লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ৩


৩য় পর্ব – বিদায় নেবার পালা

সকাল থেকে সারা বাড়ি মুখরা, শয্যা তুলুনি নিয়ে একচোট হয়ে গেছে সিতাভ্র আর স্যামন্তকের মাঝে। জামাইবাবু একশো এক টাকায় আটকে, স্যামন্তক নাছোড়বান্দা হাজার এক টাকা দিলে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না হলে নয়। সিতাভ্র অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা চালিয়ে যায়, দাঁত ব্রুস করতে দেবার জন্যও উঠতে দেয়না, চা খাওয়া বা বাথরুম যাওয়া দুরের কথা। মা জেঠিমা একবার করে আবেদন করে গেলো “ছেড়ে দে তুই ওকে।” স্যামন্তক খ্যাঁকরে ওঠে “তোমার পকেট থেকে যাচ্ছে নাকি। চুপ করে থাকো।” পুবালির দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে সিতাভ্র “কি করবো বলো, একটু বাঁচাও।” পুবালি হেসে বলে “শালা জামাই বাবুর মধ্যে আমাকে টানো কেন, নিজে কিছু করো।” বন্দনার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে থাকে। শেষ মেশ শ্যালিকার দিকে তাকায় সিতাভ্র “হেল্প মি প্লিস।” স্যামন্তক কট মট করে তাকায় বন্দনার দিকে “কিছু বলতে এলে মাথা ভেঙে দেবো।”

সিতাভ্র মজা করে বলে “ক্রেডিট চলবে কি? পোস্ট ডেটেড চেক দিচ্ছি পাঁচ হাজার টাকার নিয়ে নাও।”

—“ক্যাশ ছাড় নাহলে বাথরুমে যেতে দেবো না।”

—“এখানে করে দিলে কি ভাল হবে?”

—“নিজেকে ধুতে হবে, বউ এখনো আমার হাতে।”

—“রেখে দাও, সাতপাক তো দেওয়া হয়ে গেছে আবার কি চাই।”

—“মানালি গিয়ে একা একা আঁঠি বেঁধো তাহলে।”

পুবালির মুখ লাল হয়ে যায়—“তুই উলটো পাল্টা বলা ছারবি। এবারে আমি তোকে মারবো কিন্তু।”

—“বর কে বোঝা, না হলে এখান থেকে কেটে পড়। বেশি বলতে যাসনা, এক রাত হোল না, পালটি মেরে যাচ্ছিস।”

পুবালি কি করে, সিতাভ্র কে বলে—“দিয়ে দাও নাহলে ছারবেনা।”

—“নেই তো কি কোরবো, কোথা থেকে এনে দেবো রে বাবা।”

শেষ মেশ জেঠিমা ওকে শান্ত করায়। সিতাভ্রর দিকে তাকিয়ে বলে—“শাশুড়ির জন্যে পার পেয়ে গেলে, বম্বে গিয়ে বাকিটা উশুল করবো।”

বাকিটা দিন কাজে কর্মে কেটে যেতে থাকে। স্যামন্তক বাড়ির কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরে, বর কনে যাবে। ওদিকে প্যান্ড্যাল খোলা, খাওয়ার জায়গা সাফ করার লোকজন যোগাড়। সব হিসাব ঠিক করে রাখতে হবে, রাতে দিদি চলে যাবার পরে বাবা জেঠূর সাথে বসে হিসেব দিতে হবে। বাকি থাকে কনেযাত্রী যাওয়ার গাড়ি ঠিক করা। সিতাভ্রর কাকার বাড়ি বেনাচিতিতে, সেইখান থেকে বিয়ে হয়। রি-কোল পার্ক থেকে বেশি দুরে নয়।

বন্দনা সারাক্ষণ পুবালির আসেপাশে থাকে, সুবিমলের কোন কাজ নেই বিশেষ। মাঝে মধ্যে এসে ওদের সাথে গল্প করে চলে যায়।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসে। পুবালি আর সিতাভ্র এবারে যাবার পালা। কিছুক্ষণ পরে সারা বাড়িতে কনে বিদায়ের কান্নার রোল শুরু হবে। এমনিতেই সবার চোখে জল ছলছল করতে থাকে। এক এক করে আশীর্বাদ করে নব দম্পতি কে।

বন্দনা পুবালির সাথে যাবে বেনাচিতি, রাতে থাকবেনা। সুবিমল বা অন্য কেউ ওকে আনতে যাবে। একটা সাধারন সালওয়ার কামিজ পরে, তার ওপরে একটা গাড় নীল রঙের কার্ডইগান চাপিয়ে নেয়। খুব বেশি সাজার ইচ্ছে করেনা, এমনিতে চারদিকের কান্নার রোল দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। তারপরে ও ভাবতে থাকে যে পুবালি চলে যাবার পরে ও কার সাথে কথা বোলবে। কাল রাতের ঘটনার পরে স্যামন্তকও সকাল থেকে ঠিক ভাবে কথা বলছেনা। সুবিমল বা অন্য কারুর সাথে কথা বলতে হবে বা কিছু করে সময় কাটাতে হবে আরও দুই দিন। বউভাতের পরের দিন ওর ফিরে যাবার টিকিট।

স্যামন্তক এই ফাঁকে চুপিচুপি ছাদে উঠে, জলের ট্যাঙ্কের ওপরে চড়ে বসে। ঐ কান্নার মধ্যে যাবার ওর কোনও ইচ্ছে নেই। অন্তত দিদির চোখের সামনে তো নয়ই। একটা সিগারেট ধরিয়ে, শুয়ে পরে। সন্ধ্যের আকাশে, এক এক করে তারারা ফুটে উঠছে। পাখী গুলো দিনের শেষে নিজের বাসায় ফেরার জন্য উড়ে চলেছে। বাতাসে একটা ঠাণ্ডার আমেজ বয়ে চলে। মাথার ওপরে পাখী গুলোর কিচির মিচির আওয়াজে ওর মনটা কেমন কেঁদে ওঠে।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরনো সব কথা। বড়দি ওদের দুজনার চেয়ে প্রায় সাত বছরের বড়। ছোটো বেলায় যখন বড়দি এক থালায় ভাত মেখে খাইয়ে দিত তখন দুই ভাই বোনের মধ্যে ঝগড়া লাগতো কে আগে খাবে সেটা নিয়ে। ছুটিতে এক নয় কলকাতায় যাওয়া হতো পুবালিদের নাহলে বাবা মা স্যামন্তককে নিয়ে চলে আসত দুর্গাপুরে। বাড়ির বাগানে একটা শিউলি ফুলের গাছ আছে, ছোটো বেলায় সেই গাছে ঝাঁকা দিয়ে কত শিউলি ফুল কুড়িয়েছে ওরা। পুবালি ভাইকে ‘কাক’ বলে খেপাত আর স্যামন্তক দিদিকে ‘হারগিলে’ বলে ডাকতো। ছোটো বেলায় দুজনেই অনেক রোগা পটকা ছিল। একবার দিদির পুতুল ঘর ভেঙ্গে দেয় তাই নিয়ে পুবালি মাথা ফাটিয়ে দেয় স্যামন্তকের। তার পরে মাথা থেকে রক্ত দেখে নিজেই কান্না জুরে দেয়। রক্ত থেমে যায় কিন্তু পুবালির কান্না কেউ আর থামাতে পারেনা। শেষ মেশ বড়দি পুবালিকে গল্প শুনিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে চুপ করায়। স্যামন্তকের রাগ হয়, মার খেলাম আমি আর দিদি খেল আদর, ব্যাস এক দিন পুরো কথা বন্দ। দিদি নাচ শিখতে শান্তিনিকেতনে চলে যায়, অনেক বার গেছে দিদির সাথে শান্তিনিকেতন। কলেজে প্রথম যেদিন পা রাখে স্যামন্তক, সেই দিন পুবালি নিজের জমানো টাকা দিয়ে ভাইকে একটা বাইক কিনে দেয়।
স্যামন্তক বলে—“চল ঘুরে আসি।”
মাথায় হাথ বুলিয়ে পুবালি বলে—“আমাকে নিয়ে কেন, তোর গার্লফ্রেন্ড কে নিয়ে ঘুরতে যাস।”
এক বছর পরে প্রথম শ্যামলীকে বসায় বাইকের পেছনে, রেড রোডের ওপর দিয়ে বাইক ছোটায় সেদিন। খুব খুশিতে ছিল সেদিন, ফোন করে জানায় দিদিকে—“জানিস আজ প্রথম কাউকে নিয়ে বাইক চালালাম।”
পুবালি হেসে বলে—“অনেক বড় হয়ে গেছে আমার ভাইটা।”

এই সব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে স্যামন্তক, চোখের জল বাঁধ মানেনা।

এক এক করে সবাই আশীর্বাদ করে পুবালিকে, ঘন ঘন চোখ মুছতে থাকে। সবাই কে দেখতে পায়, বড়দি, জামাইবাবু, দুই বোনঝি, ছোটো বোন, কাকু কাকিমা বাবা, মা, সবাই আছে কিন্তু দিদির চোখ থেকে থেকে খুঁজতে থাকে ভাইকে।

সুবিমল কে ডেকে বলে—“স্যামু কোথায় গেলো?”
খোঁজ খোঁজ কোথায় স্যামন্তক, কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না ছেলেটাকে। ওদিকে দেরি হতে থাকে যাবার। সুবিমল ছাদে গিয়েও খুঁজে পায়না। স্যামন্তক তো জলের ট্যাঙ্কের ওপরে শুয়ে। সুবিমল এবং বাড়ির অন্য লোকেরা হাঁক পারে—“স্যামন্তক স্যামন্তক।”

সুবিমল নিচে এসে জানায় যে স্যামন্তককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুবালিকে আর দেখে কে, আর ও নড়বে না। ভাই এলে তবে ও যাবে, ওদিকে স্যামন্তক ওপর থেকে সব শুনেও চুপ করে থাকে, দিদির সামনে যাওয়ার মতন শক্তি নেই।

সুবিমল আবার একবার ছাদে এসে খুঁজে যায়, দেখে স্যামন্তক জলের ট্যাঙ্কের উপরে বসে। চেঁচিয়ে বলে—“কি করছিস ওখানে নেমে আয়, পুবালি যাচ্ছে তোকে খুঁজছে ও।”

দুঃখ ঢেকে চেঁচিয়ে বলে স্যামন্তক—“বাল ছিঁড়ছি এখানে বসে। ওকে বোলো আমি নিচে যাবনা। বেনাচিতি বেশি তো দুরে নয়, রাতের বেলা দেখা করে আসবো। কিন্তু এখন আমি নিচে যাবনা।”

সুবিমল নিচে এসে পুবালিকে জানায় যে স্যামন্তক ছাদে বসে, নিচে আসবেনা। পুবালির মনটা ককিয়ে ওঠে ব্যাথায় ‘ঠিক আছে রাতে ত যাবে, বেচারার কি যে অবস্থা হবে কে জানে।’ নিজেকেই সান্ত্বনা দেয়, বুঝতে পারে যে স্যামন্তক আসবেনা নিচে, অগত্যা কিছু বলার থাকেনা ওর। চোখে জল নিয়ে গাড়িতে চাপে, পাশে বন্দনা।

স্যামন্তক চুপি চুপি নিচে নেমে এসে এক কোনে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। গাড়িটা স্টার্ট নেয়, পুবালি দেখতে পায় ভাইকে। হাথে দিয়ে ইশারা করে ডাকে কাছে, গাড়ির স্টার্ট বন্দ হয়ে যায়। স্যামন্তক কাছে এসে পুবালির দিকে জল ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলেনা, একটু হাসে। পুবালি ওর মাথায় গালে হাত বুলায় হাসি কান্না মিলিয়ে ধরা গলায় বলে “রাতে আসিস কাজ শেষ করে” তারপরে ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বলে।

সিতাভ্রর কাকার বাড়িতে পৌঁছতে বেশি দেরি হয়না। সবাই নতুন বউকে বরন করতে ব্যাস্ত হয়ে পরে। সব কাজ কর্ম শেষ হয়ে যাবার পরে দুই বান্ধবী একটু একা সময় পায়।

পুবালি বন্দনাকে জিজ্ঞেস করে—“কিরে তুই আজ এতো চুপচাপ কেনও সকাল থেকে? কেউ কি কিছু বলেছে।”

হেসে বলে বন্দনা—“কই নাতো কিছুই তো হয়নি। সব ঠিক আছে। তোর জন্য মনটা খারাপ লাগছিলো তাই।”

—“বেশ তো, এবারে তুই বিয়েটা করে ফেল আর দেরি করছিস কেনও?”

—“বাবা মা নারাজ সেটাতো জানিসই, এই ভাবে কি করে করি তাই ভাবছি।”

—“নিরুপম কি বলছে?”

—“ও তো কিছুই বলছেনা। ও বলছে ওয়েট করো। এর বেশি ওয়েট করলে, বাবা আমার বিয়ে অন্য কারুর সাথে দিয়ে দেবে।”

—“তুই যদি চাস তো আমি এক বার কথা বলতে পারি মাসিমা মেসোর সাথে।”

—“আরে না না, আমি ঠিক করে নেবো।”

—“তোকে কে নিতে আসছে? বড়দি কে কিছু বলে এসেছিস বা স্যামুকে গাড়ি পাঠাতে বলেছিস কি?”

—“আমি জানিনা, আমি তো ভাবলাম কেউ না কেউ নিতে আসবে।”

—“ঠিক আছে আমি ফোন করে জেনে নেবো খানে।”

ফোন করে বলে স্যামন্তককে পাঠাতে, যাবার বেলায় ঠিক ভাবে কথাও বলতে পারেনি পুবালি ওর ভাইয়ের সাথে। ও ভাবতে থাকে, যদি চাকরি নিয়ে বম্বে যায় তাহলে বেশ ভাল হবে, বম্বে না হলেও কাছাকাছি যদি পুনেতে ও চাকরি পায় তাহলে ও হবে। তারপরে বন্দনা আর ও গল্প করতে করতে রাত হয়ে যায়। বন্দনা যখন জানতে পারে যে স্যামন্তক আসছে ওকে নিতে ওর কেমন যেন একটু লাগে “কেন ও আসছে, অন্য কাউকে পাঠাতে পারত তো। বড় মুশকিল সময়, মনকে বেঁধে রাখার।”

পুবালি চলে যাবার পরে বাড়িটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে সবার। স্যামন্তক সব হিসাব নিয়ে বসে পরে ওপরের ঘরে। রাত বাড়তে থাকে, বড়দি স্যামন্তককে বলে—“এই ছেলে, যা এবারে ঐ বাড়ি, একবার দেখে আয় পুবালিকে আর বন্দনাকে নিয়ে আয়।”

মাথা চুলকে স্যামন্তক বড়দি কে জিজ্ঞেস করে—“আমাকেই আনতে যেতে হবে?”

—“আর কে যাবে?”

—“সুবিমলদা কিম্বা অন্য কাউকে গাড়ি দিয়ে পাঠালে তো পারো।”

—“গাড়ি আছে কি নেই তুই জানিস, যা করার তুই করবি। পুবালি ফোন করেছিলো তাই আমি তোকে মনে করিয়ে দিলাম যে মেয়েটাকে আনতে কাউকে যেতে হবে।”

“আচ্ছা যাচ্ছি” বলে স্যামন্তক বেরিয়ে গেলো। গাড়ি সব চলে গেছে, পাশের বাড়ির কুনালের বাইক নিয়ে আনতে যেতে হবে। বাইরে অনেক ঠাণ্ডা তাই গায়ে একটা জ্যাকেট চাপিয়ে নিলো। হেলমেট পরে বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে নিজের মনেই হেসে ফেলে স্যামন্তক। মিনিত কুড়ি লাগে, ফাঁকা রাস্তা দিয়ে বাইক হাঁকাতে।

ঢুকেই দেখে সিতাভ্র বসার ঘরে বসে আরও সব লকজনের সাথে গল্প করছে। ওকে দেখে বলে—“কি হল শালা বাবু, দিদি কে ছেড়ে থাকা গেলো না?”

হেসে বলে—“কাল রাতের পরে আমি দেখব কত বউ ছেড়ে থাকো।” তারপরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে “মানালিতে অনেক ঠাণ্ডা গুরু, রুম থেকে বাইরে বেশি বেরিওনা। কলকাতায় গিয়ে আমি একটা দারুন সারপ্রাইস প্রেসেন্ট দেবো তোমাকে, সঙ্গে নিয়ে যেও অনেক কাজে দেবে।”

ভুরু কুঁচকে তাকায় শালার দিকে, স্যামন্তক হেসে চলে যায়। পুবালি স্যামন্তকের গলা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে, পেছনে বন্দনা। ভাইকে দেখে বলে ওঠে—“কিরে ছাদে গিয়ে বসে ছিলিস কেন তখন?”

দিদিকে জড়িয়ে ধরে বলে—“তো কি করতাম, তোর প্যান প্যানানি দেখতাম নাকি দাঁড়িয়ে।”

“একটু বসে যা।” পুবালি ওকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। এমন সময় একটা সুন্দরী মেয়ে একটা প্লেটে কিছু মিষ্টি আর এক কাপ কফি নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢোকে। পরনে একটা টপ এবং নিচে স্কার্ট। স্যামন্তক একবার আপাদমস্তক মেয়েটিকে নিরীক্ষণ করে। বয়সের অনুযায়ী শরীরের গঠনটা বেশ উন্নত। কাঁচা দেহ এখন পাকার অপেক্ষায়। গায়ের রঙ ফর্সা, নাক টিকালো, চোখ দুটি বেশ বড় বড়, চোখে মিটি মিটি হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তক আর পুবালির দিকে। মাথার চুল বেশি লম্বা নয়, ছোটো একটা পনি টেল বাঁধা। পরনের টপ টা, তরুণীর ঊর্ধ্বাঙ্গ এর প্রত্যেকটি আঁকা বাঁকা ঢেউ সুন্দর ভাবে মেলে ধরেছে।

পুবালি আলাপ করিয়ে দেয়—“শকুন্তলা, তোর জামাই বাবুর খুড়তুতো বোন। এই বছর উচ্চ মাধ্যমিক দেবে। এই বাড়িটা এদের।”

শকুন্তলা প্লেটটা স্যামন্তকের হাথে ধরিয়ে দিয়ে নতুন বউদির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দু চোখে লালিমা মাখা যেন ভোরের সূর্যি উঁকি মারছে।

স্যামন্তক পুবালির দিকে তাকিয়ে হাসে, কানের কাছে ফিসফিস করে বলে—“সাঙ্ঘাতিক তো রে।”

“তোর তো সবাইকে সাংঘাতিক বলে মনে হয়” মাথায় একটা থাপ্পর মেরে হেসে বলে পুবালি, “খেয়ে নিয়ে তারাতারি, বের হ অনেক রাত হয়ে গেছে।”

পেছন থেকে বন্দনা মিটি মিটি করে হাসতে থাকে, ওকে হাসতে দেখে স্যামন্তক বলে ওঠে—“দাঁত কেল্লাচ্ছো কেনও? ফিরতে আমার সাথেই হবে, সেটা মনে আছে।”

পুবালি বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে—“কি যে করিস না তোরা।”

“কেন আমি কি করলাম?” বন্দনা জিজ্ঞেস করে পুবালি কে।

“তুই কবে ফিরে যাচ্ছিস?” জিজ্ঞেস করার সময় পুবালির মুখটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

“পরশু দিন, হাওড়া থেকে রাতে ট্রেন।” বন্দনা পুবালির হাথের ওপর হাথ রেখে উত্তর দেয়।

“ঠিক করে থাকিস” তারপরে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে বলে “আর দেরি করিস না, যা তোরা। আর হ্যাঁ, পারলে সকাল বেলা বন্দনাকে নিয়ে চলে আসিস।”

“আমি আবার?” বন্দনা জিজ্ঞেস করে পুবালিকে।

“আবার কবে তোর সাথে দেখা হবে তাতো জানিনা। তুই তো ডিব্রুগরে ফিরে যাবি, আমি চলে যাবো বম্বে।” বলতে বলতে পুবালির গলা একটু ধরে এলো।

স্যামন্তক বেগতিক দেখে বলে—“চল আমরা বের হই, কাল সকালে ওকে আমি পৌঁছে দেবো খানে।”

স্যামন্তক আর বন্দনা বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। বাইকে স্টার্ট দিয়ে বন্দনাকে পেছনে বসতে ইশারা করে স্যামন্তক। বন্দনা বাইকের পেছনে চেপে বসলো, আলতো করে ডান হাথটা ওর কাঁধে রেখে নিজেকে ব্যালেন্স করে বসে একটু দুরত্ব রেখে। কারুর মুখে কোনও কথা নেই, দুজনেই চুপ। রাত তখন এগারোটা বাজে। জিটি রোড ধরে বাইক চালায় স্যামন্তক, সামনে থেকে পেছন থেকে শুধু ট্রাক আসা যাওয়া করছে। ভারি ট্রাকের ঘড়ঘড় আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাচ্ছে। চারদিকের হিমেল হাওয়া বন্দনার উষ্ণতা উরিয়ে নিয়ে যায়। ওর পরনের কার্ডিগান টা ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা কে রুখে রাখতে পারেনা। পেছনে বসে কাঁপতে থাকে বন্দনা, তাও নিজেকে স্যামন্তকের সাথে জড়িয়ে ধরতে চায়না। দুজনের মাঝের শীতল নীরবতা, বন্দনার হৃদয়ে পেরেকের মতন ফুটতে থাকে।

স্যামন্তক ভাবে, “যা হবার হয়ে গেছে একবারের জন্যও মাফ করে দাও।“ ইচ্ছে করেই একটু ব্রেক দেয় স্যামন্তক, আলতো করে স্যামন্তকের ডান কাঁধে চাপ দেয় বন্দনা, সামনের দিকে একটু ঝুঁক পরে কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে নেয় বন্দনা ওর ওপরে পরে যাবার আগে। স্যামন্তক বেশ ভাল ভাবে বুঝতে পারে বন্দনার মনের আলোড়ন।

গান্ধী মোড়ের কাছে এসে বাঁক নেবার আগে, স্যামন্তক বাইকটা আস্তে করে নেয়। বন্দনা তখনও চুপ করে বসে থাকে। একবারের জন্যও মনে হয় জিজ্ঞেস করে “কেনও থামাচ্ছো? সোজা বাড়ি চলো।“ বড় রাস্তা থেকে বাঁ দিকে মুড়ে বাইক থামিয়ে দেয় স্যামন্তক। বন্দনার নিজের চোয়ালটা শক্ত করে ফেলে একটু রাগ হয়। হেলমেটটা খুলে ঘাড় ঘুরিয়ে বন্দনার দিকে তাকায় এক করুন চোখে। বন্দনার চোখ দিয়ে তখন আগুনের ফুল্কি ঝরে পরে ওর চাহনি দেখে, মনে মনে বলে ওঠে “আদিখ্যেতা দেখাচ্ছ না দয়া দেখাচ্ছ তুমি আমার ওপরে? তুমি কি ভাব নিজেকে।”

স্যামন্তক নিচু স্বরে বলে ওঠে—“আই এম সরি।”

“সরি বললে সব শেষ হয়ে যায়, তাই না।” ঝাঁঝিয়ে ওঠে বন্দনা।

“কি করতে হবে আমাকে বলো, আমি সেটা করবো।” কাতর স্বরে বলে স্যামন্তক।

“আমার সাথে কি নরমাল ব্যাবহার টুকু করা যায়না? আজ সকাল থেকে তুমি আমার সাথে এমন বিহেভ করছও যেন আমি অচ্ছুত কন্যা” বলতে বলতে গলা ধরে আসে বন্দনার। নিজের অজান্তেই স্যামন্তকের ডান কাঁধটা খামছে ধরে “আমি কি এমন করেছি তোমার সাথে যে তুমি আমার সাথে ঐ রকম বিহেভ করছও?”

বন্দনার ধরা গলা শুনে স্যামন্তকের মনটা কেমন গলে যায়। বাঁ হাতটা পেছনে বাড়িয়ে দিয়ে বন্দনার কোমরটা আলতো করে ছোঁয়। কোমরে স্যামন্তকের হাথের পরশ ও নিজের রাগটা ভুলে যায়, বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে, শিরশিরয়ে ওঠে ওর কোমল শরীর।
“আচ্ছা বাবা নরমাল বিহেভ করবো আমি। আজকের ব্যাবহারের জন্যও ক্ষমা করে দাও, প্লিস। ভুলে যাও আমি রাতে যা বলেছি বা জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে।” নিচু গলায় কাতর স্বরে বলে স্যামন্তক।

“হুম, ঠিক আছে ভুলে যাবো, এক সর্তে, যদি কাল আমার সাথে পুবালির বাড়িতে সারাদিন থাকো” বন্দনা বলে।

“কি যে বল না তুমি, সেটা কখন পসিবেল নয়। কাল বাড়িতে আমার অনেক কাজ, তত্ব সাজানো, কনেযাত্রীর গাড়ি, আর তুমি বল যে তোমার সাথে কাল থাকতে? মাথা টাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোমার?” গলায় অবিস্বাসের সুর, স্যামন্তকের।

“যাও তাহলে আর কথা বলবো না।” অভমানি সুরে বলে বন্দনা, ডান হাত দিয়ে আলতো করে একটা চাঁটি মারে স্যামন্তকের মাথায়।

—“আরে বাবা একটু বুঝতে চেষ্টা করো আমার অবস্থা।”

—“তাহলে আমিও যাবনা।”

—“সেটা তোমার আর দিদির ব্যাপার। তবে এখন যদি আমরা বাড়ির দিকে না যাই তাহলে আমরা ঠাণ্ডায় জমে যাবো।”

ডান হাতটা কাঁধ থেকে নামিয়ে স্যামন্তকের কোমর জড়িয়ে ধরে বন্দনা, মনে মনে একটা কিন্তু নিন্তু ভাব থেকে যায়। বাঁ কাঁধের উপরে নিজের থুতনিটা রেখে নিচু গলায় বলে “চলো ঠাণ্ডা লাগছে।”

হেসে ওঠে স্যামন্তক, পিঠের ওপরে বন্দনার শরীরের হাল্কা উষ্ণতা ওর শরীরের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেয় “একদম পাগলী মেয়ে একটা তুমি।”

বাড়ি পৌঁছেই দেখে বড়দি দাঁড়িয়ে ওদের জন্য। বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞেস করে—“কিরে এতো দেরি হল কেনও তোদের, পুবালি ফোন করে জানাল যে তোরা নাকি অনেকক্ষণ হল বেড়িয়েছিস?”

বন্দনা একবার স্যামন্তকের মুখের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বড়দির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ টিপে হাসতে থাকে। স্যামন্তক কি উত্তর দেবে ভেবে পায়না—“বাইক পানচার হয়ে গেছিলো তাই দেরি হোল।” অগত্যা একটা অজুহাত দেখাতে হোল।

“তোরা কি খেয়ে এসেছিস ওদের বাড়ি থেকে?” বড়দি জিজ্ঞেস করে বন্দনাকে।

“না খাইনি এখনো।” বন্দনা উত্তর দেয়।

“তারাতারি খেয়েনে তোরা, সবার খাওয়া হয়ে গেছে” তারপরে বড়দি স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে বলল “পুবালিকে একটা ফোন করে দিস যে তোরা পৌঁছে গেছিস। কি যে করিস না তোরা।” বলে ভেতরে চলে গেলো বড়দি।

দিদিকে ফোন করতেই, পুবালি ঝাঁজিয়ে ওঠে—“দেরি কেন রে তোর।”

“টায়ার পানচার হয়ে গেছিলো তাই” একই অজুহাত দেখাতে হয় ওকে।

“টায়ার পানচার না তুই পানচার। বাড়ির এক মাত্র ছেলে, আমার একটি মাত্র ভাই সেটা একটু মনে রাখিস। ধুর তোর সাথে আমার এখন কথা বলতেও ইচ্ছে করছেনা।” দিদির বকা শুনে স্যামন্তক কি বোলবে কিছু ভেবে পেল না।

“আরে বাবা শোন তো আমার কথা, আমি কিছু করছি না বা কিছু ধরে বসিনি। আমি সব ঠিক করে নেবো, প্লিস তুই রাগ করিসনা সোনা মনা দিদি আমার।” একটু আব্দারের সুরে দিদি কে ঠাণ্ডা করার জন্য বলে স্যামন্তক।

“ঠিক আছে ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। যা করবি কর তবে যেন একটা দুরত্ব বজায় থাকে সেটা মাথায় রাখিস।” সাবধান বানী শুনিয়ে পুবালি ফোন রেখে দেয়।

বন্দনা ড্রেস চেঞ্জ করে নেয়, একটা ঢোলা টি-শার্ট তার নিচে একটা লম্বা স্কার্ট। গায়ে একটা কালো রঙের শাল চাপিয়ে খাবার টেবিলে বসে পরে। স্যামন্তক হাত ধুয়ে খেতে বসে পরে। সবার খাওয়া দাওয়া আগেই শেষ, তাই ওরা দুজনে একা একা খেতে বসে টেবিলএ। চাকরটা খাবার রেখে যাবার পরে, বন্দনা থালাতে ভাত বেড়ে দেয়, তার সাথে ডাল তরকারি।

স্যামন্তক চুপচাপ দেখতে থাকে বন্দনাকে, ঝুঁকে পরিবেশন করার সময় স্যামন্তকের নজর বন্দনার সুডৌল বুকের ওপরে পরে, নরম ময়দার তালের মতন বলদ্বয় দেখে ওর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায় এক মুহূর্তে “মেয়েটা নিশ্চয় নিচে কিছু পরেনি তাই এতো নরম বুক দুটি ফেটে বের হচ্ছে।“

বন্দনার চোখ হটাৎ করে স্যামন্তকের দিকে পরে, ওর নজরটা দেখে কান, গাল গরম হয়ে ওঠে বন্দনার “আমাকে পুড়িয়ে দেবে নাকি ঐ দৃষ্টি দিয়ে?” বন্দনার বুকের ওপরে এক আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। চাদরটা একটু ভাল ভাবে জড়িয়ে নেয় বুকের ওপরে। স্যামন্তক চোখ নিচু করে ফেলে, ধরা পরে গেছে ও।

মা একবার উঠে দেখে যায়, জিজ্ঞেস করে—“তোর তো এই ক দিন দেখা নেই।“
“হ্যাঁ, তোমার মেয়ের বিয়েটা তো গাছ থেকে আম পারার মতন করে হয়ে গেলো তাই তো।” মায়ের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় স্যামন্তক।

“আমার পান শেষ। তোকে বলতে ভুলে গেছিলাম।” স্যামন্তকের মা স্যামন্তককে বলে।

“রাত বারোটায় মাথা খারাপ কোরোনা তো, পান না খেয়ে আজ শুয়ে পরো কাল এনে দেবো।” রেগে গিয়ে স্যামন্তক মা কে উত্তর দেয়।

খাওয়ার পালা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে স্যামন্তক টিভি চালিয়ে দেখতে থাকে। সবাই যে যার ঘরে শুয়ে পরেছে, ওর ঘরটা খালি। বন্দনা কিছুক্ষণ রান্না ঘরে বাসন পত্র সিঙ্কে রেখে ওর ডান পাশে একটু দুরত্ব রেখে বসে পরে।

কিছুক্ষণ পরে বন্দনা জিজ্ঞেস করে—“আমি শোবো কোথায়? কাল তো বড়দির ঘরে শুয়েছিলাম। তোমার যা দুটো দুষ্টু ভাগ্নি, বাবা রে বাবা। আজ আমি আর যাচ্ছি না ওখানে, আমার অন্য জায়গায় ব্যাবস্থা করো।”

“আমার ভাগ্নি দুটি মিষ্টি, দুষ্টু তো অন্য কেউ।” চোখ টিপে বন্দনাকে খ্যাপানোর জন্য বলে।

—“ও কে বাবা, ঠিক আছে আমি না হয় দুষ্টু। কাল তুমি কোথায় শুয়েছিলে?”

—“সোফায়, আবার কোথায় শোবো, সুবিমলদা আর সিতাভ্রদার বন্ধুরা মিলে তো আমার রুম তা কব্জা করে নিয়েছিলো কাল রাতে।”

“তাহলে আজ আমি তোমার রুমে শুয়ে পড়ি, প্লিস।” নাক মুখ কুঁচকে বন্দনা আবদার করে স্যামন্তকের কাছে।

মাথায় যেন বাজ পড়ল স্যামন্তকের, “মেয়েটা বলে কি, আমার রুমে শোবে মানে?” ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে মিটি মিটি করে হাসে বন্দনার দিকে। চোখ নাচিয়ে বলে—“আর রাতে যদি ভুতে ধরে তখন টের পাবে।”

পা দুটি গুটিয়ে সোফার উপরে গুটিসুটি মেরে বসে, হাত দুটি দিয়ে নিজের হাঁটু জড়িয়ে ধরে বন্দনা। হাঁটুর ওপরে থুতনি রেখে স্যামন্তককে বলে “ঠাণ্ডা টা বেশ জম্পেশ পরেছে কি বলো?”

স্যামন্তক হাত দুটি কে ছড়িয়ে দেয় সোফার মাথার ওপরে, ডান বাজু বন্দনার পিঠের পেছনে আলতো করে ছুঁইয়ে দেয়। ছোঁয়া পেয়ে ভুরু কুঁচকে তাকায় ওর দিকে বন্দনা। স্যামন্তক ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে “কি হোলও?”

স্যামন্তকের খুব সিগারেট খাবার ইচ্ছে করে, ও বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে “আমি সিগারেট খেতে ওপরে যাচ্ছি তুমি কি যাবে আমার সাথে?”

বন্দনা মাথা নাড়িয়ে বলে—“চলো যাই এতো রাতে টিভি দেখে কি করবো। তুমি বললে নাতো আমি কোথায় শোবো।”

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে স্যামন্তক বন্দনার সর্পের ন্যায় চলন দেখে একটা বড় নিঃশ্বাস নেয়, নিজের মনে মনে হাসে, কি যে করতে যাচ্ছিল। বন্দনা ওর দীর্ঘশ্বাস শুনে বুঝতে পারে ও কি ভাবছে, ও পেছন ফিরে হেসে বলে “এখন আর নিশ্চয়ই তুমি ঐ সব ভাবছনা।” দুই জনেই হেসে ফেলে, দু জনের মধ্যে যে শীতল টানাপোরেন চলছিলো সেটা আর নেই, দুই জনে বেশ বুঝে গেছে যে দুরত্বটা থাকা ভাল।

ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে স্যামন্তক সিগারেট জ্বালায়, কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বন্দনার দিকে তাকায়। বন্দনা গায়ের চাদরটা আরও ভাল ভাবে জড়িয়ে ওর দিকে একটু সরে এসে গা ঘেঁসে দাঁড়ায়।

“তুমি পুবালি কে খুব ভালোবাসো তাই না” জিজ্ঞেস করে বন্দনা।

“হুম” মাথা নাড়ায় স্যামন্তক “বড়দি আমার চেয়ে ন বছরের বড় আর আমার বোন আমার চেয়ে দশ বছরের ছোটো, আমরা পিঠো পিঠি তাই।”

—“তো সন্ধ্যে বেলা কোথায় উঠেছিলে?”

“ওখানে আবার কোথায়।“ স্যামন্তক হেসে ফেলে, ট্যাঙ্কের ওপরে দিকে দেখায় “ছোটো বেলা থেকে ওখানে আমার লুকোবার জায়গা। কেউ খুঁজে পেতনা কেউ জানে না ওটা আমার লুকানর জায়গা। এই তোমাকে বললাম।”

“বাপ রে আমি যে তোমার লুকোনোর জায়গা জেনে ফেললাম এবারে কি হবে।” খিল খিল করে হেসে বন্দনা জবাব দেয়।

হাসি টা বড় মিষ্টি লাগে স্যামন্তকের “আর দরকার নেই আমার ওই খানে লুকানোর।”

—“তুমি নিশ্চয়ই পুবালির সাথে অনেক বার শানিতিকেতন গেছো?”

—“হ্যাঁ গেছি ওনেক বার, তবে তোমাকে তো দেখিনি দিদির সাথে কোনোদিন?”

একটু আনমনা হয়ে যায় বন্দনা, আকাশের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে “নিরুপম কে ওর ভাল লাগে না, তাই অনেকদিন ধরে আমাদের মধ্যে কথা বন্দ ছিল। হয়তো তোমাকে একটা খারাপ মেয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়নি তোমার দিদির, তাই আলাপ হয়নি।”

স্যামন্তক একটু ঝুঁকে বন্দনার মুখ দেখতে চেষ্টা করে, মেয়েটা দেখছি বড় ভাবপ্রবন হয়ে পড়লো—“কি গো ইমোশানাল হয়ে পরলে নাকি, ধুর ছাড়ো ওসব কথা।”

একটু তো চোখের পাতা ভিজে এসেছিলো বন্দনার, কিন্তু রাতের অন্ধকারে স্যামন্তক সেটা লক্ষ্য করেত পারে না। হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলে—“না না আমি ইমোশানাল হয়ে পরিনি। কি কথা বলতে চাও বলও?”

“আমি কি আর বলবো।” সিগারেটটা ফেলে দিয়ে, হাত দুটি মাথার ওপরে করে আড়ামোড়া নেয়।

ঠাণ্ডা হাওয়াটা মুখে লাগতেই হটাৎ করে নিরুপমের মুখটা সামনে ভেসে ওঠে বন্দনার, একটু উষ্ণতা খোঁজে বকের মাঝে। ছোটো দুটি চোখে এক ঝলকানি দেখা দেয়। মনে পরে যায় ওর ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মত্ত খেলায় নিজেদের হারিয়ে যাওয়া। মনটা কেমন ছটফট করে ওঠে, গাল দুটি গরম হয়ে যায়, নিচের ঠোঁটটি কামড়ে ধরে দাঁত দিয়ে। চাহনিটা কেমন ভাসা ভাসা লাজুক লাজুক হয়ে পড়ে।

স্যামন্তক মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে বন্দনার মুখভাব বদলে গেছে, কেমন যেন ভাসা ভাসা স্বপ্নময়। একটু খোঁচানোর সুরে জিজ্ঞেস করে “কি মনে পরেছে এই ঠাণ্ডা রাতে, উম… দুষ্টুমি গুলোর কথা”

মাথা না উঠিয়েই মাথা নাড়ল “তুমি না একটা…”

স্যামন্তক ওর সুর শুনে বুঝতে পারে যে বন্দনা নিজেদের কেলির কথা ভাবছে। কেমন যেন ফাঁকা হয়ে ওঠে ওর বুকের মাঝে। চুপ করে যায়, আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করেনা। বন্দনা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে, কিছুই যেন বলার নেই আর। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে একবার নিরুপম কে ফোন করলে হতো, হয়তো ওর মনের ভেতরে যে আলোড়ন চলছে সেটা কিছুটা থামত। বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নেই বন্দনা, নিঃশ্বাস নেবার ফলে ভরাট বুক দুটো যেন আরও ফুলে ওঠে। শিরশির করে ওঠে বুকের শিরা গুলো, নিচে কোনও অন্তর্বাস নেই, ঠাণ্ডায় কঠিন হয়ে ওঠে ওর দুটি বৃন্ত।

অনেক ক্ষণ কারুর মুখে কোনও কথা নেই দেখে স্যামন্তক বন্দনা কে জিজ্ঞেস করে “শুতে যাবে কি?”

স্যামন্তকের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়—“হ্যাঁ চলো, কিন্তু আমি কোথায় শোবো?”

—“আমার রুমে শুয়ে পরো, আমি কালকের মতন সোফায় শুয়ে যাবো।”

বন্দনাকে মেজনাইনের রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে স্যামন্তক সোফায় এলিয়ে দেয় গা। ঘুমে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে, মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে।

বন্দনা ঘরে ঢুকে দেয়াল গুলো দেখতে থাকে, ও অনেক বার পুবালির বাড়িতে এসেছে কিন্তু এই ঘরটায় কোনও দিন আসেনি। এই ঘরটা বেশির ভাগ সময় বন্দ থাকতো, আজ ও বুঝতে পারল যে এটা স্যামন্তকের ঘর। দেয়ালের এক কোনে একটা কাঠের আলমারিতে গল্পের বইয়ে ঠাঁসা, শরত, রবিন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ, সরবিন্দু, সমরেশ, সঞ্জিব আরও কত। আলমারিটা খুলে একটা খাতা পেল বন্দনা, খাতাটার পাতা ওলটাতে লাগলো, স্যামন্তকের লেখা। বাঙলায় লেখা কিছু কবিতা আর গল্প। কোনও কোনও জায়গায় লিখতে লিখতে কাটা কুটি করা তার সাথে ছোটো ছোটো স্কেচ করা। পাতা ওলটাতে ওলটাতে বিভোর হয়ে যায় বন্দনা, “কতো কি লুকিয়ে আছে এই ছেলেটার মধ্যে।” যত্ন করে আবার আলমারিতে রেখে দিয়ে শুয়ে পরে।

সকাল থেকে আবার নিত্য কর্ম শুরু। আজ বউভাত, সুতরাং তত্ত্ব সাজানোর ব্যাপার আছে। সকাল বেলায় পুবালি একবার ফোন করে বাড়ির সবার সাথে কথা বলা হয়ে গেছে। স্যামন্তক সোফায় ঠিক করে ঘুমোতে পারেনি তাই সবাই জেগে যাবার পরে ও আবার দিদির ঘরে গিয়ে শুয়ে পরে। পুবালি বন্দনাকে বলে চলে আসতে, কিন্তু কে নিয়ে যাবে সেটা প্রশ্ন। বন্দনা দেখে যে স্যামন্তকের ওঠার কোন নাম নেই তাই অগত্যা সুবিমলকে বলে যে ওকে বেনাচিতি ছেড়ে আসতে।

সুবিমল যেন চাঁদ হাথে পায়, এই রকম একটা হাসি হেসে বলে—“হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো।”

বেরনোর আগেও একবার পুবালির ঘরে ঢুকে দেখে যদি স্যামন্তক উঠে থাকে, না ছেলেটা বেহুঁশ হয়ে ঘুমচ্ছে। একটু মন খারাপ লাগে বন্দনার তাও সেটা কে নিজের চেহারায় না এনে সুবিমলের সাথে পুবালির বাড়ি চলে যায়। সুবিমলের একটু গায়ে পরে কথা বলার স্বভাব, সেটা নিয়ে বন্দনা আর কি করে। মাঝে মাঝে হ্যাঁ বা মাথা নাড়িয়ে বা একটু হেসে উত্তর গুলো দিতে হয়।

পুবালি সুবিমলের সাথে বন্দনা কে দেখে একটু অবাক হয়, বন্দনার দিকে চোখ নাচিয়ে মিটি মিটি হেসে প্রশ্ন করে “কি রে কিছু হোলও নাকি।”

ঠোঁট উল্টে বলে বন্দনা “ধুর ব্যাঙ, যার আসার ছিল সে তো নাক ডেকে ঘুমচ্ছে।”

“তুই আর আমার ভাই।“ হেসে ওঠে পুবালি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে “বড়দি আমাকে বলল তুই নাকি রাতে ওর ঘরে শুয়েছিলিস? কি ব্যাপার?”

“আরে না না কিছু না।” কোনো রকমে নিজের লজ্জা টাকে লুকিয়ে নিয়ে উত্তর দেয়। তারপরে বলে “তোর ভাই তো কবি রে, কাল রাতে আলমারি তে একটা খাতা ছিল পড়লাম।”

“কি!!! তুই ওর খাতা পড়ে ছিলিস?” বড় বড় চোখ করে তাকায় বন্দনার দিকে, কপালে চাপর মেরে বলে “কাউকে ও ওর খাতা ছুঁতে দেয় না এমনকি আমাকেও নয়। ও যদি ধরতে পারে তাহলে হয়েছে তোর আজ।”

“কি করবে ও আমার” এমন একটা ভাব দেখায় বন্দনা যেন ও বীর মহিলা যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।

“খেয়ে ফেলবে তোকে।” হেসে বলে পুবালি।

“তোরা মানালি কবে যাচ্ছিস?” জিজ্ঞেস করে বন্দনা।

—“অষ্টমঙ্গলার এক দিন পরে কলকাতায় কাকুর বাড়িতে যাবো, ওখানে দু দিন থেকে ফ্লাইটে করে দিল্লি। কাকু ফ্লাইটের যাতায়াতের দুটো রিটার্ন টিকিট দিয়েছেন।”

—“কাকু মানে, স্যামন্তকের বাবা?”

“হ্যা বাবা, আমার একটাই কাকু। চল বাড়ির সবার সাথে আলাপ করিয়ে দেই। একটু পরে তো আবার উনুন ধরাতে যেতে হবে, বাপরে বাপ কে যে এতো সব নিয়ম কানুন বার করেছিলো” দুই বান্ধবী গল্পতে মজে যায়।

স্যামন্তক ঘুমবে কি, বাড়ির লোকেরা তাকে ঠিক করে ঘুমোতে দিলে তো। একবার ভাগ্নি গুলো এসে মাথার ওপরে তাণ্ডব করে চলে যায় “মামা মামা, আজ মাসির মতন ফুলে সাজবো।”, একবার বড়দি এসে নাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে “তত্ত্ব সাজানোর লোক তো এখনো এলো না রে।” ঘুম চোখে বলে “ফোন করে নাও নিজে”। জেঠিমা এসে বলে “বিকেলে যারা আসবে তাদের তো কিছু খেতে দিতে হবে রে, কিছু ব্যাবস্থা করেছিস কি?” চুল ছেঁড়ার পালা স্যামন্তকের, চেঁচিয়ে ওঠে “আমি কি একটু শান্তিতে শুতে পারবোনা।” তারপরে জেঠিমার দিকে তাকিয়ে বলে “সুবিমলদা এলে ওকে বাজারে পাঠিয়ো, লিস্টটা আমার জামার পকেটে আছে।” তারপরে বাবা এসে জিজ্ঞেস করেন “এই ছেলে বাস কটায় আসবে?” দাঁত কিড়মিড় করে বালিশের উপরে মুখ চেপে ধরে “ঘুমের হল চোদ্দ গুষ্টির তুষ্টি।“ তারপরে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে “সন্ধ্যে সাতটায় আসবে, সাড়ে সাতটার মধ্যে বের হতে হবে।” ঘুম তো হলনা, কোনও রকমে মুখ চোখ ধুয়ে কাজে লেগে পরে।
সারাটা দিন কাজে কর্মে কেটে যায়। দুপুরের পরেই ফোন আসে বন্দনার ওকে নিয়ে আসার জন্যে। যথারীতি সুবিমলদাকে একটা গাড়ি দিয়ে পাঠিয়ে দেয় স্যামন্তক বন্দনাকে নিয়ে আসার জন্য। বন্দনা স্যামন্তককে না পেয়ে একটু হতাশ হয় এক বার ভাবে “না কিছু নয় সব মনের ভ্রম।”

বউভাতের রাতে পরার জন্য বন্দনা দুটো শাড়ী এনেছিল কিন্তু ঠিক করতে পারছেনা কোনটা পরেবে। মেয়েদের মহলে তো আর স্যাম্নতকে ঢুকতে পারবেনা, আজ তো আর পুবালি কে সাজানোর নেই যে স্যামন্তক আসবে। পুবালির ঘরে সব মেয়েদের ভিড়, সাজগোজের পালা। একবার স্যামন্তক কে জিজ্ঞেস করলে ভাল হতো কোনটা পরলে ভাল দেখাবে। ও ভাবতে থাকে ও কি ওর রুমে থাকবে, যা ব্যাস্ত ছেলে কোথায় যে থাকবে আর কোথায় নয় সেটা তো ও নিজেই জানেনা। তাও একবার দেখে আসতে দোষ কি যদি পেয়ে যায়, এই ভেবে শাড়ী দুটি হাতে করে নিয়ে স্যামন্তকের রুমে গিয়ে টোকা মারে দরজায়।

“কে? আমি কাপড় পড়ছি।” স্যামন্তকের গুরু গম্ভির গলার আওয়াজ।

যাক বাবা বাঁচা গেলো আছে তাহলে ভেতরে এই ভেবে কিছু না বলেই দরজা খুলে ঢুকে পড়লো। ঢুকেই দেখে হাঁ হয়ে যায় মুখ, চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তকের দিকে। এই সদ্য মনে হয় গা হাত পা ধুয়ে কোমরে একটা তয়ালে জড়িয়ে ড্রেস করতে যাবে। খালি গা, বুকের মাংস পেশি গুলো যেন মাইকেলএঞ্জেলর খুদা পাথরের মূর্তি, বাইসেপ গুলো কঠিন, গায়ের রঙ তামাটে, বুকের মাঝে একটু লোম। দেখেই কেমন যেন ঝটকা খেল বন্দনা। স্যামন্তক ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব, মেয়েটা কি করছে ওর রুমে। বন্দনার গালে লালিমার ছটা দেখে স্যামন্তক বুঝতে পারে তন্বী তরুণীর হৃদয়ের আলোড়ন। ও ভাবলও একটু মজা করা যাক বন্দনার সাথে, ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে “কি দেখছ ঐ রুকম ভাবে, দেখনি নাকি আগে।”

স্যামন্তকের আওয়াজ শুনে খুব লজ্জায় পড়ে গেলো বন্দনা, তোতলাতে তোতলাতে দুটি শাড়ী দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে “কোন শাড়ীটা পড়বো ঠিক করতে পারছিলাম না তাই জিজ্ঞেস করতে আসলাম।”
কাছে আসে স্যাম্নতক, বন্দনার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায় কয়েক গুন। ওর হৃদয়টা যেন ফেটে বেরিয়ে আসবে বলে মনে হয়। স্যামন্তকের মুখের দিকে না তাকিয়ে নিজের হাতে রাখা শারীর দিকে তাকিয়ে থাকে “না মানে আমি জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম কোনটা পড়বো, এই ব্যাস।”

স্যামন্তক দেখল ওর হাতের দিকে, হাত দুটি মৃদু কাঁপছে। একটা হাল্কা নীল সিফন শারী তাতে সাদা আর রূপোর জরির কাজ, আর একটা জলপাই রঙের শাড়ী। স্যামন্তকের নীল শাড়ীটা ভাল লাগলো, গায়ের রঙের সাথে বেশ মানাবে। একবার নিজের মাথার মধ্যে এঁকে নিতে চেষ্টা করে বন্দনাকে ঐ শারীর পরতে পরতে। এই রকম ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ওর বেশ মজা লাগছিলো আর বন্দনার মুখের লাজুক উষ্ণতাটা কে বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলো। নিচু স্বরে বন্দনার কাছে গিলে বলল “নীলটা পরো খুব সুন্দর দেখাবে।” স্যামন্তকের মনটা যেন আর ওর আয়ত্তে থাকতে পারছেনা, হাত দুটি নিশপিশ করছে যেন বন্দনাকে এখুনি জড়িয়ে ধরে হোক না ও কারুর কিন্তু এই একলা ঘরের মধ্যে ও তো আমার কাছেই এসেছে। ধিরে ধিরে ও বুঝতে পারে যে ওর নিঃশ্বাসে আগুন ধরেছে। মাথার সবকটা ধমনীতে ফুটন্ত রক্ত বইছে। সামনে দাঁড়িয়ে বন্দনা ভেজা পায়রার মতন কাঁপছে।

বন্দনা নিজেকে লুকিয়ে ফেলার প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু স্যামন্তকের শরীর থেকে যেন এক অদৃশ্য চুম্বকীয় আকর্ষণে ও নোড়তে পারছেনা। ও নিচের দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারে যে স্যামন্তক ওর মুখপানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, ওর পেলব দেহ আর সৌন্দর্য সুধা দু চোখ ভরে পান করছে। ভরাট বুকে তুফান উঠে কাঁপতে শুরু করেছে। বন্দনা টের পায় যে স্যামন্তক হাত বাড়াচ্ছে ওর দিকে, আর থাকতে না পেরে বলে ওঠে “আমি যাচ্ছি কেউ এসে পরবে।“

সারা অঙ্গে এক অদ্ভুত শিহরন মাখিয়ে নিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যায় বন্দনা। হাঁপাতে হাঁপাতে নিচে নেমে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। আয়ানায় নিজের মুখটা দেখতেও ওর লজ্জা করে। “না আমি মারা পড়বো, আর নয় ওর সামনে।”

হতবাক স্যামন্তক ধুপ করে বসে পড়ে খাটে, কি হল কি করলো আবার ও না মাথা আর ঠিক থাকছে না মেয়েটা ওকে পাগল করে ছেড়ে দেবে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে, গাড় বাদামি রঙের একটা সুট পরে বেরিয়ে গেলো, ঘরের মধ্যে আর ওর মনটা টিকছে না।

বন্দনা হাল্কা নীল রঙের শাড়িটাই পড়লো, সিফনের শাড়ী তাই তার পেলব দেহটার ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে গেলো শাড়িটা। সবকিছুই ঢাকা কিন্তু উজাগর করেছে এক নতুন বন্দনাকে, সুন্দরী তন্বী তরুণী, চোখের কোলে কাজল, আঁকা ভুরু যেন চাবুক। বুকের ওপরে আঁচল, পিনআপ করে নিলো যাতে খসে না পরে যায়। একটা ব্রোচ দিয়ে আঁচল টাকে ব্লাউসের সাথে আটকে দিল। ডান কাঁধে একটা শাল। ঘন লম্বা চুল আজ আর খোঁপা নয়, একটা বেনুনি করে সাপের মতন ঝুলিয়ে দিল ওর চওড়া পিঠের ওপরে। আজ শুধু ওর মুখটুকু ছাড়া বাকি সব ঢেকে রেখেছে শারীর ভাঁজে ভাঁজে।

বাস এসে গেছে, ওপরে উঠে একবার সবাইকে জানিয়ে দিয়ে চলে যায় যে বাস এসে গেছে। ছেলেরা তৈরি, মেয়েদের সাজার এখনো বাকি। বাসে এক এক করে সবাই বসার পরে ও স্যামন্তক বাসে চাপেনা। জেঠু জিজ্ঞেস করলেন “কিরে তুই কিসে যাবি” ও উত্তর দিল “আমি আসছি, বাইকে করে তোমরা যাও, তোমাদের আগেই পৌঁছে যাবো আমি।” স্যামন্তক আড় চোখে একবার বন্দনার দিকে তাকায়, তাহলে ওযে শারীটা পরতে বলেছিল সেটাই পরেছে। বড় বেশি পেঁচিয়ে যাচ্ছে ওর সম্পর্কটা, ওকে যেচে হাল্কা করতে হবে না হলে সবার চোখে পরে যাবে।

বন্দনা বেশ ভাল ভাবে বুঝতে পারে যে ওর ঘরে ঢোকার আগে একবার জানানো উচিৎ ছিল যে ও ঢুকছে। সেটা না করে ও নিজেকে এবং স্যামন্তককে বেশ অসুবিধায় ফেলে দিয়েছে। এবারে নিজেকে ওর থেকে একটু দুরে রাখাই ভাল, একদিক থেকে ভালই হল যে ও বাসে যাচ্ছে না। বন্দনা নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। বাস ছেড়ে দেবার পরে ও অনেকক্ষণ চোখ বন্দ করে চুপচাপ বসে থাকে।

স্যামন্তক আগেই বেনাচিতি পৌঁছে যায়। দিদি বেশ সুন্দর সেজেছে, একটা নীল রঙের বেনারসি শাড়ীতে ঢেকে বেশ টাবুর টুবুর হয়ে রাজরানির মতন একটা চেয়ারে বসে আছে।
একা ভাই কে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে “কিরে তুই একা বাকিরা কোথায়?”

—“আসছে পেছনে, আমি বাইকে এসেছি।”

—“বাইকে কেনও?”

আব্দারের সুরে বলে দিদিকে “তোকে একটু বেশি করে দেখব বলে”

সিতাভ্র ওকে দেখে জিজ্ঞেস করে “কি রে শালা, বাকি রা কোথায়?”

সিতাভ্র কে মজা করে বলে “বাকিদের দিয়ে কি হবে আজ, রাতটা তো তোমার গুরু।” তারপরে দিদির দিকে চোখ টিপে বলে “তোর খবর তো কাল সকালে নেবো রে। তুই যেমন আমারটা নিয়েছিলি।”
পুবালির মুখটা এমনিতেই সাজানোর ফলে লাল ছিল, টার ওপরে আবার ভাইয়ের মুখে ঐ রকম কথা শুনে একদম রক্ত জবার মতন লাল হয়ে গেলো। একটু বকুনির শুরে বলে “তুই এখান থেকে যা নাহলে মারবো এবারে।”

বাস পৌঁছে যায় কিছুখন পরে। বন্দনাকে নামতে দেখেই মজা করে বলে ওঠে “আজ প্রথম থেকেই বলছি যে দারুন লাগছে।”

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা বন্দনা, ওতো ভেবেছিলো যে … স্যামন্তক বলে ওঠে “কি ভেবেছিলে আমি আর কথাই বলবনা তোমার সাথে, তাই তো।” বন্দনার ছোটো ছোটো চোখ দুটি বিস্ময়ে মাখা, কি বোলবে ভেবে পায়না হাঁ করে চেয়ে থাকে ছেলেটার দিকে, কি অধভুত ছেলে। ঠোঁট দুটি ফাঁকা দেখে নিচু স্বরে বলে স্যামন্তক “হাঁ বন্দ করো নাহলে মাছি ঢুকে যাবে, কিছু ভেবনা, আমি ঠিক আছি, পরে কথা বলবো।”

লজ্জা পেয়ে যায় বন্দনা, লাজুক হেসে নিজের মনের আলোড়নটা মুছে ফেলে বলে “তোমাকে বোঝা বড় শক্ত।”

নাকের ওপরে আলতো করে ডান হাতের তর্জনী ছুঁইয়ে স্যামন্তক বলে “দিদির কাছে যাও, সব ঠিক আছে।”

মাথা নিচু করে হরিণীর মতন পালিয়ে যায় বন্দনা, যেতে যেতে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে স্যামন্তকের দিকে, এই ছেলেটা পাগল করে ছাড়বে সত্যি। চেহারাটাই পাল্টে যায় বন্দনার, সারা মুখে এক অদ্ভুত আলোর ছটা লাগে। গালের লালিমা যেন শত গুন বেড়ে যায়, ও যে নাক টা ছুঁয়েছে পরশটা যেন খুব মধুর লাগে।

পুবালিকে দেখেই বলে ওঠে “কি রে দারুন লাগছে তোকে, আর তোর দোসর টা কোথায় একটু দেখি তাকে।”

সিতাভ্র পাশেই ছিল, মজা করে বলে ওঠে “এমন একটা শালি হাত ছাড়া হয়ে যাবে।”

“তুমি তো দেখলেই না আর কি করা যাবে বলও।” বন্দনা ওকে একটু খুঁচিয়ে বলে।

সিতাভ্র বলে—“তোমার মনটা তো কারুর জন্য পরে আছে না হলে সাথে নিয়ে যেতাম মানালি।”

—“আগে দেখি পুবালি কি রেস্পন্স দেয় তারপরে তোমাকে সুযোগ দেওয়া যাবে কিনা ভেবে দেখব।”

—“বাপরে আগে যাচাই করবে তারপরে খেয়ে দেখবে।”

পুবালি ওদের কথা শুনে কি বোলবে ভেবে পায়না।

স্যামন্তকের সবার সাথে কথা বার্তা আলাপ পরিচয় করে, এক সময় মনে হয় যে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এবারে খেয়ে নেওয়া উচিৎ। কন্যে যাত্রীর বাকিদের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে, ওর বাবা একবার জিজ্ঞেস করে গেলো ওকে যে কখন খাবে ও। ও বলল পরে খাবে। বন্দনা ও পুবালির পাশেই বসে ছিল সারাটা সময় ওর ও খাওয়া হয়নি, ওদিকে সুবিমল ও তাকে ছিল যে বন্দনার সাথে খেতে বসবে। ঘুরতে ঘুরতে সুবিমল একবার পুবালির বসার জায়গাই এসে বন্দনাকে জিজ্ঞেস করে যে ও খাবে কি না। পুবালি ভুরু নাচিয়ে ইশারা করে “যা, কি করছিস।”

অগত্যা যেতে হয়, যেতে যেতে ওর চোখ পরে স্যামন্তকের দিকে, গাড় বাদামি স্যুটে দারুন লাগছে ছেলেটাকে। একে বেশ লম্বা চওড়া, পেটানো শরীর তাতে ও যে ড্রেসই পরে তাতেই মানিয়ে যায়।

ওকে ইশারায় করে জিজ্ঞেস করে “কি গো কখন খাবে?”

স্যামন্তক হাত নাড়িয়ে বলে “চলো”

খাওয়ার সময়ে কথা বার্তা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায় দুইজনার মাঝে, কঠিন নীরবতা আর থাকেনা। রাতেও বাড়ি ফিরে যদিও বিশেষ কথা হয়না তবুও আজ আর সেই তিক্ততা ভাবটা নেই।

দুপুরের আগেই বাড়ি খালি হয়ে যায়, যে যার নিজের বাসস্থানে ফিরে যায়। স্যামন্তক থেকে যায়, কেননা পুবালি সিতাভ্রকে নিয়ে অষ্টমঙ্গলার পরের দিন ওকে ফিরতে হবে কলকাতায়। দুপুরের খাওয়ার সময়, বন্দনার মনটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো আবার ফিরে যেতে হবে নিজের ব্যস্ত জীবনে, ফিরে যেতে হবে ডিব্রুগড়ে। এই দুই দিনে অনেক কিছু পেয়েছে ও, অনেক নতুন আলেয়ার হাতছানি মাঝে মাঝে মনের কোন কোণে জেগেও উঠেছিল কিছু প্রশ্ন, সব প্রশ্নকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে।

বন্দনা স্যামন্তককে জিজ্ঞেস করে “আমাকে স্টেশানে ছেড়ে আসবে? ট্রেনের সময় তো হয়ে এলো।”

—“ঠিক আছে”

গাড়িতে যাওয়ার সময়েও বিশেষ কথা হয় না দু জনের মাঝে। কি বলবে কেউ কিছু ভেবে পায়না। দুজনেই আনমনা হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনের অপেক্ষা করে।

স্যামন্তক একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ছোটো করে দুটি টান দিয়ে ফেলে দেয়, সিগারেটটা ও যেন তেতো লাগছে।

এমন সময় বন্দনা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসে। ঐ হাসি দেখে স্যামন্তকের মনের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে মনে হয় যেন কি হারিয়ে যাচ্ছে ওর সামনে থেকে। নিচু স্বরে ওকে জিজ্ঞেস করে “ফোন করবে আমাকে?”

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকে পরে, চারদিকের লোক জনের চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে যাই। বন্দনা একটু উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করে “কি বলছও? একটু জোরে বলও আমি শুনতে পাচ্ছিনা।”

কানের কাছে মুখ এনে স্যামন্তক জিজ্ঞেস করে “আমাকে ফোন করবে?”

বুক কেঁপে ওঠে বন্দনার, চোখে কোণটা একটু ভিজে ওঠে। ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে। ও বলে “আমাকে ভুলে যেও, আমি চললাম, ভাল থেকো। আর পুবালিকে জানিয়ে দিও যে আমি একদিন নিরুপমকেই বিয়ে করবো।”

পেছন ফিরে আর তাকায় না বন্দনা, সুটকেসটা হাতে নিয়ে ট্রেনে উঠে পরে। ট্রেন ছেড়ে দেয়, স্যামন্তক দাঁড়িয়ে থাকে নিথর হয়ে, সারা পৃথিবীটা খেলো মনে হয়। সব কিছু যেন ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেলো মেয়েটা।

==== তৃতীয় পর্বের সমাপ্তি =====

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s