কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান (part 01)


কিছু কথাঃ দেখি নাই ফিরে এর দ্বিতীয় পর্ব কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান নামে লেখা হচ্ছে এখন। মূল লেখক মামনজাফরান নামে পরিচিত। আসল নাম জ্যোতি বন্দোপধ্যায়। বাংলাইরোটিক এর পাঠক দের জন্য ধারাবাহিকভাবে এখন থেকে আবার প্রকাশিত হবে।
যারা আগের পর্বগুলো পড়েন নি তারা প্রথম পর্ব থেকে পড়তে শুরু করে দিন।
আগের পর্ব – দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 34)

কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান
লেখক = মামনজাফরান (মূল নাম – জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়)

ইদানিং মায়ের ব্যবহারটা অনিশার ঠিক ভাল লাগছে না। দিন দিন মা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই মায়ের প্রতি অনিশার অভিমান হয়।
একটা সময় ছিল মা বুক দিয়ে ওদের দুই ভাইবোনকে আগলে রাখত। কিছু হলে মায়ের মুখ চোখ কেমন শুকিয়ে যেত। নীরুমামা, কনিষ্কমামা, বটামামাকে চব্বিশঘন্টা বাড়িতে হাজির থাকতে হত। তারওপর ডাক্তারদাদু।
কিন্তু কিছুতেই মনের অনুসন্ধিৎসু গুলো মাকে খুলে বলতে পারে না। মাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে না কেন তুমি দিন দিন এরকম হয়ে যাচ্ছ। মা যদি কিছু মনে করে।

কিন্তু ও এখন বড়ো হয়ে গেছে। দুদিন পরে ও এ্যাডাল্ট হয়ে যাবে। দিদানকে জিজ্ঞাসা করে দিদানেরও এক কথা সময় হোক সব জানতে পারবি।
আগে এরকম হতো না! সেই টেন পাশ করার পর থেকেই ওর মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না।
দিদান বলেছে অনি ব্যানার্জী ওর বাবা সেটা ও ছোট থেকেই শুনে আসছে।
স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল আন্টি একবার ওকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিল,
হু ইজ অনি ব্যানার্জী ? জার্নালিস্ট, সোস্যাল ওয়ার্কার ?
প্রিনসিপ্যাল আন্টির কথা শোনার পর মনটা খারাপ হয়ে গেছিল,
আন্টিকে বলেছিল, জানো আমি এখনো বাবাকে দেখি নি।
আন্টি বলেছিলেন, কিছু ভেব না মাই ডটার গডের কোনদিন মৃত্যু নেই।
সেদিন কথাটার অর্থ ধরতে পারি নি। আমার বাবা গড হতে যাবে কেন ? গডরা মন্দিরে থাকে। তাদের পূজো করা হয়। কই আমার বাবাকে কেউ পূজ করে না।
পরে ও হিডমিস্ট্রেস আন্টির কাছে জানতে পেরেছিল প্রিন্সিপাল আন্টিকে ওর বাবা একবার সাহায্য করেছিল। সেদিন ওর বাবা যদি প্রিন্সিপাল আন্টির পাসে না দাঁড়াতেন তাহলে প্রন্সিপাল আন্টির একটা বড়ো বিপদ হতে পারত। সেই থেকে প্রন্সিপাল আন্টি বাবাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেন। মাকে এখনো মাঝে মাঝে ফোন করেন।
সত্যি, জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আজও ওর বাবার দেখা পেল না। বাবাকে ও ছবিতে দেখেছে। আর লোকের মুখে বাবার গল্প শুনেছে। যাকেই বাবার কথা জিজ্ঞাসা করেছে তারাই বলেছে, তোর বাবা! ওঃ একটা ডেঞ্জারাস পার্সেন। সবাই কেমন যেন বাবার কথা শুনলে এড়িয়ে এড়িয়ে গেছে।
বাবার কিছু কিছু কথা ইসলামদাদাই রতন আঙ্কেল বলেছে। তবু কেমন কেমন যেন লাগে। মাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিল, মা বাবা কবে ফিরবে ? মায়ের চোখের পাতা ভাড়ি হয়ে উঠেছিল। তারপর থেকে মাকে ও আর বিরক্ত করে না।
উচ্চ মাধ্যমিকের ফইন্যাল পরীক্ষার তিন মাস আগে থেকে অনিশা রাতজেগে পড়তে শুরু করে। শুতে শুতে প্রায় মাঝরাত হয়ে যায়। আগে মা অনিশার সঙ্গে একসঙ্গে শুত এখন আর মা অনিশার সঙ্গে শোয় না। নীচের ঘরে শোয়।
বাবার আলমাড়িটা পর্যন্ত নিচের ঘরে নিয়ে চলে গেছে। বাবার ঘরটা এখন সম্পূর্ণ ওর নিজের ঘর। ছোটদিদানের ঘরটা দাদা দখল করেছে।
বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অনিশা লক্ষ করেছে সপ্তাহের একটা বিশেষ দিন একটা বিশেষ সময়ে মা অনেক রাতে বাগানের একটা কোনে চলে যায়। পায়চারি করে বাগানের এই প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত। মোবাইলে নীচু স্বরে কার সঙ্গে কথা বলে। তখন চারদিক শুনসান।
সেদিনটা আকাশে মেঘলা করেছে। ঘনো ঘনো বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
অনিসা জানলার কাছে এসে জানলার পাল্লাদুটো বন্ধ করতে গেল। হঠাৎ নিচে আমগাছের তলায় চোখ পরতেই দেখল মা বাগানে পায়চারি করছে। বিদ্যুতের আলোয় মায়ের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল।
এতো রাতে মা নিচে আমগাছের তলায়!
ও একটু নিজেকে আড়াল করে স্পষ্ট দেখতে পেল মা ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে।
এতো রাতে মা কার সঙ্গে কথা বলছে!
সেদিনটা ও অনেক ভেবেছে কিন্তু কোন উত্তর পায় নি। কাকে ও মনের কথা জিজ্ঞাসা করবে।
একদিন ও সাহস করে নিচে নেমে এসেছিল। অন্ধকারে পা টিপে টিপে মায়ের ঘরে ঢুকেছিল দেখেছিল বাবার আলমাড়িটা হাট করে খোলা। ঘর ঘুট ঘুটে অন্ধকার। মা বাগানে আম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ফোনে কার সঙ্গে হেঁসে হেঁসে নীচু স্বরে কথা বলছে।
রাস্তার নিওন আলোর ছেঁড়া ছেঁড়া স্পর্শ মায়ের চোখে মুখে। উজ্জ্বল মুখটা খুশিতে ভরপুর। চোখে মুখে উচ্ছ্বলতা। ঝর্ণার জলধারার মতো কল কল শব্দে মা কথা বলে চলেছে।
অনিশা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে শোনার চেষ্টা করেছে। পরিষ্কার শুনতে পায় নি। তবে ওর কথা দাদার কথা, ছোটদিদা, বড়দিদা, দাদাই, দুদুন, সবার কথা মা বলছে। এমনকি অফিসের কথাও মা বলছে।
কথা বলা শেষ হলে মা ফোনটা অফ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চোখের জল মুছেছে। ধীর পায়ে আমগাছের তলা থেকে ঘরে এসেছে। অনিসা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে শিঁড়ির কাছে লুকিয়ে থেকেছে।
মা ঘরে ঢুকলে আস্তে আস্তে ভেজানে ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মের দেখেছে। মা ফোনটা আলমাড়িতে তুলে রেখে একটা খাতা বার করে টেবিলে গিয়ে বসেছে। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কি যেন লিখলো। তারপর খাতাটা তুলে রেখে আলমাড়িতে চাবিটা দিল।
বাবার টেবিলের ড্রয়ারের এক কোনে চাবিটা লুকিয়ে রাখল। বাবার সেই বড়ো সন্ন্যাসী সাজা ফটোটার কাছে গিয়ে প্রণাম করলো। টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা নিয়ে মাথার শিয়রে রাখল। তারপর শুয়ে পরলো।
তাহলে কি মায়ের দুটো ফোন! এই ফোনটা মা খালি সপ্তাহে একদিন রাতে কথা বলার জন্য ব্যবহার করে!
ছোট থেকেই নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি অনিশার প্রবল আকর্ষণ।
মা বাধা দিয়েছে। বকেছে। তবু ও লুকিয়ে লুকিয়ে সে গুলো জানার চেষ্টা করেছে, দেখেছে। নিজের মনের ক্ষুধা মিটিয়েছে। কেউ টেরটি পায় নি।
মনে মন ঠিক করল এখন এই নিয়ে ও একটুও ভাববে না। আগে পরীক্ষাটা ভাল করে দেবে। ভাল রেজাল্ট কর সকলের মুখ বন্ধ করে দেবে। তারপর নিজের কাজ গোছাবে। ওকে জানতেই হবে মা কার সঙ্গে কথা বলে।
ও বেশ লক্ষ করেছে এই দিনটার পরের দিনটা মা বেশ ফুর ফুরে থাকে।
ওই দিন মা রাগ করতে জানে না। মার কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। মা একবারও জিজ্ঞাসা করে না। কি জন্য তুমি এটা চাইছো, কি প্রয়োজন।
মাঝে মাঝে বাড়িতে আড্ডা বসে সেখানে বেশির ভাগ সময়টা বাবার কথা বলেই হাসাহাসি হয়। বাবা আমাদের কাছে নেই তবু বাবা যেন সব খানেতেই আছে।
সেদিন সুরঞ্জনা মনি কথায় কথায় বলছিল, জানিস অনিসা অনিদা যদি থাকত না এ সময় দেখতিস। মাথা তো নয়….। তারপরই সুরঞ্জনা মাসি কথাটা আর বললো না।
এইরকম ছেঁড়া ছেঁড়া কথা প্রায়ই অনিসা শোনে মাথাটা মাঝে মাঝে ঝিম ঝিম করে। আর মনের মধ্যে জেদ চেপে বসে। যে ভাবেই হোক ব্যাপার গুল সব জানতে হবে। এখনো সময় আছে। নিজেক অনেক ধীর স্থির থাকতে হবে।
মার মুখ থেকে শুনেছে। বাবা কোনদিন কাউকে দোষারপ করত না। নিজের কাজ নিজে চুপ চাপ করে যেত। ববার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় গেছে। বাবা কাউকে কোনদিন তা জানতে দেয়নি।
এমনকি মা পর্যন্ত বাবার মনের কথা জানতে পারে নি। কাজের শেষে সকলে জানতে পারত বাবা এই কাজটা করলো।
এই রকম সাত পাঁচ চিন্তা অনিশার মাথায় খালি ঘুর পাক খায়। মাস তিনেক ও দাঁতে দাঁত চেপে থাকল। দাদাকে একবার বলেছিলো ব্যাপারটা। দাদা খালি বললো, ও সব জানে। ও নিজেও ওয়াচ করছে সব ব্যাপর গুলো।
ধোঁয়াশাটা নিজেদের খুঁজে বার করতে হবে। যে কোন মূল্যে বাবাকে চাই। সে জীবিত হোক আর মৃত। কিন্তু মাঝে মাঝে একটা প্রশ্ন প্রায়শই ওর মনে দানা বাঁধে। বাবা যদি বেঁচেই থাকবেন তবে কেন ফিরে আসছে না।
দিন পনেরো হলো পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আজ বাড়ি সম্পূর্ণ ফাঁকা।
মা দাদাকে নিয়ে অফিসে গেছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই মা দাদাকে অফিসে নিয়ে যাচ্ছে। আজ দাদা যেতে চায় নি। মা জোড় করে নিয়ে গেছে। অফিসের কাজ বোঝাচ্ছে। ওকেও যেতে বলেছিল ও যায় নি।
দাদাইরা দামিনী দিদার ওখানে গেছে। কি কাজ আছে। দিদাইরা জ্যেঠিদিদার বাড়িতে গেছে। অনিসা এই সুযোগটা কোনমতে হাত ছাড়া করতে চাইল না। সবাই বেড়িয়ে যাওয়ার পর। ও পিকুকে ফোন করলো।
পিকুদা।
বল।
তুই কোথায় ?
অফিসে। মনির ঘরে।
কে রে ? মায়ের গলা স্পষ্ট শুনতে পেল অনিশা। পিকুদা বললো, অনিসা ফোন করেছে।
ধর মনি তোর সঙ্গে কথা বলবে।
কিরে একা থাকতে ভাল লাগছে না। রবীনকে পাঠাব।
না না এমনি পিকুদাকে একটু ফোন করলাম। কোথায় আছে তাই।
তুই কি করছিস।
নেটে বসেছি।
নেটে বসে কি করছিস।
তোমাকে সব কথা বলা যায়।
তা ঠিক, বড়ো হয়ে গেছিস।
দাদাকে দাও।
নিউজরুমে গেছে।
অর্ক মামাকে দাও।
সবাই কি তোর জন্য এখানে বসে থাকবে। কাজ নেই। তুই চলে আয়। সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।
ঠিক আছে, ছাড়ছি।
রবীনকে পাঠাব।
দরকার পরলে ফোন করবো।
অনিশা ফোনটা কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। এই সুযোগটা হাতছাড়া করা যাবে না। নিচে নেমে এলো। বুকের ভেতরটা ধুক পুক করছে।
যে কাজ করতে ও যাচ্ছে যদি ধরা পড়ে যায় তাহলে সব পন্ড। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিজে বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধ করলো।
কাজটা করা ঠিক হবে ? নিজেই ডিসিসন নিলো। একটা সত্যিকে ও জানার চেষ্টা করছে। তাতে অন্যায় কোথায়। মা কেন গোপন করছে সব কিছু।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই গেটের দিকে একবার তাকাল। ছগনদাদু গেটে হেলান দিয়ে ঝিমচ্ছে। ভজুমামা কোথায় ?
এদিক ওদিক তাকিয়ে বারান্দা থেকে বাগানে নেমে এলো। দেখল ভজুমামা বাগানের এক কোনে বসে গাছের চাড়া লাগাচ্ছে। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলো না অনিশা। পায়ে পায়ে মায়ের ঘরে চলে এলো।
দরজাটা ভেজিয়ে দিল। বাবার ছবিটা টেবিলে দাঁড় করান। মা বলেছিল বিয়ের দিন নীরু মামারা এই ছবিটা তুলেছিল। বাবার ওই গল্পটা মনে পড়তেই অনিশা হেসে ফেললো। ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালো। বাবা যেন ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
কিরে কি ভাবছিস। ভয় করছে।
চমকে উঠলো অনিশা।
কে, কে কথা বললো।
আবার বাবার ফটোটার দিকে তাকাল।
না। কেউ না। তাহলে!
থমকে দাঁড়িয়ে গেলি কেন।
তোমাকে দেখছি।
কেন।
এতোদিন তোমাকে দেখেছি। আর আজকে তোমাকে দেখছি…..কি বলবো তোমাকে, তোমার মতো ভাল বাংলা লিখতে পারিনা। বলতেও পারি না।
চুটিয়ে বই পড়। দেখবি আপসেই ভাল বাংলা বলতে পারছিস। তুই যা বলতে চাইছিস সেটা হলো ফারাক, তফাৎ, কোন মিল খুঁজে পাচ্ছিস না।
তুমি একেবারে আমার মনের কথাটা বলে দিয়েছ।
দেখলি আমি কিরকম তোর মনের কথাটা জেনে ফেললাম।
কি করে জানলে।
নিজে নিজেকে প্রশ্ন করবি আর নিজে নিজে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবি।
করিতো উত্তর পাই না।
জাস্ট প্র্যাক্টিস, দেখবি কারুর হেল্প দরকার লাগবে না।
সত্যি।
হ্যাঁ সত্যি।
বলো আমি এখন কি করতে এসেছি।
আলমাড়িটার ভেতর কি আছে তাই দেখবি তাইতো।
কি করে বুঝলে!
বুঝলাম।
আচ্ছা তুমি মাকে ভালবাসো।
খুউউউউউউব।
তাহলে ফিরে আসছনা কেন।
দামী প্রশ্ন করেছিস। একটু সময় লাগবে উত্তর দিতে।
আর একটা প্রশ্ন করব।
বল।
তোমার একটুও ইচ্ছে করে না আমাকে দাদাকে দেখতে।
আমি সপ্তাহে একদিন তোদের একবার করে দেখি।
কি করে।
সে বলবো না।
ওমা তুমি কার সঙ্গে বক বক করছো।
অনিশা পেছেন ফিরে তাকাল।
ভজুমামা ঘরের ভেতর এলো।
অনিশা একদৃষ্টে ভজুর দিকে তাকিয়ে, গায়ের লোম গুলো কেমন খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তুমি অনিদার ফটোর সঙ্গে কথা বলছিলে। আমি সারা বাড়ি খুঁজে পেলাম না। শেষে এই ঘরের ভেতর থেকে শব্দ আসছে দেখে ভেতরে এলাম।
অনিশা ভজুর চোখ থেকে চোখ সরাল না।
তুমি অমনভাবে তাকিয়ে আছ কেন। কথা বলবে না ?
বাবার সঙ্গে তুমি কতদিন থেকেছ।
ও মা তোকে দেখে আমার ভয় লাগে কেন। তোর চোখ গুল ওরকম ঘোলাটে কেন।
যা বলছি তার উত্তর দাও।
আগাগোড়া তোর বাপের সঙ্গে আছি।
এ বাড়িতে কবে এসেছ।
তোর জম্মের আগে।
আমি যে এ ঘরে ঢুকেছি কেউ যেন জানতে না পারে।
ভজু হাঁ করে তাকিয়ে থাকল অনিশার দিকে।
মনে রাখবে জানতে পারলে বাবাকে বলে দেব।
তোমার সঙ্গে অনিদা কথা বলছিল।
হ্যাঁ।
আমার সঙ্গে একটু কথা বলিয়ে দাও। কতোদিন গলার স্বর শুনিনি।
আমি যা বলবো তাই করবে।
তুমি যা বলবে তাই করব।
ঠিক আছে নেক্সট যেদিন কথা বলবো সেদিন বলিয়ে দেব।
কথা বলাবে তো ?
আমার কথা শুনলে।
শুনবো।
যাও দরজাটা ভেজিয়ে বাইরে গিয়ে বসো।
ভজু বেরিয়ে গেল।
অনিশার বুকের ভেতর ধক ধকানিটা অনেকটা কমে গেছে। একটু আগে বুকের ভেতর যেরকম উথাল পাতাল করছিল এখন সেটা অনেক কম। নেই বললেই চলে।
আবার বাবার ফটোটার দিকে ঘুরে তাকাল। পায়ে হাত দিয়ে মনে মনে বললো, আমাকে ক্ষমা করো বাবা। আমাকে জানতেই হবে।
টেবিলের ড্রয়ারটা খুললো। ডাঁই করা সব কাগজের টুকরো। কোথাও চাবিটা দেখতে পেল না। একটা পুরনো মানিপার্স। ড্রয়ারের কোনের দিকে পরে আছে। পার্সটা হাতে নিয়ে একবার উল্টে পাল্টে দেখলো। বহুযুগ আগেকার পার্স।
কিন্তু চাবিটা গেল কোথায়। মাকে এখানেই কাল রাতে রাখতে দেখেছি।
তাহলে কি মা জায়গা বদলেছে ?
মানিপার্সটা খুলতেই বাবা-মার একটা ছবি চোখে পরলো। মনে হচ্ছে সেই সময়কার তোলা। একবার বাবার ফটোটার দিকে তাকাল। একবার মানিপার্সের ছবিটার দিকে। নিজে নিজেই হেসে ফেললো। মায়ের পাশে বাবাকে কেমন কেমন যেন লাগছে। পার্সের বাঁ পাশের খাপ খুলতেই অনিশার চোখ চক চক করে উঠলো। একটা মর্চে পরা চাবি।
তাহলে কি এইটা ?
অনিশা চাবিটা হাতে নিলো। গা-হাত-পা কেমন ভারি ভারি লাগছে। শরীরের শক্তিটা নিমেষে কেমন যেন উধাও হয়ে গেল। মনে হচ্ছে এইখান থেকে ওই এই টুকু ও যেতে পারছে না।
কেন এরকম হচ্ছে ?
মার মুখ থেকে শুনেছে বাবা রাতের বেলা শ্মশানে গিয়ে বসে থাকত। বাবার নাকি প্রিয় জায়গা। চিকনামামার সঙ্গে একবার গিয়ে ওখানটা ঘুরে এসেছে। তাহলে আজ এরকম হচ্ছে কেন।
দূর যত্তো সব।
অনিশা পায়ে পায়ে আলমাড়িটার দিকে এগিয়ে এলো।
চাবি ঘুরিয়ে আলমাড়িটা খুললো।
আলমাড়িটা খোলার আগে মনে মনে অনেক কল্পনা করেছিল। কিন্তু কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল খুঁজে পেল না।
ইস কি অগোছাল। মা একটু পরিষ্কার করতে পারে না।
ওপরের তাকে বাবার প্যান্ট গেঞ্জি, পাজামা পাঞ্জাবী, কেমনভাবে যেন রাখা। এর থেকে আমার আলমাড়িটা অনেক পরিষ্কার। তার পরেরটায় মার কাপর শালোয়াড়।
মা এই জামা কাপর এখন আর পরে না! মাকে কোনোদিন এগুলো পরতে দেখে নি।
কেনো ? তাহলে কি মা…..।
পরের তাকে খালি কাগজ পত্র আর ফাইল। ডানদিকে চারটে এক্সাসাইজ খাতা। মনে হয় আট নম্বর হবে। অনিশা হাত বাড়িয়ে একটা খাতা বার করে আনলো। হ্যাঁ মায়ের হাতের লেখা। ওপরে তারিখ দেওয়া।
বুবুন আমি আর পারছি না।
দু’চারলাইন পরার পর ওর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। না সময় নষ্ট করা যাবে না।
খাতাগুলো এখান থেকে নিয়ে গেলে মা বুঝে যাবে। জেরক্স করলে কেমন হয় ?
তাহলে এখন জেরক্স করাবার জন্য বেরতে হবে।
না বেরনো যাবে না।
ভজুমামা বুঝে যাবে। মাকে বলে দিতে পারে। না তার থেকে স্ক্যান করে নেওয়াই ভাল। তাহলে ওর ল্যপটপেই থাকবে। রাতে সময় নিয়ে পড়তে পারবে।
অনিশা স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নিল। নিচ থেকে একটা খাতা বার করে আনল।
কেউ চলে আসার আগে স্ক্যানটা শেষ করে ফেলতে হবে। রাতে সময় নিয়ে পরতে হবে। আলমাড়িটা বন্ধ করে চাবিটা ঠিক জায়গায় রাখল। মা যাতে বুঝতে না পারে।
ঘরের বাইরে এলো। ভজুমামা বাগানে গাছের ডাল ছাঁটছে।
অনিসা ওপরে উঠে এলো। নিজের ঘরে এসে আগে ল্যাপটপটা অন করলো। মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। তিনটে মিস কল! খেয়েছে। মা ফোন করেছিল।
সঙ্গে সঙ্গে রিং ব্যাক করলো।
কোথায় ছিলি।
বাগানে।
কি করছিলি।
ভজুমামার সঙ্গে কথা বলছিলাম।
নেট থেকে কখন উঠলি।
তোমার সঙ্গে কথা বলার পরই উঠে পরেছি।
একা একা থাকতে ভাল লাগছে না।
তোমাকে তাই বললাম।
চলে আয়।
না এখন অনেক কাজ।
কি কাজ করছিস।
আচ্ছা আমি কি এখনো ছোট আছি।
মিত্রা হো হো করে হেসে ফেললো।
অমনি হেসে দিলে।
নে মিলি মাসি কথা বলবে।
দাও।
অনিসা মনে মনে বিরক্ত হচ্ছে।
একেই হাতে সময় নেই। খাতাটা স্ক্যানকরে সঠিক জায়গায় রেখে আসতে হবে না হলে ধরা পরে যাবে।
কিরে কি করছিস।
কাজ করছি।
পরীক্ষা শেষ, আবার কিসের কাজ।
শেষতো কি হয়েছে। আমার নিজের কাজ থেকতে পারে না।
বাবা তুইতো গিন্নীদের মতো কথা বলছিস।
এখন রাখি তোমার সঙ্গে বিকেলে কথা বলবো।
খুব তাড়া।
খুউউব। রাখছি।
আচ্ছা।
অনিশা সময় নষ্ট করলো না। স্ক্যানারটা রেডি করে পটা পট স্ক্যান করতে শুরু করলো। প্রায় একশো পাতা স্ক্যান করতে বিকেল গড়িয়ে গেল। খুব সন্তর্পনে খাতাটা সঠিক জায়গায় রেখে এলো। একবার ভাবল আর একটা খাতা নিয়ে গিয়ে স্ক্যান করে ফেলি। তারপর ভাবল না ব্যাপারটা রিক্স হয়ে যাচ্ছে। আজ থাক, আবার আগামীকাল দুপুরে।
অনিসা আজ খুব জোর মার হাত থেকে বেঁচে গেছে। বলতে গেলে বাবাই বাঁচিয়েছে। সাতদিন লাগল খাতাগুলো সব স্ক্যান করতে। সময় করে করতেই পারে না। একটু করে আবার রেখে যায়। এই কদিন ও একা শুতে পারে নি।
ছোটদিদাই-এর শরীরটা খারাপ ছিল, তাই ছোটদিদাই-এর কাছে শুতে হয়েছিল।
এইকদিন সবাই বাড়িতেই ছিল, ফাঁক মতো খাতা ওপরে নিয়ে গিয়ে স্ক্যান করতে হতো। যাতে কেউ জানতে না পারে।
আজ সবে মাত্র শেষ খাতাটা স্ক্যান শেষ করলো। মায়ের ঘরে ঢোকার আগে বড়দিদাই জিজ্ঞাসা করেছিল, ওই ঘরে কি করতে যাচ্ছিস।
অনিসা চোখ পাকিয়ে খালি তাকিয়ে ছিল।
আলমাড়িতে ঠিক জায়গায় খাতাটা তুলে রেখে, চাবিটা যথাস্থানে রেখে, বাবার ফটোটার সামনে এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ঘরের ছোট লাইটটা জলছিল। খেয়াল নেই। বাবার সঙ্গে ও কথা বলছিল। মা কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে জানে না। ও আপনমনে বাবার সঙ্গে কথা বলছিল।
হঠাৎ মায়ের গলা।
কিরে তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস।
অনিশা মার দিকে ঘুকে তাকাল।
মা ওর দিকে তাকিয়ে কি বুঝলো কি জানে, দৌড়ে গিয়ে ঘরের বড়ো লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। তারপর কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তোর চোখ মুখের অবস্থা এই রকম কেন ? কি হয়েছে তোর!
অনিশা মার দিকে তাকিয়ে রইলো।
মিত্রার চেঁচামিচিতে ছোটমা, বড়মা এসে ঘরের সামনে দাঁড়াল।
কি হয়েছে!
দেখো দেখো ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখো। বুবুনের ফটোটার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
কার সঙ্গে কথা বলছিলি মা। এই তুই ওপর থেকে নামলি। বড়মা বললো।
বাবার সঙ্গে।
অনিশার গলাটা একটু অন্যরকম শোনাল।
মিত্রা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
তুমি কাঁদছো কেনো ? দেখ আমার কিছু হয় নি। বাবা আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলো, তাই কথা বললাম।
দেখছ ছোটমা দেখ একেবারে বুবুনের মতো কথা।
আমিও অনিদার সঙ্গে কথা বলেছি।
সবাই পেছন দিকে তাকিয়ে দেখল, ভজু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।
তুই এই জন্য একা একা বাড়িতে থাকিস।
মিত্রা মেয়ের মুখের দিকে তাকাল।
তুমি কেঁদ না কাঁদলে কোনদিন কিছু পাওয়া যায় না। ভেতর থেকে আর্চ থাকা দরকার।
তুই এসব কথা কোথা থেকে শিখলি।
বাবা বলেছে।
ছোটমা তুমি জ্যোতিষদাদাকে ফোন করো।
কি করবে তোমার জ্যোতিষদাদা। আমাকে নিয়ে গেছিলে। সব ফালতু।
মিত্রা মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। এ কথার কি উত্তর দেবে। মেয়ের কথা শুনে মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে।
ঠিক আছে। তুই ও ঘরে চল। মিত্রা তুই জামা কাপড় ছেড়ে নে।
বড়মা অনিশার হাত ধরে ঘরের বাইরে চলে এলো। মিত্রা মেয়ের চলার পথের দিকে একবার উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল। এতোদিন ও লক্ষ করে নি। আজ ও লক্ষ করলো একেবারে বাবার মতো চলন।
কিন্তু অনন্য। ওকে কখনো এইভাবে কথা বলতে শুনি নি বরং অনেক বেশি চুপচাপ। দশটা কথা বললে একটা উত্তর দেয়।
আজ অফিস থেকে বেরবার সময় বললো, তুমি চলে যাও আমি রাতে ফিরব।
মিত্রা কেন কি বৃতান্ত জিজ্ঞাসা করে নি। খালি আসার সময় সন্দীপকে ফোন করে বলে এসেছিল, ও রইল তুমি দেখবে।
দরজাটা বন্ধ করে ফটোটার সামনে এসে দাঁড়াল।
কিরে কি ভাবছিস।
কোন উত্তর নেই।
মনে পরেছে, তোকে একদিন বলেছিলাম। তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বারিছে সে। আমার কথাটা শুনে খুব হেসেছিলি। আজ নিজের চোখের সামনে দেখলি।
মিত্রা মাথাটা নীচু করে নিল।
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো।
আর কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে বলতে পারিস ?
মিত্রা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলো।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো তারপর বাথরুমে চলে গেল।
খাওয়ার সময় মিত্রা একবার মেয়েকে বলেছিলো, কিরে আজ রাতে আমার সঙ্গে শুবি।
অনিশা সড়াসরি মায়ের মুখের ওপর না বলে দিয়েছে।
খাওয়ার শেষে অনিশা নিজের ঘরে চলে এলো। আলোটা জালতে ভাল লাগল না। পাখাটা ছেড়ে দিলো। আজ হঠাৎ করে গরমটা কেমন যেন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
অনিশা বাগানের দিকের জানলাটা খুলে দিল।
অন্ধকার ঘরটায় রাস্তার নিওন আলো ঠিকরে এসে পরলো। আমগাছের তলাটা ঘনো অন্ধকার। অনিশা জানলার সামনে এসে দাঁড়ালো।
আমগাছের পাতায় হাওয়ার স্পর্শে একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে।
এই শব্দটাকে কি করে ব্যাখ্যা করবে।
দূর ছাই, ভাল করে বাংলাটা লিখতে পারি না। বলতেও পারি না। বাবা বলেছে প্রচুর পর দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।
কই আগেও অনিশা বহুবার এই জানলার ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। কই এমন অদ্ভূত একটা ভালো লাগা ওকে গ্রাস করেনি। আজ তাহলে কেন এমন ভালো লাগছে।
মার মুখ থেকে ও বহুবার শুনেছে। বাবা সময় পেলে এই জানলাটার সামনে এসে দাঁড়াত। ওই আমগাছটার সঙ্গে কথা বলতো। আরও কতো কি।

অনিশা মাকে ঠাট্টা করে বলেছে। বাবা একটা পাগল ছিল, তাই ওইরকম পাগলাম করতো।
আজ তাহলে অনিশার এরকম মনে হচ্ছে কেন।
তাহলে কি বাবার মতো পাগলামি ওর মধ্যেও চেপে বসছে ?
কই ওর নিজেকে পাগল বলে মন হচ্ছে না।
জ্ঞানতঃ সব কিছু বুঝতে পারছে। ভাবতে পারছে।
না আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। খাতাটা পড় ফেলতে হবে।
জানলার থেকে সরে এলো।
ল্যাপটপটা টেবিলে রাখল ছোট টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নিল। নিজের ভেতরটা কেমন কেমন যেন লাগছে। একটা নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করতে চলেছে। মায়ের গোপন কথা।
দূর ছাই যত্তোসব বাজে বাজে চিন্তা।
অনিশা ফোল্ডারটা ওপেন করে ইমেজ ফাইলটা খুলে ফেললো।
বুবুন আমি আর পারছি না।
গত সাত মাস ধরে তোর কথা খালি ভেবেছি। তোকে একটা আনন্দের সংবাদ জানাই। আমি কাঁদতে ভুলে গেছি। আমার চোখ দিয়ে এখন আর একটুতে জল পরে না।
তুই ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কে আছে বল।
কাকে আমি আমার মনের কথা বলব। সেই তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, তুই মরে গেছিস। তুই বিশ্বাস কর। আমি এখনো সিঁদুর পরি।
একথা আমি লিখতে পারছি না। চোখে জল ভরে আসছে। তুই আমাকে অথৈ জলে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেলি। এতো বড়ো সাম্রাজ্য, আমি সামলাই কি করে।
তোর সঙ্গে কতো কথা বলার ছিল, তুই কিছুই শুনলি না।
সেদিন তুই চলে আসার পর দাদুর বাড়িতে কতো হৈ হুল্লোড় করলাম। রাতে সব এক সঙ্গে খেতে বসলাম। সব খানেতেই তুই। বরুণদা একে একে সমস্ত ঘটনা বললো।
তখন জানতে পারলাম। তুই পনেরদিন ধরে কোথায় ছিলি, কি করছিলি। তবে বরুণদার কথা শুনে মনে হলো, বরুণদাও সব জানে না। বরুণদা বরুণদার পার্ট টুকু জানে।
দাদুর সঙ্গে দাদা কতোক্ষণ কথা বললো। সব মান অভিমানের পালা শেষ হলো। দাদা কথা দিলো এখানে আসবে। দাদাকে তোর কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বললো এখনো এসে পৌঁছয় নি। ভাবলাম কোথাও কাজ সেরে ফিরছিস। তোর মতি গতি বোঝা মুস্কিল।
রাতে তোকে অনেক বার ফোন করলাম, দেখলাম তোর ফোন স্যুইচ অফ। মনটা খারাপ হয়ে গেল।
দিদিভাই আমি সানা একসঙ্গে শুলাম।
পিকুও আমাদের সঙ্গে শুলো। সারারাত পিকু আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকল। সে এক আলাদা অনুভূতি, তোকে কি করে বোঝাই।
মনে মনে ভাবলাম আমিও মা হতে চলেছি। আমার সন্তানও আমাকে এই ভাবে জড়িয়ে ধরে সারারাত শুয়ে থাকবে তুই যেমন রাত জেগে পাহাড়া দিস তেমনি পাহাড়া দিবি।
ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই।
সকালে ছোটমার ডাকে ঘুম ভাঙলো।
ছোটমার মুখটা কেমন গম্ভীর, চোখের পাতা ভেঁজা ভাঁজা। মনটা কেমন কু গাইল। ধর ফর করে উঠে বসলাম। ভাবলাম দাদুর হয়তো কিছু হয়েছে। তারপর শুনলাম তোর এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। মাথাটা কেমন চক্কর কাটল তারপর আর জানি না।
তিন দিন পর জ্ঞান ফিরল। চোখ মেলে তাকাতেই দেখি ডাক্তারদাদা আমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বসে আছে। মুখটা কালো হয়ে গেছে। চোখ দুটো ছলছলে। তখন আমার মাথার ভেতরটা কেমন খালি খালি। ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।
বুঝলাম আমি নার্সিংহোমে শুয়ে আছি। ডাক্তারদাদা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আস্তে করে বললো, একটু ঘুমবার চেষ্টা কর।
আমি ঘরের চারিদিকটা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কতো যন্ত্রপাতি। আমার সারাটা শরীর কেমন যন্ত্রণা করে উঠলো। ডাক্তরাদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো। ডাক্তারদাদা চোখ মুছিয়ে দিল। যেন মনে হলো বাবা আমার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছেন। আবার তোর কথা মনে পরে গেলো।
ডাক্তারদাদাকে অস্ফুটট স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম, বুবুন।
বললো ভাল আছে।
ওকে ডাকো।
বললো ও একটা নার্সিংহোমে ভর্তি আছে।
মনে মনে আশ্বস্ত হলাম তুই বেঁচে আছিস। মনে একটা জোর পেলাম।
ডাক্তারদাকে বললাম আমি ভাল হয়ে গেছি। তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো।
ডাক্তারদাদা বললো, আর একটু সুস্থ হয়ে ওঠ, তারপর নিয়ে যাব।
ডাক্তারদাদা আমাকে ইঞ্জেকসন দিল, তারপর আর জানি না।
প্রায় দিনকুড়ি বাদে বাড়িতে এলাম। এর মধ্যে কতো লোক আমাকে দেখতে এসেছে তোকে বলে বোঝাতে পারব না। তোর বন্ধুরা ছাড়াও আরও কতো লোক। তাদের সকলকে চিনিও না। তোর কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে ভাল আছে।
বাড়িতে যেদিন এলাম। ঘরে লোকে লোকারণ্য। আমি তখন সুস্থ।
আমাকে অনিমেষদা, বৌদি, প্রবীরদা, অনুপদা, বিধানদা, রূপায়ণদা বড়মার ঘরে নিয়ে গেল। নানা কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে খালি বলতে লাগল মিত্রা তোকে এবার শক্ত হতে হবে। তুই মা হতে চলেছিস। তোর এখন অনেক কাজ। আমরা তোর পাশে আছি। তোর কোন চিন্তা নেই। তখনই বুঝে গেলাম, আমার কপালে কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে।
তারপর সব জানলাম। গুম হয়ে গেলাম।
জানিষ বুবুন আজ আমার সাধ। তুই জানিষ সাধ কাকে বলে। তুই তো একটা গাধা। তোকে বলেই বা লাভ কি।
জ্যেঠিমনি কাল রাতে এসেছে। তিনজনে মিলে সব গোছ গাছ করছে। বৌদি একবার এসে ফিরে গেছিল আজ সকাল থেকে এসে হাজির। সুরো আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, বৌদি তোমার পেটটা এতো বড়ো কেন।
সঙ্গে সঙ্গে বড়মা বলে উঠলো বলতে নেই।
আমার সে কি হাসি।
পূর্ণিমার রাতে পীরবাবার থান থেকে ফিরে এসে তুই আমাকে যে জীবনটা দান করেছিলি। তাকে তিলে তিলে আমার শরীরের রস রক্ত জলে বড়ো করে তুলছি। আমার শরীরে তোর বীজ বাসা বেঁধেছে। কি ভালো লাগছে তোকে বোঝাতে পারব না।
আজ তোর সন্তানের বয়স সাত মাস হয়ে গেল।
আমি এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি।
জেনেছি এ্যাক্সিডেন্টে তুই মারা গেছিস। কিন্তু আমি মন থেকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তুই এই ভাবে মরে যেতে পারিস না।
ইসলামভাই এই কয় মাসে আমার সঙ্গে মাত্র সাতবার দেখা করেছে কিনা সন্দেহ। ছোটমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, বলেছে ইসলামভাই বাইরে গেছে। কাজ আছে। রতন আবিদ কারুর দেখা পাই না। দামিনী মাসি এলেও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে না। বুঝতে পারছি তোর এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ওরা কেউ মেনে নিতে পারছে না।
আজকে সবাই এসেছে। সবাই হৈ হুল্লোড় করছে কিন্তু কোথায় যেন তাল কেটে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কিন্তু কেউ প্রকাশ করতে চাইছে না। কনিষ্করা এলো অনেক দেরিতে। আমার সঙ্গে একটু ইয়ার্কি ফাজলাম করলো। নীরু দিদিভাই-এর পেছনে একটু লাগল। যে পিকু আঙ্কেল আঙ্কেল করে পাগল সে কেমন চুপচাপ।
বিকেলের দিকে কনিষ্ককে একটু একা পেলাম।
আমি জানতাম আর কেউ কিছু করুক না করুক তোর জন্য ও অনেক দূর এগবে। ওর কাছে তোর সঠিক খবর পাওয়া যাবে। মনে হলো এই দিনটার অপেক্ষায় আমি বসে ছিলাম।
ওকে আমার ঘরে নিয়ে এলাম, সঙ্গে নীরু বটা। মিলি টিনা আসতে চেয়েছিল বারন করলাম।
কনিষ্ক হয়তো আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছিল। ঘরে ঢুকেই বললো,
ম্যাডাম তুমি কিন্তু অনির কথা জিজ্ঞাসা করতে পারবে না।
আমি খুব ধীর স্থির ভাবে ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, আমি শুনতে চাই কনিষ্ক।
না। আমি বলতে পারব না।
তুমি বলো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। আমার কিছু হবে না।
কনিষ্ক আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
নীরু বললো, না তোকে বলতে হবে না।
আমরা যদি ওই দৃশ্য সহ্য করতে না পারি। ম্যাডাম সহ্য করবে কি করে।
আমি নীরুকে বললাম, আমি সহ্য করতে পারব। বুবুন আমাকে এই কদিনে সেই সহ্য শক্তি দিয়েছে। তোমরা নির্ভয়ে বলো।
বটা বললো, দেখ কনিষ্ক ম্যাডামের এটা জানা উচিত, তাহলে ম্যাডামও নিজের মতো করে চলতে ফিরতে পারবে।
কনিষ্ক বলতে শুরু করলো।
রাত তখন দেড়টা স্যারের ফোন পেলাম। স্যারের গলায় উৎকণ্ঠা।
তুই কোথায় আছিস।
আমার আজ নাইট স্যার।
একবার আসতে পারবি।
এতো রাতে!
অনির এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।
মাথাট কেমন ঘুরে গেল।
আমি এখুনি যাচ্ছি স্যার।
ফোনটা রেখেই, সঙ্গে সঙ্গে নীরুকে বটাকে ফোনে ধরলাম। বললাম তোরা চলে আয় অনির বাড়িতে। আমি আর একজনকে দায়িত্ব দিয়ে চলে এলাম।
এই বাড়িতে এসে দেখলাম কে নেই। সবাই চলে এসেছে। অনিমেষদার মুখটা পাংশু। দাদাকে স্যার প্যাথিডিন ইঞ্জেকসন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রেখেছে। স্যারের মুখ থেকে সব শুনলাম।
তাপসকে কারা যেন বারাসাত হাসপাতালে ভর্তি করেছে। তাপসের ইঞ্জুরি সেরকম নয়। হাতে এবং মাথায় লেগেছে।
ওকে পুলিস জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
আমি বললাম অনির খবর কি।
স্যার বললো, অনিকে পাওয়া যাচ্ছে না।
তারমানে।
সেটাই তো ভাবছি।
এদিকে তাপস যা বলেছে তা হলো। চোখে আলো পরতে ও গাড়িটাকে স্লো করে দেয়। তারপর অপজিট সাইড দিয়ে আসা গাড়িটা ইচ্ছে করে ধাক্কা মারে। তারপর ও কয়েক মিনিটের মতো অচৈতন্য হয়ে যায়।
জ্ঞান আসতে দেখে। অনিকে কারা যেন একটা টাটা স্যুমোতে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ির নম্বরটাও ও বলেছে। কিন্তু সেই গাড়িটা কলকাতার নয় ইউপির।
তখন তোমাকে নিয়ে যমে মানুষে টানা টানি চলছে। আমাদের কনসেন্ট তখন অনি নয় তুমি। তোমাকে কোন প্রকারে বসিরহাট থেকে নার্সিংহোমে ঢুকিয়ে স্যারেদের হাতে সঁপে দিয়ে অনির খোঁজ করতে শুরু করলাম।
ইসলামভাই-এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছি। অনিমেষদা তার প্রশাসনিক ক্ষমতা কতটা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন তখন দেখেছিলাম। বিশ্বাস করবে না ম্যাডাম একটা মাছি গলতে পারবে না। বেঙ্গলের চারদিক শিল করে দেওয়া হলো।
ইসলামভাই দুদিনের মাথায় খবর জোগাড় করলো সাগির, অবতার, নেপলাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ওদের ফোনও স্যুইচ অফ।
ইদানিং সাগির অবতার নেপলাকে নিয়ে অনি বেশি ঘুরতো। তাহলে কি ওরাই অনির কোন খতি করলো। ইসলামভাই তখন পাগলের মতো চারদিকে খোঁজ লাগাচ্ছে। কোথাও কোন ট্রেস করতে পারছে না।
এমনকি আবিদ রতন দামিনী মাসি যার যেদিকে যতটা এক্সট্রিম ক্ষমতা আছে।
তৃতীয় দিন সকালের দিকে অনিমেষদা পার্টি অফিসে ডেকে পাঠালেন। গেলাম। বললো এখুনি চল একবার কল্যানী যাব।
কেন!
ওখানকার থানা ইনফর্ম করেছে। একটা বডি পাওয়া গেছে। প্যান্টের পকেট থেকে যে মানি পার্টস পাওয়া গেছে তা থেকে অনির প্রেস কার্ড মিলেছে।
বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো।
অনিমেষদা মাথা ধরে বসে আছেন।
বিধানদার মুখ থেকে কোন কথা সরছে না।
রাজনাথকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে, কোথাও রাজনাথের কোন হদিস নেই।
প্রবীরদার অবস্থা পাগলের মতো।
সবাই স্নান খাওয়া সব ভুলে গেছি।
থানা থেকে বডি তুলে আনা হয়েছে। ভয় বলে কি জিনিষ জানতাম না। জীবনে প্রথম সেদিন ভয় পেলাম।
বডিটা দেখে, নীরু বটা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। কি বলবো তোমায় ম্যাডাম, মাথা কোন কাজ করছে না। আমরা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না খবরটা। বুকের ভেতরটা দুরু দুরু করে উঠলো। মুখ চেনা যাচ্ছে না। থেতলে গেছে।
সেই ডোরাকাট লালা হলুদ গেঞ্জি জিনসের প্যান্ট পরা।
অনিমেষদা বললেন, কিরে চিন্তে পারছিস।
আমি বললাম পোষাক পরিচ্ছদ দেখে মনে হচ্ছে অনি। অনিমেষদা তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন রাজনাথই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। এর মধ্যে ইনভলভ অবতার, সাগির, নেপলাও।
পোস্টমর্টেম হলো। সব কিছু মিলে গেল অনির সঙ্গে। পোস্টমর্টেম টেবিলে আমি ছিলাম। আমার মনের অবস্থা তখন তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।
চোখে জল এসেছিল কিনা বলতে পারব না। যার সঙ্গে বসে কথা বলেছি হাসি ঠাট্টা করেছি। এক বিছানায় শুয়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছি। তার মৃত শরীররে আমি ছুঁড়ি চালাচ্ছি।
স্যারকে খালি বললাম, স্যার আমি একটু ডিএনএ টেস্ট করবো। স্যার আমার মুখের দিকে তাকালো।
তোর শেষ অস্ত্র।
হ্যাঁ স্যার, ওর সমস্ত রেকর্ড আমার কাছে প্রিজার্ভ করা আছে।
আর একটা জিনিষ একটু আমাকে বলুন এই বডির হার্টটা কোন দিকে।
কেন বলতো।
একটু দরকার আছে।
বামদিকে।
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
তখনই আমার স্থির বিশ্বাস হলো, এই বডিটা অনির নয়। অনি মরে নি।
কাউকে এই মুহূর্তে এই কথা বলা যাবে না।
এমনকি এতদিন নীরুরাও জানত না। আজ বলে ফেললাম।
কনিষ্ক ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আমার হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, বিশ্বাস করো ম্যাডাম ওটা অনির বডি নয়। ও মরে নি। ও বেঁচে আছে। কোথায় আছে জানি না। তবে ও বেঁচে আছে।
তুই বিশ্বাস কর বুবুন কথাটা শোনার পর আমার এতো আনন্দ হচ্ছিল, তোকে বলে বোঝাতে পারব না।
নীরুকে বললাম একটু চা আনো, আর কেউ যেন এই সময় আমাদের বিরক্ত না করে।
সত্যি তোর বন্ধু। তুই ভাগ্যকরে কিছু বন্ধু পেয়েছিলি বটে। কতটা তোকে ভালবাসলে এইরকম স্যাকরিফাইস করতে পারে সেদিন জানলাম।
বটা সেদিন একটাও কথা বলে নি। চুপচাপ শুনে গেছে।
কনিষ্ক কান্না থামার পর বললো।
জানো ম্যাডাম আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে বিরল প্রজাতির মানুষ অনি।
সুমন্তর জন্য ও যেদিন রক্ত দেওয়ার মনস্থির করলো। তারপর ওর থরো টেস্ট করলাম।
আমি নিজে হাতে সেদিন ওর সব কিছু টেস্ট করেছিলাম।
সেদিনই প্রথম জানতে পারলাম। সবার হার্ট বাঁদিকে থাকে ওরটা আছে ডানদিকে। ওর শরীরের টোটাল সিস্টেমটা তাই আলাদা। বইতে পরেছি চোখের দেখা কোনদিন দেখি নি। এক্সরে থেকে শুরু করে সব করলাম। এমনকি ডিএনএ-টেস্ট পর্যন্ত করালাম।
তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না। দেখলাম দুটো জিনিষ ওর সঙ্গে মেলে নি। এক ওই বডিটার সঙ্গে ওর হার্টের পজিসন, আর ডিএনএ।
রিপোর্ট গুলো পাওয়ার পর আমি তখন মনে মনে ভাবতে শুরু করে দিয়েছি ও মরে নি।
এদিকে সেদিন বডি হ্যান্ড ওভার করা হয়েগেছে। অনিমেষদা কাঁদতে কাঁদতে বডি নিলেন। কেউ গেল না। বড়মা শোনার পর ফিট হয়ে যাচ্ছে। তুমি হাসপাতালে। সে কি অবস্থা। চোখে দেখা যায় না।
একমাত্র তোমাদের কাগজ ছোট করে রিপোর্ট করলো আর সব কাগজ বড়ো বড়ো করে রিপোর্ট করলো। কাগজ পড়ে বাড়িতে সকলে হাজির সে এক হুলুস্থূলুস কান্ড।
ওই রকম জাঁদরেল ইসলামভাই সে পর্যন্ত ভেঙে পরেছে।
রতন আবিদের কথা ছেড়ে দাও। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
অনিমেষদা ওখান থেকেই ফোন করলেন যে ভাবেই হোক মার্ডারার কে ধরে দিতে হবে।
সেই কটা দিন কি ভাবে যে কেটেছে বলে বোঝাতে পারব না। কার কথা বলবো।
দাদা খালি বললো অনির শ্রাদ্ধ করা যাবে না।
এই সময় আমার আর একটা সন্দেহ হয়েছিল। যে চিকনা অনির বিয়ের দিন আমার মুখে অনির কথা শুনে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছিল, সেই চিকনা সেদিন কাঁদল বটে, কিন্তু সেই কান্নার মধ্যে কোন প্রাণ ছিল না।
দাদা আর অনির কাকা বললো শ্রাদ্ধ করা যাবে না। তাহলে মিত্রার মনের ওপর আরও চাপ বাড়তে পারে এতে হিতে বিপরীত। যেমন চলছে তেমন চলতে দাও।
আমি কবে আরও শিয়োর হলাম ম্যাডাম জানো….।
ঠিক মাস খানেকের মাথায় হঠাৎ আবিদ হাসপাতালে এসে হাজির।
আমি দেখে অবাক, কিরে এখানে।
তোমার সঙ্গে একটু দরকার আছে।
ওকে নিয়ে ক্যান্টিনে এলাম।
চা খেতে খেতে চাপা স্বরে বললো। রাজনাথ স্যুইসাইড করেছে একেবারে ডঃ ব্যানার্জীর মতো।
আমি আবিদের কথা শুনে ঝট করে দাঁড়িয়ে পরলাম।
কি বলছিস তুই!
ঠিক বলছি। বসো।
তুই কি করে জানলি।
আমি মজঃফরপুরে লোক পাঠিয়েছিলাম। আমার কাছে খবর ছিল অনিদার ঘটনার পর রাজনাথ পালিয়েছে। তারপর পাত্তা নিতে শুরু করলাম। জানলাম ও মজঃফরপুর থেকে পঞ্চাশ কিলো মিটার দূরে একটা গ্রামের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছে। লোক পাঠালাম।
আজ সকালে খবর এসেছে। মজঃফরপুর স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে লাইনের ওপর ওর বডি পাওয়া গেছে।
আবিদ আমাকে ম্যাসেজটা দেখাল। অবিশ্বাস করি কি করে।
এরপর তুমি বিশ্বাস করো অনিদা মরে গেছে। আলবাৎ অনিদা মরে নি।
আমি আবিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
ওর চোখে মুখের কাঠিন্য দেখে আমার বুকটাই ধক ধক করে উঠলো।
তাহলে সাগির, অবতার, নেপলা ?
অনিদার সঙ্গেই আছে।
তুই গেজ করছিস।
আবিদ কোনদিন গেজ করেনা। আমি ভালোপাহাড়ে লোক পাঠিয়েছিলাম, ওখানে শ্যাম শিবু নেই। দারু সমস্ত কিছু কন্ট্রোল করছে। তুমি কতদিন ওখানে যাও নি ?
মাস খানেকের ওপর।
তোমাকে কথা দিলাম কনিষ্কদা, ইসলামভাই অনিদাকে খুঁজে বার করতে পারবে না। যতদিন পর্যন্ত অনিদার মকসদ পূর্ণ না হয়।
অনিদার মকসদ পূর্ণ হলেই অনিদা নিজে ফিরে আসবে। এসব যা দেখছ শুনছ সব গট আপ।
তুই কি আমাকে বাজাতে এসেছিস।
না।
তাহলে।
আমি শেষের কয়েকদিন অনিদার সঙ্গে ঘুরেছি। আমি জানি, ইসলামভাই-এর থেকেও অনিদার হাতটা অনেক বেশি লম্বা। ইসলামভাই-এর মতো দশটা মথা এক করলে অনিদার মাথা হবে।
তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না কনিষ্কদা। আমরা যে এখানে বসে আছি। এই খবরটাও হয়তো অনিদার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
কি পাগলের মতো বকছিস। এখানে সবাইকে আমি চিনি।
এটাই অনিদার প্লাস পয়েন্ট, তুমি যাকে সন্দেহ করবে না, সেইই অনিদার ঘুঁটি।
তুই আমার মাথাটা খারাপ করে দিবি।
আমি ঠিক বলছি কনিষ্কদা। অনিদা আমাদের সকলকে বুকে করে আগলে রাখছে। রাজনাথ দিদির কতবড়ো খতি করেছে তুমি জান না। ইসলামভাই কিছু জানে, সব কথা জানে না। তাহলে ইসলামভাই নিজেই রাজনাথকে সরিয়ে দিত।
খালি অনিমেষদার জন্য রাজনাথ এতদিন বেঁচে যাচ্ছিল।
শেষের পনেরদিন দাদা যা ছক করেছিল তার একটা আমি একটু আভাস ইঙ্গিতে জানতে পেরেছিলাম। তাতে বুঝেছিলাম অনিদা খুব তাড়াতাড়ি দেশ ছেড়ে হাওয়া হয়ে যাবে।
তুমি কি ভাবছো আমি বসেছিলাম। না। আমার স্বল্প ক্ষমতায় পাত্তা লাগিয়েছিলাম।
ধরা পরে গেছি। বকুনি খেয়েছি। তারপর আমাকে ফোন করে বললো, যা দিয়িত্ব দিলাম অন্ধের মতো পালন কর। তোর ভাবনা আমি ভাবব।
তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমাকে আগে বলিসনি কেন।
সেদিন অনিদার চেহারা তুমি দেখ নি। আমি রতনদা, নেপলা দেখেছিলাম। কথার যদি অবাধ্য হতাম, সেদিনই ছট্টুর মতো হাওলা করে ছেড়ে দিত। আজও অনিদার কথার অবাধ্য হই নি। যে দায়িত্ব দিয়ে গেছে পালন করে যাচ্ছি।
আমারও তো বলার একটা লোক দরকার, কাকে বলি বলো।
কেন ইসলামভাই।
অনিদা ইসলামভাইকে আর এই জগতে রাখতে চায় না। আমাদেরও। বলেছে অপেক্ষা কর।
অনিদা চলে যাবার পর তোমাকে দাদার আসনে বসিয়েছি।
তাই জানাতে এসেছি। এটা অনিদা করিয়েছে। অনিদা এখনও বেঁচে আছে কনিষ্কদা।
আমি আবিদের কথা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম।
মাথা কোন কাজ করছে না। এ কি শুনিয়ে গেল আবিদ। যদি সত্যি হয় কার কাছে ক্লারিফাই করবো। নিজের কাছে নিজে ?
অনেকক্ষণ বসে থেকে ওয়ার্ডে ফিরে এলাম।
রাতে অনিমেষদার সঙ্গে কথা বললাম। বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। গেলাম। বৌদি প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেছিল। তারপর অনিমেষদা এলেন। সব বললাম।
আমার কথা শোনার পর অনিমেষদা হাসলেন। খবরের সত্যতা স্বীকার করে নিলেন। সেদিন আমি অনিমেষদাকে আমার সংগ্রহের দুটো ক্লু দিলাম। অনিমেষদার চোখ ছানাবড়া।
কি বলছিস তুই!
আমি ঠিক বলছি দাদা।
বৌদি শুনে লাফাতে আরম্ভ করলো।
অনিমেষদা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি অনি মরে নি।
তোর কথা শুনে এখন তাই মনে হচ্ছে। আমার আর একটা প্রশ্ন মনে জাগছে বুঝলি কনিষ্ক।
কি বলুন দাদা।
কয়েকদিন আগে শুনলাম মুখার্জী ট্রান্সফার নিয়ে দুবাইতে গেছে। একবারে দেশ ছেড়ে বিদেশে।
আমার মাথায় ঢুকছে না দাদা।
ঠিক আছে তুই যা, ভেবে দেখি। মিত্রা কিছু জানতে পেরেছে ?
বলতে পারব না। তবে মনে হচ্ছে আবিদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।
না।
কেন বলছেন দাদা।
আবিদ রতনকে আমি ওয়াচে রেখেছি।
শ্যাম, শিবুর ব্যাপারটা।
ওটা প্রবীরকে দায়িত্ব দিতে হবে।
কনিষ্করা চলে গেল বুঝলি বুবুন। মনটা আশ্বস্ত হলো। আজ থেকে আবার নতুন করে বাঁচার ইনস্পিরেসন পেলাম।
আজ আমি নার্সিংহোমে ভর্তি হলাম। নিজের নার্সিংহোম, নিজের পরিচিত সব। অতএব অসুবিধে হওয়ার কিছু নেই। বড়মা, ছোটমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি সঙ্গে এলো। বুঝতে পারছি সবাই আড়ালে চোখের জল মুছছে।
আমি একটুও মন খারাপ করলাম না। আমি জানি, ওরা জানে না। বৌদি যেহেতু জানে তাই ওদেরকে সান্তনা দিচ্ছে।
সবাই ফোনে খবর নিচ্ছে।
সব কিছু চেক আপ হলো।
বিকেলের দিকে সবাই বসে গল্প করছি। নীরু এসে ঢুকলো। ও এখন আমার দেখভাল করে। তবে টাইট লুজের ব্যাপারটা ওকে দেখাই নি। যা কিছু ওপর ওপর। আমাকে প্রশ্ন করে আমি তার উত্তর দিই। মাঝে মাঝে ইয়ার্কি ফাজলামও মারে।
ম্যাডাম মনে রাখবে আমি কিন্তু অনির সাবস্টিটিউট।
তাহলে বুবুনকে ব্যাপারটা জানাতে হয়।
তোমার যা অবস্থা আমারও তাই অবস্থা।
তারপর একটা জোড়া কলা বার করে বলে খাও তো।
বড়মা হেঁই হেঁই করে উঠলো।
বদমাশ এই সময় জোড়া কলা খাওয়াতে হয়।
খাবে না মানে, আলবাৎ খাবে।
জানিস জোড়া কলা খেলে কি হয়।
দেখো বিদ্যেটা অনি শিখিয়েছে। ভুলি কি করে বলো।
তখন সবাই চুপ করে গেল।
কেন খাওয়াতে চাইছিস বল।
এতদিন বলিনি। আজ বলছি। ম্যাডাম দুজনকে ক্যারি করছে। টুইন বেবি।
জানিস বড়মা উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। থামাতেই পারি না। তারপর বললো, অনি আর কোনদিন দেখতে পাবে না।
আমি চুপ করে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর কনিষ্ক গজ গজ করতে করতে ঢুকলো।
আমার দিকে তাকিয়ে বললো। তুমি কাউকে নিচে থাকার পার্মিসন দিয়েছো।
না।
আরে আজ সাত আট দিন হয়ে গেল। একটা বানজারা ফ্যামিলি নার্সিংহোমের তলায় রয়েছে।
তোর কি। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখগে যা নিচে। কি নোংরা করে রেখেছে।
ওরা ফুটপাথে আছে। তোর জায়গা।
ওটা নার্সিংহোমের ফুটপাথ। বেশ করেছে আছে, থাকবেও।
তারমানে!
তোকে ওরকম ডেকরেসন করতে কে বলেছে। এটা কলকাতা। ওরা সাজিয়ে গুছিয়ে সংসার পেতেছে। থাকার জায়গা দিতে হবে তো।
আচ্ছা আচ্ছা। এবার থামো। বুঝেছি।
কি বুঝেছো।
আমাকে সিকুরিটির ছেলেটা এসে বলেছিল। ম্যাডাম ওরা এসে রয়েছে। দুটো ছোট ছোট বাচ্চা রয়েছে। ওরা বেশিদিন থাকে না। ম্যানেজার সাহেব চলে যেতে বলছেন, ওরা বলেছে কয়েকদিন পর চলে যাবে। আপনি যদি একটু বলে দেন।
তাই আমি ম্যানেজার সাহেবকে বলেছি।
পরের দিন আমার সিজার করার দিন ধার্য হলো। বড়মা জ্যোতিষদাদার কাছ থেকে ডেট টাইম সব নিয়ে এসেছে। কিন্তু মাঝ রাতের দিকে আমার হঠাৎ শরীরটা খারাপ হলো। কনিষ্করা থাকতোই সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারদাদা চলে এলো। যাকে দিয়ে আমার সিজার করানর ঠিক ঠাক ছিল, তাকে পাওয়া গেল না। তখন ডাক্তারদাদার এক বান্ধবী অঞ্জলি সাহাকে দিয়ে সিজার করান হলো। বাড়ির কেউ জানতেও পারল না।
আমাকে সেনস্লেস করে দিয়েছিল। মনে হয় অবস্থাও কিছুটা বেগতিক ছিল। তোর বন্ধুরা সব সামলে দিয়েছে। মাঝে একবার একটু একটু মনে পরছে। আমার মাথার শিয়রে একটা লাইট জ্বলছে।
ডাক্তারদাদা আমার গালে আস্তে আস্তে থাপ্পর মেরে বলছে মামনি দেখ দেখ দাদুভাইকে দেখ।
দিদিভাইকে দেখ। দুজনেই কেমন জুল জুল করে তোর দিকে তাকিয়ে। একবার মনে হয় চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলাম।
ভোরের দিকে আমার পুরো সেন্স এলো।
সেই ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে বসে আছে।
হেসে ফেললো।
আমিও হাসলাম।
হাসিস না। তিনজনে মিলে যা চরকি নাচন নাচালি না।
ওরা কেমন আছে।

এদিকে তো টনটনে জ্ঞান আছে। এখন কেমন লাগছে।
ঠিক আছি।
আমাকে হাতমুখ ধুইয়ে ডাক্তারদাদা হরলিক্স আর দুটো বিস্কুট দিল।
তুমি আগে ওদের নিয়ে এসো।
নিয়ে আসছি। ওদের একটু সাজুগুজু করতে দে। সবে পৃথিবীর আলো দেখলো।
নীরু ফিক ফিক করে হাসছে।
বুঝলি একেবারে গা জালান হাসি।
ওরা সবাই চা খেল। দুজন সিস্টার দুটো বেবি কটে ছেলে মেয়েকে নিয়ে এলো। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে তোর মুখটা মনে পরে গেল।
ভীষণ খারাপ লাগছিল। আমাদের দুজনের ভালবাসার প্রথম ফল।
দুজনের গায়ে হাত রাখলাম। এক একটা গোটা টাওয়েলে দুজনকে আলাদা আলাদা করে পৌঁটলা বানিয়ে দিয়েছে।
নীরু তুই সব চেক করে নিয়েছিস।
হ্যাঁ।
এবার দুধ খাওয়াবে।
ম্যাডাম যদি পারে খাওয়াক।
ওরা বেরিয়ে গেল।
ডাক্তারদাদা সিস্টারদের বলে গেল, ওদের একটু দুধ খাওয়াও। বেচারারা পৃথিবীর আলো দেখার পর কিছু খায় নি।
ডাক্তারদাদাও চলে গেল।
তুই বিশ্বাস কর বুবুন, প্রথম মাতৃত্ব কাকে বলে অনুভব করলাম। বার বার তোর কথা মনে পরে যাচ্ছে। একটা শূন্যতা। তুই পাশে থাকলে কি ভালো লাগতো।
তুই বলেছিলি এক জন্মে সব কিছু পরিপূর্ণ হয় না। পরের জন্মের জন্য কিছু রাখ। এইটুকু পরের জন্মের জন্য রাখলাম।
প্রথমে ছেলেকে বুকে আঁকড়ে ধরলাম। মনে মনে বিশ্বাস করলাম। তোর নেক্সট জেনারেসন। তারপর মেয়েকে। ওরে তোকে কি বলবো, যেই কোলে নিয়েছি, টিঁ টিঁ করে সে কি কান্না।
কিছুতেই থামাতে পারি না। সিস্টাররা হেল্প করলো।
দুজনকে দুধ খাওয়ালাম। সারাটা শরীরে একটা বিদ্যুতের শিহরণ। এক আলাদা অনুভূতি। আমার স্বপ্ন স্বার্থক। তোর দেওয়া জীবন তোকে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি।
কচি কচি ঠোঁটে নিপিল দুটো নিয়ে কি খামচা খামচি। যেন সাত রাজার ধন এক মানিক খুঁজে পেয়েছে। কি শুরশুরি লাগছিল। হঁ হঁ করছে।
কচি কচি হাত দুটো চোখ বন্ধ করে কিছু ছুঁতে চাইছে। কিছুতেই সামলাতে পারি না। সিস্টার দুটো সাহায্য করলো। মিনিট তিনেক নিপিল দুটো চোষাচুষির পর ঘুমিয়ে পরলো।
মনটা খারাপ হয়ে গেল।
সিস্টারকে বললাম ওরা আর খাবে না।
পেট ভরে গেছে আবার এক ঘন্টা পর।
ওদের নিয়ে চলে গেল।
বার বার মনে হচ্ছে তুই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস।
আমাকে গুছিয়ে গাছিয়ে বেডে নিয়ে এলো।
ঘরে এসে অবাক হয়ে গেলাম। ঘর ভর্তি লোক। ওই সাত সকালে বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি সবাই হাজির। কারুর আর গুছিয়ে কাপর পড়ার সময় হয় নি। দেখে মনে হলো যা পরেছিল সেই ভাবেই চলে এসেছে। কার কথা বাদ দেব।
তুই এলি দাদু দিদা কোথায়। বড়মা কট কট করে উঠলো।
আমি হাসি।
এখন ওর কাছে দেওয়া যাবে না। ডাক্তারদাদা বললো।
ওমনি বড়মার সে কি মুখ রে, ডাক্তারদাদার চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দেয় আর কি। ডাক্তারদাদা বাধ্য হয়ে বললো। নীরু ওদের একবার নিয়ে আসতে বল। বড়মার দিকে তাকিয়ে বললো, মনে রাখবে, মাত্র পাঁচ মিনিট। গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। তারপর ওদের নিয়ে চলে যাবে।
তাহলে তোমরা আছো কি করতে।
ডাক্তারদাদার হাসিটা তুই যদি এই সময় দেখতিস।
সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে।
বেবিকট ঠেলতে ঠেলতে দুজন সিস্টার ওদের নিয়ে এলো। গুঁটু শুঁটি মেরে দুজনে চোখ বন্ধ করে ঘুমচ্ছে। মাথা ভর্তি চুল। মুখ দুটো লাল। পাশ ফিরে আছে।
সবাই হুমরি খেয়ে পরলো।
তোকে কি বলবো বুবুন, আমি তখন ফাউ। এই পৃথিবীতে আমার কোন দাম নেই।
তোর কথা মনে পরে গেল। আসলের থেকে সুদের দাম বেশি।
যে যা খুশি নামে ডাকছে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। আমি তখন যথেষ্ট ফিট।
বড়মা নাতি নাতনির মুখ দেখে, আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো। ব্যাগ থেকে একটা ফুল বার করে আমার কপালে গায়ে বুলিয়ে দিলো।
এতো সকালে কোথায় পূজো দিলে।
তুই ভর্তি হয়েছিস শুনে, চিকনা কাল এসেছে। পীরসাহেবের থানে নিজে পূজো করেছে।
বোঝ একবার। তোর শিষ্য।
চিকনা কোথায় ?
নিচে আছে।
এলো না।
বললো বাড়িতে গেলে দেখবে।
কাকারা আসে নি।
খবর দিয়েছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।
বড়মারা কেউ ঘর থেকে নড়লো না। সবাই একে একে আসছে। আমার সঙ্গে দেখা করছে। চলে যাচ্ছে। পিকুর নাচ তো তুই দেখলি না। আমি দেখলাম।
দিদিভাই ওকে বলেছে মনিকে ভগবান দুটো পুতুল দিয়েছে। পুতুল দুটো ওর।
নীরু আমাকে চেকআপ করতে এসে ফিস ফিস করে বললো, জানো ম্যাডাম সেই বানজারা গুলো তল্পি-তল্পা গুটিয়ে চলে গেছে।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম।
কনিষ্কটা কতো বড়ো গাঢ়ল, এবার বুঝতে পারলে।
আমি নীরুর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি।
তুমি জানলে কি করে।
সিকুরিটির ছেলেটা এখন এসে বললো। সকালে ওরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেছে।
ছেলেটা ওদের সঙ্গে কথা বলেছিল।
কি জানি।
লোকের আসা যাওয়ার কোন বিরাম নেই। আমার থেকেও ভিআইপি এখন তোর ছেলে মেয়ে।
কাকা, কাকী, সুরোমাসি এলো একটু বেলার দিকে। দেখলাম উনা মাস্টার এসেছে।
সবার চোখ ছল ছল।
নাতি নাতনির মুখ দেখলো। উনা মাস্টার কাছে এসে আমার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করলো।
জানিস মা সুযোগ থাকলে ও দুটোকেও অনি বানাতাম।
না তুমি বুবুনের মতো ওদেরকেও মারবে।
উনামাস্টার হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো।
আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
কাকা উনামাস্টারকে সামলাল।
নীপা কাছে এগিয়ে এলো। মাথা নীচু।
আমি ওকে কাছে টেনে নিলাম।
আমি বিশ্বাস করিনা অনিদা নেই। তুমি চিকনাদাকে ধরো। ও সব জানে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
তুমি বিশ্বাস করো মিত্রাদি।
যে শ্মশানকে ও ভয় পেত সেই শ্মশানে ও মাঝরাতে যায়। পীর সাহেবের থানে গিয়ে বসে থাকে। ওর কে বন্ধু আছে, মাঝরাতে কামরপাতায় বসে ওকে গল্প করতে হবে।
তুই দেখেছিস!
আমি খোঁজ নিয়েছি। সব সত্যি।
অনাদিকে বলেছিস।
বলেছি। অনাদিদাকে বলেছে বেশি বাড়াবাড়ি করবি গাইপ করে দেব। ওকে সকলে ভয় পায়।
ঠিক আছে আমি ওর সঙ্গে কথা বলবো।
দুপুরে ইসলামভাই এলো। তখন সবে খেয়ে উঠেছি।
প্রায় সাত মাস পর। ঘরে তখন কেউ নেই। একমাত্র দামিনী মাসি বসে ছিল। বুড়ি সারাদিন একটু বাথরুম পর্যন্ত করতে যায় নি। বড়মা কতো বার বললো চলো একটু মুখে জল দিয়ে আসি, বললো তোমরা যাও দিদি, আমি মামনিকে পাহাড়া দিই।
ইসলামভাই-এর মুখটা কে যেন কালি ঝুলি লেপে দিয়েছে। মিশ কালো মুখখানা। কিছুক্ষণ গেটের মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। আমাকে দেখলো। তারপর আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এই প্রথম ইসলামভাই আমার শরীর স্পর্শ করলো।
সে কি কান্না।
ইসলামভাই-এর চোখের জল আমার কপালে টপ টপ করে পরছে। ইসলামভাই-এর চোখ বন্ধ। আবিদ রতন পেছনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
কান্না ভেঁজা গলায় বললো, আমি হেরে গেলাম, বুঝলি মামনি। পাঠানের সব অহংকার আজ মাটিতে চুরমার হয়ে ভেঙে পরেছে। জং এর ময়দানে অনি জিতে গেছে, তোর ইসলামভাই আজ মৃত সৈনিক।
আমি অবাক হয়ে ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
ইসলামভাই-এর স্নেহের স্পর্শ তখন আমার কপালে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পরছে।
কেন তুমি মন খারপ করছো। আমি করছি না।
আর মন খারাপ করবো না। আজ আল্লার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি, সব ছেড়ে দেব।
আমি ইসলামভাই-এর হাতটা শক্ত করে ধরলাম। চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল।
তোকে একটা জিনিষ দেখাব কাউকে বলবি না।
মাথা দোলালাম। না।
এতদিন বিশ্বাস করতে পারি নি, আজ বিশ্বাস করছি।
কেন!
মনটা মরে গেছিল, আজ হঠাৎ যেন বেঁচে উঠলাম। আমাকে তুই কয়েকদিনের জন্য ছুটি দে।
না।
তোকে দিতে হবে। আমাকে শেষ কাজটুকু করতে দে।
যাদের কাজ তারা করুক, তুমি আমার পাশে থাকবে। কি দেখাবে বললে।
ইসলামভাই রতনের ফোনটা চাইল। একঘন্টা আগে রতনের মোবাইলে ম্যাসেজটা এসেছে।
কে পাঠিয়েছে ?
তুই দেখ।
বুকের ভেতরটা দুর দুর করে উঠলো।
রতন ম্যাসেজটা ওপেন করে মোবাইলটা আমার হাতে দিল।
রতনদা বসকে বলবে নেপলা বেঁচে থাকতে অনিদার গায়ে কেউ কোনদিন হাত তুলতে পারবে না। অনিদার শরীর হাত লাগাবার আগে নেপলাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
ম্যাসেজটা পরার পর আমার শরীরটা কেমন ভারি হয়ে গেল। শরীরটা কেমন যেন আনচান করতে লাগল। আমার চোখে মুখে সেটা ফুটে উঠেছিল।
আবিদ মনেহয় বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারটা, ছুটে বাইরে চলে গেল। মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই নীরু, কনিষ্ক, বটা ছুটে ঘরে ঢুকলো।
তখন আমি নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে নিয়েছি।
এনি প্রবলেম ম্যাডাম।
না।
তাহলে।
ওদের হাত দেখিয়ে ইশারায় থামতে বললাম।
আমি তখনো ইসলামভাই-এর হাতটা শক্ত করে ধরে আছি। ইসলামভাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
দামিনীমাসি উঠে এসে আমার মাথার শিয়রে দাঁড়িয়েছে। আমার মাথা দামিনীমাসির বুকে।
কি হলো ইসলামভাই।
আমি কনিষ্কর দিকে হাত তুলে একটু দাঁড়াতে বললাম।
কনিষ্ক চুপ করে গেল।
নিজেকে সামলে নিলাম। কনিষ্কর হাতে মোবাইলটা দিলাম। ইসলামভাই-এর দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমাকে কিছু পাঠায় নি।
রতনকেই আরও দুটো ম্যাসেজ করেছে।
কনিষ্করা ততক্ষণে পড়ে ফেলেছে। মুখটা হাসিতে ভরে গেল।
এটা আমি জানতাম ইসলামভাই, আজ এক্কেবারে সিয়োর হয়ে গেলাম। কনিষ্ক বললো।
ইসলামভাই ওগুলো জানে না ? কনিষ্ক আমার দিকে তাকালো।
না।
ইসলামভাই আমার মুখের দিকে তাকাল।
তুই আগে জানতিস।
ঠিক জানতাম না। কনিষ্কর মতো বিশ্বাস করতাম ও আছে। আজ কনফার্ম হলাম।
দামিনীমাসি আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। গালে গাল ঘোষল।
পরের দুটো কি আছে।
রতন আবার মোবাইলটা আমার হাতে দিল।
মঞ্জিল আভি তক বহুত দূর রতনদা। কবে ফিরবো জানি না। আজ বহুত খুশ রতনদা, আজ ভাইপো ভাইঝির বার্থডে। অনিদা ছুটি দিয়ে দিয়েছে।
পরের ম্যাসেজটা।
অনিদা জানে না আমি তোকে ম্যাসেজ করছি। কেউ যেন জানতে না পারে। বস খুব মনেমনে কষ্ট পাচ্ছে তাই না। পাক। এই কাজ বস সারাজীবনেও করতে পারত না।
ম্যাসেজগুলো পরার পর আমার চোখে জল ভরে এলো। দামিনী মাসি আমার মাথাটা ধরে চোখের জল মুছিয়ে দিল।
কোথা থেকে ম্যাসেজগুলো এসেছে কিছু খোঁজ খবর নিলে।
আবিদ জেনে এসেছে।
কোথা থেকে।
দুবাই থেকে।
আমার পিঠে সপাং করে কে যেন চাবুক মারলো বুঝলি বুবুন। তার মানে তুই টোডির পেছনে ধাওয়া করেছিস!
রাতে আমার কাছে জ্যেঠিমনি থাকবে বলেছিল। দামিনীমাসিকে কিছুতেই নরানো গেল না। আমি যতো দিন এখানে থাকবো দামিনীমাসি থাকবে। আমার ঘরে। ডাক্তারদাদার কাছ থেকে সেই পার্মিসন করিয়ে নিল।
বিকেলে ঘর ভর্তি লোক। সারাদিন সময় পাই নি মোবাইলটা খুলে দেখার। রাতে দামিনী মাসিকে বললাম। ব্যাগ থেকে আমার মোবাইলটা এনে দাও।
দামিনী মাসি এনে দিল।
আমি মোবাইলটার স্যুইচ অন করতেই বহু ম্যাসেজ। একটা ম্যাসেজের নম্বর বুঝতে পারলাম না। প্লাস সাইন মাত্র তিনটে ডিজিট। খুললাম।
তুই আমাকে আমার জীবনটা ফিরিয়ে দিলি। আমি পিতৃত্ব লাভ করলাম। আমার সবচেয়ে আনন্দর দিন। তোর পাশে নিজে থাকতে পারলাম না। তবে আমার লোক জোন তোর চারপাশে আছে। তোকে কথা দিয়েছিলাম, আমার ভালবাসাকে যারা ধূলোয় লুটিয়ে দিয়েছে। তারা আমার হাত থেকে কোন দিন ছাড়া পাবে না। আমার শরীরের শেষ বিন্দু দিয়ে তাদের সঙ্গে যুঝে যাবো। এই যুদ্ধ যতদিন শেষ না হচ্ছে ততদিন তুই আমার মুখ দেখতে পাবি না। আমি ভালো আছি। ছেলে মেয়ের দায়িত্ব তোকে দিলাম। ওদের যেন কোন অসুবিধা না হয়। বুবুন।
ম্যাসেজটা পাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। নিমেষের মধ্যে আমার হাতপাটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। শরীরটা এত ভারি হয়ে গেল নড়া-চড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললাম। তোকে কি বলবো। যেন আমি দশমনি বস্তা। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা।
দামিনীমাসি মনে হয় বুঝতে পেরেছিল। কাছে এসে দাঁড়াল।
কার ম্যাসেজ পরলি, অনির।
মাথা দোলালাম।
শয়তান ছেলে। একবার ফিরুক। দেখাচ্ছি মজা।
মাসির কথা শুনে হেসে ফেললাম।
সিস্টার আবার তোর ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসে হাজির করলো। ওদের দুধ খাওয়ালাম। মাসি ওদের দুটোকে একসঙ্গে কোলে নিয়ে আদর করলো।
বাড়িতে চল তেল মাখিয়ে তোদের শক্ত করে দেব।
মাসির কথায় আমি হাসছি।
মিটি মিটি চোখে মাসির দিকে তাকায়। আবার হাই তুললো। তোকে কি বলবো জিভটা লাল টুকটুকে। আবার ঠোঁট চাটলো। আমি যেই হাতটা নিয়ে গেছি ওমনি আমার একটা আঙুল চেপে ধরলো।
দিলো মাসির কোলে মুতে।
ওরা নিয়ে চলে গেল।
নীরু এলো চেকআপ করার জন্য।
এখনো চেকআপ করার কিছু আছে।
আছে ম্যাডাম আছে। পান থেকে চুন খসলে। ঘ্যাচাং।
কেন।
সকালের খবরটা আপটুডেট নিলাম।
কি পেলে।
ব্যাটারা নির্ঘাৎ অনির লোক। তুমি যেদিন ভর্তি হয়েছো। সেদিন মাঝরাতে নিচে বাসা বেঁধেছিল। যেই শুনেছে তোমার খাল্লাস, সেই ভেগে পরেছে।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম। ভাবলাম তোর ম্যাসেজটা একবার ওকে দেখাই। তারপর নিজেই চেপে গেলাম।
তুমি কি আজ থাকবে।
কাল সকালে আবার চলে আসছি। কনিষ্ক, বটা থাকবে। তুমি বাড়ি ফিরে চলো তোমাকে একটা কথা বলবো।
এখন বলো।
না।
কবে ছাড়বে।
যে রকম আছো সেরকম থাকলে কাল ছেড়ে দেব।
ওরা দুজন ঠিক আছে।
তোমার থেকে ভালো আছে।
কেন।
তুমিতো বেগড়বাই করছো। ঠিক আছে গুড নাইট।
গুড নাইট।
নীরু চলে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত এগারটা।
মনটা ভীষণ আনচান করছে। অনিমেষদাকে ফোন করলাম। বুঝলি অনিমেষদা ফোন পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল।
কিরে মামনি ? এত রাতে! তোর কাছে কেউ নেই ?
দামিনীমাসি আছে।
কি হয়েছে বল।
আপনার খাওয়া হয়ে গেছে।
হ্যাঁ। নিউজ দেখছি। তোর শরীর।
ভাল।
বাচ্চাদুটো।
ভাল।
বল কি হয়েছে।
আপনি একবার আসবেন।
কে ফোন করেছো গো।
মিত্রা।
এতরাতে!
আমি পরিষ্কার বৌদির গলা শুনতে পেলাম।
কি হয়েছে!
মিত্রা।
হ্যাঁ বৌদি।
কি হয়েছে রে।
একবার দাদাকে নিয়ে একটু আসবে।
কি হয়েছে আগে বল।
আমি আর পারছিনা বৌদি।
আবার কান্নাকাটি করে।
তুমি দাদাকে নিয়ে একটু এসো না। একবার।
আচ্ছা যাচ্ছি।
কিছুতেই ঘুম আসছে না। কনিষ্ক এলো। আমার থম থমে মুখের দিকে তাকিয়ে। একটু অবাক হয়ে গেল।
এরকম করলে হবে না ম্যাডাম। ঘুমতে হবে।
ঘুম আসছে না কনিষ্ক।
তাহলে ইঞ্জেকসন দেব।
এখন না একটু পরে দিও।
মাসি তুমি ম্যাডামের হাতে মোবাইল দিয়েছ কেন।
শয়তানটা ম্যাসেজ করেছে।
কে!
কে আবার গুনধর।
অনি!
কই দেখি দেখি।
বুঝলি কনিষ্ক ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে মোবাইলাটা নিয়ে নিল। এক নিঃশ্বাসে ম্যাসেজটা পরে, দুহাত ওপরে তুলে একবার ঝাঁকিয়ে নিল।
শালা। বাবা হয়েছো।
অনিমেষদা আসছে।
এতরাতে!
আমি ডেকে পাঠালাম।
কাল সকালে বললে হতো না। সকাল থেকে শরীরের ওপর দিয়ে এতটা জার্ক গেল। কেন তুমি অবুঝপনা করছো।
আমি পারছিনা কনিষ্ক।
কেন এককথা বার বার বলো। আমাদেরও কি ভালো লাগছে। তবু লড়ে যেতে হবে। স্যার শুনলে আমাকে একেবারে চিঁড়ে ভাজা করে দেবে।
অনিমেষদা বৌদি সুরঞ্জনা এলো।
আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। বৌদিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। অনিমেষদা প্রথমে একটু ভড়কে গিয়েছিল। তারপর কনিষ্ক সব গুছিয়ে বললো।
অনিমেষদা হো হো করে হেসে ফেললো।
কাঁদিসনা মামনি। এতদিন অন্ধকারে হাতড়াচ্ছিলাম। তুই বিশ্বাস কর। তোর দাদা বসে থাকেনি।
অনিমেষদা আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
নিজে থেকেই ইসলামভাইকে ফোন করলো।
তুমি কোথায় আছো….একবার নার্সিংহোমে এসো….না ভয়ের কিছু নেই….হ্যাঁ। রতনকে সঙ্গে এনো।
তুই একটু ঘুমো মা। বাচ্চাগুলোকে দেখতে হবে।
আমার ঘুম আসছে না।
তোকে এই বিষয়ে চিনতা করতে হবে না। আমি দেখছি।
কনিষ্ক আমাকে ইঞ্জেকসন দিল।
আজ সারাটা দিন আমার শরীরের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেল।
শরীর বইছে না। লিখতে ইচ্ছে করছে না। তবু লিখছি। তুই ছাড়া আমার কে আছে বল। তাই লেখার মধ্যে দিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলি।
লেখার আগে কতো কথা মনে আসে এটা লিখব সেটা লিখব। যেই লিখতে বসি কিছুতেই মনে পরে না। অর্ধেক মনে পরে তো অর্ধেক মনে পরে না।
আজ তোর ছেলে মেয়ের ষষ্ঠীপূজ হলো।
নার্সিংহোম থেকে ফেরার পর লোকের আর শেষ নেই। সারাদিন লোক আর লোক।
কাল থেকে সব এসে হাজির। সেই বিয়ের দিনের মতো। সবাই তোর ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ে মত্ত।
সকালে প্রথমে আসে বটাদা, হরিদা।
দুজনে সাত সকালে এসেছে লক্ষ্মী-নারায়ণকে দেখতে। দুটো সোনার চেন নিয়ে এসেছে। লকেটটা জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার। দাদা বকাবকি করলো। এতো দাম দিয়ে এসব নিয়ে আসার কি দরকার।
দুজনের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। তারপর দাদাকে বললো। অনেক নুন খেয়েছি। এইটুকু দিলাম। দিদিমনির দাদুর সময় এসেছি। দিদিমনির কাছে লক্ষ্মী-নারায়ণ এসেছে। তুমি রাগ করো কেন।
ওদের দুটোকে নিয়ে দুই বুড়ো কিছুক্ষণ বসে থাকল।
দুজনের খুনসুঁটি দেখে সকলে হাসে।
তারপর খেয়ে দেয়ে অফিসে চলে গেল।
তুই বিশ্বাস করবি না। দুজনের কেউ ঘুণাক্ষরেও তোর নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করল না। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম।
অনিমেষদারা সবাই এলো। প্রবীরদা একটু মন খারাপ করলো। বললো জানিষ মিত্রা এবারও ফেল করে গেলাম। সব উদ্ধার করলাম, কিন্তু ওকে পেলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম ও আছে।
নম্বরটা পেয়েছো।
পেয়েছি।
দাও একবার ট্রাই করি।
তুই কি ভেবেছিস আমি বসে ছিলাম।
যদি আমি করতে ধরে।
নম্বরটা এমন কারুর যে ওখানে বসবাস করে। সে ওকে চেনে না।
সব বলতে সে বললো আপনি ভুলভাল বলছেন, ঠিক করে নামটা বলুন তাহলে আপনাকে হেল্প করতে পারব।
নেপলারটা।
ওটা স্যুইচ অফ।
আমার পরিচিত একজনকে বলেছি। সে ওখানেই থাকে। এক সপ্তাহ টাইম নিয়েছে।
বিধানদা খালি দুজনকে চেয়ে চেয়ে দেখল। আর হাসলো।
যাই বল মিত্রা, এদুটো মনে হয় ওর বাপের মতো হবে না।
হাসলাম।
কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলি বলতো।
সুরঞ্জনা তোর মেয়েকে নিয়ে ঘুরছিল। হঠাৎ দেখি দৌড়ে বৌদির কাছে চলে গেল।
ধরো ধরো।
কেনরে শখ মিটে গেল।
উঃ ধরো না তুমি।
বৌদি ধরলো সুরঞ্জনা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
তারপর দেখি তোর মেয়ে টিঁ টিঁ করে উঠেছে।
দামিনী মাসি গিয়ে ধরলো।
হেসে ফেললো।
সত্যি তোর মেয়েটে একেবারে অসভ্য। সুরঞ্জনার কোলে পটি করে দিয়েছে।
বাথরুম থেকে সুরঞ্জনা বেরতে সকলে হাসাহাসি করলো।
সুরঞ্জানা বলে প্রথমে দেখি ও চুপ করে গেল।
তারপর দেখি ওর নাকটা কেমন ফুলে ফুলে উঠছে। আমার দিকে কেমন পিট পিট করে তাকিয়ে।
ভাবলাম নতুন মানুষ দেখেছে হয়তো। ওমা তারপর দেখি আমার হাতটা গরম গরম ঠেকছে। একটা পড় পড় আওয়াজ ব্যাশ মায়ের কোলে দিয়ে সিধে বাথরুম।
সুরঞ্জনা বলে সবাই হেসে গড়িয়ে পরে যায়।
জানিষ বুবুন এখন আমার সহ্য শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। এখন আর সেইভাবে মন খারাপ হয় না। কেউ কিছু বললে ভাবি। চিন্তা করি কেন এই কথা বললো। নিশ্চই কোন কারণ আছে তাই।
কাকা উনা মাস্টারকে ধরে এনেছে। উনা মাস্টার নাকি তোর ষষ্ঠীপূজো করেছিল। তাই তোর ছেলে মেয়ের ষষ্ঠীপূজো সেইই করবে।

জ্যোতিষদাদা এসেছিল। তোর ছেলেমেয়ের জন্মের আগে দিনক্ষণ ঠিক করে দিয়েছিল। সেই সময়তো হয় নি। তার আগেই হয়েছিল।
সব দেখে টেখে বললো মিত্রা তুই ছেলেকে আটকে রাখতে পারলেও মেয়েকে আটকে রাখতে পারবি না। এ ওর বাপের মতো স্বভাব পাবে। আর দেখবি এইই ওর বাপকে ধরে আনবে।
তারমানে! কবে মেয়ে বড় হবে তবে ওর বাবা ফিরবে!
তোকে আমি আগেই বলেছিলাম। অনি থাকবার ছেলে নয়। ও তোর জীবনে বেশি দিন থাকবে না। ওকে তুই বেশি দিন ধরে রাখতে পারবি না। একরোখা। মাথায় যেটা ঢুকবে সেটা যতোক্ষণ পর্যন্ত শেষ না দেখছে ততক্ষণ পর্যন্ত তার পেছনে ও পরে থাকবে।
তোকে এও বলেছিলাম তোর দুই সন্তান হবে। তুই তখন বিশ্বাস করিস নি।
দেখ মিত্রা, কে কি বলে জানিনা। তবে পড়াশুনটা ঠিক মতো করলে কিছু বলা যায়।
না হলে নস্ত্রাদমু কি করে এতো ভবিষ্যৎবাণী করে গেল। তার কিছু তো মিলে যাচ্ছে।
তোর ছেলে শান্তশিষ্ট অতো ঘোর প্যাঁচোয়া হবে না। কিন্তু মেয়ের থেকে সাবধান। বাবার লাইফলাইন ওর ওপর ভীষণভাবে প্রভাব বিস্তার করবে।
তুমি কিছু দাও।
দিয়ে লাভ নেই। ওর বাবাকে দিয়ে কিছু হয়েছে।
জ্যোতিষদা খাওয়া দাওয়া করে চলে গেল। যাওয়ার আগে বড়মার কানে ফুস মন্ত্র দিল।
তুই যখন চলে গেলি। তোকে যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর শুনলাম তোর ডেডবডি পাওয়া গেছে কল্যানী হাইওয়ের একটা ঝোপে।
আর সেই দিনটার কথা চিন্তা করতে ভাল লাগছে না। সেদিন কিন্তু একজনই বলেছিল তুই মরিস নি। সে হচ্ছে জ্যোতিষদাদা। তুই বেঁচে আছিস। কোথায় আছিস বলতে পারবে না। জোড় দিয়ে বলেছিল তুই বেঁচে আছিস। বড়মা শুনে আশ্বস্ত হয়েছিল।
কিন্তু মন কি মানে। সব সময় কু গাইত।
বড়মার সে কি তাড়া।
তুমি আগে বলো অনির কি করলে।
ফিরে আসবে। ওর কাজ সারতে দাও।
কতদিন লাগবে।
কোন ঠিক নেই। তোমাদের আগেও বলেছি। ওকে সহজে কেউ মারতে পারবে না।
ওর গ্রহ-নক্ষত্র প্রচন্ড স্ট্রং।
ছেলের কথা বলো।
ছেলে ভালো। মেয়ে ঠিক নয়।
কেন। ওর বাপের মতো জ্বালাবে।
জ্বালাতে পারে।
ব্যাশ আগুনে ঘৃতাহুতি পরলো।
এখনি তুমি ওর একটা ব্যবস্থা করো। ডোমরা টোমরা কি লাগবে বলো।
এখন লাগবে না। যখন লাগবে বলবো।
জানিস আজ বসিরহাট থেকে সবাই এসেছিল। দাদু দিদা পর্যন্ত।
তুই চলে যাবার পর দাদুর দীর্ঘদিন কথা বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তারদাদা অনেক ওষুধ খাইয়ে তবে স্বাভাবিক করতে পেরেছিল। বুড়ো বলে কি আমি অনির ছেলেকে না দেখে মরবো না।
বুড়ো তোর ছেলেকে মেয়েকে কোলে নিয়েছে। পারে নাকি। আমি ধরলাম। তোর মেয়ে সত্যি অভদ্র। বুড়োর কোলে মুতে দিয়েছে।
সকালবেলা উনা মাস্টার ঘন্টাদুয়েক পূজো করেছে। আমি ঠায় ওদের দুটোকে নিয়ে বসেছিলাম। কোমড় পিঠ ব্যাথা হয়ে গেছিল।
শেষে সবাই লাঠি দিয়ে কুলো ভাঙলো। তোর সেই গানটা গাইল।
আট কড়াই বাট কড়াই ছেলে আছে ভাল ছেলের বাবার কাঁচা ধরে টানা টানি করো।
শুধু তুই নেই।
অনিসা আড়মোড়া ভাঙলো এতোক্ষণ ল্যাপটপের থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। জলের বোতলটা হাত বাড়িয়ে টেনে নিল। ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। একবার জানলার কাছে এলো।
নিশুতি রাত। নীচের ঝোপ থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ।
নীচের দিকে তাকাল। অন্ধকার ঘুট ঘুট করছে। ভাবল একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াবে। তারপর ভাবল না। স্ক্যান ইমেজগুল পরে ফেলি। যতো তাড়াতাড়ি পরা শেষ করতে পারব তত জানতে পারব।
এতোক্ষণে এটা ও বুঝে গেছে ওর বাবা মরে নি। বেঁচে আছে।
টোডি কে।
রাজনাথ কে।
কেনই বা বাবা রাজনাথকে মেরেছে।
মা দামানি দাদুর কথা বলেছে। কিন্তু রাজনাথের কথা কোন দিন বলে নি।
বাবার সঙ্গে মায়ের আলাপ।
দামিনীদিদার গল্প।
দুদুন (দাদা) দিদানের (বড়মা) গল্প।
দাদাই (মল্লিকদা) দিদাই-এর (ছোটমা) গল্প।
ডাক্তারদাদাই-এর গল্প।
আবিদ আঙ্কেল কনিষ্ক মামাকে গিয়ে বলেছে, রাজনাথ মায়ের ক্ষতি করেছে!
বাবা কেনই বা টোডির পেছনে ধাওয়া করতে গেল।
মা লিখেছে। বাবা বলেছে তার ভালবাসার যে অপমান করেছে তার শোধ তুলতে গেছে।
কিসের অপমান! কেনই বা বাবা শোধ তুলতে যাবে ?
মা বলেছে বাবা এই কাগজের মালিক।
মালিকরা এরকম মস্তান হয় নাকি।
নেপলা কে ? কেনই বা নেপলা বলেছে তাকে মেরে তবে অনিদার গায়ে হাত দিতে হবে।
কিসের জন্য বাবাকে মার কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে হবে।
মা কার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতি সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিন অনর্গল কথা বলে।
ওকে বার করতেই হবে। এর একটা শেষ ও দেখতে চায়।
কার হেল্প নেবে ?
ইসলামদাদাই কিছু বলবে না। হেসে উড়িয়ে দেবে। আবিদ আঙ্কেলকে ধরতে হবে।
ভজুমামা বলছিল বাবার সঙ্গে থাকতো। তারমানে ভজুমামা অনেক কিছু জানে।
ঠিক আছে সব নোট ডাউন করি। একটা কোশ্চেনইয়ার তৈরি করতে হবে। এনকোয়ারি গুলো আগে লিখে রাখি, তারপর দেখা যাবে।
অনিসা আবার ডাইরীর পাতায় চোখ রাখল।
আজ সকালে ঘরে ঢুকে আমার আলমাড়িটা একটু গোচ্ছাছিলাম। সকালেই তোর ছেলে মেয়ের ডাক্তারদাদু, দুটো আলমাড়ি নিয়ে এসেছে কোথা থেকে।
দুজনের দুটো আলমাড়ি।
শোন মামনি দুজনের জিনিষপত্র সব আলাদা আলাদা রখবি। এক সঙ্গে কোন কিছু রাখবি না।
তথাস্থ।
ওদের যা জামা কাপর হয়েছে একটা আলমাড়িতে হবে না। তিনটে করে আলামাড়ি হলে ঠিক হবে। আমার এখন স্থান হয়েছে বড়মার ঘর।
দামিনী মাসি তোর ছেলে-মেয়ে হওয়ার পর থেকে আর এবাড়ি ছেড়ে নরে নি। আমার দেখভাল, ছেলে-মেয়ের দেখভাল করছে। আমার ডিউটি টাইমে টাইমে গিয়ে দুধ খাওয়ান।
ডাক্তারদাদা বলেছে। বুকের দুধ ছাড়া এই মুহূর্তে কোন সিনথেটিক দুধ খাওয়ান যাবে না। রতন কোথা থেকে প্রত্যেক দিন তিনলিটার করে গরুর দুধ এনে দিয়ে যাচ্ছে।
আমাকেও একেবারে গরু বানিয়ে দিয়েছে বুঝলি। খালি খাচ্ছি আর দুধ দিয়ে যাচ্ছি। তুই থাকলে তবু কিছুটা হেল্প পেতাম। এখন দিদিভাই জ্যেঠিমনি পর্যন্ত বড়মার দলে।
চিকনা আজ পাঁচকিল সরষের তেল নিয়ে এসেছে। নিজেদের খেতের সরষেদিয়ে কাঠের ঘানিতে মেরে নিয়ে এসেছে। সে কি কাদানি কাদানি দেখতে। বোঝাই যায় না সরষের তেল। নিজে নিজেই তাকে গরম করে শুদ্ধ করলো। ভাই আর বোনের বোতল ভাগাভাগি করে দিল।
বড়মাকে বললো নিশ্চিন্তে মাখাও আমি মাসে মাসে এসে দিয়ে যাব।
চিকনা আজকাল কলকাতায় এলেই এই বাড়িতে তিন চারদিন থাকছে। কোথাও নড়ছে না। সারাক্ষণ দুটোর মুখের কাছে বসে থাকে।
আজ দেখি আমার ঘরের বারান্দায় সামনে ঘোরা ঘুরি করছে। দরজা হাট করে খোলা। বুঝলাম কিছু বলতে চায়। সুযোগ পাচ্ছে না।
ইশারায় ভেতরে ডাকলাম।
ঘরে এলো।
কিছু বলবে।
এমাসে তিনলাখ টাকা প্রফিট হয়েছে।
আমি কি করবো, তোমার গুরুকে ফোন করো।
তুই বিশ্বাস করবি না, আমিযে ওই ভাবে বলতে পারি ও বিশ্বাস করতে পারে নি। মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমি খাটে গিয়ে বসলাম।
আজকাল একা একা শ্মসানে যাচ্ছ। সময় পেলেই পীরসাহেবের থানে যাচ্ছ। মাঝ রাতে কামরপাতায় গিয়ে কার সঙ্গে ফুস ফুস করে কথা বলছো।
তুই বিশ্বাস করবিনা বুবুন, একটা কথা মুখ থেকে বেরলো না।
তোর ছেলের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো। কোন আওয়াজ হচ্ছে না। খালি ফুপিয়ে যাচ্ছে। শক্ত কাঠের মতো দাঁড়িয়ে আছে। টপ টপ করে জল পরছে।
আমার কথার জবাব দাও। না হলে যা ভালো বোঝো নিজে করবে। আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। ওটা তোমার আর তোমার গুরুর ব্যাপার।
ওমা দেখি আমার পা ধরে আমার কোলে মাথা রেখে। সে কি কান্না।
বলে কিনা, তুমি আমার মা। তোমাকে আমি মিছে কথা বলতে পারবো না। তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করো না।
ওর কান্নার আওয়াজে দেখি বড়মা গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটু অবাক হয়েছে।
বড়মাকে ইশারা করলাম। চুপ। আড়ালে যাও।
বড়মা কি বুঝলো গেটের পাশে দাঁড়াল।
কেঁদে কোন লাভ নেই চিকনা। তুমি যখন আমাকে মা বলছো, মায়ের কাছে সন্তান কিছু গোপন করে না।
আমি বলতে পারবো না। অনির খতি হবে।
আমার কোল থেকে কিছুতেই মুখ তোলে না।
বুবুন কোথায় আছে।
জানিনা।
কার সঙ্গে তুমি কথা বলো।
তনু দিদির সঙ্গে।
ওর কথা শুনে আমার সারাটা শরীর কেঁপে উঠলো। খুব জোড় সামলে নিলাম।
তনুদিদিকে তুমি পেলে কোথায় ?
অনি চিনিয়ে দিয়েছে।
কি করে চেনাল।
ও যাওয়ার আগে তনু দিদি কলকাতা এসেছিল।
তুমি সব জানতে।
জানতাম। আমি যেতে চেয়েছিলাম। আমাকে নেয় নি। বলেছে তোর এখানে অনেক কাজ।
তনু এখন কোথায় ?
লন্ডনে।
তোমার সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছে।
ভাইবোন যেদিন হয়েছে সেদিন।
সেদিন সকালে!
না।
তাহলে।
আগের দিন কলকাতায় এসেছিল। তারপর রাতে আমাদের ওখানে গেছিল।
তনু ওখানে গেছিল!
হ্যাঁ।
কি করে গেলো।
লাস্টট্রেনে গেছিল। আমি মটোর বাইকে করে নিয়ে যাই।
কেউ জানে না।
না।
কেন এসেছিল।
অনি কাকা-কাকীর (মা-বাব) জন্য ফুল পাঠিয়েছিল। প্রথমে শ্মশানে যাই, তারপর পীরসাহেবের থানে। ওখান থেকে কলকাতায় আসি।
কি করে এলে।
ফার্স্ট ট্রেনে।
তারপর।
তনুদিদ হাওড়া থেকে একটা মেমসাহেবের গাড়িতে উঠে চলে গেল।
কোথায় গেল।
জানি না।
তনুদিদি আমার কাছ থেক সব খবর নিয়ে দুপুরের প্লেন ধরে লন্ডন চলে যায়।
সঙ্গে আর কে ছিল।
মেমসাহেব ছাড়া আর কেউ ছিল না।
বুবুন কোথায় ?
তুমি বিশ্বাস করো, আমি জানি না। আমার সঙ্গে তনুদিদির কথা হয়। ও নাকি শুনতে পায়।
অনিসার সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। মাথাটা কেমন যেন দপ দপ করছে। একটা মানুষ কেন এতটা জটিল হতে যাবে, কিছুতেই বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে এর মধ্যে আরও অনেক কিছু আছে। যা ওর কাছে অজানা।
অনিসা ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে খোলা জানলার দিকে তাকাল।
চোখ কান নাক ভোঁ ভোঁ করছে। মাথায় কিছু ঢুকছে, কিছু ঢুকছে না।
কেমন যেন সব মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। কোথাথেকে যে সারারাত কেটে গেলো বুঝতেই পারল না। স্ক্যান ইমেজগুলো পরতে পরতে অনিশা কখনো হেসেছে কখনো কেঁদে ফেলেছে। কখনো ওর পিঠের শিড়দাঁড়া দিয়ে গরম শ্রোতের মতো দ্রুত কিছু ছুটে গেছে।
মা ভীষন ভাল লিখেছে। যেন মনে হচ্ছে চোখর সামনে সব কিছু দেখতে পাচ্ছে।
ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিল থেকে উঠে এলো। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে একবার এপাশ ওপাশ করলো। কালই আবিদ আঙ্কেলকে ধরতে হবে। ইসলামদাদাইকে এখন ঘাঁটান চলবে না। মনে হচ্ছে মিলি মাসি টিনা মাসিও এর মধ্যে ইনভলভ।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনিসা ঘুমিয়ে পরলো।
আমি রান্নাঘর থেকে চায়ের ট্রেটা নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলে রাখলাম।
দাদা একবার আমার দিকে তাকাল। চোখমুখটা কেমন শুকনো শুকনো।
দাদা, শরীরটা খারাপ লাগছে ?
না।
তাহলে চোখমুখটা কেমন কেমন যেন লাগছে।
কাল সারারাত ঘুমোয় নি।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম।
কেনো!
জিজ্ঞাসা কর। খালি অনন্য কোথায় গেছে ? কেনো তোমরা ওকে একা একা যেতে দিলে।
ও তো ডাক্তারদাদার সঙ্গে গেছে।
বিশ্বাস করলে তো।
ছোটমা চায়ের পট থেকে সকলকে চা ঢেলে দিল।
অনিসা উঠেছে। দাদা জিজ্ঞাসা করলো।
না।
আমি একবার দাদার দিকে তাকালম।
মেয়াটাকে ডাক।
থাকনা এইতো সবে পরীক্ষা শেষ হলো।
দাদা একবার বড়মার মুখের দিকে তাকাল।
জানো মিনু এখন এই দুটো আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। বুকে যন্ত্র বসিয়ে কতদিন বেঁচে থাকা যায় বলো।
আমি মাথা নীচু করে নিলাম। ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে গেলাম। কাজের মাসিকে বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে গেলাম….।
মিত্রা।
দাদার ডাকে ফিরে তাকালাম।
অনন্য কখন আসবে।
ডাক্তারদাদা বলেছে সকালের দিকেই ফিরে আসবে।
কোথায় গেছে।
বুবুনের বাড়িতে গেছে।
পরীক্ষা দিয়েই চলে গেছে!
হ্যাঁ।
তিনদিন হয়ে গেল। ফোন করেছো ?
আজ সকালে কথা হয়েছে। ডাক্তারদাদা বললো কিছুক্ষণ পর বেরবে।
ডাক্তারের কান্ডজ্ঞান দেখ, ওকে ছাড়া যাওয়া যায় না।
ডাক্তারকে দোষ দিচ্ছ কেন। ও অনেকদিন থেকে বলে রেখেছে। পরীক্ষা শেষ হলেই যাবে।
আমি দাঁড়িয়ে থেকে মুচকি হাসলাম। বেরিয়ে এলাম।
বারান্দায় আসতেই ভজু এগিয়ে এলো।
দিদিমনি ছোটবাবু কবে আসবে ?
আমি ভজুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আজ আসবে।
মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো।
ছোট দিদিমনি ঘুমচ্ছে ?
ডাকতে যাচ্ছি।
তাড়াতাড়ি ডাকো।
কেন।
ও বাড়িতে যাবে বলেছে।
আমি পায়ে পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলাম।
দরজা ঠেলতেই হাট হয়ে খুলে গেল। অনিশা আষ্টেপৃষ্ঠে পাশবালিশ জাপ্টে ধরে শুয়ে আছে। এলো চুল বিছানায় লুটপুটি খাচ্ছে।
সত্যি এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা যাবে না। কতবার বলেছি মা শোয়ার সময় চুল বেঁধে শুবি। কে কার কথা শোনে।
আমি চেয়ে চেয়ে ওকে দেখছি। ভরা যৌবনের স্পর্শ সারাটা শরীরে। মুখটা একেবারে বুবুনের মতো। সেই চোখ সেই ঠোঁট। একেবারে বাবার মতো। মাঝে মাঝেই কথা বলতে বলতে চুপ করে যায়। স্থির চোখে দেখে।
মাস দেড়েক এই পরিবর্তনটা আরও বেশি করে চোখে পরছে।
আমি ধীরে ধীরে খাটে উঠে এলাম। অনিশার কপালে হাত রাখলাম।
এবার ওঠ মা।
অনিশা চোখ মেলে তাকাল, আমাকে গলাটা জড়িয়ে ধরে কপালে গালে চকাত চকাত করে চুমু খেল।
ইস তোর মুখে গন্ধ।
অনিশা মার গলা জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘোষল।
যদি অনি ব্যানার্জী চুমু খেতো, এ কথা বলতে পারতে।
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। অনিসা কি কথা বললো!
কপট গাম্ভীর্যে মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
ওমনি মুখটা শুকিয়ে গেল।
আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
জানো মা আজ একটা দারুণ স্বপ্ন দেখলাম।
মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম।
কি দেখলি।
মিঃ অনি ব্যানার্জী এসেছেন।
আমাকে দাদাভাইকে চিনতেই পারছে না। তোমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, মিত্রা এরা কারা। যেন আমরা কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি।
আমিও তেমনি গম্ভীর ভাবে বললাম আমার মাকে নাম ধরে ডাকার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে।
দেখি মিঃ অনির মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে।
আপনি চিনতে পারছেন না। আমি অনিশা ব্যানার্জী আর আমার দাদা অনন্য ব্যানার্জী। আচ্ছা মা বাবার সঙ্গে তোমার কোন যোগাযোগ আছে ?
মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম। কল কল করছে। বুকের ভেতরটা আবার দুরু দুরু করে কেঁপে উঠলো। কি বলতে চায় ও ?
বলোনা। তোমার সঙ্গে বাবার কোন যোগাযোগ নেই ?
না।
সামথিংস রং।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি বোঝার চেষ্টা করছি।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
পিকুদা কখন আসবে ?
ও ফার্স্ট আওয়ারে অফিসে যাবে।
ভজু আমার ফোনটা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
দিদিমনি, মিলিদিদি ফোন করেছে।
আমার হাতে ফোনটা দিল।
হ্যালো।
তুমি কি আজ অফিসে আসছো।
বলতে পারছি না। কেন বলতো ?
দুটো থেকে মিটিং আছে। কামিং ইয়ারের বাজেট।
তাহলে যাব। তোরা সামলাতে পারবি না ?
পারব। তবে তোমার থাকা জরুরি।
দাদার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
দশ মিনিটের জন্য। ওখান থেকে মেল এসেছে।
তাই! কখন ?
তুমি মেল চেক করনি! দেখো তোমাকেও ফরোয়ার্ড করা হয়েছে। পুরো গাইড লাইন দেওয়া রয়েছে।
এখন আর কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। মনে হচ্ছে সমস্ত ব্যাপারটা অবাস্তব।
অবাস্তব বলি কি করে, আজ সতেরো বছর ধরে আমাদের সমস্ত ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছে তো।
আমার আর ভাবতে ভালো লাগছে না।
তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি একবার এসো।
দেখি।
দেখিনা আসবে।
মিলি ফোনটা কেটে দিল। অনিসা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখের পাতা পরছে না।
কিরে ?
মিলি মাসি ফোন করেছিল।
হ্যাঁ।
নিজের ফোনটা বালিশের তলা থেকে টেনে বার করলো। পটা পট বোতাম টিপে ডায়াল করলো।
আবিদ আঙ্কেল….এক ঘন্টার মধ্যে বাড়িতে আসবে….কি বললে….ওসব কাজ ফাজ অন্য কাউকে দিয়ে দাও। যা বলছি তাই করবে।….ঠিক আছে দেড়ঘন্টা সময় দিলাম তার বেশি হলে আমি আমারটা বুঝে নেবো….মনে থাকে যেনো। ভাইদাদাই কোথায় ?….দাও….শোনো, আবিদ আঙ্কেলের সঙ্গে তুমিও আসবে।….মনে থাকে যেনো….হ্যাঁ আমি অনি ব্যানার্জী আর কিছু জানতে চাও।
আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম। ওর কথা বলার ভঙ্গি দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত গলার স্বরে এরকম তীক্ষ্ণতা ছিল না। মাস খানেক হলো ওর চলন বলন একেবারে বদলে গেছে। পুরো বাপকা বেটি!
কি দেখছো।
কার সঙ্গে কথা বললি।
ভাইদাদাই-এর সঙ্গে।
তুই ইসলামভাই-এর সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলছিলি!
কি হয়েছে।
কি হয়েছে মানে!
আমার প্রয়োজন আছে তাই। এইতো নয় আজই বলছি। আজ থেকে সাতদিন আগে বলে রেখেছি। আজ যদি বলে সময় দিতে পারবে না। তাহলে হয় কি করে।
তাই বলে তুই!…….
তুমি নিচে যাও। আমি রেডি হয়ে নামছি। ভজুমামাকে বলো গাড়িটা ধুয়ে দিতে।
ভজুমামা তোর চাকর।
ঠিক আছে তোমাকে বলতে হবে না আমি বলে দিচ্ছি।
হন হন করে বারান্দায় বেরিয়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠলো, ভজুমামা ভজুমামা বলে।
নিচ থেকে ভজু চেঁচিয়ে উঠলো। ও নিজের কথা বলে ভেতরে চলে এলো। হন হন করে বাথরুমে ঢুকে গেল। আমি কিছুক্ষণ স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলাম।
একেবারে বাবার মতো স্বভাব। সেই তেজ। ইদানিং মাঝে মাঝে দাদাকে পর্যন্ত এমন ভাবে ক্রশ করে, দাদা পর্যন্ত চুপ করে যায়।
দাদা প্রায়ই বড়মাকে বলে, দেখেছো, নিজে কেটে পরেছে, একটা দিয়ে গেছে।
বোঝ এবার তোরা।
এটা তবু একটা পদের ওটা আরো মিট মিটে। নিজের কাজ নিজে করে যাচ্ছে। বললেই বলবে কিছু হয়নি।
কিরে মুখটা শুকনো কেন।
বড়মা কাছে এগিয়ে এলো।
নিশ্চই বুঁচকি কিছু বলেছে।
না।
তাহলে।
ও দিন দিন একেবারে বুবুনের মতো হয়ে যাচ্ছে।
আমি বড়মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলাম।
কি করবি বল। সব কপাল। তুই ওর পেট হোস নি। ও তোর পেটে হয়েছে।
আমি আর পারছি না বড়মা।
এতদিনেও ভুলতে পারছিস না।
ভুলি কি করে বলো।
ছোটমা এগিয়ে এলো।
বুঁচকি কোথায় ?
আসছে।
সোফায় এসে বসলাম। যতোক্ষণ কাজের মধ্যে থাকি, ততক্ষণ কিছু মনে হয় না। যখনই একলা হয়ে যাই। তখনি বার বার মনে পরে যায়। আষ্টেপৃষ্ঠে সমস্ত দিক দিয়ে যেন আমাকে বেঁধে রেখেছে। পালাবার কোন উপায় নেই।
আবার ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম অনন্য। ফোনটা ধরলাম।
মা আমরা বাড়ির রাস্তায় ঢুকছি। তুমি টেনসন কোরো না। দুদুন ফোন করেছিল। তোমার নাকি মন খারাপ।
না।
বোন উঠেছে ?
উঠেছে।
ঠিক আছে যাচ্ছি।
আয়।
কিরে তুই কখন এলি।
এইতো মিনিট পাঁচেক।
গিয়ে একটা ফোন মারতে পারতিস।
সময় পাই নি।
খুব ঘুরেছিস।
শুধু ঘোরা। যা খেলাম না।
আমার জন্য নিয়ে এসেছিস।
দাদু আনতে দেয় নি।
অনিশা সোফায় গিয়ে মায়ের পাশে বসলো।
মনে রাখিস এক মাঘে শীত যায় না।
তুই চলে যা।
অবশ্যই যাব। তোকে বলতে হবে নাকি। সময় হোক দেখতে পাবি।
তাল পাটালি খেলাম বুঝলি। ছোটঠাকুমা যা বানিয়েছিল না।
লোভ দেখাস না। তোকেই হয়তো কামরে খেয়ে নেব।
দুই ভাই বোনের তরজা চলছে। সবাই নির্বাক দর্শক। আমি হাসছি।
তুই এতো সকাল সকাল এতো ড্রেস লাগিয়ে কোথায় বেরচ্ছিস।
ডাক্তারদাদা অনিশার মুখের দিকে তাকাল।
দিদান।
বড়মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
বল কি হয়েছে।
খিদে লেগেছে। রুটি না লুচি।
কোনটা তোমার মুখে রুচবে বলো।
আমার কোন ফ্যাসিনেসন নেই, তোমার নাতির আছে।
আমি মেয়ের দিকে তাকালাম।
তাকিয়ে কোন লাভ নেই। যা বলছি সত্যি বলছি।
তুই আমার কথার উত্তর দিলি না। ডাক্তারদাদা বললো।
এখনো সময় হয় নি। খাওয়ার টেবিলে প্রশ্ন করবে উত্তর পাবে।
তুমিই আদর দিয়ে ওদের মাথায় তুলেছো।
দাদা ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে বললো।
অনিশা কট কট করে দাদার দিকে তাকাল।
রাতে ডেকো দিদিভাই বলে, সেলো টেপ আটকে দেব।
দাদা অনিশার কথা শুনে হেসে ফেললো।
হ্যাঁরে বুঁচকি সকালে মাকে কি বলেছিস।
অনিসা ছোটমার দিকে তাকাল।
কই। কিছু বলিনি।
আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
তুমি রাগ করেছো। ঠিক আছে আর কোনদিন হবে না।
আমি মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
দাদা তুই আজ কোথায় যাবি।
এখন খাবো দাবো, তারপর ঘুম।
দুপুরে স্নান করে খাওয়া, তারপর দাদাই-এর সাথে দামিনীদিদার ওখানে।
কিগো দিদান তোমার হলো।
কেন ঘোঁড়ায় জিন দেওয়া আছে।
হ্যাঁ আছে।
বড়মা রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে এসে টেবিলে রাখল।
দাদা তুই আজ দিদাই-এর পাশে আমি দিদানের পাশে। নো ঝামেলা।

চলবে

2 thoughts on “কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান (part 01)

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s