লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ৪


৪র্থ পর্ব – বর্ষার রাত

বন্দনা ফিরে যায় তার নিজের জীবনে ডিব্রুগড়ে, তার নাচের স্কুল তার পুরনো বন্ধু বান্ধবীদের কাছে। নিরুপম বেশ কয়েক বার ফোন করেছিলো কিন্তু আসেনি। বন্দনা অনেক বার করে জিজ্ঞেস করে “আমরা কবে বিয়েটা করবো?” নিরুপম প্রত্যেক বার একই উত্তর দেয় “আরে হানি, একটু দাঁড়াও আমি কয়েকটা এক্সিবিশন করে নেই তারপরে বিয়ে করে ফেলব। এতো তারা কিসের? মন থেকে তো আমরা বিয়েটা করেই ফেলেছি তাই না হানি!“

মার্চ মাসে বন্দনার বাবা রিটায়ার করেন। কৃষ্ণনগরের পুরানো বাড়ির ভাগ বিক্রি করে এপ্রিল মাসে বন্দনারা কলকাতায় চলে আসে। ওর বাবা বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে একটা তিন রুমের ফ্লাট কেনেন। পুবালির বিয়ে পরে বন্দনা প্রথম প্রথম বেশ কয়েক বার বম্বেতে ফোন করেছিলো, দিনে দিনে সেটা কমে যায়। পুবালি অনেক বার ওকে বম্বে ঘুরে যেতে বলে, কিন্তু নিজের নাচের ক্লাস ছেড়ে বন্দনার আর বম্বে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

কলকাতায় ফিরে বন্দনা ভাবে শান্তিনিকেতন অনেক কাছে, নিরুপমের সাথে দেখা করার আর তাদের মাঝে যে দূরত্বটা ছিল সেটা পুশিয়ে নেবার ভাল সময়। কলকাতায় বন্দনা মমতাশঙ্করের নাচের ট্রুপ জয়েন করে। মাঝে মাঝেই ওর প্রোগ্রাম হয় বাংলাদেশ দিল্লি বম্বে আরও নানান জায়গায়। বন্দনা শান্তিনিকেতন এবং ওর নাচ নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরে। মেয়ের বয়স চব্বিশ পার হতে চলে, বন্দনার বাবা মেয়ের জন্য ছেলে দেখতে শুরু করে দেন। প্রথম প্রথম বন্দনা বেশ কয়েকবার বাধা দিয়েছিলো, কিন্তু বাবা বেশি দিন দেরি করতে চাননি।

একদিন বন্দনা ফোন করে নিরুপমকে জানায় যে বাবা তার বিয়ে দিতে চাইছেন। সেই শুনে নিরুপম আবার বলে “কিছু দিন ওয়েট করো আমি কিছু একটা ব্যাবস্তা করে নেবো।“ বন্দনার একগুঁয়েমি দেখে বাবা শেষ পর্যন্ত একটা ছেলে দেখেন, ছেলেটি বিডিও, ঝারগ্রামের দিকে পোস্টিং। প্রেমে পাগল বন্দনা কারুর কথায় কান দেয়না, নিরুপম কে ওর চাই ই চাই।

প্রায় এক মাস নিরুপমের সাথে দেখা হয়নি বন্দনার। মনটা আর বাড়িতে থাকতে চাইলনা। সকাল থেকে ইলশেগুরি বৃষ্টির খেলা চলেছে, এই রকম দিনে, ভেজা ভেজা হাওয়ায় বন্দনার হৃদয়টা দুলে ওঠে, “যদি কাছে পেতাম আমি তাহলে নিজেকে উজার করে খেলায় মত্ত হতাম। ডুবিয়ে দিতাম নিজেকে নিরুপমের ভালবাসায়।“ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের হাত চলে যায় উন্নত বক্ষে, রক্ত গরম হয়ে ওঠে, মত্ত খেলায় কেলি করতে মন ভীষণ ভাবে উন্মুখ হয়ে পরে। কোমল বক্ষ যুগল শির শির করে কাঁপতে থাকে, হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরে নিজের ভরাট উন্নত কুচ। বৃন্ত দুটি যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে মনে হয়, দুই সুডৌল থাইএর মাঝে শিরশির করে ওঠে রক্ত। ঝির ঝির বারী ধারা যেমন জানালার বাইরে ঝরতে থাকে তেমনি বন্দনার নাভির নিচে বইতে থাকে নিজের ফল্গু নদী। সর্ব শক্তি দিয়ে সুন্দর মসৃণ থাই দুটি পরস্পরের সাথে ঘসতে লাগলো নিজের জ্বালা নিবারন করবার জন্য। এখনি ওর চাই নিরুপমকে না হলে ওর পিপাসা মিটবে না। নাভির নিচে, তলপেটের নিচ থেকে শিরশির করতে করতে কেমন যেন শক্তি হারিয়ে এলিয়ে পরে বিছানার ওপরে। অনেক ক্ষণ পরে চোখ মেলে তাকায় বন্দনা “না আমাকে যেতেই হবে।” পাগল হয়ে উঠেছে সে এক মত্ত হস্তিনির ন্যায়।

“আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, কমলিকার বাড়িতে” এই বলে একটা ছোটো ব্যাগে নিজের কিছু জামা কাপড় নিয়ে বেরিয়ে যায়। একটা চিঠি লিখে রেখে যায় ড্রেসিং টেবিলের ওপরে
“আমি নিরুপমের কাছে চললাম, আমাকে খুঁজতে এসনা লাভ হবে না।”

দুর্গাপুর থেকে বাস ধরে ও অনায়াসে শান্তিনিকেতন পৌঁছে যাবে, নিরুপম কে একটা বড় সারপ্রাইস দেবে। ব্যাস চনমনে উচ্ছল তরঙ্গের ন্যায় বন্দনা বেরিয়ে পরে বাড়ি থেকে তার হৃদয়ের মোহনার সঙ্গমে।

ট্রেন থেকে নেমে দেখে চারদিকে কালো করে মেঘ জমে এসেছে, ঝড় বইছে, তুমুল বৃষ্টি। এই ঝড় মাথায় নিয়ে বেরিয়ে কি করবে বন্দনা সাত পাঁচ ভাবতে থাকে “পুবালি বাড়িতে আজ রাতটা কাটিয়ে দিলে হয়, কাল সকালের বাস ধরে যাওয়া যাবে।” বাবা মা যে চিন্তা করবেন সেই টুকুও ওর মাথায় খেলে না।

দিদির বিয়ে হয়ে যাবার পরে স্যামন্তক পরীক্ষার জন্য নিজেকে পরাশুনায় ডুবিয়ে ফেলে। মে মাসে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার দু দিন পরেই চলে গেছিলো দিদির কাছে বম্বেতে, বাড়িতে মন লাগছিলনা ওর। হপ্তা দুএক থাকার পরে ফিরে আসে। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার পরে বেশ কয়েকটা কোম্পানিতে চাকরির দরখাস্ত দিয়েছে কিন্তু গ্র্যাজুয়েট না হওয়া পর্যন্ত কেউ চাকরি দেবে না। ইতি মধ্যে ও দিল্লি এবং পুনে তে গিয়ে কয়েকটা ইন্টারভিউ ও দিয়ে এসেছে।

বম্বে গিয়ে এলিফেন্তা কেভে হারিয়ে গেছিলো স্যামন্তক, দিদি জামাইবাবুর সাথে ঘুরতে ঘুরতে, কিছু না পেয়ে শেষ মেশ জেটি তে বসে থাকে কখনো তো আসবে। স্যামন্তককে খুঁজে না পেয়ে পুবালির চেয়ে সিতাভ্রর অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গেছিলো “বউয়ের একটি মাত্র ভাই আমার একটি মাত্র শালা, তার দর অনেক বেশি।”

দুপুরের পর থেকেই আকাশে মেঘ জমে এসেছে। মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া বইছে। তার সাথে ভেসে আসছে শুকনো মাটির গন্ধ, লাল মাটি একটু পরেই ভিজে যাবে বরষার জলে। স্যামন্তকের ঐ মাটি ভেজা সোঁদা সোঁদা গন্ধটা বুক ভরে নিতে খুব ভাল লাগে। মাঝে মাঝে গুর গুর করে ওঠে আকাশের কালো মেঘ। রাস্তার পাশের বিপিন দেবদারুর গাছ গুলো হাওয়ার দলে মাথা নাড়াতে থাকে। সন্ধ্যে প্রায় ঘনিয়ে আসে। স্যামন্তক একা একা বসে ছিল সোফায়, কিছু করার নেই। কত আর টিভি দেখে কাটানো যায়। জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই রকম ঝড় বৃষ্টি তো অবশ্যম্ভাবী কিছু তো করার নেই। বাবা মা, বোন জেঠু জেঠিমা সবাই মিলে বম্বে ঘুরতে গেছে দিদির বাড়িতে। সিতাভ্রদা দুই মাসের জন্য রাশিয়া গেছে কোনও ট্রেনিংএ, তাই স্যামন্তক বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।

একবার জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকাল স্যামন্তক “আজকে আর আড্ডা মারতে যাওয়া হবেনা।” মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির অনির্বাণএর সাথে সিটি সেন্টাররে গিয়ে আড্ডা মারে। কিন্তু আজ সেটা আকাশের বাদল ভাঞ্ছি দিল। দিদি দিনে তিন বার করে ফোন করবে, সকাল বেলা খাওয়া হল কিনা, দুপুরে খেয়েছিস আবার রাতে একবার করে ফোন করা চাই “কি খেলি আজ, কি রান্না করে গেছিলো কাজের মাসি।“ রোজ একই উত্তর দিতে হয় তাও ভাল লাগে। কাজের মাসি দু দিন আসবেনা, ওর ছেলের শরীর খারাপ তাই দু দিনের রান্না করে ফ্রিজে রেখে গেছে।

বৃষ্টিটা শুরু হয়ে গেলো, প্রথম প্রথম ঝিরঝিরে তার পরে দমকা এক বাতাসে মেঘ গুলো গরগর করতে শুরু করলো। করকর করাৎ করে পাশেই কোথাও বাজ পড়লো মনে হল। জানালা গুলো বন্ধ করে রান্না ঘরে ঢোকে। এক কাপ কফি খেলে ভাল হতো। কফিটা একটু করা করে বানিয়ে একটা সিগারেট জ্বালায় স্যামন্তক, বাল্কনিতে বসে বৃষ্টির আনন্দ নিতে নিতে কফির কাপে ছোটো করে চুমুক দিতে থাকে। ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেয় আজ ওর অন্ধকারে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে। এমন সময় টেলিফোনটা বেজে ওঠে, ভাবতে থাকে কে ফোন করে ওয়ি সময় দিদি তো দুপুরে একবার ফোন করেছিলো আবার কি ফোন করবে

“এই কাক কি করছিস একা একা, দুপুরে খেয়েছিলিস ঠিক করে…”

দিদির গলা শুনে চমকে ওঠে স্যামন্তক “তুই আবার এখন ফোন করলি…”

“একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল তোর কাছে…” গলায় একটু দুষ্টুমি মাখিয়ে পুবালি জিজ্ঞেস করে ভাইকে।

“কি বল?” প্রশ্ন করে স্যামন্তক।

–“পুনেতে যখন ইন্টার্ভিউ দিতে গেছিলি তখন শকুন্তলার সাথে দেখা করেছিলি? কেমন লাগে তোর মেয়েটাকে।”

সিতাভ্রর খুড়তুতো বোন শকুন্তলা, বিয়ের সময়ে আলাপ হয়েছিল মানে এক বার দেখা হয়েছিল। কিন্তু ওর সাথে সেই রকম ভাবে কথা হয়নি স্যামন্তকের। মেয়েটা কচি কিন্তু বেশ ডাগর দেখতে। কাঁচা বয়সের তুলনায় শরীরের গঠনটা বেশ উন্নত। পুবালি অনেক বার বলেছিল ওকে দেখা করতে কিন্তু সময়ের অভাবে ওর দেখা করে ওঠে হয় নি। সেটা ও আর জানায় নি দিদিকে।

আর তো মিথ্যে কথা বলা যায়না “না রে কাজের চাপে আর দেখা করা হয়ে ওঠে নি।”

—“ধুর তোর দারা কিছুই হবেনা, পুনের ইন্টারভিউ টা যদি হয়ে যায় তাহলে খুব ভাল হবে। তুই আমার কাছে প্রত্যেক শুক্রবার রাতে চলে আসতে পারবি আর সোমবার সকালে ফিরে যেতে পারবি।”

“তুই এই জন্যে ফোন করেছিলি? তুই ও না একটা পাগলী মেয়ে।” হাসতে হাসতে বলে স্যামন্তক “এখানে খুব ঝড় হচ্ছে, দারুন লাগছেরে। বেশ একটা কড়া করে কফি বানিয়েছি আর সাথে একটা সিগারেট।”

একটু রাগত শুরে দিদি ধমক দেয় “একা একা দিনে কটা করে সিগারেট খাওয়া হচ্ছে রে তোর?”

এই প্রশ্নের উত্তর ও দিতে চায়না “ফোন রাখ…”

একটু রেগেই ফোনটা কেটে দেয় পুবালি “মড় গে যা… যাই হোক রাতে খাওয়ার পরে ফোন করিস।”

একটু পড়ে কারেন্ট চলে যায়, স্যামন্তক দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে একটা ফ্রিজের ওপরে রাখে একটা খাবার টেবিলে রাখে। চফির কাপটা নিয়ে চুপ করে বসে পড়ে সোফায় “ধুর শালা, এই সময়ে কি কারেন্ট যায়।” একবার মনে করতে চেষ্টা করে শকুন্তলার মুখটা, বড় মিষ্টি দেখতে মেয়েটাকে, যদিও বিশেষ কিছু মনে করে উঠতে পারেনা মুখের আদল আর মিষ্টতা টাকে। এমন সময় দরজায় কেউ নক করে। “কে এলরে বাবা এই ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।” যাই হোক নিচে তো যেতে হবে, টর্চটা হাতে নিয়ে নিচে গিয়ে দরজা খুলতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভিজে চুপসা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা সাদা পায়রা থর থর করে কাঁপছে, পায়রাটার নাম বন্দনা।

বন্দনা হাঁ করে দাঁড়িয়ে দরজায়, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা যে স্যামন্তকের সঙ্গে আবার কোনও দিন দেখা হয়ে যাবে। সত্যি পৃথিবীটা গোলই বটে। পরনের কামিজটা ভিজে গায়ের সাথে লেপটে গেছে, ঠাণ্ডাও লাগছে।

স্যামন্তক ওকে ভিতরে আসতে ইশারা করে। বন্দনার শরীরের প্রতিটি খাঁজে খাঁজে মুড়ে থাকা ভিজে কামিজটা ওর পেলব দেহ টাকে অসম্ভব ভাবে কমনীয় করে তুলেছে। সুডৌল ভরাট বুকের খাঁজ, ধিরে ধিরে পাতলা হয়ে আসা কোমর তার পরে ঢেউ খেলে ওঠে পুরুষ্টু নিতম্ব। ওকি স্বপ্ন দেখছে না সত্যি বন্দনা ওর সামনে দাঁড়িয়ে, ঠিক ভেবে পাচ্ছে না।

“তুমি এখানে?” বন্দনার প্রশ্নে যেন ঘুম ভাঙ্গে স্যামন্তকের।

“হ্যাঁ, তা তুমি এই দুর্যোগের রাতে, কি ব্যাপার কি হয়েছে? ওপরে চলো।” স্যামন্তক ওকে ওপরে উঠতে বলে।

বন্দনা ভাবতে থাকে ওকি সত্যি কথাটা জানাবে না থাক জানিয়ে কি হবে। ওপরে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করে “মাসিমা মেসোমশায়, কেমন আছেন, ভাল।”

“হ্যাঁ ভাল আছেন।” সামনে বন্দনা, পেছনে স্যামন্তক সিঁড়ি চড়তে চড়তে ভেজা কাপরে ঢাকা পায়রার চলন ওর মনটাকে ও দুলিয়ে দেয়, ঠিক প্রথম যে দিন দেখা হয়েছিল, সেই রকম ভাবে। ও বলে “বাড়িতে কেউ নেই, আমি একা। জেঠু, জেঠিমা বম্বে গেছে দিদির বাড়িতে, আমি এক মাসের জন্য বাড়ি পাহারা দিচ্ছি।”

একটু খানির জন্য কেঁপে ওঠে বন্দনার বুক, “ও একা আমিও একা এই নিশুতি দুর্যোগের রাত যাই কোথায়”, ঘাড় ঘুরিয়ে একবার স্যামন্তকের মুখটা দেখার চেষ্টা করে কিন্তু অন্ধকারের জন্যে মুখের ভাব ভঙ্গি বুঝে উঠতে পারেনা। ওপরে উঠে জিজ্ঞেস করে “লাইট কখন গেছে?”

মোম বাতির আলোয় বন্দনাকে যেন এক অপূর্ব সুন্দরী অপ্সরার, ভিজে চুলের কয়েক গুচ্ছ মুখের ওপরে এসে পরেছে, নাকের ডগায় কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল, মুখটাও জলে ভেজা, গালে কয়েক ফোঁটা জল। সুডৌল বুকের উপরি ভাগে এক গভির খাঁজ, বুকের যেটুকু উন্মুক্ত সেখানে জলের দাগ। ওড়নাটা ডান কাঁধে একটা পাতলা দড়ির মতন হয়ে ঝুলে রয়েছে। ছোটো ছোটো চোখে ওর দিকে শত প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে। স্যামন্তক কথা বলতে ভুলে যায়, গলাটা শুকিয়ে যায় ওর।

চশমার পেছন থেকে বড় বড় চোখ দুটি যেন ওকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত জরিপ করছে। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে বন্দনার বুক, নড়ছে ওর পেলব শরীরটা। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে “আমি কি এই রকম ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো না আমাকে চলে যেতে হবে?”

সম্বিৎ ফিরে পায় স্যামন্তক, জোর করে মাথা নাড়ায় “না না, তুমি দিদির ঘরে যাও। ড্রেসটা চেঞ্জ করে নাও, না হলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমি এক কাপ কফি বানাই তোমার জন্যে।”

পুবালির ঘরের দিকে যেতে যেতে ভাবে “একি ডেকে আনলাম আমি নিজের জীবনে, যার কাছ থেকে দুরে যাবো ভেবেছিলাম, সেই আমার সামনে এতো দিন পরে আবার। আমি কাল সকাল হলেই চলে যাবো। আজ রাতটা কোন রকমে কাটলে হয়।”

বাথরুমে ঢুকে কাপড় পাল্টে নেয় বন্দনা, একটা ঢোলা গোলাপি হাত কাটা টিশার্ট আর একটা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা সাদা স্কার্ট। কে জানত যে ওকে দুর্গাপুরে নামতে হবে, ওতো নিরুপমের সাথে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে বাড়ি ছেড়েছে, তাই ও যা জামা কাপড় এনেছে সে গুলো নিরুপমের পছন্দ মতন। ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওর খালি পাদুটি শিরশির করে ওঠে, জঙ্ঘার মাঝে এক চনমনে ভাব শুরু হয়ে যায়। বাথরুম থেকে বের হতে যেন ওর আর শক্তিতে কুলোয় না। কি করে স্যামন্তকের সামনে যাবে এই ভাবতে থাকে, মাসি মেসো থাকলে তো কোনও চিন্তা ছিলনা।

“কতক্ষণ লাগে তোমার বাথরুমে? কফি হয়ে গেছে বের হও তারাতারি” গলায় সাবলীল ভাব এনে ডাক দেয় স্যামন্তক। নিচ্ছয়ই মেয়েটা কোনও বিপদে পড়ে দুর্গাপুরে এসেছে না হলে তো ফোন করত।

“হ্যাঁ বের হচ্ছি রে বাবা। মেয়েদের বাথরুমে একটু দেরিই হয়, তোমাদের মতন না যে ঢুকলাম আর হয়ে গেলো।” বন্দনা ও বুঝতে পারে যে মন থেকে সব কিছু মুছে ফেলে একদম সাধারন ভাবে ব্যাবহার করতে হবে। না হলে এই বর্ষার রাতে……

হেসে ওঠে স্যামন্তক, একটু ভয় দেখাতে ইচ্ছে করে ওর, একটু খানি মজা—“ঠিক আছে, নাও যত সময় নিতে পারো আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দরজার বাইরে।”

চেঁচিয়ে ওঠে ভেতর থেকে “কি তুমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে? ভাগ…” দরজা খুলে দেখে স্যামন্তক সোফায় বসে ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি করে হাসছে।

যেই মাত্র বন্দনা দরজা খুলে বের হয়, হাঁ হয়ে যায় স্যামন্তকের মুখ, চঞ্চল হয়ে ওঠে রক্ত মাখা শিরা উপশিরা। এই নির্জন বরষার রাতে, মেয়েটা একটা ছোটো স্কার্ট আর টপ পড়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে। তলপেটের নিচটা মুচরে ওঠে। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, কান দুটি গরম হয়ে যায়। কি দেখছে ও, নিজের চোখ দুটিকে বিশ্বাস করতে পারেনা। মেয়েটি আজ ওকে ঠিক করে শুতে দেবেনা, থাকতে দেবেনা এমনকি হয়তো বাঁচতেও দেবেনা।

বাঁ হাত টা বাড়িয়ে বন্দনার হাতে কফি মগ টা ধরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে “কেমন আছো?”

ছোটো সোফায় জড়সড় হয়ে বসে বন্দনা, কাপে একটা ছোটো চুমুক দেয়। একটু অসস্থি বোধ হয়, হাঁটুর নিচ থেকে পাটা পুরো অনাবৃত, টপ টাও হাত কাটা, দুই হাত অনাবৃত। মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয় “হ্যাঁ ভালো আছি।” ভাবতে থাকে স্যামন্তক যদি প্রশ্ন করে যে কেন এসেছ তাহলে কি উত্তর দেবে, সত্যি কথাটা কি বলে দেবে ও, শুনে কি ভাববে। যাই ভাবুক না কেন ওতো চিরদিনের মতন নিরুপমের হতে চলেছে।

স্যামন্তক জিজ্ঞেস করে “কি ব্যাপার, এতো রাতে এখানে, কিছু হয়েছে কি? এখানে আসাটা নিশ্চয়ই সাডেনলি না হলে ফোন করতে তাইতো।”

“হ্যাঁ, সাডেনলি।” একটু খানি আমতা আমতা স্বরে বলে, মোমবাতির টিম টিম আলোয় ঘরটা ভুতুরে লাগে। সামনের দেয়ালে, স্যামন্তকের ছায়াটা যেন একটা দানব। বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নেয় ঠিক যেন গভির জলে ঝাঁপ দেওয়ার আগের প্রস্তুতি “আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।”

আস্ফুট আওয়াজ বের হয় হতোচকিত স্ত্যামন্তকের মুখ থেকে “কি?”

টি টেবিলেটার দিকে দৃষ্টি প্রক্ষেপণ করে নিচু স্বরে বলে বন্দনা “বাবা আমার জন্য ছেলে দেখেছেন, আমার বিয়ে দিয়ে দেবেন, তাই আমি পালিয়েছি।”

চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে স্যামন্তকের, এক অদ্ভুত রাগ আর বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে মনটা, মাথাটায় ঝিম ধরে। ভুরু কুঁচকে কড়া চাহনিতে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টে বন্দনার আবছা আলেয়ায় মাখা কাতর বেদনা ময় মুখটির দিকে।

কাতর স্বরে বলে ওঠে বন্দনা, চোখে মাখা বেদনা “পুবালিকে জানিও না প্লিস।”

চিবিয়ে উত্তর দেয় স্যামন্তক “কেন দিদি কে জানাতে কি হয়েছে?” নিঃশ্বাস টা বন্দ করে নেয়, বুকের মাঝের আলোড়নটাকে আয়ত্তে আনতে চেষ্টা করে, স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে স্যামন্তক।

—“এমনিতে আমি ওর চোখে অনেক পড়ে গেছি, আর নিজেকে ছোটো করতে চাইনা।”

—“তো তুমি সেটা বোঝো তাহলে।”

“হ্যাঁ” মাথা নাড়িয়ে বলে বন্দনা “আমি নিরুপমকে ছেড়ে থাকতে পারবোনা সুতরাং সেই সব কথা নিয়ে বলে তো লাভ নেই।”

“ওকে, আমি দিদিকে জানাবো না।” স্যামন্তক কফি কাপ টা এক চুমুকে শেষ করে। কথা বলার কিছু নেই, কি বলবে আর। দুই জনেই চুপ চাপ বসে থাকে।

বন্দনা জিজ্ঞেস করে “রান্না করা কি আছে না রান্না করতে হবে?”

—“রান্না করতে লাগবে না, ফ্রিজে আছে। এমনিতে কাজের মাসি দুদিন আসবেনা তাই দুদিনের রান্না করে রেখে গেছে।”

একটু হেসে বলে বন্দনা “কেনও তুমি রান্না জানোনা?”

—“আলু সিদ্ধ ভাতে ভাত সব ব্যাচেলার ছেলেরা পারে সেটাই জানি।”

—“কিছু করতে হবে কি না বল আমি করে দিচ্ছি।”

মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় বন্দনাকে যে কিছু বানাতে হবে না। এমন সময় কারেন্ট চলে আসে। এমনিতে সব ঘরের লাইট বন্দই ছিল তাই উঠে পড়ে স্যামন্তক, এক এক করে ঘরের লাইট গুলো জ্বালাতে।

বন্দনা কি করেবে কিছু ভেবে না পেয়ে, টিভি চালিয়ে দেখতে বসে যায়। টিভি চলতে থাকে টার সাথে মনের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ভরে ওঠে “আমি যা করতে যাচ্ছি ঠিক করছি তো? হ্যাঁ কেন নয়, নিরুপম কে একটা সারপ্রাইস ও দেওয়া হবে। কিন্তু ওকে না জানিয়ে আসা টা কি ঠিক হল? যা হবার দেখা যাবে। এক বার ফোন করবো, না ফোন করলে তো কি বলবে জানিনা। না এক বার রাতে ফোন করে নেবো দেখি কি বলে। কিন্তু যদি না বলে তাহলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে যে? না আমি বুঝিয়ে বলবো যে আমি যদি বাড়ি ফিরে যাই তাহলে বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দেবে।”

স্যমন্তক সব ঘরের লাইট জ্বালিয়ে, খাবার টেবিলে বসে পেছন থেকে টিভি দেখতে থাকে। বাইরে ঝড়টা অনেক কমে গেছে, ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে এক নাগাড়ে, থামার নাম নেই। হয়তো মাঝ রাতে গিয়ে থামবে। ঘড়ির দিকে তাকায়, রাত ন’টা বাজে, খেয়ে দেয়ে নেওয়া উচিৎ, এমনিতে দেরিতে খায় কিন্তু আজ আর বেশিক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছে করছেনা ওর।

স্যামন্তক বন্দনা কে জিজ্ঞেস করে “খেয়ে নেবে কি?”

বন্দনা একটু চমকে ওঠে, এতোক্ষণ ডুবে ছিল নিজের চিন্তায়। মাথা ঘুরিয়ে উত্তর দেয় “তোমার কি খিদে পেয়েছে, তাহলে খেয়ে নিতে পারি।”

—“না মানে তুমি তো অনেক ক্ষণ খাওনি নিশ্চয়ই তাই জিজ্ঞেস করলাম।”

—“ঠিক আছে খেয়ে নেই, কাল আমাকে তারাতারি উঠতে হবে। সকাল সকাল বেরিয়ে যাবো।”

কোনও উত্তর দেয়না স্যামন্তক, ফ্রিজ থেকে খাবার গুলো বের করতে লেগে যায়। বন্দনা উঠে এসে, এক এক করে খাবার গুলো রান্না ঘরে নিয়ে গিয়ে গ্যাসে গরম করতে লেগে যায়। থালা ধুয়ে টেবিলে সজায় স্যামন্তক।

খাবার সময় চুপচাপ খেয়ে চলে দুজনে, একে অপরের দিকে মুখ তুলেও তাকায় না।
এক সময় স্যামন্তক জিজ্ঞেস করে “তুমি যে স্টেপটা নিয়েছ সেটাতে তুমি কনফিডেন্ট।”
“হ্যাঁ কেনও? তুমি কেনও এই প্রশ্ন করছও?” বন্দনা একটু রাগত সুরে জিজ্ঞেস করে ভাবে ‘কি দরকার তোমার জানা নিয়ে আমি কি করি না করি’

—“এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কিছু না।”

খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে, বম্বে ফোন করতে হবে, এমনিতে দিদি ফোন করে সাড়ে দশটার পরে, কিন্তু আজ আগে করবে কিনা ভাবছে।

বন্দনা চুপ করে পুবালির ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। যদি আজ স্যামন্তকের সাথে দেখা না হতো তাহলে ওর মনে এই সব দ্বিধা জাগত না, কিন্তু এখন মনের মাঝে শত প্রশ্ন জেগে ওঠে হটাৎ করে। চুপ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফেলে আসা ডিব্রুগড়, ছোটো বেলা থেকে বড় হয়েছে রেল কলোনিতে। বাবা ছিলেন রেলের কর্মচারী। ছোটো বেলা থেকে নাচে গানে ভালো ছিল। ফুলবাগানের ভিক্টোরিয়া গার্লস স্কুল থেকে পড়াশুনা শেষ করে বাবা কে অনেক আবদার করে শান্তিনিকেতনে নাচ শিখতে যায়। ছুটির দিনে বান্ধবীদের নিয়ে চর পড়া ব্রমহপুত্র নদিতে ঘুরতে যাওয়া, মাঝে মাঝে চরুই ভাতি করতে যাওয়া হতো সাইখুয়াতে, সেই সব দিন গুলোর কথা মনে পড়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে বন্দনার। একদিকে ফেলে আসা দিন, অন্য দিকে নতুন সূর্য, নিরুপম। খুব ইচ্ছে হয় একবার নিরুপম কে ফোন করতে। রাত অনেক হয়ে গেছে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে বন্দনা, ঘুম আর আসতে চায়না দু চোখে।

অনেকক্ষণ পড়ে জল খাবার জন্য উঠে পড়ে বন্দনা, সব ঘরের আলো নিভানো। রান্না ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে যে খাওয়ার ঘরের ছোটো আলোটা জ্বালানো, ধুক করে ওঠে বুক টা “স্যামন্তক এখনো জেগে?” উঁকি মেরে দেখে টিভি টা চলছে, সোফায় গা এলিয়ে পড়ে আছে ছেলেটা। চুপচাপ কিছুক্ষণ ঘুমন্ত মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকে যেন একটি ভিজে বেড়াল, মৃদু হেসে টিভি টা বন্দ করে দেয়। জল খেয়ে শুয়ে পড়ে বন্দনা।

সকাল বেলা যখন ঘুম ভাঙে ওর, তখনও ঠিক ভাবে ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি। বাথরুমে ঢুকে নিজেকে তৈরি করে নেয় এক নতুন জীবনে পদার্পণ করার জন্য। নিজের ছোটো ব্যাগটায় জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে দেখে স্যামন্তক তখন ঘুমোচ্ছে। “ওকে আর জাগিয়ে কি লাভ, এমনিতে চলে গেলে ভালো”

এই ভেবে একটা ছোটো কাগজে লেখে

“রাতটার জন্য ধন্যবাদ। আমি জানি, আজকের পরে কোনও দিনও তুমি আমাকে ভালো চোখে দেখবে না, কিন্তু আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে বুঝতে পারতে আমি ঠিক করছি। আমি সবার কাছ থেকে অনেক দুরে চলে যাচ্ছি, তোমার সাথে হয়তো আর কোনও দিন দেখাও হবেনা। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই আর জাগালাম না, ঘুম থেকে উঠে গেলে হয়তো আমাকে যেতে দিতে না। আমি বাড়িতে চিঠি লিখে এসেছি সুতরাং বাবা মা আমাকে খুঁজবে না হয়তো। আমি নিরুপমের কাছে যেতে বদ্ধ পরিকর। আই হ্যাভ ম্যেড আপ মাই মাইন্ড। গুড বাই।”

==== চতুর্থ পর্বের সমাপ্তি ====

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s