দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 32)


ও ব্যাটা বলে কি, একটা বোতলের দাম দাও।
আমি সেই সময় হাঁসব না কাঁদব। পকেটে একটা পয়সাও নেই।
তোকে পরে দেব।
এখুনি দাও, আমি মাল কিনতে যাব।
বুঝলাম সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে, ওকে টাকা দিয়ে মাল কিনতে পাঠিয়ে দেব। আমরা আমাদের কাজ করবো।
ঠিক আছে দাঁড়া, আমি বন্ধুদের ডাকি আমার কাছে পয়সা নেই, ওদের কাছ থেকে চেয়ে দিচ্ছি।

সে তখন নেসার ঘোরে, কনিষ্কদের ডেকে আনলাম। ওরা দশ বারো জন। ওরা পয়সা দিল। মর্গের ভেতরে ঢুকলাম। জীবনে প্রথম মর্গে ঢোকা। ঢুকেই আমার চক্ষু ছানা বড়া। ট্রেতে জায়গা নেই বলে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে পচা গলা বডি। সে গন্ধে আমার অন্নপ্রাসনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। দেখি দেয়ালে একটা লোক হেলান দিয়ে বসে আছে। মাথা নেই। মাথাটা তার কোলে। বড়মার দিকে তাকালাম।
একবার ভাবো।

তুই থাম, আর বলতে হবে না।
একিগো না শুনলে জানবে কি করে। ডাক্তার হতে গেলে কতো কসরত করতে হয়।
দিদি তুমি কানে আঙুল দাও, আমরা একটু শুনি। ছোটমা বললো।
বল শুনি। বড়মা ঢোক গিলে বললো
মর্গের চাবি ওর কাছ থেক নিয়ে নিলাম। ও ব্যাটা মাল কিনতে গেল। কনিষ্করা সবকটা বডি দেখে বললো মনে হয় কালকে এই বডিটা পাবো বুঝলি নীরু। এটাই যা একটু ফ্রেস আছে।
মাথা নেই।
শেলাই করে বসিয়ে দিলেই হলো।
বটা বলে উঠলো, দাঁড়া মালটাকে জোড়া লাগাই।
মর্গের ভেতর তখন বিয়ে বাড়ি।
ওরা হাসছে।
আমি ওদের রগড় দেখছি। গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে। ওরা দিব্বি আছে। অভ্যেস আছে। সেই কন্দকাটা বডিটাকে পেটা পিটি করে শুইয়ে গলাটা ধরের কাছে রাখলো। তারপর সব স্কেল দিয়ে মেপে লেখা লিখি করতে বসে গেল।
একবার বুকের কাছে মাপে আর একবার ঠ্যাং মাপে কেউ পেট মাপে। বডির পুরো স্ট্রাকচারটা খাতায় ড্রইং করলো। আমি চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখি। মর্গ থেকে বডি আনতে গেছি। কিন্তু মর্গে ঢুকি নি। একপাশে দেখি একটা মেয়ের বডি পরে আছে উপুর হয়ে গায়ে একফোঁটা কাপর নেই। চারিদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মানে ওটা কাটা হয়ে গেছে।
বটা বলে চল মেয়েটার বডিটা একটু দেখে নিই।
কনিষ্ক বললো দেখছিস না ওটা সাবার হয়ে গেছে। ভেতরে কিছু মাল নেই।
অনিকেত নীরু মেয়েটার বডি টেনে এনে ওই কন্দকাটার পাশে শোয়াল।
আমি ওদের রগড় দেখছি। কারুর কোন হেল দোল নেই। এর মধ্যে নীরু বলে উঠলো।
বুঝলি কনিষ্ক দেখে মনে হচ্ছে কুমারী মেয়ে, জীবনে এখনও কিছু পায় নি বুঝেছিস।
নীরু কনিষ্কর দিকে তাকিয়ে ভাবছি এই বুঝি পাছায় কষিয়ে একটা দেয়।
মালটাকে বিয়ে দিয়ে দে গলা কাটার সঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে বটার ঝেড়ে লাথি নীরুর পেছনে। তখন মর্গের ভেতর হুলুস্থূলুস কান্ড।
মর্গের ভেতর তোরা মারামারি করছিস! বৌদি বললো।
আমি না ওরা।
করবে না। আনন্দে। পরীক্ষার কোশ্চেন পেপার আউট। ভাবোদেখি একবার, আগামীকাল তোমার সবচেয়ে টাফ পেপারের পরীক্ষা, আর আজ তুমি কোশ্চেন হাতে পেয়ে গেলে। তোমার কি হবে।
সবাই মিলে মর্গের বাইরে এলাম। সে কি আনন্দ বড়মা কি বলবো, যেন মনে হলো গ্যাস চেম্বার থেক বেরলাম। ব্যাটা তখন বেহেড মাতাল, মর্গের গেটে তালা বন্ধ করে চাবি দালাম। সোজা বৌবাজার, সারারাত হোটেল খোলা, সবাই মিলে মাংস ভাত খেলাম।
হাত ধুয়েছিলি। বড়মা বললো।
মনে নেই।
ওই হাতে খেলি ? মিত্রা বললো।
কাঁধটা মিত্রার নাকের কাছে ঠেকিয়ে দিয়ে বললাম, গন্ধটা শোঁক, এখনো ওই গন্ধ পাবি।
দেখছো বড়মা।
তুই বললি কেন।
তুমিতো প্রথমে বললে।
হাওয়া ওদিকে ঘুরে গেছে।
ছোটমার দিকে তাকালাম।
চা। এইতো।
তুমি কতো বোঝ। জড়িয়ে ধরলাম।
আর আদর দেখাতে হবে না। ভালোপাহাড়ে কবে নিয়ে যাবি।
টিনারা সকলে হৈ হৈ করে উঠলো।
তোরা চেঁচাচ্ছিস কেন ?
একটু আগে অনিদাকে বলেছি পাত্তা দেয়নি। বলে কিনা অনেকটা হাঁটতে হবে।
কনিষ্কর মুখ থেকে শুনেছি। খবর পাঠালে ওরা মাথায় করে নিয়ে যাবে। ছোটমা বললো।
তাহলে কনিষ্ককে বলো।
চা পাবি না।
বাইরেটা দেখ অন্ধকার হয়ে আসছে।
ও ছোটো ওকে বলেছিস। বড়মা ছোটমার দিকে বিষ্ময়ভরা দৃষ্টি রেখে বললো।
কখন বলবো। দেখলে তো সবাই এসে জমে গেলাম।
আমার দিকে তাকিয়।
এই তুই নিচে চল, তোর সঙ্গে কথা আছে।
মিত্রার দিকে তাকালাম। মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে। বুঝলাম ও কিছুটা জানে।
ওরা সবাই বসে রইলো। আমি ছোটমা বড়মার পেছন পেছন নিচে এলাম। দামিনী মাসি ভজুরামও নিচে চলে এলো। দেখলাম ইসলামভাই তার দলবল নিয়ে কাজ করছে। পুরো দায়িত্ব ইসলামভাই-এর ঘারে। আমি সোফায় বসলাম।
চা এলো। ভজুরামের হাত দিয়ে চায়ের ট্রে ওপরে চলে গেলো। চা খেতে খেতে ছোটমা বললো। আজ রাতে তোর এ বাড়িতে থাকা হবে না।
কেন!
কাল রাত্রি। আজ তোর মিত্রার মুখ দেখা হবে না।
ভীষণ ফাজলাম করতে ইচ্ছে করছিল। করলাম না। নিজেক চেক করে নিলাম।
ঠিক আছে আমি ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছি।
তোর একা যাওয়া হবে না। তোর সঙ্গে কেউ যাবে।
না তা হবে না। আমি একা যাব, কেউ আমার সঙ্গে থাকতে পারবে না।
কি বদমাশরে তুই। বৌদি বললো।
তুই আমার বাড়িতে চল।
না তা হবে না।
তাহলে তোকে যেতে হবে না। নিচের ঘরে তোকে তালা বন্ধ করে রাখি।
তাও হবে না। আমি ঠিক ওর মুখ দেখে নেব।
বড়মা হাসছে।
ও ছোট ও যা খুশি করুক, আমাদের কাজ হয়ে গেছে। ও এবার ওরটা বুঝে নিক।
বুঝলাম আমার কথায় এদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় রয়েছে। ঝোপ বুঝে কোপ মারলাম।
কটায় বেরতে হবে।
সন্ধ্যে হওয়ার আগে।
সন্ধ্যে হতে আর কি বাকি আছে ? বাইরেটা একবার দেখ।
ঠিক আছে। আর ঘন্টা খানেক পরে বেরবি।
এখুনি বেরিয়ে যাই। তাহলে আমারও কিছু কাজ করা যাবে।
মিত্রাকে বলে যা।
মিত্রা জানে না!
জানে তবু তুই একবার বলে যা। ওর ভালো লাগবে।
আমি ছোটমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে একবার হাঁসলাম। ওপরে এলাম। দেখলাম ওরা সবাই গল্প করছে। মিত্রা আমাকে দেখে একবার হাসল।
কিগো অনিদা কি বললো ছোটমা। টিনা বললো।
আমাকে তাড়িয়ে দিলো।
মিত্রা হাসছে। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।
আজকে আমার মতো জামা প্যান্ট পরি।
মিত্রা মাথা দোলাল, পর। কাল কখন আসবি ?
চলে আসব।
ফোন স্যুইচ অফ করবি না।
এটা কথা দিতে পারব না।
কেন বলছিস ওকে। দেবা বললো।
তোরা থাকবি না চলে যাবি।
হয়তো তোর ওখানে চলে যেতে পারি।
যাস নি।
কেন।
বাঁধা গরু ছাড়া পেলে কি হয় জানিস।
তোকে যেতে হবে না। আমি গিয়ে ছোটমাকে বলছি। মিত্রা বললো।
মিত্রা খাট থেকে নিচে নেমে এলো।
মহা মুস্কিল দুটো মন খুলে কথাও বলা যাবে না ?
এই যে তুই বললি, বাঁধা গরু ছাড়া পেলে….।
ঠিক আছে তুই রাতে লোক পাঠা, দেখ আমি আছি কিনা।
তা করবো কেন, তুই মুখে বলেছিস এটাই যথেষ্ট।
আমি আমার মতো গেঞ্জি জিনসের প্যান্ট ড্রয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলাম। সোজা ছোটমার ঘরে। মিত্রা পেছন পেছন এলো।
তুই চলে যাবি একটুও ভালো লাগছে না।
বিয়ে করতে গেলি কেন।
আমি করলাম, তুইতো করতে গেলি।
বাবাঃ, ঘটা করে শাধ মেটালি, একটু কষ্ট করবি না।
তোর কষ্ট হচ্ছে না।
হচ্ছে, তবে তোর মতো নয়।
মিত্রা পেটে খোঁচা মারল।
দাঁড়া।
মিত্রার দিকে ফিরে তাকালাম।
মিত্রা দরজার সামনে গিয়ে একবার বারান্দায় উঁকি মারল। বুঝলাম দরজা বন্ধ করার ধান্দা।
ও ভুল করিস না। ছোটমা হানা দিতে পারে।
দিক। এখন আর ভয় নেই।
ভয়ের বাকিটা কি রেখেছিস ?
আমি পাজামা পাঞ্জাবীটা খুললাম।
কি ছোটো।
আবার। সারারাত ঘুম হবে না।
একটু।
একবারে না।
মিত্রা তবু আমাকে জাপ্টে ধরলো। ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
এবার ছাড়।
তুই যেন ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছিস।
এখুনি ইচ্ছে করবে।
কর।
আজ ওসব করতে নেই।
আমার নাম করে অন্য কাউকে করিস। তাহলেই আমাকে করা হয়ে যাবে।
মিত্রার দিকে তাকালাম। চোখের মনি স্থির।
ওমনি মন খারাপ হয়ে গেল।
আমি প্যান্ট পরতে শুরু করলাম।
কিরে ভেতরে কিছু পরবি না।
হাসলাম।
হাসছিস যে।
দেখ ভুল করে কি নিয়ে এসেছি।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে ফেললো।
তুই আমারটা নিয়ে এসেছিস।
তুই যে আমার প্যান্টের তলায় গুঁজে রাখবি কি করে জানব।
তখন তাড়াহুড়ো করে তোর প্যান্টের তলায় গুঁজে বাথরুমে গেছিলাম।

তারপর আর পরিস নি ?
না।
বেশ করেছিস।
সাবধান কিন্তু।
নিশ্চিন্তে থাকতে পারিস।
দুজনে ছোটমার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
কখন আসবি।
হয়তো দেখবি তুই ঘুমচ্ছিস, আমি এসে কড়া নারলাম।
মিত্রা খিল খিল করে হসে ফেললো।
দু’জনে নিচে চলে এলাম। আমাকে দেখে ছোটমার চোখে বিস্ময়।
কিরে এট পরেছিস কেন। তোর আর জামা প্যান্ট নেই ?
মিত্রার দিকে তাকিয়ে। তুই কি করছিলি, ও যখন এটা পরলো।
আমাকে বললো, আমার পছন্দ মতো পরি।
তুই একেবারে গদোগদো হয়ে বললি, পর।
মিত্রা মাথা নীচু করে হাসে।
কি খাবি।
কিছু না।
রাতে মনুর হাত দিয়ে খাবার পাঠাব।
পাঠিয়ো না।
কেন! তুই ওখানে যাচ্ছিস না ?
কে বললো যাচ্ছি না।
আমি লোক পাঠাচ্ছি।
তাহলে অনি তার পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে।
ছোটমা চুপ করে গেল। মুখটা হঠাৎ গম্ভীর। বড়মা এগিয়ে এলো।
কেন গোঁয়ার্তুমি করছিস।
এতো মহা মুস্কিল। আমি কি এখনো ছোট আছি।
আমার কথার ধরণে সকলে হাসছে। একমাত্র ছোটমা গম্ভীর।
তুমি লোক পাঠিয়ো। তবে রাত বারটার পর। তার আগে কিছু কাজ আছে, সারবো।
ছোটমা তবু গম্ভীর।
বুঝলাম কথাটা বলা বুমেরাং হয়ে গেছে।
আবার কাছে গেলাম, জড়িয়ে ধরলাম। একটু আদর করলাম। আবার স্বাভাবিক।
ঠিক আছে। তুমি রাতে খাবার পাঠিও। আর ভজুকে পাঠিয়ে দিও।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম একটা কাজ করবি।
বল।
আমাকে গোটা কুড়ি হ্যান্ডমেট পেপার আর রংয়ের বাক্সটা এনে দে, পারলে বোর্ডটাও।
মিত্রা ছুটে বেরিয়ে গেল।
ছোটমা হাসছে।
তুমি গম্ভীর হয়ে গেলে মেজাজ বিগড়ে যায়। একটা মিষ্টি দাও, একটু জল খাই।
মাসি লুচি ভাজছে। দুটো খেয়ে যা।
তাই দাও।
ছোটমা ছুটে চলে গেল।
বড়মার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভজুরাম কোথায় ?
দেখ বাগানে কোথায় লাইট লাগাচ্ছে। তাদের পেছন পেছন ঘুরছে।
বাইরের বারান্দায় এসে ভজুরামকে ডাকলাম। দেখলাম ইসলামভাই এসে হাজির।
কিরে কোথায় যাচ্ছিস।
বনবাসে।
ইসলামভাই হাসছে।
বিয়েতো করলে না, জ্বালা বুঝবে কি করে।
তোকে দেখে মনে হচ্ছে এবার একটা বিয়ে করে ফেলি।
কেউ মেয়ে দেবে না এই বুড়ো বয়সে।
ইসলামভাই জোড়ে হেসে উঠলো।
বলনা কোথায় যাচ্ছিস।
জানিনা। রাস্তায় বেরই আগে।
মানিপার্টস থেকে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা বার করলাম। ইসলামভাই-এর হাতে দিলাম।
এটা কি করবো।
ছোটমার হুকুম, রাতে একা থাকা যাবে না। তুমি ভজুরামকে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেবে। আমি ঠিক সময় চলে আসব। বাকিটা ছোটমা তোমাকে বলে দেবে।
তোর সঙ্গে রাতে আমি থাকব। আপত্তি আছে ?
আছে।
তুই সোজা সুজি বলে দিলি।
ছোটমার হুকুম ভজুরাম ছাড়া কেউ থাকবে না।
আচ্ছা।
কিরে আমি কখন থেকে খাবার নিয়ে বসে আছি। ছোটমা দরজার বাইরে থেকে চেঁচাল।
আমি ফিরে তাকালাম।
মনুকে বলেছিস।
জিজ্ঞাসা করো।
ইসলামভাই হাসছে।
ওমা এসে দেখি দুটোর জায়গায় গোটা দশেক লুচি। মিত্রা ওপর থেকে সব গুছিয়ে নিচে চলে এসেছে। ইসলামভাই আমার প্লেট থেকে দুটো লুচি তুলে মুখে দিল। দেখা দেখি মিত্রা দুটো লুচি তুলে নিল।
ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলো কিরে তোরা সবাই খেলে ও খাবে কি।
ওর জন্য বেশ তড়িজুত করে সাজিয়ে দিয়েছ। আমার জন্য দাও ? প্লেটে আরও আছে, খাক না।
আমি হাসছি। আমারা তিনজনে ভাগাভাগি করে খেলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম।
গেটের বাইরে এসে দেখলাম, বাড়িটা বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। চারদিকে সাজো সাজো রব।
মনে মনে যেটা ঠিক করেছি সেটাই করবো।
প্রথমে ভাবলাম রিমঝিমদের বাড়িতে যাই। ওকে মডেল করে কিছু ছবি আঁকি, তারপর ভাবলাম না ওর থেকেও তিয়ার শারীরিক গঠন আরও শার্প। ওকে মডেল করলে ভালো হয়।
রাজী হবে কি ? বলেই দেখি না।
সঙ্গে সঙ্গে তিয়াকে একটা ফোন লাগালাম। রিং বাজতেই ফোন ধরলো।
একটু চেঁচামিচির আওয়াজ। অপর প্রান্ত থেকে তিয়ার গলা ভেসে এলো।
হ্যালো অনিদা দাঁড়াও, আমি তোমাকে রিং ব্যাক করছি।
তিয়া ফোনটা কেটে দিল।
ট্র্যাংগুলার পার্কের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
তিয়া ফোন করলো।
বলো অনিদা। আমি তো ভড়কে গেছিলাম।
কেন।
তুমি আমাকে ফোন করবে, এ সৌভাগ্য আমার আছে। আমি কি রিমঝিম।
থাক তাহলে, আর যাব না।
তার মানে!
ভাবছিলাম হাতে একটু সময় আছে তোমার বাড়িতে যাব।
এ কি সৌভাগ্য আমার, চলে এসো।
তুমি কোথায় ?
ক্লাবে।
তাহলে থাক, তোমার বন্ধুরা আবার কি ভাববে।
দূর, সব বোগাস বুঝলে, এখানে আসি, টাইম পাস।
তোমার বাড়িতে এখন কে কে আছেন।
কেউ নেই।
কেন, বাবা মা ?
বাবা মা এখানে থাকেন না।
ওরে বাবা তাহলে যাওয়া যাবে না।
সত্যি তুমি এখনো সেকেলে রয়ে গেলে। একটু আধুনিক হওতো। ঝিমলিদি ঠিক কথা বলেছে।
হাসলাম, কোথায় তোমাদের বাড়ি ?
নিউ আলিপুর। তুমি কোথায় আছো বলো, আমি তোমাকে পিকআপ করে নিচ্ছি।
আমি রাসবিহারী কানেকটরে দাঁড়াই।
তাই দাঁড়াও আমি পার্কস্ট্রীটে আছি, আধঘন্টার মধ্যে তোমার কাছে পৌঁছে যাচ্ছি।
চলে এসো।
ফোনটা কেটেই, সুজিতদাকে একটা ফোন লাগালাম।
সুজিতদা ধরলো।
কিরে ব্যাটা তুই কোথায়, অ্যাতো গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছি।
লেক মার্কেটের গা দিয়ে হাঁটছি।
এখন!
একজায়গায় যাব। তুমি কোথায় ?
অফিসে।
তোমার এতো পয়সা খাবে কে বলো।
কেন তুই আছিস।
হাসলাম।
আমার কাজ কতদূর।
চলছে।
আচ্ছা অনি সত্যি তোর রবিবার বিয়ে।
হয়ে গেছে।
কবে।
গতকাল। আগামীকাল বৌভাত। সেই জন্য তোমায় আসতে বলেছি।
আগামীকাল তোর বৌভাত! তুই এখন লেক মার্কেটে হাওয়া খাচ্ছিস ?
শোনোনা তুমি কখন বাড়ি ফিরছো।
কেন বলতো।
একটু দরকার আছে।
আরও একঘন্টা।
মানে আটটা বাজবে।
হ্যাঁ।
শোবে কখন।
সাড়ে এগারটা বারটা।
আমি যাব।
কি পাগলের মতো বলছিস, আমার ঠিক বধোগম্য হচ্ছে না।
তোমাকে বুঝতে হবে না। আমি যাব। জেগে থাকবে।
তোর বৌদিকে ভর্সা করে ফোনে বলতে পারি তুই আসবি।
অবশ্যই।
ঠিক বলছিস।
আরে বাবা….।
তোকে এখনো বিশ্বাস হয় না।
গেলেই বুঝতে পারবে।
ফোনটা কেটে দিলাম।
রাসবিহারী কানেকটরে এসে দাঁড়ালাম।
ঝিমলির মাকে একটা ফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গে উনি রিসিভ করলেন। ঝিমলির খবর জানতে চাইলাম। উনি বললেন ভাইজ্যাকে মিঃ মারান ঝিমলির জন্য খুব সুন্দর একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। স্টেশন থেকে ঝিমলিকে গাড়িতে করে পিকআপ করে নিয়ে গেছে।
এমনকি মারানের ফোন নম্বর পর্যন্ত দিয়ে এসেছে। যদি কনো প্রবলেম হয় যেন একবার ফোন করে। উনি খুব খুশী।
ঝিমলি আমাকে বেশ কয়েকবার ফোনে সব জানাতে চেয়েছিল, আমার ফোনের স্যুইচ অফ।
টিনা, মিলি, অদিতির খুব প্রশংসা করলেন।
কাল সন্ধ্যার দিকে একটু সময় হবে।
কেন বলো।
আমার ট্র্যাংগুলার পার্কের বাড়িতে একটু আসতেন।
কেন ?
এমনি একটা ছোটখাটো ভোজসভা আছে।
বিয়ে করছো ?
ওই রকম আর কি।
উনি হাসছেন।

সত্যি অনি আজকের দিনেও তোমার মতো একটা সেকেলে ছেলের দেখা পাওয়া যায়।
তা নয়। আমার আত্মীয় স্বজন বলতে কেউ নেই। তাই নিজেকেই….।
যাব।
ঝিমলি নেই। রিমঝিমকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসবেন। মানে সবাই।
উনি হাসছেন।
ঠিক আছে, ঠিক আছে।
ফোনটা কেটে দিলাম।
সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে না। কয়েকটা লজেন্স কিনলাম। আর চিকলেট ক্যান্ডি।
চার মাথায় এসে দাঁড়ালাম। একটা ক্যান্ডি মুখে দিয়ে চিবোতে শুরু করলাম। ফোনটা বেজে উঠলো দেখলাম তিয়ার ফোন।
কোথায় আছো ?
দেখো আমি মেট্রো স্টেশনের গায়ে দাঁড়িয়ে আছি।
হুস করে একটা গাড়ি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ দামী গাড়ি। দরজা খুলে গেল। ভতরে দেখলাম তিয়া ড্রাইভিং সিটে বসে। আমি উঠে বসলাম। দরজা বন্ধ করলাম। হাল্কা এসি চলছে। তিয়া গাড়ি স্টার্ট করলো।
তোমাকে দূর থেকে দেখেছি কিন্তু চিন্তেই পারি নি।
কেন।
তুমি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছো। যেন কনো স্কুলের ছেলে কোচিনে যাবে।
হাসলাম।
এগুলো কি নিয়ে বেরিয়েছো।
ছবি আঁকার ষন্ত্রপাতি।
তুমি ছবি আঁকো!
একটু আধটু। তবে আহামরি কিছু না।
কোথায় গেছিলে।
তোমার কাছে যাব বলেই বেরিয়েছি।
আমার কাছে যাবে! ছবি আঁকবে! ঠিক বুঝতে পারলাম না।
চলো গিয়ে বোঝাচ্ছি।
যদি আমাকে না পেতে।
তাহলে রিমঝিমের কাছে চলে যেতাম।
আমি লাকি নম্বর ওয়ান। রিমঝিমকে কিছুতেই এই সুযোগ দেব না।
আমি মনে মনে হাসছি। এরা চারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কিন্তু একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দী।
আমাকে দেওয়া ম্যাসেজগুলো তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
আমি পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে তিয়ার দিকে এগিয়ে দিলাম। এই বার ওর দিকে নজর পরলো। চোখ নামিয়ে নিলাম। এ কি পোষাক পরেছে তিয়া! এতক্ষণ খেয়ালি করিনি। কালো রং-এর ফিন ফিনে একটা টপ পরেছে মসারির নেটের মতো। ওর অন্তর্বাস পুরো দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বাস বললে ভুল হবে পুরো শরীরটা আমার চোখের কাছে উন্মুক্ত। এমনকি সুগভীর নাভীর নীচে যেখানে চওড়া বেল্টে প্যান্টের কোমরবন্ধনী। ওর পরনে জিনসের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। পায়ে রিবকের একটা জুতো। ছোটো মোজা। আমার চোখ দেখে তিয়া বুঝতে পেরেছে। মুচকি হাসছে।
আমি ভিউগ্লাস দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। তিয়া আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের পাশ দিয়ে গাড়ি ঘোরাল। আমি জানি এখানে সব নামীদামী লোকেদের বাস। কেউ কারুর খোঁজ রাখে না। তিয়া এসে যে বাড়িটার সামনে দাঁড়াল, এই বাড়ির পাশ দিয়ে আমি বহুবার হেঁটে গেছি। হর্ণ বাজাতেই গেট খুলে গেল। গেটের দারোয়াণের পোষাক দেখেই বোঝা যায় বাড়িটা যে সে লোকের বাড়ি নয়।
তিয়া গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করলো। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। চলো।
আমি একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। গাড়ির ভেতর থেকেই চারিদিক লক্ষ্য করলাম।
বুঝতে পারছি তিয়া তাড়িয়ে তাড়িয়ে আমার এই ব্যাপারটা উপভোগ করছে।
আমি দরজা খুলে নিচে নামলাম। উচ্চবিত্তের বাড়ি বলতে যা বোঝায় একদম সেরকম। তিয়া আমার কাছে এগিয়ে এলো। চলো ভেতরে চলো।
সত্যি আমি তিয়ার পাশে ভীষণ আন-স্মার্ট।
তিয়া আমি দুজনে ওদের বাড়ির ভেতরে এলাম। নিচের ফ্লোরটা বসার জায়গা। বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো অয়েল পেন্টিং আছে। একেবারে টিপ টপ সাজানো গোছান। পুরণো দিনের আসবাব।
আমি কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। একদিকে একটা বাঘের মডেল। দেখেই বুঝতে পারলাম তিয়াদের বাড়ির পূর্ব পুরুষেরা কেউ শিকারী ছিলেন। না হলে এরকম মডেল থাকা সম্ভব নয়।
ওকে জিজ্ঞাসা করলাম। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেলাম। ঠিকই ধরেছি আমি, তিয়ার দাদুর শিকারী ছিলেন। এই বাঘ তাঁর হাতের শিকার। কাছে গেলাম ভালকরে দেখলাম। তিয়া দেখাল, দাদু এখানে গুলি করেছিল। আমায় গুলির জায়গাটাও দেখাল। চলো আমার ঘরে চলো।
ড্রইংরুমের ভেতর দিয়েই ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আমি ঘোরান সিঁড়ি দিয়ে ওর পেছন পেছন ওপরে উঠে এলাম।
ওর ঘরে ঢুকে মনটা ভরে গেল। প্রায় চারশো স্কয়ার ফিটের ঘর। স্ট্যান্ড এসি। একসাইডে ওর শোবার খাট এবং দামি পুরনো দিনের আসবাব। মাঝখানে একটা ছোট্ট সেন্টার টেবিল। তার চারদিকে সোফা। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। তিয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি যে গোগ্রাসে গিলছি, সেটা ও বুঝতে পারছে।
বসো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলে হবে।
আমি সোফায় বসলাম। এখানকার আদব কায়দা সত্যি আমার অজানা।
কি খাবে ?
এক গ্লাস প্লেন জল।
তিয়া খিল খিল করে হেসে ফেললো।
হাসলে যে।
ভাবছি তুমি কি করে অতো বড়ো কাগজের মালিক হলে।
আমি হই নি। আমাকে করা হয়েছে।
তাহলে তুমি সামলাচ্ছ কি করে।
ওই আর কি।
উঁহুঁ সে বললে শুনবো না। আমি খোঁজ খবর নিয়েছি। তোমাকে অফিসে সবাই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বলে।
হবে হয়তো, আমার সামনে তো কেউ বলেনা।
একজন গুড এ্যাডমিনিস্ট্রেটর না হলে এই ধরণের কথা অফিসের লোকজন বলে কি করে ?
আমি হাসলাম।
তুমি এতো সাধারণ, তোমাকে এতো ভায় পায় কেন লোকে, খুব জানতে ইচ্ছে করে।
খোঁজ করো জেনে ফেলবে।
এ-মা তুমি জল চেয়েছিলে। দাঁড়াও নিয়ে আসি।
তিয়া বেরিয়ে গেল।
ভেবেছিলাম ঘরের বাইরে গিয়ে তিয়া চেঁচিয়ে উঠবে আয়া।
তা করলো না নিজেই বেরিয়ে গেল।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে ঘরটার চারিদিক দেখলাম। বেশ কয়েকটা পেন্টিংও আছে তিয়ার ঘরে। ছোটো ছোটো। মনে হয় খুব একটা দামি আর্টিস্টের আঁকা নয়। তুলির স্ট্রোকগুলো ভীষণ দুর্বল। কালার কমবিনেশনটা এমন উগ্র খুব চোখে লাগে। মনে হচ্ছে বুক ফেয়ার থেকে কিনে বাঁধান। কলকাতা আর্ট কলেজের বহু ছাত্র বুকফেয়ারের ওই দশদিন মাঠে বসে ছবি আঁকে। আমি তিয়াদের বয়সী মেয়েদের, যাদের একটু পয়সা আছে, ওদের কাছ থেকে ছবি কিনতে দেখেছি।
কিগো ছবির মধ্যে ঢুকে গেলে নাকি।
ফিরে তাকালাম। তিয়ার ঝলমলে শরীরটার দিকে ঠিক ভাবে তাকাতে পারছি না। বার বার চোখ নামিয়ে নিচ্ছি। তিয়া খুব স্বাভাবিক। নিজের মনকে বোঝালাম তুই কি রে অনি। তুই নাকি তিয়াকে মডেল করে ছবি আঁকবি। ও যদি তোকে বলে অনিদা তুমি আমার একটা নুড স্কেচ করে দাও।
মনে মনে হাসলাম।
কিগো নিজের খায়ালে নিজে হাসছো।
কথাটা ঘুরিয়ে নিলাম। এই ছবিটা কি তুমি বুক ফেয়ার থেকে কিনেছো।
কি করে বুঝলে।
এমনি বললাম।
নিশ্চই তুমি কিছু একটা বুঝেছো, না হলে বলতে পারতে না।
তারমানে তুমি বুক ফেয়ার থেকেই কিনেছ।
হ্যাঁ।
আমি এগিয়ে এসে তিয়ার হাত থেকে জলের গ্লাস নিলাম।
তিয়া তোমার বাড়িতে কেউ নেই।
মা-বাবা কয়েকদিনের জন্য একটু বাইরে গেছেন।
কোথায় ?
হাঁসিমারাতে আমাদের তিনটে টি-গার্ডেন আছে। কলকাতার অফিস থেকেই সব কিছু হয়, কি একটা প্রবলেম হতে বাবা গেলেন সঙ্গে মাও গেলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই চলে আসবেন।
তুমি গেছ।
মাসে একবার যাই। অনিদা তুমি ম্যাজিক জান।
হ্যাঁ মনের ম্যাজিক। ওটা কাউকে শেখানো যায় না, অনুভব করতে হয়। এবার আমার আসার কারণটা তোমাকে বলি।
গ্লাসটা সেন্টার টেবিলে রাখলাম।
আমি একটা কাজ করছি বুঝলে তিয়া। একটা এ্যাড এজেন্সির কিছু প্রমোসনের কাজ।
তুমি!
কেন, করতে পারি না।
না মানে।
আমার আবার কিসের টাকার দরকার।
হ্যাঁ!
আমার টাকার দরকার আছে। কাগজের জন্য। অনেক টাকা পেলাম, তাই কাজটা নিয়েছি।
তিয়ার চোখদুটো বদলে গেল। চোখের তারা দুটো অন্য কিছু কথা বলতে চায়।
রিমের মা বলছিল তোমার কাগজকে এ্যাড পাইয়ে দিয়েছে।
হ্যাঁ দিয়েছেন। সরকারী দপ্তরের এ্যাড। কেন ?
এমনি তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম। আচ্ছা অনিদা তোমার কনো আত্মসম্মান বোধ নেই।
কিসের জন্য বলো।
তুমি তোমার কাগজের হয়ে ওনার কাছে এ্যাড চেয়েছো কেন।
কাগজ এ্যাডের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কাগজের প্রতি আমারও একটা দায়িত্ব আছে।
সেটা ঠিক, তা বলে ওনাকেই তোমাকে চাইতে হবে।
বুঝলাম ব্যাপারটা নিয়ে চার বন্ধুর মধ্যে কিছু একটা আলোচনা হয়েছে। কথাটা ঘোরাবার চেষ্টা করলাম।
ও ছেড়ে দাও তিয়া। তুমিতে মডেলিং করো ?
করি।
তুমি আমার প্রমোসন গুলোয় মডেলিং করবে।
অফকোর্স কেন করবো না। কিন্তু তুমি কি আমাকে নেবে ?
নেবো। তোমাদের চারজনকেই একটা সুযোগ দেব।
তাহলে আমি করবো না।
কেন।
আমি ওদের সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করবো না।
প্রোডাক্ট একটা নয়। অনেক গুলো আছে। সবেতেই তুমি মডেল হবে, তা হবে না।
ঠিক আছে। তাহলে করবো। কিন্তু তোমাকে একটা প্রমিস করতে হবে, আমি যেই প্রোডাক্টে কাজ করবো সেই প্রোডাক্টে অন্য কেউ কাজ করতে পারবে না।
হাসলাম। তোমার স্টিল গুলো আমাকে একটু দেখাবে।
নিশ্চই। কেন দেখাব না। তিয়া ওর দেয়াল আলমাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। আমি সোফায় বসতে বসতে বললাম। তোমার যে গুলো পছন্দ সেগুলো আমায় দাও।
তিয়া বেছে বেছে আমায় ফটো দিল। ছবিগুলো বেশ ভালো। বুঝলাম এই ঘরেই তোলা।
কিছু সিডিতে আছে। তোমায় দিতে পারি। ওগুলো আউটডোর স্যুটিং।
আমি ল্যাপটপ নিয়ে আসিনি।
নিয়ে যাও, সময় করে দিয়ে যাবে।
ঠিক আছে।
তিয়া আমার সামনে বসে। ওর ডাগর চোখে অনেক জিজ্ঞাসা। ওর চোখ তাই বলছে।
আমি তোমার কয়েকটা ছবি আঁকবো। তোমার আপত্তি আছে।
একটুও না। এই ড্রেসে, না চেঞ্জ করবো।
তোমায় যদি কস্টিউম আর টু পিসে দেখতে চাই, দেখাবে ?
তুমি নুড দেখতে চাইলেও, দেখাতে পারি।
একটু থমকে গেলাম। তিয়া বলে কি!
না তার দরকার পরবে না। আমার যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু হলেই চলবে।

তাহলে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো আমি আসছি।
তিয়া বেরিয়ে গেল। ঘরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে। তবু কেমন যেন আমি ঘেমে যাচ্ছি। কাগজ বার করলাম পেন্সিল বার করলাম, রেডি হলাম। ঘরের দরজাটা বন্ধ। বশে বশে পোজ গুলো ভাবছিলাম কি ধরণের ড্রইং করবো।
তিয়া ঢুকলো।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। তিয়ার হাইট প্রায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি। মেয়েদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভালো হাইট। বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত একফোঁটা মেদ নেই, শরীরটা ধরে রাখার জন্য বেশ ভালোরকম চর্চা করে। ব্রা-প্যান্টি যা পরেছে তা না পরার মতো। শরু ফিতেয় ঢাকা। টকটকে ফর্সা চেহারায় লাল রঙের ব্রা-পেন্টিতে ওকে মোহময়ী করে তুলেছে। আমি ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। তিয়া হাসলো।
পছন্দ।
আমি নিজে যথেষ্ট স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করলাম। এই ঘরে ঢুকেই দেখেছি দুটো স্পট লাইট আছে।
তিয়া আমার সামনের সোফায় এসে বসলো। চোখ ফেরাতে পারছি না ওর শরীর থেকে। বুঝতে পারছি তিয়া আমার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে।
এবার বলো। তুমি কেমন ভাবে আঁকতে চাও।
তোমার ঘরে ওই স্পট লাইটটা জ্বলে না।
হ্যাঁ। প্রয়োজন লাগে না, তাই জ্বালাই না।
লাইটটা জ্বালাও।
তিয়া সোফা থেকে উঠে গেলো। হাঁটার ভঙ্গির মধ্যে উদ্ধত ভাব। একটা ছন্দ আছে।
তিয়া লাইটা জ্বালিয়ে আমার দিকে তাকাল।
ঠিক লাইটটার নিচে দাঁড়াও।
তিয়া হেঁটে গেল।
ঠিক ফরটি ফাইভ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলে দাঁড়াও।
কি ভাবে বলো।
আবার বললাম।
তুমি উঠে এসে দেখিয়ে দাও।
আমি উঠে গিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এলাম। তিয়া হাসলো।
আমি সোফায় ফিরে এসে ড্র করতে শুরু করলাম। তিনটে এ্যাঙ্গেলে তিনটে স্কেচ করলাম। একটা বসে দুটো দাঁড়িয়ে।
আবার ওর কাছে গেলাম। ওকে ঠিক মতো দাঁড় করিয়ে ওর সামনে থেকে স্কেচ করলাম। এইভাবে একের পর এক গোটা পনেরো স্কেচ করে ওকে রিলিফ দিলাম।
আমি সোফায় এসে বসলাম। তিয়া বললো একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।
আমি ছবি গুলো দেখছিলাম, আর নিজের প্রশংসা নিজেই করছিলাম। কনোদিন মডেলিং করিনি, কিন্তু দেখে দেখে খুব খারাপ স্কেচ আমি করিনি। ছবিগুলো নিয়ে নিজেই একটু একটু কারেকসন করছিলাম, তিয়া এসে ঢুকেই আমার পাশে বসলো। হাতে দুটো অরেঞ্জ জুসের গ্লাস। টেবিলে গ্লাস দুটো রেখে, ওআও বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
তুমি কি দারুণ এঁকেছো অনিদা।
হাসলাম।
আগে কোনদিন এইভাবে সিটিং করেছো।
একবার।
কোথায়।
আমরা যেখানে শিখি। আর্ট কলেজের কিছু ছাত্র-ছাত্রী এসেছিল তাদের কাছে।
এবার তুমি চেঞ্জ করে নাও।
তোমার কাজ শেষ।
হ্যাঁ।
তিয়া বেরিয়ে গেল, কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো, এবার অন্য পোষাক, জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জি।
দুজনে অরেঞ্জজুস খেলাম।
আমি এবার বেরবো তিয়া।
তুমি কোথায় যাবে।
লেক মার্কেট।
চলো তোমায় পৌঁছে দিই।
আমি চলে যেতে পারবো।
কটা বাজে খেয়াল আছে।
কটা।
সাড়ে দশটা, এখান থেকে এখন ট্যাক্সি পাবে না।
হাঁটতে হাঁটতে ওই মোড়ে চলে যাব।
সত্যি অনিদা, আচ্ছা আমি ছেড়ে দিয়ে আসলে তোমার কনো আপত্তি আছে।
হাসলাম। চলো।
দুজনে নিচে নেমে এলাম।
তাহলে তোমাকে নিয়ে আমি পরিকল্পনা করতে পারি।
অবশ্যই।
গাড়িতে আসতে আসতে ওর সঙ্গে ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো কথা হলো।
সঠিক জায়গায় এসে আমি ওকে গাড়ি থামাতে বললাম, এখান থেকে সুজিতদার বাড়ির দূরত্ব মিনিট চারেক। তিয়াকে বিদায় দিলাম।
সুজিতদার বাড়ির কাছে এসে মোবাইলটা বার করে অন করলাম। চারজনকে ম্যাসেজ করলাম।
তোমাদের অনিদা হঠাৎ একটা বিয়ে করে ফেলেছে। তাদের কাগজের মালকিনকে। যদি পারো আগামীকাল সন্ধ্যায় একবার এসো। ফোনটা অফ করে দিলাম।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এলাম। যাক এখনো সেই নেমপ্লেটটা সুজিতদা টাঙিয়ে রেখেছে। পরিবর্তন করে নি। বেল বাজাতেই বৌদি দরজা খুলেই চেঁচা মিচি শুরু করে দিল। ভেতরে এলাম। জুতো খুললাম। দেখলাম বৌদির চেঁচা মিচিতে ভেতরে থেকে সুজিতদা আর বছর সাত আটেকের একটা বাচ্চা ছেলে বেরিয়ে এলো। সুজিতদার ছেলে। ওর যখন এক বছর বয়স শেষ এসেছিলাম। ছেলেটা আমাকে দেখে হাসছে।
কি গুবলুবাবু অনি কাকাকে নিশ্চই চিনতে পারছ না।
তোকে চিনবে কি করে তখন ওর এক বছর বয়স। বৌদি বললো।
আয় ভেতরে আয়। সুজিতদা বললো।
কথা বলতে বলতে ভেতরে গেলাম।
আমি বেশিক্ষণ বসবো না। আরও এক জায়গায় যেতে হবে।
এতো রাতে কোথায় যাবি ? বৌদি বললো।
অনেক কাজ, বুঝলে বৌদি।
অনেক বড়ো হয়ে গেছিস এখন, তাই না ?
সুজিতদা বৌদি কিন্তু গন্ডগোল করছে।
বৌদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তোর একটুও পরিবর্তন হয় নি ও সেদিন ঠিক বলেছিল।
হবে কি করে। পরিবর্তন হলে এই অবেলায় তোমার এখানে আসতাম।
উঃ মুখে যেন খই ফুটছে। কি খাবি ?
স্রেফ জল। একদিন বৌকে নিয়ে এসে পেট ভরে খেয়ে যাব।
তোর বৌ আসবে ?
অনি যখন আসতে পেরেছে তার বৌও আসবে। তখন সে মালকিন নয়। অনির বৌ।
তাহলে আমি যা শুনেছিলাম সেটাই সত্যি।
কি শুনেছিলে বলো।
তোর সঙ্গে তোর হাউসের মালকিনের প্রেম নিবেদন চলছে।
বৌদি আজ থেকে সাতবছর আগে তোমায় একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম তোমার মনে আছে।
হ্যাঁ।
কি নাম বলো।
মিত্রা।
এইতো বেশ মনে রেখেছো।
মনে রাখবো না। তার কথা বলে কতোদিন চোখের জল ফেলেছিস।
ফেলেছি বুঝি।
বৌদি হাসছে।
সেই মিত্রাই এই মিত্রা।
অ্যাঁ।
কিগো বুলা তুমি তাহলে ভুল ইনফর্মেসন দিয়েছ।
সে কাগজের মালকিন ছিল না।
তখন তার বাবা ছিল। এখন সে হয়েছে।
সুজিতদা জোরে হাসলো। আর যা শুনেছ ওকে বলতে যেও না। সব কথা নস্যাৎ করে দেবে।
না সুজিতদা বৌদি যদি ওর সম্বন্ধে কোন খারাপ কথা শুনে থাকে তারও একটা রিজিন আছে।
একটু থামলাম।
সেই নিয়েই মেতে আছি সুজিতদা। ভুলটা যে কতটা অসত্য তা প্রমাণ করতে হবে।
সুজিতদার দিকে তাকালাম।
যাক কালকে কিন্তু ভাইপকে নিয়ে যাওয়া চাই।
আমি ভেতরের ঘরে চলে এলাম। সুজিতদার সঙ্গে কাজের কথা বললাম। ছবি দেখালাম।
সুজিতদা অবাক।
তুই এখন ছবি আঁকতে বেরিয়েছিলি!
হ্যাঁ।
সুজিতদা চেঁচিয়ে উঠলো, বুলা দেখে যাও অনির কীর্তি।
বৌদি প্লেটে করে মিষ্টি, জল নিয়ে এসেছে।
কিগো সাদা জল না কোল্ডড্রিংকস ?
কোল্ডড্রিংকস।
বৌদি ছবিগুলো দেখল, হাসল।
তোর না আজ কালরাত্রি।
সেই জন্যই ফাঁক পেয়ে গেলাম।
সুজিতদা হাসছে।
কাজের প্রতি তোর ডেডিকেসনকে আমি সত্যি শ্যালুট করি।
তোমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি।
দেব এক থাপ্পর।
তা তুমি দিতে পার বৌদি। কিন্তু যে লোকটি টাকা দিয়েছে। তার কথা একবার ভাব। তাকে গ্যাস খাইয়ে তখন বুঝিয়ে দিয়েছি। যদি করে দিতে না পারি, তাহলে কতোবড় প্রেসটিজ বলো।
এই জন্য তোর দাদা তোকে দিয়েছে।
আমি সব নয় বৌদি, দাদার টিমকেও কাজ করতে হবে।
ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
আমি একটা মিষ্টি গুবলুবাবুকে দিলাম। আর একটা মিষ্টি নিজের মুখে তুললাম।
তোকে কিন্তু আজ দেখে ভীষণ ভাল লাগছে।
ও কথা বলো না, মিত্রা শুনলে রাতে দরজা বন্ধ করে ঠ্যাঙাবে।
দেখেছো কি টক টক করে কথা বলছে। সেই অনি আর এই অনি! বৌদি বললো।
জানিস অনি, তুই সেদিন চলে আসার পর। আর কাজ হয় নি।
কেন।
আমার মার্কেটিং ম্যানেজার, সেলসের ছেলে আমাকে এসে ছেঁকে ধরলো।
কেন আমাকে পিটবে নাকি!
দূর।
শোন না আগে কি বলে। বৌদি বললো।
তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বসো।
বৌদি বসলো।
ওরা দুমাস ধরে যাকে বোঝাতে পারে নি, তুই এক ঘন্টায় তাকে কি করে বোঝালি।
সত্যি জান কি সুজিতদা, আমি ওর চোখ মুখ দেখে ধরে ফেলেছিলাম।
ভদ্রলোক একটু ক্রিয়েটিভ আর্ট পছন্দ করেন। এই গড্ডালিকা প্রবাহের মতো যা চলছে তা ওঁর মন পসন্দ নয়। আমি সেই এ্যাঙ্গেলে কথা বললাম, মাছ বড়সিতে বিঁধলো।
শুনলে বুলা, অনির কথা শুনলে। তাহলে ও যদি মালিক না হয় কে হবে।
তুই বেশ সুন্দর কথা বলতে শিখেছিস।
সব তোমার আর্শীবাদ বৌদি। আমার জীবনে কয়েকটা বছর, তোমরা দুজনে আলো দিয়েছো।
আমি ভুলি কি করে।
সব শালা নেমকহারেমের জাত। সুজিতদা বললো।
রাগ কোর না দাদা। তোমার হাতের পাঁচটা আঙুল সমান, তুমি নিজে বলো। অনি গ্রামের ছেলে। শহরে উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছে। তাকে নেমকহারামী করলে চলবে।
আর বক বক করিস না।
বেশ কিছুক্ষণ সুজিতদা বৌদির সঙ্গে গল্প করলাম।
তারপর উঠে এলাম। তিনজনে আমাকে নীচ পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

তুই এখন কোথায় যাবি।
বাড়িতে ঢোকা নিষেধ নতুন বৌ-এর মুখ দেখা যাবে না। তাই নিজের খুপরিতে।
তোর সেই ফ্ল্যাটে ?
হ্যাঁ।
চল তোকে ছেড়ে দিয়ে আসি।
কলকাতা শহরে সারারাত ট্যাক্সি চলে।
সুজিতদা হাসছে।
তোর সঙ্গে কথায় পেরে ওঠা যাবে না।
কালকের কথাটা মথায় থাকে যেন। আর শোনো ছবিগুল সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।
সুজিতদা বৌদি দুজনে হাসছে।
এখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ আমার বাড়ি। তবু আমি সেখানে যেতে পারব না। কালরাত্রি। নিজের মনে হেঁটে বড়ো রাস্তায় চলে এলাম। একটা ট্যাক্সি ধরলাম।
ট্যাক্সি থকে যখন নামলাম তখন সাড়ে এগারোটা হবে। গেটের কেয়ারটেকার ছেলেটি আমায় দেখে হাসলো।
দাদা অনেকদিন পর।
তুমি ভালো আছো।
হ্যাঁ দাদা।
আমার ঘরে কেউ এসেছে।
দু’জন ভদ্রলোক এসেছেন। একজনকে আগে দেখেছি। আর একজন নতুন।
লিফ্টের দিকে এগিয়ে গেলাম।
বুঝলাম ইসলামভাই আর ভজু। ওপরে উঠে এলাম। দরজায় নক করতেই দরজা খুলে গেল।
গেটে ভজুরাম।
কে রে ভজু। ভেতর থেকে ইসলামভাই-এর গলা পেলাম।
অনিদা।
ভেতরে এলাম।
তুমি এতরাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে ?
কাজ করছিলাম।
বড়মা কতবার ফোন করলো জানো।
তুই কিছু বললিনা কেন।
ইসলামদার সঙ্গে কথা হয়েছে।
তুই খেয়েছিস।
তুমি আস নি খাব কি করে।
বেশ করেছিস। পেটে ভিঁজে গামছা বেঁধে থাক।
ঘরে এলাম।
দেখলাম ইসলামভাই আমার বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে আছে। আমায় দেখে হাসল।
একটা চকচকে চাদর পাতা। ঘরটা মনে হয় আগের থেকে একটু চকচক করছে।
ঘরটার কি অবস্থা করেছিলি।
কতদিন আসিনি সেটা বলো।
তা ঠিক। কাজ হলো।
হ্যাঁ। আর একটা বড়ো কাজ বাকি আছে, কাল সকালে সারব।
হাত মুখ ধুয়েনে তিনজনে বসে খাই।
তুমি খেয়ে আস নি ?
তোর এখানে আসব, খেয়ে আসব কেন। দিদিকে বললাম দিয়ে দাও, তিনজনে একসঙ্গে খাব।
তুমি থাকবে না কেটে পরবে।
তুইতো থাকতে দিবি না ?
আমি সে কথা বলিনি, তোমার ওখানে কি কাজ আছে না আছে আমি কি করে জানব।
ওখানকার কাজ সাল্টে দিয়েছি। বাকি যে টুকু আছে রতন, আবিদ করবে, লোক আছে।
আচ্ছা ইসলামভাই আমাকে একটা কথা বলতে পার।
বল।
টোটাল ব্যাপারটার স্পনসর কে।
জেনে তোর লাভ।
আমার কোন লাভ নেই। তবু একবার জিজ্ঞাসা করা কর্তব্য তাই।
ইসলামভাই হাসছে।
তুই ব্যাটা বহুত ঘাঘু মাল। ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানিস না।
কিগো তুমি এখনো হাত মুখ ধোও নি। আমার খাবার গরম হয়ে গেছে। খিদে লেগেছে।
তুই রান্নাঘরের খোঁজ পেলি কি করে!
এসে ঘর গোছালাম, ও বাড়ি থেকে আসার সময় দিদিমনি নতুন চাদর দিয়েছিল পাতলাম।
ওই জন্য, তখন থেকে ভাবছি এ চাদর এলো কোথা থেকে। এতো চকচকে।
ব্যাগে তোমার পাজামা পাঞ্জাবী আছে। পরে নাও।
তুই রেডি।
হ্যাঁ।
দাঁড়া আমি ঝট করে হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।
বাথরুমে গেলাম। তাড়াতাড়ি কাজ সারলাম। দেখি ইসলামভাই ছোট টেবিলটা টেনে নিয়ে কাগজ পেতেছে।
কি এনেছিস ভজুরাম।
আলুপরটা মটর পণির আর চিকেন।
কিগো ইসলামভাই মেনুটা মনে হচ্ছে মিত্রার সিলেকসন।
ইসলামভাই হাঁসছে।
ও বাড়ির লেটেস্ট খবরা খবর নিতে নিতে খাওয়া শুরু করলাম।
ইসলামভাই বললো তুই ফোনের স্যুইচ অফ করে রেখেছিস। মামনি ফোন করেছিল, আমি কতোবার ফোন করেছি। আবার টেনসনে পরে গেছিল সবাই। কেন তুই এরকম করিস ?
আমি হাসছি।
একটু বললে যেখানে সব ঝামেলা মিটে যায়, সেখানে চেপে রাখার কি দরকার।
আমি শুনে যাচ্ছি।
অনিমেষদা বিধানদার সঙ্গে আমি দামিনী কাল একঝলক কথা বলেছি।
কি বললো।
দামিনীকে ওখানকার দায়িত্ব নিতে বলছে।
মাসি কি বলছে।
তোর সঙ্গে কথা বলে জানাবে।
অনিমেষদা কি বললো।
হাসছে। বিধানদাকে টিপ্পনি কেটে বললো, বিধানবাবু অনি এখন বড়ো নেতা।
ঠিকঠাক খাইয়েছো।
সাদা ভাত, মুড়িঘন্টের ডাল, মাছ, সামান্য দই মিষ্টি খেয়েছে দুজনে। খুব ভালো মুডে ছিল।
ওদিককার ব্যাপারে তোমায় কিছু বললো।
গ্রীণ সিগন্যাল দিয়েছে। এবার আমাকে কাজের কাজ করতে হবে।
চিন্তা ভাবনা করলে।
কালকের কাজটা মিটুক।
কতজনের এ্যারেঞ্জমেন্ট।
দাদা বললো অনি একটা পাগল বুঝেছো ইসলাম। কাকে কাকে বলবে আমি নিজেও জানিনা। তুমি বরং তিনশো জনের কথা মাথায় রেখে ব্যবস্থা করো।
হাসলাম।
আমি এর মধ্যে মাথা গলাব না।
সে বললে হয়।
খাবার গুলো বেশ ভাল বানিয়েছে বুঝলে ইসলামভাই।
আমি জাকিরকে বলেছি একবারে রিচ করবি না। ঘরোয়া বানাবি। ব্যাটা আমার কথাটা রেখেছে।
কালকের মেনু।
বলাযাবে না।
সেকিগো! বিয়ে আমার, মেনু জানতে চাইছি, বলছো কিনা বলা যাবে না।
ইসলামভাই হাসে।
ইসলামভাই-এর ফোনটা বেজে উঠল। নামটা দেখে বললো, মামনি।
কিরে মামনি।
বুবুন এসেছে।
তিনজনে বসে খাচ্ছি। তোকে খাওয়া হয়ে গেলে, ফোন করতাম।
কখন এসেছে।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ।
ওর ফোন বন্ধ কেন।
আমার ফোন খোলা আছে।
পকেট থেকে বার করে একবার দেখ না।
ভজু দেখতো।
অনিদা ঠ্যাংটা একটু রেখো।
কিরে তোর ঠ্যাং ও খাচ্ছে।
তাহলে কি।
ওরে সকাল থেকে ওর মুখ বন্ধ নেই, শরীর খারাপ করবে। ডাক্তারদাদা সকালে একবার বকেছে।
নাগো অনিদা দিদিমনি মিছে কথা বলছে।
আমি ভজুর দিকে তাকালম।
তোমার ফোন বন্ধ।
কিরে, দেখলি।
তুই কোথায় ?
বড়মার ঘরে শুয়ে আছি।
কেন ?
তোর ঘরে সব মেয়েরা।
মেয়েরা মানে।
অদিতি, সুরো বাড়ি যায় নি। ফেল সবাই ও ঘরে।
তাই!
ছোটমার ঘরে দাদা মল্লিকদা। আগামীকাল আরও লোক আসবে ডাক্তারদাদার বাড়িতে শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেন ?
কোন আবার কিরে, এতো লোক শোবে কোথায় ?
দেখ আমি কিছুই জানি না।
তোর সব বড় বড় ব্যাপর।
এই রিটার্নটা কাল পাবি।
সরি সরি আর বলবো না।
তোর কাছে আর কে শোবে ?
ছোটমা বড়মা।
ওঘরে।
মাসি কবিতা। ইসলামভাই প্রচুর জিনিসপত্র ঢুকিয়ে গেছে।
মামনি ওরা বার করে নি ?
কোথায় রাখবে, তুমি কিছু বলোনি।
আমি রতনকে ফোন করছি।
এখন আর তোমায় ফোন করতে হবে না। সারাদিন পরে সবে দু’জনে একটু শুয়েছে।
বুবুন।
উঁ।
তুই কখন আসবি।
দেখি।
দেখি কেন, ইসলামভাই-এর সঙ্গে চলে আসবি।
ঠিক আছে, এখন রাখ।
খাওয়া শেষ ?
শেষের পথে।
মিত্রা ফোন বন্ধ করল। খাওয়া শেষ হতেই, বেশ ঘুম পাচ্ছে। ইসলামভাইকে বললাম, আমি এই সাইডে তুমি ওই সাইডে। ভজুরাম মাঝখানে।
ইসলামভাই বললো তাই হোক।
ভজুরামকে বললাম মাথাটা একটু কড়কে দে।
ঠিক বলেছো অনিদা তোমার মাথাটা অনেকদিন ভাল করে টেপা হয় নি।
ভজুরাম সব গুছিয়ে গাছিয়ে নিল। আমি বিছানায় টান টান হয়ে শুলাম।
ইসলামভাই, কাল কিন্তু আমি অনেক ভোর ভোর বেড়িয়ে যাব।
তুমি জাগলে ভালো, না হলে ডাকব না। মনে রেখো।
কাল আবার কোথায় যাবি ?

বলা যাবে না।
অন্যদিন কাজটা করলে হতো না।
না।
আমায় জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দেব।
বলবে সকালে উঠে চলে গেছে, দেখা হয়নি।
কখন আসবি।
বলতে পারছিনা।
তারমানে!
কাজটা শেষ করে আসতে হবে।
কালকেই করতে হবে।
ভেবেছিলাম তোমাকে বলবো না। তোমরা কেউ জানতেই পারবে না। তখন কথায় কথায় বললে একটু বললে যদি ঝামেলা কমে তাহলে বলবিনা কেন তাই হিন্টস দিলাম।
ফোনটা অন্ততঃ পক্ষে খোলা রাখিস।
হয়তো হবে না।
দুপুরে এসে খাবি।
চেষ্টা করবো।
আবার কোন গন্ডগোল পাকাচ্ছিস।
না।
ঠিক।
তুমি বিশ্বাস করতে পার।
ভজুরাম মাথাটা বেশ ভালো ম্যাসাজ করে। এমনভাবে টেপে মাথাটা একেবারে হাল্কা হয়ে যায়। কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি জানি না। ঠিক সময়ে ঘুম ভাঙলো। উঠে দেখলাম ওরা দু’জনে অঘোরে ঘুমচ্ছে। আমি মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেস হলাম। জামা প্যান্ট পরলাম। আলমাড়ি থেকে জাঙ্গিয়া বার করে পরতে ভুললাম না। ফ্ল্যাটের চাবিটা দেখে নিলাম টেবিলের ওপর আছে কিনা। মোবাইলের ঘরিতে দেখলাম, পৌনে পাঁচটা বাজে। বাইরে হাল্কা আলো। আমি বেরিয়ে এলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আজকের কাজটা আমার জীবনের একটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আমাকে এই কাজটা ঠিক মতো শেষ করতেই হবে।
দরজাটা ভেজিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে লক করে দিলাম। সোজা নিচে নেমে এলাম। এখনো ঠিক ঠিক আলো ফোটে নি। রাস্তার নিওন আলো গুলো সমান তেজে জ্বলছে। গেটের মুখে সেই ছেলেটি। ঝিমচ্ছে। ওর গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম। চমকে উঠে পরলো।
দাদা আপনি! এত সকালে ?
একটু বেরবো দরজাটা একবার খুলে দাও।
ছেলেটি চাবি নিয়ে এসে দরজা খুললো। আমি বেরিয়ে এলাম। হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম গড়িয়াহাট। সকালে সবাই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছে। মোটা মোটা থল থলে চেহারার মানুষ। সব বয়সের। কেউ কেউ আবার গোল পার্কের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। হয়তো লেকে ঢুকবে। সকাল হতে না হতে কতো লোকের কতো কাজ। আমি যেমন চলেছি মানুষ খুঁজতে।
নিজের মনে নিজে হাসলাম। একটু জোরে হেসে ফেলেছি। একবার পেছন ফিরে দেখলাম। না আমার আশে পাশে কেউ নেই।
চায়ের দোকনটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। এককালে রোজ এখানে চা খেতাম। এখন খাই না। তাই আমাকে চেনার বালাই নেই। জলের মগটা নিয়ে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেলাম। তারপর একভাঁড় চা একটা বিস্কুট সহযোগে মারলাম। বাড়িতে থাকলে একটু আতিথেয়তা পেতাম, এখানে তার বালাই নেই।
পয়সা ফেকো তামাসা দেখো। ভাঁড়টা সঠিক জায়গায় ফেলে একটা সিগারেট কিনলাম। কালকের কেনা বেশ কয়েকটা ক্যান্ডি পকেটে পরে আছে। সিগারেট ধরালাম। এতো সকালে কোনদিন সিগারেট খাই না। গলায় লাগলো, খক খক করে কেশে উঠলাম।
দুর শালা বলে সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলদিলাম।
আবার হাঁটতে শুরু করলাম। দেশপ্রিয় পার্কের মুখে এসে বাস উঠলাম।
কন্ডাকটর টিকিট চাইল। বললাম ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি। কলকাতায় বিখ্যাত কালীবাড়ি। আমাদের কলেজের সামনে।
বলতে গেলে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। মিত্রা আমি দু’একবার এখানে এসেছি। পূজোও দিয়েছি। ঘন্টাখানেক লাগল এখানে আসতে। বাস থেকে নামলাম। বিশেষ ভিড় নেই। মন্দিরে ঢুকে প্রণাম করলাম। আমার খুব একটা ধর্মে মতি নেই। তবু মনকে প্রশ্ন করলাম আজ এলাম কেন ? উত্তর পেলাম না। যেটুকু আচার ধর্ম পালন করার দরকার, তাই করলাম।
তিনটে প্যাকেটে পূজো দিলাম একটা মিত্রা আমার নামে, একটা বড়মা দাদার নামে আর একটা ছোটমা মল্লিকদার নামে। ব্রাহ্মণ মশাই গোত্র জিজ্ঞাসা করলেন বলতে পারলাম না। পূজোর প্রসাদী আমার হাতে দিলেন। আমি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
ঠিক পাশেই বীণা সিনেমা। হলের নীচের সিঁড়িতে একটু বসলাম। হুড় মুড় করে কতো কথা মনে পরে যাচ্ছে। নিজের মনেই হেসে বললাম, থামনা বাপু। অনেক হয়েছে। আর ভালো লাগছে না। তবু চোখের সামনে মিত্রা আমার হাত ধরে বুকে রেখেছে, বোঝার পর আমার হাত সরিয়ে নেওয়ার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মনে মনে হাসলাম। দূর, উঠে পরলাম। আমার চেনা রাজপথ। আমার কলেজ জীবন কেটেছে এই রাজপথে। অলিতে গলিতে কত স্মৃতি আঁকি বুকি কাটা হয়ে রয়েছে।
সোজা কলেজ পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শ্যামবাজার চলে এলাম। গোলবাড়ির বড়ো ঘরিতে দেখলাম সোয়া সাতটা বাজে। এতোক্ষণে বাড়িতে হুলুস্থূলুস কান্ড বেঁধে গেছে। ইসলামভাই-এর সাপ-সাপান্তর চলছে। শ্যামবাজার বাটার সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এই প্রথম আমি মনে হয় ঈশ্বরের স্মরণাপন্ন হচ্ছি।
চোখ বন্ধ করতেই ঠনঠনিয়া কালীমার মুখটা ভেসে উঠলো। মনে মনে বললাম আজ আমি যেখানে যাচ্ছি, আমাকে সেখানে জিততেই হবে। তুমি আমার সঙ্গে থেকো। মায়ের হাসি হাসি মুখটা চোখের সামনে ভেসে এলো।
যেন মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে বল পাচ্ছি। কেন এমন হচ্ছে ? এটা হওয়ার কথা নয়। এর আগে বহু সমস্যা সঙ্কুল কাজ আমি করেছি। তখন এমন মনে হয় নি।
তাহলে আজ কেন হচ্ছে ? পায়ে পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
গলি পথ পেরিয়ে সেই বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। না এখনো সেই রকম আছে। গত দশ বছরে তার কোন পরিবর্তন হয় নি। হয়তো পলেস্তরা খসিয়ে দেয়ালে নতুন পলেস্তরা পরেছে। সেই দরজা। কড়া দুটোও সেই রকম। আমি আস্তে করে কড়া নারলাম। একবার দুবার তিনবার। দরজা খুলে গেল।
বছর পাঁচেকের একটা ছেলে। এক মাথা ভর্তি চুল। কি মিষ্টি দেখতে।
তুমি কাকে খুঁজছো।
আমি ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি।
বলোনা আংকেল, তুমি কাকে খুঁজছো।
কি বলবো এই দুধের শিশুকে। আমি কিসের টানে এই বাড়িতে, এই সাত সকালে ছুটে এসেছি।
কেরে পিকু কার সঙ্গে কথা বলছিস।
ভেতর থেকে মহিলা কন্ঠ ভেসে এলো। দশবছর আগে এই গলার স্বর শুনেছি। মেলাবার চেষ্টা করলাম। সেই কিনা।
একটা আংকেল এসেছে। কথা বলছে না। বোবা।
হেসে ফেললাম।
আবার হাসছে দেখো না।
মুখ বাড়িয়ে ভেতরে তাকালাম। না কারুর দেখা নেই। আমি পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করলাম। পিকুর চোখের সামনে ধোরলাম।
আমি খাই না। দাঁতে পোকা হবে।
হাসলাম। মনে মনে বললাম কি পাকা পাকা কথা রে বাবা।
নাও না এটা খেলে পোকা হবে না। সব পোকা মরে যাবে।
মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললো, তুমি কথা বলতে পার।
হাসলাম।
মা বকবে।
বকবে না। আমি মাকে বকে দেবো।
তুমি আমার মাকে চেনো।
হুঁ।
কেরে পিকু।
দরজার সামনে এই মুহূর্তে যে এসে দাঁড়াল তাকে আমি দশ বছর আগে দেখেছি। মুখশ্রীর কোন পরিবর্তন হয় নি। সিঁথির সিঁদুর বেশ ঝকঝকে। এখুনি স্নান করে উঠে এসেছে, গায়ার রং আগের মতোই। মাজা মাজা। আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে, আমিও তাকিয়ে আছি। চোখের দৃষ্টিতে বিষ্ময়। চেনা চেনা মুখ, তবু যেন অচেনা।
আংকেল তুমি যে বললে মাকে চেন।
ইসিতা পিকুকে হাত ধরে ভেতরে টেনে নিল। মুখের রং বদলে গেল। কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
কেন এসেছিস ?
ইসিতা গলার কাঠিন্য তবু লোকাতে পারল না।
মা তুমি আংকেলকে বকছো কেন ?
থামো, পাকা পাকা কথা বলতে হবে না।
কেগো ইসিতা। ভেতর থেকে পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
ইসিতা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। কিছু বোঝার চেষ্টা করছে।
বাইরে দাঁড়িয়েই সব কথা বলবো।
আমি খুব মৃদু স্বরে ইসিতার দিকে তাকিয়ে বললাম।
পেছনে একজন বছর পঁয়ত্রিশের ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন।
স্টাউট ফিগার। একটা বাটিক প্রিন্টের লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবী পরা।
কাকে চান আপনি ?
ইসিতা মাথা নীচু করে আস্তে করে বললো, ও অনি।
অনি! তোমাদের সেই অনি।
হ্যাঁ।
আশ্চর্য, ওনাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছ কেন, ভেতরে আস্তে দাও।
পিকু আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
আসুন আসুন।
ইসিতা গেট থেকে সরে দাঁড়াল, আমি ধীর পায়ে ভেতরে এলাম। নিচের বসার ঘরটা সেরকমই আছে। সেই টেবিল। এখানে কতো স্মৃতি আঁকা হয়ে রয়েছে। এই দু’বোনের সঙ্গে কতো কথা বলেছি এই টেবিলে বসে। হুড়মুড় কর সব চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি চারিদিকে একবার তাকালাম। আট দশবছর আগেকার স্মৃতি। ফাইন্যালের রেজাল্টটা নিয়ে আমি শেষবারের মতো এই বাড়িতে পা রেখেছিলাম। সেদিন মিত্রার তথাকথিত মা আমার সঙ্গে খুব একটা ভালো ব্যবহার করেন নি। তারপর দু’একবার মিত্রার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাস খানেকের মধ্যে। তারপর আমি হারিয়ে গেলাম।
বসুন।
ইসিতা নিশ্চই আপনার সহধর্মিনী।
আমি বরুন মুখার্জী।
আমি অনি….।
আপনার গল্প বহু শুনেছি ইসির মুখ থেকে। তাছাড়া আপনি একজন রিনাউন্ড পার্সেন। আপনাকে কলকাতায় একডাকে সকলে চেনে। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন বসুন।
উনি টেবিলের অপর্জিট চেয়ারে বসলেন। আমি একটা চেয়ারে বসলাম। আগেকার দিনের কাঠের চেয়ার। অযত্নে মলিন।
বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিস। ইসিতা বললো।
গতকাল সন্ধ্যায়।
তার মানে!
হাসলাম।
এতো সকালে কোথা থেকে আসছিস!
এইতো, ঘুরতে ঘুরতে এসে পরলাম।
সেতো দেখতে পাচ্ছি।
আমি বেশ ভালো করে লক্ষ্য করছি। ভদ্রলোক আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পরিষ্কার মাপছে।
ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।
দশবছর সময়টা নেহাত কম নয়। একটু অপেক্ষা কর, বোধগম্য হবে।
ইসিতা আমার কথায় চমকে উঠলো।
যাও তুমি চা করে নিয়ে এসো। উনি….।
প্লীজ বরুনদা আমাকে আপনি করে বলবেন না। আমি ইসিতার সমবয়সী।
প্রথম প্রথম হবে না। একটু সময় লাগবে।
পিকুকে দেখতে পেলাম না।

ইসিতা বেরিয়ে গেল। এই বাড়ির নিচেরটা বসারঘর, খাবারঘর, রান্নাঘর, গেস্টরুম, ওপরে সব থাকার ঘর। বেশ মনে আছে। ওপরে আমি দুবার উঠেছি। তিনতলায় মিত্রাদের পড়ার ঘর।
আপনার লেখা আমি পড়ি।
বরুনদার দিকে তাকালাম।
সরি তোমার লেখার হাতটা দারুণ।
হাসলাম।
কাগজে চাকরি করি। যে যেভাবে বলে লিখে দিই।
তুমি চাকরি করো!
হ্যাঁ।
তাহলে যে লোকে বলে তুমি ওই কাগজের মালিক!
লোকে বলে। আমি বলি না। আমায় দেখে কি তাই মনে হয় ?
সেটা ঠিক বলেছ। তোমাকে দেখে কিন্তু সেটা মনে হচ্ছে না।
তাহলে।
আমি আমার অফিসের কাজে প্রায় তোমাদের কাগজের অফিসে যাই।
তাই! কেন ?
আমাদের কোম্পানীর কাজে।
আপনি কোথায় আছেন।
আইবিএম। তোমাদের কমপিউটার ডিভিসনটা আইবিএমকে মেনটেনান্সের দায়িত্ব দেওয়া আছে।
সফটওয়ার না হার্ডওয়ার।
সফটওয়ার।
তার মানে আপনি সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।
বরুণদা হাসলেন।
ওটা আপনাদের কাগজ।
শুনেছি, একসময় ছিলো। এখন নেই।
কে বললো।
এদের মুখ থেকেই শুনি।
একটু খানি নাড়া চাড়া করেই বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক খুব অমায়িক। রাখঢাক নেই।
ইসিতা ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকলো।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ইসিতা সকালে ঠনঠনিয়াতে গেছিলাম। প্রসাদ আছে। জ্যেঠিমনিকে দিয়ে আয়। পিকুকে দেখতে পাচ্ছি না।
ইসিতা আমার দিকে তাকিয়ে। বুদ্ধিমতী মেয়ে। বোঝার চেষ্টা করছে অনি কি ভাবে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে চাইছে। আমি ওর চোখ দেখে বুঝতে পারছি। ও কিছুতেই আমাকে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে দেবে না।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম অনি তুই যখন একবার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে পেরেছিস। তোকে জিততেই হবে। যে করেই হোক। কারুর বাধা তুই শুনবি না।
মা পূজো না করে কিছু খান না।
জানি। এটা কিন্তু পূজোরই প্রসাদ।
ইসিতা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো।
নাও চা খাও। বরুণদা বললো।
হ্যাঁ নিচ্ছি।
একটা কাপ এগিয়ে নিলাম। চায়ে চুমুক দিলাম।
প্রশ্ন করলি না এতোবছর পরে হঠাৎ কেন এতো সকালে এসে উপস্থিত হলাম।
ইসিতা আমার চোখে চোখ রেখেছে। শেয়ানে শেয়ানে কোলাকুলি।
বিয়ে করছিস তাই নেমন্তন্ন করতে এসেছিস। ইসিতা টেরা টেরা কথা বলা শুরু করলো।
বৌভাতের দিন কেউ নেমন্তন্ন করতে আসে।
তোর আজকে বৌভাত!
কেন তুই জানতিস না।
বরুণদার দিকে তাকালাম।
দাদা ইসিতার সামনে আপনি একটা সত্যি কথা বলবেন।
বলো।
আমি অনি। এই নামটা আপনি শুনেছেন। হয়তো আমার সম্বন্ধে অনেক গল্পও আপনি ইসিতার মুখ থেকে শুনে থাকবেন। ভালো খারাপ দুটোই। এটা কি আপনি শোনেন নি আমি পর্শুদিন বিয়ে করেছি, ইসিতার আর এক বোন মিত্রাকে ? আর আজ আমার বৌভাত।
বরুণদা মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল।
ও কিছু জানে না।
ইসি বরুণদার থেকেও তুই আমাকে ভাল করে চিনিস। কেন আমি এসেছি এই সাত সকালে, নতুন করে বলতে হবে ?
আমাদের সঙ্গে মিত্রার কোন সম্পর্ক নেই।
সেটা আমি জেনেছি পর্শুরাতে। কেন নেই সেটাও জেনেছি।
ইসিতা চুপ করে রয়েছে। চায়ে চুমুক দিল।
আমি মিত্রাকে বিয়ে করছি এটা জানলি কি করে ?
আমি চায়ে চুমুক দিলাম। নিস্তব্ধ ঘর। পিন পরলে শব্দ হবে। বরুণদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক পরছে না।
তোকে বলতে হবে না। আমি বলছি।
ইসিতা আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো জিঘাংসায় পরিপূর্ণ। পারলে আমাকে এখুন ছিঁড়ে খাবে যেন।
বুড়ীমাসি এসে বলেছে।
বুড়ীমাসি এ বাড়িতে আসে না। ইসিতা চেঁচিয়ে উঠলো।
বরুণদা মুখ নামিয়ে নিল।
আমি কিন্তু এ বাড়িতে এসেছি তোদের নিয়ে যেতে।
কোনদিন হবে না।
আমি এই কাজ করবোই।
আমার গলার স্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো।
তুই কি বলতে চাস।
আমি এই পরিবারের আত্মীয়। বরুণদার মতো আমিও এই বাড়ির জামাই। সেই দৃষ্টিকোন থেকে আমার কিছু ডিমান্ড আছে। আমি আমার সেই ডিমান্ড জানাতে এসেছি।
জানাতে এসেছিস জানালি, এবার চলে যা।
আমি চলে যেতে আসি নি ইসি।
ইসির চোখে প্রতিহিংসা।
কাল সারাটা রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ছটফট করেছি। জ্যেঠিমনির সঙ্গে আমাকে দেখা করতেই হবে।
করুণা দেখাতে এসেছিস। বেরো এখান থেকে।
ইসিতা দপ করে জ্বলে উঠলো।
বরুণদা উঠে দাঁড়াল।
এ কি বলছো ইসি। অনি আমাদের….।
রাখো। আজ আট বছর কোথায় ছিল অনি। কে খোঁজ খবর নিয়েছে, আমরা কেমন আছি।
ইসিতা রাগে কাঁপছে।
তুই এখুনি আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি। ইসিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
আমি যাব না ইসি। তুই আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দিলেও আমি যাব না। আজ থেকে দশবছর আগে আমি যেটা মুখ বুঁজে মেনে নিয়েছি। আজ আমি কিছুতেই সেটা মানব না।
তুই মানিস কি না মানিস তোর ব্যাপার, তুই এখন বেরিয়ে যা।
ইসিতা উঠে দাঁড়াল। ছুটে এসে আমার হাত ধরলো।
এই ইসি, এ তুমি কি করছো! তুমি অনির হাত ছাড়ো।
ও এখুনি বেরিয়ে যাবে, আর একমুহূর্ত এই বাড়িতে ওর থাকা হবে না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি ওপরে চলো। অনি তুমি একটু বসো।
বরুণদা ইসিতাকে ধরে ওপরে নিয়ে চলে গেল।
আমি বসে রইলাম। একা।
কতোক্ষণ বসে আছি জানি না। নানা কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইসিতা যে ব্যবহারটা আমার সঙ্গে করলো, আমি তাতে একটুও দুঃখ পাই নি। কেননা আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, আমি যদি ওর জায়গায় থাকতাম তাহলে এর থেকেও খারাপ ব্যবহার করতাম।
মিত্রার বাবা ইসিতাদের ফাঁকি দিয়েছে। তার লক্ষ্য চরিতার্থতার জন্য। অতএব বাবার কৃতকর্মের ফল মিত্রাকে ভোগ করতে হতেই পারে।
যতো সময় যাচ্ছে আমার মধ্যে তত জেদ চেপে বসছে। আমাকে যে ভাবেই হোক জ্যেঠিমনিকে নিয়ে যেতে হবে। আমি এই কাজ করবই। এইটুকু কথা বলে যেটুকু বুঝলাম ইসি সব জানে না যা মিত্রা জানে। বরুণদাও জানে না। পারিবারিক এমন কিছু ব্যাপার থাকে যা জামাইদের জানান যায় না। এমনকি তাদের পরিবারের কেউ জানতেও পারে না।
সময়ে সেটা আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতে দাউ দাউ করে জলে ওঠে তারপর একসময় সেই আগুন ছাই চাপা পরে যায়। কালের নিয়মে তা মাটিতে পরিণত হয়।
মিত্রা আমাকে যা জানিয়েছে, তা ইসি জানে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মিত্রা তার বাবার দিনলিপি পরে সব জেনেছে। ইসি তা কোনদিন হাতে পায় নি। এমনকি জ্যেঠিমনি পর্যন্ত মিত্রার বাবার দিনলিপির হদিস জানতেন না। ওদের অনেক কিছুই অজানা। আমার হাতে প্রচুর অস্ত্র। যে কোন অস্ত্রের বিনিময়ে আমাকে জিততেই হবে।
অনি।
বরুণদার ডাকে মুখ তুলে তাকালাম।
দরজার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে তাঁকে আমি আজ থেকে দশ বছর আগে দেখেছি। সেই পাকা গমের মতো গায়ের রং এখনো অটুট। সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টিকলো নাক। মাথার চুলে এখোনো সেইভাবে পাক ধরে নি। দু’একটা রূপালি তার এদিক সেদিক উঁকি ঝুঁকি মারছে।
সাদা ধবধবে কালো পাড় শাড়ি পরা। গালদুটো সামান্য ভেঙেছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।
থাক বাবা থাক।
আমায় চিনতে পেরেছ জ্যেঠিমনি ?
ইসি না বললে পারতাম না। বয়স হয়েছে, চোখের জ্যোতি কেমেছে।
তুমি কেমন আছ।
ভালো।
আমি মিত্রাকে বিয়ে করেছি।
ইসি বললো।
আমি জ্যেঠিমনির চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। বুঝতে পারলাম জ্যেঠিমনি সত্যি বলছে না। উত্তেজনা হীন চোখ। পোর খাওয়া মানুষ। আমি হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এলাম। চেয়ারটা এগিয়ে দিলাম। জ্যেঠিমনি বসলো।
তোমরা কথা বলো। আমি একটু চা নিয়ে আসি।
বুঝলাম বরুণদা আমাকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে গেলেন।
তোমার জন্য পূজোর প্রসাদ নিয়ে এসেছি, খাবে ?
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকাল। অনেক না বলা কথা এই চোখে।
রাখো, পরে খাচ্ছি।
বরুণদা বেরিয়ে গেল।
পিকু কোথায়। ?
ওর কথা আর বোলো না। ওপরে দুষ্টুমি করছে।
আমার আজ বৌভাত, তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকাল। এ চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।
আমি কোথাও বেরোই না বাবা।
আজ বেরবে, শুধু মাত্র আমার জন্য বেরবে। মাত্র দশমিনিটের জন্য আমার সঙ্গে যাবে। আমি তোমায় আবার পৌঁছে দিয়ে যাব।
না বাবা থাক, আর একদিন যাব।
ইসিতা বরুণদা ঘরে ঢুকলো। মিষ্টিরপ্লেট এবং চা হাতে। ইশিতা মুখ নীচু করে আছে। বুঝলাম ওপরে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করেছে। মুহূর্তের উত্তেজনা। তার রেশ ওর চোখের পাতায়।
আমি তাকালাম না।
আমি কিছু খাব না ইসি, খালি চা খাব।
কেন বাবা, তুমি আজ প্রথম আমাদের বাড়িতে এলে।
আজ প্রথম নয় জ্যেঠিমনি, এর আগেও বহুবার এসেছি। তোমার হাতের তৈরি বাটি চচ্চড়ি লুচি খেয়ে গেছি।
সেতো বহুকাল আগে।
আজ আমি এবাড়িতে নতুন নয়।
তুমি নতুন জামাই বলে কথা।
এটা তুমি স্বীকার করে নিচ্ছ না জ্যেঠিমনি। ইসিও মানতে চাইছে না।

জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
যদি তাই হতো আমার সঙ্গে একবার যেতে।
না বাবা তা হয় না।
কেন হয় না জ্যেঠিমনি, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না….।
সে তুই জানিস না। তোকে তো বলেছি আমাদের সঙ্গে ওর কোন সম্পর্ক নেই। ইসিতা খুব নীচু স্বরে বললো।
আমি ইসিতার দিকে তাকালাম। চেয়ার থেকে উঠে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলাম। ওর চোখে চোখ রাখলাম।
আমার ওপর তুই রাগ করতে পারিস, অভিমান করতে পারিস। আমি হয়তো তোকে অনেক ছোটবড়ো কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু তুই তোর বনের ওপর রাগ করতে পারিস না।
কে বলেছে ও আমার বোন। একটা নোংরা মেয়ে। বাজারের….। ইসি দপ করে জ্বলে উঠলো।
আমি ততধিক নরম, খুব আস্তে ধীরে বললাম।
ঠিক বলেছিস। এটা ওর প্রাপ্য।
ইসি।
জ্যেঠিমনির গলার কঠিন স্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো।
তোমার মুখ থেকে ওর সম্বন্ধে আর কোন কথা যেন না শুনি।
মা! তুমিই তো….।
জ্যেঠিমনির স্থির চোখে শাসনের ছোঁয়া।
ইসি চুপ করে গেল।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
নাও বাবা খাও। সকাল থেকে কিছু খাওনি।
জ্যেঠিমনির গলা থেকে স্নেহ ঝরে পরছে।
না জ্যেঠিমনি, আমি চা ছাড়া কিছু খাব না।
কেন।
খেতে আমি পারি জ্যেঠিমনি একটা সর্তে।
জ্যেঠিমনি আমার চোখের দিকে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করলো আমি কি বলতে চাই।
আমাকে তোমার ঘরে একবার নিয়ে যেতে হবে।
সে যাবে খোন। এটা আবার বলতে হয় নাকি।
তাহলে চলো। তোমার ঘরে যাই। তারপর নিচে নেমে এসে নতুন জামাই হিসেবে মিষ্টি মুখ করে আমি বেরিয়ে যাব। অনি তোমাদের কাছে আর কোনদিন আসবে না।
ঠিক আছে তুমি চাটা খাও।
এখন খাব না। ওই যে বললাম তোমায়।
ইসিতা আমার দিকে তাকিয়ে।
ইসি আমি যদি জ্যেঠিমনিকে নিয়ে কিছুক্ষণ ওপরে সময় কাটাই তোদের আপত্তি আছে।
এমা ওদের আপত্তি থাকবে কেন। তুমিতো আমার ঘরে যাবে।
হয়তো থাকতে পারে। যদি থাকে তাহলে যাব না। আমি এখান থেকেই চলে যাব।
পাগল ছেলের কান্ড দেখ। ঠিক আছে তুমি চলো আমার সঙ্গে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বরুণদা ইসি নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়ে। আমি জ্যেঠিমনির পেছন পেছন ওপরে উঠে এলাম। ইসি আমার দিকে একবার ড্যাব ড্যাব করে তাকাল। বুঝতে পারছি, ওর চোখের আগুন আমাকে পুরিয়ে মারবে।
দশ বছর আগের স্মৃতিটাকে একবার ঝালিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। জ্যেঠিমনির ঘরে তিনটে ছবি আছে একটা মিত্রা আর ইসির বছর দশেক বয়সের একটা ছবি। আর একটা ইসির বাবার আর একটা মিত্রার বাবার।
এই তিনটে ছবি ছাড়া দু’একটা ক্যালেন্ডার, আর ঠাকুর দেবতার ছবি।
এছাড়া আছে একটা পুরনো দিনের খাট দুটো কাঠের আলমাড়ি।
আমি পায়ে পায়ে জ্যেঠিমনির ঘরে এসে ঢুকলাম। অবাক হয়ে গেলাম। দশ বছর আগে যেখানে যে ভাবে দেখেগেছি ঠিক সেই ভাবেই আছে। সব কিছুই মলিন। ঝকঝকে তকতকে নয়। সেই ইজিচেয়ার। আমার ঘরে যেরকম একটা আছে। আমি চারিদিক একবার ভাল করে লক্ষ্য করলাম। আমার মুখ থেকে কোন কথা সড়ছে না।
আমি মিত্রা আর ইসির ছবিটার কাছে এলাম। ফ্রক পরে দু’বোন ছাদে দাঁড়িয়ে। দু’জনেরই মুখ অনেক ভেঙেচুড়ে গেছে। কিন্তু আদলটা এখনো সেই রকম। শুনেছি ইসির থেকে মিত্রার বয়সের ডিফারেন্স বেশি নয়। পিঠো পিঠি।
বোসো।
ফটোর সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম। কোথা থেকে শুরু করবো। মনে মনে ঠিক করার চেষ্টা করলাম। মনকে বোঝালাম অনি তোর এটা শেষ সুযোগ। তুই এখন একা জ্যেঠিমনির সামনে। তোকে বোঝাতেই হবে কেন তুই এখানে ছুটে এসেছিস, কেন তুই আজই জ্যেঠিমনিকে নিয়ে যেতে চাস।
তোকে জ্যেঠিমনির দুর্বল জায়গাটায় দারুণ ভাবে আঘাত করতে হবে। অনেক দিনের জমান আক্রোশ তোকে একধাক্কায় টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিতে হবে। তবেই তুই জিতবি। এবার তোর খেলা। তুই এই খালায় দারুণ পটু।
জ্যেঠিমনি।
জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি আবার ছবিটার দিকে ঘুরলাম।
আচ্ছা। এই ছবিদুটো (মিত্রার বাবার ছবিটারও উল্লেখ করলাম) তুমি আজও টাঙিয়ে রেখেছ কেন।
আছে, থাক। জ্যেঠিমনি খুব আস্তে কথা বললো।
কেন থাকবে ? এদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক নেই যেখানে।
কে নামাবে বলো। লোকের অভাব।
আমি নামিয়ে দিই।
না। ওরা ছবিতেই থাকুক।
আমি দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। দরজাটা সামান্য ভেজিয়ে দিলাম। ফিরে এসে জ্যেঠিমনি সামনে দাঁড়ালাম। জ্যেঠিমনি আমাকে দেখছে। বুঝতে পারছি ভেতরে ভেতরে অসীম যুদ্ধ চলছে। আমি আবার মিত্রা আর ইসির ফটোটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
জ্যেঠিমনি আবার সেই অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না। দুই বোন একসঙ্গে তোমার কাছে আসবে, থাকবে, খুনসুটি করবে। তুমি তাদের সন্তানদের সঙ্গে খেলা করবে গল্প করবে, যেমন তুমি পিকুর সঙ্গে করো।
সে হয় না অনি।
কেন হয় না জ্যেঠিমনি। একটা ভুলকে গেড়ো দিয়ে রেখে লাভ কি।
ভুল সেটা ভুল, তাকে শোধরান যায় না।
কেন যায় না জ্যেঠিমনি, আমি শুনেছি মেনেনেওয়া মানিয়ে নেওয়া মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম। আমি যদি সব জানার পর মেনে নিতে পারি, তোমাদের আপত্তি কোথায় ?
তুমি কি জান।
মনে মনে বললাম এই সুযোগ অনি, তুই হাত ছাড়া করিস না। তোর কথার ফাঁদে জ্যেঠিমনি পা দিয়ে ফেলেছে। এই সুবর্ণ সুযোগ তুই আর পাবি না।
নিজেকে উজার করে দে। তুই জিতে যাবি।
আমি ওই ফটোর দিকে মুখ করেই ধীরে ধীরে শুরু করলাম। একে একে সমস্ত কথা বলতে শুরু করলাম। কখনো গলা ভাড়ি হয়ে আসছে কখনো ধরে যাচ্ছে। কখনো গলা বুঁজে আসছে। আমি থামি নি। থামলাম না। কতোক্ষণ বলেগেছি জানি না। নিজের কথা বলেছি। অফিসের কথা বলেছি। মিত্রার কথা বলেছি। মিত্রা কোথা থেকে কোথায় তলিয়ে গেছিল তা বলেছি। সেখান থেকে কিভাবে তাকে উদ্ধার করে এনেছি তা বলেছি। বুঝতে পেরেছি কথা বলতে বলতে কখনো আমি ভীষণ ইমোশনাল হয়ে পরেছি।
শেষে পর্শুরাতে মিত্রার বলা সমস্ত কথা আমি উগড়ে দিলাম।
একটু থামলাম।
এরপরও কি তুমি বলবে জ্যেঠিমনি যে মেয়েটা তার সবচেয়ে আনন্দের দিনে তার গর্ভধারিণী মাকে একটিবার দেখতে চায়, সে খুব অপরাধ করছে। তার তো কনো অপরাধ নেই। কেন সে অন্যের অপরাধ নিজের ঘারে সারাজীবন বয়ে বেরাবে ?
তাই যদি হয়, কেন তুমি ন’মাস দশদিন তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলে ?
কিসের লোভ, কিসের লালসা ? কি জন্য নিজেকে আত্মবলিদান দিয়েছিলে ? কেন তুমি তার জন্মের পর তাকে মেরে দাও নি ? কেন তুমি সেই নবজাতক শিশুর কচি ঠোঁটে তোমার স্তন গুঁজে দিয়েছিলে ? কেন তুমি তাকে কলে পিঠে করে মানুষ করেছিলে ? কি তার অপরাধ ?
আবার একটু থামলাম।
আমি জানি জ্যেঠিমনি আমার এত প্রশ্নের উত্তর তুমি দিতে পারবে না। গলাটা বুজে এলো।
আমি মিত্রার অনুরোধে তোমার কাছে আসে নি। মিত্রা জানেও না আমি এখন তোমার কাছে তোমার ঘরে। আমি এসেছি নিজের মনের তাগিদে। এক মাতৃহারা স্ত্রীকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেব। ও জানে না আমি কোথায় এসেছি। কখন এসেছি। ওর মুখ থেকে সব কথা শোনার পর। মনটা ভীষণ ছটফট করছিল তোমার সঙ্গে দাখা করার জন্য।
সুযোগ খুঁজছিলাম।
কিছুতেই বাড়ির বাইরে আসতে পারছিলাম না। ছোটমার কথায় সুযোগ পেয়েগেলাম। ছোটমা বললো আজ কালরাত্রি আমাদের দু’জনকে এক ভিটেতে থাকতে নেই। সেই যা বেরিয়ে এসেছি।
জ্যেঠিমনি আমি তোমার কাছে আসিনি, আমি এসেছি মিত্রার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে, আমার মাকে আমি ছবিতে দেখেছি। জ্ঞানতঃ তার কথা মনে পরে না। যাক, সব যখন জেনেই ফেললাম তাই মেয়ের কাছে মাকে নিয়ে যেতে এসেছিলাম।
মনে হয় এতো সৌভাগ্য মিত্রার কপালে নেই। তোমায় আজকে যা বলে ফেললাম, কথা দিচ্ছি এ কথা কেউ কনোদিন জানতে পারবেনা। অনি যে এ বাড়িতে এসেছিল তাও কেউ জানতে পারবে না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পার।
কতক্ষণ দুই বনের ফটোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলাম জানি না।
ফটোর দিক থেকে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। চোখে হয়তো জল এসে গেছিল।
মানুষ এই জায়গাটায় ভীষণ দুর্বল। আবঝা দেখতে পেলাম গেটের কাছে ইসি আর বরুণদা। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ওরা কখন এসেছে! আমি দরজা ভেজিয়ে দিয়েছিলাম ? জ্যেঠিমনি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে। চোখ ছল ছলে।
হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে হন্তদন্ত হয়ে আমি গেটের কাছে এগিয়ে গেলাম।
তুই যাবি না। তুই এবাড়ি থেকে এভাবে যেতে পারিস না।
ইসির কথায় মাথা নত করলাম।
না ইসি। আমাকে যেতে হবে।
ওরা আমার জন্য ভীষণ চিনতা করছে। আমি যদি কোন অপরাধ করে থাকি। তার জন্য আমাকে শাস্তি দিস। আমি মাথা পেতে নেব।
পিকু আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। পকেট থেকে একটা ক্যান্ডি বার করে ওর হাতে দিলাম।
নাও, এটা খেলে দাঁতে পোকা হবে না।
পিকু আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বরুণদা কেমনভাবে যেন আমাকে দেখছে।
ওরা কিছুতেই গেট ছেড়ে সরে দাঁড়াচ্ছে না।
ইসি আমায় ছাড়, আমি যাই।
ইসি আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। চোখে জল টল টল করছে।
বড়কি আমি অনির সঙ্গে ছুটকির কাছে যাব। তোরা যাবি ?
জ্যেঠিমনির গম্ভীর কণ্ঠস্বরে ঘরটা গম গম করে উঠলো। বরুণদা চমকে তাকাল আমার দিকে।
আমার কাঁধটা ধরে বার কয়েক ঝাঁকিয়ে দিল।
ইসি ছুটে গিয়ে জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো।
আংকেল তুমি আমার মাকে বকলে কেন।
পিকুর কথায় বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। ওর বয়সে আমি আমার মা বাবাকে দেখি নি। একদিন ও বড়ো হবে। যদি এই স্মৃতিটুকু ওর মনে থেকে যায় সেদিন ও নিজের বোধ বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করবে, ওর আংকেল কতটা সত্যের দাসত্ব করে।
আমি পিকুকে কোলে তুলে নিলাম। সিঁড়িদিয়ে নিচে নেমে এলাম।
বাইরের গেটে তালা দিতে দিতে ইসি বললো, কিরে তোর গাড়ি কোথায় রেখেছিস।
হাসলাম।
হাসছিস যে।
আমার গাড়ি নেই। আমি বাসে চড়ি। প্রয়োজনে অটোতে ট্যাক্সিতে।
তারমানে! কাগজের মালিক হয়েছিস, গাড়ি নেই। লোকে শুনলে কি বলবে।
আমি মালিক নই। মন থেকে আমি এখনো কর্মচারী। তোর বোন জোর করে আমার গলায় মালিকের মাদুলি ঝুলিয়ে দিয়েছে।
তোমায় একদিন অফিস থেকে এসে এই কথাটা বলেছিলাম ইসি, তোমার খেয়াল আছে। তুমি তখন বলেছিলে, ছাড়ো, বড়ো লোকেদের বড়ো বড়ো খেয়াল। আজ প্রমাণ পেলে।
সত্যি তোর গাড়ি নেই!
চলনা, এই টুকুতো, গলির মুখ থেকে ট্যাক্সি পেয়ে যাব।

আমার একহাতে পিকু আর একহাত জ্যেঠিমনির একটা হাত। ওরা দুজনে সামনে। পিকু তরতর করে কথা বলে চলেছে। ওর অনেক প্রশ্ন। তার অর্ধক উত্তর আমার জানা অর্ধেক জানা নেই। ওর মহা আনন্দ, আংকেলের সঙ্গে মাসির বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছে।
ইসিকে বললাম, কটা বাজে।
ইসি ঘড়ি দেখে বললো, দেড়টা বাজে।
মনে মনে বললাম সাড়ে ছ’ঘন্টা ধরে যুদ্ধ করে অনি তুই জিতলি এটা মনে রাখিস।
তোর মাবাইল নেই ? ইসি জিজ্ঞাসা করলো।
আছে, পকেটে স্যুইচ অফ অবস্থায়।
খোল।
অসুবিধে আছে।
কিসের ?
তুই বুঝবি না।
ইসি চুপ করে গেল।
গলির মুখে এসে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। বললাম ট্র্যাংগুলার পার্ক। এককথায় রাজি হয়ে গেল। আমি সামনে পিকুকে নিয়ে বসলাম। পেছনে ওরা তিনজন। আসার সময় পিকুকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে এলাম সব কিছু। ওরা তিনজনে পেছনে বসে আমার কথা শোনে আর হাসে।
মাঝে মাঝে ইসি বললো, তুইতো পিকুর সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্প করছিস। আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যায় ওর সঙ্গে বক বক করতে।
দু’জনেই ক্যান্ডি মুখে দিয়েছি। চিবচ্ছি।
বাড়ির গেটে যখন গাড়ি এসে দাঁড়াল, তখন আড়াইটে বাজে। আমি ট্যাক্সির গেট খুলে প্রথমে নামলাম। দেখলাম আজ বাড়ির গেট খোলা। ভতরে অনেক লোকজন। চিকনা প্রথম আমাকে দেখতে পেয়েছে। ছুটে গেটের বাইরে চলে এলো।
তারপর আমার সঙ্গে অপরিচিত লোক দেখে থমকে দাঁড়াল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ও হাসলো। কোন কথা বললো না। ট্যাক্সিভাড়া মেটালাম। জ্যাঠিমনিকে হাত ধরে আস্তে আস্তে নামালাম। গেটের মুখে আসতেই ছগনলাল বললো, ছোটাবাবু বহুত গজব হো গায়া।
কেন ছগনলাল।
তুমি সকাল থেকে নেই আছো।
হাসলাম।
দেখলাম মিত্রা তীরবেগে বারান্দা থেকে বাগানের পথে ছুটে আসছে। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য।
আমার একহাতে পিকু অন্য হাতে জ্যেঠিমনি। কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। হাঁপিয়ে গেছে। ওর বুক ওঠা নামা করছে। চোখদুটো কেমন যেন হয়ে গেল। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ওর চোখে মুখে ফুটে উঠলো। না পাওয়ার বেদনার মধ্যে আনন্দ।
চিকনা ছুটে ভেতরে চলে গেল। একটা হৈ হৈ শব্দ ভেতর থেকে ভেসে এলো। বুঝলাম আমার আসার আগমন বর্তা পৌঁছল। মিত্রা জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ইসিতা মিত্রাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি স্থানুর মতে দাঁড়িয়ে।
বরুণদা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি সকলে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে।
কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। বরুণদা অপ্রস্তুত।
বেশ কিছুক্ষণ পর জ্যাঠিমনি কথা বললো। চোখের দু’কোল বেয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পরছে।
কাঁদিস না। আমি এসেছি। অনি আমার সব রাগ, যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়েছে।
মিত্রা জ্যেঠিমনির বুকে মুখ ঘসছে।
সেই তুমি এলে, এতো দেরি করে এলে কেন।
কোথায় দেরি করলাম। দেখ আমি ঠিক সময়ে এসে পরেছি। আজ আনন্দের দিন, তুই কাঁদিস না। ওই ছেলেটার দিকে একবার তাকা। জানিস না ও সকাল থেকে কতো লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করেছে।
আংকেল চলো নেমন্তন্ন খাই।
মিত্রা জ্যেঠিমনির বুক থেকে মুখ তুললো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। এ হাসি কোটি টাকা দিলেও পাওয়া যায় না। মিত্রা পিকুর গাল টিপে দিল।
কোথায় নেমন্তন্ন খেতে যাবে।
মাসির বিয়ে। গাল থেকে মিত্রার হাতটা সরিয়ে দিল।
সবাই ঘিরে ধরেছে। আমার দিকে কেমন ভাবে যেন তাকাচ্ছে। বড়মা এগিয়ে এলো। চোখা চুখি হলো জ্যেঠিমনির সঙ্গে। বুঝতে পারলাম দু’জনে দু’জনকে কোথায় যেন দেখছে চিনি চিনি করেও চিনতে পারছে না। বত্রিশ বছর আগের একরাতে কয়েক ঝলকের দেখা। স্মৃতি ফিকে হয়ে গেছে। তবু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
জ্যেঠিমনি, বড়মা। বড়মা ইনি মিত্রার জ্যেঠিমনি।
দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরলো।
ভাবগম্ভীর পরিবেশ।
আমি সবার সঙ্গে একে একে আলাপ করিয়ে দিলাম। দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা কাউকে দেখতে পেলাম না। ছোটমা সন্দেহের চোখে আমাকে দেখছে। অনি মিত্রার জ্যেঠিমনিকে কোথা থেকে ধরে আনল। এর গল্প আগে কখনো শুনি নি। ছোটমার চোখ তাই বলছে। আমি এমন ভাবে হাসলাম, যেন কেমন দিলাম এক্সক্লুসিভ নিউজ।
ছোটমা হেসে চেখের ইশারায়, আমার গালে থাপ্পর মারল।
ভেতরে এলাম। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বারান্দায় আমার ঘরের সামনে আমার বন্ধুরা। সবাই আমাকে মাপছে। ভেতরে এসে দেখলাম দাদারা বসে। কাকা, উনা মাস্টারও আছে।
আমি সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম জ্যেঠিমনি ইসিতা আর বরুণদার সঙ্গে। ওরা প্রথমে একটু অবাক হলো। চোখ দেখে বুঝতে পারলাম। পিকু বলে উঠলো।
আংকেল আমরা কোথায় নেমন্তন্ন খেতে বসবো। মাসিকে দেখাও।
ঘর ভর্তি সবাই হেসে উঠলো। ইসিতা আমার হাত থেকে পিকুকে নিয়ে মিত্রার কোলে তুলে দিল।
এইযে তোর মাসি। নে হয়েছে।
সবাই পিকুর গাল টেপে। ও হাত সড়িয়ে দেয়। বক বক করছে।
তাহলে এডিটর, কথাটা তাহলে সত্যি।
কি।
যার বিয়ে তার হুঁস নেই, পারাপড়শির ঘুম নেই।
ডাক্তারদাদার কথায় জ্যেঠিমনি পর্যন্ত হেসে ফেললো। আস্তে করে বললো।
ওর দোষ নেই। ও সকাল থেকে অনেক যুদ্ধ করছে।
কি অনিবাবু মনে হচ্ছে যুদ্ধটা তাৎক্ষণিক সময়ের মধ্যে মাথায় এসেছিল।
দেখলে তো তোমার মাথাও তোমায় কেমন বিট্রে করলো।
তোমরাই বা কেমন বাপু এক কথায় চলে এলেই হতো। তাহলে ওকে যুদ্ধ করতে হতো না। বড়মা বললো।
আমি পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আমে দুধে মিশে গেছে, আমি আঁটি এবার গড়াগড়ি খাব। চিকনা আমার পেছন পেছন। বাসু অনাদিকে দেখলাম শিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে মুচকি হাসল। আমি ওপরে উঠে এলাম। দেখলাম কনিষ্ক বটা নীরু।
কিরে আর সব কোথায় ?
তোর বিয়ে বলে কি হাসপাতাল বন্ধ থাকবে।
হাসলাম।
ঘরে এলাম।
মনে হচ্ছে একটা এক্সক্লুসিভ মারলি। কনিষ্ক বললো।
হাসলাম।
একটা সিগারেট দে।
চিকনা তোমার গুরুকে একটা সিগারেট দাও।
চিকনা হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো।
খুব জমিয়ে নিয়েছিস বলে মনে হচ্ছে।
বুঝলি অনি, চিকনা হচ্ছে ফ্রেস অক্সিজেন। নিলে হার্টের জোড় বারে।
কিরে চিকনা কনিষ্ক কি বলে।
কনিষ্কদা বাড়িয়ে বলছে।
চিকনা সিগারেট বার করে সবাইকে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
হাসলি যে।
তোর কাউন্টার আমার।
সঞ্জু কোথায় রে।
নিচে। ইসলামদার সঙ্গে কাজ করছে।
তুই।
আমি হাওয়া খাচ্ছি।
মিনতিকে দেখতে পেলাম না।
এতো ভিড়ে দেখবি কি করে।
সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
কাছে এলে তো।
কনিষ্ক।
বল।
কাকাকে দেখলি।
দেখলাম। তার থেকেও বড়ো সরেষ জিনিষ তোর উনা মাস্টার।
হেসে ফেললাম।
চিকনা একটু চা হবে।
দাঁড়া, বলে চিকনা হন হন করে হেঁটে চলে গেল।
তোদের খাওয়া হয়েছে।
তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
কিরে নীরু।
দাঁড়া তোকে একবার ভালকরে দেখি।
কেন।
গেট পেরিয়ে বাগানের লনে, দেখেই ম্যাডামের হান্ড্রেড মিটার স্প্রিন্ট। একেবারে প্রথম স্থান।
অলিম্পিকে সোনা জিতেছে। তারপরেই ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া। তুই….।
বটা ঝেড়ে একটা লাথি কষালো নীরুর পেছন দিকে।
তুই মারলি কেন।
তোর কমেন্ট্রি শুনে।
সবাই হাসছে।
অনি ব্যাপারটা তোলা রইলো মনে রাখিস।
অনাদির দিকে তাকালাম।
কখন এলি।
আটটা।
বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছিস।
সাড়ে চারটে।
ওখানে কাকে রেখে এলি।
তোর এতো চিন্তা কিসের। কনিষ্ক খেঁকিয়ে উঠলো।
তুই গিয়ে পাহাড়া দিবি। বটা বললো।
অনাদি হাসছে।
বলুনতো ওকে।
মিলি গেটের মুখে এসে দাঁড়াল। আমাকে দেখে ফিক করে হেসে বললো। তোমার সঙ্গে পরে একচোট ঝগড়া হবে। কনিষ্কদা, ছোটমা সবাইকে নিচে খেতে ডাকছে।
কনিষ্ক আমর দিকে তাকাল।
সকাল থেকে কিছু পেটে পরেছে।
না।
খালি পেটে লড়ে গেলি।
হ্যাঁ।
এসেই দেখলাম তুই নেই। বড়মার মুখ হাঁড়ি।
কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে চাঙ্গা করলাম। ছোটমার মুখ থেকে সব শুনলাম। বুঝলাম নিশ্চই কারুর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গেছিস। জিজ্ঞাসা করিস বড়মাকে, আমি এই কথা বলেছি কিনা।
ঠিক বলেছিস কনিষ্ক, এই বোঝাপড়াটা আমার জীবনের একটা মাইলস্টোন।
জানি, আবহাওয়া তাই বলছিল। ম্যাডামের এ্যাকসন, রি-এ্যাকসনে তার প্রতিফলন ঘটলো।
আর কথা নয় এবার চলো। মিলি বললো।
ওরা নিচে চলে গেল।
বাসু বললো, তুই আবার কোথাও বেরবি নাতো।
হেসে ফেললাম।
ওরা চলে গেল। আমি টেবিলের কাছে গেলাম। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম। স্যুইচ অফ। নিজে থেকেই জিভ বার করলাম। মোবাইলটা অন করলাম। দেখলাম পঞ্চাশটা মিস কল। আর দেখার ইচ্ছে হলো না। সবাই একবার করে টিপেছে। মনে হচ্ছে কেউ বাদ যায় নি। মনটা হাল্কা, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন এখনো পাথর চাপা।

আর একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। টেবিলের ওপর পরে থাকা প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আমগাছে ছোট ছোট আম ধরেছে। এখন আর আমের বোল একটাও চোখে পড়ছে না। গাছের ডালে আলো লাগানো হয়েছে। ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালাম। সারা বাগানে ছোট ছোট ছাতা লাগান হয়েছে। এক একটা ছাতার তলায় দুটো করে চেয়ার। মনে হয় ইসলামভাই বুফে সিস্টেমে খাওয়াবে।
এইনে, ধর।
পেছন ফিরে তাকালাম।
চিকনা চায়ের কাপ হাতে।
নিজে বানালাম।
খেয়ে গালাগালি করবি না। সিগারেটটা দে। দু’টান মেরে নিবিয়ে দিই, পরে খাবো।
কেন।
সবাই ছোটমার ঘরে ঢুকেছে, এবার তোর ঘরে আসবে, আমি কেটে পরি।
হাসলাম।
চিকনা এই কদিনে কতো বোঝদার হয়ে গেছে। ভাবতেই ভালো লাগছে।
জানলার সামনে দাঁড়িয়েই চা খাচ্ছিলাম। আবার ভাব সাগরে ডুবে গেলাম।
মানুষের জীবন নদীর মতো, কোথা দিয়ে যে বইবে কেউ জানে না। উপন্যাসে বহু চরিত্র পড়েছি। আমার জীবনটাই যেন একটা উপন্যাস হয়ে যাচ্ছে। যতো ভেতরে ঢোক তত রস।
কিরে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোথায় ডুব মারলি। ছোটমার গলা।
ও বুঝি মাঝে মাঝেই এরকম ডুব মারে। জ্যেঠিমনি বললো।
ফিরে তাকালাম।
গেটের মুখে সবাই। বড়মা, ছোটমা, জ্যেঠিমনি, বৌদি, মিত্রা, ইসিতা।
দিদি এইটা ছোটবাবুর ঘর। আগে মাসের পর মাস বন্ধ থাকত, মিত্রা আসার পর থেকে মাসের মধ্যে কুড়িদন বন্ধ থাকে বাকি দশদিন খোলা হয়।
আমি তাকালাম। ছোটমার মুখে বাঁকা হাসি। মিত্রার দিকে তাকালাম। ওর ডাগর নবীন চোখে বিশ্বজয় করার হাসি।
আমার দিকে তাকিয়ে মুখ নীচু করলো।
ভাবতেই পারে নি ওর বুবুন এইরকম একটা কান্ড করতে পারে।
কিরে সকলকে প্রসাদ দিয়েছিস। জ্যেঠিমনি কিন্তু আমার হাত থেকে নেয়নি।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি জ্যেঠিমনির থেকে একহাত লম্বা।
তুই আমার সব বাঁধ ভেঙে দিলি আজকে।
কই পারলাম, চেষ্টা করলাম মাত্র। সফল হই আগে।
এখনো তোর সন্দেহ আছে।
সন্দেহ না, এখনো অনেক কাজ বাকি আছে।
সে তুই তোর মতো করিস।
এইবার ঠিক কথা বলেছো।
কেন।
এতোক্ষণ তুমি আমাকে সম্মান দিচ্ছিলে, তুমি সম্বোধন করছিলে। যতই হোক আমি মিত্রা নই। সম্মান পেতেই পারি। চ্যাটুজ্জে বাড়ির ছোট জামাই বলে কথা।
দেবো কান মূলে, আবার বড়ো বড়ো কথা। ছোটমা বললো।
ইসিতা ফিক করে হেসে ফেললো।
ও ছোট আজ থাক, ওর বৌভাত। সখ করে বিয়ে করলো। বৌদি বললো।
বড়মা হেসেও হাসে না।
হ্যাঁরে তোর আবার ধর্মে মতি গতি কবে থেকে হলো।
কেন।
তুই নাকি ঠনঠনেতে গেছলি।
হ্যাঁ।
কেন।
মানত করেছিলাম।
কিসের!
মিত্রাকে বিয়ে করলে পূজো দেব।
ও হরি দেখেছো ছেলের কান্ড।
ছোটমার কথায় সবাই হাসে।
তুই কবে মানত করেছিলি শুনি।
সে তুমি বুঝবে না।
বোঝার আর কি বাকি রেখেছিস শুনি।
ছোটমার কটকটে কথায় ইসিতা হেসে গড়িয়ে পরে।
জ্যেঠিমনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
তুইকি আজ সারাদিন এই জামাকাপর পড়ে কাটাবি ঠিক করেছিস। বৌদি বললো।
চসসোর কোথাকার। ছোটমা বললো।
আমি হাসছি।
বড়মার কাছে এগিয়ে গেলাম। খালি শুনলে হবে, কিছু বলো।
দাঁড়াবাপু সকাল থেক বড়ো জ্বালিয়েছিস।
নির্জলা।
তাহলে কি মন্ডা মিঠাই খাবে। ছোটমা ছেঁচকিয়ে উঠলো।
ইসিতার দিকে তাকালাম।
কি ইসি ছুটকির বাড়িতে তোমাদের নিয়ে এসে অন্যায় করেছি।
ইসিতা মাথা নীচু করলো। বুঝলাম চোখ ছল ছল করে উঠেছে।
ছুটকি আবার কার নাম রে। ছোটমা বললো।
আমি হাসছি।
জ্যেঠিমনি হেসে ফেললো। ছোটোবেলায় ওদের দুজনকে বড়কি আর ছুটকি বলে ডাকতাম।
ছোটমা চোখ বড়ো বড়ো করে, কিরে মিত্রা আগে বলিসনি কখনো ?
ছোটমার কথার ধরণে ইসিতা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললো।
দু’বোন দু’জনকে জড়িয়ে ধরেছে।
এখন আর তোর কি কি বাকি আছে।
কিসের।
বুঝতে পারছিস না।
একটুও না।
বোঝাচ্ছি।
আপনি ও ভাবে তাকাবেন না দিদি, ওর কীর্তি কলাপ শুনলে আপনার গা হিম হয়ে যাবে।
ওর সঙ্গে কাল যদি কেউ না থাকত, তাহলে আমরা কেউ জানতেও পারতাম না ও কোথায় গেছে। এবার বুঝুন।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
আধ ঘন্টার মধ্যে রেডি হবি। ওদের খাওয়া হলে খেতে বসবো।
আর একটা কথা নিজের পছন্দ মতো জামা কাপর পরা চলবে না।
আমি হাসছি।
ছোটমার শাসনে ওরাও হাসে।
ওরা সবাই চলে গেল।
আমি দরজাটা ভেজিয়ে জামা প্যান্ট খুলে টাওয়েলটা কাঁধে চাপিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। ভালো করে স্নান করলাম। দেহের সমস্ত ময়লা যেন ধোয়া হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম সত্যি আমার জীবনটা যেন কি রকম। নিজের কাছে নিজে যে কিছু প্রত্যাশা করবো, তার কোন উপায় নেই।
বাথরুম থেকে বেরতেই দেখলাম দুই বোন খাটে বসে বসে কথা বলছে।
আমি আবার বাথরুমের ভেতরে ঢুকে গেলাম।
উঃ লজ্জাশীলা নারী। ইসিতা বললো।
আয় চলে আয় আর লজ্জা পেতে হবে না। মিত্রা বললো।
বাথরুমের গেট থেকে মুখ বার করে হাসলাম।
মিত্রা মুখ টিপে হাসছে।
তোর কীর্তি কলাপ শুনছিলাম ওর মুখ থেকে।
দে দে তাড়াতাড়ি গেঞ্জিটা দে শরীর ঢাকি।
একিরে তুই বিয়ে করা বৌকে কি বলে সম্বোধন করলি।
তুই বুঝবি না। দারুণ মজা।
দাঁড়া আমি মাকে গিয়ে বলছি।
শোধরাতে পারবি না।
আমি গেঞ্জিটা পরলাম। জাঙ্গিয়াটা পরতে গিয়ে ওদের দিকে তাকালাম।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো।
আমরা কেউ দেখবো না।
আমার আপত্তি নেই, ভয় না পেলেই হলো।
কি শয়তান রে, শালি বসে আছে।
আমি টেবিলের কাছে গেলাম।
দেখে পর, কারটা পরছিস। ইসিতা চোখ পাকিয়ে বললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
গল্প হয়ে গেছে ?
মিত্রা হাসছে। সদ্য কালকের ঘটনা, না বলে পারি।
বেশ বেশ। মাথায় রাখিস, ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় শোধ করে দেব।
রেডি হলাম। আজও নতুন পাজামা পাঞ্জাবী। বেশ লাগছে। ঘন ঘন নতুন নতুন পোষাক।
এটা কার স্পনসর।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
জ্যেঠিমনি।
তারমানে!
এটা অনেক দিন আগে কেনা হয়েছিল। মানুষটা তৈরি হয়নি, তাই ভাঙা হয় নি।
সেই জন্য ন্যাপথালিনের গন্ধ।
চোখ নাচিয়ে বললাম, কি ইসিতা ম্যাডাম।
ইসি খাট থেকে উঠে এলো। আমি পাঞ্জাবীর বোতাম লাগাচ্ছিলাম। ইসি আমার হাত সড়িয়ে পাঞ্জাবীর বোতাম লাগাতে লাগাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফললো।
কি হলো ম্যাডাম। এটা ঠিক নয়। অনি অনির কাজ করেছে।
মিত্রা উঠে এলো।
এই দিদি কাঁদিস না।
তোকে আমি সকালে অনেক নোংরা কথা বলেছি।
ওটা আমার প্রাপ্য ছিল ইসি। নাহলে তোদের নিয়ে আসতে পারতাম না।
তুই আগে কেন বললি না।
তুই সেই পরিবেশ দিস নি। আমি সাড়ে ছ’ঘন্টা তোদের বাড়িতে ছিলাম। তাগিদ আমার, আমাকে পরিবেশ রচনা করতে হলো। আমার মনে হয় তুই পুরো শুনিসও নি।
ইসি মাথা নাড়ছে। শোনে নি।
আমি অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি, বর্তমান আর ভবিষ্যতকে নিয়ে চলি। এবার ছাড়, নাহলে এখানে সেখানে হাত দিয়ে ফেলবো। ভাববো মিত্রা জড়িয়ে ধরেছে। সকাল থেকে কিছু খাওয়াস নি। খালি গাল দিয়েছিস মনে মনে।
ইসি কোমরে একটা চিমটি কাটলো।
মিত্রা হাসছে।
ইসি হাসতে হাসতে চোখ মুছলো।
টাওয়েলটা দিয়ে মুখটা মুছে নে।
মিত্রা চিরুণি এগিয়ে দিল। চুল আঁচড়ালাম। চুলে চিরুনি চলে না। এবার সময় করে কাটতে হবে।
তিনজনে নিচে নেমে এলাম। খুব হৈ হৈ হচ্ছে। পিকু বাবুকে দেখলাম কনিষ্কদের টেবিলের সামনে। বটা চেঁচিয়ে উঠলো। অনি এসে গেছে এবার ঝেড়ে দে।
কেন, না বললে পেটের ভাত হজম হচ্ছে না। নীরু দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠলো।
তখন থেকে তোরা খেও-খেয়ি করছিস, কি হয়েছে বলতো। ছোটমা বললো।
দাঁড়িয়ে যাও, এবার নীরুর আর একটা পর্দা ফাঁস। বটা বললো।
কনিষ্ক হাসছে।
ইসিতা মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
এগুলোর সঙ্গে ইসির আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
হ্যাঁ।
আমি কিন্তু খেতে খেতে উঠে যাব ছোটমা।
নীরু চেঁচাচ্ছে সকলে হাসছে।
কেন তোরা ওর পেছনে লাগছিস বলতো। ছোটমা আবার বললো।
তাহলে একটা এক্সক্লুসিভ মিস করবে।

ছোটমা কনিষ্কর দিকে তাকাচ্ছে। মিটি মিটি হাসছে।
আচ্ছা বড় ম্যাডাম।
কনিষ্ক ইসিতার দিকে তাকাল।
না বলছি, একবারে বলবি না। নীরু আবার চেঁচিয়ে উঠলো।
নীরুর কথায় সকলে হাসছে।
তাহলে অনির প্রোগ্রাম ক্যানসেল। কনিষ্ক বললো।
নীরু চুপ করে গেল।
কিরে বলবি তো অনির প্রোগ্রাম ক্যানসেল, না তোরটা বলবো।
অনির প্রোগ্রাম হবেতো ? নীরু লজ্জা লজ্জা ভাবে বললো।
আমি কথা দিচ্ছি, হবে।
কিরে তোরা কি শয়তান, অনির নাম করে….। ছোটমা বললো।
ছোটমা তুমি সাক্ষী রইলে। নীরু বললো।
কনিষ্ক হাসছে। আমিও হাসছি।
ব্যাপারটা কি রে ? আমি বললাম।
মিত্রা আমার হাতটা ধরেছে। টিনারা তাকিয়ে কনিষ্কর দিকে। ফিক ফিক করে হাসছে।
আঙ্কেল মিষ্টিটা দাও। পিকু বলে উঠলো।
ইসি হো হো করে হেসে ফেললো।
দাঁড়া ব্যাটা দিচ্ছি। কনিষ্ক বললো।
কিরে তোকে….! আমি বললাম।
আর বলিস না। প্রথমে নীরুকে ঝামেলা করছিল, তারপর আমার কাছে চলে এসেছে। ম্যাডাম আপনি একটু এদিকে আসুন।
কনিষ্ক ইসির দিকে তাকিয়ে বললো।
ইসি এগিয়ে গেল।
মিত্রা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো। নীরুর অবস্থা খারাপ। তাকিয়ে দেখ।
কেন রে।
আপনি ওই ভদ্রলোককে চিনতে পারছেন। কনিষ্ক নীরুকে দেখিয়ে বললো।
আমি ব্যাপারটা ধরতে পেরে গেলাম।
হো হো করে হেসে ফেলেছি।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। ঘরের মধ্যে আমিই একা হাসছি।
তুই একেবারে আমাকে চাটবি না।
নীরু আমার দিকে কট কট করে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
তার মানে! মিত্রা আমার হাত ধরে। চোখে জিজ্ঞাসা।
দেখেছিস সমঝদারকে লিয়ে ইশারা ভি কাফি। কনিষ্ক বললো।
ইসি আমার দিকে তাকিয়ে।
কিরে অনি।
তুই নীরুকে চিনতে পারছিস না।
না।
বছর পাঁচেক আগে দেখেছিস। কচি কচি দেখতে ছিল তখন, সেই জন্য চিনতে পারছিস না।
নীরুর দিকে তাকালাম।
কিরে নার্সিংহোম না হাসপাতাল ?
মিত্রা আমার হাতটা ধরে খিল খিল করে হেসে আমার গায়ে ঢলে পরলো।
দেখলি, দেখলি কনিষ্ক, এবার অনি মালটা রসিয়ে রসিয়ে ঝারবে। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
মিত্রা ইসির কানে কানে ফিস ফিস করছে।
ইসি হো হো করে হেসে উঠলো।
তুই সব গজব করে দিলি। নীরু গজ গজ করছে।
কনিষ্ক বটা হাসছে।
সোনাবাবা, রসোগোল্লা খাওয়া হয়েছে। কনিষ্ক পিকুকে বললো।
আরও জরে সবাই হেসে ফেললো।
মিত্রার কাছ থেকে এবার সবার কাছে সংবাদটা পৌঁছে গেছে।
তখন ও আরও রোগা ছিল। হাসতে হাসতে ইসি বললো।
কেন মোটা হলে ভালো লাগতো। আমি বললাম।
দেখবি রে শয়তান। ইসি এগিয়ে এলো আমার কাছে।
নীরু এটা তোর কতো নম্বর।
নীরু লজ্জা পেয়ে গেছে।
পার্সোনালি তিন নম্বর।
খবরটা ঘর ময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে। সবাই হাসছে।
বরুণদা খেতে খেতে নীরুর কাছে উঠে গেল।
সত্যি নীরুবাবু সেদিন আপনি না থাকলে, আমি ইসি আর পিকুকে ফিরে পেতাম না।
বরুণদা একেবারে গদোগদো।
আমি ঘরথেকে বেরিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় নীরুর দিকে তাকিয়ে বললাম। ওপরে চল কিমা বানাব।
কনিষ্ক, আমার কিছু হলে তুই দায়ী থাকবি, মাথায় রাখিস।
সকলে নীরুর কথায় হাসা হাসি করছে।
ঘর থেকে বারান্দায় এলাম। চারিদিকে লোকজন। দাদাদের দেখলাম লনে একটা ছাতার তলায় বসে গল্প করছে। সঙ্গে উনা মাস্টার, কাকা, ডাক্তারদাদা।
পায়ে পায়ে পেছন দিকে গেলাম।
দেখলাম ইসলামভাই রান্নার লোকেদের সঙ্গে কথা বলছে। কাছে যেতে বললো, কিরে খাওয়া হয়েছে।
না।
আর কখন খাবি, তিনটে বেজে গেল।
এবার বসবো। তুমি খেয়েছো ?
বড়দি জোরকরে খাইয়ে দিয়েছে। তুই আজকে আর একটা দিদিকে এনে হাজির করলি। এটাই তোর সকাল থেকে উঠে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল।
হাসলাম।
সেই জন্য সকালে উঠে দৌড়লি।
তোমায় কেউ কিছু বলেনিতো ?
শুরু করেছিল, ডাক্তারদাদা ধমক মারল। সবাই থেমে গেল। নাহলে পিন্ডি একবারে চটকে দিত।
আমি হাসছি।
হাসিস না। তুই কেশ করবি আমাকে তার ঝাল পোহাতে হয়। এই খবরটা কি পর্শু সারারাত কালেকসন করেছিস ?
তোমায় কে বললো।
তুই সারারাত জাগলি, এমনি এমনি, তা হয় ?
হেসেফেললাম।
সেই জন্য কালকে তোকে বাধা দিই নি। না হলে জেগে বসে থাকতাম। তোর কালকের মুখ আর এ্যাকসনের দিনের মুখের মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল।
বাবা তুমিও দেখছি এখন মুখ দেখে বিচার করতে শিখে গেছ।
আগে একটু একটু জানতাম তোর পাল্লায় পরে এখন পুরো জেনে ফেলতে হচ্ছে।
তারপর ডাক্তারদাদা সাহায্য করছে।
সাগির, অবতার, কবিতা, লক্ষ্মীকে দেখতে পাচ্ছিনা।
কবিতা ভেতরে কোথাও আছে। ওরা তিনজনে আর একটু পরে আসবে।
রতন, আবিদ।
সকাল থেকে ছিল। একবার বললো খোঁজ খবর নেব অনিদার।
নিতে বলতে পারতে।
ওরা খোঁজ নিলেও তোকে পেত না।
আমি হাসছি।
ইসলামভাই আমার পেটে একটা খোঁচা মারল। তুই এখন ওয়েস্ট বেঙ্গলের ডন।
তাহলে ইসলামভাই কি।
অনির চেলা।
মাথায় রাখবে।
ওই দেখ, তোকে মামনি ডাকছে।
পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম মিত্রা ইসলামভাইকে ইশারা করছে আমাকে পাঠাবার জন্য।
যাই, তুমি কাজ শেষ করো।
আমি এগিয়ে এলাম। মিত্রা দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতে বললো।
এক থাপ্পর।
আবার কি করলাম।
মাথায় খালি ফিচলে বুদ্ধি।
আমি হাসছি।
পিকু নীরুর হাতে ডেলিভারি তুই বুঝলি কি করে।
কনিষ্কর কথার ভাঁজে। দেখলি না নীরু কিরকম লজ্জা পাচ্ছিল।
শালা ওপরে চলুক ওকে দেখাচ্ছি।
কেন ও কি অন্যায় করলো।
তুই বুঝবি না।
তোকে এমন দেব না। আমি কিছু বুঝি না, না।
তাহলে জিজ্ঞাসা করছিস কেন। ওটা মেয়েদের ব্যাপার নয়, ছেলেদের।
এখনো আশ মিটছে না।
মেটে, তুই বল। নীরুর চোখ দিয়ে দেখা হয়ে যাবে।
দাঁড়া আমি দিদিভাইকে বলছি।
বলিসনা, কোথায় কি হয়ে যাবে।
তোকে একবারে খেয়ে ফেলবো।
বাকি কি রেখেছিস।
পায়ে পায়ে চলে এলাম, ঘরে ঢুকতেই দেখলাম কনিষ্ক বটা কোমরে টাওয়েল জড়িয়েছে।
কিরে টাওয়েল পরেছিস ?
তোদের খাইয়ে দিই। না হলে দেরি হয়ে যাবে।
বড়মা পার্মিসন দিয়েছে।
দেয়নি, জোগাড় কেরে নিলাম। মাসি একটু ঝামেলা করছিলো। নীরু ধমক দিলো।
নীরু ধমক দিলো!
বলছি কি, দেখনা রান্না ঘরে গিয়ে, একবার উঁকি মার।
দখি টিনা, মিলি, অদিতি সকলে লেগে পরেছে। মৈনাক, দেবা পাতা পাতছে।
তাড়া তাড়ি খা। একটা ছোট প্রোগ্রাম আছে।
আবার কি ?
দেখতে পাবি।
তোরা মনে হচ্ছে আবার কিছু ঘোটালা পাকাচ্ছিস।
দেবা হাসছে।
আমরা সবাই একসঙ্গে বসলাম। আজ দেখছি কয়েকটা এক্সট্রা টেবিল ঘরে ঢুকেছে। সবাই এক সঙ্গে বসলাম। খাওয়া শুরু করলাম। সুরো এসে পাতের সামনে দাঁড়াল। মিটি মিটি হাসছে।
কিরে। তোর আবার কি হলো।
আমার পাতের দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে।
তোমার একটা ঠ্যাং দাও।
আমার ঠ্যাং!
ওই হোল, মুরগীর।
ওকিরে এখুনি একপেট খেলি। বৌদি চেঁচিয়ে উঠলো।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
কনিষ্কদা বৌদির জন্য আর একটা দিচ্ছে, তুমি ওটা দাও না। সুরো হাসছে।
আমি সুরোর মুখে তুলে দিলাম। সুরে নাচতে নাচতে চলে গেলো। ইসি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ফিক ফিক করে হাসছে।
নীপা একটা বাটি নিয়ে এগিয়ে এলো।
একবারে ওকে দিবি না। আদর না। মিত্রা খেঁকিয়ে উঠলো।
আমি ঠিক বুঝে ওঠার আগেই বড়মা বলে উঠলো।
ওরকম করিস না। ওর জন্য কতোদূর থেকে বয়ে এনেছে সুরোমাসি বল।
আমি হাসছি, মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
একবারে তাকাবি না, চোখ গেলে দেব। তোর জন্য সুরোমাসি চিংড়িমাছের মোলা আর টক নিয়ে এসেছে। এতো খেয়েও আস মিটছে না।
আমি হাসছি।
কনিষ্ক। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
কি হলো ম্যাডাম।

কনিষ্ক সামনে এসে দাঁড়াল।
নীপার হাত থেকে বাটিটা নাও।
কেন!
নাওনা, আমি বলছি।
নীপা হাসছে।
সুরোমাসি এগিয়ে এলো।
ও মিত্রা যেটুকু আছে আমি সবাইকে ভাগ করে দিচ্ছি।
আগে দাও, তারপর ওর বাটি বসবে। কতো খায়। মিত্রা মুখ ভেঙচে বললো।
জ্যেঠিমনি এতোক্ষণ শুনছিলো কিছু বুঝতে পারছিল না। এইবার হেসে ফেললো।
তুই কি সব সময় ওর সঙ্গে এরকম করিস।
তুমি জানো না ও কিরকম তেঁদড়। সুরোমাসি কারুর জন্য নিয়ে আসে নি। খালি বুবুনের জন্য নিয়ে এসেছে।
তুই তো তখন খেলি। ছোটমা হাসতে হাসতে বললো।
একটু খানি টেস্ট করেছি।
অতোটা খেলি। ওটা টেস্ট!
ছোটমার কথাকে পাত্তাই দিলো না মিত্রা।
কনিষ্ক তুমিতো পাওনি। একটু টেস্ট করো।
সুরোমাসি মাটির খাবরি রান্নাঘর থেকে নিয়ে এলো। সবাইকে একটু একটু দিলো।
কনিষ্ক মুখে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। মার্ভেলাস, কি টেস্টরে অনি।
নীরু বটা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো।
হাগুড়ে। কনিষ্ক গম্ভীর হয়ে বললো।
তুই খেলে দোষ নেই, আমি খেলেই হাগুড়ে। নীরু বললো।
হাসাহাসি চলছে।
জ্যেঠিমনি একবার মুখে দিয়ে দেখো। মিত্রা বললো।
এটা অনিদা স্পেশাল। মিলি বললো।
ওখানে গেলে এই দিয়ে এক জাম পান্তা খায়। মিত্রা বললো।
তুই খাস না। ছোটমা বললো।
আমার বাটি টেবিলে রাখা মাত্র বটা, নীরু, মিলি, টিনা, অদিতি, দেবা, মৈনাক সবাই হাত মারলো। আমি হাসছি।
কিরে তোরা সবাই খেয়ে নিলে ও খাবে কি।
বৌদি থাকনা, আমি অনেক খেয়েছি।
আ-মোলো ধর্মাবতার যুধিষ্টির। বড়মা এমন ভাবে বললো হাসির ঢেউ উঠলো।
বড়মা আমরা খেলেই অনির খাওয়া হয়ে যাবে। কনিষ্ক আঙুল চাটতে চাটতে বললো।
ইসি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ব্যাপারটা এরকম তুই পারিসও বটে। তোকে যতো দেখছি, তত অবাক হচ্ছি।
ওরা তিনজনে একদিকে। তারপাশে বৌদি। আমি বড়মা ছোটমা দামিনী মাসি।
তুই কি মেয়ে এতো টক খাস। ইসি বললো।
এতে তবু পোঁয়াজ কুঁচি, কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা সরষের তেল পরে নি। পরলে দেখতিস। টকাস করে জিভ দিয়ে আওয়াজ করলো মিত্রা।
সবাই হাসছে।
নীরু এগিয়ে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আমাকে।
তোর আবার কি হলো।
বটা, নীরুকে একটা ঝেড়ে দেতো। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
দাঁড়ানা, এই মালটা খাওয়ার জন্য ওর ওখানে যেতে হবে না।
তোর চেম্বার ?
রাখ তোর চেম্বার।
সবাই হাসছে।
ও নীরু ওকে ছাড় বেচেরা সকাল থেকে কিছু খায় নি। বৌদি বললো।
কর্পোরেশনের প্রচুর জল টেনেছে। ওই জন্য খিদে পায় নি।
নীরুর কথা বলার ঢঙে সবাই হাসছে।
বড়মা।
কিরে।
নীরু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে বড়মার পাতে।
নীরু চোখ গেলে দেবো। একবারে তাকাবে না। মিত্রা চেঁচালো।
নীরু মিটি মিটি হাসে।
দেবো। একটু অপেক্ষা কর। বড়মা বললো।
এতো খেয়ো না সোনা। অনেক রাত পর্যন্ত টানতে হবে। কনিষ্ক নীরুর পিঠে হাত দিয়ে বললো।
বটা সত্যি সত্যি এগিয়ে এলো।
বড়মা এটা ঠিক হচ্ছে না। তুমি বটাকে কিছু বলো। এতো অত্যাচার সহ্য হয়। নীরু বললো।
তুই তুলবি, আমি খাবো। বটা বললো।
তার মানে! হাঁস ডিম পারবে খাবে দারোগা।
এবার হাসি আরো জোরে। জ্যেঠিমনি খাওয়া থামিয়ে দিয়েছে। হাসছে।
দিদি খাওয়া থামিয়ে লাভ নেই, এটা নিত্যকার ব্যাপার। ছোটমা বললো।
বুঝতে পারছি তোমাদের দু’জনের খুব কষ্ট। জ্যেঠিমনি হাসতে হাসতে বললো।
কষ্ট মানে, মাঝে মাঝে এদের জ্বালায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ছোটমা বললো।
মিত্রা নিজের পাত ছেড়ে উঠে এসে আমার পেছনে দাঁড়াল। বড়মা একবার আমার দিকে তাকাল। ইসারা করলো কিরে ?
আমি হেসে ইশারায় বললাম। যেটুকু চিংড়ি মাছের মোলা পরে আছে নেবে।
বড়মা হেসে ফেললো।
কিরে কি নালিশ করছিস বড়মাকে। মিত্রা কট কট করে বললো।
কিছু না।
আমি দেখলাম তুই বড়মাকে ইশারা করছিস।
আমি ওর দিকে তাকালাম। তুই বাটিটা নিবি, আমার ভালো লাগছে না খেতে।
কি ভালোরে তুই। আমার গালটা টিপে মিত্রা ছোঁমেরে বাটিটা তুলে নিল।
বড়মা মিত্রার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।
বুঝলি মিত্রা।
বলো।
অনি ইশারা করে এই কথাটা বলছিল।
ও বলুক।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
দেখলাম বটা, নীরু, কনিষ্ক মিত্রাকে ঘিরে ধরেছে। বাটিটা আজ আর মাজতে হবে না।
আমি হাসতে হাসতে বেসিনে গিয়ে মুখ ধুলাম।
বৌদি চেঁচিয়ে বললো তুই ওপরে যা আমরা যাচ্ছি।
বুঝলাম আমার কপালে আজ শনি লেখা আছে।
আমি দামিনী মাসির কাপরে হাতটা মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বেরোবার সময় ছোটমার গলা শুনতে পেলাম, তোর পকেটে রুমাল নেই।
গলার শব্দ শুনে একবার পেছন ফিরে তাকালাম, দেখলাম দামিনী মাসি হাসছে।
বারান্দায় এসে দেখলাম বাসু, সঞ্জু, চিকনা, অনাদি কথা বলছে। আমাকে দেখে সঞ্জু হাসলো।
কিরে কোথায় ছিলি এতোক্ষণ, দেখতে পাই নি।
ওইতো পেছনে ছিলাম।
চিকনা, সঞ্জু সত্যি কথা বলছে।
একটু জল মেসানো আছে। অনাদি বললো।
হ। চিকনা হাসছে।
সঞ্জু কট কট করে তাকাচ্ছে চিকনার দিকে।
শিঁড়ি দিয়ে উঠতে আরম্ভ করলাম। ওরা আমার পেছনে।
মিনতি কোথায়রে সঞ্জু, দেখতেই পাচ্ছি না।
বড়মার ঘরে।
কি করছে।
কি করে বলবো।
তুই দেখ গিয়ে। ওর দায়িত্ব এখন তোর।
চিকনা জোড়ে হেসে উঠলো। অনাদিও হাসছে।
ঘর চ, জুতায় ছাল খিঁচবো।
এবার আমি হেসে ফেললাম, সঞ্জু একেবারে গাঁইয়া ভাষা মুখ থেকে বার করে ফেলেছে।
আয়।
ঘরে ঢুকতেই চিকনা সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। আমি একটা বার করে নিয়ে ওর হাতে দিলাম। চিকনা পকেটে ঢুকিয়ে নিল।
কিরে!
ওরা সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। একমাত্র তুই আর আমি খাই।
সঞ্জু হাঁটু দিয়ে চিকনাকে গোঁতা দিল।
অনি সব জেনে ফেলেছে। বাকিটুকু অনিকে বলে দেব।
বলনা, বল। ওখানে গিয়ে পানা পুকুরে পুঁতবো।
আমি হাসছি।
কিরকম খেলি।
বার বার খেতে ইচ্ছে করছে।
চিকনার কথায় বাসু হাসছ।
সেই যে পর্শুদিন থেকে খাওয়া শুরু করেছিস, থেমেছিস। বাসু বললো।
থামবো মানে, অনির বিয়ে বলে কথা, প্রাণভরে খেয়ে যাব।
তোর পেট থেকে সব টেনে বার করবো। সঞ্জু বললো।
অনি আর টানিসনা এবার দে, আমি সঞ্জু দু’জনকে টানতে হবে।
কেন আর সিগারেট নেই, সঞ্জুকে একটা দে।
ভাগা ভাগি।
তুইতো অনাদিকে একটা দিলি না।
পকেটটা দেখ ইসলামদা দিয়েছে। রেখে দিয়েছে। পঞ্চায়েত না, ওখানে গিয়ে ফুটানি মারবে।
আমি হাসছি।
ওখানে গিয়ে যদি হামবড়ক্কি দেখিয়েছিস। আন্দোলন করে মাটি কাটা বন্ধ করে দেব। এবার অনিমেষদা আছে বুঝলি।
চিকনার কথায় অনাদি বাসু এতোজোড়ে হেসে ফেললো মিত্রা মিলিরা পর্যন্ত চলে এলো। আমি হাসির চোটে খাটে বসে পরেছি। অনাদি বাসু তখনো হাসছে।
মিত্রা ভেতরে ঢুকলো।
কিরে এতো হাসির চোট কিসের।
চিকনা গম্ভীর হয়ে বললো। একটা ছোটো করে দিলাম তাতেই অনি কুপোকাত।
তার মানে।
আমি তখনো হাসছি।
কিরে বলবি তো।
আমি হাসতে হাসতেই বললাম চিকনাকে জিজ্ঞাসা কর।
চিকনা লজ্জা পেয়ে বললো, যাঃ বার বার বলা যায়।
এমনভাবে বললো এবার মিত্রা মিলি হেসে ফেললো।
আস্তে আস্তে সকলে ঘরে এসে জড়ো হলো। ঘর ভড়ে গেল। যে যার মতো বসলো।
সবার হাতেই কিছুনা কিছু জিনিসপত্র। আমি বুঝলাম ব্যাপারটা।
সবাই মিত্রার হাতে দিল সব। বেশ মজা লাগছে। জ্যেঠিমনির মুখে সকালের কালো মেঘ নেই।
ইসিতা এগিয়ে এলো।
পিকু কোথায় ?
নীচে।
কি করছে।
কতো দাদাই বলতো, খেলছে। এই নে তোর বরুণদা তোকে এটা দিয়েছে।
কি এটা।
খুলে দেখ।
আমি কাগজে মোড়া প্যাকেট খুলতেই ছবিটা বেরিয়ে এলো। সকালে যে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার কথা বলেছি। বরুণদার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
মিত্রাকে ছবিটা দিলাম। ওর চোখটা ছল ছল করে উঠলো।
না ম্যাডাম না, আজ এসব কিছু হবে না। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
বৌদিও একটা ফটো ফ্রেম আমার হাতে দিলো। আমি মৃদু হেসে বৌদির দিকে তাকালাম।
তুমি এ ছবি পেলে কোথায়!
বৌদি হাসছে।
যার কাছে ছিলো তার কাছ থেকে নিয়ে এসে তৈরি করেছি।
আমি মাথা নীচু করলাম, জান বৌদি স্যারের কাছে যাওয়া হয়নি।
আজ আসবে।

স্যার আসবে!
ছবিটা মিত্রার হাতে দিলাম।
মিত্রা ছবিটা দেখে আমার দিকে তাকাল।
কোন ইয়ারের ছবি চিনতে পারিস।
আর চিন্তে হবে না, এই খাতাটা নে এবার শুরু কর।
ওই ছবিতে বসে যেটা করে ফার্স্ট হয়েছিলি। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো।
ছবিটা মিত্রার হাত থেকে ইসিতার হাতে গেল, জ্যেঠিমনি বরুণদাও দেখল। আস্তে আস্তে সবার হাতে চলে গেল। সবার চোখেই বিষ্ময়। মিলি দৌড়ে এসে বৌদিকে জড়িয়ে ধরলো।
জানো বৌদি সে বছর আমরা সবে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছি। মাঠে ছিলাম আমি অদিতি টিনা। প্রথমে ভেবেছিলাম কি শ্রুতি নাটক শুনবো। অনিদার গলা শুনে দৌড়ে অডিটোরিয়ামে চলে এসেছিলাম।
পনেরো মিনিটের ডুয়েট, নিস্তব্ধ হলঘর, আমরা সব যেন গিলে খাচ্ছিলাম দু’জনকে।
সারা ঘর নিস্তব্ধ। মিলির কথা শুনছে।
টানা দু’মিনিট হাততালি। আমরা সবাই চেঁচিয়ে উঠেছিলাম থ্রি চিয়ার্স ফর অনিদা, থ্রি চিয়ার্স ফর মিত্রাদি। ইন্টার কলেজ কমপিটিসনে আমাদের কলেজ ফার্স্ট।
আমি মিলির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
ওর স্বতঃস্ফূর্ততা আমাকে যেন সেই দিনের অডিটেরিয়ামে নিয়ে গেল। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম আমি মিত্রা স্টেজে বসে আছি। দু’জনের ডুয়েটে চলছে কচ দেবযানী শ্রুতি নাটক। কেউ কাউকে এক তিলার্ধ মাটি বিনাযুদ্ধে সেদিন ছেড়ে দিইনি।
কিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস, শুরু কর শুরু কর। কনিষ্ক এগিয়ে এলো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। ওর চোখ বলছে ওর ইচ্ছে আছে। হাসলাম।
বুড়ী বয়সে এখনো শখ আছে।
তার মানে। বৌদি বলে উঠলো।
তুই ওকে বুড়ী বলছিস। তাহলে তুই কি ?
যা খাতাটা নিয়ে আয়। ওই কারণে দামিনী মাসির ওখানে রাখা ভাঙা বাক্স থেকে খাতটা বার করে এনেছিলি।
মিত্রা মাথা নীচু করে হাসছে।
কনিষ্ক খাতাটা মিত্রার হাতে দিল।
তুই শুরু কর। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
সবটা পারবো না একটুখানি করব।
এরা মানবে।
মানবে।
আমি শুরু করলাম।
কচঃ দেহো আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাস
করিবে প্রয়াণ। আজি গুরুগৃহবাস
সমাপ্ত আমার। আশীর্বাদ করো মোরে
যে বিদ্যা শিখিনু তাহা চিরদিন ধরে
অন্তরে জাজ্জ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,
সুমেরুশিখর শিরে সূর্যের মতন
অক্ষয়কিরণ।
দেবযানীঃ মনোরথ পুরিয়াছে
পেয়েছ দুর্লভ বিদ্যা আচার্যের কাছে,
সহস্রবর্ষের তবে দুঃসাদ্য সাধনা
সিদ্ধ আজি, আর-কিছু নাহি কি কামনা,
ভেবে দেখো মনে মনে।
….. ……. …… ……. ……
দেখলাম মিত্রা আর কনটিনিউ করছে না।
আমি খাতা থেকে মুখ তুললাম। ও মাথা দোলাচ্ছে। ওর চোখ চিক চিক করছে। বুঝলাম এটা দুঃখের অশ্রু নয়, অনন্দের অশ্রু। মিলিরা এসে জড়িয়ে ধরলো মিত্রাকে। দেখলাম দরজার সামনে দাদা, মল্লিকদা, কাকা, উনা মাস্টার, ডাক্তারদাদা।
বিস্ময় চোখে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে। ছোটমা দৌড়ে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। ডাক্তারদাদার হাত ধেরে ভেতরে আনলো। পেছন পেছন সবাই।
বাবাঃ, অনিবাবু যে আবৃত্তি টাবৃত্তি করেন এটা জানতাম না।
আমরাও জানতাম না। বৌদির আনা ছবিটা দেখে জানলাম।
ছোটমা ফটো ফ্রেমটা এগিয়ে দিলো ডাক্তারদাদার হাতে।
কলেজ লাইফের ছবি, এই দুটোর, দেখুন চিনতে পারেন কিনা ?
ডাক্তারদাদা দেখে হেসে ফেললেন।
কিরে কনিষ্ক তোরা জানতিস।
আমাদের কলেজের ফেস্টেও এইটা করে ওরা প্রথম হয়েছিল। তখন অনি-মিত্রা জুটির একটা কদর ছিল সব কলেজে।
কিগো এডিটর বান্ধবীকে কিছু বলো। সকাল থেকে অনেক বকছিলো।
মরণ। ও আবার কি বলবে গা।
বড়মার কথায় ঘর ভর্তি লোক হাসে।
আমায় কিছু বলতে হলো ? দাদা ডাক্তারদাদার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বললো।
ডাক্তারদাদা মাথা দোলাচ্ছে। হাসছে।
বটা একটা বিশাল কিছু নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
নীরু এগিয়ে গেলো। দে দে অনিকে আমাদের উপহার।
দাঁড়া স্যার তুলে দেবে ওর হাতে। কনিষ্ক বললো।
আমি কেন বাবা, তোদের জিনিষ তোরা দে। ডাক্তারদাদ বললো।
না স্যার, এটা আপনি আমাদের হয়ে অনির হাতে তুলে দিন।
তারমানে! নিশ্চই এমন কিছু আছে যার জন্য অনির কাছে মার খেতে পারিস।
তা আছে।
আমি নীরুর দিকে তাকিয়ে আছি।
রাতের খাওয়াটা খেয়ে নিই, তারপর তুই কিমা করিস।
সবাই হাসছে।
ডাক্তারদাদা এগিয়ে এসে লেমিনেট করা ফটোটা দিল। বুঝলাম এটা নিশ্চই আমার কনো ফটো।
কাগজটা খুলেই আমি হেসে ফেললাম। ছোটমা উঁকি মেরে আরও জোরে হেসে উঠলো।
আ মোলো ও ছোটো তুই অমন ভাবে হাসিস কেন। বড়মা বলে উঠলো।
ছোটমা কনো কথা বলে না খালি হাসে।
কি ছোটমা কেমন দিয়েছি বলো ? নীরু বললো।
ছোটমা আমার হাত থেকে নিয়ে সবার দিকে ফটোটা ঘুরিয়ে দিল। জ্যেঠিমনির দিকে তাকিয়ে বললো, দেখুন তো দিদি এই ওঝাটাকে চিনতে পারেন কিনা।
জ্যেঠিমনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে হাসতে শুরু করলো।
ঘরের সবাই হাসছে। এমনকি কাকা উনা মাস্টার পর্যন্ত।। পিকুও ছবিটা ভালো করে দেখছে।
হ্যাঁরে এটা তুই কবে সেজেছিলি। কাকা বলে উঠলো।
এটা অনির লেটেস্ট কালেকসন কাকা, পর্শুদিন। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি হাসছি।
ইসি আমার কাছে এগিয়ে এলো।
এটা জেনুইন।
তোর ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা কর।
সে ঝেঁটার বাড়ি আপনি খাননি ম্যাডাম। তাহলে ডাক্তার হয়ে যেতেন।
নীরুর কথায় ঘর ভর্তি সবাই হাসে।
একমাত্র তুই খেয়েছিলি কি বল। বটা বললো।
তোকে কথা বলতে বলেছি। একবার বলেছি, বড়রা যখন কথা বলবে ছোটেদের শুনতে হয়।
হঠাৎ আমার গলা আর মিত্রার গলায় শ্রুতি নাটকটা বেজে উঠলো। দেবা মোবাইলে রেকর্ড করেছে।
তুই রেকর্ড করেছিস! কনিষ্ক বললো।
লাইভ।
সবাই দেবার কাছে গেল। ওর মোবাইলে উঁকি মারছে। আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। মিত্রা হাসছে। ইসি পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
পাগলদের কান্ড দেখছো।
ইসি আমার দিকে তাকাল।
জানিস অনি এই পাগলামির মধ্যে একটা আনন্দ আছে। এই আনন্দটা আবার সকলে উপভোগ করতে পারে না।
মিত্রা ইসির দিকে তাকিয়ে।
অনেকদিন পর মন খুলে একটু আনন্দ উপভোগ করছি। তোর বরুণদাকে দেখেছিস। কেমন ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে।
তুই আবার ইমোশন্যাল হয়ে পরছিস ?
হচ্ছিনারে, তুই এমন ভাবে পরিবেশ রচনা করলি বাধ্য হচ্ছি ইমোশন্যাল হয়ে যেতে। মায়ের মুখের দিকে একবার তাকা। আনন্দটা যে এই ভাবে উপভোগ করা যায় এতদিন জানত না। তুই সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে সেই আনন্দটা শেয়ার করে নিচ্ছিস।
ছোটমা। চেঁচিয়ে উঠলাম।
ছোটমা তখন দেবাদের মোবাইলে হামলে পরেছে। আমার দিকে তাকাল।
চা হবে না এখন, ভাগ।
ও কবিতা, মা একটু দেখনা ওরা চা করেছে কিনা নিয়ে আয়। বড়মা বললো।
দেখলে ডাক্তার, গলার স্বর কি নরম। ছেলে বলেছে। আমি বললে এখুনি ছেঁচকে উঠতো।
বড়মা এমন ভাবে দাদার দিকে তাকাল, ডাক্তারদাদা হেসে ফেললো।
সবাই ঘুরে তাকিয়েছে। ইসি আমার মুখের দিকে তাকাল।
তুই পারিশও বটে।
জানিশ ইসি মিত্রাকে জিজ্ঞাসা কর এই ডুয়েটটা দারুন এনজয়বেল।
নীরু আমার টেবিলে ওঝার ছবিটা নিয়ে এসে রাখল। বেশ ব্রাইট লাগছে। সবাই ছবিটার দিকে তাকায় আর হাসে। বটা নীরুর পেছনে এঁটুলে পোকার মতো লেগে আছে।
আচ্ছা অনি এরা ডাক্তার ?
ইসি আমার দিকে তাকিয়ে।
তোর কি মনে হয়।
ইসি হাসছে।
বাইরের জানলায় চোখ পরেগেল দেখলাম আমগাছে লাইট জ্বলছে। এখন গোধূলি। কবিতা চা নিয়ে এলো। অনেকগুলো থার্মোকলের কাপ। ঘরে কম লোক নেই। নীরু ছুটে এগিয়ে গেল।
কিরে তুই কি করছিস ওখানে। ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলো।
ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ।
কনিষ্ক, নীরুকে করকে দে। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।
কবিতাকে আর চা দিতে হল না। এখন ওটা মৈনাক কনিষ্কর হাতে চলে গেছে।
অর্ক, অরিত্র, লক্ষ্মী হৈ হৈ করতে করতে ঢুকলো।
তোমার সঙ্গে ঝগড়া আছে অনিদা। সেদিন করতে পারি নি। বিয়েতে বসেগেছিলে।
অর্ক এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। অরিত্রও। লক্ষ্মী প্রণাম করতে গেল।
আজ করিস না। আমাকে করলে সবাইকে করতে হবে। তোর কোমর ব্যাথা হয়ে যাবে।
লক্ষ্মী লজ্জা লজ্জা চোখে আমার আর মিত্রার দিকে তাকাল, মাসি বকবে।
আমি দামিনী মাসির দিকে তাকিয়ে। মাসি হাসছে।
আমি বলছি মাসি বকবে না।
সবাইকে এই ভাবে একসঙ্গে পাব না একটু করি। লক্ষ্মী প্রণাম করতে শুরু করলো।
এট কি হলো অনিদা। অর্ক বললো।
ইসি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ওদের তিনজনকে দেখছিল।
কি বলবি তো।
তুমি অরিত্রকে আমার পেছনে লাগিয়েছিলে কেন।
আমি হাসছি।
লক্ষ্মী প্রণাম করতে করতে চেঁচিয়ে উঠলো। অরিত্রদা না বৃহন্নলাদি।
সবাই একবার লক্ষ্মীকে দেখে, একবার আমাকে দেখে।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
লক্ষ্মী সেদিনও এই কথাটা বলেছিল, ব্যাপারটা কি বলতো।
অনিদাকে আপনি জিজ্ঞাসা করুণ ম্যাডাম। অর্ক বললো।
আমি হাসছি।
ইসি ইসারায় মিত্রাকে জিজ্ঞাসা করলো এরা কারা।
তুই একদিনে সব জানতে পারবি না দিদিভাই, অনেক কীর্তি, খালি দেখে যা পরে সব বলবো।
বৌদি চেঁচিয়ে উঠলো কিরে বলবিতো অরিত্রর নাম বৃহন্নলা হলো কি করে ?
কিরে অরিত্র বলে দে।
অরিত্র আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে হাসে।
লক্ষ্মী এগিয়ে এলো।

এই দিদিকে চিনতে পারলাম না।
ইনি তোর বৌদিমনির দিদিভাই।
আমি লক্ষ্মী, দাদার বোন।
ইসি তাকিয়ে লক্ষ্মীর দিকে।
কিরে লক্ষ্মী অরিত্রকে বৃহন্নলাদি বললি কেন। মিত্রা বললো।
দাদা জানে, তুমি দাদাকে জিজ্ঞাসা করো।
দেখবেন ম্যাডাম কেন অরিত্র বৃহন্নলাদি। অর্ক বললো।
টিনারা এবার এদিকে তাকাল।
অর্ক চেঁচিয়ে উঠলো, টিনাদি তোমার ল্যাপটপটা একটু নিয়ে এসো।
অনিদার টেবিলে আছে দেখো। টিনা চেঁচিয়ে বললো।
তুমি এসে একটু চালাও না।
টিনা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো। ওর পেছন পেছন সবাই। আমি হাসছি।
অরিত্র কেশ খেলে তুই খাবি। এটা জানলো কি করে।
আর বোলোনা সেদিন লক্ষ্মী মুখ ফসকে ম্যাডামের বাড়িতে বলে ফেলেছে। ব্যাশ।
ম্যাডাম একবারে অরিত্রর কথায় ভুলবেন না। অনিদা বহুত ঘাঘু মাল।
মিত্রা ইসি ওখান থেকেই আমার দিকে তাকাল।
দাদা মল্লিকদা ডাক্তারদাদ চা খেতে খেতে উঠে এলো।
অর্ক এরি মধ্যে ফিট করে ফেলেছে।
একটা হাসির রোল উঠলো ওই ভিড় থেকে, বুঝলাম অরিত্রর সাজ পোষাক দেখে হাসছে।
অরিত্র আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
দাদা মল্লিকদা ডাক্তারদা সবাই উঠে টেবিলের কাছে ভিড় করেছে। অর্ক বোঝাচ্ছে। ও এমন রসিয়ে রসিয়ে বোঝাচ্ছে সকলে হাসছে।
মিত্রা ভিড় থেকে বেরিয়ে আমার কাছে এলো।
তুই সেদিন অরিত্রকে মেয়ে সাজিয়ে ওই লোকটার গাড়িতে বসিয়ে রেখেছিলি।
কেন, লক্ষ্মীকে দেখলি না।
সেতো আগে জেনেছি। অরিত্র যে ছিল সেটা জানতাম না।
অরিত্র মাথা নীচু করে আছে।
আস্তে করে বললো।
সেদিন আমাদের দশজনের টিম ছিল। আপনি আমাদের তিনজন ছাড়া আর কাউকে চিনতে পারবেন না ম্যাডাম।
ওরা কারা ইসলামভাই-এর লোক।
একদম না। সব অনিদার কালেকসন। শিয়ালদায় মাঝে মধ্যে ওদের দেখা পাওয়া যায়।
ইসি পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাদের কথা শুনছে।
তখন তোকে যেটা বলছিলাম। গত সপ্তাহে কাগজে যেটা বেরিয়েছিল।
মিত্রা ইসির দিকে তাকিয়ে বললো।
হ্যাঁ।
তার নায়ক নায়িকা এরা। ও পরিচালক।
ইসির চোখ বড়ো বড়ো।
এই টুকু টুকু পুঁচকে ছেলে মেয়ে!
ওরা সব অনিদার অংশ। কাজের সময় এদের চেহারা দেখলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আমি বড়মা ছোটমা খালি ঠাকুরের নাম করি।
দেখবি খোন একটু পরে সব আসবে। এক এক পিস।
ভিড় থেকে মিলি ছিটকে বেরিয়ে এসে আমার কাছে দাঁড়াল।
অনিদা আমি কাল রিজাইন দেব, তুমি আমাকে সাংবাদিকতার কাজে এ্যাপয়েন্টমেন্ট দাও।
মিত্রা হেসে ফেললো।
সেদিন অনিদার চেহারা দেখে কাপর নষ্ট করে ফেলছিলি, আবার সাংবাদিক হবি। যা বেরো।
ধ্যাত তুমিনা কি মিত্রাদি।
অদিতি টিনা ইসি হেসে গড়াগড়ি খায়।
চিকনা এসে সবার সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
এইজন্য তোকে গুরু বলি, তোর জন্য এক কিলো পাটালি।
তারমানে! চিকনা, আমি বাদ ? মিত্রা বললো।
না না ম্যাডাম আপনিও পাবেন, একশো গ্রাম।
দরকার নেই আমি সঞ্জুকে বলছি।
পাবে কোথা থেকে, ও যে এখন….।
একবার দেখে নিলো উনা মাস্টার কোন দিকে তাকিয়ে আছে।
খালি বগলে নিয়ে ঘুরছে।
সঞ্জু কট কট করে তাকিয়ে। কিছু বলতে পারছে না। বাসু অনাদি হাসছে।
তুমি পাহাড়া দিচ্ছ।
চিকনা ফিক করে হেসে ফেললো।
ইসি ওদের রকম সকম দেখে হাসছে।
অরিত্র।
অরিত্র আমার দিকে তাকাল।
তোর রাত্রি আর দিনকে বলেছিস।
মিত্রা ইসি আমার দিকে তাকিয়ে।
দিন না খুশী।
ওই হলো।
তুমি অর্ককে বলো।
কেন।
ও বারন করেছে।
ওরা আবার কে রে।
তুই চিনবি না।
অরিত্র মাথা নীচু করে মিটি মিটি হাসছে।
কিগো অরিত্র ওরা কারা।
সব জেনে ফেললে হবে কি করে। আমি বললাম।
তুই থাম তোকে জিজ্ঞাসা করেছি।
যা একটা ফোন করে দে, বল আমি ডেকেছি। আসতে পারবে।
ট্র্যাংগুলার পার্ক থেকে নিয়ে আসতে হবে।
তাই কর।
অর্ক। অরিত্র ডাকলো।
অর্ক টেবিলের কাছ থেকেই পেছন ফিরে তাকাল।
অনিদা খবর দিতে বলেছে। এখুনি নিয়ে আয়।
অর্ক কট কট করে অরিত্রর দিকে তাকাচ্ছে।
অরিত্র মুখ নীচু করে হাসছে।
বলনা তোর রাত্রি আর খুশী কে।
দুটো মেয়ে। অফিসে নতুন জয়েন করেছে।
এই মিসনে ওরাও ছিল ?
হ্যাঁ।
আরও কিছু আছে তুই চেপে যাচ্ছিস।
অর্ক এদের মধ্যে একটাকে পটকেছে।
মিত্রা হো হো করে হাসছে।
কি বুঝলি দিদিভাই। কতটা খোঁচাবার পর একটু পেলি।
ইসি আমার হাতটা ধরেছে।
জ্যেঠিমনি বিয়ের দিনে তোলা ছবি দেখছে। টিনা সব বোঝাচ্ছে। বড়মা, ছোটমা, বৌদি, দামিনীমাসি হাসা হাসি করছে।
ছোটমা ছিটকে বেরিয়ে এলো। আমার কাছে এসে বললো।
তোর মতো বিচ্চু দ্বিতীয় কেউ নেই।
ইসি হাসছে।
মিত্রা।
হ্যাঁ ছোটমা।
চল চল নিচে চল। সন্ধ্যে হয়ে গেল।
ঘর আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল।
আমরা ছেলেরা কয়েকজন। খাটে এসে বসলাম। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম দেখনা একটু চা ম্যানেজ করা যায় কিনা। তখন নীরু কি যে দিল, বুঝতে পারলাম না।
হ্যাঁ, নীরু দিল। নীরু চেঁচাল।
তুইতো তো দিলি। বটা বললো।
তোকে কতোবার বলেছি বটা, সিনিয়াররা যখন কথা বলবে জুনিয়রদের কথা বলতে নেই।
শালা সিনিয়ার মারাচ্ছ।
নীরু আমার পেছনে।
সিনিয়ার নয় ? তুই বিয়ে করেছিস ? নীরু বললো।
সত্যিতো বটা, নীরুর বৌ কোথায় গেল।
আমি বলবো। মৈনাক বললো।
কেন তোমার অতো চুলকুনি কিসের। বিচুতি পাতা লেগেছে। নীরু বললো।
আমি নীরুর দিকে তাকালাম।
তুই কিছু ভাবিস না চলে আসবে। কনিষ্ককে জিজ্ঞাসা কর, সকালে একবার এসে ঘুরে গেছে।
কোথায় গেছে।
নার্সিংহোমে।
খেপ।
একটা জরুরি কাজ আছে।
বলনা খালাস করাতে গেছে। মৈনাক চেঁচিয়ে উঠলো।
আস্তে করে গালাগালি দিল, তোর বৌ-এর।
আমি কনিষ্ক হাসছি।
কনিষ্ক হাসতে হাসতেই বললো, নীরু হাইড দিয়েছে এইটা।
আমি নীরুরু দিকে তাকালাম। হাসছি।
শালিরটা কেমন দেখলি।
দেখলি দেখলি কনিষ্ক। অনিটা কি হারামী হয়ে গেছে।
কনিষ্ক হাসছে।
আমি চেষ্টা করলেও দেখতে পাব না। তুই তবু দেখেছিস। তোর চোখ দিয়েই দেখি।
দাঁড়া ম্যাডামকে বলছি গিয়ে।
মনে থাকে যেন, তোর বউ আসছে।
কি করবি তুই।
সবার সামনে চুমু খাব।
নীরু হাসতে গিয়েও হাসল না। হাসিটা মুখে ছড়িয়ে রয়েছে।
বল, আমার বৌকে তো তুই চুমু খেয়েছিস। কনিষ্ক বললো।
ভালো দেখতে টাইট। নীরু বলেই ফিক করে হাসলো।
সবাই হেসে ফেললাম। মৈনাক দেবা এগিয়ে এলো।
শালা হারামী।
কেন তোর বৌ বাদ যাবে নাকি, তোর বৌ-এরটাও বলবো অনিকে।
হারামী তোর কাছে গেলে তো। দেবা বললো।
আচ্ছা মৈনাকের এখনো কিছু জুটলো না কেন নীরু।
জুটলোনা কে বলেছে।
তার মানে।
ও শালা প্রথমদিনই যদি বলে চলো দীঘায় ঘুরে আসি, বগলে হাত দেয়, সেই মেয়ে থাকে।
হ্যাঁরে ফিস ফিস করে গালি দিল, তোর মতো।
আমিতো বিয়ে করেছি। তুই করেছিস।
অমি কনিষ্ক বটা হাসছি। অনাদি বাসু গম্ভীর নেই।
নীরুর ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করেই বললো, দেবীর আগমন ঘটেছে। আমি এবার নিচে গিয়ে নিয়ে আসি।
উঠে দাঁড়াল।
এখন নিচেই রেখে আসিস। পরে নিয়ে আসিস।
কেন চুমা দেবে না।
আমি হাসছি।
মৈনাকের দিকে তাকালাম।
তুই শালা বহুত হারামী আছিস। নীরুর পেট থেকে টেনে টেনে কথা বার করছিস।
সত্যি বলনা মালটা কে, একটু দেখা ?
বলছি নেই, হলে দেখাতাম।
দেবা। আমি চেঁচালাম।

আমি ঠিক জানি না।
ওর দ্বারা প্রেম হয়, কেন হেজাচ্ছিস বলতো। কনিষ্ক বললো।
হারামী, তোমার দ্বারা খালি হয়। মৈনাক খেপে গেল।
আমি হাসছি।
চিকনা চা নিয়ে এসে ঢুকলো।
তাড়াতাড়ি সাঁটা।
কেন।
লোক জন এসে পরেছে।
এই অবেলায় কে এলো আবার।
তোর কে সুজিতদা না কে এসেছে। টিনা ম্যাডামের সঙ্গে আলাপ আছে, কথা বলছে।
দেবা দাঁড়িয়ে পরলো।
আমি যাই সুজিতদার সঙ্গে কথা বলি।
যা।
নীরুদার বৌ এসেছে। খুব হাসাহাসি চলছে। চলে এলো বলে।
কনিষ্ক চিকনাকে দেখছে আর হাসছে।
নেক্সট নিউজ চিকনা।
ম্যাডাম পাজামা পাঞ্জাবী বার করেছে সবার জন্য, নিয়ে আসছে।
কাদের জন্য ?
অনি তোমাদের আমাদের সবার জন্য।
আমরা পাজামা পাঞ্জাবী পরবো ?
সবাইকে পরাবে।
চা খা চা খা। বেশি কথা বলিস না এতে বিপদ বারবে।
কিরে শালা নিজেরা খেয়ে নিলি আমারটা কোথায়। নীরু ঢুকলো।
আর নেই।
মানে।
বটাদা খেয়ে নিয়েছে।
কনিষ্ক হাসছে।
কিছু বুঝলি নীরু ? কনিষ্ক বললো।
এতো বটার থেকে আর এক কাঠি ওপরে।
কার শিষ্য দেখতে হবে।
চিকনা চায়ের কাপটা নীরুর দিকে এগিয়ে দিল।
কনিষ্ককে বললাম তোরা বোস আমি একটু নিচ থেকে আসি। সুজিতদার সঙ্গে দেখা করে আসি।
যা। একটা টান মেরে যা।
আর ভালো লাগছে না।
নিচে নেমে এলাম।
বসার ঘরে ঢুকতেই দেখলাম চম্পকদা, সুজিতদা, বৌদি, দাদা, সনাতনবাবু, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা সবাই গোল টেবিল হয়ে বসেছে। বড়মার ঘরে মহিলাদের ভিড়।
আমি গিয়ে সামনে দাঁড়ালাম।
চম্পকদা হাসছে, সনাতনবাবু হাসছে।
যাক দাদা অনিবাবু তাহলে বিয়ে করলেন। চম্পকদা বললেন।
বিয়ে করলো মানে! একটু খানি নয়, পুরপুরি।
আমরাও নিশ্চিন্ত হলাম কি বলুন দাদা। সনাতনবাবু বললেন।
নিশ্চিন্ত হলাম কিনা বলতে পারবো না, তবে ছাড়া গরু বাঁধা পরলো।
হাসাহাসি হচ্ছে।
মিত্রা কাছে এগিয়ে এলো।
কিগো সুজিতদা গুবলুবাবু কোথায় ?
এইতো পিকুবাবুর সাথে বাগানের দিকে গেলো।
ছোটমা চায়ের কাপ ট্রেতে করে নিয়ে এলো।
ছোটমার দিকে তাকালাম।
এক ফোঁটাও পাবি না। তুইতো দাদাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিস।
ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিগো ছাড়িয়ে গেছে। ডাক্তারদাদা বললো।
সুজিতদা, ছোটমার সঙ্গে আলাপ হয়েছে ?
তোকে আর আলাপ করাতে হবে না।
শোন আমাদের লোকে বেচুবাবু বলে ডাকে। যেচে আলাপ করি।
আমি হাসছি।
বুলাবৌদি বলে উঠলো, উঁ মুরোদ কতো।
সরি সরি অনি আমার ভুল হয়ে গেছে বলাটা। ক্ষমা কর, আমি বেচেরাম, তুই বেচুবাবু।
সুজিতদা এমন ভাবে কথা বললো সবাই অবাক হয়ে গেল।
আমাদের চারপাশে ভিড় জমছে। সবাই বড়মার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কেন তুই অনিকে বেচুবাবু বলছিস সুজিত। চম্পকদা বললো।
আমি সারা জীবনে যা সেল করতে পারিনি ও তিনদিন আগে করে তা দেখিয়ে দিয়েছে। তাহলে নিজেকে কি করে বেচুবাবু বলি বল চম্পক।
তারমানে!
দিন তিনেক আগে হঠাৎ বাবুগিয়ে আমার অফিসে হাজির। তাও ধর ছয় থেকে সাতবছর পর। আমি দু’মাস ধরে একটা পার্টিকে নিয়ে ঘসরাচ্ছিলাম। বলতে পারিস আমার অফিসের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভগুলো পর্যন্ত ফেল মেরে গেছিল। ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। মানে উনি সেইদিন আমাদের বিদায় দিয়ে চলে আসছেন। ব্যাপারটা নেগেটিভ বলতে পারিস।
ও একঘন্টায় পটকে দিল। কি বুজুং বাজুং দিল সব শুনলাম কিন্তু ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। তারপর ভদ্রলোক অনির প্রতি গদোগদো হয়ে কন্ট্রাকটা দিল। সর্ত একটা অনিকে পুরো দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করতে হবে।
কত কামালি।
পঞ্চাশ।
এ্যাঁ।
এ্যাঁ না হ্যাঁ।
সকলে হাসছে।
অনিকে কি দিলি।
সঙ্গে সঙ্গে তিন দিয়ে দিলাম। আর তোদের কাগজকে পনেরো দিলাম।
হয়ে গেল।
কি হয়েগেল!
আমার সব্বনাশ করলি।
চম্পকদার কথায় সবাই হাসছে।
কেন তোর আবার কি সব্বনাশ করলাম।
সব্বনাশ করলি না। তুইতো ওটা অনিকে দিয়েছিস। আমাকে দিয়েছিস ?
তাতে কি হয়েছে।
দুদিন পরেই অনি আমাকে ডেকে বলবে চম্পকদা টার্গেট কতদূর। আমি কিন্তু আপনার টার্গেটের এতোটা এনে দিলাম। তারপর একটা চিঠি ধরাবে, আমার চাকরি খতম। তোর অফিসে একটা চাকরি দিস।
সবাই হাসছে।
সুজিতদা চোখ বড়োবড়ো করে বললো, অনি আজকাল এসব করছে নাকি!
পুরো দমে। এগুলোকে দেখেছিস।
মিলি, অদিতি, টিনা, দেবাদের দিকে তাকিয়ে বললো।
টিনাইতো ভেতরে ডেকে এনে সবার সঙ্গে আলাপ করাল।
এগুলো কোথায় কোথায় ছিল তুই জানিস।
হ্যাঁ জানি।
সবকটাকে তুলে এনে কাগজে জড়ো করেছে। বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা। ভাই আমাকে একটা চাকরি দিস, না হলে বৌ বাচ্চা নিয়ে না খেতে পেয়ে মরে যাব।
হাসি থেমে নেই।
সুজিতদা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
কিরে মিত্রা চম্পক যা বলছে সত্যি।
ওটা চম্পকদা আর বুবুন জানে।
বুবুন আবার কেরে।
তুই এটাও জানিস না। চম্পকদা বললো।
না।
ম্যাডাম অনিবাবুকে এই নামে ডাকেন, সেই কলেজ লাইফ থেকে। আর আমরা এখন অনিকে ছোটবাবু বলে ডাকি।
দাঁড়া দাঁড়া চম্পক, আমার মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।
বৌদির দিকে তাকিয়ে।
কিগো বুলা তুমি কিছু জান।
বৌদি হাসছে।
কি সাংঘাতিক তুমি, কই আগে কখনো আমাকে বলোনি!
আহা, সব বলা যায়। কি বল মিত্রা।
বৌদি এমন ভাবে বললো, সবাই হাসছে।
কি সনাতনবাবু আমি যা বললাম একবর্ণও মিথ্যে ? চম্পকদা বললেন।
একবারে না।
দাদাও হাসে, মল্লিকদাও হাসে।
তোকে কি বলবো সুজিত, আমরা কোন ছাড়, অনি আজকাল দাদাকে পর্যন্ত হুকুম করে।
করবে না। তোমরা সব এক গোয়ালের গরু। বড়মা খেঁকিয়ে উঠলো।
কাম সেরেছে। চম্পক এবার তুই চুপ কর। ছেলের নামে বলে ফেলেছিস, গায়ে লেগে গেছে। দাদা বললো।
সবাই হাসা হাসি করছে।
কইরে ওকে জামাকাপরটা দে।
বড়মা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
তোমরা একটু বোস। আমি আসছি।
আজ একটু গায়ে সেন্ট দিস। চম্পকদা চেঁচিয়ে বললো।
আবার হাসি।
আমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। মিত্রা আমাকে রাজ বেশ পরাল। সুরো এসে একবার পাঞ্জাবী ঠিক করে একবার চোস্তা ঠিক করে। নীপা সামনে দাঁড়িয়ে। দারুন সেজেছে সব। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেখবো।
একে একে সবাই আসতে আরম্ভ করেছে। অনিমেষদা এলেন বিধানদা এলেন। আমার পেছনে কিছুটা লাগলেন। বিধানদা একরাশ বই আমার জন্য নিয়ে এসেছে।
আমি হলফ করে বলতে পারি এগুলো তোর পড়া হয় নি।
আমি সবাইকে প্রণাম কে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ভেতরে তখন তুমুল আড্ডা শুরু হয়েগেছে।
একফাঁকে গিয়ে আমি ইসলামভাই আবিদ, রতন, সাগির, অবতার, নেপলাদের সঙ্গে দেখা করে এলাম। ওরা ভীষণ খুশী। সবাই যে যার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে। সবার পরনে নতুন কুর্তা পাঞ্জাবী। এ যেন মিত্রার হুকুম।
সুরো, নীপা, মিনতি সাজগোজ করে ঘুরছে। জ্যাঠিমনির চোখে প্রশান্তি। যে যেরকম পারছে ছবি তুলে যাচ্ছে। ইসলামভাই বাড়িটাকে বেশ সুন্দর সাজিয়েছে। চারিদিকে রুচির ছাপ স্পষ্ট। বড়মা ছোটমা, বৌদি সবার মধ্যমনি। বাইরের অতিথিদের সামলাচ্ছেন।
ভেতরের অতিথি সামলাচ্ছে লক্ষ্মী, কবিতা, দামিনীমাসি। দেখলাম মিত্রাও তার ক্লাবের কিছু বান্ধবীকে নিমন্ত্রণ করেছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। আমাকে আজকে যা রাজবেশ পরিয়েছে, তাতে আমার মাথা খারাপ। আমি এদিক ওদিক ঘুরছি।
আমি বাগানের পেছনে ছিলাম। চিকনা ছুটতে ছুটতে এসে বললো। তোকে এখুনি বৌদি ডাকছে। তোর স্যার এসেছে।
আমি তাড়াতাড়ি এলাম। ডঃ রায় ওনার স্ত্রী সুনন্দাদি ও শুভঙ্করবাবু। কলকাতায় আজ যাঁদের জন্য আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছি। কাছে গেলাম।
মিত্রা দাঁড়িয়ে আছে মাথা নীচু করে। স্যারকে ঘিরে অনিমেষদা, বিধানদা, ডাক্তারদাদা, দাদা, মল্লিকদা সবাই। আমি সবাইকে প্রণাম করলাম।
যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত অনি মিত্রাকে খুঁজে পেয়েছে, কি বলো সুতপা। ডঃ রায় বললেন।
আমি মিত্রা মাথা নীচু করে। সবাই হাসছে।
আমি নিশ্চিন্ত হলুম, আমার একটা চিন্তা দূর হলো বুঝলে অনিমেষ, কি পাগলামোটাই না করছিল তখন দু’জনে। শুভঙ্কর আমার মাথা খেয়ে ফেলে। সুনন্দাকে বলি তুমি অনি এলে চেপে ধরো।
আর বলবেন না স্যার। গত সপ্তাহের কথা একবার ভাবুন। বৌদি বললো।
আর মনে করিয়ে দিও না সুতপা। সেদিনটা বড়ো কষ্ট পেয়েছি।
কি মিনু তুমি যে আমার ছাত্রী, সেটা অনিকে বলেছো।
স্যার বড়মার দিকে তাকিয়ে বললেন।

না স্যার।
ওকে বলো।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম বড়মার দিকে।
এ কথাটা আগে কোনোদিন জানতাম না। আজ প্রথম শুনলাম।
অনিমেষ।
হ্যাঁ স্যার বলুন।
এবার ওকে তোমরা একটু জব্দ করো।
ওর মাথায় অনেক বড়ো বড়ো বুদ্ধি, বুদ্ধি গুলোকে একটু ঘসে মেজে তোমরা ছোট করে দাও।
বিধানবাবুকে সব কথা বলেছি।
বিধানবাবু আপনার সঙ্গে আলাপ ছিলো না। এই মুহূর্তে আলাপ হলো। আপনাকে আর কি বলবো। আমার ছাত্রটিকে একটু দেখুন।
বিধানদা হাসছেন।
যাও আমরা বুড়োরা একটু গল্প করি। তোমরা অতিথিদের দেখ।
আমি মিত্রা ভিড় থেকে বেরিয়ে এলাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। পরিতৃপ্ত চোখে সুখের ঝলকানি। ইসি পাশে।
জানিস অনি ডঃ রায় কোথাও কোনদিন যান না! ইসি বললো।
জানি।
তোর বিয়েতে এসেছে, আমি ভাবতেই পারছি না।
মিত্রা অনিমেষদার সঙ্গে ইসিতার আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
দিয়েছেরে দিয়েছে। সত্যি অনি এখন নিজের খুব খারাপ লাগছে। সকালে জেদ ধরে যদি না আসতাম খুব মিস করতাম।
ইসি সকালেও কথাটা একবার তোকে বলেছি, আমার কাছে অতীতটা অতীতই। আমি তার কাছ থেকে শিক্ষা নিই। চলি বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে। বরুণদা কোথায় ?
কাজ খুঁজছিল, ইসলামদা ওকে অতিথি আপ্যায়ন ঠিক হচ্ছে কিনা তার দায়িত্ব দিয়েছে।
পিকু ?
সে কোথায় খেলে বেরাচ্ছে গুবলুর সঙ্গে। তার মহা আনন্দ।
পায়ে পায়ে তিনজনে এগিয়ে এলাম, কনিষ্করা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে। নীরুর পেছনে কিছুটা লাগলাম। নীরুর বৌ হেসে খিল খিল।
অনিদা তুমি ওকে নিয়ে যা করো না।
আর টেলাতে হবে না। তোমরা সব বেইমান, আসার আগে বলেছিলে আমার পাশে থাকবে, এখন অনির দলে ভিড়ে গেছ। নীরুর কথায় সবাই হাসছে।
ওইতো অনিদা।
খালি এই কথাটা কানে এলো। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই দেখলাম একটা মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘসে দিলো। এরপর তিনজন একিভাবে।
পিঙ্কি, চুর্ণী, তিয়া, রিমঝিম।
মিনাক্ষীদেবীকেও দেখলাম। বুঝতে পারলাম নীরুর চোখ কপালে উঠে গেছে। আমি সবার সঙ্গে ওদের আলাপ করিয়ে দিলাম, মিত্রাকে ওরা জড়িয়ে ধরলো। এক একজন যা পোষাক পরেছে। সবাই তাকিয়ে আছে। চিকনা সঞ্জুর চোখ যেন আগুনে ঝলসে গেছে।
আমি ওদের নিয়ে বড়মা ছোটমাদের কাছে এলাম। আসার সময় নীরুর দিকে তাকিয়ে চোখ মারলাম।
ওদের সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। মিনাক্ষী দেবী এদিক ওদিক তাকালেন যেখানে অনিমেষদা স্যার দাদারা বসে আছেন সেদিকে চোখ যেতেই বললেন, ডঃ রায় না।
হ্যাঁ।
উনি এগিয়ে গেলেন।
ছোটমা আমার সঙ্গে এই কচি কচি সখীদের দেখে মুচকি মুচকি হাসছে।
মিত্রাকে ইশারা করে বললো ওরে ওকে সামলে রাখ। আমি হাসছি।
সুজিতদা এক দৃষ্টে ওদের দেখছে।
মিনাক্ষী দেবী স্যারের কাছে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
তুমি কোথা থেকে ?
অনি কাল ফোন করেছিল। ও নাকি একটা বিয়ে করেছে।
সবাই হাসছে।
ওরা চারজনে প্রণাম করলো সকলকে।
অনিমেষদা হাসতে হাসতে বললেন তাই বলি, আমাদের সরকার অথচো আমাদের পার্টি মুখপত্রে কেন বিজ্ঞাপন নেই। সব বিজ্ঞাপন কেন অনির কাগজে।
আমাদের কাগজের সার্কুলেসন বেশি তাই আমরা সরকারী বিজ্ঞাপন বেশি পাব। টিনা, মিলি, অদিতি একযোগে বলে উঠলো।
দেখছেন বিধানবাবু দেখছেন, অনির গ্রুপবাজি।
সবাই হাসছে।
ওরা চারজন মিত্রাকে যেন চেটে খাবে। এমন অবস্থা।
আমি ওদের রেখে আবার কনিষ্কদের কাছে গেলাম।
যেতেই চিকনা আর সঞ্জু আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘোষলো।
কনিষ্ক হেসে মাঠে গড়িয়ে পরে। নীরু আমার দিকে কট কট করে তাকিয়ে।
কি হলোরে।
আমরা অভাগা এরকম ছোঁয়া স্বপ্নে দু’একবার পাই। তাই তোর গালে গাল ঘোষলাম। চিকনা বলে উঠলো।
কনিষ্ক তখনো হাসছে।
মিত্রারা কাছে এলো। সবাই তখনো হাসছে।
চিকনা সঞ্জু গিয়ে মিত্রার হাত ধরলো।
কি হলো চিকনা।
দাঁড়ান ম্যাডাম, একবারে কথা বলবেন না।
বটা, কনিষ্ক, মৈনাক, দেবা হেসেই চলেছে।
কি হলো কনিষ্ক ব্যাপারটা কি।
বুঝতে পারছেন না।
মিত্রা অবাক চোখে তাকাল কনিষ্কর দিকে।
ওইযে চারপিশ আপনাকে আর অনিকে….।
মিত্রা এবার হেসে ফেললো।
অদিতি ইসিরাও হাসছে।
আমরা চেষ্টা করলেও পাব না ম্যাডাম। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম। চিকনা বললো।
নীরু কিন্তু রাগে ফুঁসছে অনি। কনিষ্ক বললো।
কেন।
তোর বৌ থাকতেও কচি কচি মেয়েগুলো তোর গালে গাল ঘসলো, ওর বৌ থাকতেও পেল না। ও বলছে আজকেই শ্রীপর্ণাকে ডিভোর্স করবে।
আমি হাসছি। অনাদি বাসুর হাসি থামে না।
ঠিক আছে নীরুকে দুঃখ করতে হবে না।
তুই এককাজ কর অনি, ওদের পেসেন্ট বানিয়ে দে। কনিষ্ক বললো।
কনিষ্ক খুব খারাপ হয়ে যাবে। মিত্রা চেঁচিয়ে উঠলো।
দেখলি অনি।
তুমি বটা একটা একটা করে নিয়ে নাওনা। মিত্রা বললো।
ফিট করে দিন।
মিলি, টিনা আড়চোখে একবার বটা কনিষ্কদের দিকে তাকাল।
তাহলে মৈনাককে বাদ দিলি কেন। আমি বললাম।
ওর চেন খুলে যাবে। মিত্রা এমন ভাবে বললো।
আবার সকলে হেসে ফেললো।
দেখলি দেখলি কনিষ্ক মিত্রা কি থেকে কি বললো।
মৈনাক মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
একবার পরিচয় করিয়ে দে। আজই নীরুর পেসেন্ট বানিয়ে দেব।
দে মৈনাক তাই দে আমার আত্মা একটু শান্তি পাক। নীরু বললো।
সবাই হাসছে।
আমি তাহলে অনিদার কাছে চলে যাব। শ্রীপর্ণা বললো।
ম্যাডামকে দেখেছ, ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে।
মিত্রা ইসি হাসতে হাসতে দু’জনে দু’পাশ থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।
মিলিরা হাসতে হাসতে মাঠে বসে পরেছে।
একি মিলি ম্যাডাম এরকম চকমকি পোষাক পরে মাঠে বসলেন। চিকনা এমন ভাবে বললো। আবার হাসি।
অনিদা।
পেছন ফিরে তাকালাম। ওরা চারজন এদিকে আসছে।
অনিরে তোর পায়ে পরি একটু কথা বলিয়ে দে। চিকনা দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
আমি বাদ যাই কেন। নীরু বললো।
তাহলে পেসেন্ট দেব না। মৈনাক বললো।
ঢ্যামনা।
মিত্রা কট কট করে তাকাল, নীরুর দিকে।
ওরা কাছে এলো।
অনিদা তুমি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে না।
তোমাদের সঙ্গে তো আলাপ করিয়ে দিলাম, কথা বলো।
হায় বলে ওরা শুরু করলো। সবার সঙ্গে হাতে হাত মেলালো। আমি লক্ষ্য করছি সবার মুখ। এক একজনের এক একরকম জিওগ্রাফি।
চিকনাকে হায় বলে হাতে হাত রাখতেই চিকনা সিঁটিয়ে গেল। দেঁত হাসি হেসে বললো, হেয়।
সঞ্জু একবার কট কট করে তাকাল চিকনার দিকে।
মৈনাক ওদের সঙ্গে ইংরাজীতে কথা বলা শুরু করেছে।
কনিষ্ক আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আস্তে করে বললো। এরা মডেল নাকিরে ?
মিত্রা শুনতে পেয়েছে। আমার দিকে তাকাল।
আমি মাথা দোলালাম।
সেই জন্য।
কি সেই জন্য ?
সব ট্রান্সপারেন্ট ব্রা পরেছে।
মিত্রা মুখের কাছে হাত নিয়ে হাসল।
হারামী। লক লক করছে।
আজ মনে হচ্ছে কুমার থেকে লাভ নেই বুঝলি অনি।
মিত্রা কনিষ্কর দিকে তাকাল।
রিমঝিম আমার দিকে এগিয়ে এলো।
অনিদা বৌদিকে কিন্তু তোমার থেকেও কিউট লাগছে।
আমার যে আবার বৌদির থেকে তোমাকে বেশি মিষ্টি লাগছে।
দুষ্টু।
মিত্রা রিমঝিমের কথায় হাঁসবে না কাঁদবে। ওর চোখের ভাষায় তাই বোঝাচ্ছে।
তুমি আমাদের কবে ক্লাস নেবে।
দেখি। একটা সপ্তাহ আমাকে একটু সময় দাও।
তিয়া এগিয়ে এলো। ডাগর চোখে আমার দিকে তাকাল। ওদের পেছনে চিকনা। চিকনা বুকে হাত দিয়ে অভিনয় করছে।
আমার বুক ফেটে গেল রে অনি।
আমি না পারছি হাসতে না পারছি গম্ভীর থাকতে। মৈনাক দেবা সবাই আমাকে ইসারা করছে ওরে তুই এদের নিয়ে কোথাও যা। মিলি টিনার চোখের ভাষাও তাই।
আমি বললাম চলো তোমাদের সঙ্গে একজনের আলাপ করিয়ে দিই, তোমাদেরই ফিল্ডের।
তাই! কি সুইট তুমি অনিদা। চুর্ণী বললো।
চলো সেই ভালো। তোমাকে তো কিছুক্ষণ একা পাওয়া যাবে।
আমি সুজিতদাকে খুঁজে বারকরলাম। সুজিতদা দেখেই হেসে ফেললো।
জোগাড় করে ফেলেছিস।
হ্যাঁ। তোমার পছন্দ।
পছন্দ মানে। তোকে একা পেলেই কথাবলবো ভেবেছিলাম।
কথাবলো সবার সঙ্গে। তোমার ভিজিটিং কার্ড দেবে। তারপর তোমার সঙ্গে আমি আলাদা করে কথাবলে নেব। সকলকে নিয়ে আমার আলাদা আলাদা পরিকল্পনা আছে।
ওদের দিকে তাকালাম। সুজিতদার পরিচয় দিলাম।
ওরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।

আমি বললাম, আমি ওদের একটু সময় দিই, তোমরা কথা বলো।
কথা বলেই তোমার কাছে যাচ্ছি।
আচ্ছা এসো।
আমি আবার ফিরে এলাম।
আসার সঙ্গে সঙ্গেই চিকনা সাষ্টাঙ্গে মাঠে শুয়ে পরে আমাকে প্রণাম করলো। তারপর উঠে পাঞ্জাবীটা ঝেড়ে নিলো।
এটা কি হলো কনিষ্ক।
গুরু প্রণাম। যদি প্রসাদ পাওয়া যায়।
মিত্রা বড়ো বড়ো চেখ করে কনিষ্কর দিকে তাকাচ্ছে।
তোকে কি সুন্দর দুষ্টু বললো, আমাকে বলেনা কেন অনি।
চিকনার কথায় ওরা হেসে গড়িয়ে পরে।
তুই এগুলোকে কোথা থেকে জোগাড় করেছিস বলতো। মিত্রা বললো।
ওইযে মীনাক্ষী ম্যাডামকে দেখলি, সেইদিন টিনাদের পাঠিয়েছিলাম।
হ্যাঁ।
রিমঝিম ওনার মেয়ে, আর একটা ঝিমলি ভাইজ্যাকে আছে। আর তিনটে রিমঝিমের বন্ধু।
ওরে বাবা তুইতো অনেক হিসেব নিকেষ করে জাল ফেলেছিস। কনিষ্ক বললো।
কনিষ্কের কথায় ওরা হাসছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে। চিকনা আমার হাতটা শুঁকে মিত্রার দিকে তাকাল।
একবার হাতটা শুঁকুন ম্যাডাম ওই মেয়েটার গন্ধ এখনও পাবেন।
মিত্রা হাসছে, ইসিও হেসে গড়িয়ে পরে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করলাম।
ওদের ইসারায় বললাম একমিনিট। একটু দূরে চলে গেলাম।
হ্যালো।
ঠাস হিন্দিতে ভেসে এলো কঠিন কন্ঠস্বর, শালা….ছেলে বেজন্মার বাচ্চা, বিয়ে করে খুব মজমা নিচ্ছ। কালকেই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ করবো।
আমাকে কথা বলার কোন সুযোগই দিল না। লাইনটা কেটে গেল।
মুখটা কঠিন হয়ে গেল। এই ভাবে আমাকে এখনো পর্যন্ত কেউ কোনদিন বলে নি। ভাবলাম একবার রিং ব্যাক করি। নিজেকে নিজে সামলালাম। না ঠিক হবে না। কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এই সময় মোটেই মাথা গরম করা চলবে না। সব পন্ড হয়ে যাবে। স্রেফ অভিনয় করে যেতে হবে। কিন্তু সুযোগ হাতছাড়া করলে চলবে না। পাখি একবার হাত থেকে উড়েগেলে বিপদ। হতে পারে কিছুই হবে না। তবু আমাকে এখন অনেক অঙ্ক কষে চলতে হবে। ফিরে দাঁড়ালাম। হাসি হাসি মুখ করে বললাম, তোরা একটু দাঁড়া আমি আসছি।
তুই কোথায় যাচ্ছিস। মিত্রা কাছে এগিয়ে এলো। সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখেছে।
একটু আসছি।
কে ফোন করেছিল ?
ওর চোখে গভীর জিজ্ঞাসা।
চিনবি না, বাইরের লোক।
তাহলে তুই ওইদিকে যাচ্ছিস।
পাঁচ মিনিট, এখুনি চলে আসব।
আমাকে বলবি না।
বলার হলে বলে দিতাম।
আমি দাঁড়ালাম না। মনে হয় অভিনয়টা ঠিক হল না। ধরা পরে গেলাম। কারুর প্রতি দুর্বলতা জন্মালে সব কিছু গোপন করা যায় না।
সোজা চলে এলাম রতনের কাছে। আস্তে করে ইশারায় ওকে কাছে ডেকে নিলাম।
কি হয়েছে অনিদা! কোন গড়বড় ?
না। সেরকম কিছু না।
তাহলে! তোমাকে কেমন ফিউজ দেখাচ্ছে।
তুই এই নম্বরে একটা ফোন কর।
কি হয়েছে আগে বলো।
এই নম্বর থেকে এখুনি একটা ফোন এলো।
কি বলেছে বলো।
কি বলতে পারে, বুঝতে পারছিস না।
শুয়োরের বাচ্চা। দাও নম্বরটা।
আমি মোবাইল দেখে ওকে নম্বরটা বললাম।
গলা নামিয়ে বললাম, চেঁচা মিচি করিস না। বাড়ি ভর্তি লোক।
ও নম্বরটা ডায়াল করতেই ওর মোবাইলে একটা নাম ভেসে এলো।
এতো বসিরের এসটিডি বুথের নম্বর। কাশীপুরে থাকে।
জিজ্ঞাসা কর পাঁচ মিনিটের মধ্যে কারা এই নম্বর থেকে ফোন করেছে। সাউন্ড অন কর।
কেরে বসির।
হ্যাঁ গুরু।
তোর ওখানে কে এসেছে।
কেউ না।
শুয়োর, সত্যি কথা বল।
খুব চেঁচা মিচি হচ্ছে গুরু, কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
চল ওইখানে যাই। আমি বললাম।
দুজনে বাগানের শেষপ্রান্তে চলে এলাম। দেখলাম আবিদ নেপলা পেছন পেছন এসে হাজির।
কি হয়েছে রতনদা। আবিদ বললো।
দুজনেরি চোখের রং বদলে গেছে।
মনে মনে বললাম, এরা গন্ধও পায়।
দাঁড়া একটু।
বল বসির কে এসেছিল তোর এসটিডি বুথে।
কেউ না।
এখুনি কে এসে ফোন করছিল তোর এসটিডি বুথ থেকে।
দু’জন এসেছিল। চলে গেল।
তুই চিনিস।
না।
সত্যি কথা বল।
তুমি বিশ্বাস করো।
তুই আমাকে দে রতনদা। তোর দ্বারা হবেনা।
আবিদ ফোনটা কেরে নিল রতনের হাত থেকে। প্রথমেই মা মাসি উদ্ধার করে দিল। এবার বল বসির। আমি আবিদ।
তুই বিশ্বাস কর আবিদ। আমি চিনি না।
ঝাঁপ বন্ধ করে এখুনি তুই ওদের পাত্তা লাগা, আমি যাচ্ছি।
ওরা পাশের একটা রেস্ট হাউসে আছে। কাশীপুর গানসেল ফ্যাক্টারির সামনে।
নজর রাখ। কজন এসেছিল।
দুজন। গুরু সেরকম কিছু। মাল পত্র সব বার করবো ?
ওরা যখন ফোন করে, কিছু শুনিস নি।
বললো কাল কাকে ওরাবে।
কোন নম্বরে ফোন করেছিল ?
দাঁড়া দেখে বলছি।
বসির নম্বরটা বললো।
আমার মোবাইলেরই নম্বরটা বললো।
ওরে খান….ছেলে। তুই এখুনি মালপত্র বার কর। আমি যাচ্ছি। পাখী যেন উড়ে না যায়। তাহলে তোকে ঝেড়ে দেব।
আমি কি করলাম।
কাঁচা কাঁচা খিস্তি, কি করলি। যা বলছি কর।
এখুনি ঝাঁপ বন্ধ করছি।
পেছন ঘুরে দেখলাম চিকনা পাশে দাঁড়িয়ে। ওর চোখ মুখের চেহারা বদলেগেছে।
আবিদ ওগুলোকে যে কোন প্রকারে গ্যারেজ কর। মনে হচ্ছে এখনো কিছু বাকি আছে। কথা শুনে মনে হলো ইউপির লোক। মন বলছে রাজনাথের চেলুয়া, ইউপি থেকে এসেছে।
সেরকম বুঝলে উড়িয়ে দেব।
ঘাউড়ামি করবি না।
আবিদ মাথা নীচু করলো।
ওমপ্রকাশ কোথায় ?
ও বাড়িতে আছে।
আর কে আছে।
আরও লোক আছে, তোমাকে ভাবতে হবে না।
ওমপ্রকাশকে আগে ওখানে পাঠিয়ে দে। তোর যেতে যেতে ওম পৌঁছে যাবে। ওই বাড়ি থেকে স্পটটা কাছে। অনিমেষদাকে এখন কিছু জানান যাবে না।
তুমি পাগল হয়েছো।
ইসলামভাই কোথায় ?
ওখানে আছে।
রতন বাইরেটা ভালো করে দেখে নে একবার। নেপলা ভেতরে থাকুক।
বাইরে সব লোক আছে, তোমাকে ভাবতে হবে না। তাছাড়া থানা থেকেও লোক এসেছে।
আচ্ছা।
যা বেড়িয়ে যা, আমাকে একটা ফোন করবি।
আচ্ছা।
আমি যাব আবিদদা। চিকনা বললো।
না দাদা এইকাজ তোমার নয়। দাদাকে দেখছ না। কতো কুল।
আবিদ বেরিয়ে গেল।
নেপলা একটা ঠান্ডা আনতো।
নেপলা দৌড় লাগাল। ওখানে গিয়ে কিছু বলিসনা যেন।
তুমি পাগল হয়েছো অনিদা।
চিকনা একটা সিগারেট দে।
সাগির, অবতার কোথায় ?
দাদার কাছে। ব্যাটারা পুরো চেঞ্জ।
হাসলাম।
ঠিক হয়ে যাবে দেখিস রতন। একটা ধাক্কা ওদের দরকার ছিল।
নেপলা একটা ঠান্ডার বোতল নিয়ে এলো। আলগোছে কিছুটা ঢক ঢক করে খেলাম। তারপর রতনের হাতে দিলাম। ওরা তিনজন ভাগাভাগি করে খেল।
তোমাকে কি বললো ? রতন বললো।
কয়েকটা খারাপ কথা বললো।
ঠিক আছে তুমি যাও। দাদা নাহলে সন্দেহ করবে। চোখ তো নয় চারদিকে বনবন করে ঘুরছে।
হেসে ফেললাম।
পায়ে পায়ে আবার ওদের কাছে চলে এলাম। তাল কেটেছে বুঝতে পারছি, তবু হাসি মস্করা চালিয়ে গেলাম।
মিত্রা একদৃষ্টে আমাকে দেখে যাচ্ছে।
দেখলাম গেট দিয়ে নিরঞ্জনদা, অনুপদা, রূপায়ণদা ঢুকলো।
আমি এগিয়ে গেলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন। কাছে গিয়ে সবাইকে প্রণাম করলাম।
বাবাঃ অনিবাবুকে আজ চেনাই যাচ্ছেনা তাই না অনুপ। রূপায়ণদা বললেন।
বিয়ে বলে কথা।
যাঃ বিয়ে হয়ে গেছে। নিরঞ্জনদা বললো।
আমি হাসছি।
কি ম্যাডাম এখন নো টেনসন, ডু ফুর্তি।
মিত্রা হাসলো।
আমি ওদের সঙ্গে করে অনিমেষদাদের কাছে এলাম। তারপর ঘুরে ঘুরে যারা যারা খাচ্ছেন তাদের কাছে গেলাম। কুশল বিনিময় করলাম। ওরা সবাই পাশে আছে। নীপা সুরোকে দেখলাম রিমঝিমদের সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্প করছে। আমায় দেখে হাত নারলো। আমিও হাত নারলাম। আমি একটু এগিয়ে গেছি। পেছনে মিত্রা চিকনা কথা বলছে। বুঝলাম মিত্রা চিকনাকে চেপে ধরেছে। চিকনা হাসছে। মিত্রার সঙ্গে ফাজলাম করছে।
ডঃ রায় চলেগেলেন রিমঝিমরাও চলে গেল। আস্তে আস্তে মিত্রার ক্লাবের বন্ধুরাও চলে গেল। যাওয়ার সময় হেসে বললো আপনার সঙ্গে ঠিক ভাবে কথা বলা হলো না। তবে আপনার বন্ধুরা ভীষণ লাইভ।
হাসলাম।
একদিন ক্লাবে আসুন না।
মিত্রা মুখ বেঁকিয়ে বললো। ক্লাবে! হয়েছে তাহলে।
একজন বললো, কি আপনি যাবেন না ?

আমি কোনদিন যাই নি আপনাদের ক্লাবে। মিত্রা নিয়ে গেলেই যাব।
যাসনি মানে! তাহলে আমাদের ক্লাবের এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার তোর কে হয় ?
ঠিক আছে ঠিক আছে, আগামী সপ্তাহে অনিন্দিতার বার্থডে, তুই ওনাকে নিয়ে আয়।
গেলেই নিয়ে যাব।
আমি হাসলাম। সময় পেলে অবশ্যই যাব।
গেট পর্যন্ত আমি মিত্রা এগিয়ে দিলাম।
ওরা চলে গেল। দেখি একটা ট্যাক্সি থেকে হিমাংশু রেবা নামলো।
ওদরকে ভতরে নিয়ে এলাম। কবিষ্কদের সঙ্গ জমে গেল।
মনটা ঠিক নেই বার বার খচ খচ করছে।
একে একে নিমন্ত্রিত যারা ছিল সবাই কম বেশি চলে গেল। এখনো কিছু আছে। তারা অফিসের লোকজন। দাদা যে এতো জনকে বলবে আশা করিনি। কাকা কাকীমা সুরো মাসি খেয়ে নিয়েছে। ওরা এই রান্না খাবে না, তার জন্য সুরো মাসি আলাদা রান্না করছে, ওরা তাই খেয়েছে। ওরা ডাক্তারদাদার বাড়িতে শুতে গেল। নীপা সব দেখিয়ে দিয়ে এলো। আমি রান্নার জায়গায় এলাম। ইসলামভাই-এগিয়ে এলো।
দারুন সার্ভিস দিলে।
জীবনে প্রথম, বিশ্বাস কর। ভয় করছিল।
কেন।
এতো যে সে লোকের বিয়ে নয়। অনির বিয়ে বলে কথা। গেস্ট কারা দেখতে হবে।
এই আবার শুরু করলে।
কিরে মামনি আমি ভুল কথা বলেছি।
একেবারে না। আমরা সব চুনপুঁটি। ও বাবু বলে কথা।
ইসি হাসছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। মাথায় রাখিস কথাটা।
তুই একটুতেই কেমন আজ রাগ করছিস। এরকম তো ছিলি না। তোর কিছু হয়েছে ?
ওর চোখের দিকে তাকালাম। মিত্রা এখন অনেক বেশি পরিণত। হয়তো ছিল। আমাকে এতদিন বুঝে নিল। এবার খোলস থেকে নিজেকে আস্তে আস্তে বার করছে।
দেখ ইসলামভাই আমার দিকে কেমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন আজ প্রথম দেখছে।
ঠিকি তো। তোকে আজ ও প্রথম দেখছে। ইসলামভাই হাসছে।
আমি হাসলাম।
পকেটে মোবাইলাটা ভাইব্রেট করছে। রিং অফ করে ভাইব্রেসন মুডে দিয়ে রেখেছি। বুঝছি কেউ ফোন করছে। বার করতে পারছি না। মিত্রা ধরে ফেলবে। এদিক ওদিক তাকালাম রতন ধারে কাছে নেই।
তোমার মামনিকে একটা ঠ্যাং এনে দাও বসে বসে চিবোক।
তুই কোথায় যাবি ?
বাবু বলে কথা, লোকজনদের দেখা শোনা করতে হবে না। ঠিক মতো খাচ্ছে কিনা।
মিত্রা হেসে ফেললো। আমাকে জড়িয়ে ধরে গাল ফুলিয়ে বললো, কি রাগ তোর।
দেখলে ইসলামভাই কোথায় রাগ করলাম বলো।
ইসলামভাই হাসছে।
সাগির দুটো প্লেটে করে মুরগীর ঠ্যাং এনে দিল। সবাই একটা একটা করে তুলে নিল। আমিও একটা তুলে নিয়ে হাঁটা দিলাম। ওরা সবাই ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। মিত্রা একবার আমাকে খালি আড়চোখে দেখলো। সোজা গেটের বাইরে চলে এলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ দেখছে কিনা। আমি মিত্রার চোখের আড়ালে চলে এসেছি। ঠ্যাং খাওয়া মাথায়। ফোনটা পকেট থেকে বার করে দেখলাম আবিদের ফোন। রিং ব্যাক করলাম।
আবিদ ধরলো।
বল।
আমি আসার আগেই ওম গ্যারেজ করে দিয়েছে।
কজন ছিল ?
চারজন ছিল।
বসির কোথায় ?
আমার পাশে।
ও আমাকে চেনে ?
না। তোমার নাম শুনেছে। ও তোমার নম্বর জানলে ওখানেই পুঁতে দিত।
এখন কোথায় ?
বসিরের ডেরায়।
ওখানে রাখিস না। তুলে এনে তোদের ডেরায় ঢুকিয়ে দে।
ঠিক আছে।
কি বুঝলি কথা বলে।
নিপাট ছেলে পুলে বলে মনে হচ্ছে। সঙ্গে কোন মালপত্র নেই।
তাহলে!
এদের মধ্যে একজন বলছে রাজনাথের ভাইপো।
আমার নম্বর পেল কি করে ?
প্রবীরদা এসেছিল বিকেলে। ওরা তাই বলছে।
প্রবীরদা!
হ্যাঁ।
শোন তুই এখুনি চলে আয় ওদের রেখে। তুই এলে খেতে বসবো। চারদিকটা বেঁধে আসিস।
আচ্ছা।
সঙ্গে সঙ্গে তিনটে ফোন করলাম। অরিত্র অর্ককে ম্যাসেজ করে বললাম সজাগ থাকবি।
ভেতরে চলে এলাম। দেখলাম মিত্রা গেটের মুখে একলা। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলো।
প্লিজ বুবুন তুই বল কি হয়েছে। ফোনটা আসার পর থেকে দেখছি তুই তোর মধ্যে নেই। আজ এই আনন্দের দিনে কেন তুই ঝামেলা করছিস। আমার একটুও ভাল লাগছে না।
তোর কি আমাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে।
তাহলে তুই আমাকে লুকচ্ছিস কেন।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে।
চিকনা সব শুনেছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলেই পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে। কি সব বিচ্চু তৈরি করেছিস সকলকে। আমি ইসলামভাইকে গিয়ে এখুনি বলবো।
কি হবে। একটা কেওশ হবে, তুই সেটা চাস।
তাহলে বলছিস না কেন।
সারারাত পরে আছে। আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি।
কোন খারপ খবর।
ভালো খবর থাকলে আমাকে উতলা দেখায়।
গলা নামিয়ে বললাম।
একমাত্র তুই ধরতে পেরেছিস। আর কেউ ধরতে পারে নি।
কনিষ্ক কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে।
ও বহুত শেয়ানা ছেলে।
শেয়ানা মানে। আমি এতদিন তোর পাশে শুয়ে যা বুঝতে পারি না ও বুঝে যায়।
মিত্রার গালটা ধরে একটু নেড়ে দিলাম।
এই যে স্যার আমরা এসে গেছি।
পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম মুখার্জীদা তার গ্যাং।
অর্ক অরিত্ররা ছুটে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে একবার সিগন্যাল করলো পেয়েছি।
আবার হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। সবাই আজ সাধারণ পোষাকে। কিন্তু দেখে বোঝা যাচ্ছে কোমরে সাঁটান আছে সবকটার, দলে প্রায় পনেরো জন।
আমাদের হৈ হৈ শুনে বিধানদা, অনিমেষদা, অনুপদা, রূপায়ণদা বাইরে বেরিয়ে এলেন। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় হলো।
ওরা চারটে বড়ো বড়ো ফুলের বুকে নিয়ে এসেছে। আর একটা ব্যাগ। সবাই এখন বাগানে। আমি আলাপ করিয়ে দিলাম মিত্রার সঙ্গে। ওরা ফুলের বুকে গুলো মিত্রার হাতে দিল। ব্যাগটা আমার হাতে দিল।
এটা কি মুখার্জীবাবু।
আপনার এনজিওর জন্য আগাম ডোনেসন। আমার ছেলেপুলেদের আপনার এনজিওর ব্যাপারে সব বলেছি, ওরা বলেছে, অনিবাবু ভালো কাজ করছেন, আমাদের যদি সাহায্য লাগে আমরা সাহায্য করবো। পারলে সপ্তাহে একদিন ফ্রি সার্ভিস দেব।
অনুপ, মুখার্জীবাবুর কথা শুনলে। ডোনেসন চলে এলো। তোমার বাড়ি এখনো ঠিক হলো না। অনিমেষদা বললেন।
হয়েগেছে। ঝামেলাটা শেষ হলেই অনিকে নিয়ে যাব। দামিনীমাসিকে দেখিয়েছি। ওনার পছন্দ।
তাহলে আমার দেখার কি আছে। কাজ তো ওরা করবে। আমি খালি জোগাড় যন্ত্র করে দেব।
সে বললে হয় বাবা, খালি গা বাঁচিয়ে চললে চলবে।
একচোট হাঁসা হাঁসি হলো।
মুখার্জীবাবু তার দল বল অনুরোধ করলো দামিনীমাসিকে দেখবে কথা বলবে। ওদের অনুরোধ রাখলাম। মিত্রা সমস্ত ব্যাপারটা সামলালো।
সন্দীপ এলো ওর বউকে নিয়ে, সেতো মিত্রার সামনে কিছুতেই দাঁড়িয়ে কথা বলবে না। মিত্রা আমার স্ত্রী নয় ওর মালকিন। শেষমেষ দাদা এসে রফা করলো।
বেশ হাসা হাসি হলো।
ওরা সবাই বেশ হৈ হৈ করে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া দাওয়া করলেন। তারপর একে একে সবাই বিদায় নিলেন। আমি মিত্রা মাঝে মাঝে গেট পর্যন্ত যাই আর এগিয়ে দিই।
এখন লনটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। চারিদিকে আলোর রোশনাই। বসার ঘরে এলাম।
সবাই গা এলিয়ে দিয়েছে। বৌদি অনিমেষদা পাশাপাশি বসে গল্প করছে।
আর একদিকে বিধানদা, অনুপদা, রূপায়ণদা, নিরঞ্জনদা।
এইযে ড্যাবা ডেবী, বাইরের দিকে কোথায় যাওয়া হয়েছিল। অনিমেষদা বললেন।
আমি হাসলাম।
অনিমেষদা হাসছে।
ফটোটা দেখেছিস।
দারুণ গিফ্ট। আমার জীবনের সেরা।
আমি গিয়ে অনিমেষদা বৌদির মাঝখানে বসলাম।
দেখলে দেখলে ছেলের কান্ড। উনি আর কোথাও জায়গা পেলেন না। বৌদি বলে উঠলো।
তোমরা তো কিছু খাও নি। খিদে পায় নি ?
বুঝেছি তোর খিদে লেগেছে। ও ছোট দেখ তোর পোলা কি বলে। বৌদি চেঁচিয়ে উঠলো।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো।
ছোটমা রান্নাঘর থেকে একবার মুখ বার করলো।
দেখ বেচারার মুখটা খিদেয় একেবারে আমসি হয়েগেছে।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
ব্যাগটা নিয়ে গেছিলে সেদিন।
ঠিক মনে করিয়েছিস। তুই কতো দিয়েছিলি।
জানিনা। মিত্রাকে বলেছিলাম, তোমাকে ব্যাগটা দিতে।
গুনিস নি।
না।
অনেক বেশি ছিল।
ফেরত দাও।
দিয়েগেছি, তোকে মিত্রা বলে নি ?
মিত্রা আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
কিরে তুই বলিস নি ? অনিমেষদা বললো।
তুই সব বলিস।
দেখলে দেখলে বৌদি।
বেশ করেছে, তোর বেশি আছে একটু যাওয়া ভাল।
না গো কাজের জন্য সুজিতদা ওটা দিয়েছে।
মিত্রা হাসছে।
আমি ওকে বলেছিলাম, অনিমেষদারটা দিয়ে বাকিটা তুই রেখে দিস।
দেখলাম অনুপদার ফোনটা বেজে উঠলো অনুপদা উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো। তারপর বিধানদাকে বাইরে ডেকে নিল। মুখটা গম্ভীর।
ছোটমা একটা প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে এসে আমার মুখে একটা দিল একটা মিত্রার মুখে দিল।
এখন মিষ্টি খাওয়াচ্ছিস খেতে দিবিনা ? বৌদি বললো।
তুমি একটা খাও।
বৌদি হাঁ করলো। ছোটমা মুখে দিয়ে দিল।
দাদা আপনি একটা তুলে নিন।
নাগো অনেক মিষ্টি খেয়ে ফেলেছি, আর না।
ছোটমা নিরঞ্জনদাকে দিল, রূপায়নদাকে দিল।
ছোটমা অনিমেষদার দিকে তাকাল।
দাদা, বিধানদা অনুপ গেলো কোথায়।
বাইরে।

ছোটমা বাইরে গেল। ঘরে ঢুকে বললো, দাদা আপনাকে বিধানদা একবার ডাকছেন।
অনিমেষদা উঠে চলে গেল।
মিত্রা ঝুপ করে বৌদির পাশে এসে বসলো।
বৌদি হাসছে। তুই এতোক্ষণ সুযোগ খুঁজছিলি না।
মিত্রা মাথা দোলাল।
হ্যাঁরে মিত্রা কনিষ্কদের দেখতে পাচ্ছি না।
তোর ঘরে জোড় আড্ডা চলছে। সুরো দু’বার এসে বলে গেছে, কনিষ্কদা অনিদার গল্প বলছে, শুনবে যদি চলে এসো। বৌদি বললো।
কনিষ্কটা কি পাগল বলো। আমি বললাম।
কনিষ্ক পাগল না তুই পাগল। ওদের পাগল বানাল কে ?
বাবাঃ তুমি যে ছক্কা হাঁকিয়ে দিলে।
হাঁকাব না।
বিধানদা, অনিমেষদা, অনুপদা ভাবলেশহীন মুখে ঘরে ঢুকলেন।
ওরা অপরজিট সোফায় বসলেন।
তিনজনেই নীচু স্বরে কথা বলছেন। আমাকে আড়চোখে দেখছে। আমি বৌদির সঙ্গে গল্প করছি।
ডাক্তারদাদা ঘরে ঢুকলো, চেঁচিয়ে বললো অনিমেষবাবু খাওয়া দাওয়া হবে না। বেশ রাত হয়ছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়াও দেখে আসি বাইরে না ভেতরে কোথায় ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আজ ভেতরে খাব না। সকলে মিলে একসঙ্গে বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাব। ডাক্তারদাদা বললো।
বড়মার ঘরে একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম বেশ জমিয়ে গল্প হচ্ছে। আমাকে দেখে বড়মা বললো, আয় ভেতরে আয়।
ডাক্তারদাদার খিদে লেগেছে।
মরন, সন্ধ্যে থেকে এটা নয় সেটা খালি খেয়ে যাচ্ছে, কোন পেটে খিদে লাগে শুনি।
কথা বলতে বলতে বড়মা খাট থেকে নেমে এলো। কাছে এসে বললো।
কোথায় সামন্ত।
ডাক্তারদাদা সামনেই ছিল।
আমি এখানে।
তোমার নাকি খিদে লেগেছে।
সবাই হেসে ফেললো।
তুমি কোন পেটে খাবে বলো। সন্ধ্যে থেকে তো মুখ থেমে নেই।
ওগুলো টুক টাক এবার পেট ভর্তি করে খেতে হবে।
বিধানদা, অনিমেষদা হাসছে বড়মা ডাক্তারদাদার কথায়।
ও ছোট, এখানে ব্যবস্থা করবি, না বাইরে খাবি।
আজ ঘরে খাব না। বাইরে খাব। ডাক্তারদাদা বললো।
দেখ কান্ড, বুড়ো হয়েছো এখনো সখ যায় নি।
ইসলামভাই গেটের মুখে এসে দাঁড়াল।
কিগো তোমার সব ব্যবস্থা হয়েছে। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি সেই জন্য এলাম এখানে না বাগানে।
বাগানে ব্যবস্থা করো।
বড়মার ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে এসেছে। দামিনী মাসিকে আজ ভীষণ ভাল লাগছে। দেখে কেউ বলবে না দামিনী মাসি ওই পাড়ার মেয়ে। আমি কাছে গিয়ে আস্তে করে বললাম, খুশি।
মাসি পরিতৃপ্ত চোখে আমার গালে হাত বুলিয়ে দিল।
আমি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম বারান্দার এক কোনে রতন, আবিদ, নেপলা দাঁড়িয়ে। ইসারায় বললাম এখন কোন কথা বলিস না।
নেপলাকে বললাম যা আমার ঘর থেকে সবাইকে ডেকে আন।
একে একে সব বাগানে আসছে। তিনটে টেবিল পাতা হয়েছে।
যার যেরকম প্রয়োজন দাঁড়িয়েও খেতে পারে আবার বসেও খেতে পারে। সার্ভিসের ছেলে গুলো আমাকে দেখে হাসলো।
অনিদা এতদিন আপনার নাম শুনেছি, দেখি নি। আজ দেখলাম।
আমি হাসলাম।
সুরো ছুটতে ছুটতে এলো।
অনিদা অনিদা আজ আমি তোমার পাশে বসবো।
কোন বসা বসির সিন নেই, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাড় চিবোবি।
ওরা সবাই টেবিলের কাছে এসে পরেছে, হাসছে।
বুফে।
হ্যাঁ।
কি মজা নিজে নিজে নিয়ে খেতে হবে।
পারলে নিবি নাহলে ওরা দিয়ে দেবে।
ওর দিকে একবার ভালো করে তাকালাম।
একটু আগে খোঁপা বাধাঁ ছিল এখন খোঁপা খুলে এলো চুল। ওকে বললাম।
এই নিয়ে ফোর্থ টাইম ড্রেস চেঞ্জ হলো।
সুরো হাসছে।
একরাতে চারবার ড্রেস চেঞ্জ!
হ্যাঁ। একটা বড়মা, একটা ছোটমা একটা ইসলামভাই, একটা মাসি। তুমিতো কিছু দিলে না।
ওরা হাসছে। হাসির চোটে ইসির শরীর কাঁপছে।
আমি দিলাম না মানে!
মিত্রাকে দেখিয়ে বললাম।
এরকম একটা জলজ্যান্ত বৌদি দিলাম তোকে। তুই বললি সেদিন, অনিদার বিয়েতে সাজবো। তাই বাধ্য হয়ে বিয়ে করলাম, আর তুই বলছিস কিছু দিই না। নেমকহারাম, মনে রাখিস নোট পাবি না।
চাই না। বৌদি দিয়ে দিয়েছে।
তারমানে!
তুমি তখন নিচে ছিলে, আলমাড়ি থেকে বার করে তোমার সব খাতা দিয়ে দিয়েছে।
অনিমেষদা, বিধানদা পর্যন্ত সুরোর কথায় হাসছে।
তোকে ওইই জব্দ করতে পারবে। অনিমেষদা বললো।
ইসি এগিয়ে এসে বললো, তোর ওপর ওর কি জোর।
ওকে যখন প্রথম দেখি তখন ওর দশ বছর বয়স, এখন ও লেডি, আমার সব অলিগলি ওর ঘোরা হয়েগেছে।
সুরো লাফাতে লাফাতে চলেগেল ইসলামভাই-এর ওখানে হল্লা শুরু করে দিল। নীপাও ওর পেছনে। বড়মা, ছোটমা, বৌদি জ্যেঠিমনি কথা বলছে।
পিকু কোথায় ইসি।
বড়মার খাটে ঘুম দিচ্ছে।
খুব পরিশ্রম হয়েগেছে বাচারার আজ।
পরিশ্রম মানে। সুরো চারটে চেঞ্জ করেছে ও সাতটা।
হাসলাম।
খাবার এলো।
ছেলেগুলো সব ঝপাঝপ দিচ্ছে। খাওয়া শুরু হয়েছে। হাসি মস্করা চলছেই। কনিষ্ক, বটা নীরুর পেছনে কন্টিনিউ লেগে রয়েছে। শ্রীপর্ণা হেসেই চলেছে। ওদিকে সঞ্জু চিকনার ডুয়েট চলছে। আমরা সবাই গোল করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছি। অনিমেষদা খেতে খেতে বললো।
অনি তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো ?
অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
আমি জানি তুই কোন ভনিতা পছন্দ করিসনা। কাজের ব্যাপারে তুই ভীষণ রাফ এবং টাফ।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। চোখে জিজ্ঞাসা সবাই আমাকে দেখছে।
অনিমেষদার কথা বলার ভঙ্গিতে দাদা কিছু আঁচ করতে পারল।
কেন অনিমেষ ও কি আবার কোন গন্ডগোল পাকিয়েছে।
সেরকম কিছু নয়। আবার বলতে পারেন একটু পাকিয়েছে।
কিরে অনি ঠিক বলছি।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
আমি কি করে বলবো। তুমি বললে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করবে। এখনো করলে না।
সরাসরি অনিমেষদার চোখে চোখ রাখলাম।
আগে তোমার প্রশ্নটা কি বলো তারপর উত্তর দেব।
আমি কি বলতে চাই তুই বুঝতে পেরেছিস। আমি বড়দি, ছোট, দাদা, মল্লিক, তোর বৌদি আমরা যারা আছি তাদের সবার হয়ে তোকে রিকোয়েস্ট করছি ওদের ছেড়ে দে। একটা ভুল করে ফেলেছে। এবারটার মতো মাফ করে দে। ওরা আর এ ভুল করবে না। আমি বিধানবাবু যা বলার বলে দিয়েছি।
কি হয়েছে দাদা! ইসলামভাই বললো।
দেখলাম সবাই গুটি গুটি পায়ে আমাদের চারপাশে এসে ভিড় করেছে। তা বলে খাওয়া বন্ধ নেই খাওয়া চলছে।
তুমি কিছু জান না! অনিমেষদা বললো।
না দাদা।
তাহলে তোমার থেকেও অনির ক্ষমতা বেশি।
অস্বীকার করবনা। ও এখন মাঝে মাঝে আমাকেই ধমকায়।
রতনের দিকে তাকিয়ে।
কিরে রতন কি হয়েছে ?
কিছু না।
তাহলে দাদা কি বলছে।
বুঝতে পারছি না।
ইসলামভাই হেসে ফেললো।
দাদা এরা এখন আমার হাতের বাইরে।
দেখছো তাহলে ইসলাম তোমার লোকজন তোমাকে কিছু বলেনা।
কিরে অনি তুই কিছু বলছিস না চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিস। দাদা ধমক লাগাল।
যা বাবা, আমি কি করে বলবো।
অনিমেষদা খোলসা করে বলুক আগে ব্যাপারটা কি। তারপরে আমি বলবো।
জানেন দাদা আমরা প্রসাশন চালাই, আমরা যে কাজটা করতে ঘন্টা পাঁচেক সময় নেব ও সেটা একঘন্টাতে করে দেয়। বুঝুন ওর নেটওয়ার্ক।
আমাদের টুকরো টুকরো কথা চলছে সবাই খেয়ে যাচ্ছে আর শুনে যাচ্ছে। মিত্রা আমাকে প্রবল ভাবে মেপে চলেছে। ইসি বরুণদা বুঝতে পারছে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। চোখে মুখে একরাশ বিস্ময়।
আমি ইচ্ছে করে বললাম, দাদা তুমি একটা অন্যায় করেছ।
আমি আবার কি অন্যায় করলাম।
বড়মা দাদার দিকে তাকাল।
তুমি সবাইকে নেমন্তন্ন করলে প্রবীরদাকে নেমন্তন্ন করলে না।
অনিমেষদার দিকে তাকালাম। অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে। শেয়ানে শেয়ানে কোলা কুলি চলছে বিধানদা, রূপায়ণদা, অনুপদা, নিরঞ্জনাদার চোখ স্থির।
করিনি মানে! তুই অনিমেষকে জিজ্ঞাসা কর, আমি নিজে গিয়ে বলে এসেছি সকলকে।
অনিমেষদা ফিক করে হেসে ফেললো।
টোপ দিচ্ছিস, চার ফেলে দেখছিস, মাছ খায় কিনা। তোর বুদ্ধির কাছে মাঝে মাঝে আমিও হার মেনে যাই। অনিমেষদা বললো।
কনিষ্ক স্থির চোখে আমাকে দেখছে। নীরু বটারও চোখ স্থির। ওরা আমার এরকম পারফর্মেন্স প্রথম দেখছে।
কি হলো তুমি হাসলে কেন। নিজেরা চলে এলে প্রবীরদাকে আনতে পারলে না।
আমি কথাটা রূপায়নদাদের দিকে ছুঁড়ে দিলাম।
বৌদি একবার আমার দিকে তাকায় একবার অনিমেষদার দিকে তাকায়।
লজ্জায় আসে নি। একটা দুম করে অন্যায় করে ফেললো।
আমি হাসলাম।
যখন সবই জানিস তখন ছেড়েদে।
মহা মুস্কিল তখন থেকে খালি ছেড়েদে ছেড়েদে করছো। ধরলে তো ছাড়ব। আমি হাসতে হাসতে বললাম।
দেখছো ইসলাম তোমার ওই পাঁচটা সাগরেদকে দেখো কিরকম চুপ চাপ খেয়ে যাচ্ছে। যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।
অনিমেষদা রতনদের দিকে তাকিয়ে বললো। ওরা নির্বিকার।
সত্যি দাদা বিশ্বাস করুণ। ইসলামভাই বললো।
আমি জানি তুমি কিছু জান না।
সাতটার সময় অনির মোবাইলে একটা ফোন এসেছিল। মিত্রা বলে উঠলো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। সবাই মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
বল তো মা তুই বল। ওকে জব্দ করতে তুই আর সুরো পারবি।
তোদের দুজনের প্রতি ওর দুর্বলতা আছে। আর সবার প্রতি ও কর্তব্য পালন করে। তা বলে এই নয় তাদের কিছু হলে ও নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমবে। অনিমেষদা বললেন।

আমরা তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম।
তখন কটা হবে ?
সাতটা।
তারপর ?
ও বললো একটু দাঁড়া আমি আসছি। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম। ও কিছু বললো না। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছিল।
অনুপ তুমি এগুলো মাথায় রাখ। কালকে আলোচনা করবো মিটিং-এ। অনিমেষদা বললেন।
আবার মিত্রার দিকে তাকিয়ে, তারপর বল মা।
ও ওখান থেকে চলে আসে। আমি চিকনাকে বলি দেখোতো তোমার গুরুর কি হয়েছে। চিকনা সব শুনেছে। ও তারপর সব সময় বুবুনের পেছন পেছন ছিল। চিকনাও তারপর আমাকে বলেছে ও কিছু জানেনা।
কি বুঝছেন অমিতাভদা সব কটা মাস্টার ডগ। মাস্টার ছাড়া কারুর কাছে মাথা নোয়াবে না। অনুপদা বললো।
অনিমেষদা চিকনার দিকে তাকাল।
বাবা চিকনা এবার বলে ফেলো ম্যাডামের পরের কথাগুলো।
অনিমেষদা এমনভাবে বললো সবাই হাসছে। চিকনা হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকাল।
ও তোমাকে কোনদিন বলতে বলবেনা। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি তুমি বলো। অনি কিছু বলবে না।
আমি কিছু জানিনা। আমি শুনেছি। রতনদা সব জানে।
কি ইসলাম কিছু বুঝতে পারছ।
ইসলামভাই হাসছে।
দেখনা কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে অনিমেষদা বললো।
আচ্ছা মা তুই অনিকে কখন আবার স্বাভাবিক দেখলি।
সাড়ে আটটা পৌনে নটা থেকে।
তারমানে দেড়ঘন্টা। দেড়ঘন্টায় ও কাজ শেষ করে দিল।
ওরা সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি পুলিশ কমিশনারকে ফোন করলেও দেড়ঘন্টায় কাজ শেষ করতে পারত না। কাল সকাল পর্যন্ত লাগিয়ে দিত।
তুমিতো লেবু নিগড়তে নিগড়তে তেঁতো করে ফেললে।
বৌদি অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে বললো।
সুতপা লেবু আমার হাতে এখনো এসে পৌঁছয়নি নিংড়বো কি করে। আমি বিধানবাবু এখনো অন্ধকারে। একটু আগে অনুপের ফোনে প্রবীর ফোন করে বললো, অনি চারটে ছেলেকে কিডন্যাপ করেছে। এখুনি যেন ছেড়ে দেয়।
আমি দপ করে জ্বলে উঠলাম।
প্রবীরদাকে বলে দিও ওর দম যদি থাকে অনিকে ফোন করতে। ব্যাপারটা যখন অনি ভার্সেস প্রবীর তখন আমরা দু’জনে বুঝে নেব। তোমরা এর মধ্যে মাথা গলাবে না।
সবাই আমার গলার স্বরে চমকে উঠলো। যারা আমাকে এর আগে দেখেনি তারাও আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। সবাই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কেউ বুঝতে পারে নি আমি হাসতে হাসতে এইভাবে আচরণ করতে পারি।
আমি জানতাম তুই এই কথা বলবি।
তাই তো আমি ধীরে ধীরে এগচ্ছিলাম। তোর বৌদি মাঝখানে টুকে দিল।
প্রবীরদা জানল কি করে অনি তুলেছে। তারমানে চারজন ছাড়াও আরও কয়েকজন আছে। তাদেরকে আমার সামনে হাজির করতে বলো।
সেইজন্য আমি একমুখে ঝাল খাচ্ছিনা দু’মুখে ঝাল খাওয়ার চেষ্টা করছি।
অনিমেষদা খুব শান্ত ধীরস্থির ভাবে বললো।
বিধানদার দিকে তাকিয়ে।
কি বিধানবাবু শেকড়টা কতদূর গেছে এবার বুঝতে পারছেন। আমার হয়েছে যতো জ্বালা।
প্রবীরদার এতো ক্ষমতা থার্ড পার্টি দিয়ে আমাকে হুমকি দেয় আমাকে কাল উড়িয়ে দেবে। আমি বিয়ে করে মজমা নিচ্ছি। এতো বড়ো স্পর্ধা।
উনিকি রাজ্য কমিটির নেতা বলে সাপের পাঁচপা দেখেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ওকে আমি বাটি হাতে কলকাতার রাস্তায় বসিয়ে দেব। যাতে ওর ভিক্ষে না জোটে তার ব্যবস্থা করবো।
বিধানদা প্লেট হাতে এগিয়ে এলো।
মিত্রা থালাটা টেবিলে রেখে আমার হাত চেপে ধরেছে। কনিষ্করা ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। অনি কার সঙ্গে এইভাবে গলা উঁচু করে কথা বলছে! যার একটা ফোনে এখুনি এই বাড়িতে পুলিসের হেডকোয়ার্টারের টপ টপ লোক চলে আসতে পারে।
যে বৌদি একটু আগেও আমার সঙ্গে হাসাহাসি করছিল। সেই বৌদি পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে। বুঝতে পারছে কিছু একটা জট পেকেছে। জ্যেঠিমনির মুখটা কেমন শুকনো শুকনো। ইসির চোখে কে যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জেলে দিয়েছে।
বরুণদা কেমন থতমতো খেয়ে গেছে। বড়মা, ছোটমা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা স্বাভাবিক। ইসলামভাই মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। ওরা আমার এই অবস্থা আগে দেখেছে। যারা দেখে নি এই অনিকে তাদের কাছে অজানা অনির চেহারা বেরিয়ে পরেছে।
তুই রাগ করিসনা। আজ আনন্দের দিন। আমি অনিমেষকে বারণ করেছিলাম। আজ অনিকে কিছু বলোনা কালকে পার্টি অফিসে ডেকে আলোচনা করবো। বিধানদা বললেন।
শুনে নাও ওরা সব ইউপি থেকে এসেছে। তার মধ্যে একটা রাজনাথের ভাইপো আছে। প্রবীরদা বিকেলে ওদের সঙ্গে বসে আলোচনা করেছে। আমার ফোন নম্বর ওদের দিয়েছে। এতো বড়ো অর্ডার সিটি ওনাকে কে দিয়েছে।
অনিমেষদা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে। রূপায়ণদা, অনুপদা, নিরঞ্জনদা থ হয়ে গেছে।
আমি সব বুঝতে পারছি। তুই একটু শান্ত হ। আমি তোকে কথা দিচ্ছি আমি নিজে পার্টির তরফ থেকে ডাস্ট্রিক এ্যাকসন নেব। তুই কোন অন্যায় কাজ করিস নি।
কি সাহস আবার অনুপদাকে ফোন করে হুইপ করছেন তুই ওকে ছেড়ে দিতে বল। আমি কি ওনার চাকর।
অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে।
অনিমেষ তুমি শুধু শুধু সারাদিনের আনন্দটা নষ্ট করলে।
একটুও নষ্ট হয়নি। অনুপদা চেঁচিয়ে উঠলো। ইসলামভাই মুরগীর ঠ্যাং নিয়ে এসো। জমিয়ে খাব। আজ এমন খাব যেন দুদিন খেতে না হয়।
আমার কাছে এসে, এবার একটু হাস। অন্যায় হয়ে গেছে ভাই। যতো নষ্টের গোড়া আমি। তোর মতো সব হজম করতে পারি না।
ইসলামভাই।
দাদা।
তোমাদের কোন নাচার মিউজিক নেই, চালাও তো একটু নাচি। অনেক দিন নাচিনি। কিরে চিকনা গুরুর বিয়েতে একটু নাচবি তো আমার সঙ্গে।
চিকনা ফিক করে হেসে ফললো।
সুরো আয় আয় সকলে একটু নেচে নিই।
ম্যাডামরা তোমরা ছবি-টবি একটু তোল, তবে কাগজে ছেপে দিও না।
সবাই অনুপদার কথায় এবার হেসে ফেললো।
মিত্রা আমার হাতটা ধরে কাঁধে মাথা রেখেছে।
কিরে মিত্রা ভড়কে গেলে হয়, অনি কি তোর একার নাকি। অনি সবার। তোকে অনুপদা কথা দিচ্ছে ওর কিছু হবে না। অনুপদারও কিছু ক্ষমতা আছে মাথায় রাখিস।
মিত্রা হাসছে।
অবস্থাটা আবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিন্তু থেকে থেকে যেন কোথায় তাল কেটে যাচ্ছে।
অনুপদার উৎসাহে প্রায় আধঘন্টা নাচাগানা হলো।
চিকনা, সুরো, নীপা, সঞ্জু, মিলি, অর্ক, অরিত্র, প্রধান কলা কুশলী আমরা সবাই একবার করে কোমর দোলালাম। শেষটুকু দারুণ মজা হলো। কোমর নাচান থেকে কেউ বাদ গেল না। আমি, ইসি, মিত্রা, কনিষ্ক, নীরু, শ্রীপর্ণা, বটা সবাই একসাথে একটু হাত ধরাধরি করে নাচলাম। খুব হৈ হৈ হলো। সবাই থামলাম। শেষে সবাই আইসক্রীম খেলাম বেশ মজা হলো। শেষে ডাক্তারদাদা বললো, তাহলে বান্ধবী শেষ ভালো যার সব ভালো তার। তাই তো ?
বড়মা এমনভাবে ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল। সবাই হেসে ফেললো।
ওরা গল্প করছে। আমি ইচ্ছে করেই একটু আলাদা হয়ে পরলাম। ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলাম। বাড়ির ভেতরে এলাম। পর পর গোটা চারেক ফোন করে ফেললাম। লাস্ট আপডেট নিলাম। আপাতত ঠিক আছে।
ওরা সবাই ভেতরে এলো। অনিমেষদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। বুঝছি কিছু বলতে চায়। আমি ইশারায় বললাম একটু বসো, আমি আসছি।
ইসি কাছে এলো। অনি এবার ছাড়, যেতে হবে।
না গেলেই নয়।
বাড়ি খালি পরে আছে।
দিনের পর দিন খালি পরে থাকলেও কিছু হবে না। লোক আছে।
তুই কোথায় লোক দেখলি।
বরুণদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। মিত্রা হাসলো।
কিরে ছুটকি তুই হাসলি।
ওর লোকজোন আছে।
জ্যেঠিমনি গল্প করছে বড়মা, ছোটমা, বৌদির সঙ্গে। পাশে দামিনী মাসি দাঁড়িয়ে।
তুই কি সত্যি যাবি।
গেলে ভালো হতো।
জ্যেঠিমনি।
এখন যাবে বলছে। কালকে না হয় আসবো।
বরুণদা আপনার সঙ্গে কথা বলা হলো না।
আরে ঠিক আছে। সময় চলে যাচ্ছে নাকি।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
রবীনকে বলেদে ওদের পৌঁছে দিয়ে আসুক। হ্যাঁরে সকাল থেকে বুড়ীমাসিকে দেখলাম না।
তোর চোখ থাকলে তো দেখবি।
হাসলাম।
আটটার সময় খাবার বেঁধে নিয়ে গেছে। রবীন দিয়ে এসেছে।
তোমরা কথা বলো আমি একটু আসছি।
ভেতরে দেখলাম অনিমেষদারা কথা বলছে দাদার সঙ্গে। আমি বললাম এসো ওপরে একটু কথা বলবো।
দাদা আমার দিকে তাকাল।
এখন কোন কথা নয় কাল হবে।
ডাক্তারদাদা বললো খামকা বাধা দিচ্ছ কেন এডিটর, ও যদি কথা বলতে চায় বলুক না।
অনিমেষদা, বিধানদা হাসছে।
বাইরে বেরিয়ে এলাম। মিত্রাকে বললাম তোর ফোনটা একটু দে।
কেন।
দরকার আছে।
মাঠে দেখলাম অর্ক অরিত্র ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে। বুঝলাম কাজ শুরু করে দিয়েছে।
মিত্রা আমার হাতে ফোনটা দিল। সিমটা খুলে ওর হাতে দিলাম। রাখ, আধঘন্টা পরে ফেরত দিচ্ছি।
অনিমেষদারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমি যাব। মিত্রা বললো।
ওরা ফিরে যাবে তুই একটু ব্যবস্থা করেদে।
কনিষ্করা মাঠে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে।
সিঁড়িতে ওঠার মুখে দেখলাম সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওপরে ছোটমার ঘরে এলাম।
কিরে আবার কি হলো।
বসোনা বলছি।
একটা জলের বোতল নিয়ে আসি। অনুপদা বললো।
আমি বলে দিচ্ছি।
বারান্দায় এসে চিকনাকে ডেকে বললাম।
বল কি হয়েছে, আবার কোন গন্ডগোল। বিধানদা বললেন।
না গন্ডগোল নয়, তোমাদের খুব সমস্যা আমাকে নিয়ে।
তোর কি মাথা খারাপ। অনিমেষদা বললো।
তোমরা খালি চুপচাপ দেখে যাও। আমি কি করি। তারপর আমাকে যা বলবে আমি তাই করবো। এতে তোমরা যদি আমাকে কঠিন শাস্তি দাও, তাও আমি মাথা পেতে নেব।
অনুপদা আমার দিকে তাকিয়ে।
তুই খোলসা করে বল।
আচ্ছা তোমাদের পার্টির নিজস্ব কোন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো নেই।
কি হবে রেখে।
তোমাদের পার্টির নিচের তলার কর্মীরা কে কি করছে তার হিসাব কি করে পাও।

কেন ব্রাঞ্চ, লোকাল তারপর জোনাল।
ধাপে ধাপে।
হ্যাঁ।
এগুলো যারা পরিচালনা করছে তাদের মনিটরিং করে কে।
জোনাল কমিটি করে, ওখানকার যারা রিপ্রেজেন্টেটিভ আছে তারা করে।
আচ্ছা তোমাকে যদি বলি এখুনি ওই ব্রাঞ্চের আন্ডারে একটা বাড়িতে প্রচুর আন ওয়ান্টেড ওয়েপন্স আছে, তুমি কি করে মনিটরিং করবে।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
ধরো এতো ওয়েপন্স আছে, তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। ধরো তোমাদের পার্টির কিছু কর্মী তার সঙ্গে জড়িত। আমি বলতে পারব না, তাদের কাছে তোমাদের পার্টর সদস্য পদ আছে কিনা। এখন সবাই তোমাদের পার্টির লোক। তোমরা মাথা।
অনিমেষদা কেমন গুম হয়ে গেল। বিধানদা আমার দিকে তাকাল।
চিকনা জলের বোতলটা রেখে একবার সবার দিকে তাকাল। তারপর চলে গেল।
ঘরের দরজা হাট করে খোলা।
আমি যদি কারুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তোমাদের একটু গালমন্দ করি খারাপ ভাববে না।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
অনুপদা।
বল।
তোমার সিমটা খুলে মিত্রার মোবাইলে লাগাও।
অনিমেষদা আমার চোখে চোখ রাখলো।
দাদা আপনাদের দু’জনের মোবাইলটা কিছুক্ষণের জন্য স্যুইচ অফ করুণ।
বিধানদা একবার আমার দিকে তাকাল। পকেট থেকে ফোনটা বার করে স্যুইচ অফ করল।
অনুপদা সিমটা লাগিয়েছ।
হ্যাঁ।
তুমি যখন কথা বলবে, ভয়েজ অন করবে। সবাই শুনবে।
ঠিক আছে।
রূপায়ণদা তোমায় পরিচিত কেউ ফোন করলে তুমি বার বার কেটে দেবে।
রূপায়ণদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তুই কি চার ফেলছিস মাছ ধরার জন্য।
হ্যাঁ।
ওরে প্রবীর এতো বোকা নয়।
আমি জানি তবু একটা জিনিষ আমার জানার দরকার আছে। একজনের কাছ থেকে ইনফর্মেসন পেয়ে কাজটা করে ফেলেছি। যাচাই করে দেখি নি।
পেট থেকে বার করতে পারবি কিনা সন্দেহ।
জানো রূপায়ণদা মানুষ যখন পরের পর অন্যায় করে, তখন সে সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে যায় নিজের কাছে।
ও পোর খাওয়া মানুষ, বহুদিন রাজনীতি করছে।
তোমাদের কাছে, আমার কাছে নয়। মাথায় রাখবে যে সাপ জলে সাঁতার কাটে সেই সাপই কিন্তু বন্যার সময় গাছে চড়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করে, তখন তাকে কখনো দেখেছ।
অনি। অনুপদার মুখ থেকে স্বগতোক্তির সুর।
ঠিক আছে তোর খেলাটা একটু দেখি, শিখে নিই। রূপায়ণদা বললো।
কেউ কোন কথা বলবে না। ভেবে নাও এই ঘরে খালি আমি একা আছি তোমরা কেউ নেই।
আমি আমার মোবাইল থেকে প্রবীরদার নম্বরে ডায়াল করলাম। ভয়েজ অন করলাম। রিং বাজছে।
হ্যালো।
রেকর্ডিং চালু করলাম।
প্রবীরদা আমি অনি।
হ্যাঁ বল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
আজ এলে না। তোমাকে খুব এক্সপেক্ট করেছিলাম।
শরীর ভালো নয়।
দাদা মনে হয় ঠিকমতো নেমন্তন্ন করতে পারে নি। তাই না।
চুপ। কোন কথা নেই।
কিগো কথা বোলছ না যে।
না তা নয়।
আমার ওপর রাগ করেছো।
না।
তাহলে। এলেনা যে।
চুপ। কোন কথা নেই।
ঠিক আছে। ছোটভাই হিসেবে কোন অন্যায় করে থাকলে ক্ষমা করে দিও।
কিসের ক্ষমা। তুই আমার কেরিয়ারটা ডুম করে দিলি।
আমি! তোমার কেরিয়ার ? একজন সাধারণ সাংবাদিক তোমার কেরিয়ার নিয়ে ছনিমিনি খললো, তুমি তাকে ছেড়ে দিলে।
তুই এখন সাধারণ নোস। তুই এখন কলকাতার ডন।
তুমিও বলবে।
আজ যে কটাকে তুলে নিয়ে গিছিস ছেড়ে দে। এর ফল ভাল হবে না।
আমি! কাকে তুললাম ? তুমি কি পাগলের মতো বকছো ? শরীর ঠিক আছে ?
ফালতু কথা একেবারে বলবি না। কাল সকালের মধ্যে ওদের ছেড়ে না দিলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
তুমি কি করে জানলে আমি তুলেছি ?
তুই যে ভাবে জেনেছিস।
তাহলে আরও কয়েকজন আছে, ওদেরকে একটু দেখাও দেখি।
তুইকি আমার সঙ্গে টক্কর নিচ্ছিস।
যদি মনে করো নিচ্ছি, তাহলে তাই।
খুব ভালো হবে না অনি বলে দিচ্ছি। শেষবারের মতো বলছি।
আমি এবার আস্তে আস্তে টপ গিয়ারে উঠতে আরম্ভ করলাম। গলার ভল্যুম চেঞ্জ হতে শুরু করলো।
তোমাকেও বলে দিচ্ছি। তোমরা অবস্থা রাজনাথের থেকেও খারপ করে ছেড়ে দেব। তোমাকে টাডা আইনে ফাঁসাব। জীবনে আর জেল থেকে বেরতে পারবে না।
তোর এতো বড়ো দম।
দম আছে কিনা তা প্রমাণ করে দিয়েছি। তোমার ওই পার্টির দুটো ভেড়ুয়া নেতাও তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।
কি বললি তুই।
যা বলছি ঠিক বলছি।
এ্যাঁ।
তোমার দম থাকে লড়ে যাও। আমি প্রস্তুত। আর একটা কথা বলেদিচ্ছি। কাল সকালের মধ্যে ওই গেস্ট হাউসে যদি বাকি গুলকে পৌঁছে না দাও, চারটেকে কুত্তার মতো মেরে দেব। দেখব তোমার কটা বাপ আছে।
তুই আমার বাপ তুললি।
শুধু বাপ নয় তোর চোদ্দগুষ্টি এলেও বাঁচাতে পারবে না।
কি তুই আমাকে তুই বলছিস।
এর থেকেও যদি নিকৃষ্ট কিছু থাকে বলবো।
গেটের মুখ বড়মা, ছোটমা, বৌদি, দামিনী মাসি। পেছনে সবাই। অনিমেষদা হাত তুললো মুখে ইশারা করে দেখাল কেউ টুঁ শব্দটি করবে না।
এ্যাঁ।
এ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। আমার দম দেখতে চাস। তাহলে ঘরের বাইরে এসে বারান্দায় একবার উঁকি মেরে দেখ। অনি চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকে না।
ওরা চারজন আমার দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। আমি সবার দিকে একবার তাকালাম। থম থমে সবার মুখ। উৎকন্ঠা চোখে মুখে। জ্যেঠিমনি ইসি বরুণদাকে দেখলাম। বুঝলাম ওদের যাওয়া হয়নি। সবাই আমাদের কথা শুনছে।
কিরে প্যান্ট হলুদ হয়ে যাচ্ছে। কথা বলছিস না কেন।
তুই কি আমাকে মারতে চাস।
শুধু মারা নয়। বডি পর্যন্ত গাইপ করে দেব। কেউ খুঁজে পাবে না। বারান্দায় এসেছিস ? আমি সত্যি কি মিথ্যে একবার বল তোর মুখ থেকে শুনি।
তুই কি করতে চাস। গলার স্বর নরম।
কি শুকিয়ে গেল। একটা ফোন করবো। তোর ঘর রেট করতে শুরু করবে। ওরা তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তোর বাড়িটার চারিদিকটা একবার ছাদে উঠে দেখ। মাছি গলতে পারবে না।
আমি অনিমেষদাকে ফোন করছি।
দিলাম অনিমেষদার নামে কাঁচা কাঁচা গালাগাল। ওকি আমার ঠেকা নিয়ে বসে আছে।
অনিমেষদা মুখে হাত চাপা দিয়েছে। বিধানদা মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে। রূপায়ণদা, অনুপদা না পারছে হাসতে না পারছে গম্ভীর হয়ে থাকতে।
বৌদি আমার দিকে বিষ্ময়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে। অনিমেষদা আঙুল তুলে ইশারা করছে।
তোর এতো বড়ো ক্ষমতা তুই আমাদের পার্টির টপ লিডারকে….।
রেকর্ডিং করে রাখ, আমার গলাটা ভেড়ুয়াটাকে কাল সকালে শুনিয়ে দিবি। আর একটা ভেড়ুয়া আছে। বিধান হারামী।
তুই বিধানদাকে হারামী বলছিস।
বেশ করেছি।
দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি।
বেশি দেখাতে যাস নি। বাড়ি থেকে একপাও বেরবি না। বেরলেই ওখানে দানা খেয়ে পরে থাকবি।
তোর এতো বড়ো ক্ষমতা।
ক্ষমতা আছে কিনা দেখতেই পাচ্ছিস। এক ফোনে যদি এই হয়, আর এক ফোনে তোর কি দশা হবে। আর একটা কথা বলে রাখি মন দিয়ে শোন, তোর অশ্বিনীনগরের অস্ত্র কারখানাতেও লোক পাঠিয়ে দিয়েছি। পর্শু ইউপি থেকে চার ট্রাক মাল এসেছে। ওখানে ফোন করে বলে দে নখরামি যেন না করে। ওখানে তুই ছেলে গুলোকে তুলে নিয়ে এসেছিস।
তোকে খুন করে দেব।
প্রবীরদা এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠলো যেন আমার ফোনের স্পিকারটা ফেটে যাবে।
সময় পাবি না। আগে অস্ত্র কারখানাটা খাব। তারপর তোকে।
তুই তার সময় পাবি না।
আবার বলে রাখছি। নখরামি করবি পুরো বডিটা গাইপ। আমি চারদিক বেঁধে ফেলেছি। এবার বল কি করতে চাস।
কিছুক্ষণ চুপ। কোন কথা নেই।
শোন তুই তো নিজে মুখে বলবি না। আমি রফা করি।
বল।
কিরে গলা ভাড়ি কেন। কাঁদছিস।
না।
অনেক কামিয়েছিস। কাগজের গুষ্টির তেইশ। এতদিন যা করলাম সব একটিং। মিত্রার সঙ্গে যা করার করা হয়েগেছে। আমার বহু টাকার দরকার। টাকা পেলে সব ছেড়ে ছুড়ে ফেটে যাব। তোর রাজনাথ, ডাক্তারও অনেক কামিয়েছে মিত্রার কাছ থেকে। আমিই বা বাদ যাই কেন।
তুইও ডাক্তারের কাছ থেকে টাকা টেনে নিয়েছিস।
ওটা আমার নয় মিত্রার। সাদা টাকা। মিত্রাকে ট্যাক্স দিতে হবে। ওখানেই মিত্রাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছি। আমার হার্ড ক্যাশ চাই।
কতো।
তোর জন্য কাল অনিমেষদা আমার কাছ থেকে টাকা টেনেছে।
কতো।
পাঁচ কোটি। তোর নাকি দেওয়ার কথা ছিল।
এ কথা তোকে কে বললো।
তাহলে আনিমেষ আমার কাছ থেকে নিল কেন।
কি করে বলবো।
প্রবীরদার গলাটা ভাড়ি ভাড়ি।
কিরে তুই মেয়েছেলের মতো কাঁদছিস নাকি।
না।
দেখলাম রূপায়ণদা অনুপদা ঘরের এক কোনে চলে গিয়ে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হাসছে। বৌদিরা বারান্দায়, মুখে কাপর চাপা দেওয়া। চোখে বিষ্ময়। এতোক্ষণে ওরা বুঝতে পেরেছে কার সঙ্গে আমি কথা বলছি।

তুই এখন কোথায় ?
আমি নিচের বাগানে আম গাছের তলায়। বাড়ির সবাই ঘুমচ্ছে।
তুই আমাকে বাঁচা অনি।
বাঁচাব পরে। আমার দশকটি চাই। কি করবি বল।
পেয়ে যাবি।
কাল সকালে চাই।
হবে না। কাল বিকেলে মালটা ডেলিভারি করতে হবে।
আমার কাছে খবর আছে, ওখানে যা মাল আছে আর আমি যা চাইলাম নস্যি।
তোর কখন দরকার।
যতো সকালে সম্ভব। এরা উঠতে উঠতে ফেটে যাব।
কোথায়।
আমার বাড়িতে।
না তুই এক কাজ কর।
বল।
তুই ভিআইপির মুখে চলে আয়।
আবার স্কিম।
বিশ্বাস কর।
না তুই ট্রাংগুলার পার্কের মুখে নিয়ে আয়।
ঠিক আছে পৌঁছে যাব।
শোন আজ থেকে আমরা বন্ধু। অনিমেষ, বিধান যেন জানতে না পারে।
তুই তাহলে ওগুলো সরিয়ে নে। ছেলেগুলোকে ছেড়ে দে।
দেবো আগে কাল সকালে মাল পৌঁছবে, তারপর। ওদের পেছনে খরচ করতে হয়েছে। মাগনায় হয় নাকি এসব।
তাহলে হবে না।
অনি ঝপ পাল্টি খেয়ে যাবে। দামিনীকে বলবো, ছেলেগুলোকে রেপ করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে। কনিষ্ক বটা হাসপাতালের ডাক্তার আমার বন্ধু নিশ্চই খবর রাখিস। অপারেসন করে বাদ দিয়ে দেব।
প্লিজ তুই এটা করিস না। আমি জানি তুই সব পারিস। ওখানে রাজনাথের ভাইপো আছে।
রাখছি, কাল ভোর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তারপর কাজ চালু করে দেব। আমি বাগানে পায়চারি করছি। কি ডিসিসান নিলি জানাবি।
তাহলে আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারি।
পারিস। ফালতু তখন ছেলে গুলকে দিয়ে ফোন করালি। মিত্রার সঙ্গে মজমা নিচ্ছিলাম। না করালেই পারতিস।
চুপ।
রাখছি।
ফোনটা কেটে রেকর্ডিংটা সেভ করলাম। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে। নিস্তব্ধ ঘর। আমি আবার ডায়াল করলাম।
ভয়েজ অন করা আছে।
হ্যাঁ বলেন অনিবাবু।
উনি বারান্দায় এসেছিলেন।
হ্যাঁ।
দেখে কি বুঝলেন।
ধ্বসে গেছে।
ওখানে কারা আছে।
একটু আগে খবর নিয়েছি। সব ঠিক ঠাক আছে।
একবারে চোখ সরাবেন না।
অনুপদার ফোনটা বেজে উঠলো। হাত তুললাম।
দাঁড়ান একটু বাদে আপনাকে ফোন করছি। আর একটা ফোন এসেছে।
অনুপদা আমার দিকে তাকিয়ে। ইসারা করলো।
কিরে কি করবো।
উঠে গিয়ে ভয়েজ অন করে রেকর্ডিংটা চালু করে দিলাম।
ঘুমচ্ছিলে, ঘুমভেঙে ফোন ধরছো। অনুপদার দিকে তাকিয়ে বললাম।
আমার জন্য একটু অভিনয় করো। প্লিজ।
অনুপদা হাসলো।
হ্যালো।
কিরে কখন থেকে রিং বেজে যাচ্ছে।
কি হলো আবার। এই কানারাতে কি করতে ফোন করলি।
অনি এখনো ছাড়ে নি।
কেন আমার সামনে অনিমেষদার সঙ্গে কথা হয়েছে। বললো ছেড়ে দেবে।
ছাড়ে নি। এখুনি ফোনে কথা হলো।
কি বলছে।
দশকোটি টাকা চাইছে।
অনি টাকা চাইছে!
তাহলে বলছি কি।
কি পাগলের মতো বকছিস।
অনিমেষদা বিধানদার নামে যা মুখে এলো বলে গেলো। কাঁচা কাঁচা খিস্তি দিল।
তোর শরীর ঠিক আছে।
একটুও মিথ্যে বলছি না। রেকর্ডিং করেছি।
বেশ করেছিস। এখন ঘুমিয়ে পর।
ভোররাত পর্যন্ত টাইম দিয়েছে।
কিসের।
ওর দাদার বাড়িতে টাকা পৌঁছে দিতে হবে। না হলে ওই চারটে ছেলেকে হাপিস করে দেবে।
কে বলতো ওই ছেলে গুলো। আমাদের পার্টির ছেলে। তখনও তুই বললি।
ওর মধ্যে রাজনাথের ভাইপো আছে।
রাজনাথকে পার্টি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুই আবার ঝামেলায় জড়াতে যাচ্ছিস কেন।
যতই হোক রাজনাথ আমাদের পার্টির মেম্বার ছিল এতদিন।
ছিল, এখন নেই। শুধু রাজনাথকে নিয়ে আমাদের পার্টি নয়। তাছাড়া তুই জানলি কি করে অনি তুলেছে।
আরও দুজন ছিল। খাবার কিনতে বাইরে বেড়িয়েছিল। সটকে চলে এসেছে।
ওগুলোকে কোথায় রেখেছিস।
অশ্বিনীনগরে একজন পার্টি কর্মীর বাড়িতে।
এখন ঘুমো, ভাল লাগছে না। পারলে অনিমেষদাকে ফোন কর।
অনিমেষদার ফোন স্যুইচ অফ।
তাহলে বিধানদাকে কর।
বিধানদারও স্যুইচ অফ।
ল্যান্ড লাইনে কর।
রিং বেজে যাচ্ছে। একটু ধরতো আর একটা ফোনে ফোন এসেছে।
তুই কি সারারাত ঘুমোস না।
গায়ে একটা দাগ লেগে গেছে।
অন্যায় করেছিস।
দাঁড়া।
অ্যাঁ কি বললি।….এখনো আছে।….বেরোয় নি…. ঠিক বলছিস….ঠিক আছে।
হ্যালো।
বল।
অনিমেষদারা এখনো অনির বাড়িতে আছে ? গলায় উৎকন্ঠা।
তুইকি গাঁজা খেয়েছিস। আমার সঙ্গে একসঙ্গে বেরল।
আমার লোক বললো। অনিমেষদার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
দেখলাম ইসলামভাই চিকনা ঘরের দরজার সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাখ ভালো লাগছে না। কাল পার্টি অফিসে আয় দেখছি।
তাহলে কাল সকালে টাকাটা পাঠিয়ে দিই।
কেন বলবি তো।
যদি ঝেড়ে দেয়।
কি করে বুঝলি ঝেড়ে দেবে।
ওর গলা শুনে মনে হচ্ছে। তারওপর ওর সেই মুখার্জীর লোক আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কি করতে।
মনে হয় রেইড করবে।
কেন। আবার কি গন্ডগোল করলি।
অনুপ তুই আমাকে অনির হাত থেকে বাঁচা।
তখন থেকে কি ভেজর ভেজর করছিস বল তো।
তোরা কিছু না করলে অনিকে কাল আমি ঝেড়ে দেব।
তারপর সামলাতে পারবি।
নিজে তো মরেই গেছি। একটাকে নিয়ে মরি অন্ততঃ।
ওখানে ইসলাম আছে।
কিছু চিনতা করতে ভাল লাগছে না।
আমি কি করবো। তোর জন্য আমি কি পার্টি থেকে এক্সপেল হবো নাকি। অনুপদা রেগে গেল।
ঠিক আছে, আমি আমার মতো করে কাজ শুরু করছি।
আগু পিছু ভেবে করিস।
ভাবতে গেলে শেষ হয়ে যাব।
যা পারিস কর। আমি এখন রাখছি।
অনুপদা ফোনটা কেটে দিল।
আমি ছোঁ মেরে অনুপদার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে রেকর্ডিংটা সেভ করলাম।
ফোনটা স্যুইচ অফ করে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
খালি অনিমেষদার ক্ষীণ কন্ঠ কানে ভেসে এলো। সুতপা ওকে আটকাও।
একটা হৈ হৈ পরে গেল।
ছুটে নীচে চলে এলাম। বাগানে এসে দাঁড়ালাম। নেপলা, চিকনা, সঞ্জু বেধড়ক মারছে একটা ছেলেকে। আর একটাকে টেনে হিঁচড়ে আবিদ নিয়ে আসছে। পেছনে রতন।
ইসলামভাই আমাকে দেখে বললো। তুই ওপরে যা।
চারিদিক আধো অন্ধকার। লাইট সব নিবিয়ে দিয়েছে ইসলামভাই। ছেলেগুলোর মুখ ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না। ফিরে আসছিলাম।
অনিদা বাঁচাও। আমি কিছু করিনি।
ঘুরে দাঁড়ালাম।
নেপলা আমার নাম শুনে ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়েছে। ছেলেটা ঘসরাতে ঘসরাতে আমার কাছে এসে পা জড়িয়ে ধরলো।
অনিদা তুমি বিশ্বাস করো।
দেখলাম কনিষ্ক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
কেরে টনা। কনিষ্কর গলা।
কনিষ্কদা তুমি! এরা আমাকে মেরে ফেললো।
আমি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে।
তুই এখানে, এত রাতে! কনিষ্কর গলাটা এই নিশুত রাতে গম গম করে উঠলো।
ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বারান্দায় বৌদিরা দাঁড়িয়ে। মিত্রা ইশি পাশে এসে দাঁড়াল। আমার দুহাত দুজনে শক্ত করে ধরেছে।
কনিষ্কদা একটু জল।
চিকনা জলের বোতলটা নিয়ে আয়। অনি তুই ওপরে চলে যা। কনিষ্কর এই গলা সবার কাছে অপরিচিত।
কেরে কনিষ্ক। বটার গলাটা গম গম করে উঠলো।
টনা।
ভাসিলা ভেঁড়ি।
হ্যাঁ।
ওটা আবার এতো রাতে এখানে কোথা থেকে এলো।
বলছি বটাদা, সব বলছি। টনা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠলো।
ইসলামভাই অবাক হয়ে কনিষ্ক আর বটার দিকে তাকিয়ে আছে।
অনি তুই ওপরে চলে যা। কনিষ্ক গুরু গম্ভীর গলায় ফের বলে উঠলো।
আমি আর দাঁড়ালাম না। সোজা ওপরে চলে এলাম। পেছন পেছন সবাই। দেখলাম অরিত্র ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে। আমি সোজা চলে এসে অনিমেষদা বিধানদার পায়ের কাছে বসলাম। মাথা নীচু। মিত্রা ইশি দাঁড়িয়ে। বুঝলাম এই টুকু দৌড় ঝাঁপে ওরা হাঁফিয়ে গেছে। ঘরের সবাই চুপ চাপ।

তুমি আমাকে ক্ষমা করো দাদা।
আয় পাশে উঠে বোস।
আমি তোমায় অনেক অ-কথা কু-কথা বলেছি।
সে তো তুই পার্মিসন নিয়েই বলেছিস। রাগ করিনি।
ছোট। বিধানদা চেঁচিয়ে উঠলো।
হ্যাঁ দাদা।
একটু চা খাওয়াবে।
এতো রাতে!
বিধানদা হাসছে।
অনির ফুলশয্যা হচ্ছে, আমরা পাহারা দিচ্ছি। যাও যাও একটু কড়া করে বানিয়ে নিয়ে এসো।
অমিতাভবাবু।
বলুন।
আপনার পকেটে সিগারেটের প্যাকেট আছে।
দিচ্ছি।
মল্লিকদা টেবিলের ওপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর এ্যাসট্রেটা সেন্টার টেবিলে রাখলো। দুজনে দুটো সিগারেট বার করে ধরালো। সবাই কেমন যেন বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
কিরে তোরা গিয়ে খাটে বোস। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ও সব কাজ সেরে রেখেছে। অনিমেষদা ভাবলেশহীন গলায় বললো।
সিগারেটে একটা টান মারলো।
কি বিধানবাবু ভুল কথা বলেছি।
না।
রামের কাছে হুনুমান গিয়ে যেমন সব শেষে বলতো প্রভু অনুমতি দিন। ও সেরকম ভাবে বসে আছে। অনিমেষদা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো।
অনিমেষদার কথায় সবাই ফিক ফিক করে হাসছে।
সুতপা, মুখ ভেটকে দাঁড়িয়ে রইলে কেন। ভেতরে এসো। বসো। সুরো মাকে দেখছি না।
নিচে, ঘুমিয়ে পরেছে।
যাক রক্ষে। লাইভ দেখলে মাথা খারাপ করে দিত।
বৌদি ভেতরে এলো।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
আর ওখানে বসে থেকে লাভ নেই এবার পাশে বোস।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে দু’জনের মাঝখানে বসলাম। মাথা তুলছি না।
কিরে আমরা চা খেতে খেতে তোর বাকি কাজ গুলো সেরে নে। অনিমেষদা বললো।
আমি মাথা নীচু করে বসে আছি।
আমি বলছি।
যা না অনি রেকর্ডিংগুল ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে সিমটা দে। অনুপদা বললো।
আমি তাকালাম।
তুইতো বিয়ে করলি না, যেন যুদ্ধ করলি। অনুপদা বললো।
অরিত্র।
হ্যাঁ দাদা।
অরিত্র দ্বীপায়ণ ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলো।
দেখছেন বিধানবাবু কোন টেনসন দেখতে পাচ্ছেন মুখে। অনিমেষদা ওদের দিকে তাকিয়ে বললো।
বিধানদা মুচকি মুচকি হাসছে।
আমি পকেট থেকে মাবাইলটা বার করলাম। দ্বীপায়ন এগিয়ে এলো। হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে মিত্রার দিকে একবার তাকাল।
যাও, দরজা খোলা আছে। মিত্রা বললো।
ইসি চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। ফ্যাকাশে মুখ। যেন হাসতেও ভুলে গেছে। বরুণদা গেটের মুখে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে।
ইসলামভাই গেটের কাছে এসে দাঁড়াল।
কাজ শেষ হলো ইসলাম। অনিমেষদা বললেন।
আমায় কিছুই করতে দিল না।
তার মানে।
কনিষ্ক বটার পরিচিত। আমাকে বললো তুমি ওপরে চলে যাও।
তারমানে! দলে সরকারী ডাক্তারও আছে। অনিমেষদা এমনভাবে বললো এবার দেখলাম সবাই হেসে ফেললো।
ও অনিমেষ একটা কিছু করো। বড়মা মুখ খুললো।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
কিরে দিদি কি বলছে। আমার জন্য কিছু বাকি রেখেছিস ?
আমি চুপচাপ। অনিমেষদা বড়মার দিকে তাকাল।
দিদি আপনি এতোক্ষণ সব দেখলেন, কিছু বুঝতে পারলেন না।
কই দেখলুম সব শুনলুম। গা হিম হয়ে যাচ্ছে।
রাজাকে ও চেক দিয়েছে। রাজার এক ঘরও নড়া চড়া করার শক্তি নেই। নয় গেম হার। নয় রাজাকে খোয়াও। কি বুঝলেন। আমরা সব বোড়ে। ইসলাম পর্যন্ত। অনিমেষদা বললো।
ছোটমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
এসো এসো ছোট চা না খেলে মাথা খুলবে না। বিধানদা বললো।
ইসি উঠে এলো। মিত্রা ভেটকে বসে আছে। টিনা, মিলি ভেতরে এলো। হাতে হাতে সবাইকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। বিধানদা চায়ে চুমুক দিয়ে আঃ করে উঠলো।
বেশ ভাল বানিয়েছ ছোট।
ছোটমা একবার হাসল। আমার দিকে তাকাল। এখন আর সেই আতঙ্ক মুখে নেই। ডাক্তারদাদা চুপ করে খাটের এক কোনায় বোসে।
বুঝলে অনিমেষ যা শুনলুম অনির নেটওয়ার্কটা বেশ মজবুত। মাছি গলতে পারবে না। ওর সিপাই গুলোর মাথা খুব পরিষ্কার। বিধানদা বললেন।
হ্যাঁরে মুখার্জীর লোকজন চলে এসেছে, না এখনো আছে।
ওখানে মুখার্জীর লোক নেই।
তারমানে!
অনিমেষদা আমার দিকে অবাক বিষ্ময়ে তাকালেন। ঘরের সবাই নড়ে চড়ে বসলো। মিত্রা এতোক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসেছিল। এবার বাবু হয়ে বসলো। নিশ্চিন্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছে।
তাহলে এরা কারা।
সিবিআই দিল্লিব্যুরোর লোকজন।
তুই কি এদের ইনফর্মার।
হেসে ফেললাম।
বলনা একটু শুনি।
মুখার্জী রাতে এলো। ওর লোকজন এলো। অতো যত্নআত্তি করে খাওয়ালি দাওয়ালি। ওকে কাজটা দিলি না! বাইপাস করে সিবিআই দিল্লিব্যুরো ঢুকিয়ে দিলি।
আমি মাথা নীচু করে আছি।
ওদেরকে ফোন করে বলে দিলে ফিরে আসবে ?
আমি চুপ করে আছি।
কি দিদি ছেলের মনের কথা কিছু বুঝছেন। অনিমেষদা বড়মার দিকে তাকাল।
আবার আমার দিকে ফিরে তাকাল।
তুইকি আমাদের এখানে বসিয়ে রেখে কাজ সারছিস।
তোমরা বললে শুরু করবো।
আমরা যদি না বলি ওদের চলে আসতে বলবি।
ওরা চলে আসবে, কাল গট আপ গেম খেলবে।
এনকাউন্টার!
আমি চুপ করে রইলাম।
তোর থার্ড অপসন বল।
এখনো কিছু ঠিক করিনি।
ওই মেয়েটার মুখের দিকে একবার তাকা। আমরা সবাই ফালতু। ও তোর বিয়ে করা বউ।
আমি কি নিজের জন্য করছি। চেঁচিয়ে উঠলাম।
হক কথার এক কথা।
বিধানবাবু আমার মুখ বন্ধ। এবার আপনার কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে ওকে করুণ।
কি বলবো অনিমেষ, গায়ে গন্ধ আছে। সব শুনে এক ঘর লোকের সামনে অস্বীকার করি কি করে। মিটিং-এ বক্তৃত্বা দিতে হলে সব নস্যাত করে দিতাম।
দ্বীপায়ণ ফোনদুটো নিয়ে ঘরে ঢুকলো। আমার হাতে দিল। আমি মিত্রার ফোন থেকে চিপটা অদল বদল করে দিতে বললাম। অরিত্র ঘরে ঢুকলো।
অনিদা পার্মিসন চাইছে। কি বলবো।
অরিত্রর দিকে তাকালাম।
হ্যাঁরে ছেলেটাকে মেরেদেবে না ? অনিমেষদা আমার দিকে তাকাল।
উনি যদি আমাকে মারতে চান আমি ছেড়েদেব কেন। চেঁচিয়ে উঠলাম।
তুই রেগে যাস না। ভয় লাগে।
অনিমেষদা এমনভাবে বললো, হেসে ফেললাম।
অনুপ, অশ্বিনীনগরের খবরটা আমাদের কাছে ছিল না।
অনুপদা অনিমেষদার কথায় মাথা দোলাল।
হ্যাঁরে অনি তুই এই খবরটা পেলি কোথায়।
বৃহস্পতিবার পার্কস্ট্রীটে এ্যাসিয়াটিক সোসাইটির তলায় একটা ভিখারীর সঙ্গে বুবুন বসে বসে কথা বলছিল। আমরা দেখেছি। ডাক্তারদাদা বললো, ও ভিখারী নয়। রাতে ওকে জিজ্ঞাসা করতে ও রেগে গেল, বললো আইবির লোক। মিত্রা কট কট করে বলে উঠলো।
অনিমেষদা মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। বিধানদা মিটি মিটি হাসছেন। রূপায়ণদা, অনুপদা গম্ভীর থাকার চেষ্টা করেও হেসে ফেলছে।
অনি। গেটের মুখ থেকে কনিষ্ক ডেকে উঠলো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
তুই উঠলি কেন, বোস। অনিমেষদা বলে উঠলো।
আয় বাবা ভেতরে আয়।
অনিমেষদা কনিষ্ককে ভেতরে ডাকলেন।
কনিষ্ক ভেতরে এলো।
তোর আর দুই বন্ধু কোথায় ?
নীচে আছে।
ওরা কারারে বাবা।
প্রবীর বাবুর লোক।
কোথায় থাকে।
ভাসিলা ভেঁড়ি।
তোদের চিনলো কি করে।
অনির মাধ্যমে।
কি করে সেটাই জিজ্ঞাসা করছি ?
আপনাদের অপনেন্ট পার্টির সঙ্গে ওদের মারপিট হতো এলাকা দখল নিয়ে, ওরা ইনজিওর্ড হলে অনি ওদের তুলে আনতো। আমরা বকলমে ট্রিটমেন্ট করতাম। সেই থেকে পরিচয়।
কজন এসেছে।
দুজন।
একটাকে নিয়ে আসতে পারবি।
ডাকছি।
কনিষ্ক বেরিয়ে গেল।
বিধানবাবু, সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার দেখছেন। এরা নিশ্চই ভেতরে ভেতর আমাদের সংগঠন করে। না হলে অনির কথায় এ ধরনের কাজ করবে না।
মুখ চোখ ফোলা হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা একটা ছেলে ঘরে ঢুকলো।
হাতজোড় করে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো। স্যার বিশ্বাস করুণ অনিদার নামটা আগে জানলে এ কাজ করতুম না।
তুই থামবি। কনিষ্ক ধমকে উঠলো।
বোস বোস।
টনা নিচে মাটিতে বসে পরলো।
তুই অনিকে চিনলি কি করে ?
অনিদা আমাদের ভেঁড়ি এলাকায় যায়।
কেন যায় ?
অনিদা আমাদের সংগঠনটা কি করে বারাব তার বুদ্ধি দেয়। তার বিনিময়ে অনিদাকে আমরা নিউজ দিই।
তোরা কোন সংগঠন করিস।
টনা বললো।

কোন ব্রাঞ্চ।
ভাসিলা এক নম্বর।
অনিদা আমাদের পার্টির মেম্বার নয় এটা জানিস।
অনিদা কোন খারাপ বুদ্ধি দেয় না।
অনেক লেখাপড়া জানা ছেলে অনিদার জন্য আমাদের সংগঠনে এসেছে। ওখানে অনিদা সকলকে পড়ায়। কনিষ্কদা, বটাদা, নীরুদা, অনিকেতদা সবাই যায়। চব্বিশঘন্টা জলে পরে থাকি ছেলেমেয়েদের রোগে চিকিৎসা করে, ওষুধ দেয়।
পয়সা নেয় না।
একি বলছেন স্যার। টনা কানে হাত দিল।
তোকে কনিষ্ক শিখিয়ে পরিয়ে নিয়ে এলো।
টনা আবার কান ধরে। কাল আমার বউ আমাকে মারবে স্যার। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো।
কেন রে!
যদি জানতে পারে আমি অনিদার খবর নিতে এসেছিলাম।
অনিমেষদার সাথে সাথে সবাই হেসে ফেললো।
অরিত্র। অনিমেষদা চেঁচিয়ে উঠলো।
অরিত্র ঘরে ঢুকলো।
ওদের গ্রীণ সিগন্যাল দিয়ে দে। দু’জায়গাতেই। অনিমেষদা বললো।
দেখলাম ঘরে সবার মুখের চেহারা বদলে গেল।
অনুপ ফোনগুলো অন কর। এবার বাজতে শুরু করবে। বিধানদা বললো।
হ্যাঁরে অনিকে তোর বউ ভালবাসে।
গত মাসে আমার ছেলের ভাতে অনিদা আমার বাড়িতে জল ঢালা ভাত খেয়ে এসেছে। বলেছিল পরে গিয়ে গরম ভাত খাবে, আর যায় নি। আমার মুখ ফোলা দেখলে জিজ্ঞাসা করবে। মিথ্যে কথা বললে মনা বলে দেবে।
মনা কে রে!
নিচে আছে। ও ভাসিলা দুনম্বর ভেরি দেখে। আমার সম্বন্ধি।
ও অনিকে চেনে।
হ্যাঁ চেনে।
আবার কাঁদে। তোকে কে ব্যান্ডেজ বাঁধলো।
নীরুদা।
ছোট ঘুম হলো না। আর একটু চা খাওয়াবে। বিধানদা আবার বললো।
ছোটমা হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল। অরিত্র ঘরে ঢুকলো। হাতে ফোন।
তোমার সঙ্গে একটু কথা বলবে। আমার হাতে ফোনটা দিল।
হ্যাঁ বলুন সিং সাহেব।
একবারে পরিষ্কার করে দেব।
বাংলায় হিন্দী টান। সবাই শুনছে।
ভিখিরী করে দিন। ওদিকেরটা।
ওটা ঘন্টা খানেক আগে খতম করে দিয়েছি।
কেউ পরেছে।
না একবারে ঠান্ডা ঠান্ডায় হয়ে গেল।
কালকে সিনপসিসটা পাঠান।
ঠিক আছে। ওই চারটেকে দিন।
কাজ শেষ হলে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে চলে আসবেন। ঘোঁড়ার ল্যাজ যেদিকে সে দিকে দাঁড়াবেন গাড়িতে তুলে দেব।
আমরা ঘন্টা খানেকের মধ্যে কাজ সেরে নিচ্ছি।
কাগজপত্র আছে।
সব স্পেশ্যাল ভাবে দিল্লীথেকে তৈরি করে আনিয়েছি।
ঠিক আছে।
অরিত্রর হাতে ফোনটা দিলাম। অরিত্র ফোনটা নিয়েই টেপাটেপি করে নিল।
তোরা একেবারে অনিদার মতো তৈরি হয়েগেছিস না। নো টেনসন ডু ফুর্তি। অনিমেষদা বললো।
বৌদি হাসছে।
বিধানবাবু এবার দেখছেন সুতপার মুখটা কেমন হাসি হাসি।
বিধানদা মিটি মিটি হাসছে।
কিরে অনুপ অনিকে আমাদের পার্টির সদস্য পদটা দিবি।
ভাবছি কামিং ইলেকসনে ওকে এমপি বানাব। ওর জন্য কোন প্রচারের দরকার নেই।
আমরা খাটব স্যার।
এ ব্যাটা বলে কি অনুপ।
টনার দিকে তাকিয়ে।
তোদের ওখানে গোপাল আছে না।
গোপালদা অনিদাকে ভয় পায়।
কেন।
কয়েকদিন আগে অনিদা ছট্টুকে মেরে দিয়েছে। কাগজে খপর বেরিয়েছে। গোপাল ওপারে চলে গাছে।
ওপারে মানে।
খুলনায় চলে গেছে।
কেন।
যদি অনিদা মেরে দেয়।
তাহলে অনিদা তোদের দাদা বল।
না না, অনিদা, অনিদা।
ছোটমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। এবার মিত্রা উঠে এলো। সবাইকে চা দিচ্ছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
তুই যাচ্ছিস কোথায়। অনিমেষদা বলে উঠলো।
একটু আসছি।
এগিয়ে যেতে টনা পা ধরে ফেললো। আবার কান্না।
কি হলো বলবি তো।
তুমি একটু মনাকে বলে দাও।
মনা কোথায়।
নিচে।
ছাড়, বলেদিচ্ছি। সকালে হাসপাতাল গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসবি।
আমি দুটো ফুঁড়ে দিয়েছি। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
ওই দেখুন বিধানবাবু এতোক্ষণ গলা পেয়েছিলেন ? এখন একটু একটু গলার স্বর বেরচ্ছে।
বিধানদা হাসছে।
বুঝলে ছোট, তোমাদের এখানে শোবার জায়গা থাকলে আর বাড়ি ফিরতাম না।
কেন আমার অতগুলো ঘর ফাঁকা পরে আছে। ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো।
ডাক্তারবাবু ঠিক কথা বলেছেন। আপনারা দুজনেই কুমার অসুবিধা নেই। অনিমেষদা বললেন।
সবাই হাসছে।
ওরে যাচ্ছিস যা মারার অর্ডারটা দিস না। অনিমেষদা কথাটা ছুঁড়ে দিল।
আমি বেরিয়ে এলাম। ইসির সঙ্গে বারান্দায় দেখা হলো। বরুণদা ও নীচু স্বরে কথা বলছে। আমার পথ আটকাল।
যা নিচে গিয়ে শুয়ে পর।
ইসি আমার দিকে তাকাল।
কি দেখছিস ওমন করে।
তোকে ছুঁলে মনে হয় অনেক জম্মের পাপ থেকে মুক্ত পাব।
যা একটু শুয়ে পর, বরুণদার কাল অফিস আছে।
যাবে না।
জ্যেঠিমনি কোথায় ?
আর টেনসন নিতে পারল না। ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছি।
কে দিল।
তোর নীরু ডাক্তার।
হাসলাম।
হাসলি যে।
এমনি। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। কনিষ্ক পাশে পাশে এলো। নিচে আসতেই চিকনা জড়িয়ে ধরলো। সবাই ঘিরে ধরেছে। রতন, আবিদ, নেপলা, সাগির, অবতার কাকে বাদ দেব।
একটা সিগারেট দিবি।
বটাদা। চিকনা চেঁচালো।
বটা এগিয়ে এলো। সিগারেট দিল।
রতন।
বলো দাদা। ওমকে একবার ফোন কর।
ওম ওখান থেকে মালদের নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে।
কেন।
আবিদ কি গন্ধ পেয়েছে।
এখন কোথায় আছে।
পিলখানায়। আবিদের খাশ ডেরায়।
ওদের হ্যান্ডওভার করতে হবে।
কাজ শেষ!
হ্যাঁ।
রতন দু’হাত তুলে একবার ঝাঁকুনি দিল।
মনা কোথায়রে ?
নিচের ঘরে শুইয়ে রেখেছি। নীরু বললো।
কেনরে।
মারটা একটু বেশি পরে গেছে দাদা। নেপলা মাথা নীচু করে বললো।
ভাঙ্গা ভাঙ্গি করেছিস না কি ?
না চোখটা একটু কালসিটে পরে গেছে।
ছাগল তুই থাকতে এতোটা মারল কেন। কনিষ্কর দিকে তাকালাম।
আমি তুই নিচে নামার আগেই কাজ সেরে দিয়েছে।
চল দেখি।
আমি নিচেরে ঘরে এলাম। দেখলাম মনা গুটি সুঁটি মেরে শুয়ে আছে। আমি ওর পাশে বাবু হয়ে বসলাম। সত্যি বেচারার মুখটা ফুলে একাকার হয়ে গেছে। আমি মাথায় হাত রাখলাম।
মনা।
মনা চোখ চাইল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
আমি অন্যায় করে ফেলেছি দাদা।
কাঁদে না।
শালা প্রবীরকে কালই হাঁসুয়াদিয়ে টুকরো করে দেব।
আমি ওর মাথাটা কোলে তুলে নিলাম। আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
পাগল, আগে আমার নামটা বলবি তো।
কি করে জানব। এটা তোমার বাড়ি। সেই তুমি গেলে একমাস আগে ভাগ্নের অন্নপ্রাসনে, আর গেলে না।
কেন, কনিষ্করা যায় নি।
একমাত্র অনিকেতদা গেছিল দু-বার। বললো তোমার সঙ্গে দেখা হয় নি।
কথা বলিস না। কষ্ট হবে।
শালা ওর জন্য মার খেলাম।
নীরুদা ওষুধ দিয়েছে।
হ্যাঁ।
একটু ঘুমো। কাল সকালে বাড়ি পৌঁছে দেব।
আজ রাতেই ফিরব। কাল মিটিং আছে।
ঠিক আছে কনিষ্কদা পৌঁছে দিয়ে আসবে সকালে।
কিছু খেয়ে বেরিয়েছিলি।
সেই দুপুরে বেরিয়েছি।
কনিষ্ক দেখনা কিছু খাবার আছে কিনা।
অনেক আছে।
যা টনাকে নিয়ে আয়। দু’জনকে বসিয়ে দুটো খেতে দে।
চিকনা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ওরা আমাকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখটা ছল ছল করে উঠলো।
তুমি কাঁদছ কেন।
মনা আমার হাতটা ধরে ফেললো।
আমি অন্যায় করেছি, শাস্তি দিয়েছে।
কেন অন্যায় করতে গেলি।
না জেনে করে ফেলেছি দাদা।

এখানে ভিড় করে কি করছিস সবাই। অনিমেষদার গলা।
ভিড়টা একটু সরে গেল। দেখলাম গেটের সামনে ওরা সবাই। আমাকে এই অবস্থায় দেখে ওরা এগিয়ে এলো মিত্রা এসে পাশে বসলো।
মনা আধচোখ বন্ধ ফোলা মুখে তাকিয়ে তাকিয়ে মিত্রাকে দেখছে।
তোর বৌদি।
মনা উঠে বসতে গেল। মিত্রার পা ছুঁতে চাইল। একটু হাসার চেষ্টা করলো, পারল না। দুফোঁটা জল চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো। অনিমেষদা, বিধানদা স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে।
তুই শুয়ে থাক। কিছু খেয়ে নে।
আমি ওর চোখটা মুছিয়ে দিলাম। আস্তে করে ওর মাথাটা বালিসে রাখলাম।
উঠে দাঁড়ালাম। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
নিজের চোখে একবার দেখ, সত্যি কারের যারা পার্টিটাকে ভালবাসে তারা এইভাবে মার খায়। আর বাবুরা এসি গাড়ি চড়ে।
গমগম করে উঠলো আমার গলাটা। কোথাও দাঁড়ালাম না। কারুর দিকে তাকালাম না। ফোনটা বার করে ডায়াল করলাম।
সিংজী কি খবর।
কাম শেষ করলাম।
এমন দিন মুখের জিওগ্রাফি যেন বদলে যায়। বাকিটা আমি বুঝে নেব।
কি বলছেন অনিবাবু, এ আপনার রাগের কথা।
আপনি না পারলে, আমি অন্য ব্যবস্থা করবো।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আপনি রাগ কিয়েন না।
ক্যাশ কতো পেলেন।
আরে রাম রাম। কি বলবে আপনাকে। জালি নোট ভি আছে। নেতা লোককা ঘরমে গন্ধী সিডি ভি আছে। আপনা পত্রকার যে এসেছে সে ভি বলে দু-একজনকে চেনে।
কি বলতে চায় কি।
ফরফরা রাহা হ্যায় বোলে কি হামি দিল্লিমে বাত করবে। উধার কই ক্যাবিনেট মিনিস্টার লোগোকে সাথ।
ওকে তুলে নিয়ে চলে আসুন। এখন ফ্ল্যাশ করবেন না। কালকের দিনটা যাক তারপর দেখছি।
আপনার অনিমেষবাবু ভি ওহি বোলা। হামারা সাথ বাত হুয়া।
ঠিক আছে।
হামার ওহি লোক।
একমিনিট দাঁড়ান।
আবিদ।
দাদা দুমিনিট পর ফোন করলে হতো না।
সিংজি মিনিট পাঁচেক বাদে আপনাকে ফোন করছি।
আচ্ছা।
অনিমেষদা কাছে এগিয়ে এলো। আমার হাতটা চেপে ধরলো। অনুপদা আমার সামনে। কেউ কোন কথা বলছে না। ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে।
আবিদ ছুটে এলো, দাদা ওম রুবীর সামনে দাঁড়াচ্ছে। এই গাড়ির নম্বর।
আমি আবার সিংজীকে ফোন করলাম।
হ্যাঁ বলেন অনিবাবু।
গাড়ির নম্বর লিখুন।
হ্যাঁ বলেন।
গাড়ির নম্বর বললাম।
ওরা রুবীর সামনে দাঁড়াবে আপনার গাড়িতে তুলে দেবে।
ঠিক আছে অনিবাবু। কাজ শেষ হবার পর আমাকে একবার জানাবেন।
ফোনটা কেটে সেভ করলাম।
অরিত্র।
হ্যাঁ দাদা।
ওখানে কে আছে। সায়ন্তন আর অর্ক আছে।
অর্ক কখন গেল।
তোমার ম্যাসেজ পেয়েই অর্ক সায়ন্তনকে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তারপর নিজে চলে গেছে।
কাজ হয়ে গেলে চলে আসতে বল। নিউজটা বেরবে না। সব ডকুমেন্টস রেডি রাখ। সময় হলে বলবো। আর কেউ খবরটা পায় নি ?
না।
অনুপদার দিকে তাকালাম।
অসুবিধে না হলে। ডাক্তারদাদার বাড়িতে গিয়ে একটু শুয়ে পরো। কাল সকালে কথা বলবো।
কারুর দিকে তাকালাম না। সোজা নিজের ঘরে চলে এলাম। ঘর অন্ধকার। রাস্তার নিওন আলোর কিছুটা ঘরে এসে পরেছে। টেবিলের ওপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলাম। সোজা জানলার ধারে চলে এলাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
টনা, মনা। শালা সম্বন্ধি। দুজনে ওই এলাকার নেতা। ডাকসাইটে এলাকার দাদা। এদের ভয়ে কেউ ওই তল্লাটে রা করতে পারে না। তাদের কি অবস্থা করে ছেড়েছে এরা।
কিন্তু দুজনে কতো ভালো। মনে পরে যাচ্ছে প্রথম দিনকার কথা। আমি গেছিলাম চিংড়ি মাছ নিয়ে লিখতে। ওদের ভেঁড়ি থেকে চিংড়িমাছ বিদেশে রপ্তানী হয়। কিভাবে চাষ হয়, কতদিন লাগে, কতটুকু অংশ বিদেশে যায় এই সব।
নতুন কেউ এলাকায় পা রাখলেই টনার কাছে প্রথমে খবর চলে যায়। তারপর মনার কাছে। অনেক নোংরামি ওই ভেঁড়ি এলাকায়। ফলে মানুষগুলো কিছুদিনের মধ্যে নোংরা হয়ে যায়। ওদের মন বলে আর কিছু থাকে না।
সারাদিন ভেঁড়িতে, রাতে মদ, জুয়া, মেয়ে নিয়ে নোংরামি। কি নেই।
আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে ঢুকলাম। মাথার পোকাটা নরে উঠলো, মানুষের ভালো করতে হবে। একদিন টনাকে বললাম, এখানে একটা স্কুল করনা, বাচ্চাগুলো একটু লেখা পরা শিখুক।
রাখো তুমি অনিদা। তার থেকে ভেঁড়িতে জাল টানলে দুটো পয়সা আসবে।
অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে একটা স্কুল করলাম। তাও আবার ভেঁড়ির ধারেই পাহারা দেবার একটা টংয়ে। চারদিক খোলা। শীতকালে খোলা মাঠে। ওদের সঙ্গে যতোক্ষণ থাকতাম আমি উনা মাস্টার ওরা অনি হয়ে যেতো। নিজের দুষ্টুমিগুলো ওদের মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম।
বেশ ভালো লাগতো। প্রথম প্রথম কনিষ্করা যায় নি। ওদের ভাড়ি ধরণের শরীর খারাপ হলে, চিঠি লিখে কনিষ্কদের কাছে পাঠাতাম। পরে একদিন কনিষ্ক বললো, আমাদের নিয়ে চল।
ওদের নিয়ে এলাম। টনা মনার সে কি আনন্দ। ওরা প্রস্তাব দিল, একটা ঘর করে দে। আমরা সপ্তাহে সপ্তাহে কেউ না কেউ আসবো। তোদের চিকিৎসা করবো। ওষুধ হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসতো। কিছু শ্যাম্পেল কপি ওদের দিত।
সারাদিন টেনসন কাজের চাপের মধ্যে যখন নাভিশ্বাস উঠতো ওদের ওখানে চলে যেতাম। কয়েকঘন্টা বেশ ভালো কাটতো। খাওয়া জুটতো কলাই করা থালায় মুড়ি, মাছভাজা।
একেবারে ঘরের তৈরি।
খোলা আকাশের তলায় জলের ধারে বসে আমরা আড্ডা মারতাম। কখনো কখনো ওরা চিংড়িমাছ ধরে ভেজে খাওয়াত। আমার মতো কনিষ্ক, বটা, নীরু, অনিকেত সবার মধ্যে একটা নেশা ধরে গেল। ভালোপাহাড়ের মতো এটাও আমাদের একটা এনটারটেনমেন্টের জায়গা।
এদিকে জড়িয়ে পরার পর আমি মাঝে মাঝে যেতাম, কনিষ্করা রেগুলার যাওয়া আসা করতো। আমাদের কিছু চাওয়ার ছিলো না। তাই ভালোবাসা কাকে বলে ওরা উজার করে দিত। ওরা বাম রাজনীতিতে বিশ্বাস করতো। আমরাও সবাই করতাম, ফলে মনের মিল হলো।
ওদের বুদ্ধি দিতাম কি ভাবে চলবি। তার ফল ওরা হাতে নাতে পেত। আমরা হয়ে পরলাম ওদের বিশ্বাসের স্থল। বেশ কাটছিল। গতমাসেই তো টনার ছেলেটার অন্নপ্রাসনে গেছিলাম।
মনের মধ্যে প্রচন্ড টেনসন।
কি করবো, হঠাৎ হাজির, গিয়ে দেখি টনার ছেলের অন্নপ্রাসন। ওর বউ কিছুতেই ছাড়বে না। আমারও কাজ আছে। চলে আসবো। বাধ্য হয়ে পান্তা খেয়ে চলে এলাম। ওর বউটা কাঁদছিল। অনিদা তোমাকে গরমভাত খাওয়াতে পারলাম না।
বলেছিলাম পরে একদিন এসে খেয়ে যাব। সেই শেষ যাওয়া। আর আজ।
বুকের ভেতর কে যেন পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। জানলার ধাপিতে হাতটা রেখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অন্ধকারের মধ্যেও আমগাছের পাতা গুলোকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠলো। ফিরে তাকালাম। গেটের মুখে বড়মা, ছোটমা, বৌদি, মিত্রা, ইসি।
জোড় করে হেসেফেললাম। জানলা থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলাম। কাছে এসে দাঁড়ালাম।
অনিমেষদারা ডাক্তারদাদার বাড়িতে গেছে ?
বৌদি মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বললো। দাদা, মল্লিকও গেছে।
কনিষ্করা ফিরে গেছে।
ওরা নিচের ঘরে শুয়েছে।
তোমরা একটু শুয়ে পরো। নাহলে সকালে উঠতে পারবে না।
বড়মা ছোটমা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। ইসি মিত্রা আমাকে অবাক হয়ে দেখছে।
হেসে ফেললাম। কি দেখছো অমন করে।
ছোটমা জড়িয়ে ধরলো। আরও কতো ব্যাথা এই বুকে লুকিয়ে রেখেছিস।
এই দেখো বোকার মতো কাঁদে। অনি ঠিক আছে, একটুও বিগড়ে যায় নি। যাও অনেক রাত হয়েছে।
দেখলাম ইসির চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পরছে।
তোমরা এরকম করলে চলে কি করে। আমার যা কিছু, সব তোমরা। তোমরা এরকম করলে অনি দুর্বল হয়ে পরবে। তোমরা কি এটা চাও। যাও আর দেরি করো না।
ছোটমা আমাকে ছাড়ল।
তোমরা কোথায় শোবে নিচে না ছোটর ঘরে।
দেখি। বৌদি বললো।
তুমি অনিমেষদাকে কিছু বলো না। দাদা বড়ো একা হয়ে পরেছে।
বৌদি মাথা নীচু করে কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলো।
আমি ওদের ধরে নিয়ে বারান্দা দিয়ে আস্তে আস্তে ছোটমার ঘরের কাছে এলাম।
একবার করে সকলকে জড়িয়ে ধরলাম।
সবাই আবেগে আপ্লুত। ইসিকে বললাম, অনিকে দশ বছর পর দেখছিস, অনি হয়তো অনেক নোংরা হয়ে গেছে। পারলে ক্ষমা করিস।
ইসি আমাকে জাপ্টে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
ওদেরকে ছোটমার ঘরে ঢুকিয়ে আমি মিত্রা ফিরে এলাম। দুজনে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম ওরা ছোটমার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতনাড়লাম। ওরা ঘরে ঢুকে গেল।
আমরা দরজা বন্ধ করলাম।
পায়ে পায়ে টেবিলের সামনে এলাম। মোবাইলটা টেবিল থেকে তুলে নিলাম। স্যুইচ অফ করা ছিল অন করলাম। দেখলাম কয়েকটা মিস কল। তার মধ্যে সিংজীর মিশ কলও আছে। অর্ক একটা ম্যাসেজ করেছে।
তোমার মতিগতি বোঝা মুস্কিল, কতো কষ্ট করে মালটা তুললাম, অরিত্র বললো যাবে না।
বুবুন।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি ওর দিকে তাকালাম। চোখ ছল ছল করছে।
আমার সঙ্গে একজায়গায় যাবি। আমি বললাম।
এখন ? কোথায়!
তুই বুবুনকে ভালবাসিস। তাহলে প্রশ্ন করছিস কেন।
মিত্রা আমার বুকে মুখ রাখলো।
একটু দাঁড়া।
আমি সিংজীকে ফোন করলাম।
বলুন অনিবাবু।
আপনি কি অফিসে।
হ্যাঁ।
একটা গাড়ি পাঠাতে পারবেন।
আভি।
হ্যাঁ।
কোথায় বলেন।
আমার বাড়ির সামনে।
ওই ট্র্যাংগুলার পার্কে।
হ্যাঁ।
গাড়িটাকে বাড়ির থেকে একটু দূরে দাঁড়াতে বলবেন।
ঠিক আছে আমি আভি পাঠিয়ে দিচ্ছে।
আর একটা কথা।
বলেন।
কোন কেশ লিখবেন না। আমি না যাওয়া পর্যন্ত।
এ কি বলছেন অনিবাবু!
আমি গিয়ে বলছি।
ঠিক আছে আপনি আসেন।

মিত্রা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ওকে ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইশারা করলাম। আলমাড়িটা আস্তে করে খুলে পার্টনারের স্টাম্প এবং প্যাড বার করলাম।
মিত্রার হাতে দিলাম।
একটু ধর। আমি নিচে গিয়ে ইশারা করলে পা টিপে টিপে চলে আসবি।
ওর চোখ দুটো চক চক করে উঠলো। মুখে এক চিলতে হাসি।
আমি ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নিঃশ্বাসে বুঝতে চেষ্টা করলাম কেউ জেগে আছে কিনা। দেখলাম সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। পা টিপে টিপে নীচে নেমে এলাম। গেটে তালা ঝুলছে। দেখলাম ছগনলালের ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজান আছে।
একটু ঠেলতেই খুলে গেল। আমি জানি দরজার পাশেই একটা হুকে চাবিটা ঝোলান থাকে। হুকথেকে চাবিটা নিয়ে বারান্দায় তাকালাম। দেখলাম মিত্রা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ওকে ইশারায় ডাকলাম। ও নিচে চলে এলো। আস্তে করে গেটের তালাটা খুলে। একটু ফাঁক করে মিত্রাকে প্রথমে বাইরে বার করলাম, তারপর নিজে বেরিয়ে এলাম।
তালাটা লাগিয়ে চাবিটা ছুঁড়ে বাগানের রাস্তায় ফেলেদিলাম। যাতে সকালে কারুর কনো অসুবিধা না হয়। দুজনে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। চারিদিক শুনশান। জনমানব শূন্য। দু একটা রাস্তার কুকুর গুটি শুঁটি মেরে শুয়ে আছে।
আমাদের দুজনকে একবার মুখ তুলে দেখে ওউ ওউ করে ডেকে উঠলো। মিত্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছে। দুজনে হন হন করে হাঁটছি। ট্র্যাংগুলার পার্কের কাছে আসতে দেখলাম গাড়িটা এসে কাছে দাঁড়াল।
স্যার আপনি অনিবাবু।
হ্যাঁ।
দু’জনে গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রইভার সাহেব মোবাইলে আমাদের ওঠার সংবাদ পৌঁছে দিলেন।
দুজনে গাড়ির পেছনের সিটে স্থানুর মতো বসে আছি। কাল রাতের পোষাক এখনো ছাড়া হয়ে ওঠে নি। কারুর মুখে কনো কথা নেই।
মিত্রাকে ইশারায় বললাম মোবাইলের স্যুইচ অফ করে দে। মিত্রা মোবাইলের স্যুইচ অফ করে দিল। দুজনে দুজনের দিকে তাকাই আর মিটি মিটি হাসি। গাড়িটা সল্টলেকে ওদের দফতরে যখন এসে পৌঁছল দেখলাম ভোরের আলো ফুটছে।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখি সিংজী গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। এগিয়ে এলেন। হাসছেন।
একি অনিবাবু, একেবারে ভাবিকে সঙ্গে করে লিয়ে এসেছেন।
মিত্রার সঙ্গে সিংজীর পরিচয় করিয়ে দিলাম।
সিংজী।
বলুন।
আমরা যে এখানে এটা কাউকে জানাবেন না।
ঠিক আছে।
প্রবীরদা কোথায় ?
ভেতরে।
কেশ লিখে ফেলেছেন।
না বেলের অর্ডারটা লিখেছি। আপনি জামিন নিবেন। আপনার মতো লোক জামিন করাতে এসেছে। আমি না ছেড়ে পারি কি করে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
পায়ে পায়ে ভেতরে চলে এলাম। বাইরে কিছু লোককে দেখলাম। আমাদের দেখে চাপাস্বরে কিছু কথা বলছে। ভেতরে আসতেই দেখলাম প্রবীরদা সিংজীর ঘরে মাথা নীচু করে বসে আছে।
আমাদের দুজনকে এইভাবে এই পোষাকে দেখবে কল্পনাও করতে পারে নি। ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো।
মিত্রা প্রবীরদার পিঠে হাত বুলতে বুলতে বললো, একি করছেন প্রবীরদা।
তুই আমাকে প্রবীরদা বলিস না। তোর মুখে ওই নামটা শোভা পায় না।
ওকে ছাড়ুন, বুবুনের এখন অনেক কাজ।
প্রবীরদা আমাকে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছছে।
তোমার মোবাইলটা কোথায়।
বাইরে।
কার কাছে আছে।
তোর বৌদির কাছে।
যাও গিয়ে বলে এসো, মোবাইলের স্যুইচ অফ করতে। আমরা যে এখানে আছি কেউ যেন জানতে না পারে। যে চেলারা এখানে এসেছে, তাদের যেন মুখ বন্ধ থাকে। লোকাল, ব্রাঞ্চেও খবর পাঠিয়ে দাও।
মিত্রার দিকে ঘুরে তাকালাম।
তুই প্রবীরদার সঙ্গে থাক। আমি ভেতরে যাই।
আমি সিংজীর সঙ্গে ভেতরে চলে এলাম। সব গুছিয়ে কাজ সারতে প্রায় দেড় ঘন্টা লাগলো। আমাদের অফিসের প্যাডে চার রকমের চিঠি লেখা হলো। সব আইন বাঁচিয়ে, আমি মিত্রা দুজনে সই করলাম। প্রায় গোটা পঁচিশেক। সব জায়গাতেই অফিসের স্টাম্প লাগাতে হলো। কাজ শেষে সিংজীকে বললাম চলুন আমার বাড়িতে।
এখন না, খুব টায়ার্ড।
আমার থেকেও।
সিংজী হেসে ফেললেন।
বাইরে বেরিয়ে এলাম।
সিংজীর কাজ সেরে বেরিয়ে আসতে আরও পনেরো মিনিট সময় নিলো।
বাইরে বেরতেই প্রবীরদা একচোট জড়িয়ে ধরে আবার হাপুশ নয়নে কেঁদে উঠলো।
এখন ছাড়ো। চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মিত্রা প্রবীরদার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। পিকুর মতো প্রবীরদারও একটা ছেলে আছে। ওর গালটা ধরে একটু নেড়ে দিলাম।
তোমার গাড়ি আছে।
হ্যাঁ।
তুমি মিত্রাকে নিয়ে তোমার গাড়িতে বসো। আমি সিংজীর গাড়িতে বসছি।
প্রবীরদা বাধ্য ছেলের মতো আমার কথা শুনলো।
সবাই গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু করলাম। বাড়ির গেটের মুখে এসে যখন দাঁড়ালাম, তখন সূর্য অনেকটা ওপরে। আমি প্রথম গাড়ি থেকে নামলাম। গেটের মধ্য দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম। অনিমেষদা, বিধানদা, দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা বসে আছে অনুপদা, রূপায়ণদাকে দেখতে পেলাম না। আমি গেটের দরজা খুললাম। ওরা সবাই নেমে এসেছে।
প্রবীরদা এসে আমার হাতটা চেপে ধরলো। দূর থেকে দেখলাম ওরা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। বিধানদার মুখে একচিলতে হাঁসি। এই হাঁসি এবার সবার মুখে ছড়িয়ে পরলো। পায়ে পায়ে ওরা এগিয়ে আসছে। অনিমেষদা ফোনের বোতাম টিপছে।
ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো, বান্ধবী দেখবে এসো তোমার ছেলের কীর্তি।
আমরা বাগানে ঢুকে পরেছি। নিচের বারান্দায় চেনা মুখের ভিড়। বিধানদা এসে আমার কাঁধটা জোড়ে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বুকে টেনে নিল।
বিধানবাবু সব মাংস আপনি খেলে আমি কি ঝোল খাব।
বিধানদা আমাকে ছেড়ে মিত্রাকে বুকে টেনে নিল।
তোদের দুটোকে কেউ হারাতে পারবে না। তোরা সকলকে বুকে করে আগলে রাখিস।
প্রবীরদা মাথা নীচু করে কেঁদে চলেছে। সবাই মাঠের মধ্যে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
সবার চোখেই বিষ্ময়।
অনিমেষদা ফোনটা পকেটে রেখে আমার দিকে তাকাল।
আয় আমার বুকে আয়। তোর মতো আমার বুক অতোটা চওড়া নয় বুঝলি।
সবাই আমার দিকে কেমন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
কি প্রবীর জীবনে প্রথম কাঁদছো। এটা হেরে যাওয়ার কান্না, না দুঃখের।
বিধানদা প্রবীরদার সামনে দাঁড়িয়ে।
অনিকে আমি নিজের হাতে তৈরি করিনি। ওকে প্রকৃতি তৈরি করেছে। তোমাদের নিজে হাতে গড়েছি। এখন দেখছি মানুষ গড়তে গিয়ে বাঁদর তৈরি করে ফেলেছি।
প্রবীরদা মাথা নীচু করে।
কি বনানী। অনির সম্বন্ধে অনেক কথা পার্টি অফিসে গিয়ে আমাকে বলেছো। মুখ বুঁজে তোমার সব কথা শুনেছি। কোন উত্তর দিই নি। আজ তোমার প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছ।
ওঃ বিধানবাবু।
থামো অনিমেষ। ওইটুকু দুধের শিশু কেমন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে দেখ। ও কি শিখবে। আমাদের কীর্তি কলাপ।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন ওরা এসেছে। চলুন ভেতরে যাই।
আমি মিত্রা তখন বড়মা ছোটমা বৌদির সামনে দাঁড়িয়ে। ওরা অবাক চোখে দেখছে।
এমা তুমি ভয় পাচ্ছ কেন আমরা ঠিক আছি। মিত্রার গলা কানে এলো।
থাম তুই, তুইও দেখি অনির মতো ফর ফর করছিস।
বড়মার কথায় ডাক্তারদা হেসে ফেললো। হাসি একটা রোগ। সবাই হাসছে।
বড়মা বাঁকা চোখে একবার ডাক্তারদাদার দিকে তাকাল।
আমি বৌদির বুকে আশ্রয় নিলাম। আমার পিঠে হাত বুলচ্ছে বৌদি।
তুই যে মায়াবী আগে অনুভব করতাম, আজ চাক্ষুষ দেখলাম।
আমি বৌদির গালে গাল ঘোষলাম।
দেখলাম পিকু বাবু ছুটতে ছুটতে বাইরে এলো। ঠোঁটে দুধের দাগ। তারমানে দুধ খাচ্ছিল।
আংকেল আজ নেমন্তন্ন খাব না।
আমি বৌদিকে ছেড়ে ওকে কোলে তুলে নিলাম। ছোটমার দিকে তাকালাম।
তুইতো দুধ খেলি, আমাকে চা খেতে দে, তারপর নেমন্তন্ন খাব।
ছোটমার কাছে গেলাম, পিকু আমার কোল থেকে মিত্রার কোলে চলে গেল। ছোটমার কাঁধটা ঝাঁকিয়ে বললাম, একটু চা দাও। আর পারছিনা।
ছোটমা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
দু’জনে জড়ামরি করে বারান্দায় উঠে এলাম।
বুঝলে ছোট এবার জামা কাপরটা ছাড়ি। কাল থেকে পরে আছি।
ছোটমা আমার দিকে ডাগর চোখে তাকাল।
বসার ঘরে এলাম। দেখলাম জ্যেঠিমনি থম মেরে বসে আছে। কালকের শেষটুকু জানেনি। আজ মনে হয় জেনেছে। আমাকে দেখে হাসলো।
একটু জল খাওয়াবে।
ছোটমা আমার মুখে হাত বুলিয়ে, রান্নাঘরের দিকে গেল। দেখলাম দামিনী মাসি উঁকি দিয়ে একবার দেখে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ঠোঁটে এক ঝলক হাঁসি।
আমি সোফাতে গা ছেড়ে দিয়েছি।
ছোটমা এক গ্লাস জল এনে দিল। ঠোঁটে স্পর্শ করলাম।
কই অনি, অনি কই চেঁচাতে চেঁচাতে অনুপদা, রূপায়ণদা, নিরঞ্জনদা, ইসলামভাই, রতন, আবিদ, নেপলা, চিকনা, অনাদি ঢুকলো।
অনুপদা ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে বসলো। কোলে মাথা রেখে কেঁদে ফেললো।
আমি গ্লাসটা ছোটমার হাতে দিলাম।
নিজেকে ভীষণ অপ্রস্তুত লাগছে। ওরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
এই অনুপ এ কি হচ্ছে। ছোটমা অনুপদার কাঁধে হাত রেখেছে।
না বৌদি না। ও আমাদের চাপগে চাপগে শিক্ষা দিচ্ছে, কি ভাবে মানুষকে ভালবাসতে হয় দেখো। ক্ষমতাটা শুধু দাঁপের নয়, ভালবাসার জোড় তার থেকে অনেক বেশি।
ঠিক আছে, ওঠো।
আ-মোলো ওটা আবার ওখানে বসে বসে চোখের জল ফেলে কেন। আমরা মেয়ে কাঁদতে পারি, তোরা সব ব্যাটাছেলে, কাঁদিস কেন।
অনুপদা আমার কোল থেকে মাথা তুললো মুখে কান্নাভেঁজা হাঁসি। সবাই ঘরে ঢুকেছে। দেখলাম সিংজীও এসেছেন। সবাই এলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম।
মিলি টিনা এসে জড়িয়ে ধরলো। মুখটা শুকনো শুকনো।
কোথায় গেছিলে, দেখতে পেলাম না।
ওদের নীরুদার নার্সিংহোমে রেখে এলাম।
কেন।
শরীরটা খারাপ হয়েছিল।
কনিষ্ক কোথায় ?
এখুনি এসে পরবে।
ওরা ভাল আছে।
কনিষ্কদা বললো। অনেকটা রক্ত বেরিয়েছে। রক্ত দিতে হবে।
জোগাড় করতে পেরেছে।
হ্যাঁ।
আমি মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম।
ওটা বার করছিস কেন। চলে ?

বড়মা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
বড়মার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ওরকম গা জ্বালান হাসি হাসিস না।
উঃ দিদি। ছোটমা বলে উঠলো।
থাম তুই।
ছোটমা মাথা নীচু করলো।
আজকে ওর পাল্লায় পরে মেয়েটাও মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। দুটোতে মিলে যুক্তিকরে আমাদের মারার তালে রয়েছে।
জ্যেঠিমনি হাসছে।
আমি কি করবো, বুবুন বললো মোবাইল বন্ধ করে দে। আমি বন্ধ করে দিলাম।
সোহাগী আমার দেখ কেমন। খেতে বসিস পাশে, কান ধরে উঠিয়ে দেব। বড়মা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
মিত্রা গিয়ে বড়মাকে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি এরকম করলে চলে কি করে বলো।
রাখ তোদের চলন বলন। তিরিশ বছর ধরে ঘর করছি, বাপের জম্মে এমন দেখি নি।
কি বান্ধবী তোমার প্রেসারটা একবার মাপবো।
রাখো তোমার ডাক্তারী।
আমি ঘরের বাইরে আসতে চাইলাম।
ওই দেখ ছোট ও বাইরে যাচ্ছে। আজ একপাও বেরবি না বলে দিচ্ছি, তাহলে অনাসৃষ্টি হবে।
আচ্ছা আচ্ছা ও বেরবে না। আমি কথা দিচ্ছি। অনিমেষদা বললো।
রাখ তোমার কথা। তোমাদের কারুর কথা ও শুনেছে। ও ওর নিজের মতো চলছে, কালকে ধরে যাকে ঠেঙাল, আজ সকালে তাকে নিয়ে হাজির। তোমরা কেউ আগে থেকে জানতে পেরেছিলে।
বড়মা এক তরফা বলে যাচ্ছে। সবাই মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
বড়মার কথাটা যেন আমার কানেই ঢোকে নি। এমনভাবে আমি বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। মোবাইল থেকে কনিষ্ককে একটা ডায়াল করলাম।
মিত্রা এসে পাশে দাঁড়াল। সঙ্গে ইশি, মিলি, টিনা।
কখন ফিরলি।
আধঘন্টা হলো।
খবর পেয়েছি। শোন মনার চোখটা একটু প্রবলেম হয়েছে। কয়েকদিন থাকতে হবে। অনিকেত কে পাঠিয়ে দিয়েছি ওর বাড়িতে খবর দিতে। বলেছি সামলে দিস।
পারবে ?
পারবে।
আমাকে যেতে হবে।
না। বটা সেন স্যারকে ধরে আনতে গেছে।
কে, শ্যামল সেন।
হ্যাঁ।
অপারেসন করতে হবে।
না মনে হয়। চোখের ভেতরে ব্লাডটা ক্লড করে গেছে।
দেখ চেষ্টা করে, গায়ে গতরে খেটে খায়। চোখ চলে গেলে খাবে কি।
কনিষ্ক চুপ করে আছে।
কখন আসবি ?
ঘন্টা খানেক বাদে।
সোজা ওপরে চলে এলাম। নিজের ঘরে।
ফোনটা টেবিলে রাখলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। পাঞ্জাবীটা খুলতে গিয়ে দেখলাম। ঘরের দরজার সামনে পাঁচ মূর্তি হাজির। দাদা, মল্লিকদা, ইসলামভাই, ডাক্তারদাদাও আছে।
খোল খোল কাল থেকে পরে আছিস। অনিমেষদা ভেতরে ঢুকল।
থাক পরে খুলবো।
তুই ওদের জন্য ভাবিস না, ওদের সব চিকিৎসার খরচ পার্টি দেবে।
দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বসো।
অনিমেষদারা সকলে ভেতরে এলো। আমি আর জামা খুললাম না।
তোমরা একটু বসো, আমি চোখে মুখে একটু জল দিয়ে আসি।
যা।
আমি বাথরুমে ঢুকলাম। দাঁত মাজলাম। ভালকরে মুখ হাত ধুলাম। কাল রাত থেকে যা গেল।
সত্যি ভাবলেই কেমন যেন লাগছে।
অনুপদা ঠিক কথা বলেছে, বিয়ে তো করলি না যেন যুদ্ধ করলি।
বাথরুমের ভেতর থেকে বুঝতে পারছি ওরা সবাই এতক্ষণ ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যে আমি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৌদির গলা পাচ্ছি। ডাক্তারদাদার গলাও পাচ্ছি। ঠিক বুঝতে পারছি না কি আলোচনা হচ্ছে।
আমি টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরলাম। বৌদি কাছে এগিয়ে এলো। মুখে হাত বোলাল। বুকে জড়িয়ে ধরলো। সবাই তাকিয়ে আছে।
এগুলো এবারে ছাড়।
ছাড়ছি। মিত্রা কোথায় গো।
কেন।
ওকে বলো কাগজগুলো দিতে।
স্নান করছে। বেরলে বলছি। ছোট লুচি ভাজছে, খাবি।
আমি একা।
বৌদি হাসলো। অনিমেষদার দিকে তাকাল। তোমরা ওকে এবার একটু ছাড়।
হ্যাঁ সুতপা ছেড়ে দেব। ও কোথায় শেষ করলো একটু শুনি।
আমাদের তারপর থেকে এগতে হবে। বিধানদা বললো।
বৌদি ঘর থেকে বেরতে গেল। গেটের মুখে ছোটমা। চায়ের পট হাতে।
জিজ্ঞাসা করেছো।
কিরে।
বাবু এখন ভিআইপি। খাবার সময় আছে কিনা।
ঘরের সকলে হাসছে।
বৌদি ছোটমা হাতে হাতে সকলকে চা দিল। আমার কাছে এগিয়ে এলো। হাতে কাপটা দিয়ে বললো, কনিষ্ক এসেছে। তোর কীর্তি কলাপ শুনছি।
অনিমেষদার দিকে তাকিয়ে, দাদা ভালো করে ওর খোঁজ খবর নিন, ওর আরও কটা টনা মনা আছে, কটা কনিষ্ক আছে।
সবাই হাসছে।
ও ছোট, থাক বেচারা কাল সকাল থেকে….। বৌদি বললো।
ওর সব ক্রিয়েটেড, খালি কাজ খোঁজে। তুমি দেখবে একটা না একটা ও করেই চলেছে। এই আট মাসে আমার আর দিদির হাড়মাস এক করে দিল।
আমি ছোটমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছি।
দেখছো দেখছো ওর হাসিটা দেখছো।
চল ও লুচি খাবে বলেছে।
আজ বাড়ি থেকে বেড়বার নাম করিস।
সবাই ছোটমার কথা শুনে যাচ্ছে এমনকি দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা পর্যন্ত প্রতিবাদ করছে না। ছোটমা বৌদি চলে গেল।
বিধানদা ইজি চেয়ারে। অনিমেষদা আমার খাটে। বাকি সবাই চেয়ারে।
অমিতাভবাবু।
বলুন।
একটা সিগারেট দিন।
দাদা প্যাকেটটা এগিয়ে দিলেন।
আয় এখানে এসে বোস।
আমি অনিমেষদার পাশে গিয়ে বসলাম।
দাদা মল্লিকদা আমার দিকে তাকিয়ে।
বিধানবাবু আপনি বলুন।
তুমি শুরু করো।
অনুপ।
বলুন।
আচ্ছা অশ্বিনীনগরের খবরটা কবে আসে আমাদের কাছে।
অনির বিয়ের দিন।
মিত্রার কথা মতো অনি কবে জেনেছে।
তার আগের দিন।
আচ্ছা প্রবীর ওই ব্যাপারটার সঙ্গে তোমার কোন ভাবে লিঙ্ক আছে।
প্রবীরদা চুপ করে আছে।
না প্রবীর তোমায় বলতে হবে। কাল তুমি অনির সঙ্গে ফোনে কি বলেছ তা আমরা শুনেছি। সবাই শুনেছে। অনি আমাদের পার্মিসন নিয়েই কথা বলেছে তোমার সঙ্গে।
ভদ্রলোক ওই ব্যবসা করেন। আমি সেল্টার দিয়েছিলাম।
তুমি আমাদের ব্যাপারটা জানিয়েছিলে।
দাদা। রূপায়ণদা বলে উঠলো।
বলো।
পুরনো ইতিহাসে গিয়ে লাভ নেই। প্রবীর অস্বীকার করতে পারবে না, এই ঘটনার সঙ্গে ও জড়িত নয়। আমি সকালে অনিকে খুঁজতে গিয়ে আরও খোঁজ খবর নিয়েছি। পরে বলবো আপনাকে। তারাও দেখলাম অনিকে চেনে।
আমি মাথা নীচু করে বসে আছি।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
বিধানবাবু আপনি বলুন।
অনি।
আমি মুখ তুললাম।
প্রবীরকে কি বলে নিয়ে এলি।
প্রবীরদা কোন অন্যায় করে নি।
বিধানদা হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। তড়াক করে উঠে বসলো।
কি বললি।
প্রবীরদা নির্দোষ।
ছোটমা, বড়োমা, বৌদি, জ্যেঠিমনি ঘরে ঢুকলো।
বড়োমা পরিষ্কার বললো, ও অনিমেষ আমরা তোমাদের কথা শুনবো, যেতে বলবে না। না হলে টিঁকে ওঠা দায় হয়ে উঠছে।
বিধানদা হাসতে গিয়ে কেশে ফেললো।
ঠিক আছে বসুন।
ছোটমা বৌদি সকলকে খাবার প্লেট এগিয়ে দিল।
বিধানদা লুচির প্লেট হাতে নিয়েই বললো।
ছোট খাওয়া হলে একটু চা খাওয়াবে।
হ্যাঁ দাদা সব নিয়ে চলে এসেছি।
লুচি কয়েকটা বেশি নিয়ে এসেছো। ডক্তারদাদা বললো।
আ মরণ খাও না। দেবে খোন।
অনুপদা হেসে ফেললো।
বড়মা, ছোটমা আমার দুপাশে। বড়মার পাশে জ্যেঠিমনি, ছোটমার পাশে বৌদি।
হ্যাঁগো বিধানবাবু অনি ঠিক ঠিক জবাব দিচ্ছে। বড়মা বললো।
বিধানদা খেতে খেতেই বললো। সবে ইন্ট্রোগেসন শুরু করেছি। প্রথমেই ও চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিল।
আমি বড়মার দিকে তাকালাম।
দেখছো তোমরা, কেমন ভাবে তাকায়। এখুনি বলবে তোমরা থাকো আমি চললুম।
তুমি থামো। খালি বক বক। দাদা বললো।
ধমকাও কেন, এতদিনে তুমি কিছু করতে পার নি।
আমি কি ওর পেছন পেছন ঘুরি।
ঘুরতে কে মানা করেছে।
বিধানদার খাওয়া শেষ।
কোথায় রাখি বলো ছোট।
দাদা আর দুটো নিন।
আবার তোমাদের নিচে যেতে হবে।
না না নিয়ে এসেছি।
দাও তাহলে। বাটি চচ্চড়িটা ভারি সুন্দর করেছো।
এটা অনির প্রিয় খাবার, ওর জ্যেঠিমনি করেছে।
বাঃ বাঃ। তাহলে অনিবাবু।
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম।
তাহলে প্রবীর কোন দোষ করে নি।

বৌদি উঠে গিয়ে টেবিলথেকে একটা গাডার মোড়া কাগজ নিয়ে এলো।
ধর মিত্রা দিল।
আমি বৌদির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললাম বিধানদাকে দাও।
বৌদি বিধানদাকে রোলটা দিল।
এটা কি সুতপা ?
অনি কি কাগজ চাইল, মিত্রা দিল।
কিরে এটায় কি আছে।
প্রবীরদাকে কিভাবে নিয়ে এলাম তার ডিটেলস।
বিধানদা চা খেতে খেতে চারটে চিঠি ভাল করে দেখল। তারপর অনিমেষদার হাতে চিঠিগুলো তুলে দিল।
তুইতো দেখছি আইনটাও ভাল জেনে ফেলেছিস।
আমি মাথা নীচু করে বসে রইলাম।
ওরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ডাক্তারদাদার মুখটা হাসি হাসি।
কি সামন্তবাবু, দিদির মুখ থেকে শুনছিলাম আপনি ওকে কিছুটা ধরতে পেরেছেন। কি বুঝছেন।
বিধানদার কথায় ডাক্তারদাদা চায়ের কাপ থেকে মুখ তুললো।
আপনারা এমন কিছু ঘটনা কাল ওর সামনে করেছেন যার জন্য ও নিজে চলে গেল। মনেহয় নিজের বন্ডেই ও ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
আপনি ঠিক ধরেছেন। কাগজের মালিক এবং মালকিন জয়েন্ট বন্ডে ছাড়িয়েছে। আর একটাতে অনি নিজে সাংবাদিক হিসাবে ওখানে উপস্থিত রয়েছে। প্রবীররের বাড়ি থেকে সে করম কিছু পাওয়া যায় নি।
বিধানদার কথা শেষ হবার আগেই অনুপদা খাট থেকে নেমে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। আমাকে হাত ধরে দাঁড় করাল বুকে জড়িয়ে ধরলো। সবাই অবাক হয়ে দেখছে। আমি চুপচাপ।
তুই কাল আমার মনের কথা ধরে ফেলেছিলি।
সবাই কিংকর্তব্য বিমূঢ়।
কি বলছো কি অনুপ। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। বিধানদা বললেন।
তুই বোস তোর কাছে মাঝে মাঝে আসবো। তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বিশেষ করে কি ভাবে মানুষ চিনতে হয়।
আমি বসলাম।
অনুপদা ঠক ঠক করে বড়মা, ছোটমা, বৌদি, জ্যেঠিমনিকে প্রণাম করলো। ছোটমা হাঁই হাঁই করে উঠলো।
এ কি করছো অনুপ।
নাগো ছোটবৌদি অনির মতো তোমাকে যদি ছোটমা বলে ডাকতে পারতাম খুব ভালো লাগতো।
আচ্ছা অনুপ আমরা বাম রাজনীতি করি। আমাদের রাজনীতিতে ইমোসনের কোন জায়গা নেই। তুমি এসব কি শুরু করলে।
দাদা, আপনার আর অনিমেষদার হাতে আমি, রূপায়ণ, প্রবীর তৈরি হয়েছি। অনিমেষদাকে সব কথা কম বেশি বললেও আপনাকে ভয়ে বলতে পারিনা। বলতে পারেন সেই ভয়টা অত্যাধিক শ্রদ্ধা। আমি চেষ্টা করলেও আপনার পার্মিসন নিয়ে কালকে ওই ভাবে প্রবীরের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারতাম না।
তখন ওকে আমি প্রবল ভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। তার আগেই রূপায়ণ বলেছিল, ওরে ও অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। তুই পারবি না। তখন ওর চোখ আমি দেখেছিলাম। আপনারা কেউ ওকে ফলো করেছিলেন কিনা জানিনা। ও কারুর কোন কথা শোনেনি। ও ওর কাজ করে বেড়িয়ে এসেছে। অনিমেষদা যখন অরিত্রকে ডেকে বললো, ওদের গ্রীণ সিগন্যাল দিয়ে দাও।
মুখে কিছু বলতে পারিনি। মনে মনে খুব আপসেট হয়ে পরেছিলাম।
আমাদের তিনজনের একজন সরে যাবে। তারপর একঘন্টা অনিকে দেখেছি।
আপনাদের কথা শুনেছি। অনি যখন ওপরে চলে আসছে, ওর হাতটা চেপে ধরেছিলাম। ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। মুখে কিছু বলিনি, মনে মনে বলেছিলাম। তুই প্রবীরকে ক্ষমা করে দে। আমাদের পাঁচজনের থেকে একজনকে সরিয়ে দিস না।
আপনাদের সঙ্গে ও বাড়িতে গেছি। ঘুম হয়নি। সকালে শুনলাম অনি মিত্রা দুজনেই বাড়ি নেই। মনটা প্রথমে কু গাইল। প্রবীরকে ফোন করলাম। ওর ফোনের স্যুইচ অফ, ওর পরিচিত সবার ফোনের স্যুইচ অফ। নিজের সমস্ত সোর্স ফেল, কাউকে বলতে পারছিনা ঘটনাটা।
শেষে আমি সল্টলেকে ওই আফিসে আমার একজন পরিচিত কে ফোন করি। তখন আমার বর্ণনা শুনে ও বললো, মিঃ সিংকে নিয়ে ওরা বেরিয়ে এসেছে। আপনাকে ভয়ে ফোন করিনি। যদি আপনি কিছু বলেন।
অনিমেষদাকে ফোন করতে গেলাম। তখন অনিমেষদা ফোন করে জানাল অনি গেটের মুখে গাড়ি থেকে নামছে। জিজ্ঞাসা করুণ অনিমেষদাকে আমি প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেছি, প্রবীর আছে কিনা। অনিমেষদা বললেন উইথ ফ্যামিলি।
অনুপদা হাঁপাচ্ছে।
জানি বিধানদা, আমাদের বাম রাজনীতিতে ইমোসনের কনো জায়গা নেই। সেখানে আমরা বাস্তববাদী। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আমার এই অবস্থার জন্য একমাত্র অনি দায়ী।
সারা ঘড় নিস্তব্ধ। পিন পরলে শব্দ হবে। অনিমেষদা ভাবলেশহীন মুখে বসে।
ছোট তোমার ফ্লাক্সে একটু চা হবে। বিধানদা বললো।
আমার জন্য যদি হয় একটু দেখ। ডাক্তারদাদা বললো।
দাঁড়ান আমি বলে আসছি।
দাঁড়া তোর সঙ্গে আমি যাচ্ছি। বৌদি বললো।
তুমি বসো আমি পারবো।
ছোট।
বলুন।
একবার পারলে দামিনীকে একটু ডাকো।
আচ্ছা।
ছোটমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অনুপদা বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে গেল। চোখ ছল-ছল।
প্রবীর অনির সম্বন্ধে তোমার ধারনা বলো।
প্রবীরদা মাথা নীচু করে বসে। বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
দেখো প্রবীর তুমি এবং বনানী এই কয়দিনে আমাকে অনেক কথা বলেছো, এমনকি এও বলেছো, অনি পার্টির অনেক ক্ষতি করছে। আমি শুনে গেছি। তোমাদের কথার কোন উত্তর দিই নি। আমাদের পার্টির মধ্যে অনেক দ্বন্দ্ব আছে, আমরা পার্টির মধ্যে বসেই তার সমাধান করি।
এই ঘটনাটা এখনো পর্যন্ত কেউ জানে না। হয়তো কেউ জানবেও না। যদি সত্যি সত্যি ঘটনাটা কাগজে বেরতো, পার্টি কিভাবে তার মোকাবিলা করতো। আমরা তার স্ট্র্যাটিজি তৈরি করি, আজ এই মুহূর্তে তোমাকে দায়িত্ব দিলাম। তুমি বলো।
ছোটমা বৌদি ঘরে ঢুকলো। পেছনে দামিনী মাসি।
বসো মাসি। বিধানদা বললো।
আমাকে নাম ধরে ডাকুন দাদা।
নাগো মাসি। তোমরা সবাই মিলে অনির মতো একটা ছেলে উপহার দিলে। তোমাদের নাম ধরে ডাকতে পারি। সুতপাকেও আজ থেকে আর নাম ধরে ডাকব না।
মাসি চুপ করে গেল।
তোকে একবার কনিষ্ক ডাকছে। ও চলে যাবে।
কোথায় কনিষ্ক ? অনিমেষদা বললো।
বাইরের বারান্দায়।
ওকে ভেতরে ডাকো।
মাসি গেটের কাছে চলে গেল। ইশারায় কনিষ্ককে ডাকলো।
আয় বাবা আয়। ওদের খবর কিরে। অনিমেষদা বললেন।
এখন ভাল আছে।
কোথায় রেখেছিস ?
নীরুর নার্সিংহোমে।
ওই তল্লাটে লোক পাঠিয়েছিস ?
হ্যাঁ।
সব ঠিক আছে।
না।
আবার কি সমস্যা।
অনিকেতের সঙ্গে টনা মনার বৌ এসেছে। আরো দশ পনেরো জন। ওরা অনির সঙ্গে কথা বলতে চায়।
অনিকেত কি সব সত্যি কথা বলেছে।
না বলে উপায় ছিল না। ওরা এমনি খুব সহজ সরল। বিশ্বাস হারালে ডেঞ্জার।
অনিমেষদা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। বৌদি সবাইকে চা দিল।
তুই একটু বোস।
আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে। কয়েকটা অপারেসন আছে। তাছাড়া ভালোপাহাড় থেকে লোক এসেছে। ওদের কি সমস্যা আছে। ওরা কোথা থেকে জানতে পেরেছে রাজনাথ বাবুর ঘটনাটা। ওরাও অনির সঙ্গে দেখা করতে চায়। বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখে এসেছি।
বিধানদা হেসে ফেললো। হ্যাঁগো অনিমেষ ভালোপাহাড়টা আবার কোথায় ?
অনিমেষদা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন। ঝাড়খন্ডে। কেন আপনাকে বলিনি। ওখানে আমাদের একটা সংগঠন তৈরি হয়েছে। ওরা এসে বার বার যোগাযোগ করছে। রূপায়ণকে দায়িত্ব দিয়েছি।
কে এসেছে কনিষ্ক।
শ্যাম।
তোমরা ওদের চিনলে কি করে।
তোমরা পার্টির সংগঠন কর কি করে বলতে পারো। বড়মা খ্যার খ্যার করে উঠলো।
কি করে জানবো বৌদি।
ওখানে অনি যায়। আজ নয় বিগত সাত বছর ধরে। কনিষ্করাও যায় ডাক্তারী করতে। সুতপা জানে তো।
আমি পর্শু জানলাম। অনির বিয়ের দিন। কনিষ্ক গল্প করছিল।
কি অমিতাভবাবু আপনি অনিকে অনেকদিন দেখছেন। ও আপনার হাতে তৈরি। আপনি কিছু জানতেন। বিধানদা বললো।
রাখো ওর কথা, আমি যা জানি ও তা জানে না। বড়মা বলে উঠলো।
বিধানদা হাসছে।
বিধানবাবু এক কাজ করুণ। রূপায়ণ, অনুপ পার্টি অফিসে যাক। ওদিকটা ওরা সামলাক। আমি আপনি এখানে থাকি। কনিষ্ক ওদের এখানে আনা যাবে ?
ওরা আসতে চাইছে, আমি না বলেছি।
তুই ওদের নিয়ে আয়। এ বাড়ি না হোক ডাক্তারবাবুর বাড়িতে বসে ওদের সঙ্গে কথা বলবো। প্রবীর তুমি এখানে থাকবে, না বাড়ি যাবে।
আমি একটু বাড়ি যাই, বিকেলে আসছি।
তুই একটু শুয়ে পর। তোর চোখ-মুখ লালা হয়ে গেছে।
আর একজন নীচে বড়দির ঘরে ভঁস ভঁস করে ঘুমচ্ছে। ছোটমা বললো।
বেচারা কি করে বলো, অনি এরকম বদমাস সে কি জানত, তাহলে হয়তো বিয়ে করতো না।
অনিমেষদা বললো।
বিধানদা, ডাক্তারদা, মল্লিকদা হাসছে দাদা মুচকি মুচকি হাসছে।
বলুন না একবার গিয়ে চোখে জল ভরে যাবে। আপনার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দেবে।
ছোটমা বললো।
আমার আর হাসতে ইচ্ছে করছে না কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বেদম ঘুম পাচ্ছে। মনে মনে বলছি তোমরা ঘর থেকে বেরলেই আমি ঘুমবো।
সত্যি সত্যি ওরা বেরিয়ে গেল। কারুর সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
কনিষ্ককে বললাম, ওদের নিয়ে বিকেলে আয় কথা বলবো।
ওরা খালি ঘর থেকে বেরবার অপেক্ষা, আমার আর জামা কাপর খুলতে ইচ্ছে করলো না। চিঠিগুলো মনে হয় অনিমেষদা নিয়ে গেল। আমি সোজা বিছানায় শুয়ে পরলাম। শোয়া মাত্রই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো। কে কোথায় কি ভাবে আছে কিছু চিন্তা করতে ভাল লাগছে না। ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমটা ভাঙলো তবু চোখে যতো রাজ্যের ঘুম জড়িয়ে আছে। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না।
তুই ওকে তুলতে পারবি না দিদিভাই। ও হচ্ছে স্টেট বাসের মতো, চললে থামে না। আবার থামলে চলে না।
ইসি হো হো করে হাসছে।
অতো জোরে হাসিসনা এখুনি জেগে যাবে।
তুই না সত্যি কি হয়েগেছিস।
যা বলছি শোন। না ঘুমলে আটচল্লিশ ঘন্টা জেগে কাটিয়ে দেবে। আবার ঘুমলে কুম্ভকর্ণ।
ছোটমা বললো তুলতে।
ছোটমাকে আস্তে বল। শুনলি নিজের কানে, মিলির কার গুষ্টি উদ্ধার করছিল।
মিলির কি লাইফ বল।
কি করবে। একটা ভুল করে ফেলেছে।
ও কোথা থেকে জানলো।
সকাল থেকে কি শুনছিস। দশবছর আগের বুবুন আর এখনকার বুবুন।

আমি ওকে যত দেখছি তত অবাক হয়ে যাচ্ছি।
ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে।
সত্যি ওর কোন বিকার নেই।
অনিমেষদা বিধানদা পার্টির অতো বড়ো বড়ো মাথা। ওরা পর্যন্ত তল খুঁজে পাচ্ছে না।
ওর প্রতি সুরোর কি জোড়।
জোড় মানে। বলতে পারিস কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। সেই দিনের অবস্থা তুই দেখিস নি। অনিমেষদার রূপ দেখলে তুই ভয় পেয়ে যেতিস। সেদিন বুঝলাম ওরা তিনজন ওকে কতো ভালবাসে। ইসলামভাই, দামিনীমাসি পর্যন্ত কেঁদে ভাসিয় দিচ্ছে। ও নির্বিকার।
পর্শুদিনের কথা ভাব।
সত্যি বলছি দিদিভাই আমি ভাবতেই পারি নি ও তোদের এনে হাজির করবে।
মিত্রার গলাটা ভারি হয়ে গেল।
আবার কাঁদে। যা হয়ে গেছে, গেছে, এবার আমরা সবাই এক সাথে।
বুবুন না থাকলে এ জন্মে জ্যেঠিমনিকে পেতাম না।
ঠিক আছে একেবারে চোখের জল ফেলবি না। নে কাপরটা পরে নে। ওকে ডাক।
মিত্রাদি ও মিত্রাদি।
দরজাটা খোল, মিলি এসেছে।
ব্লাউজটা পর।
পড়ছি তুই খোল না, এখন কেউ আসবে না।
ইসি দরজা খুললো।
কিগো অনিদা ওঠে নি ?
তুই ডাক, এতোক্ষণ তোর ষষ্ঠী পূজো করলো।
আমার কি হবে দিদি।
কি আর হবে।
তুমি জান না। গত তিনদিনে প্রায় তিরিশ বার ফোন করেছে।
কই তুই বলিস নি!
কখন বলবো তুমি বলো। সেই পরিস্থিতি ছিল।
আমাকে বলতে পারতিস।
ওই জন্য সেদিন তোমার বাড়ি থেকে আমি টিনা সোজা বাড়ি গেছিলাম। আমার ফ্ল্যাটে না। টিনার ফ্ল্যাটে। কথা বলেছি। বলে কিনা এখুনি চলে এসো। তোমার সঙ্গে ভীষণ দরকার। বার বার অনিদার নাম করছে।
তুই কি বললি।
আমি কিছু বলিনি। বলেছি আমার ল-ইয়ারের সঙ্গে কথা বলো। টিনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছি।
টিনা তোর ল-ইয়ার ?
ওই মুহূর্তের জন্য।
টিনা কি বললো।
ডাইরেক্ট ঝাড়, কবে সই করছেন।
তুই কেশ করেছিস।
না আমার পরিচিত একজন ল-ইয়ারকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।
রিসিভ করেছে।
হ্যাঁ।
কোন উত্তর দিয়েছে।
না।
কতোদিন হয়েছে।
দু’মাস হয়েগেছে।
বুবুন জানল কি করে।
আমি ঠিক ধরতে পারছি না দিদি। হয়তো কথা প্রসঙ্গে কখনো বলে ফেলেছি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না। আমি সবাইকে জিজ্ঞাসা করেছি, সবাই বলছে আমরা বলিনি।
তাহলে বুঝতে পারছিস তোর অনিদা কি চিজ।
সে বলতে।
তোদের গল্প বলি, তোরা বিশ্বাস করিস না।
আচ্ছা তোরা কি বলতো, বেলা হয়েছে না হয়নি। মিলিকে পাঠালাম সেও এসে জমেগেল।
ছোটমার গলা।
ভেতরে এসো।
ওকে এখনো তুলতে পারিস নি।
ডেকো না ডেকো না। তোমার ছেলের কীর্তিটা একবার শুনে যাও। মিত্রা বললো।
আবার কি হলো!
তোমায় মিলির ব্যাপারটা বলেছিলাম হাল্কা করে।
হ্যাঁ। কোন গন্ডগোল!
গন্ডগোল তোমার ছেলে করেছে।
আবার!
আস্তে কথা বলো না। জেগে গেলে আবার শুরু করে দেবে।
কি হয়েছে বল। গলা নামিয়ে।
তখন চিকনা ডাকতে গেল, মনে আছে।
হ্যাঁ। চিকনা তোকে ধরে নিয়ে এলো।
বাবু তখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মিলির তাকে ধমকাচ্ছিলেন। বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়েছেন।
একে নিয়ে কি করি বলতো। জিজ্ঞাসা করলে সব অস্বীকার করবে।
এখন মিলির মুখ থেকে শুনছি, আমার বিয়ের দিন থেকে উনি নাকি মিলিকে কনটিনিউ ফোন করে চলেছেন।
কি বলছে ?
মিলির সঙ্গে দেখা করতে চায়।
এখানে আসতে বল।
তাহলে তো ল্যাটা চুকে যেত। তুমি একটা কাজ করতে পারবে।
বল।
মিলি কোথায় থাকে রে। মিত্রা মিলিকে জিজ্ঞাসা করলো।
মিলি সল্টলেকের এ্যাড্রেস দিল।
কি করে।
সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।
তোর সঙ্গে কি করে আলাপ।
এমবিএ করতে গিয়ে।
সেপারেসন চাইছিস কেন।
চরিত্রের ঠিক নেই। আর কিছু বলতে পারব না।
বলতে হবে না।
শুনলে মিলির সব কথা।
শুনলাম। ছোটমা বললো।
তুমি একটা ঢিল ছোঁড়। ইসি বললো।
কাকে! অনিকে ?
হ্যাঁ।
দূর ওকে ছুঁড়লে কিছুই পাবি না। মিত্রা বললো।
বল তাহলে।
ওই যে নেপলা বলে ছেলেটা আছে না।
হ্যাঁ।
ওকে একবার ধমকাও, এই তুই মিলি যে ঠিকানাটা বললো ওই ঠিকানা বলে তুই ওখানে কি করতে গেছিলি।
তুই ভবলি ও আমাকে গড় গড় করে সব বলে দেবে। সেদিন অনিমেষদা একটা কথাও ওদের পেট থেকে বের করতে পারলো।
তাহলে ইসলামভাইকে বলো।
দাঁড়া ভাবতে দে। ওকে বললে ও বলবে দিদিভাই অনি আমার সমস্ত উইং বন্ধ করে দিয়েছে। আচ্ছা ও অরিত্র অর্ককে দিয়ে অপারেট করাচ্ছে না ?
এইতো ছোটমা তুমি ঠিক বলেছো।
ওরে ছাড় ছাড় ওকে ডাক এখুনি দিদি এসে হাজির হবে। টনার বৌ এখনো বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। অনিদার পায়ে ছুঁইয়ে তবে সে বাড়ি যাবে। বাচ্চাটাকে একবাটি দুধ দিয়ে এসেছি খাওয়াবার জন্য।
ছোটমা আমার কি হবে। মিলি বললো।
থাম তুই। কতো রথী মহারথী গেল তল, মশা বলে কতো জল।
মিত্রা, ইসি হাসছে।
আমি এতোক্ষণ মটকা মেরে পরে ছিলাম। এবার একটু নড়েচড়ে উঠলাম, পাশ ফিরলাম। ছোটমা আমার কপালে হাত দিল।
ও অনি এবার ওঠ, অনেক বেলা হলো। তোর জন্য আমরা সবাই বসে আছি।
আমি চোখ মেলে তাকালাম। দেখলম সবাই আমার দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে। আমি ফিক করে হেসে আড়মোড়া ভাঙলাম। একটু সরে এসে ছোটমার কোলে মাথা রাখলাম।
ওঠ বাবা ওঠ।
কটা বাজে গো ছোটমা।
দুটো বেজে গেছে।
আমাকে ডাক নি কেন।
ওঠ আর ঢং করতে হবে না। মিত্রা বললো।
ভালোই তো ঘুমলি।
তোর থেকে কম।
তোর থেকে তিনঘন্টা পরে ঘুমিয়েছি।
তেমনি তোর আগে উঠেছি।
কখন উঠেছে। ছোটমার দিকে তাকালাম।
অনেকক্ষণ।
এরা তিনজন এ ঘরে কি করছে।
তোকে পাহাড়া দিচ্ছি। আজো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার লেকচার ঝাড়লি।
রেকর্ডিং করেছিস।
ওমা কি শয়তান দেখেছো ছোটমা।
মিত্রা ঘুসি পাকিয়ে তেড়ে এলো, আমি ছোটমার কোল থেকে গড়িয়ে খাটের একপাশে চলে গেলাম। মিত্রা বিছানার ওপর ঘুসি মারলো।
দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি।
মিত্রা খাটের ওপর উঠে এলো।
আমি কিন্তু গন্ডগোল করে দেব।
কর না কর। তুই তো সব সময় গন্ডগোল করছিস।
একিরে তোরা কি দুজনে ঘুসো ঘুসি করছিস। দেখলাম দরজার মুখে বড়মা, বৌদি।
দেখছিস দেখছিস সুতপা কান্ড দেখ।
বৌদি হাসছে।
ছোট তুই ওখানে বসে কি করছিস।
এতোক্ষণ তোমার ছেলের কর্তি কলাপ শুনলাম, এখন ঘুসো-ঘুসি দেখছি।
কেন, আবার কি করলো!
বড়মা বৌদি ঘরের ভেতর এলো।
ছেড়ে দিলাম।
মিত্রা বিছানা থেকে নেমে এলো।
তুই সং-এর মতো দাঁড়িয় আছিস কেন। তোকে ডাকতে পাঠালাম এসে জমে গেলি।
মিলির দিকে তাকিয়ে বড়মা বললো।
এবার ওকে নিয়ে পরেছে। জিজ্ঞাসা করো। মিত্রা খ্যাড় খ্যাড় করে উঠলো।
তোকে বলেছে।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বক বক করছিল।
ও ওরকম করে। তা বোলে কি….।
দেখলি দেখলি দিদিভাই, বড়মার কথা শুনলি। বুবুন কোন দোষ করে না। একবারে ধোয়া তুলসী পাতা।
তুই যে সকাল বেলা ফোন বন্ধ করে রেখেছিলি।
সেটাও তোমার ছেলের কথায়।
ওর কথা শুনিস কেন।
মিত্রা বড়মাকে জড়িয়ে ধরলো। গালে গাল ঘোষে বললো, তুমিও বলবে।
তাহলে, দেখিস ও কোন অন্যায় করে না। করলেই নয় তোকে নয় আমাকে এসে বলবে। দু’জনকে যদি না পায় তাহলে ছোটকে বলবে। বলে কিনা বল।
মিত্রা বড়মার গলা জড়িয়ে ধরে আছে।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে আছি।
দেখছো দেখছো, চোখদুটো কেমন ছোট ছোট করে দেখছে। মিত্রা বললো।

চলবে

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s