে। স্যামন্তক ওকে নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে নিতে চায় যেন আর বন্দনা প্রানপন চেষ্টা করে ঐ বুকের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে।

—“মানুষ খারাপ হয় না বন্দনা, খারাপ হয় তার কর্ম। তুমি ফিরে এসেছ সেটা অনেক বড় ব্যাপার।”

বন্দনার কান্না যেন আর থামতে চায় না, দু হাত দিয়ে ওর বুকের পেশীর আঁকড়ে ধরে, মনে হয় যেন কেউ যদি ছাড়াতে আসে তাহলে ওর আত্মা খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবে। স্যামন্তক কোন বাধা দেয়না বন্দনাকে, মনের ভেতরে যত পাপ যত গ্লানি আছে সব ধুয়ে যাক। চোখের জলে বুকের অনেকটা ভিজে যায়। অনেকক্ষণ ধরে দুজনা দুজনকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। স্যামন্তক আস্তে আস্তে বন্দনার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়, বাঁ হাত দিয়ে বন্দনার মুখটা তুলে ধরে। ভিজে চোখের পাতা, ছোটো ছোটো দুটি চোখ যেন কত আশা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে। বন্দনার মনে হয় যেন, ঐ চশমার পেছনের দুটি চোখ ওকে টেনে নেবে। নাকের ওপরে আলতো করে নাকটা ঘষে স্যামন্তক, ঠোঁট জোড়া খুব কাছে। বন্দনা নিজের ঠোঁটের ওপরে স্যামন্তকের গরম প্রস্বাস অনুভব করতে পেরে কেঁপে ওঠে। তিরতির করে কেঁপে ওঠে নরম লাল ঠোঁট দুটি, যেন বলতে চায় তুমি এতো দুরে কেন। আস্তে করে, স্যামুন্তকের নিচের ঠোঁটটি বন্দনার ওপরে ঠোঁটের সাথে ছুঁয়ে যায়। আপনা হতেই বন্দনার দু চোখ বন্দ হয়ে যায়। স্যামন্তক ডান হাত দিয়ে জাপটে ধরে বন্দনার কাঁধ আর টেনে নেয় নিজের ওপরে, বাঁ হাত দিয়ে গাল ছুঁয়ে চেপে ধরে নিজের ঠোঁট ওর আধরে। বন্দনা হারিয়ে যায় ওর বুকের মাঝে, নিজের অধরটি স্যামন্তকের দুটি ঠোঁটের মাঝে পেয়ে। খুব নরম করে চুষতে থাকে স্যামন্তক ঐ দুটি ঠোঁট, যেন কোন গোলাপ পাপড়ি, বেশি জোরে চিপলে যেন ছিঁড়ে যাবে। জিবের ডগা দিয়ে মাঝে মাঝে যেন বন্দনার ঠোঁট দুটি নিজের মনের গভিরে আঁকতে চেষ্টা করে। সময় থমকে দাঁড়ায়, চুম্বনটি গভীর থেকে গভীরতর মনে হয়। বন্দনা দশটি আঙ্গুলের নখ দিয়ে স্যামন্তকের বুক খামচে ধরে। চেপে ধরে স্যামন্তক, নিজের প্রশস্ত বুকের ওপরে বন্দনার নরম সুগৌল বুকে যেন মাখনের মতন গলতে শুরু করে। বন্দনা চেপে ধরে ওর ক্ষত বিক্ষত বুক, আজ যেন কৃষ্ণের মস্তকের মণি ওর সব দুঃখ সব ক্ষত পূরণ করে দেবে উষ্ণ চন্দনের প্রলেপে। কার ঠোঁটে কার লালা মাখা সেটা ভুলে যায়। বন্দনার শরীরের ব্যাথা বেদনা যেন এক চুম্বনে সব মুছে গেছে, হৃদয়ের কোন কোণে যে টুকু গ্লানি আর ভীতি ছিল সেটা কর্পূরের ন্যায় উবে গেছে। নিজের নিঃশ্বাস ঘন থেকে ঘনতর হচ্ছে, তার সাথে সাথে বুঝতে পাড়ে যে স্যামন্তক ওর কোমরটা কত শক্ত করে জড়িয়ে ওর দিকে টেনে এনেছে। স্যামন্তক বন্দনাকে নিজের ওপরে জড়িয়ে ধিরে ধিরে সোফার ওপরে শুয়ে পরে।

বন্দনা ধিরে ধিরে নিজেকে ওর আলিঙ্গন মুক্ত করে ওর বুকে মাথা রেখে চোখ বন্দ করে থাকে। কারুর গলা দিয়ে কোন আওয়াজ নেই স্যামন্তক ওর পিঠের উপরে হাত বোলাতে থাকে। দুজনারই মনে হয়, মাঝে মাঝে এই নীরবতা ভারী সুন্দর হতে পারে। কিছুক্ষণ না অনেকক্ষণ, বন্দনা ওর বুকের ওপরে হাত দুটি ভাজ করে রেখে মুখ তুলে ওর দিকে তাকায় একটা দুষ্টু হেসে জিজ্ঞেস করে “কি করলে এটা?”

স্যামন্তক ওর ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে বন্দনার শিরদাঁড়ার ওপর থেকে নিচ অবধি বুলিয়ে দেয়, বন্দনা কেঁপে ওঠে নরম আঙ্গুলের ডগার স্পর্শে, নিজের ভরাট বুক দুটি পিষে ধরে ওর নিচের মানুষটির প্রসস্থ বুকের ওপরে।

—“দুষ্টুমি করছ?”

—“না করছি না, চিন্তা নেই।”

—“আমার না শরীর খারাপা তার ওপরে তুমি আমাকে ঐ রকম ভাবে সাজা দেবে?”

—“ঠিক আছে দেব না।”

—“কিন্তু একটু আগে কি করলে আমার সাথে?”

—“কি করলাম আবার?”

—“উঁহু যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানেনা, একলা একটা অবলা নারী পেয়ে আমাকে চুমু খেলে।”

—“যেটা তুমি অনেক আগে শুরু করেছিলে সেটা আজ ফুল স্টপ লাগিয়ে দিলাম।”

“পাগল ছেলে একটা।” তারপরে একটু থেমে বিষণ্ণ গোলায় বলে “আজকেই চলে যেতে হবে আমাকে?”

“তোমার বাবা মা যদি আজ এসে পড়েন আর নিয়ে যেতে চান, তাহলে তো আমি বাধা দিতে পারিনা” স্যামন্তকের মনটা চুমু খাওয়ার পরে বেশ উড়ুউড়ু করছিলো, মনের বাতায়নে যেন এক দখিনা বাতাস বইছিল, বন্দনার এক কথায় সব প্রসন্নতা যেন আছড়ে পড়লো খরা বালুচরে।

“তুমি সত্যি বাধা দিতে পারনা?” বুকের মাঝে কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে বন্দনার “কেন পারনা?”

প্রেমঘন বাহুবেষ্টনী আর দৃঢ় করে স্যামন্তক নিজের বুকের উপরে বন্দনার পেলব কমনীয় শরীরটিকে জাপটে ধরে “ভয় কেন পাচ্ছ আমি আছি তো।”

কান্না ভেজা স্বরে বলে ওঠে বন্দনা “ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়, আমার তাই অবস্থা। কাউকে আর বিশ্বাস হয়না।”

বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে বন্দনার মুখের দিকে, উত্তর দেবার মতন ভাষা খুঁজে পায়না স্যামন্তক। এর কি উত্তর দেবে নিজেও জানেনা। বন্দনা বুঝতে পারে যে কথাটা বড় বেদনা দায়ক কিন্তু ওর এখন সব থেকে ভয় ওটাই, কাকে ও বিশ্বাস করে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। না এবারে উঠতে হবে আর নয়। বন্দনা স্যামন্তকের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে উঠে বসে।

“কখন আসবে বাবা মা?” জিজ্ঞেস করে বন্দনা।

নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়, কি বলে বন্দনা কে বঝাবে যে ও ভালবাসে “বিকেলের দিকে। তুমি ওষুধ খেয়ে নাও তারপরে তোমার ড্রেসিং করে দিতে হবে।”

উঠে পরে বন্দনা সোফা থেকে, পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে স্যামন্তক চুপ করে ওর দিকে চেয়ে আছে উত্তরের আশায় আলতো হেসে বলে “আমি নিজের ড্রেসিং নিজে করে নিতে পারবো। যেখানে যা লাগানোর সেটা করে নেব।” এই বলে পুবালির ঘরে ঢুকে পরে। মনের ভেতরটা আজ কেমন মিলিত ভাবাবেগ আচ্ছন্ন, রাতের বজ্র বিদুত্য আর প্রবল ঝড়, সকালের মিষ্টি রোদে, প্রেমঘন চুম্বনে সিক্ত অধরওষ্ঠ, বুকের মাঝের ফাঁকা স্থান টিকে সিক্ত চুম্বনের প্রলেপে ভরিয়ে নিতে প্রবল হয়ে ওঠে মনটা, কিন্তু বিশ্বাস করা কঠিন। খাটের ওপরে দেখে ওষুধ গুলো পরে আছে তার সাথে একটি আন্টিসেপ্টিক মলম রাখা। হটাৎ করে মনে হল ওর পেছনে যেন স্যামন্তক দাঁড়িয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে হ্যাঁ ছেলেটা দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

জিজ্ঞেস করে স্যামন্তক “লাগিয়ে নিতে পারবে ক্রিমটা?”

ক্রিমটা আর বাকি জামা কাপড় নিয়ে চুপ করে বাথরুমে ঢুকে যায় বন্দনা। স্যামন্তকের মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে যায়, আজকেই চলে যাবে বন্দনা, ওকে এখানে পরে থাকতে হবে আরও দিন পনেরো তারপরে চাকরি যেখানে হবে সেখানে চলে যেতে হবে। কলকাতায় কোন নামকরা আই.টি. কম্পানি নেই যেখানে চাকরি পেতে পারে।

দুপুরে খাবার সময় অতিরিক্ত ভাবে শান্ত ছিল বন্দনা, ফিরে আসা কেন যদি ছেড়ে যেতেই হবে? খিচুড়িটা মুখের মধ্যে তেতো লাগছে, বারেবারে কেন ওকে হারাতে হয় যাকে ও আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়? গাল গড়িয়ে দু ফোঁটা জল পরে যায় থালায়। ঠিক সামনে বসে স্যামন্তক বন্দনার ভারাক্রান্ত চেহারা দেখে নিজের খাওয়া ভুলে যায়। চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে স্যামন্তক এমন সময় বন্দনা বলে ওঠে “বসে থাকো আর উঠনা। শুধু একটি বারের জন্য কথা দাও ফিরে আসবে।”

স্যামন্তক মাথা নাড়িয়ে বলে “হ্যাঁ ফিরে আসবো।”

====== ষষ্ট অধ্যায় সমাপ্ত =====

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s