কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান (part 03)


আর কি বললো।
জানিনা বলতে ভালো লাগছে না। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলবো।
সুরো আমার বুক থেকে মুখ তুললো।
সুরো কথা বলবে বলেছে।
পরে বলবো। কারো সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না।
আচ্ছা। তুমি বাড়ি যাও।
পরে যাব।
গুরুমার কথা রাখবে না।
ঠিক আছে আর একটুক্ষণ বসি।
আচ্ছা।
বড়মা কাঁদছে।
কাছে গেলাম।

আমার কেন মরণ হয় না মিত্রা। কেন আমাকে ঈশ্বর নেয় না। আমি কি জমের অরুচি।
এ সব কি কথা বলছো তুমি!
ছেলেটাকে তখন আমি কতো গালাগাল দিলাম। অনিকে আমি কোনদিন গাল দিই নি।
বড়মার চোখমুখটা কেমন যেন লাগছে।
তুমি না জেনে দিয়েছো।
ঠাকুর আমার চোখটা অন্ধ করে দেয়না কেন।
বুঝলাম বড়মা ভুল বকতে শুরু করেছে।
কাকে বলবো নিয়ে যাবার জন্য।
জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। তারও চোখে অনেক প্রশ্ন।
কনিষ্ক এগিয়ে এলো।
আস্তে করে বললাম পারলে প্যথিডিন দিয়ে দাও।
আবিদ পাঁচিলের গা থেকে পোঁটলাটা তুলে নিয়ে এসেছে।
চ্যাটচেটে কালো নেগড়ায় মোড়া।
কারুর কোন মুভমেন্ট নেই।
আমার দিকে তাকাল।
খুলবো।
খোলো।
নেগড়ার গিটটা খুলতেই একটা লাল পরিষ্কার কাপর বেরিয়ে এল মনে হলো একটা বাক্স আছে।
ঠিক তাই একটা বড় বাক্স তার ভেতর আর একটা বাক্স। তার ভেতর একটা গয়নার বাক্স আর একটা কাপড়।
সুরোর ফোনটা আবার বেজে উঠলো।
সুরো আমার দিকে তাকালো।
চিকনাদা।
কথা বল।
বলো।
তোদের ভিডিও তুলেছে কে রে।
কেন।
তুই যখন তোর অনিদাকে খাওয়াচ্ছিলি ওই ছেলেটা তখন ভিডিও তুলেছে। ছবিটা যদি ঠিক মতো আসে, আমাকে একটা স্টিল বানিয়ে দিবি।
ফোনটা কেটে গেল।
কিরে কি বললো ?
বললো আমি যখন অনিদাকে খাওয়াচ্ছিলাম সেই সময় ভিডিওর ছেলেটা ছবি তুলেছে।
সুরোর কথা শেষ হল না। রতন দৌড় দিল।
অনিমেষদার চোখ দুটো লাল, থম থমে মুখ। বিধানদা গুম মেরে দাঁড়িয়ে। ক্যাটারিংয়ের ছেলে গুলো চেয়ার এনে দিয়েছে বসার জন্য।
অংশুর বাবা এইরকম পরিস্থিতে জীবনে কোনদিন পরে নি। কেমন যেন মুখ করে দাঁড়িয়ে। ভদ্রলোক সবে মাত্র বাড়ি ফিরে যাবার জন্য তোর জোড় করছিলেন।
সবাই চেয়ারে বসলো।
অনিমেষদা ছগনলালকে ডাকলো।
ছগনলাল কাছে এলো।
তুমি ঠিক দেখেছ পুলিসের গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে।
হ্যাঁ বাবু বড়া গাড়ি থা দো গো পুলিস ভি থা ভিতর মে।
উস সময় কিতনা টাইম থা।
ও ছোটা দিদিমনি যব খানা দেকে আয়া উস টাইম।
প্রবীর থানার বড়বাবুকে একবার ডেকে পাঠাও।
প্রবীরদা ফোনটা বার করলো।
আর শোনো। না থাক।
বলুন না।
টনা-মনাকে এখন পাবে।
রতনকে পাঠিয়ে দিই। একবার ট্রাই করুক।
হ্যাঁরে রতন তোরা কেউ কিছুই জানতিস না! এই সময় অন্ততঃ সত্যি কথা বল।
বিশ্বাস করুণ দাদা।
তোদের কথা আর বিশ্বাস করতে পারি না।
রতন মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
অনুপ তুমি ছেলেটাকে দেখেছ।
বহুবার দেখেছি। মাথায় এই সিকোয়েন্সটা আসে নি। আর যেই ভাবে বসেছিল….।
ব্যাটা সকলকে ঘোল খাইয়ে দিল।
বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।
বিধানবাবু আপনি একবার ভাবুন।
আমার মাথাটা কোন কাজ করছে না অনিমেষ।
না করারই কথা। আমার কি আর করছে, করাবার চেষ্টা করছি।
সুরোর দিকে তাকাল।
দেখতো মা তোর এই প্যাকেটে কিছু লিখেছে-টিখেছে কিনা।
বৌদির মুখটা গম্ভীর। খালি কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছছে।
সুতপা কেঁদে কিছু হবে না।
অনিমেষদার গলাটা কেমন ভার ভার।
বোকাদের মধ্যে তুমিও একজন। আমার থেকে তুমি ওকে বেশি চিনতে।
দামিনী মাসি তখনো মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে আছে।
কিগো দামিনী তুমিও চিনতে পারেল না। তোমার কাছে অনি আঠারো মাস ছিল।
দামিনীমাসি মাথা নীচু করে রইলো।
সুরো প্যাকেট থেকে একটা খাম বার করে আমার হাতে দিল।
দেখনা মা কি লিখেছে গুণধর।
অনিমেষদা আমার দিকে করুণভাবে তাকাল।
একটু জোড়ে পর। সবাই শুনুক।
কিরকম রাম ঠকান ঠকালুম বলতো। তোর কথা রেখেছি। অনিদা কোনোদিন তোকে ফিরিয়ে দেবে না। আকাশের চাঁদ চাইলেও তোকে এনে দেবে। যদি তার পক্ষে সম্ভব হয়। তোকে যে কয়টা কথা দিয়েছি সব কটা রাখব। হারটা নিজের হাতে কিনেছি। জীবনে প্রথম। জানিনা তোর পছন্দ হবে কিনা। ক্যাশমেমো আছে, পছন্দ না হলে চেঞ্জ করে নিয়ে আসিস। খুব ভালো খেলাম বুঝলি। আমার মেয়েটাকে একেবারে আমার মতো দেখতে হয়েছে। ছেলেটা গাড়ল। একবারও কাছে এলো না। মেয়েকে একটা ক্যান্ডি দিয়েছি। পাগলের হাত থেকে ক্যান্ডিটা প্রথমে নিতে চায় নি বুঝলি, তারপর নিলো। সবাইকে চোখের আশ মিটিয়ে দেখলাম। কতদিন পর দেখলাম। কনিষ্কটার চোখে নেবা হয়েছে বুঝলি। কতবার বাইরে এলো, সিগারেট খেলো। পোড়া সিগারেটটা একবার ফেলে যাবি তো। তা না পা দিয়ে ডলে ভেতরে চলে গেলো।
অনিদা।
তোর এসব লেখা পরলে কার মন ভাল থাকে বল।
কনিষ্কর পর্যন্ত চোখ ছল ছল করে উঠলো। বটা নীরুর চোখ লাল।
কি কনিষ্কবাবু চোখ মুছলে হবে, পাখি উড়ে গেছে। চিঠিটা কেন পড়তে বললাম বলো।
কনিষ্ক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
এইখানেই তোমাদের সঙ্গে অনির তফাৎ। ও খুব সন্তর্পণে ইচ্ছে করে একটা ভুল করেগেছে। বলতে পার ওকে খোঁজার জন্য একটা অস্ত্র ও তুলে দিয়ে গেছে।
অনুপ তুমি বলতে পারবে।
ক্যাশ মেমোটা।
ঠিক ধরেছো।
দেখ ওটা কোন বড়ো দোকান থেকে কেনা।
পিসি চন্দ্র।
ও যেটা কিনে দিয়েছে সুরোর অপছন্দ হওয়ার কথা নয়। তবু তোমরা যদি ওর ট্রেস পেতে চাও খুঁজে নাও। প্রমাণ দিয়ে গেলাম।
কালকে তোমার একটা কাজ আছে অনুপ।
ওই দোকানের ক্যামে ওর কোন ছবি ধরা পরেছে কিনা রেকর্ড করে আনব।
ইয়েস।
আমার দরকার। শেষ চেষ্টা একটা করবো।
অনিমেষদা ইসলামভাই-এর দিকে তাকাল।
ইসলাম তোমার ছেলেটাকে বলনা যদি একটু চা খাওয়াতে পারে।
ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল ছেলেটা।
অংশুর বাবা মন দিয়ে সব শুনছে।
বুঝলেন বিধানবাবু আমার সবচেয়ে বড়কষ্ট, ছেলেটাকে কাজে লাগাতে পারলাম না। হাজার চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেল। চাড্ডিখানি ব্যাপার।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে, বুক ফেটে যাচ্ছে মুখে কিছু বলতে পারছি না।
দেখলাম বড়মাকে ধরে ধরে দিদিভাই ছোটমা নিয়ে আসছে।
তাড়াতাড়ি কাছে গেলাম।
তুমি একটু শোও না। কেন অমন করছো।
তুই আমাকে থাপ্পর মার। বড়মা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
কেন এরকম করছো।
আমি কনোদিন ওকে বাজে কথা বলিনি।
আচ্ছা ঠিক আছে, ও কি তোমায় কিছু বলেছে।
তখন ও বোবার মতো বসে আছে, ঘামে ভিঁজে গেছে, মুখটাও ভাল করে দেখতে পেলাম না। কেমন কালিঝুলি মাখা।
ঠিক আছে, ঠিক আছে তুমি একটু শান্ত হও।
ছেলেটা আমাকে পর্যন্ত একবার বললো না।
এই আবার শুরু করলে।
চিকনাকে আমাকে একটু ধরিয়ে দে আমি কথা বলবো।
ওর কি মন ভাল আছে।
আমি কথা বলবো। বড়মা তোর মেয়ের মতো কথা বলতে লাগল।
তখন আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়, বুঝলি। তুই তখন মহা আনন্দে বোনের বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিস। মেয়ের হাতে লুচি খেয়েছিস।
বাধ্য হয়ে চিকনাকে ফোন করলাম।
বলো।
বাড়ি যাও নি।
এইবার যাব।
বড়মা কাঁদছে, তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
দাও।
চিকনা বাবা।
কথা আর হলো না দুজনে খানিকক্ষণ কেঁদে নিল।
তুমি তবু দেখলে, আমি ওকে এখনো চোখের দেখা দেখি নি। তুমিও চিনতে পারলে না।
আমি যে ওকে পেটে ধরি নি বাবা।
তোমায় ও পায়ে হাত দিল। তুমি গালাগাল করছিলে ও তখন মুখ নীচু করে হাসছিল, তুমি খেয়াল করনি।
বিশ্বাস কর বাবা, খেয়াল করলে কি ওকে ছাড়ি।
অনিসা তখন যে জামাটা পরেছিল ওটা কি কেচে দিয়েছ।
জানি না।
ওর জামার পকেটে একটা কাগজের টুকরো আছে, দেখো কি আছে।
ও মিত্রা, চিকনা কি বলে।
বলো চিকনা।
দেখলাম দিদিভাই ভেতরে দৌড় দিল। অনিমেষদা প্রবীরদা দেখি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। অংশু চুপচাপ স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে।
অনিসার সঙ্গে ওর অনেক কথা হয়েছে। কি কথা হয়েছে ওকে জিজ্ঞাসা করো।
ও তো ঘুমচ্ছে।
কাল উঠলে জিজ্ঞাসা করবে।
অনিমেষদা ইশারা করলো কথা বলবে।
আমি বড়মার হাত থেকে ফোনটা নিলাম। চিকনার গলাটা তখনো ভাড়ি ভাড়ি।
চিকনা।
বলো।
অনিমেষদা তোমার সঙ্গে কথা বলবে।
দাও।
আমি অনিমেষদাকে ফোনটা দিলাম।
হ্যালো।
বলুন।
তুমি কোথায়।
অনি যেখানে এসে বসে থাকত, আমি সেখানে বসে আছি।
কি করছো।
কি আবার করবো। আমার কি কোথাও যাওয়ার জো আছে। পাহাড়া দিচ্ছি। যক্ষের ধন।
ও কবে এসেছিল।
জানিনা। আটটা নাগাদ ফোন করে বললো। চিকনা কলকাতা এসেছিলাম, কতকগুলো কাজ সারলাম। বোম্বে যাচ্ছি। ওখান থেকে লন্ডনের ফ্লাইট ধরবো।
আমি বললাম আজ সুরোর বিয়ে তুই জানতিস।
বললো সকাল থেকে ওখানেই ছিলাম। আমার সঙ্গে টনা মনা ছিল। তুই এলিনা কেন। তাহলে দেখা হতো।
আপনি বলুন দাদা ও আসবে জানলে আমি কি না গিয়ে থাকতাম।
চিকনা আবার কাঁদতে শুরু করলো।
কাঁদছো কেন, কাঁদলে কি অনিকে পাবে।
ও ফিরে আসুক তারপর দেখাচ্ছি, ওর একদিন কি আমার একদিন।
শুধু ফোঁপানর শব্দ।
রাখছি দাদা, কথা বলতে ভালো লাগছে না।
চিকনা ফোনটা কেটে দিল।
অনিমেষদা ভাবলেশহীন মুখে ফোনটা আমার হাতে দিল।
একটা পুলিসের গাড়ি এসে গেটের সামনে দাঁড়াল।
অনিমেষদা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
পুলিশ কেন।
বড়মা আমার হাতটা চেপে ধরলো।
অনিমেষদা ডেকে পাঠিয়েছে।
আমাকে নিয়ে চল আমি শুনবো।
কাঁদতে পারবে না।
দিদিভাই ছুটতে ছুটতে এলো।
কাগজতো পেলাম না এই সিগারেটের প্যাকেটটা পেলাম। আমার হাতে দিল।
অনিমেষদা দেখি আবার ফিরে এলো।
কি আছেরে এতে।
চিকনা বললো। মেয়ের সঙ্গে বুবুন অনেক কথা বলেছে। মেয়েকে প্যাকেটটা দিয়ে গেছে।
তোরাও আর অনিসাকে ফলোআপ করিস নি।
কি করে বুঝবো বলুন দাদা।
তাও ঠিক। কি কথা বলে ফেললাম।
কি সুন্দর সুযোগটা নিয়েছে। দেখতো ওর মধ্যে কিছু আছে নাকি।
আমি প্যাকেটটা খুললাম। একটা ছবি। তোর আর আমার। কয়েকটা ক্যান্ডি লজেন। একটুকরো কাগজ।
ছবিটার পেছনে লেখা আছে, এই পাগলটা তোমার বাবা, তোমার মার সঙ্গে তোমার পাগল বাবার ছবি।
ছেঁড়া টুকরো কাগজটায় লেখা আছে।
বড়মা তোমার হাতে অনেকদিন পর খেলাম। এর স্বাদই আলাদা। আজ মিত্রাকে কোনও ভাগই দিলাম না। তুমি সম্পূর্ণ আমার। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত নাতি নাতনিকে গুছিয়ে রাখবে। অনি।
বুঝলি বুবুন বুকের ভেতরটা এতো প্রচন্ড যন্ত্রণা করছে। কথা বলতে পারলাম না। খালি কাগজের টুকরটা অনিমেষদার হাতে এগিয়ে দিলাম।
বলনা ও কি লিখেছে।
বড়মার মুখের দিকে তাকালাম কোন কথা বলতে পারলাম না।
অনিমেষদা একবার দেখে নিয়ে দিদিভাই-এর হাতে কাগজের টুকরোটা দিয়ে ফিরে গেল।
তোর পাগল সাজার চলমান ছবি দেখলাম। একঝলক দেখলে কিছুতেই বোঝা যাবে না তুই। অনেকক্ষণ ভাল করে দেখলে বোঝা যাবে তুই। তোকে যে কোনদিন দেখে নি, তারপক্ষে ধরা অসম্ভব।
আবার একবার কান্নাকাটি হলো।
সারারাত আমার আর ঘুম হলো না। ডাক্তারদাদা, অনিমেষদারা গোল হয়ে বসে অনেকক্ষণ কি সব শলাপরামর্শ করলো।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে এসেই তোর মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁদো কাঁদো মুখে বললো জানো মা, পাগলটা চলে গেছে।
আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম। হায়রে ও যদি জানত ওই পাগলটা ওর বাবা।
তারপর ঘরের মধ্যে ঢুকে জামার পকেটে হাত দিল। কিছু না পেয়ে মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। আমি কাছে গেলাম।
কি খুঁজছিস।
আমার তাস।
কোথায় ছিল।
আমার পকেটে ছিল।
তাস কোথায় পেলি।
মেয়ে চুপ করে গেল। কিছুতেই বলে না।
আমাকে সত্যি কথা বললে দিতে পারি।
পাগলটা দিয়েছে।
মেয়েকে নিয়ে ওপরে চলে গেলাম।
সুরো তখন যাওয়ার তোরজোড় করছে। কার আর মন ভালো থাকে। অনিমেষদা আমাকে দেখলো, ইসারায় বললো দেখ কিছু পাস কিনা।
আলমাড়ি থেকে প্যাকেটটা বার করলাম।
পাগলটা তোকে কালকে একটা ক্যান্ডি দিয়েছিল।
তুমি জানো।
মাথা দোলালাম।
পাগলটা কি বললো জানো।
কি বললো।
পাগলটা তোমাকে চেনে। বললো ওটা তোমার মা ?
আমি বললাম হ্যাঁ।
পাগলটা দিদান দাদাই সবাইকে চেনে।
তোকে আর কি বললো।
বললো আমার বাবাকে চেনে আমার বাবা পাগলটার সঙ্গে থাকে।
তুই কি বললি।
আমাকে নিয়ে যাবে।
বললো হ্যাঁ।
গেলিনা কেন।
তুমি যে বললে ওরা ছেলেধরা, ধরে নিয়ে যাবে তাই গেলাম না।
মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। কাজের কাজ কিছুই হলো না।
সুরো চলে গেলো, যাওয়ার সময় তোর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল।
অনিসার চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে।
বুকের ভেতরটা কেমন দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা। ঠিক যন্ত্রণা হচ্ছে না আবার কিন কিন করে যন্ত্রণা হচ্ছে।
ডান হাতের তালু দিয়ে চোখটা মুছলো। আবার ঝাপসা হয়ে গেল।
মায়ের কতো কষ্ট। মা কিরকম চুপচাপ সব সহ্য করে আছে। সব জানে অথচো কিছু জানে না।
সত্যি এতদিন ও কিছুই জানতো না।
কেন বাবা আজ আঠারো বছর বাড়ির বাইরে। লেখাগুলো পরে মনে হচ্ছে বাবার সঙ্গে একমাত্র চিকনাদার ডাইরেক্ট যোগাযোগ আছে। আর সবাই ভাসা ভাসা, সব জানে। পরিষ্কার করে কিছুই নয়।
তাহলে মা কার সঙ্গে রাতে কথা বলে। বাবার সঙ্গে ?
এতোক্ষণ যেটুকু পরেছে তার থেকে এইটুকু পরিষ্কার বাবা কিছুতেই মার সঙ্গে কথা বলবে না।
বাবা সত্যি সত্যি কেন বাইরে পরে রয়েছে ?
সুরো পিসির বিয়ের দিনটা ও ভালো করে ভাববার চেষ্টা করলো।
একটু একটু আবঝা আবঝা মনে পরছে। একটা পাগলের সঙ্গে ও অনেকক্ষণ কথা বলেছে। কিন্তু কি কথা বলেছে। আজ ঠিক পরিষ্কার মনে নেই। মা লিখে রেখেছে বলে ও মনে করতে পারছে। না হলে ও ভুলেই গেছিল।
বাবা ওকে দেখেছে। ও নিজে বাবাকে দেখেছে। কথা বলেছে।
অনিসা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলো। সব কেমন যেন আবঝা আবঝা চোখের সামনে ভেসে আসছে।
হঠাৎ বাগানের আমগাছটা থেকে দু’একটা কাক কা কা করে ডেকে উঠলো। অনিসা চোখ খুলে জানলার দিকে তাকাল। পূব আকাশটা ফর্সা হয়ে এসেছে।
নিশ্চই দুদুন বাগানে ঘুরতে বেরিয়ে পরেছে।
অনিসা ল্যাপটপটা বন্ধ করলো।
সারাটা রাত ও জেগে আছে। চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। এক নিঃশ্বাসে খালি পরে গেছে।
সত্যি ওর বাবার সম্বন্ধে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে। কেন বাবা এরকম কান্ড করলো।
মিঃ মুখার্জী, ডঃ ব্যানার্জী, রাজনাথ এরা কারা। দুদুনের মুখ থেকে এদের নাম কোনদিন শোনে নি। মনে হচ্ছে ইতিহাসের মধ্যে ইতাহাস লুকিয়ে আছে।
বিতান আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করলে যে জানতে পারবে তাও নয়। এখানে পরে যেটুকু ও বুঝলো বাবাকে বিতান আঙ্কেল যথেষ্ট ভয় পায়।
মিলিমনি, টিনামনি কিছুতেই বলবে না। কালকে ইচ্ছে করে ভিডিও ক্লিপিংস গুলো পেনড্রাইভে ভরে দেয় নি।
আজ সুরো পিসির কাছ থেকে বিয়ের সিডিটা নিয়ে ল্যাপটপে কপি করে নিতে হবে। কিন্তু কি বলে চাইবে।
শুভ কালকে পুরনো কাগজগুলো দেখতে দেখতে গম্ভীর হয়ে চলে এলো। বাবা দুবাইতে আছে। ওর বাবাও দুবাইতে ছিল। তাহলে কি মিঃ মুখার্জী শুভদীপের কেউ হয় ? মার লেখাগুলো পরে মনে হচ্ছে বাবার সঙ্গে মিঃ মুখার্জীর খুব ভাল রিলেসন ছিল।
মিঃ মুখার্জী খুন হয়েছিলেন। বাবা তার প্রতিশোধ নিয়েছে।
মা তাই লিখেছে। চিকনাদার কথোপকথনের থেকে তাই বোঝা যাচ্ছে।
শুভ বলছিল ওর দাদু কিছুতেই ওর বাবা-মার সম্বন্ধে বলতে চায় না। বড়ো হলে জানতে পারবি। এই বলে এড়িয়ে গেছে। আচ্ছা আমরা কি এখনো ছোট আছি ?
দাদাকি এই ব্যাপারগুলো কিছু জানে ?
যদি জেনে থাকে ওকে কোনদিন কিছু বলে নি।
টোডি কে ? কেন বাবা টোডির পেছনে দৌড়চ্ছে।
ইসলামদাদাই কেন কিছু করতে পারবে না।
ইকবালদাদাই বললো, তুই খোঁজ, ঠিক তোর বাবার দেখা পেয়ে যাবি।
অনিসার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে।
টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘুম হবে না। ব্রাসে মাজনটা লাগিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেল। ফ্রেস হয়ে জামাকাপরটা বদলে নিচে চলে এলো।
কেউ এখনো ওঠে নি।
বাগানের শেষপ্রান্তে চলে এলো। দুদুন একটা গাছের গোড়ার মাটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নরম করছে।
পেছনে এসে দাঁড়াল।
কি করছো।
বাবাঃ তুই এত সকালে, সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে।
সূর্য ঠিক দিকেই উঠেছে। ঘুম ভেঙে গেল, ভাবলাম তোমার সঙ্গে বাগানে একটু হাঁটি।
তা বেশ।
অনিসা দুদুনের পাশে হাঁটতে শুরু করলো।
কোন কথা নেই। অনিসা প্রথম কথা বললো।
দুদুন।
বল।
তুমি কোন কলেজ থেকে পরেছো।
বিদ্যাসাগর।
দিদান।
একি কলেজে।
তার মানে তোমরা দুজনেই দুজনকে চিনতে।
অমিতাভদা থমকে দাঁড়াল নাতনির মুখের দিকে একবার তাকাল।
বলোনা।
চিনতাম।
অমিতাভদা হাসলো।
তুই হঠাৎ এই প্রশ্ন করছিস।
আমি তোমার কলেজে পরবো।
কেন ? তোর বাবার কলেজে ভর্তি হবি।
বাবা কোন কলেজে পরতো।
স্কটিশচার্চ।
বাবা-মা এক কলেজে পরতো না ?
হ্যাঁ। এক ক্লাশে।
তোমাদের মতো।
না তোর দিদান আমার থেকে জুনিয়ার।
আচ্ছা বাবার সঙ্গে তোমার আলাপ কি ভাবে হলো।
সে অনেক কথা।
অনিসা বলতে যাচ্ছিল আমি জানি। চুপ করে গেলো।
আবার নিস্তব্ধে হাঁটা।
কালকে বাবার লেখা গুলো পরলি।
পরলাম। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।
বল।
ডঃ ব্যানার্জী, রাজনাথ কে ?
ওরা এক একটা বর্ন ক্রিমিন্যাল। তোর বাবা ওদের শায়েস্তা করেছে।
কেন ? ওরা কি বাবার কোন ক্ষতি করেছিল ?
অমিতাভদা আবার দাঁড়াল, বোঝার চেষ্টা করলো। নাতনির প্রশ্নটা খুব ভালো ঠেকছে না। মনে হচ্ছে ও ওর বাবার মতো শম্বুক গতিতে এগোচ্ছে।
চুপচাপ আবার হাঁটতে আরম্ভ করলো।
অনিসা পাসে পাসে হাঁটছে।

কিগো বললে না।
কি বলতো।
ওরা কি বাবার কোন ক্ষতি করেছে।
তা একটু করেছে।
তোমার সঙ্গে বাবার কথা হয়।
একদম না।
এই কয় বছরে বাবাকে তুমি চোখের দেখাও দেখ নি।
না।
বাবা কি সত্যি বেঁচে আছে।
এইতো তুই বেঢপ সব প্রশ্ন করছিস। চল একটু চা বানা, দুজনে একটু চা খাই।
খাওয়াব, আগে বলো।
আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না।
তাহলে বাবা মরে গেছে, এটাই সত্যি।
একবারে বাজে কথা বলবি না।
তাহলে তুমি সত্যিটা বলো।
তোর ডাক্তারদাদাই জানে।
ডাক্তারদাদাই জানে, তুমি জান না, সেটা হয়।
তোর ডাক্তারদাদাই আমার থেকে বেশি জানে।
বাবা তোমার কাছে থাকতো।
তাতে কি হয়েছে।
বারে, তোমার কাছে থাকবে, আর ডাক্তারদাদাই সব জানবে, কেমন করে হয়।
বললাম তো আমি কিছু জানি না।
বুঝেছি তুমি বলবে না। এই তো। যাও তোমাকে বলতে হবে না।
অনিসা হন হন করে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
এই দেখো মেয়ের রাগ হয়ে গেলো।
অনিসা হেঁটে গেটের কাছে এগিয়ে এলো।
গেটের তালা খোলাই ছিল। অনিসা আস্তে করে গেটটা একটু ফাঁক করে বাইরে বেরিয়ে এলো। শুনসান রাস্তা। দু’একটা কুকুর গুটি শুটি মেরে শুয়ে আছে।
একবার ডান দিকটায় তাকাল।
ঠিক ওই জায়গায় বাবা বসেছিল।
অনিসা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করলো।
হ্যাঁ একটু একটু মনে পরছে।
সুরো পিসির বিয়ে। বাড়িতে প্রচুর লোকজন। ওরা সবাই এক সঙ্গে বাগানের এই প্রান্তে চোর পুলিস খেলছিল। তখন গুবলুদা পুলিস হয়েছিল।
গুবলুদা পুলিস হলেই ওকে চোর সাজাতো।
অনিসা খেলতে খেলতে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। গেটের বাইরে এসে লুকিয়েছিল।
তখন পাগলটা ঠিক এই জায়গাতে বসে।
ও পাগলটাকে মুখে আঙুল দেখিয়ে চুপ করতে বলেছিল।
পাগলটা হাসলো, অনিসাও হাসলো।
পাগলটা পাঁচিলে ঠেসান দিয়ে চুপ করে বসেছিল।
অনিসা তাকাল।
পাগালটা ওকে ইসারায় বললো একটু জল খাওয়াবে।
অনিসা এক ছুটে ছগনদাদুর ঘর থেকে জলের ঘটিটা নিয়ে এসেছিল।
পাগলটা দুহাত জড়ো করে আঁচলা মতো করলো।
অনিসা জল ঢাললো। প্রথমটায় একটু বেশি পরে গেছিল। পাগলটার চোখে মুখে জল ছিটকে গেলো।
ঘামে ভেঁজা চট চটে মুখটায় কে যেন একগাদা কালি লেপে দিয়েছে। চুল গুলোয় জট পরে গেছে, ধুলো ভর্তি। গা দিয়ে কেমন যেন একটা বঁটকা গন্ধ বেরচ্ছিল।
অনিসার দেখে কেমন যেন একটা লেগেছিল।
পাগলটা ইসারায় ওকে বললো খিদে পেয়েছে একটু খাবার দেবে।
অনিসা একছুটে ভেতরে চলে এসেছিল। মাকে বলেছিল খাবার দেবার কথা।
এই তো বেশ পরিষ্কার মনে পরে যাচ্ছে।
মা লুচি দিয়েছিল।
অনিসা ছুটে এসে সেই লুচির প্লেটটা ওই পাগলটার কাছে এসে দিয়েছিল। তারপর আরও দু’জনকে ও দেখেছিল। মুখটা ঠিক মনে পরছে না।
আবার ও ছুটে মার কাছে এসেছিল।
এইবার মা ওর সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল।
অনিসা পাগলটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার মা।
বেশ মনে পরে মা ওর কথায় হেসেছিল।
তারপর অনিসার হাত দিয়ে খাবার প্লেটটা দিয়ে ভেতরে চলে গেছিল। তখন জটাজুটো ধারি পাগলটা মাথা নীচু করে বসেছিল।
অনিসা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। তারপর পাগলটা খেতে খেতে ইশারায় ওকে ডেকেছিল।
তোমার মা।
হ্যাঁ।
অনিসা পাগলটার কাছে বসে পরেছিল।
তোমার বাবাকে আমি চিনি।
তুমি চেনো!
জানো আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
তোমার বাবা আমাদের কাছে আছে।
আমাকে নিয়ে যাবে।
নিয়ে যাব। একটা জিনিষ দেব আগে নেবে বলো ?
তাহলে নিয়ে যাবে।
যাব।
অনিশার পর পর ছবিগুলো চোখের সামনে ভেস উঠছে।
বুকের ভেতরটা কেমন যেন দলা পাকাতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছে। অনিসা নিজেকে সামলে নিল।
কেন বাবা তুমি আমার সঙ্গে এরকম করলে। আমি তোমার সঙ্গে কোন অন্যায় করিনি।
এখনো যেন অনিসার মনে হচ্ছে পাগলের রূপ ধরে ওর বাবা ওখানে বসে আছে।
বেশ মনে পরে।
পাগলটা ঝোলার ভেতর থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে ওর হাতে দিয়েছিল।
ক্যান্ডিটা নিয়েই ছুটে ভেতরে চলে এসে পিকুদাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ খেলা করেছিল। বেশ মনে আছে এরপর একবারও ও হারে নি।
দুপুর বেলা দিদানের সঙ্গে আবার খেতে দিতে এসেছিল।
দিদান বলেছিল, মরণ তোমাদের কি আর যাওয়ার জায়গা নেই। অনুষ্ঠান বাড়ির সামনে ঘর আলো করে বসে আছ। আরও কয়েকটা কথা দিদান বলেছিল। ঠিক মনে পরছে না।
তবে পাগল থালাটা টানতে গিয়ে দিদানের পা ছুঁয়েছিল।
দিদান খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠেছিল।
দিলো তো ছুঁয়ে। তোমরা কি একটু চানটান করতে পার না। কি দুগ্গন্ধ ছাড়ছে।
তারপর গেট দিয়ে ঢোকার সময় ছগনদাদুকে বলেছিল। দেখো বাবা কিছু যেন চুরি টুরি করে নিয়ে না পালায়।
পাগলটা হেসেছিল।
তারপর ও নিজেই বিকেলে জেদ ধরেছিল। পাগলটাকে নেমন্তন্ন খাওয়াবে বলে।
সুরো পিসি তখন ওকে সঙ্গে করে নিয়ে ইসলামদাদাই-এর কাছে থেকে খাবার এনে তিনজনকে দিয়ে গেছিল।
তারপর বিয়ে বাড়ি। হ্যাঁ ভারি মজায় কেটেছিল সেই রাতটা।
তারমানে মা যে ঘটনা লিখেছে ঠিক। ওই ঘটনা ওরা শুতে যাবার পরই ঘটেছে।
অনিসা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
পরের অংশটুকু পরা হয় নি।
কিরে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস।
অনিসা পেছন ফিরে তাকাল।
দিদান।
আয়, সক্কাল সক্কাল উঠে দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস।
অনিসা কাছে এগিয়ে এলো।
কিরে চোখ দুটো কেমন ছল ছল করছে।
অনিসা চুপ করে রইলো।
দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করবি, আবার কাঁদবি।
অনিসা দিদানের পাসে হাঁটতে আরম্ভ করলো।
বলবিতো কি হয়েছে।
অনিসা চুপ করে থাকল।
চল দুদুনকে দেখাচ্ছি। সক্কাল সক্কাল মেয়েটাকে….বুড়ো বয়সে ভীমরতি।
না কিছু হয় নি।
তাহলে তোর চোখটা ছল ছল করছে কেন।
এমনি। তুমি দুদুনকে কিছু বলবে না।
অনিসা বুঝতে পারল দিদান ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
বল আমাকে কি হয়েছে।
বলছিতো কিছু হয়নি।
হাঁটতে হাঁটতে বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে এলো।
দুদুন ওর দিকে তাকাল।
দেখলি তোর জন্য তোর দিদান সক্কাল সক্কাল আমাকে মুখ করলো।
আর করবে না আমি বলে দিয়েছি।
দুদুনের পাশে এসে বসলো।
মা রান্না ঘরে, দিদাইও উঠে পরেছে। দাদাকে দেখতে পেল না।
দিদাই দাদা কোথায়।
বাবু উঠেছেন। আসছে, তুই বোস।
মা রান্নাঘর থেকেই ওর দিকে একবার তাকাল।
ডাক্তারদাদাই আসবে না।
এসে পরলো বলে।
দিদান রান্নাঘরে গেল।
মা চায়ের ট্রে নিয়ে এসে সামনের সোফায় বসলো।
কাল রাতে ঘুমোস নি।
হ্যাঁ।
তোর ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত টেবিল ল্যাম্প জলছিল।
একটু পড়াশোনা করছিলাম।
মিত্র মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আচ্ছা মা তোমাকে কতকগুলো প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারবে।
জানলে বলবো।
সকাল বেলা এই নিয়ে তোর সঙ্গে গন্ডগোল হয়েছে।
অনিসা দুদুনের দিকে তাকাল।
ঠিক আছে ঠিক আছে আর বলবো না।
সকাল বেলাই দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস।
ঝগড়া না দুদুনকে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম। বললো কিছু জানে না। সব ডাক্তারদাদাই জানে।
দুদুন সব নাও জানতে পারে।
বারে বাবা দুদুনের কাছে থাকতো নিশ্চই ডাক্তারদাদাই-এর কাছে থাকত না।
কি জানতে চাস বল।
দিদান আমার চা।
অনন্য ঘরে এসে ঢুকলো।
পেছন পেছন ডাক্তারদাদাই।
ছোটগিন্নী এতো সকাল সকাল!
এখন প্রশ্ন উত্তর পর্ব চলছে। চুপ চাপ শুনে যাবে। যদি কিছু জেনে থাক তাহলে উত্তর দেবে।
দুদুনের কথায় ডাক্তারদাদাই চুপ করে গেল।
আচ্ছা মা মনিদাদাই কবে মারা গেছে।
তোর বাবা চলে যাবার ঠিক তিন বছর পর।
তুমি সেই সময় ওখানে গেছিলে।
গেছিলাম।
ওটা কি ফার্মটা উদ্বোধন হওয়ার আগে না পরে।
দেড় বছর পর।
নীপা পিসির বিয়ে কবে হয়েছে।
তারও বছর দুয়েক পর।
তখন তুমি গেছিলে।
গেছিলাম।
একা না আমরা সঙ্গে ছিলাম।
তোর মনে নেই, আমরাও গেছিলাম।
অনিসা দাদার দিকে একবার তাকাল।
সকাল থেকে তুই খুব গরম খেয়ে আছিস মনে হচ্ছে। দিদান ব্যাপারটা কি।
তুই জিজ্ঞাসা কর।
আচ্ছা ডাক্তারদাদাই তুমি বাবার সম্বন্ধে সব জান। দুদুন বললো।
সব জানি না। কিছু কিছু জানি।
বাবা চলে যাবার পর তোমার সঙ্গে বাবার কোনদিন কথা হয়েছে।
না। তবে কখনো সখনো তোর বাবার গলা শুনেছি। সেখান থেকে গেইজ করেছি সে জীবিত।
আর কিছু।
না।
অনিসা একবার ডাক্তারদাদই-এর দিকে স্থির চোখে তাকাল। ডাক্তারদাদাই মুচকি হাসল।
তোর চোখ বলছে তুই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিস না।
ঠিক তাই।
এর বেশি বলতে পারব না। বাকিটা সব গল্প, তার কোন ভিত্তি নেই আমার কাছে।
শুভদীপ এসে দরজার সামনে দাঁড়াল।
কিরে তুই এতো সকালে!
অনিসা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
দাদু এসেছে।
কোথায়!
গেটের বাইরে গাড়িতে বসে আছে।
মিত্রা উঠে দাঁড়াল।
গাড়ল দাদুকে বাইরে রেখে তুই কি করতে ভেতরে এলি।
তুই উঠেছিস কিনা দেখতে।
না উঠলে কি করতিস।
ফিরে যেতাম।
তাহলে এলি কেন।
তোর সঙ্গে কথা বলতে।
অনন্য উঠে এলো।
ছগনদাদু গেট খোলে নি।
খোলা আছে।
চল দাদুকে ভেতরে নিয়ে আয়।
তিনজনে বেরিয়ে গেল।
ব্যাপরটা কি বলতো মিত্রা। শুভ এই সাত সকালে দাদুকে নিয়ে। উনিতো বড়ো একটা এই বাড়িতে আসেন নি।
ডাক্তারদাদার কথায় মিত্রা একবার তাকাল।
বলতে পারবো না। কাল শুভ লাইব্রেরী থেকে কাউকে না বলেই চলে এসেছে।
কোথায় যেন একটা গন্ডগোল ঠেকছে।
ওরা চারজন ঘরে এসে ঢুকলো। শুভর দাদু হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো। ভদ্রলোক বেশ লম্বা চওড়া। এখনও শরীরটাকে বেশ মজবুত রেখেছেন।
জানো মা শুভ কাল দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করেছে।
তুইও আমার সঙ্গে সকালে ঝগড়া করলি। দাদা বললো।
মোটেও না।
আপনাদের বাড়িতে এই নিয়ে তৃতীয়বার এলাম। অবশ্য ওর ঠাকুমা অনেকবার এসেছে।
ওনাকে আনলেন না কেন। দাদা বললো।
কাল রাতে শুভর পিসী এসেছে দিল্লী থেকে নাতি নাতনি সহ।
আপনি হঠাৎ এই সাত সকালে।
আর বলবেন না। শুভ এখন এ্যাডাল্ট তার কথার সঠিক জবাব দিতে না পরলে সে বলেছে আমার এগেনস্টে আইনত ব্যবস্থা নেবে।
সবাই হেসে ফেললো।
কিরে শুভ দাদু কি বলছে।
ডাক্তারদাদার কথায় শুভ মাথা নীচু করলো।
আমার কিছু প্রশ্ন আছে। দাদু তার কোন সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। দাদু বলেছে আন্টি জানে। তাই দাদুকে ধরে এনেছি। আমাকে প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানতে হবে।
আরি বাবা তোর প্রশ্ন অনিসার প্রশ্ন তোরা করছিসটা কি বলতো।
দাদা এমন ভাবে বললো আবার সবাই হাসলো।
বুঝলে এডিটর ব্যাপারটা বেশ জটিল বলে মনে হচ্ছে।
আর কি বলেছিস বল।
শুভ দাদুর দিকে তাকাল।
ওটা না বললে তুমি আসতে না।
ঢেঁড়স তোর ঘটে একটুও বুদ্ধি নেই।
অনিসা বলে উঠলো।
শুভ একবার অনিসার দিকে কট কট করে তাকালো।
তাকাস না চোখে ছানি পরে যাবে।
মিত্রা মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখে হাসছে।
বড়মা চা নিয়ে এলো।
দাদা লুচি ভাজছি কয়েকটা দিই।
এটা কি আবার জিজ্ঞাসা করতে হয় নাকি। ডাক্তারদাদা বললো।
তোমার মতো নাকি যা দেখো তাই খেতে চাও। উনি হিসেব করে খান।
না না দিদি এ অপবাদ দেবেন না। একটা সময় মেইনটেন করেছি এখন আর পারি না।
দেখো, দেখে শেখো।
বুড়ো বয়সে সবারই একটু আধটু ওরকম হয়। কি বলো ডাক্তার। দাদা টিপ্পনি কাটল।
তুমি আবার আমাকে দলে টানছ কেন।
হাসা হাসি চলছে। কথা বলা চলছে।
মিত্রা তোমার সঙ্গে আমি একটু একা কথা বলতে চাই।
একা হবে না। আমি সঙ্গে থাকব।
শুভর কথায় সবাই ওর দিকে তাকাল।
আমি তো কথা দিয়ছি।
যা হবে আমার সামনে, আমার জানার দরকার আছে।
কি হয়েছে কি বলুন। ডাক্তারদাদা বললো।
আর কি বলবো দাদা আমার হয়েছে যতো জ্বালা।
পৈতে থেকে লকারের চাবিটা খুলে দাও তোমাকে আর কোন প্রশ্ন করবো না। আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে যাব। শুভ বলে উঠলো।
তোকে দেবো বলেছি।
একথা তুমি বহুবার বলেছো।
ঠিক আছে লুচি কয়টা খেয়ে নিই।
তুই ওরকম করছিস কেন।
অনিসা শুভর দিক তাকাল।
বেশি ভ্যাড় ভ্যাড় করবি না। ব্যাপারটা আমার আর দাদুর, তুই এর মধ্যে মাথা গলাচ্ছিস কেন।
তুই আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছিস।
দাদু আন্টির নাম করেছে তাই।
আমি তোর থেকে অনেক বেশি জানি।
অনিসা গট গট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শুভ কিছুক্ষণ দাঁড়াল তারপর কি ভেবে অনিসার পেছন পেছন ঘরের বাইরে চলে গেলো।
ছেলেটার সত্যি কাল থেক মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
মিত্রা মন মনে হাসছে। কি বলবে। এখনকার ছেলেমেয়ে এদের কাছে কিছু চেপে রাখা যাবে না।
কি হয়েছে বলুন ?
ডাকতারদাদা শুভর দাদুর দিকে তাকাল।
সে অনেক কথা দাদা, এতদিন তবু ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলাম। কাল বাস্ট আউট।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
কাল সকালের দিকে কোথায় বেরিয়েছিল। একটু বেলার দিকে ওর ঠাকুমাকে ফোন করে বললো, আপনাদের অফিসে যাবে। ফিরতে দেরি হবে। সাতটা নাগাদ ফিরে গেল। বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই দেখি গুম হয়ে আছে। কারুর সঙ্গে কথা বলেনি।
তারপর ওর পিসি এলো। ভাই বোনের সঙ্গে কয়েকটা কথা বললো, না বলারই মতো। তারপর খেতে বসে আমার সঙ্গে তুমুল হলো। না খেয়ে উঠে চলে গেল।
ওর ঠাকুমা আমার জ্যান্ত শ্রাদ্ধ করে ছেড়ে দিল।
বাধ্য হয়ে বললাম অনিসার মা সব জানে।
তবে ছেলে দুটো খেলো। তারপর আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে।
দেখোনা মা ছেলেটা গেল কোথায়।
শুভর দাদু মিত্রার দিকে তাকাল।

এখানেই আছে কোথাও যাবে না।
মিত্রা মাথা নীচু করলো।
বুড়োটাকে একটু বাঁচাও মা। তোমাকে ও ভীষণ শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে।
শুভর দাদু ভেঙ্গে পরলেন।
আমার একমাত্র বংশধর। ও এখনকার ছেলে কিছু ঘটিয়ে ফেললে…।
একথা বলছেন কেন, শুভ খারাপ ছেলে নয়।
সব বুঝি মা, মন মানে না। কয়েকদিন ধরে দেখতে পাচ্ছি ওর চাল চলন আগের মতো নেই।
বড়মা লুচির প্লেট নিয়ে এলো।
ঠিক আছে আপনি খান, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।
ওরা দুটো গেল কোথায় ?
বাইরের বারান্দায়।
বড়মা অনন্যর দিকে তাকালো।
ডাকতে পারছিস না। ঘটের মতো বসে আছিস কেন।
দাঁড়াও না। খালি বক বক।
তুই কিছু বুঝিস।
বুঝে কাজ নেই, মাথা ফুটো হয়ে যাবে।
অনন্য উঠে বাইরে চলেগেল।
তোমরা বরং বসো আমি ওদের নিয়ে আমার ঘরে যাই।
আগে খেয়ে নে।
ভজু প্লেটগুলো নিয়ে আয় তো।
ভজু মাটিতে বসেছিল, উঠে এলো।
আমরা যাবো না।
মিত্রা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
এখন না একটু পরে।
মিত্রা বেরিয়ে এলো।
কিরে তোরা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস ? আয় আমার ঘরে আয়।
মিত্রা বারান্দা দিয়ে হেঁটে সোজা নিজের ঘর চলে এলো। ঘরের দরজা খুলে ভেতরে এলো। নিজে খাটে বসলো ওদের সোফায় বসতে বললো।
ভজুরাম খাবার প্লেটগুলো নিয়ে এলো। সেন্টার টেবিলে রাখল।
আমরা খেতে খেতে কথা বলি কি বলো শুভ।
আমার কোন অসুবিধে নেই আন্টি।
কিরে অনন্য তুই বসবি।
তোমরা কথা বলো আমি বরং দুদুনের সঙ্গে একটু আড্ডামারি।
তাহলে যা।
অনন্য নিজের প্লেটটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শুভ মাথা নীচু করে বসে আছে। অনিসা খেতে শুরু করলো।
নাও, খেতে খেতে বলো কেন তুমি দাদুর সঙ্গে কাল রাতে অমন ব্যবহার করেছো।
শুভ চুপ করে থাকল।
বলো। তুমি চুপ করে থাকলে আমি তোমাকে হেল্প করবো কি করে।
শুভ প্লেটটা সেন্টার টেবিলে রেখে উঠে এলো।
মিত্রা নিজের খাবার প্লেটটা টেবিলের ওপর রাখল। বুঝলো একটা কিছু ঘটবে।
শুভ সোজা চলে এসে, মিত্রার কোলে মুখ গুঁজে কেঁদে ফললো।
প্রথমটায় একটু অস্বস্তি হয়েছিল মিত্রার, তারপর নিজেকে সামলে নিল। অনিসার দিকে তাকাল মুখটা কেমন পাংশু।
এই দেখো বোকার মতো কাঁদলে যে কাজ করতে নেমেছো শেষ করবে কি করে। দাদু তোমাকে কিছু বলে নি। তুমি আমার কাছে জানতে এসেছো। কেনো ? আমি জানি বলে।
আন্টি তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি দাদুকে কয়েকটা নোংরা কথা বলে ফেলেছি।
কেন বলেছো বলো।
দাদুকে যতোবার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছি দাদু তার কোন সঠিক উত্তর দেয় নি। তোমার আর আঙ্কেলের সঙ্গে বাবার একটা ছবি পেয়েছিলাম বেশ কিছুদিন আগে। তারপর থেকে অনিসাকে আমি সব বলেছি। তবু দাদু কিছুতেই স্বীকার করতে চায় নি।
কি বলেছে বলো।
বাবা দুবাইতে খুন হয়েছেন এমনকি মাকেও খুন করা হয়েছে। আমাকে তখন কেউ নিয়ে বাজারে বেরিয়েছিল। তাই আমি বেঁচে গেছি।
কিন্তু কেন বাবা খুন হয়েছেন কারা খুন করেছে আমি জানি না। দাদুর কাছে জানতে চেয়েছি।
দাদু সব সময় আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছে।
কাল অনিসার সঙ্গে লাইব্রেরীতে গিয়ে পুরনো কাগজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাবার একটা ইন্টারভিউ দেখতে পাই। তখন আমি সিওর হই তোমাদের সঙ্গে বাবার খুব ভালো রিলেসন ছিল।
দাদু কিছুতেই এসব স্বীকার করছে না। শেষে কাগজের কথা যখন বলেছি। বলেছে তুমি সব জানো।
মিত্রা কোন কথা বলতে পারলো না। মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। মেয়ে স্থির চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। নিজেকে মনে মনে তৈরি করে নিল। এভাবে এদের আটকান যাবে না।
কি করবে ও ? ও কি সব জানে ? জানলে আজ ও নিজে মনে মনে এতো কষ্ট পেত। বুবুনকে ও দোষ দিতে পারে না। তবু মিত্রা গেইজ করছে মিঃ মুখার্জীর সম্বন্ধেই শুভ কথা বলছে।
ঠিক আছে তুমি ওঠো।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস আঙ্কেলের সঙ্গে দাদুর যোগাযোগ আছে। আমি লুকিয়ে আঙ্কেলের সঙ্গে দাদুকে কথা বলতে শুনেছি। দাদু আঙ্কেলকে হেল্প করে।
মিত্রার পিঠে কে যেন সজোরে চাবুকের বাড়ি মারলো। শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন যেন একটা গরম স্রোত বয়ে যাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চিপে মিত্রা সহ্য করছে।
তোমার দাদুর সঙ্গে আঙ্কেলের কিভাবে পরিচয় হলো।
দাদু এক্স মিলিটারি ম্যান মিলিটারি ইনটেলিজেন্স ব্যুরতে কাজ করতো। বাবাও প্রথমে চান্স পেয়েছিল দাদু যেতে দেয় নি। তাই বাবা সিবিআইতে জয়েন করে।
তুমি আমাকে ফটোটা দেখাতে পারবে।
পারবো। গাড়িতে আছে।
ঠিক আছে খেয়ে নাও, তারপর গাড়ি থেকে নিয়ে এসো।
শুভর যেন তর সয় না।
আমি ফটোটা নিয়ে আসি।
ঠিক আছে যাও নিয়ে এসো।
শুভ ছুটে বেরিয়ে গেল।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকাল।
থমে থমে মুখ। মিত্রা মুখটা পড়ার চেষ্টা করলো। বুঝতে পারলো এরা দুজন অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। অনেক ভেতরে ঢুকে পরেছে।
তুই আজ সকালে দুদুনের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস কেন।
ঠিক ঝগড়া নয়। দুদুনকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করলাম।
দুদুন কেমন ইরিটেট ফিল করলো। তারপর আর কথা বলি নি।
বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলি কেন।
কান্নাপেল তাই।
এমনি এমনি।
অনিসা চুপ করে রইলো।
তোরা কাঁদলেই তোর বাবা চলে আসবে।
না।
তাহলে।
তোমার কষ্টটা অনুভব করতে পারলাম আজ সকালে তাই।
মিত্রা চুপ করে গেল। বুঝলো ছেলের থেকে মেয়ে অনেক বেশি ম্যাচিওর।
শুভ ঘরে ঢুকলো।
খামটা মিত্রার হাতে দিলো।
মিত্রা খামটা খুলে ছবিটা একবার দেখে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল। বৌভাতের দিন রাতে তোলা। মিঃ মুখার্জী যখন তার দলবল নিয়ে এসেছিলেন সেই সময় মিঃ মুখার্জী নিজের মোবাইলে ছবিটা তুলেছিলেন।
অর্ক ছবিটা তুলে দিয়েছিল।
এ ছবি তুমি কোথায় পেলে।
বাবা মার একটা এ্যালবাম ছিল দাদু সেটা কোনোদিন আমাকে দেখতে দেয় নি। কয়েকদিন আগে দাদুর আলমাড়ি থেকে আমি এ্যালবামটা সরিয়ে দিই। তারপর থেকে দাদুর সঙ্গে আমার কথা বন্ধ।
অনিসা ছবিটা দেখেছে।
দেখেছে।
তোমার আঙ্কেলের সঙ্গে তোমার বাবার খুব ভাল রিলেসন ছিল।
তাহলে বাবা খুন হলেন কেন।
সেটা আমি বলতে পারব না। তোমার আঙ্কেল ফিরে এলে জানতে পারবে।
আঙ্কেল ফিরে আসবে ?
অবশ্যই।
কবে আসবে।
তার কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবে।
কি এমন কাজ।
অপেক্ষা করো জানতে পারবে। নাও খাও।
শুভ মাথা নীচু করে রইলো।
খাওয়া শুরু করো। খেতে খেতে তোমার যদি আর কিছু জানার থাকে বলো, আমি চেষ্টা করবো উত্তর দিতে।
আচ্ছা মা। তুমিতো বাবার সম্বন্ধে কোন কিছু আমাদের বলো নি। বাবার সম্বন্ধে একটু বলবে।
কি জানতে চাস বল।
বাবা হঠাৎ কেন উধাও হয়ে গেল।
মিত্রা মেয়ের দিকে একবার তাকাল। কি বলতে চায় ও। বাবার সম্বন্ধে ওর কোন সন্দেহ।
বলো না বাবাকে এতো লোকে শ্রদ্ধা করে ভালবাসে। তবু কেন বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বাবার কি একবারও ইচ্ছে করে না আমাদের দেখতে।
ইচ্ছে অবশ্যই করে। তাই তোমাদের আগলে রাখে।
তুমি কি করে বোঝ।
এখান থেকে সেখান থেকে খবর পাই।
সেই জায়গা গুলো একটু বলো না। তোমাকে আর বিরক্ত করবো না।
আমিও সঠিক জানি না।
মিত্রার গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো।
অনিসা সোফা থেকে উঠে এসে মায়ের পাশে বসলো।
মাকে জড়িয়ে ধরলো। গালে গাল ঘোষলো।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকাল। চোখটা সামান্য ছল ছল করছে।
তোমার অনেক কষ্ট। আমি জানি।
কি করে জানলি।
মিত্রা মাথা নীচু করে নিল।
জেনেছি।
একবার ভাবলো ওদের সব বলে দেবে তারপর ভাবলো না।
ওরা নিজের থেকে জানুক। ওর মা কোথা থেকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওর জন্য ওদের বাবার কতটা সেক্রিফাইস করেছে জীবনে।
শুভর দাদু এবং ডাক্তারদাদা ঘরে এসে ঢুকলো।
কি ছোট ম্যাডাম সব জানা হয়েগেছে।
তোমাকে বলেছি না। আমাকে ম্যাডাম বলবে না।
ঠিক আছে বুঁচকি। তাহলে হবে।
তাই বলবে।
অনিসা কট কট করে উঠলো।
মিত্রা মেয়ের কথায় হাসল।
ডাক্তারদাদাই।
বল।
ওরা সোফাতে এসে বসলো।
দুদুন বলে তুমি নাকি বাবাকে খুব ভালো ইন্ট্রোগেট করতে পারতে।
পুরোটা না একটু একটু।
আচ্ছা বাবাকি ডন।
একেবারেই না।
তাহলে মস্তান।
না।
তাহলে।
তোর আমার মতো সাধারণ মানুষ।
তাহলে বাবার সবকিছু পর্দার আড়ালে কেন।
তোকে তাহলে প্রথম থেকে জানতে হবে। তুইতো জানার চেষ্টা করছিস।
করছি, পারছি কই ?
চেষ্টা কর পারবি। তোর বাবাকে কেউ কোনদিন হাতে ধরে শেখায় নি।
একটা কথা বলবো কিছু মনে করবে না।
বল।
বাবার সঙ্গে অন্য কারুর রিলেসন আছে।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকাল। এই কথাটা যে ওর সন্তানের মুখে একদিন নয় একদিন আসবে সেটা ও জানতো।
যদি একথাটা ভেবে থাকিস তাহলে ভুল।
দামিনীদিদার সঙ্গে বাবার রিলেসন কি করে তৈরি হল।
তোর বাবা কলকাতায় পড়তে এসে যখন হস্টেল থেকে বিতারিত হলো। তখন দামিনীদিদার আশ্রয়ে আঠারো মাস ছিল।
হোস্টেল থেকে বাতাড়িত হলো কেনো ?
কলেজে যে কদিন ছিল হস্টেলে ছিলো, কলেজ ছাড়ার পর হোস্টেল ছেড়ে দিতে হলো। শুনেছি ফুটপাথে মাস খানেক ছিল। তারপর দামিনী দিদার আশ্রয়ে।
ফুটপাথে!
হ্যাঁ।
তারপর।
ইউনিভার্সিটি, টিউসিনি, পরোপকার, রাস্তার কলের জল, হোটেলের রাঁধুনী, কাগজের স্বাধীন সাংবাদিকতা।
তুমি বাজে কথা বলছো।
একটুও না। বিশ্বাস না করলে বাজিয়ে দেখতে পারিস। তোর বাবাকে নিয়ে লিখলে একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যাবে।
রাস্তার কলের জল মানে, ঠিক বুঝলাম না।
বহুদিন পয়সার অভাবে খাওয়া জুটতো না। তাই কলের জন খেয়ে কাটিয়ে দিত।
মিত্রা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
ওদের জানতে দে মা। এভাবে ওদের তুই দমিয়ে রাখতে পারবি না। আজ না হয় কাল ওরা জানবে। বাবার প্রতি সন্তানের ইন্টারেস্ট থাকবে না এ কখনো হয়। অনির রক্তটা ওদের শরীরে বইছে। এটা তুই অস্বীকার করবি কি করে।
বাবা এখনো অফিসের সমস্ত খোঁজ খবর রাখে। এমনকি নার্সিংহোম ফার্ম সব কিছুর।
কার কাছ থেকে কিভাবে খোঁজ খবর নেয়, বলতে পারব না। তবে তোর কথাটা ঠিক।
অনিমেষদাদু এতো পাওয়ার ফুল লোক কিছু করতে পারছে না।
তোর বাবা ক্রিমিন্যাল নয় যে পুলিশের খাতায় নাম থাকবে। পুলিশের খাতায় নাম থাকলে তোর অনিমেষদাদু কিছু করতে পারত।
ইকবালদাদাই-এর সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে।
আছে।
এবাড়িতে ইকবাল দাদাইকে কোনদিন আমি দেখি নি।
তোদের জন্মের সময় এসেছিল। তাছাড়া তোদের শরীর খারাপ হলে দেখতে এসেছে। তাও কচিৎ কদাচিৎ। কেন তুই গেছিলি।
গেছিলাম।
কি বললো।
বললো কেউ যদি জানতে পারে তুই অনির মেয়ে তোকে ভিড় করে সবাই দেখতে আসবে।
কেন।
তার কোন উত্তর পাই নি। বলেছে জানার চেষ্টা কর পেয়ে যাবি।
চেষ্টা কর।
করছিতো। পাচ্ছি কোথায়।
কি হলো সব জানা হয়ে গেছে। পুঁচকে ছোঁড়ার দল, তেজ দেখেছো।
ছোটমা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
কিরে তুই খেয়ে বেরবি না, না দাদার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব।
ছোটমা মিত্রার দিকে তাকাল।
পাঠিয়ে দিও।
দাদা আপনার।
ছোটমা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
আজ বাড়িতে থাকব বলে এসেছি। সব দায়িত্ব ওদের ঘারে দিয়ে এসেছি। বলেছি প্রয়োজন পরলে ফোন করিস।
আজ কোথাও যাবেন না!
না ছোট। আজ শুয়ে বসে গল্প করে কাটিয়ে দেব।
ছোটমা বেরিয়ে গেল।
মিত্রা উঠে দাঁড়ালো।
আমি এবার যাই।
ওর সব প্রশ্ন করা হয়েগেছে ?
শুভর দাদু মিত্রার দিকে তাকাল।
একদিনে সব হয়। যেটা ওর কাছে এসেন্সিয়াল ছিল সেটা জানতে পেরেছে।
চা খেতে খেতে শুভর দাদুর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললো।
মিত্রা বেরিয়ে গেল।
কিরে আমি এবার যাই। তুই থাকবি না যাবি।
শুভর দাদু শুভর দিকে তাকাল।
তুমি যাও, আমি পরে যাচ্ছি।
ডাক্তারদাদা হাসল।
শুভরদাদু উঠে দাঁড়াল। ডাক্তারদাদাও উঠে দাঁড়াল।
তুমি কোথায় যাচ্ছ।
একটু বাড়িতে যাই।
এই যে বললে সারাটাদিন শুয়ে বসে গল্প করে কাটাবে। বসো এখানে। তোমার যাওয়া হবে না। শুভ দাদুকে তুলে দিয়ে আয়।
আমি ফিরে এলে শুরু করবি।
ঠিক আছে।
তারমানে!
তুমি বসো আগে তারপর বলছি।
অনিসা ডাক্তারদাদাই-এর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিল।
তুই ঝামেলা করিস না অনেক কাজ।
এই যে বললে শুয়ে বসে কাটাবে।
তারমানে, বাড়িতে যে ফাইল গুলো নিয়ে এসেছি তার কাজগুলো কে করবে।
ওইতো তোমার নার্সিংহোম আর এনজিওর ফাইল ও তোমার এক ঘন্টার কাজ।
তা হোক আমার কাজ তুই করে দিবি না।
শিখিয়ে দাও, করে দেব।
পড়াশুনো শেষ কর সব শিখিয়ে দেব। বয়স হচ্ছে আর কতদিন।
একেবারে বয়স হচ্ছে বয়স হচ্ছে করবে না। তুমি এখনো ইয়ং।
ডাক্তারদাদাই হাসছে।
তোর মনের কথাটা বল শুনি।
অনেক কথা, তোমকে যে কি করে বলি।
অনিসা খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো।
বলোনা শুভর বাবা মিঃ মুখার্জীর সঙ্গে বাবার রিলেসনটা কি।
আমার সঙ্গে ভদ্রলোকের তিনবার দেখা হয়েছে।
শুভ এসে ঘরে ঢুকলো।
বোস। কোন কথা বলবি না। খালি শুনে যাবি।
প্রথম কবে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
সেদিন সকালে উঠে দেখলাম তোদের বাড়ির সামনে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনি বেশ উত্তেজিত। ওর গলার স্বর শুনতে পেলাম।
আমি ওকে যতটুকু জানতাম ও কোনোদিন উঁচু স্বরে কথা বলতো না।
সেদিনটা কেমন যেন লাগলো।
ভাবলাম মামনির আবার শরীর খারাপ করলো নাকি।
অনির একটা স্বভাব ছিল ও সচর আচর কাউকে বিরক্ত করতো না।
এমনও অনেক দিন গেছে তোর মায়ের প্রচন্ড শরীর খারাপ হয়েছে। ও নিজের বুদ্ধিতে লড়ে গেছে। সকাল বেলা এসে আমি দেখেছি।
পাশেই থাকি কিন্তু আমাকে ডাকে নি। এমনকি তোর দিদান দাদু বারান্দার ওই কোনে থাকতো তারাও জানতে পারতো না।
সেদিন সকালে পায়ে পায়ে এসে দেখলাম। তোর মা ঠিক আছে।
কিন্তু গন্ডগোল একটা হয়েছে।
প্রথমে বুঝতে পারি নি।
তারপর অনেক পরে বুঝলাম।
সেদিন মিঃ মুখার্জীকে ও ফোনে ডেকেছিল। পরে জেনেছিলাম মিঃ মুখার্জী ওর কাছে কৃতজ্ঞ। কেন কৃতজ্ঞ, কিসের জন্য কৃতজ্ঞ তা জানতাম না। তারপরও মিঃ মুখার্জীর সঙ্গে ও অনেকগুলো কাজ করেছে।
বলতে পারিস একে অপরের পরিপূরক।

অনিমেষদাদু জানতো।
সব জানতো। তোর বাবাকে মনে মনে সাপোর্ট করতো। এখনো করে। নিজে যেটা করতে পারে না। অনি সেটা করলে মুখ বুঁজে সহ্য করে। চোখ বন্ধ করে থাকে।
এখনো করে মানে! অনিমেষদাদুর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ আছে!
এইরে, না না তোর বাবার সঙ্গে অনিমেষের কোন যোগা যোগ নেই।
এখন উঠি বুঝলি।
উঠি উঠি করবে না। বোসো চুপ করে।
ডঃ ব্যানার্জী কে।
খুব সেন্সেটিভ জায়গা। তোকে বলতে পারব না। তুই জানলি কি করে ?
কাল পুরনো কাগজে পরে জেনেছি। যা পরলাম তাতে উনি আমাদের কাগজের মালিক ছিলেন। উনি কি খারাপ কাজ করেছিলেন। বাবা কেন শাস্তি দিয়েছিল।
তোকে অপেক্ষা করতে হবে। এই কোশ্চেনটা পাশ দিলাম।
ঠিক আছে রাজনাথ কে।
এটাও পাশ দিলাম।
টোডি কে।
তুই এতো নাম জানলি কি করে বল।
তোমাকে জানতে হবে না। যা বলছি তার উত্তর দাও।
বাবাঃ তুই অমন করে ধমকাচ্ছিস কেন।
ঠিক আছে তোমাকে বলতে হবে না আমি জেনে নেব।
সেই ভালো। তাহলে আমি উঠি।
আবার উঠি উঠি করে।
এইতো, সব প্রশ্ন শেষ হয়ে গেল।
কিচ্ছু শেষ হয়নি। সবে শুরু।
ডাক্তার অনিসার মুখের দিকে তাকাল।
আচ্ছা বাবা এখান থেকে চলে যাবার পর কখনো এই বাড়িতে এসেছে।
হ্যাঁ। না কখনো আসে নি।
ধরা পরে গেছ।
কি বলতো।
বাবা এসেছিল।
বলছি আসে নি, তুই জোর করে বলাবি এসেছিল।
আচ্ছা সুরো পিসির বিয়ের সময় কোন ঘটনা ঘটেছিল।
কার বিয়ে।
সুরো পিসির বিয়ে।
সেতো এখান থেকে হয় নি।
কোথা থেকে হয়েছিল।
তোর মায়ের বাড়ি থেকে।
এখান থেকে হয়েছিল। বাবা সেদিন এই বাড়িতে এসেছিল। তোমরা অনেক পরে ঘটনাটা জানতে পেরেছিলে। বলতে পারো চিকনাদার কাছ থেকে।
নির্ঘাৎ তোর মাথাটা খারাপ হয়েছে।
তুমি তো ডাক্তার, ওষুধ দাও।
দেখছিস শুভ বুড়টাকে একা পেয়ে কিরকম করছে।
তুমি আমার কথার একটারও সঠিক জবাব দাও নি।
বেঠিকটা কি দিয়েছি।
সব পাশ কাটিয়ে গেছ। আমার মন বলছে একটা জট পেকে আছে কোথাও, বাবা সেই জটটা খুলতে গেছে। এসপার না হয় ওসপার।
তুই সার কথাটা বুঝেছিস। এবার উঠি।
আজ ছেরে দিলাম। আবার বিরক্ত করতে পারি।
ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
অনিসা কিছুক্ষণ একা একা বসে থাকল। শুভ ওর দিকে তাকিয়ে।
তুই এতো সব জানলি কোথা থেকে!
তোর কবে বুদ্ধি হবে বলতো। এই জন্য তোকে বলি লেডিস ফিঙ্গার।
আমার বাবাকে দেখেছিস।
অনিসা আঙুল তুলে টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার দিকে দেখাল।
দেখে শেখ। তোর বাবার মতো লোক তার কথায় উঠতো বসতো।
আর তুই কিনা দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করে বসলি। আর কয়েকদিন অপেক্ষা করলে মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যেত।
তুই বিশ্বাস কর।
কি বিশ্বাস করবো। তোকে বলেছিলাম বাবার সঙ্গে মুখার্জী কাকুর রিলেসন ছিল। লাইব্রেরীতে গিয়ে কাগজ পরতে পরতে গুম হয়ে চলে এলি। একবার বলে আসার প্রয়োজন বোধ করলি না।
তখন নিজেকে ঠিক রাখতে পারি নি।
গঙ্গায় গিয়ে ডুবে মর। না পারলে সেকেন্ড হুগলীব্রিজ থেকে ঝাঁপ মার। ডিসগাস্টিং।
শুভ চুপ করে থাকল।
ছবিটার দিক তাকা। চোখদুটো দেখ। এখনও যেন কথা বলছে।
সামনে গিয়ে দাঁড়া দেখবি তোর সঙ্গেও কথা বলবে।
আমি ফিল করি। ভেবেছিলাম তুই আমার মতো। এখন দেখছি….। না থাক।
শুভ মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলো।
দাদুর সঙ্গে ঝগড়া করেছিস কেন।
শুভ চুপ।
ঝগড়া করে কিছু জানতে পেরেছিস।
বাবার সঙ্গে আঙ্কেলের ভালো রিলেসন ছিল। আন্টি বাবাকে চিনতো।
তাতে তুই কি করতে পারলি।
বাবাকে যারা মেরেছে হাতের কাছে পেলে প্রতিশোধ নিতাম।
তোর কাছে এসে বলবে, শুভ আমরা তোমার বাবাকে মেরেছি।
আর তুই পটাপট তাদের মেরে দিতিস।
শুভ চুপ করে গেল।
মারতে গেলেও বুকের পাটা থাকা দরকার। তোর আছে।
শুভ মাথা নীচু করে আছে।
তোর বাবা কবে মরেছে জানিস।
শুনেছি আমার তখন চোদ্দমাস বয়স।
তারমানে আজ আঠার বছর হতে চলেছে। ভাবলি কি করে তারা এখনো বেঁচে আছে।
তাহলে!
পড়াশুনোয় ফার্স্ট হলেই হয় না। মাথাটাকে একটু খাটাতে হয়। আমার বাবা যেটা করেছে। কালকেতো কাগজ গুলো গিললি। কিছু ঘটে ঢুকেছে।
কিছুটা।
কি ঢুকেছে শুনি।
তোর বাবা আমার বাবা দুজনেই খুব ডেঞ্জার লোক ছিল।
ছাগল।
ফালতু কথা বলবি না।
শুভ রেগে উঠলো।
ফালতু কথা মানে। বুঝেছি তুই লেডিস ফিংগার। যা ভাগ। আমি একাই বার করে নেব।
প্লিজ তুই এরকম করিস না। তুই যা যা বলেছিস আমি তাই তাই করেছি। একটা ভুল করেছি।
ওই একটা ভুলের জন্যই আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।
কেন।
সে বুদ্ধি তোর থাকলে জিজ্ঞাসা করতিস না। চিকনাদাকে দেখেছিস।
দেখেছি।
একমাত্র লোক যে বাবার সম্বন্ধে সব জানে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ পেট থেকে কথা বার করতে পারবি না। এমনকি অনিমেষদাদু পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছে। যেদিন বাবার মৃতদেহটা নিয়ে সবাই কান্না কাটি করেছে একমাত্র চিকনাদা কাঁদে নি। ও রকম হতে পারবি।
অনিসা চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ চলন্ত পাখার দিকে তাকিয়ে থাকল।
একমাত্র মায়ের কাছে চিকনাদা স্বীকার করেছে ও সব জানে। কেন জানিস ?
কেন ?
চিকনাদা মাকে গুরুমা বলে। বাবাকে গুরু বলে। আমরা চিকনাদার ভাই বোন।
তোকে দেখিয়ে দেবো।
আজ থেকে তুই ছাড়া আমার পেট থেকে কেউ কথা বার করতে পারবে না।
কে রে বীর পুত্তুর।
দেখ ওই ভাবে বলবি না। কাল সারারাত ঘুমই নি।
আমিও সারারাত জেগে আছি। তোর মতো জাহির করতে যাই না।
তোর সব পড়া হয়ে গেছে!
এখনো বাকি আছে।
একটু বল।
মেয়েদের মতো করছিস কেন।
তুই ছেলে বলে।
এক থাপ্পর।
অনিসা হেসে ফেললো।
ব্যাশ ঠিক আছে এবার বল।
চল আমার ঘরে চল।
দুজনে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বারান্দায় আসতেই দেখল মা সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
তুমি রেডি।
হ্যাঁ।
দাদা ?
আমার সঙ্গে বেরচ্ছে।
অনিসা মাথা নীচু করে হাসলো।
হাসছিস যে।
এমনি।
সবাই তোর মতো হবে ভাবলি কি করে।
না আমি সেই জন্য হাসি নি।
মিত্রা বাইরের ঘরে ঢুকলো। অনিসা শুভ পেছন পেছন ঢুকলো।
দুদুন তোমার সঙ্গে যাবে।
দুদুনের গাড়ি আসবে।
তোমার গাড়িটা আজ একটু দেবে।
কেন।
আমি আর শুভ একটু বেরবো।
রবীনকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
শুভ ড্রাইভ করবে।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে তাকাল।
ঠিক আছে। আমি দুদুনের গাড়ি করে চলে যাচ্ছি।
একিরে ও বললো তুই ওমনি হ্যাঁ করে দিলি।
মিত্রা ছোটমার দিকে তাকাল।
যাক।
তারমানে ?
কি হলোরে ছোট।
বড়মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
বুঁচকি গাড়ি চাইলো অমনি মিত্রা দিয়ে দিল।
কোথায় যাবি রে।
বড়মা রান্নাঘরের গেটে।
কথা দিচ্ছি বেইরে কোথাও যাব না।
না হবে না।
কেন। আমি কি ছোট আছি।
না তুমি তালগাছের মতো ঢ্যাঙা হয়ে গেছ।
অনিসা ছুটে গিয়ে দিদুনকে জড়িয়ে ধরলো।
যতই জড়িয়ে ধরো, গাড়ি পাবে না। কোথায় কি ঘটাবে।
তুমি বিশ্বাস করো। অনেকগুলো জায়গায় যাব।
হবে না।
তাহলে বাবার মতে বাসে অটোতে করে ঘুরব।
তাও হবে না।
তাহলে কি হবে।
বাড়ির বাইরে যাওয়া হবে না।
কেন বলবে তো!
কেনর কোন উত্তর নেই।
তাহলে না বলে চলে যাব।
একবার বেড়িয়ে দেখ না ঠ্যাঙ ভেঙে দেব।
পারবে।
ছাড় আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আগে বলো। তারপর।
দুদুনকে জিজ্ঞাসা কর যদি হ্যাঁ বলে তারপর।
দুদুন হ্যাঁ বলে দিয়েছে।
কোথায় যাবি।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকালো।
দেখি।
আজকে না বেরিয়ে যদি কাল বেরোস।
ঠিক আছে। কাল কিন্তু সক্কাল সক্কাল বেরোব।
আচ্ছা।
শুভ তুমি তাহলে এখানে খেয়ে নিও।
শুভ মাথা নীচু করে রইলো।
বাড়ি যাবে ?
হ্যাঁ।
তাহলে এখুনি বেরিয়ে যাও। আর কোথাও যাবে না।
আচ্ছা।
পাতার পর পাতা পড়তে পড়তে অনিসা হাঁপিয়ে উঠলো।
কখনো চোখে জল এসে পরেছে। কখনো রাগে সারাটা শরীর জ্বালা জ্বালা করে উঠছে। বাবা ঠিক কাজ করেছে। আর কেউ বাবাকে সাপোর্ট করুক আর ছাই না করুক আমি করবো।
মায়ের জন্য বাবা জীবনে কতোটা সেক্রিফাইস করেছে।
এই ঘটনাগুলো সত্যি দুদুন দিদানদের জানার কথা নয়।
এটা মা ছাড়া আর কউ জানতে পারে না।
সত্যি মায়ের কষ্টটা অনিসাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
আচ্ছা বাবাটা কি ? একটা অজ গ্রামের ছেলে হয়ে এতো সব জানল কি করে ?
ওই ঘটনার পর বাবা অনিমেষদাদুর সঙ্গে কথা বলেছে!
মার সঙ্গে কথা বলে না কেন ?
তাহলে কি মার প্রতি বাবার কোন অভিমান!
মায়ের লেখার মধ্যে দিয়ে তনু মাসির ঘটনা জানতে পেরেছে।
তনু মাসিও বাবার জন্য কতটা সেক্রিফাইস করেছে।
টিনামনি বাবাকে ভালবাসতো।
মার লেখার একটা জায়গায় ও পেয়েছে। সত্যিতো এরকম ছেলে পেলে অনিসাও ভালোবেসে ফেলতো। ওর খুব গর্ব হচ্ছে ও অনি ব্যানার্জীর সন্তান।
এইরকম বাবার সন্তান হওয়ার মর্যাদা রাখতে হবে।
আচ্ছা দাদাটা কি ? বাবার প্রতি ওর কোন ইন্টারেস্ট নেই।
না, ও ওর মতো চুপি চুপি কাজ করে চলেছে ?
একবার খোঁজ করতে হবে।
জলের বোতলটা টেনে নিয়ে একটুখানি গলায় ঢেলে নিলো।
আবার ল্যাপটপের এলসিডিতে চোখ রাখলো।
আজ সুরোর ছেলে হলো।
অনিমেষদা প্রথমে কিছুতেই নার্সিংহোমে ভর্তি করতে চাইছিল না। শেষমেষ ডাক্তারদাদার কথায় রাজি হল। সর্ত একটা পয়সা নিতে হবে।
সব শুনে ডাক্তারদাদা একটা কথাই বলেছিল, অনিমেষ মাথায় রাখবে সুরো অনির বোন। খাতায় কলমে এই নার্সিংহোমের মালিক অনি।
আজ না হোক কাল কথাটা ওর কানে পৌঁছবে।
তখন অনিমেষদা বললো, ঠিক আছে আপনি যা ভাল বুঝবেন করুণ আমি আর এর মধ্যে নেই।
তারপর সুরোকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হলো।
সুরোর ছেলে হলো আমরা সবাই হইচই করছি।
সুরোর পাশের কেবিনে এক মৌনীবাবা ভর্তি ছিলো। ডঃ রাজনের আন্ডারে।
জটাজুটধারী ভদ্রলোকের যে কি রোগ হয়েছে। কেউ ধরতে পারে না। ভদ্রলোক নাকি দিন পাঁচেক আগে এখানে ভর্তি হয়েছে।
সব সময় দেখি চার পাঁচজন করে সন্ন্যাসী ঘরে থাকে।
বেঢপ সব চেহারা।
ডাক্তারদাদা বললো, পরের পয়সায় খাওয়া দাওয়ার গুণ। চেহারা দেখেছিস এক একটার। সব দুধ ঘি খাওয়া শরীর।
নীরু কনিষ্ককে বললো, যেটা ভর্তি হয়েছে সেটাকে দেখেছিস।
না।
মালটা যেমনি ঢ্যাঙা তেমনি দুবলি পাতলি, শালা এগুলো খেতে দেয়না মালটাকে।
ঘরে সব সময় ওদের লোকজন কেন বলতো।
উনি কারুর হাতের ছোঁয়া খান না। ফলাহার করছেন। এরাই সব নিয়ে আসে।
ভর্তি হওয়ার আগে নাকি এই কন্ডিসনে উনি ভর্তি হয়েছিলেন।
ডাক্তারদাদা বললো বেটা সন্ন্যাসী এতো পয়সা পায় কোথায় বলতো। সব থরো চেক আপ করাল। কিচ্ছু ধরা পরল না। তবু বলে পেটে ব্যাথা।
তুমি একবার দেখো। আমি বললাম।
সেটি হবে না। যতোক্ষণ রাজন না কল করছে। এটা এথিকস। ভদ্রলোক রাজনের পেসেন্ট।
আমরা খুব আনন্দ করছি।
একজন সন্ন্যাসী এসে বড়মাকে বললো। যিনি পৃথিবীতে নতুন ভূমিষ্ঠ হয়ে এসেছেন মৌনীবাবা তাকে একবার দেখতে চাইছেন।
তুই জানিস বড়মাকে, শুনেই এক পায়ে রাজি।
সে পর্যন্ত দেখতে এলো।
আমরা সবাই বড়মার কথা মতো প্রণাম করলাম কে করে নি।
ডাক্তারদাদা খালি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করেছে।
কনিষ্ক আবার ইয়ার্কি মেরে বললো। দেখো এটা আবার অনি হবে না তো।
বড়মা বললো ওইরকম একহাত দাড়ি মাথায় তিনহাত জটা। তাও আবার পেঁচিয়ে খোঁপার মতো বাঁধা। ছ্যা ছ্যা ছ্যা অনি হতে যাবে কেন।
সেই নিয়ে কতো হাসা হাসি।
রাতে তিনবার সুরোকে ফোন করলাম। বাচ্চা ভাল আছে।
সুরো বললো হ্যাঁ।
সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি চিকনা এসে হাজির। তখন কটা হবে। সাতটা।
আমায় দেখে মিটি মিটি হাসছে।
কাছে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো।
বড়মা ছোটমা বেরিয়ে এসে ভূত দেখার মতো থমকে দাঁড়াল।
তুই এত সকালে। কার কি হয়েছে।
কারুর কিছু হয় নি।
ঘটা করে গুরুমাকে পেন্নম করলি।
পনেরো বছর পর গুরুর দেখা পেলাম। গুরুকে পেন্নাম করে এলাম। মনটা আজ ভীষন খুশ। তাই গুরুমাকে পেন্মাম করলাম।
অনি কলকাতায়!
ছিলো, আজ সকালের ফ্লাইটে বম্বে চলে গেল। ওখানে কয়েকদিন থাকবে। তারপর চলে যাবে।
তুমি আমাকে একবারও বললে না।
আমি কি জানতাম। কাল রাতে ফোন করে বললো, সুরোর বাচ্চাটা খুব মিষ্টি দেখতে হয়েছে। কাল আমি সকালের ফ্লাইটে বম্বে চলে যাচ্ছি। তুই চলে আয়। জায়গা বলে দিল চলে এলাম।
চিকনার ফোনটা বেজে উঠলো।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
গুরু ফোন করে নি।
তুমি ভয়েজ অন করো।
চিকনা ভয়েজ অন করলো।
চিকনাদা।
বল।
সুরোর গলা।
আবার কাঁদে।
তুমি কোথায়।
এইতো তোর অনিদার বাড়িতে।
দাদা কখন গেল।
যথা সময়ে। দাদাকে দেখলি।
হ্যাঁ।
তোর ছেলেটা খুব লাকি বুঝলি। তোর ছেলের জন্য ওর দেখা পেলাম।
তুমি এভাবে বোল না।
গেট দিয়ে দেখলাম, অনিমেষদা, বিধানদা ঢুকছে। বুঝলাম খবর ওই পর্যন্ত চলে গেছে।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
দেখলাম অনিকেত।
বৌঠান একটা গজব হয়ে গেছে।
কি হলো।
একটুর জন্য ফস্কে গেল। হাতের কাছে কোন গাড়ি ছিল না যে ফলো আপ করবো। তবে আমি আবিদদাকে চিনতে পেরেছি।
বুবুন এসেছিল!
হ্যাঁ।
তোমার সঙ্গে পরে কথা বলছি।
তখন সুরো চিকনার ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।
বৌদি।
বল।
দাদাকে দেখলাম। দাদাকে ছুঁলাম।
সুরো কাঁদছে।
অনিমেষদারা এসে বারান্দায় দাঁড়াল।
দাদাকে আমার ছেলের মাথায় হাত রেখে শপথ করিয়েছি। বলেছে খুব তাড়াতারি ফিরে আসবে।
অনিসা কোথায়।
ঘুমচ্ছে।
অনন্য।
এখনো ওঠে নি।
যাক কাল ওরা ওদের বাবাকে অন্ততঃ ছুঁয়েছে।
কখন এসেছিল বলতো।
এসেছিল কিগো গত পাঁচদিন এখানে ছিল।
এখানে ছিল মানে!
নার্সিংহোমে ভর্তি ছিল।
কি হয়েছিল।
কিচ্ছু হয় নি।
কোন রুমে।
আমার পাশের রুমে সেই মৌনীবাবা।
মৌনীবাবা!
হ্যাঁ।
আমার ফোন বাজছে। ছোটমাকে বললাম তুমি ধরো।
অনিমেষদা আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে।
দাদা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ফোন করেছি।
বিধানজ্যেঠুকে, প্রবীরকাকুকে ফোন করেছি। জানিনা বাবা ধরতে পারল কিনা।
দাদা আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
বাবাকে জিজ্ঞাসা করো না।
অনিমেষদা মাথা দোলাল।
পারেনি।
চিকনাদা আসবে না।
বলো আমি পরে যাচ্ছি।
দেখলাম ডাক্তারদাদা ম্রিয়মান মুখে বাগানের রাস্তায় হেঁটে বারান্দার দিকে আসছে।

সুরো ফোনটা রাখল।
আমি চিকনার হাতে ফোনটা দিলাম।
বার বার কালকের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে আসছে। তুই চুপ চাপ মুখ বন্ধ করে চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে আছিস। একমুখ কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ। তুই বুড়ো হয়ে গেছিস! না সব তোর ভড়ং!
তোর দাড়ি ছিলো না। অনুপ আগে তোর ছবি আমাকে দিয়েছিল, তাতে তুই দারুণ সুন্দর দেখতে হয়েছিস। দারুণ হ্যান্ডসাম। আমি যতদূর জানি তোর কয়েকটা ছাগলদাড়ি ছিল। একমুখ দাড়ি তোর হলো কোথা থেকে ? দেখেতো কখনো মনে হয় নি ওটা ফল্স!
তাহলে!
বড়মা আবার এই নিয়ে কতো হাসাহাসি করলো।
জ্যেঠিমনি তালে তাল দিল।
তোর হয়ে তোর চেলা দুটো সমানে উত্তর দিচ্ছে।
তুই ইশারায় ওদের কি বলছিস।
টক টকে গেড়ুয়া বসন। গলায় রুদ্রাক্ষ। স্ফটিকের বিশাল মালা তিন প্যাঁচে গলা থেকে নাভি পর্যন্ত ঝুলছে। আমি তোকে ছুঁয়েছি। তুই আমার মাথায় হাত রেখেছিস।
আমি তোর স্পর্শটা বুঝতে পারলাম না!
তোহলে কি তোর শরীরের গন্ধ স্পর্শ আমি ভুলে গেছি। একি করলাম আমি।
তোর মুখশ্রী কি অনেক বদলে গেছে!
হবে হয়তো, সতেরো বছর সময়টা কম না।
চল ভেতরে চল।
অনিমেষদা কাছে এসে দাঁড়াল।
কি করবি, কপাল।
চোখ তুলে তাকালাম।
বড়মা গম্ভীর। ছোটমা অনবরতো ফোনে কথা বলে চলেছে। ফোন আসারও বিরাম নেই। দাদা মল্লিকদা সোফায় হেলান দিয়েছে।
আমি পায়ে পায়ে বড়মার কাছে গেলাম। জড়িয়ে ধরলাম।
আমি না হয় ভুল করেছি, তুইও ভুল করলি।
একই প্রশ্ন তো আমার বড়মা।
তুমিতো কতো কথা বললে ওর সম্বন্ধে শেষে বললে ও কিছুতেই তোর বুবুন হতে পারে না।
আমি এতটা ভুল করবো না।
তাহলে সুরো ভুল কথা বলছে।
সে হবে কি করে।
তাহলে তুমি বলো।
বজ্জাত ছেলে।
বড়মা চেঁচিয়ে উঠলো।
বলো না। ওর ক্ষতি হবে।
সন্ন্যাসী সাজা হয়েছে। মৌনীবাবা। একবার বাড়ির দোরগোড়ায় পা দিক।
বড়মাকে নিয়ে ভেতরে এলাম।
আবার চেলা গুলো বলে কিনা উনি গুরুজনদের প্রণাম নেন না। ভূমিতে মাথা ঠেকান। ঢং।
ছোটমা এগিয়ে এলো।
চোখে মুখে কষ্টের ছাপ। তবু চোখের দেখা দেখেছি। এতেই যেন শ্বস্তি।
দাদা বসে আছে। মাথা নীচু করে।
হ্যাঁগো, তোমার চোখে কি নেবা হয়েছিল।
দাদা বড়মার দিকে তাকাল।
কালতো অতোক্ষণ ধরে ছেলেটাকে দেখলে, চিনতে পারলে না।
দাদা হাসতে গিয়েও, হাসতে পারল না।
কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সবাই দেখেছে। অনেক সামনা সামনি। বলতে পারিস তোর সেই মুখ এখনকার মুখ হয়তো বদলেছে।
দেখছিস মিত্রা দেখছিস মিনষের চাউনি দেখ, যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে।
সুরো বললো চলে আসবে। সুরোকে যখন ও কথা দিয়েছে, নির্ঘাৎ চলে আসবে।
না এসে যাবে কোথায় শুনি।
বড়মার গলার স্বর সপ্তমে চড়েগেল।
ঠিক আছে ঠিক আছে তুমি বসো।
ইসলামভাই ঘরে ঢুকলো।
অনিমেষদা সঙ্গে সঙ্গে বললো, আবিদকে ফোন করেছো।
আসছে।
আসুক আজ। সবকটাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবো।
তুই একটা ফোন করতে পারিস নি।
চিকনার দিকে তাকাল।
চিকনা হাসছে।
লজ্জাকরে না তোর।
কালতো অতোক্ষণ কথা বললে।
ওতো বোবা ছিল, গলার স্বর শুনতে পেয়েছি।
ঘরেও গেছিলে।
পায়ের কাছে বসে বসে কথা বলেছো। একবার মৌনীবাবার বুকটায় হাত দিয়ে দেখতে পারতে। বুকটা কেমন ধক ধক করছিল।
তোকে বলেছে বুঝি।
না বললে বলছি কি করে। আমি কি তখন ওখানে ছিলাম।
ইসলামভাই মুখে ওর্ণা চাপা দিয়েছে।
দাদা, বৌদি কোথায় ?
সুরোর ওখানে নামিয়ে এসেছি।
আপনি গেছিলেন।
গেছিলাম। ফোনে সব জায়গায় খবর পাঠিয়েছি। ওরা কিছু খবর পেলে জানাবে বলেছে।
ফলো আপ করা যাবে।
চেষ্টা করছি।
তোর মেয়েরা উঠলো। সকাল সকাল এতো লোকজন দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেছিল। চিকনাকে পেয়ে তারা খুব খুশী। হাজার প্রশ্ন। চিকনাকে দেখিয়ে দিলাম।
যা চিকনাদা উত্তর দেবে।
একে একে সবাই এসে হাজির। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। একমাত্র দামিনীমাসি কাঁদছে। আর সকলের মন খারাপ। তবে সেই রাতের মতো নয়।
বড়মার কথায় দামিনীমাসি মৌনীবাবাকে ফল কিনে এনে দিয়েছিল।
অনিমেষদার ফোনটা বেজে উঠলো।
হ্যাঁ বলুন।….ট্রেস পাওয়া গেছে….এখন কোথায়….ম্যাড্রাস! শুনলাম যে বোম্বাই-এর বিমান ধরেছে।….ইন্টেলিজেন্সব্যুরো!….ফোনে বলা যাবে না। ঠিক আছে আপনি একবার বেলার দিকে একটু আসুন।
কি বলছে।
বিধানদা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
পরে বলছি।
অনিমেষ খারাপ কিছু।
বড়মা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো।
না।
তাহলে।
ওর সঙ্গে যারা ছিলো তার সবাই ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর লোকজন, একটা কাজে কলকাতা এসেছিল। দুজন খালি অনির লোক ছিল।
চিকনা হাসছে।
তুমি হাসছো কেন।
ওরা হচ্ছে আমাদের গ্রামের রবি আর নগনা।
তুমি ওদের চেন।
আমার গ্রামের ছেলে চিনবো না। অনি ওদের সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।
কবে ?
সেই যখন প্রথমবার কলকাতায় এলো।
তখন ওরা খুব ছোট।
আমি ওদের চিনি।
চিনবে না। সেই যাদের ও গাছ থেক পিয়ারা পেরে খাইয়েছিল। ওরা আঁখ নিয়ে এসে ওকে দিয়েছিল। সেই বাচ্চা।
কতোদিন হয়েছে।
তা বছর এগারো হবে। ওরা এখন ওখানে চাকরি করে।
ওদের বয়স কতো।
বছর পঁচিশ ছাব্বিশ। ওরা কলকাতায় যাতায়াত করে। খবরা খবর নেয়।
কই এতো দিন বলনি।
বারন ছিলো। এখন ও সবাইকে বলতে বলেছে।
আজ কি বললো।
ভাল মন্দ খবরা খবর নিল। বললো খুব শিগগির চলে আসবে।
কবে আসবে বলেছে।
তা কিছু বলে নি।
আবিদ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বড়মা চেঁচিয়ে উঠলো, বেরো এখান থেকে, সব আপদ এসে এখানে জুটেছে।
আবিদ এসে বড়মার পায়ে পরেগেল।
পরের বার এলে তোমাকে আর ম্যাডামকে নিয়ে যেতে বলেছে।
এই যে বলতিস তোদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ নেই।
তুমি অনিদাকে আমার থেকে ভাল করে চেন। কি করবো বলো।
অনিমষদা হাসছে। চায়ে চুমুক দিচ্ছে।
সব দোষ খালি আমার।
তা কার শুনি।
তোমাকে কতো লোকের কথা বলবো বলো।
অনিমেষদা চায়েরকাপটা সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রাখল।
আবিদকে নিয়ে দাদার ঘরে চলে গেল। কি কথা বললো ওরা জানে। প্রায় আধঘন্টা।
আজ আর অফিসে যাওয়া হলো না।
কানাঘুষো অফিসের সবাই জেনেছে।
দুপুরের দিকে সুরোর কাছে গেলাম।
আমাকে জড়িয়ে ধরে একচোট কাঁদল।
জানো বৌদি রাত তখন দেড়টা বাজে। সবে মাত্র একটু তন্দ্রা এসেছে। আয়াটা ঠেলা মারল।
ভাবলাম ছেলেকে দুধ খাওয়াতে হবে।
হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিল।
তোর সঙ্গে দেখা করবো। ঘুমিয়ে পরেছিস নাকি ? অনিদা।
কি বলবো তোমায় বৌদি, বিছানা থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল।
পাশের ঘরে তখন ফুস ফুস গুজ গুজ চলছে।
আয়াকে বললাম কোথায় ?
আপনি বললে উনি আসবেন।
এখুনি ডেকে আনো।
দেখি মৌনীবাবা এসে হাজির।
বিকেলের দেখার সঙ্গে অনেক পার্থক্য।
তখন কেমন বুড়োটে বুড়োটে দেখতে লাগছিল। কপালে নাকের ওপর একগাদা তিলক মাটি লাগান ছিল। তখন সব পরিষ্কার।
তুমি বিশ্বাস করবে না বৌদি দাড়িটা কেটে দিলে সেই মুখ, সেই চোখ।….
কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।
কিরে দাদাকে চিনতে পারলি না।
গলার স্বর শুনে জড়িয়ে ধরলাম। সেই গলা। একটুও বদলায় নি বৌদি।
বাচ্চাটাকে কোলে নিল। গলায় একটা হার পরিয়ে দিয়ে গেছে। এই দেখ। আবার একমুখী রুদ্রাক্ষ আছে।
আমি বললাম ছেলেকে নিয়ে তোমার একটা ছবি তুলি। বাধা দিল।
বিয়ের দিনের কথা বললো।
আধঘন্টা ছিল।
আমি ছেলের মাথায় হাত দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছি।
বললো এটা তুই অন্যায় কাজ করলি সুরো। আমি যদি ফিরতে না পারি।
ফিরতে তোমাকে হবেই। না হলে আমি সবাইকে এখুনি চেঁচিয়ে ডাকব।
কি হবে, তোর অনিদার এতদিনের সাধনা তুই নষ্ট করবি। তুই চাস তোর অনিদার এত দিনের সাধনা তীরে এসে তরী ডুবে যাক।
কবে আসবে বলো।
খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো, আর ভাললাগছে না।
অনিদাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
বললো, একটা কাজে কলকাতা এসেছিলাম। তুই যে এই নার্সিংহোমে ভর্তি হবি জানতাম না।
তোর বাচ্চা হবে জানতাম। মনে মনে ইচ্ছেছিল তোর বাচ্চাটাকে দেখার।
ঈশ্বর ইচ্ছেটা পূরণ করে দিল।
কাজ শেষ হয়ে গেছে। আমি সকালের ফ্লাইটে ফিরে যাব। চিকনাকে আসতে বলেছি। ওকে অনেকদিন চোখের দেখা দেখিনি।
তুমি এখানে ভর্তি হয়েছিলে কেন।
অভিনয় করতে এসেছিলাম।
এখন কি করে যাবে।
আবিদকে আসতে বলেছি।
তোমার ফোন নম্বরটা দাও।
আমার ফোন নেই।
তুমি যে কথা বলো।
এদের ফোন থেকেই বলি।
তোর দাদার একটা রিকোয়েস্ট রাখবি ?
বলো।
আমি চলে যাবার পর এক ঘন্টার মধ্যে কাউকে ফোন করবি না।
কেঁদে ফেলেছিলাম।
দাদার কথা রেখেছি বৌদি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
বললাম তোমার তো দাড়ি ছিলো না।
বললো অনেক কষ্টে বানিয়েছি। সে অনেক গল্প তোকে ফিরে এসে বলবো।
প্রত্যেক বছর দেয়ালে ফোঁটা দিচ্ছিস।
আমি এই কথার উত্তর দিতে পারি নি বৌদি।
সুরো কিছুক্ষণ কাঁদল।
সবাই শুনলো কেউ কোন কথার জবাব দিতে পারল না।
জীবনে দ্বিতীয়বার ঠকলাম।
তোকে কথা দিলাম থার্ড টাইম তুই আর ঠকাতে পারবি না।
হাসিস না। তুই জানিস তোর মিত্রার মাথায় বুদ্ধি কম। তাই মিত্রার জীবনের ওপর দিয়ে এতো ঝড় বয়ে গেলেও সে বুবুনকে ছাড়ে নি। লতাপাতার মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
বুবুন যে তার একান্ত আপনার।
কতজন তোর মিত্রার কাছ থেকে বুবুনকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছে। পারে নি।
বিশ্বাস কর বুবুন আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। আমি জানি তুই নিজের জন্য বাইরে বাইরে পরে থাকছিস না। তুই আমার জন্য বছরের পর বছর বাইরে পরে আছিস।
তোর ছেলেটা আমার মত। মেয়েটা তোর মতো। কিছুতেই আটকাতে পারছি না। মাথায় যেটা ঢোকাবে তার শেষ না দেখে ছাড়বে না।
কতো উদাহরণ তোকে দিই বলতো।
অনিসার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যাথা হয়ে গেলো। এতোক্ষণ কারুর সঙ্গে দেখা করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নি।
ওঃ লোকাল ট্রেনের যাত্রীগুলোও সে রকম যেন ওকে চেটে পুটে খাচ্ছে।
একটা মেয়ে কি কখনো একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না ?
একা দাঁড়িয়ে আছে বলে ওরকম হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকতে হবে।
দু’একজন তো আওয়াজই দিয়ে দিল।
কিগো একা কেন। যাবে নাকি।
কানের লতিটা গরম হয়ে গেছিল।
মনে মনে চ্যাটের ভদ্রলোককে গালাগাল দিল।
তবু অনিসা মনে মনে হেসেছে।
ছেলেগুলো কি নির্বোধ। এখুনি গিয়ে ও যদি কানটা ধরে ওর পরিচয় দেয়, হয়তো প্যান্টটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
দূর ছাই, লোকটা যে কি।
হ্যান্ড ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করলো। ডায়াল করলো।
কিরে, তুই কলেজে এলিনা কেন।
গেছিলাম, চলে এসেছি।
তুই কোথায় বলতো এতো চেঁচামিচির শব্দ।
শিয়ালদা স্টেশন।
ওখানে কি করছিস।
দাঁড়িয়ে আছি। একজনের সঙ্গে দেখা করবো।
আমাকে বললি না।
তুই প্র্যাক্টিক্যাল কর।
কোথায় আছিস বল, আমি এখুনি যাচ্ছি।
আসতে হবে না।
প্রেমানন্দের খোঁজ পেয়েছিস।
এখনো পাই নি।
কালরাতে চ্যাটে আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো।
কটার সময়।
সাড়ে বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত।
আমার সঙ্গেও ওই সময় কথা হয়েছে। তবে আমি আরও এক ঘন্টা বেশি কথা বলেছি।
তোর কি মনে হচ্ছে।
মনে তো হচ্ছে ইনিই মিঃ অনি ব্যানার্জী।
কি করে বুঝলি।
এতো সব পটাপট বলে দিচ্ছে। শোন তোর সঙ্গে পরে কথা বলছি।
আপনি অনিসা।
একজন ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়ালেন।
ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী। কাপরটা লুঙ্গির মতো করে পড়া।
মিস কালো চুল একেবারে ছোট ছোট করে ছাঁটা। দেখলে মনে হয় সদ্য কেউ মরাগেছেন। নেড়া হওয়ার পর চুল উঠেছে।
আসুন।
অনিসা চারদিক ভাল করে লক্ষ করলো। সেভাবে কাউকে বুঝতে পারছে না। আবিদ আঙ্কেলকে ব্যাপারটা জানালে ভাল করতো। একটু বেশি রিক্স নিয়ে ফেলেছে।
রিক্স কেন ?
মা যে বলে তোর বাবা তোদের জন্য পাহাড়াদার ঠিক করে রেখেছে।
তাহলে কি এখানে বাবার লোকজন কেউ নেই ?
মায়ের কথা ঠিক হলে নিশ্চই থাকবে।
কাউকে চিনতে পারছে না।
ভদ্রলোক অনিসার পাশে পাশে মাথা নীচু করে হাঁটছেন। অনিসার সঙ্গে কোন কথা বলছে না।
ও নিজে নিজেই যেচে কথা বললো।
আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি।
বলতে পারব না। আমার ওপর দায়িত্ব আছে আপনাকে পৌঁছে দেওয়া।
তারমানে আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানে যেতে হবে ?
ওটা আপনার ইচ্ছে।
ভদ্রলোক খুব নরম সুরে বললেন।
অনিসা থমকে দাঁড়াল। যতই হোক একটা মেয়ে। দেখতে শুনতেও ও নেহাত খারাপ নয়। চ্যাটে কথা বলে ও গেইজ করেছে।
ব্যাপারটা কি খুব রিক্স হয়ে যাচ্ছে না।
ভদ্রলোক অনিসার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি তাহলে ফিরে যাই।
অনিসা ভদ্রলোকের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল।
বোঝার চেষ্টা করলো কোন দূরোভিসন্ধি আছে কিনা। মুখ দেখে ও কিছু বুঝতে পারল না।
সৌম্য শান্ত মুখশ্রী।
চিকনাদা বলেছিল, সাপুরে যখন সাপ খেলায় লক্ষ করেছিস।
সাপ খেলায় কখনো দেখি নি।
কখনো দেখলে ভালো করে লক্ষ করে দেখবি, সাপুরে সাপের চোখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে বাঁশি বাজায়। সাপ চোখ দিয়ে শোনে কান দিয়ে দেখে।
ধ্যাত সাপের কান আছে নাকি।
খোঁজার চেষ্টা করিস পেয়ে যাবি।
বলেছিল, যে কোনো মানুষ তার সব কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে কিন্তু চোখের অভিব্যক্তি সে কোনদিন লুকিয়ে রাখতে পারে না।
যার সঙ্গেই কথা বলবি চোখে চোখ রাখবি। জিতে যাবি। চোখ হচ্ছে মনের আয়না।
এটা আমার কথা নয়, তোর বাবার কথা। তাই তোর বাবাকে গুরু বলি।
বুঝলি বুঁচকি সব প্র্যাক্টিস। তুই যতো চর্চা করবি তত জানতে পারবি।
এই যে আমি, একসময় ছাগল ছিলাম। শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করতাম।
এখন চিকনাদাকে যা দেখছিস সব তোর বাবার দাওয়াই।
তোর চিকনাদা তোর বাবা ছাড়া অন্ধ।
অনিসা চিকনাদার কথা বহুবার ফলো আপ করেছে, হাতে হাতে ফল পেয়েছে।
সে কথা চিকনাদাকে ও জানিয়েছে।
কিন্তু এই কথাটা চিকনাদাকে জানান উচিত ছিল।
অন্ততঃ পক্ষে একবার ফোন করা উচিত ছিল।

কতোক্ষণ লাগবে যেতে।
বেশিক্ষণ না। মিনিট তিনেক।
অনিসা হাঁটতে শুরু করলো। শিয়ালদহ ফ্লাইওভারটার তলায় তখন গিজ গিজ করছে লোক। উঃ লোকগুলোর গায়ে কি বোঁটকা গন্ধ।
অনিসার চোখে মুখে একটা অস্বস্তি।
কলকাতা শহরে এরকম একটা নোংরা ভ্যাট ওপেন এয়ারে থাকতে পারে ওর জানা ছিল না।
হৈ হৈ শব্দে চমকে উঠলো।
এখুনি ও মাল বোঝাই ট্রলিটার সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল।
লোকটা বাঁদিকে একটা গলির মধ্যে ঢুকলো। অনিসার বমি পেয়ে যাচ্ছে। ইস কি পচা মাছের গন্ধ। এখানে মানুষ থাকতে পারে ?
অনিসা চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। সম্পূর্ণ এক নতুন জগৎ।
এই এঁদো গলির মধ্যে লোকটা কোথায় নিয়ে চলেছে!
একা ছেড়ে দিলে ও চিনে বেরতে পারবে তো ?
বেরতে ওকে হবেই। ও এই পথের শেষ দেখে ছাড়বে।
একবার যখন নেমে পরেছে, শেষটা ওকে দেখতেই হবে।
গলি তস্য গলি। নোংরার বেহদ্দ জায়গা। পায়ের স্লিপারে কাদা লেগে চটচটে হয়ে গেছে। গা ঘিন ঘিন করছে। গলির শেষপ্রান্তে একটা অন্ধকার মতো চায়ের দোকানে এসে লোকটা দাঁড়াল।
এই দিনের আলোতেও জায়গাটা কেমন অন্ধকার অন্ধকার।
এই জায়গাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। একেবারে বাজরটার শেষপ্রান্ত।
চারিদিকে কাঁচা আনাজের বর্জ্য ডাঁই করে পরে আছে। দুর্গন্ধ ম ম করছে।
অনিসা নাকে রুমাল চাপা দিল।
ভদ্রলোক ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
আপনি ভেতরে গিয়ে বসুন।
অনিসা একবার ভেতরের দিকে তাকাল। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ঝিমচ্ছে।
আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।
ভদ্রলোক দ্বিতায়বার কোন কথা বললো না।
সামনে খানিকটা গিয়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকে পরলেন।
অনিসা চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝে দুরু দুরু করে উঠছে।
কলকাতায় আছে কিন্তু এইরকম একটা জায়গা!
অনিসার কাছে কলকাতাটাই কেমন অচেনা অচেনা ঠেকছে।
কনিষ্ক মামা বলেছিল বাবা ভাসিলা ভেরিতে যেত। ওখানে টনা মনা বলে কারা যেন আছে। মায়ের লেখায় টনা মনার নাম পেয়েছে। বাবার সঙ্গে সুরো পিসির বিয়েতে পাগল সেজে ছিল।
বাবা নাকি এখানে পরাতে আসতো ?
হঠাৎ সামনের দিকে চোখ পরতেই একটা লোক যেন আড়ালে চলে গেলো।
মুখটা চেনা চেনা মনে হলো যেন!
কোথায় দেখেছে। ঠিক খেয়াল করতে পারল না অনিসা।
ভাববার চেষ্টা করলো।
হ্যাঁ মনে পরেছে যখন স্টেসনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই সময় সামনের কাগজের স্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাগজ পরছিল লোকটা আর টেরিয়ে টেরিয়ে ওকে দেখছিল।
নিমেষের মধ্যে লোকটা কোথায় উধাও হয়ে গেল ?
ফোনটা বেজে উঠলো।
শুভ।
লাইনটা কেটে দিয়ে স্যুইচ অফ করে দিল।
তারমানে ওর পেছনেও লোক লাগান আছে।
এরা কারা আবিদ আঙ্কেলের লোক না বাবার ?
মায়ের লেখায় ও বাবার গতিবিধি পরেছে। এখন একটু একটু ও ধরতে পারছে। একটা নিপাট গ্রামের ছেলের সঙ্গে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের এতোটা রিলেসন কিসের ? বাবা অশিক্ষিত নয়। অনেকের থেকেই বরং বেশি শিক্ষিত।
তাহলে!
একদিন খুঁজে খুঁজে সুনীত আঙ্কেলের বাড়িতে গেছিল। দেখেছিল ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া। পাশের ফ্ল্যাটে বেল বাজিয়ে ভদ্রলোককে সুনীত আঙ্কেলের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিল। ভদ্রলোক কেমন যেন বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকিয়েছিল।
ডঃ ব্যানার্জীর কথা কেউ খুলে বলতে চাইছে না।
অরিত্র মামা একদিন মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল।
অনিদাটা না থকলে মালকিন এতদিনে স্বর্গধামে বিচরণ করতেন।
মাকে কিছু বলে নি তবে মার সঙ্গে ডঃ ব্যানার্জীর একটা রিলেসন ছিল। এটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু কি সেই রিলেসন।
প্রেমানন্দ বলেছে সে সব জানে।
রাজনাথ, টোডি সব কেমন যেন জট পেকে আছে।
অনিসা কিছুতেই বুঝতে পারছে না বাবার কাছে এরা কেন হার্মফুল।
বাবার সম্বন্ধে মায়ের কোন তাপ উত্তাপ নেই। নিজের মনের কথা লিখে রেখেছে।
বাবা নাকি সবার মধ্যে একটা সেতু রচনা করেছে কিসের সেই সেতু।
ইসি মনিকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিল।
ইসি মনি হাসতে হাসতে বলেছিল। বুঝলি আনিসা আমার কাছে সব কিছু ধোঁয়াসা লাগে।
অনিসা বুঝেছে ইসি মনি ওকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।
বরুণমশাইকে বলেছিল তুমি কিছু জানো।
জানলেও তোকে বলা যাবে না। তোর বয়স হয় নি।
আর কবে বয়স হবে।
একটু একটু অন্ধকার হয়ে আসছে জায়গাটা। এমনিতেই অন্ধকার জায়গাটা।
অনিসার কেমন গা ছম ছম করতে লাগল।
যে দু’একটা লোক আশে পাশে দাঁড়িয়েছিল তারাও এখন নেই।
না এখন মনে হচ্ছে কাজটা ও ভুল করে ফেলেছে।
ও ফিরে যাবে।
হটাৎ কাঁধে কে যেন স্পর্শ করলো।
পেছন ফিরে তাকাল।
তিনটে লোক।
সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে। সে কুচকুচে কালো। মুখটা ভীষণ হিংস্র। দেখলে ভয় লাগে। লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে কি বিশ্রী ভাবে হাসছে।
বাঘ যেমন শিকার পেলে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঠিক তেমনি। ঠোঁটের গোড়া থেকে কানের ডগ পর্যন্ত কাটা। লম্বা কাটা দাগটা ওর মুখটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
একটা চোখ কেমন যেন স্থির। নড়াচড়া করছে না।
অনিসার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠলো।
অনিসা লোকটার চোখে চোখ রাখলো।
আর দুজন ওর সারাটা শরীরে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
অনিসা প্রথমে কোন কথা বলতে পারল না।
বুকের ভেতরের লাব-ডুব শব্দটা যেন হঠাৎ প্রবল মাত্রায় বেড়ে গেল। তার শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
খাসা মাল মাইরি। একেবারে ডবকা।
কি নিষ্ঠুর হাসি ওদের চোখে মুখে।
লোকটা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বললো।
চেঁচাতে গিয়েও অনিসা চেঁচাতে পারল না। গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরলো না।
বুকের সাইজগুলো দেখেছিস। একেবারে হিমসাগর আমের মতো।
ছেলেটা হাত বাড়াল।
অনিসা নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারল না। দিক বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে সজোরে থাপ্পর কষাল ছেলেটার গালে। তারপর হাতের ব্যাগটা দিয়ে মাথায় আঘাত করল। এলোপাথাড়ি হাত পা ছুঁড়তে লাগল।
অনিসা তখন আর নিজের মধ্যে নেই।
কতোক্ষণ এরকম হাত পা ছুঁড়েছে খেয়াল নেই।
সম্বিত ফিরতে দেখল ছেলেটা ঠায় দাঁড়িয়ে ওর মার খেয়ে যাচ্ছে।
আর দুটো ছেলে ওর ঠিক পেছনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
অনিসা হাঁপিয়ে পরেছে। গলা দিয়ে তখনো স্পষ্ট করে আওয়াজ বেরচ্ছে না।
কাঁদতেও পারছে না।
সামান্য গোঁ গোঁয়ানি।
হাপরের মতো বুকটা তখনো ওঠা নামা করছে।
অনিসা পেছন দিকে ফিরে পালাবার চেষ্টা করলো।
ছেলে দুটো পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
অনিসা হাত তুললো।
ছেলেদুটোর কোন মুভমেন্ট নেই। স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অনিসা কেমন যেন হয়ে গেল।
ভীষণ কান্না পাচ্ছে। নিজের ইমোসানকে নিজেই দোষ দিতে চাইল। এ কি করলো ও।
আচ্ছা এতো মার খেয়েও ওরা তিনজন কেন প্রতিরোধ করলো না ?
ওদের তিনজনের শক্তির কাছে ও তো ফুতকারে উড়ে যেতে পারতো।
এখানে কোথাও তুলে নিয়ে গিয়ে…..।
অনিসা আর ভাবতে পারছে না।
কই তা তো ওরা করলো না!
মুখ বুঁজে লোকটা সমানে ওর চড় লাথি ঘুসি খেয়ে গেল।
সত্যি তো!
বোন। এতো দূর এসে তুই খালি হাতে ফিরে যাবি।
অনিসার সারাটা শরীর কেমন জ্বালা জ্বালা করছে।
বোন কথাটা শোনার পর ওর ভেতরটা কেঁপে কেঁপে উঠলো।
চমকে ফিরে তাকাল।
কালো বিশ্রীমার্কা চেহারার ছেলেটা ওর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে।
ঠোঁটের কোল বেয়ে রক্ত বেরচ্ছে।
মুখটা কেমন হাসি হাসি।
অনেক মেরেছিস, আর মারিস না। মাথায় ভীষণ লেগেছে।
অনিসা নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
অনিসা চোখে চোখ রাখল।
লোকটা মাথা নীচু করলো।
আর তোকে কোনদিন অপমান করবো না। এই প্রথম এই শেষ।
অনিসা কিছুতেই নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনা।
তাহলে কি ও স্বপ্ন দেখছিল ?
সারাটা শরীর কেমন আলগা হয়ে আসছে।
প্রচন্ড উত্তজনার পর উত্তেজনটা যখন হঠাৎ করে থিতু হয়ে যায়, তখন শরীরের অবস্থাটা যেমন হয় এখন ঠিক তেমনি লাগছে।
দু’একজন লোক ডাস্টবিনের ওপাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেগেল।
চল।
অনিসা তবু লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
আজ বিশ্বাস হচ্ছে তুই অনি আঙ্কেলের মেয়ে।
অনিসা মাথা নীচু করলো।
তোর দ্বারা হবে। তুই পারবি।
বুকের ভেতরটা কেমন ব্যাথা ব্যাথা করছে।
আয়।
ছেলেটা সামনের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলো।
অনিসা সম্মোহনের মতো ধীর পায়ে ওদের পেছন পেছন চলতে শুরু করলো।
সেই গলি। যে গলিতে ওই ভদ্রলোক অদৃশ্য হয়েগেছিল।
বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গলিটা একজায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পরেছে।
এদিকে ওদিকে কোন রাস্তা নেই। ব্লাইন্ড গলি।
লোকটা বাঁদিকের দরজায় ঠেলা মারলো।
একটা ক্যাঁচ করে শব্দ হলো।
ভেতরে এলো।
পুরনো আমলের বাড়ি। বিরাট একটা উঠোন। অনেকটা হস্টেলের মতো।
তিনতলা। চারিদিক অপরিষ্কার। অনেকদিন কোন সংস্কার হয় নি।
অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো।
অনিসা মনে মনে ভাবলো সিঁড়ির যা অবস্থা যে কেন দিন ভেঙে পরতে পারে। তাছাড়া দিনের বেলাতেও মনে হয় সিঁড়িতে লাইট জালতে হয়।
ভিকিদা আমরা এবার যাই।
বস কি বলে শুনে নে।
তারমানে ভদ্রলোকের নাম ভিকি। এটা কি আসল নাম না নকল।
সবাই দোতলার বাঁদিকে বাঁক নিয়ে প্রথম ঘরটার সামনে দাঁড়াল।
আয় ভেতরে আয়। কোন ভয় নেই।
অনিসা তাকিয়ে আছে।
মানুষ নেশা করলে যেমন হয় অনেকটা সেই রকম।
ঘরের ভেতরে এলো।
বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ভেতরে এরকম একটা ঘর থাকতে পারে।
ঘরের প্রতিটা কোনে একটা রুচির ছাপ। এসিরুম।
আপনি বসুন।
একটা ছেলে সোফাটা দেখিয়ে দিল।
এখনো বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে।
ভিকি বলে ছেলেটা ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
বুকের ভেতরটা এখনো চিন চিন করছে।
অনিসা মুখে হাত চাপা দিয়ে মাথা নীচু করে বসলো।
ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কাঁদতে পারছে না।
কিরে খুব মারপিট করেছিস শুনলাম।
পরিচিত কণ্ঠ চমকে তাকাল অনিসা।
রতন আঙ্কেল!
অনিসা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না, ছুটে এসে রতনকে জড়িয়ে ধরলো। রতনের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
রতন অনিসার পিঠে হাত রেখেছে।
এইটুকুতেই যদি কেঁদে ফেলিস তাহলে লক্ষ্য পূরণ হবে কি করে। তোকে আরও অনেক হার্ডেল পেরতে হবে।
অনিসার কিছুতেই কান্না থামছে না।
ভিকি ওর জন্য কিছু খাবার নিয়ে আয়।
দাঁড়াও আগে মাথায় ডেটল দিই।
কেন ?
যা জোরে ব্যাগটা দিয়ে মারল। মাথাটা ফেটেছে মনে হয়।
অনিসা রতনের বুক থেকে মুখ তুললো।
হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না।
কি আছে তোর ব্যাগে ওর মাথা ফাটালি।
মোবাইল আর ছাতা আছে। বাজে কথা বললো কেন।
আমি বলতে বলেছি। না হলে তোর মোন বুঝবো কি করে।
অনিসা রতনের বুকে মাথা রাখল।
যা বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে নে।
বাবা কোথায় বলো।
বাবা বাবার জায়গায় আছে।
তুমি সব সময় বলে এসেছো বাবার সঙ্গে তোমার কোন যোগাযোগ নেই।
এখনো তোকে সেই কথা বলবো।
তাহলে আমাকে যে আসতে বলেছে।
তোকে প্রেমানন্দ আসতে বলেছে। ও তোর বাবার খাস লোক। আমরাও তার কথা মতো চলি।
তাকে তুমি দেখ নি।
না। তোর বাবা ম্যাসেজ করে জানিয়েছিল।
বাবার ফোন নম্বরটা দাও।
আমার কাছে নেই।
তাহলে তোমাকে যে ম্যাসেজ করেছে বললে।
সেটা অন্য কারুর মোবাইল থেকে করেছে।
অনিসা রতনকে ছেড়ে দিল।
ভেতরে আয়।
অনিসা রতনের সঙ্গে ভেতরে ঘরে এলো।
একটা ছোটখাটো অফিস। ভীষণ সুন্দর সাজান গোছান।
ভিকি।
বলো।
একবার ফাদারকে বলে আসিস একটু পরে যাব।
আচ্ছা।
ফাদার!
অনিসা মনে মনে একবার চিন্তা করলো এখানে ফাদার আবার এলো কোথা থেকে ? অপেক্ষা করতে হবে তাড়াহুড়ো করলে চলবে না।
দেয়ালে বাবার একটা বড়ো ফটো। ও একটু অবাক হয়ে গেল।
বাবার ফটো এখানে কেন ?
তোর বাবা আমার কাছে গড তাই।
মালা পরাও নি কেন ?
অনিদা কারুর কাছে কোনদিন মালা পরে না।
ইসলামদাদাই এখানে কখনো এসেছে।
একবার। যেদিন এটা ওপেন হয়।
এটা কিসের অফিস।
তোর বাবা যে কাজ করতে দিয়েছে তার অফিস।
এক্সপোর্ট ইমপোর্ট।
হ্যাঁ।
আবিদ আঙ্কেল এখানে আসে।
না।
আবিদ আঙ্কেলও তোমার মতো কাজ করে।
হ্যাঁ।
আবিদ আঙ্কেলের কোন অফিস নেই।
আছে।
কোথায় ?
পার্ক সার্কাস।
তুমি ওই অফিসে যাও না।
মাঝে মাঝে যাই।
তোমাদের দুজনের বিজনেস আলাদা।
হ্যাঁ।
অনিসা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল রতনের দিকে।
মাথায় ঢুকছে না।
না।
মুখ চোখটা কেমন যেন লাগছে বাথরুমে গিয়ে জল দিয়ে আয়।
অনিসা উঠে গেল।
রতন মোবাইলটা বার করে রিং করলো। আবার কেটে দিলো।
ভিকি ঘরে ঢুকলো।
নিয়ে এসেছিস।
হ্যাঁ।
যা প্লেটে করে নিয়ে আয়। সবার জন্য নিয়ে এসেছিস ?
না।
তাহলে ও খাবে না।
কেন।
ও ঠিক অনিদার মতো।
মনগড়া কথা বলছো।
ঠিক আছে প্রমান করে নে।
ভিকি হাসল।
অনিসা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ভিকি ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে নিল।
রতন আঙ্কেল আমাকে যে স্টেশন থেকে নিয়ে এলেন তিনি কোথায়।
একটা কাজে পাঠিয়েছি।
উনি আমার সঙ্গে কথাই বললেন না।
উনি কম কথা বলেন।
উনি কি সন্ন্যাসী।
না।
তুমি সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ। আবার কোথায় যেন কিছু লুকচ্ছ।
তুই বুঝতে পারছিস।
একটু একটু।
ভিকি তোর জন্য খাবার এনেছে খেয়ে নে।
তোমাদের জন্য আনে নি।
আমরা তোর আসার আগে খেলাম।
তুমি জানতে না আমি আসব ?
জানতাম।
তাহলে খেলে কেন ?
ভেবেছিলাম তুই এতদূর পর্যন্ত আসবি না।
সবার জন্য আনতে পাঠাও।
ভিকি একবার রতনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তুই খেতে শুরু কর ও আনছে।
আগে আনুক তারপর।
রতনের মোবাইলটা বেজে উঠলো।
হ্যাঁ বলো।…আমার সামনে বসে আছে…ঠিক আছে।
প্রেমানন্দ এখন ব্যস্ত আছে তোর সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। রাতে তোর সঙ্গে চ্যাটে কথা বলবে।
বাবা কোথায়।
জানিনা।
আমি বিশ্বাস করি না।
আমার কিছু করার নেই। এর বেশি তোকে বলতে পারব না।
কেন।
সে অধিকার আমার নেই। আমার গন্ডী সীমাবদ্ধ তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
আবিদ আঙ্কেল ?
ওরও এক-ই অবস্থা। আমি কি কাজ করি ও জানে না। ও কি কাজ করে আমি জানি না।
জানা জানি হলে।
হয়তো এই পৃথিবীতে নাও থাকতে পারি।
কেন!
এটাই অনিদার শাস্তি।
বাবা কখনো এরকম করতেই পারে না।
চোখে দেখেছি তাই বলছি।
ভিকি ঘরে ঢুকলো।
ওদের দিয়েছিস।
হ্যাঁ।
যা তোরটা আমারটা প্লেটে করে নিয়ে আয়।
ভিকি বেরিয়ে গেল। আবার ফিরে এলো।
বোস।
অনিসার দিকে তকিয়ে।
নে খা।
আচ্ছা রতন আঙ্কেল।
বল।
বাবা কি মস্তান।
একেবারেই না।
তুমি যেভাবে বলছো তাতে বাবাকে মাস্তান বলে মনে হয়।
তোর বাবা বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দেয়। আর যারা বিশ্বাসের মর্যাদা দেয় তাদের নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে বাঁচায়। ভিকি তার প্রমাণ।
অনিসা ভিকির দিকে তাকাল।

ভিকির গালটা ওরকম ভাবে কাটা কেন ?
ও অনিদার কথা শোনে নি। নিজে বেশি বুঝেছিল। তাই চোখটা আর গালটা গেছে।
ভিকি মাথা নীচু করে নিল।
কবে হয়েছিল।
কয়েক বছর আগে।
বাবাতো এখানে ছিল না, বাঁচালো কি করে।
এখানে এসেছিল দিন পাঁচেকের জন্য। কয়েকদিন নার্সিংহোমে ভর্তি ছিল।
সুরো পিসির ছেলে হওয়ার সময়।
হ্যাঁ। তুই জানলি কি করে!
প্রেমানন্দ বলেছে।
মিথ্যে কথা বললি।
তুমি ও ভাবে তাকাবেনা।
সত্যি কথা বল।
তুমি সত্যি কথা বলছো যে আমি বলবো।
রতন হাসলো।
চুপ চাপ।
রতন আঙ্কেল।
রতন আনিসার দিকে তাকাল।
তুমি এই জগতে এলে কি করে।
সে অনেক কথা।
একটু বলো। ছোট করে।
শুনবি।
অনিসা মাথা দোলাল।
তুই চা খাবি না ঠান্ডা খাবি।
চা খাব। খুব খিদে লেগেছিল বুঝেছো।
আর একটা নিয়ে আসুক।
না পেট ভরে গেছে।
ভিকি উঠে গেল।
বলো।
কি বলতো।
তুমি এই জগতে এলে কেন।
কেউ ইচ্ছে করে আসে। পেটের তাগিদে চলে এলাম। তারপর তোর বাবার পাল্লায় পরে নিজেকে আস্তে আস্তে ওই জগত থেকে সরিয়ে নিলাম।
তোমার চায়ের দোকানটায় সেদিন গেছিলাম।
আমার চায়ের দোকান!
অবাক হচ্ছো।
তা একটু হচ্ছি।
মির্জা গালিব স্ট্রীটে।
রতন একবার ভাইঝির দিকে তাকাল। মেয়েটা মনে হচ্ছে এই কয়মাসে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। ওর পেছনে এবারে লোক লাগাতে হবে। এতোদিন ভাবছিলাম ওর সখ হয়েছে। এখন দেখছি এটা সখ নয়। অনিদার মতো ওরও একটা নিজস্ব ক্ষমতা আছে মনে হচ্ছে।
ধরা পরেগেছ।
কি বলতো।
মিথ্যে কথা বললে আমাকে।
ঠিক তা নয় আগে দোকানটা আমার ছিল। এখন আর নেই।
এখনো দোকানটা তোমার।
কে বললো তোকে।
খোঁজ নিয়েছি।
কি পেলি।
বলবো কেন তোমাকে।
রতন তাকিয়ে থাকলো অনিসার দিকে। হাসলো।
একেবারে অনিদার মতো চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একেবারে ভেতর পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে। প্রেমানন্দর সঙ্গে ওর আলাপ হলো কি করে ?
এই ব্যাপারটা ও জানতো না। ওকে জানতে হবে। কয়েকদিন আগে ওর কাছে ইনফর্মেসন আসে। সেই মতো ও কাজ করেছে। এমনও ইনস্ট্রাকসন দেওয়া আছে ও যদি কিছু জানতে চায় ওকে যেন বলা হয়। কিন্তু বুঝে শুনে।
বলো।
কি বলতো।
বাবার কাছে বিশ্বাস ঘতকদের একটাই শাস্তি মৃত্যু।
রতন হাসলো।
হাসলে কেন।
তুই খুব মনে রাখতে পারিস।
মনে রাখব না!
নে, চা খা।
বুঝেছি তুমি এটাও বলবে না।
বলছি। কটা বাজে বলতো।
ছটা দশ।
বাড়ি যাবি না। মা চিন্তা করবে।
করুক।
ওরা কেউ জানে না তুই এখানে।
সব জানাতে হয় নাকি।
মাথায় রাখবি তুই একটা মেয়ে।
তাতে কি হয়েছে।
কিছু একটা অঘটন ঘটলে।
তোমরা আছ শাস্তি দেবে।
শাস্তি দিলেই কি সব শেষ হয়ে যায়।
বলো না। তোমাকে এতোবাড় বলতে হয় কেনো বলোতো।
তুই চাইলি আর তোকে দিয়ে দিলাম, তাহলে তোর ইন্টারেস্ট থাকবে না।
ঠিক আছে যাও তোমাকে বলতে হবে না।
জানিস অনিসা সেদিনের কথাটা মনে পরলে আজও গাটা কেমন শিউরে ওঠে।
সেদিন অনিদা সবে দেশের বাড়ি থেকে ফিরেছে। সেই প্রথম ইসলামভাই অনিদার বাড়িতে গেছে। কলকাতায় ঢুকেই আমাকে ফোন করলো।
রতন।
হ্যাঁ।
একবার তুই ওমকে খুঁজে বার কর।
ওম কে।
পরে বলছি।
ঠিক আছে।
আমি বললাম, কেন আবার কি হলো।
যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব খুঁজে বার কর, না হলে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।
আবার কি হলো!
পরে বলছি।
তখন অনিদার একটা টাফ ফেজ চলছে। ঘরে বাইরে সব জায়গায়। আমরা বুঝতাম কিন্তু খোলসা করে কিছু জানতাম না। ইসলামভাই জানতো আবার জানতো না গোছের।
সঙ্গে সঙ্গে ওমকে ফোন করলাম। বললো তুমি পিলখানায় চলে এসো রতনদা। ইসলামভাই আমাকে ফোন করেছিল।
আমরা তখন কেউ ভালো লোক ছিলাম না। এখনো নই। তবে অনেক বুঝে শুনে কাজ করি। তোর বাবার কাছ থেকে এটুকু শিখেছি।
বলতে পারিস বুদ্ধি দিয়ে কাজ করি।
ওখানে এসে দেখি ওম একটা ছেলেকে নিয়ে বসে আছে।
আগে আমাদের সঙ্গে ছিল তারপর আমাদের অপনেন্ট দলে ভিড়ে যায়।
নাম কি।
ছট্টু।
তারপর আবার দাদার ফোন এলো।
বললো তুই ছট্টুকে নিয়ে থাক। আমি নেপলাকে পাঠালাম। অনি যাচ্ছে। অনিকে নেপলা পিকআপ করবে। অনি না খেয়ে বেরিয়ে গেছে। আর শোন কখনো অনিকে বলবি না আমি তোদের পাঠিয়েছি।
আচ্ছা।
হিসাব বুঝে গেলাম আবার একটা গন্ডগোল।
কেন তার আগেও গন্ডগোল হয়েছে।
তোকে বললাম না ওই ফেজটাই গন্ডগোলের ফেজ চলছে। সব টালমাটাল অবস্থা।
অনিদা এলো। নেপলা নিয়ে এলো।
কিছুই জানি না। দাদা যা বলেছে অন্ধের মতো কাজ করছি।
অনিদা যে ছট্টুকে চেনে অনিদা আসার আগে পর্যন্ত আমরা কেউ জানতাম না।
কথা প্রসঙ্গে জানলাম অনিদার কাছে ছট্টু পড়তো শেয়ালদার পথ শিশুদের স্কুলে।
অনিদা ওকে বহুবার পুলিসের হাত থেক বাঁচিয়েছে।
ছট্টু কথা প্রসঙ্গে সব স্বীকার করলো।
অনিদা ওর সঙ্গে ইয়ার্কি ফাজলামো মারলো। আমরা সবাই হাসাহাসি করলাম। তোর মার সঙ্গে অনিদার তখন দিন পাঁচেক হলো বিয়ে হয়েছে।
সেই নিয়েও হাসা হাসি হলো।
একথা সেকথা বলতে বলতে অনিদা আসল কথাটা মনে হয় জেনে ফেলল।
তারপর অনিদা কি কথা জিজ্ঞাসা করতে ছট্টু মনে হয় মিথ্যে কথা বললো (সেটা পরে বুঝতে পারলাম) দাম করে ছট্টুর বুকে একটা লাথি। মুখে একটা সজোরে ঘুসি আছড়ে পরলো।
অনিদাকে কোনদিন রাগতে দেখি নি। সেই অনিদা রেগে টং।
নেপলাকে চেঁচিয়ে বললো যা দড়ি আর লিউকো প্লাস নিয়ে আয়।
নেপলা পরি কি মরি করে জোগাড় করে নিয়ে এলো।
ওকে বাঁধা হলো। মুখে লিউকোপ্লাস আটকে দিলো নিজে হাতে।
তখন ছট্টু অনিদার পা জড়িয়ে ধরেছে। আমাকে বাঁচাও। আমি আর করবো না। আমি জানি তুমি আমাকে মেরে দেবে। আমি তোমাকে চিনি।
কে কার কথা শোনে।
অনিদার চোখ মুখ দেখে আমাদের বুক হিম হয়ে গেছে।
নেপলাকে বললো আমাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসবি চল।
আমার আর আবিদের দিকে তাকিয়ে বললো যতোক্ষণ না আমি ফিরবো এখানে বসে থাকবি না হলে আজই হজম করে দেব দুটোকে।
তখন আমাদের হাত পা কাঁপছে।
অনিদা চলে যেতে ইসলামভাইকে ফোন করে সব বললাম।
ইসলামভাই ছুটে এলো।
ছট্টুর পেট থেকে সব কথা টেনে বার করলো।
কি কথা।
তোকে জানতে হবে না।
বলো না।
তোর বাবাকে আর ইসলামভাইকে।…
বলতে পারিস তোদের পুরো পরিবারকে মারার ছক কষেছিল।
আঁ।
হ্যাঁ।
ওর মুখ থেকে এও জানলাম ছট্টু একবার গুলি খেয়ে রাস্তায় পরেছিল। তোর বাবা পুলিশের হাত থেকে ওকে বাঁচিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করিয়েছিল। কিন্তু খাতা কলমে ছট্টু হাসপাতালে ভর্তি হয়নি।
কনিষ্কদারা রাতে অপারেসন করে সেই গুলি বার করে।
যে কিনা এতো করেছে তাকে মারার ছক কষেছে ছট্টু।
কেন।
সে অনেক কথা।
তারপর বলো।
ঠিক এক ঘন্টার মাথায় নেপলা এসে খবর দিল তোমরা ফেটে যাও অনিদা ঢুকছে।
দূর থেকে দেখলাম প্রায় দশখানা গাড়ি ভর্তি স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক। হাতে সব এসএলআর।
ছট্টুকে তুলে নিয়ে গেল।
কোথায় নিয়ে গেল কি করবে কিছু বুঝলাম না। ছট্টুর মুখ থেকে যেটুকু শুনেছিলাম ঘুটিয়ারি সরিফে কারা আছে। তারা অনিদাকে মারার ছক কষেছে।
রাত দেড়টার সময় একটা ম্যাসেজ পেলাম আমি মরি নি।
পরে অর্কদার মুখে শুনেছিলাম ওখানে অনিদাকে মারার জন্য তৎকালীন একজন সাংসদ ইউপি থেকে সাত জনকে ভাড়া করে এনেছিল।
এমনকি অনিমেষদাকে পর্যন্ত মারার ছক কষেছিল।
ওই রাতে অনিদা তাদের এনকাউন্টার করাল। আমরা সবাই ভয়ে মরি। ছট্টুর মুখ থেকে ওইটুকু সময়ে যা শুনেছি। তাতে আমাদের হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে গেছে।
মিঃ মুখার্জী এই অবারেশনটা করেছিল। ছট্টুকেও অনিদা কুত্তার মতো মেরে দিয়েছিল।
সেই থেকে অনিদার কথার কোনদিন অবাধ্য হই নি।
আজও যা বলছে যেমন ভাবে চলতে বলছে। চলছি।
খাওয়া পরার কোনদিন অভাব হয় নি।
সমাজে এখন আমি প্রতিষ্ঠিত বিজনেস ম্যান। আর ব্যবসা করতে গেলে তোকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে একটু আধটু ভাব রাখতে হবে। না হলে টিঁকতে পারবি না।
বাবা ঠিক কাজ করেছে।
তুই বলছিস।
হ্যাঁ। আমি হলেও তাই করতাম।
কেন।
দুধ দিয়ে কাল সাপ পোষার থেকে না পোষা ভাল।
রতন হাসলো।
তুমি জানো মিঃ মুখার্জী কে ?
জানি, শুভর বাবা।
উনি মারা গেছেন।
মিঃ মুখার্জীকে যারা মেরেছে তারা আজ আর কেউ বেঁচে নেই।
এটাও বাবা করিয়েছে ?
আর কে করাবে, কে জানবে মিঃ মুখার্জীকে কারা মারল।
পরে শুনেছি সেদিনও অনিদা মিঃ মুখার্জীকে বারন করেছিল। আজ আপনি ওই জায়গায় যাবেন না। ভদ্রলোকের অত্যাধিক সাহস। একলা বেরিয়ে পরলেন। ভাগ্যিস বাচ্চাটাকে অনিদা তুলে নিয়ে এসেছিল।
বাবা শুভকে তুলে নিয়ে এসেছিল!
হ্যাঁ।
রতন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো।
তারপর ওর দাদু গিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসলো।
ইসলামদাদাই এসব জানে।
না।
আমাকে বললে।
তোর হজম শক্তি বেশি তাই।
অনিসা হাসলো।

(অসম্পূর্ণ- আর আপডেট হবেনা)

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s