দেখি নাই ফিরে (উপন্যাস) (cont. series 31)


আমি আপনাদের একদিন দেখেছি। অনিমেষদা আমাকে দীর্ঘদিন চেনেন।
ওই একদিনেই তোকে সম্পূর্ণ দেখে ফেলেছি।
শুক্রবার কখন যাব বল।
রাতে রেষ্ট্রি করবো। বলতে পার বাধ্য হচ্ছি রেষ্ট্রি করতে, না হলে অনেক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এই কথাটা তোকে বলবো ভেবেছিলাম। ওদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে।
হ্যাঁ। ছ’মাস আগে। তখন থেকেই তো গন্ডগোল শুরু।
পর্দা সরিয়ে বৌদি ঢুকলো, তোমরা কি শুরু করেছো বলো। কাল অতো রাত পর্যন্ত ছেলেটাকে পিষে মারলে। একটু ঘুরতে এসেছে। তা নয়, আবার শুরু করেছ।

জানোনা বৌদি ওর নামে আজকে যা রিপোর্ট জমা পরেছে। ওকে পার্টির ভীষণ দরকার কামিং ইলেকসনে। অনুপদা বললো।
সেই জন্য এখন থেকে শুরু করে দিয়েছ।
জিজ্ঞাসা করো ওকে কি জিজ্ঞাসা করছি। তোর বৌদিকে বলেছিস। অনিমেষদা বললো।
মিত্রাকে বলেছি বলতে, আমি তোমাকে বলবো ও বৌদিকে বলবে। তুমি আমার পার্টে বৌদি ওর পার্টে।
দেখছো, শুনছো ওর কথা।
মিত্রা বলেছে আমাকে। এবার ওকে ছাড়ো, আমরা একটু কথা বলি।
যাও যাচ্ছে।
তুইকি গেছিলি স্পটে।
না অনাদিকে বলেছি। আমি বুধবার ওখানে যাব। ইসলামভাই অনাদিকে নিয়ে ঘুরে এসেছে।
করিতকর্মা ছেলে তোর অনাদি।
সেই জন্য তোমাদের লোকাল কমিটি ওকে ভালকরে বাঁশ দিচ্ছে।
আর দেবে না। তোকে কথা দিচ্ছি।
ব্যাঙ্কটা উদ্বোধনের সময় তোমাদের একবার যেতে হবে।
কবে করবি।
মাস তিনেক বাকি আছে। দিন পনেরোর মধ্যে কাজ শুরু করে দেব। এখন মাঠে ব্যান রোয়া শুরু হয়ে গেছে। চাষীদের হাতে টাকা তুলে দিতে হবে।
কি বুঝছেন বিধানবাবু।
শুনছি ওর কথা।
কি রকম দিচ্ছিস।
হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার লোন। হাজার টাকা নিলে প্রতিদিন দশটাকা করে শোধ করতে হবে। ছয়মাস দিতে হবে। দশটাকার আট টাকা ব্যাঙ্ক নেবে দুটাকা তার এ্যাকাউন্টে জমা পরবে। যে পুরো দিতে পারবে এ্যাকাউন্টের টাকা তার। তা নহলে ওখান থেকে ব্যাঙ্ক তার টাকা নিয়ে বাকিটা তাকে ফেরত দিয়ে দেবে। এই রেশিয়োতে কাজ হবে।
এই প্ল্যানিংটা কার।
আমার। ডাক্তারদাদা খালি রেক্টিফাই করে দিয়েছে।
গ্র্যাজুয়েসনে তোর ইকনমিক্স ছিল না।
হায়ার সেকেন্ডারীতে ছিল। মাইক্রো এবং ম্যাক্রো ফাইনান্স এই দুটোর ওপর হিমাংশুকে জোর দিতে বলেছি।
তোকে এবার সিএম বানাতে হবে। বিধানদা হাসতে হাসতে বললো।
আমি এবার উঠবো।
তোকে তো আসল কথাটাই বলা হলো না।
বলো।
তোকে সেদিন টাকার কথা বললাম।
চেক হলে কালকে দিতে পারব। ক্যাশ হলে সোমবার নিতে হবে।
কি বিধানবাবু চেক হলে অসুবিধা আছে।
ওর অসুবিধা না থাকলেই হবে।
আমি কালকে হিমাংশুর সাথে একটু কথা বলে নিই। তোমাকে ফোনে জানাব।
কতো দিবি।
একের বেশি এখন দিতে পারব না।
একটু বাড়া।
ঠিক আছে দেড় করে দিচ্ছি।
তাই দে। আমাদেরও চলতে হবে।
ওদিককার থেকে যে টাকা আসতো সেটা কি হবে।
সেটা বন্ধ হয়ে গেল।
কি করে বুঝলে, খোঁজ নাও। টাকাটা যে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে না তার কি মানে আছে।
কিরে অনুপ।
অনিমেষদা অনুপদার দিকে তাকাল।
রূপায়ণ তুই কালকে একবার খোঁজ নে। বিধানদা বললো।
ঠিক আছে নেব।
আমি উঠি, শুক্রবার তুমি কিন্তু যাবে সবাইকে নিয়ে। যদিও দাদা তোমাদের ফোন করবে।
আচ্ছা যা।
আমি সুরোর ঘরে এলাম। দেখলাম সবাই গোল টেবিল বৈঠক করছে। আমাকে দেখেই বৌদি হাসলো।
তোকে গেঞ্জিটা কে কিনে দিয়েছে।
বলতে পারব না। সকলাবেলা বাথরুম থেকে বেরতে ছোটমা বললো, এটা পরে নে, পরে ফেললাম।
মিত্রা হাসছে।
তুই আর কিচ্ছু বলিস নি।
জিজ্ঞাসা কর ছোটমাকে। তারপর খানদশেক লুচি বাটি চড়চড়ি দিয়ে সাঁটালাম। বললো মিত্রা বানিয়েছে। তারপর বেরিয়ে পরলাম।
কোথায় গেলি ? বৌদি বললো।
সেটা বলা যাবে না।
কাকে খুঁচিয়ে এলি।
ওই যে বললাম, বলা যাবে না।
তুই মিত্রাকে কি দিবি।
আমি জিনিষ পত্র কিনতে পারিনা।
সব পারিশ, ওটা পারিশ না।
তাহলে তোমায় একটা গল্প বলতে হয়।
তোর কি গল্প ছাড়া জীবনে কিছু নেই।
এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা, এখন তোমাদের বলছি বলে গল্প।
বল শুনি।
তুমি কিছু মনে করবে না।
কেন বল।
এই ধরণের কথা তোমার সামনে কোন দিন বলিনি।
আজ বল, শুনবো।
আমি ভজু তখন হোটেলে কাজ করি। প্রথম মাইনে পেয়েছি দুজনে।
ভজুরও গেঞ্জি জাঙ্গিয়া নেই, আমারও নেই।
বললাম চল ভজু অন্ততঃ একটা করে গেঞ্জি জাঙ্গিয়া কিনে নিয়ে যাই।
তখন তুই কি পরতিস।
মার্কিন কাপরের কৌপিন।
ছোটমা সেদিন একটা খুঁজে বার করেছে। মিত্রা হাসতে হাসতে বললো।
ওই পাড়ায়, আমাদেরই পরিচিত দোকান। মুখ চেনা, গেলাম। গিয়ে বললাম। সাইজ বলতে বললো। বলতে পারলাম না। হাসলো। বললো, যা বুঝেছি প্যাকেট করে দিচ্ছি, নিয়ে যা।
নাচতে নাচতে দুজনে চলে এলাম। স্নানটান সেরে নতুন গেঞ্জি পরলাম একেবারে ঠিক ঠাক। জাঙ্গিয়া পরলাম। কি সুন্দর দেখতে। সামনে আবার ফুল। পরে দেখি হিসি করার জায়গা নেই।
সবাই হেসে ফেললো।
মহাবিপদ, কি হবে। ভাবলাম হয়তো জায়গা করতে ভুলে গেছে। নতুন স্টাইল।
ভজুরাম মহাখুশি। অস্বস্তি হচ্ছিলো, দুর খুলে রেখে ভজুকে দিয়ে দিলাম।
আমি আবার আমার কৌপিনে ফিরে গেলাম। লাল মার্কিন শালুর কৌপিন।
এর দু’চারদিন পর কোথায় গেছিলাম, রাতে ফিরে এসেছি। দেখি ভজু কাঁদছে। কি ব্যাপার। মাসি বেধড়ক পিটেছে। মাসির কাছে গেলাম। শুনে বললাম ও চুরি করেনি, আমি কিনে এনেছি। বিস্তারিত ভাবে মাসিকে বললাম। আমার কথা শুনে মাসি হেসে লুটো পুটি খায়।
সেদিন প্রথম কোনটা মিত্রাদের আর কোনটা আমাদের চিনলাম। তবে আমি কৌপিন পরা ছারি নি। জাঙ্গিয়াও পরতাম না বড় একটা। বড়মার কাছে যখন এলাম। একদিন মনে হয় ছোটমা ঘরে ঢুকে দেখেছিল।
আমাকে চারটে গেঞ্জি আর জাঙ্গিয়া কিনে দিয়েছিল।
তারপর থেকে ছোটমা বড়মা কেনে।
তুমি মাঝে মাঝে কিনে দাও। আমার চলে যায়। বেশির ভাগ সময় তো পরিই না। আমি নিজে থেকে কোনদিন কিনি নি।
ওরা হেসে এ ওর গায়ে ঢলে পরে। অনিমেষদা পাশের ঘর থেকে একবার উঁকি মেরে চলে গেল।
তোকে দেখে এরকম ছাগল মনে হয়না।
মাঝে মাঝে কেন জানিনা ছাগল হয়ে যাই।
মিলি, সুরো, নীপা হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ওঝা সেজেছিলি কবে।
নিশ্চই তোমাকে সুরো বলেছে।
তোর দাদাও শুনেছে।
খেয়েছে। তোমরা আমার আর কিছুই বাদ রাখলে না।
অনিদা মিলিদির ব্যাপারটা বলো। সুরো বললো।
এই-ই। মিলি চিল্লিয়ে উঠলো।
তোকে নিশ্চই নীপা লাগিয়েছে।
সেটা আবার কি। বৌদি বললো।
তুমি বহুত ঝামেলা করো। মিত্রা চল বেশিক্ষণ থাকলে গন্ডগোল।
আমিও তোর রসের ব্যাপারটা বলেছি বৌদিকে।
নিজেরটা বলিস নি।
মিত্রা মাথা নাড়ছে। বলে নি।
দেখ তুই কিরকম স্বার্থপর। নিজেরটা চেপে রেখে আমারটা বলেছিস।
তাহলে আমার, নীপা, টিনা, মিলি, অদিতি, দেবা, নির্মাল্য সবারটা বলতে হয়।
বলবি। পাটি পেরে শানাতে বসেছিস বৌদিকে।
কিরে মিলি, অনি কি বলে!
তুমি অনিদার কথা বিশ্বাস করো না। খালি গুল মারে।
এবার গুল। আমার গুলো ঠিক।
অনিমেষদা আবার দরজার কাছে। তোমরা কি শুরু করেছ বলো।
রাতে তোমাকে বলবো। তোমার অনির কীর্তি।
অনিমেষদা কিছু বলতে গিয়ে হাঁ করে ফেললো।
বৌদি হাসছে।
ওঠ অনেক রাত হলো।
আমি বড়মাকে ফোন করে দিয়েছি। বৌদিও বড়মার সঙ্গে কথা বলেছে।
তোর এতো তাড়া কিসের ? বৌদি বললো।
আর একটু চা খাওয়াও।
সুরো যা অনিদার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আয়। ও ঘরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করিস একবার।
অনিদা যেন এর মধ্যে কোন কিছু না বলে।
ঠিক আছে বলবেনা। তুই এলে আবার বলবে।
সুরো নীপা বেরিয়ে গেল।
আমরা সবাই বৌদির সঙ্গে গল্প করলাম।
বৌদি একবার আমার বাড়িতে যেতে চাইল।
বললাম নিয়ে যাব।
চা খাওয়া হলো। আমরা সবাই অনিমেষদাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। আসার সময় মিলি নিজেই বললো আমি গাড়ি ড্রাইভ করবো মিত্রাদি। মিত্রা না করে নি। আমি মিত্রা টিনা পেছনে বসলাম। ওরা দুজনে সামনে। বাড়িতে যখন ঢুকলাম তখন পৌনে দশটা বাজে। মিত্রা বাড়িতে ঢুকেই বড়মা বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
নাও সব এলেন রাজ্য জয় করে।
ছোটমা ঘর থেকে বলতে বলতে বেরিয়ে এলো।
পেছন পেছন ভজুরাম দৌড়ে এলো।
মিত্রা ভজুকে দেখে হেসে ফেললো।
কিরে ভজুকে দেখে পাগলির মতো হাসছিস কেন।
তোমায় বলবো ছোটমা, আজ বুবুনের আর একটা উদ্ধার করেছি।

আমি মিত্রার দিকে কট কট করে তাকালাম। পেছনের ডিগ্গিটা খুললাম। ভজু মিষ্টির হাঁড়ি সন্দেশের প্যাকেট বার করলো।
অনিদা ওখান থেকে কিনেছ।
হ্যাঁ।
আচ্ছা তোমার কি আর দোকান চেনা নেই।
আমি ভজুর মাথাটা নেড়ে দিলাম।
সবাই ভেতরে এলাম। দেখলাম ডাক্তারদাদা বসে আছে।
কখন এলে।
অনেকক্ষণ। মিত্রা।
বলো।
মিষ্টি বার করে দে।
কেন কাল সকালে খেলে হতো না। বড়মা খেঁকিয়ে উঠলো।
গরম গরম খাওয়ার মজাটাই আলাদা বুঝলে বান্ধবী।
মিত্রা বার করে বড়মা, ছোটমা, ডাক্তারদাদাকে দে।
দেখলে, এটাই হচ্ছে বড়ো মনের পরিচয়। আমি চাইলাম তোমাদের নামটাও জুড়ে দিল।
থাক অনেক হয়েছে। বড়মা কপট হাসি হেসে বললো।
আমি বড়মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। দেখলে, আজ কথা রাখলাম কিনা।
রাত দশটা, মাথায় রাখিস। কাল সারাদিন বাড়িতে থাকব না। সবাই বেরব। বাড়ি পাহাড়া দিবি।
কেন ?
সে জেনে তোর লাভ। তুই সব বলিস।
কারুর দরকার নেই, ভজুরাম থাকলেই হলো।
ভজুও যাবে।
ঠিক আছে।
আমি সোফায় এসে বসলাম। বাইরের গেটে হর্ন বাজলো।
ওই আর এক দল ঢুকছেন। ছোটমা বললো।
আমি ছোটমার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
একবারে তাকাবি না চোখ গেলে দেব। ছোটমা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
ছোটমা ওঘরের চাবি কোথায় ? মিলি বললো।
বড়দির ঘরের ড্রেসিন টেবিলে আছে।
মিলিকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না এই কদিন আগেও এই বাড়ির সঙ্গে ওর কোনো যোগাযোগ ছিল না।
দাদা ঘরে এসে ঢুকল। আমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে হেসে ফেললো।
কিরে মল্লিক, আজ কোন দিকে সূর্য উঠেছে।
পূর্ব দিকে। একটু বসো টের পাবে। ডাক্তারদাদা বললো।
তুমি জানলে কি করে ?
ছোটমা জলের গ্লাস এনে দাদা মল্লিকদার হাতে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো।
আচ্ছা এডিটর তুমি এই বাড়ির গার্জেন, কোন খোঁজ খবর রাখো এই বাড়ির সম্বন্ধে।
কেন রাখবো না ?
বলো এই বাড়ি রং হচ্ছে কেন ?
ওটা বলতে পারব না। অনি জানে।
দেখো প্রথম বলেই তুমি বোল্ড আউট।
কেন কেন শুনি।
অনিবাবু শুক্রবার বিয়ে করছেন, আর রবিবার বৌভাত।
সেতো কবে হয়ে গেছে, আবার অন্য কাউকে বিয়ে করছে নাকি ?
মরণ, দেখো দিকি কান্ড, ন্যাকা কোথাকার। বড়মা রান্নাঘর থেকে বলে উঠলো।
মিত্রা মিষ্টির প্লেট গুলো নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল।
কিরে মা ডাক্তার কি বলে। দাদা মিত্রার দিকে তাকাল।
বুবুন জানে।
কিগো তুমি কিছু জানো। দাদা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললো।
বড়মা ধীরে ধীরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
আমি একবার বড়মার দিকে তাকালাম। রাতেই মিষ্টি গুলো সব শেষ করেদাও বুঝলে, কাল পর্যন্ত আর থাকবে না।
হ্যাঁরে মিষ্টিগুলো কোন দোকান থেকে নিয়ে এলি। দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
কেন খারাপ।
এর টেস্টটাই আলাদা বুঝলি অনি। খেলে আর অন্য মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করে না। ডাক্তারদাদা বললো।
এতো খাও তবু খাই খাই গেল না। বড়মা বললো।
মিত্রা বড়মার কাছে এসে বললো হাঁ করো হাঁ করো।
কেন রে।
বড়মা হাঁ করলো। মিত্রা নলেন গুড়ের কাঁচা সন্দেশ বড়মার মুখে পুরে দিল। পর পর সবাইকে দিল। দাদা ডাক্তারদাদা আর মল্লিকদার প্লেটে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে বললো তুই আমার আঙুলটা চুষবি।
আমি কট কট করে ওর দিকে তাকালাম। উঠে দাঁড়ালাম। হাতের প্লেটটা রান্নাঘরে রেখে বেসিনে হাতটা ধুলাম। দরজা দিয়ে বেরতে যাব, দাদা ডেকে উঠলো।
কিরে, কোথায় যাচ্ছিস।
ওপরে।
বললিনা কার সঙ্গে তোর বিয়ে।
ঘর শুদ্ধু সবাই হাসছে।
আমি আর দাঁড়ালাম না, সোজা ওপরে চলে এলাম। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। জামাপ্যান্ট খুলে বাথরুমে ঢুকলাম। বুঝলাম কাল এরা সব মার্কেটিংয়ে বেরবে। দাদা আমার সঙ্গে এরকম ভাবে কথা বলতে পারে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি নি। ভাল করে মুখ হাতপা ধুলাম। টাওয়েল দিয়ে গাটা মুছলাম। বাথরুম থেকে বেরলাম।
বাথরুম থেকে বেরতেই দেখলাম, মিত্রা অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে, লক্ষ করলাম ঘরের দরজায় ছিটকিনি দেওয়া।
কিরে এ কি অবস্থা তোর!
তুই বাথরুম থেকে বেরবি, আর আমি জাপ্টে ধরবো।
সবে মাত্র গা ধুয়ে এলাম। এখন বাথরুমে ঢোক। চট পট সেরে নে।
মিত্রা চোখে দুষ্টুমি হাসি হেসে আমার কাছে এগিয়ে এলো। আমি টাওয়েলটা চেপে ধরলাম।
টাওয়েল চেপে ধরে রক্ষা পাবি। বিয়ে করবি, বিয়ে। শখ হয়েছে।
করবো না। আমার কিছু হবে না। আমি যাকে চাইব তাকেই পাব।
তোকে পাওয়াব।
টাওয়েল ছাড়।
মিত্রা আমাকে জাপ্টে ধরলো।
নিচে ওরা আছে কেউ চলে এলে গন্ডগোল হয়ে যাবে।
কেউ আসবেনা। সবাই ব্যস্ত।
লোভও হচ্ছে আবার ভাবছি,এখুনি যদি ছোটমা এসে দরজা ধাক্কা দেয়।
জায়গা করা হয়ে গেছে, কি করছিস তোরা।
তোর পেটটা শক্ত শক্ত লাগছে কেন রে।
এখনো হয়নি।
খেয়েছে। ছোটমাকে বলেছিস।
বলিনি, তবে একটা হিন্টস দিয়েছি।
তুই কি সত্যি বাধিয়েছিস।
কি করে বলবো। এমাসে না হলে টেস্ট করাব।
ওরে আমি মুখ দেখাতে পারব না।
হয়ে যাওয়া ভালো বুঝেছিস।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি। ও আমাকে জাপ্টে ধরে আছে।
তুইতো একেবারে তৈরি।
গাড়িতে তোর পাশে যখন বসেছিলাম তখন থেকে।
তাই ওইভাবে খোঁচাচ্ছিলি।
তুইতো গবেট। খালি এনকাউন্টারটা ভাল করে করতে পারিস।
তোর ওখানে।
করনা দেখি, কেমন পারিস।
দেখ আমি কিন্তু আগের থেকে পাকা খেলোয়াড়।
ছাই।
তোকে কতোদিন টাচ করিনি বলতো।
ছোটমা চলে এলে পুরো কেলো।
হাসলাম।
কিছুক্ষণ দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে আদিম খেলায় মাতলাম। মিত্রার চোখে পরিতৃপ্তির ছাপ।
দারুন লাগল বুঝেছিস।
নিচটা একবার তাকা।
কেন।
কাজ বারিয়েছিস।
মিত্রা হেসে ফেললো।
আমি মুছে দেব।
এবার ছাড়।
বল এখুনি ছোটমা চলে আসবে।
হাসলাম।
দু’জনের ছন্দে ফিরে আসতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো। নিচে নেমে এলাম। খাওয়ার জায়গা হয়ে গেছে। সবাই গোল হয়ে বসে কথা বলছে।
ছোটমা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
এতোক্ষণ কি শলা পরামর্শ হচ্ছিলো শুনি।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। আমি গম্ভীর। সোজা টেবিলে এসে বসে পরলাম।
আজ ছ’জনের সিটে তিনটে চেয়ার নতুন সংযোজন হয়েছে দেখলাম। একপাশে চারটে অপরপাশে তিনটে দুপাশে দুটো। আমি যে দিকে তিনটে চেয়ার পাতা হয়েছে সেদিকে গিয়ে বসলাম। দাদারা সোফায় বসে আছে।
নীপা জলের গ্লাস নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। ওর দিকে তাকালাম। মুখ টিপে হাসল। বুঝলাম দুজনের এ্যাবসেন্সে নিচে খুব জোর আলোচনা হয়েছে।
ছোটমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
কিরে তুই ওখানে বসলি কেন ?
তাহলে কোথায় বোসব।
এদিকে বোস।
কেন।
যা বলছি কর।
চুপচাপ উঠে এই দিকে চলে এলাম। একবারে ধারে বসলাম।
ছোটমা প্লেট রেখে রান্নাঘরের দিকে গেল। একবার নীপা বলে চেঁচিয়ে উঠল। নীপা মনে হয় বড়মার ঘরে ছিল।
যাই ছোটমা বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
মিলি টিনা ডাক্তারদাদার কথা খুব মন দিয়ে শুনছে। বড়মা রান্নাঘরের মুখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
এখুনি খাওয়ার জন্য তর সইছিল না এখনো বসে বসে গুলতানি চলছে।
মিত্রা রান্নাঘরে বড়মার সঙ্গে কথা বলছে। সবাই এসে খাবার টেবিলে বসলো। আমি ধারের চেয়ারে।
নীপা ভজু সার্ভ করছে। বুঝলাম ওদের খাওয়া হয়ে গেছে। খাওয়া শুরু হলো।
আমি মিত্রা দুজনে দুধারে মাঝে বড়মা ছোটমা। ছোটমা মিত্রার দিকে বড়মা আমার দিকে।
কিরে অনি শুক্রবার আর রবিবার কি প্রোগ্রাম আছে। দাদা বললো।
কিছুই না ঘরের সবাই মিলে একটু খাওয়া দাওয়া করবো।
ব্যাশ। আর কিছু হবে না।
তুমি একটু অনিমেষদাদের ফোন করবে। অফিসে তুমি যাদের মনে করবে বলার দরকার আছে তাদের বলে দেবে। মিত্রা যদি মনে করে ওর কাউকে বলার দরকার আছে বলবে। ছোটমা, বড়মা, ডাক্তারদাদাকে আমি বলবো।
বড়মা কানটা ধরলো।
যা বাবা! আমি আবার কি করলাম।
সব সুতপাকে বলে এসেছিস, সেটা বল।
তাহেল আর কি সব জেনে ফেলেছো।
দামিনী কাল সকালে আসবে। থাকবি, তারপর তোর হচ্ছে।
তুমি বললে বাড়ি পাহাড়া দিতে। আমি সারাদিন থাকব।

পেটে পেটে কতো বুদ্ধি দেখেছ। ছোটমা বললো।
ছোটমা পেট নয়, দেবাদার কথাটা মনে করো। টিনা বলে উঠলো।
মিলি হাসতে গিয়ে খক খক করে কেশে উঠলো।
কি হলো মিলি এক ঝটকায় বিষম। ডাক্তারদাদা বললো।
আমি হাসছি।
শুক্রবার কখন বিয়ে করবি। বড়মা বললো।
ছটা নাগাদ হিমাংশু আসবে। তোমরা থাকবে সই সাবুদ হয়ে যাবে বিয়ে হয়ে গেল। কাগজটা মিত্রার গলায় ঝুলিয়ে দেব, তারপর আমার কাজ শেষ।
তারমানে! দাদা আমার দিকে তাকাল।
তারমানে আবার কি। তারপর খাওয়া দাওয়া।
এই যে বললি তোর কাজ শেষ।
আপাতত। তারপর আমাকে কয়েকদিনের জন্য পাবে না।
কোথায় যাবি। বড়মা আমার দিকে তাকিয়ে।
দেখি কোথায় যাওয়া যায়।
এবার তুই দাঁড়ে বসেছিস। কিছু করলে তোর ঠ্যাং ভেঙে দেব।
অনি শেকল কেটে ফুরুৎ।
ধরো ধরো আবার কানটা ধরো। ছোটমা বললো।
দাদা হাসছে।
মল্লিক কয়েকটা আর্টিকেল এই মওকায় লিখিয়ে নে।
ডাক্তারদাদা গম্ভীর ছিল জোড়ে হেসে ফেললো।
মিলি।
বলো।
তুমি মীনাক্ষ্মী চ্যাটার্জীকে চেন।
না।
টিনা তুমি।
কে বলো।
তথ্য জনসংযোগের ডিরেক্টর।
একবার দেখেছি। আমাদের বসের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। কি একটা ব্যাপারে।
আলাপ আছে।
সেই ভাবে না।
কাল তোমরা কখন অফিসে যাবে ?
যেমন আজ বেরিয়ে ছিলাম।
কাল ওরা কেউ অফিসে যাবে না। বড়মা বললো।
তাহলে আমাকে বেরতে হবে।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
তুমি হাসলে কেন ?
বান্ধবী তুমি শিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক ভুলে গেছ।
বড়মা ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে।
বুঝলে না অনির কথা।
বড়মা আমার দিকে একবার তাকায়, একবার ডাক্তারদার দিকে তাকায়।
ওরে শয়তান তোকে থাকতে বলেছি বলে….।
আমি খেয়ে যাচ্ছি।
তুমি বলোনা অনিদা, আমরা ঠিক ম্যানেজ করে নেব। মিলি বললো।
অদিতি কখন আসবে।
সকালে এখানে চলে আসবে তারপর একসঙ্গে বেরবো।
তাহলে এক কাজ করো।
বলো।
অফিসে গিয়ে তোমরা তিনজনে একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরো। বারটার পর ওনার কাছে যাবার কথা। একটু আগে গেলেও অসুবিধা নেই। সকালে তোমাদের সঙ্গে একটু বসবো। দুটোর পর থেকে বড়মা ছোটমাকে সময় দাও সারারাত। কি পারবে ?
পারবো।
মিত্রা।
বল।
তোকে একটা কাজ দিয়েছিলাম দেশের বাড়িতে থাকতে তোর মনে আছে।
কি বলতো।
মনে কর।
মনে পরছে না।
তোর বাড়ির আলমাড়িতে কিছু কাগজ পত্র আছে….।
সরি সরি কাল সকালে গিয়েই আমি নিয়ে আসব। তোর ঘুম থেকে ওঠার আগেই।
যা আছে সব।
ঠিক আছে।
মিলি তোমরা তিনজনে গিয়ে মীনাক্ষ্মী ম্যাডামের সঙ্গে একটু খেজুরে আলাপ করবে। উনি একটা কাগজ তোমাদের দেবেন। নিয়ে আসবে। পারলে ওখানে বসে ভালো করে পড়ে নেবে। যদি কোন সমস্যা থেকে থাকে আলোচনা করে মিটিয়ে নেবে। বিষয়টা তোমাদের।
কিগো অনিদা। টিনা বললো।
গেলেই দেখতে পাবে।
মিলি হাসছে।
তুই ঘরে চল তোকে আর একটা কথা বলবো। এটা একবারে তোর পার্শোনাল। কাজটা কালই করবি। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
তুই এতো সব কাজ দিলি আমরা কখন বেরব। বড়মা বললো।
যা কাজ দিলাম এক ঘন্টার কাজ। তুমি এবার প্রোগ্রাম করেনাও। নাহলে আমাকে বেরতে হবে।
না তোকে বেরতে হবে না।
ঠিক আছে।
উঠে পরলাম। তোমরা খাও আমি একটু ওপরে কাজ সারি।
বড়মা আমার দিকে একবার তাকাল।
তুই আমার ওপর রেগে গেলি।
একবারে না।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
বড়মা ডাক্তারদাদার দিকে একবার তাকাল। আমি ওপরে উঠে এলাম।
সকালবেলা যখন ঘুম ভাঙলো তখন দেখলাম আমি বিছানায় একা। চোখ রগড়ালাম, আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? না, আমি স্বপ্ন দেখছি না। বিছানাতেই শুয়ে আছি। বেশ মনে আছে কাল অনেক রাতে মিত্রা ওপরে এসেছে। প্রায় সাড়ে বারোটা পৌনে একটা হবে। সেই সময় আমার ঘুমটা একটু ভেঙেছিল।
মিত্রা হেসে বলেছিল। আজ ছেড়ে দিলাম, মনে রাখিস এটা আমি সুদে আসলে তুলবো। হেসে ছিলাম। তারপর দুজনে দুজনকে জাপ্টে ধরে ঘুমিয়ে ছিলাম। বুঝতে পারছি শরীরটা খুব একটা ভাল নেই।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে নটা বাজে। উঠে বসলাম। নীচ থেকে কোন সাড়া শব্দ আসছে না। নীচে কেউ নেই ? কোথাও গেলে আমাকে নিশ্চই বলে যেত। গেল কোথায় সকলে!
ব্রাসে পেস্টটা লাগিয়ে বাথরুমে গেলাম। দাঁতটা ব্রাশ করতে করতে বারান্দায় এলাম। বাড়ি রং করা শেষের পর্যায়ে। বাড়িটাকে এখন দারুন দেখতে লাগছে।
এখন মনে হচ্ছে এটা একজন এডিটরের বাড়ি। এ পাড়ায় এই বাড়িটাই সবচেয়ে ম্যাড়মেরে ছিল। এখন অনেক বেশি চকচকে। ছগনলাল আমাকে দেখতে পেয়ে গেট থেকে এগিয়ে এলো।
ছোটবাবু মা একটু বেরিয়েছে। বলেছে চলে আসবে। তুমি কোথাও বেরবে না। আমি চা দেব।
সবাই বেরিয়েছে!
হ্যাঁ। ওই বাবুরাও এসেছিল।
কারা ?
ওই যে তোমার বন্ধু, ফর্সা মতো।
বুঝলাম দেবাশীষ।
কখন বেরিয়েছে।
সকাল বেলা করিব পাঁচটা হবে।
ঠিক আছে, তুমি যাও আমি চা করে নেব।
চা জলখাবার করা আছে। আমাকে দিতে বলেছে।
আমি নিচে যাচ্ছি।
আমি এসে বাথরুমে ঢুকলাম। দেখলাম বিছানার এক সাইডে আমার পাজামা পাঞ্জাবী বার করে রেখে যাওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে নতুন। আমি স্নান সেরে পাজামা পাঞ্জাবী লাগালাম। মোবাইলটা টেবিল থেকে নিয়ে দেখলাম অনেক মিশ কল।
দেখলাম সবাই একবার করে কল করেছে।
দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদার মোবাইল নম্বরও রয়েছে। ম্যাসেজ বক্সটা ব্লিঙ্ক করছে। বুঝলাম ম্যাসেজ বক্স ফুল। খুললাম দেখলাম রিমঝিম ম্যাসেজ করেছে। ওর বন্ধুরাও। একটাই কথা তোমাকে সত্যি ফোনে পাওয়া যায় না।
আমাকে আজ একটু সময় দেবে। সবারই এক কথা।
মনে মনে হাসলাম। ম্যাসেজ রিপ্লাই করলাম, যদি সময় পাই জানাব।
নিচে এসে ফ্লাক্স থেকে চা ঢাললাম। চায়ের কাপটা নিয়ে গেটের কাছে গিয়ে বাড়িটাকে একবার ভাল করে দেখলাম। বাগানটা অনেক পরিষ্কর হয়েছে। একজায়গায় সব শুকনো পাতা ডাঁই করা হয়েছে। গাছগুলোর নিচের দিকটা সাদা রং করা হয়েছে। বুঝলাম উই ধরেছিল।
চা খেতে খেতে বাগানের চারদিক ঘুরলাম। দাদা যাঁর কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছিলেন তিনি বেশ রসিক লোক ছিলেন। প্রায় পঁচিশ কাঠা জমির মাঝখানটুকু বাড়ি করেছেন। পেছনে প্রায় পনেরো কাঠা জমি বাগান, সামনে প্রায় পাঁচ কাঠা জমি বাগান।
একপাশ দিয়ে ইটের বাঁধানো রাস্তা সামনে থেকে বাড়ির গা দিয়ে একেবারে পেছনে চলে গেছে। পেছনে একটা টিনের সেড গাড়ি রাখার জায়গা। এছাড়াও গোটা পনেরো গাড়ি অনায়াসে এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এখন এই জমির ভ্যালুয়েসন কম করেও আট দশ কোটি টাকা।
আমি আমগাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঝাঁকরা গাছটার কিছুটা ডাল ছাঁটা হয়েছে। এ বছর অনেক মুকুল ধরেছে। আমি রাতের বেলায় এই মুকুলের গন্ধ পাই।
পেয়ারা গাছটার কয়েকটা ডালে নতুন পাতা হয়েছে। বাগানটা দেখলে মনেহচ্ছে ভজুবাবু যত্ন করে। আমি পায়ে পায়ে একেবারে দেয়ালের ধারে এলাম। ভজুবাবু কিছু কিছু চারা গাছ পুঁতেছে। মনে হচ্ছে ডালিয়া। অনেকক্ষণ বাগানের এদিক সেদিক ঘোরা ঘুরি করলাম।
ওপরে চলে এলাম। ঘড়ির দিকে তাকালম, সাড়ে দশটা। দেবাশীষকে আসতে বলেছিলাম। ব্যাটা সকালে বেরিয়ে গেছে ওদের সঙ্গে। ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। অনেকদিন মেল চেক করা হয়নি। মেল বক্স খুলতেই অবাক হলাম। তনুর প্রচুর মেল। এমনকি রিমঝিম পিঙ্কি চুর্ণী তিয়াও মেল করেছে।
প্রথমে তনুর মেল গুলো চেক করলাম। আরও মেটিরিয়ালস পাঠিয়েছে। বলেছে ঘর ও দেখেছে। আমাকে একবার যেতে হবে, না হলে কিছু করা যাবে না। এখন ও কোলকাতায় আসতে পারবে না। প্রচুর কাজের চাপ। সঙ্গে সঙ্গে ওকে রিপ্লাই করলাম। হাতের কাজ সেরেই তোমার কাছে যাচ্ছি। তুমি একবার কলকাতায় আসবে। আমার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ করো।
রিমঝিমদের মেলগুলো খুললাম। খুলেই আমার মাথা ঘুরে গেলো। বিবসনা সব ছবি। মডেল হিসাবে স্যুট করেছে। কিছু ভালো ছবিও পাঠিয়েছে। নিচে লেখা আছে লাভ রিমঝিম, পিঙ্কি লিখেছে স্যুইট হার্ট অনিদাকে। চুর্ণী লিখেছে আমাকে এক মিনিট সময় দাও। তিয়া লিখেছে, বসে আছি পথো চেয়ে।
আমি ছবিগুলো ভালো করে দেখলাম। শরীরী আবেদন মাথা ঘুরিয়ে দেবে।
অন্যান্য মেল গুলো একবার চেক করে নিলাম। ল্যাপটপ পাওয়ার অফ করে হিমাংশুকে একটা ফোন করলাম।
ফোনটা ধরেই হিমাংশু হাসছে।
হাসছিস কেন ?
বাড়িতে একা রেখে দিয়ে সকলে কেটে পরেছে।
তুই কি করে জানলি।
কেন তুই কি একা সাংবাদিক।
আমি হাসলাম। কে বললো তোকে ?
সকালে তোকে একবার ফোন করেছিলাম। দেখলাম রিং বেজে যাচ্ছে। কেউ ধরলো না। তারপর মিত্রাকে ফোন করলাম। বললো তোকে বাচ্চা ছেলের মতো ঘুম পাড়িয়ে চলে এসেছে।
কি করবো বল। মাঝে মাঝে ঢেঁকিও গিলতে হয়।
অফিসে যাবি না।
আজ মনে হয় হবে না। কিছু নিজের কাজ আছে। সাড়তে হবে।
এবার বল।
আমার কাজ গুছিয়েছিস।

হ্যাঁ।
কাল কখন আসছিস।
ছটা নাগাদ।
রেবাকে নিয়ে আসবি।
বলেছি। তোকে আর নেমন্তন্ন করতে হবে না। দাদাও ফোন করেছিলেন। তুই কি বলতো।
কি করবো বল। আমার গার্জন বলতে এখন দাদা ছাড়া কেউ নেই।
তা বলে দাদাকে দিয়ে আমাকে ফোন করাতে হবে।
বিশ্বাস কর আমি বলিনি। বলেছি তুমি যাকে যাকে মনে করবে বলবে।
আমার খুব খারাপ লাগছিল।
শোন একটা কথা আছে।
বল।
কাল অনিমেষদার বাড়িতে গেছিলাম।
কেনরে।
বৌদিকে নেমন্তন্ন করতে। আর মিত্রাকে দেখাতে।
কেন সেদিন বৌদির দেখে আশ মেটে নি।
শোন না।
বল।
অনিমেষদা টাকা চেয়েছে। দেড়কোটি দেব বলেছি। ওদের চেক নিতে অসুবিধে নেই কি করবো।
পুরটাই ট্যাক্সের আওতায় চলে আসবে। তুই বরং ক্যাশ দে।
আমি মিত্রাকে অফিসে পাঠাচ্ছি। ওর হাত দিয়েই নিয়ে আসব। প্রয়োজন পরলে তুই একবার সনাতন বাবুর সঙ্গে কথা বলে নিবি।
ঠিক আছে।
ফোনটা কেটেই অনাদিকে ফোন করলাম। বাইরে গাড়ির হর্ন বেজে উঠলো।
বুঝলাম সবাই এসে পরলো।
কিরে কোথায় তুই।
নিজের ঘরে বসে আছি।
ঘরে বসে আছিস মানে, শরীর খারাপ নাকি!
কাজ করছি।
ম্যাডামরা কোথায়।
সকালে বেরিয়েছিল এই ফিরছে।
গাড়ির হর্ণের আওয়াজ পেলাম।
এখনো ওপরে আসে নি।
বল।
রবিবারের প্রোগ্রাম কি করেছিস।
আমরা চারজন যাব।
কে কে আসবি।
আমি চিকনা বাসু সঞ্জীব।
এক কাজ কর।
বল।
গোরাকে একটু বল দুটো গাড়ির ব্যবস্থা করতে। সবাই চলে আয় কাঞ্চন কে নিবি লতাকে নিবি উনা মাস্টারকে বলবি আসার জন্য সঙ্গে মিনতিকে নিয়ে নিবি। স্যারকে বলবি আমি বলেছি। আর শোন সেদিন অনিমেষদারা সবাই আসবে।
সেদিন সকালে চলে এলাম। তোর সঙ্গে দেখা হলো না। কি হলো শেষ পর্যন্ত শোনা হলো না।
পরে শুনিস।
কিরে কিরকম দিলাম বল। মিত্রা গেটের সামনে।
ওমা তুই কার সঙ্গে একা একা প্রেম করছিস। মিত্রা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো।
ম্যাডম ঢুকলো, তাই না। অনাদি বললো।
হ্যাঁ।
মিত্রা ছুটে এসে আমার হাত থেকে ফোনটা কেরে নিল। কাকে চাই।
অনাদি মনে হয় হেসে ফেলেছে।
ও তুমি। কেমন আছো। দাঁড়াও একটু পরে তোমাকে ফোন করছি।
ফোনটা কেটেই আমাদের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকাল।
চল চল নিচে চল।
কেন বলবি তো।
জানি না। বড়মা বললো ওটাকে ধরে আনবি।
মাথায় লাল টিপ্পা লাগিয়েছিস। ব্যাপারটা কি বলতো।
আগামীকাল বিয়ে না।
বিয়ের আর বাকি কি রেখেছিস।
সেতো তুই। তোর জন্যই সব গন্ডগোল। চল চল।
আমাকে টেনে খাট থেকে নামাল।
তোকে কিন্তু পাঞ্জাবীটা পরে দারুণ মানিয়েছে।
তুই কিনেছিস ?
আমি না, বড়মা। নিজে হাতে।
কোথায় গেছিলি।
দক্ষিণেশ্বর।
হঠাৎ।
বড়মা কাল রাতে বললো মানত করেছি। আমি বললাম তাহলে চলো। প্রোগ্রাম বানিয়ে নিলাম।
ভালো করেছিস। কটা বাজে দেখেছিস।
আমি তোর কাজ করে এসেছি।
তোকে এই বাসন্তী কালারের শাড়িটা কে দিল।
ছোটমা। যা পরেছি, সব ছোটমা।
ভেতরেরটাও।
এক থাপ্পর।
দু’জনে নিচে নেমে এলাম। দেখলাম একপাশে ডাক্তারদা, দামিনীমাসি এবং ইসলামভাই বসে আছে। আর একদিকে দেবা, নির্মাল্য।
আমাকে দেখেই দেবা বললো, আমাকে কিছু বলবি না। সব বড়মা, যা কিছু বড়মাকে বল।
তাহলে বড়মা তোর হয়ে কাজ করে দেবে।
বড়মা দেখছো। অনি কি আরম্ভ করেছে।
দামিনী মাসির দিকে তাকালাম। কিগো সব একসঙ্গে, কোথায় দেখা হলো।
এই এলাম।
মিত্রা তোমায় খাতাটা দিয়ে এসেছে ?
নিয়ে গেছিল, বলেছি কয়েকদিন রেখে দে।
বড়মা পূজোর প্রসাদ আর ফুল নিয়ে এলো। আমার মাথায় পূজোর ফুল ঠেকাল। একটা পেঁড়া দিল। আমি মাথায় ঠেকিয়ে খেয়ে নিলাম। তাহলে পূজো ভালই দিলে বলো।
হ্যাঁ।
গঙ্গার স্নানটাও জমিয়ে করলে।
তা করেছি।
মন পুরো শুদ্ধ।
তোকে আর পাকাম করতে হবে না।
দামিনী মাসির ঘরটা কেমন দেখলে য
বড়মা আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।
মিত্রা বলে নি। এটা তোমায় নিশ্চিত করে বলতে পারি।
দামিনী মাসির দিকে তাকাল।
দামিনী মাসি অবাক হয়ে বড়মার দিকে তাকিয়ে।
ওরা কেউ বলে নি, আমার কিছু লোকজোন আছে।
দাঁড়া ওই দুটো মক্কেল আসুক ঝেঁটিয়ে আজ বাড়ি পাঠাব।
ডাক্তারদাদা জোড়ে হেসে উঠলো।
তুমি হাসছো কেন।
তোমার কথা শুনে। ও যতোটা না শিওর ছিল এখন পুরো পুরি শিওর হয়ে গেল।
মানে!
ওর কোন লোকজন ছিল না, পুরটা ভাঁওতা।
অ্যাঁ!
হ্যাঁ।
ও এখুনি ছিপ ফেলেছিল। মাছটা খেল। ও একটু খেলিয়ে মাছটাকে তুলে নিল।
বড়মা আমার কানটা সজোরে মুলে দিল। তোর পেটে পেটে এতো বুদ্ধি।
বুদ্ধি আছে বলেই ও মুখার্জীর মতো লোককে পকেটে পুরে রেখেছে।
তুমি কি করে জানলে।
ও ঢোকার পর থেকে ওকে ফলো করলাম।
ওর চাল চলন কথাবার্তা।
বড়মা ডাক্তারদার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে।
ও একটা জাল বিস্তার করলো। বলতে পার চাড় ফেললো। তারপর ঝুপ করে বড়শি ফেললো। মাছ খেল। ও মাছটাকে খেলিয়ে তুলে নিল।
বড়মা টেবিলের ওপর প্রসাদের থালাটা রেখে আমার পাশে বসলো।
ছোটমা আমার আর এক পাশে এসে বসলো। মিত্রা আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বলো ডাক্তার, তুমি বেশ ভলো বুঝতে পেরেছ, ওই জন্য ও চুপ করে আছে।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
ডাক্তারদাদা তুমি বলবে না। আগে কচুরি আসুক। মাসি তুমি ওরকম ভেটকে গেলে কেন।
তোকে দেখছি।
দেখে কোন লাভ নেই বুঝলে মাসি। একসময় তুমি আমাকে যা বলেছ আমি চোখ কান বুঁজে শুনেছি। এখন তোমার বয়স হয়ে গেছে। আমি যা বলবো তোমাকে শুনতে হবে।
আমি কি শুনি না।
শোন, মাঝে মাঝে বেগড়-বাই করো।
ছোটমার দিকে তাকালাম।
সকাল থেকে এককাপ চা পেটে পরেছে আর কিছু পরে নি। তোমরা বেশ ফুলকো ফুলকো লুচি সাঁটিয়ে এলে।
তোর জন্য নিয়ে এসেছি।
বড়মা, দাদা-মল্লিকদা কোথায় ?
অফিসে গেছে এখুনি চলে আসবে। ও ডাক্তার বলো। না হলে আবার ভুলে যাব।
ছোট একটু চা।
আগে বলো। বড়মা বললো।
অনির লুচি খাওয়া হোক তারপর।
ছোটমা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
দাদা এখন না আমি যাই আগে।
দেখছিস তোর ডায়গনসিসের কি ভ্যালু।
আমি হাসছি।
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো।
কিরে বল, কাজ হয়েছে।
মিত্রা ভয়েজ অন করে দিল। মিলির গলা।
দারুণ একটা সুখবর আছে মিত্রাদি।
তোর কথা সবাই শুনছে।
অফিসে যেতে আর ভালো লাগছে না।
চলে আয়। সুখবরটা কি বল।
কালকে আমরা অনিদার ওপর রাগ করছিলাম না।
হ্যাঁ।
সত্যি অনিদা কখনো চুপচাপ বসে থাকে না বুঝলে। ঠিক একটা কাজ বার করে নিয়ে চলে এসেছে। আমরা খালি কাগজটা নিতে এসে ছিলাম, কয়েকটা বড় বড় রসোগোল্লা খেলাম।
আমার জন্য নিলি না।
দুর চাওয়া যায়। আমরা মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।
চলে আয়।
বড়মা আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকাল।
কিরে কাল এখান থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছিলি।
ওই যে সুখবর আনতে, শুনলে না। আজও বেরবো।
আজ তুই একপাও বেরবি না।
ছোটমা লুচি তরকারি নিয়ে এলো।
আজ বেরবার নাম করলেই ঠ্যাং ভাঙবো।
আমি লুচির প্লেট নিলাম।

ছোটমা মিত্রাকে সরিয়ে পাশে বসলো।
দাদা এবার বলুন ওর বুদ্ধিটা শুনি।
ইসলাম তুমি ধরতে পেরেছ।
আমি এতোক্ষণ শুনলাম কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছি না। কোন কথার ও কি মানে করলো।
ও বলে না দাবা খেলে। ডাক্তারদাদা বললো।
ইসলামভাই ডাক্তারদার দিকে তাকিয়ে।
সত্যি ও দাবা খেলে। ঠিক কথাটা ঠিক জায়গায় পুট করে দেয়। ও উত্তর পেয়ে যায়।
দেবাশীষ, নির্মাল্য হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি নিশ্চিন্তে লুচি খাচ্ছি। মিত্রা একটা লুচি অলরেডি তুলে সাঁটিয়ে দিয়েছে। আবার হাত বাড়াতে গেল, আমি প্লেট সরিয়ে নিলাম।
দিবিনা কেনরে, তোর একার নাকি। মিত্রা চিল্লিয়ে উঠলো।
মিত্রা তুই কালকে দামিনীর ওখান থেকে কোন খাতা নিয়ে এসেছিলি। ডাক্তারদাদা বললো।
মিত্রা লুচিটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললো, হ্যাঁ!
দামিনী মাসি হেসে ফেললো।
এবার ধরতে পেরেছ দামিনী ?
সত্যি দাদা আমি ভাবতেই পারছি না।
মাসি হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকাল। দিদি ঠিক বলে তোর পেটে পেটে এতো বুদ্ধি!
আমি গম্ভীর হয়ে লুচি চিবচ্ছি।
এবার তুমি বান্ধবীদের বলে দাও। সকাল বেলা তোমরা ওকে না বলে চলে গেছ। ওতো জানবেই তোমরা কোথায় গেছিলে। প্রথম অস্ত্র ও প্রয়োগ করেছে। তাতেই কাজ হয়ে গেল, না হলে নির্মাল্যকে ও জবাই করতো। দেখলে এখানে ঢোকা তক নির্মাল্যকে ও একটা প্রশ্নও করে নি।
দামিনী মাসি হাসতে হাসতে বড়মার দিকে তাকাল।
কালকে ওরা যখন গেছিল, তখন অনি ওর বাক্সটা কবিতাকে দিয়ে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করালো, আপনাকে বাক্সটা দেখালাম না।
হ্যাঁ।
ওর থেকে অনির একটা খাতা মিত্রা নিয়ে এসেছিল। আসার সময় বললো, মাসি আমি নিজে এসে তোমায় ফেরত দিয়ে যাব। কালকে ওরা চলে আসতে মনটা খুব খারাপ লাগছিল। আমি ইসলাম ছাদের ওপর মাদুর পেতে বসেছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত।
আজ ও ঢুকেই আমাকে বললো কিগো সব একসঙ্গে, কোথায় দেখা হলো।
আমি বললাম, এই এলাম।
তারপরই ও বললো, মিত্রা তোমায় খাতাটা দিয়ে এসেছে।
আমি বললাম না।।
তারপরেই আপনাকে বললো, কিগো দামিনী মাসির ঘরটা কেমন দেখলে।
ওরে বাবা! তুই কি সাংঘাতিক! তোকে তো কোন কথা লোকান যাবেনা।
ছোটমা মাথায় হাত দিয়ে বলে উঠলো।
বড়মা আমার মুখের দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে। পরিতৃপ্ত মুখখানি আমার কৃতিত্বে খুশি। আমার মাথাটা টেনে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তখনই তোমায় বললাম বড়মা, একটা ফোন করে দাও বুবুনকে।
আমি কি তোকে বারণ করেছিলাম।
আমি ছোটর দিকে তাকালাম, এবার চা হোক।
ছোট কিল বাগিয়ে আমার মুখের কাছে এগিয়ে এলো, আমি বড়মার বুকের কাছে সরে গেলাম।
নীপা যাতো মা চা-টা ঢেলে আন।
বুবুন।
বল।
কাল তোর আর ভজুর কীর্তি বড়মাকে বলেছি।
সবাই হেসে ফেললো। হাসি আর থামে না।
হাসতে হাসতে দামিনী মাসির চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেল, ছোটমারও একি অবস্থা।
ভজুরামও হাসে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি বলিনি অনিদা।
হাসিটা একটু থামতে আমি গম্ভীর হয়ে তাকালাম মিত্রার দিকে।
তুই এটা ভালো করলি।
তুইতো কাল বৌদিকে বলেছিস। তারমানে সবাইকে বলে দিলি। তুই বললি না, আমি বললাম।
বুঝলি মিত্রা আমার ঘরটা ভালো করে খুঁজলে তুই ওরকম একটা ছেঁড়া নেগড়া এখনো পাবি। বড়মা বললো।
তুমিও কি স্মৃতি করে রেখেছ।
নারে তোর দাদার একবার সখ হয়েছিল।
আবার হাসি, এবার আর থামান যায় না।
টিনা, মিলি, অদিতি এসে ঘরে দাঁড়াল। ওরা ঢুকে অবাক। এতো হাসির চোট কিসের।
কিগো তোমরা এতো হাসছো কেন। টিনা বললো।
মিত্রা হাসতে হাসতে বললো কালকেরে সেই বুবুনের জাঙ্গিয়া….তারপর কৌপিন।
টিনা মিলি হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছে।
দাদারও শখ হয়েছিল কৌপিন পরার। বড়মা বললো এখুনি।
প্রাণখোলা হাসিতে ঘরটা গম গম করে উঠলো। মিলি হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পরলো।
অদিতি হাসতে হাসতে বললো সত্যি অনিদা তুমি জিনিষ একটা, বাঁধিয়ে রাখার মতো।
কলেজে দেখেছি, তুইতো তখন এতটা ধুর ছিলিনা। দেবা হাসতে হাসতে বললো।
দুর ধুরের কি আছে, চেয়েছি প্যাকেট করে দিয়ে দিয়েছে। খুলে দেখেছি নাকি। তাই পেয়ে ভজুরামের কি আনন্দ। মাসির কাছে রাম কেলানি খেয়ে ভজুরাম তারপর বুঝতে পেরেছে। তার আগে আমার বোঝা হয়ে গেছে।
হাসির রেশ কিছুটা কমতে টিনা মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো।
তুমি কি খাওয়াবে অনিদাকে।
কেন আবার কি আনলি ?
মিলি ব্যাগ থেকে খামটা বার করলো।
ডাক্তারদাদা খুলুক এখানে সিনিয়ার মোস্ট।
দে।
মিলি খামটা ডাক্তারদাদার হাতে দিল।
কিরে অনি সাপ না ব্যাঙ। ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকাল।
সাপ গো সাপ। অদিতি বললো।
ডাক্তারদাদা চিঠিটা পরে আর হাসে।
কিগো ডাক্তার, কি লেখা আছে ওতে, তুমি হাস কেন নিজে নিজে। বড়মা বললো।
তোমার ছেলে কালকে আবার একজনকে জবাই করেছে। এবার রাজ্য সরকারে কোষাগার লুঠ। তিনকোটি টাকা।
অ্যাঁ। বলো কি।
হ্যাঁ। এই দেখো তার কনসাইনমেন্ট।
মিত্রা উঠে দাঁড়িয়ে মিলিকে জড়িয়ে ধরলো। সত্যি।
সত্যি নাতো কি মিথ্যে।
সেই জন্য কালকে ও কাজের হিসাব দিচ্ছিল ওদের। কি এবার তুমি ওর ওপর রাগ করবে।
বড়মা আমার থুতনি ধরে চুমু খেলো।
তুইতো চম্পকের মুখ একেবারে বন্ধ করে দিলি। দেবাশীষ বললো।
এটা কি আমি নিয়ে এসেছি, ওরা তিনজনে নিয়ে এসেছে। সরকারী খাতায় ওরা রিসিভ করেছে।
সত্যি অনি তোর মাথাটা ফাটিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে।
আর তোমাকে মাথা ফাটাতে হবে না। অদিতি বললো।
চল এবার ওপরে গিয়ে একটু বসি। ছোটমা।
আমি ছোটমার দিকে তাকালাম।
ছোটমা আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে। চোখের ভাষা, এই জন্য তোকে আমরা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। এটা বুঝিস না।
তারপরেই কপট রাগ মুখে।
যাও চা পাঠাচ্ছি।
আমি উঠে দাঁড়ালাম, মিত্রাকে ইশারায় ডাকলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন বারান্দায় এলো। মুখে হাসি হাসি ভাব। পরিতৃপ্ত মুখ। আমার সামনে দাঁড়াল, চোখে জিজ্ঞাসা।
কাগজগুলো কোথায় ?
বড়মার ঘরে।
চল।
আমরা দুজনে বড়মার ঘরে এসে ঢুকলাম।
মিত্রা একটা ফাইল বার করে আমার হাতে দিল।
এতে সব আছে।
এতো কি ?
অনেক দলিল আছে। এগুলো দেখাইনি। সবতো গেছে। এটুকু লুকিয়ে রেখেছিলাম।
তুই আগে ওই কাগজটা দে।
মিত্রা খামটা বার করলো। আমি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলাম। হাসলাম।
এই একটা মাত্র তুই পাকা কাজ করেছিস।
তাও অনেক কাঠ খর পুরিয়ে।
তুইতো নিজে মুখে কিছু বলিসনি, আমাকে উদ্ধার করতে হচ্ছে।
বিগত আট মাসে বলার সময় দিয়েছিস।
তাও ঠিক।
সার্টিফিকেটটা খামে ভরে ওর হাতে দিলাম।
ফাইলে রাখ। আর একটা কাজ করতে হবে।
বল।
কাল ব্যালেন্স চেক করেছিস।
হ্যাঁ।
লকারে কতো আছে।
সাড়ে চার কোটি।
চাবি কার কাছে।
সনাতন বাবুর কাছে।
আমাকে দেড়কটি টাকা দিবি।
কেন!
এই প্রথম মিত্রা আমার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করলো। ফিক করে হেসে ফেললাম।
হাসিসনা, বল।
বিয়ে করছি, যৌতুক দিবি না।
যাঃ, বল না। ওরকম করছিস কেন।
অনিমেষদা চেয়েছে।
অনিমেষদা! তোকে ?
হ্যাঁ। কাল রাতে আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো। পার্টি ফান্ডে দিতে হবে। আমি তোকে আবার ফেরত দিয়ে দেব।
মিত্রার মুখের রং বদলে গেল। কেমন যেন মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তুই একথা বললি কেন। আমি কি এখনো তোর আপন হতে পারলাম না।
মুখটা নীচু করে নিল। চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
আমার দিক থেকে আমি কোন খামতি রাখি নি।
মিত্রার গলাটা কেমন ভাড়ি ভাড়ি।
এই দেখো।
কিরে চা এখানে দেব না টেবিলে রাখব।
ছোটমা গেটের কাছে। মিত্রার দিকে তাকাল। ছোটমা বুঝতে পেরেছে কিছু একটা হয়েছে। এগিয়ে এলো।
কিরে মিত্রা চোখটা ছল ছল করছে কেন।
না কিছু না।
নিশ্চই তোকে কিছু বলেছে।
না।
তাহলে।
এমনি।
দাঁড়া আমি দিদিকে ডাকছি।
না তুমি ডাকবে না।
ছোটমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
ঠিক আছে তোকে দিতে হবে না। আমি বেরিয়ে আসতে চাইলাম। ও আমার হাতটা ধরলো।
আমি তোকে দেবনা বলেছি।
তাহলে সব কিছুতে তোর চোখে জল আসে কেন ?
কেন আমি কি অপরাধ করেছি, এখনো তোর আপন হতে পারলাম না।
আমি এখনো এই জিনিষগুলো নেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারি নি।

তোকে কে বলেছে। আমি ?
না। আমার মন বলছে।
আমি তোর কাজে কোনদিন বাধা দিয়েছি ?
না।
তোর সব কাজ মেনে নিয়েছি। আমি জানি তুই আমার জন্য, আমাদের ভালর জন্য করছিস।
একটু থেমে।
নিজের জন্য নয়।
মাথা নীচু করে রইলাম।
তাহলে তোর এতো সংকোচ কেন।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কালকে তুই ফর্মগুলো সই করতে চাস নি। কেন ?
আমি সই করে দিয়েছি।
দাদা বলার পর।
চুপ করে রইলাম।
তুই যেমন আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিস, তোকে নিয়ে আমারও কিছু স্বপ্ন আছে, আমারও কিছু ইচ্ছে অনিচ্ছা আছে। শুধু আমার একার নয়, সবার। কেন তুই সেটা মেনে নিবি না।
আমি তোর যোগ্য হতে পারি নি।
তাহলে আমার সঙ্গে নিজেকে জড়ালি কেন।
আমার ভেতর থেকে কে যেন বললো তোর বিপদ তোকে সাহায্য করা উচিত।
আমার বিপদ তোর কি, তুই কি দেশোদ্ধার করতে এসেছিস।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তুই নিজের জীবন বিপন্ন করে সব করছিস। আমরা কেউ তোর পাশে থাকি না। বাড়িতে থেকে গুমড়ে মরি। কার জন্য তুই এই সব করছিস। তোর নিজের জন্য।
আমি চুপ। মাথাটা মনে হচ্ছে পায়ের সঙ্গে মিশে যাবে।
তাহলে তোর এতো সংকোচ কেন। কেন তুই ভাবছিস এটা শুধু আমার, তোর নয়।
বুঝলাম বেশি চুপ করে থাকলে আরও কথা বেরবে। দীর্ঘদিন মনে এই কথা গুলো ও পুষে রেখেছে। বলার সুযোগ পায় নি।
আমি গিয়ে ওর দুই কাঁধ হাত রাখলাম। চোখ দুটো যেন গনগনে কয়লার এক একটা টুকরো।
আমি কথা দিচ্ছি। আর কখনো বলবো না।
তুই প্রায়ই বলিস এই কথা। আমি বুঝি। চুপ করে থাকি। তুই আমার আর তোর মাঝে একটা সূক্ষ্ম দেয়াল তুলে রেখেছিস। তুই কি ভাবিস আমি কিছু বুঝি না। তোকে আমি নিজের টাকায় শেয়ার হোল্ডার করেছি। তুই তার ঋণ শোধ করছিস।
তুই বিশ্বাস কর। আমি কখনো এই সব ভাবি নি।
তাহলে তুই কেন বার বার একই কথা বলিস।
নিজের মনের মধ্যে এখনো একটা খটকা রয়ে গেছে। আমি এর যোগ্য কিনা ?
যাচাই কে করবে তুই না আমি।
আমি মাথা নীচু করে রইলাম।
আমার কষ্টটা তুই স্বীকার করলি। তোর কষ্টটা আমাকে স্বীকার করতে বাধা দিচ্ছিস কেন।
আমার কোন কষ্ট নেই।
সেটা সাদা চোখে দেখার ক্ষমতা তোর নেই। নিজের আয়নায় নিজের মুখ দেখেছিস। আমি তোকে ভালবাসিনি। তোর ভেতরে যে যাযাবরটা আছে তাকে ভালবসেছি। তাকে আমি এখন খুঁজে পাচ্ছি না। তাই তোর মনটাকে কাছে পাওয়ার চেষ্টা করেছি।
আমার মাথা হেঁট।
বুঝতে পারছি আমার একটা ছোট্ট ভুলে কি হলো। ওর কথা শুনে কানের লতি গরম হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করছে। নিজেকে নিজে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিনা।
তুই একটা পাথর। ভাবছিস তোকে আমি একদিন ভালবাসতাম তার অধিকারে তোকে কিছু দায়িত্ব দিয়েছি। তুই তা পালন করছিস।
না আমি কখনো তা মনে করিনি।
মুখ তুললাম।
মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো। হয়তো আমার চোখের ভাষা ও পরতে পারলো।
আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।
নিজেকে কষ্ট দিয়ে কেন এতো আনন্দ পাস। আর একজনও তো কষ্ট পায়। সে শুধু একা নয়, তোর সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তারা সকলে। এটা ভেবেছিস কখনো।
আমি শক্ত কাঠের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মিত্রার হাত থেকে নিজেক ছাড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে ফিরলাম। দেখলাম বড়মা ছোটমা ঘরের মধ্যা দাঁড়িয়ে। কারুর দিকে তাকালাম না। সোজা বেরিয়ে এলাম।
দেখলাম বসার ঘরে ওরা সবাই বেশ খোশ মেজাজে কথা বলছে। মৃদু স্বরে আমাদের একটা কথাও ঘরের দরজার বাইরে আসে নি। যা শুনেছে বড়মা ছোটমা। আমি বারান্দা দিয়ে হেঁটে সোজা ওপরে চলে এলাম।
নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজালাম।
টেবিলের কাছে গিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিলাম। একটা সিগারেট বার করে ধরালাম। সোজা চলে গেলাম জানলার কাছে। আমগাছের একটা ডাল একেবারে জানলার কাছে। হাত বারালেই ডালটার স্পর্শ পেয়ে যাব। কচি পাতা সবে মাত্র ধরেছে। তার ঠিক ওপরে আমের বকুল হয়েছে। বেশ দেখতে লাগছে। প্রত্যেকটা প্রাণের মধ্যে সন্তান ধারণের কি প্রবল লিপ্সা। এই গাছটা কথা বলতে পারেনা। বোবা। তবু ওরও বেঁচে থাকার কি ইচ্ছে। নিজের বংশ বিস্তারের স্বপ্ন।
মিত্রা এভাবে আমাকে আগে কনোদিন বলেনি। ও আমার বুকের ভেতরটা প্রবল ঝড়ে ওলট পালট করে দিল। বার বার চোখের সামনে মিত্রার মুখটা ভেসে আসছে। ওর কথা কানের কাছে বার বার শব্দ তরঙ্গ তৈরি করছে। এই কটা মাস আমার মধ্যে একটা জেদ চেপে বসেছিল। নেশার ঘোরে আমি খালি কাজ করে গেছি। কেনো ?
আমি মিত্রাকে সেফ্টি দেখতে চেয়েছি। হ্যাঁ আমি অনেক ঝুঁকি নিয়েছি। কখনো কখনো নিতে বাধ্য হয়েছি। কিসের জন্য ? আগু পিছু কিছু ভাবি নি। যেটা নিজে থেকে ঠিক মনে করেছি, সেটাই করেছি। কারুর বাধাকে গ্রাহ্য করিনি। সত্যিতো ওরাও আমাকে বাধা দেয় নি। একবারও প্রতিরোধের কোন দেয়াল আমার সামনে খাঁড়া করে নি।
আমি যেমন ভাবে ভাবছি, ওরাও তো ঠিক তেমন ভাবেই ভাবতে পারে। এটা আগে কখনো ভাবি নি কেন ?
আবার একটা সিগারেট বার করে ধরালাম।
আর সিগারেট খাবি না।
কর্কশ একটা কন্ঠ কানে এসে ধাক্কা দিল। এ গলা আমার পরিচিত নয়। আমার অচেনা অজানা।
ফিরে তাকালাম।
মিত্রা ঘরের দরজা বন্ধ করছে। চায়ের কাপের ট্রেটা বিছানার ওপর রাখা। পায়ে পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এলো। জ্বলন্ত সিগারেটটা হাত থেকে টেনে নিয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। চোখ দুটো আগের মতোই গনগনে।
তোকে এই পৃথিবীতে আর কেউ বুঝুক আর না বুঝুক আমি বুঝেছি।
আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম।
কাকে কাকে ফোন করলি টাকার জন্য।
কাউকে করি নি।
করবি। এটা ভেবেছিস তো।
মাথা নীচু করলাম।
আমি সনাতনবাবুকে ফোন করে দিয়েছি। দাদার হাতে টাকা পাঠিয়ে দেবে। কাউকে আর ফোন করতে হবে না।
আমি মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তোর তো অনেক ক্ষমতা, মলকে সরিয়ে দিয়েছিস, সুনীতদাকে শাস্তি দিয়েছিস, রাজনাথের ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছিস, প্রবীরবাবুকে রিজাইন দিতে বাধ্য করিয়েছিস, ডাক্তারের এমন হাল বানিয়েছিস এই জীবদ্দশায় আর করেকম্মে খেতে হবে না, ছট্টুকে এনকাউন্টার করিয়েছিস এইবার তোর মিত্রা সেফ। এইবার মিত্রাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। শেষ যেটা ছুঁতে পারবে বলে তুই মনে করছিস, তাকে তুই তোর হেফাজতে রেখে দিয়েছিস। সময় বুঝে তাকেও তুই সড়িয়ে দিবি। কাক পক্ষী কেউ টের পাবে না। কেউ তোকে ছুঁতেও পারবে না। পারবি ছট্টুর মতো আমাকে এনকাউন্টার করতে। আমাকে নিয়ে তোর অনেক চিন্তা। একবারে শান্তি পেয়ে যাবি।
মিত্রার প্রত্যেকটা কথা আমার শরীরের মাংস ভেদ করে ছুঁচের মতো আমার হাড়ে বিঁধছে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছে। সত্যি আজ আমি ওর মনের সংবেদনশীল অংশে নাড়া দিয়ে ফেলেছি। এই জায়গাটা আমারও আছে। ওরও থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
মিত্রা ওর মতো বলে চলেছে। আমার কানের মধ্যে দিয়ে এক বর্ণও আমার মাথার মধ্যে ধাক্কা মারছে না।
আমার হলে আমিও যে এই ব্যাব্যহারই করতাম। মিত্রা ঠিক সেই ব্যাবহার টুকু জাস্ট আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আমাকে এটা শুনতে হবেই। এছাড়া আমার কনো উপায় নেই। উভয়ের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক এই ব্যাপারগুলোর ওপরই গড়ে ওঠে। লোকে বলে বোঝাপড়া। না হলে সম্পর্ক ভেঙে যায়।
আমি মিত্রার সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে চাই নি। চাইলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে থাকতাম না। নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ আমি বহু বার পেয়েছি। আর শরীর! দামিনী মাসির ওখানে যখন থাকতাম, চাইলেই পেতাম। হয়তো জীবনটা অন্য খাতে বইতো। কিন্তু মিত্রার কলেজ লাইফের চিঠি গুলো ছিলো আমার সবচেয়ে বড়ো বল ভরসা।
ওর চিঠি গুলো আমাকে কারুর মুখের দিকে তাকাতে বারণ করতো।
বার বার ও আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলতো আমি মরিনি বুবুন।
আমি তোর কাছে ফিরে আসবই। তুই শুধু মাত্র আমার।
কতোদিন ওর কথা ভেবে রাতের পর রাত জেগে কাটিয়ে দিয়েছি। কোন অসুবিধে হয় নি। বরং পরেরদিন পূর্ণ উদ্যমে কাজ করেছি। রাতে ক্লান্ত কাকের মত বাসায় ফিরেছি। কনো দিন খাবার জুটেছে কনোদিন জোটেনি। কই কনো অসুবিধে হয়নি। বার বার মন বলেছে মিত্রা তোর সঙ্গে আছে, বুবুন তোর চিন্তা কিসের।
তাহলে আমার মধ্যে এই সংকোচ কেন। মিত্রা কোন অন্যায় কথা বলছে না।
আমি একি করলাম। তাহলে কি আমি আমার আধিপত্য এদের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি ? আমি কারুর কাছে কোন দিন ঋণী থাকব না। আমি সকলকে ঋণী করবো। সেই জায়গাটা মিত্রা মেনে নিতে পারছে না।
জানি না তখন সেই মুহূর্তে আমি কি করছিলাম।
একটা প্রবল ঝাঁকুনিতে আমার সম্বিত ফিরে এলো।
বুবুন, বুবুন এই বুবুন।
আমার চোখ বন্ধ মাথা নীচু। বুঝতে পারছি আমার চোখের জলে মিত্রার মুখটা ঝাপসা দেখছি।
কিরে আমি তোকে কি বললাম, তুই কাঁদছিস!
আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি।
এটুকু বলার অধিকার কি আমার নেই!
আমি মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মুখ গুঁজে দিলাম।
আচ্ছা বাবা আমার অন্যায় হয়েছে। আর কোন দিন তোকে কিছু বলবো না। আমি মেয়ে ভ্যাঁ করে কাঁদতে পারি, তুই কাঁদতে পারিস এটা জানা ছিল না।
ছাড় ছাড় এখুনি ছোটমা চলে এলে কেলো হয়ে যাবে। বলবে আবার, আধ দামড়া ছেলে, বউকে জড়িয়ে ধরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে।
আমি ওকে ছাড়লাম না। আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরলাম।
আমি তো তোর শত্রু। আমি কি তোর নিজের। তাই আমার কাছে কিছু চাইতে তোর লজ্জা হয়, সঙ্কোচ হয়। আমার কোন লজ্জা নেই দখ। তাই তোর কাছে দু’হাত পেতে খালি নিয়েই যাচ্ছি। তুই আমাকে ঘড় দিয়েছিস, বড়মা-ছোটমাকে দিয়েছিস, দাদা-মল্লিকদাকে দিয়েছিস। আমার মৃত বাবা-মার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিস।
সর্বোপরি আমাকে তুই নতুন ভাবে বাঁচতে শিখিয়েছিস।
আর আমি এখনো তোর বাবা-মার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারলাম না। অনেক কষ্টে তোর কাছ থেকে একটা জীবন পেয়েছি। জানিনা সেটা বেঁচে আছে কিনা। জানিনা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব কিনা।
আমি মিত্রাকে ছেড়ে দিলাম। জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
আমরা এখন বেরবো তুই কি যাবি ?
না।
গেলে ভালো লাগতো।
যাব না।
কোথাও বেরোবি।
বলতে পারছি না।
ওদের সঙ্গে কি বসবি।
না। ওদের চলে যেতে বল।
দেবা নির্মাল্য আসুক।
ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে যা। কালকে আসতে বল।
বুঝতে পারলাম মিত্রা দরজার ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে গেল।

আমি বাথরুমে গেলাম। মুখটা ভালো করে ধুলাম, চোখে জল দিলাম। টাওয়েল দিয়ে ভালো করে মুখটা মুছলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ালাম। মাথার মধ্যেটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে। সিগারেটটা খেতে ভালো লাগল না। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। বিছানার ওপর মোবাইলটা পরে রয়েছে। এগিয়ে গিয়ে তুলে নিলাম, দেখলাম স্যুইচ অফ। অন করলাম। গাদা খানেক মিস কল আর ম্যাসেজ। সবাই আছে। কার নাম বাদ দেব।
কিরে সত্যি তুই যাবি না।
একবারে আমার পেছন থেকে শব্দটা ভেসে এলো। ঘুরে তাকালাম। মিত্রা একটা নতুন শালোয়াড় পরেছে। টিয়া পাখির গায়ের রংয়ে। ঠোঁট দুটো লাল টুক টুকে। কপালে ম্যাচিং করে একটা বিন্দির টিপ লিগিয়েছে।
মন ভালো হয়েছে।
আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
তুই থাকলে সব সময় জার্নিটা একটু অন্য রকমের হয়।
তবু আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
দাদা নিয়ে এসেছে। দাদার ঘরে আছে।
আমার মুখ থেকে কোন শব্দ নেই।
তুই কি বোবা হয়ে গেলি। আমার সঙ্গে কথা বলবি না।
তোরা যা। আমার ভালো লাগছে না।
একা একা নিজের সঙ্গে বোঝা-পড়া করবি।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি জানি আমরা বেরিয়ে যাবার পর তুই বেরিয়ে যাবি। যেতে পারতিস আমাদের সঙ্গে।
এখন বিরক্ত করিস না।
বুঝেছি।
তোর খাবারটা এখানে দিয়ে যাব।
খেতে ভালো লাগছে না। তোর ফাইলটা দিয়ে যা।
ওটা নিয়ে এখন কি করবি।
কাজ আছে।
আমার জন্য তোকে আর কিছু করতে হবে না। যেদিন নিজের মনে করবি সেদিন করবি।
বেশি বক বক করিস না। যা বলছি কর।
কেনো তুই কি ভাবিস, আমি তোকে ভয় পাই।
না আমি সে কথা বলিনি। সকাল থেকে তুই অনেক বাঁকা বাঁকা কথা বলছিস।
আমি বলিনি তুই আমাকে বলাচ্ছিস।
এখন যা কথা বলতে ভালো লাগছে না।
যেখানেই থাকিস নটার মধ্যে আসবি।
সেটা নাও হতে পারে।
তাহলে মাথায় রাখবি আজ রাত নটার পর থেকে তোর সঙ্গে আমার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না।
কথাটা বলেই মিত্রা গট গট করে বেরিয়ে গেল।
আমি মিত্রার চলে যাওয়াটা ধীর স্থির ভাবে দেখলাম।
আমার ওপর কি আধিপত্য! কি ডিকটেটরশিপ! কই আমি ওর ওপর এতটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারিনি! তাহলে কি ও আমাকে একতরফা ভালবাসে ?
আমি কি এখনো সেইভাবে ওকে ভালবাসতে পারিনি ? আমার সব কিছু মেকি। আমার ভালবাসার মধ্যে কি কনো প্রাণ নেই ? সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
মিত্রা আবার ফিরে এলো। ফাইলটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে দিল। কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল। ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে আঁচড়ে কামরে টুকরো টুকরো করে দিই। মিত্রার চোখে বক্র হাসি।
ঘর থেক বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ির আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম সকলে বেরিয়ে গেল।
আমি আলমাড়িটা খুলে ফাইলটা তুলে রাখলাম। পাঞ্জাবী খুলে আমার পেটেন্ট সেই পোষাক পুরনো জিনসের প্যান্ট আর আধময়লা গেঞ্জিটা লাগালাম। আঃ কি আরাম। মনে মনে বললাম অনি নতুন পোষাকে তোমায় দারুণ দেখতে লাগে, তবে এই পুরোনো গুলোয় অনির আসল রূপটা ফুটে বেড়োয়। এইখানেই অনির বিশেষত্ব, অনি নিজেকে নিজে খুঁজে পায়।
গেট দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ছগনলাল আমায় দেখে হাসলো। কোনদিন হাসে না। আজ হাসলো।
কি ছগনলাল হাসছো কেন ?
কাল তোমার বিয়ে। বড়বাবু মা সব বাজারে গেল। আমাকে বললো তোমার সঙ্গে যারা গল্প করে তাদের কাল আসতে বলবে।
তুমি খুশি ছগনলাল।
তোমাকে দিদিমনিকে ভালো লাগবে।
আমি হাসলাম।
ট্র্যাংগুলার পার্ক বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস ধরলাম। সোজা চলে এলাম পার্কস্ট্রীট। এশিয়াটিক সোসাইটির ফুট ধরে চলে এলাম আস্থার অফিসে। অনেকদিন সুজিতদার সঙ্গে দেখা হয়নি। সাংবাদিকতার প্রথম জীবনে সুজিতদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। একটা প্রোডাক্ট লঞ্চের ক্যাম্পেনিংয়ে কভার করতে গিয়ে সুজিতদার সঙ্গে প্রথম আলাপ।
তারপর জানতে পারলাম সুজিতদার এ্যাডএজেন্সি আছে। তখন সুজিতদা আমাকে দিয়ে কপি লেখাত। বেশ কিছু পয়সা পাওয়া যেত। কিন্তু ওই যে, আমার যেহেতু কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। যোগাযোগের অভাবে ঠিক মতো কাজ করে উঠতে পারতাম না। তবে রিলেসন নষ্ট হতে দিই নি। মাঝে মাঝে আসতাম।
বিল্ডিংটার সামনে আসতে চিনতেই পারলাম না। কোথায় সেই আদ্যিকালের পুরনো বিল্ডিং! এখানে দেখছি একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং হয়েছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। বললো এই বিল্ডিং-এর ফিফথ ফ্লোরে চলে যান। অগত্যা মধুসূদন তাই করলাম। ফিফথ ফ্লোরে আনেক অফিস। আবার একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। বললো, ওই কর্নারের অফিসটা আস্থা।
কাঁচের দরজার সামনে এলাম। পুরনো অফিসের সঙ্গে আকাশ পাতাল পার্থক্য। সেই কোন যুগে এসেছিলাম। এখন সব বদলে গেছে। সেই মোটা ভ্যাটকা রিসেপসনিস্ট মেয়টা এখন আর নেই। দেখলাম রিসেপসনে একজন তরতাজা তরুণী বসে আছে। বেশ সুন্দর, শোকেশের ডল পুতুলের মতো। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। যা হয় আর কি। আমি এগিয়ে গেলাম।
সুজিতদার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।
ভদ্রমহিলা আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন, যেন আমি কে হরিদাস পাল, সুজিতদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
আপনি ঠিক বলছেন।
কেন সুজিতদা এখানে নেই!
হ্যাঁ আছেন।
তাহলে।
আপনার এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
সুজিতদার সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ঢুকতে হয় এখন ?
আপনি কতোদিন আগে এসেছিলেন।
ধরুন বছর আটেক আগে। তখন এই বাড়িটা হয় নি।
তরুণী মুখের কাছে হাত নিয়ে মুখ টিপে হাসলেন।
আপনার নাম।
পকেট থেকে মানিপার্সটা বার করে কার্ডটা দিতে যাচ্ছিলাম। কি খেয়াল হতে আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।
আপনার ভিজিটিং কার্ড আছে।
না। বলুন অনি এসেছে।
নাম বললেই হয়ে যাবে।
না হলে ফিরে যাব।
বসুন।
আমি গিয়ে ভিজিটরদের জন্য রাখা সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। চারিদিকে সব সুন্দরী মেয়ে। ছেলগুলোও দেখতে খারাপ নয়। ভদ্রমহিলা ইন্টারকমে কার সঙ্গে কথা বললেন। দেখলাম কাঁচের ঘর থেকে সবাই আমাকে মাপছে। আড়চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে একবার দেখলাম আমার প্যান্টের চেন খোলা আছে কিনা। প্রায়শই আমার এটা হয়। বহুবার মিত্রা হাসতে হাসতে আমাকে ইশারা করেছে। অসতর্কের ভান করে হাত দিয়ে দেখলাম, না চেনটা টানাই আছে।
কোথায় অনি, কোথায় অনি।
একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ভেতর থেক বেরিয়ে এসে চেঁচা মিচি শুরু করেদিলেন।
সেই রেসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলা ঢোক গিলে উঠে দাঁড়ালেন, বার পাঁচেক স্যার স্যার বলে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এলেন।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোকের মাথায় বেশ টাক পরেছে। চোখে চশমা। হ্যাঁ, মুখের আদলের সঙ্গে সুজিতদার মুখটা মিলে যাচ্ছে। আমি হ্যাঁ করে তাকিয়ে আছি। ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। সুজিতদা সবার দিকে চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে স্থির দৃষ্টি ফললো।
ওইতো, কিরে ব্যাটা ?
সুজিতদা এগিয়ে এলো।
আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে পিঠে ফটা ফট তিন চারটে চাপর মেরে দিল।
আমি তোমাকে চিনতেই পারি নি! তোমার মাথার সেই কুচকুচে কালো চুল গেল কোথায় ?
সুজিতদা হাসছে।
তুমি একেবারে বুড়ো মেরে গেছো। তোমার চুলের অবস্থা এখন এপার ওপারের মতো।
বয়স কি কম হলো।
তাহলে বৌদিও বুড়ী হয়ে গেছে।
তা হবে না।
তাহলে দেখা করবো না। আট বছর আগের দেখা বৌদির মুখটাই আমার চোখে থাক।
কি লীনা তোমরা চিনতে পারছ না।
সুজিতদা রিসেপসনিস্ট মেয়াটার দিকে তাকাল।
তারপর আমার দিকে ফিরে।
তুই কিন্তু আগের মতোই রয়েছিস। একবারে মডেলদের মতো ফিগারটাকে ধরে রেখেছিস।
না খেয়ে খেয়ে।
আমার কথা শুনে, লীনা মেয়েটি আগের মতোই মুখের ওপর হাত রেখে মুখ টিপে হাসছে।
কাঁচের দেওয়ালের ওপাশ থেকে যারা এতোক্ষণ আমাকে দেখছিল, তারা বেশ অবাক।
আমি ভাবতেই পারছি না তুই আমার কাছে আসবি।
কিছু কপি দাও না লিখে দিয়ে যাই। ভীষণ টাকার দরকার।
মারব এক থাপ্পর।
সুজিতদা হাত তুললো, আমি হাত তুলে আড়াল করার চেষ্টা করলাম।
গুটি গুটি করে বেশ কয়েকজন সেই কাঁচের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
মেয়েগুলো আমায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে। এ কেমন জোকার!
আর যারা ভিজিটার আছেন অপেক্ষা করে তারা অবাক।
আমাদের কাগজের নাম করে একটি ছেলের দিকে তাকিয়ে সুজিতদা বললো, কিরে সাগ্নিক মেটিরিয়ালটা কাগজে পাঠিয়ে দিয়েছিস।
দিয়েছি স্যার, কিন্তু রবিবারে ছাপতে পারবেনা বলেছে। কে যেন একজন ম্যাডাম নতুন জয়েন করেছেন। তিনি না বললে ছাপা যাবেনা, চম্পকদা বললেন।
রাখ তোর ম্যাডাম, কিরে মালিক আমার বিজ্ঞাপন ছাপা হবে না ?
আমি হাসছি।
এবার সবার চোখ প্রায় ঠেলে বেরিয়ে আসার জোগাড়। কেউ যেন হাজার পাওয়ারের বাতি জেলে দিয়েছে ওদের চোখের সামনে।
এ কি শুনলো।
আবার সাগ্নিকের দিকে সুজিতদা ঘুরে তাকাল। ওরে ওই কাগজের ওয়ান অফ দেম পার্টনার আমার সামনে দাঁড়িয়ে, আর তুই বলছিস কিনা বিজ্ঞাপন যাবে না।
উনি অনি ব্যানার্জী। লীনা বলে মেয়েটি বিষ্ময়ে বলে উঠলো।
কেন তোমায় কার্ড দেয়নি ?
না।
তাহলে।
উনি একবার মানি পার্টসটা বার করেছিলেন তারপর পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন, বললেন, বলুন অনি এসেছে। আমি বললাম, এতেই উনি চিনতে পারবেন। উনি বললেন, না চিনতে পারেলে চলে যাব।
ইস কি মিস করলে লীনা, তুমি ওর কাছ থেকে কার্ডটা আদায় করতে পারলে না। একজন অতোবড়ো কাগজের মালিক তোমায় কার্ড দেবে তুমি ভাবতে পার।
লীনা মাথা নীচু করলো, সরি স্যার।
আর সরি, এ সুযোগ বার বার আসবে তোমার জীবনে।
গত পর্শু ওর ঝড়তোলা লেখাটা পরেছো।
হ্যাঁ স্যার, উনিই যে সেই ব্যক্তি বুঝবো কি করে।
ও চিরটাকাল একরকম থেকে গেল।
আমার হাতটা চেপে ধরলো।

চল চল ভেতরে চল। তুই যখন এসেগেছিস তখন সামনা সামনি তোর সঙ্গে কথা বলে নেওয়া যাবে। একজন ক্লায়েন্ট এসেছেন ভেতরে।
সুজিতদা আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে ভেতরে টেনে নিয়ে গেল।
ছোট ঘর, কিন্তু দারুণ ডেকরেসন। কর্পোরেট হাউসের মালিকের ঘর যেমন হয় আর কি।
তুই আমার চেয়ারটায় বোস।
একবারে ফালতু কথা বলবে না, তাহলে ফুটে যাব।
কতোদিন পর তোর সঙ্গে দেখা। সুজিতদা আবার বুকে জড়িয়ে ধরলো।
প্রায় আট বছর। তোমার পুরনো অফিসে কপি লিখতে আসতাম।
ভুলে যা। সেতো এক যুগ। গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। তখন কাজ করেও মজা ছিল। এখন কম্পিটিসনের মার্কেট টিঁকে থাকতেই দম হাল্কা হয়ে যায়।
তোমার তো ভালোই ব্যাবসা হচ্ছে।
তোদের কাগজটা আছে বলে টিঁকে যাচ্ছি। তাও চম্পক এতো হারামী গিরি করছে, কি বলবো।
কেন!
আজ না কাল কাল না পরশু। জায়গা নেই। পার্টির চয়েস মতো যদি ডেট না পাই, জায়গা না পাই, বিজ্ঞাপন দিই কি করে বল।
তুমি ইয়ার্লি কনট্র্যাক্টে যাচ্ছনা কেন ?
কতবার বলেছি, চম্পক বলেছে কাগজের লস। হবেনা। যদিও বা হাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলো। শুনলাম সব ওলোট পালট হয়ে গেছে। নতুন ম্যানেজমেন্ট। তাদের রেটও নাকি বেশ হাই। ভেবেছিলাম তোর কাছে একবার যাব। অতি কষ্টে তোর ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। ওমা দেখি সারাক্ষণ স্যুইচ অফ।
তাহলেই বোঝ আমি কেমন মালিক।
সুজিতদা হেসে ফেললো।
সুজিতদা নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললো, তুই হঠাৎ আমার অফিসে।
সকাল থেকে মনটা খুব খারাপ, ভাল লাগছে না। ভাবলাম আমার পুরনো আত্মীয়স্বজন কারা আছে। প্রথমেই তোমরা মুখটা ভেসে উঠলো। চলে এলাম।
এটা তোর গল্প, আসল কথা বল।
হ্যাঁগো বিশ্বাস করো।
আমার মুখটা তোর হঠাৎ মনে পরলো কেন ?
বলতে পারব না। মনকে জিজ্ঞাসা করিনি।
কি খাবি।
যা বলবো খাওয়াতে পারবে।
বলনা দেখি পারি কিনা।
আসার সময় মোড়ের মাথায় দেখলাম ছেঁড়া পরোটা তৈরি করছে। আর ঘুগনি। খাওয়াবে ?
তুই কি আমার সঙ্গে ফাজলাম করছিস।
উঠে দাঁড়ালাম, তাহলে চলি।
আরে বোস বোস খেপে যাচ্ছিস কেন, সত্যি তুই খাবি!
সুজিতদা অনি এখনো মালিক হয় নি। হলে তোমার কাছে সে আসতো না।….
আমার গলার স্বরটা সামান্য হলেও পরিবর্তন হলো।
সুজিতদা আমার দিকে তাকিয়ে।
….মালিক হলে সে তোমাকে ডেকে পাঠাত। মালিক ডাকলে তুমি যেতে না ?
মালিক অনির কাছে যেতাম, ছোটভাই অনির কাছে যেতাম না।
এই তো তোমার মুখ থেকে আসল কথাটা বেরিয়ে গেল।
তাহলে ছেঁড়া পরোটা নিয়ে আসতে বলি।
অবশ্যই। আর একটা কাজ করবে।
বল।
পাশেই গরম গরম জিলিপি ভাজছে। গোটা কতক নিয়ে আসতে বলো।
সত্যি অনি, তুই এখনো সেরকম আছিস।
বাড়ি থেকে হেঁটে বাস স্ট্যান্ড, সেখান থেকে পাবলিক বাসে পার্ক স্ট্রীট, হেঁটে তোমার অফিস। এর মধ্যে একটুও ভেজাল নেই, ফাঁকি নেই।
তোকে দেখে আমার ভীষণ ভীষণ ভাল লাগছে।
তোমাকে দেখেও। মনের মধ্যে একটা শান্তি বোধ করছি। বৌদি ভালো আছে।
দাঁড়া।
সুজিতদা মোবাইল বার করে পটাপট বোতাম টিপলো। ভয়েজ অন করতে রিংটোনে রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে এলো। আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি।
হ্যালো, বলো।
তুমি কোথায়।
একটু মার্কেটিংয়ে এসেছি।
আমার কাছে একজন এসেছে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছে, তুমি কেমন আছ।
কে গো।
অনি।
অনি! ওটা বেঁচে আছে।
বালাই ষাট ও কথা বলতে আছে।
বলবো না, দাও ওকে ওর চুলের মুটিটা ধরি।
তোমার কথা ও শুনতে পাচ্ছে।
কিরে ছাগল, পথ ভুলে।
না গো বৌদি, পৃথিবীটা যে গোল আজ অনুভব করলাম।
এভাবে তোর সঙ্গে কথা বলবো না। কবে আসবি।
হঠাৎ কোন একদিন।
হ্যাঁগো ও কি সেরকমই দেখতে আছে। না মুটিয়েছে।
আরি বাবা একেবারে সেরকম কোন পরিবর্তন নেই, সেই ময়লা ময়লা গেঞ্জি, আর ছেঁড়া ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট।
মাথার চুল।
এখনো সেই রকম। দাড়ি গোঁফ তো ওর কনো দিন ছিল না। একটু একটু ছাগল দাড়ি, সেটা আজ কেটেছে।
আমি হেসে ফেললাম। ওর একটা ছবি তুলে আনো।
আমি ওকে বললাম কি খাবি। ও কি বললো জানো।
কি খেতে চেয়েছে রুটি আলুর দম।
সেরকমই। ছেঁড়া পরোটা ঘুগনি আর জিলিপি।
ও ওই হাউসের মালিক হওয়ার যোগ্য নয়।
সুজিতদা হাসছে।
কিরে অনি কবে আসবি।
দাদাকে একটা দিন ঠিক করে দিচ্ছি, সেদিন আসব।
আয় জমিয়ে গল্প করবো। বিয়ে করেছিস।
না। মেয়ে পাচ্ছি না।
এই যে শুনলাম তুই তোর মালকিনকে পটিয়েছিস।
তোমার কি বিশ্বাস হয়।
বিশ্বাস হয় না। অবিশ্বাসই বা করি কি করে।
ঠিক আছে এই বিষয় নিয়ে পরে কথা হবে।
শোনো ও যা খেতে চায় ওকে খাওয়াও।
আচ্ছা।
রাখি।
হ্যাঁ।
একজন এসে ঘরে ঢুকলেন।
স্যার।
হ্যাঁ বলুন।
আমরা ওনাকে বোঝালাম। উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।
কি বুঝলে।
মনে হচ্ছে উনি ঠিক সেটিসফায়েড নন।
নিয়ে এসো।
ছেলেটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সুজিতদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হ্যাঁরে অনি তুই এখনো স্ক্রিপ্ট তৈরি করিস।
কেন বলো।
একটা পার্টিকে কিছুতেই পটাতে পারছি না।
অনেক দিন স্ক্রিপ্ট লেখা ছেড়ে দিয়েছি। আঁকি বুকিও চুলোর দরে গেছে।
একটা ভালো পার্টি এসেছে বম্বে থেকে, ওরা এখানে প্রোডাক্ট লঞ্চ করবে। কাজটা করবি।
সব।
তুই করলে আমি নিশ্চিন্ত হই। তাছাড়া তুই এখন মালিক বলে কথা। ওয়েট ক্যারি করবে।
কতো দেবে।
প্রোজেক্টটা পঞ্চাশ কোটি। ওরা একবছরে খরচ করবে। পুরো ইষ্টার্ন রিজিয়ন আমাকে দেবে। তোদের কাগজের জন্য আমি ওয়ান থার্ড ধরে রেখেছি। তোকে এটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বাকিটা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ব্যানার সব কিছুতে।
আমি কিন্তু লে আউট প্ল্যানিং করে ছেড়ে দেব। বাকি তোমাকে করতে হবে।
অবশ্যই তুই ভিজুয়ালি যেমন করে দিতিস আমাকে সেই রকম করে দে।
তাই হবে।
আমি কি পাব।
তোর পেছনে আমি চার খরচ করতে পারি।
চার লাখ না কোটি।
তুই কি এখন লাখে সীমাবদ্ধ, তোকে ধরতে গেলে কোটি দরকার।
গুল মের না।
ঠিক আছে ভদ্রলোককে আসতে দে, কথা বল।
রাজি হলে, তোর কাগজের ব্যাপরটা আজই কিন্তু ওনার সামনে ফাইন্যাল করে নেব।
আমার কিন্তু ক্যাশ চাই হাফ এ্যাডভান্স।
তাই হবে।
পটাতে পারলে আজকেই দিতে হবে।
তুই যদি আমার হয়ে পটাতে পারিস, আমি কথা দিলাম যত রাত হোক তোর ঘরে পৌঁছে দেব।
ডাকো। তাহলে আমার ছেঁড়া পরোটা এখন খাওয়া হবে না।
পরে খাস। আগে কাজ।
সুজিতদা ইন্টারকমে কথা বললো।
সেই ভদ্রলোক, আর একজন স্যুট টাই পরিহিত টিপ টপ একজনকে নিয়ে সুজিতদার ঘরে এলেন। আমি ভ্যাবলার মতো ওনার দিকে তাকালাম। সুজিতদা প্রথমে ব্যবসায়িক ভাষণ দিলেন। নাম বললেন মিঃ নেওটিয়া। বাংলা হিন্দী ইংরাজী মিশিয়ে কথা বলছেন। আগামী মাস থেকে উনি ক্যাম্পেনিং করতে চান।
সুজিতদা আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
ভদ্রলোক প্রথমে আমাকে দেখে ভ্রু-কোঁচকালেন। তারপর আমার নাম শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
আপনার জন্য রাজনাথ আর ওই মিনিস্টার….।
সুজিতদা তাকিয়ে আছে।
আমি ঠিক হাসলাম না। আবার গম্ভীরও থাকলাম না।
ভদ্রলোক আমার হাতটা ধরে বেশ কয়েকবার ঝাঁকিয়ে দিলেন।
প্রায় একঘন্টা কথা হলো। ভদ্রলোককে পটিয়ে নিলাম। দুটো কনট্রাক্ট লেটার তৈরি হলো। একটা আমার কাগজের সঙ্গে, আর একটা আমার সঙ্গে। উনি একটা পাঁচ কোটি টাকার চেক আর আমাকে বাই নেম দু’কোটি টাকার চেক দিলেন। কনট্রাক্টগুলো আমি নিলাম। কাজ বুঝলাম। সুজিতদা সব ফাইল করে আমাকে দিল। ভদ্রলোক চলে গেলেন।
ভদ্রলোককে অফিসের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে সুজিতদা হৈ হৈ করতে করতে ঘরে ঢুকলো। আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। তোর জন্য আজকে ব্যাবসাটা পেলাম। তোর কি কনসেপ্টরে। তুই জানিষ ওই ভদ্রলোককে আমার অপনেন্ট এম এস এ্যাড এজেন্সি নিয়ে চলে গেছিল। আজও কোন মতে ওকে সেটিসফায়েড করতে পারেনি এরা কেউ।
সকাল থেকে দুটো সেসন পার করে দিয়েছে এরা। তুই এক ঘন্টায় মালটাকে কুপকাত করে দিলি! তুইতো এখন অনেক বড় খেলোয়াড়।
আমার ছেঁড়া পরোটা।
আনছি আনছি। ওরে শালা! এখন বুঝছি তোকে কেন ম্যাডাম মালিক বানিয়েছে। যার হাত থেকে সহজে মাল গলে না এককথায় কুড়ি কোটির চেক দিয়ে চলে গেল।
মাথায় রাখবে আমি ক্যাশ চেয়েছি, কাগজেরটা পুরো এ্যাডভান্স চেয়েছি।
ও দিয়ে দেবে।
দিয়ে দেবে না। বুধবারের মধ্যে অফিসে চেক পৌঁছন চাই।….
এই তুই ঝামেলা শুরু করছিস।
….না হলে পুরো সিডিউল ক্যানসেল করে দেব।

তুই কি আমাকে মারবি।
মাল পেয়ে গেলে মারব না।
তাড়াতাড়ি খাবার বলো।
ও দিকটা একবার তাকা।
দেখলাম কাঁচের দরজার ওপাশে সকলে দাঁড়িয়ে আছে।
সারাটা অফিস রাষ্ট্রহয়ে গেছে।
সুজিতদা ইশারা করলো ভেতরে আসার জন্য।
দুজন ভেতরে এলো।
স্যার আমরা সকলে অনিবাবুর সঙ্গে আলাপ করতে চাই। সবাই করিডরে জড়ো হয়েছে।
কি বুঝছিস। সবাই জেনে গেছে তুই আজ অফিসের হয়ে মাল ফাঁসিয়েছিস।
আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি, আমার কমিশন।
পেয়ে যাবি।
ধার বাকি নেই। ক্যাশে নেব।
তোকে যখন কথা দিয়েছি, দেব।
ফুল ক্যাশ।
তাই হবে। তুই আমার ছ’মাসের মাসের ব্যবসা তুলে দিলি। তোকে দেব না তো কাকে দেব।
ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে, তোরা সবাই বোস, ও তোদের সঙ্গে মিট করবে।
ওরা বেরিয়ে গেল।
সুজিতদা বৌদিকে ফোন করে সব জানাল।
বৌদি খুশিতে ডগমগ করছে।
আমার আর্ট ডিপার্টমেন্টের ছেলেগুলোর সঙ্গে তুই একটু মিটিং করে যা।
তাই চলো ওখানে বসে সবার সঙ্গে আলাপও করা যাবে, আবার কথাও বলে নেওয়া যাবে।
আমি সুজিতদা ওই ঘরে এলাম। সুজিতদার চেম্বারের থেকে বড়ো।
সবাই আমার সঙ্গে এসে আলাপ করলো। মেয়েগুলো আমাকে দেখে মুচকি হাসে। বিশেষ করে লীনা বলে মেয়েটি।
আমাদের প্রথম ক্যাম্পেনিং সেই চায়ের বিজ্ঞাপনটা তোমাদের মনে আছে।
ওরা সুজিতদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
বহুবার গল্প বলেছি তোমাদের।
হ্যাঁ স্যার, চুমুকে চমক।
ঠিক বলেছো।
ওটা অনির কনসেপ্ট। সেইদিন আস্থার নাম সবাই জেনেছিল। আজ আট বছর পর ও আবার এই কাজে হাত দিল। আশা রাখছি তোমরা নতুন কিছু পাবে।
আমরা স্যার অনিদার সঙ্গে কাজ করতে পারি না।
সবই তোমরা করবে, ও খালি লে-আউট ডিজাইন প্ল্যানিং করে দেবে। তোমাদের সঙ্গে ও এখনি একটা ছোট্ট মিটিং করবে।
তাহলে খুব ভাল হয় স্যার।
ছেঁড়া পরটা ঘুগনি আর জিলিপি এলো।
আমার খাওয়ার বহর দেখে মেয়েগুলো হাসাহাসি করলো।
খেতে খেতে ওদের সঙ্গে মিটিং করলাম, ছবি আঁকলাম, ওদের যে আর্ট ডিরেক্টর তার সঙ্গে বসে আমার চিন্তা-ভাবনার আদান-প্রদান করলাম।
আবার সুজিতদার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গেঁজাবার পর উঠলাম।
দেখতে দেখতে প্রায় তিন ঘন্টা কোথা থেকে কেটে গেল বুঝতে পারলাম না।
সুজিতদাকে আমার কার্ডটা দিলাম।
মেটেরিয়াল গুলো আটটার সময় এই এ্যাড্রেসে নিয়ে এসো আমি থাকব।
এতো ট্র্যাংগুলার পার্কের ঠিকানা।
হ্যাঁ।
আমার বাড়ির থেকে মিনিট পাঁচেকের দূরত্ব।
আমি এখন এখানেই থাকি। চলে এসো।
আমি ঠিক ওই টাইমের মধ্যে যাব।
তুই একটু চম্পককে বলে দে।
বলে দেব।
বেরিয়ে এলাম।
সুজিতদা গেটের বাইরে করিডর পর্যন্ত এল।
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রাস্তার নিওন আলো সবে জ্বলে উঠেছে।
পার্কস্ট্রীটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করে অন করলাম।
মিস কল আর ম্যাসেজ।
দেখলাম তার মধ্যে মিত্রার মিস কল সব চেয়ে বেশি। একটা ম্যাসেজও করেছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিস। বড়মাকে কথা দিয়েছিলি আজ বেরবি না।
আবার ম্যাসেজ ফোনটা সুইচ অফ করে রেখেছিস কেন।
অনেক জিনিষ কিনেছি। তোকে কাল সাজাব। আমার মনের মতো করে।
ম্যাসেজ দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম। পথচলতি লোকের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম।
সরি।
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিল।
হঠাৎ রাস্তার ধারে ডাস্টবিনে বসে থাকা পাগলটার দিকে চোখ পরতেই হেসে ফেললো।
থমকে দাঁড়ালাম।
এঁঠো পাতা থেকে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। চিনতে পারলাম। চোখ মারলাম। সোজা হাঁটতে হাঁটতে এসে দুটো সিগারেট কিনলাম।
এ্যাসিয়াটিক সোসাইটির সিঁড়িতে বসলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। একটা হাতে রাখলাম। সুমন হেলতে দুলতে হাঁসতে হাঁসতে আমার কাছে এসে বসলো। আমি যে সিঁড়িতে বসলাম তার তিনধাপ নিচে। সিগারেটটা ইচ্ছে করে ফেলেদিলাম। সুমন কুড়িয়ে নিয়ে টানতে শুরু করলো।
চারদিকে রাস্তার নিওন আলো গুলো ঝক ঝক করছে। হোর্ডিং-এর আলো এসে পরেছে সোসাইটির সিঁড়িতে।
আমি ওর কাঁধে হাত দিয়ে সিগারেটটা দিতে বললাম। ও চোখ মারলো। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে ওর সিগারেট থেকে আমার গোটা সিগারেটটা ধরালাম। দু’একজন হাঁটতে হাঁটতে আমাদের বাঁকা চোখে দেখে হাসলো।
সিগারেট খাচ্ছি আর নিজের মনে কথা বলছি।
কিরে এখানে কি করতে ?
সুমনও সিগারেট খাচ্ছে, মাথা নীচু করে ধুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার কথার উত্তর দিয়ে চলেছে।
তোমার লেখার রি-অ্যাকসন। ঘুম করে নিয়েছ। ওদিকে সাদা পোষাকের মাল তোমায় আমায় লক্ষ করছে।
আমাকে চেনে।
না। মাপছে।
তাহলে ফুটে যাই।
বসো অসুবিধে নেই।
তাহলে আর দুটো সিগারেট কিনে আনি। আমি উঠে চলে গেলাম। সিগারেটের দোকানে গিয়ে সিগারেট কিনলাম সুমন আমার পেছন পেছন এসে আমার গায়ে হাত দিয়ে সিগারেট চাইলো।
একজন নোংরা পাগল একজন ভদ্রলোকের গায়ে হাত দিয়ে সিগারেট চাইলে যা করে আমি সুমনকে তাই করলাম। উপরন্তু একটা সিগারেট দিলাম। আবার এসে বসলাম।
সুমন আমার পেছন পেছন এসে একটু দূরত্ব নিয়ে বসলো। চোখ চারিদিকে সজাগ।
গুরু দারুণ এ্যাকটিং করলে। মাল পুর হাওয়া।
তোর কি আজকে এখানে ডিউটি।
হ্যাঁ। তোমাকে যাবার সময় দেখেছি।
লক্ষ্য করিনি।
জানতাম। তোমার চোখ। দেখলে একবার থমকে দাঁড়াতে।
তখন কোথায় ছিলি।
ব্লু-ফক্সের ধারে।
এখানে কিসের গন্ধ।
শুনছি আমেরিকান হাউসে এ্যাটাক হবে।
খবরটা দিস। আমার নম্বর আছে।
না।
ইচ্ছে করে মানি পার্টসটা বার করে উঠে দাঁড়ালাম কার্ড বার করতে গিয়ে মানিপার্টসটা হাত থেকে ফেলে দিলাম। কাগজপত্র টাকা পয়সা পরে গেল। সুমন নিজের জিনিষটা নিয়ে নিল।
আমি একটা একটা করে সময় নিয়ে গুছিয়ে তুলে মানি পার্টসে রাখলাম।
আরও কিছুক্ষণ বসে ওর সঙ্গে গেঁজালাম।
প্রবীরদার থেকে তুমি একটু সাবধানে থেক।
কেনরে!
তোমাকে স্কিম করার ধান্দা করছে।
পারবেনা।
জানি তোমার হাতটা অনেক চওড়া। আজও চারটে গাড়ি অশ্বিনীনগরে ঢুকেছে। সব অটো মাল।
এখন কি সব ছেড়ে ছুড়ে ওই ব্যবসা শুরু করেছে!
ওটা রাজনাথের।
এ্যাড্রেস।
লোকটার ফার্মাসির ডিস্ট্রিবিউটর সিপ আছে।
মুখার্জী জানে।
না। চেপে আছি। স্টেটের ব্যাপার ওরা আগে খবর করে কিনা দেখি।
সেদিনের মালটা ?
যখন জানলাম, তখন তুমি খেল খতম করে দিয়েছ।
মোবাইলের ঘরিটা দেখলাম সাতটা বাজে।
আজ চলিরে।
যাও।
ওখান থেকে উঠে সোজা রাস্তার এপারে কালীঘাট মাঠে এসে দাঁড়ালাম।
বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে না।
সুজিতদাকে একটা ফোন লাগালাম।
কথায় তুমি।
তোর মালটা জোগাড় করতে গেছে। আর কিছুক্ষণ পর এসে পরবে।
শোনো আমি একটা কাজে ফেঁসে গেছি। তুমি আমার বাড়ির গেটে যে দারোয়ান আছে, ওর নাম ছগনলাল ওর কাছে রেখে আসবে।
যদি কিছু হয়।
কিছু হবে না।
তুই যখন বলছিস রেখে আসবো।
সোজা একটা ট্যাক্সি ধরে চলে এলাম গঙ্গার ধার।
আমার সেই জায়গা। এই রাতে এই জায়গায় বড় একটা কেউ আসে না।
দূরে জেলে নৌকগুলোয় রান্না চাপিয়েছে। স্টিমারের ছেঁড়া ছেঁড়া আলো গঙ্গার বুকে পিছলে পরে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
মিঃ মুখার্জীকে ফোন করলাম।
কি স্যার কি খবর।
মুখার্জী হাসছে।
রবিবার একবার সময় রাখবেন। সন্ধ্যার পর আমার এখানে একবার আসতে হবে।
মুখার্জী জোড়ে হেসে ফেললো।
হাসছেন যে।
নেমন্তন্ন এই তো ?
হ্যাঁ।
জানি।
কি করে।
দাদা ফোন করেছিলেন।
তাহলে সবই জেনেছেন। টোটাল টিম নিয়ে আসবেন।
যাক পাখি এবার দাঁড়ে বসবে।
পার্ক স্ট্রিটে লোকজন ঘুরতে দেখলাম।
এ খবর পেলেন কোথা থেকে!
বলুন না, আমি যা বলছি সত্যি কিনা।
সত্যি।
আমেরিকান হাউস টার্গেট।
সেরকমই খবর।
আমি যেন আগে পাই মাথায় রাখবেন।
মুখার্জী হাসছেন।
আচ্ছা আপনি খবরটা পেলেন কোথা থেকে ?
পেয়েছি।
সত্যি, এবার আপনার পেছনে আমাকে লোক লাগাতে হবে।
লাগান। কে বারণ করেছে।
সত্যি আপনি ইনভিজিবিল ম্যান।
হাসলাম। রাখি।
আচ্ছা।

ফোনটা পকেটে রাখতেই একটা ছায়া মূর্তি সামনে এসে দাঁড়াল।
দাদা চা আনি।
আবিদ রতন ছাড়া ইসলামবাই-এর দলের আমি কাউকে সেই ভাবে চিনি না। তবে ইসলামভাই-এর দয়ায় এদের অনেকেই আমাকে চেনে।
দেখলেই মনে হবে নিপাট ভাল ছেলে। এদের চোখই অনেক কথা বলে।
আমি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
চা-এর সঙ্গে কিছু আনি।
শুধু চা আন।
ছেলেটা চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা চা ওয়ালাকে ধরে আনল। চা দিয়ে ছেলেটা এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। আলো আঁধারি পথে মিশে গেল।
একা থাকলেই বার বার মিত্রার কথাটা মনে পরে যাচ্ছে।
তাহলে কি আমি কোথাও ভুল করে ফেললাম ?
কিছুতেই স্থির থাকতে পারছি না।
হাজারটা বাজে চিন্তা আমার সামনে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে। আমাকে যেন বিদ্রূপ করছে।
ধ্যুস। উঠে পরলাম।
পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলাম। ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবু ঘাটের মুখটায় এলাম।
একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে।
দাদা যাবেন নাকি ?
কোথায় ?
ট্র্যাংগুলার পার্ক।
চলুন।
উঠে বসলাম।
বেশ বুঝতে পারছি একটা ঘোড়ের মধ্যে আঠি। এতটা পথ চলে এলাম কিছুই বুঝতে পারলাম না। ট্র্যাংগুলার পার্কের কাছে এসে ছেলটি বললো দাদা কোনদিক দিয়ে ঢুকবেন। ওকে পথনির্দেশ দিলাম।
গেটার মুখ যখন এসে দাঁড়ালাম তখন রাত প্রায় আটটা বেজে গেছে।
ছগনলাল আলো জালায় নি। একমাত্র বড়মার ঘরে আলো জলছে।
দুটো দরজা চেন দিয়ে আটকান একটু ফাঁক করে ভেতরে ঢুকলাম।
ছোটবাবু।
ছগনলাল এগিয়ে এসেছে। ওর মুখের দিকে তাকালাম।
একটু আগে একজন বাবু এসিছিলেন। অনেক জিনিষপত্র আর একটা ব্যাগ দিয়ে গেলেন। বড়মার ঘরে রেখেছি।
ঠিক আছে।
ঘোরের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় উঠে এলাম।
বাগানটা এখনো বেশ অপরিষ্কার। চারিদিকে জিনিষপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
বড়মার ঘরে এলাম। ছগনলাল সব ডাইনিং টেবিলে গুছিয়ে রেখেছে।
ড্রইং-এর মেটিরায়ালস গুলো নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম।
ছগনলাল গেটের মুখে দাঁড়িয়ে।
দাও আমি নিয়ে যাচ্ছি।
থাক আমি নিয়ে যাচ্ছি। তবু ছগনলাল এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে ড্রইং-এর বোর্ডটা নিল।
আমাকে একটু চা খাওয়াবে।
তুমি সকাল থেকে কিছু খাও নি।
খেয়েছি, তুমি একটু চা করো।
আমার বিছানায় বোর্ডটা রেখে ছগনলাল চলেগেল।
হঠাৎ নিজের ভেতরে কেমন যেন একটা পরিবর্তন অনুভব করলাম।
হাতটা ভীষণ উসখুস করছে ছবি আঁকার জন্য। ধীরে ধীরে সব গুছিয়ে নিলাম। বিছানা ময় সব ছড়িয়ে দিলাম। বাথরুম থেকে বালতি করে জল আনলাম। মগটা নিয়ে এসে একমগ জল আলাদা করে রাখলাম। তুলিগুলো সব ডুবিয়ে দিলাম। জামা প্যান্টটা টেনে খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। টাওয়েলটা পরে নিলাম। নিমেষের মধ্যে ঘরের চেহারাটাই বদলে গেল।
ড্রেস মেটিরিয়ালসের ছবি আগে এঁকে ফেলতে হবে।
আমার দীর্ঘদিনের অভুক্ত খাবার আজ পেয়েছি। সুজিতদার কাছেই শেষ কাজটা করেছিলাম। মাথার মধ্যে সব কেমন যেন কিল বিল করতে আরম্ভ করলো।
ছগনলাল চা দিয়ে গেল। আমি ড্র করতে শুরু করলাম। বার বার পিঙ্কি চুর্ণী তিয়া রিমঝিমের মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বিশেষ করে তিয়ার মুখটা।
পারফেক্ট মডেলের মত চেহারা।
হাতের পেন্সিল হ্যান্ড মেড পেপারের ওপর চলতে শুরু করলো। পর পর অনেক গুলো স্কেচ করে ফেললাম ঘরের চারদিকে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি আর এঁকে যাই।
একজন মানুষ দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকার পর যখন খেতে পায়, সে যেভাবে খায় আমিও যেন সেই ভাবে এঁকে চলেছি।
মিঃ নেওটিয়া বলছিলেন প্রথমে উনি মেয়েদের ড্রেস মেটিরিয়াল দিয়ে শুরু করবেন। আমাকে তারও ড্রইং করে দিতে হবে। সিকোয়েন্স গুলো মনে মনে একবার সাজিয়ে নিলাম। হ্যান্ড মেড পেপারগুলো আগে ভালো করে বালতির জলে ডুবিয়ে নিলাম। প্রথমে একটা প্রকৃতির দৃশ্য আঁকলাম, না হাতটা ঠিক আছে। তারপর ক্যাটওয়ার্ক গুলো তৈরি করলাম। এবার রাম্পে হাঁটার থেকে আরম্ভ করে পর পর সিকয়েন্স গুলোর স্কেচ আঁকতে শুরু করলাম।
অনেকদিন পর তুলি হাতে পেয়ে মনেহচ্ছে আমি যেন স্বর্গ হাতে পেয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম, এই মুহূর্তে স্কেচগুলো আমার সবচেয়ে বেশি আপনজন। কনোদিকে খেয়াল নেই। আমি আমার সাধনায় নিমগ্ন।
কতোক্ষণ এঁকেছি, কতগুলো ছবি এঁকেছি জানি না। পর পর মনে যা এসেছে, যে ভাবে ভেবেছি তুলির রং-এ তাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আঁকা শেষ হলে একটা একটা করে খাটের ওপর রেখে এসেছি।
আঁকতে আঁকতে হঠাৎ দেখলাম কে যেন আমার ড্রইং বোর্ডের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তার ছায়া আমার ড্রইং বোর্ডে পরেছে। চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম মিত্রা। হেসে ফেললাম।
ঝট করে রং-এর প্লেটটা রেখে ওকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে একপাক ঘুড়ে নিলাম। ওকে কোলে তুলে নিলাম।
মিত্রা, মিত্রা আমার মিত্রা।
ছাড় ছাড় পরে যাব। তোর কোথাও লেগে যাবে আবার।
আমি ছাড়লামনা ওকে জাপ্টে ধরে বললাম, জানিষ আজ আমি জিতে গেছি।
তখনও ও আমার কোলে। আমার গলা জড়িয়ে ধরে আছে।
আমাকে নিচে নামা আমি পড়ে যাব।
আমি আছি, কেন তুই পড়ে যাবি ? তুই পড়ে গেলে আমি তোকে ধরে ফেলবো।
প্লিজ তুই নিচে নামা।
আমি ওকে নিচে নামালাম।
ওর দিকে তাকালম। চোখে জল টল টল করছে।
এমা তুই কাঁদছিস কেন ? আমি আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছি। তুই বিশ্বাস কর, তুই তখন বললি না। জানিস আমি আজ একটা বিরাট কাজ পেয়েছি। আট বছর পর।
ও আমার দিকে ছল ছল চোখে তাকিয়ে।
কাঁদিস না। তাহলে মনটা খারাপ হয়ে যাবে। আমি কিন্তু তোর কথা রেখেছি।
আমার দু’হাতের আঁজলায় ওর মুখ তুলে ধরলাম। বুড়ো আঙুল দিয়ে ওর চোখ মোছালাম। কপালে একটা চুমু খেলাম।
আমি হরে গেছি বুবুন।
কে বললো তুই হেরেগেছিস! তুই জিতেছিস। দেখ আমি তোর কথা রেখেছি। তারাতারি চলে এসেছি। আর কোথাও বেরই নি। খালি ছবি আঁকছি। অনেকদিন তুলি ধরিনি বুঝলি।
মিত্রা আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
এই দ্যাখো আবার কাঁদে, তুই সুজিতদাকে চিনিস ?
তারপর নিজে নিজেই বলে উঠলাম।
সত্যিতো তুই সুজিতদাকে চিনবি কি করে। আমি তোকে সুজিতদার কথা আগে বলিনি। জানিস সুজিতদা আমাকে একটা বিরাট কাজ দিয়েছে। কততো টাকা দিয়েছে জানিস।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
এমা, এই দ্যাখো আবার বোকার মতো কাঁদে। আমি তোর কথা রেখেছি। এবার তুই নিশ্চই আমার সঙ্গে থাকবি। আমাকে ছেড়ে যাবি না।
মিত্রা আরও জোড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, তুই আর বলিস না।
কেন। আমি কি আবার অন্যায় করলাম ?
তোকে আমি সকালে অনেক খারাপ কথা বলেছি।
কই না! ওগুলো তোর মনের কথা নয়। তখন তুই আমার ওপর রাগ করেছিলি। আমি সত্যি তখন অন্যায় করেছিলাম। তাই তুই বলেছিস। তুই বিশ্বাস কর আমি একটুও রাগ করিনি।
ওকে খাটের কাছে নিয়ে গেলাম।
দেখনা দেখ, আমি এরি মধ্যে কতগুলো ছবি এঁকেছি। কেমন এঁকেছি বল।
মিত্রা ছল ছল চোখে আমার দিকে তাকাল। ভাল।
শুধু ভাল! আর কিছু নয় ?
মিত্রা আমার বুকে ঠোঁট রাখল।
হেসে ফেললাম এইবার বুঝলাম, শুধু ভাল নয়, তার থেকেও যদি কিছু থাকে, তাই।
মিত্রা হেসে ফেললো।
চা খাসনি কেন।
খেয়েছি, ছগনলাল একবার দিয়েছে।
তুই খেয়েছিস!
হ্যাঁ।
তাহলে ওটা কি।
কই দেখি।
আমি চায়ের কাপটা দেখলাম।
যেমন দিয়ে গেছিল তেমন পরে আছে।
তাহলে হয়তো ছগনলাল পরে আর একবার দিয়ে গেছে। এখন আমাকে একটু চা খাওয়াবি।
কটা বাজে জানিস।
কটা ? তুই এখন এলি, নটা বাজে।
মিত্রা আমার মুখে হাত দিল। কিছু খোঁজার চেষ্টা। চোখদুটো জলে টলটল, স্থির।
সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
তোরা অনেকক্ষণ এসেছিস!
হ্যাঁ।
আমাকে ডাকলি না কেন।
তোর সাধনায় ব্যাঘাত ঘটুক কেউ তা চায়নি।
হেসে ফেললাম।
ডাক ডাক সকলকে ডাক।
মিত্রা এগিয়ে গেল।
দাঁড়া দাঁড়া পাজামাটা পরে নিই, টাওয়েল পরা আছে। ওরা আবার কে কি মনে করবে।
ওরা সবাই তোকে এই অবস্থায় দেখে গেছে।
এ-মা, তুই বারন করতে পারলি না।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
আমি তাড়া হুড়ো করে পাজামা পাঞ্জাবীটা পরে নিলাম।
মিত্রা গিয়ে দরজা খুললো। দেবারা সবাই ঘরের মধ্যে এলো। আমি হাসলাম।
তুই এগুলো কি করছিস!
জানিস দেবা আজ হঠাৎ একটা কাজ পেয়ে গেলাম। একটা এ্যাড প্রমোসনের।
তুমি এ্যাড প্রমোসনের কাজ করছো!
হ্যাঁগো টিনা। আগে করেছি কয়েকবার। অনেক দিন পর আবার একটা সুযোগ পেলাম, ছাড়লাম না, লোভ হলো কাজটা করতে, নিয়ে নিলাম।
এই ছবি গুলো তো ড্রেস মেটিরিয়ালের। মিলি বললো।
হ্যাঁ। ওরা প্রথমে ওদের ড্রেস মেটেরিয়াল লঞ্চ করবে। মডেলরা রাম্পে হেঁটে সেই ড্রেস মেটিরিয়াল শো করাবে। আমি খালি এ্যাঙ্গেল গুলো ঠিক করে স্কেচ গুলো ড্র করে দিচ্ছি।
তুমি আগে করেছো কখনো!
অনেকদিন আগে করেছিলাম। তোমাদের মনে আছে কিনা জানি না, একটা চায়ের বিজ্ঞাপনে একটা ক্যাপসান খুব হিট করেছিল, চুমুকে চমক।
হ্যাঁ। মনে আছে।
ওই চায়ের টোটাল প্রোমোশনটা আমি করেছিলাম। সেই থেকে সুজিতদার ব্যাবসার উন্নতি।
সুজিতদা! আস্থা! দেবাশীষ বললো।
হ্যাঁ। তুই চিনিস।
চিনব না মানে!
আমি ধীর পায়ে জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
বাইরেটা অন্ধকার। পাঁচিলের বাইরে মিউনিসিপ্যালিটির লাইট পোস্ট থেকে যে টুকু আলো আসছে তাতেই বাগানটা আলোকিত। আকাশের তারা ফ্যাকাশে।

তখন আমি স্বাধীন সাংবাদিক বুঝলি দেবা। সুজিতদার সঙ্গে আলাপ হলো পার্ক হোটেলের একটা প্রোগ্রামে। দাদা কভার করতে পাঠিয়েছিল। কথায় কথায় বললাম আমাকে কিছু কাজ দিন না। তখন খেতে পাই না। যদি কিছু আসে।
তা বললো তুমি কপিরাইট করতে পারো। বললাম পারি না, তবে দিলে একবার চেষ্টা করবো। উনি দিলেন, পাশ করে গেলাম।
সেই থেকে শুরু। তারপর হৃদ্যতা, এমনকি একদিন সুজিতদার অন্দরমহল পর্যন্ত পৌঁছেগেলাম। অনেকগুলো কাজ করেছি সুজিতদার। মাঝে সুজিতদার সঙ্গে একবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
তবে আস্থা যে তার নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব স্বকীয়তায় এগিয়ে চলেছে তার খোঁজখবর রাখতাম। তোর শ্রেণিকদাকে মনে আছে। রেডিফিউসন যার হাতে তৈরি।
হ্যাঁ। খুব ভালো করে চিনি।
শ্রেণিকদা খুব ভালো স্পোর্টসের ওপর লিখতেন।
উনি স্পোর্টস রিপোর্টার ছিলেন। সুজিতদার মতো শ্রেণিকদার সঙ্গেও আমার আলাপ খেলার মাঠে। তখন শ্রেণিকদারও প্রচুর বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, কপিরাইট, চারলাইনের বিজ্ঞাপণী গান লিখে দিয়েছি। এককথায় বলতে পারিস দেহপসারিণী। যেখানে দুটো পয়সা সেখানেই অনি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
জানিস দেবা, আজ সকালে মিত্রার কয়েকটা কথায় মনটা খুব খারাপ লাগলো। এতে মিত্রার কনো দোষ নেই। দোষ সম্পূর্ণ আমার। তোরা সবাই চলে যাবার পর, নিজের সঙ্গে নিজে কিছুক্ষণ যুদ্ধ করলাম। একবার ভাবলাম গঙ্গার ধারে আমার পুরনো ঠেকায় চলে যাই। কিছুক্ষণ জলে ভেসে চলে আসবো। তারপর নিজের মনে খুঁজতে শুরু করলাম আমার পুরনো ভালোবাসার লোকজন কে আছে, যার কাছে গিয়ে আমি দু’দন্ড শান্তি পাব। এক কথায় বলতে পারিস ব্রেক।
ট্র্যাংগুলার পার্ক থেকে বাসে উঠলাম। কোথায় নামবো জানি না। পার্ক স্ট্রীটে এসে ভাবলাম এখানে নেমে পরি। বাস থেকে নামলাম। একবার ভাবলাম মিত্রার ক্লাবে যাই। ওখানে আমার এক পুরনো বন্ধু আছে। তারপর ভাবলাম না, তাতে মিত্রার সম্মানহানি হতে পারে। আফটার অল আমি মিত্রার একজন পার্টনার। তারপরই সুজিতদার মুখটা ভেসে উঠলো। অনেকদিন সুজিতদার সঙ্গে দেখা হয় নি। গেলে চিন্তে পারবে কি ? তবু গেলাম। সত্যি কথা বলতে কি সুজিতদার কাছে কিছু টাকা চাইতে গেছিলাম। ওই মুহূর্তে আমার কিছু টাকার দরকার ছিল।
একটু থামলাম।
নিশ্চিত তুই মনে মনে হাসছিস। অনি তোর আবার টাকার দরকার, তার জন্য সুজিতদা! হ্যাঁ দেবা, আমার হাতের মুঠোয় রাজ্য এবং রাজকন্যা। আমার আবার কিসের টাকার দরকার ? আচ্ছা বলতো দেবা, আমি এখনো পর্যন্ত যা পেয়েছি, যা করেছি তার একটা পয়সাও আমার ?
সুজিতদাকে মনের কথাটা বলেছিলাম। সুজিতদা থাপ্পর মারতে এলো। এটাই স্বাভাবিক। অনেকটা তোর মনে মনে হাসির মতো। আমি সুজিতদাকে আমার মনটা খুলে দেখাতে পারি নি।
তারপর গঙ্গাদিয়ে অনেক জল গরাল। আলটিমেট সুজিতদা কাজটা আমাকে অফার করলো। ভালো টাকা দেবে বললো, লোভ সামলাতে পারলাম না।
ফিরে তাকালাম ওদের দিকে, হয়তো চোখ দিয়ে দু’এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এসেছিল। ডান হাতের তালু দিয়ে তা মুছলাম।
সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। মিত্রাকে দেখতে পেলাম না।
জানিস আমর এসব কিছুই ছিলো না। সুজিতদা কিনে দিয়ে গেল।
আদিতি আমার কাছে এগিয় এসে বললো, তুমি এতো ভালো স্কেচ করতে পার!
এগুলো আর ভালো কোথায়, মনের ভাবটা প্রকাশ করার চেষ্টা করছি। বাকিটা ওরা করে নেবে।
টিনার দিকে তাকালাম।
টিনা তোমাদের জন্য একটা সুখবর আছে।
আমাদের জন্য!
হ্যাঁ। ওই ফাইলটা দাও।
আমরা দেখেছি।
তোমরা দেখেছো! কখন ?
তখন তুমি একমনে স্কেচ করছিলে।
এ-মা আমাকে ডাকো নি কেন ?
কিভাবে সাধনা করতে হয় তোমার কাছ থেকে শিখছিলাম। বড়মা বললো ওকে দেখে তোরা শেখ। এখন বিরক্ত করিস না, ওর সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে। টিনা বললো।
বোকা বোকা কথা।
ওরা কেমন ভাবে যেন আমার দিকে তাকাল।
জানো মিঃ নেওটিয়া কাজটা অন্য একটা এজেন্সীকে দিতে চেয়েছিলেন। ভাগ্যিস আমি আজ সুজিতদার কাছে গেছিলাম। সুজিতদা আমার সঙ্গে ওনার আলাপ করিয়ে দেবার পর উনি একেবারে গদ গদ হয়ে পরলেন, আফটার অল কাগজের মালিক বলে কথা। ওনার প্রোডাক্টগুলো শোনার পর, আমি ওনাকে ব্যাপারটা আমার দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে বোঝালাম। উনি আমার কনসেপট এ্যাকসেপ্ট করলেন। সুজিতদাকে দিয়ে প্রমিস করালেন অনিবাবু যদি নিজে দায়িত্বে কাজটা করেন, তাহলে উনি কাজটা দিতে পারেন। সেই সময় সুজিতদার সেই চোখের চাহুনি আমি এড়িয়ে যেতে পারলাম না। সম্মতি দিলাম। উনি সুজিতদাকে কাজটা দিলেন।
দাদা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল পেছন পেছন সবাই।
আমি ছুটে গিয়ে দাদাকে প্রণাম করলাম। হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেলাম।
জানো দাদা আজ অনি হঠাৎ অনেক টাকা রোজগার করে ফেলেছে।
দাদা হাসল, অনেক টাকা!
দেখো দেখো নিচের ব্যাগে টাকা আছে, এই দেখো চেক।
তোর তো টাকার দরকার নেই, কি করবি এগুলো।
আমি মিত্রাকে সব দিয়ে দিয়েছি। বলেছি, এটা তোর।
দাদা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
সকাল বেলা মিত্রা কি বললো যানো, ও আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না। গলাটা ধরে এলো।
তাই বুঝি।
হ্যাঁগো। মনটা খুব খারপ হয়ে গেল। ভাবলাম কিছু একটা করতে হবে, কাজটা নিয়ে নিলাম। বলো ঠিক করিনি ?
দেখলাম দাদার চোখটা ছল ছল করছে।
এ-মা তোমার চোখেও জল।
ছোটমা বড়মার দিকে তাকালাম।
ধ্যুস, বুঝেছি আমি কাজটা নিয়েছি তোমাদের কারুর পছন্দ নয়। কালকে সুজিতদাকে ফেরত দিয়ে দেব।
দাদা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
বড়মা ছোটমার কাছে গেলাম, কিগো তোমরাও আমার এই কাজটাকে অপছন্দ করছো ?
ডাক্তারদাদা এগিয়ে এলো, তুই ছবি আঁক, আমরা পরে আসবো।
না ডাক্তারদাদা, এখন আর ছবি আঁকা হবে না।
কেন ?
ব্রেক হয়ে গেল।
তাহলে নিচে চল।
যাও, আমি যাচ্ছি।
ওরা সবাই আস্তে আস্তে চলে গেল। শুধু মিত্রা দাঁড়িয়ে রইলো। আমি ড্রইংগুলো একজায়গায় পর পর সাজিয়ে রাখলাম। নিজের আঁকা স্কেচ গুলো বেশ দেখতে লাগছে। মিত্রা এগিয়ে এলো, আমাকে সাহায্য করলো। আমার দিকে তাকাচ্ছে আর মিটি মিটি হাসছে।
তোর ছবিগুলো ভালো লাগেনি।
ও আমাকে জড়য়ি ধরলো।
তোর এই গুণটা আছে, আগে জানতাম না।
তোর ভালো লেগেছে।
হাঁ।
ব্যাশ, তাহলে আমি এই পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে দেব।
পারবি।
আলবাত পারব।
তোর জন্য একটা জিনিষ নিয়ে এসেছি।
কিরে ?
একটা কথা দে।
বল।
কালকে আমি তোকে যেভাবে দেখতে চাইবো তুই সেই ভাবে আমাকে দেখাবি, বলতে পারিস আমার স্বপ্ন। তোর যেমন কিছু কিছু স্বপ্ন আছে, আমারও আছে। আমি তোকে কালকে দু’চোখ ভরে দেখতে চাই।
ধ্যুস আমি কি পুতুল, তুই পুতুল খেলবি।
ধরনা কালকের দিনটা আমি পুতুল খেলব।
সে দেখা যাবে।
দেখা যাবে কেন ?
আমি মিত্রার গালটা একটু টিপে দিলাম।
আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তাই হবে। খিদে পেয়েছে।
নিচে চল।
জানিস মিত্রা একটা অন্যায় করে ফেলেছি।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
কি অন্যায় করেছিস।
তোকে না জানিয়ে সুজিতদার সঙ্গে ছ’মাসের এগ্রিমেন্ট সাইন করে ফেলেছি।
বেশ করেছিস।
তুই রাগ করলি না।
তোর ওপর রাগ করে নিজেই বেশি কষ্ট পাই। দেখলাম চেকও নিয়ে এসেছিস।
বাকিটা আগামী বুধবার দিয়ে দেবে। পরিষ্কার বলে দিয়েছি হান্ড্রেড পার্সেন্ট এ্যাডভান্স।
নিচে চল, খিদে পেয়েছে বললি। সকাল থেকে কি খেলি।
ছেঁড়া পরটা ঘুগনি, কয়েকটা জিলিপি।
মিত্রা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
তোর কথা মনে পরে নি।
মিত্রা হাসলো।
কোথায় খেলি ?
সুজিতদার ওখানে।
সুজিতদা খাওয়ালো না তুই খেতে চাইলি।
হেসে ফেললাম।
চল।
দাঁড়া তুলি গুলো একটু ধুয়ে নিই।
তুই বালতি নিয়ে কি করছিলি।
কাগজগুলো জলে চোবালাম।
হ্যান্ডমেড পেপারগুলো জলে চুবিয়ে ছবি আঁকছিলি!
হ্যাঁরে, কালার গুলো তাতে দারুণ খোলে।
টাকা গুলো কি করবি।
ওটা তোর, তোকে তো কিছু দিতে পারিনি কোন দিন।
আমি নিয়ে কি করবো। আমার অনেক টাকা। এটা তোর পরিশ্রমের টাকা।
মিত্রা আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে। আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। মাথা নীচু করে নিলাম। স্বগোতক্তির সুরে বললাম।
ধার শোধ করবি।
তার জন্য তুই বিজ্ঞাপন এনে দিয়েছিস।
তোর যা খুশি করিস, ভাবতে ভালো লাগছে না।
এখনো ওই বিজ্ঞাপনের সিকোয়েন্স গুলো তোর মাথায় খালি ঘুরপাক খাচ্ছে, তাই না ?
হেসে ফেললাম।
ডাক্তারদাদা ঠিক কথা বলেছে, ও এখন আর ওর মধ্যে নেই, তোমরা কোন প্রশ্ন করলে ঠিক ঠিক জবাব পাবে না।
কেন আমি কি কোন অসংলগ্ন কথা বলছি ?
বলছিস না, বলা হয়ে যাচ্ছে।
কি খুচুর খুচুর করছিস দু’জনে, নিচে চল।
ছোটমার গলা, দারজার মুখে দাঁড়িয়ে, আমি ছোটমার দিকে তাকালাম।
বুঝলে ছোটমা, গর্ধভটাকে নিয়ে চলা বড় কষ্ট, একটু মেরামত করার চেষ্টা করছি। মিত্রা বললো।
কি মনে হচ্ছে, পারবি ?
হাল ছাড়িনি, ছাড়বও না।
দেখ চেষ্টা করে, আমি দিদি হাল ছেড়ে দিয়েছি।
আমি একবার ছোটমা একবার মিত্রার মুখের দিকে তাকাই। কি বলছে ঠিক এই মুহূর্তে মগজে ঢুকছে না। মিত্রা ঠিক বলেছে। এ্যাডের সিকোয়েন্সগুলো এখনো মাথায় রিনিঝিনি তালে সুর রচনা করে চলেছে।

বুঝেছি, তোর এখন মাথায় কিছু ঢুকবে না। তুই এখন সব কিছুর মধ্যে রাম্প দেখছিস, মডেলদের ড্রেস মেটিরিয়াল দেখছিস।
চলো ছোটমা। খিদে লেগেছে।
মিত্রা মুখ টিপে হাসল।
আমি ছোটমাকে টেনে নিয়ে নিচে চলে এলাম। দেখলাম সোফায় বসে সবাই গল্প করছে। দেবা অদিতি নির্মাল্যকে দেখতে পেলাম না। বড়মাকে দেখলাম রান্নাঘরে। এগিয়ে গেলাম। পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বড়মা আমার মুখের দিকে তাকাল।
খিদে পেয়েছে।
তোর কাজ শেষ হলো।
কই হলো, ওরা চলে এলো।
দুপুরে কোথায় গেছিলি ?
তুমি জানো না!
না।
পরে বোলবো।
কিরে তুই যে দেখবি বললি। মিত্রা এসে রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়াল।
কি বলতো ?
আমরা যা নিয়ে এলাম।
চল। দাঁড়া টিনাকে একটা কথা বলে নিই।
বড়মার ঘরে চল আগে।
তাই চল।
আমি মিত্রার পেছন পেছন বড়মার ঘরে এলাম। বড়মার খাটের ওপর ডাঁই করা কাপর জামার প্যাকেট। আমি দেখে কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম।
এতো জামা কাপড়! কার ?
তোর আছে, আমার আছে, সবার আছে। মিত্রা বললো।
এতো কি হবে ?
দরকার আছে। মিত্রা আমার দিকে দুষ্টুমি চোখে তাকিয়ে। মিটি মিটি হাসছে।
তুই দুপুর বেলা ওই প্যান্ট গেঞ্জিটা পরে বেরিয়েছিলি কেন। তোর আর জামা প্যান্ট নেই।
কি জানি, ভালো লাগলো, পরে নিলাম।
ওই জামা প্যান্ট পরলে অনিকে ঠিক অনির মতো লাগে তাই না।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
অন্য জামা প্যান্ট পরলে অনিকে বড্ডবেশি চক চকে মনে হয়।
তুই আমায় দেখেছিস!
মিত্রার স্থির চোখ আমার মুখে, হাসি হাসি চোখ দুটোয় না বলা অনেক কথা।
তুই একটা ভিখিরীর সঙ্গে এ্যাশিয়াটিক সোসাইটির সিঁড়িতে বসে কথা বলছিলি।
ও ভিখারী নয়।
আমার গলার স্বরটা হঠাৎ কর্কশ হয়ে গেল। মিত্রা চমকে আমার দিকে তাকাল।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গেলাম। দেখলাম টিনা মিলি ছোটমা বড়মা ঘরের দরজা আটকে দাঁড়িয়ে।
টিনা। তোমায় কেউ ফোন করেছিল।
না অনিদা।
তোমায় একজন ফোন করতে পারে। ওদের একটা এ্যাড সানডের পেজে যাওয়ার কথা। চম্পকদা তোমার কথা বলেছে, তোমার পার্মিসন ছাড়া এ্যাডটা যাবে না।
ওরা আমার গলার স্বরে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আমার পার্মিসন ছাড়া এ্যাড যাবে না!
সেই রকমই বলা হয়েছে অফিস থেকে।
আমি এরকম কথা কখনো বলিনি অনিদা। টিনা বললো।
চম্পকদার সঙ্গে ওর দেখাই হয়নি কাল থেকে। মিত্রা বললো।
মিত্রার দিকে ঘুরে তাকালাম।
তাহলে বুঝতে পারছিস।
পারছি।
তুই ওদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে সাইন করে দিয়েছিস।
হ্যাঁ।
টিনার দিকে ঘুরলাম।
কাল তুমি চম্পকদাকে ফোন করবে। বলেদেবে আস্থা থেকে যে এ্যাডটা গেছে, ওটা রবিবার ছাপা হবে। যখন কথা বলবে তখন গলার ভলুমটা যেন হুইপের ঢঙে থাকে। মাথায় রাখবে তোমাদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা চম্পকদার মতো যারা আমাদের অফিসে আছেন, তাদের বস হিসাবে দেওয়া।
টিনা মাথা নীচু করলো।
তোমরা তোমাদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কি লেখা আছে পরেছো।
না।
কেন! না পরেই এক কপি সই করে দিয়েছ।
তুমি আছো।
চিরটা কাল নয়।
টিনা মিলি আমার মুখের দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকাল।
তুমি অদিতি মিলি এখন থেকে এ্যাডের পার্টটা একটু একটু করে দেখতে শুরু করো। দেখবে, তোমাদের সাবতাচ করার মতো লোক ওখানে অনেক পাবে। সব বাস্তু ঘুঘু। সবার সঙ্গে কথা বলে লোক চেন। একটু কিছু গন্ধ পেলে আমাকে জানাবে। আজ আমি আগামী ছয় মাসের একটা এ্যাডকেম্পেন নিয়ে এসেছি, ফাইলটা ওপরে আছে, পারলে দেখ নাও।
দেখেছি।
তোমরা কখন এলে, কখন আমার ঘরে ঢুকলে, কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিছু বললেই, বলো দেখেছি।
তুই কি তখন তোর মধ্যে ছিলি। বড়মা বললো।
তাহলে কোথায় ছিলাম, আকাশে ডানা মেলে উড়ছিলাম।
তাই হবে। সকলে তোর ঘরে গেল এটা ওটা দেখল, তুই কিছুই জানলি না।
হবে হয়তো।
টিনার দিকে তাকালম।
আগামী এক সপ্তাহ তোমাদের আমি সময় দিতে পারব না। অসুবিধা হলে ফোন করবে।
আচ্ছা।
বড়মা জায়গা হয়েছে।
হ্যাঁ।
এগুলো দেখবি না। মিত্রা বললো।
আগে খেয়ে নিই, তারপর।
বেরিয়ে এলাম। খাবার টেবিলে না বসে সোফাতে দাদা আর মল্লিকদার মাঝখানে বসলাম। অপরজিটের সোফায় ডাক্তারদাদা বসে।
কিরে, অশান্ত মন শান্ত হলো।
ডাক্তারদাদার দিকে তাকালাম। মাথা নীচু করলাম।
হাসলাম।
তোকে কিন্তু আজকে দারুণ দেখাচ্ছিল। ভাবলাম একবার গাড়ি থেকে নেমে যাই।
কোথায় দেখলে ?
এ্যাসিয়াটিক সোসাইটির তলায়।
নামতে পারতে।
তুই তখন আমাকে পাত্তাই দিতিস না।
কেন।
তাহলে ওই ভিক্ষারী বেশী ভদ্রলোক উঠে চলে যেত।
হাসলাম।
আমি এদের তখনই বলেছি। ও ভিক্ষারী নয়, ও নিশ্চই অনির পরিচিত।
কি করে বুঝলে ?
তোর কথা বলার ধরণ দেখে। লোকে জানছে তুই একটা আধ পাগলা, কিন্তু আসলে তা নয়।
সত্যি বুবুন ও ভিক্ষারী নয়! মিত্রা আব্দারের ঢঙে বললো।
কেন।
ডাক্তারদাদার সঙ্গে আমারা চ্যালেঞ্জ করেছি।
তাহলে হেরে গেছিস।
ও ভিক্ষারী নয়!
না। ও একজন আইবির সিনিয়ার অফিসার। নাম সুমন চৌধুরি।
ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খাচ্ছিল!
প্রয়োজনে আরও অনেক কিছু ওরা করে।
কি বলছিস তুই!
ঠিক বলছি। ভেক না ধরলে ভিক্ষা পাওয়া যায় না।
সবাই চুপ। মুখ দিয়ে কারুর কোন কথা বেরচ্ছে না।
ওদের ইনফর্মেসনের ওপর তোরা বেঁচে আছিস। না হলে অনেকদিন আগে মরে হেজে যেতিস।
বড়মার দিকে তাকালাম। খেতে দাও।
ছোট জায়গাটা করে ফেল, ও অনেক্ষণ থেকে খেতে চাইছে।
ঘরে পা দিয়েই দেখলাম বিছানায় নতুন চাদর পাতা। বালিশের ওয়ারগুলোও নতুন লাগান হয়েছে। বেশ ভালো লাগলো দেখে। চাদরের কালারটা এতো সুন্দর, মন ভরে গেল। কিছুতেই বিছানায় শুতে ইচ্ছে করছে না। টান টান করে পাতা চাদরটার দিকে এক দৃষ্টে তাকালাম। বুক থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
কাকা স্কুলফাইন্যাল পাশ করার পর একটা বেড কভার কিনে দিয়েছিল। মনে পরে না কয়দিন ওই বেড কভারে শুয়েছি।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে মানিপার্টসটা থেকে আলমাড়ির চাবিটা নিলাম। জামাকাপড়ের পেছন থেকে পুরনো এ্যালবামটা বার করলাম। কাকা কলকাতায় আসার সময় এ্যালবামটা দিয়েছিল। এতে আমার বাবা মা আমার কিছু ছবি আছে।
এই এ্যালবামে এবাড়ির কারুর হাত এখনো পরে নি। সেদিন ফ্ল্যাট থেকে এটা নিয়ে এসেছিলাম।
পাতা উল্টে প্রথম ছবিটার দিকে তাকালাম। বাবা মা একসঙ্গে, মায়ের কোলে আমি। এই একটা ছবি আমি বহুবার দেখেছি। তখন আমার বয়স আঠারো মাস। বাবা কলকাতায় এসেছিলেন স্কুলের কাজে। আমাকে মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। স্টুডিওতে তুলেছিলেন। মার খুব গঙ্গায় স্নান করার শখ হয়েছিল। পেছন দিকে স্টুডিওর স্ট্যাম্পটা এখনো রয়েছে। আলো স্টুডিও। এই এ্যাড্রেস ধরে ওখানে গেছি। স্টুডিও খুঁজে পাইনি তার জায়গায় একটা খাবার দোকান পেয়েছি। লোককে জিজ্ঞাসা করতে বলেছে, যিনি ছবি তুলতেন সেই ভদ্রলোক মারা যেতে তার ছেলেরা দোকান বিক্রি করে দিয়েছে।
চোখ বন্ধ করে বহুবার আমার এই আঠেরো মাস বয়সে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। বহুবার মায়ের কোলে বসে থাকার অনুভূতি পাবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। ছবিটা দেখলেই বুকটা ভীষণ টন টন করে, তাই দেখি না।
আজ হঠাৎ কেন দেখার ইচ্ছে হলো ?
প্রশ্ন করে কনো উত্তর পেলাম না। একবার আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম, একবার ছবির দিকে তাকিয়ে আমার মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মায়ের মুখের আদল আমার মুখশ্রীর সঙ্গে কিছুটা মেলে।
জানো মা তোমার ছেলের আজ অনেক পয়সা। অনেক ক্ষমতা তার। লোকে ফিস ফাস করে। বলে রবিনহুড। একচ্যুয়েলি ওরা আমার মতো এতো ভ্যারাইটি লাইফ লিড করে নি। নিজের বলতে তার কিছু নেই। শুধু বিদ্যেটুকু ছাড়া। এই পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয় আজও পর্যন্ত কাউকে পাই নি। তোমরা তার ক্লুও কোনদিন রেখে যাও নি, যে খুঁজে বার করবো। তবে এখনো আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষের একটা শেকড় আছে। শুধু আমার নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কলমকরা গাছ। ওই গাছ থেকে কেটে ঘষে মেজে এই গাছে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
বড়মা ছোটমা আমার জন্য যথেষ্ট করে। আমি তাদের ঋণ আমৃত্যু শোধ করতে পারব না। এখন মাঝে মাঝে ভীষণ ভাবে তোমার কথা অনুভব করি। মিত্রা আমার মধ্যে অনেক কিছু দেখতে চায় বুঝলে মা। কিন্তু ওকে আমি কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারিনা, না পেতে পেতে আমার মনের সব আনন্দ গুলো শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। সেখানে এক সমুদ্র জলটাও নস্যি।
আমি জানি মা ওরও অনেক স্বপ্ন আছে। আমি যেমন ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি ও নিশ্চই আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। আজকে ও অনেক কথা আমাকে বলেছে। যার একটা কথারও আমি উত্তর দিইনি। কেন যানো ? ও অবুঝপনা করবে। বড়মা ছোটমা ওর দলে। ওরা আমার জীবনের ছটা বছর দেখেছে। কিন্তু বাকি বাইশটা বছর কি ভাবে কি পরিবেশে আমি বড়ো হয়ে উঠেছি, সেটা ওরা দেখে নি। ওরা আমার মুখ থেকে শুনেছে কিন্তু সেটাই সব নয়। সেই বাইশটা বছরের একটা প্রভাব আমার ওপর থাকবেই। কি করে বোঝাই ওদের বলো। বড়ো যন্ত্রণা।

জান মা, মিত্রা আজ ওর মনের মতো করে জামাকাপড় কিনে এনেছে। কালকে আমাকে সাজাবে। পীরবাবার থানের মাটি ওর কপালে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। তোমার গলার চেনটা ওকে দিয়েছি। তোমার সিঁদুর কৌটটা ওকে দিয়েছি। তাতেও মনে হয় ও পরিতৃপ্ত হতে পারে নি।
আজ একগাদা জামা কাপড় কিনে এনেছে। তিনদিন ধরে আমাকে সাজাবে। আমি ওকে বাধা দেব না। ওরও কিছু কিছু শখ আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা কি জানো মা ও স্থূলো সুখে সুখী।
মা, জান আমি ওকে ভীষণ ভীষণ ভালবাসি।
তোমাকে দেখিনি, চোখ বুঁজে তোমার অনুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করি। আর মিত্রা আমার শয়নে স্বপনে আমার শরীরের প্রতিটা তন্তুতে মিশে আছে। ও কষ্ট পেলে আমি ভীষণ কষ্ট পাই। আমি কাঁদতে ভুলে গেছি কোন জন্মে। খুব কষ্ট পেলে দু’এক ফোঁটা জল এমনি বেরিয়ে আসে। মিত্রা এখনো কাঁদতে ভালবাসে। ওর সঙ্গে আমার অনেক পার্থক্য তবু কোথায় যেন ওর সঙ্গে আমার একটা মিল আছে। দুজনেই মাতৃ পিতৃ হারা সন্তান।
কেউ আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। তার নরম হাতের বন্ধনে আমি ধ্যানভ্রষ্ট হলাম। এ্যালবামটা বন্ধ করে হাতের অর্গল খুললাম, বুঝলাম মিত্রা। টেবিলে এ্যালবামটা রেখে মুখো মুখি দাঁড়ালাম। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
তুই কাঁদছিস!
হাসলাম। না।
তোর চোখে জল!
এমনি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি।
আজা সারাদিন তোর চোখে দু’বার জল দেখলাম। আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা!
না।
তাহলে ?
তোর সব প্রশ্নের উত্তর এইভাবে দিতে পারব না। কিছু প্রশ্নের উত্তর কাজের মাধ্যেম দেব। কিছু অনুভূতি দিয়ে বুঝতে হবে।
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। চোখের মনি স্থির, কিছু বোঝার চেষ্টা করছে।
এই এ্যালবামটা কোনদিন আমাকে দেখাস নি ?
ফ্ল্যাটে ছিল, কয়েকদিন আগে নিয়ে এসেছি।
মা বাবার সঙ্গে তুই।
হ্যাঁ।
তখন তুই ভীষণ কিউট দেখতেছিলি।
তুই দেখেছিস।
অনেকক্ষণ ধরে দেখেছি। তুই তোর মধ্যে ছিলি না।
মাঝে মাঝে আমার এমন হয়।
মাঝে মাঝে না প্রায়ই হচ্ছে।
আমি চুপ করে থাকলাম।
তখন তুই দেবাদের তোর কষ্টের কথা বলেছিস, দাদাকেও বললি।
বলতে চাই নি, বলা হয়েগেল। কেন জানি না।
আমি তোকে সকালে খুব কষ্ট দিয়েছি।
হয়তো ওটা আমার প্রয়োজন ছিল। সত্যি তোর স্বপ্নের দিকটা আমি কখনো ভাবিনি।
সকালবেলা তুই সবচেয়ে বেশি অপমানিত বোধ করেছিস, ফাইলটা তোর মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াতে।
না।
তুই না বললে হবে কি করে। আমি তখন তোর চোখ দেখেছি।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তোকে কষ্ট দিলে আমিও কষ্ট পাই বুবুন। কেন তুই অমন করিস।
তুইতো ইচ্ছে করে দিতে চাস না। কখনো সখনো হয়ে যায়।
তখন যে আমার কি হলো। কেন তুই তোর আমার ভাগ করিস। আমি তো পারি না।
চুপ করে থাকলাম।
ডাক্তারদাদাকে বলেছিলাম।
কি বললো ডাক্তারদাদা।
ডাক্তারদাদা হাসল।
আচ্ছা বুবুন তোর কি মনে হয় আমি তোকে ভালবাসিনা।
আমি ওর মুখটা চেপে ধরলাম।
ও কথা বলতে নেই।
বলনা আমার জানার দরকার আছে।
কেন তোর মনের মধ্যে এই প্রশ্নটা এলো।
আজ সারাদিন অনেকে অনেক ভাবে তোকে নিয়ে আলোচনা করলো। তাতে আমার হঠাৎ মনে হলো আমার দিক থেকে মনে হয় কিছু খামতি থেকে যাচ্ছে।
ভুল কথা। তুইই একমাত্র আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন।
আমি মিত্রাকে বুকের কাছে টেনে নিলাম।
আমি তোর কাছ থেকে ডিমান্ড করি। তুই কখনো আমার কাছে কোন ডিমান্ড করিসনা।
কে বললো করিনা, সকাল বেলা তোর কাছ থেকে টাকা চাইলাম।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। চোখের পলক পরছে না।
তুই কি শুধু আমার থেকে টাকা চাস।
তোর কি তাই মনে হয়।
আমি তোকে জিজ্ঞাসা করছি।
ওটা ওই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল। আমার থাকলে তোকে চাইতাম না।
কে বললো তোর নেই।
মাথা নীচু করলাম।
এই দেখ এখনো তোর মধ্যে আমাকে গ্রহণ করা নিয়ে সংকোচ বোধ রয়েছে।
তুই বিশ্বাস কর।
তুই আমাকে গ্রহণ করতে পারছিস, আর আমার টাকা নিতে পারবি না।
আমি মিত্রাকে জড়িয়ে ধরলাম।
বিশ্বাস কর মিত্রা ওটা পুরুষের অহম বোধের জায়গা। তোকে কি করে বোঝাই।
সেই জন্য বিগত ছয়মাস তুই সেলারি নিয়েছিস। তোর ডিরেক্টর শিপের রেমুনারেসন রিফিউজ করেছিস।
তোকে কে বললো।
হিমাংশু। কেন তুই নিস নি ?
তুই আমাকে ক্ষমা কর।
কিসের ক্ষমা। আমি যদি তোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। তুই যদি মনে নিতে পারিস, আর আমি যদি আমার ব্যবসার অংশীদার তোকে করতে চাই তাহলে তুই মনে নিবিনা কেন। আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, তুই এটা করতে পারতিস।
আমি মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তুই একা একা গুমড়ে মরবি, আমি ফুর্তি করবো তা হয়না। আজ না হোক কাল সকলে আমাকে কাঠ গোড়ায় দাঁড় করাবে। আমি তখন স্বার্থপর, তুই তখন মহান।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে মিত্রার কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়েছি।
তোকে বলতে হবে বুবুন। আমার দিকে তাকা।
আমি মিত্রার কাঁধ থেকে মুখ তুললাম।
বল, কি জানতে চাস।
কেন তুই রিফিউজ করছিস।
তুই তখন বললি না, আমি মহান হতে চাইছি তুই স্বার্থপর। বলতো আমাকে, তোর কাগজের মালিকনা স্বত্ব গ্রহণ করার এক কনাকড়ি গুণ আমার আছে।
কে বললো নেই। অনেকের থেকে বরং বেশি আছে।
তুই আমাকে অন্ধের মতো ভালবাসিস তাই বলছিস। লোকে তা বলে না। বলে কি আমি তোর ভালবাসার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছি।
কে কি বললো তাতে কি এসে যায়।
আসে মিত্রা আসে। তুই মানুষের খোলা মুখ চলা পথ সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিলেও আটকাতে পারবি না। আমরা তথাকথিত সামাজিক জীব। আধুনিকতা আমাদের শরীরে, মনে নয়। এতদিন আমরা একসঙ্গে থেকেছি লোকে বলেছে লিভ টু গেদার। বিদেশে এ ব্যাপারটার কোন গুরুত্ব নেই, ওখানে লিভ টু গেদার করতে করতে সন্তান এসে গেলে কারও যায় আসে না।
সেই সন্তান বহাল তবিয়েতে বড়ো হয়। এখানে কোন সন্তানের জন্ম হলে প্রথমে তার পিতৃ পরিচয়ের দরকার হয়। তবে বার্থ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কেন, তোর নিকট আত্মীয় বলেনি তোকে ফুসলিয়ে নিয়ে চলে গেছি। তুই তো নিজের কানে শুনেছিস সেই কথা। আমাদের সমাজটা বড় জটিল, বুঝেছিস।
আমি মিত্রার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
কালকে যে কাজটা তোর সঙ্গে করতে যাচ্ছি, সেটা সামাজিক দায়বদ্ধতা মেটাতে, পাশাপাশি তোর সঙ্গে আমার যে একটা রিলেসন তৈরি হয়েছে সেটা দশজনকে বোঝাতে। বলতে পারিস একটা সরকারী শিলমোহর।
মিত্রা আমার মুখে হাত বলাচ্ছে।
তুই যতটুকু কর্পোরেট লাইভ লিড করেছিস আমি তার এক তিলার্ধও এখনো পর্যন্ত করিনি। কেন জানিষ ? পকেটের রেস্তো কোনদিন ছিল না। আমাকে তুই তোর কাগজের মালিক বানিয়ে দিয়েছিস। কর্পোরেট লাইফের কেতা শিখতে আমার এখনো এক বছর লাগবে। তাই আমাকে দেখবি আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই।
মিত্রার একটা হাত আমার পাঞ্জাবীর ভেতর দিয়ে আমার বুকে।
টিনারা যেটুকু কর্পোরেট লাইফ লিড করেছে আমি সেটুকুও করিনি। একদিন তাজে বসেই আমি ব্যাপারাটা ধরে ফেলেছিলাম। ওটা একটা আলাদা জগৎ। আমি কোনদিন এ্যাবজর্ভ করতে পারব না। যদিও বা পাড়ি মাঝে মাঝে পা হড়কে পরে যাব। এখন যেটুকু করছি মনে রাখবি আমার পরিচিত লেভেলে। তাদের প্রতি আমার জোড় আছে। এটা বেশিদিন চলতে পারে না। দেখবি আমি খুব ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি।
আমি মিত্রার কপালে চুমু খেলাম।
আমাদের মানসিক মিলন হয়ে গেছে সেদিন, যেদিন পীরসাহেবের থানে তোর গলায় মায়ের গলার চেনটা পরিয়ে দিয়েছিলাম। ভূমি থেকে মাটি তুলে তোর সিঁথিতে লেপে দিয়েছিলাম। আগামীকালের থেকে সেই দিনের মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি। তোর কোন কিছুকে আমি অস্বীকার করিনি, করবও না কোনদিন। কিন্তু কি জানিষ, তুই আমার জীবনের আট বছর দেখেছিস বাকি কুড়ি বছর দেখিস নি। আমিও তোর জীবনের আট বছর দেখেছি বাকি কুড়ি বছর এর তার কাছ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি, অনুভব করেছি তোর কষ্টটা, তাই আমি হিংস্র হয়ে উঠেছি। যে মেয়েটা ফুলের মতো বাঁচতে পারত, লোভের আগুনে সেই ফুলের পাঁপড়ি গুলো ছেঁড়ার অধিকার কে দিয়েছে ওদের।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
তোকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমাকে নিয়েও তোর অনেক স্বপ্ন থাকতে পারে। আমি অস্বীকার করছি না। তুই একভাবে মানুষ হয়েছিস। আমি আর এক ভাবে মানুষ হয়েছি। আমার জীবনবোধ আর তোর জীবনবোধের মধ্যে অনেক পার্থক্য। তোকে এগুলো অনুভূতি দিয়ে বুঝতে হবে। তোকে একটা ছোট্ট কথা বলবো মন খারাপ করবি না।
বল।
আমি ভুল কি ঠিক জানিনা তবে আমার কথাটা খারাপ লেগেছিল। হয়তো সেই থেকেই বেশ কিছু কথা চাপান উতোরে বেরিয়ে এলো। হয়তো এটা ভালো, হয়তো এটা খারাপ। তুই হয়তো না ভেবেই বলেছিস। আমি কথাটা অন্য ভাবে ধরেছি। পরে নিজের সঙ্গে নিজে সারাদিন যুদ্ধ করলাম। এই মুহূর্তে তোকে বুকে জড়িয়ে ধরেও সমানে যুদ্ধ করছি বলতে পারিস।
কি কথা বল।
তোকে তখন টাকাটা চাইতে তুই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলি।
আমাকে বলেছিলি, কেন!
অনিমেষদার নামটা শুনে তুই আরও ঘাবড়ে গেছিলি। তুই বিশ্বাস করতে পারিস নি অনিমেষদা আমার কাছে টাকা চাইতে পারে।
তুই বিশ্বাস কর বুবুন। আমি সেই ভেবে বলিনি।
আমি কথাটা বলার আগে তোর অনুমতি চেয়ে নিয়েছি। আমি কিন্তু বলেছি তুই হয়তো সেই ভেবে বলিস নি, আমি ভেবে নিয়েছি।
কেন তুই ভাবলি।
এটা একটা দামী কথা।
বলতে পারিস এই সমস্যাটা আমার আছে। ছোট থেকে স্নেহ ভালবাসা কি জিনিষ জানি না। অনেক দিন গেছে, আমার কোন কাজে কাকা কাকীমা রাগ করে আমাকে খেতে দেয়নি। আমি চিকনার বাড়িতে গিয়ে দুটো পান্তা খেয়ে স্কুলে গেছি।
হয়তো সেই দিনটা বাড়ি ফিরি নি। চিকনার বাড়িতেই কাটিয়ে দিয়েছি। কখনো কখনো বাসুদের বাড়িতে থেকেছি। কাকা কাকীমা কেউ আমার খোঁজ নেয় নি। আমি কেমন আছি কি খাচ্ছি। তারপর হয়তো পাড়া প্রতিবেশীর চাপে কাকা মেনে নিয়েছে।
তুই আমার প্রথম ভালবাসা। আমি তোকে অন্ধের মতো ভালবাসি। তোর কিছু হলে আমি হয়তো চোট খাওয়া সিংহের মতো হয়ে যাব।

আচ্ছা মিত্রা যাকে আমি এতো ভালবাসি যার দায় অদায় সম্পূর্ণ আমার তাকে যদি একটা জিনিষ চাই, সে যদি সন্দেহ প্রকাশ করে, আমি তার কাছ থেকে সেই জিনিষটা হাত পেতে নিই কি করে বল। আমি কি তখন বিশ্বাস করতে পারি, সে আমাকে ঠিক ঠিক ভাবে বিশ্বাস করতে পারছে না। যার জন্য এতো কৌতূহল।
জানিষ মিত্রা, সে আমার যতো আপনজন হোক। হয়তো ক্ষণিকের জন্য তার কাছ থেকে নিই। তারপর তাকে ফেরত দিয়ে দিই। সে যদি আমার ঔরসজাত সন্তান হয় সেও আমার এই মানসিকতার থেকে দূরে থাকবে না।
সেই জন্য তখন তুই বললি আমি তোকে ফেরতে দিয়ে দেব।
আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তুই জানিষ সেই কথাটা শুনে আমার মনটা কতোটা খারাপ হয়েছিল। যার জন্য তোকে এতো কথা বললাম, সারাদিন কষ্ট পেলাম।
তুই যতোটা কষ্ট পেয়েছিস তার থেকেও বেশি কষ্ট আমি পেয়েছি। তার থেকে কিছুটা দেবাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি।
টিনা নিচে আমাকে আলাদা ভাবে সব বলেছে।
একটা উপকার হয়েছে। কাকতালীয় হলেও সুজিতদার কাছ থেকে একটা কাজ পাওয়া গেছে। অনেক টাকা পাওয়া গেছে। তোর সঙ্গে কিছুক্ষণ মান অভিমানের পালা চলেছে। দু’জনে কিছুটা হলেও মানসিক দিক থেকে পরিশোধিত হয়েছি।
তুই একটা তুচ্ছ কথায় এতটা ভেবে বসে থাকতে পারিস, এটা আমি কল্পনাও করতে পারি নি।
তুই আমাকে ভালবেসেছিস ঠিক, আমার মনের গহনে ডুব মারতে পারিস নি। আমি তোর মনের গভীরে কতটা ডুব মারতে পেরেছি, বলতে পারব না। এটা তোর অপরাধ নয়। আমার অপরাধ। আমি তোকে হয়তো আমার মনের অন্দরে ঢুকতে দিই নি।
যখন তুই ফাইলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললি, যেখানেই থাকিস নটার মধ্যে আসবি, না হলে আজ থেকে তোর সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক থাকবে না, তখন আমার ভেতরটা আরও দুমরে মুচরেএকাকার হয়ে গেল। একবার ভাবলাম না আমি ফিরবো না।
দাদা আজ পর্যন্ত আমাকে এই ভাবে কথা বলতে পারে নি। মিত্রা কে ? তারপর ভাবলাম, না আমি যেখানেই থাকি আজকের দিনটা আমি ডিউ টাইমে ফিরে আসব, মিত্রাকে আমি জেতাবই, মিত্রাকে আমি কখনো কোনদিন হারতে দেব না। তুই বিশ্বাস কর আমি আটটার সময় ফিরে এসেছি। আর কোথাও বেরই নি।
মিত্রার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো। আমার পাঞ্জাবীর বোতামটা খুলে আমার খোলা বুকে ঠোঁট ছোঁয়াল।
একফোঁটাও চোখ দিয়ে জল বার করবি না। এটা তোর সঙ্গে, আমার বোঝা পড়া।
তুই বিশ্বাস কর বুবুন এটা আমার দুঃখের অশ্রু নয়, এটা আমার অনন্দের অশ্রু। আমি আমার বুবুনকে যেভাবে পেতে চাই, বুবুনকে আমি সেই ভাবেই পাচ্ছি।
জানিস মিত্র ভালবাসাটা শুধু শরীরী নয়, মনটাও অনেকখানি জুড়ে থাকে, তাই দেখবি প্রাচ্যের মেয়েদের খুব একটা ডিভোর্স হয় না। যেটা পাশ্চাত্যে আকছাড় হয়ে থাকে।
তুই কতো গভীরে গিয়ে ভাবিস। আমি যে সব গুলিয়ে ফেলি।
গুলিয়ে ফেললে কষ্ট পেতে হবে। তার দায় আমার নয়। সম্পূর্ণ তোর।
আজ মায়ের ফটোটার দিকে তাকিয়ে একটা কথা বার বার মনে হচ্ছিল। আমার রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয় নেই। খুঁজলে তোর দু’একটা পাওয়া যাবে। আমার পাওয়া যাবে না। আমি যেন কলম করা গাছ। বহু চেষ্টা করেছি খুঁজে পাই নি। এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। জানিনা আমার ভাগ্যে কি লেখা আছে। তবু তুই আমাকে আশ্রয় দিয়েছিস। কাছে টেনে নিয়েছিস।
এভাবে বলিস না।
যা সত্যি তাই বললাম।
চল এবার শুই। চাদরটা কেমন হয়েছে কিছু বললিনা।
জানিস মিত্রা দারিদ্রতা এতো কাছ থেকে দেখেছি,….তারপর যখন এগুলো পাই ঠিক ঠিক উপভোগ করতে পারিনা। মনের মধ্যে বার বার খচ খচ করে, অনি তুই এটা কি করছিস ? এটা তোর পথ নয়, তুই গা ভাসিয়ে দিচ্ছিস।
মিত্রা আমার হাতটা ধরে খাটের কাছে দাঁড়িয়ে।
তখন তুই প্যান্ট জামার কথা বললি, বিশ্বাস কর হাতের সামনে থাকতেও ইচ্ছে করে ওটা পরে গেছিলাম। মনের মধ্যে একটা আলাদা স্পিরিট অনুভব করলাম। মিঃ নেওটিয়াকে তো কাত করলাম। আজ প্রতিজ্ঞা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলাম। আমাকে দেড় কোটি টাকা যেখান থেকে হোক আনতে হবেই।
সেই জায়গায় তুই মিত্রাকে জিততে দিবি না।
হেসে ফেললাম।
এই হেরে যাওয়াতে কোন দুঃখ নেই জানিস বুবুন, এই হেরে যাওয়াটা সবচেয়ে বেশি আনন্দের। আমি এইরকম ক্ষেত্রে বার বার তোর কাছে হারতে চাই।
মিত্রা আমার অনেক কাছে।
তুই তখন বললি আলবাৎ পারব। সেই সময় তোর চোখের আগুনে আমি নিজেকে পুরে যেতে দেখেছি। তুই বললি পৃথিবীটাকে তুই হাতের মুঠোয় দুমরে মুচরে একাকার করে দিবি। আমি তোর চোখের আগুনে নিজেকে পুরিয়ে শুদ্ধ করেছি। আমি যে এই বুবুনকে চাই।
আমি মিত্রার চোখে চোখ রেখেছি।
বুবুনরে ভেতরের এই স্পিরিটটা আমাকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছে। তাই জন্য তোর কোন কাজে আমি বাধা দিই নি। কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু মনকে বলেছি বুবুন যে কাজে হাত দেবে ও জিতবে। ও কোনদিন হারতে জানে না।
না আমি ভগবান নই। তবে অন্যায় যে করবে মন থেকে যদি বুঝি সে সত্যি অন্যায় করেছে। তোকে বলে রাখি তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে। আমার হাত থেকে তার নিস্তার নেই।
এবার শুই চল।
তুই ওঠ আমি আসছি।
না তুই আগে উঠবি। আমি তোর হাত ধরে বিছানায় উঠবো।
কোন সংস্কার।
না।
তাহলে।
এখানে তোর অনুভূতি কাজ করবে না।
বুঝেছি। তাহলে দুজনে একসঙ্গে উঠবো।
তাই হবে।
কোন দুষ্টুমি একেবারে নয়।
একটু, বেশি নয়।
ঠিক আছে।
কিগো তোমার বিয়ে আর তুমি পরে পরে ঘুমচ্ছ।
এক ঠেলায় ঘুমের বারটা বেজে গেল।
কইরে অনি, যার বিয়ে তার হুঁশ নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই। দে ওর গায়ে জল ঢেলে।
বুঝলাম বৌদি আর সুরো এসে হামলা শুরু করেছে।
বৌদিগো ঘুম থেকে ওঠা বড়ো কষ্ট।
দাঁড়া তোকে কষ্ট দেখাচ্ছি। চাদর মুড়ি দিয়ে ভোঁস ভোঁস। কটা বাজে খেয়াল আছে।
কেন মিত্রাতো আছে।
মিত্রা তোকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তোর সঙ্গে কে থাকবে।
আমি চোখ মেলে তাকালাম। চাদরটা মুখ থেকে সরাতেই দেখলাম বৌদি, বড়মা, ছোটমা, সুরো।
ওমা দেখেছো বড়দি যেই মিত্রার কথা বলেছি, ড্যাব ড্যাব করে কেমন তাকাচ্ছে। ওরে শয়তান।
আমি হাসছি।
ওঠ আগে।
উঠছি, তাড়াহুড় করছো কেন। তুমি কি এখুনি এলে ?
আবার কথা। আজ যা বলবো চোখ কান বন্ধ করে শুনে যাবি।
আমি হাসছি।
একবারে দাঁত বার করবি না।
আমি উঠে বসলাম। সুরোর দিকে তাকালাম।
কিরে সাজিস নি।
এখন সাজবো কেন, সে তো বিকেলে।
দুর এখন থেকে সেজেগুজে বসে থাক। অনেকে আসবে পছন্দ হলে তোরটাও সেরে ফেলবো।
তোমাকে আর ঘটকালি করতে হবে না।
বড়মা, ছোটমা মিটি মিটি হাসছে।
মুখ ধুয়ে ওই পাজামা পাঞ্জাবীটা পর। এখুনি বেরোব।
কোথায় ?
বলেছি না কোন কথা বলবি না।
আমি ভ্যাবলার মতো কিছুক্ষণ তাকালাম তারপর উঠে বাথরুমে গেলাম। ওরা সবাই চলে গেল।
আমি বাথরুম থেকে বেড়িয়ে পাজামা পাঞ্জাবীটা পরলাম। গেড়ুয়া কালারের একটা পাঞ্জাবী আর চোস্তা। মনকে বোঝালাম, এখন কোন বিদ্রোহ নয়। এই তিনটে দিন তুমি ওদের আনন্দের সঙ্গী।
আলমাড়ির আয়নটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। খারাপ লাগছে না। চুলটা আঁচড়ে নিচে এলাম। দেখলাম বাগানে রবীন দাঁড়িয়ে আছে। মিত্রার বড়ো গাড়িটা আছে।
বসার ঘরে আসতেই দেখলাম চারজনে ফিট ফাট হয়ে বসে আছে।
আমি সবাইকে নমস্কার করলাম।
কিগো সব কোথায়!
বললামনা, তোকে ছেড়ে সব পালিয়ে গেছে। বৌদি বললো।
কিগো বড়মা, মিত্রা কোথায় ?
বড়মা মুখ টিপে হাসছে।
ছোটমা একটু চা খাওয়াবে না।
এখানে হাঁড়ি বন্ধ।
তারমানে!
ও সব জানি না, আমার চা চাই।
চল গিয়ে খাবি।
কোথায় যাব ?
সুরো মুচকি মুচকি হাসছে।
কিরে সুরো ?
কেমন মজা বলো।
চল চল ওঠ।
বড়মার দিকে তাকিয়ে।
দিদি ওই ব্যাগ দুটো নিলেই হবে।
হ্যাঁ।
ছোট তোরগুলো।
রবীনকে বলেছি গাড়িতে তুলে নিতে।
মনে হচ্ছে তোমরা কিছু একটা ঘোটালা পাকাচ্ছ।
একবারে কথা বলবি না।
বাবাঃ সেই ঘুমথেকে ওঠা ইস্তক ধমকে যাচ্ছ।
আমার কথায় ছোটমা মুখ টিপে হাসছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। চা না খাইয়ে বার করছো, এটা মনে থাকে যেন।
সব মনে আছে এখন চল।
আমি বড়মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। বলোনা কোথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছ। এই বাড়ি শুনসান সকলে কোথায় ? মিত্রাকে দেখছি না, দাদা, মল্লিকদা, টিনা, মিলি, নীপা, সব গেল কোথায়!
এত বুঝিস এটা বুঝতে পারিস না।
ঠিক তা নয় তোমরা প্রোগ্রাম চেঞ্জ করে থাকলে আলাদা ব্যাপার। বাড়ি মাত্র দুটো, নয় এ বাড়ি, নয় ও বাড়ি।
তাহলে।
বাঃ দারুণ লাগছে এবার, সুরো বড় বিয়ে করতে যাচ্ছে বুঝলি। তুই নিধ কনে। বড়কর্তা বৌদি। বড়মা, ছোটমা বড়যাত্রী।
ছোটমা তেরে এলো, দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি।
আমি ছুটে বারান্দায় চলে এলাম।
আগে বলতে হয় তাহলে জলটাও খেতাম না।
ওতে কোন দোষ হয়না। বড়মা বললো।
ছেলের বাড়ির ব্রাহ্মণ কে ছোটমা ?
হ্যাঁরে গাঢ়ল। ছোটমা বড়মার ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
তাহলে।
সব দেখতে পাবি গেলে।
আমার বেশ ভয় ভয় করছে বড়মা।
ছোটমা এসে কানটা ধরলো।
ভয় ভয় করছে বড়মা।
সুরো খিল খিল করে হাসছে।

আমরা পাঁচ মূর্তিমান গাড়িতে উঠলাম।
আমি সুরো সামনের সিটে। বড়মারা তিনজন মাঝে।
বড়মা ছগনলালকে বললো, তালা দিয়ে দাও আমাদের আস্তে আস্তে সন্ধ্যে হয়ে যাবে।
আমরা বেরিয়ে এলাম।
ছোটমা বৌদি আমার পেছনে, আমি স্পিকটি নট।
মাঝে মাঝে সুরোর দিকে তাকিয়ে হাসি। সুরোও হাসে।
এক ঘন্টার একটু কম সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম মিত্রার বাড়িতে। গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখলাম, চিকনা ছুটে এলো। রবীন বাগানে গাড়িটা দাঁড় করাল। সুরো দরজা খুলে নিচে নেমে গেছে। আমি নামতে গেলাম।
একবারে নামবি না আগে আমরা নামি তারপর নামবি। ছোটমা পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো।
চিকনা হাসছে।
কি গুরু আজ কিন্তু সঞ্জুর পাকা দেখা নয়।
তুই কখন এলি ?
ম্যাডাম কাল ফোন করলো, আজ সকালে এসে হাজির।
আর কেউ আসে নি।
অপেক্ষা কর দেখতে পাবি।
ওখানকার কাজ কর্ম।
একবারে কাজের কথা বলবিনা, সব সোমবার থেকে।
ঠিক বলেছিস, ওখানে গেলে একেবারে….ছোটমা ঘুসি দেখাচ্ছে।
চিকনা হেসে গড়িয়ে পড়ে।
গুরু ছোটমা পার্মিসন দিয়ে দিয়েছে।
কিগো এবার নামব।
না বলেছি।
বড়মা তুমি একটু দেখো।
দেখছি তো।
কোথায় দেখছো।
বড়মা হাসছে, তুই একটু থাম না বাপু।
মিত্রা কোথায়রে চিকনা।
সকলে আমার অবস্থা দেখে হাসে।
দেখলাম দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
সুরো খিল খিল করছে। গাড়ির দরজা খুলে আমি বসে আছি।
বাঁদড়ী খালি দাঁত বার করে হাসে।
দেব না একটা।
সুরো ঘুসি বাগিয়ে এগিয়ে এলো। আমি ওর হাতটা ধরে বড়মার মুখের দিকে তাকালাম।
কিগো কখন নামব।
বিয়ে করার সখ জেগেছে, একটু কষ্ট করবি না। ছোটমা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।
দেখলাম ভেতর থেকে দামিনী মাসি ইসলামভাই এগিয়ে আসলো। দামিনী মাসির হাতে একটা পেতলের থালায় কি সব যেন। দামিনী মাসি এসে বড়মার হাতে দিল। একটা প্রদীপও জ্বলছে দেখছি। বড়মা প্রদীপের তাপ এবং হলুদ চন্দনের ফোঁটা আমার কপালে লাগিয়ে দিল। চিকনা বাসু, অনাদি উলু দিল। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে দাঁত কড় মড় করছি। একে একে সবাই মাথায় ধান দুর্বো দিয়ে আর্শীবাদ করলো। আমি গাড়ি থেকে নামলাম প্রত্যেককে প্রনাম করলাম।
সবাই এসে হাজির। আমি যেন এক আজব বস্তু সকলে আমার দিকে সেইভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
বড়মা এবার চা।
খালি চা চা করে গেল। ছোটমা খঁচিয়ে উঠলো।
তোমরা ওকে চা দাও নি! মল্লিকদা বললো।
কেন দিতে হবে শুনি, একদিন না খেলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।
বড়মা হাসছে।
তুমি মাথায় রাখবে, এরপর তোমাকে কোন কথা বলবো না। তুমি সব জানতে কিছু বলো নি।
তুই বলিস, কাজ শেষ হয়ে যাবার পর বলিস।
দিদি কি করবে রে, দিদি কি করবে, দিদি তোকে বাঁচাবে। তোকে আজ দেখনা কি করি।
ছোটমার কথায় সবাই হাসছে।
আমরা সবাই ভেতরে এলাম। দেখলাম বুড়ীমাসি দাঁড়িয়ে গেটের কাছে, চোখটা ছল ছল।
কিগো বুড়ীমাসি তোমার আবার চোখে জল।
বড়বাবু থাকলে কি আনন্দ করতেন।
বুড়ীমাসি ভেতরে চলো, এখন একবারে ওসব নয়। ছোটমা বললো।
ব্যাশ কাজ শেষ, এবার কচুরী জিলিপি।
কাজ শেষ মানে! তোকে আচ্ছা করে হলুদ মাখাই আগে। বড় হবে হলুদ মাখবে না।
বৌদি দাঁতে দাঁত চিপেছে।
দেখলাম শিঁড়িদিয়ে টিনা, মিলি, অদিতি, নীপা নামছে।
কি অনিদা হেবি মাঞ্জা দিয়েছ।
কোথায় আর দিলাম। বললো আরও বাকি আছে।
তুই যাকে খুঁজছিস পাবি না, ঠিক সময়ে দেখতে পাবি। বৌদি বললো।
আমি ছোটমার দিকে হাঁসি হাঁসি মুখ করে তাকালাম।
ওইখানে গিয়ে চুপটি করে বসবি যখন ডাকব তখন আসবি।
আমি দাদা মল্লিকদার মাঝখানে গিয়ে বসলাম।
ফোনটা বেজে উঠলো।
পকেট থেকে বার করলাম। দেখলাম সুজিতদা। উঠে এলাম।
হ্যাঁ বলো দাদা।
কিরে সব ঠিক আছে।
তোমার এ্যাড সানডে বেরবে। চিন্তা নেই। তুমি রবিবার কি করছো।
কেনোরে।
একবার আসতে পারবে ?
কোথায়।
দাদার বাড়িতে।
যে বাড়িতে গেছিলাম।
হ্যাঁ।
কেন।
আমার বিয়ে।
ভাগ। গুল মারার জায়গা পায় না।
বিশ্বাস করো।
তোকে বিশ্বাস করা মুস্কিল।
ঠিক আছে তোমায় আসতে হবে না। তুমি বৌদিকে আমায় ফোন করতে বলবে।
ঠিক আছে।
দেখলাম মল্লিকদা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে।
আমি ফোনটা কাটতেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
এখানেও ব্যবসা ?
কি করবো বলো। দায়িত্ব নিয়েছি। সুজিতদা জানে না।
কালকের সুজিত।
চম্পকদাটা সব গজব করে দেবে বুঝলে মল্লিকদা।
তোকে অনেকদিন বলেছি।
কি করবো। পুরনো লোক দাদা দুঃখ পাবে।
ওকি এ্যাডটা যাবে না বলেছে।
তা বলে নি। বলেছে একজন নতুন ম্যাডাম জয়েন করেছে তিনি পার্মিসন না দিলে যাবে না।
দাঁড়া আজ চম্পকের সঙ্গে দেখা হোক।
তুমি কিছু বলতে গেলে বলবে ওই দেখ পারিবারিক তন্ত্র।
তাবলে যা খুশি করবে মেনে নিতে হবে।
তুমি দাদাকে দিয়ে বলাবে।
যাই অফিসে আজ।
হ্যাঁগো আমি সন্দীপদের বলিনি, দাদা বলেছে।
তোকে ভাবতে বলেছি।
এখানে কি ফুসুর ফুসুর হচ্ছে শুনি, চল ভেতরে চল। ছোটমা মল্লিকদার দিকে তাকিয়ে হাসল।
আমি ছোটমার পেছন পেছন শুর শুর করে ভেতরে চলে এলাম।
দামিনী মাসি কাছে এসে বললো একটু চা খাবি।
চা খাব মানে। এটা জিজ্ঞাসা করে কেউ। সকাল থেকে চা চা করে চাতক পাখির মতো মরছি।
মাসি মিত্রাকে কিছু খেতে দিয়েছ। ছোটমা বললো।
বললো কিছু খাবে না। সকাল বেলা সরবত খেয়েছে।
আমি একবার ছোটমা একবার দামিনী মাসির দিকে তাকালাম। ইসলামভাই হাসছে।
কোথায় লুকিয়ে রেখেছ।
আমি শিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গেলাম। ছোটমা হাঁই হাঁই করে উঠলো।
আমি হাসছি।
ছোটো ওকে ওপরে যেতে দাও। দাদা হাসতে হাসতে বললো।
ছোটমা চুপ করে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
আমি ওপরে উঠে এলাম। দেখলাম মিত্রার ঘর থেকে চেঁচামিচির শব্দ। বারান্দা শুনসান। আমি ধীর পায়ে মিত্রার ঘরের সামনে এলাম। আমাকে দেখে সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। মিত্রা একটা কাশ্মীরি গালিচার ওপর বসে। ওকে ঘিরে টিনা মিলি সবাই।
বড়মা বৌদি সোফায় বসে। প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এসেছিলাম মিত্রার সঙ্গে ওই সোফাতে বসেছিলাম। সে রাত্রিটার কথা এখনো চোখের সামনে বাঁধান ছবির ফ্রেমের মতো ভেসে আছে।
মিত্রা একটা হলুদ রং-এর শাড়ি পরেছে। লাল ব্লাউজ। কপালে আমার মতো হলুদের টিপ তেল গড়িয়ে পরেছে। আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল।
বড়মা বড় এখানে কেন। টিনা চেঁচিয়ে উঠলো।
টিনার কথাটা আমার যেন কানেই ঢুকছে না। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। এক দৃষ্টে ওর দিকে তাকালাম। তারপর ফিরে এলাম। শিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলাম।
শিঁড়ির মুখে দামিনী মাসি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে। মাসির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে সোজা বাগানে চলে এলাম। কারুর দিকে তাকালাম না। রবীন গাড়ি মুছছে। পায়ে পায়ে রবীনের দিকে এগিয়ে গেলাম। চায়ের কাপটা রবীনের হাতে দিয়ে বাগানের পেছনে চলে এলাম।
মিত্রার বাগানটা ও বাড়ির থেকেও সুন্দর। এ বাড়িতে দুটো মালি আছে। ওরা মেইনটেন করে। সব ধরনের ফুল কম বেশি ফুটে আছে। আমি ডালিয়ার টব গুলোর কাছে গিয়ে বসলাম। দারুন লাগছে ডালিয়া গুলো দেখতে।
পাশেই হাসনুহানা। কি রং যেন যৌবন ফুটে বেরচ্ছে। চার রকমের গোলাপ। মেরুণ কালারের গোলাপ গুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমি ঘাসের ওপর বসে পরলাম। মনে হলো আমি এদের কতোদিনের পরিচিত।
দেয়ালের ধার ঘেঁসে পাম, সুপুরি, নারকেল গাছ। আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি। সামনেই দুটো চড়ুই পাখি উড়ে এসে বসলো। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে একে অপরকে সোহাগ করলো তারপর আবার ফুরুত করে উড়ে চলে গেল।
আমি একমনে দেখছি। মিত্রাকে আজ কি সুন্দর লাগছে। হয়তো ওর প্রথম বিয়ের দিন আরও বেশি সুন্দর লেগেছে ওকে। এ বাড়িতে তখন কতো লোকের হৈ চৈ। কতো ব্যস্ততা। আজও হয়তো সেইটা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।
কিরে এখানে একা একা বসে আছিস।।
মুখ তুলে তাকালাম। মিত্রা পাশে এসে বসলো। আমি ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
কি দেখছিস অমন করে।
তোকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।
তাই।
মাথা দোলালাম।
হঠাৎ ওই ভাবে চলে এলি।
সকাল থেকে তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। দেখা হয়ে গেল, চলে এলাম।
ছোটমা বললো, তুই মিত্রা মিত্রা করে পাগল করে দিয়েছিস।
হাসলাম।
আমাকে বকলি না।
কেন।
তোকে না বলে চলে এলাম।
তুই আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিস, আমি সারপ্রাইজড হলাম।
তাই নিচে চলে এলি, মন খারাপ করে।
কই মন খারাপ করলাম।
চা রবীনকে দিয়ে দিয়েছিস।

তোকে দেখার পর খেতে ইচ্ছে করলো না।
কেন।
তুই আমার জন্য কষ্ট করছিস, আমি এইটুকু পারব না।
কই আমি কষ্ট করছি।
তুই তো কিছু খাস নি।
সরবত খেয়েছি।
আমি জল খেয়েছি।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠলো। চল ভেতরে চল, ছোটমা হলুদ মাখাবে দুজনকে।
এই সুন্দর জামাটা নষ্ট করে ফেলব।
আবার কিনে দেব তোকে।
তোর বাবা মার কাছে একবার নিয়ে যাবি।
চল। আমার ঘরে কোন ফটো নেই। মায়ের ঘরে আছে। ও ঘরে তুই কোনদিন ঢুকিস নি।
বড়মা কোথায় ?
তোর মন খারাপ হয়েছে দেখে বড়মারও মুখটা কেমন ভারি হয়ে গেল। দামিনী মাসি বললো তুই যা মিত্রা, তুই গেলে ও ঠিক হবে।
নারে আমার মন খারাপ হয়নি। মাঝে মাঝে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, আমি এসবের যোগ্য কিনা।
কেন তোর মনে এতো সংকোচ।
সংকোচ নয়। না পাওয়ার বেদনা। যখন পাই ঠিক মতো গ্রহণ করতে পারিনা।
আমি আছি তোর পাশে, ভয় কিসের।
তোকে হারাবার ভয়, আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
আর আমাকে হারাবি না। এবার ওঠ। আজকে তুই আমার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আমি সার্থক করবো।
আমি বাধা দেব না। আর কি কি আছে।
নাই বা জানলি।
ঠিক আছে জানতে চাইব না।
পায়ে পায়ে দুজনে মিত্রার মায়ের ঘরে এলাম। দুজনকে আগে যেমন দেখেছিলাম। ফটোতেও সেরকম দেখলাম। সমান জীবন্ত। ফুলের মালা দিয়ে সাজানো। আমি মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলাম।
জানিস বুবুন আজ বাবা থাকলে ভীষণ খুশী হতো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
তুই প্রণাম করে কি বললি।
যে দায়িত্ব মাথা পেতে নিচ্ছি তা বহন করবার শক্তি দিন।
মিত্রা কাছে এসে আমার বুকে ঠোঁট রাখল।
এবার তুই কিছু খা।
না। আমাকে এই ঘরে একটু একা থাকতে দিবি।
না।
কেনো।
তুই আবার মন খারাপ করবি।
না করবো না।
তুই আজ আমার সঙ্গে থাকবি। একটুক্ষণের জন্যও আমার চোখের আড়াল হবি না।
তোর আত্মীয়রা কেউ আসবে না।
সবাইকে বলেছি, যারা আসে আসবে, নাহলে কি করবো।
তুই কখন এসেছিস।
ভোর বেলা। সবাই মিলে গঙ্গায় স্নান করলাম। তারপর চলে এলাম।
আমাকে একা রেখে চলে এলি।
তুই বড়, তোকে সঙ্গে আনা যায়।
হেসে ফেললাম।
তুই বিয়ে করতে চেয়েছিস, বিয়েটা শুধু কাগজ কলমে হয়, একটু অনুষ্ঠান না করলে চলে।
তার মানে ছাঁদনা তলা শুভ দৃষ্টি ?
দূর ওসব কবে হয়ে গেছে।
তাহলে।
দেখবি, সময় হোক।
এখন কি করবো।
কি করবি, ঘুরে ঘুরে বেড়াবি।
দু’জনে পায়ে পায়ে নিচে নেমে এলাম।
ডাক্তারদাদা আমার দিকে তাকিয়ে, কি স্ট্রংম্যান মনে হচ্ছে চিন্তা শক্তির কোথাও ছেদ পরছে ?
মাথা নীচু করে হাসলাম।
তুমি ভাবতেই পার নি এরকম কিছু একটা হতে পারে।
মাথা দোলালাম।
তোমায় কিরকম সারপ্রাইজ দেওয়া হলো বলো।
হাসলাম।
হাসলে হবে, তোকে মুখে কিছু বলতে হবে। দাদা বললো।
দাঁড়াও না এডিটর, বাবু এখন নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছে।
কি করে বুঝলে।
ওর মুখ বলছে।
থামো তুমি, হ্যাঁরে তোরা দু’জন কিছু খা। বড়মা বললো।
আমি খাব না মিত্রা খাক।
তুই খেলে খাব।
এই যে বললি খেতে নেই।
তোকে মিত্রা বলেছে।
বললো খালি সরবৎ খেয়েছি আর কিছু খাব না।
একটু মিষ্টি খা কিছু হবে না।
মিত্রার দিকে তাকালাম।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
দেখলাম অনাদি বাসু নিচের বিশাল ড্রইংরুমের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ইশারায় ওদের ডেকে নিলাম। তিনজনে বাগানের সবুজ গালিচার মতো ঘাসে এসে বসলাম। সামান্য গরম লাগছে। গাছতলায় বসে অনাদিকে বললাম একটা সিগারেট দিবি।
আমার কাছে নেই, চিকনার কাছে আছে।
বাসু বললো দাঁড়া চিকনাকে ডাকি।
ও কোথায় ?
আবার কোথায়, বড়মার পেছন পেছন ঘুরছে, আর খেয়ে যাচ্ছে।
বাসু উঠে দাঁড়াল।
হ্যাঁরে অনাদি মৌসুমি মাসি এখন ওখানে আছে।
না, দেশে গেছে, মাস খানেক পরে আসবে, লোক জোগাড় করে।
কেন।
চিকনা মৌসুমি মাসিকে বলেছে।
কেন আমাদের ওখানে লোক পাওয়া যাবে না।
চিকনার বিশ্বাস নেই। তারওপর তোর বাবার আমলের লোক। চিকনা বললো মাসি তার লোকজন নিয়ে ধান সেদ্ধকরা শুকনো করা ওই সব করবে। বাকি পচা, পাঁচু, হাঁড়ি পাড়ার কিছু ছেলে।
মাসির বয়স হয়েছে।
কে শুনবে কার কথা। যেই শুনেছে অনি মিনি রাইস মিল করবে সেই থেকে স্যারের মাথা খেয়ে ফেলছে। চাষের সময় ছাড়া গ্রামের ঘরে কাজ কোথায় বল। সব সময় তোর ওখানে পরে আছে।
ঠিক।
তুই মৌসুমি মাসির দেশের বাড়ি গেছিস। অনাদি বললো।
মাস দুয়েক আগেও গেছিলাম। মৌসুমি মাসির বড়ভাই ওখানকার মুখিয়া। আমার ভীষণ ভালো লাগে জায়গাটা। নামটাও ভীষণ সুন্দর ভালোপাহাড়। জানিস ওখানে প্রায় সকলে আমাকে চেনে। এক একটা ছোট ছোট টিলার মতো পাহাড় আট দশটা পরিবার নিয়ে এক একটা গ্রাম। পাঁচটা গ্রাম পঞ্চাশটা পরিবার। পাঁচ ছশো মানুষ। আমরা শহরে বসে অনেক লেকচার দিই বুঝেছিস অনাদি। তুই গেছিস কখনো ?
না।
দেখলাম বাসু চিকনা হাসতে হাসতে আসছে। কাছে এসে একটা ভেউ করে ঢেঁকুড় তুললো।
কিরে!
খাওয়াটা একটু বেশি হয়ে গেছে বুঝলি অনি।
কি খেলি ?
বেশি না, গোটা কুড়ি লুচি, আর দশটা রসোগোল্লা।
এটা টিফিন!
তাহলে কি।
দুপুরে।
ইসলামভাই-এর লোকজন তৈরি করছে। বিড়িয়ানি, মুরগীর ঠ্যাং।
আমি চিকনার দিকে তাকালাম।
তাকিয়ে লাভ নেই। এই জন্য বলেছিলাম, অনি বিয়ে করিস না। বিয়ে করলে খাওয়া জুটবে না।
আমি হাসছি।
তুই এইকথা কখন বললি অনিকে। বাসু বললো।
আশাপুরায় যখন পড়তাম। ক্লাস ফোর।
আমার হাসি থামে না।
অনি একটা সিগারেট চাইছে। অনাদি বললো।
তোরা পাবি না।
কেন ?
একটাই প্যাকেট আছে। সন্ধ্যে পর্যন্ত চালাতে হবে।
কিনে নিবি।
এখন ব্যবসা মন্দা, বুঝে শুনে খরচ করতে হবে।
শুনছিস অনি চিকনার বাতেলা।
সঞ্জুকে আসতে দে, সব হিসেব করে দেব।
কেন ও কি আমার বাপ।
বাপ কি মা এলেই বোঝাব।
অনি তুই এখন ভিভিআইপি তোকে এখন ধরা খুব মুস্কিল। এই ফাঁকে কিছু কথা সেরে নিই।
চিকনা আমার হাতে একটা সিগারেট দিল। ওদেরও দিল। সিগারেট ধরালাম। চিকনা বসলো।
বল।
ধান রাখার আর জায়গা নেই।
আমি কি করবো।
তুই কি করবি মানে! গাছে তুলে দিয়ে মই কেরে নিবি ?
জায়গা বার কর।
অনাদির বাড়িতে রেখেছি, বাসুর বাড়িতে রেখেছি।
কিছু বেচে দে।
এখন বেচলে লাভ হবে না।
তাহলে সেদ্ধ করে চাল বানিয়ে নে। মেসিন পত্র নিয়ে এসেছিস ?
মেসিন এসেছে, এখনো ফিটিং হয় নি।
কেন।
অনাদিকে জিজ্ঞাসা কর। হারামী আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে চড়কি ঘোরাচ্ছে।
আমি হাসছি।
হাসিসনা, ও শালা অনেক টাকা চাইছে। মেসিন বসাবার জন্য।
তোর যদি পোষায় অনাদিকে দিয়ে কাজ করাবি, না হলে করাবি না।
সেখানেও ও পুটকি মেরে রেখেছে।
কেন।
তুই জিজ্ঞাসা কর।
ব্যবসা করবি তুই, আমি অনাদিকে জিজ্ঞাসা করবো কেন।
অনাদি, বাসু হাসছে।
চিকনা গাল দিল। হাসি হচ্ছে অনির সামনে। আমাকে কেশ খাওয়ানো।
নিশ্চই কিছু একটা অসুবিধা আছে, তাই অনাদি পরে করবে বলছে।
তোকে বলেছে, আমাকে বলেনি।
আমাকে অনাদি কিছু বলেনি।
তাহলে তুই জানলি কি করে।
তোর কথা শুনে।
আমার কথা শুনে তুই সব জেনেগেলি!
আমি হাসি।
মাথাটা একটু খাটা না। কতদিন গবেট গোবিন্দ হয়ে থাকবি।

ও বলেছে ব্যাঙ্কের বিল্ডিং-এর মেটিরিয়াল যখন আসবে তখন মেসিন বসাবে।
ঠিকই তো বলেছে। ডবল খরচ করবে কেন।
কিসের ডবল খরচ।
তোর জন্য একবার গাড়ি ভাড়াদিয়ে মেটিরিয়াল নিয়ে আসবে, আবার ব্যাঙ্কের জন্য মেটেরিয়াল নিয়ে আসবে।
কেন ও শালা গাড়িভাড়া আমার কাছ থেকে নেবে না, মাগনায় নিয়ে আসবে।
তোর কাছ থেকে কম নেবে।
শালা ওমনি অনির সামনে আমাকে কেশ খাওয়ালি।
চিকনা অনাদিকে তেরে গেল।
এটা ম্যাডামের বাড়ি নো ঝামেলা।
ওখানে গিয়ে রাম কেলান কেলাব।
দেখলাম মিত্রা একবার বেরিয়ে এসে আমাদের দেখে আবার ভেতরে চলে গেল।
দেখলি দেখলি ম্যাডাম তোর গলার আওয়াজে একবার দেখে গেল। বাসু বললো।
এর থেকে আস্তে কথা বলা যায় না।
বোস বোস। এবার বাকিটা বল।
এইটাই আর কিছু নয়।
এই যে বললি রাখার জায়গা নেই।
অনাদি একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
তাহলে যে বললি অনাদি কিছু করছে না।
আমি তোকে তাই বললাম নাকি।
কতো ধান তুলেছিস।
পাঁচ টন।
ওরে বাবা টাকা পেলি কোথায়।
ইসলামভাই দিয়ে এসেছে।
ইসলামভাইকে শোধ করবি কি করে।
ধান বিক্রি করে।
টাকার সুদ।
নেবেনা বলেছে।
তাহলে।
ও তুই বুঝবি।
আমি বুঝলে তুই কি ব্যবসা করবি।
দাঁড়া একটু চা নিয়ে আসি।
অমনি সটকে পরার ধান্দা।
চিকনা হন হন করে চলে গেল, আমি চেঁচিয়ে বললাম, আমি কিন্তু খাব না।
চিকনা একবার পেছন ফিরে দাঁড়াল।
সেকিরে ভূতের মুখে রাম নাম।
বিয়েতো করলি না।
ওমনি দিলি।
আমি হাসলাম। চিকনা গট গট করে চলে গেল।
অনাদিকে বললাম কি হাল রে।
কাজ চলছে পুরো দমে।
আমি দিন পনেরোর আগে ওখানে যেতে পারব না।
তুই কাজ শেষ করে আয়।
নিরঞ্জনদা এলো না।
এসেছে। দাদা কোথায় পাঠিয়েছে।
নিরঞ্জনদা জায়গাটার ব্যাপারে কি বললো।
শুনেছি কাগজপত্র রেডি হচ্ছে। নিরঞ্জনদা খুব দৌড়দৌড়ি করছে।
আমি অনাদির দিকে তাকিয়ে।
তোকে একটা সুখবর দেওয়া হয় নি।
আবার বাপ হবি নাকি ?
দুর।
বাসু জোরে হাসল।
বাসু চান্স নিচ্ছে ?
ঢেমনা। বাসু বলে উঠলো।
আমাকে লোকাল কমিটির দায়িত্ব দিয়েছে।
তার মানে! অমল কোথায় ?
মাঝে ও একটা ঘোটালা করেছে, মেয়ে ঘটিত।
দিবাকর কেশ!
কাছা কাছি।
তারপর।
নিরঞ্জনদা প্রায়ই এখন ওখানে যাচ্ছে। ওকে সাসপেন করেছে, আমাকে বলেছে তুই দেখ।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
তারপর দেখছি।
তারমানে তোর চাপ বেরে গেছে।
সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত দৌড়।
তোকে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে।
কমিউনিকেসন বাড়াতে, আর যতটা পারি লোকের উপকার করতে। বিশ্বাস কর অনি আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমি জানি আমি এখন যেখানে আছি স্রেফ তোর জন্য। জীবনে কোনদিন ভাবতে পারিনি অনিমেষদার সঙ্গে বসবো। কথা বলবো। আমার সেই শাধ পূর্ণ হয়েছে।
কবে বসেছিলি।
তুই যেদিন অসুস্থ হয়েছিলি।
ওই যে ম্যাসেজ পেয়ে আমরা চলে এলাম। বাসু বললো।
ওইদিন। আমাদের প্রত্যেককে ডেকে পাই টু পাই তোর সম্বন্ধে জেনেছে। কি জেরা রে। প্যান্ট ভিঁজে যায় আর কি।
চিকনা।
দুর ওর কোন বুদ্ধি শুদ্ধি আছে। অনিমেষদার সামনে বলে আমাকে একবার ডাক্তারকে ধরে এনে দিতে পারেন।
এ্যাঁ।
এ্যাঁ না হ্যাঁ। ও ডাক্তারকে একবার দেখে নেবে, ডাক্তার যেন দিবাকর।
তারপর।
সারাক্ষণ তোর পা ধরে বসে থাকল আর কাঁদে। কেউ নড়াতে পারল না ওখান থেকে। পকেট থেকে পাঁচসিকে বার করে তোর কপালে ঠেকিয়ে মানতে করেছে। আগামী বছর রাসের সমস্ত খরচ ওর।
কি পাগল বলতো।
পাগল না। তখন যা অবস্থা ছিল ডাক্তারদাদার মতো ওরকম জাঁদরেল মানুষ ঘাবড়ে গেছিল।
আমি পরে অনেক চিন্তা করেছি বুঝলি, কেন হলো কিছুই বুঝতে পারছি না।
তোর ওপর তখন পীরবাবা ভর করেছিল।
কচু।
তুই বাসুকে জিজ্ঞাসা কর।
তোকে তখন ধরে রাখা যাচ্ছিল না। আমরা তিনজনে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম। কি শক্তি তোর গায়ে।
যাঃ যতো সব গাঁজা খুরি।
তুই যখন চোখ খুললি তোর চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। কি হয়েছিল বলতো।
মৃগী হয়েছিলি।
তুই সব কিছুতে হেঁপি মেরে উড়িয়ে দিস।
তোরা আজকের দিনে বসে যদি এসব কথা বলিস, চলে কি করে।
তাহলে তুই পীরবাবার থানে যাস কেন।
ওটা আমার বিশ্বাস, ভালবাসা। তাই বলে পীরবাবা আমার ওপর ভর করবে, এটা মানা যায়।
দেখলাম চিকনা মিত্রা সমেত সবাইকে ধরে নিয়ে আসছে। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
মিত্রা আমার পাশে এসে বললো।
চা খাবিনা কেন।
এমনি।
আমি ফোন করেছিলাম খেতে বলেছে।
হাসলাম।
হাসলি যে।
তুই ফোন করে পার্মিসন নিলি।
আজকের দিনটা মানব।
বুঝেছি আবার একটা ঘোটালা।
এই জন্য তোকে বলেছিলাম বিয়ে করিস না অনি, ফুর ফুর করে ঘোরা যাবে।
চিকনাদা। নীপা চেঁচাল।
ওরে বাবা, এ স্মার্ট ম্যাডাম ছিল কই।
মিত্রা হাসছে।
বিশ্বাস করুণ ম্যাডাম এটা মনের কথা নয়। নীপার দিকে তাকিয়ে।
কালকে পর্যন্ত হিসাব করে এসেছো। নীপা গম্ভীর হয়ে বললো।
অনি বলেছে এখানে কোন বিজনেস টক হবে না। খালি খাওয়া দাওয়া আনন্দফূর্তি।
আংরেজী! অনাদি বলে উঠলো।
হ্যাঁরে….তারপর নিজের মুখ নিজে চেপে ধরলো।
অনাদিরা জিভ বার করে হাসছে।
এখুনি সব্বনাশ করে দিচ্ছিলি।
আটকে দিয়েছি।
তোকে অনি কখন বললো এ সব কথা। অনাদি বললো।
তোর কানে বয়রা, শুনবি কি করে।
হাসি থেমে নেই।
মিত্রা আমার হাতে চায়ের কাপ দিয়ে পাশে বসলো। সবাই ঘাসের ওপর গোল করে বসেছে।
অদিতি, দেবা নির্মাল্যকে দেখছি না।
আর বোলোনা তিনঘন্টা হয়ে গেছে। ইসলামভাই-এর ফোনের বিল চড় চড় করে বারছে।
কোথায় গেছে ?
নিউ মার্কেটে পাঠিয়েছে, মাংস আনতে।
চিকেন না মটন।
দুটোই। তাহলে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বার করে আনছে।
ওরা হাসে।
সেরকমই হবে। তাও ইসলামভাই-এর পরিচিত দোকান, সব বলে রেখেছে ইসলামভাই।
ম্যাডাম আপনারে কিন্তু আজ চাকমা দেখাচ্ছে। চিকনা বললো।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
চিকনা একবার নীপার দিকে তাকাল।
তুই তাকাস না। অনির বে বলে কথা। একটু আনন্দ ফূর্তি করবো না।
বে কি চিকনা। মিত্রা বললো।
গাঁইয়া কোথাকার। নীপা বললো।
দেখলি অনি, আমি গাঁইয়া।
বিয়ে বলতে পার না।
অনি কি ? অনি কি ? ও শউরে।
সবাই হাসছে।
ম্যাডাম একটা পার্মিসন নেব।
কি।
অনির বিয়ে উপলক্ষে একটা বিড়ি খাব।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসে।
অনি একটা খাবে।
ও বিড়ি খায় !
পাইলে ছাড়ে না।
তোর বিড়ি খাওয়ার প্রথম দিনটা মনে আছে। আমি বললাম।
এইতো শুরু করলি, আমার প্রেসার কুকারে গ্যামো মারার ধান্দা।
চিকনা এমন ভাবে কথাটা বললো সবাই হেসে গড়া গড়ি যায়।
মিত্রা হাসতে হাসতে আমার গায়ে ঢলে পরলো, সেটা কিরে বুবুন।
বুঝলি না।
মিত্রা মাথা নাড়ে।
অনি একবারে না। তাহলে আমি এ্যান্টাসিড খেয়ে মরে যাবে।
মরো না মরো। নীপা দাঁত খিঁচিয়ে বললো।
ওরকম করে বলিস না, দাঁত ভেঙে যাবে।

সবাই হাসে।
কিরে বুবুন। বলনা চিকনার কোড ল্যাঙ্গুয়েজ গুলো।
প্রেসার কুকার হচ্ছে প্রেসটিজ। প্রসটিজ প্রেসার কুকার আছে না।
ওরা হেসে এ ওর গায়ে ঢলে পরে।
গ্যামো হচ্ছে গ্যামাকসিন।
অনিদা তুমি থাম। মিলি বললো।
এ্যান্টাসিড হচ্ছে ম্যাটাসিড। ধানে পোকা লাগলে দেয়। ওটা বিষ।
চিকনা এতো জানে। মিত্রা এমন ভাবে বললো সবার অবস্থা সঙ্গীন।
এইতো ম্যাডাম। আমি সেই পুকুর ঘাটের কেশটা এবার দেখাই।
মিত্রা আমার হাতটা ধরে বললো ওকে তুই থামতে বল।
আমি বললে ও থামবে। সবে তো শুরু। এখনো সঞ্জু আসে নি। এলে হাতাহাতি হয়ে যেত।
বিড়ি খাওয়ার কেশটা।
দেখলি চিকনা দেখলি, মিত্রা আবার মনে করিয়ে দিল।
কি আছে বললে, তোর প্রেসার কুকার ফেটে যাবে নাতো। অনাদি বললো।
আমি কাঞ্চন কেস বলবো।
বলবি।
অনিদা বলো এটা শোনা হয়নি। নীপা বললো।
দেখো কিরকম ছত্তিশ পাটি বের করেছে। খুব সখ না। চিকনা বললো।
ওখানে চলো ছত্রিশ পাটি দেখাব।
ওখানে কেন এখানে দেখা।
উঠবো।
ওঠা উঠি কেনো, বসে বসে তো বেশ হচ্ছে।
সবাই হাসে।
বুবুন বলনা।
আমি চিকনার দিকে তাকাই।
চিকনা মাথা নীচু করে বললো, বল। ম্যাডাম যখন শুনতে চাইছে।
অনাদি হেসে ফললো।
তোর মাটি কাটার গল্প বলি।
বলনা। পঞ্চায়েত হবো দুটো পয়সা কামাবনা তা হয়।
শুনলি শুনলি অনি।
আর আমি ধানে দু’টাকা বেশি চাইলে, বলে গ্রামসভা বসাব।
এটা অন্যায়, এটা আমি মানতে পারছি না। অনাদি এটা ঠিক নয়, ও ওর ব্যাবসা করবে। সে দু’টাকা বেশি নিক আর কম নিক।
সেটা খাতায় লেখে না। গেঁড়ায়। ওটা বলছোনাতো। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।
তুই আমাকে তেল কেনার পয়সা দিস। আমি যে এদিক ওদিক যাই। বিড়া খাওয়ার পয়সা দিস।
তেল না থাকলে তুমি ইসলামভাই-এর বাইক নিয়ে যাও। তুমি ওই পাড়ায় কি করতে যাও। অনিদাকে বলবো।
চিকনা ছুটে গিয়ে নীপার পা ধরে।
তোর পায়ে ধরি তুই বলিস না। তুই যে ঘর শত্তুর বিভীষণ জানতাম না।
সবাই জোরে জোরে হাসছে।
আমি ঘরশত্রু বিভীষণ। দাঁড়াও তোমায় দেখাচ্ছি।
কিরে নীপা বলতো একটু শুনি গিয়েই গ্রাম সভা বসাব। অনাদি বললো।
তুই আবার আগুনে ঘি ঢালছিস কেন। চিকনা অনাদির দিকে ঘুরে বললো।
মিত্রা হেসে আমার কোলে মাথা দিয়েছে।
বুবুন একিরে, কি থেকে কি বেরচ্ছে।
দাঁড়া আরও বেরবে।
চিকনা আমাদের দুজনের কাছে এসে বসলো। বিশ্বাস কর অনি সব মিথ্যে। তুই গেলে আমি তোকে সব বলবো।
মিনতিকে খুঁজে পেয়েছিস। আমি চোখ নাচিয়ে বললাম।
বাসু মুচকি মুচকি হাসছিল। এবার জোরে হেসে উঠলো।
বিকেল হলেই সঞ্জুদা চিকনাদা নেই। কোথায় ? ফোন করো, খালি বলবে আসছি দাঁড়া না। নীপা বললো।
এই কেশটা কতোদিন চলছে নীপা।
আমি এখানে আসার পর থেকে বেশি হচ্ছে। আমি সব খবর রাখছি। সঞ্জুদা পালের গোদা।
তুই বিশ্বাস কর অনি, নীপা মিছে কথা বলছে।
ঠিক আছে সঞ্জু আসুক।
তুমি কাকে বলবে, সঞ্জুদাও ওইরকম। তুমি স্যারকে বলে আসার পর, মিনতিও এখন রেগুলার এ্যাপো করছে।
ওরে বাবা, তুই থাম নীপা। আমার হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেল। মিত্রা বললো।
কি বুঝছো টিনা।
সব বুঝেছি অনিদা তুমি আর খুঁচিও না। পেটে খিল ধরে গেছে।
চিকনা আমার আর মিত্রার সামনে বসে। আমি চিকনার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকালাম।
তুই বিশ্বাস কর অনি।
মিনুকে তুই তুলে আনিস বাড়ি থেকে।
হ।
এনে সঞ্জুর কাছে গ্যারেজ করে দিস।
হ।
তারপর দুজনকে পাহারা দিস।
চিকনা লজ্জা পেয়েগেল, মাথা নীচু করে ঘাড় দোলাল।
আবার বাড়িতে দিয়ে আসিস।
চিকনা হাসে।
সঞ্জু তোকে তেলের পয়সা দেয় ?
না।
কেন ?
ডিউ স্লিপ।
সবাই হাসছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুই ওর পেট থেকে কথা বার করে ফেললি ?
ওর প্রেম করার দম নেই, মেয়ে দেখলে দশহাত দূর থেকে পালায়।
একমাত্র তুই বুঝেছিস, নীপাটা কিরকম করলো বল।
তুই ওকে বলিসনি কেন।
ও স্যারকে বলে দেবে।
নীপা তোকে মাইনে দেয় না।
খালি খাটিয়ে মারে বলে কিনা ব্যবসা মন্দা।
ঘোর অন্যায়। আমি যে নীপাকে বলেছিলাম।
প্রতিদিন কুড়িটাকা দেয়। বাবাকে গিয়ে টাকা দিয়ে আসে। আমাকে দেয় না।
তুমি টাকা ওড়াবে।
দেখেছিস কিরকম টট্টরি।
আমি মিত্রা হাসি।
ম্যাডাম তুমি বলো না নীপাকে প্রতিদিন পাঁচটা টাকা বেশি দিতে।
মিত্রা কোন কথা বলে না খালি হাসে।
দেবাদের গাড়িটা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো।
অদিতি চেঁচিয়ে উঠলো বাবুরা এলেন।
আবার হাসিতে সকলে ফেটে পরলো।
দেবা গেট দিয়ে ঢোকার মুখেই আমাদের দেখেছে। দেখলাম পেছনের সিটে আর একজন বসে। মিত্রাকে একটা কনুইয়ের খোঁচা মারলাম।
কিরে।
দেখ পেছনের মালটাকে চিন্তে পারিস কিনা ?
মিত্রা ভালো করে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে ঘার দোলালো, চিনতে পারছে না।
দেবা, মৈনাক নামলো। নির্মাল্যকে বললো এগুলো ভেতরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর।
দু’জনে কাছে এলো। মৈনাক একবার আমাকে দেখল একবার মিত্রার দিকে তাকাল।
শালা হারামী চোখ মেরে মেরে আমার রেটিনা শুকিয়ে গেল, আর তুই মালটাকে তুলে নিলি।
টিনা মিলি মনে হয় আগে কখনো দেখে নি। ওরা ঠিক বুঝতে পারছে না।
ওই জন্য তোর চোখে কাঁচের গ্লাস, আমি বিন্দাস।
মৈনাক কাছে এসে উবু হয়ে বসলো।
মিত্রাকে পুরো আপেল লাগছেরে অনি।
কবে কিসমিস ছিলো।
দেখ অনি দেখ, মিত্রা আমাকে চিনতে পারছে না। কিরকম ভাবে তাকিয়ে আছে।
তোর পরিচয়টা ছোট্ট করে দিই মনে পরে যাবে।
মিলি ইশারা করে বললো, বলো বলো।
তুই ওদের চিনিস।
মৈনাক পেছন ফিরে ওদের দেখলো।
না।
আগে তোর পরিচয় দিই, তারপর ওদেরটা দেব।
তোর কি এখনো বয়স হয় নি।
কোথায় হলো।
মৈনাক মুচকি মুচকি হাসছে।
দেখ সবাই তোর পরিচয় দিতে বলছে।
তোকে অলংকার ঝাড়তে হবে না।
সবাই মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসছে।
দেবা তুই বলে দে।
ওতো আর একজন।
কেন।
ফোন করে বললো, অনির বিয়ে চলে আয়। তারপর ফোন অফ।
আমি ফোন করি পাই না। তারপর কোনক্রমে পেলাম। বললো, নিউমার্কেটে মাংসের বাজার।
ভেবে দেখ, অনির বিয়ে নিউ মার্কেটের মাংসের বাজার। কিরকম খার লাগে।
সবাই হাসছে।
মিত্রার দিকে তাকালাম, আস্তে করে বললাম, তোর মনে পরে সেই প্যান্টের চেন খোলা, বাচ্চাটা খামচে ধরেছে।
ভ্যাট। মৈনাক বলে উঠলো।
মিত্রা হাসতে গিয়ে বিষম খেলো। মিলি টিনা ছুটে এলো।
কি হলো মিত্রাদি!
মিত্রা হাত দেখাচ্ছে। তোরা থাম থাম। আমি ঠিক হয়ে যাব।
সবাই এগিয়ে এসেছে।
ওরে বাবারে আমি আর হাসতে পারছি না।
মিত্রা ওদের নিয়ে একটু তফাতে সরে গেল। মৈনাক আমার পাশে বসলো।
মৈনাক হাসছে। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোর সামনে প্রেসটিজ ঝুল করে দিস না।
আমরা যখন থার্ড ইয়ার ওরা তখন ইলেভেন টুয়েলভ।
সব আমাদের কলেজের!
সবাই।
খালি ওটা নয়। ওটা এবার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হবে। নীপার দিকে আঙুল তুলে বললাম।
একটা অট্টহাসির রোল উঠলো মিত্রাদের ওখান থেকে।
কিরে তোদের আবার কি হলো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
ঝেড়ে দিয়েছিস।
মিত্রা হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছে।
মৈনাক বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকাল।
তুই মাইরি এখনো সেরকমই আছিস। শোন আমি আসার পথে নীরুকে ফোন করলাম, বলে আমরা বেড়িয়ে পরেছি। ওরা এসে পরলো বলে।
তুইতো পুরো কেলো করে দিলি।
কিরে বুবুন।
মৈনাক আমার দিকে তাকাল, তোকে মিত্রা এখনো সেইনামে ডাকে।
হাসছি। মৈনাক নীরুকে ফোন করেছিল, ওরা এসে পরলো বলে।
ওরা এতো জোর হৈ হৈ করে উঠলো ভেতর থেকে বড়মা, ছোটমা, বৌদি বেরিয়ে এলো।
মিত্রারা ছুটে চলে গেল।
দেবা মৈনাককে ছোটমার সঙ্গে পরিচয় করাবার জন্য টেনে নিয়ে গেল।
চিকনা কাছে এসে বললো, গুরু কেশটা কি বলতো একটু খানি শুনেছি।
কিসের!

ওই যে তোর নতুন বন্ধু মৈনাক না কি যেন নাম।
আমি হেসে ফেললাম।
আরে বলনা, এখুনি সব চলে আসবে।
চিকনা ঠিক বলেছে অনি। আমাদের শোনা হয়নি।
আমি হাসছি।
হাসিসনা বলনা।
দেখলাম মৈনাককে নিয়ে ওরা ভেতরে যাচ্ছে।
একটা সিগারেট দে।
একটা না পুরো প্যাকেটটা দিচ্ছি।
চিকনা উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে পকেট থেক প্যাকেটটা বার করে দিল।
বল বল।
আমি হাসছি।
হাসিসনা বলনা।
আমি একটা সিগারেট ধরালাম। হুস করে ধোঁয়া ছেড়ে বলতে আরম্ভ করলাম।
সেদিন বসিরহাটে মৈনাকের এক আত্মীয় বাড়ি গেছিলাম। ফিরছি বিকেলের বাসে। থ্রিসিটে বসেছি। জানলার ধারে একজন মহিলা, কোলে একটা বাচ্চা। মাঝখানে মৈনাক সাইডে আমি। বাসটা ফাঁকা ফাঁকা। অনেকটা জার্নি। তাই বাসে ওঠার আগে দুজনেই তলপেট খালি করে নিলাম। এবার গিয়ে সিটে জমিয়ে বসলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়েছে। বাসের ভেতরে একটা মাত্র লাইট জ্বলছে। দুজনেই ঘুমিয়ে পরেছি। হঠাৎ মৈনাক হাঁই হাঁই করে চেঁচিয়ে উঠলো। ঘুম ভেঙে গেলো।
কিরে কি হয়েছে!
মৈনাক চুপ।
ভদ্রমহিলা যিনি জানলার ধারে বসেছিলেন তিনি মুচকি মুচকি হাসছেন। বাচ্চাটা ভদ্রমহিলার কোলে বেশ ছট-ফট, ছট-ফট করছে। মৈনাক নেন্টুর জায়গাটা ধরে বসে আছে।
আমি ভাবলাম ভদ্রমহিলা কি ওর নেন্টু টিপে দিল নাকি। মৈনাক একবার ভদ্রমহিলার দিকে তাকায় একবার বাচ্চাটার দিকে তাকায়। বাচ্চাটা তখনো হ হ করছে। চুপ করে গেলাম।
বাস থেক এসপ্লেনেডে নেমে মৈনাককে জিজ্ঞাসা করলাম কিরে কি হয়েছিলো তখন। তুই চেঁচিয়ে উঠলি কেন। ভদ্রমহিলা কি তোর গোপন জায়গায় হাত দিয়েছিল।
মৈনাক গম্ভীর। অনেক বার জিজ্ঞাসা করার পর বললো, কি হারামী বাচ্চারে।
আমি বললাম, কেন! কি হয়েছে ?
শালা আমার নেন্টু ধরেছিল।
তারমানে!
আজ জাঙ্গিয়া পরিনি। এতটা জার্নি ভেবেছিলাম পাছা গরম হয়ে যাবে।
তুই খালি পাছায় প্যান্ট পরেছিলি!
হ্যাঁ।
চেন খোলা ছিল!
হবে হয়তো।
চুল ধরে খামচা মেরেছে!
হ্যাঁ।
ওই জন্য তুই চেঁচিয়ে উঠলি!
মৈনাক মুখ ভেটকে বললো, কতগুলো চুল ছিঁড়েছে জানিস। শালা….
আমাকে আর শেষ করতে হলো না। ওরা তিনজনে হাসতে হাসতে মাটিতে শুয়ে পরলো।
বাসু হাসতে হাসতে বলে উঠলো ওরে অনি আমরা কি জিনিষ তোর এই বন্ধুরা এক একজন এক একদিকে দিকপাল।
চিকনা হাসতে হাসতে বেদম কেশে উঠলো।
মিত্রা আবার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
ছুটে আমার কাছে এলো।
ও হাসছে।
তুই এদের বলেছিস নিশ্চই।
কি করবো শুনতে চাইলো।
চিকনা তখনো খং খং করে কাসছে।
সত্যি, মৈনাকটা কিরে।
ম্যাডাম আপনি থামুন, আর বলতে হবে না। বাসু বলে উঠলো।
ফোনটা বেজে উঠলো।
দেখলাম কনিষ্ক।
ফনটা ধরতেই তেড়ে খিস্তি। তারপর বললো তোর মিত্রার বাড়ি খুঁজে পাচ্ছি না। মৈনাক হারামী এমনভাবে বললো, কিছুই বুঝতে পারলাম না। ওদের আবার ঠিক মতো ডিরেকসন দিলাম।
কেরে।
ডাক্তাররা আসছে।
এর মধ্যে আবার ওরা!
কেন তোর ভালো লাগছে না।
আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। তোর বন্ধু নয়তো এক এক জন এক এক পদ।
ম্যাডাম আপনি বলুন এদের ডাক্তার বলে মনে হয়। মনে হয়না এরা ছ্যাবলা। চিকনা বললো।
তবু ওরা ডাক্তার, ডাক্তারদাদা বলছিল ওদের বেশ নাম ডাক আছে।
আমার দিকে তাকাল, ভেতরে চল হলুদ মাখাবে বলছে বৌদি।
হলুদ আবার কেন।
তুমি জান না। চিকনা এমন ভাবে মুখ ভেংচালো মিত্রা হাসতে হাসতে আমাকে ধরে ফেলল।
চিকনারটা কিন্তু শোনা হয়নি।
মৈনাকদারটা শোনার পরও আমারটা শুনতে হবে।
মিত্রা হাসছে।
ভেতরে এলাম। ছোটমা এগিয়ে এলো। আমার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে মুখে হাসির ছটা।
তোর বন্ধু গুলো কি সব তোর মতো ?
কেন।
তোর গ্রামের বন্ধু আর শহরের বন্ধুর মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি না।
ডাক্তাররা আসছে।
ওদের কে বললো!
মৈনাক। বুঝতে পারছো এবার।
সবতো লন্ড ভন্ড করে দেবে।
অনির বিয়ে বলে কথা। এই জন্য অনি চুপি চুপি সারতে চেয়েছিল।
ছোটমা আমার মাথাটা টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেলো।
বাইরে গাড়ির তাড়স্বর হর্ণ বেজে উঠলো।
এইরে ওরা এলো। যাই দিদিকে গিয়ে বলি। ছোটমা ভেতরে গেল।
আমি বেরিয়ে এলাম।
সেদিন ছিলো ছয়জন আজকে আরও চারজন জুটেছে। সবাই হৈ হৈ করতে করতে ভেতরে এলো। বাকি চারজনের সঙ্গে ওরাই সবার পরিচয় করিয়ে দিল।
কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো। বড়মা, দাদা মল্লিকদা স্যারকে দেখতে পাচ্ছি না।
একটু বাইরে গেছে, এখুনি এসে পরবে।
ম্যাডাম এটা কি হলো। কথাছিল রবিবার। কনিষ্ক চেঁচিয়ে উঠলো। নীরু।
বলনা, ওরকম করিস কেন।
তোর সঙ্গে আগে অনির বিয়েটা সেরে নে, তারপর ম্যাডামের সঙ্গে হবে।
সেটা আবার কিরে। বড়মা বললো।
তুমি বুঝবেনা। দেখনা কি হয়। দুজনের এনগেজমেন্ট আজ থেকে আট বছর আগে হয়েছে।
মিত্রা আমার পাশে, সবাই চারিদিকে ভিড় করে আছে। ওরা আমাকে মিত্রাকে ঘিরে ধরে আছে। সবাই হাসা হাসি করছে। নীরু এগিয়ে এলো। বলনা তুমি আমাকে কবে বিয়ে করবে ? কবে ঘরে তুলবে ? চিরিদিক একবার দেখে নিলাম আমাকে কে কে লক্ষ করছে। খুব গম্ভীর হয়ে দিলাম নীরুর তলাটা টিপে। একমাত্রা মিত্রা ছাড়া কেউ বুঝতে পারল না। মিত্রা মুখে হাত দিয়েছে। নীরু অক করে দূরে সরে গেল, বটা চেঁচিয়ে উঠলো।
কিরে নীরু পেনিসিলিন না ট্যারামাইসিন ?
কনিষ্ক বড় বড় চোখ করে বললো, এরি মধ্যে অনি হাত….।
তবে। হাতকি সাফাই বলে কথা। বটা বলে উঠলো।
আমি গম্ভীর হয়ে হাসছি। নীরু গিয়ে সোফায় বসে পরেছে।
বাপ আমায় একটা সম্পত্তি দিয়েছে করে কর্মে খাওয়ার জন্য, তাও যদি হরণ হয়ে যায় থাকব কি নিয়ে।
ঘর ভর্তি সবাই হেসে উঠলো।
এরপর হলুদ মাখা মাখি হলো। কেউ বাদ গেল না। এমনকি ইসলামভাইকে পর্যন্ত হলুদ মাখান হলো। তার মধ্যেই কনিষ্ক গিয়ে বড়মার সঙ্গে কি কথা বললো। বড়মা খালি হেসে বললো তোরা দেখিস বাবা। তোদের বন্ধু।
কাল মিত্রা ঠিক কথা বলেছিল তোকে নিয়ে পুতুল খেলব। তুই না করবি না। আমি সত্যি আজ গোবর গণেশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এমনকি ভজুরাম, সে পর্যন্ত আমার মুখে হলুদ মাখিয়ে চলে গেল। কি আনন্দ তার। এতগুলো লোকের আতিথেয়তার কোন খামতি ওরা রাখে নি।
যে যার ইচ্ছে মতো ছবি তুলছে। হৈ হট্টগল হাসা হাসি। একমাত্র দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা এখনো ফিরল না । মনে হয় অফিসের দিকে একবার গেছে।
হলুদ মাখা মাখি শেষ হতেই কনিষ্করা আমাকে এসে ঘিরে ধরলো। ম্যাডাম অনিকে একটু ছাড়তে হবে। মিটিং আছে ওর সঙ্গে।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল, ওকে ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম, না বল। ও তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। ব্যাপারটা এরকম ডাকছে যখন যা না।
অনি ম্যাডাম না বললেও তোকে তুলে নিয়ে যাব এটা মাথায় রাখিস। বটা বললো।
বুঝলাম বেগতিক।
বড়মা, ছোটমা, বৌদি হাসে।
বটা চেঁচিয়ে উঠলো বড়মা কোন ঘরে।
তোরা কি এখনই করবি ওই সব।
হ্যাঁ।
তাহলে ওই ঘরে যা। স্নানটা সেরে নিলে হতো না।
আমি খালি শুনে আঁচ করার চেষ্টা করছি ওরা কি করতে চায়।
ওটা পরাস না চুলকুনি হবে।
ওষুধ দিয়ে দেব তোমায় ভাবতে হবে না।
এ ওর মুখের দিকে তাকায়।
নীরু মাল গুলো নিয়ে আয়।
নীরু লাফাতে লাফাতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। ওরা আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ঘরে চলে গেলো।
হৈ হৈ রৈ রৈ। হাসা হাসি।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো।
শালা তুই সবাইকে ভুগিয়েছিস এবার তোকে একটু ভোগাই।
বলবিতো কি। কি করতে চাস তোরা।
পাজামা পাঞ্জাবী খোল।
নেংটো হয়ে নৃত্য করবো।
দরজা ধাক্কা দেবার শব্দ। বটা দরজা খুললো। নীরু ভতরে এলো।
সোহাগী তুমি আজ আমায় একটু ঝেঁটার বাড়ি মার।
গান্ডু।
দেখলাম বটা প্লাসটিকের প্যাকেট থেকে সেই ওঝার জামা কাপর কৌপিন উইগ দাড়ি গোঁফ বার করেছে। কমন্ডুল লাঠি। এমনকি সিঁদুর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
ওরে শালা এগুলো কোথা থেকে নিয়ে এলি।
কনিষ্ক সিগারেট বার করে দিল।
নে নে দু’টান মেরে নে।
ধরালাম।
কিরকম দিলাম বল। অনিকেত বললো।
দারুণ। শালা নীরুর কথা মনে পরে যাচ্ছে। এই হারামী নীরু।
বলনা।
একটু নারকেল তেল আর একটা ছেঁড়া কাপরের টুকরে বড়মার কাছ থেকে নিয়ে আয়।
নীরু দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
একটু ফাঁক হতেই দেখলাম সবাই উৎসুক চোখে ঘরের দরজার দিকে চেয়ে বসে আছে।
হ্যাঁরে কনিষ্ক বড়মা বলছিল পরলে চুলকোবে সেটা কি রে।
গান্ডু সব দিকে কান আছে। অনেক কষ্টে নীরুর রুম থেকে তোর কৌপিনটা খুঁজে বার করেছি, বাকি সব কিনে এনেছি।
আবার নীরুর ঘাড় ভেঙেছিস!
তাহলে কি, শালা পেটে হাত বুলিয়ে বহুত কামাচ্ছে।
খোল খোল দেরি করিস না।

দাঁড়া না মুখটা মুছি আগে।
নীরু দরজা ধাক্কালো দেখলাম মৈনাক, দেবা নীরুর সঙ্গে ঢুকলো।
তোরা এলি কি করতে ?
হারামী সেদিন গল্প বলেছিস, আজ দেখি ভাল করে।
বটা এটা কি হলো। মৈনাক বললো।
কেন তোর আবার কিসের চুলকুনি।
অনি হারামী সেই কেশ পর্দাফাঁস করে দিয়েছে। কচি কচি মেয়েগুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
প্যান্টের চেন খুলে রাখবে ধরলেই দোষ।
তোরা ওর একটা কিছু বার কর।
ও এখন কাপর ছাড়ছে, পারলে একটু হাত বুলিয়ে দে, দেবা মোবাইলে ছবি তুলে রাখছে।
বোকা…।
পুরো দেনা। আজ কেনো আধা আধা বাপের কথায় সুতো বাঁধা।
আমি হাসছি।
হাসিস না তোর মালটা অনেক দিন পর ঝারলাম।
ওরা পুরোটা জানে।
মৈনাক শালা জানে, দেখছিস না মুখ ফোলাল।
কিরে অনি কলসি থেকে জল গড়িয়েছিস। কনিষ্ক বললো।
চেঁখে দেখেছি।
নোনতা না মিষ্টি।
দুটোর মাঝামাঝি।
শালা, দুদিন পরতো আমি দেখবই। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
তার আগে তোর বউটাকে নিয়ে একরাত দীঘায় কাটিয়ে আসব।
দেখলি দেখলি বটা অনি কি কথার কি মানে করলো।
কেন তুমি বাচ্চা দেখতে গিয়ে হাত ছোঁয়াবে ও করলেই দোষ।
তাহলে আমরা সবাইকে করি।
সবাইকে করো না ওর বউকে করবে।
নীরু চুপ করে গেল।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী খুলে সেই রক্তবর্ণ চেলি পরলাম। মাথায় উইগ দাড়ি গোঁফ। মাথায় লাল টিপ লম্বা করে। বরং সেদিনের থেকে একটু সময় নিয়ে ভাল করে সাজলাম।
ওরা ভেতরেই হৈ হৈ করে উঠলো। দরজায় দু’চারবার ধাক্কার আওয়াজ পেলাম।
গুরু সেদিনের মতো একটু করবে। নীরুকে ফিট করছি, বাইরে গিয়ে। বটা বললো।
ঝাঁটা লাগবে।
তুই শালা আমাকে আজও ঝেঁটা মারবি। নীরু চেঁচিয়ে উঠলো।
ঠিক আছে, তাহলে হবে না।
অভিনয় করতে গেলে কয়েকটা ঝাঁটার বাড়ি খেতেই হবে। কনিষ্ক বললো।
ক্যানসেল।
বটা আমি কিছু জানিনা। কনিষ্ক বললো।
তুই আজকে কনিষ্কের ভূত ছাড়া। নীরু বললো।
সেকিরে, আমাকে কি ভূতে ধরেছে।
তাহলে মৈনাকের।
আমাকে ক্ষমা দে। সকাল থেকে অনি আমার প্রেসটিজ পিসে মেরে দিয়েছে।
ঠিক আছে তোদের মন রাখতে আমিই বলির পাঁঠা হই। নীরু বললো।
নীরু দরজা খুলতেই দেখলাম মিত্রারা সবাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে এক ঝলক দেখে ওদের সে কি হাঁসি।
সবাই গড়িয়ে পরে। খালি কানে এলো, বড়মাগো তোমার ছেলেকে দেখবে এসো।
দরজা বন্ধ।
আমি রেডি হলাম।
তোকে কিন্তু দারুণ মানিয়েছে অনি। দেবা বললো।
তুই শালা সব মোবাইলে তুলেছিস ?
হ্যাঁ।
অদিতিকে দেখিয়ে খুশবু নিবি।
মিত্রাকেও দেখাব।
হারামী।
দরজা খোলা হলো। আমি বেরলাম। গম্ভীর মুখশ্রী। আমাকে দেখে সকলে এতো জোরে হেসে উঠলো। নীরু ব্যাটা পর্যন্ত উঠে দাঁড়াল। আমার ভূত পালিয়ে গেছে অনি তোকে আর ভূত ছাড়াতে হবে না। ওরা যে যার ইচ্ছে মতো ছবি তুলছে। দাদা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা হাসতে হাসতে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে।
বটা এগিয়ে গিয়ে বড়মাকে ধরে নিয়ে এলো আমার সামনে। দেখ তোমার ছেলেকে চিনতে পারো। তবু মেকআপটা সেদিনের মতো হয় নি।
বড়মা আমার মুখে হাত দিয়েছে।
কনিষ্ক বলে উঠলো হাত দিও না খুলে যাবে।
সে এক হৈ হৈ ব্যাপার।
চিকনা এসে শাষ্টাঙ্গে প্রণাম। বড়মা এতো গুণীনকাকার বাবাগো।
আবার হাসির রোল।
ছোটমা এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। মিত্রা এসে আমার দাড়িতে একবার হাত বোলাল। যে যার ইচ্ছে মতো ছবি তুলছে, হাসছে। সুরো এগিয়ে এসে আমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো সত্যি অনিদাতো।
নীরু বড়মাকে জড়িয়ে ধরে বললো দেখছো এইবেশে সেদিন আমাকে ঝেঁটার বাড়ি মেরেছিল। যতো নষ্টের গোড়া ওই কনিষ্ক।
বড়মা হাসছে।
এবার খুলে ফেলি কুট কুট করছে।
তোরা ওকে ওইটা পরিয়েছিস! বড়মা বললো
পরাব না মানে।
বড়মা আমার কাপরে হাত দিল।
এই দ্যাখো, দাঁড়াও সবাই আছে।
আবার হো হো করে হাসি।
খোল তুই আগে।
ঘরে যাই।
এখানে খোল।
ভারি মজা না। পাগলাম করবে না।
তোরা এরকম করলে, পাগল হতে কে বাকি থাকবে।
দামিনী মাসি কাছে এসে মুখে কাপর চাপা দিয়েছে। ভাল করে আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
নীরু কাছে এলো, অনি সেই ডায়লগটা একবার দে কানে এখনো বাজে।
ফিস ফিস করে বললাম হারামী।
বড়মা দেখছো, অনি গালাগালি দিচ্ছে।
ওরা যে যার ওদের মতো হাসছে।
ইসলামভাই এগিয়ে এলো। মোবাইলটা মিত্রার হাতে দিয়ে বললো, মামনি আমার সঙ্গে সাধুবাবার একটা ছবি তুলে দে।
সবাই ছবি তুললো আমি বড়মা ছোটমা দামিনী মাসি বৌদি একটা ছবি তুললাম। মিত্রার সঙ্গে আলাদাকরে ছবি তোলা হলো, বিভিন্ন পোজে। দাদার সঙ্গে ছবি তুললাম। ওরা যে যার ইচ্ছে মতো ভিডিও স্টিল করছে। আমার মোবাইলটা নিয়ে এসে মিত্রা ইচ্ছে মতো ছবি তুললো। শেষে আমি উইগ খুলে বাথরুমে ঢুকলাম।
ভালো করে স্নান করলাম। মিত্রা এসে পাজামা পাঞ্জাবী দিয়ে গেল। স্নান সেরে বেরলাম।
মিত্রা দেখলাম আমার আগে রেডি হয়ে গেছে। এগিয়ে এসে আমাকে চিরুনিটা দিল। আমি চুলটা আঁচড়ালাম। খাওয়ার জায়গা করা হচ্ছে। কর্নারের টেবিলে ভিড়, সবাই চেঁচা মিচি করছে হাসছে।
ওখানে কি হচ্ছে রে ?
সবার তোলা ছবি টিনা ল্যাপটপে লোড করছে।
কোন ছবি।
গায়ে হলুদ তোর ওঝা সাজা।
অনিদা। মিলি এদিকে ফিরে ডাকলো।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
ঋতি অনুযায়ী বাড়ির সকল গুরুজনকে আমি মিত্রা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।
ডাক্তারদাদা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, যাই বল অনি তোর গল্পের সঙ্গে চরিত্রটা বেশ মানানসই।
মল্লিকদার হাসি আর থামান যায় না।
আমি মল্লিকদার দিকে তাকালাম।
তাকাস নি। একটা আর্টিকেল নামাচ্ছি জমপেশ করে। সাধুবাবার কাহিনী। টিনাকে বলেছি ছবিগুলো বেছে রাখ কাজে লাগাব।
ছোটমা এসে ঘরে ঢুকলো। পেছনে বৌদি। দুজনের হাতে মিষ্টির প্লেট, জলের গ্লাস।
কি হয়েছে গো।
অনিকে বললাম ওই কথাটা।
ছোটমা টেবিলে মিষ্টির প্লেটটা রেখে হাসতে আরম্ভ করলো।
কিরে ছোট। বৌদি বললো।
ও অনিকে নিয়ে লিখবে, সাধুবাবার কাহিনী।
সত্যি দেখ, এখন ওকে দেখ, তখন কিরকম সেজেছিল। আমি সুরোর মুখ থেকে শুনেছিলাম, বিশ্বাস করিনি, আজতো দেখছি সত্যি ও এসব করেছিল।
মৈনাকের কথা তখন শুনলে না।
মিত্রা হেসে ফেললো। ছোটমা বৌদি দুজনেই হাসে।
দাদা বললো ছোট এই ব্যাপারটা আবার কি।
আপনাকে শুনতে হবে না।
আচ্ছা থাক।
সব কিছুতে তোমার ইন্টারেস্ট কেন এডিটর।
দাদা হাসছে।
খাবার জায়গা করেছি, চলুন বসে পরবেন।
ওরা বসুক আগে।
সবাই একসঙ্গে। এরপর অনেক কাজ।
ওরা সবাই বেরিয়ে গেল। ছোটমা বেরবার আগে বললো।
বৌদি তুমি ওদের দুটোকে মিষ্টিগুলো খাইয়ে এসো।
আমি বৌদির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।
তুই এতো করার সময় পেতিস কি করে বলতো।
আমি না কনিষ্ক।
কনিষ্ককে জিজ্ঞাসা করলে বলে এসবের হোতা অনি। তোকে জিজ্ঞাসা করলে বলিস কনিষ্ক।
নে খেয়েনে দু’টোতে।
একটা খাব বৌদি। বাকিটা মিত্রা খাক।
আমি কি রাক্ষস নাকি। তুই খা।
তুইতো খেতে ভালবাসিস।
এই শুরু করলি।
কিরে দুটো মিষ্টি খেতে বেলা বইয়ে দিলি যে।
ছোটমা আবার ঘরে ঢুকলো।
নে নে, খেয়ে নে।
আমি একটা খাব।
আমিও।
তোরা কি যুক্তি করে চলছিস।
হাসলাম। ওরা খেতে বসেছে।
দেখনা গিয়ে একবার, নীরুটাকে নিয়ে কি করছে, ও বেচারা প্লেট হাতে নিয়ে দিদির পেছন পেছন ঘুরছে।
দাঁড়াও আমি যাই। না হলে ওরা থামবে না।
মিষ্টিটা খেয়ে নে।
আমি একটা নিয়ে মুখে দিলাম। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুই খেয়ে আয়।
আমি আসতেই নীরু বলে উঠলো, অনি তুই বল, আমাকে এরা একটু শান্তিতে খেতে দেবে না ?
অনি একবারে এদিকে মাথা গলাবি না। আজ তোর বিয়ে। বটা চেঁচিয়ে উঠলো।
ওকে খেতে দে।
ওকি শুঁকছে। দুবার নেওয়া হয়ে গেছে। জিজ্ঞাসা কর মাসিকে। কনিষ্ক বললো।
দামিনী মাসি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আচ্ছা তুই মিলিদের কাছে বসবি চল।
ওকিরে! ওরতো আছে তার ওপর উপরি। কনিষ্ক বলে উঠলো।

যতই হোক ঝাঁটা পেটার গুণ বুঝলি কনিষ্ক। বটা বললো।
মিলিরা মুখ নীচু করে হাসছে।
অনি একটা বোম ঝারবো। নীরু বললো।
দাঁড়া খেয়ে উঠি তোর বোম ফাটাব। কনিষ্ক বললো।
দেখলি অনি দেখলি, এবার তুই সামলাবি।
মিত্রা ঘর থেকে বেড়িয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
কেন তুই বলতে পারছিস না। তোদের আমার কাছে আসতেই হবে।
বটা হয়তো আসবে, কনিষ্ক আসবে না।
কেন।
তোকে পরে বলবো।
পরে বলাবোরে ছাগল। এখন মাংস চিবচ্ছি হারগুলো তোর খাব।
বড়মা তুমি এখান থেকে যাও তো। কনিষ্ক চেঁচাল।
কেন বড়মা থাকলে তোর অসুবিধা আছে।
আছে। তোকে ধুতে পারছি না।
কাচলি কোথায় যে ধুবি।
সবাই হাসে।
নীরু তুই বরং বাড়ি চলে যা। আমি বললাম।
কখনই না। বাড়িতে বলে এসেছি রাতে খাব না। চেম্বার বন্ধ করেছি।
বটা দেখতো পকেটটা।
কেন।
চেম্বার বন্ধ করেছে আজ, তারমানে আজকের কামাই গতকাল করে নিয়েছে।
সকালে অনির ড্রেস কিনতে ফুটে গেছে।
অনির জন্য কি কিনেছিস। বড়মা ফুট কাটল।
ওইযে লাল কাপড় দাড়ি। দেখলে না।
বড়মা না হেসে থাকতে পারল না।
কনিষ্ক একবার কট কট করে তাকাল নীরুর দিকে।
আমি হাসছি।
ম্যাডাম, বিয়ে অনি করছে, হনিমুন স্পট বেছেছেন। কনিষ্ক বললো।
তোমাদের বন্ধু জানে।
কিরে অনি, ভালোপাহাড় ?
আমি হাসছি।
সেটা আবার কোথায়! মিত্রা বললো।
কেন আপনাকে বলেনি!
না।
ওটা একটা পাগল বুঝেছেন ম্যাডাম। তবে ওর পাগলামির সামিল আমরাও।
এতে একটা উপকার হয়েছে। টাকা পয়সা কিছু জোটেনি। প্রচুর মানুষ দেখেছি, আর প্রণভারা ভালবাসা কি জিনিষ তা অনুভব করেছি।
কনিষ্ক ক্যাজুয়েলি কথাটা বললো, কিন্তু কথাটার মধ্যে এতটাই সংবেদনশীল মনের পরিচয় দিলো, সারা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
চুপচাপ সবাই খেয়ে যাচ্ছে।
তুই এর মধ্যে কি ওখানে যাবি। বটা আমার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো।
দেখি।
গত সপ্তাহে অনিকেত গেছিল। শ্যামের কাছে ওষুধ পত্র দিয়ে এসেছে। নীরু তুই কবে যাবি।
মঙ্গলবার যাওয়ার কথা।
ম্যাডাম একটু সন্দেহের চোখে দেখছেন আমাদের। ব্যাপারটা ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না।
কনিষ্কের কথায় মিত্রা ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে।
কনিষ্ক হাসলো। অনির গল্প বলতে গেলে মাস পাঁচেক টানা বলতে হবে। তবে যদি শেষ হয়।
একটু থেমে।
মাসি।
দামিনী মাসি সারা দিলো।
কিগো থামলে কেন। গোটা চারেক ঠ্যাং নিয়ে এসো।
আবার সবাই নিজের জায়গায় ফিরে এলো।
এই ফাঁকে নীরুর খাওয়াটা শান্তিতে হলো। ওরা খেয়ে দেয়ে উঠলো। হাতমুখ ধোয়ার পর কনিষ্ক মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো, ম্যাডাম একটু মাঠের দিকে গিয়ে বসলে হতো না। মিত্রা আমার দিকে তাকালো। আমি ইশারায় বললাম, যা।
আরে ওর পার্মিসন নিতে হবে না। আপনি চলে আসুন।
তুই আপনি বলছিস কেন। মৈনাক বললো।
মাঠে চল, আর ইসলামদার কাছ থেকে একটু পোড়া তেল নিয়ে আয়।
সবাই কনিষ্কের কথায় হাসে।
দেখলি অনি কনিষ্কের কথার ছিড়ি দেখলি।
মাঠে চলে যা।
ওরা সব দঙ্গল বেঁধে মাঠে গেল। আমি কিছুক্ষণের জন্য ওদের সঙ্গে গেলাম। তারপর বাড়ির ভেতরে চলে এলাম। ওখানে জোর আড্ডা চলছে। আমি এসে দাদাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম।
ওরা কেউ খেল না। বললো রাত্রি বেলা খাবে। আগে কাজ মিটুক। এমনকি ইসলামভাই পর্যন্ত খেল না। একফাঁকে একবার ইসলামভাইকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কিগো রতনরা কই।
চলে আসবে সন্ধ্যার সময়।
তুমি একটা কাজ করতে পারবে।
বল।
একটু অবতার সাগির আর লক্ষ্মীকে আনতে পারবে।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকাল। চোখে জিজ্ঞাসা।
নিয়ে এসো না, আমি বলছি, কিছু হবে না।
দামিনীকে একবার বলি।
বলতে হবে না। কিছু বললে আমার ঘারে দোষ চাপাবে।
ঠিক আছে আমি রতনকে বলে দিচ্ছি।
বলে দাও।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়ে এলো। আমি বড়মাদের কাছে বসে গল্প করছি। ওরা বাগান থেকে উঠে এসে ওপরে মিত্রার ঘরে সবাই গল্প করছিল। হঠাৎ চিকনা চোখ মুখ লালকরে আমার কাছে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরলো, হাউ হাউ করে কান্না। ওর সেই কান্না থামান যায় না।
দেখলাম কনিষ্ক, অনাদি, বাসু, মিলি সবাই নিচে নেমে এসেছে।
এই দেখ পাগলাম করে। কি হয়েছে বলবিতো। কে তোকে বকেছে।
ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।
কিরে বাসু তোরা কিছু বলেছিস চিকনাকে।
সকলে অবাক।
না।
তাহলে।
কনিষ্কদা তোর সম্বন্ধে গল্প করছিল ও উঠে চলে এলো। তখনই ওর মুখ চোখের অবস্থা দেখে বুঝেছি ও তোর কাছে আসছে।
দূর পাগল কনিষ্ক সব বাজে কথা বলছে আমার সম্বন্ধে, সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে, একটাও সত্যি কথা নয়।
তবু ওর কান্না থামে না।
আমি ওকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম, ওর কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে খেলাম, বোঝালাম।
তারপর ওর কান্না থামে।
বাগান থেকে পায়ে পায়ে ভেতরে এলাম। দেখলাম কনিষ্কর পায়ের কাছে সাগির, অবতার বসে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে বাড়ির সকলে। আমি কাছে গেলাম।
কি হলো কনিষ্ক ?
আর বলিসনা। পায়ে ধরে কেঁদে গড়িয়ে পরছে।
কিরে অবতার আবার কি হলো ?
দুজনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে।
যা আজ কোন কথা নয়। অনিদার বিয়ে খেতে চেয়েছিলি। তাইতো ?
দুজনে মাথা নাড়ে।
যা ভেতরে যা, অনেক কাজ। হাতে হাতে সবাই কাজ কর।
ওটা ঠান্ডা হয়েছে। চিকনাকে দেখিয়ে কনিষ্ক বললো।
হ্যাঁ।
পুরো কাদামাটিরে অনি।
হাসলাম।
মিত্রা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।
সবাই ভেতরে এলাম।
এবার লোকজন আসতে শুরু করেছে। মনে হলো সত্যি সত্যি বিয়ে বাড়ি।
ব্রাহ্মণকে দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ রক্তবর্ণ পোষাক, দেখে মনে হচ্ছে তান্ত্রিক হবে। মিত্রার সিলেকসন। অনিমেষদা, বিধানদা, অনুপদা, রূপায়ণদা ঠিক সময়ে এলো। নিরঞ্জনদা নিয়ে এসেছে। হিমাংশু ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। বিয়ের আয়োজনের কোন খামতি নেই দেখলাম। সব মিত্রা, ছোটমা, বড়মার ইচ্ছে অনুসারে হচ্ছে।
সন্দীপ, অর্ক, অরিত্র এসেছে। যে যার মতো মজা লুটে নিচ্ছে।
আমার ডাক পরলো, বৌদি ছোটমা মনের মতো করে সাজাল। বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। মিত্রাকে বড়মা নিয়ে এলো। ঘন্টা চারেক সময় লাগল। বুঝলাম না কি মতে বিয়ে হলো। যা বললো তাই করে গেলাম। কিছু বাদ থাকলো না।
মিত্রা একটা বেণারসী পরেছে কিন্তু দেখে মনে হলো খুব জমকালো নয়। বাসন্তী রং। বেশ সুন্দর। কেমন যেন পুরনো পুরনো। ডাক্তারদাদা কন্যা সম্প্রদান করলেন। হৈ হৈ করে বিয়ে হয়ে গেল। সবাই খুব খুশি। প্রচুর ফটো তোলা হচ্ছে বুঝতে পারলাম।
কার হাতে ক্যামেরা নেই। কনিষ্করা ইয়ার্কি ফাজলামর চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেল। যে যেমন ভাবে পারে আনন্দ করছে। আমি খালি একটা কথাই মনে মনে বললাম, মিত্রা বলেছে, আজকের দিনটা তুই আমাকে দিবি, আমি যেমন ভাবে তোকে দেখতে চাইবো, তুই দেখাবি।
আমি অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করলাম। সই সাবুদ হলো। আমার পক্ষে দাদা, মল্লিকদা, অনিমেষদা মিত্রার পক্ষে বড়মা, ছোটমা, বৌদি।
সব কাজ শেষ হতে হতে বেশ রাত হলো। একসঙ্গে বসে খাওয়া হলো। আমার ডাক্তারবন্ধুরা চলে গেল, যাবার আগে বড়মাকে বলেগেল, রবিবার সকাল থেকে এসে জ্বালাবে।
দাদা, বড়মা, মল্লিকদা, ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, নীপা, আরও সবাই ও বাড়িতে চলে গেল। কিছু এ বাড়িতে রয়ে গেল। কাল যাবে আমার সঙ্গে। দামিনী মাসি ফিরে গেল। কাল সকালে আসবে।
রাত একটার সময় আমি মিত্রা শুতে এলাম বড় বৌ-এর পোষাকে। ছোটমা বৌদি মিত্রার ঘরে দুজনকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করলো। আমি ঘরের চারিদকটা চেয়ে চেয়ে দেখছি। গত দশমাস আগে এই ঘরটাই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সব ঘটনা হুড়মুড় করে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। মিত্রা আমার একেবারে কাছে। মুখের দিকে তাকিয়ে। ওর ভাসা ভাসা চোখ দুটো আনন্দে আত্মহারা। আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আবার কি হলো। মন খারাপ করিস না।
না বুবুন আজ আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন।
কেন এতদিন কি নিরানন্দে ছিলি।
না।
তাহলে।
এতদিন আমার কোনো অভিভাবক ছিল না। আজ আমি একজন অভিভাবক পেলাম।
বলতে যাচ্ছিলাম ডাক্তার। মুখে এসেও বলতে পারলাম না। মনে পরে গেলো, এই মধু রাত শুধু তোমার আমার।
এই দেখো বোকা বোকা কথা বলে।
মিত্রা আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে।
আমি ওর মুখটা বুক থেকে তুললাম, প্রস্ফুটিত পদ্ম। দীঘির বুকে জল টল টল করছে। হাওয়ার দোলায় ফুলের পাঁপড়ি থিরি থিরি কেঁপে কেঁপে উঠছে। কেন জানিনা আজ মিত্রাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। হয়তে নববধূর বেশে ওকে আগে কখনো দেখিনি বলে।
তোকে এতো সুন্দর করে কে সাজিয়েছে।
মিলি, অদিতি, টিনা।
দারুণ মিষ্টি সাজিয়েছে তোকে। এই দেখো আবার চোখে জল আসে।
আজ আমাকে একটু কাঁদতে দে।
কেন।
তোকে সম্পূর্ণ দিতে পারলাম না। কিছুটা দিলাম।
তুই সম্পূর্ণ নোস, একথা কে বললো ?
আমার বিবেক।

ভুল কথা। সময় বলে একজন ব্যক্তি আছে জানিস। সে সর্টিয়ালি করে তোকে আমার কাছ থেকে কিছুটা সময় আলাদা করে দিয়েছিল। মনের দিক থেকে আমরা এক ছিলাম।
সেটা তুই মন থেকে মনে নিয়েছিস, আমার মনের মধ্যে সেই খচ খচানি এখনো রয়েগেছে।
কেন আমি তোকে কিছু মনে করিয়ে দিয়েছি।
না।
তাহলে এরকম ভাবিস না। তুই কষ্ট পেলে, আমিও যে কষ্ট পাই।
জানিস বুবুন। আজ আমি যা চেয়েছিলাম তাই পেয়েছি।
তাই ? আমি কিন্তু আজ একটুও দুষ্টুমি করি নি।
মিত্রা আমার ঠোঁটে একটা চুমু খেলো।
আমি তোর মতো এখন সাধনা করি।
কি রকম ?
তুই বলিসনা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সাধনা করবে সেই মাটি পর্যন্ত জানতে পারবে না তুমি কিসের সাধনা করছো।
তাই!
মিত্রা চোখ বন্ধ করে মিষ্টি করে মাথা দোলাল।
আমি সকলকে এই জ্ঞানটা দিই।
হাসলাম।
দেখলাম আমিও সফল।
তাহলে আমি ভুল নয় এটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি বল।
নিশ্চই।
তোকে আমি আজ কয়েকটা কথা বলবো কয়েকটা জিনিষ দেখাব। তুই আমাকে ভুল বুঝবি না।
কেন একথা বলছিস।
হয়তো তুই ভাবতে পারিস মিত্রা নিজেরটা গুছিয়ে নিয়ে এইগুলো দেখাচ্ছে। আগে দেখালে হয়তো এই কাজটা করতাম না।
কেন ?
তোকে হারাবর ভয়ে এইগুলো এতদিন গোপন করেছি, বলতে পারিস এই দিক থেকে আমি ভীষণ স্বার্থপর।
তুই স্বর্থপর হলে, আমি তোর পাশে থাকতাম না।
ঠিক বলছিস ?
হ্যাঁ।
তোকে দেখালে তুই তোর মিত্রাকে ভুল বুঝবি না।
একটুও না।
আমাকে ছেড়ে চলে যাবি না।
একবারে না।
তোকে দাখাব। তুই জ্যোতিষ দাদাকে দেখলি।
কোথায়! কখন এসেছিলো।
বাবাঃ চারঘন্টা ধরে মন দিয়ে তার মন্ত্র উচ্চারণ করে আমাকে অতো যত্নো করে গ্রহণ করলি, আর বলছিস চিনতে পারলাম না।
ওইটা তোর জ্যোতিষদাদা!
হ্যাঁ।
তুই ছাড়া আমরা এখন সবাই ওনার নেওটা।
দেখে মনে হলো ভদ্রলোকের একটু আধটু পড়াশুন আছে।
একটু আধটু নয় অগাধ। যাওয়ার সময় কি বললো জানিষ।
কি।
আজকের দিন না হলে উনি তোর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন।
কেন বার খাওয়াচ্ছিস, আমি কি অবতার না সুপার ম্যান ?
তা জানি না। তবে উনি বললেন, ও পৃথিবীতে এসেছে মানুষের উপকার করতে। কিন্তু নিজে বড় দুঃখী। শাস্ত্রকে যদি মানি তন্ত্রসাধনাকে যদি বিশ্বাস করি, তাহলে তুই ঈশ্বরের অংশ বিশেষ।
তোর বংশের কেউ না কেউ একদিন সন্ন্যাসী ছিলেন। তুই অনেক বড়ো বংশের ছেলে। তোদের বংশের মূল জিনটা তুই বহন করছিস।
আমার বংশই নেই, তায় আবার সন্ন্যাস। সাতপুরুষের কাউকে চিনি না। এমনকি নিজের রক্তের সম্পর্কের কাউকে আজও পর্যন্ত চোখে দেখি নি।
তুই কাল মায়ের ফটোটা নিয়ে কাঁদছিলি। বার বার জানতে চেয়েছিস তোর শেকড়।
তুই জানলি কি করে।
আমি যে তোর অস্ফুট চাওয়া গুলো লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি।
তুই শুনেছিস!
মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো। আমি তোর শেকড়ের সন্ধান দেব।
তুই! কোথা থেকে পেলি ?
চুরি করেছি।
কোথা থেকে ?
তোর মায়ের আলমাড়ি থেকে।
তাই!
হ্যাঁ।
কি করে বুঝলি।
তোর পথে হেঁটে। প্রথমে ভীষণ ভয় করছিল। তারপর হাঁটতে শুরু করলাম। কি মজা। নেশা ধরে যায়।
আমি মিত্রাকে বুকের সঙ্গে জাপ্টে ধরলাম।
তোর সঙ্গে কতো কথা আছে। তোকে না বলতে পেরে আমার পেট ফুলে যাচ্ছে।
কেন আমি তোর কাছেই আছি।
দুদিন ট্রাই করলাম, তুই ঘুমিয়ে পরলি। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল তোকে জাগাতে।
ডাকতে পারতিস।
মন থেকে সায় দেয়নি, বিশ্বাস কর।
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে খাটে এসে বসলাম।
জানিস মিত্রা আজ বার বার এই ঘরটার কথা মনে পরে যাচ্ছে।
কেন।
তুই আমাকে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালি। তারপর রাতে এই ঘরে ওই সোফাটায় দুজনে বসলাম। আমার কাঁধে মাথা রাখলি। ওই দিন পর্যন্ত আমার জীবনটা একটা খাদে বইছিল। আট আটটা বছর ধরে সযত্নে তাকে লালিত পালিত করেছি। এক লহোমায় তুই সব ওলট পালট করে দিলি।
তুই আমাকে তোর সব কথা এখনো বলিসনি।
কে বললো তোকে।
কনিষ্ক আজ মাঠে বসে কিছু কথা বললো।
আমি বালিশটা টেনে নিয়ে বিছানায় শুলাম। মিত্রা আমার বুকের ওপর উঠে এলো।
কনিষ্ক আর নীরু কিছুটা আমাকে চিনেছে। তবু আমি ওদের সময় দিতে পারি না। আমার দেখান পথে ওরা এখনো হাঁটে। বাকি সব ধ্বজা ধরা।
কনিষ্কর কথা শুনে আজ চিকনা কেঁদে ফেললো।
সত্যিতো মনে পড়ে গেছে, চিকনা তখন ওরকম ভেউ ভেউ করে কাঁদল কেন বলতো।
তুই বল কি কথা শুনলে চিকনা কাঁদতে পারে। আর কেউ ওর মতো কাঁদল না। মন খারাপ হয়েছিল সকলের।
কি করে বলবো।
তুই তোর জীবনের একটা রাত জেলে কাটিয়েছিস।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, বোঝার চেষ্টা করলাম কনিষ্ক কতটা ওদের বলেছে।
কিরে তাকিয়ে আছিস কেন। সাজিয়ে নিচ্ছিস কি ভাবে গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলবি।
হাসলাম। ছিলাম।
কই আগে বলিসনি ?
বলে কি করবো। তোর মনের মধ্যে করুণার উদ্রেক জাগাব। বলবো আমার এইসব কথা শুনে মিত্রা তুই আমাকে আরো ভালবাস।
আমি সে কথা তোর মুখ থেকে শুনতে চাইনি।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে এরকম ঘটনা ঘটে, খালি স্ফেয়ারটা আলাদা।
কনিষ্কর কথা শুনে বড়মা, ছোটমা, দামিনী মাসি, ইসলামভাই পর্যন্ত চোখের জল ফেলেছে।
কনিষ্ক ভুল করেছে।
কনিষ্ক ভুল করেনি, কনিষ্ক ঠিক কথা বলেছে। মৈনাক যদি ওকে না খোঁচাত তাহলে তোর এই কথা আমরা কোনোদিন জানতে পারতাম না। তুই নিজের মুখে কোনদিন কোন কথা বলিস না।
তোরা সবাই আমাকে দেবতা বানিয়ে দিচ্ছিস। কিন্তু আমি যে সাধারণ মানুষ। খুব বেশি হলে বলতে পারিস তোদের থেকে আমার জীবনের গতিপথ একটু আলাদা।
কনিষ্কর কথা শুনে আমারও কান্না পেয়েছিল। কিন্তু কাঁদিনি। মনটাকে শক্ত করেছি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি তোর এতো কষ্টের স্বপ্নগুলো সার্থক করবো।
হয়তো কিছুটা হবে, সব হবে না।
তখন মৈনাক হাঁসতে হাঁসতে কনিষ্ককে বললো, কনিষ্ক অনি সবার কিছুনা কিছুনা বার করে প্রেসটিজ গ্যামাকসিন করে দিচ্ছে। তুই ওকে আমাদের থেকে বেশি চিনিস। ওর একটা কিছু বল, একটু মজা করি।
কনিষ্ক বললো বললে সহ্য করতে পারবি।
আমিও তালে তাল দিলাম। বিশ্বাস কর পরে এরকম ঘটতে পারে বিশ্বাস করিনি।
সেদিন তুই কনিষ্ক দুজনে শেয়ালদায় পথ শিশুদের স্কুলে পড়িয়ে বেরনর সময় কনিষ্ক তোকে খেতে বলেছিল।
হ্যাঁ।
তুই খাসনি। বলেছিলি পেট ভর্তি আছে। তারপর বলেছিলি। আমি একটু ব্যারাকপুর যাব।
মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম।
কনিষ্ককে তুই এড়িয়ে গেছিলি। কনিষ্ক তোর সেই অবস্থা বুঝতে পেরে তোকে ফলো করেছিল।
তুই জানিস ?
না।
তারপর স্টেশনের কলে পেট ভর্তি করে জল খেয়ে ট্রেনে বসেছিলি।
হ্যাঁ।
তুই জানিস সে রাতে কনিষ্কও কিছু খায় নি।
পরে জেনেছি। যখন হস্টেলে গেলাম।
তারপর কি হলো বল।
কেন কনিষ্ক বলে নি।
কনিষ্ক ওই সময় থাকবে কি করে তোর সঙ্গে। ও চলে এসেছিল।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। সত্যি কথা বলবো না মিথ্যে কথা বলবো।
একবারে বানিয়ে বানিয়ে বলবি না। আমি সব জেনেছি। আমি তোর মুখ থেকে শুনতে চাই সত্যি না মিথ্যে।
কি হবে শুনে। বুবুনের প্রতি তোর করুণা একটু বেরে যাবে।
তবু তুই নিজেকে ভাঙবি না।
অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল জেলখানায় যারা থাকে তাদের নিয়ে একটা লেখা লিখব। বানিয়ে বানিয়ে লিখতে পারি না। যদি একবার জেল খানায় ঢোকার চান্স পাই। যদি একটু থাকার সুযোগ হয়, তাহলে ওই জীবনটা দেখতে পাব। বেশ ভালো করে লিখতে পারব। রাত এগারটা চল্লিশের ব্যারাকপুর লোকালে উঠে বসলাম। উইদাউট টিকিট। ব্যারাকপুর এলাম। যাওয়ার কোন জায়গা নেই। ট্রেনেই পরে থাকলাম। তারপর একটু বেশিরাতে স্টেশনে নেমে ঘোরাঘুরি করছিলাম। আমাকে সন্দেহভাজন বলে জিআরপি ধরলো।
যাক বাঁচা গেল আমার মনস্কামনা পূর্ণ হলো। ফার্স্ট ট্রেনে আমাকে শিয়ালদহ জিআরপিতে ট্রান্সফার করা হলো। সেই সময় মনে হয় বটা আমাকে দেখেছিল। ও নাইট করে বাড়ি ফিরছিল। ওই সবাইকে খবরটা দেয়। তারপর ওরা আমাকে ছাড়াল। আমার লেখাটা আর হলো না।
তুই মিথ্যে কথা বললি।
বিশ্বাস কর।
বিশ্বাস করছি না। সার্জারীর হেড ডঃ আর এল দাস স্টেশন ম্যানেজারকে ফোন করেছিল। তিনি সব কথা বলেন ওনাকে। তারপর তোকে ওরা ছাড়ে।
হবে হয়তো।
তারপর বল।
তারপর আর কি, কিছু না।
তুই এখনো মিত্রাকে সব কথা মন খুলে বলতে সংকোচ বোধ করছিস!
বিশ্বাস কর তখন কি বলেছিলাম মনে নেই।
আমাকে তোর এই কথাটা বিশ্বাস করতে হবে! তুই নীরুকে বলিস নি, কেন তোরা আমাকে ছাড়ালি। অন্ততঃ পক্ষে পনেরোটা দিন থাকা খাওয়ার কোন অভাব হতো না। পনেরো দিনের মধ্যে জেলে একটু বদমাইশি করতাম তাহলে ওটা এক্সটেনসন হয়ে মাস দেড়েক হয়ে যেত।
আমি মিত্রার চোখে চোখ রেখে চুপ করে গেলাম।
তোর তখন থাকার জায়গা ছিল না। হোস্টেলে পয়সা দিতে পারিসনি বলে তোর জিনিষপত্র আটকে রেখে তোকে বের করে দিয়েছিল।

দামিনী মাসি বললো। মনে পরছে না। তবে আমি প্রথমবার ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম দিন পনেরো পর দেখা করো দেখি তোমায় থাকার জায়গা দিতে পারি কিনা। তাই তুই এই পথ বেছে নিয়েছিলি!
আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকিয়ে, ওর চোখ ছল ছল।
বল এই কথা শুনে যদি চিকনা কেঁদে ফেলে সে কি খুব অন্যায় করেছে। না সে তোকে অন্ধের মতো ভালবাসে, এটা তার অমার্জনীয় অপরাধ।
মিত্রার গলাটা ধরে এলো। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শুরু করলো।
তুই ভাবলেশহীন মুখ করে তাকিয়ে থাকিস না। একটু কথা বল। আমার কি একটুও শুনতে ইচ্ছে করে না। কেন আমি তোর বন্ধুদের মুখে তোর কথা শুনবো।
একটু থেমে চোখটা নতুন বেনরসীর খুঁট দিয়ে মুছে….
তুই ভালপাহাড়ে যাস। সাঁওতালদের সঙ্গে থাকিস। ওদের ওখানে স্কুল করেছিস। কনিষ্কদের নিয়ে গিয়ে ওখানে ওদের চিকিৎসা করাস। বিনা পয়সায় ওষুধ নিয়ে যাস। সব ওদের পাওয়া স্যামপেল কপি। বাকি কিনে নিয়ে যাস। কই আমাকে একবারও বলিস নি। খালি বুবুন ফুরুত ফুরুত করে কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
কোথায় যায় কেউ জানে না। তুই এখন কম যাস। তবু মাসে একবার তোর যাওয়া চাই। ওরা এখন পালা করে কেউ না কেউ প্রতি সপ্তাহে যায়। ওদের মধ্যে তুই ইনজেক্ট করে দিয়েছিস। কনিষ্ক বলেছে সে জীবনে কোনদিন বিয়ে করবে না। বটা কনিষ্কের পথের পথিক। বাকিগুল প্রেম করে। মোবাইলটা হয়ে তোর কাজের অনেক অসুবিধে হয়েছে তাইনা।
মিত্রা এক নিঃশ্বাসে কথা বলে গেল। মনে হয় একটু হাঁফিয়ে গেছে।
ওর বুকের ওঠা নামা লক্ষ্য করলাম।
আমি চুপ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
তোর ওখানের মৌসুমি মাসির বাড়ি ভালোপাহাড়ে। অনাদির কাছ থেকে জানলাম সেই সাঁওতাল ভদ্রমহিলা তোর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে থাকে। কই আমি দুবার গেলাম আমাকে মৌসুমি মাসির সঙ্গে আলাপ করালি না।
দু’বারই মৌসুমি মাসি ছিল না।
মিথ্যে কথা বলছিস।
বিশ্বাস কর। তুই চিকনাকে জিজ্ঞাসা কর।
তোর গুণীন কাকা অশ্বিনী জ্যেঠু এটা তুই কখনো বলেছিস। কিন্তু সেই ভদ্রলোক কতবার এসেছে, আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। কই একবারও ঘুণাক্ষরে বলিস নি।
আমি চুপ।
তুই অশ্বিনী জ্যেঠুকে বারন করে দিয়েছিলি।
না। গুণীন কাকা তোকে দেখতে চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম পরিচয় দিতে পারবে না।
এটা বারন করা হলো না ?
মিত্রার অবস্থা দেখে আমি হাসব না কাঁদব ঠিক করে উঠতে পারছি না। কি পাগলী মেয়েরে বাবা।
কাকাকেও তুই বারন করে দিয়েছিলি। কিসের ভয় তোর। তোর বিদ্যে আমরা শিখে নেব। কাকা আসুক রবিবার, আমি এবার বুঝে নেব।
হেসে ফেললাম। তুই বৃথা উত্তেজিত হচ্ছিস।
কষ্টটা আমার শরীরের বসন, বুঝলি মিত্রা ছেঁড়া জামাকপরে আমি বেশ কমফর্ট বোধ করি। মনে হয় অনি এবার সত্যি অনি। ভেক না ধরলে ভিক্ষা পাওয়া যায় না। তাই না।
মিত্রা এমন ভাবে ভেংচি কেটে বললো আমি হেসে ফেললাম, বাধ্য হয়ে মিত্রার মুখটা আমার বুকে চেপে ধরলাম।
ছাড় ছাড়।
আজ আটমাস ধরে তোর কথা শুনেগেছি। কনো উত্তর দিই নি। আমাকে কিছু বলতে দে। আমারও বলার থাকতে পারে।
আমি মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় একপাক ঘুরে গেলাম। মিত্রা এখন আমার বুকের নীচে। আমি মিত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। প্রথমে ও কিছুতেই ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে দেবে না। দুবার কামরেও দিল। আমি তবু ওর ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরালাম না। বেশ কিছুক্ষণ পর ও সারাদিল। ওর হাত কথা বলতে শুরু করলো। বুঝলাম মাথার আগুন, বুকের জ্বালা এবার কিছুটা কমেছে। আমি ঠোঁট থেকে ঠোঁট তুললাম। মিত্রা হাসলো।
এবার শান্তি।
আমি হাসছি।
মিত্রা ঠান্ডা হলো তাই তো।
তবু আমি হাসছি।
হাসিদিয়ে তুই বিশ্বজয় করতে পারবি না। তুই আমাকে যে জীবন দিয়েছিস, তিলে তিলে আমার শরীরের সুধা পান করে বেড়ে উঠছে। মনে রাখবি, তোমাকে বধিবে যে গকুলে বাড়িছে সে।
সত্যি।
আমি আবার ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম।
কই এখবরটা আমাকে দিসনি।
তুই সব কথা বলিস। কেন তোকে বলতে যাব।
বাবাঃ, গালটা কিরকম মেনি বিড়ালের মতো ফুলে গেছে, আর কে জানে ?
ছোটমা।
কি করে।
তুই সেদিনকে বললি না, তোর পেটটা কেমন শক্ত শক্ত লাগছে।
হ্যাঁ।
আমার কেমন সন্দেহ হলো। ছেলেদের চোখ। তার ওপর তোর চোখ।
ছোটমাকে চুপি চুপি বললাম। একটা কি বেরিয়েছে এখন। সকালের ইউরিন একফোঁটা ওখানে দিলেই নেগেটিভ না পজিটিভ বোঝা যায়। দেখলাম পজিটিভ।
কই আমাকে বলিসনি এতো সব।
তুই তোর বউ-এর খোঁজ রাখিস। তুই নিজের তালে থাকিস। খালি মিত্রা টাকার কথায় কেন বললে অভিমান হয়, টাকার জোগাড় করতে ছুটিস। আমি তোর আপন নয়, শত্রু।
এই আবার সেন্টিমেন্টের শুরশুরি দিচ্ছিস। বড়মা যানে।
ছোটমা হয়তো বলেছে।
ডাক্তারদাদা।
ছোটমা বলেছে কাজটা মিটুক তারপর বলবে।
জিজ্ঞাসা করেনি, কবে হলো।
বলেছি। পীরবাবার ওখানে যেদিন গেছিলাম মনে হয় সেইদিন।
কী বললো ছোটমা।
মাথায় হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলো।
আমি আবার মিত্রার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। কতোক্ষণ ছিলাম জানি না। আজ কিন্তু মিত্রার সঙ্গে একটুও সেক্স করতে ইচ্ছে করছে না। বার বার ওকে আদর করতে ইচ্ছে করছে। ঠোঁট তুললাম। মিত্রা আমার মুখের দিকে হাঁসি হাঁসি মুখ করে তাকিয়ে।
বুবুন।
বল।
তোর ভাল লাগছে।
মাথা দোলালাম।
আমাদের ভালবাসার নতুন প্রাণ।
আমি মিত্রার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। দুজনের মুখেই কোন কথা সড়ছে না। যা কিছু কথা চোখে চোখে। আমি মিত্রার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। কপালের চন্দন এখনো ঘেঁটে যায় নি। যেন আরও উজ্জ্বল লাগছে। ডাগর চোখ দুটো এক দৃষ্টে আমাকে গিলে খাচ্ছে।
কি দেখাবি বললি। দেখালিনা।
আজ থাক।
না। এই আনন্দের দিন আমি নিজের শেকড়টা জানতে চাই। অন্ততঃ পক্ষে আগামী ভবিষ্যতকে বলতে পারব, তোমাদের মা এই দিনে আমাকে আমার শেকড়টা খুঁজে বার করতে সাহায্য করেছিল।
সত্যি তুই দেখবি।
হ্যাঁ।
একটুও দুঃখ পাবি না।
পৃথিবীতে অনেক দুঃখ পেয়েছি। দুঃখকে আর ভয় পাই না।
তুই ভাগ্য বিশ্বাস করিস।
আমি মনে করি মানুষ তার নিজের ভাগ্য নিজে রচনা করে। বলতে পারিস, মেন ইজ মেকার অফ হিজ ওউন ফেট।
সব কিছু শোনার পর, সব কিছু দেখার পর, তুই যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাস।
যেতেই পারি না।
ঠিক বলছিস।
বলছি তো। যদিও বা যাই তা ক্ষণিকের, মনে রাখবি আমি কনো কাজ শেষ করতে গেছি।
যদি তোর সেই কাজ শেষ না হয়, তুই যদি আর না ফিরিস।
কেন তোর জ্যোতিষ এটাও বলে দিয়েছে।
জ্যোতিষদা তোর সব কথা মিলিয়ে দিয়েছে।
যতো সব গাঁজাখুরি।
আমি তোর বিশ্বাসে কোন দিন আঘাত করিনি।
আমি তোর বিশ্বাসে আঘাত করছি না, তবে তার একটা রিজিন থাকবে।
রিজিন তৈরি হতে কতোক্ষণ।
আচ্ছা আমি….না থাক আজকে বলবো না।
বলনা বল। আমি তোর কাছ থেকে শক্ত হওয়ার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছি। আজকের পর থেকে দেখবি আমার চোখে তুই জল পাবি না।
পাগলাম করিস না। আমি তোকে কাঁদতে বারণ করিনি। ফরনাথিং কাঁদতে বারণ করেছি।
তুই তোর মতো করে বলবি।
ঠিক আছে আর বলবো না। এবার দেখা।
এখনো বলছি দেখার পর মন খারাপ করতে পারবি না।
একটুও মন খারাপ করবো না।
দুজনে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। মিত্রা ফ্রিজ থেকে জলের বোতল বার করলো। দুজনে খেলাম। ওর ড্রেসিন টেবিলের ড্রয়ারের চোরাকুঠরি থেকে আলমাড়ির চাবি বার করলো।
কিরে তুই চাবি এখানে রাখিস ?
কেউ জানতেও পারবে না। এমন একটা খোপ। বাবা বানিয়েছিল।
মিত্রা আলমাড়ি খুললো।
বুবুন তোকে একটু ধরতে হবে।
কি ধরবো।
এই যে থাকটা দেখছিস এটাকে তুলে ধরতে হবে এর ভেতরে ফাইলটা আছে সেটা বার করবো।
তুই একা হলে কি করতিস।
জামা কাপর সব টেনে নামাতাম, তারপর বার করতাম।
এটা কি ঢাকনার মতো।
হ্যাঁ সবকটা তাকই সেরকম তারপর ডবল লক।
আমি ঢাকনাটা তুলে ধরলাম। বেদম ভারি। মিত্রা লক খুলে ভেতর থেকে ফাইল বার করলো।
জানিস বুবুন বাবা মৃত্যুর আগে অসুস্থ অবস্থায় একটা চিরকুটে লিখে এই ফাইলটার হদিস দিয়েছিল। খুঁজে পাওয়ার পর আমাকে একা ঘরে পেয়ে বলেছিল। ওই ফাইলটায় আমার সব আছে। আর ব্যাঙ্কের লকারের চাবির হদিস দিয়েছিল। ব্যাঙ্কের লকারটা এই ছয়বছরে দেখা হয়ে ওঠেনি।
ব্যাঙ্কে গেছিলি।
গেছিলাম।
লকার দেখিস নি।
না।
কেন।
যদি শয়তানটা হদিস পেয়ে যায়।
ইস। আবার ওই নামটা করলি।
এখন আমার কোন ভয় নেই। তুই আছিস। আমার গার্জেন।
আমি মিত্রার নাকটা ধরে নাড়িয়ে দিলাম। দু’জনে পাশাপাশি বসে।
জানিস বুবুন আজ আমার প্রথম বিয়ে হলো।
কেন।
আগে তো কখনো বিয়ে হয় নি। কেউ সিঁদুরও পরিয়ে দেয়নি। ভয় দেখিয়ে বিয়ে হয়। খুব সাধ ছিল কনে সেজে সেজেগুজে বিয়ে করবো। তুই সেই সাধটা পূরন করলি।
আমি তোকে পীরবাবার থানের মাটি তোর কপালে লাগিয়ে দিয়েছিলাম।
জানিস বুবুন, আমি ভীষণ লোভী, ওইটুকুতে আমার কিছু হয়নি। তাই আরও চেয়েছিলাম। যেভাবে একটা মেয়ে একটা পুরুষের হাতে ধরা দিতে চায় ঠিক সেই ভাবে।
আগে যদি জানতাম।
আমি ভেবেছিলাম তুই আমার এতো সব খোঁজ নিয়েছিস, এটাও জানতিস।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।

মিত্রা ফাইল খুললো, অনেকগুলো দলিল। তার মধ্যে থেকে একটা খাম বের করে নিয়ে এলো। একটা ছবি আমার হাতে দিল। ফটোটা লাল হয়ে গেছে। আমি কাছে নিয়ে এসে ভালো করে দেখলাম। বছর বাইশ তেইশ বয়স হবে মেয়েটার। ছবিটা স্টুডিওতে তোলা। বড়মার মুখশ্রীর সঙ্গে কিছুটা মিল আছে।
আমি অনেকক্ষণ ফটোটা লক্ষ করলাম। মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
চিনতে পারছিস।
মনে হচ্ছে বড়মাকে যদি এই বয়সে নিয়ে যাই, তাহলে ছবিটার সঙ্গে বড়মার মুখশ্রী মিলে যাবে।
মিত্রা আমাকে জাপ্টে ধরে ঠোঁটে চুমু খেলো।
দ্যাটস রাইট বুবুন, তুই একেবারে ঠিক কথা বলেছিস।
তাই!
মিত্রা চোখের ভাষায় আর ঘাড় দুলিয়ে, হ্যাঁ বললো।
তুই পেলি কোথায় ?
প্রশ্ন করবি না। খালি দেখে যা। আমি তোর মতো হতে পারছি কিনা বল।
এবার এই ছবিটা দেখ।
বিবাহ বাসরে তোলা ছবি। সবে বিয়ে হয়েছে। একজন মিত্রার বাবা আর একজন সেই ভদ্রমহিলা মানে বড়মা। তারমানে বড়মার সঙ্গে মিত্রার বাবার বিয়ে হয়েছিল! আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। মিত্রা আমার চোখের দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে। আমি কি বলি।
তোর বাবার সঙ্গে বড়মার বিয়ে হয়েছিল!
ইয়েস ইয়েস বুবুন তুই একেবারে ঠিক।
মিত্রার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো।
তুই প্রমাণ পেলি কি করে।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরলো, তোকে সব বলবো বুবুন, তুইযে আমার সব, তোকে বলতে না পারলে আমি শান্তিতে মরতেও পারব না।
এই দেখ একটা পোস্ট কার্ড।
হাতে নিয়ে পরলাম। ফর্মাল চিঠি কন্যাদায় গ্রস্ত পিতা আর একজনের পুত্রের সঙ্গে তার মেয়ের বিবাহ দিতে চান। নিচে বসিরহাটের ঠিকানা। আর মিত্রাদের বাড়ির ঠিকানা।
পড়লি।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
জানিস বাবা এরপর বড়মাকে দেখতে যান, পছন্দ হয়, বিবাহ হয়। বাবা তার দিনলিপিতে এটা লিখে গেছে। তোকে পরাব। তারপরের ঘটনা তুই জানিস। বড়মা পীর সাহেবের থানে নিজে মুখে সব স্বীকার করেছে। তোকে নতুন করে কি বলবো। বাবা আর কোনদিন বিবাহ করেন নি।
আমি চমকে মিত্রার দিকে তাকালাম।
ভাবছিস আমি পৃথিবীর আলো দেখলাম কি করে।
আমি এক দৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি তোকে ফাঁকি দিতে চাইনি বুবুন, তুই বিশ্বাস কর। আমি ভীষণ লোভী।
মিত্রা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো।
আমি মিত্রাকে কাছে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
মিত্রা আমার বুকে মাথা রেখেছে। চোখ বন্ধ। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি মিত্রার গালে আস্তে করে থাপ্পর মারলাম। মিত্রা চোখ খুললো।
কিরে, শরীর খারাপ লাগছে।
মিত্রা অস্ফুট কিছু বলতে চাইল, বলতে পারল না।
আমি জলের বোতলটা কাছে টেনে নিয়ে মিত্রার চোখে জল দিলাম। আমার পরনের কাপরটা দিয়ে মুছিয়ে দিলাম।
কষ্ট হচ্ছে।
মিত্রা আমর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
যে কথা ছ’বছর ধরে নিজের বুকের মধ্যে বয়ে বেরিয়েছি, আজ তোকে বললাম। তুই ছাড়া দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি জানে না।
একটুক্ষণ থেমে।
বুকের ভেতরটা ভীষণ ব্যাথা করছে, জানিস বুবুন।
হুকটা একটু খোল আমি হাত বুলিয়ে দিই।
না থাক, একটু সহ্য করতে শিখি। তুই আমার থেকে আরও কষ্ট পেয়েছিস।
আমি মিত্রার মুখটা বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
নারে বুবুন সত্যি। এখন তুই আছিস, আমার আর ভয় নেই। আমার আর কিছু হবে না, দেখিস।
আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু কি করবো, প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু কষ্ট আছে। যা সম্পূর্ণ ভাবে তার নিজস্ব। সেটা ভাগ করে নেওয়া যায় না। হয়তো অনুভব করা যায়। তার কষ্টের সমব্যাথী হওয়া যায়। কিন্তু শেয়ার করা যায় না।
জানিস বুবুন, বড়মা যে দাদার সঙ্গে থাকেন, বাবা সেটা জানতেন।
উনি জানতেন! তা সত্বেও….
বাবার দিনলিপি তার প্রমাণ।
জানিস, বাবা মারা যাবার আগে আমার আর মার মধ্যে প্রপার্টি ভাগ করে দিলেন।
মিত্রা আমার ডানহাতটা ওর হাতে তুলে নিল।
তখনি আমার একটা খটকা লেগেছিল। কিন্তু কাউকে বলিনি। বাবা আমার বয়ফ্রেন্ড। বাবার কাছে আমি কখনো কনো কথা কোনদিন গোপন করিনি। সিনেমা হলে তোর হাত নিয়ে যেদিন বুকে রেখেছিলাম বাবাকে এসে অকপটে সব স্বীকার করেছি।
বাবা হেসে বলেছিলেন ছেলেটাকে তুমি একবার আমাকে দেখাতে পার। আমি মাথা দুলিয়ে বলেছিলাম পারব। উনি বলেছিলেন কবে ? আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ও ভীষণ মুডি, আমার ইচ্ছের ওপর আসবে না। বাবা হেসেছিলেন। একটু মনে করে দেখ তারপর তোকে প্রথম আমাদের বাড়িতে নিয়ে গেছিলাম।
স্বরস্বতী পূজোর দিন।
এইতো তোর মনে আছে।
সেইদিন বাবার আচার আচরণে তুই কিছু বুঝতে পেরেছিলি।
কাঁচা মন, তখন এতো সব ঘোর-প্যাঁচ বুঝতাম না। সত্যি কথা বলতে কি তখন আমার চোখে সব রঙ্গীন। গ্রাম থেকে একটা ছেলে শহরে এসেছে। কেরিয়ার তৈরি করতে হবে। কলেজে দাদা হতে হবে, একটা হামবড়ক্কি ভাব। মাঝে মাঝে সেই দিন গুলর কথা মনে পরলে হাসি পায়।
বাবা তোকে দেখার পর, তোর সঙ্গে কথা বলার পর বলেছিলেন আমার অমত নেই।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল।
তুই একটু ভেবে দেখ, তখন আমাদের সেকেন্ড ইয়ার চলছে।
হ্যাঁ।
আমাদের ঘনিষ্ঠতা এরপর আরও বেড়েছে। তুই আমাদের বাড়ি এসেছিস কম, কিন্তু আমি তোর হোস্টেলে প্রায় গেছি।
ঠিক।
জানিস বুবুন, বাবা মারা যাবার পর আমি নিজেকে নিজে আবিষ্কার করলাম, আমি কে ?
কলেজে পড়ার সময় আমি জানতাম না কে আমার মা ? ছোট থেকে জানতাম আমার মা আমার জন্মের পর আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। আমি জ্যেঠিমনির কাছেই মানুষ। জ্যেঠিমনি আমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন।
মিত্রা!
হ্যাঁ। বুবুন তুই বিশ্বাস কর। আমি তোকে….
মিত্রার চোখ দুটো জলে টল টল করছে। আমি ঠোঁট দিয়ে তা মুছে দিলাম।
তুই আমার মা বলে যাকে আজ সকালে প্রণাম করলি, সে আমার মা নয়।
আমি মিত্রার চোখের দিকে স্থির চোখে তাকালাম। কি বলতে চায় মিত্রা ?
আমি বাবার ঔরস জাত জ্যেঠিমনির সন্তান। বাবার সঙ্গে জ্যেঠিমণির অবৈধ সম্পর্ক ছিল।
আমি মিত্রার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি।
একমাত্র বাবা আর জ্যেঠিমনি ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ জানত না। আমি হওয়ার পর বাবা আইনত জ্যেঠিমনির কাছ থেকে আমাকে দত্তক নিয়েছিল।
মিত্রা থামলো।
তুই বিশ্বাস কর আমি এতোসব জেনেছি বাবার দিনলিপি পরে। বাবা ডে টু ডে ডিটেলসে সব লিখেছে। এমনকি জ্যেঠিমণির সঙ্গে কবে কবে সেক্স করেছে তাও।
জ্যেঠু।
জ্যেঠু আমার হওয়ার মাস তিনেক আগে মারা গেছেন। সেটা সুসাইড ছিল।
কেন ?
তুই বুঝে নে।
তোর যে আর এক বোন ছিল।
ওটা জ্যেঠুর।
তাহলে তোর মা বলে যাকে দেখেছি ?
উনি আমার বাবার সেক্স পার্টনার। বলতে পারিস ক্যাশ বাক্স। আমি যেমন ছিলাম শয়তানটার। বাবার সঙ্গে ওনার বয়সের ডিফারেন্স প্রায় কুড়ি পঁচিশ বছরের। ওনার সঙ্গে বাবার আলাপ ক্লাবে। পয়সা ওয়ালা ঘরের মেয়ে। বাবা কনোদিন ওনাকে বিয়ে করেন নি। এই বাড়িটা কিনে উনি এখানে ওনাকে রেখেছিলেন।
কিন্তু আমি তো ওনাকে ও বাড়িতে দেখেছি।
দাদু খুব স্ট্রিক্ট প্রিনসিপালের লোক ছিলেন। দাদু যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন ওনার প্রবেশাধিকার ছিল না। দাদু মারা যাবার পর উনি ওই বাড়িতে প্রবেশাধিকার পান।
তারপর।
এনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর জ্যেঠিমনির সঙ্গে বাবার দূরত্ব বেড়েছে। জ্যেঠিমনি প্রথমে আমাকে দিতে চান নি। পরে দাদুর চাপে আর বাবার ব্ল্যাকমেলিংয়ে আমাকে দিতে বাধ্য হন। হাঁড়ি আলাদা হয়েছে। তুই ওপর থেকে কিছু বুঝতে পারিস নি।
তুই কাকে মা বলতিস।
জ্যেঠিমনিকে। ওনার কাছেই তো ছোট থেকে মানুষ।
তাহলে এই মা।
কলেজ লাইফে এসে পেলাম।
তখন তুই কিছু বলিসনি।
একথা কাউকে বলা যায়। আমার বাবা বিয়ে করেছেন।
তাহলে তুই তোর বাবাকে ভালো লোক বলিস কি করে ?
শোন আমার কথা।
আমি মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম।
বড়মার সঙ্গে ওই ব্যাপারটা ঘটে যাবার পর। বাবা মেন্টালি ডিসব্যালেন্সড হয়ে যান। তারপর জ্যেঠিমনির জন্য সুস্থ হন। বলতে পারিস তারপর থেকে জ্যেঠিমনি বাবা ক্লোজ হয়ে পরেন।
জ্যেঠু কি করতো।
পারিবারিক ব্যবসা, কাগজ। তখন শেয়ার অত্যন্ত কম ছিলো। পাঁচ পার্সেন্ট।
তোর বাবা কি করতেন।
কাগজ দেখতেন। আর শেয়ারের কারবার। বলতে পারিস ব্রোকার। আমার তথাকথিত মার পরিবারেরও শেয়ারের ব্যবসা। বাবার প্রচুর উচ্চাকাঙ্খা ছিল। বাবা মার বাড়ির সম্পত্তি পায়। কাগজের ভাগটাও কিছুটা সেই পরিবারের।
মানে!
আমার মার পরিবার দামানি। ওরা অবাঙালি।
তারপর।
বাবা মার কাছ থেকে তার সম্পত্তি জোড় করে লিখিয়ে নেন। মানে কাগজের ভাগ। তারপর কাগজটাকে আস্তে আস্তে কুক্ষিগত করেন। আমাদের পরিবারের ফাইভ পার্সেন্ট শেয়ারও নিয়ে নেন। বাড়িটা জ্যেঠিমনিকে ছেড়ে দেন।
টোটাল প্রপার্টি!
হ্যাঁ ফাইভ পার্সেন্টের যা মূল্য।
বাবা জানতেন বড়মা অমিতাভদার স্ত্রী হিসাবে অমিতাভদার কাছে থাকেন। দাদা দামানিদের খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। মিঃ দামানি আর আমার দাদু দুজনে খুব বন্ধু মানুষ। মিঃ দামানি দাদুকে শেয়ারটা কিনিয়ে দিয়েছিলেন। ওদের হাতেই সিংহভাগ শেয়ার ছিল। বাকিটা আর তিন চারজনের কাছে।
তারপর।
বাবা অমিতাভদাকে কব্জা করার জন্য ছলে বলে কৌশলে সব শেয়ার কিনে নিলেন। বলতে পারিস ঘুরিয়ে বড়মাকে শাস্তি দান। কিন্তু মার বাবা আমার মামাদাদু খুব ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন তা করতে দেন নি। বাবা মারা যাবার বছর খানেক আগে মামাদাদু মারা যান। বাবা দামানিদের পুরো শেয়ারটা নিয়ে নেয়।
তখন বাবার অনেক পয়সা। দারুণ প্রতিপত্তি। কাগজটা বাবা পুরো পুরি কব্জা করে ফেলেছেন। কিন্তু আমার তথাকথিত মার সঙ্গে বাবার দূরত্ব বেড়ে যায়। মা আমাকে একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। বাবার সঙ্গে প্রায় ঝগড়া করতেন। সেই সময় বাবার ক্যানসার ধরা পরলো। মার নতুন বন্ধু ডাক্তারের প্রবেশ। মার সঙ্গে রেগুলার ঝগড়া। বাবার অসহায় মুখটা মনে পরে যায়।
জ্যেঠিমনির কাছে যাই। দু’একদিন এসেছিলেন। মা বাবার অমতে জোর করে সেই শয়তানটার সঙ্গে আমার ম্যারেজ রেজিস্ট্রি করায়, তলারও খাবে গাছেরও কুরবে। এটা বলতে পারিস বাবার প্রতি মার রিভেঞ্জ। আমি তখন দিশেহারা। এক কথায় বলতে পারিস বলির পাঁঠা। আমি না পারছি ও বাড়িতে ফিরে যেতে, না পারছি এ বাড়িতে থাকতে। তখন আমার মনের কি পরিস্থিতি তোকে বোঝাতে পারব না।
তারপর।

বাবা মারা গেলেন।
ব্যাশ আমি মা শয়তানটার হাতের পুতুল। কাগজের সম্পত্তি আর কিছু প্রপার্টি আমার নামে ছিলো। মিঃ দামানি মানে আমার দাদুও আমাকে কিছু প্রপার্টি লিখে দিয়ে যান। শেষে মা শয়তানটার চাল বুঝতে পারলেন। তাই আমার নামে নিজের প্রপার্টির কিছুটা লিখে দিয়ে যান।
তোর মায়ের কোন ভাই ছিল না ?
না। মা দাদুর এক মাত্র মেয়ে।
দাদুর অবর্তমানে বাড়িটার কি হাল হোল ?
রি মডেলিং করে নার্সিংহোম হয়েছে।
তারপর।
এরপর পুরনো বাড়ির সঙ্গে কনো সম্পর্ক রইলো না। বাবা থাকতে যেটুকু ছিল বাবা মারা যাবার পর তা একদম তলানিতে ঠেকে গেল। তারপর সব শেষ। আমি তখন গা ভাসিয়ে দিয়েছি। শয়তানটা মার শরীর খারাপের বাহানায় স্লো-পয়জন করে মেরে দিল।
মরার আগে মার নামে যেটুকু প্রপার্টি ছিল নিজের নামে সই করিয়ে নিল। আমি তখন ওর হাতের পুতুল। ওর ভাগ্না সুনীত কাগজ দেখে। আমি খালি সই করি। কাগজে একটু একটু যেতে শুরু করেছি। বাবার ডাইরী পরে সব জেনেছি। নিজের মনকে শক্ত করেছি।
একদিন কাগজের একটা অনুষ্ঠানে বড়মাকে দেখলাম। সেদিন বড়মা আমাকে দেখেন নি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম এই ভদ্রমহিলা আমার বাবার জীবনটা নষ্ট করেছেন। আমার বাবা এতো খারাপ লোক ছিলেন না। আমি ওনাকে সঠিক শাস্তি দেব। বলতে পারিস আমিও প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠলাম।
যে ভাবেই হোক উপরে ফেলতে হবে। ফার্স্ট টার্গেট মল্লিকদা অমিতাভদা। সেই ভাবে প্ল্যান প্রোগ্রাম তৈরি করতে শুরু করলাম। দেখলাম সুনীতদা সম্পাদক হওয়ার জন্য উঠে পরে লাগল। আমি সুযোগটাকে কাজে লাগালাম।
এই সময় ধুমকেতুর মতো তোর সঙ্গে একদিন ক্লাবে দেখা। তুই আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইলি। বাবার কথাটা মনে পরে গেল। অনি এলে ওকে কখনো ফিরিয়ে দিবি না।
তোর বাবা জানতেন না আমি ওই কাগজে আছি।
জানলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। তুই জানতিস, বাবা ওই কাগজের মালিক ?
না।
বাবা বেঁচে থাকাকালীন মা যখন চাপ সৃষ্টি করছে শয়তানটার সঙ্গে রেজিস্ট্রীর জন্য, তখন তোর খোঁজ বার বার করেছি। শুভঙ্করবাবুর কাছে গেছি। কার কাছে যাইনি তোর খোঁজ নিতে। লজ্জার মাথা খেয়ে শেষমেষ ড. রায়ের কাছেও একবার গেছি।
প্রতিটা জায়গা থেকে হতাশ হয়ে ফিরেছি। তারপর নিজের মনকে বুঝিয়ে সব মেনে নিয়েছি। তখন তোর মিত্রা বাজারের দেহপসারিণীর থেকে খুব একটা কম যায় না। বলতে পারিস সফিসটিকেটেড বাজারী মেয়ে।
আমি মিত্রার মুখটা চেপে ধরলাম। মিত্রা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমার বুকে মুখ গুঁজলো। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর ও থামল।
আজ বিগত দশ মাসে আমার জীবনটা একশো আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে।
জানিস বুবুন তখন রেগুলার ড্রিঙ্ক করতাম। বেলেলাপণার চূড়ান্ত। যে কোন পুরুষকে জড়িয়ে বলরুমে ড্যান্স করতাম। ভাবতাম এ ভাবেই আমার জীবনটা শেষ করে দিতে হবে। কাগজের ব্যাপার তখন কিছু বুঝতাম না। বুঝেও বা লাভ কি। তখন আমার পার-ডে হাত খরচ পাঁচ হাজার টাকা। বাকি সব বাদ দে।
তোর খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম। দু’তিনবার দাদাকে ডেকে পাঠালাম। জানলাম দাদা শুভঙ্করবাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শুভঙ্করবাবুর থ্রু দিয়ে তুই কাগজে এসেছিস। কিন্তু তুই তখন চরম বহেমিয়ান জীবনযাপন করছিস। তোকে কিছুতেই ধরতে পারছি না।
প্রতিজ্ঞা করলাম তোকেও কাগজ থেকে সরিয়ে দেব। সুনীতদা বারণ করলো। বললো অনির নিজস্ব একটা পাঠক আছে। ওকে সরালে আমাদের কাগজের ক্ষতি। তার চেয়ে বরং ওকে প্রসার করা হোক।
তবু আমি রিজিড থাকলাম। খোঁজ নিলাম। তুই তখন ভাইজ্যাক গেছিস। ওই পনেরো দিন তোর আর্টিকেল আমি রেগুলার পরেছি। তোর ধার আর ভারের কাছে আমি মাথা নত করেছি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম। আমাদের কাগজে তোর মতো সোর্স কারুর নেই।
তুই এখনো সেরকম একরোখা। স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড। একমাত্র অমিতাভদা ছাড়া তুই কাউকে অফিসে পাত্তা দিসনা। যেরকম তোকে কলেজে দেখেছি। ড. রায় ছাড়া কাউকে পাত্তা দিতিস না। বুবুন এখনো ডেয়ার ডেভিল। বুবুনের যে গুণটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল।
তোর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকলাম। তখন বাবার ছবির কাছে বসে প্রতিদিন ড্রিঙ্ক করতাম, আর বলতাম বাবা আমাকে পথ দেখাও, বুবুনকে আমার জীবনে ফিরিয়ে নেব কিনা। বাবা কোনদিন না বলে নি।
তুই ফিরে এলি। প্রথম রিটার্ন পেলাম তোর কাছ থেকে। তুই আমার ডাকে সারা দিলি না। তুই সুনীতদাকে এক কথায় উড়িয়ে দিলি। সবাই মেনে নিল, তুই খালি বললি তুই ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বসবি। বুঝলাম সব ঠিক আছে। লোহা লোহাকে কাটতে পারবে।
মনকে শায় দিলাম অন্ততঃ একটা লোক আমার পাশে দাঁড়াতে পারে। তোকে জড়িয়ে ধরলাম। সেখানেও শয়তানটা সব বুঝতে পারল। তখন দুটো পথ বেছে নিলাম যে কনো মূল্যে তোকে আমায় ফেরত পেতে হবে। তাতে যা হয় হোক।
ওকে বললাম বুবুনকে আমার চাই। ওকে আমি কাগজের শেয়ার হোল্ডার করবো। তখন শয়তানটা বারাসতের একটা বিশাল প্রপার্টি আমার কাছ থেকে লিখিয়ে নিল। ওটা দামানিদের প্রপার্টি ছিল। দাদু আমাকে দিয়েছিলেন।
দুই তোমাকে ডিভোর্স দিতে হবে। দ্বিতীয়টা ও মেনে নিল না। বরং কাগজের নামে লোন নিয়ে, ও আর মল সব টাকা আত্মসাৎ করে নিল। ইসলামভাইকে সেই সময় আমি দেখি। ইসলামভাই তখন ওদের অপারেটর।
টোডি।
ওদের একটা গ্রুপ আছে। টোডিও বড় ব্যবসায়ী। আমাকে ওরা টোপ হিসাবে ব্যাবহার করলো। প্রথমে বুঝে উঠতে পারি নি। পরে যখন বুঝলাম, তখন সব হাতের বাইরে। দেহটার আর কিছু নেই বুঝলি।
মিত্রা থামল।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে।
তোর মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার কথা শুনতে শুনতে।
একটুও না।
তুইতো আজ একটুও রেগে যাচ্ছিস না। তোর চোখের রং একটুও বদলে যাচ্ছে না।
তুই বল, আমি শুনছি।
আর কি শুনবি, সবই তুই জানিস।
বড়মা, আজকের বিয়ে।
মিত্রা আমার কোল থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমার জেদ বুবুন।
তোর জেদ!
হ্যাঁ।
তোর ডাকে যেদিন প্রথম শয়তানটাকে নিয়ে দাদার বাড়িতে গেলাম সেদিন বড়মাকে দেখে জ্যেঠিমনির কথা মনে পরে গেল। যিনি আমাকে ন’মাস দশদিন গর্ভে ধারন করেছিলেন। একজন স্নেহময়ী মা। বিশ্বাস কর সেদিন থেকে প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোভাবটা মন থেকে আস্তে আস্তে উবে গেল।
আমি তোর আত্মশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। ধীরে ধীরে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে শুরু করলাম। নতুন জীবন দেখালি তুই। তুই কিরকম মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলে আকাশে উড়িস। তোর ওখানে গিয়ে তোর প্রতি সকলের ভালবাসা আমাকে পাগল করে দিল। আমার প্রতি তোর ভালবাসা যে তখনো অটুট, সেটা বুঝতে পেরে নিজে পাগল হয়ে গেলাম। তোর সমস্ত কথা মেনে নিতে শুরু করলাম।
মিত্রা একটু থামল।
বার বার তোর খোঁজ নিয়েছি। তুই সেই শয়তানটার মতো মুখোশ ধারী কিনা। প্রত্যেক বার তোর কাছে হেরে গেছি। তুই কাকার অপারেশনের পর দেশ থেকে ফিরে এসে পাগলের মতো হয়ে গেলি। আমি সেই সময় শয়তানটার কাছে বার বার গেছি। সুনীতদাকে বলেছি তোমরা এটা কি করছো। ওরা তোকে মারবার জন্য উঠে পরে লেগেছে।
তারপর যখন শুনল তুই ওদের থেকেও ইসলামভাই-এর খুব কাছের লোক, তখন ওরা গুটিয়ে গেল। সেই সময় আমি স্বার্থপরের মতো একটা চাল চাললাম। বললাম আমি বুবুনকে সামলাতে পারি, যদি তুমি আমাকে ডিভোর্স দাও। গিভ এন্ড টেক পলিসি।
এক কথায় রাজি হয়েগেল। সময় নষ্ট করিনি। নিজের পরিচিত উকিল ঠিক করে ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে মিউচ্যুয়াল ডিভোর্স নিলাম। কাগজ ওর হাতে দিলাম না। আমার কাছে রাখলাম। আমি তখন মুক্ত বিহঙ্গ। তোকে গ্রহণ করা খালি সময়ের অপেক্ষা।
নিজের আনন্দটুকু তোর সঙ্গে শেয়ার করবো তার কনো উপায় নেই। তোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বার বার বড়মার কাছে ছুটেগেছি, কোন দিশা পাই নি। ভেবেছি বড়মা তোকে তার নিজের বাড়িতে রেখেছে।
বিশ্বাস কর সেই সময় ওই ঠিকানা ধরে বড়মার বসিরহাটের বাড়িতেও একদিন গেছি। যদি তুই ওখানে থাকিস। ব্যার্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছি।
মিত্রা হাঁফাচ্ছে।
তখন জানতাম না। তুই বড়মার সম্বন্ধে কিছুই জানিস না। হঠাৎ একদিন অফিসে আবিষ্কার করলাম, যাদের ভয়ে আমি সিঁটিয়ে থাকতাম, তার সব কেঁদো বাঘ হয়ে গেছে। দিনরাত আমাকে তেল দিচ্ছে। আমি কোন কাজে অনড় থাকলে ভয় দেখাচ্ছে তোকে নিয়ে।
তখন আমার মনের পরিস্থিতি কি তোকে বোঝাতে পারব না। যাকে আমি খড়কুটোর মতো ধরে বাঁচতে চাইলাম সেও আমাকে বুঝলো না। তোর ওপর তখন আমার ভীষণ রাগ। তারপর সেইদিন এলো। একদিনে তুই সব ওলট পালট করে দিলি। কি আনন্দ হচ্ছিল। সেই আনন্দটুকু তোর সঙ্গে শেয়ার করবো ভেবেছিলাম। তুই কারুর ডাকে সারা দিলি না। চলে গেলি।
সেইদিন দুপুরে ও ডেকে পাঠাল। ও আর মল চূড়ান্ত অপমান করলো।
এক কথায় বলতে গেলে আমাকে শকুন দিয়ে ঠুকরে খাইয়ে দেবে।
মনকে বোঝালাম, ওরা ভয় পেয়েছে। তাই এই সব কথা বলছে। নরমে গরমে আমার কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক স্টাম্প পেপারে সই করাতে চাইল পেয়ারলেস ইনে বসে। আমি করলাম না। তখন আর জীবনের পরোয়া করি না। বেশি কি করতে পারে মেরে দেবে। সে ওরা পারবে না। বুবুন এখন আমার পাশে আছে। তবু মনে ভয়। চলে গেলাম ক্লাবে, বেহেড মাতাল হলাম।
হেসে ফেললাম।
হাসলি যে।
তারপরই তো থাপ্পর।
মিত্রা ঝট করে উঠে বসে আমার গালে চুমু খেল।
তুই বিশ্বাস কর তখন যে আমার কি হয়েছিল।
আমি ওর দিকে তাকালাম। ও মাথা নীচু করে নিল।
এরপর তোকে ছেড়ে আর থাকতে ভালো লাগেনি। ওই চার সপ্তাহ বড়মা ছোটমা আমার জীবনটাকে নতুন রং-এ রাঙিয়ে দিল। সঙ্গে তুই। তোর দায়িত্ব, কর্তব্য বোধ আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমার বাবা তোকে কতটা চিনেছিলেন।
মনে মনে ঠিক করলাম বাবার সঙ্গে বড়মার বিয়ে হলে বড়মা আমার মা হতো। আমার কাছে বড়মা মা। বহুবার বড়মা তোর কাছে কনফেস করতে চেয়েছে, তুই পাত্তা দিস নি। তুই যেন নতুন পৃথিবী গড়তে এসেছিস। দুর দাড় করে এগিয়ে যাচ্ছিস। আমি বড়মা ছোটমা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম। তোর মন বুঝে কথা বলতাম।
কখনো বড়মা আমাকে পাঠাত তোর কাছে তোর মন বুঝতে, কখনো ছোটমাকে পাঠাত, শেষে নিজে আসত। আস্তে আস্তে দেখলাম প্রত্যেকেই তোকে কেন্দ্র করে আশ্রয় পেতে চাইছে। আমি শুধু একা নয়। ভারি মজা লাগল।
অফিসে খোঁজ খবর নিলেই দেখি সকলে ওরে বাবা বলে দশহাত পিছিয়ে যাচ্ছে। যারা একসময় ছেঁড়া নেকড়ার মতো আমাকে একটা ডাস্টবিনে ফেলে রাখত তারা মর্যাদা দিচ্ছে।
বুঝলাম আমার বুবুন সফল। ও অন্যায় কাজ করছে না।
মিত্রা থামল।
আমি সম্মোহনের মতো ওর কথা শুনে যাচ্ছি। ও আপন মনে সব বমি করছে।
কিরে, কি ভাবছিস ? তোর মিত্রা কবিতার মতো নষ্ট মেয়ে ?
আমি মিত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। ও চোখ বন্ধ করে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো। উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে কোন সেক্সের গন্ধ নেই, সেখান ভালবাসার চরমতম স্পর্শ। আমি ঠোঁট থেকে ঠোঁট তুললাম। মিত্রা তাকাল।
আমাকে একটু জলের বোতলটা দিবি।
হাত বাড়িয়ে ওকে জলের বোতল দিলাম। ও ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেল। তারপর আবার আমার কোলে মাথা রাখল।
জানিস বুবুন তোর কোলে শুয়ে আছি, কি শান্তি।
আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। ও আমার ডান হাতটা জাপ্টে ধরে বুকের কাছে টেনে নিল।
পীরবাবার থানের মাটি তুই যেদিন আমার মাথায় লাগালি, সেদিন আমি দুটো জিনিস চেয়েছিলাম পীরবাবার কাছে। একটা তোর সন্তান আমি গর্ভে ধারণ করে মা হব। দুই বড়মার মাথার সিঁদুর ঘটা করে অনুষ্ঠান করে আমার সিঁথি রাঙাবো।
ওই সিঁদুর আমার বাবার হাতে দেওয়া। আজ বাবা নেই বড়মা আছেন।
বড়মা সেই অর্থে আমার মা। বাবার সঙ্গে বড়মা থাকলে আমি বড়মার গর্ভেই আশ্রয় পেতাম।

মিত্রা উঠে বসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
আমি জানতাম তুই একদিন না একদিন আমাকে রেস্ট্রী করবি। না হলে এতো বড়ো প্রপার্টি তুই ঠিক ভাবে সামলাতে পারবি না। তবে সেটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে বুঝতে পারি নি। প্রথমে ভেবেছিলাম তুই বুঝতে পেরেছিস আমি মা হতে যাচ্ছি। তাই বিয়ে করা জরুরি। একটা সামাজিক স্বীকৃতি আমাকে দেওয়া দরকার। তারপর তোর মনের কথা বুঝতে পারলাম।
জেদ করে আমি এই অনুষ্ঠান করলাম। তাও আমার বাড়িতে। কেন জানিষ ? আমার বাবা মা দুজনেই আজ এখানে উপস্থিত। আমার মা তোকে বরণ করে গাড়ি থেকে নামিয়েছেন। আমার মা আমাকে ধরে নিয়ে এসে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েছেন। মা তার বিয়ের সিঁদুর কৌট থেকে সিঁদুর নিয়ে কুনকেতে লাগিয়ে দিয়েছেন, যেটা তুই আমার সিঁথিতে দিয়েছিস। বাবা ওপর থেকে সব দেখেছেন। তার বিয়ে করা স্ত্রী তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছে।
মিত্রার গলাটা ধরে এলো। কথা বন্ধ হয়ে গেল। আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। বেশ বুঝতে পারছি ওর বুকের লাব ডুব শব্দটা ঘন হয়ে এক তালে বেজে চলেছে।
এরপরও তুই বলবি ম্যান ইজ মেকার অফ হিজ ওউন ফেট। মিত্রার গলাটা বুঁজে গেল, কথা বলতে পারলো না।
মিত্রা কিছুক্ষণ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকল। আমি ওর মাথায় হাত বোলাচ্ছি।
জানিস বুবুন আমি যে বেনারসীটা পরে আছি এই বেনারসীটা পরে বড়মা বাড়ি ছেড়ে বিয়ের রাতে চলে এসেছিল। আজ আমার শরীরে যা দেখছিস সব বড়মার। ব্লাউজের হাতাগুলো বড়মা নিজের হাতে শেলাই করে দিয়েছে।
আমার ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মুখ মন্ডলে তার প্রতিক্রিয়া হয়তো কিছুটা পরেছে, তবু যতোটা সম্ভব ভেতরে ভেতরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে চলেছি।
আজ আমি যা চেয়েছি, যেমন ভাবে চেয়েছি, তাই পেয়েছি। আমার জীবনের চরমতম সুখের দিন। যেদিন প্রথম আমার শরীরটা তোর হাতে তুলে দিয়েছিলাম সেদিনের থেকেও। আজকের দিনটার সঙ্গে শুধুমাত্র একটা দিনের মিল আমি খুঁজে পাই।
কোন দিনটা। আমার গলার স্বর অস্পষ্ট।
যেদিন পীরবাবার থান থেকে ফিরে এসে সেই চাঁদনী রাতে তুই আমাকে তোর জীবনটা দিলি।
আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। কাঁদলাম না। তবে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরলো।
এমা, মিত্রার কষ্টে তুই কেঁদে ফেললি, দেখ আমি একটুও কাঁদছি না। আমি তোর মতো শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি।
মিত্রা ডানহাতটা দিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিলো। আমার ঠোঁট স্পর্শ করলো।
কাঁদিসনা বুবুন। তোর মিত্রাকে কেউ আর তোর কাছ থেকে কনোদিন কেরে নিতে পারবে না। তোর মিত্রা তোরই থাকবে। যে আসছে দেখিস সে তোর থেকে কোন অংশে কম যাবে না। জ্যোতিষদাদা বলেছে। তোর বুবুন যেখানে থামবে, সেখান থেকে সে শুরু করবে। আমি যে নদী বুবুন। কতো নোংরা আমার শরীরে। কিন্তু দেখ আমি কতো পবিত্র জিনিষ গর্ভে ধারণ করেছি। কজনের ভাগ্যে এটা ঘটে। তোর কোলে মাথা রেখে আমি নিজেকে নিজে উজার করে দিচ্ছি। এটাও আমার একটা পাওয়া। বলতে পারিস বড়ো পাওয়া।
মিত্রা থামলো।
আমার কোলে মাথা রেখে ও শুয়ে আছে।
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। সকালের আলো ফুটে উঠেছে। সারারাত ঘুম হল না। দু’জনে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছি। মিত্রার সব কথা শুনলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারছি না। সব কেমন জট পেকে যাচ্ছে। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম ফাঁক থেকে যাচ্ছে। নয় মিত্রা সব গুছিয়ে বলতে পারল না। নয় ও ইচ্ছে করে কিছু একটা গোপন করে গেল। তবে এই মুহূর্তে ও নিজে কিছু গোপন করেনি বলেই মনে হচ্ছে। ও ঠিক গুছিয়ে বলতে পারল না। আমাকে ওর বাবার দিনলিপিটা পরতে হবে। আরও কিছু উদ্ধার করা যাবে তার থেকে।
কিরে আবার কোথায় ডুব মারিল।
অ্যাঁ, না কোথাও না।
দেখছি তো। আমি যে তোর কোলে শুয়ে আছি সেটাই ভুলে গেছিস।
হাসলাম।
ভাবছিস মিত্রা কতোটা স্বার্থপর।
না।
বুবুন আমার ওপর তোর একটুও রাগ হচ্ছে না।
একটুও না।
তুই এখান থেকে বলছিস।
মিত্রা আমার বুকে হাত দিল।
হ্যাঁ।
তুই আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলি না।
কি বিষয়ে বল।
তোকে এতো কথা বললাম, তুই কিছু বললি না।
এখনো সময় আসে নি। হ্যাঁরে বড়মা জানে।
কি ব্যাপারে বল।
তোর বাবার সঙ্গে বড়মার বিয়ে হয়েছিল।
না।
ওই ঘরে যে ফটোটা আছে বড়মা দেখে নি ?
না। ওই ঘরের চাবি আমার কাছে আছে। একমাত্র তুইই ঢুকেছিলি।
কেউ দেখতে চায়নি!
চেয়েছে, অন্য ফটো দেখিয়েছি।
সেটা কার।
দাদুর কম বয়সের একটা ছবি।
হাসলাম।
হাসলি কেন।
কতদিন গোপন করবি।
আমি বড়মাকে মুখ ফুটে কোনদিন বলতে পারব না।
তোর তো মা। মায়ের কাছে লজ্জা কিসের।
যদি কিছু মনে করে।
করলে করবে। তোর বাবা কিছু কিছু অন্যায় করেছে। এটা তুই স্বীকার করিস।
করি।
তা সত্বেও তুই তোর বাবাকে ফ্রেন্ড ফিলোজাফার গাইড বলছিস।
হ্যাঁ।
বড়মা অন্যায় করেছে, তাকে তুই মা বলে স্বীকার করেছিস।
হ্যাঁ।
তাহলে তাকে জানাতে অসুবিধা কোথায়। কিছুটা তার মন সংশোধন হবে।
এরকম ভাবে কখনো ভাবিনি বুবুন!
মিত্রা আমাকে জাপ্টে ধরে উম উম উম করে গোটা পাঁচেক চুমু খেলো। সত্যি তুই কি সহজভাবে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলি। এই জন্য তুই আমার বুবুন।
তা বলে এই নয় যে আজকেই তুই গিয়ে বলে দিবি।
না তা বলবো না। তবে কি জানিষ বড়মা মনে হয় কিছু একটা আঁচ করেছে।
কি করে বুঝলি।
এই বেনারসীটা আমি জোর করে বড়মার কাছে দেখতে চেয়েছি, বলেছি তোমার ছেলেকে বিয়ে করলে এই বেনারসী পরেই বিয়ে করবো, না হলে করবো না। নিজে পছন্দ করে আমার জন্য বেনারসী কিনেছে, আমি সঙ্গে ছিলাম, তবু আমি বলেছি আজ পরবো না।
ওটা আমি রবিবার পরবো। তোর সমস্ত কাপর জামা বড়মাকে পছন্দ করতে বলেছি। যেগুলো তুই আজ পরেছিস। আর রবিবারেরটা ছোটমা পছন্দ করেছে। একটাও আমি পছন্দ করিনি। সমস্ত ব্যাপারটা আমি ছেড়ে দিয়েছি দু’জনের ওপর।
দামিনী মাসি ইসলামভাই তোর জন্য পছন্দ করে জিনিষ কিনেছে। সকাল থেকে তুই যে দুটো পাজামা পাঞ্জাবী পরেছিস। একটা দামিনী মাসির একটা ইসলামভাই-এর। তাতেই যেন মনে হলো বড়মা কিছু একটা আঁচ করেছে।
আচ্ছা ডাক্তারদাদা তোকে সম্প্রদান করলো কেন ?
বড়মার ইচ্ছে অনুযায়ী।
কিরকম!
ডাক্তারদাদা আমার জীবন দিয়েছে। তাই।
ডাক্তারদাদা আপত্ত করেনি।
একটুও না। বরং বলেছে, বুঝলে বান্ধবী আমরা সব ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
হাসলাম।
তুই বুঝতে পেরেছিস।
মাথা দোলালাম।
জানিস বুবুন আমি কথাটা শুনে মনে রেখেছি, একটুও বুঝতে পারিনি।
কেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজতো একটা দেশের নাম।
না। পৃথিবীর একটা পোর্সান। ওখানে অনেকগুলো ছোট ছোট দেশ আছে।
ডাক্তারদাদা, ইসলামভাই, দামিনী মাসি, বড়মা, ছোটমা, দাদা, মল্লিকদা, এক একটা দ্বীপ আমরা দুজনে সকলকে একত্রিত করেছি।
কি দারুণ কথা বলেছে ডাক্তারদাদা।
ডাক্তারদাদার জীবনবোধটা ভীষণ গভীর। আমার সঙ্গে কিছুটা মেলে।
ঠিক বলেছিস।
কেন।
সেদিন বাড়ি ফিরে দেখলাম তোর ঘরের লাইট জ্বালা।
কি ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল তোকে বলে বোঝাতে পারব না। আজ বুবুন আমার কথা রেখেছে। গাড়ি থেকে নেমে সবার আগে ছুটে আমি ওপরে চলে এলাম। তোকে সারপ্রাইজ দেব। পা টিপে টিপে বারান্দা পার হয়ে তোর ঘরের সামনে এলাম। তুই একমনে ছবি আঁকছিস। আমি স্ট্যান্ট হয়ে গেলাম। তুই ছবি আঁকতে পারিস আমি জানতামই না।
পা টিপে টিপে তোর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তোর কোন খেয়াল নেই। এক মনে ছবি আঁকছিস। আমি যে তোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছি তুই বুঝতেও পারলি না। আবার সেই ভাবে নিচে নেমে এলাম। সবাইকে বললাম। ডাক্তারদাদা বললো ও সাধনা করছে, তোমরা ওকে বিরক্ত করো না।
আমি বললাম তোমরা দেখবে না। কি দারুন সব পেন্টিং করছে বুবুন।
ওরা সবাই এলো, নিস্তব্ধে দেখল চলে গেল। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ। ধৈর্য ধরতে পারলাম না। তোর সামনে গেলাম। তোর চোখদুটো তখন কি ভালো লাগছিল। তুই আমাকে দেখছিস, তবু যেন দেখছিস না।
হেসে ফেললাম।
মিত্রা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল।
জানিস বুবুন আমি ঈশ্বরের কাছে মনে প্রাণে প্রার্থনা করছি, যে আসছে সে যেইই হোক আমার গুণ যেন সে একটুও না পায়, তোর সব গুণগুলো সে যেন পায়।
তাই ?
হুঁ।
কেন তুই খারাপ।
ভালো বলি কি করে বল।
মন খারাপ করিস না। জীবনটা সব সময় এক খাতে বইবে সেটা হয় কি করে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
তোর বুবুন ত্রুটিহীন মানুষ নয়।
আমার থেকে অনেক গুণে ভালো।
তোর বুবুনেরও অনেক বেড পার্টনার থাকতে পারে। যদি কখনো জানতে পারিস কি করবি।
আমার বুবুনকে আমার কাছ থেকে কেউ কখনো ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
কে বলেছে তোর জ্যোতিষদাদা।
হুঁ।
ঘেঁচু।
তোর বুবুন কৃষ্ণ তার শতো গোপিণী।
তা থাক, তবু সে রাধার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।
ওরে বাবা খুব বুঝেছিস দেখছি।
আরও অনেক কিছু বুঝেছি তোকে এখন বলবো না।
আর একটা কি দেখাবি বললি, আমার ক্লু।
আজ থাক। আমার কথা শুনে তুই ক্লান্ত হয়ে পরেছিস। আর একদিন তোকে বলবো।
আমি ক্লান্ত হইনি, তুই বল।
জানিস আজ অবতার আর সাগির কনিষ্কর পা ধরে কি কান্না।
তোকে আমার ক্লু টা বলতে বললাম।
আজ ভাল লাগছে না। যেটা বলছি সেটা শোন না।
ঠিক আছে বল।
আমরা সবাই গেলাম।
ইসলামভাই একটু ভড়কে গেছে। কনিষ্কর পা ধরে অবতার সাগির কাঁদে কেন।

কি বলছিল ওরা।
তুই ছট্টুকে এনকাউন্টার করিয়েছিস ওদেরকেও ছাড়বি না। কনিষ্ককে দেখলে তখন তুই হাসবি না কাঁদবি।
কেন।
গম্ভীর হয়ে বললো। তোদের এখনো অনি বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি অনির জায়গায় থাকলে অনেক আগে মেরে দিতাম।
কনিষ্কর পা ধরে সে কি কান্না। ঢেউ তুলে তুলে। রতন, আবিদ, নেপলা হেসে গড়িয়ে পরে।
তারপর কনিষ্ক দামিনীমাসির দিকে তাকিয়ে বললো। তুমি জাননা মাসি, অনি এদের জন্য কি না করেছে। গুলি খেয়ে রাস্তায় পরে থেকেছে। খবর পেয়ে তুলে এনেছে।
রাতে হাসপাতালে এ্যাডমিসন না করে অপারেসন থিয়েটরে নিয়ে গিয়ে ওদের হাত থেকে পা থেকে গুলি বার করেছি আমি বটা। ওরা অনির বিরুদ্ধে স্কিম করে! ওদের জন্ম দিল অনি। আর ওরা যদি গাদ্দারি করে, বেঁচে থাকবে। আমি সাক্ষী আছি। কে কি বললো বুঝতে যাব না।
ছাড় পা ছাড়। আজ অনির বিয়ে মাথায় রাখিস।
তখন ইসলামভাই বললো অনি সেই জন্য ওদের আনতে বলেছে।
দেখ অনি তোদের নেমন্তন্ন করেছে, নিশ্চই কথায় কথায় একদিন বলেছিল আমার বিয়েতে তোদের নেমন্তন্ন করবো, আর তোরা স্কিম কর, অনিকে মারার জন্য।
সবাই হাঁ করে কনিষ্কর কথা শুনছে।
বটা দাঁড়িয়ে ছিল। দু’টোর হাত ধরে টেনে তুলে বললো যা ভেতরে চলে যা। রবিবার এসে অনির সঙ্গে দেখা করবি। না হলে এবার টেবিলে তুলে মেরে দেব। অনি জানতেও পারবে না। তারপর মর্গে পচে যাবি।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়ে আছি।
আচ্ছা বুবুন তুই এইসব করার সময় পেতিস কি করে ?
সেই জন্য তুই খুঁজে পাস নি।
এক থাপ্পর। আমার কথাটা আমাকে ঘুরিয়ে দিলি।
আমি হাসছি।
তোর সঙ্গে অর্ক ঝগড়া করবে।
কেন।
রবিবার আসুক বুঝতে পারবি।
তুইতো জানিস বল।
এখন বলবো না।
দরজায় কড়ানাড়ার শব্দ পেলাম।
ধ্যুস কি সুন্দর গল্প করছিলাম।
কটা বাজে খেয়াল আছে।
সত্যিতো। তোর কোলে শুয়ে আছি। কিছুই বুঝতে পারিনি। বুবুন আমরা ঘুমলাম না!
আমি হাসছি।
তুই কি রে, ভাবলাম তোর কাছে একটু আদর খাব।
এতো খেয়েও মন ভরলো না।
ভরে, তুই বল।
যা দরজা খোল।
মিত্রা উঠে গিয়ে দরজা খুললো।
ছোটমা।
আমি তাড়াতাড়ি করে ফাইলটা গুছিয়ে রাখলাম। বুঝতে পারছি ছোটমা মিত্রার দিকে তাকিয়ে কালকে কতটা আদর করেছি তার সন্ধান পেতে চাইছে। তাহলে খুনসুটি করবে।
কিরে! ও ওখানে বসে কি করছে! তোরা সারারাত ঘুমোস নি ?
মিত্রা সোজা সাপ্টা জবাব দিল, না।
কি করছিলি ড্যাবা ডেবীতে।
গল্প করছিলাম।
গল্প করতে করতে রাত কাবার!
হ্যাঁ।
কই দেখি চল।
ছোটমা ভেতরে এলো। চারিদিক অনুসন্ধিৎসু চোখে দেখলো।
আলমাড়ি খোলা! সামনে ফাইল!
তুই মাটিতে থেবরে বসে আছিস, তোদের ব্যাপারটা কি বলতো ?
চা এনেছো।
আনা হচ্ছে।
ওটার এখন ভীষণ দরকার। বড়মা ফোন করেছিল ?
করেছিল।
কখন যেতে বলেছে।
কেন।
ওখানে গিয়ে বাথরুমে যাব।
কেন এখানকার বাথরুম মনে ধরছে না। আগে তো অনেকবার ঢুকেছো।
দুজনে ঢোকা যাবে না।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে ফেললো।
দাঁড়া তো।
ছোটমা তেড়ে এলো কান ধরতে।
যতো বড় মুখ নয় ততবড় কথা।
ও ছোট করিস কি এই সাত সকালে।
বৌদি চায়ের পট কাপ-ডিশ ট্রে নিয়ে ঘরে এলো।
দেখো দিদি দেখো, সারারাত না ঘুমিয়ে দুটোতে ফাইল পত্র দেখেছে। আবার বলে কিনা ও বাড়িতে গিয়ে বাথরুমে ঢুকবে।
বৌদি চায়ের ট্রে সেন্টার টেবিলে রাখল। মিত্রার দিকে তাকাল। ভালো করে দেখে বললো।
কিরে সত্যি তোরা ঘুমোসনি!
মিত্রার মুখ দেখে বুঝতে পারছ না।
আমি হাসছি।
বৌদি ছোটমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো, সত্যি ছোট তুই পারিসও বটে।
বৌদি, তুমি কখন এলে ?
আমি গেলাম কখন যে আসব।
কেন।
বৌ নিয়েমতো ঘরে ঢুকলি বৌদির খোঁজ রেখেছিস।
আচ্ছা বাবা অন্যায় হয়েছে। সুরো কই।
ও বাড়িতে, তিনবার ফোন হয়ে গেছে। অনিদা কখন যাবে।
আমার খোঁজ খবর নেওয়ার ওই একটাই লোক আছে বুঝলে।
দেবোনা এক থাপ্পর, দাঁড়া দিদিকে খবরটা দিচ্ছি। ছোটমা বললো।
বৌদি, সকাল বেলা এত অত্যাচার ঠিক হচ্ছে না।
সত্যি তোরা ঘুমসনি!
চায়ে চুমুক দিলাম।
আঃ।
আর আয়েশ করতে হবে না। বৌটাকে দাও। নিজে খেলে খালি হবে।
নিয়ে নিক।
দেখেছ ছেলের কথা। ছোটমা বললো।
জানো বৌদি একটা কাজ করছিলাম, দেখলাম সাতটা বেজে গেছে। তোমরা আরও সকালে ডাকতে পারতে।
হাসছি। মিত্রাও হাসছে।
ছোটমা।
বলুন।
হাসলাম।
কিছু খাবর জুটবে।
তোকে দেখলে গা পিত্তি জলে যাচ্ছে। নিজেও ঘুমোস নি, মেয়েটাকেও ঘুমোতে দিস নি। দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
দেখলি মিত্রা, কে দোষ করলো, কার ঘারে দোষ পরলো।
ছোটমা ঘর থেকে গট গট করে বেরিয়ে গেল। বৌদি সোফায় বোসল, কাপে চা ঢেলে নিল।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে।
আয়। বোস এখানে।
মিত্রা গিয়ে বৌদির পাশে বসলো।
ঘুমোসনি কেন।
আমি হাসছি। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর বৌদির দিকে তাকাল।
ও ঘুমোতে দেয় নি। বললো চল গল্প করি।
সারারাত!
বিশ্বাস করো, বুঝতে পারি নি।
নিশ্চই কোন জরুরি বিষয় নিয়ে গল্প হচ্ছিল বল।
কতোদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়নি বলো। অনেক জমে ছিল।
আজ সব শেষ করে দিলি।
কিছুটা, এখনো বাকি আছে।
ছোটমা ঘরে ঢুকলো।
আমি হেসে বললাম প্রমপ্ট এ্যাকসন।
তা বলবে না।
ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল।
বলো।
কিরে তুই নাকি ঘুমোস নি! বড়মার গলা।
তুমি চলে এসো, দেখে যাও।
ছোট বললো।
চা চেয়েছি, তাই।
ছোটমা আমার কান ধরে মুলে দিল, আমি উ করে উঠলাম।
কি হলো রে।
ছোটমা কান মুলে দিল।
বেশ করেছে।
কখন বাড়ি যাব বলো।
কেন থাকতে ভালো লাগছে না।
বল না বল, ওখানে গিয়ে বাথরুমে ঢুকবো। ছোটমা বললো।
আমি হাসছি।
তুমি ছোটমার সঙ্গে কথা বলো।
দে।
আমি ছোটমার হাতে ফোনটা চালান করে দিলাম।
বৌদি টিনারা কোথায় ?
সব ও বাড়িতে চলে গেছে।
ওরা যে থাকবে বলেছিল।
বৌদি হাসলো।
কিরে, তুই যাবি, না আমি সেরে নেব।
তুই যা।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ফাইলটা আলমাড়িতে তুলে রাখলাম। পাঞ্জাবীটা খুলে বিছানায় ছুঁরে ফেলে দিলাম। বাথরুমের দিকে এগোলাম।
কিরে তুই কাপর পড়ে যাবি ? মিত্রা বললো।
কেন কি হয়েছে ?
দাঁড়া আমি তোকে টাওয়েল দিচ্ছি।
দোখছো বৌদি, কান্ড দেখ।
কান্ড দেখবে কি রে। গর্ধভ কোথাকার। ছোটমা বললো।
তখন থেকে যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছ। দাঁড়াও ওখানে গিয়ে মল্লিকদাকে রিপোর্ট করছি।
ছোটমা হেসে ফেললো।
বাড়িতে যখন পৌঁছলাম সাড়ে দশটা বাজে। ছগনলাল ঢুকতে দেখেই হাসলো।
দেখলাম বাড়ি ভর্তি লোক। সবাই হাজির এই সময়। আমি মিত্রা গাড়িতে, সবাই নেমে এলো। বড়মা বরণ করলো। দু’জনকে আমার ঘরে নিয়ে গেল। হৈ হৈ রৈ রৈ বেশ মজা লাগছিল। উপকরণের কোন অভাব নেই। যেন মোচ্ছব বসে গেছে। কাজ কর্ম শেষে খাওয়া দাওয়া হল। আর এক চোট হৈ হৈ। মিত্রা বললো আমি বড়মার ঘরে একটু নাক ডেকে ঘুমবো।
আমি ওপরে চলে এলাম।
দেবাকে বললাম আয় তোদের সঙ্গে কিছু কথা সেরে নেই। বড়মা বললো তুই একটু ঘুমিয়ে নে। আমি বললাম না। পরে ঘুমচ্ছি।

ওপরে উঠে এলাম। চারিদিকে একটা বিয়ে বিয়ে গন্ধ। ঘুম নেই কিন্তু শরীরে ক্লান্তিও সেই ভাবে নেই। আমি এসে জানলার সামনে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট খেলাম। ছোট ছোট চকমকি লাইট দিয়ে বাড়ি সাজান চলছে। ইসলামভাই-এর পাগলাম। মনে মনে হাসলাম। মিত্রার সব কথা হুড়মুড় করে মনের মধ্যে এসে ভিড় করছে।
মানুষের মন। সত্যি কি থেকে কি হয়ে গেল। ভাবতেই পারছিনা। মিত্রার লাইফটা বারে বারে ঘুরে ফিরে আমার চোখের সামনে ভেসে আসছে। সত্যি কি ও এক সময়ে বুহু পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী ছিল ? ও নিজে মুখে স্বীকার করেছে।
কেমন যেন লাগছে। আমার মিত্রা। যাকে আমি মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছি কই আমার মধ্যে কোন ফাঁকি ছিল না।
তাহলে মিত্রা ?
ও একটা মেয়ে। মেয়েদের অনেক বাধ্য বাধকতা থাকে। ও স্বীকার করে নিয়েছে। ওই সময় গা ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া ওর কোন উপায় ছিলনা। তাহলে আমি ওকে ভুল ভাববার চেষ্টা করছি কেন ? আমি যদি ওর জায়গায় থাকতাম ?
তাহলে আমিও হয়তো এর থেকে কিছু কম যেতাম না। যতই হোক আমি একটা ছেলে। আমি এই পৃথিবীতে যেভাবে লড়াই করতে পারব, একটা মেয়ের পক্ষে সে ভাবে লড়াই করা সম্ভব নয়। নিজের মনকে বোঝালাম, মিত্রাকে ভুল ভাবা আমার কখনোই উচিত নয়।
আমার একটা ব্যাপারে ওর কাছে সব সময় ঋণী থাকা উচিত। ও আমাকে নতুন দিশা দিয়েছে। আমাকে নতুন ভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে।
কিরে কি করছিস ওখানে দাঁড়িয়ে।
ফিরে দাঁড়ালাম।
আয়।
দেবারা পাঁচজন।
টিনা এগিয়ে এলো। ভ্রু নাচিয়ে বললো, অনিদা কাল রাতটা কেমন কাটালে।
টিনার মুখের দিকে তাকালাম। খুব একটা ভাল নয়।
কেন!
টিনার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
তোমরা চলে এলে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।
টিনা ফিক করে হেসে ফেললো।
এই জন্য।
হ্যাঁ।
বিশ্বাস করো কালকে একটু নিজেদের ফ্ল্যাটে গেছিলাম আমি আর মিলি। এখানেই পরে আছি দিন পাঁচেক হলো। একবার দেখতে গেলাম।
ভালো করেছো।
আমি খাটে এসে বসলাম। কিরে দেবা কাল কেমন মজা করলি।
দারুণ।
আনিদার বিয়েটা স্মরণীয় হয়ে থাকল আমাদের কাছে।
কেন অদিতী।
তোমার না বলা অনেক কথা কাল শুনলাম। তোমার নতুন নতুন জগৎ নতুন নতুন দিক।
অনিদাটা খুব খারাপ না।
এই তুমি শুরু করতে চাইছ। মিলি বললো।
হেসে ফেললাম। জানো অদিতী একটা সময় আমার সেরকম কোন কাজ ছিল না। বদ সঙ্গ বদ নেশা করতে পারি নি। তাই কি করবো, নেই কাজ তো খই ভাজ।
ওরা হাসছে।
আচ্ছা মৈনাক তোকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করাল কনিষ্কদের সঙ্গে। তুই ওদের আপন হয়ে গেলি, আর মৈনাক ফুটে গেল, ব্যাপারটা কি বলতো ?
কি করে বলবো। আমার ভালো লাগতো, তাই ওদের কাছে যেতাম। তারপর দেখলাম আমি ওদের মতো না হলেও, ওরা আমাকে বন্ধু হিসাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, তাই হয়তো টিঁকেগেলাম।
অনিদা আমাদের একবার ভালোপাহাড়ে নিয়ে যাবে। কনিষ্কদার মুখ থেকে ভালোপাহাড়ের কথা শুনে মনে হচ্ছিল এখুনি ওখানে চলে যাই। মিলি বললো।
তোমরা যেতে পারবে না।
কেন।
অনেকটা হাঁটতে হয়, চড়াই উতরাই।
তুমি প্রোগ্রাম করো, যাব। টিনা বললো।
কনিষ্করা কম বেশি রেগুলার যায়। ওদের বলে দিচ্ছি ঘুরে এসো।
তুমি না গেলে মজা নেই।
কেন, কনিষ্ক খুব ভালো ছেলে।
পাগল! কি গলা। গম গম করছে যেন। কি পার্সোনালিটি! মিত্রাদিকে কাল অনেক কথা বলেছে তোমার সম্বন্ধে। শেষে বলেছে ওকে কখনো ভুল বুঝবেন না। ঠকে যাবেন। মিলি বললো।
ও আমাকে একটু বেশি ভালবাসে, তাই সব সময় বারিয়ে বারিয়ে বলে।
আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কনিষ্কদা অনিদা আপনাদের কিরকম বন্ধু।
হাসলাম।
হেসো না, বলে কিনা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যেমন বন্ধুত্ব থাকে তেমন।
তোমাদের মিত্রাদি বলে ওঠে নি, গে কিনা।
সেটা মিলি বলেছে। টিনা বললো।
তাতে কি উত্তর দিলো কনিষ্ক।
বললো অনি না থাকলে সে বছর আমরা ডাক্তার হতে পারতাম না, পরের বছর লেগে যেত।
হাসলাম।
আচ্ছা ডোমেদের সঙ্গেও তোমার বন্ধুত্ব আছে।
ওরা আমার নিউজ সোর্স। হাসপাতালের খবর ওদের থেকে বেশি কেউ রাখে না।
মিত্রা নাচতে নাচতে ঘরে এসে ঢুকলো।
কিরে তুই ঘুমলি না!
ঘুম আসে। তুই জমিয়ে গল্প করছিস।
ওই দেখ, সবাই এসে হাজির।
তোকে দেখতে এলাম।
এসো এসো বসো অনিদার গল্প শোনো। টিনা বললো।
সবাই খাট জুড়ে বসলো। মিত্রা আমার ঘারে উঠে বসলো। আর একপাশে সুরো ঘারে উঠেছে।
কোনটা বলছে রে।
কালকে কনিষ্কদা বললো না অনি না থাকলে ওই বছর ডাক্তার হতে পারতাম না।
কিরে আমাদের বাদ দিয়ে ঝেড়ে দিচ্ছিলি।
দেনা দে পিঠে একটা গুম করে। ছোটমা বললো।
বড়মা, ছোটমা সকাল থেকে….
ছোটমা তেড়ে এলো।
বৌদি সাক্ষী আছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমি হাসছি।
কি বুঝছো বড়মা। তোমাদের দুটো বললাম এটা থার্ড, কনিষ্ক একটু ছুঁয়ে গেছে। মিত্রা বললো।
বড়মা ইজি চেয়ারে হেলান দিয়েছে। পান চিবচ্ছে পুচুর পুচুর।
কিগো নিজে একটা বেশ গুছিয়ে মোটা করে চিবচ্ছ, আমারটা কোথায়।
তোকে খেতে হবে না জিভ মোটা হয়ে যাবে। ছোটমা বললো।
ওমা দেখি সবার গাল ফোলা। কিগো বৌদি ?
আমারও মুখে ছিলো, শেষ করে ফেলেছি। কানের কাছে সুরো ঘ্যানর ঘ্যানর করলো।
ভালো করেছো, এবার পরীক্ষার আগে নোটটা চেয়ো, লবডঙ্কা দেখাব।
আমার ভেঙচি কাটাতে, সকলে হাসছে।
বলনা। মিত্রা বললো।
দেরি করিস না এখুনি বিকেল হয়ে যাবে, অনেক কাজ। ছোটমা বললো।
কি শুনবে, মরা ঘাঁটার গল্প।
বড়ম ওয়াক করে উঠলো।
দেখলে, আর হবে না। এবার বমি করে ফেলবে।
পানটা গলায় আটকে গেছিল। বড়মা বললো।
আবার হাসি।
ওমনি ছোট করে একটা দিলে।
সবাই হাসে।
আমি কিন্তু এডিট করে বলবো।
তাই বল।
কনিষ্কদের একটা পেপার আছে বুঝলে বড়মা, ডেড বডি দেখে পরীক্ষা দিতে হয়। তাও আবার ফ্রেস বডি হতে হবে। এটা আনসিন কোশ্চেনের মতো। কিরকম বডি পরবে কেউ জানে না। ধরো তোমার বডি আর ছোটমার বডি এক।
না। ও একটু রোগা আমি একটু মোটা।
তেমনি মিলির বডি আর সুরোর বডি এক।
না।
অতএব অন দ্যা স্পট বডি দেখে পরীক্ষা দেওয়া খুব টাফ। তার থেকে যদি বডিটা আগে দেখে নেওয়া যায় তাহলে বডির কেমন স্ট্রাকচার সে গুলো দেখে নেওয়া যায়। পরীক্ষাটা ভালো হয়, নম্বর ভালো পাওয়া যায়। গ্রেডেসান বেড়ে যায়।
এই বডি থাকে কোথায় ?
মর্গে।
সেখান থেকে বডি বার করে এনে ট্রেতে রাখা হয়। সবাই দেখে আর পরীক্ষা দেয়। অনেক মাপ জোক আছে, ওটা ওরা ভালো বলতে পারবে।
তুই মর্গে ঢুকলি। মিত্রা বললো।
হ্যাঁ।
গন্ধ লাগে নি।
সেতো ভালো গন্ধ।
সবাই এমাগো করে উঠলো।
পরীক্ষার আগে আড্ডা মারতে গেলাম ওদের হোস্টেলে। নীরু বললো অনি তুই এ যাত্রায় বাঁচা। বললাম কেনো রে, আবার ভূত। ওরা সব ডিটেলসে বললো। আমি বললাম দাঁড়া আমার পরিচিত লোকটার ডিউটি যদি মর্গে থাকে তাহলে হিল্লে হয়ে যাবে।
তোর সঙ্গে ডোমেদের পরিচয় আছে ? ছোটমা বললো।
হ্যাঁ। ওরা আমার নিউজ সোর্স।
তোর আর কোথায় কোথায় নিউজ সোর্স আছে বলতো। বড়মা বললো।
তাহলে তোমায় বলছি কি বড়মা। টিনা বললো।
রাত তখন বারটা সাড়ে বারটা বাজে। মেডিকেলের মর্গটা একটু ব্যাকোয়ার্ড পজিসনে বুঝলে। আমি গেলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ। ওখানটা একটু একটু অন্ধকার। ব্যাটারা লাইট লাগালেও ভেঙে দেয়।
কেন।
মদ খেতে অসুবিধা।
দেখলাম আমার পরিচিত লোকটা নেই ওর এক সাগরেদ আছে। বসে বসে মদ গিলছে। কাছে যেতেই বললো, ভেতরে তোমার মাল আছে নাকি অনিদা ? বললাম আছে।
কেন তোর কি প্রচুর মরা বন্ধু ছিল।
ঠিক তা নয় সে আবার অন্য গল্প বলতে হয় তোমাকে।
এটা আগে শুনি পরে ওটা শুনবো।
মিত্রা হাসছে। সুরো আমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসেছে।
ডোম ব্যাটা বললো কার ?
বললাম বিকেলে লাইনে গলা মেরেছে। আলটপকা আর কি। বুঝলে। ওরা বলেছে পরীক্ষায় ফ্রেস বডি দেবে।
গলাকাটা বডি ফ্রেস বডি। মিত্রা বললো।
কেন তোর বডি দেবে পরীক্ষার খাতায়, ছাগল।
সবাই হাসে।
তোর বডিটা দিতে পারত।
তাহলে কাল বিয়ে করতে পারতিস না।
উঃ থামনা মিত্রা। বৌদি বললো।
দেখছো বৌদি বড়মা কেমন চুপ করে শুনছে। এই বেলা কিছু বলতে পারছে না।
বলবো, আগে শুনে নিই।
তা বললো আছে, আন ওটেড (ওয়ান্টেড) বাডি (বডি) পোস্ট মটেম (মর্টেম) হয় নি। ওরাও মাঝে মাঝে ইংরাজী ঝাড়ে। সে ইংরাজী শুনলে তোমার মাথা খারপ হয়ে যাবে।
আমি বললাম, কেন।
কাল নতুন ডাক্তারদের কি কাজে লাগবে, তারপর পোস্ট মর্টেম হবে।
বুঝে গেলাম ওই বডিটা কনিষ্কদের দেবে।
চলতো দেখি, আমার পরিচিত লোকের বডি ডাক্তারদের কাজে লাগাব।

চলবে

কিছু লিখুন অন্তত শেয়ার হলেও করুন!

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s