দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 33)


কিরে বসে থাকলে হবে। সকালথেকে গোটা চারেক লুচি খেলি, যা স্নান সেরে নে। বৌদি বললো।
একটু চা খাওয়াবে।
না হবে না ভাগ। ছোটমা বললো।
আমি করে নিয়ে আসবো ছোটমা। মিলি বললো।
ছোটমা হাসলো।
যা নিয়ে আয়। আর টনার বৌটাকে ডেকে দে।
টনার বৌ এসেছে ?
সকাল থেকে হত্যে দিয়ে পরে আছে। অনিদার সঙ্গে দেখা না করে যাবে না। বড়মা বললো।
একা না আর কেউ আছে।

পাঁচ সাতজন আছে।
আমি খাট থেকে নেমে এলাম। টেবিলের কাছে গিয়ে মোবাইলটা নিলাম।
কনিষ্ককে ফোন করবি তো ? মিত্রা বললো।
হ্যাঁ।
ওরা ভাল আছে। তুই উঠলে আমাকে ফোন করতে বলেছে। তাহলে আসবে।
সকালে বলছিল, শ্যামেরা এসেছে।
সেটাও মাথায় আছে। ছোটমা বললো।
হাসলাম।
তোর বায়োডাটা এখনো অসম্পূর্ণ, এবার পুরোটা দিস।
মাথা নীচু করে থাকলাম।
বাপের জন্মে এরকম ছেলে দেখিনি।
আমি মুখ তুলে ছোটমার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আর হাসিস নি।
দেখো ইসি কেমন ভাবে আমাকে দেখছে। কি ভাবছে বলো তো।
ভাবাভাবির কিছু নেই। দুদিনে ও আমাদের মতো সেগুনকাঠ হয়ে গেছে। তাও তোর দু-আনা দেখেছে। আর একজনকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারাতে হচ্ছে।
টনার বৌ মালতী ঘরে ঢুকলো। কোলে মাস সাতেকের বাচ্চা। চোখ ছল ছলে। ওর পেছন পেছন আরও চার পাঁচ জন। ওদের আমি দেখেছি নাম জানি না।
আমি এগিয়ে গেলাম। মিলি চায়ের পট নিয়ে ঘরে ঢুকলো। ওরা যে যার আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
থাক থাক। টনাকে দেখেছিস।
মালতী কাঁদছে।
আমি বাচ্চাটার মাথায় হাত দিলাম। নরম তুলতুলে মাথাটা, আমার স্পর্শ পেয়ে নড়ে উঠলো। পিট পিট করে তাকাচ্ছে। আমার পাশে মিত্রা, ইসি, ছোটমা, বড়মা, বৌদি।
টনাকে দেখেছিস।
মালতী ঘাড় দোলালো।
ঠিক হয়ে যাবে। কাঁদিস না।
বাচ্চাটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
এটা ছেলে না মেয়ে।
ছেলে।
বাঃ।
তুমি ওকে একটু কোলে নাও।
দাঁড়া বাবু হয়ে বসি। না হলে নিতে পারবো না।
আমি মাটিতে বসলাম। মালতী আমার কোলে বাচ্চাটাকে দিল। বেশ গোল গাল। টনার মতো গায়ের রং কালো। চক চক করছে।
কনিষ্কদা ইঞ্জেকসন দিয়েছে।
দুটো দিয়েছে। আবার আগামী মাসে যেতে বলেছে।
নিয়ম করে ইঞ্জেকসন দিবি।
আমার কি হবে অনিদা।
সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি টনার বৌ-এর মাথায় হাত রাখলাম।
বাচ্চাটা আমার কোলে ভীষণ নড়া চড়া করছে। আমি ঠিক মতো ম্যানেজ করতে পারছিনা। ইসি মিত্রা আমার রকম সকম দেখে হাসছে। তারপর দেখলাম কেমন ভিঁজে ভিঁজে লাগছে।
ও মালতী দেখ দেখ ব্যাটা মনে হয় পেচ্ছাপ করলো। কেমন কেমন লাগছে।
ইসি, মিত্রা, মিলি জোরে হেসে উঠলো।
বাচ্চাটা চোখ বড়ো বড়ো করে চারদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে।
মালতী আমার কোল থেকে বাচ্চাটাকে তুললো। সত্যি ব্যাটা আমার কোলে মুতে দিয়েছে। পাঞ্জাবী কুর্তা ভিঁজে একসা হয়ে গেছে।
খেয়েছিস।
মালতী মাথা দোলালো।
বাড়ি যাবি কি করে।
ভক্তা এসেছে।
মনার বৌ আসে নি।
ও পোয়াতি। অনিকেতদা এখন বেরতে বারণ করেছে।
যা নিচে যা। আমি স্নান সেরে যাচ্ছি।
ওরা নিচে চলে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। মিত্রা, ইসি, মিলি আমাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে। ছোটমা, বড়মা, বৌদির চোখে বিষ্ময়।
দাও চা দাও। খেয়ে বাথরুমে যাব।
দিলো মুতে তোর গায়ে। মিত্রা বললো।
এরকম অনেক বাচ্চাই মোতে, আবার গায়েই শুকিয়ে যায়।
তারমানে!
তিনজনে একসঙ্গে বলে উঠলো।
আমি হাসলাম, চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
তোর কটা বাচ্চা আছে।
বুঝবে না।
দেখ ছোট এই টুকুর জন্য ওরা সকাল থেকে বসে আছে। বৌদি বললো।
নাগো বৌদি ঠিক তা নয়। ওরা ঋণ শোধ করতে জানে। আর একটা সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার ওরা বেইমান না। ওরা উপকারীর উপকারটা স্বীকার করে। ওরা যে অশিক্ষিত।
ইসি আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
তুই ওদের ওখানে কখন যাস।
ঠিক নেই মন খারাপ হলে যাই। বলতে পার ওদের ওখানটা আমার এনটারটেনমেন্টের জায়গা। ওদের সঙ্গে কথা বললে মন ভালো হয়ে যায়।
বৌদি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বড়মার চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।
মিত্রা।
বড়মার ডাকে মিত্রা ফিরে তাকাল।
ওকে ইসির আনা পাজামা পাঞ্জাবীটা বার করে দে।
আবার নতুন!
ভালো লাগছেনা বল। মিত্রা ফুট কাটল।
ইসি হাসছে।
অনিকে ঠিক নতুন জামা কাপরে মানায় না, তাই না।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আয় তাড়াতাড়ি, ওরা আবার এসে পরবে। বড়মা বললো।
আবার কারা আসবে ?
তোর অনিমেষদা, তার সাঙ্গ পাঙ্গ। তুই তো ওদের ভাবিয়ে তুলেছিস। বৌদি বললো।
তুমি বিশ্বাস করো।
বিশ্বাস করতাম না। এখন সব শুনে বিশ্বাস করতে হচ্ছে।
সুরো কোথায় ?
কলেজে গেছে। এসে খাবে।
ওকে একবার ফোন করে দাও।
তুই রেডি হ। চলে আসবে।
ওরা চলে গেল, আমি টাওয়েলটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। শরীরটা এখন বেশ ঝড়ে ঝড়ে লাগছে। ভালো করে স্নান করলাম। বার বার টনা মনার মুখটা ভেসে আসছে। মালতীর মুখটা ভেসে উঠছে। বাচ্চাটার মুখ চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে। আমি যখন বাচ্চাটাকে কোলে নিলাম তখন মিত্রার মুখটা লক্ষ করছিলাম। কি পরিতৃপ্ত মুখ। মা হওয়ার জন্য কতটা উদগ্রীব। আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়েছিল আমিই লজ্জা পেয়ে গেছি। সবার চোখ এড়ালেও ছোটমার চোখ এড়াতে পারি নি।
মালতী বাচ্চাটাকে যত্ন করে। তাছাড়া ওরা প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত। ওদের ওখানে গিয়ে বেশ কয়েকবার দেখেছি, দুধের বাচ্চা গুলোকে চপচপে করে তেল মাখিয়ে রোদে ফেলে রাখে। ওদের কাছে অলিভ অয়েল স্বপ্ন। ঘানিতে ভাঙা কাদানি সরষের তেল ভাল করে মাখিয়ে ফেলে রেখে দিল। মালতীর বাচ্চাটা হাসপাতালে হয়েছে। নীরু কনিষ্ক ছিল। হওয়ার পর আমাকে ফোন করেছিল।
কিরে আরও কতো সময় লাগবে। মিত্রার গলা।
দাঁড়া বেরচ্ছি।
আমি পাজামা পাঞ্জীবীটা জলে চুবিয়ে ভালো করে ধুয়ে দিলাম।
টাওয়েল পরে বেড়োলাম।
মিত্রা বাথরুমের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। আমি বেরতেই একেবারে মুখো মুখি। ডাগর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। দরজা ভেজানো। ছিটকানি দেওয়া নেই। বুঝলাম দুষ্টুমি করবে না।
একটু ধরি।
আবার কি হলো।
তোকে না ধরতে পারলে ভালো লাগে না।
দরজা খোলা আছে।
এমনি তোকে একটু জড়িয়ে ধরবো।
বাবা এতো ভদ্রহলি কবে থেকে।
আজ থেকে।
কেন।
তুই আমার মাথাটা অনেক উঁচু করে দিয়েছিস।
তোর মাথা নীচু ছিল নাকি।
মাটির সঙ্গে মিশে ছিল।
বাবা অতো বড়ো কাগজের মালকিন।
একবারে মালকিন মালকিন করবি না।
হেসে ফেললাম।
দে পাজামা পাঞ্জাবীটা দে পরে নিই।
মিত্রা আমাকে জাপ্টে ধরে আছে। খাটের কাছে এলাম।
এটা কি ইসি কিনে এনেছে।
আজ গিয়ে কিনে এনেছে।
হঠাৎ।
জানিনা, জিজ্ঞাসা করিস।
মালতীরা তোর জন্য গল্দা চিংড়ি নিয়ে এসেছে।
কেন।
তুই বিয়ে করেছিস।
হাসলাম।
তোকে কি ভালো বাসে। তোর জন্য আমিও একটু পেলাম।
আমি না থাকলেও পেতিস।
আমাকে একবার নিয়ে যাবি।
কনিষ্করা প্রায় যায় ওদের সঙ্গে চলে যাস।
তুই নিয়ে যাবি না।
আমার কোন দিনক্ষণ নেই। তোর অফিসের ঝামেলা যখন মেটাচ্ছিলাম তখন ওখানে গিয়ে পড়ে থাকতাম। ওরাও আমার অনেক কাজ করে দেয়। মাস দুয়েক যাই নি।
পাঞ্জাবীর হাতাগুলো বেশ বড়ো, মিত্রা হাতাটা ভাঁজ করে দিল।
জানিস বুবুন যে দিদিভাই আজ ছয় বছর আমাকে একটা ফোন করে নি। আমার খোঁজ খবর নেয় নি, আজ আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, জানিস ছুটকি একটা বড়ো ভুল করে ফেলছিলাম।
সব তোর জন্য।
আমার জন্য কেন ?
তুই আমাকে যদি মালিক না বানাতিস তাহলে আমি এই কাজ করার সুযোগ পেতাম না।
তুই আমাকে টুকলি।
একটুও না তুই বিশ্বাস কর। তুই একটু ভেবে দেখ। তুই তোর মতো আছিস, আমি আমার মতো আছি। তাহলে কি এই ঘটনা গুলো ঘটতো।
না।

তাহলে।
তুই মালিক বানালি, পর পর ঘটনা ঘটে চলেছে। আমি খালি তোর সেফ্টি দেখতে চাইছি। পারছি কই। সবার স্বার্থে আঘাত লাগছে। আমি খালি পরিষ্কার করতে চাইছি।
ঠিক বলেছিস।
চল। এবার যাই। না হলে ছোটমা এসে হাজির হবে।
তোর পারফর্মেন্সে ছোটমা সবচেয়ে খুশী।
জ্যেঠিমনি ?
কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
সকাল থেকে আমাদের যারা আত্মীয় আছে সবাইকে ফোন করা হয়েগেছে। যেই শুনেছে তুই ছুটকির বড়। সবাই সকাল থেকে একবার করে এসে চলে গেছে। তোর ঘুমন্ত শরীরটা ঘরে এসে দেখে, তোর ঘুমেরো প্রশংসা করে সকলে।
আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে।
সত্য বলছি বিশ্বাস কর।
জ্যেঠিমনিকে বলেছে ওই বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান করো।
জ্যেঠিমনি কি বললো ?
ওর মতি গতির কথা শুনছো তো। আগে হ্যাঁ বলুক তারপর। জ্যেঠিমনিকে কেউ ছেড়ে কথা বললো না। দু’একটা কথা শোনাল।
সেই জন্য তোর মাথাটা উঁচু হয়ে গেছে।
মিত্রা চোখ বুঁজিয়ে মাথা দোলাল।
দুজনে বেরিয়ে এলাম।
নীচে নামলাম। মালতী সিঁড়ির কাছে বসে আছে। বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। আমাকে দেখে বাচ্চাটার মুখে কাপর চাপা দিলো। আমি কাছে গেলাম।
ভক্তা কইরে।
ও পাসে গেছে।
একবার ডাক।
একজন উঠে গিয়ে ভক্তাকে ডেকে নিয়ে এলো। আমাকে দেখেই পায়ে হাত দিল।
কিরে বাড়ি যাবি ?
বড়মা বললো খাবার দেবে।
কিসে যাবি।
ট্রলি নিয়ে এসেছি।
যেতে পারবি ?
খুব পারবো।
আমি মানি পার্টস থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট মালতীর হাতে দিতে গেলাম।
নাগো অনিদা আছে।
থাক তবু রাখ কাজে লাগবে।
সকালে অনিকেতদা দিয়ে এসেছে।
বাধ্য হয়ে পার্সে ঢুকিয়ে রাখলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তুমি সকাল থেকে কিছু খাও নি। খেয়ে নাও। তুমি খেয়ে উঠলে আমি যাব। মালতী বললো।
কেন টনা বলে দিয়েছে।
মালতী চুপ করে রইলো।
বাইরের গেটে ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। দেখলাম বটা, নীরু, কনিষ্ক, অনিকেত নামছে।
নীরু ট্যাক্সি ভাড়া দিল। আমি এগিয়ে গেলাম। আমার পাশে পাশে মিত্রাও এলো।
কিরে খাওয়া হয়েছে।
না।
শরীর ঠিক আছে।
হ্যাঁ।
টনা কেমন আছে।
টনা ঠিক আছে, মনা একটু সমস্যা করেছিল। এখন ঠিক আছে। কাল ছেড়ে দেব।
চোখটা।
যা ভয় করেছিলাম তা নয়। স্যার দেখে বললেন, একটু বেশি ধাক্কা লেগেগেছে। ওষুধ চলবে।
দিন পনেরো লাগবে।
পেছনে দেখলাম মালতী দাঁড়িয়ে আছে।
কিরে তুই বাড়ি যাস নি। নীরু মালতীর দিকে তাকিয়ে বললো।
মালতী মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সব ঠিক আছে চিনতা করতে হবে না।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এলাম। বারান্দায় বড়মা ছোটমা দাঁড়িয়ে।
খাবার রেডি করো, বহুত খিদে পেয়ে গেছে। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
অনিকেত ওষুধের প্যাকেটটা ভক্তার হাতে দে, ও মনার বউকে দিয়ে দেবে। নীরু বললো।
কিসের ওষুধ।
মনার বৌ-এর।
ওর আবার কি হলো!
তোর হোক বুঝবি।
নীরু এমন ভাবে বললো, মিত্রা পর্যন্ত ফিক করে হেসে ফেললো।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম।
নীরু জমা হয়েগেলি মাথায় রাখিস। বটা বললো।
অনি বললো কেন।
আমি কিছু জানি না।
আজ একটা ঝামেলা হয়ে গেল বুঝলি অনি। কনিষ্ক বললো।
কাজের কথাটা বল। নীরু বললো।
আমি কনিষ্কর দিকে তাকালাম।
সুপারের সঙ্গে একচোট আজ হয়ে গেল।
কেন।
সকালে তিনটে একসিরা কাটার ছিল। যা কেচাল বাধল। হাসপাতালে যেতে দেরি হয়ে গেল। একটা করতে পেরেছি। আর দুটো হয় নি।
পেসেন্ট কিছু বলছিল ?
না।
তাহলে।
আমাদের এখনকার সার্জারীর হেড ডিপটা হারামী। বক বক করছিল।
তারপর।
দিলাম ঝাড়। দেখি সুপারকে রিপোর্ট করেছে। মেজাজ গরম ছিল। শালা পার্টি দেখাচ্ছিল।
দাঁড়া কালকেই করকে দিচ্ছি। ওর সাতদিনের ঘুমের বারটা বাজিয়ে দেব।
তোকে করতে হবে না। কনিষ্ক হাই তুলে এসেছে। বটা বললো।
মানে!
ন্যানো, সব বোঝ এটা বোঝ না। নীরু বললো।
মিত্রা হাসছে।
তোর বউ বুঝেছে তুই বুঝিস নি।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
ওরা সবাই হাসে।
ওর মাথায় এখন ওটা নেই। ওই যে কনিষ্ককে সুপার বলেছে। সেদিকে কনসেন্ট করেছে।
মিত্রা বললো।
তোকে কিছু করতে হবে না। এমনি তোর নাম শুনে প্যান্ট হলুদ হয়ে গেছে।
আমি তাকিয়ে আছি।
নীরু আমার চোখের সামনে দুবার হাত নাড়াল।
ফিরে আয় বাবা মর্তে ফিরে আয়। কনিষ্কর কিছু হয় নি।
সবাই হাসছে।
বুঝলে বড়মা তোমার অনিকে বেশামাল করতে আমাদের বেশি সময় লাগবে না। এক ডোজ ব্যাশ অনি বেশামাল। পুরো ওপরে চলে গেছে। কিছুতেই মর্তে নামাতে পারছিনা।
তারপর কি হলো।
তোর পায়ে ধরছি, কিছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে গেছে, সুপার সাহেব ঘেমে চান করে গেছে।
কাজ মিটে গেছে।
হ্যাঁ বাবা কাজ মিটে গেছে।
যাক বাবার এবার মর্তে আগমন হলো বুঝলি কনিষ্ক। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখলাম বসার ঘর থেকে ইসি বেরিয়ে এলো ওরা সবাই হাসাহাসি করছে। মিত্রা এগিয়ে গেছে। ও মনে হয় সবাইকে বললো। বড়মা আমার দিকে কেমনভাবে যেন তাকিয়ে আছে। আমি গিয়ে সোফায় বসলাম। আমার একপাশে কনিষ্ক, আর একপাশে নীরু বসলো।
বড়মা খিদে পেয়েছে। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ডায়াল করলাম।
কিরে কাকে ফোন করছিস। আমি জানি তোর ঘোর এখনো কাটে নি। কনিষ্ক বললো।
কেন তুই বলতে গেলি। নীরু বললো।
যা পারিস কর আর ভালো লাগছে না। কনিষ্ক বললো।
অর্ক।
হ্যাঁ দাদা।
তুই কয়েকদিন আগে একটা আর্টিকেল লিখে আমাকে দেখিয়েছিলি মনে আছে।
মেডিকেল কলেজের ওপর।
হ্যাঁ।
ছবি করেছিস।
না।
সায়ন্তনকে পাঠিয়ে দে। কি ভাবে ছবি করবে বলে দে।
ঠিক আছে।
আর শোন। ছবি গুলো প্রিন্ট করে, লেখাটা রাতে দাদার হাতে পাঠাবি। যেন দেখতে না পায়।
আচ্ছা।
আজকে অশ্বিনীনগরের লেখাটা নামিয়েছিস।
হ্যাঁ।
দাদাকে দিয়েছিস।
দাদা বললো তোমার সঙ্গে কথা বলে ফাইন্যাল করবে।
দাদাকে বল ওটা ছেড়ে দিতে। কালকে যেন কাগজে বেরোয়।
আচ্ছা।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
হয়েছে এবার শান্তি। মাথা থেকে কেলাটা নামলো। নীরু খেঁকিয়ে উঠলো।
আমি হাসলাম।
তোকে কিছু করতে হবে না। কতবার বলছি সুপার তোর নাম শোনার পর থেকে পঞ্চাশবার কনিষ্ককে ফোন করেছে। ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। কেন হুলোটা দিবি।
অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে।
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা মেরে লাভ কি।
বলবে কেন।
বেশ করেছে বলবে, তোর কি।
বললেই হলো।
মিত্রা কাছে এসে দাঁড়াল।
খিদে লেগেছে। তোর লাগে নি।
চল।
উঠে দাঁড়ালাম।
বড়মা, দামিনীমাসি ইসলামভাই কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।
সব কি তোর জন্য এখানে খুঁটি গেড়ে বসে থাকবে। তাদের কি কোন কাজ-কম্ম নেই।
ও আচ্ছা।
আবার কি হলো।
না কিছু নয়।
তোর কাজ করতে গেছে। অনুপ বাড়ি দেখাতে নিয়ে গেছে।
দাও খেতে দাও।
টিনা, অদিতিরা কোথায়।
অফিসে গেছে। মিত্রা বললো।

কোথায় বসবো।
টেবিলে।
সবার এক সঙ্গে হবে না ?
তোরা খেয়ে নে তারপর খাব। বড়মা বললো।
নীচে বসলে হতো না।
ও কবিতা, মা নীচে জায়গা কর।
কবিতার দিকে তাকালাম। হাসছে।
ঘুমিয়ে শরীর ভালো হয়ে গেছে। মাথার পোকা গুলো আবার কিলবিল করতে শুরু করেছে।
হাসলাম।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোমড় দোলাচ্ছিস কেন, হাতে হাতে জায়গা কর না।
ওকে ধমকাচ্ছিস কেন। আবার কোথাও বেরবার মতলব করছিস নাকি। আজ বেরবার নাম করলেই ঠ্যাং ভাঙবো। ছোটমা বললো।
আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম।
মিত্রা ওর কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে নে। বড়মা চেঁচালো।
মিত্রা এগিয়ে এলো।
উঃ দাঁড়া না। বড়মা বললো অমনি নাচতে নাচতে চলে এলি।
কাকে ফোন করছিস।
কাজ আছে।
টিনা।
হ্যাঁ।
কোথায় তুমি।
অফিসে।
সে তো বুঝলাম।
তাহলে।
মিত্রার ঘরে না অন্য কোথাও।
সনাতন বাবুর কাছ থেকে ফিরছি।
হাওয়া কি রকম।
গিয়ে বলবো।
তুমি একটা কাজ করতে পারবে।
বলো।
একবার সুজিতদাকে ফলো আপ করবে।
সুজিতদা সকালে চেক পাঠিয়ে দিয়েছে। একটা চিঠি তোমাকে দিয়েছে। আমি এবার বেরচ্ছি।
আমরা খেতে বসছি, চলে এসো।
ঠিক আছে।
নির্মাল্য, দেবা কোথায়।
কিছুক্ষণ আগে ঢুকেছে। অদিতির ঘরে।
ওদেরকেও সঙ্গে করে নিয়ে চলে এসো।
আচ্ছা।
ফোনটা কেটে পকেটে রাখলাম।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
কিরে সুজিতদা চেক পাঠিয়েছে।
মাথা দোলালাম।
কি ম্যাডাম আবার আমদানি ? নীরু বললো।
মিত্রা মাথা দোলাল।
সেই মডেল কন্যা।
মিত্রা হেসে ফেললো।
বটা তুই অনিকে সামলে দিস, আমি ঝিমিকে….।
নীরুর কথায় বটা কট কট করে তাকাচ্ছে। ইসি হাসছে।
এই নীরু এখন আর ফক্করি করতে হবে না। জায়গা হয়ে গেছে। ছোটমা বললো।
আমি গিয়ে একটা ধারে বসলাম।
তুই ওখানে বসবি না। ছোটমা বললো।
তাহলে।
মাঝখানে।
কেন।
বোস তারপর বুঝতে পারবি।
আচ্ছা।
ইসি হাসছে।
আমি উঠে পড়লাম।
ইসি জ্যেঠিমনি কোথায় ?
ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।
খেয়েছে।
হ্যাঁ।
পিকু।
পিকু তার দিদার কাছে শুয়ে ঘুমচ্ছে, বরুণদা তোর অফিসে গেছে। কাজ আছে।
আমি চুপ করে থাকলাম।
আর কোন খবর নেওয়ার আছে।
না।
তুই কি এখনো মর্তে ফিরিস নি। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
তখন থেকে খালি মর্তে মর্তে করে চেঁচাচ্ছিস, আমি কখন স্বর্গে গেলাম।
এখনো স্বর্গে বিচরণ করছিস।
চুপ করে থাকলাম।
ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করে দেখলাম, দাদার ফোন।
বলো।
খেয়েছিস।
না খেতে বসছি।
থাক, তাহলে পরে বলবো।
না বলো।
কে ফোন করেছে রে মিত্রা। বড়মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
শুনতে পাচ্ছিনা।
কিরে তোর বড়মা চেঁচাচ্ছে।
ও তো সব সময় চেঁচায়।
দাদা ফোন করেছে। মিত্রা চেঁচালো।
আমাকে একটু দিবি কথা বলবো। বড়মা বললো।
শুনতে পাচ্ছ।
শুনছি।
বলো।
অর্ক এসেছিল।
ওই রিপোর্টটা করে দাও। দরকার আছে। খালি রাজনাথের ভাইপো এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেটা উল্লেখ করে দেবে। পারলে সিংজীর সঙ্গে কথা বলে নেবে।
সিং একটা ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছে।
ডিটেলস আছে।
আছে।
তাহলে ছেড়ে দাও।
অনুপ বারন করছিল।
কিসের জন্য।
তুই একবার কথা বল।
তুমি কথা বলে নাও।
না তুই বল।
ঠিক আছে কথা বলে নিচ্ছি।
আমি ফোনটা মিত্রার হাতে দিলাম। মিত্রা রান্নাঘরের সামনে গেল।
বড়মা কথা বলছে। আজ কোন রাগা রাগি নয়। বেশ হেসে হেসে কথা বলছে। বুঝলাম খুব খুশ।
কিরে তুই এখনো ঠিক হোস নি। ইসি বললো।
কেন, আমি ঠিক আছি।
ওই যে ডাক্তার বলছে।
কে।
নীরু।
ওটা একটা ছাগল।
হ্যাঁরে আমি ছাগল, তুই কি। নীরু চেঁচালো।
আমি হাসছি।
মিত্রা আমার হাতে ফোনটা দিল।
তুই ওকে এখন জিজ্ঞাসা করে ঠিক উত্তর পাবি না।
ইসি হাসছে।
তোর সঙ্গে কথা বলছে ঠিক কিন্তু মাথাটা অন্য জায়গায়।
ফোনটা নিয়ে ডায়াল করলাম।
আবার কাকে ফোন করছিস। মিত্রা বললো।
আবার বিরক্ত করে।
আমি ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।
তুমি কোথায়।
তোর বাড়ির সামনে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে যাব। কেন ?
একটু দরকার ছিল।
অপেক্ষা কর পৌঁছে যাচ্ছি।
আচ্ছা।
একটু থাম না, ভালো লাগছে না।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
সব সময় পেছন পেছন ঘুরলে চলবে। ডাক্তারদাদা কোথায় রে ?
কাজে গেছে।
খাবে না।
এসে খাবে।
কখন আসবে।
খবর চলে গেছে, আসছে।
তুই এখন যা। পেছন পেছন ঘুর ঘুর করিস না।
যাব না কিছু করতে পারবি।
মহা মুস্কিল।
ম্যাডাম চলে আসুন, মর্তে আসতে সময় লাগবে। ঘুঁটি সাজাচ্ছে। নীরু ভেতর থেকে চেঁচাল।
দেখছিস নীরু কি বলছে।
বলুক। কাজ ও করবে না। আমাকে করতে হবে।
এখন খেয়ে নে।
দিক যাচ্ছি।
তোকে একটা কথা বলবো।
বুঝেছি, তুই আমাকে বিরক্ত করবি। চল।
না, এখানে দাঁড়িয়ে।
বল।
মিলির কেশটা কি করলি।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
কিরে চোখের মনিদুটো স্থির হয়ে গেল। উত্তর দে।
তুই জানলি কি করে ?
তুই ঘুমলে তোকে সব সময় পাহাড়া দিতে হবে, তাহলে অনেক কিছু জানা যাবে।
হাসলাম। তাই তখন বলছিলি মিলিকে নিয়ে এবার পরবো।
হ্যাঁ। কাকে দায়িত্ব দিয়েছিস।
কেন।
গত তিন দিন মিলিকে তিরিশবার ফোন করেছে।
তাই! মিলিকে ডাক।
এখন না পরে।
ডাক না।
কেন যে তোকে বলতে গেলাম।
মিত্রা ভেতরে গেল।

কি ম্যাডাম কেশ খেয়েছেন। কনিষ্ক চেঁচালো।
মিত্রা হাসলো।
বুঝলাম মিলি বড়মার ঘরে আছে। মিত্রা সেই দিকেই গেল।
আমি রতনকে একটা ফোন করলাম।
বলো অনিদা।
কোথায় আছিস।
কেন।
ব্যস্ত আছিস।
না।
তোকে একটা কাজ দিয়েছিলাম। মনে আছে।
কোনটা বলো।
ওই যে সল্টলেকের এ্যাড্রেস।
হ্যাঁ হ্যাঁ।
রেজাল্ট কি।
তুমি যে ভাবে বলেছো, সেই ভাবেই বলে এসেছি।
তাতে কি বললো।
ব্যাটা আইন দেখাচ্ছিল।
তারপর।
প্রথমে ভেবেছিল দিদি পাঠিয়েছে, আবিদ ব্যাটা ঘউড়া। তোমার নামটা ফট করে বলে দিয়েছে। ব্যাস যাবে কোথায়।
তারপর।
ত ত করছিল। আমি বললাম দাদা পাঠিয়েছে ভাই তুই তাড়াতাড়ি কাজটা সাল্টে দে। না হলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।
তুই কখন আসবি।
রাতে যাব, তোমার সঙ্গে একটু দরকার আছে।
ঠিক আছে আয়।
পেছন ফিরে দেখলাম, মিলি, ইসি, মিত্রা, ছোটমা। আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
কাকে ফোন করলি। মিত্রা বললো।
তোর জেনে লাভ।
বড়মা বলেছে এখন কোন গন্ডগোল করবি না।
গন্ডগোল ছাড়া বাঁচতে পারবি।
বুঝতে পারলাম আমার গলার স্বরটা একটু কঠিন হয়ে গেছে। ওরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
মিলি ওই ভদ্রলোকের ফোন নম্বরটা দাও।
এখন থাক না অনিদা।
যা বলছি করো।
দেখলাম কনিষ্ক নীরু উঠে এলো।
মিলি ফোন নম্বরটা দিল।
কি যেন নাম।
অনীশ।
আমি ডায়াল করলাম।
ইচ্ছে করেই ভয়েজ অন করলাম। সবাই শুনুক।
রিং হচ্ছে।
হ্যালো।
কে বলছেন।
কাকে চান আপনি। ঝাঁজিয়ে উঠলো ভদ্রলোক।
আপনি কি অনীশ বাবু।
হ্যাঁ।
আমি অনি ব্যানার্জী। আলাদা করে আমার পরিচয় দেওয়ার দরকার আছে।
না স্যার, না স্যার।
ভদ্রলোকের গলা মুহূর্তের মধ্যে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল। মিলি হেসে ফেললো।
আমার লোক আপনার কাছে গেছিল।
আমি স্যার বার বার ওকে ফোন করছি, ফোন ধরছেনা।
ও এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমার সঙ্গে ওর কি রিলেসন নতুন করে বলতে হবে।
না স্যার, আমি সব খোঁজ খবর নিয়ে নিয়েছি।
কি করতে চাইছেন।
ও যা বলবে আমি তাই করে দেব।
এতদিন করেন নি কেন।
আপনি যদি সময় দেন তাহলে আপনার কাছে গিয়ে বলতাম।
আপনি তো অনেক দিন আগেই বিয়ে করে ফেলেছেন।
না স্যার আপনাকে মিথ্যে কথা বলেছে।
প্রমাণ চান।
চুপচাপ।
কি হলো চুপ করে রইলেন কেন।
না স্যার একটা ভুল হয়ে গেছে।
তাহলে দুবছর ধরে ল্যাজে খেলাচ্ছিলেন কেন। ফ্ল্যাটটা লিখিয়ে নিতে চান।
না স্যার।
মিলি ছোটমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।
আপনি কোথায় কাজ করেন, কি করেন না করেন, সমস্ত খবর আমার কাছে আছে।
ওই ছেলেটি আমাকে সব বলেছে।
কালকে বারোটার মধ্যে কাজটা শেষ করে ফেলবেন। ওর সঙ্গে আমার স্ত্রী যাবে।
আচ্ছা স্যার।
সব ব্যবস্থা ও করে রাখবে। আপনি খালি এসে কষ্ট করে সইটা করে দেবেন। লোক পাঠাতে হবে।
না স্যার আমি চলে যেতে পারবো।
মিলি আপনাকে রাতে ডিটেলসে বলে দেবে। দ্বিতীয়বার ওকে বিরক্ত করবেন না।
আচ্ছা স্যার।
এটা আমার ফোন নম্বর সেভ করে রাখুন পরে ফোন করে আসবেন। আপনার কথা শুনবো।
আচ্ছা স্যার।
ফোনটা কেটে রেকর্ডিংটা সেভ করলাম।
দেখলাম বড়মা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। নীরু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। কনিষ্ক স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরের গেটে অনুপদার গাড়ি এসে থামল।
দেখলাম ইসলামভাই, ডাক্তারদা, দামিনী মাসি নামল। আমি ভেতরে এলাম। বড়মা গেট ছেড়ে দাঁড়াল। কোন কথা বললাম না। থম থমে পরিবেশ। আমি সোফায় এসে বসলাম।
বড়মা সামনে এসে দাঁড়াল।
এবার খেতে বসবি।
দাও। সবাই এসেছে ?
বসে পর সবাই এসে পরবে।
বড়মা রান্না ঘরে চলে গেল। দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনুপদা, ছোটমা, ইসলামভাই, দামিনী মাসি কথা বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে ইসি, মিত্রা, মিলি। বুঝলাম এতক্ষণ যা হলো তার রিপোর্ট সার্ভ করা চলছে।
আমি উঠে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা জলের জাগটা থেকে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেলাম।
তোর কাজ করে দিলাম।
অনুপদা ঘরে ঢুকলো।
আমি অনুপদার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
তিনজনকেই দেখিয়েছি। পছন্দ।
একে একে সবাই ভেতরে এলো।
চলো খেতে বসে কথা হবে।
কিগো বান্ধবী আমার খাওয়া জুটবে। ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো।
বুড়ো ছেলের ঢং দেখ।
বড়মার কথায় সবাই হাসছে, আমিও হেসে ফেললাম।
তোমার স্ট্রং ম্যানের মেজাজ ঠিক নেই। মিত্রা বললো।
তোরা খালি বিরক্ত করবি, তাহলে মেজাজ ঠিক থাকে কি করে।
আর সাউকিরি করতে হবে না।
দামিনী মাসি রান্নাঘরের কাছে গেল। ইসলামভাই এসে আমার পাশে বসলো।
দামিনী সব নিয়ে গিয়ে মাঝখানে জড়ো করো, তারপর পাতে পাতে দিয়ে দাও।
নাও হাত ধুয়ে নাও খেতে বসে যাই। ইসলামভাই-এর দিকে তাকিয়ে বললাম।
অনুপদার দিকে তাকালাম।
দাদাকে সকাল বেলা কিছু বলেছো।
কি ব্যাপারে বলতো।
কালকের ব্যাপারে।
দাদাকে বলে দে ছাপতে। সকালের পজিসন আর এখনকার পজিসন সেপারেট।
দাদাকে তুমি বলে দাও।
এই জন্য তুই ফিউজ ?
আমি ফিউজ কে বললো।
ওই তো ছোটবৌদি বললো।
ওরা মনগড়া কথা বলে।
আমরা সব মনগড়া কথা বলি। যাবো দেখবি। ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলো।
ও ছোট আবার কি হলো।
বলবো দিদিকে।
বলো।
এবার খেতে বসে উদ্ধার করো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কনিষ্করা বাইরে দাঁড়িয়ে, ভেতরে ডাকলাম।
আমি গিয়ে মাঝখানে বসলাম। কনিষ্করা আমার অপরজিট সাইডে বসলো।
ছোটবৌদি আমি যদি অনির পাশে বসি অসুবিধে আছে। অনুপদা বললো।
অসুবিধে আছে। তুমি অনির বাঁদিক থেকে দুটো আর ডানিদেক থেকে দুটো ছেড়ে বসবে।
ওরে সব্বনাশ এগুলো বুক।
হ্যাঁ।
তাই হোক।
দামিনী মাসি হাসছে।
যে যার জায়গায় বসলো, খাওয়া শুরু হলো। ভাসিলা ভেড়ির গলদা চিংড়ির মালাইকারি এলো।
অনি কে আনল রে। কনিষ্ক বললো।
মালতী নিয়ে এসেছে।
নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
বড়মা চাইলে পাওয়া যাবে।
না। গোনা গুনতি।
তাহলে আমাকে দিও না।
বড়মা নীরুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
সবাই নীরুর দিকে তাকিয়ে। ও যে এই কথাটা বলতে পারে কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না।
তাকিয়ে লাভ নেই। তুমি একটা দেবে। সেটাও আমার ভাগ্যে জুটবে না। আমারটা রেখে দাও। যাওয়ার সময় খাব।
বড়মা ওরটা আমার পাতে দাও। বটা বললো।
নীরু সটাং উঠে দাঁড়াল।
কি হলো! খেতে খেতে উঠে দাঁড়ালি কেনো ? বড়মা বললো।
ওর শরীর খারাপ লাগছে, আর খাবে না। কনিষ্ক বললো।
বড়মা আমি যদি পাতাটা নিয়ে তোমার কাছে যাই অসুবিধে আছে।
বড়মা হাসছে।
আয়।
নে আর একটা নিয়ে চব্বচোষ্য খা। নীরু বটার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
আসন ছাড়াই নীরু বড়মার পাতের কাছে এসে থেবড়ে বসে পরলো।
কম বেশি হাঁসা হাঁসি চলছে। চেঁচা মিচি হচ্ছেই। হঠাৎ বড়মার ঘরের গেট খুলে পিকু দাঁড়াল।
আংকেল তুমি নেমন্তন্ন খাচ্ছ।
ঘর শুদ্ধ সবাই হাসছে।
পিকুর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, সোজা চলে এসে আমার পাত ডিঙিয়ে, মিত্রাকে সরিয়ে মাঝখানে বসে পরলো।
নীরু পিকুর দিকে তাকিয়ে আছে।
ভাত খাবি।

না।
তাহলে কি খাবি।
লব স্টার।
আবার হাসি।
নীরু পিকুর দিক তাকিয়ে। বাবা আমার যখের ধন, অনেক কষ্টে আগলে রেখেছি, তুই তোর মেসোরটা নে।
মেসো না অংকেল।
জয় হোক বাবা, তোর আংকেলেরটা নিয়ে তুই ঝামেলা কর।
আমাদের চেঁচামিচিতে জ্যেঠিমনির ঘুম ভেঙেগেছে। গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ দেখে হেসে ফেললো। আমি একটু চিংড়িমাছ ভেঙে ওর মুখে দিলাম।
মুখে দিয়েই ফেলে দিল। চেঁচিয়ে উঠলো দিদাই।
দামিনী মাসি, বড়মা, ছোটমা তিনজনেই বলে উঠলো, বলো।
রসো নেই।
পিকু উঃ আঃ করছে। ঝাল লেগেছে।
জানিস পিকু তোর আংকেলের থেকেও এটা বেশি ঝাল। নীরু পিকুর দিকে তাকিয়ে।
দামিনী মাসি উঠতে যাচ্ছিল। কবিতা উঠে গিয়ে মিষ্টার হাঁড়িটা নিয়ে এলো।
বড়মা একটা তুলে আমার পাতে দিল। এবার আর পিকুকে খাইয়ে দিতে হলো না। পিকু নিজে নিয়ে খেতে শুরু করলো। আমার কোলে উঠে বসেছে।
বুঝলে বড়মা ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় আসাতে খাওয়াটা ভালই হলো।
কনিষ্ক বটা অনিকেত একবার দেখে নিল, ব্যাপারটা এরকম খেয়ে নে, তারপর তোর বাংলার হিসাব দেব।
গেটের মুখে টিনা, নির্মাল্য, অদিতি, দেবা এসে দাঁড়াল। বড়মা বললো, হাত ধুয়ে বসে পর। দেরি করিস না।
কবিতা উঠে দাঁড়াল।
তোমায় উঠতে হবে না আমরা নিয়ে নিচ্ছি। টিনা বললো।
যে যার মতো হাত মুখে ধুয়ে বসে পরলো।
টিনা তুমি চিংড়ি খাবে ? নীরু বললো।
কেন বলো।
বটা বলছিল, আর একটা হলে ভালো হয়, তা বড়মা বললো গোনাগুনতি।
তোরটা দেনা। দেবা বললো।
ওটা পিকুর জন্য।
আবার হাসি। টিনা মাটিতে থেবড়ে বসে পরেছে।
খাওয়া শেষ হলো।
তোমার সঙ্গে কথা বলা হলো না। একটু রেস্ট নাও আসছি। অনুপদাকে বললাম।
আমি মুখ ধুয়ে ওপরে চলে এলাম। নিজের ঘরে ঢুকলাম। চিকনাদের কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা, ওরা মনে হয় চলে গেছে। মিত্রার কাছ থেক শেষ খবরটা নিতে হবে। অনিমেষদা বলছিল বিকেল বেলা আসবে। সুরো এখনো এলো না। এই ঘরে আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট ধরালাম। বাগানটা অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে।
ইসলামভাই-এর টিমটা বেশ ভালো। কালকে কাজ হয়েছে, আর আজ সকালের মধ্যে বাগান নব্বইভাগ পরিষ্কার।
সকালে নিশ্চই আমি ঘুমবার পর ওরা মিটিং করেছে। মিত্রাটা একটা ঢেঁড়স ওই সময় ভোঁস ভোঁস করে ঘুমচ্ছিল। দেখি ইসির পেটে একটা কিল মেরে কিছু পাওয়া যায় কিনা। ও অন্যদিক থেকে বুদ্ধিমতী কিন্তু এই দিক থেকে কতটা সরেস একবার ঘাঁটা ঘাঁটি করতে হবে।
অনিমেষদা বিধানদা আসবে। তারমানে এবার অনেক আটঘাট বেঁধে নামবে। হয়তো আমার অনেক ঘুঁটিকে ওরা অফ করে দেবে। আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে।
চিকনা গেল কোথায় সকাল থেকে দেখতে পাচ্ছি না। ফোনটা পকেট থেকে বার করলাম। ডায়াল করলাম। চিকনার গলা।
কিরে কোথায় ?
ক্ষমা কর। তোর সঙ্গে আসার সময় দেখা করে আসতে পারি নি।
এখন কোথায়।
আদাশিমলার বিলে।
একা না কেউ আছে।
পাঁচুকে ফোন করেছিলাম, পাঁচু নিতে এসেছে।
অনাদিরা কখন গেছে।
ওরা সকালে চলে এসেছে। কাকাকে কিছু জানাই নি। বলেছি তুই একটা কাজে গেছিস। নীপা জেনেছে। তুই কিছু ভাবিস না, আমরা সবাই তৈরি হয়ে গেছি।
তৈরি হলেই ভালো। দেখছিস তো আমার চাপ।
জানি গুরু, তোমাকে এদিকে মাথা গলাতে হবে না। তুমি দেখো আমরা ঠিক তৈরি করে নেব।
দেখি যদি পারি এই সপ্তাহে যাব।
তুই আগে ওই দিকটা সামলা। অনিমেষদা, বিধানদা সকালে প্রবীরদাকে হেবি ঝেড়েছে।
হ্যাঁরে মিলি কেশটা কি।
কেন।
তুই ভুল ভাল বকছিলি। ভাবলাম আবার পীরবাবা ভড় করল কিনা।
হাসলাম।
তোকে নিয়ে আমাদের টেনসন।
আমি ঠিক আছি। প্রবীরদাকে কি বললো।
আমাকে ফুটিয়ে দিল। দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা ছিল। তবে সব তোর ফরে।
ঠিক আছে। রাতে পারলে অনাদিকে একবার ফোন করতে বলিস। আর শোন, কাকাকে এই সপ্তাহে একবার ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করিস।
আচ্ছা।
ফোনটা পকেটে রাখলাম। আস্তে করে পিঠে একটা টোকা পরলো। ফিরে তাকালাম। মিত্রা পিটি পিটি হাসছে। গেটের মুখে ওরা সবাই। মিত্রা আমার দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে। চোখের মনি দুটো খুশিতে চক চকে।
কি হলো। তোমরা ভেতরে এসো।
চিকনাকে ফোন করলি।
হ্যাঁ।
তোর কথা বলার ধরণ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম।
তোরা এলি কনিষ্করা এলো না।
অনুপদার সঙ্গে কথা বলছে।
ও।
ও করিস না। তোর জন্য সুপার বেচারা ঝাড় খাচ্ছে।
ওরা ঠান্ডা ঘরের মধ্যে বসে এ্যাডমিনিস্ট্রেসন চালায়, নিচের তলায় সুবিধা অসুবিধা বোঝে না।
তুই বুঝিস।
চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিস। মালতী বাড়ি গেছে ?
হ্যাঁ। অনুপদা বলেছে কনো সমস্যা হলে খবর দিতে।
নীরুকে দেখলি, মনার বৌ-এর জন্য ওষুধ পাঠাল, ওটা কি ওর কাজ, আমার মতো ও একটা পাগল। স্যাম্পেল কপি পাঠাল, হয়তো নিজের পয়সায় কিছু ওষুধ কিনে দিয়েছে। অন্য ডাক্তার হলে ওই স্যাম্পেল কপি বিক্রি করে ওই পয়সায় পিটার ক্যাটে বৌকে নিয়ে ডিনার করতো।
বৌ-এর কাছে আদর্শ স্বামী সাজতো। ওই মেয়েটা যদি ঠিক মতো পথ্য না পায় তাহলে একটা রিকেট রুগীর জন্ম দেবে। হাসপাতালে যা দেখতে পাবি একটা বেডে দুটো মা তার বাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছে। এ মুখো ও মুখো হয়ে।
রোগ আছে। ওষুধ নেই। যদিওবা ওষুধ আছে, যা পাওয়ার লেখা আছে, তা নেই। তার হাফ পাওয়ার আছে। একটা ডাক্তার কি নিয়ে লড়বে। ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার।
অর্ক একটা লেখা লিখেছে। উইথ ডকুমেন্টস। স্টোরিটা করতে তোর হাউসের দশহাজার টাকা খরচ করেছি। যদি না ছাপি তাহলে যে ছেলেটা কষ্ট করে স্টোরিটা করলো তার কষ্টটা মাঠে মারা যাবে। যদি ছাপি, সুপারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিসন বসবে। প্রশাসনে বিরাট আলোড়ন পরে যাবে। বল কোনটা ঠিক।
মিত্রার চোখ ছল ছল করে উঠলো। আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তুই বলবি বুবুন তুই এসব ছেড়ে দে। আর ভালো লাগছে না। তোর কথা মেনে নিয়ে যদি তাই করি, তাহলে দেখবি, টোটাল ব্যবস্থাটা একদিন ভেঙে পরবে। তুই বলবি তুই কি সবার ঠেকা নিয়ে বসে আছিস। না আমি আমার কাজ করছি। তবু লেখালিখি করাতে ওরা কিছুটা ধাক্কা পায় নড়ে চড়ে বসে সামান্য কাজ হয়। না হলে সেই গড্ডালিকা প্রবাহ।
তা বলে আমি ভগবান নই। নিজের কেউ নেই। তাই প্রচুর মানুষের সঙ্গে মিশি। বন্ধুত্ব করি। কিছু টেঁকে কিছু টেঁকে না। আমি আমার কাজ করে চলি। সেই ঘুরে ফিরে এক কথা পাগলের গোবরানন্দ।
মিত্রা চোখে জল চিক চিক অবস্থায় হেসে ফেললো।
এসো টিনা। সবসময় অনিদার কথায় মন খারাপ করবে না। অনিদা যখন কিছু সহ্য করতে পারে না, তখন মন খারাপ করে। তোমরা ঠিক থেকো।
টিনা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
কিরে দেবা দাঁড়িয়ে রইলি কেন। বোস।
তোর কথা শুনছিলাম। আর ভাবছিলাম তোর কাছে না এলে নিজের কতো ক্ষতি করতাম। সবচেয়ে বড় ব্যাপার তোকে চেনা মুস্কিল হতো। এখন বার বার মনে হচ্ছে, তোকে কিছুদিন আগে পেলে খুব ভালো হতো। এতদিন খুব মিস করেছি।
জানিস দেবা তোর মতো আমিও এই দুদিনে অনিকে দেখে অবাক হচ্ছি। আর ছুটকিকে ভীষণ হিংসে করছি। কেন ও স্কটিশে পড়লো। ওতো প্রেসিডেন্সিতে চান্স পেয়েছিল।
ইসি কথাটা বলে হেসে ফেললো।
দেবা একটা কিনলে একটা ফাউ, কি বলিস। আজকাল এরকমই অফার চলছে।
শয়তান, মিত্রা কোমড়ে চিমটি কাটল।
ইসি তেড়ে এলো।
দেখাচ্ছি দাঁড়া।
ইসি আমি কিন্তু চোখ বন্ধ করে ভেবে নেব, তুই মিত্রা, বুঝতে পারছিস।
মিলিরা হাসে।
অদিতি চেঁচিয়ে উঠলো যাক বাবা মেঘ কাটল।
টিনা সুজিতদা কি দিয়েছে দাও।
মিত্রাদির কাছে।
কিরে আমার পার্সোনাল চিঠি তোর কাছে কেন ?
তোর এখন আর কিছু পার্সোনাল নেই, সবাই দেখেছে।
তার মানে তোদের সবার দেখা হয়ে গেছে!
বাড়ি শুদ্ধ সবার। কি খাওয়াবি বল।
কি লেখা আছে দেখলামই না। খাওয়াব কি।
টিনা, মিলি, অদিতি মুচকি মুচকি হাসছে।
কি ম্যাডামরা মুচকি মুচকি হাসছেন, কিরে দেবা।
মিত্রা বলবে, আমরা দর্শক।
তুই বল আগে কি খাওয়াবি।
আগে দেখি কি লেখা আছে তারপর খাওয়াবার প্রশ্ন।
তোকে দেখতে হবে না। ওটা আমাদের জন্য। ঠিক আছে তোকে খাওয়াতে হবে না। ভালো পাহাড়ে কবে নিয়ে যাবি।
আরি বাবা এতো কিডন্যাপ কান্ড।
গিভ এন্ড টেক পলিসি।
দরকার নেই আমি সুজিতদাকে ফোন করছি।
দেখেছিস দিদিভাই দেখেছিস কি তেঁদড়।
নীরু হন্ত দন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। আমার সামনে এসে বললো, ম্যাডাম একটু সরুন তো। ওকে কোলে নিই।
কেন আমি কি তোর বউ।
কনিষ্করা গেটের মুখে দাঁড়িয়ে হাসছে।
নীরুর কি হলো রে। আমায় কোলে নেবে বলছে।
সুখবর আছে। কনিষ্ক বললো।
হবে নাকি।
দেখলি বটা ইমোসানটাকে চটকে একেবারে কাদা করে দিল।
আমি নীরুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কি হয়েছে বল।
আর পরের নার্সিংহোমে কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। এবার নিজেদের নার্সিংহোম।
হাসলাম। হাসপাতাল ছাড়া চলবে না।
পাগল তুই, অনুপদা সুপারকে ধরে আচ্ছা করে কর্কে দিয়েছে।
অনুপদাকে বলতে গেলি কেন।
আমি বলবো কি ছোটমা গ্যাস খাওয়াল, বড়মার গালাগালি। সাং সাং কাজ। স্যারকে অফার দিয়েছে মেডিক্যাল বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য।
ডাক্তারদাদা কি বললো।

সাতটা নার্সিংহোম নিয়ে হিমসিম খাচ্ছি, আর দায়িত্ব নিতে পারব না।
তোরা চারজন না সবাই।
আপাতত চারজন, বাকি কনিষ্ককে দায়িত্ব দিয়েছে।
তোর বউ।
লাইনে আছে। ফোন করে বলেছি ইঁট পাতো।
সবাই নীরুর কথা শুনে হাসছে।
শ্যাম নিচে এসেছে একটু কথা বলে নে। ওরা আবার রাতের ট্রেনে ফিরবে। কনিষ্ক বললো।
ডেকে আন।
অনিকেত বেরিয়ে গেল।
দেবা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করলো। নিজে একটা বার করে কনিষ্কর দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
তুই খাবি।
না।
কবে থেকে সতী হলি।
কোনদিন ছিলাম।
কেন মুখ লাগাচ্ছ দেবাদা। মিলি বললো।
শালা সব সময় এরকম করে।
কনিষ্ক টনা মনাকে কাল ছেড়ে দিবি।
সাত্যকি বললো, আজই ছেড়ে দিতে আমি বললাম আজ রাতটা রেখে দে। কাল ছেড়ে দিস।
বিল।
অনুপদা নীরুকে বলেদিয়েছে, কার নামে কি ভাবে করতে হবে।
নীচে গাড়ির শব্দ শুনলাম।
কিরে আবার কে এলো।
দেখি দাঁড়া।
বটা বারান্দায় বেড়িয়ে গেল।
ওখান থেকেই বললো। অনিমেষদা, বিধানদা, রূপায়ণদা, প্রবীরদা।
দেখলি। আমি জানতাম। তুই এবার আপার লেবেলে চলে যাবি, তোকে এখন পাওয়া যাবে না। মিত্রা মুখ বেঁকিয়ে বললো।
শ্যাম, শিবু, দারু এসে ঘরে ঢুকলো। সটান এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
কালো কুচ কুচে চেহারা। চক চক করছে। মাথা থেকে তেল চুঁইয়ে পড়ছে। হাতের চেটো গুলো বেদানা কালারের। গাঁট্টা গোট্টা চেহারা। এক একটা যেন বাচ্চা হাতি। প্রণাম করে উঠেই আমাকে সড়াসরি প্রশ্ন।
তুই গেলি না কেনে।
শ্যামের কথা শুনে মিত্রা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। সাঁওতালী টান বাংলার মধ্যে তার ওপর আমাকে তুই বলছে।
হাসলাম। কেন, কনিষ্কদা যায় নি।
তুই গেলি না।
যাব। অনেক কাজ ছিল। সেগুলো সারলাম।
আমি ওদের এক একজনকে বুকে টেনে নিলাম।
ধারা গিড়ির সুবল কইলকাতা এসছিল, ফিরে গেয়ে বইললে কে যেন তোকে মাইরবে বইলছে, একবার দেইখে দে, হাঁসুয়া দিয়ে কাইটে দিই। শ্যামের চোখ দুটো বদলে গেল।
দূর বোকা কেউ মারবে না।
তাইলে ও মিছে কথা বইলছে বল।
না ও মিছে কথা বলে নি। ঠিক কথা বলেছে।
ঠিক আছে ও আমি পরে বুঝে লিবেক। তোকে বুঝতে হবেক লাই।
বউমনিকে দেখেছিস।
না। কনিষ্কদা ফোন কইরে বইললো।
এই যে তোদের বউমনি।
মিত্রাকে দেখালাম। ওরা মিত্রার দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে মিটি মিটি হাসছে। একবারে লজ্জা পেয়ে গেছে।
কিরে হাসছিস যে।
তুর বউটা সন্দর।
পছন্দ। চূড়ার থেকেও সুন্দর।
হ। চূড়া কালা, তোর বউ সাদা।
মিত্রা ইসি হাসছে।
শিবু ব্যাগটা লিয়ে আয়।
শিবু একটা সাইড ব্যাগ নিয়ে এলো।
কি আছে এতে।
তোর জন্য লিয়ে এসছি।
দুটো বড়ো বড়ো বোতল বার করলো।
কিরে এতো দেখছি মধু। ওটা কি ? মহুয়া!
শিবু মাথা নাড়ছে।
তুই বলছিলি খাবি। চূড়া বনায়ে দিছে। শ্যাম বললো।
মিত্রা আমার হাত থেকে নিয়ে নিল।
কিরে শ্যাম অনিদাকে দিলি। আমারটা কই। কনিষ্ক বললো।
তুই গেলে তুকে খাওয়াব।
আচ্ছা এবার প্যাঁক প্যাঁক করে ইঞ্জেকসন দেব।
তুই দিবি লাই।
ওরা সবাই হাসছে।
অনিদা মহুয়া খায় না। তুদের দিয়ে দেবে।
বাবা তুই সব জানিস।
দারু একটা প্লাসটিকের প্যাকেট আমার হাতে দিল।
এটা কিরে।
হুড়ুং-এর সত্তু।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
কি ম্যাডাম ধরতে পারলেন না। নীরু বললো।
মিত্রা মাথা দোলাচ্ছে।
মুড়ির ছাতু।
ওরা সবাই হাসছে।
তুর সঙ্গে কথা আইছে। তুই ওখানে চইল।
শ্যাম বারান্দার দিকে হাত দেখাল।
ওরা সবাই তিনজনকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে। কি সহজ সরল এরা। শহুরে বাতাবরণ একটুও নেই। না আছে রাখ ঢাক, না আছে কিছু। ওরা সম্পূর্ণ ওদের মতো।
তোর বৌদিমনিরা যাবে বলছে।
কবে জিবে বল। তোকে লিয়ে যেতে হবেক লাই। আমি এসে লিজে লিয়ে যাবেক।
মিত্রা সমেত মিলিরা সবাই হৈ হৈ করে উঠলো।
তুই কি করে নিয়ে যাবি।
কেনে দোলায় করে লিয়ে যাবেক।
মৌসুমি মাসি ওখানে না ফিরে এসেছে।
ওখানে আছে, চাঁদ উঠলে ফিরে আসবেক।
আমি ওদের নিয়ে গেটের সামনে এলাম। দেখলাম ছোটমা, বড়মা, জ্যেঠিমনি।
শ্যাম আমার মায়েদের সঙ্গে কথা বলেছিস।
নিচে কনিষ্কদা বলায়ে দিল।
তোমরা বসো আসছি।
আমি ছোটমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তারপর ফিরে এলাম।
বড়মা ওরা চলে যাবে, ওদের কিছু খাবার দিয়ে দাও। পথে যেতে যেতে খাবে।
কবিতা গুছিয়ে রেখেছে।
তোরা কিছু নিয়ে এসেছিস।
তুই পাতায় করে দে বেঁধে লিচ্ছি।
কিগো শ্যাম তুমি অনির জন্য মহুয়া নিয়ে এসেছো কেন।
আগুবার গিয়ে চূড়াকে বইললে, মহুয়া খাওয়াস তাই চূড়া দিলে।
খেলে নেসা হয়।
টোকচা খেলে লেসা হবেক লাই। ফলের রস। শরীল টাটালে ভালো হয়।
ছোটমা হাসে।
আমি ওদের নিয়ে নীচে এলাম। অনিমেষদাদের সঙ্গে দেখা করালাম। বিধানদাকে বললাম, ওরা ওদের কথা বললো। আমি শুনেছি পরে তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করবো। ওরা এখন চলে যাবে।
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নীরু, কনিষ্ক, বটা, অনিকেত চলে যেতে চাইল। আমি বললাম ডাক্তারদাদার সঙ্গে একবার দেখা করে আয়। ওরা দেখা করে এলো।
কিরে কি বললো।
চারজনকে রাতে একবার আসতে বললো।
চলে আয়। রবীন পৌঁছে দিচ্ছে।
আমি ওদের গেটের মুখ পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। ওরা চলে গেল। ফোনট পকেট থেকে বার করে একবার হিমাংশুর সঙ্গে কথা বললাম মিলির ব্যাপর নিয়ে। ও প্রথমে অবাক হয়ে গেল।
তাই! জানতম না।
তুই কালকে একটা ব্যবস্থা কর। মিউচুয়াল সেটেলমেন্ট। আইন বাঁচিয়ে।
এটা আমি করতে পারব না। দেখি দাঁড়া কাকে দিয়ে করান যায়।
তুই একবার রাতের বেলায় আসবি।
ফেরার পথে যাব।
কালকে লতার সঙ্গে কথাই বলা হলো না।
কেন বলিসনি সেতো আজ জানলাম দাদার মুখ থেকে।
অফিসে গেছিলি ?
হ্যাঁ।
হাওয়া কি বুঝলি।
সবাই তোর ভয়ে তটস্থ। কার ঘাড়ে কখন খাঁড়া পরে কেউ জানে না। তবে কাজে অনেক গতি বেরেছে।
তুই আয় রাতে কথা বলবো।
আচ্ছা।
বসার ঘরে উঁকি মারলাম। দেখলাম পাঁচ মহারথী, ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনীমাসি বসে কথা বলছে।
তুই কি এখন বসবি। অনিমেষদা বললো।
আমাকে খুব দরকার আছে।
ইসলামভাই হেসে ফেললো। বিধানদাও হাসছে।
নীচে বসবে না ওপরে বসবে।
তোর ঘড়ে হলে ভালো হয়।
ঠিক আছে এসো।
যাচ্ছি তুই যা।
আমি ওপরে চলে এলাম। বড়মারা নিচেই থাকল। ওপরে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, ঘরের ছোট লাইটটা জালালাম, মানসিক ভাবে নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। কিছুতেই অনেক ব্যাপার নিজের মন থেকে মনে নিতে পারছি না। তবু মেনে নিতে হচ্ছে।
একেই মনে হয় বলে কমপ্রমাইজ। আমাকেও কমপ্রমাইজ করতে হবে। অনিমেষদার মুখের ওপর কথা বলতে পারি না। এদের জন্যই আজ আমি কলকাতা শহরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছি। না হলে কবে মরে হেজে যেতাম তার ঠিক ঠিকানা নেই।
সত্যি তুই একটা পাগল। তোকে নিয়ে….
ঘরে লাইট জলে উঠলো।
পেছন ফিরে তাকালাম। ইসি মিত্রা দুবোন আমার ঘরে। একজনের হাতে চায়ের ট্রে। আর একজনের হাতে চায়ের পট।
তুই আধ ঘন্টা সময় দে। এরপর তোকে আর পাব না। তুই ভিভিআইপি বলে কথা। ইসি বললো।
হাসলাম।
আমি ভিভিআইপি নয়, তোদের থেকেও নগন্য। তোরা আমাকে ভিভিআইপি বানিয়ে দিচ্ছিস।
আয় তিনজনে একটু চা খাই।
আমি জানলার কাছ থেকে এগিয়ে এলাম। খাটে বসলাম। ইসি চা ঢাললো।
অনিমেষদারা কোথায়।
নিচে।
কি করছে।

জোর গল্প হচ্ছে। দিদিভাই অনিমেষদাকে বললো, আপনারা একটু গল্প করুণ আমি একটু অনির সঙ্গে কথা বলে নিই।
হাসলাম।
দেখলি দিদিভাই, কিরকম হাসছে দেখ।
বল ইসি তোর কি কথা আছে।
কবে যাবি।
কোথায়।
আমাদের বাড়ি।
ইচ্ছে ছিল আজই তোদের গিয়ে রেখে আসবো। জ্যেঠিমনিকে সেরকমই কথা দিয়েছিলাম।
দেখ কিরকম তুই খোঁচা মেরে কথা বলছিস, তুই এখনো সেই দিনকার কথা ভুলতে পারিস নি।
আচ্ছা আর বলবনা।
তুই আমার একটা উপকার করবি।
বল।
আমি খাট থেকে নেমে টেবিলের কাছে গেলাম। সেদিন যে ফটোটা আমায় বরুণদা দিয়েছিল সেটা নিয়ে এলাম।
কিরে এটা নিয়ে এলি। মিত্রা বললো।
এটা নিয়ে গিয়ে যেখানে ছিল সেখানে রাখবি। আমি গিয়ে দেখব।
কেন এটা তোর বরুণদা দিয়েছে।
তুই বুঝবিনা। তোকে যা বললাম তাই করিস।
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
আমি এর থেকে একটা কপি করে নিই, তারপর দিয়ে দিস।
তাহলে দায়িত্বটা তোর ওপর থাকল। আমি যেকোন মুহূর্তে গেলে জ্যেঠিমনির ঘরে যেন ছবিটা দেখতে পাই।
আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।
এবার বল ইসি কি বলতে চাস আমাকে।
প্রথমে বল তুই কবে যাবি।
কালও যেতে পারি, আবার ছ’মাস বাদেও যেতে পারি। তুই সব দেখছিস।
দেখছি বলেই বলছি।
তাহলে।
মা বলছিল, নতুন জামাইকে মা একবার খাওয়াবে।
সেদিন এতো খাওয়ালি….সরি ভুল হয়ে গেছে। তুই ছুটকিকে নিয়ে চলে যা। কয়েকদিন থেকে আসুক।
তুই চল, তুই না গেলে আমি যাব না। মিত্রা বললো।
বড়মা, ছোটমাকে নিয়ে চলে যা।
বড়মা ছোটমা যাবে বলেছে, তোকেও যেতে হবে।
দেখি। আসল কথা বল। এই জন্য তুই ওপরে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসিস নি।
বলছি, দাঁড়া না।
আমি ইসির দিকে তাকালাম।
দেখছিস কিরকম ভাবে তাকিয়ে আছে, যেন গিলে খাবে।
মিত্রা হাসছে।
তুই বাড়িতে বসে ঘর সংসার করছিস, না অন্য কিছু করছিস।
ঘর সংসার করছি। পিকু এখন একটু বড়ো হয়েছে।
বিরাট বড়ো হয়েগেছে, তোর আর বরুণদার ভাড় বইতে পারবে।
দেখছিস তুই কেমন খোঁচা মারছিস।
আর মারবনা। বল।
দুবার হলো।
হাসলাম।
আমি ওখানে একটা নার্সারী স্কুল করতে চাই, শুরুও করেছিলাম, ভীষণ বাধা পাচ্ছি।
কারা বাধা দিচ্ছে।
আমার গলার স্বরটা ওদের কাছে বেমানান লাগল।
ইসি মাথা নীচু করে নিল।
রাজনাথের লোক জোন।
ইসি মাথা দোলাল।
স্কুলটা আছে, না বন্ধ করে দিয়েছিস।
প্রায় বন্ধ।
কোথায় করেছিলি।
আমার বাড়ির থেকে কয়েকটা বাড়ির পরে, একজনের নীচের তলাটা ভাড়া নিয়ে।
ঠিক আছে, তুই যা। আমি একটু খোঁজ খবর নিয়ে নিই। তুই একবার পারলে অনিমেষদা কিংবা বিধানদার সঙ্গে কথা বলে নে।
তুই বল, আমার বলতে কেমন যেন লাগছে।
আর।
সব একদিনে বলতে পারব না। তুই এখন ঘরের লোক, তোকে সব জানাতে হবে। না হলে বেঁচে থাকাটা দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে।
অনিমেষদারা এসে ঘরে ঢুকলো।
কিরে কথা শেষ হয়েছে।
আমার ইসি আর মিত্রার মুখের দিকে তাকাল।
কিরে মুখটা কেমন থম থম করছে।
আবার কি হলো! অনুপদা বললো।
ইসি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলবে, ওর কথা শুনে নাও, আমি নীচ থেকে একটু আসছি।
আমি নীচে নেমে এলাম। শিঁড়ির মুখে দামিনী মাসি ইসলামভাই-এর সঙ্গে দেখা হলো, দুজনে ওপরে আসছে। আমায় দেখে বললো।
কোথায় যাচ্ছিস।
আসছি। ঘরে গিয়ে বসো।
অনেক রাত পর্যন্ত অনিমেষদাদের সঙ্গে কথা হলো। এর মধ্যে আমি দুবার উঠেছি। একবার হিমাংশু যখন এসেছে তখন। আমি মিলির সঙ্গে হিমাংশুকে বসিয়ে দিয়ে চলে এসেছি, বলেছি মিত্রা মিলির সঙ্গে যাবে। তুই থাকবি।
আর একবার ইসিরা যখন ফিরে গেল। জ্যেঠিমনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল। আমি মুখে কিছু বলিনি। মন মনে বলেছি, জ্যেঠিমনি আমি জিতেগেছি।
অনিমেষদারা ফিরে যাবার পর, দামিনী মাসি, কবিতা, ইসলামভাই ফিরে গেল। টিনা, মিলিকে যেতে দিলাম না। বললাম তোমরা আজ রাতটা থেকে যাও। কাল থেকে যে যার নিজের জায়গায় ফিরে যাবে। ওরা আমার কথা রাখল। নির্মাল্যরা যথা সময়ে ফিরে গেল। কনিষ্করা আসতে পারে নি, ডাক্তারদাদার সঙ্গে ফোন করে কথা বলে নিয়েছে।
খাওয়ার টেবিলে ডাক্তারদাদা মাতিয়ে রাখল। মল্লিকদা দাদা সঙ্গ দিল। বেশির ভাগ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আমি। আমি খুব একটা কথা বললাম না। চুপ চাপ খেয়ে দেয়ে ওপরে চলে এলাম। ওরা তখনও বসে আছে।
বুঝলাম ছোটমা বড়মার একটু অভিমান হলো, তবু আমাকে মুখে কিছু বললো না। জামা কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুলাম। মিত্রা আজও একটা নতুন চাদর পেতেছে। বালিশের ওয়ারগুলোও এক। সব ম্যাচিং। সামান্য শীত শীত করছে। একটা পাতলা চাদর গায়ে টেনে নিলাম।
সারাটা দিন আজ কি ভাবে কাটল। বলতে গেলে গত পর্শু সকাল থেকে, সেই যে জ্যেঠিমনিকে আনতে গেছিলাম। তারপর থেকে নিঃশ্বাস নিতে পারলাম না। একটা ঝড় যেন আমার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। আজও সারাটা দিন তার রেশ চলেছে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চোখটা বন্ধ হয়ে এলো।
একটা মিষ্টি আবেশ আমার সারাটা শরীরে। হঠাৎ আমার চোখের পাতা দুটো কে যেন টেনে ধরে ফাঁক করলো, তারপর জোড়ে একটা ফুঁ দিলো। আমি একটু কেঁপে উঠলাম। বুঝতে পারলাম মিত্রা। জোর করে হাতটা চেপে ধরতে গেলাম। ছিটকে বেরিয়ে গেল।
দাঁড়া, চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমনো বার করছি। সকলকে সময় দেওয়ার সময় ঘুম পায় না। খালি আমাকে সময় দিতে গেলে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে।
পিট পিট করে তাকালাম। মিত্রা শরীর থেকে কাপরটা টেনে খুলছে আর বক বক করছে।
ঘুমলেই গায়ে জল ঢেলে দেব। আমার অনেক কথা আছে, পেট ফুলে যাচ্ছে। কালকে ভাবলাম বেশ মৌজ করে ফুলশয্যা করবো ও মা উনি কাজ বাড়িয়ে বসে আছেন।
আমি চাদরটা টেনে নিয়ে আপাদ মস্তক চাপা দিলাম।
বুবুন খুব খারাপ হয়ে যাবে। আমি সত্যি সত্যি গায়ে জল ঢেলে দেব।
আমি নির্বিকার।
দিলো একটানে আমার চাদর খুলে।
শয়তান কখন থেকে বলছি ঘুমবি না। পাত্তাই দিচ্ছে না।
মিত্রা ব্রা শায়া পড়ে দাঁড়িয়ে, আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
প্লীজ প্লীজ এখন না। আমি বাথরুম থেকে ঘুরে আসি।
আমি উঠে বসলাম।
তাহলে চাদর খুললি কেন।
তুই ঘুমবি না। সেই আমার বাড়িতে তোর সঙ্গে কথা বলেছি, তারপর থেকে তোর সঙ্গে কথা বলা হয় নি।
মাথায় রাখবি। বিছানায় আয় চটকে একবারে লেচি বানিয়ে দেব।
দিবি ? দাঁড়া তাড়াতারি মুখটা ধুয়ে আসি।
মিত্রা নাচতে নাচতে বাথরুমে চলে গেল। আমি আবার চাদরটা টেনে নিলাম বুঝলাম আজ আমার ঘুমের বারোটার তেরোটা। ওর বক বক শুনতে হবে। কে আমার নামে কি বলেছে। তার গুণাগুন বিচার হবে। চুপচাপ চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। মিত্রা বাথরুম থেকে বেরোলো।
আমি পিট পিট করে দেখলাম, বুকের সঙ্গে টাওয়েলটা বাঁধা। সারা অঙ্গে টাওয়েলটা ছাড়া আর কিছু নেই। ভাবলাম গিয়ে একটু কচলিয়ে দিই। তারপর ভাবলাম না থাক। ও পা টিপে টিপে আমার সামনে এলো মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, আমি ঘুমিয়েছি না মটকা মেরে পরে আছি।
মিত্রা ঘরের বড়ো লাইটটা নিবিয়ে দিয়ে ছোট লাইটটা জাললো, আলমাড়ী খুলে পাউডারের কৌট বার করলো। এটা ছিল কোথায়! এই কৌট আগে দেখি নি ? মিত্রার শরীর থেকে টাওয়েল খসে পরলো। নিরাভরণ শরীর।
আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নিঃশব্দে উঠে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। মিত্রা কল কল করে উঠলো, আমার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
আমি জানতাম তুই উঠে আসবি।
কি করে।
তোর চোখ পিট পিট করছিল, ঘাপটি মেরে পরেছিলি।
ঘেঁচু।
শিওর হওয়ার জন্য বড়লাইটটা নিভিয়ে ছোটলাইট জাললাম, পেছন ফিরে শরীর থেকে টাওয়েলটা খসিয়ে দিলাম। এতেও তুই যদি উঠে না আসতিস, তাহলে বুঝতাম তুই আবার ঘুমিয়েছিস। তখন তোকে বিরক্ত করতাম।
আমি মিত্রাকে আরো জোড়ে চেপে ধরে গালে গাল ঘোসলাম।
বুবুন।
বল।
আমি সখ করে একটা নাইটি কিনেছি, ভেবেছিলাম ওটা পরে তোর সঙ্গে ফুলশয্যা করবো।
এখনো সখ আছে।
বারে থাকবে না কেন! আমার তো ফুলশয্যা হয় নি।
সব যদি এ জন্মে সেরে ফেলিস, পরের জন্মের জন্য কি বাকি রাখবি।
পরের জম্মে তোকে যদি না পাই।
পাবি পাবি।
বলনা পরবো ?
পর।
তুই কিছু বলবি না।
কেনো।
আমি জানি তুই ওটা দেখলেই খ্যাচ খ্যাচ করবি।
তাহলে পরছিস কেন ?
খালি আজকের দিনটা, আর কোন দিন না। আমার সব সখ মেটালি এটুকু মেটা।
তাহলে আমি খ্যাচ খ্যাচ করবো।
সে তুই কর।

মিত্রা আলমাড়ি থেকে একটা প্যাকেট বার করলো। একটা সাদা রং-এর সুতোর নাইট গাউন বার করলো। আমি দেখে অবাক হয়ে গেলাম, পুরোটা কুরুশ কাঠি দিয়ে বোনা। সম্পূর্ন সুতোর তৈরি। কি সুন্দর তার বুনোট, সারাটা শরীরে একটা ময়ূরের ডিজাইন। আমি ওকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম।
কিরে তোর ভালো লাগছে ?
ভীষণ সুন্দর। কোথা থেকে কিনেছিস ?
এইটা একপিসই আছে। আমি একটা বুটিক থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়েছি।
কবে বানিয়েছিলি!
তোর বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর।
তুই জানতিস।
মনে মনে।
খালি আমার সঙ্গে একরাত পরে শুবি বলে!
হ্যাঁ।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। কি পাগল মেয়েরে বাবা।
যদি অন্য দিক থেকে ভাবি, তাহলে ও ঠিক। ওর কোনদিন বিয়ে হয় নি। যে বিয়েটা হয়েছে, তা ধর্ষণের নামান্তর। এই বিয়েকে ও বিয়ে বলে মনে করছে, এনজয় করছে। তবু মনে মনে একটা অপরিপূর্ণতা থেকে গেল। কাল এটা ওর পড়ার কথা ছিল আজ পড়লো।
আবার ভাবতে শুরু করলি ?
না।
তাহলে।
কালকে কাজটা না করলেই পারতাম। তাহলে তোর এইটা পড়তে একদিন লেট হোত না।
নারে তুই ঠিক করেছিস।
মিত্রা আমার কাছে এগিয়ে এলো, লতানো গাছের মতো আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। আমার বুকে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
জানিস বুবুন, আজ আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন।
কেন।
তুই আমার গর্ভধারিনী মাক আমার কাছে নিয়ে এসেছিস।
আমি তুই ছাড়া ঘটনাটা কেউ জানে না।
দিদিভাই শুনেছে, তবে ধরতে পারে নি। তবে কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছে।
বরুণদা।
বলতে পারব না।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
জানিস বুবুন, আমি জানতাম না বরুণদা আমাদের অফিসে কাজ করতে আসে। দিদিভাই-এর বিয়ের সময় আমি যাই নি। দেখিও নি। বুড়ীমাসির মুখ থেকে মাঝে মাঝে ওদের কথা শুনতাম। খারাপ লাগতো। আগ বাড়িয়ে কিছু করতে গেলে যদি অপমানিত বোধ করে।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রাখল।
বরুণদা আজ একটা দারুণ কথা বলেছে।
কি।
জান ছোট ম্যাডাম, এখানে না এলে মিত্রা-অনি আমার কাছে গল্পের নায়ক-নায়িকা থাকত, আজ সেই গল্পের নায়ক-নায়িকা আমার চোখের সামনে হেঁসে-খেলে বেরাচ্ছে, আনন্দ ফুর্তি করছে। আমি দু’চোখ ভরে চেয়ে চেয়ে দেখছি। ভীষণ ভালো লাগছে।
কখন বললো।
সকালে একটা ফোন এলো বরুণদার অফিস থেকে। বললো আমাদের অফিসের কম্পিউটার ডিভিসনের যিনি ম্যানেজার, কি যেন নাম ?
দিগন্ত চৌধুরী।
হ্যাঁ হ্যাঁ। তিনি কল করেছেন মেসিনের কি প্রবলেম হয়েছে। তখন বরুণদাকে বড়মা তাড়াতারি খাবার ব্যবস্থা করে দিল। আমি ভাবছিলাম একবার ফোন করে বলে দিই। তারপর ভাবলাম, না এতো তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা লিক আউট করবো না। খেতে বসে বরুণদা বললো। সবাই শুনে অবাক।
আমি মিত্রাকে দেখছি। মিত্রা কল কল করছে।
দূর ছাই তোকে কিছুই দেখান হয় নি।
মিত্রা আবার আলমাড়ির পাল্লা খুললো। অর্নামেন্টের বাক্স থেকে একটা বিছে হার বার করলো। দেখেছিস এটা।
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
কিরে কি ভাবছিস, এতো মোটা কেন ?
আমি মাথা দোলালাম।
দাদু আমার জম্মের সময় বানিয়েছিল। জম্মের সময় আমার যতটা হাইট ছিল সেই হাইটের, আর আমার ওজনের দশভাগের একভাগ ওজনের সোনা দিয়ে।
সোনা সেটা বুঝতে পারছি।
তাহলে।
তোর ওজনের দশভাগ ব্যাপারটা ধরতে পারছি না।
এটা সাতাশ ভড়ি। দিদিভাই-এরও একটা আছে। সেটা উনত্রিশ ভড়ি। দুই বোনের জন্য দুটো বিনিয়েছিল।
এবার মাথায় ঢুকেছে।
কি বলতো।
তার মানে জম্মের সময় তোর ওজন ছিল দু’কিলো সাতশো আর ইসির দু’কিলো নশো।
হবে হয়তো।
তবে তোর দাদু হেবি মালদার লোক ছিল।
তা ছিল।
চ এবার শুয়ে পরি, অনেক গল্প শুনলাম।
তারমানে! এখনো শুরুই করলাম না।
শুরু করলি না মানে!
এতো কথা এক রাতে শেষ হবে না।
তাহলে থাক বলতে হবে না।
সেকিরে! তোকে না বললে আমার পেট ফেটে যাবে।
তাহলে যেটাকে পেটে ধরেছিস তার কি হবে।
ঠিক মনে করিয়ে দিয়েছিস।
আবার কি মনে করালাম।
আজ সকালে একটা কেলো হয়েছে।
কি!
বড়মার ঘরে ঘুমচ্ছিলাম, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল, গাটা কেমন গুলিয়ে উঠলো। তখন ঘরে বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি, দিদভাই। ওরা পাটি পেরে গল্প করছিল, আমি ধরফর করে উঠে বসলাম। আমার অবস্থা দেখে ছোটমা বুঝতে পেরেছে, আমার শরীরটা গন্ডগোল করেছে।
আমি ইশারায় বললাম, বমি পাচ্ছে। ছোটমা ছুটে গিয়ে আমার ছেড়ে রাখা কাপরটা, মাটি থেকে তুলে আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। ঘরের দরজা বন্ধ করলো। বমিতো আর হলো না। কিছুক্ষণ পেট ধরে ওয়াক ওয়াক করলাম। কিছুটা লালা বেরলো।
ছোটমা ফিক করে হেসে ফেললো। আমার তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা। চোখ জলে ভড়ে গেছে। সেই সময় বড়মার মুখটা যদি দেখতিস, কি বলবো বুবুন, যেন সোনা গলে গলে পরছে। বড়মার মুখটা দেখে আমার তখন যে কষ্টটা হচ্ছিল, সব ভুলে গেলাম। খাটে উঠে এসে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরলো।
কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ততক্ষণে ছোটমা জল নিয়ে চলে এসেছে। খাটে বসে বসেই, আমি মুখে চোখে জল দিলাম। তারপর ছোটমা ডিটেলসে সব গুছিয়ে বলে দিল। সব শোনার পর, জ্যেঠিমনির আনন্দ আর ধরেনা। দিদিভাইতো বলেই ফেললো, বড়মা নার্সিংহোম থেকে সোজা আমাদের বাড়ি, একমাস ওখানে, তারপর এই বাড়ি।
আমি একটু ঠান্ডা হতে, বড়মা গিয়ে ডাক্তারদাদাকে ডেকে আনল, সব বললো। ডাক্তারদাদার হাসি দেখলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আস্তে করে বললো, বুঝলে বান্ধবী, ছেলেটার অঙ্কের মাথা খুব ভালো।
তখন এক বাড়ি লোক, আমি ভাবলাম এই বুঝি জানাজানি হয়ে গেল।
বৌদি, সুরো ছিলো না ?
তখন ওরা বেরিয়ে গেছে।
বড়মা এবার ডাক্তারদাদাকে চেপে ধরলো, ও সামন্ত ভয়ের কিছু নেই।
আগে চা খাওয়াও তারপর বলবো।
বড়মা খিঁচিয়ে উঠলো।
জ্যেঠিমনির তখন কি হাসি, ফুলে ফুলে উঠছে।
তুই খুব এনজয় করছিলি বল।
খুব।
তারপর ছোটমা চা নিয়ে এলো। ডাক্তারদাদা চায়ে চুমুক দিল। বড়মা বললো।
সামন্ত তুমিতো আমাদের থেকে অনিকে অনেক বেশি চেন।
চিনি।
তাহলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, সত্যি করে বলবে।
পারলে বলবো, তবে সব সময় যে আমি ওকে বুঝতে পারি, সে কথা হলপ করে বলতে পারব না। সত্যি কথা বলতে কি ও নিজেই নিজেকে ঠিক মতো চেনে না। আমরা তো কোন ছাড়।
এই তুমি হেঁয়ালি শুরু করলে। খালি অনির মতো পাশ কাটাবার ফন্দি।
আচ্ছা তুমি বলো, পাশ কাটাব না।
জ্যেঠিমনি, ডাক্তারদাদা আর বড়মার কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পরে।
বড়মা তোকে জ্যেঠিমনির সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করে নি।
হাল্কা আওয়াজ দিয়েছিল।
কি।
হ্যাঁরে তোর জ্যেঠিমনিকে অনি কোথা থেকে ধরে আনলো। তুইতো কোনদিন বলিস নি।
আমি সঙ্গে সঙ্গে পাল্টি। তোমাকে বলেছি আকারে ইঙ্গিতে, তুমি ধরতে পার নি।
আমি হাসছি।
তুই বেশ পাকা খেলোয়াড় হয়েগেছিস।
তোর থেকেও ?
হুঁ।
দুজনে বিছানায় এসে শুয়ে পরলাম। মিত্রা আমার বুকে উঠে এলো।
আজ কিন্তু একবার, বেশিক্ষণ না। মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
না আমার দম নেই।
আমি দম দিয়ে দেব।
আমি হাসলাম।
তারপর শোন না।
বলবি তো।
দেখছিস দেখছিস, তুই কেমন খোঁচা খুঁচি শুরু করেদিলি।
ঠিক আছে বল। হাতটা একটু রাখি ?
আচ্ছা।
তারপর বড়মা বললো, আচ্ছা ডাক্তার অনি যাকে ওরকম দেড়ে মুশে গালাগাল দিল, তাকে হঠাৎ ছাড়িয়ে আনতে গেল কেন ?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে।
আচ্ছা বুবুন, সত্যি করে বলতো, তুই কেন প্রবীরদাকে ছাড়িয়ে আনতে গেলি ?
কেন ডাক্তারদাদা তো তার ব্যাখ্যা দিয়েছে।
দিয়েছে, বড়মার মন পসন্দ হয় নি।
তাহলে।
সব শোনার পর বড়মা বললো, যতই বলো ডাক্তার তোমার এই ব্যাখ্যাটা ঠিক জুৎসই হলো না। কেমন যেন ফলকা ফলকা।
আমি মিত্রার কথায় হাসছি।
বলনা, তুই ওরকম করিস কেন।
তুইতো গেছিলি আমার সঙ্গে। কিছু বুঝিস নি।
দাঁড়া এটাকে খুলি। তোর সঙ্গে বডি কন্টাক্ট হচ্ছে না।
খোলার কি আছে। সবই তো দেখতে পাচ্ছি। ভেতরে কিছু পরিস নি। ফাঁক ফোঁকর দিয়ে যতটা কন্টাক্ট হয় ভালো।
এই তুই শুরু করলি। যা আমি খুলে ফেলছি।
তাহলে আমি ঘুমিয়ে পরবো।
ঘুমনা, চোখে খোঁচা মারবো। দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
মিত্রা নাইট গাউনের বুকের কাছের হুক গুলো খুলে ফেললো। আমি হেসে ফেললাম।
তুই জানিস না, তোর বুকে বুকটা দিয়ে শুলে কি আরাম পাই।

মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ডাক্তারের বুকে কখনো বুক দিয়ে শুস নি। খুব জোড় সামলে নিলাম। হাসলাম। মিত্রা আমার বুকে নেমে এলো।
এবার বল।
কি ?
কেন প্রবীরদাকে ছাড়িয়ে আনলি। তাও নিজের বন্ডে।
আমার স্বার্থ আছে। তাই।
সে তো বুঝলাম, কিসের স্বার্থ, বল।
তোর কাগজটাকে আরও বড়ো করে তুলতে হবে। পয়সা থাকলেই বড়ো হওয়া যাবে না। সরকারী ক্ষমতাও তার সঙ্গে কিছুটা দরকার।
প্রবীরদার কনো ক্ষমতা নেই!
কে বললো নেই।
তুই এমন লাগলি মন্ত্রীত্ব থেকে রিজাইন দিল।
ওটা সাময়িক।
তবে কালকের কেশটা যদি উইথড্র না করতাম তাহলে পার্টিতে একটা বড়ো-সড়ো গন্ডগোল হতো। বিধানদা, অনিমেষদা দু’জনেরি বিপদ বারতো। টালমাটাল পজিসন তৈরি হয়ে যেত।
কেন ?
তোর মাথায় ঢুকবে না।
তুই ঢোকালেই ঢুকবে।
দেখ আমাদের শরীরে যেমন হাত-পা-মাথা আছে, এরা পাঁচজন পার্টির হাত-পা-মাথা। পাঁচজনে মিলে একটা শরীর। বিধানদা প্রবীরদা, অনুপদাকে তৈরি করেছেন। রূপায়ণদা অনিমেষদার হাতে তৈরি। কিন্তু প্রবীরদা খুব তাড়াতারি ক্ষমতা পেয়েগেছে। ফলে কিছুটা পদস্খলন হয়েছে।
আজ রাজনাথকে (সন্তর্পণে ডাক্তারের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলাম) ঘাঁটতে গিয়ে অনেক কিছু ভেতরের ব্যাপার সামনে চলে আসছে। হয়তো অনিমেষদা, বিধানদা জানে আবার হয়তো জানে না। ওরা ধরতে পারে নি, আমার সোর্সটা ওদের থেকে স্ট্রং।
বৌদির মুখ থেকে শুনেছে। কিন্তু অতটা গেইজ করতে পারে নি। তবে এই কয়দিনে ওরা আমাকে পায়ের নোখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত মেপে নিল। আজ রাতের মিটিংয়ে একে অপরকে বুঝলাম।
আমার তরফ থেকে এই বার্তাও ওদের কাছে পৌঁছে দিলাম, তোমরা আমাকে প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে আটকে রাখতে পারবে না। তবে তুই যদি আমার কাছ থেকে সরে যাস আলাদা ব্যাপার।
কেন এ কথা বলছিস ?
আজ পর্যন্ত যা কিছু করতে পেরেছি, তোর জন্য, তুই আমাকে ক্ষমতটা দিয়েছিলি তাই। সত্যিকারের আমার পেছনে যদি মালিকের তকমাটা না থাকতো, তাহলে আমি কিছু করতে পারতাম না।
আমি সেটা ফিল করি। আজ তোকে একটা কথা বলছি, আর কোনদিন বলবো না, তুই আমাকে এভাবে আর কোনদিন বলবিনা। আমি তোকে কোনোদিন আমার জীবন থকে সরাব না। বরং তুই আমাকে সরিয়ে দিতে পারিস, তোর জীবন থেকে।
আমি মিত্রাকে কাছে টেনে নিলাম। ওর কপালে চুমু খেলাম।
রাগ করিসনা, মাঝে মাঝে আমার কেমন যেন মনে হয়। নিজের প্রতি নিজে আস্থা হারিয়ে ফেলি। সব কেমন গোলমাল পাকিয়ে যায়। আমি চাই আমার ভুলগুলো তোর চোখ দিয়ে দেখব।
কাল রাতে টনা মনাকে বৌদি নিজে হাতে খেতে দিয়েছে, বসে বসে খাইয়েছে।
ওই ছেলেগুলোর কথা একবার ভাব। মুখ দুটো চোখের সামনে ভেসে উঠলেই, বার বার শিউরে উঠছি।
তোকে ওরা অন্ধের মতো ভালবাসে।
আমি কোনদিন ওদের কাছে কিছু চাই নি। কিন্তু প্রবীরদা মিস ইউটিলাইজ করলো। এখানে আসার আগে যদি একবার জানতে পরতো ওরা আমার বাড়িতে আসছে। তাহলে প্রবীরদার ক্ষতি করে দিত।
কেন।
ওইযে তুই বললি ভালবাসা।
সেই জন্য মালতীর সঙ্গে অনিমেষদা বিধানদা আলাদা করে কথা বলেছে। সে কি জেরা রে।
তুই ছিলি না।
তখন সবে মাত্র ওই অবস্থা থেকে উঠেছি। ইচ্ছে করেনি শুনতে।
ছাগল।
তুই আমাকে ছাগল বললি ?
তাহলে কি বলবো। কষ্ট হলেও শুনতে হয়। তাহলেই শিখবি। না হলে কাঁচকলা।
বুবুন তুই কিন্তু মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছিস। আমি এখন তোর বিয়ে করা বউ।
ঘুমিয়ে পর। আমিও একটু ঘুমিয়ে বাঁচি।
দাঁড়া পেটে টান লাগছে। নীচে নেমে শুই।
কিরে কোন সমস্যা!
এই সময় এরকম একটু হবে, ডাক্তারদাদা বলছিল। গাদাখানেক ওষুধ দিয়েছে। খেতে হবে। বড়মা বলে দিয়েছে। এখন আর কোথাও যাওয়া হবে না। অফিসে তিনঘন্টার বেশি থাকা যাবে না। প্রয়োজনে অফিসকে বাড়িতে নিয়ে চলে আসতে।
তুই আমার বিপদ বাড়ালি।
তুই কিন্তু এখনো বললি না। কেন প্রবীরদাকে ছাড়িয়ে আনলি।
এতো কথা বলার পরও খোলসা করে বলতে হবে, কেন ছাড়ালাম।
ওই জন্য ডাক্তারদাদা বললো, বুঝলে বান্ধবী ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো ধোঁয়াসা। তবে ও এই ক্ষেত্রে সর্ট-টার্ম গেম খেললো না। লং-টার্ম গেম খেললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
কিরে তোর চোখ দুটো স্থির কেন। আবার কি প্ল্যান ভাঁজছিস।
কিছু না।
জানিস বুবুন জ্যেঠিমনি দিদিভাই যতো তোর কথা শুনছে, ততো অবাক হয়ে যাচ্ছে।
কেন।
সেই রাতে অতো লোক জন এসেছে, এটা ওরা ভাবতেই পারে নি।
তার ওপর তোর ওই কীর্তি। জ্যেঠিমনি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল। প্রেসার হাই। নীরু ওষুধ দিল। তারপরই ঘুম। ব্যাশ সব ঠিক।
ইসি তখন অনিমেষদাকে বলেছে।
প্রথমে বলতে চায় নি। লজ্জা পাচ্ছিল। অনিমেষদা বললো, তুই বলনা, তোর কোন ভয় নেই। তখন ও অনিমেষদাকে সব বলেছে।
কি বললো অনিমেষদা।
প্রথমে গম্ভীর হয়ে গেল। প্রবীরদাকে বললো, এই সমস্যার সমাধান তুমি করবে। আমি অনুপকে দায়িত্ব দিতে পারতাম। কিন্তু দেব না।
প্রবীরদা শুনে কি বললো।
কালকেই ওখানে যাবে। আমাদের ও বাড়ির এ্যাড্রেস নিয়ে নিল। জানিস দিদিভাইকে ওরা খুব অপমান করেছে। তোকে ও সব কথা বলে নি। শুনলে তুই যদি কিছু করে বসিস।
জানি।
তুই জানিস।
আমি খবর নিয়ে নিয়েছি।
কখন নিলি ?
তোকে জানতে হবে না। আর কি বললো।
প্রবীরদাকে এক সপ্তাহের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে দিতে বলেছে। এও বলেছে অনি যেন এর মধ্যে ইন্টারফেয়ার না করে। সেটা তুমি দেখবে।
তাই জন্য যাওয়ার সময় প্রবীরদা বললো কাল বিকেলে একবার আসব তুই থাকিস।
তোকে বলেছে!
হ্যাঁ।
তখন প্রবীরদার কথা শুনে মনে হচ্ছিল তোকে ভীষণ ভয় পাচ্ছে।
ছাড় ও সব কথা, বরুণদা কি বললো ?
দিদিভাইকে বলেছে, তুমি এই ছেলেটাকে সকালে বাড়ি থেকে বার করে দিচ্ছিলে। আচ্ছা সত্যি করে বলো, সারাজীবন তুমি যদি চেষ্টা করতে এই সব লোকের সান্নিধ্যে আসতে পারতে ?
কি বললো ইসি।
খুব লজ্জা পেয়ে গেল। চোখদুটো ছল ছল করে উঠলো।
জানিস ইসিরটা বেশ টাইট।
কি টাইট।
কিছু না।
ওরে শয়তান, কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে এলি।
আমি হো হো কেরে হাসছি। মিত্রা আমার ঠোঁটে কামড় দিল। দুবার কোমড় নাচিয়ে নিল।
আমার পেট ফেটে যাবে। আমি হাসতে হাসতে বললাম।
যাক না যাক।
আমি হাসছি।
আমি জানতাম তুই নীরুর পেট থেকে কথা বার করবি।
তবে তোর থেকে নয়।
দিলো আমার বুকে গুম গুম করে কিল।
মিত্রা আমার বুকে নেমে এলো। আমার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। আমি ওর কথা রাখলাম। শরীর থেকে সুতোর নাইটিটা খসিয়ে দিলাম। মিত্রা আমার আরও কাছে গভীর ভাবে এগিয়ে এলো। চোখে চোখ। ঠোঁটে ঠোঁটে কথা। দুজনে শরীরী খেলায় মেতে উঠলাম। আজ সেই ভাবে না খালি ছোঁয়া ছোঁয়া। কতোক্ষণ খেলা করলাম জানি না। শরীর আর টানছে না। একথা সেকথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পরলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি ঘরে একা শুয়ে আছি। চারিদিকের দরজা জানলা হাট করে খোলা। এমনকি বাইরের দরজাটাও খোলা। আমাগাছের পাতায় বাতাসের ছোঁয়ায় শির শির করে একটা মিষ্টি আওয়াজ ঘরের চারদিকে ম ম করছে। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করলাম এখন কটা বাজে। জানলা দিয়ে সূর্যের চেহারা দেখে বুঝলাম, বেশ বেলা হয়ে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। কিছুক্ষণ অলস দৃষ্টি নিয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম।
তারপর নেমে এসে ব্রাসে মাজন লাগিয়ে জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমগাছটায় ছোট ছোট আম হয়েছে। আপন মনে যে যার ঝুলে আছে। সেই কাক দুটোকে আর দেখতে পাচ্ছি না। তাদের পরিত্যক্ত বাসাটা এখনো আমগাছের একটা ডালে ঝুলে আছে। নিচের দিকে তাকালাম। পেয়ারা গাছটায় দুটো শালিক বসে ঠোঁটে ঠোঁট ঘসছে।
একটু দূরে পাঁচিলের গায়ে চোখ পরলো। অনেক গুলো বেল ফুলের গাছ, মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এ নিশ্চই ভজুরামের কাজ। ভজুরাম সারাদিন বড়মা ছোটমার পেছন পেছন ঘুর ঘুর করে, আর বাগান পরিচর্যা করে। বেশ আছে। গণিকা পল্লীর বয়ের থেকে ভালো আছে। জানলা থেকে সরে এসে বাথরুমে ঢুকলাম। ভালো করে ফ্রেস হয়ে বাথরুমের বাইরে এলাম। ইজি চেয়ারে বড়মা। হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। আমার দিকে তাকাল।
কখন উঠলি।
আমি মুচকি হাসলাম।
বড়মা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
আমি মুখ মুছে টাওয়েলটা কাঁধে ফেললাম, আলনা থেকে টেনে একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করলাম। বড়মা আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তুই উঠে পরেছিস! ছোটমা বলতে বলতে ঘরের ভেতর এলো।
দিদি এখানে নিয়ে চলে আসি ?
কেন, আমি নিচে যাচ্ছি।
বড়মার দিকে তাকিয়ে।
জানি তোমাদের অনেক প্রশ্ন আছে। আজ তার সঠিক উত্তর আমায় দিতেই হবে।
বড়মা, ছোটমা আমার দিকে তাকিয়ে, আমাকে বোঝার চেষ্টা করছে।
কিগো তাই তো ?
বড়মা এমন ভাবে মুখ টিপে হাসলো, আমি হেসেফেললাম।
খালি ফিচলেমি। দেবনা কান মূলে। ছোটমা তেড়ে এলো।
আজ কোথাও বেরবনা বুঝলে বড়মা। আজ খালি তুমি আমি ছোটমা। খাব আর গল্প করবো। কি মজা বলো।
দেখছিস দেখছিস ছোট। ও কিরকম এখন থেকে প্ল্যান ভাঁজছে দ্যাখ।
তুমি দেখো, ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছি। খাবার নিচে খাবে না ওপরে নিয়ে আসবো ?
এই দ্যাখো, বললাম আমি নিচে যাচ্ছি। তোমরা নিচে গিয়ে টেবিলে বসো, আমি চেঞ্জ করেই চলে যাচ্ছি।
বড়মা ছোটমা দুজনেই বেরিয়ে গেল। ভাবলাম চেঞ্জকরে নিচে চলে যাই, তারপর ভাবলাম না, স্নানটা একেবারে সেরে নিই। ভাবামাত্রই আর অপেক্ষা করলাম না। বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে নিলাম। তারপর নিচে এলাম। দুজনে তখনো গুছিয়ে উঠতে পারে নি। বুঝলাম আরও কিছু কাজ এর মধ্যে সেরে ফেলেছে। আমি টেবিলে এসে বসলাম।
কিগো আমি মাঝখানে দুজনে দুপাশে, না মুখো মুখি।

মনে খুব ফূর্তি মনেহচ্ছে। ছোটমা হাসতে হাসতে বললো।
হবে না। বাবু প্ল্যান মাফিক সব কাজ শেষ করলেন। বড়মা প্রতিউত্তর দিল।
এইতো শুরু করলে, অনি তাহলে ভোঁ ভাঁ।
যা না দেখি, তোর কতবরো ক্ষমতা। মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেব।
বড়মার কথায় ছোটমা হাসছে।
আমি বড়মাকে পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
পারবে অনির ঠ্যাং ভাঙতে।
বড়মা হাসছে।
চলো খিদে পেয়ে গেছে। মিত্রারা কোথায় ? অফিসে ?
অফিসে কেন যাবে। তুই সবাইকে কাজ দিয়ে রেখেছিস। কাজ সারতে গেছে।
দাঁড়াও একটা ফোন করি।
তোর ফোন খোলা আছে ? বাড়িতে থাকবি, তাও স্যুইচ অফ।
আমি ঘুমোচ্ছিলাম, তুমি খুলে দিতে পারতে।
খালি মুখের ওপর কথা।
ঠিক বলেছ এ ভাড়ি অন্যায়।
ফোনটা স্যুইচ অন করলাম, তবে কাউকে ফোন করলাম না। খোলার সঙ্গে সঙ্গে যা হয় কিছু মিস কল আর ম্যাসেজ।
ছোটমা খাবার নিয়ে চলে এলো। আজ কিন্তু বাটি চচ্চড়ি আর লুচি নয়। দেখলাম কড়াইশুঁটির কচুরি বানান হয়েছে, তার সঙ্গে বেশ কষা কষা আলুর দম। দুজনে আমার দুপাশে। বুঝলাম একেবারে শাঁড়াসি আক্রমণ চলবে। আমিও মনে মনে প্রস্তুত হয়ে নিলাম।
খাওয়া শুরু হলো।
দাদা মল্লিকদা কখন বেরিয়েছে।
সব এক সঙ্গে বেরিয়েছে।
খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়েছে, না এসে খাবে ?
টিফিন করে গেছে, বললো অফিসে খেয়ে নেবে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ, আমি মাথা নীচু করে আছি। বুঝতে পারছি, দুজনের চোখ আমার দিকে।
মাথা তুললাম।
বলো কোনখান থেকে শুরু করবো। জ্যেঠিমনি থেকে না প্রবীরদা থেকে, না সেদিন রাতে মিত্রার বাড়িতে সারারাত জেগে কি করছিলাম সেখান থেকে।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। গালটা টোবলা হয়ে গেছে। নড়া-চাড়া করছে না। ছোটমা আমার কথা বলার ভঙ্গিমায় থ হয়ে গেছে।
কি ভাবছো। অনি তোমাদের মনের কথা পটাপট বলে দিচ্ছে বলে ? না অনি যাদু জানে ?
দুজনেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
বুঝলে বড়মা, অনি থট রিডিং করতে পারে।
আমি নির্বিকার ভাবে কথা বলে চলেছি আর খেয়ে যাচ্ছি।
সেদিন রাত জেগে দিদির (জ্যেঠিমনির) কথা উদ্ধার করলি, না আরও কিছু আছে। ছোটমা বললো।
আরো আছে। সেগুলো এখন বলা যাবে না।
বড়মা আর একটা কচুরি আলুরদম সহযোগে মুখে তুললো।
আচ্ছা বড়মা জ্যেঠিমনিকে দেখে তোমার কেমন মনে হলো। আমি যদিও জ্যেঠিমনিকে দশবছর পর দেখলাম।
তুই দিদিকে আগে দেখেছিস ? ছোটমা বললো।
যখন মিত্রাদের বাড়ি যেতাম, সেই কলেজ লাইফে।
কই আগে বলিসনি। বড়মা বললো।
তুমি কখনো বলেছো তুমি ডঃ রায়ের ছাত্রী।
বড়মা হাসতে হাসতে কান ধরার জন্য হাত তুললো।
আমি মাথা সরিয়ে ছোটমার দিকে হেলে পরলাম। বড়মার পাত থেকে একটা কচুরী তুলে নিলাম। ছোটমা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
সেই ভাবে প্রয়োজন হয় নি। তবে সেই রাতে মিত্রার মুখ থেকে কিছু কথা জানার পর মনে হলো ওই দিনটা জ্যেঠিমনির উপস্থিত থাকা খুব প্রয়োজন। তাই নিয়ে এলাম।
ভদ্রমহিলাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি। বড়মা বললো।
আমি অর্থপূর্ণ হাসি হাসলাম।
হাসিসনা বল। ছোটমা বললো।
তুমি তোমার ব্রেনটা সার্চ করো, দেখবে পেয়ে যাবে।
বয়স হয়ে গেছে, স্মরণশক্তিতে ছাতা পরেছে।
আমি হাসছি।
আচ্ছা বড়মা মিত্রা তোমার বিয়ের বেণারসী পরে বিয়ে করতে বসলো। কেন বসলো ?
তা বলতে পারব না। তবে ও এমন ভাবে জেদ ধরলো। না বলতে পারলাম না।
তোমার মনে প্রশ্ন আসে নি, কেন মিত্রা জেদ ধরলো। তোমার বিয়ের বেনারসী পরে তোমার ছেলেকে বিয়ে করবে।
ওরতো অনেক খেয়াল, ভাবলাম ওটাও ওর একটা খেয়াল।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম, কিছু লোকাবার চেষ্টা করছে কিনা।
আচ্ছা বড়মা তুমি আমাকে তোমার সব কথা বলেছো, আমি যদি তোমাকে আরও কিছু কথা বলি তুমি মনে কিছু করবে না। কোন দুঃখ পাবে না।
কেন তুই এ কথা বলছিস। ছোটমা বললো।
দাঁড়া ছোট, ওকে বলতে দে।
ছোটমা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
জানো বড়মা মাঝে মাঝে নিজের ওপর ভীষণ আক্ষেপ হয়। মনেহয় পৃথিবীতে আমি জন্মেছি সবার জট ছাড়াতে। ছাড়িয়েও যাচ্ছি। শেষে নিজের জট ছাড়াব। তখন তোমাদের কাছ থেকে কিছু দিনের জন্য ছুটি নেব।
কেন একথা বলছিস!
হঠাৎ মনে হলো, তাই বললাম।
ছোটমার ফোনটা বেজে উঠলো। আমার দিকে তাকাল।
মিত্রা।
কথা বলো।
তুই বল সকাল থেকে তিনবার ফোন হয়েগেছে।
তুমি কথা বলো, তারপর বলছি।
বল।….হ্যাঁ বাবু উঠেছেন….
ছোটমা আমার হাতে ফোনটা বাড়িয়ে দিল। আমি কানে দিলাম।
শয়তান নিশ্চই তোমাদের সঙ্গে আলুরদম কচুরি খাচ্ছে। আমাদের বাড়ি থেকে বার করে….।
কেন তোরা খেয়ে যাস নি।
কাল রাত থেকে সকলকে কাজ দিয়ে দিয়েছিস, খাবার সময় পেলাম কোথায়।
হরিদার ছেলেকে বল আনন্দ থেকে বিড়িয়ানি এনে দেবে।
তাহলে তুই আয়।
আমি একটা জরুররি মিটিং করছি বড়মার সঙ্গে।
ওই ব্যাপারে।
হ্যাঁ।
তাহলে পরে ফোন করবো।….ছাড়িসনা….ধর ধর মিলি একটু কথা বলবে।
দে।
অনিদা।
বলো।
তোমার জন্য এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম।
আমার জন্য কেন। তুমি চেয়েছিলে।
তুমি না থাকলে আরও কতদিন ঝুলতাম জানি না।
শুষ্ঠভাবে কাজ হয়েছে।
হবে না মানে। ইসলামভাই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছে।
ইসলামভাই গেছিল!
কেন বড়মা কিছু বলে নি।
আমি কি সবাইকে সব কথা বলি।
মিলি হাসছে।
ঠিক আছে দেখি যদি পারি যাচ্ছি।
আচ্ছা।
ছোটমার হাতে মোবাইলটা দিলাম। বড়মার দিকে তাকালাম।
কিগো ইসলামভাই গেছে তুমি বলো নি।
ওইতো উত্তরটা বলে দিলি।
মনে থাকে যেন।
ছোটমা কাঁধে হাত দিল।
সব সময় কান ধরলে চলে এখন অনি বিয়ে করেছে।
ছোটমা হেসে ফেললো।
তারপর বল।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম।
হ্যাঁ। সত্যি তোমার মনে কোনো প্রশ্ন আসে নি।
এসেছে উত্তর পাই নি।
আচ্ছা বড়মা এখন যদি তোমাকে আমি কিছু কথা বলি তুমি একটুও দুঃখ পাবে না।
কেনো তুই বার বার এক কথা বলছিস।
নিজের মধ্যে একটা সংকোচ বোধ কাজ করছে। কিন্তু তোমাকে ব্যাপারটা বলা দরকার।
বল।
তাহলে তোমাদের দুজনকে একটা কথা দিতে হবে।
বল। কি কথা।
আমি তোমরা দুজন মিত্রা ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কেউ জানবে না।
তোর দাদা মল্লিক!
না। শুধু আমরা এই তিনজন।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকাল।
কি কথা দিচ্ছ।
দিলাম।
আমি খুব ধীর স্থিরভাবে একে একে সেই রাতের সমস্ত কথা বললাম। প্রায় এক ঘন্টা লাগল বলতে। এর মধ্যে বড়মা কোন কথা বলে নি। কখনো গম্ভীর হয়েছে। কখনো অবাক বিস্ময়ে আমাকে দেখেছে। ছোটমা নির্বাক শ্রোতা। খাওয়া শেষ, চা খাওয়া হয়ে গেছে এক রাউন্ড। তবু আমি ছোটমাকে বললাম আর একবার চা নিয়ে এসো, তারপর আর একটা ধাপ তোমাদের বলবো। তারপর তোমরা আমাকে প্রশ্ন করবে। আমি তার উত্তর দেব।
ছোটমা উঠে চলে গেল, রান্নাঘর থেকে চায়ের ফ্লাক্সটা নিয়ে এলো। চা ঢাললো।
এবার আমি সেদিন সকাল থেকে মিত্রার বাড়িতে গিয়ে প্রথম থেকে যা যা ঘটনা ঘটে ছিল সব বললাম, এমন কি জ্যেঠিমনির সঙ্গে কি কথা হয়েছে, আমি জ্যেঠিমনিকে কি কথা বলেছি সব। শুনতে শুনতে ছোটমার চোখ বড়মার চোখ ছল ছল করে উঠলো।
কাঁদলে কিন্তু অনি নিজেকে আর ওপেন করবে না। চুপ করে যাবে। অনি নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করবে। আর তোমাদের কিছু বলবে না।
বড়মা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলো। ধরাগলায় বললো।
আমাকে একবার নিয়ে চল।
তুমি দুর্বল হয়ে পরছো।
দোষটা আমার।
না দোষটা তোমার নয়, তোমার পরিবারের। মিত্রা একদিন তোমার বসিরহাটের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে।
মিত্রা আমার বাড়িতে গেছিল!
হ্যাঁ। কোন একটা কারণে তোমার বসিরহাটের বাড়িতে যেতে সে বাধ্য হয়েছিল।
বড়মা মাথানীচু করে রইলো।
সেই জন্য ও আমার পরনের বেনারসীটা পরে বিয়ে করতে বসেছিল, আমার সিঁদুর কৌটো থেকে সিঁদুর নিয়ে বিয়ের আসরে সিঁথিতে দিয়েছিল!
হ্যাঁ।
বড়মা চোখ মুছছে।
তুমি এরকম করলে আমি কিন্তু উঠে চলে যাব।
যাস না। তুই এখন আমার বল ভরসা।
শুধু তোমার না দিদি আমাদের সকলের। ছোটমা বললো।
জ্যেঠিমনি মিত্রাকে গর্ভে ধারণ করেছে, কিন্তু মিত্রা জানে তুমি তার বাবার বিয়ে করা বৌ।
ও কোন অন্যায় করে নি। আমি ওর জায়গায় থাকলে এরকম করতাম।
আমি বড়মার গলা জড়িয়ে ধরলাম। বড়মা আমার কাঁধে মাথা রেখেছে, বুঝতে পারছি চোখের জলে আমার কাঁধ ভিঁজে যাচ্ছে।

তুমি কাঁদলে কথা বলি কি করে।
কতো কষ্ট বুকে নিয়ে মেয়েটা বেঁচে আছে বল।
সে তুমি কি করবে, এটা ওর ভাগ্যের লিখন।
ছোট ওকে ডেকে নে।
এখন থাক, ও লজ্জা পাবে। আমি ওকে বলেছিলাম, তুই নিজের মুখে বড়মাকে বল। ও বলেছে আমি কোনদিন বড়মাকে মুখ ফুটে এসব কথা বলতে পারব না।
বড়মা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে চলেছে।
তাহলে তোমরা কান্নাকাটি কর আমি চললুম।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বড়মা আমার হাতদুটো চেপে ধরলো।
আমায় কিন্তু তোমরা দুজনে কথা দিয়েছ, দাদা মল্লিকদা কোনদিন জানতে পারবে না।
ছোটমা মাথা দোলাচ্ছে।
মিত্রাকে একবার ডাকি। বড়মা বললো।
কেন।
ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
আমি বড়মার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বড়মা মাথা নীচু করে নিল।
ঠিক আছে ডাকো, কান্নাকাটি করতে পারবে না।
আচ্ছা।
ছোটমা নীচুস্বরে মিত্রার সঙ্গে কথা বললো। আভাসে ইঙ্গিতে বুঝলাম, ও চলে আসছে। আমি আছি কিনা সেটাও ও জিজ্ঞাসা করছে, বড়মা মনখারাপ করছে কিনা সেটাও ও জিজ্ঞাসা করছে। ছোটমা হ্যাঁ হুঁ করে উত্তর দিয়ে চলেছে।
সেদিন ও যে ওর বাবার ফটোটা দেখাল সেটা তো ও নয়।
তোমাকে অরিজিন্যাল ফটো দেখায় নি। যদি তুমি ধরে ফেল। ও তোমাকে ওর দাদুর ছোট বেলাকার একটা ফটো দেখিয়েছিল।
বড়মা মাথা নীচু করে আছে। ছোটমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুই কখনো ওকে দেখেছিস।
সামনা সামনি দুবার কথা হয়েছে। সেই কলেজ লাইফে। তারপর আর যাই নি।
তুই দামানিদের বাড়ি কখনো গেছিস।
সেই সৌভাগ্য আমার হয় নি।
আমি একবার তোর দাদার সঙ্গে গেছিলাম।
মিত্রার মার সঙ্গে তোমার আলাপ হয়নি।
উনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তোর দাদাকে খুব ভালো বাসতেন। তাই বড়োমুখ করে বলেছিলেন, একবার বৌমাকে নিয়ে আসিস দেখবো।
তার মানে উনি ব্যাপারটা জানতেন।
বলতে পারব না।
আচ্ছা দাদা কোনদিন জানতেন না।
তোর দাদার সঙ্গে মিত্রার বাবার সম্পর্ক ভালো ছিলো না। তোর দাদা সব সময় দামানির কথা মতো চলতো।
কেন তখনতো মিত্রার বাবা কাগজের সর্বে সর্বা।
ঠিক, তবুও দামানিদের প্রতিপত্তি তখন কমে যায় নি।
তারপর।
তারপর তোর দাদার ওপর একটা প্রেসার ক্রিয়েট করা হলো। তখন তুই সবেমাত্র কাগজে আসা যাওয়া শুরু করেছিস। তোর চাকরিটা দামানির জন্য হয়েছে। তোর দাদা দামানিকে বলে তোর চাকরির ব্যবস্থা করেছিল।
ডাক্তার কবে থেকে কাগজের দায়িত্ব নিল।
যখন মিত্রার বাবা আসা বন্ধ করলো।
তখন দাদা তোমাকে এসে কিছু বলতো না।
একদিন রাতে ফিরে বললো। বুঝলে মিনু আজ থেকে কাগজে নতুন মালিক আসা শুরু করলেন। আমি বললাম কি রকম। তা বললো, দামানির জামাই অসুস্থ, তাই সে তার জামাইকে দায়িত্ব দিয়েছে। আমি বললাম কেন দামানির মেয়ে গেল কোথায়। তা বললো, ওর কথা ছাড়ো, খালি ক্লাব পার্টি করে বেড়াচ্ছে।
তখন দামিনী বেঁচে।
উনি বেঁচে ছিলেন।
তুমি মিত্রাকে কবে প্রথম দেখেছো।
আমাদের বাড়িতে যেদিন প্রথম এলো।
মিত্রা তোমাকে এখানে আসার আগে দেখেছে।
কবে!
তুমি একদিন আমাদের কাগজের কোন একটা ফাংসনে গেছিলে সেদিন।
বড়মা আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
তারপরে ও দাদার প্রতি রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য এসব করেছিল। তখন ও ভেসে বেড়াচ্ছে। জীবনটাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছে। বাবা মারা গেছে। মাকে স্লো-পয়জেন করে ডাক্তার মেরে দিয়েছে। মিত্রা তখন ডাক্তারের হাতের পুতুল। কাঠগোড়ায় দাঁড় করিয়েছে তোমাকে দাদাকে, সঙ্গে মল্লিকদা। সুনীতদা এই সুযোগটা নিয়েছে। বলতে পার সেই সময় আমার আবির্ভাব।
তুই আর বলিস না।
বড়মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ছোটমা চোখ মুছছে।
তুমি কাঁদছো কেন। তুমি চেষ্টা করলে এখন কিছু করতে পারবে।
দুজনেই নিস্তব্ধে চোখের জল মোছে।
বাইরের বাগানে গাড়ি এসে দাঁড়াবার শব্দ হলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বড়মা আমার হাতটা ধরে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল। দুজনে আমার দুহাত ধরে আছে। যেন কতো অপরাধী। আমি গেটের দিকে তাকিয়ে আছি। মিত্রা এসে গেটের কাছে দাঁড়াল। চোখ দুটো ছল ছলে। মাথা নীচু করে ধীর পায়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। বড়মা এগিয়ে গিয়ে মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। তিনজনেই কাঁদে। আমি নির্বাক দর্শকের মতো বসে আছি। নিস্তব্ধ ঘর।
ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম দাদা ফোন করেছে।
কি হয়েছে।
তুই কোথায়।
বাড়িতে।
মিত্রা বেরিয়ে গেল। বললো শরীরটা খারাপ লাগছে।
হ্যাঁ বাড়িতে পৌঁচেছে।
তুই ওকে এতো প্রেসার দিচ্ছিস কেন।
কোথায় দিলাম।
সকাল থেকে সব কাজ দিয়েছিস।
ঠিক আছে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি দেখছি।
তোর বড়মাকে দে, ওর ফোন বন্ধ।
বড়মা বাথরুমে।
ছোটকে দে।
ছোটমা বাগানে।
তুই কোথায়।
আমি কচুরি সহযোগে কষা আলুর দম খাচ্ছি।
ঠিক আছে পরে ফোন করবো।
সেই ভালো।
আমি ছোটমার ফোনটা কাছে টেনে নিলাম। স্যুইচ অফ করলাম। তিনজনেই আমার দিকে তাকিয়ে চোখ লাল, মুখে হাসি।
কি এবার সব ঠিক আছে, না কান্না পর্ব আর কিছুক্ষণ কনটিনিউ করবে।
তিনজনেই আমার দিকে তাকিয়ে।
তোমাদের মেয়ে দাদাকে বলে এসেছে তার শরীরটা খারাপ লাগছে। আমি নাকি খুব প্রসার ক্রিয়েট করেছি ওর ওপর।
করেছিস তো, না বলতে পারবি। ছোটমা বললো।
ঠিক কথা।
আমি ফোনটা তুলে নিয়ে ইসিকে ফোন করলাম।
বল।
কি করছিস।
সংসারের কাজ করছি।
কি ধরনের কাজ।
দুদিনের জামাকাপর কাচলাম শুকোলাম এবার ভাঁজ করছি। বাকি গুলো ইস্ত্রি করতে পাঠাব।
তিনজনেই আমার দিকে তাকিয়ে। বোঝার চেষ্টা করছে কার সঙ্গে কথা বলছি।
শোন রান্নাবান্না কিছু করেছিস।
কেন তুই খাবি ?
ভাবছিলাম দুপুরের খাওয়াটা শ্বশুর বাড়িতেই করবো।
মিত্রা হেসে ফেললো।
সত্যি আসবি!
আমি না গেলেও আমার রিপ্রেজেনন্টিভ, বড়মা, ছোটমা যাবে।
সত্যি!
আমি কি মিথ্যে বলছি।
কই ছুটকি কিছু বললো না।
তোর সঙ্গে কখন কথা হয়েছে।
ধর ঘন্টা দুয়েক আগে।
আমি বাড়িতে। তোর ছুটকিও আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কিরে পিকু ঝামেলা করছে।
শুধু পিকু, মা সামনে দাঁড়িয়ে।
জ্যেঠিমনিকে দে।
বল।
কিগো তোমার বাড়িতে গেলে দুটো খেতে দেবে, না সেদিনের মতো….।
আমি সব শুনতে পাচ্ছি। ইসির গলা পেলাম।
তুই কি ভয়েজ অন করে রেখেছিস।
বিদ্যেটা তোর কাছ থেকে শেখা।
দক্ষিণা কি দিবি।
তুই আয় তারপর দেখাচ্ছি।
পিঠে না পেটে।
দু জায়গাতেই।
কিগো জ্যেঠিমনি তুমি কিছু বলছো না যে।
কখন আসবি।
ঘন্টা খানেকের মধ্যে। তবে আমি যাব রাতের বেলা।
এই যে বললি এসে খাবি।
কয়েকটা কাজ আছে বুঝলে।
তোর সব সময় কাজ।
আমি ভয়েজ অন করলাম।
তুমি নিজের চোখে দেখে গেলে।
আজ কাজ করতে হবে না।
তোমার ছুটকি অফিস থেকে দূর করে দেবে।
করলেই হলো।
সে তুমি বুঝবেনা জ্যেঠিমনি, কতো জ্বালা।
কখন আসবি।
বলেও মুস্কিলে পরলাম।
চলনা ওরকম করিস কেন। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
শুনলে তোমার ছুটকির গলা।
শুনলাম। সকালে কথা বলেছি।
আমার নামে কি নালিশ করলো।
নালিশ করে নি।
সেকিগো আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে।
জ্যেঠিমনি হেসে ফেললো।
নাও ছুটকি চাইছে কি কথা বলে দেখ।
আমি মিত্রার হাতে ফোনটা দিয়ে ঘরের বাইরে চলে এলাম। আসার সময় বড়মার মুখের দিকে একবার তাকালাম। থমথমে কিন্তু মেঘ কেটে গেছে। ছোটমার হাসি হাসি মুখটা বেশ ভালো লাগলো। আমি বাগানে এলাম, দেখলাম ভজুরাম একেবারে কোনের দিকে ঝাঁট দিয়ে দিয়ে পাতা গুলো একজায়গায় জড়ো করছে।
কিরে কাজ শেষ হয়নি।
কতোদিন ঝাঁট দিই নি বলো।
কখন শেষ করবি কাজ।

দেরি আছে।
সেকিরে যা এবার স্নান সেরে নে। বড়মার সঙ্গে একটু ঘুরে আয়।
কোথায় ?
যা না দেখতে পাবি।
তুমি যাবে না ?
না আমি পরে যাব।
ভজুরাম ঝাঁটা ফেলে দিয়ে একদৌড়ে ভেতরে চলে গেল। আমি পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম। দেখলাম তিনজনে সোফায় বসে। আমাকে দেখে মিটি মিটি হাসলো।
কি মেঘ কেটেছে।
বড়মা মাথা নীচু করে নিল।
আমি ছেলেটা মোটেই সুবিধার নয় বুঝলে বড়মা।
বড়মা মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল।
ছোটমা একটু চা খাওয়াও। দেরি করো না বেরিয়ে পরো।
তুই যাবিনা।
যাবো। প্রথমে একটু অফিসে যাবো। তারপর।
মিত্রার হাত থেকে ফোনটা নিলাম। দেবাশীষকে একটা ফোন করলাম।
কোথায়রে।
আগে বল তুই কোথায়।
বাড়িতে।
কখন উঠলি।
অনেকক্ষণ।
তুইতো একফোনে কাজ সেরে দিলি।
হাসলাম। তোকে যে কাজ দিয়েছিলাম, কতোদূর এগোলি।
সিক্সটি পার্সেন হয়েছে। আমি এখন তোর অফিসে।
নির্মাল্য।
অফিসেই আছে।
অপেক্ষাকর আমি যাচ্ছি।
হ্যাঁরে মিত্রার কি হয়েছে।
কেন।
দাদা বললো শরীর খারাপ।
ওই আরকি।
ঠিক আছে তুই আয়।
আচ্ছা।
মিত্রা হাসছে।
কিগো দ’এর মতো বশে রইলে কেন জামাকাপড় পরো।
তুই চল।
এইতো….।
ছোটোমা চা নিয়ে এলো। সবার জন্য।
চ’ না এরকম করিস কেন।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম।
ঠিক আছে যেতে পারি বেশিক্ষণ থাকব না। দিয়েই চলে আসব।
আজকের দিনটা। আজকের কাজ গুলো কালকে করিস। একদিনে কিছু যায় আসবে না।
মনে থাকে যেন।
খুব মনে থাকবে।
বড়মার মুখে হাসি ফুটল।
নাও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
তুই দেবাকে একটা ফোন করে দে। আমি যাব না। দাদাকে বলেদে, শরীর ঠিক আছে, নিজের বাড়িতে যাওয়ার জন্য শরীরটা খারাপ হয়েছিল।
ছোটমা হেসে উঠলো।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নিজের ঘরে এলাম। দেখলাম ভজুরাম ছোটমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটা আয়নায় নিজের টেরি বাগাচ্ছে। একটা প্যান্ট শার্ট পরেছে।
কিরে চুলে অতো টেরি বাগালে সব উঠে যাবে।
ভজুরাম থতমতো খেয়ে গেছে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
ভালো জায়গায় যাব।
কোথায় যাবি।
দিদিমনি বলেছে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে।
বেশ করেছে।
আমি নিজের ঘরে এসে ঢুকলাম। আলমাড়ি খুলে চিরাচরিত পোষাক বার করলাম। বাথরুমে গেলাম। মুখে চোখে জল দিলাম।
কিরে তুই এই পরে যাবি। মিত্রা খাটে বসে।
ঝামেলা করবি না। তুই বলেছিলি তিনদিন তোর কথা শুনে চলতে, শুনেছি। এবার আমার মতো চলতে দে।
তা বলে নতুন জামাই!
রাখ তোর নতুন জামাই।
তোর এটা পরা হবে না।
তাহলে যাব না।
আমার একটা প্রসটিজ আছে।
জ্যেঠিমনির কাছে।
যার কাছেই হোক।
ঠিক আছে ওটা সঙ্গে করে নিয়ে নে। যেটা দিবি সেটা পরে যাব। তারপর ওটা পরে বেরিয়ে আসব।
মিত্রা হেসে উঠলো।
কি হলোরে মিত্রা।
ছোটমা গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। কাপর পরা হয়ে গেছে।
তুমি ভেতরে এসে দেখ। কি জামা কাপড় বার করেছে।
নিশ্চই ওর মনের মতো সেই শত ছিদ্র….।
হ্যাঁ।
বলেকিনা তোদের মনের মতো জামাকাপড় পরে যাব ও বাড়িতে গিয়ে এটা পড়ে বেরিয়ে আসবো।
আগে যেতে দে তারপর দেখছি।
ঝামেলা করলে অনর্থ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি।
দেখি না তুই কিরকম অনর্থ করিস।
তাহলে যাব না।
উঁউউ বললেই হলো। প্রথম শ্বশুর বাড়ি যাবে….।
আমার শ্বশুর বাড়ি যাবার উদ্বোধন হয়ে গেছে।
বক বক করিস না। যা বলি শোন। দিদি দুবার ফোন করে ফেলেছে। বেরিয়েছি কিনা।
ঠিক আছে তোমরা নিচে যাও আমি যাচ্ছি।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
দাদাকে ফোন করেছিস।
করেছি। বড়মা কথা বলেছে।
যা এবার নিচে গিয়ে গাড়িতে বোস, যাচ্ছি।
ওরা নিচে চলে গেল। আমি নতুন জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জি পরলাম খারপ লাগছে না। ভালই লাগছে। বেরিয়ে এলাম। দেখলাম নিচে কয়েকটা বোঁচকা বুঁচকি গাড়ির পেছনে রবীন তুলছে। বড়মার পাসে মিত্রা দাঁড়িয়ে। কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। আমি সামনে গেলাম।
বুঝলি ভিআইপি বাবু সবে নিচে নামলেন। ধর কথা বল।
কে।
দিদিভাই।
বল।
তুই সত্যি মেয়ের বেহদ্দ।
তাহলে আমাকে প্রমাণ দিতে হয়।
দে।
একবার চান্স দে।
একটা থাপ্পর এমন দেব না।
তোর বোন একবার মেরেছিল, গালটায় খুঁজলে এখনো তোর বোনের আঙুলের ছাপ পাবি। বড়মা ছোটমাকে সারাজীবনের জন্য দুটো কান ইজারা দিয়ে দিয়েছি। সবাই মিলে তোরা যদি মারধোর করিস, আমি যাই কোথায় বলতো।
মিত্রা হেসে উঠলো।
এখন রাখ, বস্তাগুলো তার বাড়িতে ফেলতে পারলে শান্তি।
কি বললি বস্তা। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
ওকে বলতে দেনা সঙ্গে যেতে হচ্ছে না। মেজাজ এখন মনুমেন্ট। ছোটমা বললো।
আমি মিত্রার হাতে ফেনটা দিলাম। নিজের ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম প্রবীরদা। প্রবীরদা এই সময় ফোন করছে ? কেন!
ফোনটা ধরে কানে তুললাম।
বলো প্রবীরদা।
তুই কোথায় ?
সবাইকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি।
কতো নম্বর।
এটা ঠিক কথা বলেছো। কি বলি তোমাকে। মিত্রাদের পুরনো বাড়িতে।
ঠিক আছে আয়। এলে আমাকে একবার ফোন করিস।
কেন।
ওই ব্যাপারটা আজই মেটাব।
তুমি চলে এসো। একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করা যাবে।
তুই পৌঁছে আমাকে একবার ফোন করিস। আমি এখন দামিনীমাসির ওখানে আছি।
কেন, কোন সমস্যা।
মিত্রা বড়মা ছোটমার চোখের ভ্রু শরু হয়ে গেল। মুখ থমথমে।
আর বলিসনা, মাঝে মাঝে মনে হয় তুই যদি আমার থেকে সিনিয়ার হতিস তোকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতাম।
গ্যাস খাওয়াচ্ছ।
প্রবীরদার অট্ট হাসিতে আমার মোবাইলের স্পিকার প্রায় ফেটে যায়। কান থেকে সরিয়ে নিলাম।
ঠিক আছে তুই এসে আমাকে একটা রিং করিস।
আচ্ছা।
প্রবীর ফোন করেছিলো ? বড়মা গম্ভীরভাবে বললো।
হ্যাঁ।
কেন ?
বললো ও বাড়িতে গিয়ে একবার ফোন করতে, আসবে।
আবার কি হলো ?
কিছুনা।
বড়মার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আমার উত্তরটা মন পসন্দ হলো না। মুখ ভ্যাটকাল।
ভজুরাম গাড়ির পেছনে উঠে বসেছে, মাঝে বড়মা ছোটমা মিত্রা, আমি সামনে। রবীনকে বললাম, কোথায় যেতে হবে জানিস।
হ্যাঁ।
যাওয়ার সময় শ্যামপুকুরের চিত্তরঞ্জনে একটু দাঁড়াস।
কেন, নকুর দোকানে যাবে না ?
আবার এতটা ঘুরবি।
রবীন চুপ করে রইলো।
ঠিক আছে চল, নকুর দোকান হয়েই যাই।
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স হয়ে বৌবাজার ছাড়িয়ে কলেজস্ট্রীটে ঢুকতেই মিত্রা বড়মা ছোটমাকে আমাদের কীর্তি কলাপ বলা শুরু করলো। কোথায় কোথায় ঘুরতাম কি করতাম। এসব।
তুই কাকে বাঝাচ্ছিস।
বোঝাচ্ছি না বড়মাকে বলছি।
বড়মা বিদ্যাসাগরে পড়তো, এটা মাথায় রাখিস।
মিত্রা জিভ বার করলো।
সত্যিতো তুই ঠিক বলেছিস।
দিলি তাল কেটে।

বড়মা খেঁকিয়ে উঠলো।
আমি পেছন ফিরে তাকালাম।
কেন তুমি দাদা আসো নি ?
তোদের মতো নাকি।
তা ঠিক। তখন তোমরা আবার কমিউনিস্ট পার্টি করতে।
বড়মা মুখটিপে হেসে চুপ করে গেল।
ঠনঠনিয়ার কাছে আসতে বড়মা বললো রবীন গাড়ি দাঁড় করা। রবীন গাড়ি দাঁড় করাল। বড়মা, ছোটমা, মিত্রা নামলো। বুঝলাম এবার পূজো দেওয়া হবে। হোলও তাই। তারপর বীনা সিনেমা দেখান হলো। মিত্রা আবার কল কল শুরু করে দিয়েছে। গাড়ি চলতে শুরু করলো। বড়মা আবার বিবেকানন্দের বাড়ির সামনে এসে ঠোক্কর খেল।
এইজন্য বলেছিলাম তোমরা যাও, আমি পরে যাচ্ছি।
রবীন থামাতে হবে না, চল বাবা ও ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছে।
ওমনি গোঁসা হয়ে গেল।
তুই এখন ভিআইপি মানুষ বলে কথা, তোর কতো কাজ।
রবীন গাড়ি দাঁড় করা আমি নেমে যাই, তুই এদের নিয়ে যা।
নাম দেখিনি তোর কতো বড়ো সাহস।
উরি বাবা, তোমার তো দেখি রাগও আছে।
আমার বলার ভঙ্গিমায় মিত্রা ছোটমা হাসছে। আমি পেছন ফিরে তাকালাম। বড়মার চোখ হাসছে মুখ গম্ভীর।
জলের বোতলটা দাও একটু মুখে দিই। পেঁড়া খাওয়াবার পর জলের বোতলটা দিতে হয় জান না।
তুই চেয়েছিস।
চাইতে হবে কেন। ভিআইপি মানুষের সঙ্গে যাচ্ছ, তাদের হাবভাবে কিছু বোঝ না।
এবার আর বড়মাকে রোখা গেল না। কানে হাত পরলো। রক্ষে যা নকুর দোকানের সামনে এসে রবীন গাড়ি দাঁড় করাল, বেশিক্ষণ কানে হাত রাখা হলো না।
আমি মিষ্টি কিনলাম।
আমাদের খাওয়া। সেই সাত সকালে কয়েকটা কচুরী মেরেছি।
তার মানে! গিয়ে এখুনি ভাত খাবি।
খাওয়া না।
বড়মার মুখের দিকে তাকালাম।
ও যখন বলছে কেন।
ভালোই আছ।
আবার ওদের জন্য মিষ্টি কিনলাম।
বুঝলি অনি চিত্তরঞ্জনে আর দাঁড়াতে হবে না। এখান থেকে একটু দই নিয়ে নে। ছোটমা বললো।
কে খাবে ?
তোকে খেতে হবে না।
হাসলাম।
আবার দই কিনলাম।
মিত্রার ফোন বেজে উঠলো।
আর দশ মিনিট, এখন বিডনস্ট্রীটে আছি।
কেরে।
দিদিভাই।
ওর এতো তাড়া কিসের।
শুনতে পাচ্ছিস বাবুর কথা।….মেজাজ ঠিক নেই….গিয়ে বলছি।
মিত্রার বাড়ির গলিতে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় একটা বেজে গেছে। রবীনকে বললাম, কিরে গাড়ি ভেতরে যাবে।
যাবে। তবে রাস্তা জ্যাম হয়ে যাবে।
তাহলে এখানে দাঁড় করা। হেঁটে চলে যাব।
না চলো, তোমাদের ভেতরে রেখে আসি।
কেন ঝামেলা করবি। এখানে থাক। একটু হাঁটলে মহাভারত অশুদ্ধ হবেনা।
তুমি তাহলে বড়মাদের নিয়ে যাও। আমি এগুলো নিয়ে যাচ্ছি।
তাই কর।
আমি বড়মাকে গাড়ি থেকে ধরে নামালাম। মিত্রা আমার হাত শক্ত করে ধরেছে।
তোর আবার কি হলো ?
কতদিন পর আসছি বল।
এটা তোর বাড়ি না অন্য কারুর।
ছ’বছর, সময়টা খুব একটা কম নয়।
গলি পেরিয়ে মিত্রার বাড়ির দোরগোড়ায় এলাম। বড়মা চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে।
বুঝলি ছোট, বাগবাজারটা এখনো সেরকমই রয়েগেছে।
বুঝলাম। আমি টিপ্পনি কাটলাম।
কি বুঝলি।
সব কি আর ইনস্ট্যান্ট বলা যায়। রয়ে সয়ে বলতে হয়।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। গম্ভীর মুখে হাসির বিদ্যুৎ রেখা।
আমি দরজায় কড়া নারলাম। দরজা খুললো। আজ পিকু নয় ইশি সামনে দাঁড়িয়ে। বড়মাকে জড়িয়ে ধরলো। দেখলাম ভেতর থেকে জ্যেঠিমনি বেরিয়ে এসেছে। বড়মাকে হাত ধরে ভেতরে নিয়েগেল। আমি বড়মার মুখের দিকে তাকিয়ে।
একদিন এই ভদ্রমহিলার হাত ধরেই এই বাড়িতে বড়মার প্রবেশাধিকার হবার কথা ছিল। তা হয় নি। হলে হয়তো ইতিহাসটা অন্য ভাবে লেখা হতো। তখন অনির ইতিহাসটাও হয়তো অন্য রকমের হয়ে যেত। আজ এতদিন পর সেই জ্যেঠিমনিই বড়মাকে হাত ধরে এই বাড়ির চৌকাঠ পার করলো।
জানিনা দুজন দুজনকে কতটা চিনেছে। তবে আমার কথায় কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। ওরা ভেতরে গেল। ছোটমা বড়মার পেছনে। তারও ইতিহাস বড়মার থেকে নেহাত কম নয়। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে।
দেখ দেখ দিদিভাই বুবুনের চোখ দুটো দেখ। ও নিশ্চই এ জগতে নেই।
মিত্রার কথায় সম্বিত ফিরলো। ইসি হাসছে।
বড়মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ধরতে পেরেছে আমার মনের কথা। হাসলো। ছোটমা হেসে মুখ লোকাল।
কি হলো আয়।
ভাবছি।
কি ভাবছিস।
কপালে কতটা দুর্গতি লেখা আছে।
ইসি আমার হাতটা চেপে ধরে ভেতরে নিয়ে এলো। ভজুরামও হাজির, দুহাতে দুটো মিষ্টির হাঁড়ি, রবীনের হাতে আরও দুটো।
কিরে গাড়িতে আর কিছু আছে।
আছে। বড়মার ব্যাগ পত্র।
ইসি এগুলো রাখার ব্যবস্থা কর।
বসার ঘরে রাখুক।
আমি রবীনের দিকে তাকালাম।
ওই ঘরের টেবিলে রাখ।
ভজুরাম রবীনকে দেখিয়ে দিলাম।
ওরা ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর রেখে এলো।
ভজুরাম মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখেই পটা পট সবাইকে প্রণাম করে নিল।
বাবাঃ ভজুরাম কতো স্মার্ট দেখেছিস। ইসি বললো।
একবার চুলের টেরিটা দেখ।
ভজু ফিক করে হেসে রবীনের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
ইসি পিকু কোথায় ?
তোর বরুণদার সঙ্গে গেছে।
কোথায় ?
গোলবাড়ির কষামাংস আনতে।
কেন ঝামেলা করতে গেলি।
থাম তুই।
বড়মা, এবার আমি কেটে পরি।
তারমানে!
বড়মা আমার দিকে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে।
দেখনা দিদিভাই সারা রাস্তা বড়মার সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে এসেছে।
কেন ?
ও আসবেনা বড়মা নিয়ে আসবে।
জ্যেঠিমনি কাছে এগিয়ে এলো।
চল ওপরে চল।
তুমি এদের নিয়ে যাও। আমি পরে যাচ্ছি।
কেন।
একটু দরকার আছে।
এখানেও কাজ বগলে করে নিয়ে এসেছে। কাজের মানুষ বলে কথা। ছোটমা বললো।
কেউ আসবে ?
হ্যাঁ।
কে ?
প্রবীর। বেরবার সময় ফোন করলো। তুই পৌঁছে ফোন করিস। ছোটমা বললো।
প্রবীরবাবু তোকে ফোন করেছিল ? ইসি বললো।
কেন!
সকাল থেকে কতোজন যে এলো তোকে কি বলবো।
কিসের জন্য।
সকলে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তোর বরুনদা শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললো। ঠিক আছে আমরা অন্যায় করে ফেলেছি অনিকে বলে। এক কথা, তাদের ভুল হয়ে গেছে। ম্যাডাম আপনি বলুন কবে স্টার্ট করবেন আমরা সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
সেই ব্যাপার। বড়মা ইসির দিকে তাকিয়ে বললো।
হ্যাঁ।
অনি প্রবীরকে ফোন কর।
তাই তুই তখন খাবার কথা বলছিলি। মিত্রা বললো।
হ্যাঁ।
আসতে বল।
সেকেন্ড টাইম ভজু রবীন এলো ব্যাগ নিয়ে সঙ্গে পিকু বরুণদা। আমায় দেখে হাত বারিয়ে দিল। আমি হাতে হাত রাখলাম।
আজ কেউ ঝামেলা করেনি।
করেনি, তবে করবে, তার ষড়যন্ত্র চলছে।
এই একবারে বাজে বকবি না। ইসি ঝগরুটে মেয়ের মতো তেড়ে এলো।
জ্যেঠিমনি খেতে কি এখন দেবে, না দেরি হবে।
মাংসটা আসুক।
ইসি তাহলে চা দে। রবীন গাড়ি সাইড করে রেখেছিস ?
হ্যাঁ দাদা।
আঙ্কেল আজ নেমন্তন্ন খেতে যাবে।
আমি পিকুর দিক তাকালাম। লম্বাদের ভিড়ে ছোট্ট মানুষটা হারিয়ে গেছে। ওর গালটা একটু টিপে দিলাম।
এখানে নেমন্তন্ন খাব।
এই নাও।
পিকু পকেট থেকে একটা ক্যাডবেরি লজেন বার করে আমার হাতে দিল।
দেখেছ কি বদমাশ, আমরা চাইলে একটাও দেয় না। আর অনিকে….।
আমি হাসছি।
নিচের ঘরে এসে বসলাম। বরুণদা সঙ্গে এলো। ওরা সবাই ওপরে চলে গেল। আমি প্রবীরদাকে ফোন করলাম।
চলে এসেছিস।
হ্যাঁ।
আমি তোর সামনা সামনি আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।
চিনতে পারবে।
চিনে নেব।
এসো, জ্যেঠিমনিকে চায়ের কথা বললাম। দেরি করলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।
যাচ্ছি।
বরুণদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
আপানকে সেদিন থেকে একেবারে সময় দিতে পারিনি। যা ঝামেলা চলছে।

তুমিতো আবার ঝামেলা ছাড়া চলতে পার না।
না ঠিক তা নয়। ওই আর কি, জড়িয়ে পরি।
এই মওকায় তোমার ফ্লেভারটা আমরাও বেশ উপোভোগ করছি।
কিরকম।
পর্শুদিন তোমার অফিসে গেলাম। চম্পকবাবুর সঙ্গে দেখা হলো। ব্যাশ আগে যে টুকু সম্মান পেতাম, তার থেকে এখন তিনগুণ বেড়ে গেছে। আর একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম, তোমাকে অফিসে সবাই বেশ ভয় আয়।
আপনার কি মনে হয়।
খুব সাধারণ। আচ্ছা অনি তখন থেকে তুমি আপনি আপনি করে যাচ্ছ কেন।
খুব তাড়াতাড়ি শুধরে নেব।
আমি এমনভাবে কথাটা বললাম বরুণদা হেসে ফেললো।
চাকরিটা ছেড়ে দাও।
বরুণদা হাসতে হাসতে হঠাৎ থমকে গেল, চোখে মুখে বিষ্ময়। আমি এই মুহূর্তে এরকম একটা কথা বলতে পারি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে নি।
কেন!
আমাদের অফিসে জয়েন করো।
বেশতো আছি।
বলতে পার তোমার শালির স্বার্থে।
শালির কাজে লাগবে, তোমার কাজে লাগবে না।
আমি কর্মচারী, তোমার শালি মালিক।
এখনো নিজেকে তাই মনে করো।
মনেকরি বলে ঠিক আছি, না হলে বিগড়ে যেতাম।
ইসি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
কিরে জমিয়ে আড্ডা মারতে শুরু করেছিস, আমি মিস করছি।
তুমি কাল রাতে যে কথাটা বলছিলে, অনি এখন সেই কথাটাই বললো।
সত্যি!
হ্যাঁ।
ওটা আমার কথা নয় মায়ের কথা।
তাই!
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝলাম আমাকে নিয়ে এই বাড়িতে কাল রাতে জোড় আলোচনা হয়েছে। দুজনেরই চোখে নতুন দিশা। পরিতৃপ্ততা।
মা কাল রাতে বলছিল, দেখিস অনি বরুণকে কাজটা ছেড়ে দিতে বলবে। মা আর একটা কথাও বলেছে। সেটা এখন বলবো না। যদি কখনো মেলে তবে বলবো।
মা কি করে বললো।
ওর সামনে ওর গুণকীর্তন করা যাবে না।
বাইরের দরজার কড়াটা জোরে নড়ে উঠলো।
দেখ প্রবীরদা এলো।
ইসি এগিয়ে গেলো।
আমি ঘর থেকেই দেখলাম প্রবীরদা ইসলামভাই গেটের মুখে দাঁড়িয়ে।
কইরে অনি।
ইসি হো হো করে হাসছে। ভেতরে।
আপনারা যান আমি ফোন করলে একবার আসবেন, আজই ব্যাপারটা মিটিয়ে যাব।
প্রবীরদা কাদের যেন বললো।
দুজনে ভেতরে এলো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ইসলামভাই-এর অতোবড়ো বুকে আমি হারিয়ে গেলাম।
তুমি কোথা থেকে।
তুই অবাক হয়ে গেছিস।
ঠিক অবাক হই নি। আবার হয়েছি বলতে পার। প্রবীরদা বসো।
চায়ের কাপ নাও ইসি আবার নিয়ে আসছে।
এইটা মিত্রাদের বাড়ি। প্রবীরদা চারিদিক দেখতে দেখতে বললো।
আদি বাড়ি। ধরো একশো বছর হতে চলেছে।
ইসি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইসলামভাই প্রবীরদা চেয়ারে বসলো।
যাই বল একশো বছরের মাল এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
হাসলাম।
হাসলি কেন।
পরে বলবো।
প্রবীরদা খুব সাবধান। ইসলামভাই বললো।
সাবধান মানে, একবার পা পিছলে গেছে আর….।
দাদাভাই, তুমি কোথা থেকে এলে। মিত্রা ঘরে ঢুকলো।
তুই অবাক হয়ে গেছিস।
হবোনা। তখন তো বললেনা এপাশে আসবে।
তোরা এখানে আসবি ঠিক ছিলো।
আমাকে বলবেনা। আমিতো অফিসে গেলাম। তারপর ছোটমার ফোন, চলে আয়। চলে এলাম।
তোকে ছাড়ার পর প্রবীরদা ফোন করলো। আমিও চলে এলাম। ওতো সব কাজ সেগরিগেসন করে রেখেছে। ডাক্তারদাদা ওখানে আছে। এখনো খবর পায় নি।
বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি ঘরে ঢুকলো। প্রবীরদা ইসলামভাই দুজনেই উঠে গিয়ে তিনজনকে প্রণাম করলো।
এটা কিসের। বড়মা ইসলামভাই-এর দিকে তাকিয়ে বললো।
এটা অনির কাছ থেকে শেখা। দিদি তোমার মতো আমিও ওকে ওর দেশের বাড়িতে এই প্রশ্নটা করেছিলাম। বললো, ইসলামভাই তোমার এই পৃথিবীতে দেওয়ার মতো কিছু নেই। একটা মানুষের কাছে তুমি যদি একটু মাথানত করো ক্ষতি কি। দেখবে এর বিনিময়ে তুমি তার কাছ থেকে অনেক কিছু পাবে। যা তুমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না। তারপর থেকে এটা অভ্যেস করে ফেলেছি।
সবাই চুপ করে গেল। ইসলামভাই জ্যেঠিমনির দিকে তাকাল।
কি দিদি আমি তথাকথিত বিধর্মী কিন্তু কিভাবে ধর্মের বাঁধনকে ভেঙে মানুষ হতে হয় ওকে দেখে শিখেছি। বলতে পার এখনো প্রতিটা দিন যখনই সময় পাই ওর কাছ থেকে শিখি। ও সব মানুষকে এতো তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে পারে, না দেখলে বুঝতে পারবে না।
সবাই ইসলামভাই-এর কথায় থ।
ওর বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে একটু আলাদা করে কথা বলবে। দেখবে ওদের মধ্যেও এই ব্যাপারটা নেই। প্রথম প্রথম ওকে দেখে মনে হতো ওর এটা একটা ভড়ং। তারপর যাচাই করে দেখলাম। অনেক ভাবে বাজালাম। তারপর একের পর এক উদাহরণ চোখের সামনে পর পর হাজির করে দিল। এখন দেখি আমার যারা খাশ লোক ছিল, আমাকে এখন তারা যতটা পাত্তা দেয় তার থেকে বেশি পাত্তা দেয় ওকে। মেনে নিলাম। আমরা জাতে খান বংশ। খানরা সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি মনে নেয় না। আমাকে ও মানতে, মেনে নিতে বাধ্য করিয়েছে।
ইসলামভাই-এর কথায় পরিবেশটা বেশ থমথমে হয়ে গেল। নিস্তব্ধ ঘর।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম।
বক্তৃত্বা শুনলে হবে। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। পেটে ছুঁচো ডন বটকি মারছে। ডাক্তারদাদা ওখানে শুকনো মুখে বসে আছে। কিছু একটা ব্যবস্থা করো।
আমি কেন করবো। তুই কর তুই কেজ মানুষ বলে কথা।
বড়মার কথায় থমথমে পরিবেশ কিছুটা হাল্কা হলো।
মাথায় রাখবে। এরপর যখন বলবে অনি বল, উত্তর পাবে।
এই আবার শুরু করলি। মিত্রা বললো।
কেনরে আবার কি হলো ? ইসলামভাই বললো।
সেই বেরবার সময় থেকে বড়মার সঙ্গে চলছে। দুবার রবীনকে বলেছে গাড়ি থামা নেমে যাই।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসছে।
তুই আজকাল দিদিকেও চমকাচ্ছিস।
ঝামেলা করছে। ফোনটা করো ডাক্তারদাদাকে। ইসলামভাই কাছাকাছি কেউ আছে।
আবিদকে বলে দিচ্ছি।
আর একজন ?
সেও আছে। ওখানে মিটিং করছে। প্রবীরদা বললো।
তোমরা কোথায় ছিলে ?
এখানে একটা ঝামেলা পাকিয়ে রেখেছিস। তার সমাধান করছিলাম। ইসলামভাই বললো।
কিগো প্রবীরদা কিছু হলো।
না হওয়ার কি আছে। ওই যে তোকে তখন বললাম, তুই আমার থেকে সিনিয়ার হলে তোকে প্রণাম করতাম।
মনে হচ্ছে আজ আমার শরীর খারাপ করবে।
ইসলামভাই আমার পেটে খোঁচা মারল।
দেখলে প্রবীরদা, বুঝতে পারলে ও কি কথা বলতে চাইছে। ইসলামভাই বললো।
বোঝার আর কি বাকি রেখেছে।
ওরা সবাই মুচকি মুচকি হাসছে। বরুণদা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
মিত্রা ডাক্তারকে একটা ফোন কর। বড়মা বললো।
মিত্রা ডায়াল করলো। রিং-এর আওয়াজ শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম, ভয়েজ অন করে রেখেছে।
কিরে মামনি।
তুমি কোথায় ?
আর বলিসনা ছেলেটা এই বুড়ো বয়সে আমাকে জোয়ান মরদ করে দিয়েছে।
তোমার কথা শুনতে পাচ্ছে।
তাই, ওকে দেতো একবার, ওর মাথাটা ফাটাই।
কেন।
যা সব ফিরিস্তি দিয়ে রেখেছে সম্ভব।
বড়মা তোমার কথা শুনছে, তুমি বুবুনের মাথা ফাটালে তোমার মাথ আস্ত থাকবে ?
ওরে বাবা তারমানে বিরাট একটা ষড়যন্ত্র চলছে মনে হয়।
আর বক বক করতে হবে না। খিদে লাগে নি। বড়মা খেঁকিয়ে উঠলো।
আরি বাবা বড় বান্ধবী যে। খিদে লাগলে দেবে কে। দামিনীও টুক করে কোথায় কেটে পরলো, ইসলামও সেই যে গেল আর এলো না। আর একটা কে পার্টির নেতা আছে কি যেন নাম।
প্রবীর।
হ্যাঁ। ওদের দ্বারা কিছু হবেনা বুঝলে। খালি বড়ো বড়ো লেকচার।
প্রবীরদা হেসে ফেললো।
কে হাসে বান্ধবী।
প্রবীর।
ও কি ওখানে।
হ্যাঁ। তুমি চলে এসো।
কোথায়।
ইসলামভাই ফোনের কাছে এগিয়ে গেলো।
দাদা আমি আবিদকে বলে দিচ্ছি নিয়ে আসছে।
তোমরা সব কোথায় আছো বলো তো ?
মামনির পুরনো বাড়িতে।
বাগবাজার।
হ্যাঁ।
বাবা, কুটুমবাড়িতে গেলে কিছু নিয়ে যেতে হয়।
মস্করা রাখো চলে এসো।
বড়মার কথায় সবাই হেসে উঠলো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। চোখদুটো চক চক করছে।
কিরে ইসি চা তো গঙ্গাজল একটু করে খাওয়া।
ভাত খাবি না।
সবাই আসুক।
তোমরা ওপরে চলো।
একটু পরে দিদি, অনির সঙ্গে একটু কথা সেরে নিই।
জ্যেঠিমনি হাসল। ইসি ওদের তাহলে মিষ্টি এনে দে।
ছোটমা হেসে ফেললো।
দিদি তুমি হাসলে। ইসলামভাই বললো।
জিজ্ঞেস কর বাঁদরটাকে।
মনে থাকে যেন। মাত্র কয়েকটা কচুরি।
সবাই হাসছে।
ওরা সবাই ওপরে চলে গেল।
আমি প্রবীরদা ইসলামভাই বসলাম।

কিরে হঠাৎ এখানে। ইসলামভাই বললো।
এমনি জ্যেঠিমনি বলেছিল একবার আসার জন্য তাই।
তুই এতো তাড়াতাড়ি এখানে আসার পাত্র নোস, নিশ্চই কিছু একটা হয়েছে।
কিছুই হয় নি।
তুই এমনি এমনি চলে এলি।
মহা মুস্কিল।
ঠিক আছে বলতে হবে না।
তার মানে এখানে অনি এসেছে নিশ্চই কিছু একটা ঘটেছে। প্রবীরদা বললো।
তোমাকে ভেবে নিতে হবে। ও কোন কাজ ছাড়া একপাও কোথাও নরবে না। কারুর কাছে যাবেও না। এটা ওর স্বভাব।
সাংঘাতিক।
নাগো, ইসলামভাই বাড়িয়ে বলছে। আমি শ্বশুর বাড়িতে আসব না।
সে তুই আসতেই পারিস। আজকেই আসবি….।
ইসি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
খুব জোর গল্প হচ্ছে।
আর বলিসনা, ও যা তেঁয়েটে।
দুদিন দেখেই বুঝেছি।
তোকে নিয়ে একটু বসবো। কাজটা মিটিয়ে ফেলতে হবে। প্রবীরদা বললো।
সকাল থেকে অনেক লোক এসেছে।
আসবে। কি করি বলতো। আমাদের পার্টির নীচের তলায় যে এতটা পানা পড়ে গেছে আগে বুঝিনি। অনি চোখ খুলে দিল। রিকভার করতে না পারলে সামনে ভারি বিপদ। যেখানে যাচ্ছি পদে পদে বাধা পাচ্ছি।
ইসি মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
ওই দেখ কারা নামছে।
মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, দামিনীমাসি ডাক্তারদাদা নীরু নামল। আবিদ ড্রাইভারের সিটে বসে। ইসি ছুটে বেরিয়ে গেল।
ওরে বাবা তোদের বাড়ি তো জব্বর জায়গায়।
ডাক্তারদাদার কথায় ইসি হাসছে।
সামনেই আমার বন্ধুর বাড়ি।
কার কথা বলছো।
ডঃ আর এন চ্যাটার্জী।
নামটা শুনেই প্রবীরদা তরাক করে উঠে দাঁড়াল।
দাঁড়া ওর সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় নি। আজ একবার দেখা করবো।
কি হলো তোমার আবার।
আরে ওই বাড়িটা নিয়েই তো সমস্যা।
তারমানে!
ইসি যে স্কুলের জন্য ভাড়া নিয়েছে। ওই বাড়িতেই।
তাই।
যাক, সমস্যার সমাধান হলো ডাক্তারবাবুকে বলতে হবে ব্যাপারটা।
সমস্যাটা কি।
ডাক্তারকে পাড়ার লোক বিগড়েছে, ডাক্তার এখন কিছুতেই স্কুল করতে দেবে না।
তাহলে ভাড়া দিয়েছিল কেন।
তখন দিয়েছিল। তারপর যা হয়। ডাক্তারের কান ভাঙচি দিয়েছে। পার্টির মাতব্বররা গিয়ে ক্ষমতা দেখিয়েছে। ব্যাশ ডাক্তার বিগড়ে গেছে।
ও তুমি বোঝ। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে বাইরে এলাম।
এই দেখ দামিনী। তোমার সুপুত্তুরকে দেখ। আমাদের চড়কি নাচন নাচাচ্ছে আর বাবু শ্বশুর বাড়িতে হাওয়া খেতে এসেছে।
দামিনী মাসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। আটপৌরে করে একটা দামী তাঁতের শাড়ি পরে এসেছে। তুঁতে কালারের পাড় খোলটাও তুঁতে কালারের ওপর সাদা। কাছে এগিয়ে এলো।
কখন এলি।
ঘন্টা খানেক হব। তুমি কোথায় গেছিলে।
কোথাও যাই নি।
তাহলে ডাক্তারদাদা যে তখন বললো।
কাছেই ছিলাম। তুই বুঝতে পারিস নি।
হাসলাম।
নিচে ডাক্তারদাদার গলা পেয়ে জ্যেঠিমনি নেমে এসেছে। পেছন পেছন ছোটমা, মিত্রা।
নীরু আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসছে।
নীরু।
স্যার।
মিষ্টির হাঁড়ি বার কর।
এসব আবার আনতে গেলেন কেন। জ্যেঠিমনি বললো।
সেকিগো মেয়ের বাপের বাড়িতে এলাম, খালি হাতে আসা যায়। আমার পছন্দের মিষ্টি এনেছি।
ডাক্তারদাদা ভেতরে এলো।
হ্যাঁরে অনি, তা হঠাৎ আজ এ বাড়িতে ঢুঁ মারলি।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
হাসলে কেন ইসলাম।
আমাদেরও একই প্রশ্ন।
ডাক্তারদাদা আমার কাঁধে হাত রাখল।
বড়ো সরেস ছেলে বুঝেছো।
সে আর বুঝতে বাকি আছে।
বড় বান্ধবীকে দেখছিনা।
ওপরে আছে।
খাওয়ার তোড়জোড় করছে ?
জ্যেঠিমনি হাসলো।
ইসলামভাই বাইরে বেড়িয়ে গিয়ে আবিদের সঙ্গে কথা বললো। আবিদ মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই ওপরে উঠে এলাম। সবাই ইসির ঘরে এসে বসলো। ঘর ভড়ে গেছে। বড়মাকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম সেই যে ওপরে এসে জ্যেঠিমনির ঘরে ঢুকেছে আর বেরোয় নি।। আমি ওই ঘরে গেলাম। দেখলাম বড়মা জ্যেঠিমনির খাটে থম মেরে বসে আছে। কাছে গেলাম।
এই জন্য আসতে বারন করেছিলাম।
ছোটমা পাশে এসে দাঁড়াল।
ওঠো ডাক্তারদাদা ডাকছে।
বড়মা উঠে দাঁড়াল। আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
একবারে ঝামেলা করবে না। কাজ মিটিয়েছ।
বড়মা মাথা দোলাল।
তুমি জ্যেঠিমনি ছাড়া কেউ জানতে পারেনি।
বড়মা মাথা দোলাল, না।
ওই ঘরে চলো, মাথায় রাখবে ডাক্তারদাদার চোখে মাইক্রোস্কোপ ফিট করা আছে। তার ওপর দামিনীমাসি। তোমাদের নিয়ে বড়ো সমস্যা।
কিরে তুই বড়মার সঙ্গে কি ফুস ফুস করছিস।
ইসি ঘরে ঢুকলো। কাছে এগিয়ে এলো। বড়মার থমথমে মুখ।
কিগো বড়মা, অনি তোমাকে বকাবকি করছে ?
ওর আর কাজ কি বল। আমাদের ওপর ছাড়া কার ওপর হম্বিতম্বি করবে। ছোটমা বললো।
দাঁড়া আমি মাকে গিয়ে বলছি।
বলনা, ঝামেলা করবে আবার বললে মন খারাপ করবে।
তুই যখন করিস।
আমার কথা ছাড়।
তোর কথা ছাড়ব কেন।
ও তুই বুঝবি না।
মিত্রা ঘরে ঢুকলো।
ওকিরে দুজন কি করছিস।
ছোটমা মুচকি মুচকি হাসছে।
বড়মাকে ধমকাচ্ছে। ইসি বললো।
ও এই কথা, দিদিভাই এর মধ্যে মাথা গলাস না। এখন এই দেখছিস, একটু পরেই দেখবি বুবুন ছাড়া বড়মা অন্ধ হয়ে যাবে। তখন তুই আমের আঁটি।
বড়মা হেসে ফেললো।
তুই সার কথা বুঝেছিস। ছোটমা বললো।
জ্যেঠিমনির ঘর থেকে ইসির ঘরে এলাম। এতো লোকজন দেখে পিকু খুশীতে কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না।
এই যে বান্ধবী তোমার ছেলের কীত্তি শুনেছ।
বড়মা ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
হাসলে হবে না। আমার আর দামিনীর বয়স তিরিশ বছর কমিয়ে দিয়েছে। এবার একটা মেয়ে দেখ। বিয়ে করে ফেলি।
তোমার নয় মেয়ে দেখলাম, দামিনীর ছেলে পাব কোথায়।
সবাই হাসে।
দামিনী মাসি এমনভাবে আমার দিকে তাকাল আমিও হেসে ফেললাম। মাসি এই পরিবেশের সঙ্গে এখনো সরোগড়ো হতে পারে নি।
শোন অনি মামনি যে ব্যাগটা দিয়েছিল খালি হয়ে গেছে। ব্যাগ ভর্তি করার ব্যবস্থা কর।
কবে লাগবে বলো।
যত তাড়াতাড়ি দিবি তত ভালো।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
ইসলাম তুমি খালি হাস কেন বলো তো।
ওর টাকার অভাব। আপনি বললেন, দেখবেন কেউ না কেউ কালকে আপনাকে আবার একটা ব্যাগ দিয়ে যাবে।
ভিআইপি মানুষ ভিক্ষা করতে বেরলে সকলে কম বেশি দেয়।
বড়মা ফিক করে হেসে ফেললো।
কিগো বান্ধবী তুমিও দেখছি খালি ফিক ফিক করে হাসছো।
হাসছে কেন বলোতো। মিত্রা বললো।
কেনোরে।
আসার সময় বড়মা ওকে ভিআইপি বলেছিল, সে কি রাগ, বাবু গাড়ি থেকে এই নামে তো সেই নামে। তোমরা যাও। এই জন্য বলেছিলাম….।
ইসি হেঁসে গড়িয়ে পরে।
ওই ঘরে বড়মাকে কেমন ধমকাচ্ছিল বল।
ওতো আবার গাড়িতে চড়েনা অটো, বাস, ট্যাক্সিতে চরে। ডাক্তারদাদা বললো।
সবাই হাসছে।
তা এরকম মালিককে কে ভিক্ষা দেবে না বল। কোথা কার কে শ্যাম সেও ওকে মধু, মহুয়া দিয়ে যায়। আমি ডাক্তার কতো জায়গায় গেলাম, কেউ এক ফোঁটা মধু দিল না। বান্ধবীর কাছ থেকে নিয়ে একটু খেলাম, ওমা ঘেমে গেলাম। তুই চেষ্টা করলে পাবি।
জ্যেঠিমনি খিদে পেয়ে গেছে, এবার কিন্তু বদহজম হয়ে যাবে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
তোর বদ হজম হবে না। কর্পোরেসনের জল খাওয়া পেট। নিরু বলে উঠলো।
আবার সবাই হেসে উঠলো। বড়মার মুখের দিকে তাকালাম। এখন অনেকটা পরিষ্কার।
মেঘ আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। আমারে চোখে চোখ রাখল। বড়মা ইশারা বুঝতে পারল। ছোটমা একমাত্র লক্ষ্য করলো আর কারুর চোখে পরলো না।
দিদি খাবার ব্যবস্থা কোথায় করবেন।
বডমা জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে বললো।
ওপরের ঘরে করো, একসঙ্গে সকলের হয়ে যাবে।
ওরা সবাই একে একে ওপরে ঘরে চলে গেল, পিকু নীরুকে নিয়ে পরেছে। নীরুর হাত ধরে টানতে টানতে জ্যেঠিমনির ঘরে নিয়ে গেল। এ ঘরে আমি ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনীমাসি, প্রবীরদা।
ও প্রবীর।
বলুন দাদা।
তোমার ওই বাড়িটায় কয়েকটা সমস্যা হচ্ছে।
কিসের বলুন।
একটা এ্যামবুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
কেন নিচে থাকবে। আমি দামিনী অনেক চেষ্টা করলাম। একটা ঘর নষ্ট হয়ে যাবে।
তোমরা কি ওই বাড়িই রেখে দেবে ভেঙে নতুন করবে না। আমি বললাম।
তুই দেখেছিস ?

কোথায় দেখলাম। সেদিন অনুপদা তোমাদের দেখিয়ে নিয়ে গেল, বললো তোমাদের পছন্দ হয়েছে, ব্যাশ।
তুই দেখ। বাড়িটা পুরনো হলেও খারাপ নয় এখনো মজবুত আছে, বেশ বড়ো বড়ো ঘর। একটু সারিয়ে নিলে টেঁকসই হবে। আর তুই যদি ভেঙে নতুন করতে চাস অনেকটা জায়গা নষ্ট হবে।
তোমরা যা ভালো বোঝ করো। আশে পাশে কোথাও এ্যামবুলেন্স রাখার ব্যবস্থা করা যায় না।
কে দেবে জায়গা। মাসি বললো।
তাহলে একটা গ্যারেজ মতো কিনে নিতে হবে।
সেটা একটা যুক্তির কথা। তাছাড়া যে ডাক্তাররা আসবে তারা গাড়ি করে আসবে, তাদের গাড়ি রাখার একটা প্যাসেজ দিতে হবে। ওদের জীবিকার খতি করে তুমি উপকার করতে পারবে না।
আমি মাথা নীচু করে রইলাম।
কিরে কিছু বল।
আগে দেখি। না দেখে কিছু বলতে পারব না। মাসি কি বলছে।
তোর মাসি আবার এক কাঁটা ওপরে। সব সময় এক কথা আপনি যা ভাল বোঝেন করুণ। তারপর অনি আছে।
ইসলামভাই-এর দিকে তাকালাম।
আমাকে কিছু বলিস না। আমি রি-মডেলিংয়ের ব্যাপারে যাবতীয় হেল্প করবো বলে দিয়েছি।
কাজ কি শুরু করেছো ?
কাল থেকে শুরু হয়েগেছে।
চলো খেয়ে নিই। খেয়ে বেরব।
ডাক্তারদাদাকে আমারটা বল। প্রবীরদা বললো।
তুমি বলো।
এখুনি ডাক্তারদা আমাকে উদ্ধার করে দেবে।
ডাক্তারদাদা, দামিনীমাসি হাসছে।
আমার সমস্যা ডাক্তারদাদাকে বোঝাতে পারব না।
আমি ডাক্তারদাদাকে ইসির ব্যাপারটা সংক্ষেপে বললাম।
প্রবীরদা এখানকার পার্টিগত সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছে। বাকিটা ডাক্তারের হাতে।
রথীন না দিতে চাইলে অন্য কোথাও করুক। আমার অতো বড়ো বাড়িটা ফাঁকা পরে রয়েছে।
সেতো করাই যায় কিন্তু এখানকার স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাবে।
ওটাকি রানিং।
হ্যাঁ। আপাততঃ বন্ধ।
কিহে প্রবীর বাপের জম্মে শুনিনি একটা শিশুদের স্কুল এভাবে বন্ধ করা যায়।
অপরাধ নেবেন না।
অপরাধের প্রশ্ন আসছে না। তোমরা কতটা অধঃপাতে নেমেছ বুঝতে পারছো। আমরা একসময় যারা পার্টিটাকে ভালবাসতাম তারা কেন সরে এসেছি বুঝতে পারছো। তোমরা সব ধরাকে সরাজ্ঞান করেছ। রথীন তো খারাপ লোক নয়। ওকে নিশ্চই তোমরা ধমকা ধমকি করেছো।
তা করেছে।
সেই জন্যই ও বেঁকে বসেছে।
ছোটমা এসে দরজার সামনে দাঁড়াল।
কি ছোটবান্ধবী।
দাদা খাবার জায়গা হয়েগেছে।
ছোটমা একবার পরিবেশটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করলো। বুঝলো সামান্য হলেও গন্ডগোল কিছু একটা হয়েছে।
চলো খেয়ে নাও, তারপর তোমাকে আর ইসিকে নিয়ে যাব।
আমরা উঠে দাঁড়ালাম। সবাই বেরিয়ে এলাম দেখলাম বরুণদা দুজনকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। পোষাক দেখে মনে হচ্ছে এরা নিশ্চই কোন হোটেলের ডেলিভারি ম্যান।
ওপরের ঘরে সকলের আসন পাতা হয়েছে।
আমরা একে একে সব বসলাম। দেখলাম আজ ইসি, মিত্রা, ছোটমা সবাইকে খেতে দিচ্ছে।
কিরে তুই বসবিনা।
পরে বসছি।
ছোটমা হাসলো।
পেছনে না লাগলে হচ্ছে না।
বুঝেছি খাবারটা মনে হয় সেরকম জুতসই নেই। তাই না ডাক্তারদাদা।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল।
আবার আমাকে এর মধ্যে টানছিস কেন।
নারে অনি গোলবাড়ির কষামাংস। অনেকদিন খাই নি। নীরু বললো।
তুইতো আজকে শান্তিতে খাবি।
তা বলতে, কব্জি ডুবিয়ে।
রিপোর্ট কার্ড রেডি করছি।
দেখছো বড়মা শুরু করে দিল।
বড়মা হাসছে।
বুঝলি নীরু আজ বড়মা জ্যেঠিমনি দু-জনেরটা জমপেশ করে খাওয়া যাবে।
তুই একা!
তাহলে কি দোকা।
ম্যাডামের জায়গায় আমাকে চান্স দে।
এই নীরু।
মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
না না আমি চান্স নেব না। যা পাই তাই ভালো।
পিকু এসে আমার কোলে বসে পরেছে। নেমন্তন্ন খেতে বসেছে।
কিরে তুই ওখানে।
ইসি পিকুর দিকে তাকিয়ে বললো।
আমি আঙ্কেলের সঙ্গে নেমন্তন্ন খাব।
পিকুর পাকা পাকা কথা শুনে সবাই হাসে।
খাওয়া-দাওয়া হলো। ডাক্তারদাদা আজ ফোর ফন্টে ব্যাট করলো। বড়মা জ্যেঠিমনি খালি হাসে। মিত্রারা শেষের দিকে বসে পরলো। মিত্রা এসে আমার আর বড়মার পাতের সামনে বসলো।
একিরে তুই এখানে।
বড়মার শেষের গুলো নিতে হবে না। তুইতো মাংস খাস না।
শুঁকি। মাংস তোর মিষ্টি আমার।
তুই মাংস খা আমি মিষ্টি খাই।
আমি থেমে গেলাম।
ডাক্তারদাদা চিত্তরঞ্জন থেকে মিষ্টি নিয়ে এসেছে। আমি নকুর দোকান থেকে। বড়মার সঙ্গে একচোট হলো নকু ভার্সেস চিত্তরঞ্জন। আমরা দর্শক, খালি দুজনের ডুয়েট উপভোগ করলাম।
প্রবীরদা এই প্রথম এইরকম পরিবেশে আমাদের সঙ্গে খেতে বসেছে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খালি হেসে গেল।
খাওয়া শেষ। ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনীমাসি প্রবীরদা সারাটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখল। বরুণদা ওদের ঘুরে ঘুরে দেখাল। আমি নিচে এসে কয়েকটা ফোন করলাম, তার মধ্যে দাদার সঙ্গে একবার ফোনে কথা বললাম। দাদা এখানকার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করলো। সব বললাম। মিলিকে ফোন করলাম।
কোথায়।
অফিসে। জোর কাজ করছি।
টিনা কোথায়।
ওর ঘরে। ওর সঙ্গে আজ প্রেস ম্যানেজারের এক চোট হয়েছে বুঝলে।
তারপর।
ও মেমো ইস্যু করেছে। সনাতনবাবু প্রথমে দিতে চান নি। যেই বলছে ঠিক আছে অনিদাকে ফোন করে জানাচ্ছি। অমনি প্রেস ম্যানেজারের ঘরে মেমো পাঠিয়ে দিয়েছে।
তারপর।
তারপর আর কি ম্যানেজার মশায়ের মুখ কালো। বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়েছে টিনা।
দাদা জানে।
ম্যানেজার দাদার কাছে গেছিল। দাদা বলে দিয়েছে, ওর মধ্যে আমি ইন্টারফেয়ার করবো না।
তোমার ডিপার্টমেন্ট।
তোমার সঙ্গে একবার বসবো। প্রচুর জল মেশান আছে। বুঝতে পারছি, ঠিক জায়গাটা ধরতে পারছি না।
কেন।
বলবো গিয়ে।
আজ রাতে আসছো নাকি ?
আজ আমি টিনা আমার ফ্ল্যাটে থাকব। তোমায় পরে সব ঘটনা বলব।
কোন সমস্যা।
সামান্য।
শুনি কি রকম।
এখন না।
অদিতী।
ভালো আছে। সনাতনবাবু সব ফাইল ওর ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বলে দিয়েছে ম্যাডামের ডিসিসন ছাড়া আমি একপাও নড়তে পারব না।
দেবা নির্মাল্য কোথায় ?
তোমার সেই এডিটর রুমের নতুন একটা ঘরে। দুজনে তোমার এ্যাড কোম্পানী নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। ও হ্যাঁ শোনো সুজিতদা লোক পাঠিয়েছিল। একটা নতুন ক্যাম্পেন আছে। এই টিনা এসেগেছে।
আমি টিনার গলা শুনতে পেলাম।
কার সঙ্গে কথা বলছিস।
অনিদা।
দে দে আমি একটু কথা বলি।
আমি বলেছি।
অনিদা ভাল করিনি বলো।
একবারে সঠিক স্টেপ। একটুও পাত্তা দেবে না। দিলেই গাড্ডায় ফেলে দেবে।
এ মাসের স্ক্র্যাপের হিসাব দিয়েছে এক লাখ।
মাত্র!
হ্যাঁ। আমি সব হিসাব পেয়ে গেছি।
কি করে পেলে।
সুতনুবাবুকে বললাম, এমাসে কতো কালি লেগেছে কটা রিল লেগেছে। কয় বান্ডিল প্লেট লেগেছে। হিসেব পেয়ে গেলাম।
আমি হাসলাম।
হেসো না, বলোনা ঠিক করেছি কিনা।
একেবারে ঠিক করেছো। তোমার হিসাবে কি আসছে।
সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ।
মেমোতে কি লিখেছো।
লিখেছি আপনার হিসাবে আমি খুশি হতে পারলাম না, আপনার দেওয়া হিসাবটা ক্লারিফাই করে দিন।
কি বলছে।
মেমো হাতে পেয়েই দাদার কাছে গেছে, সনাতনবাবুর কাছে গেছে। মাঝে একবার চম্পকদা এসে বলেছিল এবারটার মতো ছেড়েদে টিনা।
আমি বলে দিয়েছি ওটা অনিদার ব্যাপার। আমি অনিদার হুকুম মতো কাজ করছি। অনিদা ছেড়ে দিতে বললে, ছেড়ে দেব।
তখন কি বললো।
একবারে চুপ। বলে কিনা তুইতো সিংহের মুখে ফেলে দিলি।
মিলি হাসছে।
কেমন লাগছে।
তোমার ফ্লেভারটা বশ উপভোগ করছি। তুমি নেই তবু তুমি সব জায়গায় আছ।
ঠিক আছে কাল অফিসে যাব।
তোমরা সব ঠিক আছো।
এখান থেকে বেরিয়ে একটু দামিনীমাসির ওখানে যাব। কাজটা শুরু হয়েছে। দেখব।
ইসলামভাই বললো যে এখনো শুরু করিনি।
আমাকে বললো করেছি। দেখি গিয়ে কি শুরু করেছে। হাতের কাজ গুলো তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নাও । এদিকটায় সময় দিতে হবে। ধরো মিলি কি বলবে।
বলো মিলি।
সুজিতদার ব্যাপারটা কি করবো।
তুমি টিনা চলে যাও। না হলে এক কাজ কর।
বলো।
আমরা এবারে ওই এ্যাড এজেন্সীর থ্রুদিয়ে বিজ্ঞাপন নেব। সেইরকমই তো প্ল্যান করেছিলাম

হ্যাঁ।
দেবা, নির্মাল্যকে পাঠিয়ে দাও। ওরা হ্যান্ডেল করুক।
দেবাদা আজকে ওর পুরনো অফিসে প্রপোজাল পাঠিয়েছে।
রি-অ্যাকসন।
জানিনা।
তোমকে আর ডিস্টার্ব করেনি।
তুমি কি গো, এর পর কেউ আর ডিস্টার্ব করে। বলে কিনা তুমি আমার ভাল বন্ধু হতে পার না।
হয়ে যাও।
দেখছো টিনা কিরকম হাসছে।
হাসতে দাও। কাল দেখা হচ্ছে।
আচ্ছা।
ফোনটা পকেটে রাখলাম। আবার ওপরে এলাম। দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্প হচ্ছে। মধ্য মনি ডাক্তারদাদা। আমাকে দেখেই বললো।
কিরে সব খোঁজ খবর নেওয়া হলো।
হ্যাঁ। তুমি বেরবে বললে যে।
যেতে হবে না।
কেন ?
রথীন বললো তুই থাক আমি যাচ্ছি। গল্প করতে বসে গেলাম। তুই আমার একটা উপকার কর।
তোমার ? আমি!
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি বড়মার পাশে ছোট্ট জায়গাটায় নিজেকে গুঁজে দিলাম। মিত্রা ইসিকে কনুইয়ের গোঁতা মেরে ইশারা করে দেখাল।
ব্যাপারটা এরকম, কি বুঝছিস ? ইসি হাসছে।
বড়মা আমার মুখের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল।
কিরে আমার উপকারটা তাহলে করবি না।
বলবে তো কি উপকার করতে হবে।
ওই ছেলেটাকে আর ওখানে দরকার নেই, সরিয়ে নে।
ইসলামভাই প্রবীরদা অবাক হয়ে ডাক্তারদার দিকে তাকাল। দামিনীমাসি মুখ নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
ঘরের সবার চোখে হাজার পাওয়ারে বাল্ব জ্বলছে।
আমি প্রথমটায় একটু অবাক হওয়ার ভান করলাম। যেন ব্যাপারটা কিছুই জানি না। এই প্রথম শুনলাম। ডাক্তারদাদা আমার চোখে এমন ভাবে চোখ রাখল যে আমি অস্বীকার করতে পারলাম না। এও বুঝলাম এই কাজের স্বাক্ষী হিসাবে দামিনীমাসিকে ডাক্তারদাদা রেখেছে।
না সরান যাবে না। এখনো অনেক কাজ বাকী আছে।
কি দামিনী তোমায় কি বলেছিলাম তখন।
মাসি আমার দিকে তাকাল। মুখে হাসি।
কিগো সামন্ত ওকি আবার গন্ডগোল পাকাচ্ছে। বড়মা বললো।
গন্ডগোল নয়, গন্ডগোল যাতে না হয় তার আটঘাট বাঁধছে। এই যেমন ধরো প্রবীর, ইসলাম, দামিনী ওরা এতদিন একটা স্রোতে চলছিল, এখন কিছুটা হলেও উল্টো মুখে চলছে। বলতে পার ভালো হতে চাইছে বা ওদের ভালো করার চেষ্টা করছে অনি। অনেকে তা মেনে নেবে না। ওদেরও শত্রু আছে। সেগুলোকে ও বেঁধে দিয়েছে। বলতে পার এখন যারা কাজ করছে তার সব ওর চতুর্থ ধাপের লোক। দ্বিতীয়, তৃতীয়, প্রথম ধাপের লোক জনের দেখা পাই নি। হয়তো আশে পাশে আছে বুঝতে পারছি না। তখন একজনকে দেখে কেমন যেন সন্দেহ হলো, তাই দামিনীকে বললাম, তুমি চেন কিনা। বললো না। কিন্তু ছেলেটার হাবভাব বলছে ও আমাদের সকলকে চেনে।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকিয়ে।
তুমি কি ভাবছো ইসলাম ওর কাছে কনো খবর নেই।
ইসলামভাই হাসছে।
সব খবর আছে। তুমি কখন এসেছো, কি কাজ করছো। তোমাকে কেউ ফলো করছে কিনা সব। ম্যায় প্রবীরের পেছনেও ওর খাশ লোক আছে।
কিরে অনি! প্রবীরদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
নাগো, ডাক্তারদা সব মন গড়া কথা বলছে।
তাহলে তুই বললি কেন এখন সরান যাবে না।
সম্ভব নয়, তাই বললাম।
ছেড়েদাও প্রবীরদা, ওর কাজ ওকে করতে দাও, আমদের কাজ আমরা করি।
ইসলামভাই বললো।
না ইসলাম তাহলে আমাদের সোর্স ফেল, এটা ধরে নিতে হবে।
ঠিক আছে আমি একটু খোঁজ খবর নিই, তারপর বলবো।
ওতো আমার ওখানকার সব কটা মেয়েকে হাত করে নিয়েছে। কেউ সঠিক কথা বলে না।
দামিনীমাসি বললো।
কি বুঝছো প্রবীর, তুমি হয়তো ওদের সকলকে চেনোও না। ডাক্তারদাদা বললো।
একবারে ঠিক কথা।
ইসলাম চেনে, জিজ্ঞাসা করো ও পর্যন্ত সকলকে চেনে না। কি তোমরা পার্টি পলিটিক্স করবে।
তুমি চিনলে কি করে। বড়মা বললো।
ব্যাটা আমার কাছ থেকে ….। না থাক অনি ওকে সরিয়ে দেবে।
আমি হাসলাম।
কিরে হাসছিস কেন।
যা বাবা, একটু হাসতেও পারব না।
তুই ওকে সরিয়ে দিয়েছিস না।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে বললো সকলে হেসে ফেললো।
মহা মুস্কিল। তুমি বেশ রসিয়ে রসিয়ে দিচ্ছ।
আমি যদি মিথ্যে কথা বলি তুই প্রতিবাদ কর।
তোমার কাছ থেকে সিগারেটটা না চাইলেই পারত।
দামিনী মাসি হো হো করে হেসে উঠলো। বড়মা মুখ টিপে হাসছে। ছোটমা ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
ওরে বাবা কি সাংঘাতিক ছেলেরে তুই।
আচ্ছা এবার একটা সত্যি কথা বল। এখন মনে হচ্ছে আমার ইন্টরোগেসনটা একেবারে কারেক্ট।
বলো।
তুই কি আমাকে টোপ দিলি। আমি ধরতে পারি কিনা।
আমি এবার সত্যি সত্যি হেসে উঠলাম।
দেখলে বান্ধবী দেখলে, তোমার ছেলের বুদ্ধির দৌড় দেখলে।
রাখ তোমার হেঁয়ালী, খোলসা করে বলো।
তুমি বুঝলে না।
কি করে বুঝবো।
তোমার দ্বারা কিছু হবে না। অনিকে তুমি আটকাতে পারবে না।
ও কথা বলছো কেন।
ও একটু নড়াচড়া দিয়ে দখলো কজন ধরতে পেরেছে, সেই ভাবে পরবর্তী ঘুঁটি সাজাবে। হয়তো এতোক্ষণে সাজিয়ে ফেলেছে। দূর কি বোকার মতো ওকে বলে ফেললাম। না বললেই পারতাম। ওর কাছ থেকে কিছু শেখা যেত।
বড়মা আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে। ব্যাপারটা এইরকম তুই এতো মিটমিটে।
হ্যাঁরে তুই কি এর মধ্যে আবিদ আর রতনকেও রেখেছিস ?
ইসলামভাই সড়াসড়ি আমার চোখে চোখ রাখল।
ওরা তোমার লোক।
সে ঠিক, আজ আবিদ এলো তোর সঙ্গে একটা কথাও বললো না। আমি যা বললাম হ্যাঁ হুঁ করে ছেড়ে দিল। মনে হলো ওর তাড়া আছে।
পর্শু রাত থেকে সাগির অবতারের দেখা নেই। সেই যে বলে গেল মাসি আমরা একটু কয়েক দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, দিন পাঁচেক পরে ফিরব। দামিনীমাসি হাসতে হাসতে বললো।
ওকে জিজ্ঞাসা করো বলবে আমি তো বাড়ির বাইরে বেরোই নি। আমি তোমাদের চোখের সামনেই আছি। তাহলে আমাকে সন্দেহ করো কেন বাবা। ডাক্তারদাদা ইনিয়ে বিনিয়ে বললো।
সবাই মিটি মিটি হাসে। প্রবীরদা আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। পকেট থেকে ফোনটা বার করলো। কাকে যেন রিং করলো।
ফোন করে কোন হদিস পাবে না প্রবীর। ও অনেক দূর ভেবে কাজে হাত দেয়।
একটু দাঁড়ান। বলছি।
আমি প্রবীরদা বলছি।
হ্যাঁরে রাজনাথকে কি ছাড়াবার কোন বন্দোবস্ত হয়েছে।….কি বললি….
সবাই প্রবীরদার মুখের দিকে তাকিয়ে। প্রবীরদার মুখের ভাব ভঙ্গি লক্ষ্য করছে।
কবে ছাড়বে….ঠিক আছে তুই ফলো আপ কর….এ্যাঁ….
প্রবীরদা কানে ফোনটা আরো জোড়ে চেপে ধরলো, কেউ যেন কিছু শুনতে না পায়। মুখের ভাব ভঙ্গিটা আস্তে আস্তে পাংশু হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন যেন ঠান্ডা মেরে যাচ্ছে।
প্রবীরদা ফোনটা পকেটে রেখেই উঠে দাঁড়াল। সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমার হাতটা চেপে ধরলো।
প্লিজ অনি তুই একাজ করিস না। আমি তোর থেকে সিনিয়ার। জগতটা তোর থেকে একদিন হলেও বেশি দেখেছি।
তুমি বৃথা চেষ্টা করছো।
আমার গলার স্বর, চোখের কাঠিন্যে, প্রবীরদা চুপ করে গেল।
ও কিছু করতে পারবে না।
ঘরের সবাই চুপ।
তুমি ওকে যতদিন চেন তার থেকে আমি বেশিদিন চিনি।
ঠিক আছে, আমি সব মেনে নিচ্ছি। আমার এই অনুরোধটুকু তুই রাখ। তোকে আমি কথা দিচ্ছি, আমার কোন ক্ষতি ও করতে পারবে না।
বিশ্বাস করতে পারছি না।
ঘরের পরিবেশ থম থমে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
কি হয়েছে প্রবীর, জল অনেক দূর গড়িয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
দাঁড়ান ডাক্তারদাদা আমি একটু অনিমেষদাকে ফোন করি, অনিমেষদা বিধানদা ছাড়া ওকে কেউ আটকাতে পারবে না। আমাদের ও চুনো পুঁটি মনে করে। এতোদূর ও যখন এগিয়ে গেছে, ও অনেক কিছু করতে পারে। ওর যে কতো প্লাস পয়েন্ট কল্পনা করতে পারবেন না। প্রবীরদা মোবাইলের বোতাম টিপতে টিপতে আপন মনে কথা বলে চলেছে।
কি হয়েছে তুমি বলবে তো। ডাক্তারদাদা বললো।
পরে বলছি।
প্রবীরদা আবার রিং করলো। এবার মনে হয় ভয়েজ অন করে রিং করলো। সকলে যাতে শুনতে পায়। অনিমেষদার ফোনে রিং হওয়ার আওয়াজ।
বলো প্রবীর ওখানকার কাজ মিটল।
আর্ধেক হয়েছে, অনি আবার একটা গন্ডগোল পাকিয়েছে।
কেন আবার কি হলো।
ফোনে বলা যাবে না। আপনি কোথায় ?
আমি এখন বরাহনগরে।
আমরা অনির শ্বশুর বাড়ি, বাগবাজারে।
মিত্রাদের পুরনো বাড়িতে ?
হ্যাঁ।
তোমরা কি করতে গেছো।
সে অনেক কথা, না এলে জানতে পারতাম না।
আমার এখানে কাজ সারতে আরো ঘন্টা খানেক লাগবে। ফেরার পথে যাব।
কোথায় বসবেন।
অনি কোথায়।
আমার সামনে বসে আছে। কোন কথার উত্তর দিচ্ছে না। চুপ করে আছে।
ওকে দাও।
আপনার কথা শুনতে পাচ্ছে। বড়দি, ছোটদি, ডাক্তারদাদা সবাই আছে।
অনিমেষদা হেসে ফেললো, তারমানে বড়ো ভোজ ছিল বলো দুপুরে। ঠিক আছে, তুমি গিরিশমঞ্চে এসো ঘন্টা খানেক বাদে। ওখানে একটা সমস্যা আছে মিটিয়ে যাচ্ছি।
আচ্ছা।

প্রবীরদা আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। আমি চুপচাপ বসে আছি।
কিরে তুই আবার গন্ডগোল পাকিয়েছিস।
বড়মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোমার বিশ্বাস হয়।
এতো কথা হলো অবিশ্বাস করি কি করে।
গন্ডগোল ছাড়া জীবন বৃথা।
তারমানে তুই পাকিয়েছিস।
আমি পাকাই নি, ওরা পাকাল। আমি চেক দিলাম।
তোর চেকগুলো এতো কঠিন আমাদের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে। প্রবীরদা বললো।
ওকি একেবারে কাস্টডিতে হাত মেরেছে! ইসলামভাই বললো।
হ্যাঁ। সেদিন রাতের মিটিংয়ে ও এই কথা বলেই রাজনাথকে ধমকেছিল। আমি কথাটার গুরুত্ব দিই নি। ভেবেছিলাম ওর মতো এরকম বড়ো বড়ো কথা অনেকেই বলে। এখন দেখছি সত্যি। দুবার এ্যাটেম্পট হয়ে গেছে।
ইসলামভাই আমার দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকাল। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
কেউ বুঝতে পারে নি। প্রবীরদা স্বগতোক্তির সুরে বললো।
দূর খালি সব ফালতু আলোচনা। আমি জ্যেঠিমনির ঘরে গিয়ে ঘুমোই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
নিচে বেলটা বেজে উঠলো।
দেখতো মা রথীন এলো মনে হয়। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জ্যেঠিমনির ঘরে ঢুকলাম। জ্যেঠিমনির বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। নিচে দু-তিনজনের গলার আওয়াজ পেলাম বুঝলাম ডাক্তারদাদার বন্ধু একা নয়, আরও কয়েকজন আছেন।
ওরা ওপরে উঠে এলো। ডাক্তারদাদা হৈ হৈ করে উঠলো। সবার সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলো। আমি এ ঘর থকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা, যা হয়। আমি মোবাইলটা বার করে পটাপট কয়েকটা ম্যাসেজ করে দিলাম। পকেটে ফোনটা রেখে দিলাম।
মিত্রা ঘরে ঢুকলো। মুখটা সামান্য ভার ভার।
কিরে তুই আবার ভেটকে গেলি কেন।
কোন কথা বললো না। আমার পাশে উঠে এলো। আমার চোখে চোখ।
কিরে আবার কোন সমস্যা।
তোর বড়টা বহুত গন্ডগোল পাকাচ্ছে।
কোনটা, বর্তমান না প্রাক্তন।
দুটোই।
মিত্রা হেসে ফেললো।
রাজনাথকে কি ছেড়ে দেবে।
তার তোর জোড় চলছে।
তুই জানলি কি করে।
তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
ভাবছি নাতো, আমার অভ্যেস হয়ে গেছে, বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি টেনসন করছে।
এতদিন বড়মা ছোটমা ছিলো, এবার সঙ্গে লেজুর জ্যেঠিমনি।
বরুণদাও খুব একটা ভালো নেই।
বড়ো বড়ো কাজ করতে গেলে একটু টেনসন নিতে হবে। না হলে পাতি চাকরি করতে হবে।
টিনা আজ প্রেস ম্যানেজারকে মেমো ধরিয়েছে।
খবর পেয়েছি।
তোকে ফোন করেছিল।
আমি করেছিলাম। দাদার সঙ্গে কথা বলেছিস।
বলেছি।
বড়মার সঙ্গে জ্যেঠিমনির বোঝাপড়া হয়েগেছে।
হ্যাঁ।
আর কেউ জানলো।
বরুণদা মনে হয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে।
করুক। আজ না হয় কাল জানতে পারবে।
কেউ না বললে জানতে পারবে না।
বললে তুই পেট খোলসা করবি, আমিতো আর করবো না।
আমিও করবো না।
কথাটা মাথায় রাখিস, তাহলেই হবে।
কিরে দুজনে কি ফুসুর ফুসুর গুজুর গুজুর করছিস।
ছোটমা ঘরে ঢুকলো। চকচকে চোখ, ঝকঝকে মুখ, দুজনের মুখের দিকে এক ঝলক তাকাল। বোঝার চেষ্টা করলো পরিবেশের গতি প্রকৃতি।
কিরে অনি রাজনাথ আবার গন্ডগোল করেছে।
শুধু রাজনাথ নয়, সঙ্গে ডাক্তারও আছে। হাতটা ছোট নয়তো।
অনিমেষদা কি করছে তাহলে।
খবরটা পৌঁছতে সময় লাগে।
তোর লাগে না।
আমার লোক যে ওর আশেপাশে ঘুরছে। প্রয়োজন আমার।
দিদি আমাকে ইশারায় গ্রীণ সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে।
তোমরা ঠিক থাকলে আমার কনো অসুবিধে নেই।
আমরা ঠিক আছি।
তোমাদের নতুন সখী।
আমাদের থেকে এক কাঁটা ওপরে। তোর কোন চিন্তা নেই। তোর যাতে কোন খতি না হয় তার ব্যবস্থা কর।
আমার খতি করতে গেলে ওরা দুবার ভাববে।
তাহলে এই যে আবার শুরু করেছে।
আমার কথার অবাধ্য হয়েছে, তাই ধমক দিয়েছি।
এটা তোর ধমক।
ওদের জন্য।
তারমানে তুই প্রত্যেকটা লোকের জন্য আলাদা আলাদা ধমকের ব্যবস্থা করেছিস।
মিত্রা ছোটমার কথা শুনে হাসছে।
তুই ভেবে দেখ। বাপের জম্মে এমন কথা শুনিনি। নতুন শুনলাম। দিদিকে বলতে হবে। তা কোথায় ধমকালি।
শুনতে হবে না।
প্রবীর থম মেরে বসে আছে। আর ওই দুটোর সঙ্গে ফুস ফুস করছে।
কার সঙ্গে।
ওই যে ডাক্তারদার বন্ধুর সঙ্গে এসেছে এই এলাকার লোকাল কমিটির সেক্রেটারি, আর জোনাল কমিটির সেক্রেটারি।
কিগো তুমিও এসে জমে গেছো। ইসি ঘরে ঢুকলো।
কেন ?
ডাক্তারদাদা অস্থির হয়ে পরছে।
হোক। একটা পুঁচকে ছেলের সঙ্গে আলাপ করতে হবে না।
ইসি হেসে ফেললো।
পুঁচকে বলো না। কি সব কান্ডকারখানা করছে বলো।
এটা নস্যি, আগের গুলো দেখিস নি। তিনজনে কতোবার কাপর বদল করেছি কে জানে।
আমি একটায় সাক্ষী।
শেষেরটা।
হ্যাঁ।
তাহলে এবার ভাব।
কিরে শুয়ে আছিস কেন ওঠ।
ইসি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
খাওয়াটা বেশ জোরদার হয়ে গেছে।
ডাক্তারদাদা ডাকছে।
কেন।
তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে। ভিআইপি মানুষ বলে কথা।
আবার শুরু করলি।
বারে ভিআইপি মানুষকে কি বলে ডাকবো।
তোর চ্যাপ্টার ক্লোজ।
এক মিনিটে।
তারমানে!
ডাক্তারদাদার মুখ থেকে সব শুনে বললো, ও তুমি যখন আছো তাহলে আমার আর কোন চিন্তা নেই। তারপর ডাক্তারদাদার মুখ থেকে তোর কান্ড কারখানা শুনে বললো, ছেলেটাকে একটু দেখাও, আমাকে তাহলে তোমার সঙ্গে জুড়ে নাও। আমিও একটু শেষ বয়সে ভালো কাজ করি।
আমি উঠে বসলাম। মিত্রার দিকে তাকালাম।
আজ মাথাটা যন্ত্রণা করবে, রাতে টিপে দিবি।
কেন তোকে দেয় না। ছোটমা কট কট করে উঠলো।
জিজ্ঞাসা করো।
মিত্রা মুখ টিপে হাসছে।
জ্যেঠিমনির ঘর থেকে তিনজনে ইসির ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালাম।
ডাক্তারদাদা বেশ জমিয়ে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছে। জ্যেঠিমনি, দামিনীমাসি, বড়মা কথা বলছে। আর একদিকে প্রবীরদা ইসলামভাই আর সেই ভদ্রলোক দুজন। আর একদিকে বরুণদা নীরু কথা বলছে। ভজুরামকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম পিকুর সঙ্গে ছাদে খেলা করছে।
আয় আয়। ভেতরে আয়।
সকলের দৃষ্টি এবার আমার দিকে। ডাক্তারদাদার বন্ধু রথীনবাবু আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন, প্রবীরদার সঙ্গে যে দুজন কথা বলছিলেন তারাও অবাক।
রথীন এই হচ্ছে অনি।
এই টুকু পুঁচকে ছেলে অনি ব্যানার্জী। তুমি কি আমার সঙ্গে ফাজলাম করছো।
সবাই রথীন ডাক্তারের কথায় হেসে ফেললো।
কেন ডাক্তার আমার ছেলের কথা শুনে কি তোমার বৃদ্ধ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। বড়মা এমনভাবে বলে উঠলো হাসি আর থামে না।
তা না অন্ততঃ পক্ষে ওর মতো হবে ভেবেছিলাম। বরুণদার দিকে ইশারা করলো।
আমি সকলকে একে একে প্রণাম করলাম।
কিরে তোকে যে কেউ অনি বলে পাত্তাই দিচ্ছে না। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি কেন, ওদের জিজ্ঞাসা করো, ওকে যারা চেনে না, যারা শুধু নামে জানে তারা কেউ মানবে কিনা।
কথাটা তুমি খাঁটি বলেছ। প্রথম দিন আমারও ওরকম ভ্রম হয়েছিল।
তা বাবা তুমি এ বঙ্গের না ও বঙ্গের।
ও শেকড়হীন বঙ্গের মানুষ।
সেটা কি রকম।
আমি ওকে পাঁচ মাস দেখছি। ম্যায় ওর দেশের বাড়িতেও একবার গেছিলাম। আমিই ওকে ঠিক মতো বুঝতে পারলাম না ও কোন বঙ্গের, আর তুমি কয়েক মিনিটের দেখায় বুঝে যাবে।
ওকে তুমি দেখেছো ?
ডাক্তারদাদা মিত্রার দিকে হাত তুললো।
জম্মাতে দেখেছি। আর কিছু জানতে চাও।
না।
তুমিও এই বাড়িতে এসেছো দু’একবার।
আমি!
হ্যাঁ। আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি।
ছুটকির দাদু একবার পরে গিয়ে কোমরে লেগেছিল। তা ধরো বছর তিরিশ আগে।
খালি গুল মারছো।
আমরা তখন মেডিক্যালে চাকরি করি।
ধ্যুস তুমি সেই ত্রেতা জুগের কথা বলছো।
তা বাবা তুই নিজে এসব লিখিস!
আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
তোমাকে একদিন ওর গল্প বলবো। অবশ্য যতটুকু জানি।
যাই বলো সামন্ত ওর চোখ দুটো কিন্তু বেশ সার্প।
ধরে ফেলেছ।
হৃদয়ের অনেক কথা যে চোখ বলে দেয়।
তুমি হার্টের ডাক্তার বলে।
তা নয় হঠাৎ মনে হলো তাই বললাম।
ইসি মিষ্টির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।

নাও মিষ্টি মুখ করো। আমি চিত্তরঞ্জন থেকে নিয়ে এসেছি।
চিত্তরঞ্জন কোয়ালিটি খারাপ করে ফেলেছে, নকু এখনো ধরে রেখেছে।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
ও হাসলো কেন। রথীন ডাক্তার বললো।
অনি নকুর দোকান থেকে নিয়ে এসেছে। আমি চিত্তরঞ্জন, তাই হাসি।
কোনটা নকুর রে ইসিতা। রথীন ডাক্তার বললো।
সব কটা।
খেয়ে দেখি আগে। তুমি খাবে না।
দুপুরে ভাতের পাতে খেয়েছি।
ও ইসি ওকে এনে দে না হলে আর এক ডাক্তারের ব্যামো হবে।
বড়মার কথায় ডাক্তারদাদা হাসছে।
আমি ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের রকম সকম দেখছি।
তুই বোস, দাঁড়িয়ে রইলি কেন। যাই বলো সামন্ত তোমার সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলো।
তা বছর দশেক হবে।
তা হবে। রিলেসন বলতে আমার প্রেসকিপসন নিয়ে তোমার কাছে পেসেন্ট যায়, তোমার প্রেসকিপসন নিয়ে আমার কাছে পেসেন্ট আসে।
আমি গিয়ে খাটে বসলাম।
কিরে চা খাবি ?
ইসির দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
প্রবীরদার ফোনটা বেজে উঠলো। বুঝলাম অনিমেষদা এসে গেছে।
হ্যাঁ দাদা….চলে এসেছেন ?….যাচ্ছি।
প্রবীরদা উঠে দাঁড়াল।
ডাক্তারদাদা আমি একটু ঘুরে আসি।
অনিমেষ চলে এসেছে।
হ্যাঁ।
যাও।
প্রবীরদা বেরিয়ে গেল সঙ্গে সেই দুই ভদ্রলোক।
অনিমেষবাবু এখানে আসবে মানে!
তোমায় বলছি না। একদিনে সব জানতে পারবে না। অনিমেষের মেয়ে আর অনি দুই ভাইবোন।
রথীন ডাক্তারের মিষ্টি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
মিষ্টিটা গিলে নাও না হলে বিষম খাবে।
তুমি আজ খালি মেঘে মেঘে কথা বলছো।
লেখা লিখি করো নাকি।
কেন।
সাহিত্য ঘেঁষা কথা বলছো।
একটু আধটু করি।
ঠিক আছে আমি অমিতাভকে বলে দেব। তোমার লেখা ছেপে দেবে।
অনি তোদের কাগজে স্বাস্থ্যের ওপর কনো পাতা নেই।
আছে।
কবে বেরোয় বল।
মনে হয় বুধবার।
দাঁড়া আমি হার্টের ওপর একটা জব্বর লেখা দেব।
আমি চুপ করে থাকলাম।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। বুঝলাম ওখানে আর যাওয়া হবে না। আজ কপালে আমার দুঃখ আছে। ডাক্তারদাদা কথাটা না বললে কিছুই হতো না। ভালোয় ভালোয় সব মিটে যেত। কেন যে ডাক্তারদাদা বলতে গেল।
কিরে খুব বোড় লাগছে না।
আমি ডাক্তারদাদার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ইসি চা নিয়ে এলো। মিত্রা সকলকে হাতে হাতে এগিয়ে দিলো। বুঝতে পারছি আজ এ বাড়ির মানুষ গুলোর ওপর খুব চাপ সৃষ্টি করা হয়ে যাচ্ছে। কি করা যাবে। বরুণদাকে দেখতে পেলাম না। বুঝলাম বরুণদা নীরু দুজনে কোথাও বেরিয়েছে। ছোটমাও ঘরে নেই।
চা খেয়ে ইসলামভাইকে বললাম, চলো একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি।
ইসলামভাই উঠে দাঁড়াল। বড়মা দামিনী মাসি আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল।
দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওপরে চলে এলাম। দেখলাম খোলা আকাশের তলায় পিকু ব্যাট করছে, আর ভজুরাম গড়িয়ে গড়িয়ে বল করছে। সন্ধ্যে হতে আর মিনিট পনেরো বাকি।
ভজু পিকুকে নিয়ে নীচে চলে যা, সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে।
আর একটু। পিকু আঙুল তুলে বললো।
না বাবা আবার পরে।
ভজু পিকুকে কোলে তুলে নীচে চলে গেল।
সিগারেট আছে।
এখন খাবি ?
কেন।
অনিমেষদা এখুনি চলে আসবে।
আসুক।
ইসলামভাই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে নিজে একটা নিল আমাকে একটা দিল। বুঝতে পারছি ইসলামভাই আমার চোখে চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করছে কেন আমি এখানে ডেকে নিয়ে এলাম।
সত্যি তুই রাজনাথকে টার্গেট করেছিলি।
না।
তাহলে প্রবীরদা বললো।
সঠিক খবর পায় নি। প্রবীরদার খুব কাছের লোক এটা করেছে।
তুই বুঝলি কি করে।
পর্শুদিন বুঝতে পেরেছি।
যেদিন অনিমেষদার সঙ্গে মিটিং করছিলি।
হ্যাঁ।
ইসলামভাই আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ঘন ঘন সিগারেটে টান দিল। আমার সিগারেটটা খেতে ভালো লাগলো না। ছুঁড়ে ফেল দিলাম।
তোমার চোখে আজকাল ছানি পড়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার করো।
একথা বলছিস কেন।
বুঝতে পারছি তাই। তুমি এরকম ছিলে না।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
বোঝার চেষ্টা করো। তোমার পুরনো শত্রুরা হাত মিলিয়েছে। যদিও কিছু করতে পারবে না।
কি করে বুঝলি।
খোঁজ খবর নাও।
রতন আবিদ আমাকে কিছু বলেনি।
বলতে চেয়েছে, তুমি বোঝ নি। আমি বুঝলাম কি করে।
খোঁজ নিতে হবে।
তোমাকে আর খোঁজ নিতে হবে না। তুমি তোমার কাজ করো। অনিমেষদার কাজ কি করলে।
অনাদি সব দেখে এসেছে। আমি এই সপ্তাহে যাব।
কবে যাবে।
তোর এই কাজটা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাব।
তুমি যাও, পরে আমি যাচ্ছি। ওখানে কাকে নিয়ে যাবে।
রতনকে বলেছি।
কি বললো রতন।
জায়গাটা দেখতে চাইল।
নিয়ে যাবে ওকে।
হ্যাঁ।
বেশিদিন আটকে রাখবে না। ছেড়ে দেবে। একবারে নতুন ছেলেদের নিয়ে কাজটা করো। যাদের গায়ে এখনো দাগ পরে নি।
এ কথা বলছিস কেন।
তুমি ভাবছো কি করে অপনেন্ট ঘুঁটি সাজাচ্ছে না।
তুই ঠিক কি বলতে চাইছিস খোলসা করে বল।
যা বলার তা তো বললাম। তাছাড়া অনাদিকে আমি কিছু দায়িত্ব দিয়েছি। গেলে জানতে পারবে। পারলে চিকনাকে বেশি করে কাজে লাগাবে। গ্রামের ব্যাপারটা চিকনা ভালো বোঝে।
আমি ওকে মাইনাস করে রেখেছিলাম।
মনে রাখবে ওইই হবে তোমার ট্রাম্প কার্ড।
কি বলছিস!
ঠিক বলছি। মিলিয়ে নেবে।
কিরে নীচে চল দাদা ডাকছে। মিত্রা পেছনে এসে দাঁড়াল।
এসে গেছে ?
অনেকক্ষণ। নতুন ডাক্তারের সঙ্গে বেশ জমপেশ করে গল্প করছে।
তুই এলি কি করতে।
খাওয়া দাওয়া হলো, বললো মিত্রা যা এবার অনিকে ডেকে আন।
কিছু বিশেষণ প্রয়োগ করে নি।
তোকে বলা যাবে না।
ইসলামভাই হাসছে।
আমি ইসলামভাই মিত্রার পেছন পেছন নিচে নেমে এলাম।
ইসির ঘরে তখন জোড় আড্ডা চলছে। সবাই আড্ডার অংশীদার এমনকি জ্যেঠিমনি পর্যন্ত বেশ টকাটক কথা বলছে অনিমেষদার সঙ্গে। সবার হাতেই চায়ের কাপ। বুঝলাম আতিথেয়তার কোন ত্রুটি রাখে নি ইসি ছোটমা। আমি ঘরে ঢুকতেই অনিমেষদা হেসে উঠলো।
আয় তোর কথাই হচ্ছিল।
আমি তাকালাম।
দিদিকে বলছিলাম, তোর বিয়ে করে কোন উপকার হয় নি।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম।।
তুই যে তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই আছিস।
আমি মুখ টিপে হাসলাম।
বোনের সঙ্গে কথা বলেছিস।
তিনদিন কথা বলিনি।
সেইজন্য ওর মেজাজ সপ্তমে।
কেন।
ফোন করে জান।
ওতো একবার ফোন করতে পারতো।
তোর ফোন বন্ধ থাকে।
চুপ করে গেলাম।
তুই নিজের প্রয়োজন ছাড়া ফোনটা ব্যবহার করিস না।
ঘরের সবাই হাসছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই তোমাদের এখানে নিয়ে চলে এলো। অনিমেষদা বড়মার দিকে তাকিয়ে বললো।
ঘুম থেকে ওঠার পর দেখলাম মুখটা ভার ভার। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে রে। কিছু বললো না। ভাবলাম রাতে হয়তো মিত্রার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। তারপর কচুরি খেয়ে ওপরে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে এসে বললো রেডি হও ও বাড়ি যাব।
আমি বড়মার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম।
মিত্রাকে ফোন করে বললো তুই অফিস থেকে চলে আয়। অনিমেষদা বললো।
মিত্রাকে ছোট ফোন করেছিল। বড়মা বললো।
অনিমেষদা হাসছে।
তোর জন্য সুরোই ঠিক। ও-ই তোকে শাসন করতে পারবে। মিত্রার দ্বারা কিছু হবে না।
মিত্রা হাসছে।
তোর এদিককার কাজ শেষ।
এদিকে কোন কাজ ছিলো না। এমনি এলাম।
তুই কি আজকাল এমনি এমনি যাওয়া আসা করছিস নাকি। সেটা জানতাম না।
সবাই অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছে কি ভাবে অনিমেষদা অনিকে বাঁধছে।
আমি চুপ করে আছি।
একটু সময় হবে। দুটো কথা বলতাম।
এবার সবাই জোরে হেসে ফেললো।
ডাক্তারবাবু আপনি একবারে হাসবেন না। অনিবাবু এখন ভিভিআইপি। দেখলেন না প্রবীরের এক ফোনে আমি এসে হাজির হয়ে গেলাম। কত কাজ নষ্ট হলো।

এবার সবাই আরও জোরে হেসে ফেললো।
ওরে থাম থাম পাশের বাড়ি থেকে সব লোক জন চলে আসবে। অনিমেষদা বললো।
তুমিও শেষ পর্যন্ত ভিআইপি বললে। মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
কেন বলতো অন্যায় করে ফেললাম নাকি।
সকাল থেকে বড়মার সঙ্গে এই নিয়ে ঘুসো ঘুসি চলছে। কি তেজ।
তাই। তাহলে উইথড্র। কিন্তু সুরো, সুতপা বলে যে।
উঁ সেদিন বৌদি বলেছিল, বলে কিনা এখনো ভেতরে ঢুকি নি, জুতোও খুলি নি, সোজা নিচে নেমে যাব। তারপর বৌদি ঘাড় ধরে ভেতরে ঢোকাল।
আমি যে ওরকম পারলাম না। তাই ওর পেছন পেছন ছুটি। ওকে স্নেহ করে বড়ো অপরাধ করে ফেলেছি।
ঘরটা মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারুর মুখে কোন কথা নেই। অনিমেষদা একবার চারদিক ভালো করে লক্ষ্য করে নিল।
ইসি।
ইসি অনিমেষদার দিকে তাকাল।
ও ঘরে কেউ আছে।
পিকু আর ভজু খেলা করছে।
চল, তুই আমি গিয়ে একটু বসি।
ইসির দিকে তাকিয়ে, চা খেলাম বুঝলি ঠিক মজাটা পেলাম না। আর একবার দিবি।
ইসি হেসে ফেললো।
প্রবীরদার দিকে তাকিয়ে।
তোমরা বসো প্রয়োজনে ডাকবো।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। এমনকি রথীন ডাক্তার পর্যন্ত অবাক হয়ে গেছে। চোখে মুখে তা ফুটে উঠছে। আমি অনিমেষদার পেছন পেছন জ্যেঠিমনির ঘরে এলাম। আমাদের দেখেই ভজুরাম হেসে ফেললো।
আমরা ওপরেরে ঘরে গিয়ে খেলা করি।
তাই কর।
অনিমেষদা পিকুর গালটা ধরে একটু টিপে দিল।
ভেতরে এলাম। অনিমেষদা জ্যেঠিমনির ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। আমি খাটে বসলাম।
প্রবীরের কাছে সব শুনলাম। আবার কি হলো।
কি শুনেছো বলো। তারপর বলছি।
তুইতো সব জানিষ।
জানি তবে প্রবীরদা কি বলেছে একটু শোনার দরকার আছে।
কেন প্রবীর কি আবার গন্ডগোল করছে।
মনে হচ্ছে প্রবীরদা নয় অন্য কেউ।
তুই কি করে বুঝলি।
আমাকে আজ রাত টুকু সময় দাও।
ওরা বলছে তুই করাচ্ছিস।
তুমি বিশ্বাস করো ?
করছি না বলেই তোকে জিজ্ঞাসা করছি।
আবীর মুখার্জী কে।
অনিমেষদা ইজি চেয়ারে এতোক্ষণ হেলান দিয়ে বসেছিল। এবার সোজা হয়ে বসলো।
কেন।
যা জিজ্ঞাসা করছি বলো।
এখানকার জোনাল কমিটির সেক্রেটারি।
তার সঙ্গে প্রবীরদার সম্পর্ক কি রকম।
সঠিক বলতে পারব না। ওইতো ও ঘরে বসে আছে। তোর সঙ্গে আলাপ হয় নি ?
না।
স্ট্রেঞ্জ।
প্রবীরদা আলাপ করায় নি। ওদের মধ্যে কেউ কি ইসির ব্যাপারে বিরোধিতা করেছিল।
এরা কেউ করে নি। তবে এখানকার ব্রাঞ্চ করেছিল।
এই ব্রাঞ্চ কার হাতে।
মনে হয় আবীর বাবুর দিকে আছে।
তোমায় গল্প বলছি তুমি খালি ফলো আপ করে আমাকে জানাবে। পারলে প্রবীরদা অনুপদার সঙ্গে কনসাল্ট করবে।
বল।
অবতারকে আমার বিয়ের দিনে দেখেছিলে।
হ্যাঁ।
ওর ভাই চিনা এখন জেলে। রাজনাথ যেদিন থেকে জেলে গেছে সেদিন থেকে আমি অবতারের মাধ্যমে চিনাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম রাজনাথ আর ডাক্তারকে ওয়াচ করার জন্য।
অনিমেষদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে চোখের পলক পরছে না।
রাজনাথকে ছাড়াবার জন্য দিল্লীথেকে তোমাদের একটা লবি তদবির করছে। মুখার্জীর ওপরও কম বেশি প্রেসার আসছে।
রাজনাথের পকেটের চারজন এখন জেলে আছে। তারা যে কোন ভাবে কয়েকদিন আগে পাল্টি খেয়ে গেছে। তোমাদের সঙ্গে সেই রাতে কথা বলার পর অবতার আমাকে রাতে ফোন করে জানায়। ওই চারজন রাজনাথকে কাস্টডির ভেতর মারার প্ল্যান করেছে। দোষটা চাপান হবে প্রবীরদার ওপর।
আমি পর্শুদিন রাতেই অবতার সাগিরকে মুখার্জীর কাছে পাঠাই ওদের একটা ফলস কেসে এ্যারেস্ট করাই। গতকাল বেল করাই নি। এখন আলিপুর জেলে রেখেছি। বলতে পার গটআপ গেম খেলছি। অবতার সাগিরকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি।
আজ সকাল থেকে তিনবার রাজনাথের ওপর এ্যাটেম্পট হয়েছে। আবীর মুখার্জীর সঙ্গে তোমাদের অপোনেন্ট পার্টি বেহালার একজন পার্টি নেতার খুব দহরম মহরম আছে। তার লোক নাচি। সেও এখন জেলে। সে এই চারজনকে নিয়ে কাজটা হাসিল করতে চাইছে।
সকাল থেকে অবতার সাগিরের সঙ্গে ওদের প্রচুর মারপিট হয়েছে। ওদের তিনচারজন উনডেড হয়েছে। তোমাদের দিল্লী লবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে আবীরবাবু এই কাজটা করছে। ও এক সময় রাজনাথের খুব ক্লোজ ছিল।
রাজনাথের ভাইপো প্রথমে ওর আশ্রয়ে এসে উঠেছিল, তারপর প্রবীরদার কাছে পাঠায় ওই ভদ্রলোক। কেশ খায় প্রবীরদা। সিং সাহেবের রিপোর্টে আবীরবাবুর নাম পাই। ওয়েপনসের ব্যবসা রাজনাথ করতো। ঘার ভাঙতো প্রবীরদার। প্রবীরদা ভাগ পেতো। এখন সেই ব্যাপারটা বকলমে আবীরবাবু করতে চাইছে। প্রবীরদা মনে হয় বাধা দিয়েছে। তাই এই পথ বেছে নিয়েছে।
ছোটমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
বাবা কি ফিস ফিস করছিস গেট থেকে শোনা যাচ্ছে না।
অনিমেষদা ট্রে থেকে একটা চায়ের কাপ তুলে নিল।
দাদা কিছু নোনতা মুখে দেবেন।
না। দেখো তো ও ঘরে মনে হয় আমার সিগারেটের প্যাকেটটা ফেলে এসেছি।
ছোটমা বেরিয়ে গেল।
কটা বাজে বলো।
সাতটা।
চলো ছাদে যাই। তোমাকে একটা জিনিষ শোনাই।
এখানে শোনা।
না।
চা খেয়ে নিই।
প্লেটে ঢেলে খেয়ে নাও।
ছোটমা ও ঘর থেকে অনিমেষদার সিগারেট প্যাকেট আনার আগেই আমাদের চা খাওয়া শেষ।
দাদা চা কি ঠান্ডা ছিল ?
না বেশ গরম ছিল।
ছোটমা একবার দুজনের দিকে তাকাল। কিছু বোঝার চেষ্টা করলো, তারপর বেরিয়ে গেল।
চল ওপরে যাই।
আমরা দুজনে শিঁড়ি ভেঙে ছাদে চলে এলাম। একবারে ছাদের এক সাইডে এসে দাঁড়ালাম। অবতারের সঙ্গে আমার কথার রেকর্ডিং অনিমেষদাকে শোনালাম। অনিমেষদা মন দিয়ে সব শুনে আমার দিকে তাকাল।
আমাকে জানাস নি কেন।
জানালে তুমি বিশ্বাস করতে।
অনিমেষদা আমার চোখে চোখ রাখল।
কিছু অঘটন ঘটলে।
ঘটবে না।
দেখছিস তো বিরোধীরা ল্যাজে গোবরে করে দিচ্ছে।
তাতে খতিটা কি হচ্ছে। যে লেখটা শুরু করেছিল সেতো আর কিছু লিখছে না। তাহলে তোমার চিনতা কিসের।
দাঁড়াও লাস্ট আপডেটটা নিই।
আমি অবতারের মোবাইলে মিস কল করলাম। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
হয়তো গালা গালি করতে পারে, মনে কিছু করো না। ওরা জানে না তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো।
অনিমেষদা মুচকি হাসলো।
তুইতো ঝানু গোয়েন্দা হয়েগেছিস।
নিজে বাঁচার তাগিদে। মিত্রার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতোটা ঝুঁকি নিতাম না।
মেয়েটা মানুষ চেনে বুঝলি। নাহলে এতো ছেলে থাকতে তোকেই বা ভালবাসতে যাবে কেন।
তোমাদের আশীর্বাদ।
অবতার রিং ব্যাক করলো।
কি খবর বল।
তুমি পার্মিসন দাও ওই চারটেকে আজ রাতেই উড়িয়ে দিই।
কেন।
ওরা আজ রাতেই কাজ হাসিল করবে ঠিক করেছে। প্রচুর টাকা ছড়িয়েছে।
তুই কিছু লুটে নে।
তুমি না থাকলে লুটে নিতাম। সারাজীবন তো ভেতরে থাকব না। বাইরে বেরলে, তোমার হাত থেকে বাঁচব না।
কি হয়েছে বল।
ওরা চারজন আজ রাজনাথের আশে পাশের সেলে থাকবে। শুনলাম ওয়েপনস নিয়ে এসেছে।
তুই কি করতে চাস।
আর কিছুক্ষণ পর খাওয়ার ঘন্টা বাজবে। খাওয়ার পর কাজ শেষ করে দেব।
জানা জানি হলে।
আমার জিভের তলায় ব্লেড আছে। শিরা কেটে দেব।
আবীরবাবুর কি খবর।
চিনাটা একেবারে ঢ্যামনা। আগে বল। তাহলে আমি ভেতরে আসতাম না। বাইরেই সাঁটিয়ে দিতাম। আমার ছেলেগুলো ঠিক ঠাক কাজ করছে।
হ্যাঁ।
তুমি মিথ্যে কথা বলছো।
কেন।
একটা ডাক্তারদাদার কাছে ধরা খেয়ে গেছে।
তোকে কে বললো।
চার নম্বরের মামনি।
ঠিক আছে তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি ঘুঁটি গুলো একটু সাজিয়ে নিই, পাঁচ মিনিট পর ফোন কর।
আচ্ছা।
আমি অনিমেষদার মুখের দিকে তাকালাম। অনিমেষদা মুচকি হাসলো।
আমি মাথা নীচু করে নিলাম।
আমার তো আর সরকারী ক্ষমতা নেই। প্রয়োজন পরলে চারটেকে সরিয়ে দেব। এটুকু ক্ষমতা আমার আছে।
আমি না আসলে তুই কি এই পথ বেছে নিতিস।
প্রবীরদাকে বাঁচাতে, বাধ্য হয়ে বেছে নিতাম।
ব্যাপরটা কেউ জানতেও পারত না বল।
তোমাদের আবীরবাবু বুঝতে পারত, তারপর অবতাররা বেরিয়ে এলে ও হাফিস হয়ে যেত। ওদের কথা কিছু কিছু আমাকে শুনতে হয়।
তুই তো এরকম ছিলি না।
আমি কোথায় অন্যায় করছি বলো। সময় হয়ে যাচ্ছে। একটা ডিসিসন নাও।
অনিমেষদা ফোনটা বার করে অন করলো।
তুমিও ফোন বন্ধ করে রেখেছিলে!
তোর সঙ্গে কথা বলবো বলে।

অনিমেষদা ডায়াল করে কানে ধরলো।
অনুপ।….হ্যাঁ ফোনের সুইচ অফ ছিলো….তুমি এক কাজ করো বিশ্বজিত বাবুকে একটা ফোন করো বলো আলিপুর জেলের জেলারকে যেন এখুনি একবার ওখানে যেতে বলে তুমিও যাও আমিও যাচ্ছি।….তোমার কাছে খবর চলে এসেছে ?….আমি অনির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি….ঠিক আছে তুমি যাও, আমি যাচ্ছি। আর শোন রাজনাথের সেলের সামনে যেন আর্মড ফোর্স থাকে, তারপর তোমায় গিয়ে সব বলছি।
চল নিচে যাই।
অবতার, সাগির কিন্তু নিজের নামে ঢোকে নি।
তাহলে!
একজন জাকির নামে ঢুকেছে আর একজন মহিন নামে ঢুকেছে।
তুইতো মাথা খারাপ করে দিবি।
আমি মুচকি হাসলাম।
তুই কোথাও বেরবি না তো।
না।
আমি তাহলে অবতারকে জানিয়ে দিই।
তাই দে।
তুমি নিচে যাও আমি ফোন করে যাচ্ছি।
ফোন করে নে একসঙ্গে যাই।
আমি অবতারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিলাম। ওকে সব জানালাম।
আমি অনিমেষদা নিচে নেমে এলাম। সবাই গল্প করছে। অনিমেষদা ঢুকতে বড়মা চেঁচিয়ে উঠলো।
কি গো অনিমেষ, তোমরা যে ম্যারাথন মিটিং করলে।
মিটিং না ওর সঙ্গে একটু গল্প করছিলাম। ছাদে বেশ ফুর ফুরে হাওয়া দিচ্ছিল।
তুমিও আজকাল হাওয়া খাও নাকি। ডাক্তারদা হাসতে হাসতে বললো।
কি করবো দাদা অনির পাল্লায় পরে সেটাও অভ্যাস করতে হচ্ছে।
দাদা চা খাবেন। ছোটমা বললো।
আমি ভাবছিলাম চা না খেয়েই চলে যাব। একটা জরুরি মিটিং আছে।
আপনি বসুন, ঠিক এক মিনিট।
অনিমেষদা চেয়ারে বসলো। রথীন ডাক্তার এখনো আছে। সেই কখন এসেছে।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
কিরে বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন।
মিত্রা হাসলো।
কি করবি বল। ওর সঙ্গে ঘর করতে হলে তোকে একটু আধটু টেনসন ভোগ করতে হবে।
জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে।
কি দিদি অন্যায় বললাম।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
অনিমেষদা আবার মিত্রার দিকে তাকাল।
এখন মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানিস ওর মগজাস্ত্রটা যদি আর কয়েকদিন আগে কাজে লাগাতে পারতাম বড়ো উপকার হতো। অনেক দেরি করে ফেলেছি।
অনিমেষদার ফোনটা বেজে উঠলো।
হ্যাঁ বলো।….পেয়েগেছো….হ্যাঁ আমি ডাইরেক্ট যাচ্ছি….প্রবীরকে সঙ্গে নেব….ঠিক আছে….প্রবীরের ফোন বন্ধ….হবে হয়তো….আমরা সব মিত্রার বাড়িতে একটু আড্ডা মারছি। অনিমেষদা হেসে ফেললো।
কিগো প্রবীর।
খেয়াল নেই দাদা।
ছোটমা চা নিয়ে এলো। সবাই চা খেলাম। এবারও প্রবীরদা আমার সঙ্গে ওই দুজনের আলাপ করিয়ে দিল না। এমনকি অনিমেষদাও খুব একটা পাত্তা দিল না। চোখা চুখি হলো। চা খাওয়া শেষ অনিমেষদা উঠে দাঁড়াল। রথীন ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে।
ডাক্তারবাবু এখন আসি। যাক অনির শ্বশুর বাড়ির দৌলতে আপনাদের পাড়ায় কিছুক্ষণ আড্ডা মারে হলো।
মাঝে মাঝে এরকম হলে খুব ভালো লাগে।
সবই তো বোঝেন নতুন করে আর কি বলি বলুন।
আমি অনিমেষদার সঙ্গে নিচে নেমে এলাম। নিচে বেশ ভিড় দেখলাম। বুঝলাম উৎসাহী মানুষের অভাব এখনো কমে নি। আবীরবাবু অনেকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। পার্টিগতো ডেকরাম। অনিমেষদা গাড়িতে উঠে বসলো। প্রবীরদা আর একটা গাড়িতে।
গাড়িতে ওঠার আগে অনিমেষদা ইশারায় বললো, ফোনটা খোলা রাখিস যদি কিছু দরকার পরে।
আমি মাথা দোলালাম
আমি অনিমেষদাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ওপরে উঠে এলাম।
বড়মা, জ্যেঠিমনি, দামিনী মাসি মুচকি মুচকি হাসছে।
কাজ শেষ হলো।
কিছুটা। এবার যেতে হবে। কাল সকাল থেকে অনিকে আটকাবার চেষ্টা করবে না।
তোর সঙ্গে আমার কথা বলাই হলো না। দামিনী মাসি বললো।
হাসলাম। অসুবিধা না থাকলে সঙ্গে চলো, ও বাড়িতে সারারাত কথা বলবো।
দামিনীমাসি বড়মার দিকে তাকাল।
যাবে ?
দামিনী মাসি মাথা নীচু করলো।
আমি তাহলে বাদ যাই কেনো। ইসলামভাই চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি হাসলাম।
বাড়ির গেটে গাড়ি এসে দাঁড়াতেই দেখলাম ভেতরে সব লাইট জ্বলছে। তারমানে বাড়িতে কেউ আছে। বড়মার দিকে তাকালাম। বড়মা হাসলো। বুঝলাম বড়মা ব্যাপারটা জানে। ছগনলাল গেট খুলে দিল। গাড়ি ভেতরে এসে বাগানের রাস্তায় দাঁড়াল। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। ওরাও সবাই নেমে এলো।
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো।
হ্যালো….হ্যাঁ সবে মাত্র বাড়িতে ঢুকলাম। এখনো ঘরে যাই নি।….হয়তো বন্ধ….হো হো হো….
দেখলাম ভেতর থেকে টিনা মিলি বেরিয়ে এলো। বুঝলাম এরা অফিস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। তারমানে এরাও কিছুটা আঁচ করেছে আজকের ঘটনার সম্বন্ধে।
তোমরা কখন আসবে….রান্না টিনা মিলি করছে….ঠিক আছে তোমরা নিয়ে এসো….বৌদি সুরো আসবে! কি মজা হবে….শোন একটু কষা কষা নিয়ে আসবে….আচ্ছা।
মিত্রা এতোক্ষণ কথা বলেছে, দামিনী মাসি ইসলামভাই ছোটমা বড়মা ওর মুখের দিকে সমানে চেয়ে আছে, বোঝার চেষ্টা করেছে মিত্রা কার সঙ্গে কথা বলছে। কথা শেষ করেই মিত্রা আমার সামনে এগিয়ে এলো। পেছন পেছন ওরা। চোখে মুখে বিস্ময়ের হাঁসি।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ফোনটা কার হতে পারে। কথা শুনে বুঝলাম, খাওয়ার একটা আয়োজন হতে পারে। ডাক্তারদাদা গাড়ি থেকে নেমে এলো।
আবার কি হলো, তোমরা সব ওকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছ কেন।
একটু পরে বুঝতে পারবে।
কেন আবার কি হলো!
ওর সব কীর্তি এবার থেকে দেয়ালে খোদাই করে রাখতে হবে।
মিত্রা হাসি হাসি মুখ করে ডাক্তারদাকে বললো।
নীরু মিত্রার কথায় হাসছে।
আমি আর দাঁড়ালাম না। প্রচন্ড জোড়ে বাথরুম পেয়েগেছে। সোজা হাঁটা লাগালাম।
কিরে হন হন করে কোথায় যাচ্ছিস। তোর হবে দাঁড়া।
শিঁড়ি বেয়ে ওপরে তর তর করে উঠে এলাম। জামা প্যান্টটা কোন প্রকারে ছেড়ে বাথরুমে দৌড়লাম। সব কাজ সেরে ভালো করে স্নান করলাম। শরীরটা এখন বেশ হাল্কা হাল্কা লাগছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম সুরো আমার খাটে চিত্তাল হয়ে শুয়ে আছে। বেশ সুন্দর একটা শালোয়াড় কামিজ পরেছে। মাথার ওপর পাখাটা বন বন করে ঘুরছে।
কিরে তুই, এই অসময়ে!
তড়াক করে বিছানায় উঠে বসলো।
ঢং, কিছু জানেনা যেন।
তারমানে!
এখানে জোর খাওয়া দাওয়া আছে।
স্পন্সর কে।
বাবা।
তোর বিয়ে ?
ছুটে এসে দিলো আমার পেটে গোঁতা।
আমার বিয়ে খাওয়ার সখ হয়েছে।
আমি হেসে উঠলাম।
কেন তুইতো ইন্টু মিন্টু করছিস আমার কাছে সেরকমই খবর আছে।
আবার তেড়ে এলো। আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম। ধস্তা ধস্তি শুরু হয়ে গেলো। সুরো চেঁচিয়ে উঠলো।
কে বলেছে শুনি আগে।
কে আবার বলবে আমি জানলাম।
কোথা থেকে জানলে বলো।
তাহলে আমার কাছে খবরটা ঠিক এসেছে বল।
ফালতু খবর। সুরো কোনদিন এলি তেলি ছেলের সঙ্গে প্রেম করবে না।
তা ঠিক। তোর তো আবার….
খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি অনিদা।
আমি ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম।
আমাকে যে ফোন করে বললো তুই সেন্ট্রাল পার্কে হাতে হাত ধরে বসে আছিস।
সুরো গঁ গঁ করতে করতে আবার তেড়ে এলো।
তবেড়ে।
আমি আবার ওর হাত দুটো চেপে ধরলাম।
টাওয়েল খুলে গেলে কিন্তু হুলুস্থূলুস কান্ড বেঁধে যাবে।
খুলুক।
সে কিরে! তোর বৌদি একেবারে কালি ঠাকুর হয়ে যাবে।
ও কিরে দুজনে মারপিট করছিস কেনো। গেটের সামনে ছোটমা।
দেখ না অনিদা বাথরুম থেকে বেড়িয়ে কিসব বলছে।
যা সত্যি তাই বলছি।
ছোটমার পেছনে এসে বৌদি মিত্রা দাঁড়াল।
ওরা আমাদের এই অবস্থায় দেখে হাসছে।
ওরা মারপিট করুক। চল আমরা নিচে যাই।
দেখ না মা অনিদা কি সব বলছে।
ও তোর অনিদা আর তোর ব্যাপার।
তাহলে বলি বল।
আমি সুরোর দিকে ভ্রু নাচিয়ে বললাম।
সুরো দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার পেট চিমটে ধরলো।
আর হবে বলো।
আমি উ উ করে উঠলাম।
আগে বলো আর বলবে।
না আর বলবো না। ছাড়।
বলো, যা বলিলাম মিথ্যে বলিলাম।
যা বলিলাম মিথ্যে বলিলাম।
আমার অপরাধ হইয়া গেছে সুরো।
এতো সাধু ভাষা বলতে পারব না।
চলিত ভাষায় বলো।
তুই আগে ছাড় তারপর বলবো।
আগে বলো তারপর ছাড়ব।
বললাম।
মুখে উচ্চারণ করে বলো।
নোট পাবি না। ফার্স্ট ক্লাস হবে না।
না হোক তবু মুখে বলো।
ওরা তিনজনে গেটের সামনে সুরোর কীর্তি দেখে হেসে গড়িয়ে পরে।
আচ্ছা পরে বলছি। এবার কিন্তু আমার টাওয়েল খুলে পরে যাবে।
খুলুক।
সেকিরে, বৌদি গেটের মুখ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
সুরো পেট থেকে হাত সড়াল আমি একটু হাত বুলিয়ে নিলাম। জায়গাটা সামান্য লালা হয়ে গেছে। বহুত জোড়ে চিমটে ধরে ছিল।

মনে রাখিস কষা মাংসের এক টুকরোও পাবি না। চেটে চেটে সব পাতে সাজিয়ে রেখে দেব।
আমি তাই খাবো।
ছোটমারা আমাদের রকম সকম দেখে হেসে গড়িয়ে পরে যায়।
আমি একটা সাবেক পাজামা পাঞ্জাবী আলনা থেকে টেনে বার করলাম।
সুরো ছুটে এলো।
এটা পরা হবে না।
সেকিরে তুইও আমার ওপর খবর দারি করবি নাকি।
বেশ করবো।
খেয়েছে।
খেয়েছে না খাইসে।
ওই হলো আর কি।
মিত্রা পায়ে পায়ে এসে ঘরে ঢুকলো।
কোনটা পরবে বল।
বিয়ের দিন সকালে যে গেড়ুয়া রংয়ের টা পরেছিল সেইটা।
আমার কি আজ বিয়ে।
আবার।
সুরো তেরে এলো।
ঠিক আছে ঠিক আছে মিত্রা তাই দে ডাকিনী যোগিনীর হাত থেকে অন্ততঃ বাঁচি।
সুরো আবার তেড়ে এলো, আমি মিত্রার পেছনে আশ্রয় নিলাম। ঢাল বানালাম মিত্রাকে।
কি ভেবেছ কি বৌদি তোমাকে বাঁচাবে।
না। তুই হাফ মার্ডার করবি আর তোর বৌদি হাফ। তাহলেই ষোলকলা পূর্ণ।
কিগো তোমার জামা কাপর পড়তে এতো দেরি।
হাসতে হাসতে টিনা ওখানেই বসে পরলো।
তোমরা তিনজনে কি করছো ?
ঘুসো ঘুসি। সুরো মারছে আমি মিত্রাকে দিয়ে আটকাচ্ছি।
এই মিলি দেখবি আয় অনিদার অবস্থা।
টিনা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখলি দেখলি একেবারে কেল করে দিলি।
বেশ করেছি।
এবার সারা পাড়া রাষ্ট্র হয়ে যাবে।
হোক।
ঠিক আছে ঠিক আছে। উইথড্র।
ঠিক।
ঠিক। যা বলেছি সব।
সুরো ঘুরে দাঁড়াল।
মাথায় রাখিস, এবারের মতো ছেড়ে দিলাম পরের বার হলে….
সুরো দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এলো।
তুমি কিছু করতে পারো না।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
মিত্রা খিল খিল করে হাসছে।
আমি কি করবো বল।
চিমটি কেটে পেটের মাংস তুলে নেবে।
মিলি বড়মা এসে হাঁসির আসরে জোগ দিয়েছে।
ওরা কি করছে রে ছোট।
কথা বলো না বৌদি বলেছে খালি দেখে যেতে।
ও সুতপা।
থামো তো তুমি। খালি সুতপা সুতপা।
তা বলে ধিংগি গুলো মারপিট করবে।
আজ দেখছো তাই বলছো, আমার দেখে দেখে চোখে ছানি পরে গেছে।
ও সুরো ছাড় ছাড় রোগা পেটকা ছেলেটা….
রোগা পেটকা। সুরো ভেংচি কাটল।
জানো গায়ে অসুরের মতো শক্তি।
মিত্রা হাসতে হাসতে খাটে গিয়ে বসে পরলো। আমি সুরো কে জড়িয়ে ধরলাম।
দেখ ঘেমে গেছি। অনেকক্ষণ ধস্তা ধস্তি হয়েছে। বহুত খিদে পেয়ে গেছে।
মাংস আমার।
সবাই এবার জোড়ে হেসে উঠলো।
শুধু মাংসো নয় আমার পাতে যা পরবে সব তোর।
সুরো আমার কি থাকবে। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
তোমাকেও ভাগ দেব।
ওরা সবাই হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ধস্তা ধস্তির পরিসমাপ্তি হলো। হাসতে হাসতে যে যার ক্লান্ত।
ওরে বাবারে সত্যি তোরা পারিসও বটে। ছোটমা বলে উঠলো।
আমি মিত্রার বার করা পাজামা পাঞ্জাবী নিয়ে ছোটমার ঘরে চলে গেলাম। বাথরুমে গিয়ে আবার গায়ে একটু জল ঢাললাম। তারপর পাজামা পাঞ্জাবী পরলাম।
এ ঘরে এসে দেখি সব নিচে চলে গেছে। বারান্দা দিয়ে লক্ষ্য করলাম পাঁচ খানা গাড়ি লম্বা করে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলাম নিচে অনেকে ভিড়ভাট্টা। আমি মোবাইলটা পকেটে নিয়ে নীচে নেমে এলাম।
আয় আয় বিধানদা আমাকে দেখেই বলে উঠলো। আমি মুচকি হাসলাম।
ঘরে পা রেখেই চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। সোফায় পাঁচ মাথা, চেয়ারে দামিনীমাসি ইসলামভাই। রতন আবিদ অবতার সাগির এক কোনে বসে আছে। বুঝে গেলাম কেশটা কি হয়েছে। এরাও সব জেনে গেছে। রান্নাঘরের সামনে নীরু সুরো খেয়ো খেয়ি করছে সঙ্গে মিত্রা। তালে তাল দিচ্ছে মিলি, টিনা। বড়মার ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদা। তারমানে দাদা মল্লিকদাও চলে এসেছে!
প্রবীরদা আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে আসতে গিয়ে বাধা পেল।
বিধানদা চেঁচিয়ে উঠলো।
না প্রবীর আমাদের আইডিয়োলজিতে ইমোশনের কনো দাম নেই, বি-প্র্যাকটিক্যাল। বাস্তব যেটা সেটা মেনে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলি।
অনুপদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
ইসলামভাই, দামিনীমাসিও হাসছে।
অবতার, সাগির দুজনেই আমার কাছে এগিয়ে এলো।
এই তোরা কি ফুস ফুস করতে যাচ্ছিসরে। এতোক্ষণ বোবা হয়েছিলি, অনিকে দেখামাত্রই মুখে বোল ফুটে গেল। রূপায়ণদা চেঁচিয়ে উঠলো।
ওরা মাথা নীচু করে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। সবাই তাকিয়ে দেখছে।
বাবুর সময় হলো নিচে নামার।
ঘর থেকে বেরতে বেরতে দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
মল্লিকদা আমাকে দেখে হাসতে হাসতে বললো। তুই পারিসও বটে।
তোমার কাজটা এবারও পুরো করতে পারলাম না। অবতার মাথা নীচু করে বললো।
অনিমেষদা বিধানদা আমার দিকে তাকিয়ে। মিটি মিটি হাসছে।
ওদের মতো এরকম বিশ্বস্ত সৈনিক পেলে আমরা অনেক দূর এগোব বুঝলি অনি।
রূপায়ণদা ফুট কাটলো।
দাদাদের সব বলেছিস।
সাগির মাথা দোলাল। বলে নি।
মাসি কিছু বলেছে।
না।
ইসলামভাই।
না।
রতন আমার হাতে একটা খাম দিল।
গেছিলি।
রতন মাথা দোলাল।
করে দিয়েছে।
হ্যাঁ।
কনো ঝামেলা করে নি।
বললো তুই আবার কবে থেকে একে চিনলি।
একটু ছুঁয়ে দিলি।
রতন হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছে।
সাগির ওদিককার খবর।
ঠিক আছে। একটু ঝামেলা করেছিল। আমি লোক লাগিয়ে দিয়েছি।
ফোন টোন কিছু করেছিল।
না।
খবরা খবর নিয়ে রাখবি।
দাদা দেখছেন ওর কারবারটা। ইসলামভাই বললো।
দেখছি, দাঁড়াও বোঝার চেষ্টা করছি। বিধানদা বললো।
দাদাদের এবার সব বলে দে। যা যা প্রশ্ন করবে সব।
অবতার, সাগির আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আবিদ তুই বাইরে আয়।
কেন ও বাইরে যাবে এতক্ষণ বেশ হচ্ছিল হোক না। অনিমেষদা বললো।
না এটা একেবারে অন্য, তোমাদের এখন জানান যাবে না।
সুতপা।
আবার কি হলো।
তোমার পুত্রবতের অবস্থা দেখেছ। আমরা এখানে বসে আছি। পাত্তাই দিচ্ছে না।
তোমাদের কোন ক্ষতি করেছে কি ?
বিধানবাবু উত্তর শুনলেন।
শুনলাম। সুতপা একটু চা দাও তারপর খাব।
দাদা কটা বাজে খেয়াল আছে।
আছে আছে। এতোবড়ো একটা অসম্মানের হাত থেকে অনি সকলকে বাঁচাল, সেই উপলক্ষে একটু চা চাইছি।
বাবাঃ ছেলের কীর্তিটা তাহলে স্বীকার করছেন। আপনারা সহজে কিছু স্বীকার করেন না।
বিধানদা হেসে উঠলো।
আমি বাইরে বেড়িয়ে এলাম। আবিদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। তারপর ভেতরে এলাম। দেখলাম তখনো চায়ের সঙ্গে অনিমেষদা বিধানদা, সাগির অবতারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে। ওরা কখনো চুপ করে আছে কখনো উত্তর দিচ্ছে। আমি ভেতরে এসে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।
এবার ওদের ছেড়ে দাও। খেয়ে দেয়ে যাক, অনেক কাজ আছে।
আবার কিসের কাজ।
আছে কিছু ছোট ছোট কাজ আছে।
সাগির, অবতারের দিকে তাকিয়ে বললাম।
যা বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নে।
আমি বলার সঙ্গে সঙ্গে ওরা উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
খোঁজ খবর নিলে। আমি যা বলেছিলাম মিললো কিছু।
অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
প্রবীরদা আর কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করো না।
তুই বিশ্বাস কর অনি।
আমার গায়ে জননেতার গন্ধ নেই তোমার আছে। চোখের সামনে প্রমাণ করে দিলাম।
আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছিনা।
বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার।
একটু থেমে।
ডাক্তারদাদা ধরতে না পারলে তোমরা কিছুই জানতে পারতে না।
সে তো বুঝলাম। বিধানদা বললেন।
ওই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে কি ডিসিসান নিলে।
এখনো কিছু নিই নি। কালকে একবার সকলে বসবো। মিটিং-এ ডেকে পাঠাই তারপর।
দেরি করো না।
কেন।

যে টুকু খতি করার করে দিয়েছে। বাকিটা সুযোগ দিও না। আর একটা কথা।
বল।
মাসিকে এখন কোন দায়িত্ব দিও না। কিছুদিন যাক তারপর দিও।
কেন বলছিস।
পরিবেশটা অনুকূল নয়।
তুই অরিত্র আর অর্ককে কোথাও পাঠিয়েছিস। দাদা বললো।
আমি! কোথাও পাঠাই নি।
ওরা বেশ কয়েকদিন অফিসে আসছে না।
ফোন করে দেখ।
সন্দীপ বহুবার ফোন করেছে, স্যুইচ অফ।
তোমার কি দরকার অফিসে হাজিরা দেওয়া না লেখা।
অনিমেষদা বিধানদা হেসে উঠলো।
দুটোই।
সম্ভব নয়।
তারমানে।
কোন মানে নেই।
অনি, কি বলছেরে তোর দাদা। বড়মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
এবার অনুপদা, রূপায়ণদা, প্রবীরদা তিনজনে একসঙ্গে হেসে উঠলো।
দেখলে, দেখলে ডাক্তার অবস্থাটা দেখলে।
দেখে কি করবো। তোমার লেখা পাওয়া নিয়ে দরকার, পেয়ে যাবে।
অনেক হয়েছে এবার ওঠো। বিধানদা চটপট করে রেডি হতে হবে। রাত হয়ে গেছে। বৌদি এসে তাড়া লাগাল।
সবাই উঠে দাঁড়াল। ইসলামভাই গিয়ে রতনদের ডেকে নিয়ে এলো ওরা ধরা ধরি করে সব টেবিল চেয়ার একপাশ সরিয়ে দিলো। নিচে আসন পাতা হল।
বড়মা আজ আমি অনিদার পাশে।
বড়মা সুরোর দিকে তাকিয়ে হাসল।
আবার শুরু করবি।
না।
মনে থাকে যেন।
হ্যাঁ।
তোর বৌদি কোথায় বসবে।
আর এক পাশে বসবে।
এটা কি হলো সুতপা। অনিমেষদা বৌদিকে বললো।
আর বোল না। এসে একচোট অনির সঙ্গে হয়ে গেছে।
কেন।
জিজ্ঞাসা করো তোমার মেয়েকে।
নাগো বাবা আনিদা বাজে কথা বললো তাই।
তাই বলে তুই….।
একটু, বেশি না।
ঠিক করেছিস, আমি বলছি তোকে, পারলে বেশি করে করবি। তোকে এবর ওর নজরদারি করার দায়িত্ব দেব। বিধানদা বললো।
দেবে।
পারবি।
তুমি বলোনা এক চিমটিতে পেট থেকে সব কথা বার করে নেব।
সুরোর কথায় সবাই হাসে।
মাথায় রাখিস আমার পাশে বসা হবে না।
বড়মা বলেছে।
বড়মার পাশে বসবি।
মাংস গুলো দিয়ে দেবে।
সবাই হাসছে।
খেতে বসা হলো।
খেতে খেতে অনিমেষদা বললো।
জানিষ অনি তোর সব কথা ঠিক ঠিক লেগে গেছে, একটা কথা লাগে নি।
কোনটা বলো।
ওরা প্রবীরকে ফাঁসাতে চেয়েছিল ঠিক, তবে তার আগে তোর নামটা ছিল।
তুমি আমার কাছ থেকে যেটা জানতে চইছো, সেটা এত সহজে জানতে পারবে না। তবে একটা কথা বলে রাখি, আমি যদি টার্গেট হতাম। কাজটা অবতাররা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে খতম হয়ে যেত। সময় দিত না। এবার তুমি যা বোঝার বুঝে নাও।
সবাই খাওয়া থামিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল।
যা বলছি ঠিক বলছি। তুমি অবতার আর সাগিরকে ছাড়িয়ে এনেছ। ওদের চারজনকে ছাড়িয়ে আনতে পারনি। ওদের কাল পরশু ছাড়িয়ে আনব। একচ্যুয়েলি অবতার, সাগির ফিডব্যাক দিত, কাজটা করতো ওরা। অবতার, সাগিরও ওদের চেনে না।
তাই কি আবিদের সঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে সেই কথাই আলোচনা করলি।
চুপ করে থাকলাম, কোন কথা বললাম না।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাপারটা তুই বেশ ভাল রপ্ত করে ফেলেছিস।
বাঁচার তাগিদে, না হলে কুকুর বেড়ালের মতো সকলে ছিঁড়ে খেয়ে ফলতো। আশা রাখি তার প্রমাণ তোমাদের এই কয়মাসে বহুবার দিয়েছি।
আস্বীকার করছিনা।
তোমরা পলিটিক্যালি ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলে। কবে জানতে পেরেছিলে ?
আজ সকালে জেনেছিলাম। অনুপদা বললো।
আমি যদি টার্গেট হোতাম কাল রাতেই কাজ হাসিল হয়ে যেত। তোমরা বড়োজোড় একটা তদন্ত কমিশন বসাতে। তার রিপোর্ট জমা পরতো তিন বছর পর। কি হতো ?
সবাই চুপ করে গেল। সুরো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি ওর পাতে আমার পাত থেকে দুটো মাংসের টুকরো তুলে দিলাম। সুরো হাসলো। দুটো তুলে দিলাম মিত্রার পাতে।
তুই খাবি না। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমার দুটে আছে। বড়মা তোদেরটাও আমার পাতে দিয়ে দিয়েছে। না হলে কম পরে যাবে।
তাহলে আর একটা দাও।
চেটে নিই তারপর দিচ্ছি।
উঁ খায় কতো।
দেখেছিস তোর বাবা খাওয়ার সময় ইনটরোগেসন শুরু করে দিয়েছে।
ওই জন্য তোমায় বললাম আমাকে একটু শিখিয়ে দাও। বাবাকে নিয়েই প্রথম লিখব।
কি লিখবি বাবা খারাপ কজ করছে।
তা না।
তাহলে।
তুমি বলে দেবে।
সুরো মাংসের হাড়টা ভালো করে চুষলো।
এটা খাবে।
দে।
এ্যাঁ কত খায়।
হাসলাম।
প্রবীরদা।
বল।
তোমার এখনো দুটো ফাঁড়া আছে। তুমি একটু চোখ কান খোলা রেখে চলো, বুঝতে পারবে।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল। মুচকি মুচকি হাসল।
কিগো ইসলাম তোমার কাছে এরকম কোন খবর আছে।
সত্যি বলছি দাদা, গত দেড়মাস আমি রতন আবিদকে সব ছেড়ে দিয়েছি। আমি খালি আপনার কাজটায় মন দিয়েছি। এদিকটা ওরাই দেখে।
হ্যাঁরে রতন।
রতন মুখ তুললো।
তোদের নামে পুলিশের খাতায় কোন খারাপ রিপোর্ট দেখিনা। এতো সব কাজ করিস কি করে।
দাদা খারপ কাজ করতে বারণ করে দিয়েছে।
তাহলে খারাপ কাজগুলো করে কারা।
রতন চুপ করে রইলো।
বলবি না এই তো।
অমিতাভদা আপনি কিছু ধরতে পারছেন।
সত্যি কথা বলবো অনিমেষ।
বলুন।
তোমার সঙ্গে বিধানবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। বলতে পার একজন কাগজের সম্পাদক হিসাবে যতটা পরিচয় থাকা দরকার ততটা। এককথায় মুখ চেনা। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু গত দেড়মাসে তোমাদের সঙ্গে যতটা ঘনিষ্ঠতা হল সেটা ছিল না।
তোমার সঙ্গে যে ওর এতটা ঘনিষ্ঠতা আছে সেটাও ঘুণাক্ষরে জানতাম না। তুমি ওর বড়মাকে জিজ্ঞাসা করতে পার। অফিসে গন্ডগোল হলো। একদিন ওকে ডেকে মিত্রার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। সেদিন প্রথম ওর চোখে মুখের চেহারার পরিবর্তন দেখলাম।
এরপর মিত্রা যখন আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে পরলো। তারপর থেকে এই ঘটনা গুলো একটু একটু জানতে পারলাম। তার আগে অনি এ বাড়িতে থেকেছে খেয়েছে শুয়েছে, ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারি নি। তবে ওর আর্টিক্যালগুলো দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো। এ ধরণের আর্টিক্যাল সেই-ই লিখতে পারে যে ওই ক্লাসের সঙ্গে গভীরভাবে মেশে। বিশেষ করে যে লেখাটা লিখে ও নাম করলো।
মাসিদের নিয়ে লেখাটা বলছেন তো।
হ্যাঁ।
প্রত্যেকটা ইনস্টলমেন্ট আপনার কাগজে দেওয়ার আগে ও সুতপাকে পরিয়ে নিত। আমি সুতপার কাছ থেকেই জেনেছি। আমার সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া ও বিশেষ কথা বলতো না। যতো জাড়ি জুড়ি সুতপার কাছে। সুতপাকে ও মন খুলে অনেক কথাই বলতো, মিত্রার কথাও একবার নয় বহুবার বলেছে, সুতপার মুখ থেকে ওর কথা শুনে শুনে ওর প্রতি একটা দুর্বলতা এলো বলতে পারেন ইনটারেস্ট, তখন ওর সম্বন্ধে একটু আধটু খবর নেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু চেষ্টা করেও ওর স্থায়ী ঠিকানা জোগাড় করতে পারি নি। কারন জানেন ?
না।
ও তখন ওই জায়গায় অনি নামে বিখ্যাত ছিল না। সকলে মাস্টার বলে জানত। তা ছাড়া দামিনী, ইসলাম ছাড়া ও যে সাংবাদিকতা করে এটাও কেউ জানত না। কি দামিনী আমি ঠিক কথা বলছি ?
দামিনী মাসি মাথা দোলালো। আমি ওই আলোচনায় কোন ইন্টারফেয়ার করলাম না। বুঝলাম অনিমেষদা একটা জাল বিস্তার করছে, কিছু জানার তাগিদে।
আপনাক সংক্ষেপে বললাম। আরও অনেক কিছু ওর সম্বন্ধে এই কদিনে উদ্ধার করেছি।
খারাপ না ভালো।
সময় বলবে।
বলা যাবে না।
না।
ছোট দুটো ভাত দাও। বিধানদা বললো।
হ্যাঁ দাদা দিই।
ছোটমা উঠে গেল।
হ্যাঁরে অনি জিজ্ঞাসা করলি না আজকের খাওয়াটা কি উপলক্ষে।
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম। তারপর সুরোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।
চিমটি কেটে পেটের মাংসো তুলে নেব। সুরো খিঁচিয়ে উঠলো।
কে কি বুঝলো জানি না, আমি হেসে ফেললাম।
কিরে তোর আবার কি হলো। অনিমেষদা বললো।
তোমাকে জানতে হবে না।
ওরকম করে উঠলি কেন।
আসাতক এরকম চলছে। বৌদি বললো।
টিন হাসছে।
টিনাদি খুব খারাপ হয়ে যাবে। সুরো আবার চেঁচাল।
না না আমি বলবো না। মিত্রাদি যদি বলে দেয়।
তুমি বৌদিকে বলেছো!
একটু।
সুরো ঘ্যান ঘ্যান করে উঠলো।
সবাই হাসছে।

কি হয়েছেরে অনি। বিধানদা বললো।
বলে দিই। সাসপেন্সে রেখে লাভ কি। আমি বললাম।
খুব খারাপ হয়ে যাবে।
আচ্ছা বলবো না। তোর ভাগের মিষ্টি গুলো আমার।
ঠিক আছে।
অনিমেষদা হেসে উঠলো।
বিধানবাবু।
বুঝলাম। তারমানে এখানেও একটা গন্ডগোল আছে।
কোন গন্ডগোল নেই। সুরো চেঁচিয়ে উঠলো।
তাহলে।
তাহলে আবার কি।
তোকে নজরদারির চাকরিটা দেওয়া যাবে না।
দিও না। বয়েই গেছে।
তাহলে খাওয়া দাওয়াটা কিসের জন্য তুই বল। বিধানদা বললো।
আমি সুরোর দিকে তাকালাম।
বাবা বললো অনি একটা ভালো কাজ করেছে।
সুরো আমার দিকে তাকিয়ে।
তাই প্রবীর বলেছে অনির বাড়িতে আজ রাতে খাওয়া দাওয়া। চলে আয়। তাই চলে এলাম।
তোর বিশ্বাস হয় অনি ভালো কাজ করেছে ? বিধানদা বললো।
অনিদা খারাপ কাজ করে না। প্রবীরকাকু তো বললো অনিদা বয়সে বড়ো হলে অনিদেকে প্রণাম করতো। খারাপ কাজ করলে প্রবীরকাকু এই কথা বলতো।
বিধানদা হাসছে।
জব্বর কথা বলেছে সুরো। কি বিধানবাবু এর পর আর কোন প্রশ্ন করবেন। ডাক্তারদাদা বললো।
বিধানদা হাসছে।
ইসলাম। ডাক্তারদা ইসলামভাই-এর দিকে তাকালো।
বলুন দাদা।
তুমিতো পর্শু চলে যাবে। এদিককার কাজের কি ব্যবস্থা করেছো।
আমি কালকে সব বুঝিয়ে দিয়ে যাব।
অনি।
বলো।
আমার টাকার কি হলো।
পেয়ে যাবে।
কিসের টাকা! অনিমেষদা বললো।
বাড়িটা সারাতে হবে না।
অনুপ ব্যবস্থা করবে।
না। আমি বললাম।
কেন।
তোমরা অনেক সাহায্য করছো এটাই যথেষ্ট। বাকিটা আমি ঠিক জোগাড় করে নেব।
আমরা যদি কিছু সাহায্য করি।
ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টটা করতে দিয়েছি। হয়ে যাক, তোমরা সাহায্য পাঠিয়ে দেবে। তখন কোন বাধা দেব না।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তোকে সবাই কান ধরে, এবার আমি কান ধরবো।
তা ধরতে পারো। কিন্তু ওটা আমার খুব সফ্ট কর্নার। বরং সুরোর কাছ থেকে আমি সাহায্য নেব।
ও তোকে সাহায্য করবে বলেছে।
হ্যাঁ। ডোনেসনের বিল ছাপতে দিয়েছি। ওকে একটা দেব ও সাহায্য নিয়ে আসবে। ও তো এই ফাউন্ডেসনের একজন মেম্বার।
সুরো মিটি মিটি হাসছে।
আর কাকে কাকে মেম্বার করলি।
তোমাদের সকলের নাম প্রস্তাব করে চিঠি পাঠান হয়েছে। যারা যারা সম্মতি দেবে তাদের আমরা মেম্বার করবো।
কি করতে হবে।
ওখানে ডিটেলসে লেখা আছে।
দাদা, পাকা পোক্ত কাজ। অনুপদা ফুট কাটল।
সে আর বলতে।
তোমরা সকলে মিলে ওকে চেপে ধরেছো কেন বলো। বড়মা বললো।
ওকে সেই ভাবে পাই কোথায় বলুন দিদি।
অনিমেষদা এমনভাবে কথাটা বলে থামলো, সারাটা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমরা চেষ্টা করলে ওর মতো কাজ করতে পারি। কিন্তু আমাদের অনেক অবলিগেসন। ও যেটা একলা তাৎক্ষণিক ভাবে ডিসিসন নিতে পারে আমাদের সেটা একটু বেশি সময় লাগে। তাতে সব সময় যে ক্ষতি হয় তা নয়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষতি হয়ে যায়। পলিটিক্যালি তাকে ধামা চাপা দেবার ব্যবস্থা করি। সব সময় হয়ে ওঠেনা। এসব কথা যদিও বলা ঠিক নয়, তবু আপনারা সবাই ঘরের লোক বলে মনে করছি। তাই বলছি।
ওর কাছ থেকে আমাদেরও কিছু শেখার আছে। প্রবীরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছি। তুমি অন্যায় করেছ এটা স্বীকার করো। ও মেনে নিয়েছে। এও বলেছি সেদিন রাতে তেমার সঙ্গে অনি যে ব্যবহার করেছে তাতে তেমার মনে কোন দাগ কেটেছে। ও স্বীকার করে নিয়েছে। অনির জায়গায় অন্য কেউ হলে ও ভেবে দেখতো। অনি মন থেকে এটা করতে চায় নি। তবে অনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছে।
জিজ্ঞাসা করুণ আমি কিন্তু প্রবীরের সামনে এই কথা বলছি। আজও প্রবীর যখন আমাকে বললো, দাদা আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। তখনই মনে একটা কু গেয়েছে। আস্তে আস্তে অনুপকে ফোন করলাম। দেখো তো কনো খবর আছে কিনা অনিকে নিয়ে। তারপরে প্রবীর গাড়িতে আস্তে আস্তে সব বললো। বুঝলাম আবার কোথাও একটা গন্ডগোল পেকেছে। অনির কাছে সব শোনার পর অনুপকে ফোন করতেই বললো ও সব খবর জোগাড় করেছে। বুঝে গেলাম।
ওখানে আমি পৌঁছবার আগে বিধানবাবু পৌঁছে গেছিলেন। আবহাওয়া খুব একটা যে ভালো ছিলো তা বলবো না। তবে ওর সৈনিকগুলো ওকে খুব ভালবাসে। ও যদি মন থেকে ওদের কাছে কিছু চায় সেই কাজটার জন্য ওরা জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দেবে।
আমি মাথা তুলে ঘরের পরিবেশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলাম। সবাই অনিমেষদার কথা মন দিয়ে শুনছে বলতে পারা যায় গিলছে। ইসলামভাই রতন আবিদরা এই প্রথম অনিমেষদাকে এতো কাছ থেকে আলাপচারিতায় দেখছে। অবতার সাগিরের চোখে কেউ যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জেলে দিয়েছে।
আচ্ছা মিত্রা তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো।
বলুন।
কিছু মনে করবি না।
না।
অনিকে তুই কতো মাইনে দিতিস।
ও মালিক হওয়ার আগে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক টাকা।
এখন।
এখনো ও সেই টাকা নেয়। ওর ডিরেকটরশিপ রেমুনারেসন নেয় না। রিফিউজ করেছে।
তোর সঙ্গে যখন ওর আবার দেখা হলো তারপর এই সব ঘটনা ঘটলো। তুই ওর আরও কাছে এলি। কখনো ওকে জিজ্ঞাসা করেছিস ও একা মানুষ এতো টাকা ও খরচ করে কোথায় ?
একবার করেছিলাম। উল্টে বলেছিল ওই টাকায় ওর কুলোয় না।
অনিমেষদা মিত্রার দিকে মুখ তুলে তাকাল, বিধানদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ব্যাপারটা এরকম আমি যে অনুসন্ধিৎসু নিয়ে এই কথা বলছি তা মিলছে। বিধানদা চোখে চোখে হাসল।
ওর খাওয়া দাওয়ার পয়সা লাগে না। বেশিরভাগ সময় ওর যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিষ তুই কিংবা দিদি বা ছোট কিনে দিস। তারপর ওর বৌদি আছে মাসি আছে, ইসলাম আছে। ওর খাওয়া খরচ লাগে না, থাকার খরচ লাগে না। বাজে খরচ ও করে না। একটা মানুষ খালি ট্রাভেলিংয়ে এত টাকা খরচ করতে পারে।
মিত্রা চুপ করে রইলো।
অনিমেষদা বড়মার দিকে তাকাল। দিদি আপনি কখনো জিজ্ঞাসা করেছেন।
আমি যতোটুকু জানি ওর দাদা ওর মাইনের কিছু টাকা কেটে ওর বাড়িতে প্রতিমাসে মানি অর্ডার করে পাঠায়। আগে কম পাঠাতো এখন বেশি পাঠায়। ওর টাকা ও খরচ করে।
অমিতাভদা আপনি কিছু জানেন।
না।
অনিমেষদা এবার আমার দিকে তাকাল।
কিরে আমাকে দাদা বলে ডাকিস, সম্মান করিস, এবার সবার সামনে আমার প্রশ্নের উত্তর দে।
আমি অনিমেষদার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম মুচকি হেসে মাথা নীচু করলাম। মনে মনে বললাম তুমি অনেক ঘোড়েল মাল। ঠিক খবর তুমি জোগাড় করে ফেলেছ।
অফিসের টাকা ছাড়াও তুই আরও রোজগার করিস। সব তোর কঠোর পরিশ্রমের টাকা। সেগুলো কি করিস ?
অনুপদা জানে অনুপদাকে জিজ্ঞাসা করো।
সবাই আমার দিকে তাকাল।
অনুপদা জোড়ে হেসে উঠলো।
অনিমেষদা মুচকি হাসল।
হাসছো কেন।
তোর মেধাকে কুর্নিশ করছি।
কেন।
অনুপ জানবে কি করে।
অনুপদা লোক পাঠিয়েছিল। নিজে সেই সব জায়গায় ভিজিট করে এসেছে।
নীরু।
গলার স্বরটা একটু বদলে গেল।
তুই বিশ্বাস কর, বটার কোন দেষ নেই।
আমি নীরুর দিকে কট কট করে তাকিয়ে।
অনুপদা ডাক্তারকে টোপ দিয়েছে, প্রমোসন করিয়ে দেবে, এক মাসের মধ্যে। বটা বলে এসেছে অনুপদা আপনাকে অনির হাত থেকে বাঁচাতে পারে। ডাক্তার রাজি হয়েছে, অনুপদা কথা দিয়ে এসেছে।
নীরু এক নিঃশ্বাসে কথা বলে থামল।
বিধানদা অট্টহাসির মতো হাসতে শুরু করলো। বৌদি, ছোটমা, বড়মা, দামিনীমাসি খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ডাক্তারদাদা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি পকেট থেকে ফোনটা বার করলাম।
ওটা পকেটে রাখ। অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি অর্ক অরিত্রকে আর ওই মেয়েদুটোর কি যেন নাম….।
রাত্রি আর খুশী। মিত্রা ফুট কাটল।
হ্যাঁ।
ছোট আমাকে আরও দুটো মিষ্টি দাও।
ছোটমা উঠে দাঁড়ালো।
সেকিগো! এ মাসের সুগারটা একটু নর্মাল আছে তাই বলে….। বৌদি বললো।
অনি আমার সুগার নর্মাল রাখতে দেবে না। বরং মিষ্টি খেয়ে নর্মাল রাখি।
ছোট আমাকেও দিও। বিধানদা বললো।
ছোটবান্ধবী আমিই বা বাদ যাই কেন। ডাক্তারদাদা বললো।
ছোটমা সবাইকে দিতে দিতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
লাগবে না।
কেন, পেট ভড়ে গেছে। ছোটমা বাঁকা চোখে তির্যক দৃষ্টি হানল।
ছোটমার দিকে তাকালাম। সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
অনিদার ভাগেরটা আমাকে দাও। সুরো বললো।
সুরোর দিকে তাকালাম।
অনেক খেয়েছো। হজম হতে সময় লাগবে।
হাসলাম। খুব মজা না।
এমনি এমনি বললাম। বাবা তোমাকে বেশি ভালবাসে কিনা।
মাথায় রাখিস।
ফুটো হয়ে গেছে।
ঠিক সময়ে ঝালাই করে দেব।
সে দিও এখন তোমার ভাগেরটা খাই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কিরে উঠছিস কেন। শেষটুকু শুনে যা। অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললো।

বড়মাকে শোনাও। চোখ দুটো দেখেছো।
তুইও শুনে যা।
না।
গিয়ে আবার ফোন করিসনা যেন। সব দায় আমার আর বিধানবাবুর ঘারে নিয়ে নিয়েছি।
পেছন ফিরে একবার হাসলাম। বাইরের বারান্দার বেসিনে মুখ ধুয়ে ওপরে চলে এলাম।
ঠিক পনেরো দিন পরে অফিসের গলির মুখে এসে দাঁড়ালাম। এই কটা দিন খুব চাপ গেল শরীররে ওপর দিয়ে। কলকাতায় সাকুল্যে ছিলাম মাত্র দুদিন, বাকি কটা দিন বাইরে বাইরেই কেটেছে। যে দুদিন কলকাতায় ছিলাম মিত্রা আমার সঙ্গে ঠিক ভাবে কথা বলেনি। ওর একটাই কথা আমারও কিছু কথা থাকতে পারে তোর সঙ্গে।
ওকে বলে বোঝাতে পারি না, আমি নিজের জন্য সময় নষ্ট করছি না। তুই আমাকে পাকে পাকে জড়িয়ে দিচ্ছিস। এই গেড়ো থেকে বেড়িয়ে আসা সত্যি খুব মুস্কিল। এই কদিন অফিসের যে টুকু খোঁজ খবর রেখেছি তা নিজস্ব প্রয়োজনে। আর কোন খোঁজ খবর রাখি নি। সব ওদের ঘাড়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। জানিনা কি অবস্থা, কেউ আমাকে ফোনও করে নি।
তুমি এখন আসছো ?
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পরেছিলাম। দেখলাম তাপস। আমাদের অফিসে ওর গাড়ি ভাড়ায় খাটে।
হ্যাঁ।
তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।
বল।
এখানে বলা যাবে না।
তাহলে।
মোড়ের মাথায় চলো।
চল।
আমি ওর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে একটু এগিয়ে গেলাম।
বল।
ঠাকুর আমার গাড়িটা বসিয়ে দিয়েছে।
কেন!
ও সন্দেহ করেছে আমি সব খবর তোমায় দিয়েছি।
কতদিন বসিয়ে দিয়েছে।
পনেরো দিন।
তোকে দায়িত্ব দিলে তুই চালাতে পারবি।
পারবো। তুমি একটা মাস দিয়ে দেখ।
ঠিক আছে আমাকে একবার ফোন করে কাল আসিস।
আমায় কিছু টাকা দাও। পকেট একদম খালি।
মানি পার্টস থেকে ওকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে দিলাম।
কবে ফেরত দিবি।
বিলটা পাই পেলে দিয়ে দেব।
বিল দিস নি।
আটকে রেখেছে, কি গন্ডগোল আছে।
কে।
তোমার ওই ম্যানেজার।
ম্যাডামকে বলেছিস।
ঢুকতেই দেয় না।
কে।
কে আবার কিংশুকবাবু।
তাপস মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
পোনেরো দিন ধরে এখানে এসে বসে থাকি তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য।
আমি ছিলাম না।
ছিদাম বললো।
কে ছিদাম।
সিকুরিটির ছেলেটা যে তোমাকে একদিন রাতে আটকেছিল।
ও মনে পরেছে।
তাপসের দিকে তাকালাম ছিদামের সম্বন্ধে ও আর কিছু জানে কিনা। না ওর চোখ সেই কথা বলছে না। ওর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ কথা বললাম।
ঠিক আছে তুই যা। কাল একবার দেখা করিস।
আচ্ছা।
পায়ে পায়ে অফিসের গেটের সামনে এলাম। দেখলাম আজ অন্য একটি ছেলে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। রবীন, ইসমাইল আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এলো।
দাদা কেমন আছো।
ভালো আছি। তোরা কেমন আছিস।
ভাল।
ইসমাইল ছেলে কেমন আছে।
আগের থেকে একটু ভালো।
ওষুধ গুলো ঠিক ঠিক খাওয়াচ্ছিস।
হ্যাঁ। নীরুদা কিছু দিয়েছে। বাকিটা কিনে নিয়েছি।
অফিস থেকে বিল নিয়ে নিয়েছিস।
হ্যাঁ।
রবীন দাদারা এসেছে ?
রবীন মাথা দোলাল।
গেট পেরিয়ে ভেতরে এলাম। রনিতা ম্যাডাম দেখেই উঠে দাঁড়াল। মর্নিং।
হাত নাড়লাম।
পায়ে পায়ে লিফ্ট বক্সের কাছে এলাম। সোজা ওপরে উঠে এলাম। মিত্রার ঘরের দিকে একবার তাকালাম। দেখলাম হরিদার ছেলে সোজা হয়ে বসে কাগজ পরছে। নিউজরুমে এলাম। আজ ঘর ভর্তি। সায়ন্তন কাছে এগিয়ে এলো।
কোথায় ছিলে এতোদিন। পুরো বেপাত্তা।
হাসলাম।
আমাকে দেখা মাত্র মল্লিকদা ফোনটা কানে তুলছে। বুঝে গেলাম। নিজের টেবিলে এসে বসলাম। অগোছাল টেবিল, চিঠির পাহাড় জমেছে। নতুন ঘরে কাঁচের রং বদলেছে। কাঁচের ওপর ফিল্ম লাগানো হয়েছে। ভেতর থেকে দেখা যাবে বাইরে থেকে কেউ ভেতরটা দেখতে পাবে না। এটা নিশ্চই দেবার আর্জি মতো মিত্রা করে দিয়েছে।
অর্ক অরিত্র হাসতে হাসতে কাছে এলো।
তুমি বহুত দুগ্গি আছো। ফাঁসিয়ে দিয়ে কেটে পরলে।
মুচকি মুচকি হাসলাম। মল্লিকদা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। অর্ক একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
পাঁচদিন ট্রেস নেই তোর ব্যাপারটা কি।
কেন! প্রত্যেক দিন তিনবার করে ফোনে কথা বলেছি সবার সঙ্গে। তোমার কাছে খবর না পৌঁছলে আলাদা।
পকেটে ফোনটা নাড়া চাড়া করে উঠলো। বার করলাম। নম্বরটা দেখে বুঝলাম ঠিক জায়গা থেকে খবর এসেছে।
বল।….কনফার্ম…..কাজে লেগে যা।…..মাথায় রাখিস মিস যেন না হয়।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
তোমার ফোন স্যুইচ অফ না। অরিত্র বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
তাহলে কার সঙ্গে তুমি কথা বললে।
একটা ছেলের সঙ্গে।
সেতো বুঝলাম। দাঁড়াও দাঁড়াও মাথায় ঢুকছে না। এটা কি আবার তোমার নতুন স্কিম।
বাজে বকিস না। চা খাওয়াবি। অনেক কাজ।
মল্লিকদা মুচকি মুচকি হাসছে আর আমাকে মেপে যাচ্ছে। দেখলাম নিউজরুমের গেটটা ঠেলে হরিদা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝে গেলাম।
চা আনব, না বড়ো সাহেবের ঘরে গিয়ে খাবে। অরিত্র ফুট কাটলো।
আমি হাসতে হাসতে মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
আর কাকে কাকে ফোন করে জানানো হয়েছে।
যারা এটলিস্ট তোর খবরটা পেতে চায় তাদের জানিয়েছি।
হরিদা কাছে এসে দাঁড়ালো।
বড়সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে। অর্ক ফুট কাটলো।
শুধু বড়ো সাহেব না। দিদমনিও আছে। হরিদা অর্কর দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো।
কার কাছে গেলে চা পাবো। আমি হাসলাম।
হরিদা হেসে ফেললো। চলোতো মেলা বকিও না।
সন্দীপ আসে নি। মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
দেরি হবে আসতে।
দেবাশীষ, নির্মাল্য ?
সকালে বেরিয়েছে। তুই এখন কোথা থেকে আসছিস ?
দিল্লি থেকে।
মল্লিকদা হেসে ফেললো।
হাসলে যে।
হাসির কথা বললি তাই।
ঠিক আছে বড়সাহেবের ঘরে এসো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
আমাদের সঙ্গে একটা ছোট্ট মিটিং করতে হবে। অরিত্র বললো।
আজ সারাদিন অফিসে আছি।
বিশ্বাস করতে পারি।
হ্যাঁ।
পায়ে পায়ে নিউজরুমের বাইরে চলে এলাম। আমার সামনে হরিদা। আমি মিত্রার ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম।
ওদিকে কোথায় যাচ্ছ ? হরিদা ধমকে উঠলো।
দিদিমনির সঙ্গে দেখা করে আসি।
সবাই এই ঘরে।
হাসলাম।
দাদার ঘরের দরজা খুলতেই চোখে পরলো মিত্রা দাদার পাশের চেয়ারে বসে আছে। চোখ চলে গেলো ওর শরীররে দিকে। পনেরোদিন ঠিক মতো ওকে দেখি নি। পেটটা সামান্য উঁচু হয়েছে। এই সময় আমার একটা দায়িত্ব আছে। প্রবল চাপে আমি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারি নি। এবার যে কেউ একটু ভালো করে তাকালে বুঝতে পারবে মিত্রা মা হতে চলেছে। ও আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। চোখে মুখে তীব্র উত্তেজনা। অপরজিটের চেয়ারে মিলি, টিনা, অদিতি। আমি মুখটা বাড়িয়ে ফিক করে হেসে ফেললাম।
আয়।
দাদার কন্ঠস্বর ভীষণভাবে স্বাভাবিক। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। বুঝতে পারছি ভেতর ভেতর ভীষণভাবে গরম খেয়ে রয়েছে। আমাকে মনের সুখে তুলধুনো না করতে পারলে শান্তি নেই।
চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। এমনভাবে বসলাম যাতে সবার মুখ নজরে আসে।
কিছু খাওয়াবে।
তুই মালিক বলে কথা। খাওয়াব আমি ?
উঠে দাঁড়ালাম।
উঠলি কেনো।
মালিক যখন তখন এডিটরকে আমার কাছে ডেকে পাঠাব।
তোর ঘড় আছে। দাদা হেসে ফেললো।
নিউজরুমের চেয়ারটা এখনো আছে।
ওখানে বসে একটা কাগজের এডিটর মালিকের সঙ্গে কথা বলবে ?
মালিক যদি বলতে চায় এডিটর পারবে না কেন। তাছাড়া এই অফিসে কথা বলার মতো অনেক জায়গা আছে, তোমার আপত্তি থাকতে পারে, আমার নেই।
বোস, বেশি বক বক করিস না।
টিনারা মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।
ছিলি কোথায় ?
দেখলাম দরজা ঠেলে মল্লিকদা ঘরে ঢুকলো।
প্রথম থেকে বলবো না আজ সকালে যেখান থেকে এলাম তার কথা বলবো।
এখন কোথা থেকে এলি ?
এয়ারপোর্ট থেকে ব্যাগটা নেপলাকে দিয়ে বাড়িতে পাঠালাম। নেপলা এয়ারলাইন্সের সামনে নামিয়ে দিল হাঁটতে হাঁটতে অফিস।

দুঘন্টা আগে পাঠিয়েছিস। এয়ারলাইন্স থেকে এখানে আসতে নিশ্চই দুঘন্টা সময় লাগে না।
ফোনটা পকেটে আবার নাড়া চাড়া করে উঠলো পকেটে হাত ঢুকিয়ে বার করলাম।
বল।…দে…হ্যাঁ ম্যাডাম প্যাকেটটা দাদার ঘরে পাঠিয়ে দিন।
সবাই কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে।
ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।
আর কি জানতে চাও বলো।
এটাকি তোর নতুন নম্বর।
হ্যাঁ।
কবে নিলি।
দিন পাঁচেক হয়েছে।
নম্বরটা দে।
দেওয়া যাবে না। তোমাদের জন্য একটা নম্বর আছে। ওটাই থাকবে।
দরজা ঠেলে হরিদা ঢুকলো। হাতে প্যাকেট।
নাও নিচ থেকে পাঠাল।
ডিমটোস্ট খাওয়াবে।
ওপরে বলে পাঠিয়েছি। আসছে।
একটা না সবার জন্য।
দেখি কটা দিয়ে যায়।
প্যাকেট থেকে ফোনটা বারকরলাম, মানি পার্টস থেকে সিমটা ঢুকিয়ে দিয়ে সেটটা চালু করলাম। সবাই আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে।
কিরে একটায় হচ্ছে না। দাদা হাসতে হাসতে বললো।
প্রয়োজন পরলো। তাই কিনে নিলাম।
টিনার দিকে তাকিয়ে, ফোনটা আর চার্জারটা দিয়ে বললাম, যাওতো একটু চার্জে বসিয়ে দাও।
টিনা উঠে দাঁড়ালো।
তোর ওই ফোনটা দেখি।
এতোক্ষণ পর মিত্রা নিস্তব্ধতা ভাঙলো।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা ওর হাতে দিলাম। আমার মুখে হাসি।
মিত্রা ফোনটা নিয়েই টেপা টিপি করতে শুরু করলো।
বুঝলাম নিজের মোবাইলে ডায়াল করার চেষ্টা করছে। আমার দিকে কট কট করে তাকাল।
দাদার দিকে তাকিয়ে বললো। দেখো দেখো একবার, ওর কান্ডটা।
কেন কি হয়েছে!
পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে। ও ছাড়া এই ফোনটা অচল।
ওই জন্য তুই চাইতেই তোকে সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিল। মল্লিকদা বললো।
মিলি অদিতি আওয়াজ করে হাসলো।
মিত্রাদি তুমি কি অনিদাকে এতো কাঁচা ভেবেছ। মিলি বললো।
এইবার তুমি অনিদাকে আর হাতের নাগালের মধ্যে পাবে না। অদিতি বললো।
ওই ফোনটা বেজে উঠলো।
টিনাকে বললাম, দেখো কে ফোন করলো।
টিনা উঠে গেলো। আমার দিকে তাকালো।
বড়মা।
কথা বলো।
আমাকে দে। মিত্রা বললো।
টিনা ফোনটা নিয়ে এসে মিত্রার হাতে দিল।
বুঝলাম মিত্রা ভয়েজ অন করে দিলো রিংয়ের আওয়াজ পেলাম।
হ্যালো।
বলো।
তুই! অনি কোথায়।
আমাদের সামনে ছত্রিশপাটি দাঁত বার করে বসে আছে।
ওর দাঁত ভেঙে দিতে পারছিস না।
তুমি আবার কষ্ট পাবে।
আমি কষ্ট পাব না তুই ভাঙ। আমি বলছি।
শোনো তিনি আর একটা ফোন কিনেছেন তার নম্বরটা আমরা কেউ চেষ্টা করলেও পাব না।
তার মানে!
পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছেন।
ওকে দে।
তোমার কথা শুনতে পাচ্ছে।
কিরে আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস।
সকাল থেকে খাওয়া জোটে নি। দাদাকে বললাম কিছু খাওয়াবে, বললো তুইতো মালিক।
সকাল থেকে কিছু খাস নি! সেকিরে আয় চলে আয়। দুজনে একসঙ্গে খাব।
দেখলি দেখলি টিনা, ছেলের গলা শুনে একেবারে গলে জল।
দেখ ছেলেটা সকাল থেকে কিছু খায় নি। ও তো বড়ো একটা খেতে চায় না।
তাহলে দাঁত ভাঙবো কি করে।
থাক এখন ভাঙতে হবে না। পরে ভাঙিস।
টিনারা সবাই হাসছে।
তোরা হাসছিস কেন।
তোমার কথা শুনে। মিত্রা বললো।
দেখ ও নিশ্চই বাজে কাজে সময় নষ্ট করে নি।
বুঝেছি।
রাতে যাব। আর শোনো ব্যাগের নিচের দিকে একটা প্যাকেট আছে। বার করে নিও।
তুই কি দিল্লী গেছিলি।
কি করে বুঝলে।
আমি আর ছোট একটা করে লাড্ডু খেয়েছি।
হ্যাঁরে বদমাস, তুইতো দিল্লীকা লাড্ডু খেলেও পস্তাব না খেলেও পস্তাব। তার থেকে খেয়েই পস্তাই। ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলো।
মল্লিকদা দাদা হাসছে।
একটু বেশি করে আনতে পারিস নি।
ঠিক আছে আগামী সপ্তাহে এনে দেব।
বড়মা ফোনটা কেটে দিল। টিনা মিত্রার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে আবার চার্জে বসিয়ে দিল।
ছোটমা ঠিক কথা বলেছে। তাই না দাদা ?
টিনা দাদার মুখের দিকে তাকাল।
আমাদের সবারি অবস্থা ছোটর মতো। বুঝলে টিনা।
হরিদা ঘরের দরজা খুললো। পেছনে ক্যান্টিনের ছেলেটা। আমাকে দেখেই হেসে ফেললো।
তুমি এসে গেছ!
কেন রে।
বটাদা তোমায় খুঁজছে।
কি হলো আবার।
সে অনেক ব্যাপার।
বক বক করিস না। এখন যা। হরিদা খেঁকিয়ে উঠলো।
তুমি তর তর করছো কেন। এবার ওপরে যেও, চায়ে নুন মিশিয়ে দেব।
হরিদা আর বাচ্চাটার মধ্যে লেগে গেল।
আমি ওদের কথা শুনে হাসছি।
ঠিক আছে তুই ওপরে যা আমি পরে যাচ্ছি।
পাঁউরুটি খাওয়া শুরু করলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে, আমি টপাটপ খাচ্ছি।
কিরে খাচ্ছিস না গিলছিস। দাদা বললো।
যা মনে করতে পার।
আবার সেদিনকার মতো কিছু আছে নাকি।
সবাই দাদার মুখের দিকে তাকাল। মল্লিকদা হাসছে।
মানে! মিত্রা দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুই খা। দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
ওর কথা বার্তায় স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
সেতো দেখতে পাচ্ছি।
খেয়ে নে।
আমার খাওয়া শেষ। প্যান্টে হাতটা মুছে নিলাম।
তোমার পকেটে রুমাল নেই। মিলি বললো।
হাসলাম।
ঘরের আলনায় শোভা পায়। পকেটে থাকে না। রুমাল রাখলে কাগজপত্র রাখার জায়গা থাকে না। মিত্রা টিপ্পুনি কাটল।
মল্লিকদা হাসছে।
আমরা সব কর্পোরেট জগতের মানুষ ও কর্পোরেট জগতের বাইরে।
চম্পকদা সনাতনবাবু দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। আমার দিকে তাকাল।
তুই! কখন এলি ? চম্পকদা ভেতরে এলো।
অনেক দিন পর ছোটবাবুর দেখা পেলাম, কি বলুন ম্যাডাম।
আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
বোস চম্পক, সেদিনের মতো বাবু খেলেন না, গিললেন।
কেন আবার কোন গন্ডগোল ?
কি করে বুঝি বল।
চম্পকদা টিনার পাশের চেয়ারে বসলো।
টিনা এবার তোর চাকরি নট।
চম্পকদা টিনার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললো।
বেঁচে যাই।
তুইও এ কথা বলছিস।
যা শুরু করেছে সব।
তুই কিছু বলেছিস ? চম্পকদা টিনার দিকে তাকাল।
আমার কি আর বলতে লাগে ? যে ভাবে গিললো। বুঝলাম এবার আমাদের গিলবে।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।
কিগো চায়ের কথা বলো।
দাদার দিকে তাকালাম।
সবার খাওয়া শেষ হোক তারপর।
চম্পকদা ফাইল থেকে একটা চিঠি বার করে টিনার হাতে দিল।
দেখ ইয়োলা কালার দিয়ে মার্ক করে দিয়েছি। ওই জায়গা গুলো পরবি।
টিনা খেতে খেতেই চোখ বোলাতে শুরু করলো। মিলি, টিনার দিকে ঝুঁকে পরলো। টিনা চিঠিটা পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসছে। মিলি জোড়ে হেসে ফেললো।
এইবার মিত্রাদি তুমি অনিদার ওপর রাগ করতে পারবে না। টিনা মুখ তুললো।
কেন! মিত্রাকি অনির ওপর রাগ করে বসে আছে।
চম্পকদা মিত্রার দিকে তাকাল।
বাবু পনেরদিন বেপাত্তা। দিনে তিনবার করে সবাইকে ম্যাসেজ। তারপর ফোনের স্যুইচ অফ।
আমাকে একদিন ফোন করলো। দেখলাম পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছে। জিজ্ঞাসা করলাম বললো, রিফিলিং করতে ভুলে গেছি।
আপনি ওর কথা বিশ্বাস করলেন। মিত্রা চম্পকদার দিকে তাকাল।
বিশ্বাস করিনি। তবু মনকে বোঝালাম ওর পক্ষেই এটা সম্ভব।
তারপর।
কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করলো। ফোনটা কেটে দিল।
নম্বরটা আছে।
তোকে হলফ করে বলতে পারি ওটা মোবাইল নম্বর নয়।
দরজাটা সামান্য খুললো। কানে ভেসে এলো।
তুই এলি কি করতে।
বেশ করেছি এসেছি, তোর কি।
এখুনি বলতে হবে।
ওর কি হকের জিনিষ। যার জিনিষ সে কোনদিন না করে না।
সবাই হরিদা আর বটাদার দিকে তাকিয়ে।
আবার কি হলো। আমি বলে উঠলাম।
দরজাটা ধর। বটাদা হরিদার দিকে তাকিয়ে গজ গজ করলো।
বটাদা, হরিদা এই দুজন এই হাউসের সবচেয়ে পুরনো মানুষ সেই মিত্রার মামাদাদুর আমলের। শুনেছি বছর ষোল বয়সে এরা এই হাউসে এসেছিল। সেই থেকে এই হাউসটা এদের ঘর বাড়ি। দুজনেই উড়িষ্যার বাসিন্দা। কিন্তু কেউ দেখলে বিশ্বাস করবে না। দাদা বটাদা হরিদা সবাই প্রায় এক বয়সী। ষাটের কাছা কাছি।

তোমাকে আজকেই এর মীমাংসা করতে হবে।
চায়ের কাপটা আমার সামনে রাখতে রাখতে বটাদা গজ গজ করে উঠলো।
তোর আবার কি হলো। দাদা বললো।
ও কম্ম তোমার নয়।
সেতো বুঝলুম।
মিত্রারা বটাদার দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে হাসছে।
বটাদা সকলকে চায়ের কাপ দেওয়ার পর আমার সামনে এসে দাঁড়াল। এক বোঝা কাগজ সামনে রাখলো।
তুমি যতদূর পর্যন্ত হিসাব করেছিলে ততদূর পর্যন্ত ঠিক ছিল। তারপর বলে কিনা আমি জল মিশিয়েছি। আমিও বলে এসেছি চোরের দল সব, অনি আসুক আমি দেখাচ্ছি মজা।
চম্পকদা সনাতন বাবু ম্যায় দাদা পর্যন্ত বটাদার কথায় হেসে যাচ্ছে।
সুদে টাকা নিলে কি হতো বলো। ভাগ্যিস তুমি দিয়েছিলে। তাই চালাতে পারলুম। তোমার টাকা পর্যন্ত শোধ করতে পারলুম না। দুমাস হয়েগেল।
ঠিক আছে তুমি যাও আমি দেখে দিচ্ছি।
দাঁড়া দাঁড়া বটাদা ঠিক বুঝতে পারলাম না। চম্পকদা বললেন।
তোমার বুঝে কাজ নেই।
তুই ব্যবসা করিস অনি টাকা দেয়।
কেন দেবে না। আমি কি অসৎ।
না মানে….।
টকা ছিল না, চাইলাম তাই দিয়েছে। কেন ও তো প্রথম থেকেই দেয়।
বটাদা আমার দিকে তাকাল।
সব শ্লিপ এই ঠোঙার মধ্যে আছে।
আজকে পারব না। কালকে করে দেব।
যখন হোক তুমি করে দিলেই হবে।
তাহলে আর একটু চা খাওয়াও।
দাঁড়াও বানিয়ে আনি।
কিগো বটাদা অনির জন্য স্পেশাল। চম্পকদা বললো।
তোমরা ওর মতো কাজ করো।
চম্পকদা হেসে উঠলো।
বটাদা গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেল।
এ নিশ্চই বটাদার চায়ের হিসাব। তাই না অনি ?
চম্পকদার কথায় আমি মাথা দোলালাম।
তুই পারিসও বটে।
চম্পকদা এবার চিঠিটা টিনার কাছ থেকে দাদার দিকে এগিয়ে দিল।
কি লেখা আছে বলনা।
স্যার দিল্লী গেছিলেন ডিএভিপির সঙ্গে কনট্রাক্ট করতে।
আমাদের ডিএভিপির এ্যাড আসতো না ? দাদা বললো।
আসতো। নামমাত্র। বলার মতো নয়। এবার বলার মতো আসবে।
কতো।
ইয়ারলি পঞ্চাশ থেকে পঁচাত্তর কোটি।
দাদা মিত্রার দিকে তাকাল।
মিত্রা মুচকি হেসে মাথা নীচু করে নিল।
সনাতনবাবু আমাদের গাড়ির ব্যাপারটা এখন কে দেখছেন।
সনাতনবাবু আমার মুখের দিকে তাকালেন।
কেন আবার কি হল।
এমনি।
তুমি প্রশ্ন করলেই ভয় লাগে আবার হয়তো গন্ডগোল করছে।
হাসলাম।
কিংশুকবাবু দেখেন। তার ওপরে মিলি ম্যাডাম।
এর মধ্যে কিছু গন্ডগোল হয়েছে। দাদা সনাতনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলো।
কই সেরকম কিছু শুনি নি।
মিলি তোমার কাছে এরকম কোন খবর আছে।
দাদার কথা শুনে মিলি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
বটাদার ব্যাপারটা কে দেখে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
ওটাও কিংশুক দেখছে। সনাতনবাবু বললেন।
কিংশুকবাবু টাকা ফেরত দিয়েছেন।
পঁচাত্তর ভাগ দিয়েছেন। পঁচিশভাগ বাকি আছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
কোথায় যাচ্ছিস। দাদা বললো।
মিত্রার ঘরে আছি। ওখান থেকে এই মুহূর্তে নড়ছি না। চিন্তা নেই।
বটা চা আনতে গেল।
এলে ও ঘরে পাঠিয়ে দাও।
আমার শারীরিক ভাব-ভঙ্গিতে সকলে বুঝল আমার নাকে কোন গন্ধ এসেছে। কারুর দিকে আর তাকালাম না বটাদার কাগজগুলো নিয়ে সোজা মিত্রার ঘরে চলে এলাম। দেখলাম মিত্রার টেবিলে সব ফাইল ডাঁই করা রয়েছে। তারমানে বুঝলাম এরা কোন ডিসিসন নিতে পারে নি। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম।
ফোনটা বেজে উঠলো। নাম ভেসে উঠলো দাদু। বুঝলাম কোথা তেকে ফোন এসেছে।
বলো।
কিরে তুই এলি না।
আমি একটু বাইরে গেছিলাম। আজ ফিরলাম।
কখন ফিরলি।
সকালে।
তোর বড়মা কেমন আছে।
ভালো আছে।
অমিতাভ।
ভালো আছে। আমি এখনো কাউকে বলিনি। তোমরা ফোনটোন করোনি তো ?
না। তুই বারন করেছিস।
কাল কিংবা পর্শুদিন যাব।
আসার আগে একবার ফোন করিস।
করবো। কি খাওয়াবে।
তুই যা বলেছিলি তাই খাওয়াব।
গিয়ে মাছ ধরবো।
ধরিস।
দাদুকে দাও।
ধর দিচ্ছি।
কাঁপা কাঁপা গলায় দাদু কথা বললো।
কিরে কবে মিনুকে নিয়ে আসবি।
মামীকে বললাম কাল কিংবা পর্শুদিন।
এখানে এসে খাবি।
তাই হবে।
মিত্রাকে নিয়ে আসবি ?
নিয়ে যাব। আমি যা বলে এসেছি মাথায় আছে।
আছে।
এতদিন শুধু শুধু কষ্ট পেলে।
তোর মতো কেউ এসে বোঝায় নি। ওপর ওয়ালা তোকে পাঠিয়েছে এইসব করার জন্য।
আবার মন খারাপ করে। তাহলে যাব না।
ঠিক আছে। আসিস।
প্রণাম নিও।
নিলাম।
ফোনটা কেটে দিলাম।
মিত্রা পাশে এসে দাঁড়াল।
চোখ চক চক করছে। দরজার দিকে একবার তাকালাম। দেখলাম লক করা হয়ে গেছে।
কাছে টেনে নিলাম। কাপরটা সড়িয়ে ওর পেটে একটা চুমু খেলাম।
দাদু! মামীমা! কোথায় খুঁজে পেলি ? আবার কাল কিংবা পর্শুদিন যাবি!
তোর ব্যাপারটা কি বলতো।
সব বলবো তুই মাঝে মাঝে এমন গরম খেয়ে যাস।
এমনি এমনি গরম খাই। নিজের দোষটা কোনদিন দেখলি না।
ধরিয়ে দে।
এই যে না বলে পনেরো দিনের জন্য হাওয়া হয়ে গেলি।
প্রত্যেকদিন তোকে ম্যাসেজ করেছি।
কথা বলিসনি।
মাঝে দুদিন কলকাতায় ছিলাম। তোকে ডেকেছি। তুই আসিস নি।
তোর জন্য আমাকে জ্যেঠিমনির কাছে কথা শুনতে হচ্ছে। বড়মা ছোটমা সবাই বলছে। আমিতো আমার ভেতরটা কাউকে দেখাতে পারি না।
ছাড় ওসব কথা। তুই আমি ঠিক থাকলেই সব ঠিক।
এখন অনিমেষদা, বিধানদা নিয়ম করে আমায় ফোন করে। তোর কথা জিজ্ঞাসা করে। কি বলি ?
যা সত্যি তাই বলবি।
কি বলবো, ও আমাকে কিছু বলে যায় নি। এটা কাউকে বলা যায়।
তোকে বলতে ভয় লাগে তুই বড়ো পেট পাতলা।
সবাই যদি চেপে ধরে তখন মিথ্যে কথা বলতে পারি ?
অশ্বথমা হতো ইতি গজো।
আমি এইভাবে বলতে পারি না।
আমি মিত্রাকে আরও কাছে টেনে নিলাম।
দাদু মামীমাকে কোথায় পেলি বল।
এখুনি জানতে হবে।
আবার দেখবো একটু পরে বেরিয়ে গেলি, একটা ম্যাসেজ করে জানালি কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি মনে কিছু করিস না।
তুই বিশ্বাস কর।
আমি জানি। তোকে ধরে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। এটা আমার কপালেই লেখা আছে। কে খন্ডাবে। তবু যেটা পেটে আছে তাকে নিয়েই কোন প্রকারে জীবনটা কাটিয়ে দেব।
মিত্রার গলাটা ভারি হয়ে এলো।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলাম। চোখদুটো ছল ছল করছে।
আমি মিত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। মিত্রা চোখ বন্ধ করলো। গাল বেয়ে দুফোঁটা মুক্তদানা গড়িয়ে পরলো। আমি ওর কপালে হাত রাখলাম।
কেন তুই আমাকে কষ্ট দিস।
কোথায় কষ্ট দিলাম। কাজগুলো সারতে হবে। জানিসনা চারদিকটা ক্যানসার হয়ে আছে। যেখানে হাত দিচ্ছি। সেখানেই দগদগে ঘা।
অনেক হয়েছে এবার ছেড়ে দে।
তুই বললে ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার অসমাপ্ত কাজ যে আসছে তার ওপর বর্তাবে, তুই সেটা চাস।
কি করে বুঝলি।
আজ তোর বাবা যদি সব পরিষ্কার রাখতো তাহলে কি এই ঘটনাগুলো তোর সঙ্গে ঘটতো।
মিত্রা চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল।
বড়ো জটিল অঙ্ক। তোকে বোঝাতে চাইলেও তোর মাথায় ঢুকবে না।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রাখল।
শুধু তোকে একটা কথা এ্যাডভান্স বলেরাখি। বেশ কিছুদিন তোকে একলা একলা চলতে হবে। আমি বাইরে থেকে ইনভিজিবিল হয়ে সব অপারেট করবো।
সে কি করে হয়! তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।
কেন পারবি না। এতোদিন পারলি কি করে।
যা হয়েগেছে গেছে। আর পারব না।
পারবি, সময়ে সব পারবি। না হলে আমি হেরে যাব। ভাববো মিত্রাকে আমি আমার মতো তৈরি করতে পারি নি।
কেন তুই এ কথা বলছিস।
এই কদিনে সেরকমই আভাস পেলাম। তোকে আর একটু গুছিয়ে দিই।

মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
নে এবার কাজগুলো সারি, অনেক কাজ জমে আছে।
তোকে ছাড়তে ভালো লাগছে না।
এই ভাবে পাগলামো করলে বিজনেস চালাবি কি করে।
ঠিক চলে যাবে।
যা বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে আয়। দেখ চোখ মুখের চেহারা কি করেছিস।
তোর ঠোঁটটা বাথরুমের আয়নায় দেখবি চল।
কেন।
মিত্রা হাসছে।
আমার হাতটা ধরে হিড় হিড় করে বাথরুমে টেনে নিয়ে গেল। বাথরুমের আয়নায় দেখলাম ওর ঠোঁটের রং আমার ঠোঁটে। ভালো করে সাবান দিয়ে মুখ ধুলাম। মিত্রা আবার নতুন করে ঠোঁটে রং লাগাল। মুখটা ঠিক করে নিল।
যা দরজারা লকটা খুলে দিয়ে আয়।
খোলা আছে।
তারমানে!
হরিদার ছেলেকে বলে এসেছিলাম, কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরলো। তুই আমার চেয়ারটায় বোস।
না। তোর পাশে বসতে পারি। তোর চেয়ারে নয়।
কেন!
তোকে বোঝাতে পারব না।
কেন বোঝাতে পারবি না বল।
রানীর চেয়ারে রাজা বসে না। রানীর সন্তান যখন রাজা কিংবা রানী হয় তারা বসে।
তুই এতোটা ভাবিস।
আবার মুখটা নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রা হাসছে।
তুই একবার বরুণদাকে ফোন কর।
ফোন করতে হবে না। বরুণদা ওপরে আছে।
তারমানে!
তুইতো বরুণদাকে রিজাইন দিতে বলেছিলি।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিলিদের মতো বরুণদাকে মাথায় বসিয়ে দিয়েছি।
আমি হাসতে হাসতে মিত্রার কাছে এগিয়ে গেলাম।
একেবারে না, মুখ নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রা ফোনটা তুলে নিয়ে কথা বললো। বরুণদাকে আসতে বলে। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো। আমি ওর অপরজিট টেবিলে বসলাম।
বল অফিসের হাল কি।
মিলির একটু অসুবিধে হচ্ছে। কিংশুকবাবু একটু গন্ডগোল করছে।
বুঝতে পারছিস তাহলে।
দূর করে দে।
আর একটু কাজ বাকি আছে। চম্পকদার কি অবস্থা।
খুব শ্রুট। পলিটিক্সটা ভাল বোঝে। যা কিছু সব টিনার ঘাড়ে। টিনাও সবাইকে টাইট দিয়ে দিচ্ছে। এমন সব টার্গেট দিচ্ছে। সবকটার নাভিশ্বাস উঠছে।
অদিতি।
সনাতনবাবুকে হ্যান্ডিক্রাফ্ট করে দিয়েছে।
আসতে পারি।
আমি মাথা ঘুরিয়ে পেছন ফিরে তাকালাম। হাসলাম।
কাকে বলছো।
দুজনকেই।
বরুণদা ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসলো।
জানো বরুণদা, এ সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।
তুমি সব সময় নিজেকে এতো ছোট ছোট ভাব কেন।
নিজে ছোট বলে।
কি মিত্রা অনি কি কথা বলছে।
ওর কথা ছাড়ুন। পাত্তা দেবেন না।
সেকিগো! একটু আগে আমি খবর পেলাম ও এসেছে। তারপরেই আবহাওয়া টোটাল চেঞ্জ। সবাই তো ওর ভয়ে তটস্থ।
কেন।
সে কি করে বলবো। তুমি থাকলেও যা না থাকলেও সেই একই অবস্থা।
আমি হাসলাম। পিকুবাবু কেমন আছে।
তার নেমন্তন্ন খাওয়া হচ্ছে না, মন খারাপ।
জ্যেঠিমনি।
খ্যাতির বিড়ম্বনা।
কেন।
এতোদিন বেশ চলছিল আমাদের জীবনটা। হঠাৎ তোমার আগমনে পাড়ায় যেন একটা বিরাট পজিসন পেয়েগেছি। প্রত্যেকদিন কেউ না কেউ এসে তোমাদের খোঁজ খবর নেবে। সেলিব্রিটি বলে কথা।
খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না।
একটুও না, বরং বেশ মজা পাচ্ছি। ইসি আবার সেই পুরনো জায়গায় ফিরে গেছে। এখন বরং ভিড় বেশি। সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে।
রেট বাড়িয়ে দিতে বলো।
সে আর বলতে। তাতেও ভিড় আটকে রাখতে পারছে না। তারপর দাদা, দিদিরা আছে।
ইসিকে বলো আমার খাওয়া পাওনা রয়েছে।
কথা বলে নাও।
এখন না। পরে। অফিসের হালচাল কি বুঝছো।
কেউ কি আর কাজ করতে দেয়। কাজ করে নিতে হয়। তা সত্বেও যদি না হয় বাঘের ভয় দেখাতে হয়। কখনো ডাইরেক্ট কখনো ইনডাইরেক্ট।
তুমি আমার একটা উপকার করতে পারবে।
বলো।
আমাকে আমাদের গাড়ির লাস্ট তিনমাসের ডেটা বার করে দাও।
ডিটেলস।
হলে ভাল হয়। নিজে হাতে কিন্তু।
জানি।
বরুণদা হাসছে।
আবার কাকে বধ করবে।
বধ করবো না। প্যারালালি ওয়াল তুলব।
লড়ে জায়গা করে নাও।
এইতো তুমি বুঝতে পেরেছো।
তোমার এই নীতিটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। তবে সবাই ইমপ্লিমেন্ট করতে পারে না।
তুমি তাহলে বার করে নিয়ে এসো। আমি আর কয়েকটা কাজ সারি। চা খাবে নাকি ?
প্রিন্টআউটটা নিয়ে আসি।
এসো।
বরুণদা বেড়িয়ে গেল।
তুই কি সুন্দর বরুণদাকে বললি!
শিখলি। আমার অবর্তমানে এইভাবে চলবি। তুই অফিসে থাকবি না। তবু সবাই মনে করবে তুই আছিস। মিউ মিউ করবি না। মিলি টিনা অদিতিকে ডাক, বল প্রবলেম ফাইল গুলো সঙ্গে নিয়ে আসতে।
সব এখানে জড়ো হয়ে আছে।
ডাক তাহলে।
মিত্রা টকা টক ফোন ঘুরিয়ে ওদের ডাকল।
তুই পাশে থাকলে কাজে একটা এনথু পাই।
আর এনথু পেতে হবে না। নিজে নিজে এনথু জোগাড় করো।
তুই ব্যবস্থা করে দে।
চল বাথরুমে চল।
তুই সেই কলেজ লাইফের মতো কথা বলছিস।
কেন।
সুমিতা একবার সবার সামনে তোকে বলেছিল তুই ছেলে কিনা আমার সন্দেহ আছে। তুই তখন বলেছিলি বাথরুমে চল প্রমাণ করে দেব।
তাই বুঝি।
নেকু। কিছু জানে না যেন।
কিগো দুজনে আবার শুরু করে দিয়েছ।
হুড়মুড় করে সবাই ঘরে ঢুকলো।
নারে সেই কথাটা বলছিলাম। বলে কিনা তাই নাকি।
সত্যি তুমি বলার আর জায়গা খুঁজে পেলে না।
বসো।
বলুন বস।
মিলির দিকে তাকালাম। মুচকি হাসলাম।
কিগো অনিদা হাসছ কেন। তোমার হাসিতে একটা গন্ধ গন্ধ ভাব। টিনা বললো।
শুঁকে দেখ। মিলি বললো।
শুঁকতে হবে না, খবর পেয়ে যাব।
মিত্রা হো হো করে হাসছে।
টিনা ম্যাডাম তোমার মেমোর উত্তর পেলে।
তুমি শোন নি।
না।
কেঁদে কেটে একসা। মিত্রাদি দাদা বললো ছেড়েদে। এবার থেকে তুই দেখ ওকে দেখতে হবে না।
তাহলে ওর কাজ কি।
ওকে প্রসে পাঠিয়ে দিয়েছি। ডে টু ডে হিসাব আমার টেবিলে রাখতে বলে দিয়েছি। ওদিকে সুতনুবাবুকে একটা আলাদা হিসাব দিতে বলেছি।
তাহলে তোমার কোন সমস্যা নেই।
নেই মানে। এ্যাড ডিপার্টমেন্টের দু’একটা ফোড়ে গন্ডগোল করছে।
গাড়ি নিয়ে।
তুমি জানলে কি করে! আমি কাউকে বলি নি।
আরি ব্যাস, আমি ফুলের বাগানে ঢুকে পরেছি।
বরুণদা ঘরে ঢুকলো।
মধু খেতে যেয়ো না ইসি ডিভোর্স করে দেবে। অমি বললাম।
সত্যি তোমার মুখে কিছু আটকায় না।
দাও।
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বোতাম টিপলাম। ভয়েজ অন।
বসো। বরুণদার দিকে তাকালাম।
রিং বাজছে।
বটাদা।
বলো।
তখন চা খাওয়ালে না।
গেছিলাম হরির ছেলেটা ঢুকতে দিল না।
এখন খাওয়াবে।
কটা।
গোটা ছয়েক নিয়ে এসো।
ছটা না সাতটা।
তোমার ম্যাডামের ঘরে ছটা, দাদার ঘরে একটা।
দাদাকে এখুনি দিয়ে এসেছি। দাদার ঘরে একজন বুড়ো বুড়ি এসেছে তোমায় খুঁজছে।
তুমি কি জোয়ান।
বটাদা হেসে ফেললো।
আর শোন।
বলো।
সেই বিস্কুট।
কুত্তা বিস্কুট।
হ্যাঁ।

মিলিরা হাসছে। বরুণদাও হাসছে।
ফোনটা পকেটে রাখলাম।
কুত্তা বিস্কুটটা কিরে। মিত্রা বললো।
এলে দেখতে পাবি।
কথা বলতে বলতে আমি আমার কাজ করে চলেছি।
মিত্রাদি আজ একটা নতুন জিনিষ আবিষ্কার করলাম। মিলি বললো।
আবার কি আবিষ্কার করলি।
অনিদা বটাদার কাছে উড়িয়া ভাষা শিখেছে।
ধ্যাৎ।
জিজ্ঞাসা করো।
কিরে মিলি কি বলছে ?
বরুণদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমি মিত্রার কথার কোন উত্তর দিলাম না।
মিলি গাড়ির বিলগুলো এখন তুমি দেখছো।
দুটো বিল আটকে রেখেছি।
কেন ?
মনে হলো ম্যানিপুলেট।
বার করো।
এরি মধ্যে তোমার দেখা হয়ে গেলো। বরুণদা আমার দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
তোমার কি সব মুখস্থ।
না।
তাহলে।
তুমিও কয়েকদিন প্র্যাকটিস করো দেখবে দুয়ে দুয়ে চার হচ্ছে। পাঁচ হবে না। যে পাঁচ করতে যাবে। ধরা পরে যাবে। তোমার কাজ হচ্ছে খবরদারি করা। আর কাজটা করিয়ে নেওয়া।
সেতো বুঝলাম, আমাকে একটু বোঝাও শিখি।
দেখো কি করি, তাহলে বুঝতে পেরে যাবে।
মিলি তুমি মিত্রার কমপিউটারে বসো তো। একটা চিঠি লেখো। তিনটে পয়েন্ট থাকবে। এক গতমাসে কেনো পনেরোটা গাড়ি এক্সট্রা নেওয়া হয়েছে। সেই গাড়িগুলো কি কি পারপাসে ব্যবহার হয়েছে। কারা কারা ব্যবহার করেছে। দুই এ্যাডের জন্য মান্থলি কটা গাড়ি ব্যবহার করাহয় টোটাল কস্টিং কতো লাস্ট থ্রি মান্থসের। তিন নিজেদের গাড়ি প্রতিমাসে কতো কিলোমিটার চলে তার কস্টিং এটাও লাস্ট থ্রি মান্থসের।
বাবাঃ তুমিতো বড়ো খেলোয়াড়।
ছোট খেলোয়াড় তুই ভাবলি কি করে। কিছু শিখলি। মিত্রা মিলিকে ধমক দিল।
শিখলাম মানে এইরকম ছোট ছোট টিপস পেলে, নড়িয়ে দেব একবারে।
চিঠিটা কার নামে লিখবে।
তোমার নামে। তুমি আমাকে দিচ্ছ। আমি কিংশুকবাবুকে ফরোয়ার্ড করছি।
হরিদা বটাদা দুজনে একসঙ্গে ঘরে ঢুকলো।
মিত্রারা হো হো করে হেসে উঠলো।
কিগো আবার দুজনে একসঙ্গে।
আমার কথা বলার ভঙ্গিতে, ওরা আরও জোড়ে হেসে উঠলো।
তোমায় দাদা ডাকছে।
কেন গো।
কি করে জানব।
চা খেয়ে নিই।
বটা আমাকে একটু দে।
ভাগ এখান থেকে। বেশি আনি নি।
হরিদা তবু দাঁড়িয়ে রইলো।
এইনাও তোমার বিস্কুট।
এই বিস্কুট আনলি ?
তোকে কথা বলতে বলেছি।
হরিদা বটাদার কথায় হেসে ফেললো।
হরিদা প্যাকেট থেকে একটা নিয়ে খেতে শুরু করলো।
বুঝলি বটা অনেকদিন পর এই বিস্কুট খাচ্ছি।
বাবামনিরা এই বিস্কুট আর চা খেতো। তোর মনে আছে।
খুব মনে আছে। এখন সব বাবু বুঝলি।
অনি বাবু নয়। ও যখনই ওপরে যায় এই বিস্কুট দিয়ে চা খায়। ওর জন্য শুধু নিয়ে আসি।
এবার আমার জন্যও নিয়ে আসিস।
পয়সা দিস।
হরিদা আবার হেসে ফেললো।
মিত্রা দাঁতে কামর দিয়েই বলে উঠলো, এটা তোমার কুত্তা বিস্কুট।
তুমি খেতে গেলে কেন, তোমার জন্য ক্রিমকেকার নিয়ে এসেছি।
এটা খালি অনির জন্য!
অনির দাঁত শক্ত। তাই।
সবাই হাসছে।
বটাদা সকলকে চা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি চা খেতে খেতেই অদিতিকে বললাম, তোমার অবস্থা কি।
সামলে নিয়েছি। প্রথমে একটু ঝামেলা হচ্ছিল।
আমার তাহলে কোন প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন নেই মানে। আমার ফাইলগুলো একটু দেখে দাও, ঠিক ঠাক স্টেপ নিয়েছি কিনা।
অদিতি নিজের ফাইলগুলো বার করে আনলো।
আমি একটার পর একটা চেক করে ওকে বুঝিয়ে দিলাম। ও নোট করে নিল। মিলির চিঠি লেখা হয়েগেছে আমাকে দিল। আমি কয়েকটা জায়গায় কারেকসন করে দিলাম।
তোমার কাছ থেকে ইংরাজীটা শিখতে হবে।
কেন।
একটা শব্দের মধ্যে দিয়ে সব কথা বলে দিলে।
এটা আইনের মারপ্যাঁচ সাপও মরবে লাঠি ভাঙবে না।
দারুণ দিলে।
তোকে কখন থেকে ডাকছি বলতো।
কথা বলতে বলতে দাদা ঘরে ঢুকলো।
আসুন। ভেতরে আসুন। দাদা ইশারায় ডাকলো।
দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা দাদার পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলেন।
আপনারা!
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ওনাদের প্রণাম করলাম।
কেমন আছেন ?
ভালো।
সেই যে ফিরে এলে আর গেলে না।
সময় পাই নি। সুমন্ত কেমন আছে।
ভালো।
ওকে নিয়ে এলেন না কেন।
তুমি ওর সঙ্গে চুক্তি করেছ গ্র্যাজুয়েট না হয়ে দেখা করবি না।
ব্যাটা মনে রেখেছে।
ভদ্রমহিলা মাথা নীচু করলেন।
এবার কোন ক্লাস হলো।
তোমার মতো বাংলা অনার্স নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। দু’নম্বরের জন্য ফার্স্টক্লাস পায় নি।
পার্ট ওয়ানে কম থাকলে কিছু হবে না। পার্টটুতে মেক আপ হয়ে যাবে।
তুমি ওকে একটু ফোন করে বলো। খুব মন খারাপ।
ওর ফোন নম্বর আমার কাছে নেই।
দাও অনিকে কাগজটা।
ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে আমার হাতে দিলেন।
আমি মোবাইলটা বার করে পটাপট ফোন করলাম। ভয়েজ অন করলাম। সবার চোখে উৎকন্ঠা। এরা আবার কারা। কোথা থেকে এলো।
হ্যালো।
কে বলছি বলতো।
অনিদা।
কি করে বুঝলি।
তোমরা নম্বরটা সেভ করে রেখেছি।
কে দিল তোকে।
কনিষ্কদা।
কেমন আছিস।
তোমার জন্য বেঁচে আছি।
পুরনো কথা মনে রাখিস না।
তুমিতো বলেছ অতীত থেকে শিক্ষা নিতে।
বলেছিলাম বোধ হয়।
তোমার মনে নেই, আমার মনে আছে। তোমার কথা রাখতে পারলাম না অনিদা।
কে বললো রাখতে পারিস নি। সেকেন্ড হাফটা একটু তেড়ে পর, দেখবি হয়ে যাবে।
আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
তারপর বল।
কনিষ্কদা বললো তুমি বিয়ে করেছো। বৌদিকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।
মা-বাবার সঙ্গে চলে আসতে পারতিস।
যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তোমার কথা রাখতে পারিনি।
দূর পাগল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
তোমার জন্য আমি একটা পাঞ্জাবী বানিয়েছি, নিজের হাতে কাজ করেছি।
বেশ করেছিস।
বাবা বৌদির জন্য নিজের হাতে একটা কাপড় বুনেছে। তুমি ফিরিয়ে দিও না। আমাদের তো দেওয়ার কিছু নেই।
তাহলে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
প্লীজ অনিদা।
তাহলে বললি কেন।
আর বলবো না।
একদিন ফোন করে অফিসে চলে আয়।
পরীক্ষাটা হয়ে যাক। যাব। একটা কথা বলবো।
বল।
একটা লেখা লিখেছি। তাঁতীদের ওপর। একটু পরে দেখবে।
কোথায়।
বাবার হাতে পাঠিয়েছি।
ঠিক আছে। এখন রাখি।
ভালো থেক।
থাকব। শরীরটার দিকে একটু নজর দিস। ওষুধগুলো ঠিক ঠাক খাস।
খাচ্ছি। তুমি এ মাসে এতো বেশি টাকা পাঠিয়েছ কেন।
মাইনে বেরে গেছে বুঝলি, তাই। তাছাড়া এখন তুই সাবালোক হয়ে গেছিস। তোর হাত খরচা।
আমি এখানে একটা ছোটোদের স্কুল করেছি।
মাস্টার কে তুই ?
হ্যাঁ।
দেশোদ্ধার করেছিস।
তুমিও তো করছো।
হো হো করে হেসে ফেললাম।
বৌদিকে নিয়ে একদিন আসবে।
দেখি যদি সময় করতে পারি।
এসোনা একদিন, ভালো লাগবে। আমার পক্ষে এতদূর জার্নি করা সম্ভব নয়।
খুব সম্ভব দু’বছর হয়ে গেছে। এখন তুই দৌড়দৌড়ি করতে পারিস।
কনিষ্কদা সামনে মাসে একটা এক্সামিন করবে বলেছে।
আসার আগে আমাকে একবার ফোন করিস। আমি তোর নম্বরটা সেভ করে রাখলাম।
তোমার মতো মানুষের মোবাইলে আমার নম্বর থাকবে এটা আমার সৌভাগ্য।
দাঁড়া তোর সঙ্গে দেখা হোক, তারপর পিট্টি দেব।
তোমার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। তুমি হচ্ছ আমার অক্সিজেন। একদিন এখানে এসো না। দেখবে তোমার কতো ফ্যান।
আমার ফ্যানের দরকার নেই। দুটো পান্তা জুটলেই হবে।

সুমন্ত হেসে ফেললো।
রাখি রে।
আচ্ছা।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকালাম। মুখটা চক চক করছে।
এই দেখুন এতোক্ষণ আপানাদের বসতেই বলা হয়নি। বৌমাকে দেখতে চাইছেন, তাইতো ?
ভদ্রমহিলা মাথা নীচু করে হাসলেন।
ওই যে চেয়ারে বসে আছে।
মিত্রা প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেছিল। তারপরে উঠে এলো। নমস্কার করতে গেলো, ভদ্রমহিলা ওর হাত দুটো ধরে ফেললো, কেউ ওর প্রণাম নিল না।
তুমি কতো বড়ো বংশের মেয়ে।
ভদ্রমহিলা মিত্রাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আপনারা একটু বসুন আমি আসছি। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দাদা আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
কিরে খামটা আমাকে দে।
পরে দিচ্ছি।
নিউজরুমে এসে ঢুকলাম।
অর্ককে খামটা দিয়ে বললাম দেখতো লেখাটা কেমন। খুব খারাপ হলে নিজে লিখে দিবি।
দাঁড়ালাম না। সোজা এসে আর্ট ডিপার্টমেন্টে ঢুকলাম। আর্ট ডিরেক্টর মুন্সীবাবু বসে বসে কথা বলছিলেন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। কাছে এগিয়ে এলেন। আমি জানি ভদ্রলোক বহুত ধুরন্ধর। আগে নাম ধরে ডাকতেন এখন স্যার বলেন।
স্যার দ্বীপায়ন একটু ওপরে গেছে।
এলে নিউজ রুমে পাঠান।
দাঁড়ালাম না, নিচে চলে এলাম। সনাতনবাবুর ঘরে ঢুকলাম।
আরে ছোটবাবু তুমি, ডাকলেই চলে যেতাম।
একটা ছোট কাজ করতে হবে।
বলো।
একটা দুহাজার টাকার চেক লিখুন।
সুমন্তর নাম ঠিকানা দিলাম।
রাইটার্স রেমুনারেসনের ভাউচার করে মিত্রার ঘরে একটু যান। দেখবেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা আছে। ওদের দিয়ে ভাউচার সই করাবেন। আমি পরে যাচ্ছি।
আচ্ছা।
সনাতনবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নিচে নিউজরুমে ঢুকতে দেখলাম দ্বীপায়ন আমার টেবিলে বসে আছে। আমাকে দেখে একগাল হাসল।
আমার জন্য তোমাকে ওপরে যেতে হবে, আসা করিনি।
নারে চলে গেলাম।
কেন বলো।
তোর কাছে আমার আর তোর ম্যাডামের বিয়ের দিনের কনো ছবি আছে।
অনেক।
তোর পছন্দ মতো একটু বড়ো করে ছটা ছবি এখুনি প্রিন্ট করে আনতে পারবি।
এই কাজের জন্য তুমি ওপরে ছুটে গেছিলে।
হাসলাম।
কাউকে দেবে।
মাথা দোলালাম।
অর্ক কাছে এসে দাঁড়াল।
লেখাটা কার বলো তো ?
কেন।
ডিটো তোমাকে নকল করেছে। কি ধার গো লেখার! বোঝাই যাচ্ছে না তুমি লিখেছ, না সুমন্ত বিষই লিখেছে।
ছাপা যাবে।
মল্লিকদা নিয়ে দাদার কাছে চলে গেছে। ছেলেটা কি করে।
এ বছর বাংলা অনার্স নিয়ে পার্টওয়ান দিয়েছে। দু’নম্বরের জন্য ফার্স্টক্লাস পায় নি।
ব্যাডলাক।
পার্ট টুতে হয়ে যাবে।
আমাদের কাগজে নিয়ে এসো।
অনেক দূরে থাকে। তাছাড়া ওর জার্নি করা বারণ।
তুমি কি এই ছেলেটিকে ছবি পাঠাবে! দ্বীপায়ণ বললো।
মাথা দোলালাম।
আমি এখুনি নিয়ে আসছি।
ওর বাবা-মা ম্যাডামের ঘরে আছে। নিয়ে যা।
দ্বীপায়ণ হন হন করতে করতে চলে গেল।
দাদা তোমায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। অর্ক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
বল।
এর নিশ্চই একটা পাস্ট হিস্ট্রি আছে। না হলে তোমার মনে এইভাবে দাগ কাটতে পারে না।
আছে। এখন জিজ্ঞাসা করিস না।
গলাটা ধরে এলো।
কিগো তুমি মন খারাপ করছো কেন।
না এমনি।
তুমি আমাকে এ্যাড্রেস দাও, আমি যাব।
অনেক দূরে থাকে।
যেখানেই থাকুক আমি যাব।
নবদ্বীপের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে।
আমি যাব। আমি ওর সঙ্গে দেখা করবো। যে তোমার মনে এতটা রেখাপাত করে, সে সাধারণ ছেলে নয়।
ম্যাডামের ঘরে যা। ওর বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে আয়।
অর্ক হন হন করে বেড়িয়ে গেল। আমি পেছন থেকে ডাকলাম। কাছে এলো।
একটা মিথ্যে কথা বলতে পারবি।
অর্ক আমার দিকে হাঁ করে তাকাল।
বলো।
মিলিকে বলবি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে। ওদের একটু হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমি বটাদার ওখানে আছি। বলবি একটা কাজে বেড়িয়ে গেছি। দাদা পরে ফোন করবে।
আচ্ছা।
অর্ক বেড়িয়ে গেল। আমি ওপরে বটাদার কাছে এলাম। বটাদা আমার মুখের দিকে তাকাল।
চা খাবে।
দাও।
আমি নিচে যাব।
গিয়ে বলোনা যেন আমি এখানে আছি।
বটাদা আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
আমি আমার নিজের জায়গায় চলে এলাম। ছাদের এককোনে। এখানে বটাদার সব উপকরণ ডাঁই করে রাখা রয়েছে। একসময় এখানে কয়লা ভাঙতো এখন গ্যাস হয়েছে। বটাদার ছেলেটা চা দিয়ে গেল।
এই শোন।
কি বলো।
একটা সিগারেট নিয়ে আয়তো।
তুমি সিগারেট খাবে!
নিয়ে আয়, একটা খাই।
নানা চিন্তা মাথার মধ্যে ভিড় করে আসছে। চা খাওয়া শেষ হলো। ছেলেটা একটা সিগারেট দিয়ে গেলো। ধরালাম।
বেশ মনে পরে, সেদিন অফিস থেকে আর ফ্ল্যাটে গেলাম না। সোজা কনিষ্কদের হস্টেল।
বছর চারেক আগের কথা সবে মাত্র চাকরিটা পেয়েছি।
গিয়ে দেখলাম কেউ নেই।
বুঝলাম রাউন্ডে গেছে। ফিরতে ফিরতে ওদের রাত হলো। সকলে একসঙ্গে ফিরলো। প্রথমে একটু হই হই হলো। তারপর কনিষ্ক বললো, অনি মনটা আজ ভালো নেই বুঝলি।
কেন।
কয়েকদিন আগে একটা ইয়ং ছেলে ভর্তি হয়েছে। হার্ট ব্লক।
তাতে মন খারাপ কেন।
সরকারী হাসপাতালে এই অপারেসন হবে না। যদিও বা করা যায় তার যা হ্যাপা মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
কেন এ কথা বলছিস।
অনেক টাকার দরকার।
তাহল ছেলেটা মরে যাবে।
চষ্টা করছি। আমাদের যারা ওষুধ সাপ্লাই করে তাদের বলেছি।
কোথায় থাকে।
নবদ্বীপের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে।
কি করে।
ওদের নিজস্ব তাঁত আছে। বাপ বেটা দুজনে তাঁত চালায়।
ছেলেটা পড়াশুনো করে।
এবছর মাধ্যমিক দিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে।
রেজাল্ট।
স্টার পাওয়া ছেলে। আলাপ হতে বললো। ডাক্তারি পড়বে।
সব গরিব গুলোর দেখবি উচ্চাশা। আর বড়োলোক গুলো দেখ, খালি পয়সা উড়িয়ে যাচ্ছে।
ফালতু কথা রাখ, দেখ কোন ভাবে উপকার করতে পারি কিনা।
কি করবো বল। আমার তো মাথার ওপর ধারের বোঝা। এ মাসের মাইনেটা পুরো দিতে পারি।
তারপর খাবি কি।
কর্পোরেশনের জল।
ভালো বুদ্ধি দিয়েছিস। নীরু তুই কি বলিস।
আমরাও সকলে মিলে এটা করতে পারি।
তাহলে ষাটভাগ সল্ভ। বাকি চল্লিশভাগ মেকআপ করে দেব।
এবার ব্লাড ডোনার।
কেন রক্ত নই ব্লাড ব্যাঙ্কে।
অপারেশনের সময় ডাইরেক্ট ট্রান্সফিউসন করতে হবে। যাকে বলে ফ্রেস ব্লাড।
ব্যাটা রাজা লোক রে সব কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসে ভর্তি হয়েছে। গ্রুপ কি ?
ও পজেটিভ।
তোদের কারুর ওই গ্রুপ নেই।
না।
ওরে ওরা কি একেবারেই অভাগা।
তুই দেখলে বুঝতে পারবি। ছেলেটাকে দেখে কেমন মায়া পরে গেছে। ওকে ফুটিয়ে দিয়েছিল। বটা দেখে ফেলেছিল তাই ভর্তি করেছে।
যদি শালা কোনদিন বড়োলোক হই, তাহলে একটা কাজ অবশ্যই করবো, এদের জন্য বিনে পয়সায় চকিৎসার ব্যবস্থা করবো।
তুই কোন দিন বড়োলোকও হবি না। আর চিকিৎসাও করতে পারবি না।
কেন তোরা তো ডাক্তার। আমি যদি কিছু করি হেল্প করবি না।
কেন, এখন করছি না ?
আমি কি সেই কথা বলেছি।
তাহলে কপচাচ্ছিস কেন।
আমি এখনো আমার ব্লাডগ্রুপ কোনদিন চেক করিনি। আমারটা চেক করে দেখতে পারিস। যদি মিলে যায়, পাশে শুয়ে পরতে পারি।
পরদিন আমার ব্লাডগ্রুপ চেক হলো। কাকতালীয় ভাবে সুমন্তর সঙ্গে মিলেও গেল। ভাগ্য আছে ছেলেটার। অপারেশনের দিন ঠিক হলো। অপারেশন হলো। দুজনে পাশা পাশি শুলাম। জীবনে প্রথম লাইভ অপারেসন দেখলাম। আমার থেকে একটু বেশি ব্লাড টান হয়ে গেছিল। আমিও পাঁচদিন হাসপাতালে থাকলাম। আমাকেও একবোতল ব্লাড দিতে হলো।
সুমন্ত সুস্থ হলো। কিন্তু হার্টের অবস্থা খুব একটা উন্নতি হলো তা বলতে পারব না। বাঁচলো এই যা। কনিষ্কদের ডাক্তারী শাস্ত্র বলে পাঁচ বছরও বাঁচতে পারে, আবার পনেরো বছর বাঁচতে পারে। নো গ্যারেন্টি।

চলবে

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s