কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান (part 02)


দিদানের ভাগ আমার।
ঠিক আছে মায়েরটা আমার।
কেন তুই দুটো নিবি।
আর বক বক করতে হবে না। এবার এসে বসে পরো।
বড়মা খেঁক করে উঠলো।
সবাই এসে বসে পরলো।
দাদা ওদিকের দুটো চেয়ার খালি রাখিস।
কেন।
ইসলামদাদাই, আবিদ আঙ্কেল আসবে।
কেনরে।
সব কেনর উত্তর হয় না।
বাবাঃ তুই আজ বেশ স্মার্টলি কথা বলছিস। মল্লিকদা বললো।

বয়স হোক বুঝতে পারবে।
ডাক্তারদাদা জোরে হেসে ফেললো।
হেসো না হেসো না বুড়ো, তোমরও সময় আসবে, মনে রেখো।
বান্ধবী ওকে একটু পাটালি দিও।
সত্যি নিয়ে এসেছো!
অনিশা ছুটে গিয়ে ডাক্তারদাদার গলা জড়িয়ে ধরলো।
সরি।
তাহলে এবার বল। এতো সব ড্রেস-ট্রেস লাগিয়ে কোথায় যাচ্ছিস।
প্রথমে একটু আবিদ আঙ্কেলকে নিয়ে বেরোব। তারপর অফিস।
অফিসে কি করতে যাবি ?
তোমাকে এখন বলবো না। সময় হোক তারপর বলবো।
এখনো সময় হয় নি।
শুরুই করলাম না।
কি শুরু করবি।
একটা কাজ স্টর্ট করছি বুঝলে দাদাই। বলতে পারো রিসার্চ ওয়ার্ক।
সাবজেক্ট ?
অনিশা ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললো।
একজনের ওপর।
পরিচিত না অপরিচিত।
নাম বলা যাবে না।
কেন!
বড়মা আমি মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।
আমি তোকে সাহায্য করতে পারি ?
অবশ্যই তোমাকে লাগবে। তবে ইনিসিয়ালি লাগবে না।
অনিশা প্রথমেই মায়ের পাত থেকে একটা আলুর দমের আলু তুলে নিল। অনন্য একবার কট কট করে তাকাল।
এদিকে তাকাবি না তুই দিদান। আমি দিদাই-মা অনেক খেয়ে এসেছিস ওখান থেকে।
মিত্রার মনে পরে যাচ্ছে বুবুনের কথা। ও ঠিক খেতে বসে এরকম করতো। তখন মিত্রা ছোটমার ভাগেরটা আর বুবুন বড়মার। মিত্রা মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
কিরে খাচ্ছিস না কেন।
মিত্রা বড়মার দিকে একবার তাকাল।
বড়মা বুঝতে পারলো। মুখে কিছু বললো না।
অনিশা কিছুই লক্ষ করলো না।
আচ্ছা দুদুন তোমাকে বাবা ভয় পেত।
দাদা অনিশার দিকে তাকাল।
কেন বলতো ?
এমনি জিজ্ঞাসা করছি।
ভয় পেতো না। তবে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতো।
ওই হলো, শ্রদ্ধার আর এক নাম ভয়।
তুই কি করে বুঝলি।
ডাক্তারদাদা অনিশার দিকে তাকাল।
যান দাদাই কয়েকদিন ঠেসে পড়াশুন করলাম। হাতের সামনে যা পেলাম তাই পরলাম।
কি কি পরলি।
গোটা দশেক উপন্যাস পরে ফেললাম। সব এ্যাডভেঞ্চার। তার মধ্যে দুটো জেমস বন্ড।
কোথায় পেলি।
কেন, নেটে।
তা হঠাৎ জেমস বন্ড।
তোমাদের মুখ থেকে বাবার কিছু ঘটনা শুনেছিলাম। তাতে মনে হলো বাবা জেমস বন্ডের মতো।
একটু থেমে।
বাবার মাথাটা ভীষণ কাজ করতো।
তোরও কাজ করতে শুরু করেছে।
অনিশা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
তুমি কি করে বুঝলে।
ওই যে বললি বয়স হোক।
তুমি বহুত চালাক পুরিয়া আছ।
ডাক্তারদাদা জোড়ে জোড়ে হাসছে।
হেসো না। হেসো না।
তোর বাবা এই সময় হলে কি করতো বলতো।
কি করতো ?
চুপ করে যেতো। আস্তে করে প্রসঙ্গটাই পাল্টে দিতো। ওই প্রসঙ্গটার মধ্যেই আর ঢুকতো না।
গুড এন্টিসিপেসন।
একটা জিনিষ শিখলি বল।
সিওর।
মিত্রা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
আজ তুই অফিসে গিয়ে তোর বাবার পাস্ট লাইফ নিয়ে ঘাঁটা ঘাঁটি করতে চাস।
মোটেই না। ওখানে ঢুকলে তল খুঁজে পাব না। তার থেকে বেশ আছি। ও সব মা বুঝবে।
তোর শেখাটা বেশ ভালো ইমপ্লিমেন্ট করলি।
অনিশা একবার ঠান্ডা চোখে ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
ডাক্তারদাদা বললো।
এ্যাম আই রাইট অর রং।
রং।
দিস ইজ ট্রু।
অফকোর্স।
সার্টেনলি নট।
প্রমাণ পেয়ে যাবে।
সবাই শ্রোতা। একমাত্র ডাক্তারদাদার সঙ্গে অনিসার ডুয়েট চলছে।
মিত্রা সব বুঝতে না পারলেও কিছু কিছু বুঝতে পারছে। ডাক্তারদাদা অনিশার মনের কথাটা ধরে ফেলেছে। মনে মনে বললো ওরে ডাক্তারদাদাই তোর বাবার চাল মাঝে মাঝে ধরে ফেলত, আর তুই কোন ছাড়। তোর নাক টিপলে এখনো দুধ বেরবে।
ইসলামভাই আবিদ এসে ঘরে ঢুকলো।
বড়মা বললো চেয়ার খালি আছে বসে পরো।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকালো।
চুবরি ঢাকা দেওয়া আছে তুলে বসে পরো।
সব একেবারে রেডি।
তোমার গুণমন্ত্র নাতনিকে জিজ্ঞাসা করো।
কেন ও সব রেডি করে রাখতে বলেছে।
হ্যাঁ ঘোড়ায় জিন দেওয়া আছে।
যাই বলো দিদি অনিশা আজ পাঞ্জাবীটা দারুণ লাগিয়েছে।
তোমার পছন্দ।
অনিসা ইসলামভাই-এর দিকে তাকাল।
পাঞ্জাবীটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
বাবার। মাকে বললাম, বাবার পাঞ্জাবীগুলো পরে পরে নষ্ট হচ্ছে, দাওতো একটা পড়ি।
তাই বল।
মিত্রা মেয়ের কথায় হাসছে।
তুই হাসছিস কেন মামনি। ইসলামভাই বললো।
ওকে জিজ্ঞাসা করো।
মা প্রথমে দিতে চায় নি। আমি জোর করে নিয়েছি তাই।
আমার জন্য একটা বার করে দেবে। অনন্য পাশ থেকে বলে উঠলো।
কেন তোর সখ হয়েছে।
অনিশা টিপ্পনি কাটলো।
তোর সখ হতে পারে, আমার হয় না।
ঠিক আছে, মা আমি যেগুলো বেছে রেখেছি সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য গুলো দেবে।
কেন।
যা না ঘুরতে যা।
অনন্য গুম করে একটা ঘুসি দিল বোনের পিঠে।
ছোটমা অনন্যর কান ধরলো।
বোন এখন বরো হয়ে গেছে।
অনন্য উঃ আঃ করে চেঁচিয়ে উঠলো।
যা আমি এখানে বসে খাবোই না। আমি দাদাই-এর পাশে গিয়ে বসবো।
অনিসা উঠে চলে গেল।
বোস। তিনজনেরটা আমার।
তুই তিন আমি পাঁচ।
মিত্রা দুজনের দিকে চেয়ে আছে। মনে মনে হাসছে।
আবিদ আঙ্কেল তাড়াতারি সাঁটাও, বেরতে হবে।
আমার কিন্তু আজ অনেক কাজ।
আমাকে দুটো পর্যন্ত সময় দেবে। তারপর তোমার ছুটি।
আমার কাজটা কি বল।
ইসলামভাই বললো।
ভেবেছিলাম তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে বসবো। আজ ওটা ক্যানসেল করলাম।
তাহলে আমার ছুটি।
হ্যাঁ। তবে ফোন করতে পারি। প্রোগ্রাম চেঞ্জ হতে পারে।
তুই যাবি কোথায় বল ?
দাদা জিজ্ঞাসা করলো।
একটু ঘুরতে বেরবো।
কোথায় ?
তোমাকে বলতে যাব কেন।
ইসলাম ও একজনের সম্বন্ধে রিসার্চ শুরু করছে। তোমাকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করবে।
অনিশা ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
দাদাই খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
অনিশা পাটালিটা হাতে নিয়ে মায়ের কাছে এলো। মায়ের মুখের কাছে এগিয়ে দিয়ে বললো।
কামড়াও।
মিত্রা একটু কামড় দিল।
কেমন টেস্ট বলো।
মিত্রা হাসছে।
মাকে ঘুস দিলি।
বড়মা বলে উঠলো।
ঘুস ঠিক না। শেয়ার করলাম।
পাটালিটা কেমন খেলি বল।
ডাক্তারদাদা বললো।
দারুণ।
তোর একটা থ্যাঙ্কস দেওয়া উচিত চিলো।
ডিউ স্লিপ দিলাম।
অনিশার কথার ভঙ্গিতে সবাই হেসে উঠলো।
অনিশা বেসিনের দিকে চলে গেল। হাত ধুয়ে ঘরের বাইরে চলে এলো। সোজা নিজের ঘরে। ল্যাপটপের ব্যাগটা নিয়ে তর তর করে নিচে নেমে এলো। মায়ের ঘরে ঢুকলো।
পায়ে পায়ে ববার ফটোটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
এক দৃষ্টে বাবার চোখের দিকে তাকাল।
কাল তোমার কিছু জিনিষ পরলাম। আজ চেষ্টা করবো শেষ করতে। তোমার সঙ্গে আমার অনেক বোঝা পড়া আছে।
দাঁতে দাঁত চিপে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো। আই মাস্ট উইন দ্যাট গেম। আই মাস্ট ডু ইট।
টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলো।
ঘুরে দাঁড়াতেই মায়ের মুখো মুখি হলো। মা এক দৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে।
কি বললি বাবাকে।
অনিসা মাথা নীচু করলো।
নীচু হয়ে মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
কি হয়েছে বল।
কিছু না।
প্রণাম করলি যে।
একটা শুভ কাজে যাচ্ছি, তাই।
বলা যাবে না।
এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত।
মাকেও বলা যাবে না।
সময় হোক বলবো। তুমি আমাকে বাধা দিও না।
আমার যে হারাবার ভয়।
আমি বাবার মতো ভীরু নয়।
মিত্রা মেয়ের মুখটা চেপে ধরলো।
অনিশা মায়ের মুখের দিকে তাকাল। মায়ের চোখদুটো ছল ছল করছে।
সারাজীবন কেঁদেছ। কিছু করতে পেরেছ।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। বুঝলো ওর হাতের বাইরে মেয়ে চলে যাচ্ছে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু উপায় নেই। দোষ ওর। ওর বাবার সম্বন্ধে অনেক কিছু ও গোপন করেছে।
তুমি কাঁদো, আমি আসি। তবে তোমায় একটা কথা দিলাম। কাজটা আমি করবোই। সময় নেবো ওনলি থ্রি মান্থস।
আবিদ আঙ্কেল আমরা প্রথমে যাব প্রিন্সেপঘাট।
ওখানে কি করতে যাবি।
গঙ্গার হাওয়া খেতে।
আবিদ একবার অনিশার দিকে তাকাল। ভাইঝির মতি গতি ঠিক ভাল ঠেকছে না। মনে হচ্ছে ও নিশ্চই একটা কিছুর গন্ধ পেয়েছে।
আবিদ বুঝতে পারল, এবার অনিশা ওকে ছাড়বে না।
আবিদও মনে মনে ঠিক করলো সড়াসরি ওকে ধরা দেবে না।
আবিদ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করছে। রাস্তা দিয়ে আসার সময় অনিসা একটা কথাও আবিদের সঙ্গে বললো না। শুধু ভিউংগ্লাস দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকেছে।
প্রিন্সেপঘাটে গাড়িটা দাঁড় করাতেই পরিচিত সব মুখগুলো দূর থেকে আবিদের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সবাই দেখছে। অনেকে আবিদকে দেখে কাছে আসতে চাইল আবিদ ইশারায় সকলকে না বলে দিল।
অনিশা গাড়ি থেকে নেমে এলো।
আবিদ ভাইঝির দিকে তাকাল আজ অনিদার পাঞ্জাবী আর জিনসের প্যান্টটা পরে ওকে দারুণ লাগছে। চোখে একটা সানগ্লাস লেগিয়েছে। হাইট অনেকটা অনিদার মতো। অতোটা না হলেও মেয়েদের জেনারেল হাইটের থেকে ও একটু লম্বা। ওর মাথার লম্বাচুল পিঠ ছড়িয়ে পরেছে। হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে চুলটা আটকান। ঠিক কালো নয়। একটু ব্রাউনিস।
কোথায় যাবি ?
অনিসা আবিদের সামনে এসে দাঁড়াল।
তুমি বলোতো আবিদ আঙ্কেল আমি হঠাৎ এখানে এলাম কেন।
কি করে জানবো, তুই বললি একটু ঘুরতে যাব গঙ্গার ধারে, তাই এলাম।
তার জন্য তোমাকে সঙ্গে নেব কেন। ভজুমামাকে নিয়ে চলে আসতে পারতাম।
আবিদ ভাইঝির মনের কথাটা বোঝার চেষ্টা করলো। পোড় খাওয়া আবিদ অনিসার চোখের ভাষা ঠিক ঠাহর করতে পারছে না।
তাকিয়ে আছো কেন, আমার কথার উত্তর দিলে না।
আমার মাথাটা তোর মতো পরিষ্কার নয়। আমি তোর মতো লেখাপড়া শিখি নি।
বাবা এখানে এসে কোথায় বসতো। তোমার সঙ্গে কোথায় বসে কথা বলতো।
আবিদ চমকে তাকাল ভাইঝির দিকে।
আমাকে সেই জায়গাটায় নিয়ে চলো।
আবিদ এবার মাথা নীচু করলো।
নিয়ে যাবে না ?
কি করবি ওখানে গিয়ে।
তোমার সঙ্গে বসে দু’ঘন্টা গল্প করবো।
এখানে না বসে অন্য কোথাও যাই চল।
কেন!
জায়গাটা ভাল নয়।
বাবা কেন এই খারাপ জায়গায় তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসত ?
তোর বাবা সাংবাদিক। সংবাদ সংগ্রহ করতে আসত।
আমিও নিউজ কালেক্ট করতে এসেছি।
আবারও আবিদ চমকে উঠলো।
চলো।
এবার আবিদ আর না করলো না। পায়ে পায়ে গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে এলো। পাঁচিলের ধারে সেই বেঞ্চটায় গিয়ে বসলো।
অনিসা বসলো না। চারদিকটা একবার ঘুরে ঘুরে দেখলো। নিজের মোবাইলে ছবি তুলে নিল। স্টিল ভিডিও।
বুঝলে আবিদ আঙ্কেল বাবার টেস্ট ছিল।
আবিদ চেয়ে চেয়ে ভাইঝির রকম সকম দেখছে। একেবারে ডিটো অনিদার চোখ। সব সময় যেন কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে।
আবিদ আঙ্কেল বাবা এখানে এসে বসলে তুমি বাবাকে বাদাম দিতে আসতে। তোমাকে দেখে কেউ বাদাম দিতে আসছে না কেন।
আমাকে কেউ চেনে না। তাই।
ইকবাল দাদাই-এর নৌক কোনটা।
আমি চিনি না।
ভাইদাদাই-এর বুজুম ফ্রেন্ড। ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর তুমি চেন না। তা হয় ? আমাকে লুকিয় না আমি সব জানি। বলতে পার জেনে ফেলেছি।
আবিদ চুপ করে থাকলো।
আমাকে একটু বাদাম খাওয়াও।
অনেক বাদাম ওয়ালা আছে ডেকে নে।
আমি ডাকবো না তুমি ডাকো।
আমি ডাকলে আসবে না।
কেন আসবে না। তোমাকে সবাই চেনে বলে।
তুই কি করে জানলি।
আমি জেনেছি। কি করে জেনেছি তোমাকে বলবো না।
তাহলে আমিও বলবো না।
অনিসা আবিদের কোল ঘেঁসে বসলো। আবিদের মুখের দিকে তাকাল।
তুমি ধরা পরে গেছো। তোমার মুখ বলছে। আমার দিকে তাকাও।
আবিদ ভাইঝির মুখের দিকে তাকাল।
আমি বাবাকে ছবিতে দেখেছি। তোমরা বাবার কাছে থেকেছো। বাবার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছো। বলোনা বাবা কোথায় আছে ?
আবিদের চোখটা হয়তো ছল ছল করে উঠেছিল। নিজেকে সামলে নিল।
তুমিই তো কনিষ্ক মামাকে প্রথমে বলেছিলে, বাবা মরে নি বাবা বেঁচে আছে। বাবাকে সহজে কেউ মারতে পারবে না।
আবিদ এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
ধমকে উঠলো, তুই চুপ করবি।
আমি চুপ করার জন্য আসি নি। আমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে।
আমি জানি না যা।
তুমি চলে যাও, আমি একা এখানে থাকব।
না তোর এখানে থাকা হবে না।
তাহলে ইকবালদাদাই-এর কাছে নিয়ে চলো।
ইকবালভাই এখানে নেই।
আছে। বাবা ইকবালভাই-এর আত্মীয়ের কাছে আছে।
তুই ভুল জানিষ।
ঠিকটা তাহলে কি বলো।
আবিদ চুপ করে রইলো।
অনিসা লক্ষ করেছে এরি মধ্যে দু’চারজন সাদা ধুতি পাঞ্জাবী ওয়ালা বাদাম ওয়ালা ওদের দিকে তাকাতে তাকাতে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চলে গেছে। সকলের চোখে একটা সন্দেহ।
এক কাজ করো।
বল।
তুমি আমাকে ইকবালদাদাই-এর কাছে নিয়ে চলো। তারপর তোমার ছুটি।
তুই অফিসে চল।
আমি একা চলে যেতে পারব। তুমি চলে যাও।
আবিদ কিছুক্ষণ অনিসার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
অনিসা মুচকি মুচকি হাসছে।
তুমি হেল্প না করলে আমি ঠিক খুঁজে নেবো। তখন তুমি কিন্তু কিছু বলতে পারবে না।
আচ্ছাই তো পাগলকে নিয়ে পরলাম।
অনিসা হাসছে।
ঠিক আছে চল কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারবি না।
ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবেতে হবে না। ওটা আমি বুঝে নেব।
ইসলামভাইকে একটা ফোন কর।
ফোন করতে হবে না। আমি তোমাকে নিয়ে কোথায় এসেছি। খবর চলে গেছে।
কি করে বুঝলি।
আমি অনি ব্যানার্জীর মেয়ে, তাই।
আবিদ হেসে ফেললো।
খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস। দেবো একটা ঝাঁপ্পড়।
তুমি মারতেই পারবে না।
তুই ইকবালভাই-এর কথা জানলি কি করে।
তোমাকে সব বলবো, আগে একটু গুছিয়ে নিই।
আবিদ উঠে দাঁড়াল। ঠিক আছে চল।
অনিসা আবিদকে জড়িয়ে ধরলো।
এইতো গুড বয়। আর একটা কথা আছে আঙ্কেল।
বল।
তুমি কাউকে বলতে পারবে না।
কি।
আমি কোথায় যাচ্ছি কি করছি।
এইতো বললি ভাইদাদাই সব জানতে পারছে।
পারবে না।
কেন।
সে তোমাকে পরে বলবো।
সব পরে বললে আমি কি উত্তর দেবো।
তোমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করবে না।
অনিসা আবিদের হাত ধরে গঙ্গার ধার দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
গাড়িটা ওখানে থাকবে।
ও কিছু হবে না।
তারমানে!
আমিতো বললাম কিছু হবে না।
তোমার দেখার লোক আছে।
আবিদ হেসে ফেললো।
তুইতো বহুত জালাস। আছে। হয়েছে এবার।
অনিসা হাসছে।
এবার বাদাম খাওয়াও।
যেখানে যাচ্ছিস সেখানে খাওয়াবে।
তোমাকে এখানে কারা কারা চেনে একটু দেখাবে না।
একটু অপেক্ষা কর জানতে পারবি।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা মসজিদের সামনে এসে দাঁড়াল। আবিদকে দেখে অনেকেই আসলাম আলেকম সালাম বলছে। আবিদও আলেকম সালাম বলছে।
অনিসা চেয়ে চেয়ে দেখছে। ও শুনেছে বাবা ধর্ম বলে কিছু মানতো না। বাবার কাছে সব ধর্ম সমান। অনিসা শুনেছে বাবা নাকি একসময় ইসলামদাদাইকে কি একটা জটিল ব্যাপার থেকে বাঁচিয়েছে। কেউ ওকে ভেঙে বলেনি সব ভাসা ভাসা। সেই থেকে নাকি ইসলামদাদাই বাবাকে খুব ভালবাসে। আবিদ আঙ্কেল রতন আঙ্কেলও বাবার খুব নেওটা।
তুই এখানে একটু দাঁড়া, আমি ভেতর থেকে আসছি।
অনিসা মাথা ঝাঁকালো।
আবিদ ভেতরে চলেগেলো।
অনিসা চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। কতো লোক নমাজ পরে বেরচ্ছে, আবার কতো লোক নমাজ পরতে যাচ্ছে। সবই কি রকম এক ছন্দে বাঁধা। কেউ কেউ ওকে যে দেখছেনা তা নয়। অনিসা গা করলো না।
হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাতেই ও দেখলো একটা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া বাদামওয়ালা আস্তে করে নিজেকে আড়াল করে নিলো। অনিসা বুঝলো এ আবিদ আঙ্কেলের লোক।
অনিসা চারদিক ভালো করে দেখছে। কেউ কিন্তু ওকে কোন প্রশ্ন করছে না। কিছুক্ষণ পর একজন সাদা লুঙ্গি সাদা পাঞ্জাবী মুখ ময় সাদা দাড়ি ফর্সা একজন আবিদ আঙ্কেলের সঙ্গে মসজিদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। সোজা এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
দেখো চিন্তে পার কিনা।
অনিসা মনে মনে ভেবে নিলো এ নিশ্চই ইকবালদাদাই।
নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
থাক থাক মা।
অনিসা সোজাসুজি ইকবালদাদাই-এর চোখে চোখ রাখলো। চেখদুটো কি অস্বাভাবিক জ্বলজ্বলে।
মুখটা বড়ো চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু চিন্তে পারছি না।
অনিসা হাসছে।
ভালো করে মুখটা দেখো চিন্তে পারবে।
কে বলতো, অনির কেউ ?
অনিদার মেয়ে।
এবার বুড়ো আবেগে অনিসাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তুই এতোবড়ে হয়েগেছিস!
অনিসার কপালে চুমু খেলো।
কতোদিন পর তোকে দেখছি। তুই যখন ছোট ছিলি তখন ইসলাম তোকে একবার নিয়ে এসেছিল। আর তুই যেদিন জন্মেছিলি সেদিন দেখতে গেছিলাম। আয় আয় ভেতরে আয়।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর বুক থেকে উন্মুক্ত হলো।
ওর অনেক প্রশ্ন, আমি তার একটারও উত্তর দিতে পারব না। তুমি পারলে দাও।
ইকবালভাই হাসছে।
আবিদ অনিসার দিকে তাকাল।
এবার আমি যাই।
যাও।
আবিদ হাসছে।
কাজ হয়েগেছে তাই না।
অনিসা মাথা দোলাচ্ছে।
মসজিদের পেছনে একটা ছোট্ট ঘরে ওরা তিনজনে এলো। সাধারণ একটা ঘর। কয়েকজন ঘরে বসে আছে। ইকবালভাই নিজের আসনে গিয়ে বসলো।
আয় মা আয় এখানে এসে বোস।
ইকবালভাই নিজের পাশে জায়গা দেখাল।
অনিসা গিয়ে ইকবালভাই-এর পাশে গিয়ে বসলো।
আবিদ একবার সেলিমকে ডাক না।
আবিদ বেরিয়ে গেল।
ইকবালদাদাই যারা বসেছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলছেন।
অনিসা বুঝতে পারলো, এখানে যারা এসেছে তারা তাদের নানা সমস্যা নিয়ে এসেছে ইকবালদাদাই-এর কাছে। বেশ মজা লাগছিল অনিসার।
কারুর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। কোন বাচ্চাটা রাতে ভয়পায়। আরও কতো সমস্যা।
ইকবালদাদাই কাউকে মাদুলি দিচ্ছে, কাউকে জলের বোতলে মন্ত্র পড়ে দিচ্ছে। কাউকে বলছে একটা ধুপের প্যাকেট কিনে নিয়ে আয়। আমি ফুঁ দিয়ে দিই। সবাই সরল বিশ্বাসে সেইগুলো নিয়ে আসছে। ইকবালদাদাই তা মন্ত্রপূতঃ করে দিচ্ছে, ওরা সেইগুলো নিয়ে চলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর আবিদ আঙ্কেল একজনকে নিয়ে ঘরে এলো। তাকে দেখতে বেশ সুন্দর। ইকবালদাদাই-এর মতো পোষাক পরা। কিন্তু বয়সটা আবিদ আঙ্কেলের মতো।
আয় সেলিম। দেখ একে চিনতে পারিস কিনা।
সেলিম অনিসার দিকে কিছুক্ষণ তাকাল। কিছুটা সন্দেহের চোখে।
মুখের আদলটা অনেকটা অনিদার মতো লাগছে। অনিদার কেউ ?
অনির মেয়ে।
অনিসা উঠে দাঁড়াল। প্রণাম করার জন্য নীচু হলো। সেলিম ওর হাতটা চেপে ধরলো।
একবারে বাপের মতো। গুরুজন দেখলেই কোমড় নীচু করে ফেলবে।
ওরে সেলিম রক্তের দোষটা যাবে কোথায় বল।
সবাই ইকবালদাদাই-এর কথায় হাসছে।
সেলিম ওকে নিয়ে গিয়ে কিছু খেতে দে। তারপর আমি যাচ্ছি।
চল।
ইকবালভাই এবার আমি যাই। অবিদ আঙ্কেল বললো।
দাঁড়া, যাস নি। কিছু কথা আছে।
তাড়াতারি এসো।
যা যাচ্ছি।
অনিসারা চলে এলো।
তিনজনে গিয়ে সেলিম আঙ্কেলের ঘরে গিয়ে বসলো। সেলিম আঙ্কেল ঘড়ে ঢোকার সময় একজনকে ডেকে কিছু বললো। তারপর ভেতরে এলো।
হ্যাঁরে তোর নাম কি।
অনিসা।
বাবাঃ তুই একবারে তোর বাবার নামে নাম রেখেছিস।
আমার বাবতো নেই।
কে বললো তোর বাবা নেই।
আমিতো জম্মের পর থেকে বাবাকে দেখলামই না।
তোর বাবা তোকে দেখে।
ওপর থেকে।
সেলিম আঙ্কেল জিভ বার করলো।
ও কথা বলতে নেই।
তুমি আমার বাবাকে একটু দেখাবে।
সেলিম আঙ্কেল হাসছে।
তুই ভীষণ চালাক।
কেন।
তুই মন থেকে তোর বাবাকে দেখতে চাইছিস। একটু অপেক্ষা কর সময় হলেই তোর বাবাকে দেখতে পাবি।
অনিসা বুঝতে পারল সেলিম আঙ্কেল কথাটা ঘোরাবার চেষ্টা করলো।
তুমি কি করে জানলে।
জানি বলেই বলছি।
আমার সঙ্গে বাবার একবার কথা বলিয়ে দেবে।
তোর বাবা বলবে না।
কেন।
তোর বাবা এখন সাধনা করছে। একটু ধৈর্য ধর চলে আসবে।
তোমরা সবাই বলো বাবা আছে। কোথায় আছে আমাকে একটু বলো না। আমি ঠিক চলে যাব। মাঝে মাঝে বাবার জন্য খুব মন খারাপ হয়।
অনিসার গলাটা ধরে এলো।
সেলিম কাছে এগিয়ে এলো।
তোর মন খারাপ হয় তোর বাবার হয় না ?
সেলিম অনিসার মাথায় হাত রাখল।
তুই তো খোঁজার চেষ্টা করছিস।
অনিসা ডাগর চোখে সেলিমের দিকে তাকাল।
আস্তে করে মাথা দোলাল।
তোর বাবা তোকে কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকে রেসপন্স করবে।
আমি বিশ্বাস করি না।
রেসপন্স করলে বিশ্বাস করবি।
হ্যাঁ।
ইকবালদাদাই ঘরে ঢুকলো।
কিরে মা চোখ ছল ছল করছে কেন।
ওর বাবাকে খুঁজতে বেরিয়েছে।
শক্ত কাজ।
কেন ও কথা বলছো।
মনে এলো তাই।
জানো দাদাই মা কাল রাতে বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুব কাঁদছিল। মায়ের জন্য ভীষণ কষ্ট হয়।
তোর বাবা তোর মায়ের কাজ করতে গেছে।
এমন কি কাজ বাবার সতেরো বছর সময় লাগছে।
হয়ে এসেছে। আর মাস তিনেক সময় লাগবে হয়তো। কেন তোর মা সব জানে।
মা যে বলে এখন আমার আর বিশ্বাস হয় না।
সেটাও মিছে কথা বলে না।
তাহলে সত্যিটা বলো।
তুই আমাকে চিনলি কি করে।
তুমি আমাকে বাবার কথা না বললে, আমি তোমাকে বলবো কেন।
ওরে দুষ্টু মেয়ে। বাবার মতো প্ল্যান করেছ।
সবাই তোমরা আমাকে বাবার মতো বলো কেন আমি আমার মতো হতে পারি না।
তুই তোর মতো। কেন তুই বাবার মতো হতে যাবি। তুই তোর বাবার থেকেও আরও বড়ো হবি। আমি বলছি। আমি সব শুনেছি।
আমার সঙ্গে বাবার একটু কথা বলিয়ে দাও না।
সেটা পারব না।
কেন! বাবাকে তোমরা ভয় পাও।
ইকবালদাদাই হেসে ফেললো।
তা বলতে পারিস। ভয়ও পাই আবার ভালোবাসি।
সবার এক কথা।
অনিসা মাথা নীচু করে থাকলো।
যাও তোমাদের কিছু বলতে হবে না। আমার বাবাকে আমিই খুঁজে বার করবো।
এইতো তুই তোর বাবার মতো কথা বলছিস।
অনিসা একবার ইকবালদাদাই-এর দিকে তাকাল।
চোখ দুটো চক চক করছে। মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। সৌম্য মুখটায় কোন উত্তজনা নেই।
ধর তোর বাবা যদি এক্ষুনি তোর সামনে এসে দাঁড়ায় তুই চিনতে পারবি।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর চোখে চোখ রাখলো।
তোর চোখ বলছে তুই পারবি না। তাই তো।
হ্যাঁ।
আগে তুই এইটুকু চিনতে শেখ দেখবি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর চোখ থেকে চোখ সরাল না। মনে মনে ভাবল, বুড়ো তুমি বহুত গভীর জলের মাছ, আমি তোমাকে জালে ধরতে না পারি ডুব সাঁতারে ধরবার চেষ্টা করবো। তবে তোমায় কথা দিচ্ছি তোমরা সাহায্য করো আর না করো আমি আমার বাবাকে খুঁজে বার করবো।
কিরে তুই ওরকম ঠান্ডা হয়ে গেলি।
না মানে।….
একজন একটা ট্রেতে করে সরবতের গ্লাস নিয়ে এলো। প্রথমে অনিসাকে দিল। অনিসা হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা তুলে নিল। তারপর সবাই নিল।
এই সরবৎটা এরকম দেখতে কেন।
তোর বাবা খেতে খুব ভালবাসতো। পেস্তা আর বাদাম দিয়ে তৈরি।
বাবা খেতে ভালবাসতো বাবাকে দেবে, আমাকে দিচ্ছো কেন।
তুই বাবার রিপ্রেজেন্টেটিভ। তাই।
ইকবালদাদাই-এর কথায় অনিসা চুপ করে গেল।
জানিস নিসা।
অনিসা ইকবালদাদাই-এর দিকে তাকালো।
তোকে এই নামে আজ থেকে ডাকবো।
অনিসা হাসলো।
তুই যে মসজিদে বসে আছিস। এটা তোর বাবার পয়সায় তৈরি। বিশ্বাস করবি।
অনিসা অবাক হয়া গেল।
আজ এখানকার কেউ জানে না তুই অনির মেয়ে। যদি জানতে পারে এখানে তোকে দেখার জন্য ভিড় হয়ে যাবে। ভাবছিস ইকবালদাদাই কি সব আজে বাজে কথা বলছে।
হ্যাঁরে, আজেবাজে কথা।
তোর বাবা এখানে নেই তবে সবার মনের মধ্যে আছে।
তার কাজ সবার মন চুরি করে নিয়েছে।
দেখেতো মনে হচ্ছে এই মসজিদটার বয়স আট দশ বছর। তাই না।
অনিসা মাথা দোলালো।
তোর কথা ঠিক। তুই খোঁজ কর জানতে পারবি। তোর বাবা সব সময় চাইতো কারুর ওপর নির্ভরশীল হবে না। নিজে থেকে জানার চেষ্টা করো জানতে পারবে। পারলে সাহায্য নাও।
আমি একসময় গঙ্গায় নৌক চালাতাম। আজ আমি এই মসজিদের ইমাম। তোদের ধর্মমতে এই মন্দিরের পুরোহিত। এটাও তোর বাবার অনুপ্রেরণায়।
আজ ইসলামকে রতনকে আবিদকে যে অবস্থায় তুই দেখছিস, ওরা এরকম ছিল না। ওরা খুব খারাপ লোক। তোর বাবা ওদের ভালো করে দিয়েছে। কিন্তু দেখ তোর বাবা এখানে নেই।
তুই যখন আমার কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছিস, তুই পারবি। চেষ্টা কর।
অনিসা মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলো।
অনেক কথা মাথার মধ্যে ঘুর পাক খাচ্ছে। কিন্তু বলতে পারছে না। বাবার প্রসঙ্গ এলেই সবাই কেমন সুন্দর ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ও ইকবালদাদাই সেলিম আঙ্কেলের সঙ্গে গল্প করলো। বাবার অনেক অজানা কথা ওদের কাছ থেকে জানল। ওর মনে হচ্ছে ওর বাবা একটা ইনভিজিবিল ম্যান।
ঘন্টা খানেক ওদের সঙ্গে কাটিয়ে অনিসা বেরিয়ে এলো।
আবিদ আঙ্কেল মাকে একটা ফোন করে বলে দিল। ওকে অফিসের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে।
মা নিশ্চই আবিদ আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় গেছিলে।
আবিদ আঙ্কেল হাসতে হাসতে ইকবালদাদাই-এর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল।
অনিসা সব বুঝতে পারল। আবিদ আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

তুমি কামিং সানডে আমার জন্য একটু সময় রেখো।
কেন।
তোমাকে নিয়ে বেরবো।
হবে না।
কেন।
আমি অনিদার দেশে যাব, কাজ আছে।
ওআও।
আবিদ ভাইঝির দিকে তাকালো। চোখে মুখে খুশি গলে গলে পরছে।
কবে ফিরবে।
তিন চারদিন লাগবে।
দারুণ।
কি দারুণ।
আমি তোমার সঙ্গে যাব।
না।
কেন।
সে তোকে জানতে হবে না।
ও সব শুনছিনা। আমি যাব।
তুই তো ভারি বজ্জাত। আমি আর আসবই না।
পারবে।
আবিদ ভাইঝির কথায় হাসছে।
নিজের বাড়িতে যাব তাতে তোমার আপত্তি কোথায়।
আমি তোর পেছন পেছন ঘুরতে পারব না।
তোমায় ঘুরতে হবে না। আমি নিজে নিজে ঘুরবো। তুমি তোমার কাজ করবে আমি আমার কাজ করবো।
মা পার্মিসন দিলে তবে যেতে পারবি তা না হলে হবে না।
ঠিক আছে পার্মিসন আমি নিয়ে নেব।
অফিসের গেটের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াল। অনিসা নেমে গেল।
গেট দিয়ে রিসেপসনিস্ট কাউন্টারে আসার সময় দু’একজনের কথা কানে ভেসে এলো।
একেবারে অনিদার হাইট, অনিদার মুখটা যেন বসানো।
অনিসার একবার ইচ্ছে হচ্ছিল পেছন ফিরে দেখে। এদের বয়স কতো।
তারপর নিজেকে সামলে নিলো। সোজা গট গট করে ভেতরে ঢুকে এলো।
ম্যাডাম।
রিসেপসনিস্ট মেয়েটার মিহি ডাকে ফিরে তাকাল।
আপনার জন্য একজন কনফারেন্স রুমে অপেক্ষা করছে।
আমার জন্য!
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কই ডাকুন।
মেয়েটি চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটির পেছন পেছন শুভদীপ এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
তুই এখানে! জানলি কি করে আমি এখানে আসব!
তোর মোবাইল অফ।
সরি।
আন্টিকে ফোন করেছিলাম। বললো তুই দুটোর পর অফিসে আসবি।
তাই নাচতে নাচতে চলে এলি।
তাহলে চলে যাই।
এলি যখন যাবি কেন। মার সঙ্গে কথা বলেছিস।
ফোনে কথা বলেছি। এখানে এসে আর জানাই নি।
কেন।
শুভদীপ চুপ করে থাকলো।
চল ওপরে চল।
দুজনে লিফ্ট বক্সের সামনে দাঁড়াল। ওপরে উঠে এলো। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনিসা শুভদীপের দিকে একবার তাকাল।
তুই এরকম একটা আলখোল্লা পরেছিস কেন।
তোর অসুবিধে আছে।
অবশ্যই।
তাকাবি না।
অনিসা চুপ করে গেল।
মায়ের ঘরের সামনে এসে দেখলো কেউ নেই। লকে হাত দিয়ে দরজাটা ফাঁক করতেই দেখলো বেশ কয়েকজন বসে আছে। একমাত্র মিলিমনি আর টিনামনিকে চিনতে পারলো। আর কাউকে চিনতে পারলো না।
মিত্রা একবার ওদের দিকে তাকাল।
তুমি ব্যস্ত আছো।
ভেতরে আয়।
শুভ আছে।
ওকে নিয়ে আয়।
তোমাদের অসুবিধা হবে না।
দেখেছিস টিনা কেমন পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে।
মিত্রাদি ও এখন এ্যাডাল্ট।
অনিসারা ভেতরে এলো।
মিত্রা একবার মেয়ের দিকে একবার শুভদীপের দিকে তাকাল।
শুভকে পেলি কোথায়।
উনি নাকি তোমাকে ফোন করে জেনেছেন আমি দুটোর পর আসব, নীচে অপেক্ষা করছিলেন।
তুই যদি না আসতিস।
ওকে জিজ্ঞাসা করো। গবেট কোথাকার।
মিত্রা মুচকি হাসলো।
শুভদীপ একবার অনিসার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকালো।
তোর ফোন অন করা আছে।
সরি মা। এখুনি অন করে দিচ্ছি।
বন্ধ কেন।
অনিসা হাসলো।
মিত্রা ঘরে যারা আছে তাদের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনারা এখন যান। আমি ডিসিসান নিয়ে আপনাদের জানাব। ফাইল গুলো রেখে যান।
সবাই আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। একমাত্র টিনা মিলি বসে থাকল।
শুভদীপ চুপ চাপ বসে আছে।
শুভকে আজ খুব গম্ভীর গম্ভীর লাগছে। মিলি হাসতে হাসতে বললো।
দিয়েছি ঝাড়।
মিত্রা আবার হাসলো।
কেন রে! টিনা বললো।
ওর বাড়িতে আর কোন প্যান্ট জামা নেই। কি একটা পরেছে দেখ। কোন টেস্ট আছে ?
মিত্রা হাসছে।
বললাম এরকম একটা আলখাল্লা পরেছিস কেন।
বললো তাকাবি না।
এবার টিনা মিলি জোড়ে হেসে ফেললো।
সেই জন্য শুভ গম্ভীর।
ওর যে কখন কি হয় বোঝা মুস্কিল। দাদুকে বলে এসেছিস।
না।
ঠাম্মাকে।
বলেছি।
এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবি এই তো।
শুভ চুপ করে রইলো।
মিত্রা মেয়ের শাসন দেখছে। মনে মনে হাসছে। কি জোড় ছেলাটার ওপর। ও চুপচাপ মেয়ের ধমক খেয়ে যাচ্ছে। ওর যতো হম্বিতম্বি শুভর ওপর।
আবার শুভ যখন গুম হয়ে যায় তখন অনিশা কি তেল মাড়ে।
বেশ মজা লাগে মিত্রার।
শেষের আট দশ দিন মিত্রা লক্ষ্য করেছে শুভ খুব ঘন ঘন ওদের বাড়িতে আসছে। কমপিউটার নিয়ে দুজনে বসে কি সব যেন করে। তারপর চলে যায়।
ছোটমাকে ও ব্যাপারটা বলে ছিল।
ছোটমা বললো। থাক, মাঠে ঘাটে তো যাচ্ছে না। বাড়িতেই থাকে। তুই বুঁচকিকে কিছু বলিস না।
মিত্রা চুপ করে গেছে।
কি খাবি।
আমার পেট ভড়া। তুই খেয়ে বেরিয়েছিস ?
শুভ মাথা দোলাল।
কিভাবে মাথা দোলাল দেখলে। অনিসা মার দিকে তাকাল।
ও নির্ঘাৎ খেয়ে আসে নি।
কি করে বুঝলি।
মথাটা কেমন দ’র মতো দোলাল দেখলে না। হ্যাঁ নার ঠিক মাঝা মাঝি।
মিত্রা হাসছে।
দাদাই-এর ঘরে কে আছে ?
অনিসা মার দিকে তাকাল।
দাদাই আছে।
দাদাই এসেছে ?
হ্যাঁ।
আমাকে একটা বসার জায়গা দাও।
এতো জায়গা আছে তোর বসার জায়গা নেই।
দূর।
মিলির ঘরে চলে যা।
মিলি মনি এখুনি আবার যাবে।
মিলির যেতে দেরি আছে।
তাহলে তুমি দুটো চিকেন প্যাটিস আর কোল্ড ড্রিংকস পাঠিয়ে দাও।
এই যে বললি পেট ভড়া আছে।
ও খাবে আমি চেয়ে চেয়ে দেখব নাকি।
মিত্রা হাসছে।
অনিসা উঠে দাঁড়াল।
চল।
শুভদীপও উঠে দাঁড়াল। দুজনের হাইটই সমান। উনিস বিশ। মিত্রার বুকটা হঠাৎ যন্ত্রণায় মোচর দিয়ে উঠলো। ইস যদি বুবুন থাকতো।
অনিসা ঘর থকে বেরিয়ে শুভর দিকে তাকাল।
দাদুকে একটা ফোন কর।
ফোন করে বলে দিয়েছি।
এখানে এসেছিস বলেছিস।
না।
কেন।
সবাইকে সব কিছু জানাতে নেই।
পেকো রাম। লিফ্টে যাবি না হেঁটে উঠবি।
হেঁটে।
দুজনে সিঁড়ি ভাঙা শুরু করে দিল।
কখন বেরিয়েছিস।
সাড়ে দশটা।
কোথায় ছিলি এতোক্ষণ!
তুই যে কাজগুলো দিয়েছিলি সেগুলো করছিলাম।
নেগেটিভ না পসিটিভ।
কয়েকটা নেগেটিভ আছে।
আমিও আজ গেছিলাম।
কি পেলি।
যা বুঝলাম সবাই বাবাকে কম বেসি ধ্বসে। কেউ মুখ খুললো না।
একটা কেলো হয়েছে।
কি।
কয়েকদিন ধরে আমার পার্সোনাল ই-মেল আইডিটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল কে যেন হ্যাক করেছে। আজ দেখি আবার আছে। ভাবলাম কেউ হয়তো ঘাঁটা ঘাঁটি করেছে। দেখলাম, না সব ঠিক আছে।
ওই আইডিটা আর ইউজ করিস না। একটা নতুন বানিয়ে নে।
বানিয়েছি। আবার সকলকে মেল করে জানাতে হবে।
শিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে কেউ চোখাচুখি হলে অনিসার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কেউ আবার বলছে গুড আফটারনুন ম্যাডাম।
অনিসাও মাথা দুলিয়ে সম্বোধনের প্রত্যুত্তর দিচ্ছে।
অনিসারা ওপরে চলে এলো। মিলি মনির ঘরে ঢুকে কাঁধ থেকে ল্যাপটপটা নামিয়ে রাখল। মিলি মনির ঘরটা একেবারে নিউজ রুমের গায়ে। এখান থেকে পুরে নিউজরুমটা দেখা যায়। নিউজরুমটা এখন বেশ ফাঁকা ফাঁকা। দাদাইকে টেবিলে দেখতে পেল না। হয়তো দুদুনের ঘরে গেছে।
ফোনটা তুলে নিয়ে দুদুনকে বলে দিল আমি মিলি মনির ঘরে আছি। তোমার কাছে পরে যাচ্ছি। দুদুন বললো তোর মা জানিয়েছে।
অনিসা ফোনটা রেখে দিল।
দুজনে চেয়ারে বসলো।
বল তোর আপডেট।
শিয়ালদহ, পিলখানা দু’জায়গাতেই গেলাম। নাম শুনে সবাই কেমন সন্দেহের চোখে দেখে। একজনতো আমাকে এমন এক জায়গায় টেনে নিয়ে গেল, কলকাতায় যে ওই রকম একটা জায়গা থাকতে পারে তা কল্পনাই করতে পারি না।
সে কি জেরা রে। প্যান্ট প্রায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় দিলি।
পরিচয় দিই নি। বললাম উনি আমার আঙ্কেল। জন্ম থেকে আঙ্কেলকে দেখি নি। তাই দেখার খুব ইচ্ছে।
কি বললো।
আমার নাম বাড়ির ঠিকানা বললাম।
কিছুতেই বিশ্বাস করে না।
তারপর আন্টির নাম বলতে ছাড়ল।
শুভ চুপ করে গেল। অনিসা শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে।
বুঝলি অনিসা আঙ্কেলের দম আছে। আজ সতেরো বছর কলকাতায় নেই। মনেই হচ্ছে না। আমার মন বলছে আঙ্কেল মাঝে মাঝে কলকাতায় আসে।
কি করে বুঝলি।
ওদের কথা বার্তায়।
আমারও কেমন কেমন যেন মনে হয়। শেষ যে দিন প্রিন্সিপ্যাল আন্টির কাছে গেছিলাম। আন্টি বললো। মন খারাপ করো না। তোমার বাবা কোনোদিন খারাপ কাজ করে নি। ঈশ্বর তার কোনদিন ক্ষতি করবেন না।
কথাটা শোনার পর বার বার ভেবেছি। আন্টি হঠাৎ কেন ওই কথা বললেন।
কোন উত্তর পাই নি।
একটুভাব উত্তর পেয়ে যাবি।
আজ ইকবালদাদাই হঠাৎ একটা কথা বললো, তুই তোর বাবাকে কোন দিন দেখিস নি। আজ যদি তোর বাবা তোর সামনে এসে দাঁড়ায় চিনতে পারবি।
তখন থেকে আমি খালি এই কথাটা চিন্তা করে যাচ্ছি। ইকবালদাদাই কেন এই কথা বললো।
একটা কাজ করলে হয় না।
বল।
আঙ্কেলের ওই সময়কার কোন ছবি তোর কাছে আছে।
আছে।
চল একজন আর্টিস্ট খুঁজে বার করি।
আবার আতলামো শুরু করে দিলি।
কথাটা শোন না।
বল।
তাকে একটা প্রোপোজাল দিই।
কি।
এই ছবিটা দেখে এই মানুষটা আঠারো বছর পর কেমন দেখতে হবে ড্র করে দিন।
ছাগল।
কেন ও কথা বললি।
ভেবে দেখ। পাগলাম করার আর জায়গা পেলি না। আঁতেল কোথাকার।
ডায়নোসারের জীবাশ্ম আবিষ্কার হওয়ার পর যদি ডাইনোসার দেখতে কেমন ছিল তা জানতে পারি, এটা হবে না কেন।
অনিসা একবার শুভর দিকে তাকাল। শুভর চোখ দুটে চক চক করছে।
এইতো তোর মাথার গোবর গুলো আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে আমার কথা শুনবি উপকার পাবি, নিজেক সবজানতা হরিদাস পাল ভাববি না।
দেব পিঠে একটা গুম করে।
আমার কথা পছন্দ না হলে তুই দিয়েই থাকিস। আমার তোর মতো অতো ইনটেলেক্ট নেই।
এইতো, সেন্টু ঝাড়তে শুরু করলি।
অনন্য কোথায়।
ও এখন পুরোপুরি ব্যবসায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। মা আস্তে আস্তে ওকে সব বোঝাচ্ছে।
তুই।
বাবাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি।
স্ক্যানগুলো সব পরা হয়ে গেছে।
না। আজ আবার রাতে ধরবো।
আমাকে পেন ড্রাইভে করে দে।
আজ না পর্শুদিন দেব।
একজন বেয়ারা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলো। অনিসা যা বলেছিল ঠিক তাই পাঠিয়েছে মা। খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেল।
নে খেয়ে নে। একবার লাইব্রেরী যাব।
কেন।
বাবার পুরনো লেখাগুলো একবার দেখব। ওখান থেকে কিছু মেটিরিয়ালস পাওয়া যেতে পারে।
এটা একটা ভালো সাজেসন।
আর একটা নাম পেলাম মায়ের ডাইরী পরতে পরতে।
কি।
মিঃ টোডি। বাবা তার পেছনে ধাওয়া করে মিডিলইস্টে গেছে। তারপর আর ফিরে আসে নি।
দাঁড়া দাঁড়া নামটা খুব শোনা শোনা মনে হচ্ছে।
তুই কোথায় শুনলি!
দাদুর কাছ থেকে।
দাদুর কাছ থেকে!
হ্যাঁ।
কি বললো দাদু।
দাদুর কাছে কয়েকদিন আগে বাবা-মার মৃত্যুর কারণ জানতে চেয়েছিলাম। তখন আমার বছর খানেক বয়স। আমারও খুব ইন্টারেস্টিং লাগে পার্টটা। দাদু কথা প্রসঙ্গে টোডির নাম করলো। বললাম ভদ্রলোক কোথায় আছেন এখন। দাদু বললেন মিডিলইস্টে। তারপর দাদু প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল। জানিস আমার জন্ম দুবাইতে।
ভারি ইন্টারেস্টিং।
দাদুর কাছে অনেক মাল আছে বুঝলি।
কিন্তু কিছুতেই বার করতে পারছি না। সিন্দুকটা এমনভাবে আগলে রাখে।
এখন চেপে যা। আগে এদিকটা একটু গোছাই। তারপর দেখছি।
আবিদ আঙ্কেল কি বললো।
খালি পিছলে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
কিরে এখনো খাওয়া হয় নি, কি গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করছিস দুজনে।
মিলিমনি ঘরে ঢুকলো।
তুমি এখন কাজ করবেতো।
হ্যাঁ।
ভালো, আমরা একটু লাইব্রেরীতে যাব। তোমার এখানে আমার ল্যাপটপটা থাকলো।
রেখে যা।
আচ্ছা মনি, বাবার সঙ্গে তোমার কবে পরিচয় হয়।
কেন, আবার বাবাকে নিয়ে পরেছিস নাকি।
বড়ো হয়েছি, বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে।
তাহলে তুই বড়ো হয়েছিস বলছিস।
কেন তোমার কি মনে হয় আমি ছোট আছি।
এইতো সেদিন জন্মালি।
কামিং মান্থ এইট্টিন কমপ্লিট করবো।
ওরে বাবা তাহলে তুই এ্যাডাল্ট।
বলো না।
কি বলবো।
তোমার সঙ্গে বাবার কবে পরিচয় হয়।
কলেজে।
তারপর তোমাদের সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল না।
হুঁ।
তারপর কিভাবে তোমাদের সঙ্গে বাবার রিলেসনটা এতটা ডিপ হলো।
মিলি একবার অনিসার দিকে তাকাল। কি বলতে চায় মেয়েটা। ও খুব সহজ সরল ভাবে মিলিকে প্রশ্ন করছে কিন্তু এর মধ্যেও কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে।
পরে বলবো। এখন মেলা বকাস না অনেক কাজ।
এই তুমি ঘুঁটি বসিয়ে দিলে, আর বলবে না বুঝেছি।
তুই জেনে কি করবি।
তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে, আমি যদি তোমাকে প্রশ্ন করতাম কি উত্তর দিতে।
দাঁড়া মিত্রাদিকে ফোন করছি। তুই বড্ড পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছিস।
বলোনা, মাকে আমি সব বলেছি।
মিলি চুপ করে গেল।
জানো মনি কাল রাতে মা কাঁদছিল।
কে বললো তোকে।
আমি মায়ের কান্নার আওয়াজ পেয়েছি।
মিলি গম্ভীর হয়ে গেল।
কোথায় যাবি বলছিলি।
তারমানে তুমি বলবে না।
একটু অপেক্ষা কর সব জানতে পারবি।
বুঝেছি যাও, তোমাকে বলতে হবে না। নিজের কাজ নিজে করে নেব।
মিলি তাকিয়ে তাকিয়ে অনিসাকে দেখছে। আর মনে পরে যাচ্ছে অনিদাকে। অনিদা ঠিক এরকম এক রোখা ছিল। যে কাজটা হাত দেবে করে ছাড়বে। অনিসা কি তাহলে কিছু বুঝতে পেরেছে ? কই মিত্রাদি কিছু বললো না। একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে।
অনিসা শুভ দু’জনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো।
একটা কথা বলবো মনি, এটা না করবে না।
মিলি হাসলো।
বল শুনি।
তোমার কাছে বাবার কিছু ভিডিও ক্লিপিংস আছে। আমাকে দেবে।
টিনামনিকে বল। ওর কাছে সব গোছান আছে।
টিনামনি আবার বলবে ওসব নিয়ে তুই কি করবি।
ঠিক আছে আমি বলে দিচ্ছি।
তুমি নিয়ে এসে রাখ আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।
তুই চাইলেই কি দিতে পারব। একটু সময় দে।
দিলাম তো। বললাম তো যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।
আচ্ছা। যা।
রাতে খাওয়ার টেবিলে মা ভীষণ চুপচাপ। অনিসা ব্যাপারটা লক্ষ করেছে। ফেরার সময় মা ওর সঙ্গে আজকের ব্যাপারে কোন কথা জিজ্ঞাসা করে নি। এমনি এটা সেটা গল্প করেছে।
বরং দুদুন বললো তোর আজকের কাজ শেষ হলো। লাইব্রেরীতে বাবার লেখা গুলো পরলি। কতদিন অনির লেখা পরিনি।
কেন সুমন্তমামা তো লিখছে।
দূর। দুধের সাধ ঘোলে মেটে। ওর লেখার টাচটাই আলাদা।
অনিসা চুপ করে গেছে।
খাবার টেবিলে ডাক্তারদাদাই প্রথম মুখ খুললো।
ছোটোম্যাডাম আজ কাজ গোছালে।
তুমি আমাকে ম্যাডাম বললে, তোমার সঙ্গে কথা বলবো না যাও।
আচ্ছা তাহলে ছোটগিন্নী বলি।
না তাও বলতে পারবে না।
মিত্রা হাসলো।
তাহলে কি বলবো।
তুমি যে নামে ডাকো সেই নামে ডাকবে।
তাহলে বুঁচকি বলি।
ওটা ছোটদিদান আর দুদুনের জন্য।
বাবাঃ সব আলাদা আলাদা রেজিমেন্ট আছে।
অফ কোর্স।
আজকে কতো ডাটা কালেকসন করলি।
কিছুটা করেছি। এবার তোমার সঙ্গে বসতে হবে।
আমার থেকেও দুদুন অনেক কিছু জানে।
ঘেঁচু।
অনিসার কথায় সবাই হাসে।
তারমানে! দাদা বলে উঠলো।
তুমি কাগজছাড়া কিছু বোঝ না। একটা কাগজ চালাতে গেলে বহুত স্কিম করতে হয়। তোমার ঘটে ওসব বুদ্ধি নেই।
দেখলে দেখলে বড়ো তোমার নাতনির কতোগুলো পাখনা গজিয়েছে।
হুঁ হুঁ কার মেয়ে দেখতে হবে। নারে তুই তোর কাজ কর। আমি যতটুকু জানি বলবো। তুই ধরে আন শয়তানটাকে।
আচ্ছা দিদান। বাবা তোমাকে সবচেয়ে বেসি ভালবাসতো।
ভালোবাসলে কি ওই ভাবে পালিয়ে যেতো।
বড়মার গলাটা ভারি হয়ে এলো।
অনিসা ওপরজিটের চেয়ার থেকে উঠে এলো। দিদানের গলাটা জড়িয়ে ধরলো। তোমায় কথা দিলাম বাবাকে আমি ঠিক খুঁজে বার করবো।
সে বেঁচে আছে কি মরে গেছে এতদিনে সেটাই জানতে পারলাম না।
কেন সবাই যে বলে বাবা বেঁচে আছে।
বেঁচে থাকলে এই কয় বছরে আমার সঙ্গে একবার কথা বলতো।
তোমার সঙ্গে একবারও কথা বলে নি।
একবারও না।
অনিসা চুপ করে গেল, মায়ের মুখের দিকে একবার তাকাল।
মিত্রা অনিসার দিকে তাকাল মাথাটা নীচু করে নিল। অনিসা মায়ের চোখের ভাষা পরে ফেললো।
অনিসা নিজের জায়গায় এসে বসলো। চুপ চাপ খেয়েদেয়ে উঠে গেল। নিজের ঘরে চলে এলো। ল্যাপটপটা টেবিলে অন করে দরজা বন্ধ করলো।
আজ মনটা ভীষণ খারাপ বুঝলি বুবুন। সকাল থেকে মনের ভেতর একটা কু গাইছিল। কেন জানিনা। অফিস থেকে খবর নিলাম তোর ছেলে মেয়ে ঠিক আছে। কয়েকদিন আগে শরীরটা খারাপ হয়েছিল। সে এক হুলুস্থূলুস কান্ড। বড়মাকে বললাম আমি আজ অনিমেষদার কাছে যাব।
বড়মা বললো যা। বুঁচকি বোচন ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি ফিরিস।
অফিস থেকে সোজা অনিমেষদার বাড়িতে এলাম।
প্রত্যেকটা দিন কি যে অসীম যন্ত্রণায় কাটাচ্ছি তোকে বলে বোঝাতে পারব না। নিজে আর সামলে উঠতে পারছি না।
মাঝে মাঝে এমন হচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুড়ে কোথাও চলে যাই।
তারপর ভাবি পালিয়েই বা যাব কোথায়।
যে অবস্থায় ছিলাম এখন তার থেকে যথেষ্ট ভালো আছি।
আমি গেছি শুনে অনিমেষদা তাড়াতারি পার্টি অফিস থেকে ফিরে এলো। সঙ্গে সবাই।
জানিস মিত্রা, সবাই মিলে একটা গেম খেলে ফেললাম।
আবার কি গেম খেললে। বৌদি বললো।
জান সুতপা, অনিদের সিটটা খালি ছিল। বাই ইলেকসনে ওটাকে জুড়ে দিল। আমরা অনাদিকে দাঁড় করিয়ে দিলাম। জানি ওই সিটটাতে জিততে পারব না। তবু একটা রিক্স নিলাম।
অনির কাজগুলো প্রজেক্ট করো।
ঠিক ধরেছো। সেই জন্য রিক্সটা নিলাম।
বিধানদা বললো হ্যাঁরে মিত্রা ভুল করলাম নাকি।
চুপ করে থাকলাম।
কি উত্তর দেব বল বুবুন। আমি তোর মতো রাজনীতি বুঝি না।
প্রবীরদা খালি বললো, আমি ফলোআপ করে যাচ্ছি মিত্রা, তুই কিছু ভাবিস না।
পরটা আলুভাজা খাওয়া হলো। সেদিনটার কথা খুব মনে পরে গেল। তুই আমি মিলি টিনা নীপা দামিনীমাসির ওখান থেকে অনিমেষদার বাড়িতে গেছিলাম, বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। মনটা ভীষণ খারাপ লাগছিল। কাউকে বুঝতে দিই নি। সবকটা পরটা খেতে পারিনি জানিস। তোর কথা মনে করে দুটো রেখে এসেছিলাম।
বাঁদর ছেলে কোথাকার।
আচ্ছা তোর কি একটুও আমার কথা মনে পরে না।
অনিমেষদার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তোর হদিস পায় নি। তোর ফোন কল ধরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ওই তল্লাটে ওই নামে কেউ থাকে না। তবে একটা দুঃসংবাদ দিল। মিঃ মুখার্জী এবং তার স্ত্রীকে কারা যেন খুন করেছে। বাচ্চাটা কোন প্রকারে বেঁচে গেছে। ওর দাদু ঠাকুমা ওখান থেকে বাচ্চাটাকে কলকাতা নিয়ে এসেছে।
আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড। মিঃ মুখার্জীকে প্রায় ভুলে গেছিলাম। হঠাৎ করে মনে পরে গেল। নার্সিংহোমে থাকতে অনিমেষদা বলেছিল। মিঃ মুখার্জী ট্রান্সফার নিয়ে ওখানে গেছে। তারপর খবরটাপেয়ে একেবারে মুষড়ে পরলাম।
তারমানে তুই কোথায় ? আর ভাবতে পারছি না।
কখনো মনে হয় তুই আছিস। কখনো মনে হয় তুই নেই। সব সময় একটা দোলাচলের মধ্যে থাকি। আমি একা বললে ভুল হবে। তোকে সবাই যারা ভালোবাসে সববাই।
ইসলামভাই সব সময় বলে তোকে বলেছিলাম মামনি অনি আমার বাবা।
সত্যি অনি আমার বাবা কিনা প্রমাণ পাচ্ছিস।
মিঃ মুখার্জীর খোঁজ করেছিলাম। পাই নি। তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছি।
ইসলামভাইও অনেক খোঁজ করেছে।
মিঃ মুখার্জীর যে সব আত্মীয়স্বজন আছে তারা সব কলকাতার বাইরে চলে গেছে। জানিনা বাচ্চাটা কেমন আছে। মনটা খুব খারাপ লাগে যখন মনে পরে যায় বাচ্চাটা তোর মতো অনাথ হয়ে গেল।
আমি জানি এই ঘটনারও তুই প্রতিশোধ নিবি। অপেক্ষা অপেক্ষা শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া আমার এই জীবনে আর কিছু নেই। তুই যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস।
আচ্ছা তুই একবার বড়মাকে ফোন করতে পারিসতো। তোকে পেটে ধরে নি বলে এতো কষ্ট দেওয়ার অধিকার তোর নেই।
ওদের দুটোর দিকে একবার তাকা। ওরা তোর কোন ক্ষতি করে নি। আমার সামনে কাঁদে না আড়ালে চোখের জলে বুক ভিঁজে যায়।
ইদানিং ছোটর কি যে হয়েছে কি জানি তোর ছেলে মেয়ে ছাড়া পৃথিবীটা তার কাছে অন্ধকার।
দুজনে দুটোকে নিয়ে শোয়। আমি বড়মার ঘরের সোফাতে আলাদা বিছানা করে।
দামিনীমাসি প্রত্যেকদিন আসবে তোর ছেলেমেয়েকে তেল মাখিয়ে স্নান করাতে।
সেদিনকে আমার হাতটা ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি মামনি।
কি হয়েছে বলবে তো।
অনির ভাঙা বাক্সটা থেকে তোর লেখা চিঠিগুলো পরেছি। ওর কয়েকটা লেখাও পরলাম। ছেলেটা নেই হাতের লেখাগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে ওর অনুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করলাম।
দুর মনটা খারাপ হয়ে গেল। লিখতে ভালো লাগছে না।
আচ্ছা তুই আমাকে একটা প্রশ্নের জবাব দিতে পারবি। খুব জানতে ইচ্ছে করে।
আমি তোকে তোর জীবনটা একটু চেয়েছিলাম বলে তুই কি খুব রাগ করেছিলি। তাই সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে সব মায়া মমতা বন্ধন ত্যাগ করে চলে গেলি।
অনিসা টেবিলের ওপর রাখা বোতলটা নিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেল। একবার জানলার কাছে গেল। না মাকে দেখতে পেল না। সারাটা বাড়ি নিস্তব্ধ।
অনিসা জানলা থেকে সরে এলো। একবার বাথরুমে গেল। ঘরের দরজাটা খুলে একবার বারান্দায় এলো। দেখলো দাদার ঘরের দরজা বন্ধ।
পায়ে পায়ে একবার দাদার ঘরের দিকে গেল। না দাদার ঘরের লাইট জ্বলছে না। ও ঘুমোচ্ছে।
আবার টেবিলে এসে বসে পরলো। আজকে যতটা হোক পরে শেষ করতে হবে।
আচ্ছা তখন শুভ লাইব্রেরী থেকে হঠাৎ গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এলো কেন ?
বাড়িতে এসে ও ফোন করেছে। ওর ফোনের স্যুইচ অফ।
বহুবার রিং করেও পায় নি।
ব্যাপারটা ওর ঠির মাথায় ঢুকছে না।
কাউকে না জানিয়ে চলে আসাটা অনিসার ভাল ঠেকছে না। কাল সকালে ওর বাড়িতে একবার ঢুঁ মারতে হবে।
আবার টেবিলে এসে বসলো।
জানিস বুবুন তোর ছেলে মেয়ে এখন সরাটা বাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়। সবার চোখের মনি। বিশেষ করে ভজুরাম।
কেউ ওদের বকতে পারবে না। তাহলে ভজুরাম হাঙ্গার স্ট্রাইক শুরু করে দেবে। লুকিয়ে লুকিয়ে দামিনীমাসিকে ফোন করে ডেকে আনবে। বিচার সভা বসাবে।
কেন বোচন আর বুঁচকির গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। তার মান ভাঙানো খুব মুস্কিল।
ভজুরাম হচ্ছে ঘোড়া আর তোর ছেলে মেয়ে হচ্ছে তার সওয়াড়ি। সারাটা বারান্দা ওদের ঘোড়া চড়াচ্ছে।
বেশ লাগে। মাঝে মাঝে আমি মোবাইলে ছবি তুলে রাখি।
জানিনা তোর সঙ্গে দেখা হবে কিনা। দেখা হলে তোকে সব দেখাব।
ও তোকে বলতে ভুলে গেছি।
আমি এখন বেশ ভালো কমপিউটার জেনে ফেলেছি।
সব টিনা আর বরুণদার সৌজন্যে। এমনকি মোবাইল থেকে ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে সিডি করে রাখি। আর একটা পৌর্টেবল হার্ডডিক্স কিনেছি। শুধু মাত্র তোর জন্য। তুই যদি কোন দিন ফিরে আসিস, তোকে সব সব দেখাব।
আজ বাড়িতে প্রচুর লোকজন তাই আমি তাড়াতাড়ি অফিসে চলে এলাম। কাল থেকে ভীষণ টেনসনে আছি। ওখানে বাই ইলেকসন হলো পর্শুদিন। আজ রেজাল্ট।
দাদা সকাল থেকে হুলুস্থূলুস বাদিয়ে দিয়েছে।
সন্দীপকে ফোনে ফোনে এই মারে তো সেই মারে। অর্ক ওখানে পৌঁচেছে কিনা।
ইসলামভাই নাওয়া খাওয়া ভুলে আদা জল খেয়ে ওখানে পরে আছে। সকাল থেকে আমি দুবার ফোন করেছিলাম। নট রিচেবল বলে দিয়েছে।
অফিসে চলে এলাম।
নিজের কাজে মন দিলাম। এসে দেখে যাস এখন আমি সেই মিত্রা নেই। মালকিন বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।
তুইতো এটাই চেয়েছিলি। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াই।
কথাটার কতটা গুরুত্ব তখন বুঝি নি। আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
শোননা যেটা বলছি।
দুটো নাগাদ হঠাৎ দেখি আমার ঘরের দরজা খুলে তিন মক্কেল হাজির।
ইসলামভাই, বাসু, অনাদি।
বুঝলাম কিছু একটা আনন্দ সংবাদ আছে।
ঠিক তাই।
ছটা সিটের মধ্যে ছটাই অনিমেষদারা জিতে গেছে।
অনাদি ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আমি উঠে গেলাম।
কাঁদছো কেন আজ আনন্দের দিন। বুবুন তোমাকে বলেছিল। এমএলএ বানাবে।
ম্যাডাম জানিনা আজ ওর কথাটা বড্ড বেশি করে মনে পরছে।
শুধুকি তোমার। আমাদের সবার। এবার অনেক কাজ অনাদি। ওর স্বপ্নগুলো সফল করতে হবে।
আমি করবো ম্যাডাম আপনাকে কথা দিচ্ছি। ব্যাঙ্কটা মোটামুটি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। এবার ফার্মিংটা নিয়ে লড়ে যাব। কাজতো অনেকটা গুছিয়ে ফেলেছি।
মনে থাকে যেন। ওর অনেক স্বপ্নছিল ওখানে একটা ভালো ইস্কুল তৈরি করতে হবে।
আমি কথা দিচ্ছি ম্যাডাম।
বসো। তোমাদের আর এক মক্কেল কোথায় ? গুরুর শিষ্য।
রেজাল্ট বেরোবার পর ও চলে গেল। বললাম আমরা ম্যাডামের কাছে যাচ্ছি।
কিছু বললো না।
আসার সময় খবর নিলাম। পীরসাহেবের থানে বসে আছে। আজ যা কিছু সব চিকনার জন্য।
ওর মাথায় এতো বুদ্ধি কোথা থেকে এলো বুঝতেই পারছি না।
কেন!
শেষ মুহূর্তে ইসলামভাই হাল ছেড়ে দিয়েছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমি হেরেগেছি। ও কোথা থেকে পাঁচু পচাকে নিয়ে সারারাত্রি কি হুইসপারিং ক্যাম্পেনিং করলো কি জানি।
এতোভোটে জিতবো আসা করি নি। অমূল্য যেভাবে বিট্রে করলো শেষ পর্যন্ত। ওমা দেখি ভোটের দিন অমূল্যের লোকজনই সবচেয়ে বেশি খাটা খাটনি করছে।
তাহলে শেষ তাসটা চিকনাই খেললো বলো।
তাস মানে একেবারে ট্রাম্প কার্ড।
আচ্ছা তোমাদের কিছু মনে হয় না।
মনে হলে কাকে জিজ্ঞাসা করবো। ও তো এখন অনির ছায়া।
নিজেকে অনি বলে মনে করে। কিছু বললেই বলে কথা কম বল যা করছি খালি দেখে যা।
আমি হাসছি।
পর্শুদিন ইসলামভাইকে পর্যন্ত ধমকাল।
বলে কিনা, তুমি এতদিন কি করে তোমার সাম্রাজ্য চালালে।
ইসলামভাই হাসবে না কাঁদবে।
একমাত্র ওই বলেছিল সব সিট হারলেও তোর সিটটা আমার চাই। আমি তোকে জেতাবই।
সারাক্ষণ ভোটগণনা কেন্দ্রের বাইরে ছিল। একবারের জন্য ভেতরে যায় নি।
কি খাবে বলো। সকাল থেকে নিশ্চই কিছু খাওয়া হয়নি।
দেখলাম ফোনটা কেঁদে উঠলো। দেখলাম অনিমেষদা। ভয়েস অন করলাম।
হ্যাঁ দাদা বলুন।
তোর কাছে অনাদি ইসলাম গেছে।
হ্যাঁ।
ওদের ফোন বন্ধ কেন।
সবাই বুবুনের গুণ পেয়েছে।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে একহাত জিভ বার করলো। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোনটা বার করে অন করলো।
রেজাল্ট শুনেছিস।
হ্যাঁ শুনলাম। ছেলেটা রিয়েলি মিরাক্যেল।
এখানে নেই তবু যেন সব সময় আছে। আমি যেগুলো নেগেটিভ ধরে ছিলাম সেগুলো পর্যন্ত পজিটিভ করে দিয়েছে।
আমি চুপ করে রইলাম, মনটা ভারি হয়ে গেল।
এই দেখো চুপ করে গেলি কেন। তোর মন খারাপ হয়, আমার হয় না।
না দাদা আপনি বলছেন আমি শুনছি।
চিকনা এসেছে।
না।
কেন ?
ও অনির ফেভারিট জায়গায় গিয়ে বসে আছে।
হয়তো গুরুদেবের সঙ্গে টেলিপ্যাথিতে কথা বলছে।
বুঝলি শেষ খেলাটা ওইই খেলে দিল।
আমি চুপ করে আছি।
দে ইসলামকে একবার দে।
ভয়েজ অফ করে ইসলামভাই-এর হাতে ফোনটা দিলাম।
বুঝলাম নিরঞ্জনাদার কথা জিজ্ঞাসা করছে। ওখানে কাকে দায়িত্ব দিয়ে আসা হয়ছে। এই সব। পারলে একবার রাতে বাড়িতে যেতে বললো। সবার সঙ্গেই কথা বললো।
খাওয়া দাওয়া করে আজ একটু বিকেল বিকেল সবাই ফিরে এলাম।
গেটের মুখে এসে রবীন গাড়ি দাঁড়করাতেই আমি নেমে এলাম।
অনাদি, বাসু, ইসলামভাইও নেমে এলো।
দেখলাম তোর ছেলে মেয়ে মাঠের ধুলো মাথায় মেখে একেবারে ধবল হয়ে গেছে। সে কি হাসির চোট। তাদের সাহায্য করছে ভজুরাম।
আমি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম। অনাদি আমার পাশে।
চোখের কোল জলে ভরে গেল।
অনাদি আমার হাতটা চেপে ধরলো।
ম্যাডাম এটা কি হচ্ছে।
আমি অনাদির দিকে তাকাতে পারলাম না।
আমি জানি ম্যাডাম আপনার সেই দিনকার কথা মনে পরে যাচ্ছে। আমার বাড়িতে আমার ছেলে মেয়েদের কথা মনে পরে যাচ্ছে। সেদিন আপনার পাশে অনি ছিল আজ নেই।
অনাদির ফিলিংসটা আমার মনে ভীষণ দাগ কাটল।
সত্যি সত্যি আমার সেদিনকার কথাটা মনে পরে যাচ্ছিল।
অনাদির বাড়ি, খামার, খুঁটিতে গরু বাঁধা, আমি তুই দাঁড়িয়ে অনাদি ঘুম চোখে উঠে এলো।
অনাদির বাচ্চদুটো খামারে খেলছে। ধুলো মাখছে। আমি ছুটে গেলাম।
আজ কিছুতেই ছুটে যেতে পারলাম না। বুঝলি। খালি তুই আমাকে হাত ধরে টেনে রেখে দিলি।
বার বার তোর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তুই বার বার বলতিস আমি প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত হয়েছি আমার সন্তানও সেই ভাবে বড়ো হোক।
ওদেরকে ওদের মতো বড়ো হতে দাও।
আজ তোর নিজের বাড়িতে এলাম। প্রায় তিন বছর পর। সবাই এসেছে। কেউ বাদ যায় নি। তিনবছর পর শ্বশুর বাড়িতে এলাম।
যে ভাবে তুই নিয়ে আসতিস ঠিক সেই ভাবে। প্রথমে সেই ধাবাতে। তারপর পরিদার দোকান। পরিদা তোর ছেলে মেয়েকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা।
গাড়ি থেকে নামতে দেরি তোর ছেলে মেয়েকে কোলে তুলতে দেরি নেই।
অনেক লোক আজ। সবাই এসেছে। ছখানা গাড়ি।
পরিদা নিজে হাতে তোর ছেলে-মেয়েকে গরম দুধ, দুটো রসোগোল্লা খাওয়ালো। বললে আমার দোকানে আজ লক্ষ্মী-নারায়ণ এসেছে।
আমি বাধা দিই নি। ওরা দুটোতে বেশ গপ গপ করে গিললো।
গাল দুটো সবার টেপার চোটে লাল হয়েগেছে।
জন্মের পর এই প্রথম তোর ছেলে মেয়ে নিজের বাসভূমিতে এলো। এখন ওদের বয়স চব্বিশ মাস। আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করে দেব বলেছি।
আমার কথা শুনে বড়মা হাঁই হাঁই করে উঠেছিল। একমাত্র মল্লিকদা আমাকে সাপোর্ট করলো। মিত্রা ঠিক কথা বলেছে।
সেই ক্যালভার্ট, সেই শ্মসান, তোর সেই স্কুল। যেমন দেখে গেছিলাম ঠিক তেমনই আছে। রাস্তায় আসার পথে উনা মাস্টারের বাড়ির সামনে এসে একটু দাঁড়াতে হয়েছিল। কাকীমা এলেন। তোর ছেলে মেয়েকে কোলে নিলেন।
তোর ছেলে মেয়টাও সেরকম কারুর কাছে না নেই। আবার চলা শুরু। একটাই নতুনত্ব দেখলাম মোরাম রাস্তাটা খালি পিচে ঢাকা হয়েছে।
সঙ্গে কে আসে নি। সবাই এসেছে। দেবা, নির্মাল্য এই কদিন প্রানপাত করলো। আগামীকাল তোর স্বপ্নের প্রজেক্টের উদ্বোধন। অনিমেষদা এই প্রথম তোর বাড়িতে আসবে।
কাল উদ্বোধনের পর তোর ভিটেতে রাত কাটাবে বলেছে।
বৌদি সুরো আমাদের সঙ্গেই এসেছে। প্রবীরদারা সবাই ডাইরেক্ট প্রজেক্টে চলে গেছে। রাতে আসবে বলেছে। এক এলাহি ব্যাপার।
গাড়ি থেকে নেমে ট্রলিতে ওঠার পর দেখলাম ছেলে মেয়ে আর আমার কাছে নেই। বড়মা চেঁচামিচি শুরু করেদিল।
ডাক্তারদাদা বোঝালো।
কে কার কথা শোনে।
সেই তরজা।
খামারে এসে ট্রলি থামলো। যেমন দেখিছিলাম ঠিক তেমনই আছে। খালি বাঁশবাগানের একটা জায়গায় মেসিনটা বসানো হয়েছে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি হলো। আমি সব শুনে যাচ্ছি।
নীপা এখন এই বাড়ির গার্জেন।
মৌসুমি মাসিকে জীবনে প্রথম দেখলাম।
দিদিভাই, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি সব দেখে শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছে। ওরা কোনোদিন এরকম সহজ সরল জীবন দেখে নি।
তুই নেই কিন্তু তুই সব জায়গায় আছিস।
এতোক্ষণ পর তোর ছেলে মেয়ের দেখা পেলাম। একজন কাকার কোলে, একজন উনা মাস্টারের কোলে বসে আছে। উনা মাস্টার সকাল থেকে এসে বসে আছে। তোর ছেলে মেয়ে আসবে শুনেছে। হাতে কি যেন একটা আছে, খাচ্ছে।
মনে মনে ভাবলাম নির্ঘাত পেট খারাপ করবে।
আমার সব হাতের বাইরে বুঝলি।
সবাইকে প্রণাম করে আমি নিজের ঘরে এলাম। সঙ্গে দিদিভাই।
ঘরের ভেতর এসে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। যেখানকার যা জিনিস সেখানেই আছে। কেউ একটুও হাত দেয় নি। ঝকঝকে তকতকে। কাঁদতে পারলাম না। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। ভীষণ যন্ত্রণা। খালি চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো।
দিদভাই আমার পিঠে হাত রাখল।
তুই মন খারাপ করলে, আমার ঠিক থাকি কি করে।
আমি মন খারাপ করতে পারব না, কি জ্বালা বোঝ। আমার কোন সুখ-দুঃখ তাপ-অনুতাপ থাকতে নেই। তাহলে সকলের মন খারাপ হবে।
হঠাৎ সিঁড়িতে মা মা শব্দ শুনে ঘরের বাইরে এলাম।
দেখলাম চিকনার কোলে তোর ছেলে মেয়ে।
ওদের নিচে নামিয়ে আমাকে প্রণাম করলো।
এটা কি হলো চিকনা।
বন্ধুর স্ত্রীকে পেন্নাম করলাম না। আমার গুরুমাকে পেন্নাম করলাম।
দিদভাই হেসে ফেললো।
সবাই আসছে। তুমি এখন অনি। সেইভাবে চলবে। সাতটার সময় তোমাকে নিয়ে একজায়গায় যাব। যাবে আমার সঙ্গে ?
যাব।
আর কাউকে নিয়ে যাবে না।
দিদিভাই বললো।
না সেখানে গুরুমা আর তার সন্তানের প্রবেশ আছে, আর কারুর নেই।
চিকনা তোর ছেলে মেয়েকে কোলে তুলে চলে গেল।
খাওয়া দাওয়া হলো, হাসাহাসি হলো।
তোর ছেলেকে একটু চিংড়ি মাছের মোলা দিয়েছিলাম উঃ আঃ করে ঝামেলা পাকাল, চিনি মুখে দেবার সময় দেয় না। মেয়ে দিব্যি খেয়ে গেলো। চোখ ছল ছল তবু নোলা কমে না।
বিকেলে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগতো। গ্রাম শুদ্ধ ঝেঁটিয়ে সবাই অনির ছেলে মেয়েকে দেখতে এসেছে। ওরে তোর ছেলে মেয়ে কতো শাক-সব্জি, ফল-মূল পেল তার কোন ইয়ত্তা নেই।
দিদভাই তো অবাক হয়ে বলেই ফেললো এগুলো কি রে।
আমি বললাম এখানকার সাধারণ মানুষের ছেলে মেয়ের মুখ দেখে দেবার মতো ক্ষমতা নেই তাই খেতের আনাজ-পাতি গাছের লেবু কুমড়ো আঁখ বুবুনের ছেলে মেয়ের জন্য নিয়ে এসেছে।
জ্যেঠিমনি দামিনীমাসি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে।
বরুণদা খুব এনজয় করছে।
সে এক জনস্রোত। সবাই হিমসিম খায়। কাকা মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে।
সন্ধ্যার দিকে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হলো।
কনিষ্করা জাল টানল পাঁচুদের সঙ্গে দারুণ এনজয় করছে সবাই।
সাতটা বেজে গেল, আটটা বেজে গেল, চিকনার দেখা নেই।
কাউকে মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও পারছি না।
জেনারেটর চলছে। সঞ্জুর ছলেগুলো সব দেখভাল করছে। অনাদি হোলটাইম ডিউটি দিচ্ছে। সবাই আছে। বাসু বাইরেটাই বেশি সামলাচ্ছে।
আমি নিজের ঘরে এসে একটু নির্জনে বসলাম।
মনে একটা চাপা টেনসন।
চুলটা আঁচড়ানোর আর সময় পাই নি। তাই আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়াচ্ছিলাম। কত স্মৃতি আমাদের এই ঘরে লেখা রয়েছে।
হঠাৎ দেখি একটা মিশ কালো ছেলে ঘরে ঢুকলো।
প্রথমে বুঝতে পারি নি। তারপর মুখের কাছে আঙুল দেখিয়ে চুপ করতে বলে একটা মোবাইল এগিয়ে দিলো।
হাতে নিলাম।
হ্যালো।
হ্যালো।
গুরুমা তোমাকে নিয়ে আসতে পারলাম না। বড্ড রিক্স হয়ে যেত। রাতে তোমার ঘরে একা থাকবে। ফোনটা সব সময় অন করে রাখবে। পারলে সারারাত জেগে থাকবে। আমি যখন তখন তোমায় ফোন করতে পারি।
লাইনটা কেটে গেল।
ছেলেটা আমার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে আমাকে একবার ঠক করে প্রণাম করল। নিমেষে চাল টপকে অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল।
তুই বিশ্বাস করবি না বুবুন আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কি নিস্তব্ধে কাজ করে গেল ছেলেটা। কাক পক্ষীও টের পেল না।
তখনি বুঝলাম তুই আজ চিকনাকে ফোন করতে পারিস।
সেই মুহূর্তটা এতো আনন্দ হচ্ছিল তোকে কি বলবো। সব দুঃখ যেনো জুড়িয়ে গেল।
নাচতে নাচতে কোন প্রকারে এই বাড়িতে চলে এলাম।
আমার খুশি মনে হয় চোখে মুখে ছড়িয়ে পরেছিল।
ডাক্তারদাদার চোখ বুঝলি। একবারে মাইক্রস্কোপ।
ঠিক ধরতে পারল। আমি বুঝলাম আর ডাক্তারদাদা বুঝলো।
তোর ছেলে মেয়ের আজ চোখে ঘুম নেই। পিকু আর দুটোতে মিলে পাগল করে দিচ্ছে। সঙ্গে অনাদির বাচ্চা দুটো বাসুর ছোট ছেলেটা।
তোর বাড়িতে ধানের সাম্রাজ্য। তাই সবার এই বাড়িতে শোবার আয়োজন। আমারও।
আমি বললাম না আমি ওবাড়িতে শোব।
একা একা কি করে ও বাড়িতে শুবি!
বড়মা বললো।
আমি পারবো।
ডাক্তারদাদা বললো ও যখন ও বাড়িতে শুতে চাইছে যাক না।
সঞ্জুর ডাক পরলো। সে পাহাড়া দেবে নিচে।
বড়মা চিকনার কথা জিজ্ঞাসা করলো।
কাকা বললো, চিকনা!
সে এখন অনাদির থেকে বড়ো নেতা। লোকে অনাদির থেকে ওকে এখন বেশি খোঁজে।
ঘরে চলে এলাম। ছেলে মেয়ে তার দিদাই দিদানের কাছে।
সময় আর কাটতে চায় না। ঘর অন্ধকার করে মোবাইলটা ভাইব্রেট মুডে রেখে জানলা দিয়ে তাকিয়ে রয়েছি। সেই মিশ কালো অন্ধকার।
জেনারেটরের তারস্বর শব্দ। ঝিঁ ঝিঁ-র ডাক। ঝলমলে জ্যোৎস্নারাত। সব একরকম আছে। কোথাও কোনো পরিবর্তন হয় নি। জোনাকিগুল মাঝে মাঝে জলছে আর নিবছে।
হঠাৎ একটু ঝিমুনি এসেছিল। ভঁ ভঁ শব্দে চমকে তাকিয়ে উঠলাম। দেখলাম মোবাইলটা প্রায় খাট থেকে নিচে পরে যাচ্ছিল। খপ করে চেপে ধরলাম। দেখলাম চিকনার নম্বর ব্লিঙ্ক করছে।
হ্যালো।
বলো।
ঘুমিয়ে পরেছিলে।
না।
তাহলে! দুবার রিং করলাম। লাইনটা কেট না। ধরে রাখো।
চুপ করে রইলাম।
আমার কথা শুনতে পাচ্ছো।
পাচ্ছি।
টুঁ শব্দটি করবে না। পারলে মুখে কাপর বেঁধে নাও। গুরুকে লাস্ট আপডেট দেব।
আচ্ছা।
বিশ্বাস করবি না, বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।
আড়াই বছর আগে ছেলে-মেয়ের জন্মদিনে তোর এসএমএস পেয়েছিলাম। আজ তোর গলা শুনবো, প্রায় সাড়ে তিন বছর পর। চোখ ফেটে জল আসছে। জানিনা এটা দুঃখের না আনন্দের।
তোর সঙ্গে কতো কথা বলার আছে।
দূর ছাই।
কথা বলা আর লেখা দুটোর মধ্যে অনেক পার্থক্য। লিখতে আর ভালো লাগে না। সব সময় গুছিয়ে লিখতেও পারি না। হাত ব্যাথা হয়ে যায়। তবু না লিখে পারি না। ভুলে যাব যে।
তোকে অনেক দিন থেকেই বলবো বলবো ভেবেছিলাম বলা হয় নি।
যদিও তুই একদিন কথার ফাঁকে হিন্টস দিয়েছিলি।
বলেছিলি পরে বলবো।
সে বলা আর তোর হয়ে ওঠে নি।
আচ্ছা বুবুন সত্যি করে বলতো তুই বিয়ে করার পর আমাকে কতটা সময় দিয়েছিস।
বলবি, দেবো কোথা থেকে। তুই আমাকে এমন চক্করে ফেললি। বিয়ের মজাটাই ভুলে গেলাম।
তারপরে আরও বলবি, একজন্মে যদি সব পাওয়া হয়ে যায়, পরের জন্মে কি করবি।
আমার দরকার নেই। আমি এই জন্মেই সব কিছু পেতে চাই, তুই ফিরে আয়।
জানিস আজ কনিষ্ক বটা বিয়ে করলো। পাত্রী কে জানিষ মলি আর টিনা। কনিষ্ক মিলিকে বিয়ে করলো বটা টিনাকে।
ভেতরে ভেতরে ওদের একটা ইন্টু-মিন্টু চলছিলি সেটা বুঝতে পারতাম কিন্তু ওরা কেউ এসে কিছু বলতো না। আমিও জিজ্ঞাসা করতাম না।
সত্যি কথা বলতে কি, তুই ওদের সঙ্গে যে ভাবে মিসতিস আমি পারতাম না।
গত সপ্তাহে কনিষ্ক বটা বাড়িতে এলো। সকালের দিকে।
প্রথমে একটু অবাক হলাম। দেখলাম নীরুও কিছুক্ষণ পর এলো।
তোমার সঙ্গে একটা ছোট্ট মিটিং আছে।
আমার সঙ্গে!
হ্যাঁ। তোমাকে একটা গুরু দায়িত্ব নিতে হবে।
আবার অবাক হলাম।
কনিষ্ক বটা মিটি মিটি হাসে।
বলো।
নীরু সব বললো।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
হেসো না। অনি নেই তাই তোমাকে সব দায়িত্ব নিতে হবে।
কি দায়িত্ব নিতে হবে বলো।
সবার কাছে প্রথমে পার্মিসন আদায় করতে হবে। তারপর বিয়েটা এই বাড়িতে হবে।
তাই হলো। আমি দায়িত্ব নিলাম।
নীরুকে এই সময় দেখতে হয়।
ও শোন, নীরু বাবা হতে চলেছে।
কনিষ্ক বলেছে তোরটা আমি ডেলিভারি করবো।
নীরু বলেছে মিলিকে নিয়ে তাহলে পালিয়ে যাবে।
সে কি হাসি রে।
জানিস জানিস তোর ছেলে মেয়ে আর পিকু নিধ বর আর নিধ কনে।
সব এই বাড়ি থেকে হলো।
মিলির বাবা-মা দাদা বৌদি এসেছিল।
টিনার মা-দাদ-বৌদি এসেছিল।
বিয়ে বলতে রেস্ট্রি ম্যারেজ। আমাদের পরিচিত লোক জন ছাড়া কেউ আসে নি।
ইসলামভাই সব কিছুর দায়িত্ব নিল।
বেশ ছিলাম সারাটা দিন। খাওয়ার সময় তোর কথা উঠলো।
ব্যাশ আমার এতো সুন্দর মেজাজটা গেল খারাপ হয়ে।
আচ্ছা তোর কথা না তুললেই কি হতো না ?
অনিকেতটা ভীষণ বদমাস ওইই তোর কথা তুললো।
অনিটা থাকলে এই সময় নীরুর অবস্থাটা দেখতিস।
তারপর শুরু হয়ে গেলো।
আমি কেমন যেন হয়েগেলাম, কিছু আর ভালো লাগলো না।
কাউকে বুঝতে দিই নি। তবে বৌদি বুঝতে পেরেছিল। যাওয়ার সময় বললো, মনখারাপ করিস না। তোর আর সুরোর একই অবস্থা।
তোর দাদাকে কতো বার বললাম। তোমরা কি সরকার চালাচ্ছ বলো তো। একটা ছেলেকে ধরে আনতে পারছো না।
আমার কথা শুনে বললো, যে ধরা দিয়ে বসে আছে, তাকে কি করে ধরবো বলো।
আমি কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না।
বৌদিরা চলে গেল। টিনা গেল নিজের ফ্ল্যাটে, আর মিলি গেল সেই ফ্ল্যাটে।
আচ্ছা বুবুন তোর কি একবারও ছেলটাকে মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছে করে না।
ওরা তোর মতো হয়েছে না আমার মতো হয়েছে একবারও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে না।
চিকনার কাছ থেকে তুই ওদের খোঁজ খবর নিস।
আমার কাছ থেকে তোর নিতে ইচ্ছে করে না।
আমি কি অপরাধ করেছি বল না।
প্লিজ প্লিজ বুবুন আমার সঙ্গে একবার কথা বল।
আমি যে আর পারছি না। হাঁপিয়ে উঠেছি।
আজ তোর ছেলে মেয়ে ক্লাস থ্রিতে উঠলো।
স্কুলে গার্জেন কল মিটিংয়ে গেলাম।
বড়মা ছোটমা দাদা মল্লিকদা এতো দিন যেত। আমি এই প্রথম গেলাম।
সত্যি কথা বলতে কি, স্কুলটা আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগে নি। কনিষ্ক খালি জোড় করে বলেছিল, তুমি আমার এই রিকোয়েস্ট টুকু রাখো। কয়েক বছর পড়াও, যদি ভালো না লাগে তাহলে তোমার পছন্দের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিও।
সত্যি স্কুলটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
প্রথম যেদিন ভর্তি করাতে এসেছিলাম সেদিন স্কুলটা সবে তৈরি হচ্ছিল। সাকুল্য দুশো বাচ্চা।
এখন প্রায় হাজার খানেক, কি নেই। বাচ্চাদের সমস্ত উপকরণ স্কুলটায় আছে।
স্কুলটা পরিচালনা করছেন ফাদার হ্যারিস।
উনি একজন মিশনারি। কিন্তু স্কুলের সমস্ত শিক্ষিকা এবং শিক্ষক এখানকার।
ফাদার মাঝে মাঝে এখানে আসেন। বেশির ভাগ সময় গোয়াতে থাকেন।
প্রিন্সিপ্যাল আন্টি আমাকে দেখে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন।
তারপর শুধু তুই।
আমি খালি শুনে গেলাম।
ফাদারের সঙ্গে তোর নাকি ভীষণ ভালো রিলেসন। সেই সূত্রে প্রিন্সিপ্যাল আন্টির সঙ্গে তোর পরিচয়। তুই নাকি এই স্কুলটার জন্য অনেক টাকা ডোনেসন তুলে দিয়েছিস।
ফাদার প্রিন্সিপ্যাল আন্টিকে বলেছেন তোর ছেলে মেয়েদের যেন টেক কেয়ার করা হয়।
যতো তোর কথা শুনি ততো মনটা ভারি হয়ে যায়।
বুকের ভেতর একটা যন্ত্রণা অনুভব করি।
তোর মেয়ে একটা ছেলেকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এলো।
জানো মা এটা শুভদীপ আমার ফ্রেন্ড আমি ওকে লাভ করি।
মেয়ের কথা শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো।
কি পাকা পাকা কথারে বাবা।
প্রন্সিপ্যাল আন্টি দুজনকে ডেকে নিয়ে দুটো টফি দিল, ওরা নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল।
জানেন ম্যাডাম শুভদীপের ব্যাকগ্রউন্ডটা ভীষণ স্যাড।
প্রিন্সিপ্যাল আন্টির কথায় তাকালাম।
কি রকম।
ওর বাবা মা নেই। দুজনেই মারা গেছেন। ও দাদু ঠাকুমার কাছে থাকে।
কি করে মারা গেলেন।
বলতে পারব না। শুভদীপ ফাদারের রেকমেন্ডেসন।
কেন জানিনা ছেলেটার প্রতি মায়া পরে গেলো।
প্রন্সিপ্যাল আন্টির সঙ্গে বেরিয়ে এলাম, দেখলাম শুভদীপ ওর দাদুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
কাছে গেলাম। ভদ্রলোক দাদার থেকে কয়েকবছরের ছোটই হবেন। কাঁচা পাকা চুল। বেশ স্টাউট ফিগার। প্রণাম করলাম।
আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
কেন।
শুভ বললো আন্টির সঙ্গে আলাপ করবে না।
ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।
দু’একটা সৌজন্য সূচক কথা বলে চলে এলাম।
সুমন্ত আজ পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে এলো।
ও এখন পুরো পুরি সুস্থ। ডাক্তারদাদা ওর জন্য লড়েছে। তবে ছেলেটাও ঋণ স্বীকার করলো। ওকে আমাদের অফিসে চাকরি দিয়েছি।
এখন ও কলকাতায় থাকে। দেশের জমি-জমা সব আমাদের ট্রাস্টিকে দান করেছে। ডাক্তারদাদা ওখানে একটা স্কুল করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে।
আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতে পারিস।
তোর সঙ্গে যারা মেশে তারা সবাইকি তোর মতো গোঁয়াড় গোবিন্দ।
আজ বিতানকে আমাদের অফিসে কিংশুকবাবুর পোস্টে জয়েন করালাম। কিংশুকটাকে দূর করলাম।…….
অনিসা আবার বোতলটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে জল খেল। কিছুতেই মনিটর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। যতো পরছে তত যেন নেশা ধরে যাচ্ছে। কিছুতেই চোখে ঘুম আসছে না।
পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে। আর নোট ডাউন করে চলেছে।
আজ এই মাত্র বাড়ি ফিরে তোকে লিখতে বসলাম।
বসিরহাট গেছিলাম। শ্মসান থেকে ফিরলাম।
সকাল থেকে দাদুর শরীরটা খারাপ ছিল। খবর পেয়ে সবাই গেছিলাম।
তোর ছেলে মেয়ের মাথায় দাদুর শীর্ণহাতটা ঘোরা ফেরা করছে। চোখের কোল বেয়ে জল পরছে। মুখ দিয়ে কোন কথা বলতে পারছে না। ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। ঘর থেকে বাইরের বারান্দায় চলে এলাম।
হাপুস নয়নে কিছুক্ষণ কাঁদলাম।
তোর মেয়ে এসে একবার কাপরের আঁচল টেনে ধরে বলেছিলো কাঁদছো কেন মা।
দাদাই তোমায় বকেছে।
কি বলবো তোর মেয়েকে।
বড়ো হোক সব জানতে পারবে।
দুপুরের দিকে দাদু দেহ রাখলেন।
বড়মা খুব কাঁদলো।
কেঁদে কি করবে।
ডাক্তারদাদা শেষ চেষ্টা করেছিল।
দাদু ইঞ্জেকসনটা নিতে পারল না।
শেষ সময়টুকু খুব কষ্ট পেল।
তোর ছেলে মেয়ে পাশেই ছিল।
কি বুঝলো, কতটুকু বুঝলো জানি না।
মামীমা বললো। শেষ কটা দিন খালি তোর নাম করেছে। জড়িয়ে জড়িয়ে বলেছে অনিটা এলো না। ওর সঙ্গে আর শেষ দাখা টুকু হলো না।
ভাবলাম একবার রেকর্ড করা তোর গলাটুকু শোনাই। তারপর ভাবলাম না থাক। তোর আবার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে।
আমি শ্মসানে গেছিলাম। ওখান থেকেই বাড়িতে এলাম। দাদা মল্লিকদা আমার সঙ্গে ফিরল। তোর ছেলে মেয়েকে বড়মা আসতে দিলো না। ওরা ওখানে রয়ে গেল।
আসার সময় সারা রাস্তা তোর কথা ভাবতে ভাবতেই এলাম।
একদিন বসিরহাট থেকে ফেরার পথেই তুই হারিয়ে গেলি।
খুব কষ্ট পেলাম আজ। বাবার মৃত্যুর পর দাদুর মৃত্যুটা ঠিক মেনে নিতে পারলাম না।
মনকে বোঝালাম দাদুর বয়স হয়েছিল।
দাদুর খুব ইচ্ছে ছিল, তোকে একবার দেখে। দেখতে পেল না।
ঠাকুর আজকে বড়ো বিপদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করলো। মনটা আজ ভীষণ ভীষণ আনন্দ লাগছে। আজ থেকে আবার বিশ্বাস করতে শুরু করলাম তুই আছিস। তুই আছিস।
আমার সুখ দুঃখের কথা কার সঙ্গে শেয়ার করি বল। তুই ছাড়া আমার কে আছে। তুই আমাকে সব কিছু দিয়েছিস, আর আমি যখন তোকে দিতে গেলাম, দেখলাম তুই আমার পাশে নেই। তোর ছায়াটা আমাকে সর্বোক্ষণ পাহাড়া দিচ্ছে।
বছর খানেক আগে সুনীতদা অফিসে এসেছিল ল ইয়ার নিয়ে। তার নাকি অনেক টাকা কড়ি পাওনা আছে অফিসের কাছে। সেই সব ঘটনার পর আমি কিছুই জানতাম না। কি কাগজপত্র তুই তৈরি করেছিলি। কি করেছিস না করেছিস তা কিছুই জানতাম না।
ইসলামভাই দাদা হিমাংশুর সঙ্গে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। ওরাও ঠিক হদিস দিতে পারল না। বললো এটা অনি হ্যান্ডেল করেছিল অনিই সব বলতে পারবে।
বিশেষ করে ওই জায়গাটা। এখন সেখানে অফিস তৈরি করে সব একাকার করে ফেলেছি। মনে হয় সুনীতদা সব নতুন করে তৈরি করে ডিমান্ড করছে। বেশ আট ঘাট বেঁধেই নেমেছে। অলরেডি কেশও করেছে।
তারপর চলেও গেল।
চোখ ফেটে জল আসছে।
তোর এতো কষ্টের জিনিস হারাতে হবে।
প্রায় দেড় বছর ধরে কেশ চললো। আমরা প্রায় হারতে বসেছি।
শুনানির লাস্ট ডেট আগামী সপ্তাহে। তারপর রায় বেরবে। নির্ঘাৎ হারছি এটা ধরে নিয়েছি। ইসলামভাই বললো ওকে সরিয়ে দেবে। রতন আবিদেরও একই কথা। আমি বাধা দিলাম।
বললাম যার জিনিষ সে যখন নেই তার সম্পত্তি আমরা রক্ষা করতে যাব কেন।
এটা তোর অভিমানের কথা। আমি আনিকে সব অরিজিন্যাল দলিল হাতে তুলে দিয়েছিলাম।
তাহলে অনিকে ধরে আনো।
ইসলামভাই আমার কথায় চুপ করে গেল।
ওই একটা দুর্বলতার জায়গা সবার।
আজ হঠাৎ সুনীতদা এসে হাজির।
ভরা অফিস। সবাই জানে কিছু একটা হয়েছে। সুনীতদা হয়তো ডিক্রী ফিক্রী কিছু বার করে নিয়েছে। হিমাংশুও এই কদিনে প্রায় বেসামাল হয়ে পরেছে।

বার বার আমাকে বলেছে। ওই দিনে অনি সুনীতদাকে দিয়ে সব কিছু লিখিয়ে নিয়েছিল। আমি নিজে হাতে ড্রাফ্ট করেছি। সেটা আপনি কোথায় আছে খুঁজে দেখুন। সেই দলিল কাগজপত্র আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও পাই নি।
অগত্যা প্রমাণ না করার দায়ে সব হারাতে বসেছি।
সুনীতদা এসে সোজা দাদার ঘরে ঢুকলো। উইথ ল ইয়ার।
আমি তখন দাদার ঘরে বসে আছি। চম্পকদা, সনাতানবাবু, ইসলামভাই, ডাক্তারদাদা আছে। আরও অনেকে। কার নাম বাদ দিয়ে কার নাম করবো। তোর কোর কমিটি।
মিটিং চলছে। এই বুঝি কিছু হয়। তার স্ট্র্যাটিজি তৈরি করছি।
সুনীতদা ঘরে ঢুকে সটাং দাদার পা ধরে হাপুস নয়নে কেঁদে ফেললো।
দাদা প্রথমে অবাক।
তোমার এটা আবার কি রকম নাটক সুনীত।
আপনি আমাকে বাঁচান দাদা।
আমি আবার তোমাকে কি করে বাঁচাব। দু’বছর ধরে কেশ করে তোমার সম্পত্তি উদ্ধার করছো। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তোমার কেশের জবাব দিতে পারতাম।
অনি বেঁচে আছে দাদা, আমি কোনদিন আর এ ভুল করবো না।
সারা ঘর নিমেষে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পিন পরলে শব্দ হবে।
সকলে সুনীতদার কথায় অবাক। দাদাও প্রথমে ব্যাপারটা ধরতে পারে নি। আমি কোন ছাড়।
বেশ কিছুক্ষণ পর সবার সম্বিত ফিরে এলো।
কি করে বুঝলি, অনি বেঁচে আছে। চম্পকদা বললো।
আজ সকালে আমাকে ফোন করেছিল। চব্বিশ ঘন্টা সময় দিয়েছে। যদি কেশটা উইথড্র না করি, আজই আমার বংশ লোপাট করে দেবে।
পুলিসের কাছে যা। ডাইরী কর। তোকে ভয় দেখাচ্ছে বলে।
বিশ্বাস কর চম্পক আমি মিথ্যে বলছি না।
তুই সত্যি বলছিস প্রমাণ কোথায়।
আমাকে হুইপ করল সব কথাবার্তা রেকর্ড করতে এবং অফিস খোলার আধঘন্টার মধ্যে তোদের কাছে এসে ক্ষমা চাইতে। তারপর এখান থেকে কোর্টে গিয়ে কেশটা উইথড্র করতে।
তুই বাধ্য ছেলের মতো সব কথা শুনে ফললি।
উপায় নেই। আমি ওকে চিনি। ও মুখে যা বলে তাই করে।
দেশের কিছু আইন কানুন আছে।
ও আইন কানুনের উর্ধে।
ইসলামভাই এই গুরুগম্ভীর পরিবেশের মধ্যেও হেসে ফেললো।
তুই রেকর্ড করেছিস।
করেছি।
শোনা।
সুনীতদা দাদার পায়ের কাছ থেকে কিছুতেই ওঠে না।
তারপর অনেক কষ্টে চম্পকদা সুনীতদাকে টেনে তুললো।
তুই জানিস না চম্পক একমাত্র দাদা ছাড়া এই ভূ-ভারতে ও কাউকে পাত্তা দেয় না।
ন্যাকামো করিস না ওঠ। এতই যদি ভয়, কেশ করতে গেলি কেন।
আমি ভেবেছিলাম ও মরে গেছে।
চম্পকদা হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না।
সুনীতদা ফোনটা চম্পকদার হাতে দিল।
তুই রেকর্ডিংটা চালা।
চম্পকদা রেকর্ডিংটা চালালো।
নিস্তব্ধ ঘরে পিন পরলে শব্দ হবে।
হ্যালো।
কে রে সুনীত।
আপনি কে বলছেন।
তোর বাবারে, বাবা। এরি মধ্যে অবতারকে ভুলে গেলি। কলকাতায় নেই বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছিস। অনেকের সঙ্গে কাওতালি করেছিস। সব খবর আছে।
কি বাজে বকছেন।
ধর অনিদার সঙ্গে কথা বল।
অনি মরে গেছে।
তোর বাবা মরেছে। অনিদা সামনে আছে বলে তোকে ধুতে পারলাম না। না হলে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতাম।
দেতো ফোনটা আমাকে, ওর কপচান বার করছি।
সাগিরের গলা পেলাম।
শোন অনিদাকে মারার মতো লোক এখনো পৃথিবীতে জন্মায়নি। নে কথা বল।
আমি কথা বলবো না।
তাহলে আজ রাতের মধ্যে তুই সমেত তোর বংশ লোপাট হয়ে যাবে।
আর একটা কথা শোন। এটা রেকর্ডিং কর।
সকালে অফিস খুললে আধা ঘন্টার মধ্যে কেশটা উইথড্র করবি। কাগজপত্র সব পৌঁছে যাবে। ভাল করে দেখে নিবি। অরিজিন্যাল না ডুপ্লিকেট। তোর ওই উকিলটাকে দেখিয়ে নিবি। তারপর ওর হাইকোর্টে প্র্যাক্টিশ করা বার করছি।
তুই এতো কথা বলছিস কেনরে অবতারদা। শালা বেশি তরপাচ্ছে। বল সময় নষ্ট করলে এখুনি করকে দেব। আর কাগজের অফিসে যেতে হবে না।
নেপলার গলা পেলাম।
রেকর্ডিং করছিস।
করছি।
প্রথম থেকে করছিস না এখন থেকে করছিস।
তোর বলার আগে থেকে করছি।
এইতো ভালো ছেলে। নে ধর অনিদার সঙ্গে কথা বল।
তুই বিশ্বাস করবি না বুবুন, সারাঘর নিস্তব্ধ।
কারুর মুখে কোন কথা নেই।
আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তাকিয়ে দেখলাম শুধু আমি নয়। সবার মুখ কেমন থম থমে।
সবাই রুদ্ধশ্বাসে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে আছে। কারুর চোখে পলক পরে না। ইসলামভাই-এর চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে গরম শ্রোত বইছে। এগারো বছর পর তোর গলা শুনবো। এক যুগ। মিলি, টিনা, অদিতি, নির্মাল্য, বিতান, দেবার চোখ মুখ কেমন যেন হয়ে গেছে।
হ্যালো।
তোর গলা শোনা মাত্র সকলের চোখের রং বদলে গেল।
হ্যালো।
সুনীতদা আমি অনি। গলাটা চিনতে পারছ।
পারছি।
এবার বুঝতে পারছ। আমি সেদিন এ্যাক্সিডেন্টে মরিনি। ওটা একটা সাজান ঘটনা।
বুঝতে পারছি।
চম্পকদা মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেললো।
এটা তুমি কি করলে। এতোবার বলা সত্বেও, তুমি এটা কি ভাল কাজ করলে।
তুই এতো ঠান্ডা এতো নরম গলায় কথা বলছিস ভাবতেই পারছি না। সেই গলা সেই থ্রোইং।
আমার হকের জিনিষ, কেন ছাড়বো। প্রমাণ করুক মিত্রা ওটা ওর।
ওই সম্পত্তিটা মিত্রার নয়, আমার নামে লিখে দিয়েছিলে, এটা ভুলে গেলে কি করে।
তার কাগজপত্র মিত্রা দেখাতে পারে নি।
কোনদিন দেখাতে পারবে না। থাকলে তো দেখাবে। তাই তুমি সেই সুযোগটা নিলে।
বেশ করেছি তোর ক্ষমতা থাকলে দেখা।
আমি এখানে বসে বসে এতদিন তোমার রগড় দেখছিলাম। যদি মনে করতাম, শেষ যেদিন আমি কোর্টে হাজির ছিলাম, সেদিনই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়ে চলে আসতাম।
তুই কোর্টে হাজির ছিলি!
তাহলে কি ম্যানা বোতল মুখে নিয়ে এখানে বসে বসে দুদু খাচ্ছিলাম।
ঘর ভর্তি সবাই মুখে হাত চাপা দিয়েছে।
যাক যেটা বলছি মন দিয়ে শুনে নাও।
তুই আমাকে ওটা ফিরিয়ে দে।
তোমার দিবাকরকে আমি তুলে নিয়ে চলে এসেছি। তোমার শেষ অস্ত্র এখন আমার হাতে।
কথাটা শোনা মাত্র আমি থ হয়ে গেলাম। সত্যি কয়েকদিন ধরে দিবাকরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিকনা আমাকে ফোন করেছিল।
রাজনাথ, ডঃ ব্যানার্জীর যা হাল করেছি তোমরও তাই হাল করে ছেড়েদেব। কোনদিন কোর্টে কেশ উঠবে না।
এটা তুই কি বলছিস।
যা বলছি তোমার ভালর জন্য বলছি। আমার অনেক কাজ। বেশি কথা বলার সময় নেই।
বল কি করতে চাস।
তোমার এ্যাকাউন্টে কিছু ডলার পাঠিয়ে দিচ্ছি। কাল পেয়ে যাবে। সেটা নাড়াচাড়া করে কিছু করে-কম্মে খাবে।
আর শোন, অনুপ বলে একটি ছেলে অফিসে যাবে।
আমার বিশেষ বন্ধু। তার কাছে সমস্ত ইনফর্মেসন থাকবে। আমি সমস্ত ব্যাপারটা ফলোআপ করছি। কথা না শুনলে, অবতার যা বললো, সেটা ঘটবে। তখন আমার হাতের বাইরে চলে যাবে সব কিছু।
ফোনটা কেটে গেলে।
সারাঘর নিস্তব্ধ আমার হাত-পা ঠক ঠক করে কাঁপছে।
দাদা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
ইসলামভাই-এর মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
চম্পকদা বুঝতে পেরেছে দাদা ভীষণ আপসেট হয়ে পরেছে।
চেয়ার থেকে উঠে দাদার কাছে গেল।
দাদা হরিদাকে একটু চা আনতে বলি।
দাদা মুখ তুললো।
দাদার চোখে জীবনে প্রথম জল দেখলাম।
ডাক্তারদাদার মুখটাও কেমন থম থমে।
জানিনা আবিদ রতন এখানে উপস্থিত থাকলে কি করতো।
মল্লিকদা উঠে দাদার কাছে এলো। আমি দাদার পাশেই বসে আছি।
তুই বল চম্পক….।
দাদা আর কথা বলতে পারল না। গলাটা ধরে এলো।
কথা বন্ধ হয়ে গেল। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
মুখে চোখে কী ভীষণ যন্ত্রণার ছাপ তা তোকে বলে বোঝাতে পারব না।
আপনি এরকম করলে কি করে হবে।
দাদা ধরা গলায় বললো, কি রাজকার্য করতে গেছে শুনি।
আপনি আমার থেকে ওকে ভালো করে চেনেন।
বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে ভালো করে তাকাতে পারি না। ওদের দেখলেই ওর কথা মনে পরে যায়। মনে হয় এই যেন ও এসে পরেছে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনি শুনলেন সব কথা।
আমাদের অফিসের অবস্থাও আপনি দেখছেন। অনেক ডিসিসান কে নিচ্ছে, আপনি নিশ্চই বুঝতে পারছেন, আমরাও বুঝতে পারছি। আমরা একসঙ্গে ওই ডিসিসন গুলোয় সহমত হয়েছি।
এখান থেকে এইটুকু, একবার দাদা বলে এসে মুখটা দেখিয়ে যেত পারতো না।
হয়তো ওর কোন অসুবিধে আছে।
হরিদা উঁকি মারল। দাদার ওরকম অবস্থা দেখে ভেতরে এসে সুনীতদার ওপর সে কি তেন্ডাই মেন্ডাই। এই বুঝি সুনীতদার গালে থাপ্পর কষায় আর কি। ঘরে তখন এক হুলু-স্থূলুস কান্ড।
সনাতনবাবু গিয়ে হরিদাকে আটকায়। যে ল-ইয়ার এসেছিল তার মুখ চুন।
বরুণদা এতো ঠান্ডা মাথার ছেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে চলে গেল।
এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে, সে বুঝে উঠতে পারে নি।
বুড়োকে ধরে রাখা যায়, হরিদা হাঁপিয়ে গেল।
তারপর একটু থিতু হতে বললো, নীচে অনুপ বলে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, দিদিমনির সঙ্গে দেখা করতে চান।
তুই ডেকে নিয়ে আয়, এ ঘরেই আসুক, কি বলিস মিত্রা ?
চম্পকদা বললো।
আমি মাথা দোলালাম।
হরিদা বেরিয়ে যেতে চাইছিল।
চম্পকদা চায়ের কথা বললো।
দাদা কাঁদছে কেন আগে বলো।
হরিদাও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।
বলছি বলছি তুই আগে সবার জন্য চা বল বটাদাকে।
হরিদা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।
ওরে তোকে কি বলবো। তোর অনুপ সবে মাত্র ঘরে ঢুকেছে। ঠিক পেছন পেছন বটাদা হাজির।
হরিদাকে তো আটকান গেছিল।
বটাদাকে ধরে রাখা যায় না। দেবাশীষ, বিতান, নির্মাল্য হাঁপিয়ে গেল।
দুই উড়ে তখন রাজ করছে ঘরের মধ্যে। বুড়োর সে কি তেজ।
বলে কিনা, একটাকে খেয়েছিস আর দুটোকে খেতে এসেছিস। তোর রক্ত টাটকা খেয়ে নেব।
বাধ্য হয়ে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম।
কোনপ্রকারে বুঝিয়ে শুনিয়ে বললাম তোমাদের ছোটবাবু বেঁচে আছে।
কথাটা শোনা মাত্রই দুজনে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার কথা আমরা এতোক্ষণ শুনছিলাম।
তোকে কি বলবো বুবুন, নিমেষে মুখের ভঙ্গিটা কেমন চেঞ্জ হয়ে গেল।
বটাদা কেমন কাঁপতে কাঁপতে বসে পরলো।
আমিতো ভাবলাম এইরে স্ট্রোক হয়েগেল।
চোখে মুখে জলের ছিটে দিলাম দেখলাম বটাদা নড়েচড়ে উঠলো।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, কালকেই আমি মায়ের কাছে জোড়া পাঁঠা দেব।
তোর অনুপ এসব দেখে পুরো ফিউজ।
তাকে কি দেখভাল করবো। ঘর সামলাতেই আমরা সবাই হিমশিম খেয়ে গেলাম।
প্রায় আধঘন্টা পর স্বাভাবিক হতে পারলাম।
অনুপ তার নিজের পরিচয় দিল।
সে নাকি সুপ্রীমকোর্টে প্র্যাক্টিশ করে।
কলকাতায় বাড়ি। তুই নাকি ওকে সুপ্রীমকোর্টে প্র্যাক্টিশের ব্যবস্থা করে দিয়েছিস।
মিত্রাদেবী কে।
আমি।
তাকালাম।
আপনার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে।
আপনি এখানে বলতে পারেন। আমি সবার সঙ্গে ওনার পরিচয় করাই আর উনি বলতে থাকেন আমি সবার নাম শুনেছি। কারুর সঙ্গে পরিচয় হয় নি। সবাইকে আমি এই প্রথম দেখছি।
বটাদা চা নিয়ে ঢুকল।
চা খেতে খেতে দাদা একটু স্বাভাবিক হলো।
হ্যাঁ গো অনুপ তোমার সঙ্গে অনির পরিচয় কি করে।
দাদা বললো।
আমি ও একসঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে পরতাম।
তুমিও কি জার্নালিজম নিয়ে পরেছো।
হ্যাঁ। তারপর ওর বুদ্ধিতে ওকালতি পরি।
এখানে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে প্র্যাক্টিশ করতাম। তারপর আমাকে ধরে নিয়ে গেল দিল্লিতে।
তোমার সঙ্গে ওর শেষ দেখা কবে হয়েছিলো।
যে দিন আপনাদের লাস্ট কেশের ডেট ছিল।
তুমি সেদিন কোর্টে ছিলে!
আমি ছিলাম না। আমার লোক ছিল। আমি কোর্টের বাইরে ছিলাম।
চম্পক তুমি সনাতনবাবু সেদিন গেছিলে না।
গেছিলাম।
অনিকে দেখেছ।
দেখলে কি খালি হাতে ফিরতাম।
তোর অনুপ হাসছে।
হাসছো কেন অনুপ।
ও চেনার মতো পোষাক পরিচ্ছদ পরে এখানে আসে নি। সুনীতবাবু কে ?
সুনীতদা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
উঠতে হবে না বসুন।
দাদার দিকে তাকিয়ে।
দাদা নিচে আমার একটা বড়ো ভিআইপি স্যুটকেস আছে। বেশ ভাড়ি। নিয়ে আসতে হবে। কেউ যদি আমার সঙ্গে একটু যায়।
তোমায় যেতে হবে না। আমি বলে দিচ্ছি।
দাদা ফোনে বলে দিল।
হায়, দেখি নিউজরুম থেকে সন্দীপ, অর্ক, অরিত্র, দ্বীপায়ণ তোর রাত্রি, খুশী সব এসে হাজির। সারা অফিস রাষ্ট্র হয়েগেছে। দাদা সবাইকে ধমকে ঘর থেকে বার করে দিল।
আর বার করা। একদল যায় তো একদল আসে। তারা সবাই সুনীতদাকে দেখে নেবে।
আমি হাসব না কাঁদব। বোবার মতো বসে আছি।
দেবাশীষরা সুনীতদার মোবাইল থেকে তোর রেকর্ড করা গলা ব্লুটুথে ট্রন্সফার করে নিল।
সেই ভিআইপি স্যুটকেশ এলো।
এখানে সবাই অনির খুব ক্লোজ। আমি নির্ভয়ে খুলতে পারি।
হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি খোল।
স্যুটকেশটা খুলতেই আমি উঁকি মারলাম। ঠাসা মালপত্র, মিষ্টির বাক্স, অনুপ একটা ফাইল বার করলো।
দাদা এর মধ্যে সব আছে। আপনি দেখে নিন।
আমি কি বুঝবো বলো। তুমি উকিল তুমি এদের বুঝিয়ে দাও। হিমাংশু তুমিও বুঝে নাও।
মল্লিকদা দেখলাম ঘরের এককোনে ফিস ফিস করে কথা বলছে। বুঝলাম কার সঙ্গে কথা বলছে।
অনুপ সুনীতদার ল-ইয়ারের হাতে দোলিলগুলো দিল। উনি দেখে চোখ কপালে তুললেন।
সুনীতদার দিকে তাকালেন।
আপনি এই অরিজিন্যল কাগজের এগেনস্টে লড়ছিলেন।
সুনীতদা চুপ।
আপনি হাইকোর্টে জিততেন। তারপর কেশটা সুপ্রীম কোর্টে গেলে কি হতো বুঝতে পারছেন। আপনি সব জেনেও একটা সাজান কেশ করতে গেলেন।
সুনীতদা মাথা আর তোলে না।
ভদ্রলোক রাগ করে বললেন এখানে আর বসে থেকে লাভ নেই। কোর্টে গিয়ে কাজ সারি।
এই নিন, আপনারা যে কেশটা উইথড্র করবেন তার ফাইল। এখানে সবকিছু বলা আছে।
ফাইল ঘুরছে সবার হাতে, ডাক্তারদাদা ডুব দিল কাগজপত্রের মধ্যে।
সেই ল-ইয়ার ভদ্রলোক এবার দাদাকে বললেন।
দাদা আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।
বলুন।
বছর দশেক আগে আপনাদের কাগজে অনি ব্যানার্জী বলে একজন কাজ করতো।
রাজনাথ বাবুর সম্বন্ধে ডঃ ব্যানার্জীর সম্বন্ধে তখন বহু লেখা লেখি হয়েছিল। উনি লিখেছিলেন। তখন একটা ঝড় বইছিল কলকাতা শহরে।
হ্যাঁ ওই অনি ব্যানার্জীই এই অনি ব্যানার্জী।
বাবাঃ গলা শুনে তো মনে হচ্ছিল উনি ডন।
এই শয়তানরা ওকে ডন বানিয়েছে। আজ ও দেশ ছাড়া। কেন আপনার গুনমন্ত্র মক্কেল সব খোলসা করে বলে নি।
বললে কি কেশটা হাতে নিতাম দাদা। কাগজের এগেনস্টে কেশ, জিতলে একটু নাম ডাক হবে। মক্কেল বেশি পাব। এই ভেবে কেশটা হাতে নিয়েছিলাম।
এরই মামা ডঃ ব্যানার্জী। আর কিছু বললাম না। ওর মুখ থেকে শুনে নেবেন।
মিত্রাদেবী ?
অনির স্ত্রী।
বোঝা হয়ে গেছে।
আপনি শুধু সুনীতবাবুকে বাঁচালেন না। আমাকেও একটা নোংরামোর হাত থেকে বাঁচালেন।
উঠি দাদা।
ভদ্রলোক হাতজোড় করলেন।
হিমাংশু কোর্টে গেল, সনাতনবাবু, চম্পকদা সঙ্গে গেল।
এবার তোর অনুপ ঝোলা থেকে সব বার করতে আরম্ভ করল।
প্রথমে দাদার হাতে একটা খাম দিল।
এটা আপনার জন্য।
কি এটা ?
প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারব না দাদা।
এই দেখুন এই কাগজে সিরিয়ালি লেখা আছে। আমি ধরে ধরে দিয়ে যাচ্ছি।
ইসলামভাই।
আমি।
এই খামটা আপনার।
একে একে নাম ধরে ধরে ডাকে আর একটা করে খাম হাতে দেয়।
মিলি, টিনা, দেবা, সনাতনবাবু, চম্পকদা, নির্মাল্য, বরুণদা, জ্যেঠিমনি, মল্লিকদা সবার খাম।
দুটো প্যাকেট বার করলো একটা বড়মার একটা ছোটমার।
এগুলো দিল্লির লাড্ডু হুকুম ছিল কিনে পাঠান হয়েছে।
ম্যাডাম আপনি এগুলো সবার মধ্যে ভাগ করে দিন।
এর ভেতরে দুটো প্যাকেট আছে। ওটা বার করলাম না। বাড়িতে গিয়ে আপনি দেখবেন।
আর বড়মা ছোটমার প্যাকেটটা ওনারা খুলবেন আর কেউ খুলবে না।
অনুপ আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
দাদা দেখি আপন মনে হো হো করে হেসে ফেললো।
সবাই প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেল।
ওরে আগে কম্পোজে পাঠা মল্লিক, বলে কিনা নিজস্ব সংবাদদাতা। আমি ওর নাম ছেপে দেব। দেখি তুই কতোবরো দাদা হয়েছিস।
ডাক্তারদাদা দাদার দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকাল।
তুমি কি পাগল হয়ে গেলে।
হ্যাঁ ডাক্তার, আমি পাগল হয়ে গেছি। দেখো দেখো আমি যে জিনিসটা চাই সেটাই পাঠিয়েছে। উইথ ফটোগ্রাফ।
বিতান, হরিকে ডাক, চা আনতে বল।
নাঃ যাই করুক লেখাটা ভোলে নি, বুঝলি মা। কি কনস্ট্রাকসন শব্দগুলোর কি তেজ।
দাদা আমার দিকে তাকাল।
একেবারে তোর ছেলেমেয়ের মতো আচরণ করছে।

হরিদা বটাদা চা নিয়ে ঢুকলো। পেছন পেছন অর্ক, অরিত্র, সায়ন্তন, সন্দীপ, দ্বীপায়ন।
দেখ সন্দীপ দেখ অনি লেখা পাঠিয়েছে। একচ্যুয়েলি তিনটে ইনস্টলমেন্টে পুরোটা বেরিয়ে যায়। একসপ্তাহ ধরে কনটিনিউ করবি। দ্বীপায়ন ছবিগুলো ভালো করে প্লেস কর।
ঘরের মধ্যে যেন হরির লুট চলছে।
দাদা বড়মাকে ফোন করলো।
ইসলামভাই ওর্ণাদিয়ে চোখ মুছছে।
তোমার আবার কি হলো ইসলাম।
ডাক্তারদাদা বললো।
গতো সপ্তাহ পর্যন্ত যা ভুল কাজ করেছি, তার একটা লিস্ট পাঠিয়েছে। কি করতে হবে তাও বলে দিয়েছে।
তার মানে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ও কলকাতায় ছিল ?
ডাক্তারদাদা অনুপের দিকে তাকাল।
কি অনুপ তুমি মিছে কথা বলছো কেন।
বিশ্বাস করুণ স্যার। আজ সকালে এই স্যুটকেশ আর এই চিঠিটা আমার বাড়িতে আসে। গাড়ির কাঁচে লেখা ছিল প্রেস বিবিসি।
আমাকে বাক্সটা হ্যান্ড ওভার করে গাড়িটা ভোঁ করে চলে গেল।
তারপর আমার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এলো আধঘন্টা পর। পরলাম। সব জানতে পারলাম। আপনি যদি ম্যাসেজটা দেখতে চান এখুনি দেখাতে পারি।
দেখাও।
ডাক্তারদাদা মুখের কথা আর কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না।
অনুপ মোবাইল থেকে ম্যাসেজটা বার করে ডাক্তারদাদার হাতে দিল।
অনুপ ম্যাসেজটা ফরোয়ার্ড করে দাও না।
দেবাশীষ বললো।
অনুপ হাসছে।
নিয়ে নিন।
ঘরে তখন হৈ হৈ রৈ রৈ।
আচ্ছা মামনি।
আমি ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
এখানে কেউ আবার অনির ইনফর্মার নেই তো।
সবাই উচ্চশ্বরে হেসে ফেললো।
জব্বর কথা বলেছো ইসলাম।
দাদা বললো।
কাকে বিশ্বাস করি বলুন দাদা। সব কেমন যেন স্বপ্ন দেখছি মনে হচ্ছে।
তুমি স্বপ্ন দেখ আমি আর দেখতে রাজি নই। ছেলেটা এলো, তোমরা খপ করে ধরতে পারলে না।
কি করে বুঝবো। যে কটাকে আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম, তাদের গলা শুনলেন।
তুমি খোঁজ লাগাও, দেখ ওদের চ্যালা চামুন্ডা কে আছে।
আমি কি বসে আছি দাদা। নো ট্রেস।
একবার ভালকরে খুঁজে দেখ ঠিক পেয়ে যাবে।
দেখি।
অনুপ তার কার্ডটা আমাকে দিল।
আমি আমার কার্ড দিতে গেলাম।
আপনাদের সবার নম্বর আমার কাছে আছে।
তারপর দাদার কাছে গিয়ে বললো দাদা একটা অপরাধ হয়ে গেছে।
আবার কি হলো ?
আপনাদের কাউকে প্রণাম করা হয় নি।
কেন খবরটা চলে গেছে বুঝি।
সবাই আবার হেসে ফেললো।
অনুপ সবাইকে প্রণাম করে চলে গেল।
যাওয়ার আগে বললো, আমাকে প্রয়োজন হলে ফোন করবেন।
ফোন করবো কি হে তুমিই তো এখন শিখন্ডি।
আবার সবাই হাসে।
আমি অনুপের পেছন পেছন বাইরে এলাম।
গেটের মুখে দাঁড়ালাম।
এটা আমার তরফ থেকে আপনাকে দিলাম। কেউ যেন জানতে না পারে। এমনকি অনি পর্যন্ত। তাহলে ওর হাতেই আমার মৃত্যু লেখা থাকবে। আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি।
আমি ছোট্ট খামটা ওর হাত থেকে নিলাম। হাসলাম।
আসি ম্যাডাম।
নিজের ঘরে গেলাম। ব্যাগটা গুছিয়ে নিলাম। দাদার ঘরে গেলাম।
দাদা আজ আর ভাল লাগছে না। আমি বাড়ি যাই।
ডাক্তারদাদা হঁ হঁ করে উঠলো। তুই একা কেন। আমিও যাব।
ইসলামভাই উঠে দাঁড়াল। আমিও যাব।
আমার গাড়িতেই সকলে এক সঙ্গে উঠলাম।
গাড়ি এসে গেটের কাছে দাঁড়াতেই বারান্দা দিয়ে দেখলাম দামিনীমাসি নেমে বাগানে চলে এল। পেছন পেছন বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি।
মনে মনে ভাবলাম এরি মধ্যে দামিনীমাসি, জ্যেঠিমনি এলো কোথা থেকে!
আমাদের কি নামতে দেয়।
আমি নামতেই দামিনীমাসি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজলো।
ছোটমা, বড়মা, জ্যেঠিমনির মুখ কাঁদো কাঁদো। দিদিভাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তোর ছেলে মেয়ে পিকু তার স্বরে চেঁচা মিচি করছে।
অনি কোথায় আছে বল।
আচ্ছাই শুরু করলে তোমরা, ভেতরে চলো, সব বলছি।
কে কার কথা শোনে।
ততক্ষণে রবীন গাড়ির পেছন থেকে সেই বড়ো এ্যাটাচিটা নামিয়ে নিয়েছে।
দিদিভাই এইবার বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এলো।
তোর ছেলেমেয়েদের কোন হুঁস নেই। পিকুদাকে পেয়ে তারা স্বর্গরাজ্য দেখেছে।
দিদিভাই ইসারা করে বললো বল না একটু।
আমি মনে মনে হাসি। আসল লোকটার দেখা নেই। তার গলা নিয়ে কি কান্ডটাই না ঘটে যাচ্ছে।
আচ্ছা তোর কি একটুও ইচ্ছে করে না। এদের মুখ গুলো দেখতে।
আমরা তিনজনে এসে ভেতরের ঘরে বসলাম।
তোর মেয়ে ইসলামভাই-এর গলা জড়িয়ে ধরে বললো, ভাইদাদাই আমরা চোর পুলিশ খেলছি।
তোরা ওই ঘরে গিয়ে খেল, আমরা একটু কথা বলি।
ওরা চলে গেল।
ডাক্তারদাদা ইসির দিকে তাকিয়ে বললো, একটু চা কর না।
কিছু খেয়েছো।
বড়মা বললো।
না সকাল থেকে যা চললো জুটবে কোথা থেকে।
ভাত খাও।
আগে একটু চা দাও।
দিদিভাই রান্নাঘরের দিকে গেল। বুঝলাম কানটা এদিকে রেখে গেল।
কি বলবো। খালি ওর গলা শুনলাম।
মল্লিক যে বললো ও কলকাতায় এসেছিল। বড়মা বললো।
ইসলাম বললো সাতদিন আগে পর্যন্ত ছিল। দামিনীমাসি বললো।
ইসলামভাইকে জিজ্ঞাসা করো।
এসেছিল আমরা কেউ দেখতে পাই নি। অনুপ বলে ছেলেটি ওর সঙ্গে ছিল।
ডাক্তারদাদা বললো।
হ্যাঁগো ইসলাম তুমি কি করছিলে।
কি করবো তুমি আমাকে বলো দিদি।
রতন আবিদ কি করছে।
ওরা হয়তো আমার থেকে বেশি জানে।
আসুক আজকে ঝেঁটা মেরে বিদায় করবো।
এই মুহূর্তে আমার হাসি পেল না। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
দিদিভাই চা নিয়ে এলো।
চা খেতে খেতে আমি ওদের রেকর্ডিংটা শোনালাম। জ্যেঠিমনি, বড়মা ডুকরে কেঁদে উঠলো।
এই দেখো তোমরা এরকম করলে আমি উঠে চলে যাব।
বড়মা আমার পাশে এসে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
কান্না থামাও আর একটা জিনিষ শোনাব।
বড়মা চোখ মুছছে।
শোনার পর কাঁদতে পারবে না। প্রমিস।
বড়মা মাথা দোলাচ্ছে।
আবার কি শোনাবি!
ইসলামভাই-এর চোখ বড়ো বড়ো।
শোন না আগে তারপর বলছি।
সবাই হুমড়ি খেয়ে পরেছে। আমার মোবাইলটার ওপর। আবার সকলের চোখে মুখে উত্তেজনা।
আমি দশ বছর আগে তোর গলার রেকর্ডিংটা অন করলাম।
কিরে আজ আবার পা পিছলে ছিলি।
কই।
তাহলে মিত্রাকে খবর পাঠালি কেন।
এ খবরটাও তোর কাছে চলে গেছে।
তোকে বলেছিনা চিকনা আমি সাধনা করছি। আমার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাবার চেষ্টা করবি না।
ক্ষমা কর।
আমার কাছে ভুলের কোন ক্ষমা নেই। এটা তুই ভাল করে জানিস।
কি করবো, গুরুমার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।
ওটা তোর আর তোর গুরুমার ব্যাপার।
একটুক্ষণ চুপ।
চুপ করে রইলি কেন।
কি করবো বক বক করবো, তুই আমাকে আর ফোন করে জানতে চাইবি না।
তাহলে সরে যেতে হবে।
কবে সরাবি বল, আমি প্রস্তুত। আমার আর ভাল লাগছে না।
চিকনার কান্না।
বাচ্চা দু’টোকে কোলে নিয়েছিলাম বললো তুমি আমার বাবাকে দেখাবে। কি উত্তর দেব।
মেয়ের দিব্যি খেয়ে বলছি চিকনা টোডিকে এমন মার মারব, ওর বডির একটা টুকরো তোরা কেউ খুঁজে পাবি না। খালি কয়েক টুকরো পোড়া মাংসো পাবি।
একটু থেমে।
শালা জীবনটাকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে খাক করে দিলো। গলাটা ধরে গেল।
চুপ চাপ।
কথা বলছিস না কেন, আমার প্রশ্নের উত্তর দে। পৃথিবীতে তুই ঠিক আর সবাই ভুল।
চুপ চাপ।
বোবার শত্রু নেই তাই না। তুই কি হনু হয়ে গেছিস। আমি আর কতো জবাব দিহি করবো। কতো মিথ্যে কথা বলবো। বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি, সুরো কতো নাম বলবো।
সুরো এসেছে!
হ্যাঁ।
কাঁদছিস ?
না।
বৌদি।
এসেছে।
হ্যাঁরে বাচ্চাদুটো তোকে কি বললো।
দেখলাম বড়মা মুখে কাপর চাপা দিয়েছে। কাঁদতে পারছে না। ছোটমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসির একই অবস্থা।
ডাক্তারদাদার চোখ মুখ স্থির, যাকে বলে একেবারে কুল।
ইসলামভাই-এর গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে।
কি বলবে, পাটালি খাওয়ালাম। নিজে হাতে বানিয়ে ছিলাম।
খাইয়েছিস। কি বললো খেয়ে।
কি বলবে, কিছুটা খেয়ে আমার মুখে ঢুকিয়ে দিল।
কেমন দেখতে হয়েছেরে, মিত্রার মতো ?
কাল এসএমএস করে তোকে ছবি পাঠাব।
পাঠা।
বুঝলি এবার কলকাতা গিয়ে তিনবার চান্স নিলাম দেখার জন্য, দেখতে পেলাম না। কেউ নিয়ে বাগানে বেরলই না।
তুই এখন কোথায়। দুবাই না লন্ডন।
লন্ডন।
মিথ্যে কথা বলছিস।
বিশ্বাস কর। কাগজের অফিসটা বানাব তার তোর জোর করছি।
হ্যাঁরে, বড়মার চুলগুলো একেবারে সাদা হয়ে গেছ তাই না।
আচ্ছা তার আগে বল কারা কারা এসেছে।
সবাই। দামিনীমাসি পর্যন্ত।
দামিনীমাসি এসেছে!
হ্যাঁ।
শোবার জায়গা কোথায়।
রাজপ্রাসাদ বানিয়েছি।
আবার ঝামেলা শুরু করে দিলি।
ছাড়, কথা বলতে ভালো লাগছে না।
তুই এখন কোথায়।
পীরসাহেবের থানে বসে আছি।
কটা বাজে বলতো।
দুটো ফুটো হবে।
আমাদের এখানে সবে মাত্র বিকেল হলো।
হ্যাঁরে ছোটমাকে দেখতে কেমন হয়েছে।
ছবি তুলে পাঠাব, দেখে নিবি।
তুই গরম খেয়ে যাচ্ছিস কেন।
বেশ করছি, কবে মারবি বল।
তোকে মারলে আমিই মরে যাব।
মেয়েটা তোর মতো দেখতে হয়েছে।
ধ্যাত।
দেখে নিবি।
কোনটা বেশি দুষ্টু।
মেয়েটা। ছলেটা ভিঁজে বেড়াল।
কি রকম করে কথা বলছে।
রেকর্ড করে পাঠাব।
পাঠা। প্রজেক্টের খবর বল।
ঠিক ঠাক চলছে। একটু ঝামেলা হচ্ছিল পার্টিগত ভাবে।
অনিমেষদাকে জানিয়েছিস।
না। সামলে নিয়েছি।
রসদ আছে।
আছে।
কাকা কেমন আছে।
ভাল। তোর ওদিকের কাজের খবর কি।
মিঃ মুখার্জীকে যে মাল গুলো সাল্টে ছিল। তার চারটেকে হজম করেছি। আর দুটো বাকি আছে। আশা রাখছি আগামী সপ্তাহে হজম করে নেব।
অবতার সাগির কোথায়।
দুবাইতে।
টোডি।
লন্ডনে।
তাই তুই লন্ডনে।
হ্যাঁ। ওকে চেইন করে বেঙ্গলে নিয়ে যাব। শালা নাম ভাঁড়িয়ে বড়ো ব্যবসায়ী হয়েছে।
কতোদিন সময় নিবি।
বলতে পারছি না। তবে ওই কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারুর সঙ্গে কথা বলবো না।
নেক্সট ডেট বল।
ম্যাসেজ করবো।
তোর নম্বরটা গুরুমাকে দেব।
না। কাজের জায়গায় দুর্বলতার কোন স্থান নেই। একথা তোকে আগেও বলেছি।
আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
সম্ভব না হলে অনাদি বাসুকে দায়িত্ব দিতাম, তোকে দিতাম না।
অনাদি এখানে স্কুল করতে চাইছে।
কোথায় ?
মোরাম রাস্তার ধারে।
জমি যেটা নেওয়া হবে সবাই যেন পয়সা পায়। ফোঁকটসে নয় মাথায় রাখবি।
ও হাফদাম দেবে বলেছে।
পয়সাকি ওর বাবার ঘর থেকে দেবে।
আমিও সেই কথা বলেছি।
চেপে যা দেখনা কি করে। তারপর আমি লোক পাঠাব। হিমাংশুর কাছে গেছিলি।
হ্যাঁ।
ডিডটা তৈরি করে দিয়েছে।
দিয়েছে।
আগামী সপ্তাহে পরিদার দোকানে লোক যাবে দিয়ে দিবি। সাইন করে পাঠিয়ে দেব।
তুই কি সত্যি সব উইল করে দিবি।
আমার নিজস্ব বলে কি আছে বলতো চিকনা। বাবার কয়েক বিঘে জমি।
ওটাও তো বাসন্তী মাকে দিয়ে দিলি।
যদি না ফিরি। যাদের জিনিষ তাদের দিয়ে দেওয়া ভালো।
আর কয়েকদিন পর করলে হতো না।
হতো। তবে ডিসিসন নিলাম যখন করেই ফেলি।
তনুদি কবে আসবে।
লন্ডনের অফিসটা বানিয়ে নিই তারপর।
তুই এতো টাকা পাচ্ছিস কোথায়।
মস্তানি করে।
খিস্তি দেব।
দে। অনেকদিন তোর মুখের গালাগাল শুনি নি।
তুই কবে আসবি।
কেন, কথা বলছি, তাতে আশ মিটছে না।
গুরুমার সঙ্গে একটু কথা বল না। মনটা শান্তি পেত।
আমাকে দুর্বল করে দিসনা চিকনা। তুই পাশে আছিস এই যথেষ্ট।
বাচ্চাদুটোর সঙ্গে কথা বল।
ওরা বড়ো হলে নিজের তাগিদে তাদের বাবাকে খুঁজে নেবে। শোন আমি একটু বেরোব। একটা মিটিং আছে। পারলে কালকের আপডেটটা দিস, ঠিক এই সময়ে।
কে ফোন করবে তুই না আমি।
আমিই করবো।
আচ্ছা।
রাখছি।
ফটোগুলো পাঠাতে ভুলিস না যেন।
ফোনটা কেটে গেলো।
আমি ফোনটা হাতে তুলে নিলাম।
বড়মা চোখ মুছতে মুছতে বললো। তোকে কবে ফোন করেছিল।
আমাকে করে নি। চিকনাকে করেছিল। চিকনা কনফারেন্সে আমাকে শুনিয়েছে।
কবে করেছিল বললি না।
দশ বছর আগে। যেদিন কৃষিফার্মটার উদ্বোধন হয় তার আগের দিন।
আমাকে এতদিন জানাস নি কেন।
শুনলে তোমার ছেলের কথা, কি বললো।
বড়মা ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি এরকম করলে আমি কি নিয়ে থাকব।
কিছুতেই কান্না থামে না।
ডাক্তারদাদা উঠে এলো। কোনপ্রকারে সামলে নিলাম নিজেকে।
তারপর হাজার প্রশ্ন। ইসলামভাই, ডাক্তারদাদার। উত্তর দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম।
দাদা মল্লিকদা ফিরে এলো।
দাদা ঢুকেই স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে বড়মাকে বললো, জানো বড়ো আজ অনি লেখা পাঠিয়েছে।
বড়মা কোন কথা বললো না।
দাদা চুপ করে গেল।
তোমার প্যাকেটটা খুলেছো। দেখো কি আছে। আমার জন্য খালি একটা লেখা পাঠিয়েছে।
বড়মা কথার কোন উত্তর দিচ্ছে না।
বুঝেছি খালি তোমারই একা কষ্ট হয় আমার হয় না। আমি পাষাণ।
দাদা নিজের ঘরে চলে গেল।
দেখলাম বড়মা দাদার পেছন পেছন ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
ছেলে-মেয়ে এসে দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে মল্লিকদার সঙ্গে।
আমি ছোটমার দিকে তাকালাম।
একটু ওপর থেকে আসি খাবার রেডি কর।
বেরিয়ে এলাম।
নিজের ঘরে ঢুকলাম।
আজ ভারি ভালো লাগছে।

সারাটাদিন লোকের ভিড় আর বড়মাকে সামলাতে আমি হিমসিম খেয়ে গেলাম। সবাই আছে। তবু ঘন ঘন আমার ডাক। আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না।
তুইও অনির মতো হয়ে গেলি। দশ বছর ধরে নিজের কাছে গোপন রাখলি আমাকে একটি বারের জন্যও শোনালি না।
কাকে কি বলবো। সব তুই। তোর জন্য আজ এই অবস্থা।
রাতে অনিমেষদা এলো তাকেও আমার সম্বন্ধে এক ঝুড়ি নালিশ করলো। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। ব্যাপারটা এরকম আমি তুই শলা-পরামর্শ করে এসব করছি।
মাঝে মাঝে তোর ওপর ভীষন রাগ হয়। তারপর কি জানি, মনে হয় তুইই ঠিক। তুই যদি ঠিক না থাকতিস তাহলে হয়তো এই জায়গায় পৌঁছন যেত না।
অনেক ঝড় এই কয় বছরে গেল, সব উতরে গেছি।
বেশ মনে পরে যখন ওই জায়গাটায় অফিস এক্সটেনসনের জন্য হাত দিলাম। তখন মলের আত্মীয় স্বজন বাধা দিল।
ইসলামভাই যথেষ্ট করলো কিন্তু হলে হবে কি পার্টির একটা লবি দেখলাম মলের আত্মীয়দের হয়ে কথা বলছে।
অনিমেষদা সব শুনলো। বললো একটু অপেক্ষা কর। আমি আগে নিজের ঘরটা সামলে নিই। পার্টির ভেতরে কথা বলি, তারপর তুই কাজে হাত দিস।
তখন আমার কি টেনসন।
কাকে বলবো মনের কথা।
হিমাংশু খালি একটা জেরক্স দিতে পেরেছিল।
তাতে কি কাজ হয়।
ইসলামভাই বললো টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করে কাজ শুরু করি।
অগত্যা আমি রাজি হলাম।
অনিমেষদাকে সব বললাম।
অনিমেষদা শুনে বললো ঠিক আছে তোরা তোদের মতো এগো পার্টির ব্যাপারটা আমি বুঝে নেব।
সুজিতদাকে ধরে টাকা জোগাড় করলাম।
সুজিতদা এক কথায় দিয়ে দিল।
টাকা দিয়েও দিলাম। কম নয় তিন কোটি টাকা।
প্রায় দিন পনের হয়ে গেছে। কাজ শুরু করলাম। ইসলামভাই-ই সব দেখা শোনা করছে।
একদিন সাত সকালে ইসলামভাই একজন অপরিচিত লোককে নিয়ে হাজির আমি তাকে কোনদিন দেখি নি।
ইসলামভাই বললো, ইনি তোর সঙ্গে একটু আলাদা করে কথা বলতে চান। আমাকে কিছুতেই ভেঙে বলছেন না। ইনি মলের ভাইপো।
দাদা মল্লিকদা ছিল।
আমি বললাম, আমি একা আপনার কথা শুনবো না। দাদা মল্লিকদা ইসলামভাই-এর সামনে আপনাকে বলতে হবে।
ভদ্রলোক রাজি হলেন। বললেন খালি আপনি হ্যাঁ বলবেন, না হলে আমি মার্ডার হয়ে যাব। আমার কাকা আপনার সঙ্গে ভালো বিহেভ করে নি।
ওপরের ঘরে সবাই বসলাম।
উনি নিজের পরিচয় দিলেন আমি ওম আছি ম্যাডাম। চাচা বহুত ব্লান্ডার কিয়া আপনাকো সাথ। অনিবাবু আপনার হাজব্যান্ড আছে।
আমি চুপ চাপ শুনে যাচ্ছি।
ও দো মকান আপনে রেনোভেসন কা কাম চালু কিয়া ও আপ কুছদিন বন্ধ রাখিয়ে।
কেন। আপনারা যে টাকা ডিমান্ড করেছিলেন সে টাকা দিয়ে দিয়েছি।
ওহিতো গজব হো গয়া। হামি আপনাকে টাকা ওয়াপাস করবে।
কেন।
সে আপনাকে বলতে পারবে না। নেহিতো গজব হো জায়েগা। হামি মার্ডার ভি হো সাকতা হ্যায়।
ও আপনাদের ব্যাপার, কাজ আমি বন্ধ করবো না।
আপনি বলেন তো হামি আপনার পাও ভি ছুঁ সাকতা হুঁ।
কেন বলছেন ও কথা।
বহুত দুঃখ কি বাত।
ভদ্রলোক চুপ করে রইলেন।
ও জায়গা ভি আপনা পিতাজীকা হ্যায়। মেরা চাচা ডুপ্লিকেট ডিড বানাকে ও জায়গা লে লিয়া। অনিবাবুকা পাস অরিজিন্যাল ডিডকা কপি হ্যায়। চাচাকা পুত্তর আপনাকো প্রেসার কারকে ও রুপিয়া লেকে ভাগ গিয়া।
আমি ওমের কথা শুনে থ। কি বলে কি ভদ্রলোক ওই জায়গাটা বাবার!
আভি হাম শুনা ও ভাগা নেহি অনিবাবু উসকো উঠাকে দুবাই লেকে চালা গিয়া। উসকা টোটাল যো প্রপার্টি হ্যায় ও ভি রেজিস্ট্রি করকে আপনা নাম কর লিয়া। কলকাত্তাকা প্রপার্টি ওউর রাজস্থানকা প্রপার্টি। হামারা সাথ উসকা বাত হুয়া।
আপনার সাথে ওর কথা হয়েছে!
সবার চোখ বড়ো বড়ো।
হ্যাঁ। আভি ও পত্রকার নেহি দাদা বন গায়া।
মুখটা কাঁচু মাচু করে বললো।
হামকো বোলা টাকা ওয়াপাস করনেকে লিয়ে।
উসকা সাথ বাতচিত করনেকে বাদ হাম রাজি হো গয়া।
বাত এহি হ্যায় হামারা পাস ক্যাস হ্যায় চেক মে হাম নেহি দে সাকতা। অনিবাবু বোলা জরুর চেক লেকে আপনা পাস আনেকে লিয়ে। আপ ক্যাস লে লিজিয়ে মেম সাব।
দাদা খেপে উঠলো। তোমরা এসব কি নোংরামি শুরু করেছ।
দাদা আপকো হাম বোল নেহি সাকতা, কেয়া হুয়া কেয়া নেহি হুয়া। স্রিফ আপ যো রুপায়া হামি লোগ লিয়া ও আপনে ওয়াপাস লে লিজিয়ে।
ইসলাম তুমি কি বলো।
হামি ইসলামকো থোরা হিন্টস দিয়া। ইসলাম মেরে জানপাহচন আদমি হ্যায়।
কি বলবো বলুনতো দাদা, হাতের কাছে ওকে পাচ্ছিনা যে চেপে ধরবো।
ইসলামভাই, অবতার সাগির ভি উসকা পাস হ্যায়। ওহি সব কুছ অপারেট কিয়া।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকাল।
এ যো ড্রিল হোগা দুসরা কোই আদমী জানেগা নেহি। তো ভি হামকো লিয়ে খতরনাক বন সাকতা। এ মেরা রিকোয়েস্ট।
চুপ করে রইলাম।
ছোটমা চা নিয়ে এলো।
দাদা সব কথা বললো ছোটমাকে।
কি শুরু করেছে বলোতো ছেলেটা।
ছোটমার চোখ ছল ছল করে উঠলো।
শেষ পর্যন্ত টাকাটা আমাকে নিতে হলো।
ওখানে বসেই ভদ্রলোক একটা ম্যাসেজ করলো।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তার রিপ্লাইও এলো। খালি ইসলামভাইকে দেখাল। ইসলামভাই আবার নিজের ফোন থেকে ম্যাসেজ করলো। তারও রিপ্লাই এলো। তারপর ভদ্রলোক চলে গেল।
ইসলামভাই-এর কাছ থেকে নম্বরটা নিয়ে ফোন করতে দেখলাম ওটা তনুর নম্বর।
আর কি শুনতে চাস বল। এরকম কতো ঘটনা আছে লিখে শেষ করতে পারব না।
তুই বড়মাকে কি লিখেছিস বাঁদর একবার আয় তোর হবে।
আমি মহা সুখে আছি।
জানিস চিঠিটা বড়মা পড়তে পড়তে কতো বার যে কাঁদল কি বলবো। তোর মেয়ের হাজার প্রশ্ন। তার উত্তর দেওয়া সত্যি খুব মুস্কিল।
বড়মা একটা লাড্ডু নিয়ে এসে তোর মুখে ছোঁয়াল। তোর মেয়ে তাই দেখে বললো দিদানটা কি বোকা দেখ, বাবা খেতে পারে নাকি, ওটা বাবার ছবি তার থেকে আমাকে দাও খেয়ে নিচ্ছি।
ছোটমা, জ্যেঠিমনি সবার একই অবস্থা।
আমার জন্য কিছু পাঠাস নি। আমি কি তোর কেউ নই।
তোর মেয়ের জামাটা ভীষণ সুন্দর হয়েছে। ছেলে প্যান্ট পরে তখন থেকে ঘুরে বেরিয়েছে সারাটা দিন।
রাতে ল্যাপটপে অনুপের দেওয়া পেনড্রাইভ থেকে খালি তোকে দেখলাম। মন ভরে গেল।
এটা শুধু আমার। এর ভাগ কাউকে দেওয়া যাবে না।
তোর গলা শুনছি। তোর মুভমেন্ট দেখছি। কতোবার যে দেখলাম তার ইয়ত্তানেই। বুঝলাম পুরোটা অনুপ নিজের মোবাইলে তুলেছে। তুই জানিস ?
তোকে কিন্তু আগের থেকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে।
একেবারে চ্যেংরা ছেলের মতো। তোর পাসে আমাকে একেবারে বেমানান।
তুই কি শরীর চর্চা করছিস।
বল না।
তোর হাসিটা কিন্তু আগের থেকে আরো বেশি কিউট। যে কোন মেয়ে পটে যেতে পারে।
কিরে কারুর সঙ্গে ইন্টু-মিন্টু করছিস নাকি। তাহলে আমি কিন্তু স্যুইসাইড করব। তখন তোর মিত্রাকে তুই খুঁজে পাবি না।
দূর ছাই কার সঙ্গে বক বক করছি।
তুই তো ছবি।
ছবি হয়েই থাক।
আজকের দিনটা অনেক দিন মনে থাকবে বুঝলি।
একটু ফ্রেস অক্সিজেন পেলাম।
ঘুম পাচ্ছে।
আর ভালো লাগছে না।
পারলে একবার মিত্রার নম্বরে ভুল করে ফোন করিস। নম্বরটা চেঞ্জ করিনি।
আজ অফিসে যাওয়ার পথে আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম পশ্চমি দিকটা মেঘলা করেছে।
সেই দিনটার কথা মনে পরে গেল বুঝলি।
তখন সবে মাত্র তিন মাস।
বড়মা অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
সপ্তাহে একদিন অফিসে যাই।
নিজের ঘরে বসে কাজ করছিলাম।
তুই হুড়মুড় করে দরজা ঠেলে ঢুকলি।
কি করছিস রে।
ট্রান্সপোর্টের ফাইলটা দেখছি।
বন্ধ কর।
কেন!
যা বলছি কর না।
কেন বলবি তো।
খালি বক বক। নিজে ড্রাইভ করতে পারবি।
পারবো।
নীচে আয়। ঝটপট।
কোথায় যাবি কিছুই বললি না। তোর সবকিছুতেই এইরকম।
নীচে গিয়ে দেখলাম মেঘটা কালো করে রয়েছে। একটু পরেই প্রবল বৃষ্টি হবে।
নে ঝটপট কর। সময় হয়েগেছে।
কোথায় যাবি বলবি তো ? এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে!
যাহান্নামে।
হেসেফেললাম।
গাড়িতে উঠেই বললি সোজা সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ দিয়ে বোম্বে রোডে চল।
তোর কথা মতো রাস্তা দিয়ে এলাম।
তখন সবে মাত্র বৃষ্টিটা ঝিড় ঝিড় করে পরছে।
বোম্বেরোডে উঠে কিছুটা আস্তেই তুই একটা ফাঁকা মাঠের মতো জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করাতে বললি। গাড়ি সাইড করে থামালাম।
দুজনে গাড়ি থেকে নামলাম।
ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সামান্য বৃষ্টি। মিশ কালো মেঘটা ছাতার মতো পৃথিবীটাকে যেন ঢেকে রেখেছে। যতোদূর চোখ যায় খালি কালো মেঘের আস্তরণ।
দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তুই অবাক হয়ে চারদিক দেখছিস। তোর চোখে বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা।
পাশ দিয়ে হুস হুস করে গাড়ি চলে যাচ্ছে।
হাওয়া দিতে শুরু হলো প্রথমে আস্তে তারপর প্রবল ঝড়।
আমরা দুজনে গাড়িতে উঠে এলাম।
জানলার কাঁচটা একটু নামানো।
সোঁ সোঁ একটা শব্দ। গাছপালা গুলো বেঁকে ধনুকের মতো হয়ে যাচ্ছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাজ পরছে। কড় কড় করে।
আমি তোকে জড়িয়ে ধরে আছি। চোখ বন্ধ।
মিত্রা।
উঁ।
তুই চুপ।
কি বলবি তো।
সামনের দিকটা একবার তাকা।
না। আমার ভয় করছে।
দূর ভয়। আমিতো আছি। মেঘগুলো একে অপরের সঙ্গে কিভাবে মারপিট করছে দেখ।
তোর কথায় চোখ খুলে তাকালাম।
এই ভাবে আগে কোনদিন মেঘ দেখি নি। মুষল ধারে বৃষ্টি পরছে। দূর থেকে বৃষ্টিটা কেমন আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে আমাদের গাড়ির দিকে। কে আগে আসবে তার জন্য যেন যুদ্ধ চলছে। তারপর হুড়মুড় করে আমাদের গাড়িটাকে গ্রাস করে ফেললো। কি দারুণ সেই দৃশ্য।
তারপর বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ। ফাঁকা মাঠে গাড়ির ভেতর আমরা দুজন। গাড়ির ছাদটা ফুটো হয়ে যেন বৃষ্টির ফোঁটা আমাদের গায়ে পরছে। বৃষ্টির প্রবল বেগে সামনে ধূসর হয়ে গেছে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কি প্রচন্ড জোরে মঘের সেই গর্জন। ভয়ে আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে।
তোর ভালো লাগছে না।
হুঁ।
এইভাবে আগে কখনো বৃষ্টি দেখেছিস।
তোর মতো পাগলের পাল্লায় পরি নি তো।
এইরকম বৃষ্টিতে কখনো ভিঁজেছিস।
না।
জানিস আমি যখন ক্লাস নাইনে পরতাম সেই সময় একবার ভীষণ কালবৈশাখী হয়েছিল।
চিকনা আমি মেঘ করতেই দে ছুট। স্কুল থেকে ফেরার পথে শবর পাড়ার কাছে যে আমবাগান, এক দৌড়ে সেখানে। তারপর সে কি ভীষণ ঝড়। ঝপাঝপ আম পরছে।
বিদ্যুৎ গুলো মাঠের মধ্যে আছড়ে আছড়ে পরছে। পরমুহূর্তেই সেই বিকট শব্দ কড় কড় কড়। আমার ভীষণ ভালো লাগছিল। চিকনা আম গাছের তলায় দেখি গুটি সুঁটি মেরে বসে কাঁপছে।
কিরে।
বাড়ি চল।
দাঁড়া বৃষ্টিটা থামুক।
থামবে না।
তুই কি করে বুঝলি।
আকাশের অবস্থা দেখেছিস।
তাহলে ভিঁজে যাবি।
বাকি কি আছে।
তারপর দিলো আমাকে গালাগালি।
সে কি ওর লম্ফ ঝম্প।
কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাবে না।
বৃষ্টিতে ভিঁজে দুজনে কাকস্নান করে ফেলেছি।
ঘন্টা খানেক পর বৃষ্টি থামল।
দুজনে বাড়ি ফিরলাম।
ফিরেই একেবারে কাকার মুখো মুখী। কপালে উত্তম মধ্যম জুটলো।
জানিস বুবুন আমরা তোর মতো ভিঁজতে পারতাম না। কখনো সখনো স্কুল থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি এলে ছাতা থাকলেও ইচ্ছে করে ছাতাটা মাথা থেকে সরিয়ে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিঁজতাম। জুতো জামা ভিঁজে যেত। দুদিন স্কুল যাওয়া বন্ধ।
তুই আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছিস।
হঠাৎ তুই বললি মিত্রা তুই একটু শো তো।
কেন। করবি।
শো না। খালি খুচখুচানি।
আমি পেছনের সিটে শুলাম।
তুই আমার পেটের কাপর সরিয়ে কানটা রাখলি।
বুবুন সুর সুর করছে।
দাঁড়া না।
কি করছিস বলবিতো।
আবার কথা বলে। চুপ করে শো।
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।
গাড়ির কাঁচগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে।
না, কাঁদছে না বুঝলি।
কে কাঁদবে।
তুই বোকার মতো হাসলি।
বুঝলি না।
না।
তোর পেটে যেটা আছে। কান দিয়ে শুনলাম। মেঘের গর্জনে সে কাঁদছে কিনা।
তোর ইনোসেন্ট মুখটা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।
তোকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম।
তবু তোর চোখের ভাষা বদলালো না।
প্রায় একঘন্টা আমরা ওই ফাঁকা মাঠে বসে বসে বৃষ্টি দেখলাম।
দুজনে ফিরে এলাম বৃষ্টি স্নাত রাস্ত দিয়ে। তখন বৃষ্টি একটু থেমেছে।
আমার সেই বুবুন এখন কোথায়। কেন বুবুনকে আমি হারিয়ে ফেললাম।
কিছুতেই মেলাতে পারি না।
এখনো কি আমার বুবুন আমাকে ছাড়া একা একা বৃষ্টি দেখে। ওই রকম ইনোসেন্ট হয়ে পরে ?
ম্যাডাম এসেগেছি।
রবীনের ডাকে চমকে তাকালাম।
রবীন গাড়িথেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছে।
দূর কোথায় চলে গেছিলাম। আর কোথায় এলাম।
গাড়ি থেকে নামলাম।
ভেতরে এলাম। সবাই কেমন নড়ে চরে বসলো। সদ্য কালকের ঘটনা। অফিসের অবস্থা দেখলাম বেশ চনমনে।
নিজের ঘরে এসে বসতেই, চম্পকদার ফোন।

তুই এসেছিস।
জাস্ট ঢুকলাম। কেনগো ?
তোর কাছে যাচ্ছি।
আবার কি হলো।
একটা মিটিং কল করেছি অনির কোর কমিটি। তুই প্রধান অতিথি।
হাসলাম।
হাসিস না। কি ধুরন্ধর, আমার চিঠিটা তোকে গিয়ে পরাচ্ছি।
তোমরাই দেখো, মানুষটা কিন্তু এখানে নেই। আজ বারো বছর হয়ে গেল তোমরা কেউ খুঁজে আনতে পারলে না।
তুই তো সব জানিষ। আমাকে এইভাবে বলিস না।
ঠিক আছে আধ ঘন্টা পর এসো।
আচ্ছা।
আমি বাথরুমে গেলাম। ঠিক ঠাক হয়ে বাথরুম থেকে বেরতেই দেখি বিতান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
কিরে তুই এই অসময়ে।
বিতান সোজা উঠে আমার কাছে এলো।
তোর চোখ মুখটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে।
আমাকে বাঁচাও বৌদি।
কি হয়েছে বলবি তো।
কাল সারারাত ঘুমোইনি।
কেন মামার শরীর খারাপ!
না।
তাহলে মামীর!
না।
বাচ্চাটা কেমন আছে ?
সব ভালো আছে। খালি আমি ভালো নেই।
কেন বলবিতো।
তুমি বাঁচাও বৌদি না হলে বৌ বাচ্চা নিয়ে একেবারে পথে বসে যাব।
কি পাগলামো করছিস।
কাল মিলিদিকে টিনাদিকে ফোনে সব জানিয়েছি। ওরা বলেছে কিচ্ছু করতে পারবে না। বাবা-মা বললো পিসিকে জানাতে। আমি না করেছি।
তুই আসল কথাটা বলবিতো।
বলছি, তোমার পাটা একটু ছুঁই আগে।
এই দেখো খালি মাথা খারাপ করে। যা বোস।
বিতান গিয়ে চেয়ারে বসলো। গেলাস থেকে জল খেলাম।
বেল বাজিয়ে হরিদার ছেলেকে ডাকলাম।
দু’কাপ চা দেতো। কোথাও যাসনি যেন। অনেকে আসবে।
হরিদার ছেলেটা চলে গেল। কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে এলো। বিতান মাথা নীচু করে বসে আছে।
নে চা খা। এবার বল।
বিতান একটা খাম আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
কি এটা।
পরো না।
তোর চিঠি আমি পরবো কেনো।
আমিতো বলছি।
চিঠিটা পরলাম। যে দিন থেকে বিতান জয়েন করেছে। সে দিন থেকে ও কি কি ভুল কাজ করেছে তার একটা লিস্ট দেওয়া আছে। শেষে ওর ভুলের জন্য কোম্পানীর কত লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে, সেই এ্যামাউন্টটাও লেখা আছে। শেষ লাইনে একটা প্রচ্ছন্ন ধমকানি।
আমি চিঠি থেকে মুখ তুলে হাসলাম।
তুমি হাসছো। আমার প্যান্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতো টাকা আমি নষ্ট করেছি। কি করে মেটাব।
তুমি বিশ্বাস করো।
আমি হাসছি।
তুমি হেসো না একটা পথ বাতলে দাও। দাদু থাকলে রেহাই পেয়ে যেতাম।
পেতিস না।
এরপর সুনীতদার মতো যদি একটা ফোন আসে আমি কোথায় যাব বলো।
তাহলে তুই ভুল করেছিস।
কিছুতেই ধরতে পারছিনা বিশ্বাস করো। সকালে এসেই বরুণদাকে একটা লিস্ট দিতে বলেছি। আমি মেলাবো।
বরুণদা দিয়েছে।
বললো একটু বোস, বার করে দিচ্ছি। আচ্ছা তুমি বলো কলকাতার ত্রিসি মানায় নেই কি করে এতো ডিটেলসে অফিসের খবর রাখছে।
আমি হাসছি।
মিলি, টিনা, অদিতি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
কাল রাতে মোবাইলের স্যুইচ অফ করে রেখেছিলে কেন।
আর ভালো লাগছিলো না। সারাটা দিন যা ধকল গেল।
কিরে বিতান বৌদি বাঁচাবে বলেছে।
এখনো কিছু বলে নি।
অর্ক একবার দারজাটা খুলে উঁকি মারল।
আপনি ব্যস্ত।
কেন রে।
আপনার সঙ্গে আনন্দটা শেয়ার করতে না পারলে ভালো লাগছে না।
ভেতরে আয়।
অর্ক ভেতরে এলো।
একবার পাঁচ মিনিটের জন্য ওপরে চলুন।
কেন বলবি তো।
আপনি একটু রিসেপসনে বলে দিন নিউজরুমের ফোনটা একটু বন্ধ রাখতে।
আমি হাসছি।
আপনি হাসছেন আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছি।
টিনারা জোরে হেসে উঠলো।
ফোন বন্ধ করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণের জন্য রিলিফ পাব। ওপরে সকলের থুতুতে আঁঠা জমে গেছে।
বেশি করে জল খা।
চলুন না চলুন একবার রগড়টা দেখবেন চলুন।
তোরা দেখ।
অনিদার ফ্যান এতো স্ট্রং এতদিন বুঝিনি। তেরো বছর ঘষা হয়ে গেল কিছু করতে পারলাম না।
আমি হাসছি।
আমায় কি লিখেছে জানেন।
কি লিখেছে।
বলেছে একটা নামিয়েছিস দ্বিতীয়টা যেন না নামে। কি লজ্জার কথা। রাত্রির চিঠিটা পরে কান গরম হয়ে গেছে। বলে অনিদা এইভাবে লিখতে পারে।
খুব সাবধান অর্ক কথার খেলাপ হলেই ঢিসুম ঢিসুম। জানিস অনিদা এখন ডন।
মিলির কথায় সবাই জোরে হেসে ফেললো।
ম্যাডাম বিতান ভেটকি মাছের মতো বসে আছে কেন।
ওর চাকরি চলে গেছে।
যাঃ তাহলে খাবে কি।
ওকে জিজ্ঞাসা কর।
আপনি খালি একবার সন্দীপদাকে দেখে আসুন, এমন ঠাসান ঠেসেছে লেচি হয়ে রুটি হয়ে গেছে। আমাকে চিঠিটার কয়েকটা জায়গা আন্ডার লাইন করে দেখাল। সাজেসন দিয়েছে, চিঠিটা পাওয়ার পর প্যান্ট জামা ছেড়ে কাপর ব্লাউজ আর সিঁদুর পরে অফিসে আসতে। সত্যি মালটা এতো খবর রাখছে কি করে বলুন। আমাদের অফিসেই অনিদার খাস লোক কেউ আছে।
খুঁজে বার কর। তুই অনিদার চ্যালা।
মাথাটা অনিদার মতো নয়।
সুমন্তকে কিছু লেখে নি।
ভালমন্দের খবর নিয়েছে। লাস্টে একটা লাইন ছোট্ট করে গুছিয়ে লিখেছে।
লেখাটা ঠিক জমছে না। খেলা আরও খেলা।
একমাত্র দ্বীপায়ণদাকে কিছু বলে নি।
কিরে তুই আমাকে বললি আধঘন্টা পর আসতে এতো দেখি ঘর ভরে গেছে।
আবার হাসির রোল।
চম্পকদা, সনাতনবাবু ঘরে ঢুকলেন।
এইনে তোর ফাইল। সবকিছু ঠিকঠাক মিটলো। হিমাংশু হয়তো আসবে তোর কাছে কয়েকটা ব্যাপারে পার্মিসন নিতে, না হলে মুভ করতে পারবে না।
কি বলুন।
কি জানি। ওকে একটা লম্বা চিঠি দিয়েছে।
আপনাকে ধরায় নি।
অর্ক বললো।
দিয়েছে। যা ভাগ।
কোথায় যাব চম্পকদা, আপনি একবার নিউজ রুমে চলুন অবস্থাটা দেখতে পাবেন।
অফিসটা আজকে কিরকম চনমনে লাগছে না।
চনমনে কি বলছেন, দৌড়চ্ছে।
তুই হরিদার ছেলেটাকে চা আনতে বল।
অর্ক বেরতে গেল, বরুণদা ঘরে ঢুকলো।
আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসি।
মন ভালো।
মাথা দোলালাম। বসো।
চম্পকদার দিকে তাকালাম।
কাল সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেছে।
এরপরও না মিটলে কিছু বলার নেই। কেন যে দুবছর ধরে ঘাউড়ামি করলো কে যানে।
আমার মনে হয় অনি কলকাতায় রয়েছে। লোককে বলে বেরাচ্ছে দু’বাইতে আছে।
খুঁজে বার করোনা।
আমার গলাটা ভারি হয়ে গেল।
ঠিক আছে অন্যায় হয়েছে আর বলবো না। নামটা পর্যন্ত মুখ উচ্চারণ করবো না।
এটা তোমার রাগের কথা।
নামটা শোনা মাত্রই তোর যদি গলা ভাড়ি হয়ে যায় কথা বলি কি করে।
সত্যিতো চম্পকদা অন্যায় কিছু বলে নি।
আমি চুপ করে রইলাম।
বিতানের কি হলো।
অনিদা একটা দরখাস্ত ধরিয়েছে।
মিলি বললো।
তোকেও ধরিয়েছে!
তারপর স্বগোতক্তির সুরে।
আমাকেও ধরিয়েছে। কি করবি বল।
তোমার তো কোন চিন্তা নেই। আমি পথে বসবো।
আমি হেসে ফেললাম।
দেখ মিত্রা হাসছে। তুই বৃথা টেনসন নিচ্ছিস।
টেনসন কালকের ডায়লগ শুনেছ। আমার আত্মারাম খাঁচা।
তাহলে তুই কিছু একটা গন্ডগোল করেছিস।
আমি বুঝতে পারছি না।
নিশ্চই তেলচুরি হয়েছে। তোর মাথায় কাঁঠাল ভেঙেছে।
সেইরকম।
দেখ খুঁজে সেই সব গাড়িগুলো হাওয়া হয়ে গেছে।
বুঝতে পারছি না।
কাগজপত্র দেখেছিস।
বরুণদাকে বলেছি।
বরুণদা হাসছে। বিতানের হাতে প্রিন্টআউট এগিয়ে দিল।
টিনা তুই ছেলেটাকে ডোবাবি। একটুও গাইড করছিস না।
আমার কথা শুনলে তো।
টিনাদি ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।
মাস তিনেক আগে তোকে বলেছিলাম। মাইলেজটা তুই ঠিক মতো দেখ, এখন কেউ আর পনেরতে গাড়ি নিচ্ছে না তুই ওটা আঠার করে দে। তুই শুনেছিস আমার কথা।
বিতান চুপ করে রইল।
বুঝেছি ওইখানেই জল মিশিয়েছে। আচ্ছা অনিদা কি করে ধরলো বলো।
ওসব নিয়ে মাথা ঘামাস না। মাথা ফুটো হয়ে যাবে।
যা এবার নিজের কাজে যা।
বিতান বরুণদার হাত থেকে কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শোন অনি অনেক কাজের দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে। তোদের কি কি দিয়েছে।
চম্পকদা মিলিদের দিকে তাকাল।
আমাদেরও। বলতে পারো গলা পর্যন্ত।
দেবা নির্মাল্য কই।
চিঠি পেয়ে কাল থেকে শরীর খারাপ। বললো তোমরা যাও ওষুধ খেয়ে যাচ্ছি।
চম্পকদা নীচু স্বরে হাসছে।
তুই বল মিত্রা ঘরের খবর ওকে কে দিচ্ছে।
খুঁজে বার করো। ওতো বলে সরষের মধ্যে ভূত আছে। আমার কারবার সরষেকে নিয়ে।
ভূত এমনি আমার পায়ে এসে লুটিয়ে পরবে।
কথাটা খারাপ বলে নি। যাক তোকে কিছু লিখেছে।
একটা লাইনও আমার জন্য খরচ করে নি।
স্ট্রেঞ্জ।
বলছি কি তাহলে। খালি এইটুকু বুঝিয়ে দিয়েছে আমি মরিনি। সব সময় পাশে আছি।
সুনীতের থেকে ওর উকিলটা কাল বেশি ভরকেগেছে। নে আর একটু চা বল। কাজগুলো সারি। দাদা আসবে না ?
আসবে।
মিলি দেখনা দাদা এসেছে কিনা। তাহলে দাদার ঘরেই বসবো।
মিলি বেরিয়ে গেল।
জানিস মিত্রা আমাকে বলেছে তুমি এখন ঠুঁটো জগন্নাথের মতো চুপ চাপ বসে থাকবে। তোমার কাজ পাহাড়া দেওয়া। বল সম্ভব।
ওই যে নতুন টিমটা জয়েন করেছে, বলেছে ব্যাটারা বেদম ফাঁকি বাজ। তুমি দেখভাল করো।
চল দাদার কাছে যাই, আরও লিখেছে।
দেবাশীষ নির্মাল্য ঢুকলো।
আমি হাসলাম। চোখ মুখ লাল।
শরীর ঠিক আছে।
ঠিক আছে মানে। খারাপ হওয়ার যো আছে। যা দিয়েছে একহাত। জানলো কি করে বলতো এতো সব। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
চম্পকদা তোমার।
আমারও তোদের মতো অবস্থা। তবে একটা কথা ঠিক ও যে গাইডলাইনটা দিয়েছে। খুব ভেবে চিন্তে দিয়েছে। একেবারে ফেলে দেবার মতো নয়।
আমাকে একটা নতুন দায়িত্ব দিয়েছে।
কি।

ফার্মের প্রোডাক্ট সেলের ব্যাপারে ও হেল্প করবে। তবে কোয়ালিটি ডিটোরিয়েট করলে কপালে দুঃখ আছে। এমনকি এ্যাডের ব্যাপারে আমাকে কয়েকটা জায়গায় যেতে বলেছে।
ভেবে দেখ কোথায় আছে জানিনা আমাদের মালের ব্যাপারটা জোগাড়ের চিন্তা ভাবনা করছে।
বুঝলে চম্পকদা অনির একটা বদ অভ্যাস হচ্ছে ও ঘাড়ে সচর আচর কিছু নেয় না। একবার নিয়ে নিলে তুমি নিশ্চিন্ত। খালি ফলো আপ করো নিশ্চিত রেজাল্ট।
মিলি ফিরে এলো। সবাই দাদার ঘরে গেলাম। সারাটা দিন দাদার ঘরে কাটল।
প্রত্যেকের চিঠি পরে পরে দাদাকে শোনান হলো। তারপর ডিসিসনে আসা হলো।
দাদা একবার মাঝে ইসলামভাইকে অফিসে আসতে বললো। হিমাংশুকে তুই লিখেছিস রতনের নামে এবং আবিদের নামে একটা এক্সপোর্ট লাইসেন্স বার করতে। ওরা বাইরে মাল পাঠাবে। ইসলামভাই আমাদের ফার্মের ষাটভাগ মাল কিনে রতনদের সেল করবে।
ইসলামভাই প্রথমে ব্যাপারটা ধরতে পারে নি। তারপর হিমাংশু বুঝিয়ে দিল।
ইসলামভাই খালি মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে। ও কি করতে যাচ্ছে আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
হিমাংশু বললো, আমাকে লিখেছে লাইসেন্স বেরিয়ে যাবার পর অনুপকে জানাতে। অনুপ সব ব্যবস্থা করবে। এ্যাকাউন্টসের পার্ট আমার বাকি পার্ট অনুপের।
আচ্ছা তুই এতো খবর পাস কি করে। তোর কে আছে আমাদের অফিসে বল না।
তোকে নিয়ে অফিসে কতো মাতামাতি। আমি তার ফ্লেভারটুকু উপভোগ করি। তোকে কাছে পাই না। পেলে আরও ভালো লাগতো।
আজ সুরোর বিয়ে হলো।
শেষটা এমন হলো মনটা ভারি হয়ে গেলো। কান্নাছাড়া আমার জীবনে কিছু নেই বুঝলি। লোকে এরপর থেকে আমাকে কাঁদুনি মাসি বলবে।
তোর সঙ্গে ওর চুক্তি হয়েছিল, এক তুই যেখানেই থাকিস ওর বিয়েতে আসবি। দুই তোর বিয়ে যেখানে হবে ওর বিয়ে সেখান থেকে হবে। মানে সেই বাড়ি থেকে।
তাই এই বাড়িকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ছেলের নাম অংশুমান। তুই চিনিস, সুরো বললো।
একবার নাকি তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। ওর থেকে তিন বছরের সিনিয়ার। আমাদের কলেজেই পরতো।
এখন প্রফেসারি করছে।
দেখতে বেশ ভালো ছেলেটাকে।
অনিমেষদা বৌদি দুজনে দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে সব কেনা কাটার জন্য।
ইসলামভাই বিয়ের সব অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছে।
এলাহি ব্যবস্থা।
তোর ছেলে মেয়ের কি আনন্দ সুরো পিসির বিয়ে। পাত পেরে খাবে। পিকু একটু বরো সে তো আর এক কাঁটা ওপরে।
এখানেও তুই নেই।
সবার সেই এক কথা।
সবাই আগের রাত থেকে আমাদের বাড়িতে। সুরো গত সাতদিন ধরে রয়েছে।
শয়নে স্বপনে অনিদা।
কতোবার যে চিকনাকে ফোন করে বলেছে, তুমি অনিদার সঙ্গে আমাকে একবার কথা বলিয়ে দাও না।
কে কার কথা শোনে। অনিমেষদাকে পর্যন্ত ফিরিয়ে দিয়েছে।
বলেছে অনি নম্বর চেঞ্জ করেছে।
সকাল বেলা সুরো একটু কান্না কাটি করছিল। তারপর আবার ঠিক হয়ে গেছে।
মিলি তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে। টিনা তার মেয়েকে নিয়ে এসেছে। সব গ্যাঁড়া গ্যাঁড়া। অদিতির ছেলেটা একটু বড়ো। প্রথমটা নষ্ট হয়ে গেছিল। দ্বিতীয়টাকে যাই হোক নীরু জানপ্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেটারই এখন বয়স দশ।
সবাই এসেছে। আড্ডা খাওয়া দাওয়া। হই হুল্লোড়।
ছেলের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদ এসেছে।
সুরোর শ্বশুর নিজে এসেছেন।
সব কাজ মিটে যাবার পর আমাকে এসে বললো মা আমাকে একটা জিনিষ দেখাবে।
প্রথমে আমি একটু অবাক হয়ে গেছিলাম।
বলুন।
অনির একটা ছবি তোমার ঘরে আছে আমাকে একটু দেখাবে।
হাসলাম।
আমার বৌমা অনেকবার আমাকে তার দাদার গল্প করেছে। লোকের মুখে খোঁজ খবর নিয়েছি। অনিমেষবাবুর কাছ থেকেও সব শুনেছি। ও তো একটা মিথে পরিণত হয়ে গেছে।
নিজের ঘরে নিয়ে গেলাম। তোর ছবিটার সামনে ভদ্রলোক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কি বিড় বিড় করলেন কি জানি।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
চোখ দুটো যেন কথা বলছে মা।
তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এখন আর সেই ভাবে মন খারাপ হয় না। এটুকু মনে মনে জানি তুই আছিস।
তোর মেয়ে ছুটতে ছুটতে এলো, মা আমাকে দুটো লুচি দেবে।
কেনরে এই তো খেলি।
না আমি খাবো না। বাইরে একটা পাগল বসে আছে খেতে চাইছে।
তোকে বুঝি খেতে চাইল।
মাথা দোলাল।
হাসলাম।
একা একা যেও না। কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাও। না হলে পাগলটা আবার ধরে নিয়ে যাবে।
রান্নাঘর থেকে দুটো লুচি তরকারি একটা প্লেটে করে মেয়ের হাতে দিলাম।
মেয়ে নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললো, জল দাও।
ভাগ এখান থেকে খেতে পেলে শুতে চায়। ছগন দাদাকে বল তারিয়ে দিতে। কাজের বাড়িতে এরকম অনেক পাগল আসে।
দাও না।
আবার জল দিলাম।
মেয়ে দিয়ে এলো।
একবার আমি নিজে গিয়েও বাইরে বেরিয়ে দেখে এলাম। একটা নয় তিনটে পাগল।
আবার তোর মেয়েকে ডেকে লুচি দিলাম।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো। মিত্রা তোর মেয়ে দরিদ্র নারায়ণ সেবা করছে।
ছগনলাল একবার তারিয়ে দিল। দেখলাম এই ফুটপাথ থেকে ওই ফুটপাথে গিয়ে বসলো।
দুপুরে দেখলাম তোর মেয়ে নিজে হাফ খেয়ে থালা নিয়ে উঠে যাচ্ছে।
ধর ধর বলে চেঁচিয়ে উঠলো সকলে।
বললো বাইরের পাগলটা খায় নি। ওদের দিয়ে আসি।
বড়মা খেতে খেতে উঠে গেল।
আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পরেছি। সকাল থেকে বড্ড জ্বালাচ্ছে।
চল তোর পাগলদের খেতে দিয়ে আসি।
রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে, নিজে মেয়ের সঙ্গে গিয়ে খাবার দিয়ে আসল।
মনে হয় দুটো মুখও করে আসলো। গলা পাচ্ছিলাম।
আমাকে এসে বললো কোথায় তুই অনেকগুলো বললি। দেখলাম তো একটা। কি দুগ্গন্ধ বেরচ্ছে। ছগনলালকে বলে এসেছি দূর কর। কাজের বাড়ি বলে কথা।
বিকেল বেলা সুরো সাজতে গেল।
সেজেগুজে সুরো ফিরে এলো সাড়ে পাঁচটা নাগাদ।
চারিদিকে লাইট জ্বলছে।
বাড়ি ভর্তি লোকজন। তোর মেয়ে আবার জ্বালাতন শুরু করলো। খালি ঘ্যানর ঘ্যানর।
আজ ওকে পাগলে পেয়েছে।
শেষ মেষ সুরোকে ধরলো।
সুরো কনের সাজে নিজে গিয়ে তোর মেয়ের সঙ্গে পাগলকে খাইয়ে এলো।
সবাই সুরোর পেছনে কি লাগা। সুরো পুন্যি করলো।
তখন কটা হবে ছটা।
এরপর বড় এলো।
আমরা সবাই বিয়েতে মেতে গেলাম। ছেলের বাড়ি থেকে বড় যাত্রী এসেছে। তাদের দেখভাল করছে সবাই। আমি ঘর সামলাচ্ছি।
প্রথমে রেস্ট্রি হলো তারপর বিয়ের আসর বসলো।
নীপা আজ খুব সুন্দর সেজেছে। ভীষণ মিষ্টি লাগছে।
ওর পেছনে কনিষ্ক, বটা, নীরু পরে রয়েছে।
এবার তোর পালা নীপা, তৈরি হয়ে যা।
বরুণদা হেভি সার্ভিস দিচ্ছে।
মাঝে একবার অনিমেষদা নীপাকে বলেছিল।
হ্যাঁরে নীপা সবাই এলো চিকনা এলো না কেন।
সে এখন নেতা হয়েছে। সময় নেই।
সবাই নীপার কথায় হাসে।
রাতে নাচ গান হলো। তারপর খেতে বসা হলো।
আমার বিয়ের মতো সবাই এক সঙ্গে বুফে সিস্টেমে। সুরোর ইচ্ছে।
হঠাৎ দেখি সুরোর চোখ ছল ছল।
বুঝলাম মনে পরে গেছে। কাছে গেলাম।
বেশতো ছিলি সারাদিন, আবার কি হলো।
অনিদাটা থাকল না। বলেছিল তোর বিয়েতে খুব আনন্দ করবো।
বিধানদা বোঝাল।
প্রবীরদা বোঝাল, অনুপদা, রূপায়ণদা কেউ বাকি নেই।
কে কাকে বোঝায় তার ফোঁপানি বন্ধ হল না।
তারপর যা হোক তার কান্না থামল।
খাওয়া তখন বলতে পারিস শেষ।
তোর ছেলে মেয়ে তাছাড়া যতো গুলো বাচ্চা ছিল ঘুমোতে গেছে ডাক্তারদাদার বাড়িতে।
আমরা বেশ হৈ চৈ করছি।
আমাদের বিয়ের টুকরো টুকরো গল্প হচ্ছে।
অনুপদা বললো মনে আছে সুরো অনির বিয়েতে সেই নাচ, চল চল আর একবার নেচে নিই।
পাবলিকের সামনে নাচলে পেঁদাবে।
বেশ আনন্দ হচ্ছিল।
হঠাৎ সুরোর ফোনটা বেজে উঠলো।
সুরো আমার দিকে তাকিয়ে বললো, শিষ্য ফোন করেছে।
বলো।
আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কে রে ?
বৌদি বললো।
চিকনা।
বৌদি মুখ টিপে হাসল।
সুরো কথা বলিসনা ওর সঙ্গে।
খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে।
হ্যাঁ আঙুল চাটছি। তুমি কোথায় ?
পীরসাহেবের থানে বসে আছি।
তোমার সঙ্গে কথা বলবো না।
কেন।
তুমি এলে না।
কি কথা হলো চিকনার সঙ্গে বুঝলাম না। কথা বলতে বলতেই সুরোর মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল, ফোনটা নিয়ে পরি কি মরি করে গেটের দিকে রুদ্ধ শ্বাসে দৌড়ল।
আমি ধরতে পেরেছিলাম কিছু একটা হয়েছে।
অংশু ওর পেছন পেছন দৌড়চ্ছে।
আমি কি ওর সঙ্গে পারি।
আবিদ রতন সবাই দৌড়ে গেল।
একটা হতোভম্ব করা পরিবেশ। হুট করে কি যে হোল।
সুরো সটাং গেটের বাইরে এসে কাকে যেন খুঁজছে।
আমি ছুটতে ছুটতে কাছে গেলাম।
সুরো আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো।
অনিদাকে তোমরা কেউ চিনতে পারলে না।
আমি তখনো হাঁপাচ্ছি। কথা বলতে পারছি না।
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, কি পাগলের মতো বলছিস!
হ্যাঁগো বৌদি চিকনাদা এখুনি বললো। অনিদা এসেছিল।
ততক্ষণে সবাই কাছে চলে এসেছে। সুরো অঝোড়ে কাঁদছে।
রতন আবিদ গেট থেকে বেরিয়ে ছিটকে গেল।
ইসলামভাই কাকে যেন বললো গাড়িটা ওপাশ থেকে নিয়ে আয়।
মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ওলট-পালট হয়েগেল।
ছগনলাল গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।
কি হয়েছে বল। আমি সুরোকে জড়িয়ে ধরে আছি।
সুরো বললো।
চিকনাদা বললো, মনটা ভাল নয় সুরো।
কেন।
সে তোকে বলা যাবে না।
আমারও মনটা ভাল নয়।
কেন।
আমি বললাম আমার দাদা নেই।
চিকনাদা বললো, কেন, দাদাকে অতো পরি পাটি করে খাইয়ে দিয়ে এলি।
কি বাজে বকছো।
কনে সেজে তুই অনিসা খেতে দিস নি কাউকে।
সে তো বাইরে একটা পাগল ছিলি। সকাল থেকে বহু জ্বালাচ্ছিল।
ওটাই তোর অনিদা।
তুমি বলো বৌদি সকাল থেকে আমার দাদা গেটের বাইরে বসে রইলো। তোমরা কেউ চিনতে পারলে না।
ইসলামভাই রতন আবিদ তখন রাস্তায় বেরিয়ে গেছে।
ছগনলাল চেঁচিয়ে উঠলো।
কুথা যাবেন বাবু, তাকে পুলিশে উঠায়ে লিয়ে গেছে।
অনিমেষদা, প্রবীরদা, বিধানদা থম মেরে গেছে। রূপায়ণদা, অনুপদা কাকে ফোন করছে।
দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে।
সবাই কেমন হতভম্ব হয়ে গেছে কথাটা শোনার পর।
ইসলামভাই তখন ফোনটা বার করেছে পকেট থেকে। আমি ইশারায় না করলাম। আমার ফোনটা এগিয়ে দিলাম।
চিকনাকে রিং করে আমাকে দাও।
সুরো আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।
কার চোখে জল নেই। বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পরেছে। সবার এঁটো মুখ, কারুর হাত ধোয়া হয় নি।
টিনা, মিলি, অদিতি, নীপা ভেতর থেকে জলের বোতল আনতে ছুটল।
ইসলামভাই ফোনটা ধরে আমাকে দিল।
ভয়েজ অন করা আছে সবাই শুনবে, নাহলে আমার ষষ্ঠী পূজো হবে।
বলো গুরুমা।
গলাটা ভাড়ি ভাড়ি কেন।
পীরসাহেবের থানে বসে আছি, একটু ঠান্ডা লেগেছে।
কাঁদছো কেন।
তোমরা আমার গুরুকে দুটো খেতে দিতে পারলে না। তোমাদের বাড়িতে খাওয়ার এতই অভাব।
চিকনা ঝাঁজিয়ে উঠলো।
চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে, তবু কাঁদতে পারছি না।
অনিমেষদাকে দেখলাম চোখ থেকে চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছছে। এই প্রথম একটা দোর্দন্ড প্রতাপ লোককে এতোটা ভেঙে পরতে দেখলাম।
আমার কথাটা শোনো।
শুনবো না, তুমি আমাকে একা থাকতে দাও।
বুঝলাম চিকনা অঝোড়ে কেঁদে চলেছে। সবাই নিস্তব্ধ।
কান্নাকি আমারও পাচ্ছে না, কি করবো। দিনে দিনে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি। জীবনের সব তাপ উত্তাপ হারিয়ে ফেলেছি।
তবু নিজের মেয়েটার হাতে দুটো লুচি এঁটো ভাত খেয়েছে।
বুকের ভেতরটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে বুঝলি বুবুন।
যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।
একদিকে সুরো আর এক দিকে চিকনা।
যার দিকে তাকাই সেদিকে ছলছলে চোখ ছাড়া কিছুই চোখে পরে না। আমি নিজেই কাঁদতে ভুলে গেছি।
ফোনে তখনো চিকনার ডুকরে ডুকরে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
তুমি এতো দিন কি করে ঘর করলে ওর সঙ্গে।
তুমি একটু আমার কথাটা ভাবো।
ঠিক আছে ওকে চিনতে পারনি, টনা মনাকে চিনতে পারেল না কেন।
প্রবীরদা কাছে এগিয়ে এলো। ফোনটা বার করতে গেল পকেটে থেকে।
অনুপদা হাতটা চেপে ধরলো।
টনা, মনাও ছিল!
ছিলতো।
কি করে বুঝবো বলো।
সবাই আমাকে ঘিরে ধরে আছে।
পাঁচিলের পাশে একটা ছেঁড়া পোঁটলা পরে আছে। ওটা নিয়ে এসো।
বুঝলাম চিকনা ফোঁপাচ্ছে।
আর কি বললো।
বম্বে এয়ার পোর্টে নেমে আমাকে ফোন করলো। রাত দেড়টার ফ্লাইটে লন্ডন যাবে। বললো চিকনা আজ আর কাউকে কিছু বলিস না। কাল সকালে বলিস।
মেয়ের হাতের লুচিগুলো ভীষণ ভালো খেলাম বুঝলি।
চিকনা কেঁদে ফেললো।
সারাদিন না খেলেও চলতো। শেষ বেলায় সুরোর হাতে খেলাম।
চিকনা ঢেউ তুলে তুলে কাঁদছে আর বলে যাচ্ছে।
ইসলামভাই মেনুগুলো বেশ ভালো বানিয়েছে। মাংসটা আর একটু সেদ্ধ হতো, তবে রাতের দিকে ঠিক হয়ে যাবে।
দেখলাম ইসলামভাই ওর্ণা দিয়ে চোখ মুছছে।

চলবে

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s