দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 34)


দেখি নাই ফিরে উপন্যাসে প্রথম পর্ব এই খন্ডে সমাপ্ত হবে। দ্বিতীয় পর্ব এখন থেকে কাজলদীঘি শশ্মান ও পীরসাহেবের থান নামে প্রকাশিত হবে। এখানে পাবেন

শুনে মনটা খারাপ হয়েগেল। ওকে ওর বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। তারপর একবার গেছিলাম। নিজের চোখে ওদের দারিদ্রতা দেখেছিলাম। আমাকে যেন ওরা ভগবানের মতো পূজো করতে লাগলো। বুঝলাম পাকে পাকে জড়িয়ে পরছি। সুমন্ত একবার চিঠি লিখল দাদা তুমি যদি সাহায্য না করো আমার পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যাবে। সেই থেকে ওকে টাকা পাঠান শুরু, আজও চলছে।
অনিদা এবার চলো। সকাল থেকে কিছু খাও নি। ম্যাডাম তোমার জন্য বসে আছে।
অর্ক পাশে দাঁড়িয়ে। চোখটা ছল ছল করছে। গেঞ্জির হাতা দিয়ে চোখটা মুছলাম।
বটাদার ছেলের কাছ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে আয়।
আমি মুখটা ধুয়ে নিলাম। অর্ক চা নিয়ে এসেছে। আমার আর ওর জন্য।

ওরা চলে গেছে।
হ্যাঁ।
কিছু বলছিল।
ভদ্রমহিলা যাওয়ার সময় ভীষণ কাঁদছিলেন।
কেন।
ম্যাডাম ওনার ছেলের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন। উনি সব বললেন।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকলাম।
ছবি আর চেকটা দিয়েছিস।
ম্যাডাম দিয়েছেন। তারপর ম্যাডাম নিজে সুমন্তর সঙ্গে কথা বললেন। ছেলেটা কাঁদছিল।
আমি চুপ করে রইলাম।
আচ্ছা অনিদা ও কি আর বাঁচবে না ?
এ ভাবে বেশিদিন বাঁচা যায় না।
ও সেটা জানে।
জানে। তবে ঠিক বোঝে না। মনের জোরটা অসীম।
ওর বাবা-মা। জানে আবার জানে না।
আমি আগামী সপ্তাহে একবার যাব। তুমি অনুমতি দাও।
যাস। ওর শরীরে ব্যাপার নিয়ে বেশি আলোচনা করিস না।
কথা দিচ্ছি। জানি ওটা ওর সবচেয়ে সেন্সেটিভ জায়গা।
আর্টিক্যালটা কেমন লিখেছে রে।
দাদা কালকেই ছেপে দেবে। ওকে একটা চিঠিও লিখে দিয়েছে।
তাহলে ছেলেটা আরও কয়েকদিন বেশি বাঁচবে।
একথা বলছো কেন ?
সারাদিন বাবার সঙ্গে তাঁত বোনে। সপ্তাহে কুড়ি পঁচিশটা কাপর না বুনলে পেট চলবে কি করে। তাছাড়া নিজেদের কিছু জমি জমা আছে। সেগুলো দেখতে হয়। বলতে পারিস দাদার চিঠিটা ওর বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
ওর ভাই বোন নেই।
না। বাব মার একমাত্র সন্তান।
সনাতনবাবু সব শোনার পর ঘর থেকে মনখারাপ করে বেরিয়ে গেলেন। কারুর সঙ্গে কথা বললেন না। দ্বীপায়ন ঘরের বাইরে এসে কেঁদে ফেলল।
জানিস অর্ক এরকম অসংখ্য সুমন্ত আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কজনের আমরা উপকার করতে পারি বল।
তবু তুমি কনিষ্কদা সবাই একটা মিসন নিয়ে চলছো। আমাকে একটা সুযোগ দাও না।
চলে আয়, আমি কি বারন করেছি।
আমি তোমায় কথা দিচ্ছি। আমার আন্তরিকতার শেষ বিন্দু দিয়ে আমি লড়ে যাব।
চল নিচে চল।
পায়ে পায়ে নিচে নেমে এলাম। নামতে নামতে নিজেক বোঝালাম। এবার সব ভুলে যা অনি। সামনে অনেক কাজ, এতো ইমোসোন্যাল হলে জগত সংসারটা চলবে না। তোকে তোর কাজ করে যেতে হবে। সেখানে দুর্বলতার কোন স্থান নেই। দুর্বলতা দেখিয়েছিস কি মরেছিস।
অর্ক নিউজরুমে গেল। আমি মিত্রার ঘরে ঢুকলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কথা বলছিল। আমায় দেখে থেমে গেল। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
তুইতো ভগবান রে। তোর আর কতো কীর্তি আছে, একটু বলবি।
হাসলাম।
তোমার পাঞ্জাবীটা দারুণ সুন্দর। আমি একবার পরে নিয়েছি। মিলি বললো।
ভালো করেছো।
কি খাবি বল।
তোরা যা খাবি।
হরিদার ছেলেকে বাইরে দেখলি।
চোখে পরলো না।
কিরে মিলি।
ছাড়ো, অনিদাকে বলতে গেলে কেন। এখুনি বলবে আমি তোদের মতো কর্পোরেট নয়।
টিনা আওয়াজ করে হেসে উঠলো।
দাও তোমাদের ফাইল গুলো, কাজগুলো শেষ করি। মিলি তোমার চিঠিটা রেডি হয়ে গেছে।
মিত্রাদি সাইন করে দিয়েছে। আমি সনাতনবাবুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি।
আজ কোন প্রোগ্রাম আছে নাকি।
ছিলো ক্যানসেল করে দিয়েছি।
ব্যাচারা শুধু শুধু কষ্ট পাবে, আমাকে দোষারোপ করবে।
করুক।
দেখলাম মিত্রার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যাচ্ছে।
কিরে মিলি! তুই বলছিস ও বুঝছে ও বলছে তুই বুঝছিস ব্যাপারটা কি ?
আছে আছে, ইন্টু মিন্টু চলছে। টিনা বললো।
কেন আমি একা, তোর স্বার্থ নেই। মিলি ঝামটে উঠলো।
অদিতি হো হো করে হাসছে। টিনার মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো।
ব্যাপার কি রে অদিতি। মিত্রা চোখ পাকিয়ে বললো।
তোমাকে অনিদা বলবে।
ও জানে!
জানে কিনা বলতে পারবো না। না জানলে বলছে কি করে।
কিরে বুবুন।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
অদিতি কি বলছে।
আমি কি করে বলবো।
তাহলে।
ওদের জিজ্ঞাসা কর।
সময় হলে বলবো, এতো ঝামেলা করছো কেন। মিলি বললো।
মিত্রা বেল বাজাল।
হরিদার ছেলে মুখ বারাল। হিমাংশু হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।
আরি বাবা সব এক ঘরে। খুব জোর মিটিং চলছে নাকি।
তুমি কি খাবে হিমাংশু ?
এখনো খাওয়া হয় নি!
তোমার বন্ধুকে বলো।
না ম্যাডাম এই সময় অনিয়ম করা উচিত নয়।
আমি কনটিনিউ মুখ চালিয়ে যাচ্ছি।
মিলি ফিক করে হেসে ফেললো।
তুই হাসছিস কেনরে ?
যা বাবা, হাসি পেল তাই হাসছি।
দাঁড়া তোর হচ্ছে।
মিলি আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে।
হিমাংশু পাশে এসে বসলো।
মিত্রা খাবার আনতে দিল।
বল।
আমি হিমাংশুর দিকে তাকালাম।
কাজতো আমার বাড়িয়ে দিয়েছিস।
কেন।
ব্যাঙ্কের নাইনটি পার্সেন্ট মেরে দিয়েছিস।
হ্যাঁ। বড়ো হ্যেডেক ছিল। এবার মান্থলিতে চলে যা।
সেতো গেলাম, আমার কিছু লোন লাগবে।
মিত্রার এ্যাকাউন্ট থেকে দেখিয়ে দে।
তোর এ্যাকাউন্ট থেকে কিছু দেখাই।
আমার শূন্য।
মিত্রার থেকে তোর বেশি আছে।
তাহলে নিয়ে নে। এইট্টি এইট জি করে ফেলেছিস।
হ্যাঁ।
তাহলে কিছু ডোনেট করে দে। আবার ফিরিয়ে দেব।
তুই এই জন্য এনজিও বানিয়েছিস।
রথ দেখা হবে কলা বেচা হবে। নিজের পয়সায় কেউ দেশোদ্ধার করে নাকি।
হিমাংশু মুচকি মুচকি হাসছে। ওরা হাঁ করে আমার কথা শুনছে।
তুইতো আমার ভাত মারবি।
তাহলে চার্টারটা পাশ করতে হবে।
পরীক্ষায় বসে যা।
হাসলাম।
ওই ঘটনার পর কি কি উদ্ধার হয়েছে, কি কি উদ্ধার হয়নি তার একটা লিস্ট দে। আবার খোঁচা খুঁচি করি।
এক কাজ কর।
বল।
এইভাবে না করে মান্থলি মাইনে থেকে কেটে নে।
অনেক আগে ব্যাপারটা ভেবেছি। তবে আমার পিএফের দিকে নজর বেশি। তাছাড়া ভালো জায়গায় ফ্ল্যাটটা বাগিয়েছে লিখিয়ে নেব ভাবছি।
তারপর নিজের ফ্ল্যাটে নিজে ভাড়া দিয়ে থাক।
মাথা দোলালাম।
হিমাংশু হাসছে।
খাবার এলো।
হিমাংশুর ফাইলপত্র বার করলো। খেতে খেতে হিমাংশুর সঙ্গে বসে এ্যাকাউন্টসটা একটা জায়গায় নিয়ে এসে দাঁড় করালাম। মিত্রা পাশে বসে সব লক্ষ করলো।
কি ম্যাডাম কিছু বুঝছেন।
মাইনেটা বাড়িয়ে দিতে হবে।
এখনো আগের মাইনেতে কাজ করছে!
খোঁজ খবর নিই নি। সনাতনবাবুকে একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে।
আপনার মেশিনটা একটু দেখি।
মিলি কি বোর্ডটা এগিয়ে দিল।
হিমাংশু লগ করে ভেতরে ঢুকে আমার নাম সার্চ করে এ্যাকাউন্টটা বার করলো।
ওরে তোর তো প্রচুর টাকা পরে রয়েছে।
কতো টাকা আছে রে।
দশলাখ পঁয়ত্রিশ হাজার ছয়শো সাতচ্চলিশ টাকা পঁয়ত্রিশ পয়সা।
চোর কোম্পানী। কালই রিজাইন দেব। খালি বসে বসে আমার টাকার ইন্টারেস্ট খেয়ে যাচ্ছে।
পারবি।
হিমাংশু এমনভাবে বলে উঠলো, ওরা হেসে ফেললো।
হিমাংশু আমি এখানে বসে এগুলো ট্র্যাক করতে পারব। মিত্রা বললো।
আপনি একটা মাস্টার পাসওয়ার্ড বানিয়ে নিন।
দাঁড়াও আজই বরুণদাকে বলছি।
এই একটা কাজের লোক পেয়েছিস। যে ভাবে চাইছি সেই ভাবে পাচ্ছি। তোর ওই দিগন্তবাবুটা একেবারে মাল।
বরুণদার পরিচয় জেনেছিস।
দাদার মুখ থেকে শুনলাম। উনিও আমার কাছে নিজেকে খুললেন না। আমিও সেরকম কিছু বললাম না।
ব্যবহার কর, আমার আর একটা ওয়েপনস।
সেটা বুঝেছি।
চা খাবি।
এটা কেমন কথা বললি।
সরি জিজ্ঞাসা করাটা অন্যায় হয়ে গেছে।

মিলি একটু বটাদাকে ফোন করো না।
হিমাংশুদা আমাদের ব্যাপারটা একটু দেখুন। টিনা বললো।
কোনটা বলো।
আমাদের রির্টার্ণ।
লাস্ট ইয়ারেরটা নিয়ে এসো। করে দেব।
আমারটা কিন্তু অনেক হচপচ হয়ে আছে। মিলি বললো।
সব ঠিক হয়ে যাবে। কাগজপত্রগুলো সব যত্ন করে রেখেছো।
সব আছে।
তাহলে অসুবিধে হবে না।
কবে নিয়ে আসবো ?
এ মাসের শেষের দিকে।
আচ্ছা।
বটাদা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
সবাইকে চা দিল। আমার দিকে তাকাল।
তুমি একটু বাইরে এসো।
আমি বটাদার দিকে তাকালাম। উঠে বাইরে এলাম। বটাদা একবার এদি ওদিক দেখে নিয়ে কিংশুক বাবুর ঘরের চেহারার বর্ণনা দিল।
আমি ভেতরে এলাম।
কিরে বটাদা কি নিউজ দিয়ে গেল।
মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
ও আপনাকে বলবে ?
সে জানি বলবে না। যখন এ্যাকসন নেবে, তখন বুঝতে পারব।
এবার উঠি। ম্যাডামরা সবাইকে বললাম।
হিমাংশু চলে গেল।
ওদের সঙ্গে বসে অনেকক্ষণ কাজ করলাম। ফইলগুলো প্রায় শেষ করে দিলাম। মাথাটা ধরে গেছে। মিত্রাকে বললাম আমি একটু নিউজরুমে যাচ্ছি।
নিউজ রুমে এলাম। অর্কদের সঙ্গে বসলাম। ওদের কিছুক্ষণ সময় দিলাম। সন্দীপ এলো। নিজের টেবিলের চিঠি গুলো সব পরিষ্কার করলাম। এই করতে করতেই সময় চলে গেল।
মাঝে মিত্রা একবার ফোন করে বললো, কিরে আমি চলে যাব। ওকে বললাম তুই চলে যা, আমি দাদাদের সঙ্গে ফিরব।
সত্যি সত্যি ফিরতে রাত হলো। আমি দাদা মল্লিকদা একসঙ্গে ফিরলাম।
আসার সময় গাড়িতে দাদার সঙ্গে টুকরো টুকরো কথা হলো। দাদার কথায় বুঝলাম অফিসের অবস্থা এখন যথেষ্ট স্থিতিশীল। যে ঝড়টা এসেছিল সেই ঝড়টা থেমে গেছে। মিত্রাও দু’একটা বেশ ভালো স্টেপ নিয়েছে। এতে দাদা খুশী। যারা পুরনো স্টাফ ছিল তারা আবার ফিরে আসছে। আস্তে আস্তে অফিসটা আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছে। তার মানে আমি আমার বাকি কাজ টুকুতে হাত দিতেই পারি।
আমি মনে মনে এটাই চাইছিলাম একটা রিদিম। রিদিমটা ঠিক থাকলে সব ঠিক। কেউ সচর আচর বেগর বাই করতে পারবে না।
আমার কাজে একমাত্র বাধা দিতে পারে বড়মা ছোটমা মিত্রা। এদের কাউকে জানান হবে না।
টিনা মিলিদের ব্যাপারেও দাদার একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছে। ওরা কাজের মেয়ে। যখনই কোন অসুবিধে হয় দাদার কাছে ছুটে আসে। দাদার হেল্প নেয়। টিনার ব্যাপারে চম্পকদা মাঝে মাঝেই দাদার কাছে এসে অভিযোগ জানায়। ও নাকি সব ব্যাপারেই ভীষণ আপার হ্যান্ড নিয়ে নিচ্ছে। এ্যাড ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন বলেছে এভাবে চললে তারা রিজাইন দিতে বাধ্য হবে।
টিনার উত্তর, আজই রিজাইন দিক। এরকম প্যাকেজে আমাদের কাজের লোক পেতে অসুবিধে হবে না। মোদ্দা কথা টিনা চম্পকদাকে প্রায় হ্যান্ডিক্রাফ্ট বানিয়ে দিয়েছে।
মিলির ডিপার্টমেন্টটা ওর এতদিনের চেনা জগতের বাইরে, তাই প্রথম প্রথম ভীষণ অসুবিধে হচ্ছিল। এখন আস্তে আস্তে গুছিয়ে নিচ্ছে।
দাদার কথায় এটুকু বুঝলাম এদের তিনজনের কাজে দাদা খুশী। তাছাড়া মিত্রা যে বরুণদাকে নিয়ে এসেছে। তাতেও দাদা খুশী।
মাঝে একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। তুই হঠাৎ পনেরদিন কোথায় উধাও হয়ে গেলি। আমি দিল্লীর ব্যাপারটা দিয়ে ধামা চাপা দিলাম।
দাদা আরও অনেক প্রশ্ন করতে চেয়েছিল। বাড়িতে এসে ঢুকে পরলাম। কোন প্রকারে রক্ষা পেয়ে গেলাম।
নিচের ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম বড়মা ছোটমা মিত্রা সোফায় হেলান দিয়ে বসে আরাম করে টিভি দেখছে আর গল্প করছে। আমায় দেখে বড়মা উঠে এলো। ভালো করে মুখটা দেখে গালে হাত বোলাল। আমি প্রণাম করলাম।
দেখছিস মিত্রা। এতোক্ষণ বসে বসে কি কথা বলছিল। ছোটমা বললো।
ছাড় তো তুমি।
বড়মা একবার ছোটমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল।
আমি ছোটমার কাছে গেলাম। নিয়ম মাফিক একটা পেন্নাম ঠুকে দিলাম।
সাত খুন মাপ।
সব ঠিক আছে।
আর ন্যাকামো করতে হবে না। তুই না থাকলে কি সব বেঠিক থাকবে ভেবেছিস।
মুচকি হাসলাম।
শোন কাল সকালে কোন প্রোগ্রাম রাখবি না। সামন্তদা বলেগেছে কাল সকালে তোর আর মিত্রার সঙ্গে বসবে, কারা যেন আসবে।
হবে না।
সামন্তদা খেতে আসছে। জানিয়ে দিবি।
ও ছোট, ও ঠিক থাকবে দেখিস। মুখে ওরকম বলছে।
তুমি তোমার ছেলেকে সামলাবে।
ঠিক আছে ডাক্তার আসুক।
মিত্রা একটা ট্রেতে করে তিন গ্লাস সরবৎ নিয়ে এলো।
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
হাসলি কেন।
বুঝলি না। তুই জল নিয়ে এলি। করিতকর্মা হয়ে উঠেছিস। ছোটমা সমানে মুখ ছুটিয়ে চলেছে।
কেন তোকে ও বাড়িতে দিই নি।
আমি ঢক ঢক করে গ্লাসটা শেষ করে টেবিলে রাখলাম।
চা খাবি। ছোটমা তড়তড়িয়ে উঠলো।
মুচকি হাসলাম।
হাসছিস কেনো।
হাসতেও মানা।
ছোট আজ বাবুর নতুন ঘটনা শুনেছ।
মল্লিকদার কথায় ছোটমা মুখ টিপে হাসল।
এটা আজকের এপিসোড।
আমার দিকে তাকিয়ে।
পনেরদিনের এপিসোড জানতে পেরেছ।
তুমি জেনেছ ?
ছোটমা ফিক করে হেসে রান্নাঘরে চলে গেল। আমি সোফায় বসলাম। বড়মা এসে বসলো।
কোন কথা জিজ্ঞাসা করবে না।
কেনোরে! কোথায় গেলি কি করলি একটু ভালো মন্দের খবর নেব না।
সব বলা যাবে না।
তোর নতুন ফোন নম্বরটা দে।
ওটা শুধু মাত্র কাজের জন্য।
আমরা কি অকাজের লোক।
তোমাদের জন্য আর একটা নম্বর আছে।
ওটাও দে।
পকেট থেকে ফোনটা বার করে দিলাম।
এটা নিয়ে করবো কি। তুই নাকি কি সব পাসওয়ার্ড ফাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছিস।
মিত্রা বড়মার ঘর থেকে ফোনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এলো।
কথা বলবি।….এই মিনিট দশেক হলো এসেছে।….জ্যেঠিমনি….
আমার কাছে এগিয়ে এলো।
নে জ্যেঠিমনি তোর সঙ্গে কথা বলবে।
আমি ওর দিকে বড়ো বড়ো চেখ করে তাকালাম।
চোখ গেলে দেব।
তুই টুক টুক করে লাগিয়েছিস।
একটুও না। তোর কীর্তি বরুণদা গিয়ে বলেছে।
ফোনটা হাতে নিলাম।
বলো।
কেমন আছিস।
ভালো।
হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেলি।
কলকাতাতেই ছিলাম।
সেতো তোর বড়মার কাছ থেকে শুনলাম।
তাহলে সব জেনে গেছো।
এখন বিয়ে করেছিস। তোর নিজের একটা সংসার আছে। হুটহাট চলে গেলে চলবে কি করে।
ঠিক কথা। কিন্তু আমার যে এখনো অনেক কাজ বাকি।
সে জানি। এখন তো অনেকটা স্থিতাশীল। আর গন্ডগোল করিস না।
কোথায় গন্ডগোল করলাম।
এই কদিন তো তোকে দেখলাম।
না না ওরা তোমায় ভুল ইনফর্মেসন দিয়েছে।
তোর সম্বন্ধে ছুটকিও ভুল বলবে।
তোমার ছুটকি চায় আমি সব সময় ওর সামনে পুতুলের মতো বসে থাকি।
একটু আধটু বসবি।
সম্ভব নয় জ্যেঠিমনি। ও এখনো সেফ্টি নয়। তোমরা চাওনা ও সেফ্টি থাকুক।
চাই। তবু তোকে নিয়েও তো আমাদের চিনতা হয়।
আমাকে নিয়ে ভেব না। আমি ঠিক থাকব।
তুই মুখে বলছিস। মন মানে না।
তোমাদের সবার মুখে এক কথা হলে চলে কি করে। কালই আমি মিত্রাকে ডিভোর্স করে দিচ্ছি।
জ্যেঠিমনির সঙ্গে ঘরের সকলে হেসে ফেললো।
পারবি।
খুব পারবো।
করে দেখা।
তারমানে তুমি বলতে চাইছো, অনি মরিয়া গিয়ে প্রমাণ করিল সে মরে নাই।
আবার ঘরের সকলে হেসে উঠলো।
কার সঙ্গে বক বক করছে ও।
ছোটমা চায়ের ট্রে নিয়ে এসে হাজির হলো।
জ্যেঠিমনি। মিত্রা বললো।
ওকে বলে কিছু হবে না দিদি। আপনাকে সেদিন কি বলেছিলাম মনে আছে।
কেরে ছোট।
হ্যাঁ।
কথা বলো।
আমি ছোটমার হাতে ফোনটা দিলাম।
কল্কে পেলিনা নিশ্চই। চেপে ধরেছে। ওমনি ছোটমা ধরো।
হাসলাম।
ছোটমা জ্যেঠিমনির সঙ্গে কথা বলতে বলতে রান্নাঘরে চলে গেল।
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে আছে। দাদা মল্লিকদা আমাদের দুজনকে দেখে আর হাসে।
তুমি কি পারবে ওর পেট থেকে বার করতে।
ওকে পেটে ধরিনি। পারব কি করে।
সেন্টু দিয়ে লাভ নেই। তোমরা আমার পাকা ঘুঁটি সব কেঁচিয়ে দিয়েছ।
তোর পাকা ঘুঁটি কোথায় কেঁচালাম রে। বড়মা বললো।
যাও না বিধানদাকে ফোন করো, সব বলে দেবে।
লাড্ডু খেয়েছিস।
ওই তো সামনে জল জ্যান্ত বসে আছে। এরপরও খেতে বলো।
মিত্রার দিকে তাকালাম।

আমি লাড্ডু।
মিত্রা তেড়ে এলো।
তারমানে সবাইকে লাড্ডু খাওয়াবি আর নিজের কাজ উদ্ধার করবি। বড়মা বললো।
যা ভাবো।
উঠে দাঁড়ালাম।
আর একটু বোস না।
জামা প্যান্টটা ছাড়ি। সেই সাত সকালে পরেছি।
আচ্ছা যা। খেতে বসে বলবি ?
পেছন ফিরে একবার হাসলাম।
বাথরুম থেকে বেড়িয়ে দেখলাম মিত্রা হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। এইরকম অবস্থায় ওকে বহুদিন দেখিনি। এখন বেশ বোঝা যাচ্ছে। ও মা হতে চলেছে। ওর সারাটা শরীরে একটা মা মা গন্ধ। আমার দিকে একবার মুখ ফিরিয়ে দেখল। আমি ওকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছি।
অমন কোরে কি দেখছিস।
তোকে।
দেখলাম বিছানার এক কোনে আমার পাজামা পাঞ্জাবী গুছিয়ে রাখা।
শুয়ে আছিস।
শরীরটা ভালো লাগছে না।
কেন!
কাছে গেলাম। ওর কপালে হাত দিলাম। না ঠিক আছে।
কিরকম শরীর খারাপ।
ডাক্তারদাদা বললো এই সময় নাকি এরকম হয়। গাদা গাদা ওষুধ দিয়েছে। খাবার চার্ট করে দিয়েছে।
ফিক করে একবার হাসলাম।
রাতে টর্চ জ্বালিয়ে একবার দেখব।
তোকে দেখাব দাঁড়া।
আবার বাঁদরের মতো দাঁত মুখ খেঁচাচ্ছিস কেন।
উঠে বসবো ?
আরাম করে একটু শুয়ে আছিস, আবার ঝামেলা করবি কেন।
মিত্রা কট কট করে আমার দিকে তাকাল। আমি হাসলাম। পাজামা পাঞ্জাবী গলালাম। চুল আঁচড়ালাম। আড় চোখে দেখলাম মিত্রা আমাকে মেপে চলেছে।
গোয়া গেছিলি কেন ?
ঢিল ছুঁড়ে লাভ নেই। শুকনো পুকুর।
তাহলে আমার কাছে খবরটা ভুল এসেছে বল।
যে দিয়েছে তাকে জিজ্ঞাসা কর। আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ কি।
মিত্রা খাট থেকে নেমে এলো। তাহলে কোথায় গেছিলি বল।
আমি হাসলাম। ঝামেলা করিস না।
মিত্রা জড়িয়ে ধরলো। বল না। এরকম করিস কেন। আমি কি তোর শত্রু।
তুই আমার মিত্র এটা কে বলেছে।
দাঁড়া নিচে চল বড়মাকে বলছি।
তোর পেটটা বেশ বড়ো হয়েছে।
কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছিস।
নারে সত্যি। এখন মনে হচ্ছে তুই মা হতে চলেছিস।
তুই।
তোর কথায় আমি জীবন দাতা। ভাবতেই ভীষণ ভালো লাগছে।
বড়মা বলেছে এই সপ্তাহটা অফিসে যাবি, তারপর থেকে অফিসে যাওয়া বন্ধ।
অফিস এখানে তুলে আন।
শয়তানটা ছাড়া পেয়েছে না।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। ও জানল কি করে। ওরতো জানার কথা নয়।
তোকে কে বললো ?
প্রবীরদা এখন কমবেশি রেগুলার আসে। সেদিন বড়মাকে বলেছে। মিত্রা আমার ভাতৃবধূ ওর কেউ ক্ষতি করতে চাইলে, অনির আগে আমার হাত পড়ে যাবে।
যাক। নিশ্চিন্ত। তাহলে তোর চিনতা করার একটা লোক বারল।
প্রবীরদার স্ত্রী ছেলে একদিন এসেছিল। অনেকক্ষণ ছিল। কথায় কথায় বার বার তোর কথা বলছিল। তুই প্রবীরদার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিস।
আমি না তুই। চিঠিটা দেখেছিলি।
হ্যাঁ।
যত্ন করে রেখেছিস তো।
তোর ফাইলে আছে।
আমাদের ভালোবাসার সাক্ষীকে বড়ো হলে তার বাবার কীর্তি কলাপ দেখাস।
কেন তুই কোথায় যাবি।
আমি কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাব।
এই অবস্থায়, আমাকে ফেলে রেখে!
একবার বলেছি না, তোকে তৈরি হতে হবে। আমার ওপর নির্ভরশীলতা তোকে ছাড়তে হবে।
তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
পাগলামো করিস না। আমি কি মরে গেছি।
তুই কোথাও যাস না। তুই আমার সবচেয়ে বড়ো বল ভরসা।
সব ঠিক হয়ে যাবে। চল ওরা নীচে অপেক্ষা করছে।
মিত্রা কোন কথা বললো না। আমার সঙ্গে নিচে চলে এলো।
টেবিলে দেখলাম সব রেডি করা হয়ে গেছে। খালি বসার অপেক্ষা। দাদা মল্লিকদাকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম দাদার ঘরে আছে দুজনে।
কিরে বাবু মুখ খুললেন ? ছোটমা ছেঁচকিয়ে উঠলো।
মিত্রা কোন কথা বললো না গম্ভীর হয়ে রইলো।
কিরে চুপ করে রইলি কেন। তোকে কিছু বলেছে বুঝি।
না।
তাহলে মুখটা ওরকম কেন।
কিছু না।
দেখলাম দাদার ঘর থেকে ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা, দাদা বেড়িয়ে এলো।
বান্ধবী এবার দাও। অনি চলে এসেছে।
বড়মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে একবার আমার দিকে তাকাল। একবার মিত্রার দিকে। কোন কথা বললো না।
বসো তোমরা, দিয়ে দিচ্ছি।
আমি চেয়ারে গিয়ে বসলাম। মিত্রা আমার পাশে বসলো। দুপাশের দুটো চেয়ার ফাঁকা। অপজিটের চেয়ারে ডাক্তারদাদারা বসলো।
কাল তোর কি প্রোগ্রাম আছে। ডাক্তারদাদা বললো।
সকালে একটু বেরোব।
কখন ফিরবি।
বলতে পারব না।
তুই একা।
না। বড়মা ছোটমা মিত্রাকে সঙ্গে নেব।
বুঝেছি।
কি বুঝেছো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
তারমানে কালকে আর একটা কাজ সারবি।
কি করে বুঝলে।
তুইতো প্রথমে গানটা লিখিস তারপর সুর দিস।
এখুনি বড়মা বলবে তোমরা এইরকম কথা বলো না। আমরা যখন তোমাদের কথা বুঝি না, তখন আমাদের সামনে বলবে না।
বড়মা আমার কানে হাত দিল। আমি মাথা সরিয়ে নিলাম।
আমি এখন বিবাহিত। সংসারী মানুষ।
ডাক্তারদাদা হেসেফেললো।
মিত্রাও হাসছে।
সেই জন্য দুটো ফোন পকেটে রেখেছিস। ছোটমা ফুট কাটল।
দুজনে দুপাশে বসলো। খাওয়া শুরু হলো।
কাল সকালে আমি কয়েকজনকে ডেকে পাঠিয়েছি।
ছোটমা বলছিল।
আমাকে ঘন্টা খানেক সময় দে।
কিসের জন্য বলো।
তোকে মিত্রা কোন কথা বলে নি।
সময় পায় নি।
মিত্রা খাওয়া থামালো।
দেখছো বড়মা।
থাক, ওকে বলতে দে। আমরা এবার ওর সঙ্গে ধর্মঘট করবো।
পারবে তুমি ?
খুব পারব। দাঁড়ানা দেখবি।
ছোটমা মল্লিকদা ফিক করে হাসল।
মরণ। হাসছিস কেনরে মল্লিক।
এবার আমি হেসেফেললাম।
ছোট আমাকে দুটি ভাত দাও খুব খিদে লেগেছে।
ছোটমা ডাক্তারদার পাতে ভাত দিল।
দাদা একটা মাছ দিই।
দাও।
বেশি খেও না বয়স হচ্ছে। দাদা বললো।
অনি দশ বছর কমিয়ে দিয়েছে বুঝলে এডিটর।
সারাদিন চড়কি মেরে ঘুরছো। এবার একটা কিছু না বাদিয়ে ছাড়বে না দেখছি।
নাগো এডিটর এ কাজে যে কি মজা, এতদিন টের পাই নি। এখন বেশ লাগছে। বিশেষ করে যাদের সম্বন্ধে কোনদিন ধারণা ছিল না। তাদের মধ্যে সত্যিকারের মানুষ খুঁজে পাচ্ছি। আমার এই কাজে কোন ক্লান্তি আসছেনা বুঝলে।
বাবা তুমি যে অনির ভক্ত হয়ে গেলে।
যা বলো। তোমাদের বলা হয় নি। গতো পর্শুদিন হঠাৎ কনিষ্ক টনা মনাদের ওখানে নিয়ে গেল।
আমাদের নিয়ে গেলে না কেন। বড়মা খ্যাঁক করে উঠলো।
দূর ছাই ঠিক ছিল নাকি। কনিষ্ক নীরুকে ডাকতে এলো। ওখানে ওষুধ দিতে যাবে। আর কাদের কাদের যেন দেখতে হবে। তা আমি দামিনী পেছন ধরলাম। ওই জন্য সেদিন আসতে পারলাম না। সত্যি কলকাতার উপকন্ঠে এতো সুন্দর একটা জায়গা আছে আগে কখনো ভেবে দেখি নি।
তুমি ভীষণ স্বার্থপর। মিত্রা বললো।
বিশ্বাস কর। ঠিক আছে তোদের নিয়ে যাব।
কি করলে ওখানে গিয়ে।
বাঁশের বেঞ্চে বসে রইলাম সারাক্ষণ। দামিনী তবু এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখল। ওরা পেঁয়াজ কুঁচি সরষের তেল দিয়ে মুড়ি মেখে দিল। আর ভেঁড়ি থেকে চিংড়ি মাছ ধরে ভেজে দিল। তার সঙ্গে র চা। সত্যি যেন অমৃত।
তুমি খেলে! মিত্রা বললো।
বললামতো তোকে নিয়ে যাব।
বড়মার দিকে তাকাল।
বুঝলে বান্ধবী মানুষ দেখলাম। কি অমায়িক। এখনো ওদের মধ্যে সরলতা আছে। সেটা দেখে আরও ভালো লাগল।
ডাক্তারদাদা দাদার দিকে তাকাল।
বুঝলে এডিটর অনিকে ওরা সত্যি ভীষণ ভালবাসে।
নিস্তব্ধ খাবার টেবিল। যে যার নিজের মতো খেয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদা স্বগোতোক্তির সুরে বললো।
নার্সিংহোম গুলোর ব্যাপারে কিছু সমস্য তৈরি হয়েছে বুঝলি অনি।
আমি ডাক্তারদার মুখের দিকে তাকালাম। কি বলতে চায়।
ওটা কোন সমস্যা নয়। হিমাংশুকে আমি বলে দিয়েছি। তুমি মিত্রা যেভাবে পরিচালনা করবে সেই ভাবে চলবে। কেউ বাড়াবাড়ি করলে তাকে সরিয়ে দিয়ে নতুন লোক নিয়ে নেবে।
তাছাড়াও কিছু উটকো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সে সমস্যগুলো আমি মিটিয়ে দিয়েছি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমি থাকিনা কেন, আমার শকুনের চোখ। এটা তোমার থেকে ভালো কেউ বুঝবে না।
এই যে তুই বললি তুই কিছুই জানিস না।
নার্সিংহোম নিয়ে সমস্যা হয়েছে তুমি বলোনি।

দাদা মল্লিকদা খাওয়া থামিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল।
কিরে মিত্রা তোকে তখন ফোন করে আমি কি বললাম।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
তুই গোয়া গেছিলি কেন।
ডাক্তারদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
লিন্ডা তোমার সঙ্গে এসে দেখা করেছিল!
মিত্রা সজোরে আমার কোমরে চিমটি কাটল। আমি উঃ করে উঠলাম।
এই যে তুই বললি আমি গোয়া যাই নি। তোকে যে খবর দিয়েছে ভুল খবর দিয়েছে। মিত্রা ভেংচি কাটার ভঙ্গি করে বললো।
মিত্রা ওরকম করিসনা মা। বেচারা সারাদিনের পর খেতে বসেছে। বড়মা করুণ সুরে বললো।
ছোটমা হাসছে।
এই যে তুমি বললে ওর সঙ্গে ধর্মঘট করবে।
করবো তো, তেকে কথা দিচ্ছি।
তাহলে বুঝতে পারছ ও কোথায় গেছিল। খালি আমাকে দোষ দাও।
বুঝতে পারছি।
যাওয়ার সময় কি বলে গেল। আমি দেশের বাড়িতে যাচ্ছি। ইসলামভাই-এর সঙ্গে দরকার আছে। ওখান থেকে ও দিল্লী গোয়া চলে গেল ?
ও কোন দিন সত্যি কথা বলে।
মিত্রা আমার দিকে হাসি হাসি চোখে তাকাল।
ব্যানার্জী একটু গোলমাল পাকিয়েছে।
আর পাকাবে না।
তুই কি ভগবান ?
না মানুষ। এবার বলো কারা আসবে।
ডাক্তারদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। দাদা হেসে ফেললো।
রথীনকে সেদিন বলেছিলাম। ও রাজি হয়েছে। একবার তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়। আরও দু’তিনজনকে আমি বলেছি।
ওরা মিত্রার ব্যাপারটা জানে।
কম বেশি সকলেই জানে। কেউ মুখে প্রকাশ করে না।
আমাকে উহ্য রাখবে।
সে বললে চলবে কি করে। আমার জায়গায় তুই থাকলে তোর উৎসাহ হত না।
ঠিক। মাথাগুলোকে সব বদলে দাও। তুমি তোমার মতো সাজিয়ে নাও।
সে কাজটুকু করে ফেলেছি।
কোনটার হাল সবচেয়ে খারাপ দেখলে।
তুই কি এ্যাকাউন্টস দেখেছিস।
হিমাংশু দেখেছে ওর কাছ থেকে শুনেছি।
তাহলে আমার থেকে তুই ভালো জানবি।
ওখান থেকে এই মুহূর্তে টাকা নেওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। বরং আধুনিক মেশিনপত্র যদি কিছু আনার থাকে তার ব্যবস্থা করো।
করেছি।
তোমার কি আর টাকা লাগবে।
কিছু লাগবে।
তাহলে হিমাংশুকে বলবে, কাগজের এ্যাকাউন্ট থেকে নিয়ে নেবে।
সেটা হিমাংশু বলেছে।
তাহলে কনো সমস্যা নেই।
আছে।
কি আছে।
মিত্রার শরীরের অবস্থা আমার থেকে তুই ভালো জানিস।
আমার কাছে এই ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত ছিল। খাওয়ার টেবিলে যে এই ভাবে কথাটা ডাক্তারদাদার মুখ থেকে বেরতে পারে আমি ভাবতে পারি নি। এখন বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা প্রি-প্ল্যান্ড। ডাক্তারদাদার মুখ থেকেই মিত্রা গোয়ার ব্যাপারটা জেনেছে।
তারমানে লিন্ডা প্রচন্ড ভয় পেয়েগেছে। তাই ডাক্তারদাদার কাছে এসে স্যারেন্ডার করেছে। আমি সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। সকলের চোখে খুশির ছোঁয়া।
ওর শরীর ঠিক আছে।
তুই গা জোয়াড়ি করছিস।
আমাকে কি করতে হবে বলো।
তোর এখন দূরে কোথাও যাওয়া চলবে না।
আমি আগামী মাসে লন্ডন যাব।
যাওয়া হবে না। তুই ওটা পিছিয়ে দে।
দেরি হয়ে যাবে।
ওর ব্যাপারটা আমাদের থেকে তুই বেশি জানিস। কোন সমস্যা হলে তুই যে ভাবে ট্যাকেল করতে পারবি, আমরা সেই ভাবে পারব না। এটা তোকে বুঝতে হবে।
ঠিক আছে আর কি আছে বলো।
সুমন্তকে আমি রথীনকে দিয়ে একবার দেখাব।
কনিষ্ককে বলেছি ওকে একবার কলকাতায় আনার ব্যবস্থা করতে।
আমি ডাক্তারদার দিকে তাকালাম। তারপর মিত্রার দিকে।
খুব সুন্দর ব্রিফ করেছিস দেখছি। কই কাজের বেলায় তো এত সুন্দর ব্রিফ করতে পারিস না।
আমি বলিনি বড়মা বলেছে।
বড়মা জানল কি করে।
আমি বলেছি। দাদা বললো।
উরি বাবা বেশ স্ট্রং এ্যালায়েন্স তৈরি করে ফেলেছ দেখছি।
মল্লিকদা হেসে ফেললো।
ছোটমা মিত্রাকে ডিঙিয়ে আমার পিঠে হাত রাখল।
রাগ করছিস কেন। তুই তো ভালোছেলে। আমরা কেউ ধর্মঘট করবো না।
ফোনটা বেজে উঠলো পকেট থেকে বার করলাম।
দেখছো কোন ফোনটা বাজছে দেখো। মিত্রা বড়মার দিকে তাকিয়ে গজ গজ করে উঠলো।
বল।….হয়েগেছে!….ঠিক আছে নিজেদের জায়গায় চলে যা।
ফোনটা স্যুইচ অফ করে পকেটে রাখলাম। মিত্রার দিকে তাকালাম।
তুই মাছগুলো খেয়ে নে। ভালো লাগছে না।
উঠে দাঁড়ালাম।
সবাই আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাল। মিত্রার চোরা চাহুনি যেন আমায় গিলে খাচ্ছে।
বোস আরও অনেক কথা আছে। ডাক্তারদা ধমক মারলো।
সব কথা এখন বলে ফেললে কাল সকালে কি বলবে।
ডাক্তারদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
আমি বেসিনের সামনে চলে এলাম। মুখটা ধুয়ে সোজা ওপরে চলে এলাম।
লাইট জাললাম না খালি পাখার স্যুইচটা দিলাম। জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম। সেই এক চিত্র তবু কেমন যেন নতুনত্ব আছে। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরাতে গেলাম। কি মনে হলো, সিগারেটটা প্যাকেটের মধ্যে রেখে আবার ফিরে এলাম।
চিকনাকে ফোনে ধরলাম। বেশ কিছুক্ষণ বেজে যাবার পর ধরলো।
কিরে ঘুমিয়ে পরেছিস।
হ্যাঁ। তুই কবে ফিরলি।
আজ সকালে।
ওদিককার কাজ সারলি।
হ্যাঁ।
কাকার শরীর কেমন আছে।
ভালো। আজ নিয়ে গেছিলাম। থরো চেক আপ করেছে।
কি বললো।
হার্টটা একটু সমস্যা করছে। ওষুধ দিয়েছে। খাওয়ার রেস্ট্রিকসন করেছে। কে শুনবে বল।
নীপার খবর।
ম্যাডাম কতো করে বললো, শেষ পর্যন্ত এখানে ভর্তি হয়েছে।
হস্টেলে থাকছে।
না ডেলি যাতায়াত করছে।
এতটা পথ কি ভাবে যাওয়া আসা করছে।
ইসলামভাই-এর গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। না হলে আমারটা।
কেউ প্যাঁক পুঁক দিচ্ছে না।
কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে বল। সবাই জানে ও অনি ব্যানার্জীর আত্মীয়। তাছাড়া ম্যাডাম এখন জিনসের প্যান্ট, পাঞ্জাবী, সালোয়াড় কামিজ, ছাড়া কিছুই পরছেন না। রোয়াবি আলাদা। হ্যাঁরে ম্যাডামের শরীর কেমন।
কেন খারাপ হয়েছিল নাকি ?
নেকু তুই জানিস না। আয় একবার এখানে অনাদি কেলাবে বলেছে।
কেন!
এতো বড়ো একটা সুখবর তুই চেপে গেছিস।
দুদিন পর জানতেই পারতিস।
ভাগ্যিস সেদিন অনাদি গেছিল। দেখেই বুঝতে পেরেছে। তারপর বড়মাকে জিজ্ঞাসা করতে বড়মা বলেছে। সেই শুনে কাকী আবার এখানে ঠাকুরকে পায়েস করে দিল।
তোরা তো অনেক কিছু করে ফেলেছিস।
চিকনা হো হো করে হাসছে।
এ সপ্তাহে এক লাখ টাকা প্রফিট করেছি।
কোথা থেকে!
মিলে চার গাড়ি সাপ্লাই দিলাম।
তাহলে সব ধান শেষ করে দিলি।
ও বাড়িটা খালি করেছি। এবারেই তো ধানের টান ধরা শুরু হয়েছে। মৌসুমি মাসি বললো কিছু চাল করে দে আমার ছেলেগুলো হাটে গিয়ে বেচে আসবে।
কুঁড়ো গুলো কি করছিস।
এখানে গরুর অভাব। দিয়ে শেষ করতে পারছি না।
জেনারেটর নিয়ে এসেছিস।
সঞ্জুরটা দিয়ে গেছে।
তারমানে ভাড়া দিতে হচ্ছে।
কি করবো। কাল দিয়েছি খিস্তি। বলেছে আগামী সপ্তাহে এনে দেব।
ওদিককার খবর।
অনাদি আজও গেছিল। আস্তে আস্তে এগোচ্ছে।
ব্যাঙ্কের খবর।
জানিনা। তবে প্রতিদিন বেশ লোক আসছে।
তুই যাস না।
প্রতিদিন রাতে যাই।
আর সবাই ঠিক আছে।
তোর জন্য গ্রামের ছেলেগুলো করেকম্মে খাচ্ছে। কেউ বসে নেই।
দেখি আগামী সপ্তাহে যাব।
প্রবীরদা এর মধ্যে একদিন এসে হারিকেন ট্যুর দিয়ে গেছে।
প্রবীরদা গেছিল!
শুধু আসেনি পুকুরে স্নান করে কাকীমার কাছে দুটি গরম ভাত খেয়ে গেছে। আমাদের বুক এখন ছাপান্ন ইঞ্চি।
বেশি ফোলাস না। ফেটে যাবে।
চিকনা হাসছে।
নিরঞ্জনাদা।
তোর জায়গা নিয়ে ব্যস্ত। শুনেছি মাটি কাটা শুরু হয়েছে।
তুই দেখতে যাস নি।
সঞ্জু একদিন গেছিল। দেখে এসেছে। দেবাদা নির্মাল্য প্রায়ই আসছে।
তোক যা দিয়িত্ব দিয়েছি পালন করবি। তোর টিমটার সঙ্গে আমাকে একবার বসতে হবে।
তুই আয় বসিয়ে দেব। ওরাও বলছিল।
কি।
তোর সঙ্গে ওরা বসবে।
ঠিক আছে আমি আগামী সপ্তাহে যাব। তুই কোন বাড়িতে।
তোর বাড়ির নিচের তলায়।
নীপা।
ও বাড়িতে। তোর ঘরটা ছাড়া সব জায়গায় ধানের বস্তা রেখেছি।
লোকজন রেখেছিস ?

ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। শোন পুকুরটা সংস্কার করেছি। মাছ ছেড়েছি।
ভালো করেছিস। কাকা কাকী কেমন আছে।
আগের থেকে এখন ভালো।
ডাক্তারদাদার ওষুধগুলো খাওয়াচ্ছিস।
আমাকে কিছু বলতে হয় না। তারা নিজেরা নিজেরা খায়।
খুড়তোত ভইবোন গুলো এখন ঝামেলা করছে।
এরপর আর কেউ ঝামেলা করে। বুঝলি অনি সবাই আমাকে বলতো অকর্মন্যের ঢেঁকি। এখন সেই অকর্মন্যের ঢেঁকিকে সবাই তেল দেয়। বেশ ভালোলাগে। মাঝে মাঝে ভাবি তুই না থাকলে আমি হয়তো হেজে পচে মরে যেতাম।
আবার ফ্যাচ ফ্যাচ করে।
নারে সত্যি বলছি।
ভানুর খবর কি।
আনাদি ভানুকে লোন দিয়েছে একটা ট্রেকার কেনার জন্য। আমাদের গ্রামে প্রথম গাড়ি ঢুকবে। আগামী সপ্তাহে ভানু অনাদি বাসু গিয়ে নিয়ে আসবে।
তুই যাবি না।
এদিকে খুব চাপ বেরে গেছে। অনাদি বলেছিল। আমি বলেছি তোরা যা।
ভানু মন খারাপ করেছে।
একটু করেছে।
তুই বরং যা। নীপাকে একটু দায়িত্ব দিয়ে যা।
তুই বলছিস।
ভেবে দেখ।
তাহলে যাব।
গাড়ি কে চালাবে, ভানু নিজে ?
সে ওর ব্যাপার। অনাদি বলেছে প্রথম দু’মাস টাকা নেবে না। তিন মাসের মাথা থেকে টাকা শোধ দিতে হবে। ভানু রাজি হয়েছে।
বর্যাকালে।
গ্রামে ঢুকবে না। তবে চক পর্যন্ত যাওয়া আসা করবে।
পারমিট।
এখানে কোন গাড়ির পারমিট নেই। তারওপর সবাই এখন নিরঞ্জনদার নাম করে চমকায়।
এটা খারাপ।
তুই এসে বলবি।
ঠিক আছে এখন ঘুমো।
কেন।
কেন মানে, কতো রাত হলো খেয়াল আছে।
তোর সঙ্গে কতদিন পরে কথা বললাম। অনেকবার ইচ্ছে করছিল তোকে ফোন করি। তুই বারন করেছিস। তাই ফোন করিনি।
আগামী সপ্তাহে যাব।
আসার আগে একবার ফোন করিস।
আচ্ছা।
আমি ফোনটা পকেটে রেখে ঘুরে দাঁড়ালাম। মিত্রা একেবারে মুখো মুখি দাঁড়িয়ে। এই অন্ধকারেও লক্ষ্য করলাম ওর চোখ দুটো চক চক করছে। দরজার দিকে তাকালাম। দেখলাম বন্ধ। তারমানে মিত্রা নিস্তব্ধে কাজ করেছে। আমি একটুও টের পাই নি। আমাকে জড়য়ি ধরলো পাঞ্জাবীটা সরিয়ে বুকে ঠোঁট রাখল। আমার ঠোঁটের কাছে ঠোঁটটা তুলে ধরলো। আমি ঠোঁট ছোঁয়ালাম। মিত্রার চোখে মুখে হাঁসির ছটা ছড়িয়ে পরলো।
কথাবলা হলো।
কার সঙ্গে কথা বললাম বলতো।
চিকনার সঙ্গে।
কি করে বুঝলি।
ও যেভাবে জোড়ে জোড়ে কথা বলছিল স্পিকার অন না থাকলেও শুনতে পেয়েছি।
হাসলাম।
ও এখন তোর ট্রাম্পকার্ড। সকালে একবার ফোন করে, বিকেলে একবার ফোন করে। আমাকে গুরুমা বলে।
সেই জন্য সন্তানের পেটে একটু আধটু খোঁচা মারিস।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বুকে মুখ ঘোসছে।
আনাদি এসেছিল আমাকে বলিস নি তো।
তোক সব কথা বলতে গেলে সাতদিন আমাকে চব্বিশঘন্টা করে দিতে হবে।
ওখানকার সবাই জেনেগেছে।
কাকীমা পূজোদিয়ে প্রসাদ পাঠিয়েছিল।
কে এসেছিল।
কেউ আসে নি। দেবার হাত দিয়ে পাঠিয়েছিল।
দেবা!
দেবারা এখন রেগুলার যায়। তোকে তো চিকনা বললো। নিরঞ্জনদা কাজ শুরু করে দিয়েছে।
প্রবীরদা গেছিল।
তোকে হিন্টস দিয়েছি।
ওখানে গেছিল। তার হিন্টস দিস নি।
এ বাড়িতে যখন ঘনো ঘনো আসছে। তারমানে নিশ্চই ও বাড়িতেও গেছিল। প্রবীরদা খুব ইমপ্রেসড ওদের কাজকর্ম দেখে।
টাকা পাচ্ছে কোথায়।
আমি দিয়েছি।
ভালো করেছিস। হিমাংশু জানে।
হিমাংশুর সঙ্গে আলোচনা করেই দিয়েছি। হিমাংশু ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের সঙ্গে লোনের ব্যাপারে কথা বলেছে।
ব্যাঙ্ক ম্যানেজার কি বলেছে।
ওরা এক পায়ে খাঁড়া। অনিমেষদা বলেছে স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক থেকে লোনের ব্যবস্থা করে দেবে।
বাবাঃ তুইতো পাকা ব্যবসায়ী হয়ে গেছিস।
অনি ব্যানার্জীর বৌ না।
আমি মিত্রাকে বুকের সঙ্গে জাপ্টে ধরলাম।
তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো আমাকে লুকবি না।
কি বল।
আমাকে তোর বিশ্বাস হয়।
তোকে ছাড়া কাকে বিশ্বাস করবো বল। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি শুধু তোর জন্য। তুই আমাকে কাছে টেনে না নিলে আমি হয়তো যেমন চলছিলাম সেইভাবেই কোন প্রকারে চালিয়ে দিতাম।
আবার তুই একথা বলছিস।
যা সত্যি তাই বললাম।
সাগির অবতারকে কোথায় রেখেছিস।
কেন।
তুই যেদিন গেছিস সেদিন থেকে সাগির অবতারের টিকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইসলামভাই দামিনীমাসি, আবিদ আর নেপলাকে খুব ঝেড়েছে। তবু মুখ থেকে কোন কথা বার করতে পারে নি। তারপরে ইসলামভাই আবিদকে বলেছে তোরা কি ছেলেটাকে মারার ব্যবস্থা করছিস।
তখন নেপলা রেগে বলে ফেলেছে। বস তুমি যদি কোনদিন ভুল করে অনিদার গায়ে হাত তোলার কথা ভাবো, আমি যদি তা জানতে পারি, তোমায় ফিনিস করে দেব।
সে কিরে!
তোকে বলছি কি তাহলে।
এই ঘরে একদিন এসে দামিনী মাসি ছোটমাকে আমাকে সব বলেছে। ইসলামভাই নেপলার কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে, কিছুই ভেবে পায় না। আবিদ থাপ্পর মারতে গেছিল। ইসলামভাই বারন করেছে। বলেছে আমি তোদের কাছে অনিকে রেখে মরেও শান্তি পাব।
মাসি বললো, জানিস মামনি তখন আমি বুঝলাম সাগির অবতার অনির কাজ করছে। আবিদ নেপলা সব জানে। মুখে রাটি পর্যন্ত করে না। এমনকি রতন পর্যন্ত কিছু জানে না।
আবার রতন নাকি কিছু কাজ করছে, সেটা আবিদ নেপলা জানে না। অনি কিরকম ছাতার কল করেছে দেখ।
তারপর আর কি, আমি পরে ইসলামভাইকে ফোন করলাম। ইসলামভাই-এর সে কি হাসি। বলে মামনি ও আমার বাপ, যাদের ওপর আমি কোনদিন আস্থা রাখতে পারি নি। ও তাদেরকে নিয়ে দিব্যি কাজ করছে। ওর আর একটা ট্রাম্পকার্ড আছে বুঝলি, চিকনা। আমাকে বলেছিল ওকে ভরসা করতে পারো। ও মা, সেতো দেখি আমার আগে যায়। গ্রামের রাজনীতি অনাদি যতটা বোঝে, তার থেকে চিকনা আরও ভালো বোঝে।
ব্যাশ তোর ঘুঁটি গুলো ধরে ফেললাম। কাউকে অবশ্য বলিনি।
আমি মিত্রার চোখে চোখ রেখেছি। ও কল কল করে যাচ্ছে।
সেদিন রাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছি, ডাক্তারদাও ছিল। খেতে খেতে আমাকে বললো মামনি তুই লিন্ডা বলে কাউকে চিনিস।
আমি প্রথমে ডাক্তারদাকে স্ট্রেট সট ডিনাই করি। তোর মুখ থেকে নামটা আমি একবার শুনেছি।
তারপর।
ডাক্তারদা তারপর সবার সামনেই বললো। জানিস আজ মেয়েটা এসে আমার পায়ে ধরে কি কান্না। আমাকে আপনি বাঁচান।
আমরা সবাই অবাক হয়ে ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে। ডাক্তারদা গম্ভীর হয়ে বললো, অনি গোয়া গেছে। মেয়েটাকে দিয়ে নার্সিংহোমটা বেচিয়ে দিয়েছে। বলেছে টাকা পয়সা নিয়ে ইন্ডিয়া থেকে ভেগে পরো, না হলে তোমার খেল খতম। কে মারান নে কে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে। চোখে হাসি।
কিরে কিছু বল।
কি বলবো, তুইতো বলছিস।
সত্যি তুই গোয়ার নার্সিংহোমটা বেচিয়ে দিয়েছিস।
হ্যাঁ। বকলমে মারান কিনেছে।
সেই ভাইজ্যাকের দাদা।
হ্যাঁ।
তোর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে।
হ্যাঁ।
আমার মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় করে বুবুন।
কেন।
এদের সঙ্গে তুই ওঠা বসা করিস।
সবাই নিজের স্বার্থ নিয়ে চলে। আমিও নিজেরটা আখেরে গোছাই। স্বার্থে আঘাত লাগলে বিপদ। স্বার্থে আঘাত না লাগলে বিপদ নেই।
শয়তানটা এখনো বেঁচে আছে।
বলতে পারব না।
তারমানে তুই সাগির অবতারকে ওর পেছনে লাগিয়েছিস।
হ্যাঁ।
আমার ভীষণ ভয় করছে বুবুন এর একটা উল্টো রি-অ্যাকসন আছে।
খামকা ঝামেলা করছিস। তোকে বলেছি না আমার কাজে মাথা গলাবি না।
তুই বিশ্বাস কর।
আহত সিংহকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক নয়। বাঁচিয়ে রাখলে বিপদ। না হলে কোন বিপদ নেই।
তার মানে তুই মেরে দিয়েছিস।
এখনো খবর পাই নি।
তুই সত্যি করে বল না।
বিশ্বাস কর।
তাহলে তুই যে খেতে বসে বললি, হয়েগেছে….নিজের কাজে চলে যা।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
তোর চোখ বলছে তুই ধরা পরে গেছিস।
আমি চুপ করে রইলাম।
বলনা এরকম করছিস কেন।
পিকনিক গার্ডেনের রেল লাইনে স্যুইসাইড করেছে।
মিত্রা কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তারপর পাগলের মতো আমার মাথাটা চেপে ধরে আমার ঠোঁটে মুখে চোখে বুকে চুমু খেতে লাগলো।
আমি নিস্তব্ধে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।
তারপর পাগলের মতো কল কল করে হেসে উঠলো।

সত্যি স্যুইসাইড করেছে!
আমি স্থির চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
জানিস বুবুন, আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। তুই বিশ্বাস কর। আমি মনে মনে প্রতিটা মুহূর্তে ওর মৃত্যু কামনা করেছি। নিজে হাতে মারতে পারলে, অনেক বেশি শান্তি পেতাম। আমার হয়ে তুই কাজটা করলি। শয়তানটা আমার মাকে স্লো-পয়জন করে মেরেছে। চোখের সামনে দেখেছি কিছু বলতে পারি নি। আমার শরীরটাকে বাজারের বেশ্যার থেকেও ঘৃন্য করে দিয়েছে।
আমি মিত্রার চোখে জিঘাংসার চিহ্ন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
আঃ কি শান্তি।
তারপরই মিত্রা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
আমি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছি। আলো আঁধারি ঘরে মায়ার খেলা। পাঁচিলের ওপার থেকে রাস্তার নিওন আলো ঘরে এসে লুটপুটি খাচ্ছে। মিত্রা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে। কান্না থেমেছে। কিন্তু মুখ তুলছে না।
কিরে অনেক রাত হয়েছে। জেগে থাকলে শরীর খারাপ করবে। এবার শুবি চল।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। চোখের পাতা ভেঁজা দুর্বাঘাসের মতো নেতান। আমি ঠোঁট ছোঁয়ালাম। মিত্রা চোখ বন্ধ করলো।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় এলাম।
কাপর ছাড়বি না।
ছেড়েছি।
তোর সেই বালিসের ওয়াড়গুলো কোথায়।
সেটা কি!
যেটা পরে রাতে আমার পাশে শুস।
দিলো আমার কোমরে রাম চিমটি।
আমি উহ আহ করে হেসে উঠলাম।
অতো সুন্দর নাইটগাউনটা বালিশের ওয়াড়।
আচ্ছা আর বলবো না এবার ছাড়।
মনে থাকে যেন।
খুব মনে থাকবে।
আমি মিত্রার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের শরীরটাকে বিছানায় ছুঁড়ে দিলাম। মিত্রা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসছে।
তোর আঙুলতো নয় যেন শাঁড়াসি।
তোকে এইটা দিয়ে জব্দ করবো। সুরো শিখিয়ে দিয়ে গেছে।
বুঝেছি তোর গুরু এখন সুরো হয়েছে। ওর কাছ থেকে জব্দ করার টিপ্স নিচ্ছিস।
মিত্রা বিছানায় উঠে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো।
এরকম করিসনা, কোথায় লেগে টেগে যাবে। তখন হিতে বিপরীত।
তুই আমার কথা ভাবিস।
ভাবি বলেই, না থাকার প্ল্যান করেছি।
কেন।
থাকলেই তুই গন্ডগোল করবি। আমি না থাকলে আর গন্ডগোল করতে পারবি না।
তবেরে শয়তান।
দেখছিস কে শুরু করছে।
বেশ করেছি, তুই কিছু করতে পারবি।
ছোটমার কান জানিস, মাইক্রস্কোপ লাগানো আছে।
থাক। এই যাঃ….।
কি হলো রে!
ওষুধ লাগান হয়নি।
ওষুধ খেতে হয় জানতাম, লাগাতে হয় নাকি।
তুই আমার কিছু খোঁজ খবর রাখিস।
বড়মা, ছোটমা আছে। তারওপর জ্যেঠিমনি। আমি এখানে পাত্তাই পাব না।
ওষুধটা লাগিয়ে দিবি।
যা টর্চ আর ওষুধ নিয়ে আয়।
খুব সখ না।
যা বাবা নিজের জিনিস দেখব তাতে সখের কি আছে।
ওখানে না। পেটে লাগাতে হবে।
তাহলে তুই নিজে নিজে লাগিয়ে নে।
দেখলি দেখলি তুই কিরকম স্বার্থপর দেখ।
আচ্ছা নিয়ে আয় লাগিয়ে দিচ্ছি।
মিত্রা উঠে গিয়ে আলমাড়ি খুলে একটা ক্রিমের কৌট নিয়ে এলো।
এটা কি রে।
এটা একটা ক্রিম, পেটের চামড়াটা যাতে ফেটে না যায় তার জন্য ডাক্তারদাদা নিয়ে এসেছে।
আমি না থাকলে কে লাগাত।
তুই ছিলি না। আমি বড়মার কাছে শুতাম, দাদা তোর ঘরে এসে শুত। বড়মা লাগিয়ে দিত।
তাহলে তোর আদড়ের কোন খামতি নেই।
বড়ামাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরতাম।
ভালোই আছিস।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রাখল।
মন্দ থাকব কেন। তুই আমাকে ঘর দিয়েছিস। বড়মাকে দিয়েছিস, ছোটমাকে দিয়েছিস, আমার জীবন থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া গর্ভধারিণীকে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিস। দিদিভাই জ্যেঠিমনি প্রতিদিন নিয়ম করে তিনবার ফোন করে আমার খোঁজ খবর নেয়। সবাই ঠিক আছে বুঝলি বুবুন, খালি তুই না থকলে মনটা খচ খচ করে। কাউকে বলতে পারি না।
আমি মিত্রার মুখটা বুক থেকে তুলে ধরলাম। বুবুন সব সময় তোর পাশে আছে। ফিজিক্যালি নয় মেন্টালি। এটা তুই বিশ্বাস করিস।
মিত্রা মাথা ঝাঁকাল।
তুই তোর বুবুনকে অনেকগুলো কাজের দায়িত্ব দিয়েছিস।
জানি।
তাহলে।
তবু মন মানে না।
মনটাকে গঙ্গাজলে ধুয়ে দে।
মিত্রা কোন কথা না বলে বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলো।
ওঠ ওটা লাগিয়ে দিই। তারপর একটু ঘুম। আবার কিছু বাদাবি, দোষ আমার ঘাড়ে পরবে।
দেখছিস দেখছিস তুই কেমন করছিস। একটু শুয়ে আছি। তাতেও তোর সহ্য হচ্ছে না।
আমি হেসে ওর বুকে হাত রাখলাম। ও হাতটা সড়িয়ে দিল।
বুঝলাম মাথাটা গরম হয়েছে। আমার কথাটা ঠিক ঠাক মনে ধরে নি। চুপ চাপ শুয়ে রইলাম কোন কথা বললাম না। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ঘুমোতেও পারছি না। যদি খেপে যায়। কতোক্ষণ শুয়ে শুয়ে চলন্ত পাখার ব্লেড গুণলাম ঠিক নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। তিনটে বাজে। আস্তে করে মিত্রার পিঠে হাত রাখলাম। দেখলাম কোন সাড়া শব্দ নেই।
মাথার বালিসটা একটু উঁচু করে ওর মুখ দেখার চেষ্টা করলাম, দেখলাম চোখ বন্ধ করে আছে। আমার মাথার বালিসটা টেনে নিয়ে পাশে রাখলাম। বুকের থেকে ওর মাথাটা আস্তে করে তুলে নিয়ে বালিশে রাখলাম। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পাদুটো সোজা করে কোমড় থেকে কাপরটাকে আলগা করে দিলাম। কোনো সাড়া শব্দ নেই।
নাভির ঠিক নিচের থেকে তলপেটটা সামান্য উঁচু হয়ে আছে। নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। সারাটা শরীরে মা মা গন্ধ আমি একবার কানপেতে শেনার চেষ্টা করলাম। গঁ গঁ একটা আওয়াজ হচ্ছে। শায়ার দড়িটা ঢিলে করে দিয়ে পেটে ক্রিমটা ভাল করে লাগিয়ে দিলাম। কৌটটা আলমাড়িতে তুলে রাখলাম।
ওর ঘুমন্ত শরীরটা আজ একটুও নেশা ধরাচ্ছে না। কেমন যেন একটা ভালোলাগা আবেশ আমার সারাটা শরীরে রিনি ঝিনি করে বাজছে।
আস্তে করে ওর পাশে এসে শুলাম। অনেকক্ষণ ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার ভালবাসা গ্রহণ করে মিত্রা নারী জীবনের পরিপূর্ণতা পেতে চলেছে।
ভাবতেই মনটা কেমন উসখুশ করে উঠলো। ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে করলো ওকে। কিন্তু ওকে ছুঁতে পারলাম না। কিছুতেই মন থেকে সায় দিল না। ঘুম আসছে না। বিছানা থেকে উঠে এসে মিটসেফের ওপর থেকে জলের বোতলটা নিয়ে কিছুটা জল খেলাম।
সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে জানলার ধারে গেলাম। সিগারেটটা ধরাতে গিয়ে আর ধরালাম না। সিগারেটের ধোঁয়ায় যদি ওর খতি হয়।
দরজাটা আস্তে করে খুলে বাইরের বারান্দায় এলাম। সিগারেট ধরালাম। দু’একটা পাখি কিচির মিচির করে উঠলো। নিস্তব্ধ রাতে তাদের ডাকটা যেন আরও তীব্র হয়ে কানে এসে লাগল। কেউ আবার ডানা ঝাপটাচ্ছে। গাছের পাতা মৃদু হাওয়ায় দুলছে। বাইরের গেট বন্ধ। উঁচু পাঁচিলের বাইরের রাস্তাটা শুনশান। জুঁই ফুলের গাছটা একমাথা পাকা চুল নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
অনি জীবনে কখনো তুই এরকম ফ্যাসাদে পরিসনি, তাই না।
হেসে ফেললাম।
সত্যি মানুষের জীবন রহস্যটা কতো গভীর, কেউ অনুভব করতে চাইলে তার গভীরতা বুঝতে পারবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জীবনটা গড্ডালিকা প্রবাহের মতো।
তুই কি আর দশটা মানুষের থেকে আলাদা।
বলতে পারব না। তবে পরের কষ্টটা নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি।
কখনো ভেবে দেখেছিস এই মেয়েটা কতটা তোকে ভালবাসে।
জানি বলেই ওর জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারি।
ভালবাসলে শুধু মাত্র এইটুকুই করতে হয়। আর কিছু করতে নেই।
কে বললো আমি করছি না। আমি যা করছি সব ওর জন্য।
এর বাইরেও মিত্রার কিছু চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে। এটা তুই কখনো ভেবেছিস।
সেই ভাবে ভাবিনি।
কেন।
যেটা নিয়ে ও একটু আগে আমার ওপর অভিমান করলো।
কেন করলো, কখনো ভেবে দেখেছিস।
দেখেছি। দেখেছি বলেই, ওকে নিশ্চিন্তে ঘুম পাড়িয়ে, আমি বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে আছি। ঘুম আসছে না।
বুবুন।
জড়ানো কন্ঠস্বরে নিজের নামটা শুনে ছুটে বিছানার কাছে গেলাম।
মিত্রা অঘোরে ঘুমচ্ছে।
আমি কি তাহলে ভুল শুনলাম।
মুখটা ওর মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। কপালে হাত রাখলাম।
মিত্রার বুক চিড়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। কাপড় এলোমেলো হয়ে গেছে। ভাবলাম একবার ঠিক করে দিই। তারপর ভাবলাম থাক কে আর দেখবে আমি ছাড়া।
আবার একটু ওর পাশে শুয়ে পরলাম। কিছুতেই ঘুম আসছে না। মাঝে মাঝে আমার এরকম হয়। দামিনী মাসির ওখানে কত রাত এরকম অনিদ্রায় কেটে গেছে। নানা চিন্তা মাথা ফুঁরে বেরিয়ে আস্তে চাইছে।
অনি তুই এবার একটু ঘুমো।
দূর ঘুম আসলে তো।
উঠে বসলাম।
মিত্রা পাশ ফিরলো। হাতটা নাড়াচাড়া করলো কাউকে যেন খুঁজতে চাইছে। আমি পাশ বালিশটা ওর হাতের নাগালে এগিয়ে দিলাম ও জাপ্টে ধরলো। ও জানে ওর বুবুন আছে। চিন্তা কিসের। কিন্তু বুবুনের কে আছে ?
মাথার মধ্যে অজস্র চিন্তা কিলবিল করছে। চোখ দুটো কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। ঘন ঘন হাই উঠছে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পরলাম।
এক ধাক্কায় ঘুমটা ভেঙে চূড়মার হয়ে গেলো। চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না। ঘুমে জড়িয়ে আসছে। চোখ খুলতে গেলেই জ্বালা জ্বালা করছে।
শয়তান সারারাত জেগে এখন পড়ে পড়ে ঘুম হচ্ছে। ওঠ সবাই নিচে তোর জন্য বসে আছে।
মিত্রা আমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসেছে। চোখ মেলে তাকালাম।
মিত্রার চোখে মুখে হাসির ছটা। সিঁথিতে লালা ডগডগে সিঁদুরের প্রলেপ।
দেখেই মনে হচ্ছে স্নান সারা হয়ে গেছে। আমি ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
কাঁচা ঘুমটা ভাঙালি।
তোর হচ্ছে দাঁড়া।
কেন আবার কি করলাম।
কি করিস নি।
উঠে বসলাম।
ভাগ্যিস ছোটমা উঠেছিল প্রথমে। না হলে একটা কেলোর কীর্তি হতো।
সক্কাল সক্কাল মেজাজটা বিগড়ে দিলি।
আমি দিলাম।
তাহলে কে।
তোকে কাল সারারাত কে জাগতে বলেছিল।

তুইতো জাগিয়ে রাখলি।
বিছানা থেকে উঠে টেবিলের কাছে গেলাম।
কালরাতে দরজা বন্ধ করেছিলি।
একহাত জিভ বার করে ফেললাম।
মিত্রা হেসে ফেললো।
তোকে শেখাতে শেখাতে বুড়ী হয়ে যাব।
কেন তুই নেংটো হয়ে শুয়েছিলি।
তুই কাপরটা ঠিকমতো পরিয়েছিলি।
আমি খুললাম কখন।
নেকু কিছু জানেনা যেন। চল না নিচে বড়মা ছোটমা দুজনে পিট্টি দেবে।
আজ থেকে বড়মার কাছে শুবি।
বাথরুমে ঢুকলাম। সত্যিতো ঘরে ঢোকার পর আমি কি দরজা বন্ধ করিনি। মনে হয় করেছিলাম। দূর এতো সব মনে থাকে কখনো। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাথরুমের কাজ শেষ করলাম। বেরিয়ে এলাম।
মিত্রা আলনা থেকে আমার পাজামা পাঞ্জাবী বার করে বিছানার ওপর রেখেছে। এরি মধ্যে বিছানাটা গোছানও হয়ে গেছে। একটা সুন্দর চাদর পেতেছে বিছানাতে।
তুই সব কাজ গুছিয়ে নিয়েছিস মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ।
কটা বাজে বলতো।
পৌনে নটা।
কাম সারসে। টেবিলের ওপর থেকে আমার ফোনটা এনে দে।
কেন দাদুকে ফোন করবি।
ওর দিকে তাকালাম। জানলো কি করে!
আজ তোর দাদু, দিদাকে আবিষ্কার করলাম।
অ্যাঁ!
অ্যাঁ না হ্যাঁ।
খেয়েছে।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
অনেকক্ষণ গল্প করলাম।
কার সঙ্গে গল্প করলি। প্রথমে মামীমা, তারপর মামা। তারপর দাদু, দিদা।
সব চটকে দিয়েছিস।
একটুও চটকাই নি। তাড়াতাড়ি মিটিং সার। বেরবো।
বড়মা ছোটমাকে কিছু বলেছিস।
না বলিনি। গোপন আছে, গোপন থাক।
এইতো তোর বুদ্ধি হয়েছে। চিনলি কি করে।
প্রথমে তোকে খুঁজছিল। বললাম তুই ঘুমোচ্ছিস। তারপর বললো তুমি কে মিত্রা। আমি বললাম হ্যাঁ। তারপর সব জেনে নিলাম। আমার নামে অনেক রিপোর্ট করেছিস। সব এক তরফা হয়ে গেছে, মনে রাখিস।
আমি হাসলাম।
কালকে দরজাটা খুলে রেখেছিলি কেন।
ভুলে গেছি।
সিগারেটটা ঘরে খেতে কি অসুবিধা ছিল।
আমার না তোর যদি অসুবিধা হয়।
ঢং।
চুপ করে থাকলাম। আলমাড়ির আয়নায় চুলটা আঁচড়ালাম।
তুই সায়ার দড়িটাও লাগিয়ে দিতে পারিস নি ?
দূর ছাই মনে থাকলে তো।
তোকে খুলতে কে বলেছিল।
ঘুমিয়ে পরলি কেন।
তোকে আমি ক্রিম লাগাতে বলেছিলাম।
না আমার সখ হয়েছিল।
তোকে আমি বলেছিলাম, আমার পায়ের কাছে শুয়ে থাক।
এতো বড়ো বিছানায় জায়গা রেখেছিলি। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকলে আমি শোব কোথায়। এবার থেকে নিচে মাদুর পেতে শোব।
তোকে শায়াব। ছোটমা না এলে কি লজ্জায় পরে যেতাম।
এ বাড়িতে যখন আছিস তখন তুই মালকিন নোস এ বাড়ির বৌ। তাছাড়া তুই অনির বৌ, অনির মতো একটু আধটু বেসামাল না হলে চলে কি করে।
তোকে জ্ঞান দেওয়াব। কি লজ্জা করছিল।
এই প্রথম জীবনে লজ্জাপেলি, লজ্জাটা উপভোগ কর।
মিত্রা এসে কোমরটা চিমটে ধরলো।
এই দেখো কথায় কথায় চিমটি কাটলে চলে। আমার সব রোগ তোর শরীরে ঢুকে যাবে।
ঢুকুক।
মিত্রা হাত সরিয়ে নিল। আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আবার কি হলো।
কাল তুই ওরকম করলি কেন। সেই জন্য রাগ হয়ে গেল।
কি করলাম, কেনই বা তোর রাগ হলো বুঝলাম না।
তোর বুকে একটু মাথা দিয়ে শুয়েছি তাতে কি খতি হয়েছে।
কোন খতি হয় নি। এই সময় একটু নিয়ম কানুন মানতে হয় শুনেছি।
আমিতো ঘুমিয়ে পরেছি।
সেতো অনেক পরে।
আর কোনদিন হবে না।
এবার নিচে চল।
দাদুর কাছে কখন যাবি।
দেখি নিচের কাজ শেষ করি আগে।
ওই পথে লোকনাথ বাবার মন্দির পরে একবার নিয়ে যাবি।
বলে রেখেছি।
সত্যি!
হ্যাঁ।
চল তাহলে কাজগুলো তাড়াতাড়ি সেরে নে।
কারা কারা এসেছে।
সব ডাক্তারদাদার বন্ধু। সব এক একজন দিকপাল। কথায় কথায় বললো তারা আমাদের নার্সিংহোমে কোন না কোন কাজে এসেছে। তবে ব্যাব্যহার ভালো পায়নি বলে নিজে থেকেই সরে গেছে। ও আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।
কি।
ইসলামভাই ফোন করেছিল।
কি জন্য।
খবর পৌঁছে গেছে। একটু পর আসবে।
আর কে জানে।
সবাই জানে। বড়মা শুনে বললো আপদ গেছে।
তুই কাউকে কিছু বলিস নিতো ?
না।
ইসলামভাই কাকে ফোন করেছিল।
ছোটমাকে। তারপর দাদার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে।
ডাক্তারদাদা কি বললো।
সবাই শুনে বললো পাপিষ্ঠদের এইরকম অবস্থাই হয়।
চল।
দুজনে কথা বলতে বলতে নিচে নামলাম। বাগানে, গেটের বাইরে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। ঘর ভর্তি ডাক্তারদার বন্ধু বান্ধব। গুনে দেখলাম দশজন। ডাক্তারদাদা, রথীনডাক্তার, আর. এল. দাস ছাড়া কাউকে চিনতে পারলাম না। সবাই মেজাজে আড্ডা মারছে। দাদা মল্লিকদাও রয়েছে।
আমি ঘরে ঢুকতেই ডাক্তারদা চেঁচিয়ে উঠলো আসুন স্যার আসুন।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।
তুই ওই ভাবে হাসিস না।
মালকিনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এবার মালিকের সঙ্গে পরিচয় পর্ব সারতে হবে।
আমি রেডিমেড কোমড় ধাপিয়ে সকলকে প্রণাম করতে শুরু করলাম। প্রণাম শেষ।
বুঝলে শান্তনু এই হচ্ছে অনি। ডাক্তারদাদা বলে উঠলো।
এই ছোঁড়া এই সব কর্মের মালিক! না বাপু ভেবে দেখতে হবে কাজ করবো কিনা।
সবাই হেসে উঠলো। রথীন ডাক্তার হাত তালি দিয়ে উঠলো।
তুমি আবার হাতে তালি মারছো কেনো।
সেদিনকার কথাটা একবার মনে করো। আমি খালি বক বক করি না।
তোমার একটু স্বভাব আছে।
যাই বলো সামন্ত ওকে দু’একবার দেখেছি। সেই দেখা আর এই দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য চোখে পরছে। ডঃ দাস বললেন।
তুমি ওকে আগে দেখেছ!
রথীন ডাক্তার ডঃ দাসের দিকে তাকিয়ে বললেন।
তুই কনিষ্কদের সঙ্গে যেতিস না ?
হ্যাঁ, স্যার।
শেয়ালদার নায়ক তুই ছিলি।
মিত্রা জোড়ে হেসে উঠলো। ছোটমা রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এলো।
আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
তুমি ওর কীর্তি কিছু জান ?
ডাক্তার দাস ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে বললেন।
কিছু কিছু জানি। তবে তুমি যেটা বলছো সেটা জানি না।
ওর অনেক গুণ বুঝলে সামন্ত। কনিষ্কদের কাছ থেকে কিছু কিছু উদ্ধার করেছি। তবে হাতের নাগালে কোনদিন পাই নি।
এইবার হাতের নাগালে পেয়ে গেলে।
দাদা এবার কচুরি আনি।
ছোটমা হাসতে হাসতে বললো।
নিয়ে এসো।
তুমি কি সকাল বেলা শুধু কচুরি খাওয়াবে।
রথীনডাক্তার চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখো না কি আনে, তোমার পছন্দ হবে।
ওর খাই ঢুকলে বাইটা এখন গেলনা তাই নারে সামন্ত। বাজখাঁই গলায় আর এক ডাক্তার বলে উঠলো।
সবাই হাসাহাসি করছে।
তুই বোস কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবি। ওরা আবার যে যার কাজে যাবে।
হিমাংশু হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো।
এসো এসো হিমাংশু।
ডাক্তাদাদা হিমাংশুকে দেখে বলে উঠলো।
আমি একটু অবাক হয়ে হিমাংশুর দিকে তাকালাম।
ডাক্তারদাদা হিমাংশুর সঙ্গে সকলের পরিচয় করিয়ে দিল।
আমার মতো হিমাংশুও সকলকে প্রণাম করলো।
ডিড তৈরি করেছো ? ডাক্তারদাদা বললো।
হ্যাঁ।
যে ভাবে বলেছিলাম সেই ভাবেই তৈরি করেছো ?
হ্যাঁ।
অনিকে এর মধ্যে রাখনিতো।
না।
বেশ করেছো। আগে খেয়ে নাও। খেতে খেতে এদের বুঝিয়ে দাও। তারপর সই সাবুদ হবে।
হিমাংশু একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পরলো।
ছোটমা ট্রেতে করে খাবার প্লেট এনে সেন্টার টেবিলে রাখল।
আরও আছে চাইলে পাবেন কোন অসুবিধে নেই।
রথীনডাক্তার বলে উঠলো সে আর বলতে।
ওরা হাসাহাসি করছে।

আমার মাথায় ব্যাপার গুলো ঠিক ঢুকছে না। তবে এটুকু বুঝলাম ডাক্তারদাদা নিজের মতো করে সব সাজিয়ে নিয়েছে। মিত্রার চোখ মুখ দেখে বুঝতে পারছি, ও সব জানে। ছোটমার পেছন পেছন একবার রান্নাঘরে যাচ্ছে আর আসছে। হিমাংশু হাসছে।
খেতে খেতে ডাক্তারদা বললো, তোকে সব কথা বলা হয়নি। আমি সংক্ষেপে বলছি শুনে নে।
আমি ডাক্তারদার দিকে তাকালাম।
নার্সিংহোমগুলো সব আলাদা আলাদা বডি ছিল। আমি সবকটাকে একজায়গায় নিয়ে এলাম। একছাতার তলায় নিয়ে আসলাম প্রাইভেট ট্রাস্ট চ্যারিটেবিল ফর্মেসনে নিয়ে আসলাম। তাতে কাজ করার অনেক সুবিধা আছে।
হেসে ফেললাম।
ধরে ফেলেছিস।
আমি মাথা নীচু করলাম।
মাথা উঁচু করে বল আমি তোর মতো বুদ্ধি লাগাতে পেরেছি কিনা।
আমি হাসছি।
তোকে ছাড়া আমি সবার সঙ্গে আলোচনা করেছি। ওরা সবাই আমার মতে সায় দিয়েছে।
যাই করো কেউ যেন অসন্তুষ্ট না হয়।
কেউ অসন্তুষ্ট হবে না। আমাদের এই বয়সে পাওয়ার কিছু নেই। খালি এর মধ্যে অনিমেষকে রেখেছি। তোর আপত্তি আছে।
আমার কোন কিছুতে আপত্তি নেই।
অনিমেষকে ফোন করেছি এখুনি এসে পরবে।
আমি ডাক্তারদার দিকে তাকালাম।
তুই এই পনেরো দিনে তোর কাজ করেছিস। আমি আমার কাজ করেছি। অনিমেষ সব জানে।
আমি একপলক ডাক্তারদার দিকে তাকালাম।
এরাও কম বেশি সকলে সব জানে। রতনলাল তোর কীর্তি কলাপের কথা বলছিল। তোর এরকম ভুরি ভুরি কীর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
অনিমেষদা, অনুপদা, প্রবীরদা ঘরে এসে ঢুকলো। পেছনে দামিনীমাসি, ইসলামভাই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
সামন্তদা একটু দেরি হয়ে গেল। ক্ষমা করবেন।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে হাতজোড় করে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। সকলে এগিয়ে এসে অনিমেষদার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলো।
আমার দিকে তাকিয়ে।
কখন ঘুম থেকে উঠলি।
চুপ করে রইলাম।
বড়মার দিকে তাকিয়ে।
দিদি আজ ওর একটু কানটা ধরি।
আজ থাক সবাই আছে। পাশ থেকে মিত্রা বলে উঠলো।
ঘর ভর্তি সবাই হেসে উঠলো।
ইসলামভাই দামিনী মাসি আমাকে হাসতে হাসতে এক দৃষ্টে দেখে যাচ্ছে। প্রবীরদা অনুপদাও ঠিক একি ভাবে দেখছে।
ভজুরাম পটাপট এঘর থেকে ওঘর থেকে চেয়ার নিয়ে এসে জড়ো করে দিয়েছে।
সামন্তদা তাহলে দিদি ছাড়াও ওর আর একজন সাপোর্টার আছে।
কিছুক্ষণের জন্য। মিত্রা বললো।
আবার সবাই হেসে উঠলো।
দাদা কচুরী নিয়ে আসি।
নিয়ে এসো।
ডাক্তারদাদা কারুর সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিলেন না। বুঝলাম এদের সঙ্গে এরকম সিটিং এর আগে দু-চারবার হয়ে গেছে। সবাই সবার পরিচিত।
ওকে বলেছেন। অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো।
সংক্ষেপে।
কি বললেন স্যার।
স্যারের কোন কিছুতেই আপত্তি নেই। খালি বললেন কেউ যেন অসন্তুষ্ট না হয়।
এদিকে টনটনে জ্ঞান আছে।
আবার সকলে হেসে উঠলেন।
যাই বলুন অনিমেষবাবু পুঁচকে ছেলের কান্ড কারখানা কিন্তু তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মতো। ডঃ দাস বলে উঠলেন।
এগুলো ওর অনেক দিনের স্বপ্ন। সুতপাকে ও প্রায়ই বলতো পয়সা যদি ওর হাতে কোন দিন আসে, তাহলে ও জগৎতটাকে একবার দেখে নেবে।
আমার দিকে তাকিয়ে।
কিরে ঠিক বললাম।
ও এখন ভিজে বেড়াল, ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। ছোটমা ফুট কাটল।
দাও আর কয়েকখানা কচুরী দাও। ডাক্তারদাদা বললো।
আমাদেরও দিও। রথীন ডাক্তার বলে উঠলো।
হাসাহাসি খাওয়া দাওয়া গল্প। বেশ চলছে। তার মধ্যে অনিমেষদা হিমাংশুর সঙ্গে কথা বলে নিল।
দাদা আর দেরি করে লাভ নেই। শুভস্য শীঘ্রম। হিমাংশু দুটোই এনেছো ?
অনিমেষদা হিমাংশুর দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
বার করো তোমাকে আবার কোর্টে যেতে হবে।
হিমাংশু হাসছে। আমার দিকে তাকাল।
ওর দিকে তাকিয়ে লাভ নেই।
ওকে দিয়েই প্রথমে সই করাও। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি কেন সই করবো। তোমরা এর মধ্যে থাকবে। তোমরা সই করো।
বক বক করবি না। যা বলছি কর। অনিমেষদা ধমক দিল।
ছোটমা হেসে ফেললো।
তোমরা সবাই মিলে ওরকম করলে বেচারা যায় কোথায় বলো। বড়মা বলে উঠলো।
অনিমেষ আর একজন। দাদা ফুট কাটল।
বড়মা একবার দাদার দিকে কট কট করে তাকাল।
সকলে হাসছে।
হিমাংশু আমাকে যেখানে যেখানে দেখাল সই করে দিলাম। দুখানা ডিড বানান হয়েছে। একটা এনজিওর আর একটা নার্সিংহোমের। সই করতে করতে যেটুকু চোখে পরলো তাতে বুঝলাম, মিত্রা সবেতেই চেয়ারম্যান পদে রয়েছে। দেখলাম প্রবীরদা অনুপদাও সই করলো।
তুমি এসেছিলে, না হলে এই নিয়ে একটা ঝামেলা করতো। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোরা সবাই মিলে ওকে ধরে মারতে পারিস না। অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো।
বড়মাকে বলো। আদরের ছেলে বলে কথা।
অনিমেষদা জোরে হেসে ফেললো।
বড়মা বাঁকা চোখে একবার মিত্রার দিকে তাকাল।
আচ্ছা আচ্ছা আর বলবো না, হয়েছে তো। মিত্রা গিয়ে বড়মাকে জড়িয়ে ধরলো।
চা পর্ব শেষ হোল। হাসাহাসি টুকরো টুকরো কথা। আমাকে নিয়ে অনিমেষদা খুব রসিকতা করলো। বুঝলাম বেশ ভালো মুডে আছে। তারপর ডাক্তারদা তার বন্ধুদের সবাইকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলো।
অনিমেষদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
দাদা একটা সিগারেট দিন।
দাদা অনিমেষদার দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
ছোট।
বলুন দাদা।
একটু লিকার চা খাওয়াতে পার।
এইতো খেলেন।
দাও একটু, সকাল থেকে অনেক যুদ্ধ করলাম।
কেন দাদা!
আজ অনির অমর কীর্তি শোন নি!
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
কোনটা বলো। ডাক্তারদাদা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
ডাক্তার ব্যানার্জী কাল রাতে স্যুইসাইড করেছেন।
সারা ঘড় নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বান্ধবী সকাল বেলা বললো। ভেরি স্যাড নিউজ। ভদ্রলোক এরকম করবে ভাবি নি।
ডাক্তারদাদা স্বগতোক্তির সুরে বললো।
আপনার মনে কোন প্রশ্ন আসেনি। হঠাৎ কেন স্যুইসাইড করতে গেলেন ভদ্রলোক।
সে ভাবে ভাবি নি।
একটু ভাবুন উত্তর পেয়ে যাবেন।
তোমাকে সেদিনের ঘটনা বলিনি না।
কি বলুন তো!
এই দেখো এর মধ্যে তোমার সঙ্গে তিন চারবার দেখা হোলো। বলা উচিত ছিল।
অনিমেষদা ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে থাকল।
অনি এর মধ্যে গোয়া গেছিল।
শুধু গোয়া নয়। আরও অনেক জায়গায় গেছিল।
আমি গোয়ার ব্যাপারটা জেনেছি। তাও একজন মেমসাহেব বেশ কয়েকদিন আগে আমাকে এসে বললো আপনি আমাকে বাঁচান। ভাবলাম কোন রোগটোগ হয়েছে হয়তো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝলাম, ও অনির ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

তারপর জানলাম, ব্যানার্জীর যে নার্সিংহোমটা গোয়াতে আছে সেটার ও মালিক। ডাক সাইটে ব্যানার্জীর স্ত্রী। অনি নাকি ওকে বলেছে তুমি নার্সিংহোম বেচে দিয়ে ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে যাও। সে নার্সিংহোম বেচে কলকাতায় এসে এখান থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেনে লন্ডন চলে যাচ্ছে।
কথা শুনতে শুনতে অনিমেষদার চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল। প্রবীরদা অনুপদার চোখ ঠেলে বেড়িয়ে আসতে চাইছে।
আমি বললাম তাহলে তোমাকে বাঁচাব কি করে।
বললো ওর আরও সম্পত্তি আছে। অনি সব জানে। সে গুলো ও বেচতে পারে নি সময় লাগবে। ও আবার ফিরে আসছে। তখন যদি কোন বিপত্তি ঘটে। তবে ও এখানকার সমস্ত খোঁজ খবর রেখেছে। সব জানে। খুব বুদ্ধিমতী মহিলা। তারপর চলে গেল।
প্রবীরদা ফিক করে হেসে ফেললো।
হেসো না প্রবীর। ও কতোটা কুল তুমি বুঝতে পারছ। তুমি নিজে পারতে ? কতো নিস্তব্ধে কাজ করেছে বলো। কেউ ওর শরীরে একটা আঁচড় কাটতে পারবে ?
আমি ওর বাড়িতে গিয়ে ওর কাকাকে কাকীমাকে বলে এসেছি।
ইসলামভাই মুখে ওর্না চাপা দিয়ে হাসছে।
তুমি কি করে এতদিন তোমার দল চালাতে ইসলাম।
অনিমেষদা ইসলামভাই-এর দিকে তাকাল।
আমি অনেকদিন আগে হার স্বীকার করে নিয়েছি দাদা। ওর মাথায় সব ইনস্ট্যান্ট বুদ্ধি আসে। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী ও বুদ্ধি এ্যাপ্লাই করে। মুহূর্তের মধ্যে প্ল্যান চেঞ্জ করে নেয়। দেখে মনে হবে ওর যেন সব মুখস্থ।
ঘটনাটা কি বলো অনিমেষ। সত্যি কি ডাক্তার স্যুইসাইড করে নি! দাদা বললো।
আইনের খাতায় এটা ছাড়া প্রমাণ করার কোন রাস্তা নেই। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে উনি প্রচুর পরিমানে ড্রিঙ্ক করেছিলেন। লাইন পার হতে গিয়ে বেসামাল হয়ে লাইনে কাটা পরেছেন। তা ছাড়া….
অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল, যা দাদার ঘরে গিয়ে বোস।
মিত্রা চলে গেল।
রিপোর্টে, উনি যে কিছুক্ষণ আগে মহিলা সঙ্গ করেছিলেন তারও প্রমাণ মিলেছে।
কোন জায়গায় ?
এর আগের বার যে জায়গা থেকে ওই ছেলেটাকে ও তুলে নিয়ে গেছিল।
স্ট্রেঞ্জ।
আমরা ভেতরের ব্যাপারটা সব জানি বলে বলতে পারছি এটা প্রি-প্ল্যান্ড, না হলে কারুর বোঝার ক্ষমতা নেই।
কারা করেছে।
ওর নতুন রিক্রুটের কিছু ছেলে। তাদেরকে ইসলাম পর্যন্ত চেনে না। তারা সব ভাইজ্যাকের ছেলে। ব্যানার্জী চিনতো তাদের।
ওরা এখানে এসে থাকলো কোথায়, করলো কি করে।
বড়মা আমার পেশে এসে দাঁড়াল। কাঁধে হাত রাখলো।
কিরে তোর কাছে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পৌঁচেছে। অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
আমি চুপ করে রইলাম।
আমি শুনলাম ডোমটা তিনকপি জেরক্স করেছে। সেগুলো গেল কোথায় ?
জানিনা।
যথা সময়ে পৌঁছে যাবে তাই না।
আমি কনো উত্তর দিলাম না।
তোর বৌদিকে তোর গুণের কথা সব বলে এসেছি। খবরটা আমি কাল রাতেই পেয়েছি।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
রাজনাথের কোন ক্ষতি যেন না হয়।
দপ করে মাথাটা কেমন গরম হয়ে গেল।
ওকে কলকাতা ছেড়ে ওর দেশে চলে যেতে বলো। গলাটা সবার কাছেই কর্কশ শোনাল।
তাহলে তোর আরও সুবিধা।
অনুপদা হেসে ফেললো।
হেসো না অনুপ ওর মুখ চোখ দেখে বুঝতে পারছো।
আমার দিকে তাকিয়ে।
ওর কিছু হলে আমি সামলাতে পারব না।
তোমাকে সামলাতে হবে না।
তার মানে!
ওর ঘুঁটি সাজান হয়ে গেছে। ইসলামভাই বললো।
আমি কিছু করিনি।
তাহলে ?
ও প্রবীরদা আর তোমাকে টার্গেট করেছে। কাল রাতে প্রবীরদার বাড়ির আশে পাশে ওর লোক ঘুরে এসেছে।
তুই কি দিবা স্বপ্ন দেখছিস।
যা সত্যি তাই বললাম।
কোথায় আছে তুই জানিস।
জানি।
প্রবীর একবার ফোন করো।
কাল থেকে ওর ফোন ওর কাছে নেই। ওকে ফোন করে পাবে না। আমার কথা বিশ্বাস না হয় ফোন করে দেখতে পার।
সেই জন্য তুই মিত্রাকে ঘুম পাড়িয়ে সারারাত জেগেছিস। ছোটমা ফড় ফড় করে উঠলো।
কালকে তুই খেতে বসে কাকে বললি, হয়েগেছে….ঠিক আছে চলে যা। দাদা বললো।
কটায় বলুনতো দাদা। অনুপদা বললো।
ধরো পৌনে বারোটা নাগাদ। তারপর ও না খেয়ে উঠে চলে গেল।
প্রবীর ওর ফোন থেকে নম্বরটা দেখো তো।
সেকিগো তোমরা জান না। বড়মা বলে উঠলো।
আবার কি হলো।
ও একটা নতুন ফোন নিয়েছে। সেটা আবার পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে। আমরা কেউ জানি না। ও ছাড়া কেউ খুলতেও পারবে না।
অনিমেষদা আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।
মিত্রা।
মিত্রা বড়মার ঘর থেকে বলে উঠলো যাচ্ছি।
কালকে এগারোটা পঁয়ত্রিশ চল্লিশ নাগাদ ঘটনাটা ঘটেছে। লাস্ট ট্রেন ছিলো শিয়ালদা থেকে।
মিত্রা কাছে এসে দাঁড়াল।
তোর কাছে ওর নতুন ফোন নম্বরটা আছে।
আমাকে দিলে তো।
তোকে দেয় নি!
বলেছে তোদের জন্য একটা নম্বর আছে। ওটায় করবি, ওটা আমার কাজের ফোন।
ওদের হাতেও একটা করে নতুন ফোন দেখলাম।
ইসলামভাই অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে বললো।
সেই জন্য প্রবীর তোমরা কেউ ট্রেস করতে পার নি।
জানেন সামন্তদা আমি খবর পাই বারটা নাগাদ। ওখানকার থানা আমাকে খবর দেয়। তারপর অনুপকে ফোন করি। অনুপ সব ব্যবস্থা করে। প্রত্যক্ষ দর্শীদের কথায় ডাক্তার পরি কি মরি করে দৌড়ে লাইন পার হচ্ছিল। রান ওভার হয়। কেন ডাক্তার দৌড়চ্ছিল আপনি বুঝে নিন।
ঘরের সবাই চুপ চাপ, নিস্তব্ধ ঘর।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো। সবাই উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি ফোনটা বার করে দেখলাম, তারপর মিত্রার হাতে দিয়ে বললাম, কথা বল। বলবি একটু পরে বেরবো।
মিত্রা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আমি এবার বেরবো। তোমাদের আর কি জানার আছে।
কোথায় যাবি।
বড়মা ছোটমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাব। সেখানে আগে থেকে বলা আছে।
ফিরবি কখন।
ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
রাজনাথকে ছেড়ে দে।
দায়িত্ব তোমার, এরপর আমার কানে যদি কোন খবর আসে ও বেঁচে থাকবে না।
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
তাকিয়ে লাভ নেই। আমি যা বলছি খোঁজ নিয়ে দেখ ওর লোক জন এগুলো করেছে কিনা।
আমি খোঁজ নিয়েছি। ওরা তোর ভয়ে সেল্টার নিতে গেছিল প্রবীরের কাছে।
উইথ ওয়েপনস।
বলতে পারব না।
প্রবীরদা।
আমার সঙ্গে কাল রাতে শেষ কথা হয়েছে। ঘটনাটা ঘটার পর থেকে আর কথা হয় নি।
অবতার সাগির কোথায় ? ইসলামভাই বললো।
তোমার জেনে লাভ।
ইসলামভাই হেসে উঠলো।
ওরা বাচ্চা ছেলে কোথায় কি করে বসবে।
তোমার থেকে বেশি বুদ্ধি রাখে।
সেতো এখন টের পাচ্ছি।
দামিনী মাসি মুখে কাপর চাপা দিয়ে হাসছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম স্যুইচ অন করে পাসওয়ার্ড দিলাম। তারপর ডায়াল করলাম।
ওরা আমাকে স্থির চোখে সবাই লক্ষ করছে।

বলো।
কোথায় রেখেছিস।
ঠিক জায়গায় আছে। রিপোর্ট পেয়েছ।
এখনো আসে নি। শোন এখন পাঠাতে হবে না। পরে নিয়ে নেব। রাজনাথকে পার্টি অফিসের সামনে নামিয়ে দে।
ঘন্টা দুয়েক দেরি হবে।
কটার সময় বল।
একটা বাজবে।
আচ্ছা। প্রবীরদার বাড়ি থেকে চোখ সরাবি না।
ওখানে লোক আছে।
আর গুলোকে পেয়েছিস।
নেপলা ধরে বিট দিয়ে দিয়েছে। বললো ওদের চেনে।
এখানকার।
হ্যাঁ।
পকেটে পয়সা আছে।
না।
তাহলে আবিদের কাছ থেকে নিয়ে নে। ওর কাছে রাখা আছে। রাজনাথকে ছেড়ে দিয়ে মাসির ওখানে গিয়ে কাজগুলো দেখশুনো কর।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে দিলাম।
আমি চেয়ারে এসে বসলাম।
অনিমেষদা মাথা দোলাচ্ছে আর হাসছে।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
কিরে কথা হলো।
হ্যাঁ।
কখন যাবি বললি।
বললাম বুবুন একটা মিটিং করছে মিটিং শেষ হলেই যাব।
দামিনী একটু চা করো। দিদি আপনারা রেডি হয়ে নিন।
আমার দিকে তাকিয়ে।
তুই বিশ্বাস কর ও প্রবীরের কাছে সেল্টার নিতে চেয়েছিল।
আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। তুমি অনেকক্ষণ থেকে এক তরফা কথা বলে চলেছ। আমাকে বলতে পারবে এই কেসে ও যামিন পায় কি করে ?
আইন বলছে ও যামিন পেতে পারে তাই পেয়েছে।
আমি বলছি তোমাদের লবির বিচারকটা সুবিধার নয়। আমাকে একটা কথা সত্যি করে বলো, ওর প্রতি তোমাদের এতো দুর্বলতা কেন ?
তোকে বলবো। পার্টির ভেতরের সব কথা তোকে বলা যায় না। বলতে পারিস রাজনীতি করছি। আমি তোকে কথা দিচ্ছি একটু সময় দে।
অনিমেষদা এমনভাবে কথা বললো আমি কোন কথা বলতে পারলাম না।
তুই বিশ্বাস কর অনুপ প্রবীর মনিটরিং করছে। মাঝে মাঝে ওদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। কথা দিচ্ছি এবার হবে না।
এই প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলে রাখি ও আরও দু’চার জায়গায় চোখ দিয়েছে। সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। এটা ওকে জানিয়ে দেবে। ও যদি ভেবে থাকে অনির দুর্বল জায়গা গুলো ও জেনে ফেলেছে তাহলে ও ভুল করছে।
তুই সব মনগড়া কথা বলছিস।
আমি পাটিগণিতে কোনদিন ভালো ছাত্র ছিলাম না। নম্বরও পাই নি। নম্বর পেতাম বীজগনিতে। ওখানে অঙ্ক মেলাতে গেলে সব সময় একটা এক্স ধরতে হয়।
অনিমেষদা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আমি যে এ ভাবে সপাটে জবাব দিতে পারি অনিমেষদা বিশ্বাস করতে পারে নি।
অনুপদা, প্রবীরদা হেসে ফেললো।
বয়স হয়েছে রাজনীতি করতে করতে চুল পেকে গেল। তোর কথা বোঝার ক্ষমতা আছে।
আমি অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তুই যা ভাবছিস তা কখনো ঘটবে না। তাহলে তোর অনিমেষদা চুপচাপ বসে থাকত না।
এর আগেও তোমাকে সাবধান করেছি তা সত্বেও তুমি ভুল করেছ।
পার্টির কাজ করতে গেলে দশজনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তারা যদি ভুল ইনফর্মেসন দেয় কি করবো।
তাড়িয়ে দেবে।
সংগঠন চালাতে গেলে পার্টি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায় না। তাকে পার্টির মধ্যে রেখে রাজনীতি দিয়ে সেই সম্যার সমাধন করতে হয়। তোর অঙ্কটা অবশ্য আলাদা।
সবাই আমাদের কথা অবাক হয়ে শুনছে। ভাবছে অনি কার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলছে। যার মুখের ওপর কথা বলতে গেলে লোকে দশবার ভাবে। তাকে অনি এই ভাবে ক্রশ করছে।
এক সময় পার্টিটা আমি মন দিয়ে করেছি।
তুই পার্টি করিস নি। তুই পার্টিকে একান্ত ভাবে ভালবসেছিস। আজও ভালবাসিস। তাই আমার কথা ভাবিস প্রবীরের কথা ভাবিস। পার্টির স্বার্থ দেখিস। কিছু নোংরাম দেখলে আমার কাছে ছুটে যাস। নিজের চেষ্টায় পার্টির সংগঠন তৈরি করিস। বলতে পারিস তাদেরকে আমাদের পার্টির প্রতি একনিষ্ঠ হতে অনুপ্রেরণা দিস।
আমরা তোকে বলতে যাই নি। কজন নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করে। তুই যদি ভাবিস আমি বুঝি না। তাহলে ভুল। আমি বুঝি সময়ের অপেক্ষা করি।
তোমার সময়ের অপেক্ষা করতে করতে অনেক কিছু ক্ষতি হয়ে গেছে।
তোর কথা মেনে নিচ্ছি। তবে কিছুটা রিভাইভ করেছি। তুই এতো খবর রাখিস ওই খবর রাখিস না, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
আমি চুপ করে রইলাম।
তুই এই কদিনের মধ্যে ভালোপাহাড়েও গেছিলি। নিশ্চই শুনেছিস আমি অনুপকে শ্যামের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অনুপ কিছুটা কাজ করে এসেছে। আবার যাবে।
সবাই একবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
ও কবে ভালোপাহাড়ে গেল ?
বড়মা অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
আপনারা ওকে ঠিক চিনতে পারেন নি দিদি। অনুপদা বললো।
ছোটমা চা নিয়ে এলো।
কিগো দিদি ভালোপাহাড়ের কথা শুনলাম।
ছোটমা সবাইকে চায়ের প্লেট এগিয়ে দিল।
তুই একবার ভেবে দেখ ছোট, অনি এর মধ্যে নাকি ভালোপাহাড়ে গেছিল। বড়মা হতাশ গলায় বললো।
অনিমেষদা চায়ে চুমুক দিল। ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
আচ্ছা সামন্তদা অনুপ আমার একেবারে কাছের মানুষ এটা আপনি মানেন।
না হলে তুমি অনুপকে সঙ্গে নেবে কেন।
অনুপ যদি অনির ইনফর্মার হয় এবং আমার সব গোপন খবর অনির কাছে পৌঁছে দেয় আপনার ক্ষমতা আছে ইনট্রগেট করার।
কি বলছো তুমি!
আপনাকে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলাম।
আর একটা কথা বলি। একটু মন দিয়ে শুনুন। ওর অফিসের বটাদা ওর সবচেয়ে বড়ো ইনফর্মার। এটা কম বেশি সবাই জানে। তবে কি বটাদার সামনে কেউ আলচনা করবে।
না।
তাহলে বটাদা সব জেনে ওকে ইনফর্ম করে কি করে ?
ডাক্তারদাদা ঘন ঘন চায়ে চুমুক দিল।
এই বার বলুন ওর কথা কিছু বুঝলেন।
তারমানে ও তো আমার পেছনেও লোক লাগিয়ে রেখেছে!
সকলে হেসে ফেললো। আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছি।
এরকম অসংখ্য উদাহরণ আপনাকে দিতে পারি। আমি সংগ্রহ করেছি, এখনও করছি বলতে পারেন। এখন আমি নিয়ম করে ওর পেছনে এক ঘন্টা করে সময় দিই।
অনিমেষদা চায়ে চুমুক দিল।
আপনি হঠাৎ করে ওর কথা বুঝতে পারবেন না। ওর কথাগুল আপনাকে মনে রাখতে হবে। তারপর একা একা একটু ভাবলে উত্তর পেয়ে যাবেন।
তুমিতো আমার পথ ধরেছ। আমিও ওকে একই ভাবে স্টাডি করি। ডাক্তারদাদা বললো।
তাহলে বুঝুন।
দিদি, ছোট, অমিতাভদা, মল্লিক ওকে কি করে বুঝবে। মিত্রাকে আমি খরচের খাতায় ধরি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। জামাকাপরটা চেঞ্জ করে আসি ?
ঘরে একটা হাসির রোল উঠলো।
যা।
অনিমেষদা এমন ভাবে বললো আবার সকলে হেসে ফেললো।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
নিচে নেমে দেখলাম দাদা মল্লিকদা টেবিলে বসে খাচ্ছে। আর সবাই চলে গেছে। বাইরের বাগানে দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রবীন ইসমাইল দুজনেই আছে। বুঝলাম ইসমাইল দাদাদের নিতে এসেছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। দেখলাম সাড়ে এগারটা বাজে।
বড়মা ছোটমা মিত্রা কাউকেই দেখতে পেলাম না। বুঝলাম সব কাপর পরতে ব্যাস্ত। আমি সোফায় এসে বসলাম।
আজ তাহলে ওপাশে যাচ্ছিস না।
মনে হয় হবে না।
তুই কিন্তু অনেক দিন কিছু দিস নি।

দেবো একটু অপেক্ষা করো।
ব্যানার্জীর ব্যাপারটা কি করবি।
একটা বক্স করে একটা নিউজ করে দেবে আমরা দুঃখিত।
ওর বডিটা সুনীত হ্যান্ড ওভার করেছে। ওর সম্বন্ধে কিছু ভাবলি।
ও নিয়ে তুমি ভেব না। আগে লিগ্যালি কি এ্যাকসন নেয় দেখো তারপর। সুনীতদার ফাইল রেডি করে হিমাংশুর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার আমি আমারটা ডিমান্ড করে চিঠি দিতে বলেছি।
কালকে কিংশুক গন্ডগল করেছে। টিনা শো কজ করে দিয়েছে।
তার জবাব দিতে না পরলে টিনাই ব্যবস্থা করবে।
তুই কি করে জানলি।
জানলাম।
মেয়েটা যে এতো স্ট্রং মেন্টালিটির আগে বুঝতে পারি নি।
ওকে একটু হেল্প করবে। এখনো ঠিক ঠিক সড়োগড়ো হয়ে উঠতে পারে নি।
তোর সেই আগের গাড়ির ড্রাইভার তাপস এসেছিল।
কি বলেছে।
ওকে নিয়ে গন্ডগোল করে রেখেছে।
ওটাও টিনা সামলে নেবে। টিনাকে বলে দিয়েছি।
ঠাকুরের ব্যবস্থা কি করবি।
আমার সঙ্গে বসতে বলবে। আমি না যাওয়া পর্যন্ত যেমন চলছে তেমন চলবে।
ঠাকুর বলেছে তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ছেড়েদেবে প্রচুর লোক আছে।
একটা গন্ডগোল পাকাবার বন্দোবস্ত করছে।
জানি।
তুই সব জানিস!
জানি বলেই উত্তর দিতে পারছি। তুমি এক কাজ করবে ঠাকুরের হিসাবটা করে রাখতে বলবে টিনাকে।
দাদা খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকাল।
কিরে তুই এই জামা প্যান্ট পরে যাবি।
ছোটমা কথা বলতে বলতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
আর কিছু বলবে।
ওকে তারাবার মতলব করছিস।
অনেকদিন আগে থেকে ঠিক করেছি। তাই একটু আধটু ঝামেলা করছে।
সামলাবে কে।
তিনজন লাইন দিয়ে আছে। তোমাকে ভাবতে হবে না।
ছোটমা এসে থমকে দাঁড়িয়ে পরেছে। মল্লিকদার সঙ্গে চোখের ইশারায় কথা হলো।
বুঝলাম ছোটমাকে এখন কথা বলতে মানা করছে।
তোকে একটা কথা বলবো।
বলো।
তাপস ছেলেটাকে যদি দায়িত্ব দিস কেমন হয়।
আমি একবার দাদার দিকে তাকালাম।
দাদা নিজে থেকে বলছে, না কারুর কাছ থেকে শুনে বলছে।
তাপস কি তোমায় কিছু বলেছে ?
ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। মনে হলো স্বভাবটা ভালো।
পয়সার মুখ দেখলে সকলের স্বভাব বদলে যায়। আমাকে দেখছ না। তোমাকে আগের মতো আর লেখা-ফেখা দিচ্ছি না।
দাদা আমার দিকে একবার বিরক্তিভরা চোখে তাকাল।
দেখলি দেখলি মল্লিক কি কথা থেকে ও কি কথায় চলে এলো।
মল্লিকদা হেসে ফেললো। ছোটমাও হাসছে।
তোমাকে এ নিয়ে ভেবো না।
আমি ভাবতে চাই না। তোর বড়মাই খোঁচায়, তুমি একটু ওর চাপ নিতে পার না।
ওটা তোমার সঙ্গে বড়মার ব্যাপার, এর মধ্যে আমি ঢুকবো না।
বলেদিস তোর বড়মাকে, আমাকে যেন খ্যাচ খ্যাচ না করে।
কি বলছেরে অনি। বড়মা ঘর থেকে বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।
আমার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তুমি এর মধ্যে ঢুকছো কেন।
এবার দাদাও হসে ফেললো।
মিত্রা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সাজগোজ হয়ে গেছে। ওর দিকে তাকালাম।
এরপর বেরলে আর যাওয়া যাবে না।
তোকে একটা কথা বলবো।
আবার কি হলো ?
জ্যেঠিমনি দিদভাই যেতে চাইছে। ওরা কোনদিন দেখে নি।
সবাইকে মোটামুটি গাওনা গেয়ে দিয়েছিস।
আমি কি করবো বড়মা যদি জিজ্ঞাসা করে।
সত্যবাদী যুধিষ্ঠির।
খেঁচাচ্ছিস কেন।
রেডি হতে বল, যাওয়ার সময় তুলে নিয়ে যাব।
আমি বলে দিয়েছি।
কৃতার্থ করেছ।
বড়মা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পরিপাটি করে সেজেছে। দামী একটা তাঁতের শাড়ি পরেছে।
খুব মাঞ্জা দিয়েছ দেখছি।
দাদা মল্লিকদা হাসলো।
মন্দিরে যাব তাই একটু সেজেছি।
এটা মন্দিরে যাওয়ার সাজ হয়েছে ? বিয়ে বাড়ির সাজটা একবার দেখাবে তো।
তোর বিয়ের সময়েই সেজেছিলাম। তুই এটা পরে যাবি!
তোমরা যখন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে তখন তোমাদের মতো পোষাক পরবো, নাহলে আমি আমার মতো।
তাহলে যাব না।
যেও না। আমি একা চলে যাব।
আচ্ছা দিদি যখন বলছে চেঞ্জ করে নে। মল্লিকদা বললো।
বাধ্য হয়ে চেঞ্জ করলাম। সবাই এক সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। শ্যামবাজারে এসে জ্যেঠিমনিদের তুললাম। ওরা সবাই রেডি হয়েছিল। মিত্রা ইসিকে সামনের সিটে বসতে বললাম মাঝে ছোটমা বড়মা জ্যেঠিমনি। পেছনে আমি পিকু ভজুরাম।
রবীনকে বললাম একটা মিষ্টর দোকান দেখে দাঁড় করাস।
চিত্তরঞ্জন থেকে নিয়ে নাও।
আবার এতটা ঘুরতে হবে।
রাস্তায় যদি আবার পছন্দ মতো না পাই।
ঠিক আছে তাই কর।
অগত্যা আবার গাড়ি ঘুরিয়ে চিত্তরঞ্জনে এলাম। মিষ্টি কেনা হল।
আমার মিষ্টি কেনার ধরন দখে বড়মার চোখ ছানাবড়া।
কিরে এতো মিষ্টি কিনছিস কেন।
তোমার যেনে লাভ।
আমরা খাব না। মিত্রা বলে উঠলো।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
ছাড়োনা মিনু ও যা করছে করতে দাও।
রাস্তায় টুকরো টুকরো কথা খুনসুটি করতে করতে আমরা পৌঁছে গেলাম। বেশিক্ষণ সময় গেল পিকুর পেছনে। ওর প্রশ্নের আর শেষ নেই। আমি যতটা সম্ভব ওর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
মন্দিরে ঢোকবার আগে গৌতমদাকে একবার ফোন করলাম।
আজ উৎসবের দিন চারদিকে বেশ ভিড়। লোক থিক থিক করছে। গৌতমদা যথা সময়ে গাড়ির কাছে এসে হাজির হলেন। গাড়ি রাখার একটা সুবন্দবস্ত করে দিলেন।
আমি সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। গৌতমদা একেবারে গদো গদো। পায়ে পায়ে মন্দিরের দিকে এগোলাম।
বড়মাকে বললাম জানো বড়মা এই একজন মানুষ যার কোন শিষ্য নেই সবাই ভক্ত। তুমি যদি মনে করো তাহলে তুমি ভেবে নিতে পার ইনি তোমার গুরু দেব। নচেৎ নয়। ব্যাপারটা ভাড়ি মজার তাই না।
ওরা আমার কথা শুনে দাঁড়িয়ে পরেছে। ভজুরাম পিকু একটু এগিয়ে গেছে।
দেখো এতো লোক সমাগম হয়েছে আজকের উৎসবে কেউ কিন্তু এনার শিষ্য নন।
অনি ভেতরে চলো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করলে হবে না। ভাতরে গিয়ে বড়মাকে সব দেখাও গল্প করো। গৌতমদা বললো।
আমি কেন ? তুমি আছো। আমি এই মন্দিরের ভক্ত নই।
তাহলে এসেছ কেন।
দুচোখ ভরে মানুষ দেখতে এসেছি। কিসের টানে মানুষ এখানে আসে।
দেখছেন বড়মা, ওর কথা শুনছেন। এই মন্দিরটা যখন তৈরি হচ্ছে। তখন ওইই প্রথম কাগজে হাইলাইট করে। কেন করেছিল ওকে একবার জিজ্ঞাসা করুণ।
এই তুমি পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করলে। চলো খিদে লেগেছে।
আগে বিগ্রহ দর্শন করো তারপর খাওয়া দাওয়া।
আমরা সবাই মন্দিরে এলাম। নাটমন্দিরে লোক গিজ গিজ করছে তিল ধারণের জায়গা নেই। আমরা যেহেতু গেস্ট গৌতমদা ওদের ভেতরের দরজা দিয়ে নিয়ে গেল। আমি বাইরে রইলাম।
শ্বেত পদ্মের ওপর গোমুখাসনে একটা কাঠের তক্তায় হেলান দিয়ে তিনি বসে আছেন। শ্বেতশুভ্র পোষাক। জটাজুট ধারী। কিন্তু চোখ দুটোর মধ্যে অসম্ভব দীপ্তি। আমি বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে বিগ্রহ মূর্তিটা দেখছিলাম। একেবারে একা।
জীবনে একটা মানুষ কতটা কৃচ্ছসাধনা করলে এই জায়গায় পৌঁছতে পারেন তার কথাই ভাবছিলাম।

স্বপ্নে দেখা পীরসাহেবের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। পক্ককেশ শুভ্রবসন। ফর্সা টকটকে রং। শরীর থেকে একটা জ্যোতি বেরিয়ে আসছে। তার চোখ দুটোর মধ্যেও অসম্ভব রকমের দীপ্তি চোখে পরেছিল। অশ্বিনীকাকার মুখ থেকে গল্প শুনেছিলাম। তারপর নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছিলাম। তাই হয়তো ওরকম দেখেছিলাম।
তাঁর কোন ছবি আমি দেখি নি। এনাকে সামনা সামনি দেখছি। কোথাও কোন অমিল খুঁজে পাচ্ছিনা। স্থান কাল পাত্র ভেদে এনারা আলাদা আলাদা বিরাজ করছেন। দুজনেরি মত পথ এক। হিংসা নয় ভালবাসা। মানুষকে ভালবাসা দিয়ে জয় করো, হিংসা দিয়ে নয়।
অনি তুই তাহলে কি করছিস।
কেন, ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।
আমি সত্যের পূজা করছি। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। গীতায় এর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। আমি নিজে কোন অন্যায় করছি না। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করছি।
তোর মনের মধ্যে এতো কন্ট্রাডিক্টরি কেন। মনে হচ্ছে বলিষ্ঠতার অভাব।
দিলে এতো সুন্দর মনটাকে মাটি করে।
নিজে নিজে হাসলাম।
বাবা লোকনাথ। কথাটার অর্থ কি ? যিনি লোকের হিত করেন ? মানে যিনি সাধারণ মানুষের সবসময় ভাল চান ? তিনিই লোকনাথ ? তর্ক বিতর্ক থাকতে পারে। সাদা চোখে এটাই বোঝায়। যখন এই মন্দিরটা নিয়ে লিখেছিলাম, তখন বেশ কিছুদিন ওনার সম্বন্ধে পড়াশুন করেছিলাম। লেখাটা ছাপা হবার পর প্রচুর চিঠি এসেছিল অফিসে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে দেখছি, কাতারে কাতারে মানুষ ভক্তি সহকারে মাথা নোয়াচ্ছেন। প্রত্যেকেরি চোখে মুখে না পাওয়ার যন্ত্রণা স্পষ্ট। সবাই তার মনের আকুতি বিগ্রহের পদযুগলে সমর্পণ করছে। বেশ লাগছিল।
কিরে তুই ভেতরে গেলি না ?
ফিরে তাকালাম। মিত্রা পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
প্রণাম করবি না ?
করেছি।
কোথায় করলি!
মনে মনে।
ওরা সবাই একে একে এলো।
আঙ্কেল আমি দুবার চন্নামিত্ত খেয়েছি।
কেনরে।
কি মিষ্টি।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারবি।
ইসি আমার দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে।
তোরা ঠাকুর ঠাকুর করিস। ওর সঙ্গে ঠাকুরের মানসিক বন্ধনটা একবার চিন্তা কর। তাহলেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি।
তোর গভীরতা দিয়ে তুই সকলকে দেখিস কেন।
গৌতমদা বললো।
ঠিক বলেছো, গৌতমদা মাঝে মাঝে আমার অবস্থানটা আমি নিজেই গুলিয়ে ফেলি।
আগে খেয়ে নে। তারপর ঘুরে ঘুরে বড়মাদের দেখাস।
তুমিকি আমাদের জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা করেছো।
করবো না। ম্যাডাম আজকে আমাদের গেস্ট।
তাহলে ম্যাডামকে নিয়ে যাও।
এইতো, তুই কথাটা শেষ করতে দে।
গৌতমদা হাসছে।
জান বড়মা, গৌতমদা এই মন্দিরের ট্রস্টিবোর্ডের একজন কত্তা।
বড়মা হাসছে।
এই মন্দিরটা হিন্দুদের এটা তুমি নিশ্চই অবিশ্বাস করবে না।
বড়মা মাথা দোলাচ্ছে ওরা আমার দিকে সবাই তাকিয়ে।
মজার ঘটনা কি জান। এই মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের যিনি প্রধান তিনি একজন মুসলমান।
চলতে চলতে বড়মা থেমে গেল, ওরাও সবাই দাঁড়াল।
নিশ্চই আমার কথাটা শুনে শক্ড হলে।
বড়মা আমার দিকে তাকিয়ে।
তুমি ভাবছো অনি কি বলতে চায়।
বড়মার গভীর চোখ আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
না আমি তেমন কিছু বার্তা তোমার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি না। খালি এই টুকু বলবো তোমার মনের মধ্যে যদি কোন বিভেদ না থাকে তাহলে তুমি পরিপূর্ণ মানুষ।
যাঁদের আমরা এখন দেবতা বলে পূজো করি তারা কিন্তু একদিন সাধারণ মানুষ ছিলেন। বলতে পার তোমার আমার মতো গেহস্থ। তাদের জীবনধারা, চাল-চলনে কোন বাঁধন ছিল না। তারা সবখানেতেই বিরাজমান।
জাতপাতের বালাইটা এখন যেমন আছে তখনও ছিল। বরং অনেক বেশি। কোন অংশেই সেটা কম ছিল না। খুব ভালো করে ভেবে দেখবে। যাঁদের আমরা সাধক বলছি। তাদের কিন্তু এই সবের কোন বালাই ছিল না।
কেউ তখন তাঁকে প্রশ্ন করে নি। আপনি কেন ওখানে গেছেন।
আবার কোন পন্ডিত বিজ্ঞজন এসে বলেন নি, আপনি যখন ওখানে গেছেন তখন আপনি সমাজচ্যুত আপনার জাত গেছে।
আর যদি কেউ প্রশ্নও করে থাকে, তিনি ঠিক কি উত্তর দিয়েছিলেন তার সাঙ্গ পাঙ্গরা কেউ সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে যান নি। কেন করেন নি বলতে পারব না। তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনুভব করি তাদের মধ্যে কোন বিভেদ ছিল না।
রামকৃষ্ণের কথা ভাবো। একটা গ্রামের ছেলে। মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াত। তার নিজের খেয়াল খুশি মতো। পৈতের সময় ভিক্ষে মা করলেন একজন নীচু জাতের মেয়েকে। সে নাকি তার ভিক্ষে মা হবে। বাচ্চা ছেলের বায়না। তখনকার সমাজের মাথারা ওই বাচ্চাটার জেদ বলো বায়না বলো মেনে নিল।
তারপর তিনি চলে এলেন পুরুত গিরি করতে কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে। মানুষ দেখলেন। তাদের আচার আচরণ দেখলেন। মাতৃমূর্তি বিগ্রহকে তিনি তাঁর মায়ের আসনে বসালেন। সাধনা করলেন। কিসের সাধনা ?
কথিত আছে তিনি মুসলমান ধর্ম নিয়ে মসজিদে গিয়ে নমাজ পরেছেন। আবার চার্চেও গেছেন। আবার তন্ত্র মন্ত্রের সাধনাও করেছেন। তখনকার দিনের শিক্ষিত ডেঁপো ছেলেরা তাঁকে গিয়ে বিরক্ত করতো। তার মধ্যে বিবেকানন্দও ছিলেন। ছেলেটাকে তিনি ভালবেসে ফেললেন।
বিবেকানন্দ যখন চাচার হোটেলে বসে রুটি দিয়ে গো-মাংসো খেতেন, তখন রামকৃষ্ণের কাছে অনেকে গিয়ে নালিশ করতো, তোমার নরেন চাচার হোটেলে বসে গো মাংস খাচ্ছে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ওর সহ্য হয় তাই খায়, তোর সহ্য হলে তুই খা।
এইসব সাধারণ ব্যাপার গুলো একটু ভাব, দেখবে তিনি অত্যন্ত সাধারণ কথা সাধারণ ভাবে বলেছেন। কিন্তু এর মধ্যেই তাঁর জীবনদর্শনটা উঁকি ঝুঁকি মারছে। এটা নিয়ে কেউ কিন্তু কোনদিন একফোঁটাও ভাবে নি।
বড়মা আমাকে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
জান, এই দিকপাল মানুষগুলো কখনো বলে যান নি, তোমরা আমাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে পূজো করো। আমরা বোকা, তাই আমরা মন্দির বানিয়ে এদের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে দেবতা বানিয়ে দিয়েছি। এঁরা কিন্তু সব সময় তাঁদের কাজের পরিমন্ডলের মধ্যে দিয়ে বলেগেছেন, আমি যে পথের দিশা তোমাদের দেখালাম, তোমরা সেই পথে হেঁটে মানুষের উপকার করো। মানুষের পাশে দাঁড়াও।
আমার একটাই দুঃখ বড়মা, গীতাটা আমরা কেউ ভালো করে মন দিয়ে পড়ি না। কেউ মারা গেলে কিংবা শ্রাদ্ধের সময় শ্রদ্ধা সহকারে দান করি। আর ঠাকুরের সিংহাসনে রেখে দুবেলা ফুল চন্দন সহকারে পূজো করি। কিন্তু গীতাটা যদি আমরা বার বার পড়ি, তার মর্মোদ্ধার করি, তাহলে আমরা সার্থক জীবন রচনা করতে পারি। সেইটা সবচেয়ে বড় পূজো। যিনি ওটা লিপিবদ্ধ করেগেছেন তাঁরও পরিশ্রম সার্থক।
জ্যেঠিমনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পরছে না।
কিগো কি ভাবছো। অনিটা কি পাগল, তাই না।
আমার কথায় জ্যেঠিমনি সম্বিত ফিরে পেল।
তোর কথাগুলো ভাবছিলাম।
আমার কথা! কেন ?
সত্যিতো কথামৃত আমি পড়েছি। লোকনাথ বাবার জীবনী পরেছি। কিন্তু তোর মতো করে ভাবি নি। ভেবেছি বয়স হলে একটু ধম্মেকম্মে মতি হয়, আমারও হয়েছে হয়তো।
আমি বলছিনা তুমি আমার মতো করে ভাব। তবে দেখবে তুমি তাদের দেবতা না মনে করে যদি তোমার ঘরের একজন মেম্বার করে নাও, তাহলে তাদের কাজকর্ম চিনতা ভাবনার তুমিও সামিল হয়ে যাবে। দেবতা ভেবে ফেললেই তার স্থান হয়ে যাবে ঠাকুর ঘরের সিংহাসন। তোমার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে।
তোর সব সময় যুদ্ধং দেহি মনোভাব এতো ভাবিস কখন।
ইসির কথায় চোখ ফেরালাম।
এই জন্য তোর ছুটকি মনে মনে ভীষণ গালাগাল দেয়।
দেখলে বড়মা দেখলে, শেষমেষ সেই আমাকে খোঁচা দিল। মিত্রা বললো।
বড়মা হাসলো। ছোটমা আমার দিকে তখনো তাকিয়ে আছে। আমি মাথাটা ধরে একটু ঝাঁকিয়ে দিলাম।
কিগো অনির কথার ঘোর এখনো কাটে নি। অনি সব সময় খালি বক বক আর বক বক।
ছোটমা চুপ করে আছে। আমি ছোটমাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
খাওয়ার জায়গায় এলাম। গৌতমদা আমাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করেছে। কাছে আসতেই সবার সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। সকলে গদো গদো এই রকম একদল গেস্ট আজকের দিনে উপস্থিত হতে পারে ভাবতে পারে নি।

তৃপ্তি সহকারে সকলে খেল। ওরা সকলেই কম বেশি চেয়ে খেল। নিরামিষ খাবার। বড়মা জ্যেঠিমনি আমার গুণাগুন নিয়ে বিচার বিবেচনা শুরু করে দিয়েছে। আমি শারীরিক ভাবে নাস্তিক কিন্তু মনে মনে প্রবলভাবে আস্তিক।
খাওয়া দাওয়ার শেষে আমি ওদের নিয়ে ঠাকুরের আতুঁড়ঘর, বাসস্থান তার পূজা করা বিগ্রহ ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগলাম টুকরো টুকরো গল্প বলি ওরা অবাক হয়ে শোনে। পায়ে পায়ে আমবাগানে এসে দাঁড়ালাম। ইসি মিত্রা ভজুরাম পুকুরের ধারে গেল যারা বাঁকে করে জল আনছে তাদের জল ঢালা দেখতে।
আমি বড়মার মুখো মুখি দাঁড়ালাম। দুপাশে জ্যেঠিমনি ছোটমা। বড়মার কাঁধে হাত রাখলাম। চোখে চোখ রাখলাম। কোন ভনিতা নয় একে বারে সরাসরি কথা বললাম।
আচ্ছা বড়মা এখান থেকে তোমার বাড়িটা কতোদূর।
বড়মা আমার চোখে চোখ রাখলো।
এ চোখের ভাষা বড়মা পড়ে ফেলেছে। কেন অনি এ কথা বলছে।
জ্যেঠিমনি ছোটমা আমার দিকে তাকিয়ে। চোখে অবাক বিষ্ময়।
বড়মার চোখ জলে টল টল করে উঠলো।
এই মন্দিরে আগে কখনো এসেছো।
বড়মা মাথা দোলাল। না।
এই জায়গায় আগে কখনো এসেছো।
বাবার হাত ধরে একবার এসেছিলাম।
দাদুর শরীর খারাপ। আমি এখান থেকে দাদুর কাছে যাব। উনি তোমার জন্য সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন।
জ্যেঠিমনির চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ছোটমার চোখে কে যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জেলে দিয়েছে।
বড়মা আমার বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
কাঁদলে হবে না বড়মা।
বড়মা আমাকে আরও জোরে জাপ্টে ধরে কেঁদে উঠলো।
এই জায়গায় দেবতাদের মতো অনির চোখ দুটোও পাথরের, একফোঁটাও জল পরবে না। আমি দাদুকে কথা দিয়েছি। তোমাকে নিয়ে যাব।
বাবা আমাকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
উনত্রিশ বছর ধরে যে মানুষটা আত্মীয় স্বজনদের কাছে তার সন্তানের খোঁজ খবর নিয়েছে তার কতটুকু খবর তুমি রেখেছ।
আমি বাবার সম্মান রাখতে পারি নি। বাবার কাছে আমি মৃত।
তবু তুমি তাঁর সন্তান। দাদু দিদা দুজনেই অসুস্থ।
আমি জানি।
জ্যেঠিমনি ছোটমা দুজনেই বড়মার পিঠে হাত রেখেছে। ইসিরা কাছে এসে দাঁড়াল। বড়মার অঝোড়ে কান্নাদেখে প্রথমে একটু অবাক। মিত্রা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেগেছে ঘটনা কি ঘটেছে। আমি নিথরের মতো দাঁড়িয়ে আছি।
আঙ্কেল তুমি দিদাকে বকেছো।
পিকুর দিকে তাকালাম। হাসলাম।
দুষ্টুমি করেছে তাই বকেছি।
বেশ করেছ। মাও আমাকে বকে।
বড়মা আমার বুক থেকে মুখ তুলে পিকুর দিকে তাকাল। চোখ ছলছলে। তবু হেসে ফেললো।
আমি ওদের কছা থেকে একটু দূরে সরে এলাম। গৌতমদাকে একটা ফোন করলাম। অনুরোধ করলাম, আমার জন্য যদি একটুপ্রসাদ প্যাক করে দাও খুব ভালো হয়। আমরা বেরিয়ে যাব। গৌতমদা কথা রেখেছিল। কিচুক্ষণের মধ্যে নিজে গাড়ির সামনে এসে প্রসাদ দিয়ে গেল।
গাড়িতে ওঠার সময় বড়মা বললো তুই আমার পাসে এসে বোস।
আমি বড়মার দিকে একবার তাকালাম। বড়মা জ্যেঠিমনির মাঝে চাপাচাপি করে বসলাম। বড়মা আমার হাতটা চেপে ধরে আছে। কারুর মুখে কোন কথা নেই। রবীনকে বললাম সামনে একটা চৌমাথা পরবে ওখানে গিয়ে গাড়িটাকে ডানদিকে টার্ণ করবি।
বড়মা আমার কাঁধে মাথা রেখেছে। আর একদিকে জ্যেঠিমনিও আমার কাঁধে মাথা রেখেছে। বুঝতে পারছি এদের ভেতরকার টেনসন। দুজনেরি ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। উনত্রিশ বছর আগের একটা দিন।
দাদা এই রাস্তায়।
হ্যাঁ। মিত্রা।
বল।
চিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবি।
মিত্রা পেছন ফিরে চোখের ইশারায় আমাকে বললো পারব।
বড়মা ছোটমা দুজনেই আমার হাতটা আরও জোড়ে চেপে ধরেছে। ছোটমার মুখটা থম থমে। ইসি সব বুঝেও যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
ফোনটা পকেট থেকে বারকরলাম। হ্যাঁ শোনো আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি মিনিট তিনেক লাগবে পৌঁছতে।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
তোমরা দুজনে বৃথা টেনসন করছো।
জ্যেঠিমনির বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের কোল দুটো এখনো চিক চিক করছে।
ইসি পেছন ফিরে তাকাল। মুখটা থম থমে। পেছনে পিকু ভজুরাম তাদের মতো করে মত্ত।
গাড়িটা আমবাগানের ভেতর দিয়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। বড়মা জ্যেঠিমনি মাথা নীচু করে আছে। সামনের ভিউংগ্লাস দিয়ে পরিষ্কার দেখতে পেলাম বরুণদা মামীমা দাঁড়িয়ে। ইসি পেছন ফিরে আমার দিকে একবার তাকাল। মুখে হাসি।
গাড়ি থেকে ওরা নামতেই বরুণদা হাতজোড় করে ইসি মিত্রাকে সম্বোধন করলো।
তুমি এখানে! বললে অফিসে যাচ্ছি।
মাফ করবেন ম্যাডাম আজ আমার এখানে ডিউটি।
মিত্রা খিল খিল করে হাসলো। ইসি অবাক চোখে বরুণদার দিকে তাকাল। পিকু বাবা বাবা করতে করতে পেছন থেকে দুরদার করে ছুটে নামল। বড়মা ছোটমা জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ভাবলেশহীন মুখে জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে বললাম এবার নামতে হবে।
বরুণদা গেট খুললো।
জ্যেঠিমনি বরুণদার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে।
আসুন।
জ্যেঠিমনির মুখে কোন কথা নেই।
আস্তে আস্তে সবাই নেমে এলাম জ্যেঠিমনি বড়মা শক্তকরে আমার হাতটা চেপে ধরেছে। চারিদিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। হয়তো উনত্রিশ বছরের আগেকার কোন একটা ছবি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
মামীমার সঙ্গে সকলের পরিচয় করিয়ে দিলাম। বড়মার একমাত্র ভাইয়ের স্ত্রী।
মামা কোথায় মামীমা ?
তোর মামা আর সানা চৌমহিনীতে গেল। বললো দেখি ওরা আসছে কিনা।
বিতান।
সবাইকে ডাকতে গেছে তোর সঙ্গে আলাপ করাবে।
আমরা গেট পেরিয়ে ভেতরের বাগানে এলাম। তিন মহল্লা বাড়ি। রাজা আছেন কিন্তু সেই রাজবাড়ি আর নেই। নেই তার আভিজাত্য। চারিদিকে দীর্ণতার চিহ্ন স্পষ্ট। শরীরের পলেস্তরা খোসে পড়েছে। তবু পূজার মন্দিরটা ঠিক আছে।
বছর বছর পূজো হয়। তাই পরিষ্কার হয় রং হয়।
ইসি মিত্রা সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। আর একবার করে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
দাদুকে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম। দাদু সংক্ষেপে বলেছিলেন, বছরে একবার এই পরিবারের সব আত্মীয় স্বজন একত্রে মিলিত হন। হৈ হুল্লোড় চলে। পাঁচটা দিন বেশ ভাল কাটে। তখন বোঝা যায় এই বাড়ির আভিজাত্য এক সময় ছিল। দাদু কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন।
তুই এতো সব জানলি কি করে।
বই পড়ে।
আর আমার এক কলেজের বন্ধু ছিলো হাটখোলা দত্ত ফ্যামিলির তাদের দুর্গা পূজোয় একবছর উপস্থিত ছিলাম।
তুই এইসব নিয়ে খুব ঘাঁটা ঘাঁটি করিস না।
ঠিক তা নয়, আমার পুরনো জিনিষ নিয়ে ঘাঁটা ঘাঁটি করতে বেশ ভালো লাগে।
আমাদের এই পূজোটার বয়স প্রায় আড়াইশো বছর পার হয়ে গেছে। তখন এই তল্লাটে একটাই পূজো ছিল। আমার দাদুর মুখ থেকে শুনেছিলাম তখন খুব জাঁক যমক করে পূজ হতো। বলি-টলি হতো। এখন সে সব বন্ধ হয়ে গেছে।
বড়মা জ্যেঠিমনি আমার দুহাত দুজনে এখনও শক্ত করে ধরে।
দাদু তোমায় বকবে না, এবার হাতটা ছাড়।
বড়মা হাসলো। এই হাসির মধ্যে প্রাণ নেই। মুখটা ভয়ে পাংশু।
এখনো এতো ভয় পাও। তখন তাহলে এতটা সাহস দেখালে কি করে।
বড়মা মাথা নীচু করে রইলো।
আমি মামীমার দিকে তাকালাম।
তোমার বৌমাকে চিনতে পেরেছ।
মামীমা মিত্রাকে জড়িয়ে ধরলো।
ইসির দিকে ইসারা করে বললাম এটা নয় কেন।
মামীমা ফিক করে হাসলো, তোকে পরে বলবো।
বড়মার দিকে তাকালাম যাও তোমাদের দুর্গামন্দিরটা এদের সবাইকে নিয়ে একবার ঘুরে এসো। তোমার অনেক স্মৃতি ওখানে গচ্ছিত আছে।
চলুন দিদিভাই।

মামীমা বড়মার হাতটা চেপে ধরলো।
তুই চল।
বড়মা আমার হাতটা ছাড়লো না।
তুমি জ্যেঠিমনিকে চিনতে পেরেছ।
মামীমা মাথা দুলিয়ে মুখ নীচু করলো।
দিদি বলছে যখন চল। মামীমা বললো।
বড়মার বাড়ি, নিজে সবাইকে ঘুরে ঘুরে দেখাক।
বিতানরা সবাই হৈ হৈ করতে করতে এসে ঢুকে পরলো। আমায় ঘিরে ধরলো। বড়মারা তখন দুর্গামন্দিরের শিঁড়ি দিয়ে উঠছে।
পিসিমনি কই অনিদা।
খুঁজে নে।
এটা তুমি সট্টিয়ালি করছো। তোমার সঙ্গে এই চুক্তি ছিল না।
ইসি মিত্রা ওইখান থেকেই শব্দ করে হেসে উঠলো।
ঠিক আছে মার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি। বৌদি কোনটা বলো।
দুটোই।
বরুণদা তুমি বলো এটা ঠিক হচ্ছে।
একবারেই না।
বিতান একবার আমার দিকে একবার বরুণদার দিকে তাকাচ্ছে।
সামনের লনটায় আমরা দাঁড়িয়ে বড়মারা সব দুর্গামন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
বিতান হুড়মুড় করে ওদের কাছে চলে গেল। ওর পেছন পেছন ওর বন্ধুরা।
বরুণদার দিকে তাকালাম।
সব ঠিক আছে ?
হ্যাঁ।
ওপরে কে আছে।
জ্যেঠু, জ্যেঠি, আরও দু’চারজন আত্মীয়। সকলকে তো চিনি না। সবেমাত্র চিনতে শুরু করেছি। মা সকলকে কম বেশি চেনে, মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
তাই। ভালো করেছো।
সত্যি তুমি গ্রেট।
কেন এ কথা বলছো।
আমাদের পারিবারিক দ্বন্দের পরিসমাপ্তি ঘটালে। আবার সবাইকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এলে।
একচ্যুয়েলি কি জানো বরুণদা আমি ঘটকের রোলটা প্লে করছি। আর এটাই বোঝাতে চাইছি। পৃথিবীটা খুব ছোট। তুমি তাকে হাতের মুঠোয় পেতেই পারো।
নাট মন্দিরে হৈ হৈ চলছে। মজা লুটে নিচ্ছে পিকু ভজুরাম।
একটা বাইক এসে পাশে দাঁড়াল। সানা নেমেই আমাকে চোটপাট করতে শুরু করলো।
এটা কি হলো অনিদা।
আমি কি করলাম।
তুমি ফোন করবে বলেছিলে।
পরিবেশ পরিস্থিতি পারমিট করেনি।
মামা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। সানা নাটমন্দিরের দিকে দৌড় লাগাল। মামা পেছন পেছন গেলো।
আবার একচোট ভাইবোনে জড়াজড়ি করে কান্নাকাটি হলো। আমি এখান থেকেই লক্ষ্য করছি।
বরুণদা তুমি ওদের নিয়ে ওপরে যাও আমি একটু আসছি।
কোথায় যাবে!
অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি। এই ফাঁকে একটা খেয়ে নিই।
বরুণদা হাসলো।
তারাতারি, জ্যেঠু কিন্তু তোমাকে খুঁজছে।
ধ্যুস তুমি কি পাগল হয়েছো। মেয়েকে এনে হাজির করে দিয়েছি। এখন অনি আমের আঁটি।
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
রবীন এগিয়ে এলো।
দাদা এগুলো নামাবে না।
অপেক্ষা কর।
সিগারেট বার করে ধরালাম। সবে মাত্র সুখ টান দিয়েছি। মিত্রা ইসি এসে হাজির। পেছন পেছন বিতান ওর বন্ধুরা সানা।
তুমি আচ্ছা লোক। বিতান বললো।
কেনরে।
সবাইকে ভিড়িয়ে দিয়ে ফুটে এলে।
সকাল থেকে সিগারেট খাওয়া হয় নি। খাবি।
যাঃ বৌদিরা আছে।
ও কিছু হবে না।
তুই চল। মিত্রা বললো।
বিতানরা সবাই আমাদের দুজনের দিকে চমকে তাকাল।
তুমি মাইরি সত্যি। অনেক হেদিয়েছো। এবার তুইটা ছাড়ো।
সানা ইসি খিল খিল করে উঠলো।
বিতান ওর বন্ধুদের সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিল। সবাই কম বেশি পড়াশুন করছে। কেউ এমবিএ পরছে কেউ চ্যার্টার পরছে কেউ ইঞ্জিনীয়ারিং পরছে। কেউ হেদি-পেদি নয়।
একটু পরে আমার বন্ধুরা আসবে। সানা বললো।
দু’একটা পাবো ?
খারাপ হয়ে যাবে অনিদা, বৌদি আছে।
তা থাক সাইড লাইনে বসিয়ে রাখব।
ঠিক আছ তোমাকে তিনপিস দেখাব একটা পছন্দ করে নিও।
ঝাক্কাস।
একেবারে ঝাক্কাস।
মিত্রা হাসছে।
বরুণদা গেটের মুখে এসে দাঁড়াল।
অনি জ্যেঠু তোমায় ডাকছে।
সত্যি বুড়ো বহুত ঘাঘু মাল।
ওরা আমার কথায় হাসা হাসি করছে।
বিতান।
বলো।
গাড়ির পেছন দিকে কিছু মাল পত্র আছে ধরাধরি করে একটু ওপরে নিয়ে যা।
ফেলনা সিগারেটটা। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
শেষটান। মনে আছে সেই ডায়লগটা।
হ্যাঁ মনে আছে, কচি মেয়েকে চুমু খাওয়া।
আঃ ছুটকি।
বিতানের বন্ধুরা হাসছে।
পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম।
কি ইসি ম্যাডাম শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচয় হলো।
সামান্য। ইসি লজ্জা পেয়েগেল।
কোথা থেকে কি হয়েগেল তাই না।
ইসি ঘাড় নারছে।
তুই এতো সব জানলি কি করে ?
তোর বরুণদা এখনো পর্যন্ত আমাকে কিছু বলেনি। তুই জানতিস ছুটকি।
না।
জানো না বৌদি অনিদা একটা বিষ মাল। প্রথম যেদিন এসেছিল। সেই ঘটনা তোমায় যদি বলি হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে। বিতান বেশ রসিয়ে রসিয়ে বললো।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। ভাবটা এরকম তোকে আমার থেকে বেশি কে চেনে বল।
তারপর আস্তে আস্তে খাপ খুললো।
প্রথমে তো পরিচয় জানতাম না। আমি সানা চেটে পরিষ্কার করে দিলাম।
সেদিন সানার কয়েকজন বন্ধুও ছিল।
দাঁড়াওনা একটু পরে আসবে। তারপর তোমার হবে।
সানা চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
তারপর একটু একটু করে খাপ খুলতে শুরু করলো। শেষে দাদুর মতো স্ট্রং মেন্টালিটির মানুষকে পর্যন্ত পটকে দিল। সেই থেকে দাদু দিনে অন্ততঃ দশবার অনিদার খোঁজ নেবে। একবার কথা বলিয়ে দিতে হবে। ব্যাশ শান্তি। নাহলে ঘ্যানর ঘ্যানর।
বাতেলা কম কর।
সবাই হেসে ফেললো।
ওপরের ঘরে এলাম। দাদু বিছানায় শুয়ে। শরীরটা বিছানার সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। গায়ের রং চোখ মুখ দেখলে মনে হয় একসময় যথেষ্ট রাশভারি লোক ছিলেন। এই তল্লাটের জমিদার বলে কথা। এখনো অনেকে দাদুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।
থম থমে পরিবেশ। দাদুর মাথার শিয়রের একপাশে বড়মা। আর একপাশে দিদা। পায়ের কাছে জ্যেঠিমনি ছোটমা চেয়ারে একজন বসে আছেন চিনতে পারলাম না।
আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ফোকলা দাঁতে দাদু হাসলো। উঠে বসার চেষ্টা করলো।
একবারে না।
আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।
দাদু কাঁপা কাঁপা হাতে আমার মাথায় হাত রাখলো।
কিগো মেয়ে পেলে।
দাদু হাসলো।

এবার আমার বকশিস।
নাতবৌকে যে দিলাম।
বড়মা হেসে ফেললো।
নাতবৌকে দেখেছ।
দাদু মাথা দোলাল।
তুই আমাকে উঠে বসা।
তোমার জন্য অনিদা পেঁড়া এনেছে। বিতান চেঁচিয়ে উঠলো।
দাদু হাত বাড়াল।
কিগো তুমি থম মেরে বসে আছো কেন।
দিদার দিকে তাকালাম।
দিদা হাসলো।
তুইতো আমাকে এই খবরটা দিস নি।
খবর তৈরি হোক তবে না দেব।
বড়োবৌ ও ভীষণ চালাক নিজের গোছান না হলে কিছু দেয় না।
আমি দাদুকে আস্তে করে বুকে জড়িয়ে উঠে বসালাম। বড়মা বালিশগুলো পেছনদিকে খাঁড়া করে দিল।
তোমাকে যে বলেছিলাম বিকেল বেলা প্রতিদিন একটু একটু করে হাঁটবে।
সানা ধরে না।
দাঁড়াও বুড়ো কাল থেকে তোমাকে ধরবো না। অনিদার কাছে নালিশ হচ্ছে। সানা খড় খড় করে উঠলো।
দাদু হাসছে।
দিনু এসেছিল, তোর খোঁজ করছিল তুই তখন কলকাতায় ছিলি না।
কোথায় গেছিল জিজ্ঞাসা করো।
বড়মা দাদুর দিকে তাকাল।
কেন তোকে বলে নি।
বড়মা মাথা দোলালো।
এর মধ্যে একদিন ও নিজে এসেছিল। আর একদিন বরুণকে নিয়ে এসেছিল।
এখানে এসে সেটা জানলাম।
দিদা এসেছে শুনলাম, কোথায়।
কথা ঘোরাচ্ছিস কেন। বড়মা বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকাল।
আমি হাসলাম।
বৌমার সঙ্গে রান্নাঘরে গেল। ওকে দেখেছিস আগে ? দাদু বললো।
না।
ও মিনুর পিসতোতো বোন। টাকিতে থাকে।
আমি গিয়ে প্রণাম করলাম। নিয়ম মোতাবেক সবাইকে পায়ে হাত দিতে হলো।
মামীমা চায়ের প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলো। বরুণদার মাও এলেন।
তুই আজ সকালে কি গন্ডগোল করেছিস।
বরুণদার মার দিকে তাকালাম।
কে বোললো।
বরুণ।
ইসি এগিয়ে গিয়ে শ্বাশুরীর হাত থেকে চায়ের ট্রেটা নিল।
বরুণদা কিছু জানে না।
বড়মা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসল।
কেন তুই গন্ডগোল করিস। দাদু বোললো।
চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলাম।
আজ এখানে থাকতে হবে। মামীমা বললো।
খেপেছো। কতো কাজ আছে জান।
তোর ওই একটা অছিলা।
আমায় বাদ দিয়ে এরা যদি থাকে আমার আপত্তি নেই।
বড়মা হাসছে।
বরুণদা তুমি কি তাপসকে নিয়ে এসেছো।
হ্যাঁ।
ওকে দেখছি না।
বললো বসিরহাটে ওর কে আত্মীয় আছে দেখা করতে গেছে।
বড়মা দাদুকে চা বিস্কুট খাইয়ে দিল। ছোটমা, জ্যেঠিমনি চুপচাপ বসে বসে দেখছে।
আনিদা চলো তোমার সঙ্গে পার্সোনাল টকটা এবার সেরে নিই। বিতান বললো।
এখুনি!
নাহলে তুমি হুট করে বলে বসবে, আজ যাই কাল সকালে আসছি।
দেখেছিস তোর ব্যাপারটা সকলে জেনে ফেলেছে। মিত্রা বললো।
তুই খুশী।
ভীষণ খুশী।
আমাকে সবাই তোর মতো করে বুঝতে পেরেছে, তাই না।
দেখছো বড়মা ও কিরকম অন্য দিকে চলে যাচ্ছে।
ছাড়ো বৌদি তুমি এতো দিনেও অনিদাকে চিনতে পারলে না। বাড়ি থেকে যখন বেরবে বলবে পশ্চিমদিকে যাচ্ছি। দেখবে দক্ষিণে গিয়ে হাজির হয়েছে।
মিত্রা চায়ে চুমুক দিতে দিতে হাসছে।
কি খাবি।
মামীমা আমার দিকে তাকাল।
এইতো চা খাচ্ছি ব্যাশ।
তাহলে ওগুলো নিয়ে এসেছিস কেন।
বড়মার হুকুম।
দিদি কি জানতো তুই এখানে আসবি।
মিত্রা চায়ের কাপটা খাটে রেখে হাততালি দিয়ে উঠলো।
জবাবটা দে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। হাসলাম, বিতানদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
অনেকক্ষণ বিতানদের সঙ্গে কথা বললাম। ওদের অনেক গুলো আর্জি আমার কাছে। তার মধ্যে ওর দুই বন্ধুর লেখার সখ আছে, তাদের একটু ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
ভাঙা বারান্দা দিয়ে নিচের দিকে তাকালাম। দেখলাম বেশ কয়েকটা মেয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। একবার ওপরের দিকে তাকাল।
বিতানদা সানা কই।
ওপরে চলে এসো পেয়ে যাবে।
এগুলো সানার বন্ধু ?
সব তোমার ফ্যান।
কেন।
তোমার লেখা পড়তে ভালবাসে। জান অনিদা এখন আমার রেলাটা আগের থেকে বেড়ে গেছে।
কেন ?
আগে সকলকে তোমার কথা টুকটাক বলতাম। অনি ব্যানার্জী আমাদের আত্মীয়। তখন ওরা প্যাঁক দিত, কথায় কথায় চ্যালেঞ্জ করতো, একবার নিয়ে চল। পারতাম না। তখন তোমাকে পাই নি।
হাসলাম।
এখন ?
সবাইকে মুখে ঝামা ঘসে দিয়েছি।
বেশ করেছিস।
ওর বন্ধুরাও আমার সঙ্গে কথা বলছে। সবারই এক কথা আপনি এইরকম লেখেন কি করে। আমাদের এখানে আপনাদের কাগজের আরও দু’তিনজন করেসপন্ডেন্স আছে তাদের আপনার কথা বলেছি। বলার পরই ওরা কেমন টেরিয়ে টেরিয়ে তাকায়।
ওরা কথা বলছে আমার বেশ মজা লাগছে। আমার ফ্লেভারটা ওরা বেশ উপভোগ করছে।
সানা ওর বন্ধুদের নিয়ে এলো।
একপ্রস্থ তাদের সঙ্গেও হলো। এক একজনকে একটু আধটু কথার চিমটি দিলাম। দু’একজনের সঙ্গে দেখলাম বিতানের বন্ধুদের সঙ্গেও বেশ ভালো আলাপ। আমাদের হৈ হট্টগোলে জ্যেঠিমনি একবার উঁকি মেরে গেল।
ওদের কতো প্রশ্ন।
আপনি যে এইভাবে লেখেন, স্পটে যান ? আপনার ভয় করে না ? আপনার সঙ্গে এতো লোকের আলাপ কি করে হলো ?
আমি ওদের সঙ্গে হাল্কা খেজুরে আলাপের ভঙ্গিতে গল্প করলাম বেশ কিছুক্ষণ। আমার কথাবলার ধরণ ধারনে ওদের ডাগর চোখে বিষ্ময়।
মামীমা হাত ধরে হির হির করে টেনে নিয়ে এলো। দেখলাম লুচি আলুভাজা বানানো হয়েছে। সঙ্গে আমার আনা মিষ্টি। বড়মা দাদুকে একটা রসোগোল্লা ভেঙে ভেঙে খাওয়াচ্ছে। দাদু আমার দিকে তকিয়ে হাসলো।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আমাকে এইবার কাটতে হবে। এদের হাবভাব বলছে আজকে এখান থেকে এরা নড়বে না। খেতে খেতে দুচারটে আওয়াজ দিলাম তাতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। বড়মারা আজ থাকছে। তাপসকে একটা ফোন লাগালাম
কোথায় আছিস ?
তুমি কোথায় ?
তুই যেখানে বরুণদাকে নিয়ে এসেছিস আমি সেখানে।
তাই।
হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি আয় আমি কলকাতায় ফিরবো।
কাছাকাছি চলে এসেছি।

ঠিক আছে।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ফোনটা পকেটে রাখলাম।
সত্যি তুই চলে যাবি।
আবার কাল না হয় আসা যাবে।
হয়েছে থাক। সানা আধো আধো গলায় বললো।
বিশ্বাস কর। তোর বৌদি কিন্তু মাঝে মাঝে ঠকে যায়।
মিত্রা হাসছে।
দাদুর দিকে তাকালাম।
দাদার সঙ্গে কথা বলেছ।
দাদু মাথা দোলাল।
এখানে আসার কথা বলেছ।
দাদু হাসলো।
কি বললো দাদা।
আসবে বলেছে।
তাহলে আমার কাজ শেষ। আমে দুধে মিশে গেছে এবার আঁটি গড়া গড়ি।
বড়মা হাতটা বাড়াল, আমার কানের নাগাল পেল না।
আমি ধরবো। মিত্রা বলে উঠলো।
ধ্যাৎ। ছোটমা বললো।
প্রক্সি। বড়মার মায়ার শরীর।
বড়মা চোখ পাকিয়ে মিত্রার দিকে তাকাল।
আমার খাওয়া শেষ। প্লেটটা নিচে নামিয়ে রেখে হাতটা প্যান্টেই মুছলাম।
মিত্রা কট কট করে আমার দিকে তাকাল।
বড়মা তোমরা তাহলে থাক। আমি কাল সকালে আবার আসছি।
চা করেছি। খেয়ে যা।
মামীমা বললো।
তারাতারি।
কি রাজকার্যে যাবি।
সে তুমি বুঝবে না।
কাল সত্যি আসবি।
আসবো।
তাপস চলে এসেছে। ওর জন্য খাবার পাঠান হলো। আমি চা খেয়ে নিচে নেমে এলাম। মিত্রা, ইসি, বিতান, সানা ওদের বন্ধুরা নিচে নেমে এলো।
কাল কখন আসবি।
বলতে পারছি না। তবে চলে আসবো। রবীন কাছে এগিয়ে এলো। ওকে বললাম আজ রাতটা এখানে থেকে যা।
রবীন চুপ করে রইলো।
সবার সঙ্গেই একটু ইয়ার্কি ফাজলাম মারলাম। বারান্দার দিকে একবার তাকালাম। দেখলাম সবাই দাঁড়িয়ে আছে। দাদু দিদাকে দেখতে পেলাম না। হাত নাড়লাম।
গাড়িতে উঠে তাপসকে বললাম, চল।
তাপস গাড়ি স্টার্ট করে বেরিয়ে এলো।
আমি পেছনের সিটে বসেছি। বড় রাস্তায় উঠে তাপসকে বললাম, কলকাতা যেতে কতক্ষণ লাগবে।
ঘন্টা দুয়েক।
তার মানে রাত নটার মধ্যে পৌঁছে যাব কি বলিস।
হ্যাঁ।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে বেশ কয়েকটা ফোন করলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা। হেডলাইটের আলোয় যতটুকু রাস্তা আলোকিত করে রেখেছে ততটুকু দেখতে পাচ্ছি। দুপাশের মাঠ ঘাট সব নিশ্চিদ্র অন্ধকারে ডুবে আছে। তাপস ডিপার করে করে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। হাল্কা করে রবীন্দ্রসংগীত চালিয়েছে দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে।
সত্যি ছেলেটার রুচি আছে।
দূর থেকে দেখতে পেলাম একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে। যতো কাছে আসছে বুঝতে পারলাম এটা ছোটো গাড়ি নয়। বড়ো গাড়ি। তাপস ডিপার করা শুরু করলো। কিন্তু গাড়িটা কিছুতেই সেই সিগন্যালের গুরুত্ব দিলো না।
মনে হচ্ছে গাড়িটা যেন আমাদের ঘাড়ে এসে পরছে। তাপস গাড়িটা স্লো করে দিল। প্রচন্ড জোড়ে একটা গালাগালি দিয়ে উঠলো। পর মুহূর্তেই একটা দড়াম করে আওয়াজ হলো। একটা প্রবল ঝাঁকুনি। আমার মাথাটা জানলায় সজোরে ধাক্কাখেল। চোখ মুখ অন্ধকার দেখলাম। অসহ্য যন্ত্রণা সারাটা শরীরে ছড়িয়ে পরলো। আমি যেন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে আরো গভীরে।

প্রথমখন্ড সমাপ্ত এরপর দ্বিতীয় খন্ড

One thought on “দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 34)

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s