লুকিয়ে ছিলে এতদিন – ২


২য় পর্ব – অমানিশার প্রশ্ন

বিয়ের লগ্ন আসন্ন। পুবালিকে পিড়িতে বসিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় বন্দনা, স্যামন্তককে দেখে। চোখা চুখি হতেই বন্দনা একটা মিষ্টি হাসি হাসে, যেন বলতে চায় “আমি আছি, আমাকে ও দেখো।” স্যামন্তক সামান্য একটু হেসে, অন্য দাদাদের সাথে পুবালিকে পিড়িতে বসিয়ে নিয়ে যায়। চারদিকে হই চই, বউ এসেছে এসেছে। স্যামন্তকের ঠাণ্ডা হাসি দেখে বন্দনার মনের কোনও এক কোনে একটা ছোটো কালো মেঘ জমে আসে হটাত করে। আনমনেই বন্দনা নিজের মাথায় চাঁটি মেরে বলে “কি রে পাগলী কি করছিস।”

আবার ব্যাস্ত হয়ে পরে স্যামন্তক। রাত ঘনিয়ে আসছে, বরযাত্রীর খাওয়া দাওয়া, অথিতি আপ্যায়ন করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠে ও। এক সময় বরযাত্রীর দিকে দেখা শুনা, একবার বিয়ের জায়গার দেখা শুনা। কপালে ঘাম ছুটছে। এমন সময় কেউ এসে ডাক দেয় স্যামন্তককে, দিদি ডাকছে। দাঁত কিরমির করতে থাকে “এই মেয়েটার আবার কি হল?” দিদি ডেকেছে বলে কথা, যেতে তো হবেই। গিয়ে দেখে কন্যাদান শুরু হবে। পুবালি স্যামন্তকের দিকে তাকায়, হাথ নাড়িয়ে ওর পাশে বসতে বলে। সামনে স্যামন্তকের বাবা বসে, তিনি ভাইঝির কন্যাদান করবেন।

—“কি হয়েছে আবার তোর, ডাকছিস কেন?”

চোখ ভেজা, ঠোঁটে হাসি নিয়ে পুবালি স্যামন্তককে বলে—“একটু বস না আমার কাছে, সেই সন্ধেবেলা থেকে কাজ, কাজ আর কাজ করে যাচ্ছিস, মুখটা শুকিয়ে গেছে একেবারে।”

একটা চেয়ার টেনে পাশে বসে স্যামন্তক। ওদিকে, হাথে হাথ রেখে কন্যাদান পর্ব শুরু হয়ে যায়। বামনের মন্ত্র তার সাথে সাথে দিদির ঘন ঘন নাক মোছা, কেমন যেন হয়ে যায় স্যামন্তকের মনটা। পুবালির পিঠে হাথ রাখে স্যামন্তক, একটু যেন কেঁপে ওঠে ওর দিদি। ঘাড় ঘুরিয়ে কান্না ভেজা, হাসি হাসি চোখ নিয়ে তাকায়।

বন্দনা খানিক্ষন এদিক ওদিক দেখে, এক কোনায় বসে পরে। পুবালির অন্য সব বান্ধবীরা এক এক করে চলে যাবার উপক্রম। এমন সময় পুবালির পিসতুতো দাদা, সুবিমল এসে বন্দনার পাশে বসে। বন্দনা একটা ছোট্ট হাসি হেসে নমস্কার জানায়। সুবিমল অনকক্ষণ ধরে বন্দনাকে জরিপ করছিল, কখন একটু একা পেয়ে আলাপ পরিচয় করবে এই সুন্দরী তরুণীর সাথে।

বন্দনা বেশ বুঝতে পারে সুবিমল কেন ওর পাশে বসেছে। চোরা হাসি নিয়ে তাকায় বন্দনা সুবিমলের দিকে।

সুবিমল বলে—“আপনি পুবালির বন্ধু?”

আলতো করে মাথা নাড়ায় বন্দনা “হ্যাঁ।”

—“আমি সুবিমল, পুবালির পিসতুতো দাদা, আসানসোল থাকি।”

—“আচ্ছা, বেশ।”

—“আপনাকে আগে তো দেখিনি, বড়দির বিয়েতে।”

—“না তখন আমাদের পরিচয় হয়নি। আমি আর পুবালি শান্তিনিকেতনে এক সাথে নাচ শিখতাম।”

—“ও আচ্ছা এবারে বুঝেছি। আমি তো ভাবছিলাম আপনি ওর স্কুলের বান্ধবী।”

বার্তালাপ বেশ অগ্রসর হতে থাকে, সুবিমল এবং বন্দনার মাঝে। কথার মাঝে বন্দনার চোখ থেকে থেকে স্যামন্তককে খোঁজে “গেলো কথায় ছেলেটা, এই লোকটা তো বড় হেজাচ্ছে।”

কথা বলতে বলতে এক সময় বন্দনা সুবিমলকে বলে—“খই ফেলার সময় হয়ে এসেছে মনে হয়, চলুননা মণ্ডপের দিকে এক বার ঘুরে আসি। দেখে আসি কি হচ্ছে।”

সুবিমল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়, কিছু তো করার নেই। দুই জনে হাঁটতে হাঁটতে, বিয়ের জায়গায় পৌঁছয়। স্যামন্তক তখনও পর্যন্ত দিদির পাশ ছারেনি। বর কনে, আগুনের চারদিকে সপ্তপদি শেষ করে খই আগুনে ঢালছে। বন্দনা স্যামন্তককে দেখতে পেয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে “যাক বাবা, বেঁচে যাবো এই লোকটার কাছ থেকে।”

স্যামন্তক একমনে আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে, একবার দিদি জামাইবাবুর দিকে দেখে, একবার জেঠিমার দিকে দেখে। বন্দনা স্যামন্তককে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে চমকে ওঠে, সাদা ব্লেজার আর নীল জিন্সএ ছেলেটাকে বেশ ভাল দেখতে লাগছে। ও কাছে এগিয়ে এসে স্যামন্তকের কাঁধে হাথ রাখে। স্যামন্তক একটু অন্যমনস্ক ছিল, তাই হাথের স্পর্শে চমকে ওঠে। কে রাখে কাঁধে হাথ? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বন্দনা ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি চোখে হাসছে। স্যামন্তক একটা ক্ষীণ হাসি ফেরত দেয়, মনটা ঠিক ভাল নেই।

“কি হল, কিছু বলছ না যে” বন্দনা জিজ্ঞেস করে স্যামন্তককে।

আওয়াজ শুনে যেন ঘুম থেকে উঠলো স্যামন্তক, এই রকম একটা চাহনি নিয়ে তাকায় বন্দনার দিকে, বলে—“কই কিছু নাতো। এই বসে আছি এখানে।”

একটু ঝুঁকে পরে বন্দনা ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে—“তোমাকে কতক্ষণ ধরে খুঁজছিলাম আমি, কোথাও পাইনা। আমাকে কেমন লাগছে?” স্যামন্তকের নাকে ভেসে আসে বন্দনার গায়ের গন্ধ, মন মাতানো পারফিউমের সুবাসের সাথে সাথে গায়ের গন্ধটা বেশ লাগে। ঘাড় ঘুরাতেই স্যামন্তকের মাথার সাথে ঠোকর খায় বন্দনার মাথা।

“উফফফফ…। কিযে করোনা তুমি।” মাথায় হাথ বুলাতে বুলাতে বলে ওঠে বন্দনা।

ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে স্যামন্তক, জরিপ করার ন্যায় গালে হাথ দিয়ে বলে—“হ্যাঁ সুন্দর দেখাচ্ছে। তবে আমাকে কেনও খুঁজছিলে সেটা বুঝতে পারলামনা।”

একটু অভিমানের সুরে উত্তর দেয়—“শুধু এইটুকু ব্যাস?”

—“আচ্ছা বাবা, একদম ফাটা ফাটি লাগছে তোমাকে, হয়েছে।”

রেগে যায় বন্দনা, ঝাঁজিয়ে ওঠে—“বলতে হয় বোলো না হলে বোলো না। আমি চললাম।”

স্যামন্তক বেগতিক দেখল, চারদিকে বাড়ির লোকজন, বাবা, মা, বড়দি, বোন, জেঠু, জেঠিমা। ও বুঝে পেলনা কি করবে। চোখ দিয়ে বন্দনাকে শান্ত হবার ইশারা করে। বন্দনা নাক কুঁচকে অভিমানি চাহনিতে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তকের দিকে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে ওর পাশে। সুবিমল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বন্দনাকে খেতে ডাকে। বন্দনা সুবিমলকে বলে যে ও পুবালির সাথে খাবে। কিছু করার নেই দেখে সুবিমল খেতে চলে যায়।

বিয়ের পালা শেষ প্রায়, স্যামন্তক উঠে গিয়ে খাবার জায়গার তদারকি করতে যায়। অনেক রাত হয়ে গেছে, বাড়ির লোকজন ছাড়া বাইরের কোনও অথিতি নেই। শেষ পাতে বর কনে খাবে, বরের সাথে আসা কয়েক জন বন্ধুরা খাবেন আর স্যামন্তক এখনো খায়নি। স্যামন্তকের পেছন পেছন বন্দনাও চলে আসে।

হাথটা ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে বন্দনা—“কই কি হোলও, বিকেল গড়িয়ে মাঝরাত হয়ে গেলো তোমার দেখা নেই কেন?”

বন্দনা এতো কাছে দাঁড়িয়ে যে স্যামন্তকের ডান বাজুর সাথে ওর নরম মুলায়ম বুক ছুঁয়ে যায়। শক্ত মাংসপেশির পরশে বন্দনা নরম বুক একটু কেঁপে ওঠে, স্যামন্তকের বাজুতে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়।

“আরে বাবা, আমি কি বিকেল থেকে বসে আছি নাকি যে তোমার গুনগান করবো। নিঃশ্বাস ফেলার সময় ছিলোনা আমার।” বন্দনার মুখপানে চেয়ে থেকে সান্তনা দেয়। এতো কাছে এতো সুন্দরী রমণীকে দেখে স্যামন্তকের বুকের মাঝে একটা ঝড় ওঠে। বন্দনার মুখ লাল হয়ে যায় স্যামন্তকের চোখের দিকে তাকিয়ে। ওর চাহনি যেন বুকের ধমনীর কোনো কোনা নাড়িয়ে দেয়। লাজুক হেসে ঠোঁট কামড়ে ধরে বন্দনা, নাকের অগ্রভাগ গরম হয়ে ওঠে।

স্যামন্তক পকেট থেকে একটা পেন বার করে বন্দনার থুতনিটা ধরে ওপরে করে নিজের দিকে। বন্দনা কেঁপে ওঠে, থুতনিতে স্যামন্তকের আঙ্গুলের স্পর্শ পেয়ে। ভাসা ভাসা চাহনি নিয়ে তাকায় ওর দিকে। পেন দিয়ে বন্দনার থুতনিতে তিনটে ছোটো ছোটো বিন্দু এঁকে দেয় স্যামন্তক। নিজের অজান্তেই হাথ দুটি মুঠি হয়ে যায় বন্দনার, গাল, কান গরম হয়ে ওঠে। সারা মুখের ওপরে স্যামন্তকের উষ্ণ নিঃশ্বাস ঢেউ খেলতে থাকে। তির তির করে কেঁপে ওঠে বন্দনার দেহ পল্লব। ঠোঁট দুটি অল্প ফাঁক হয়ে যায় নিজের অজান্তেই। পদ্মের পাপড়ির মতন ঠোঁট গুলো কেঁপে ওঠে, যেন দখিনা বাতাসে বইছে। স্যামন্তকের আঙ্গুল থুতনি থেকে গালের ওপরে চলে আসে। আলতো করে বুড়ো আঙ্গুলটা বোলায় নরম গালে, একটু ঝুঁকে পরে বন্দনার ফাঁক করা ঠোঁটের দিকে। চোখের পাতা দুটি ভারি হয়ে আসে বন্দনার “একি হতে চলেছে, আমি কি করছি?” নিজেকে প্রশ্ন করে, উত্তর পায়না।
স্যামন্তকের বুকের মাঝে মাথা চারা দিয়ে ওঠে আষাঢ়ের ঝড়। চোয়াল শক্ত করে নেয় নিজেকে সামলানোর জন্য। কতক্ষণ ওরা দুজনে একে অপরকে নিরীক্ষণ করছিলো ঠিক জানা নেই। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে যায় দুজনার মাঝে।

নিচু স্বরে বন্দনা কে বলে—“এবারে বেশি সুন্দর লাগছে।”

স্যামন্তকের গলার স্বর শুনে সম্বিত ফিরে পায় বন্দনা। উষ্ণতার প্রলেপ মাখা মুখ নামিয়ে নেয়, চোখে চোখ রাখার মতন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও। নিথর হয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বন্দনা। স্যামন্তক কি করবে কিছু ভেবে পায়না। ওরা এতোটাই কাছা কাছি দাঁড়িয়ে যে, বন্দনার শরীরের উষ্ণতাটা পর্যন্ত স্যামন্তক উপলব্ধি করতে পারে।

“কি হোলও এবারে তুমি কিছু বলছ না যে।” নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে স্যামন্তক।

হরিণীর ন্যায় মাথা দোলায় বন্দনা, বলে ওঠে—“কিছু বলার নেই আমার।” ধির পায়ে স্যামন্তকের কাছ থেকে দূরে সরে যায় ও। চোখের কোনে এক ফোঁটা জল চলে আসে বন্দনার, বুকের মাঝে এক অজানা আলোড়ন মাথা চারা দিয়ে ওঠে। দ্বিমত দেখা দেয় হৃদয়ের এক কোনে “এতো মিষ্টি করেতো নিরুপম কোনও দিন আমাকে সাজিয়ে দেয়নি বা দেখেনি।”

স্যামন্তক বন্দনার চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, ভাবতে থাকে কিছু কি ভুল করে ফেললও, যদি ও দিদি কে বলে দেয় তাহলে দিদি ওর চামড়া গুটিয়ে দেবে। ইচ্ছে করে তো কিছু করেনি ও, বন্দনাই তো ওর কাছে এসেছিলো, ওকি যেচে বন্দনার পাশে গেছিলো? একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে, খাবার আয়োজন করতে চলে যায়।

বন্দনা খাবার জায়গার এক কোনায় একটা চেয়ারে বসে পরে। বুকটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে বন্দনার। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি। ও ভেবেছিল একটু মজা করতে, একটু ফ্লারট করতে ব্যাস। বাঁ পায়ের ওপরে ডান পা দিয়ে, ডান হাথের তালুতে থুতনিটা রেখে মনটাকে হারিয়ে ফেলে বন্দনা। ডিসেম্বরের মধ্য রাত্রেও ওর কান মাথা গরম হয়ে যায়। কে জানে কে ঠিক। “এ মন আমার হারিয়ে যায় কোনখানে, কেউ জানেনা শুধু আমার মন জানে, আজকে শুধু হারিয়ে যাওয়ার দিন, কেউ জানেনা শুধু আমার মন জানে।”

সুবিমলের খাওয়া শেষ, ও বন্দনাকে খুঁজতে খুঁজতে খাওয়ার জায়গায় এসে দ্যাখে, বন্দনা চুপচাপ এক কোনে একটা চেয়ারে বসে কিছু একটা ভাবছে।

সুবিমল বন্দনাকে জিজ্ঞেস করে—“কি হোলও হটাত করে এতো টা চুপচাপ হয়ে গেছো। কেউ কিছু বলল নাকি?”

বন্দনা ওর দিকে তাকিয়ে বলে—“না না কিছু হয়নি আমার এমনি বসে ছিলাম। সবাই চলে গেছে তাই কি করবো ভাবছি।”

ওদিকে বর কোনে কে নিয়ে খাবার জায়গায় বাড়ির লোকেরা চলে আসে। সবাই আবার খেতে ব্যাস্ত হয়ে পরে। বন্দনা পুবালির পাশে বসে যায়। স্যামন্তকের খাবার ইচ্ছেটা মরে যায়, পুবালির অনুরোধে ওর হাথ থেকে কিছু খেয়ে নেয়। খাওয়ার সময় পুবালি বন্দনার মুখ দেখে বুঝতে পারে যে কিছু একটা ঘটেছে বা ঘোটতে চলেছে। খাওয়ার পালা সেরে উঠে যাবার আগে পুবালি স্যামন্তককে জিজ্ঞেস করে যে বন্দনা এতো চুপ কেনো। স্যামন্তক মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয় ও বন্দনার ব্যাপারে কিছু জানেনা।

বন্দনা খাবার সময় খুব বেশি চুপ ছিল, পুবালিকেও কিছু জানাল না। পুবালি ওর চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারল যে বন্দনার ভেতরে একটা ঝড় উঠেছে আর ও প্রান পন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেটাকে বন্দ করতে। খাবার পরে বন্দনা বাথরুমে ঢুকে পরে। আয়নার সামনে নিজের মুখটাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখে। সত্যি কি ওর মধ্যে কিছু চলছে না ওটা ওর ভ্রান্তি। চোখে মুখে জলের ঝাপটা মেরে নিজেকে শান্ত করে চলে আসে বাসর ঘরে যেখানে পুবালি সিতাভ্র আর বাকিরা সবাই ছিল। ঘরে ঢোকার মুখে ওর বুক খুব জোরে ধুপ পুক করছিলো, ভেতরে তো স্যামন্তক বসে থাকবে, কি করে উর সাথে চোখ মিলিয়ে কথা বোলবে? কিন্তু ঘরে ঢুকে যখন দেখে যে স্যামন্তক নেই, তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে বন্দনা যাক একটা প্রবলেম সল্ভ হল।

রাতে বাসর জাগার পালা, বর কনে কাউকে ঘুমতে দেওয়া যাবেনা। খুব ইচ্ছে ছিল বাকি সবার সাথে বাসর জাগার, কিন্তু স্যামন্তক জানে যে বন্দনাও থাকবে সেখানে, ও আর চায়না আজ রাতে অন্তত বন্দনার সামনে আসতে। কাল সকালে দেখা যাবে। বাবা, মা, জেঠু, জেঠিমা এবং বাড়ির বাকি লোকজন শুয়ে পরে। এমনিতে সারা দিন খেটে খেটে স্যামন্তকের গা হাথ পা ব্যাথা করতে শুরু করে দিয়েছিলো। দিদির ঘরে বাসর বসবে, মানে ওকে মেজনাইনের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। জামা কাপড় ছেড়ে একটা পায়জামা আর টিশার্ট পরে লম্বা হয়ে যায় বিছানায়। মনে মনে ভাবতে থাকে স্যামন্তক ওকি আকৃষ্ট হয়ে পরছে বন্দনার মিষ্টি আলেয়ায়। কি করে নিজেকে বেঁধে রাখবে ও, বন্দনা তো কারুর বাগদত্তা। ও চায়না কারুর প্রেম ভেঙে নিজের করার। এমনিতে পুবালি বার বার করে বলে দিয়েছে বন্দনার কাছ থেকে একটু দূরে থাকতে।

পুবালি, জামাই সিতাভ্র, সুবিমল, সিতাভ্রর দুই বন্ধু, বন্দনা সবাই বেশ আরাম করে বসে গল্প করতে শুরু করে। দিদি এক বার খোঁজে ওর ভাইটা কোথায় গেলো? সুবিমল জানায় যে স্যামন্তক শুতে চলে গেছে। সেটা শুনে পুবালির মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় “আমার ভাই আমার বাসর জাগবে না?”

সুবিমল কে পুবালি বলে—“একটু গিয়ে দ্যাখনা, বলবি যে আমি ডেকেছি, দেখবি ঠিক চলে আসবে।”

বন্দনা বলে ওঠে—“আমি গিয়ে দেখছি।”

পুবালি একটুখানি দৃঢ় চোখে বন্দনার দিকে তাকায়, সেই চাহনি দেখে বন্দনা মুখ নিচু করে ফেলে। ও বলে ওঠে—“আমি কাপড়টা পাল্টে আসছি।“

বন্দনা বেরিয়ে যাবার পরে, সুবিমল স্যামন্তকের খোঁজে মেজনাইনের ঘরে ঢুকে দ্যাখে যে স্যামন্তক বিছানায় শুয়ে পরেছে। ওকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলে বলে—“তোকে পুবালি ডাকছে আর তুই এখানে শুয়ে পরেছিস। কি ব্যাপার তোর তো এই রকম হবার কথা নয়।”

স্যামন্তক চমকে ওঠে—“আরে তুমি কি করছও এখানে? আমি খুব টায়ার্ড ছিলাম তাই শুয়ে পড়েছি। একটু খানি রেস্ট নিয়ে যেতাম তো। তুমি গিয়ে বোলো আমি আসছি।” এই বলে স্যামন্তক সুবিমলকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

কাপড় চেঞ্জ করে নেয় বন্দনা। পরনে একটা নাইট গাউন, তার ওপরে একটা শাল জড়িয়ে নেয় বন্দনা। পুবালির ঘরে ঢোকার আগে উঁকি মেরে দেখে নেয় যে স্যামন্তক এসেছে কিনা। স্যামন্তককে দেখতে না পেয়ে বুঝে যায় যে ও এখনো ওপরে শুয়ে আছে। পা টিপে টিপে, স্যামন্তকের ঘরে ঢোকে বন্দনা। ঢুকে দেখে যে ও চিত হয়ে শুয়ে, সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছে। গলা খাখরে জানান দেয় যে ও উপস্তিত। ঘাড় ঘুরিয়ে বন্দনার দিকে তাকায় স্যামন্তক। ওকে দেখেই চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, ভাবতে থাকে কেন এসেছে? ধিরে ধিরে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় বন্দনা। মৃদু আলোতে স্যামন্তকের মুখের ভাষা পড়তে প্রচেষ্টা চালায় বন্দনা। বুকের মধ্যে তুমুল ঝঞ্ঝা বইতে থাকে, নিজের অজান্তেই হাথ দুটি মুঠি হয়ে কোলের ওপরে চলে আসে।

“কি দেখছ এই রকম ভাবে” বন্দনা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে স্যামন্তককে।

“কিছু না।” একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবতে থাকে স্যামন্তক, ওকি বলবে বন্দনাকে যে ওদের এতো কাছাকাছি আসা উচিত নয়, ওকি জানিয়ে দেবে যে বন্দনা কারুর বাগদত্তা ওর এই রকম করা উচিৎ নয়।

মুক চাহনি থেকে সব বুঝে যায় বন্দনা, পুবালি ওকে নিরুপমের কথা বলে দিয়েছে। বন্দনা স্যমন্তকের পাশে বসে পরে, হাজার ভোল্টের বিজলি লাগার মতন ঠিকরে উঠে পরে স্যামন্তক।

গম্ভির গলায় বলে ওঠে—“তোমার চলে যাওয়া উচিৎ, বন্দনা। দিদি, সিতাভ্রদা, সুবিমল সবাই তোমাকে খুঁজবে।”

কাঁপা গলায় উত্তর দেয়—“তোমাকেও তো পুবালি ডাকছে, তুমি কেনও যাচ্ছ না?”

—“তুমি চল আমি আসচ্ছি।“

—“তুমি গেলে আমি যাবো না হলে যাব না।”

—“বন্দনা, আমার যাওয়ার সাথে তোমার যাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, সুতরাং তুমি আগে চলো আমি একটু পরে আসছি।”

দাঁড়িয়ে পরে বন্দনা, হাসি কান্না সব কিছু ভুলে যায়, কি করবে বা কি করতে চায় মাথার মধ্যে সব গুবলেট হয়ে যায় ওর। দরজার দিকে যেতে যেতে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে বলে—“আমি অপেক্ষা করে থাকবো।”

দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার পরে, স্যামন্তকের মনে হল যেন তানপুরার সব তার গুলো ছিঁড়ে গেছে। ঝনঝন করে ওঠে মাথার ভেতরটা। নিজের ওপরে ক্ষোভ জন্মায়, একি করলো ও, এক জনের বাগদত্তার ওপরে জেনে বুঝে ঝুঁকে পড়ল? দিদির বারন ও শুনল না। কিন্তু ওর কি দোষ, বন্দনা তো ওর কাছে এগিয়ে এসেছিলো। কে এগিয়েছিল, ও নিজেই তো আগ বাড়িয়ে পেন দিয়ে থুতনিতে আঁকতে গেছিলো। বন্দনা কি বলেছিল ওগো আমাকে সাজাও। শত চিন্তা করে কুল পায় না, কে ঠিক কে ভুল।

বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে, চোখে মুখে জলের ঝাপটা মারে স্যামন্তক। তারপরে দিদির ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ঘরের মধ্যে সবাই কেমন যেন ক্লান্ত, ঘুম ঘুম ভাব সবার চোখে। পুবালি স্যামন্তককে দেখে চোখের ইশারা করে কাছে ডাকে। বন্দনা আড় চোখে স্যামন্তককে দেখতে থাকে আর সিতাভ্রর সাথে গল্প করতে থাকে। দিদির কাছে গিয়ে, কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে স্যামন্তক। পুবালি ওর চুলের মধ্যে বিলি কেটে দিতে থাকে।

সিতাভ্র হেসে জিজ্ঞেস করে—“কি শালা বাবু, এখনি হাঁপিয়ে উঠলে। এখনো তো রাত পরে আছে।”

স্যামন্তক বলে—“তোমাকে তো আর সারা দিন খাটতে হয়নি, এলে গাড়ি চেপে, বসে বিয়েটা করে ফেললে আর কি। কাজ শেষ, এবারে হনিমুনে গিয়ে মজা করবে। আমি শালা এখানে বাল ছিঁড়ে আঁঠি বাঁধবো আর কি।”

ওর কথা শুনে সবাই হেসে ফেলে, পুবালি একটু লজ্জা পেয়ে যায় ভাইয়ের মুখ থেকে এইরকম মন্ত্যব শুনে। চুলের মুঠি ধরে টান মারে। অল্প রেগে বলে ওঠে—“কি যাতা বলছিস তুই।”

“আউ লাগছে, ঠিকই তো বলেছি তাতে আবার কন্যের রাগ দেখো।“ দিদিকে রাগাতে ছারেনা স্যামন্তক।

গল্প গুজব আবার চলতে থাকে। স্যামন্তক দিদির কোলে শুয়ে আদর খেতে খেতে চোখ বুজে আসে। বাকি সবাই বেশ ক্লান্ত, তাদের চোখেও ঘুমের লেশ পরতে থাকে।

পুবালি সিতাভ্রর দুই বন্ধুদের দেখিয়ে স্যামন্তককে জিজ্ঞেস করে—“ওদের শোয়ার কি কিছু ব্যাবস্থা করেছিস?”

মাথা নাড়ায়—“হ্যাঁ ওরা মেজনাইনের ঘরে গিয়ে শুয়ে পরতে পারে। সুবিমলদা নিয়ে যাবে আর কি।”

—“আর বন্দনা কোথায় শোবে?”

মাথা চুলকোয় স্যামন্তক, সুবিমল খুনসুটি করে বলে ওঠে—“ও তো আমাদের রুমেই শুতে পারে।”

বন্দনার মুখ লাল হয়ে যায়, পুবালির দিকে তাকায় ও, সবাই হেসে ওঠে। পুবালি ভাইয়ের দিকে দেখে বলে—“একটা কিছু ব্যাবস্থা করে দিস, না হয় কাকিমার ঘরে শুয়ে পরবে।”
স্যামন্তক সুবিমলকে বলে—“তুমি ওদের নিয়ে চলে যাও আমার ঘরে।” তারপরে বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে—“পাশের রুমে মা শুয়ে আছে, পাশে জায়গা থাকলে শুয়ে পর না হলে নিচে বড়দির রুমে ঢুকে পরো।”

সুবিমল বাকি বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে গেলো। পুবালি আর সিতাভ্র কে বলে গেলো না শুতে। ওরা জানে যে ওরা শুয়েই পরবে, রাত প্রায় আড়াইটে বাজে।

পুবালি ভাইকে জিজ্ঞেস করে—“তুই কোথায় শুবি?”

—“ধুর শালা আমি শুতে যাবো কেনো রে, আমি শুয়ে পরলে তো তোরাও শুয়ে পরবি।”

—“লক্ষ্মী ভাইটি আমার, আমাকে একটু ঘুমতে দে।”

বন্দনা চুপ করে তখনও পর্যন্ত বসে ছিল। পুবালি ওর দিকে দেখে বলে—“তুই বসে কেন, তুই যা।”

“হ্যাঁ যাচ্ছি” বলে একবার স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো। বাইরে বেরিয়ে কোথাও যাবার ইচ্ছে করলো না বন্দনার। চুপ করে সোফায় বসে টিভি দেখতে লাগলো। কি করবে, সব যেন তালগোল পাকিয়ে আছে মাথার মধ্যে। মনের কোণে জেগে ওঠে প্রশ্ন “হটাত করে ও আমার থুতনিতে আঁকতে গেলো কেন? আমি কি বলেছিলাম। আমি তো সামান্য একটু মজা করতে চেয়েছিলাম, তাই বলে একদম আমাকে নাড়িয়ে দেবে?”

বন্দনা চলে যেতেই, পুবালি ভাইকে জিজ্ঞেস করে—“তুই শুধরাবি না, তাই না।”

—“আমি কি করলাম?”

—“বন্দনার পেছনে লেগেছিলি কেন?”

—“যাঃ শালা। আমি কোথায় লাগলাম। সারাটা সন্ধ্যে আমি কাজে ব্যাস্ত ছিলাম, তারপরে তোর পাশে বসে ছিলাম তোর বিয়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত। আমি করলাম টা কি। যা মজা করার সেটা তো সুবিমলদা করলো।”

ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তকের মুখের দিকে—“ও.কে মেনে নিলাম। তুই একটা বালিস নিয়ে আমাদের পাশে শুয়ে পর। মুখটা অনেক শুকিয়ে গেছে তোর।”

সিতাভ্র বলে ওঠে—“ওর মুখ কতটা শুকিয়েছে আমি জানিনা, তবে তোমার বার বার বলাতে ওর মুখ আরও শুকিয়ে যাবে।”

“না রে আমি যাচ্ছি। সোফায় শুয়ে পোরবো। একটু পরেই তো সকাল হবে।” ঘড়িতে তখন সাড়ে-তিনটে বাজে।

ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে, বন্দনা সোফায় বসে টিভি চালিয়ে এন-জি-সি দেখছে। স্যামন্তক চুপ চাপ কিছুক্ষণ ধরে বন্দনাকে পেছন থেকে দেখতে থাকে। তারপরে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যায়।

সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে স্যামন্তক ছাদে যাচ্ছে। ওর মনটা কেমন যেন করে উঠলো “আমি বসে আছি সেটা দ্যাখা সত্তেও ও কিছু না বলে চলে গেলো।” ভাবতে ভাবতে দেখে স্যামন্তক আবার নেমে আসছে ওর দিকে তাকাতে তাকাতে। চার চোখ এক হতেই, বন্দনা একটু আলতো হাসে।

“তুমি শোবে না” বন্দনাকে জিজ্ঞেস করে স্যামন্তক।

—“না আমার ঘুম পাচ্ছে না, তুমি ঘুমবে নাকি?”

—“তুমি সোফাটা ছারলে আমি একটু দু চোখের পাতা এক করতাম।”

অভিমানী সুর কেটে বন্দনা বলে—“আমাকে তাড়াতে চাও বলো।”

স্যামন্তক একটু রেগে যায় ওর কথা শুনে—“আমি সেটা বলিনি। সব সময়ে, কথা গুলোর একটা ভিন্ন মানে ধরে নেওয়ার স্বভাব আছে না তোমার?”

একটু ঝাঁজিয়ে বলে ওঠে বন্দনা—“আমি কোনো কথার কোনও মানে ধরে বসে নেই, বুঝলে।”

—“ঠিক আছে বাবা। শুতে চাইলে নিচে বড়দির ঘরে চলে যেও, ঘরটা খালি আছে।”

—“না আমি শুতে চাই না। তুমি তো ওপরে যাচ্ছিলে, নিচে নেমে এলে কেন?”

“সিগারেট নিতে।” সিগারেটটা নেওয়া একটা বাহানা ছিল স্যামন্তকের, আসলে ও একবার বন্দনাকে দেখতে চাইছিলো তাই উঠে গিয়েও নিচে নেমে আসে। এদিকে ওদিকে হাতরে, ওপরে যেতে পা বাড়ায় স্যামন্তক।

বন্দনা বলে ওঠে—“কি চললে নাকি, আমি যাবো সাথে?”

ঘাড় ঘুরিয়ে বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলে—“যাওয়া না যাওয়া তোমার ওপরে।”

এই রকম একটা চাঁছাছোলা উত্তর পাবে আশা করেনি বন্দনা, কেমন যেন করে ওঠে ওর বুকের মাঝে—“আমি যাবো না, তুমি একাই যাও। আমি কি তোমার সাথে শত্রুতা করেছি যে আমার সাথে এই রকম ভাবে কথা বোলছো।”

স্যামন্তক দাঁড়িয়ে পরে, ভেবে পায়না কি বোলবে বন্দনা কে। কথাটা বলার পরে নিজের ওপরে কেমন যেন রাগ হয়। আবার ঘুরে তাকিয়ে থাকে বন্দনার দিকে—“আচ্ছা চলো।”

বন্দনা টিভি টা বন্দ করে, স্যামন্তকের পাশে এসে দাঁড়ায়। স্যামন্তক একটু খানি ঝুঁকে পরে হেসে বলে—“লেডিস ফার্স্ট, অল অয়েস আফটার ইউ ডিয়ার।”

বন্দনার পেছন পেছন স্যামন্তক সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। স্যামন্তক পেছন থেকে দেখতে থাকে বন্দনা চাল, একবারে জন্য মনে হয় ওর, এই অন্ধকার সিঁড়ি তে ওকে জড়িয়ে ধরে, তন্বী সর্পিল শরীর টাকে পিষ্ট করে দেয় নিজের বাহুর আলিঙ্গনে। নরম নরম ঠোঁট দুটি কে কামড়ে চুষে বন্দনার সব সুধা পান করে নেয়। নিঙরে শেষ করে দেয় যত মদিরা লুকিয়ে আছে বন্দনার অভ্যন্তরে।

বন্দনা সিঁড়ি চড়তে চড়তে ভাবতে থাকে, নির্জন শীতের রাতে ওকে একা পেয়ে কি স্যামন্তক নিজেকে সামলে রাখবে? এক বারের জন্যও কি ও ঐ বাহুর আলিঙ্গনে বদ্ধ করে নিতে চাইবেনা? উত্তপ্ত পেশিবহুল বাহুর আলিঙ্গনে বদ্ধ হবার উন্মুখ আশঙ্কায় দুরু দুরু করে কেঁপে ওঠে বুক, নিজের অজান্তেই কান গরম হয়ে ওঠে। ও বেশ বুঝতে পারে যে স্যামন্তক ওর পেছনে হাঁটতে হাঁটতে ওর নিতম্বের দলুনি দেখছে। হটাৎ করে ওর মনে হয়, ওর পশ্চাৎ বলয়দ্বয়ের ওপরে কেউ গরম তেল ঢেলে দিয়েছে। সারা শরীর কেঁপে ওঠে উত্তেজনায়। এই রকম উত্তেজনা ওর কাছে যদিও নতুন নয় তবে সেটা অনেক পুরনো, অনেক দিন আগের, ধুলো পরে গেছে সেই স্মৃতিতে। আজ রাতের নিভৃত আন্ধকারে এই উত্তেজনাটাকে খুবই নতুন এবং আনকোরা মনে হয় বন্দনার। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার স্যামন্তকের দিকে দেখে একটা মিষ্টি হাসি হাসে। চোখে লাগে আগুনের পরশ, ঝলকে ওঠে গালের লালিমা।

বন্দনার চোরা চাহনি দেখে স্যামন্তকের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, বারংবার নিজেকে বলতে থাকে “এই কুজ্ঝটিকার আড়ালে এক মরীচিকা লুকিয়ে। সম্বরন করো নিজেকে নাহলে তপ্ত বালুচরে হারিয়ে ফেলবে।”

নিশি বড় সুন্দর। রি-কল পার্কের সব বাড়ি ঘুমিয়ে আচ্ছন্ন। আকাশে তারা টিম টিম করে জ্বলছে। সামনে সিদু-কানহ ডহর, কেউ নেই কোথাও। পাশের মাঠে কত গুলো কুকুর একবার ডাক দেয়। কোনও এক গলি থেকে একটা বেড়াল করুন সুরে কেঁদে ওঠে। যেদিকে দু চোখ যায় সেদিকে শুধু নির্জন অন্ধকার। ঠাণ্ডা হাওয়ায়ে দুলতে থাকে গাছের পাতা গুলো, মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিপিন দেবদারুর গাছ গুলো। দুরে জি-টি রোডের ওপর দিয়ে একটার পর একটা ট্রাক ছুটে যায়। গুম গুম আওয়াজে মাঝে মাঝে নিস্তব্ধ রাতের পরিবেশ খান খান হয়ে যায়।

বন্দনা এক কোনায় দাঁড়িয়ে এই রাতের সৌন্দর্য সুধা পান করতে থাকে। ঠাণ্ডায় মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে, গায়ের শাল টাকে আরও জড়িয়ে ধরে, একটু উষ্ণতার জন্য। মনের কোনও চোরা গলিতে জেগে ওঠে স্যামন্তকের বাহুপাশে বদ্ধ হবার বাসনা।

স্যামন্তক একটা সিগারেট জ্বালিয়ে একটু দুরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে জি-টি রোডের দিকে। দুইজনে চুপচাপ, কারুর মুখে কোনও কথা নেই। বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া উড়ে বন্দনার নাকে লাগে। ঘাড় ঘুরিয়ে স্যামন্তকের দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি হাসে ও। কি বলার আছে ওর ভেবে পায়না। স্যামন্তক একটু এগিয়ে যায় ওর দিকে, দুইজনের মধ্যে শীতল নীরবতা বড় কঠিন লাগে দুইজনেরই।

নীরবতা কাটানোর জন্য স্যামন্তক প্রশ্ন করে—“কলকাতায় আসা হয়না তোমার?”

—“সামনের বছর বাবা রিটায়ার করবেন, তারপরে আমরা শিফট হয়ে আসবো কলকাতায়। সাউথ ক্যালক্যাটায়, বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে একটা ফ্লাট দেখছেন বাবা। তোমাদের বাড়ি কোথায়?”

—“এয়ারপোর্টের কাছে, লেকটাউন।”

—“ফাইনাল ইয়ার তো তোমার, কি করবে এর পরে?”

—“আই-টি জয়েন করবো ইচ্ছে আছে। এখানে তো সেই রকম কোনও কম্পানি নেই তাই দেখি দিল্লি বা ব্যাঙ্গালর বা পুনে শিফট করে যাবো।”

“কলকাতা ছেড়ে চলে যাবে তাহলে?” উত্তর শুনে বুকটা যেন কেঁপে ওঠে বন্দনার তবুও একটু হাসে “আমি ফিরে আসছি কলকাতায় আর তুমি চলে যাবে?”

ম্লান হেসে উত্তর দেয় স্যামন্তক—“নদীর জল কি এক জায়গায় বেঁধে থাকে, ধেয়ে যায় মোহনার পানে সাগরের সাথে মিলতে।”

হেসে ওঠে বন্দনা, রাতের আঁধারে ঝিলিক মেরে ওঠে দু পাটি মুক্ত সাজানো দাঁতের সারি—“বাঃ বাঃ কবি লুকিয়ে আছে তোমার মধ্যে দেখছি? জানতাম নাতো এটা।”

—“হ্যাঁ আছে অনেক কিছু লুকিয়ে, কেউ বোঝেনা তাই কাউকে আর বলিনা।”

বন্দনার ভেতরে অনেকক্ষণ থেকে একটা প্রশ্ন উঁকি মারছিলো, থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে—“তোমার একটা গার্ল ফ্রেন্ড আছে না?”

প্রশ্নটা আশাতীত, নিজেকে সামলে নিয়ে স্যামন্তক উত্তর দেয়—“ছিল, এখন নেই। মাস তিনেক আগে ব্রেক-আপ হয়ে গেছে।”

—“কেনও?”

“কোনও এক কারনে, নাই বা শুনলে পুরনো কথা।” একটু থেমে ও জিজ্ঞেস করে “তোমার তো একজন বয়ফ্রেন্ড আছে তাইনা?”

মাথা নাড়িয়ে জানান দেয় বন্দনা “হ্যাঁ”

—“কি নাম?”

—“নিরুপম, দিল্লিতে বাড়ি, এখন থাকে শান্তিনিকেতনে। ওখানে মাস্টার্স করছে আঁকা নিয়ে।”

—“হুম, তো বিয়ে কবে করবে তোমরা?”

“জানিনা। আমার বাবা মার মত নেই।” একটু অন্য মনস্ক হয়ে জবাব দেয়।

একটা বড় টান দেয় সিগারেটে স্যামন্তক, ধোঁয়ার কয়েকটা রিং ছেড়ে জিজ্ঞেস করে—“ভালবাসে ও তোমাকে?”

হটাৎ এইরকম প্রশ্নের সম্মুখিন হবে, বন্দনা কোনোদিন স্বপ্নেও আশা করেনি। সহস্র রজনী কাটিয়ে এই প্রশ্নটা এই রাতে ওর কাছে বড় কঠিন মনে হয়। সময় যেন থমকে দাঁড়ায়, চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে বন্দনার। দিশা হীন ভাবে উত্তর হাতড়াতে থাকে নিজের বুকের মাঝে। আগে কোনোদিন তো ওর এই প্রশ্নের জবাব দিতে বাধেনি তবে আজ কেনও ও দ্বিধা বোধ করছে উত্তর দিতে। শালটাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে বুকের উপরে, বুকের পাঁজরে হৃদয়টা কিল মারতে থাকে। চোখের পলক পরেনা, নিথর হয়ে তাকিয়ে থাকে স্যামন্তকের মুখের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে বলে—“হ্যাঁ নিরুপম আমাকে ভালবাসে।”

স্যামন্তক ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে বন্দনার দিকে “এতো দেরি এই সামান্য প্রশ্নের?” আলতো করে ছোঁয় বন্দনার কাঁধ, নিচু স্বরে বলে—“শুতে যাও, আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি।”

==== দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ====

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s